📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর অপসারণ

📄 খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর অপসারণ


ইসলামের শত্রুরা অবাস্তব কল্পনা ও গভীর আক্রোশের বশবর্তী হয়ে এমন- সব বর্ণনার সন্ধান লাভ করে যাতে সাহাবায়ে কেরামে চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করা সম্ভব হয়। যদি তারা তাদের পরিকল্পনা ও সন্তুষ্টি অনুযায়ী বর্ণনা খুঁজে না পেত, তাহলে বানোয়াট বর্ণনার আশ্রয় নিত। আর এতে তারা আশা করে, লোকেরা এসব গ্রহণ করবে এবং তারাই এর বর্ণনাকারী ও উৎসে পরিণত হবে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু—উভয়েই এসব বানোয়াট গল্পের শিকার হয়েছেন যেখানে ইসলামের শত্রুরা ঐতিহাসিক বর্ণনাকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পদচ্যুত করলেন এ বিষয়ে তারা সবচেয়ে বেশি নযর দিয়েছে। আর তারা এই দুই মহান ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে এবং এমন-সব বর্ণনা জুড়ে দিয়েছে যা কোনোভাবেই সত্যের ধারেকাছেও নেই।২৩৭ নিচে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর পদচ্যুতির সত্য ঘটনা তুলে ধরা হলো যা মূলত দুটি স্তরে সম্পন্ন হয়েছিল এবং এ জন্য মহান উদ্দেশ্য লুক্কায়িত ছিল।

৩.৪.১। প্রথম অপসারণ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে প্রথমে সিরিয়ার গভর্নর ও সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করেন। এটি সংঘটিত হয় ১৩ হিজরীতে যখন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এই অপসারণের মূলে ছিল গভর্নরদের নিয়ন্ত্রণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, যা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু মতো ছিল না। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরদের ইসলামী রাষ্ট্রের সাধারণ নীতির মধ্যে পুরোপুরি স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। এতে শর্ত ছিল, ব্যক্তি এবং দলের সঙ্গে তাদের সম্পূর্ণ ন্যায়সংগত ও নিরপেক্ষ আচরণ করতে হবে। তিনি নিজেই রাষ্ট্রে সুবিচার নিশ্চিত করতেন। তবে তার গভর্নরগণ ন্যায়সংগতভাবে বিচারকার্য করলেও তিনি কিছু মনে করতেন না। খলীফার অনুমতিক্রমে গভর্নরগণ তাদের নিজ নিজ প্রদেশের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন। ছোট ছোট বিষয়ে খলীফার দ্বারস্থ হতে হতো না। প্রদেশে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হলে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পদ কিংবা অন্য কোনো কারণে গভর্নরদের ক্ষমতাকে খর্ব করার প্রয়োজন মনে করতেন না।২৩৮ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পরামর্শ দেন, তিনি যেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তার অনুমতি ব্যতীত কাউকে ছাগল কিংবা উট প্রদান না করে। এই পরামর্শ অনুযায়ী আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠি প্রেরণ করেন এবং এর উত্তরে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ লিখে পাঠান: আমাকে আমার মতো কাজ করার সুযোগ দিন, নতুবা আপনাকেই তা করতে হবে।' তখন খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পদচ্যুত করার জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পরামর্শ দেন।২০৯ তবে খলীফাতুর রাসূল আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে স্বপদে বহাল রাখেন। ২৪০
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন খলীফা হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি মনে করেন, গভর্নর ও প্রশাসকদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যা প্রদেশের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে অনুসরণ করা হবে। তিনি প্রদেশে সংঘটিত ছোট-বড় সবকিছুই খলীফাকে জানানো বাধ্যতামূলক করে দেন যাতে তিনি বিষয়গুলো তদন্ত করতে পারেন এবং সে অনুযায়ী নির্দেশ জারি করতে সক্ষম হন। আর গভর্নরগণ তার নির্দেশ পালনে বাধ্য থাকবে। কারণ, তিনি মনে করতেন, ইসলামী রাষ্ট্রের খলীফা স্বয়ং যা করেন, এ জন্য তিনি যেমনভাবে দায়ী, তেমনি তার গভর্নরগণ যা কিছু করবে, তার জন্যও খলীফা দায়ী হবেন। আর এ দায়-দায়িত্ব থেকে সবচেয়ে উত্তম গভর্নর নির্বাচন করেও ছাড় পাওয়া যাবে না। তিনি খলীফা নির্বাচিত হয়ে জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি বলেন : 'আমার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের পরীক্ষা করছেন এবং তোমাদের মাধ্যমে আমাকে পরীক্ষা করছেন। আর আমার দুজন সাথি আল্লাহ তা'আলার কাছে চলে গেছেন এবং আল্লাহ আমাকে এখনো জীবিত রেখেছেন। আল্লাহর কসম, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি নিজে তোমাদের দায়িত্ব সরাসরি পালন করতে পারব ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য কারও হাতে তোমাদের ছেড়ে দেব না। আর যেসব কাজ সরাসরি করতে পারব না সেসবের দায়িত্ব আমি যোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য লোকের হাতে দেব। আল্লাহর কসম, তারা (গভর্নররা) যদি ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করে, তবে আমি তাদের পুরস্কৃত করব, আর অন্যায় করলে কঠিন শাস্তি দেব।'২৪১
তিনি আরও বলতেন, 'যদি আমি সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে তোমাদের শাসক হিসাবে নিয়োগ দিই এবং তাকে ন্যায়-পরায়ণতার সঙ্গে শাসন করতে বলি, তাহলে তোমরা কি মনে করো যে, আমি আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছি?' তারা বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'না। যতক্ষণ না আমি তার আচরণ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি এবং তাকে যা করার নির্দেশ দিয়েছি, তা সে যথাযথভাবে পালন করেছে, ততক্ষণ আমার দায়িত্ব পরিপূর্ণ হবে না।' ২৪২
খলীফা হওয়ার পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই প্রত্যাশা করলেন যে, প্রাদেশিক গভর্নরগণ তার পদ্ধতিকে অনুসরণ করবে। তাদের কেউ কেউ সেটি মেনে নিল এবং অন্যরা দ্বিমত পোষণ করল। যারা তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন, তাদের একজন ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু। ২৪৩ মালিক ইবনে আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, খলীফা হওয়ার পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লিখে পাঠান : 'আমার অনুমতি ছাড়া কাউকে একটি ছাগল কিংবা উটও দেবে না।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এই চিঠির জবাবে লেখেন : হয় আপনি আমাকে আমার মতো কাজ করার সুযোগ দেবেন, নতুবা আপনাকেই এর দায়িত্ব নিতে হবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর প্রতি আমার অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ পাবে যদি আমি যা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলাম, আমি নিজেই (সেই সুযোগ পেয়ে) তা না করি।' সুতরাং তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করলেন। ২৪৪ অধিকন্তু তিনি তাকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দায়িত্ব দিতে চেয়েছেন, কিন্তু তিনি স্বাধীনভাবে ওই দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছেন, যার অনুমতি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দেননি। ২৪৫
অতএব, রাষ্ট্র পরিচালনায় গৃহীত নীতির ওপর ভিত্তি করেই তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করেছিলেন। আর শাসকগণ রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন দিকনির্দেশনা দিতেই পারেন (শরীয়তের সীমার মধ্যে)। এ রকম ঘটনা আমাদের জীবন অহরহ ঘটছে। বিভিন্ন বর্ণনা, মতামত, নিজস্ব বিজ্ঞোচিত দর্শন ও প্রভাব বিবেচনা করে এর পেছনে জটিল কোনো কারণ খুঁজে বের করার প্রয়োজন নেই। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন এক সময় ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন যখন লোকেরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগের খুব নিকটবর্তী ছিল। মৌলিকভাবেই রাষ্ট্রের প্রাদেশিক গভর্নর ও সেনাপতি নির্বাচন খলীফার অন্যতম দায়িত্ব। স্বভাবতই তারা এমন ব্যক্তি হবেন যারা খলীফার চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করবে এবং তার অনুসৃত নীতি ও পথকে মেনে চলবে। উল্লেখ্য, তখন উম্মতের মধ্যে যোগ্য ও বিশ্বস্ত লোকের কোনো কমতি ছিল না। গভর্নর ও সেনাপতিরা চিরকাল তাদের পদে অধিষ্ঠিত থাকার অধিকার রাখেন না। আর যখন রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে গভর্নরের মতের অমিল হয়, তখন গভর্নরদের আর দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকে না যেখানে আরও অনেকেই রাষ্ট্রনায়কের মতকে অনুসরণ করে দায়িত্ব পালনে আগ্রহী ব্যক্তি-বর্গ রয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ ব্যাপারে খুবই সফল ছিলেন এবং তার গৃহীত নীতিসমূহ অকল্পনীয় সফলতা অর্জন করে। তিনি কয়েকজনকে বরখাস্ত করেন এবং তাদের পরিবর্তে অন্যদের নিয়োগ দেন। নতুন যাদের নিয়োগ দেন, তারা কোনো অংশেই পূর্ববর্তী গভর্নরদের চেয়ে যোগ্যতায় কম ছিলেন না। কারণ, তখন এ রকম দায়িত্ব পালন করার জন্য যোগ্য ও সাহসী লোকের সংখ্যা ছিল অনেক। ২৪৬
কোনো রকমের প্রতিবাদ ছাড়াই খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পদচ্যুতিকে গ্রহণ করেন এবং তিনি আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্ব মেনে চলেন। পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তা'আলা তাকে কিন্নিসিরিন বিজয়ের সুযোগ দিলে আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি খলীফাকে এই বিজয় সম্পর্কে অবহিত করেন এবং সেখানে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবদান তুলে ধরেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন তার বিখ্যাত উক্তিটি করেন : খালিদ নিজেই নিজেকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করেছে। আল্লাহ আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওপর রহম করুন, মানুষ সম্পর্কে আমার চেয়ে তার বেশি জ্ঞান ছিল।'২৪৭ এ কথা বলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সাহসী ও বীরোচিত কাজের জন্য নিজেকে এমন এক উচ্চতায় আসীন করেছিলেন, যা করতেই তিনি অভ্যস্ত—বিপজ্জনক, সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পারদর্শী। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যেন বোঝাতে চেয়েছেন, তার পরামর্শ সত্ত্বেও আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু যোগ্যতা ও সামরিক দক্ষতার কথা বিবেচনা করে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করেননি। এর মানে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ কয়েকজন বীর ছাড়া অন্য কারও পক্ষে তার স্থান পূরণ করার মতো লোক ছিল না। ২৪৮
এ-সময় খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রায় চার বছর আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে কাজ করেন এবং তিনি মুহূর্তের জন্যও তার অবাধ্য হননি। আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর মহান গুণাবলিকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবস্থাকে সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং সেভাবেই তিনি তার সঙ্গে সম্মান ও দয়ার আচরণ করেছেন। তিনি তাকে নিজের কাছাকাছি রাখতেন, যখন-তখন তার সঙ্গে পরামর্শ করতেন, তার মতামতকে গুরুত্ব দিতেন এবং কখনো কখনো তাকে নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে দিতেন। এসব কারণেই খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মনে কোনো ধরনের আক্রোশ বাসা বাঁধতে পারেনি এবং ফলে তার পক্ষে সামরিক ক্ষেত্রেও এত বীরোচিত ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়েছে। দামেস্ক, কিন্নিসিরিন এবং অহল বিজয় তার ঐশী মনোবলের সাক্ষী যা পদচ্যুতির ঘোষণা শোনার পর তার আচরণে ফুটে উঠেছিল। উভয় ক্ষেত্রেই (বরখাস্ত হওয়ার আগে এবং পরে) তিনি ছিলেন আল্লাহর তরবারি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু। ২৪৯
ইতিহাস বিস্মৃত হয়নি সেই কথা, যা খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বরখাস্তের সময় আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন: 'এটি দুনিয়ার কোনো ক্ষমতা নয় যা আমি চাই এবং আমি যা কিছু করি তা এই দুনিয়ার জন্য নয়। তুমি যা কিছু দেখছ, তা শীঘ্রই নিঃশেষ হয়ে যাবে। অথচ আমরা পরস্পর ভাই, যারা আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি এবং এটি কোনো ব্যাপার নয় যে, ভাইদের একজন অপরজনের ধর্মীয় ও দুনিয়ার বিষয়াদিতে নেতৃত্ব দেবে; বরং যার ওপর নেতৃত্বের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হলো সে-ই বেশি অস্থিরতা ও গোনাহের ঝুঁকিতে রয়েছে—তারা ব্যতীত যাদের আল্লাহ হেফাজত করেন এবং তাদের সংখ্যা খুবই কম। ২৫০
যখন আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সামরিক অভিযান পরচালনা করার নির্দেশ দিতেন, তিনি তা সানন্দেই গ্রহণ করেন এবং বলেন, 'ইনশাআল্লাহ আমি তা করব। আমি কেবল আপনার নির্দেশের অপেক্ষায়ই ছিলাম।' আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তোমাকে কিছু বলতে আমার খুব লজ্জা লাগে, হে আবু সুলাইমান।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'যদি কোনো ছোট শিশুকেও আমার ওপর নিয়োগ করা হয়, আমি তাকে মেনে চলব। আমি কেমন করে আপনার বিরুদ্ধে যাব যেখানে আপনি আমার আগে ইসলামে দাখিল হয়েছেন এবং আপনি তাদের সাথেই ঈমান এনেছেন যারা দ্রুত ইসলামে দাখিল হওয়ার জন্য উদ্‌গ্রীব ছিলেন। আর স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে 'আল-আমীন' বলে সম্বোধন করেছেন। আমি কেমন করে আপনার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হব? এখন আপনাকে আমি সাক্ষী বানাচ্ছি যে, আমি পুরোপুরিভাবে নিজেকে আল্লাহর জন্য সোপর্দ করলাম এবং আমি কখনোই আপনার অবাধ্য হব না এবং এরপরে আর কখনো গভর্নরের পদ গ্রহণ করব না।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এখানেই থেমে যাননি; বরং তিনি তা বাস্তবে করে দেখিয়েছেন এবং তাকে যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তিনি তা দ্রুত বাস্তবায়নে বেরিয়ে পড়েন। ২৫১
খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা ও কাজ থেকে এটি পরিষ্কার যে, ধর্মীয় ও মানবিক অনুভূতিই তাদের মধ্যে পারস্পরিক সদাচরণে মূল ভূমিকা রাখে। খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা ও গভর্নরের প্রতি আনুগত্যের নীতি বজায় রেখেছেন যদিও পদচ্যুতির কারণে তার ব্যক্তিগত অবস্থান ও মর্যাদা পরিবর্তিত হয়েছে-সেনাপতি থেকে সাধারণ সৈনিকে পরিণত হয়েছেন। ২৫২ গভর্নরের পদ থেকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অপসারণের মূলে তার বিরুদ্ধে কোনো বিদ্বেষ, সন্দেহ কিংবা শরীয়তের সীমালঙ্ঘন বা তার ইসলামী মূল্যবোধ ও ন্যায়পরায়ণতায় কোনো কলঙ্ক দায়ী ছিল না; বরং এখানে ইসলামের দুই মহান ব্যক্তির দুটি ভিন্ন পদ্ধতির বাস্তবায়ন প্রতিফলিত হয়েছে যেখানে উভয়ে মনে করেছেন, তাদের নিজস্ব পদ্ধতিই প্রয়োগ করা উচিত। যদি তাদের একজনকে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তাহলে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি খলীফার জন্যই এই ত্যাগ স্বীকার করবেন-কোনো হীনম্মন্যতা কিংবা কোনো ক্রোধ বা আক্রোশ ছাড়াই। ২৫৩
আল্লাহর অনুগ্রহে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ায় মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ দেন। ইয়ারমুকের যুদ্ধের পর ওই এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন ছিল যাতে মানুষের মধ্যে শত্রুতা চিরতরে শেষ হয়ে যায়, আহতরা সুস্থ হয়ে ওঠে এবং তাদের অন্তরগুলো বিবাদ-বিসংবাদ ভুলে আবার এক হয়ে ওঠে। সুযোগ পাওয়ামাত্রই আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যান, কিন্তু প্রয়োজনে লড়তে তিনি পিছপা হননি। সিরিয়ার বিভিন্ন শহরের লোকেরা আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর সহনশীলতার পরিচয় পেয়ে দলে দলে এসে তার নিকট শান্তিচুক্তি করে; তারা অন্য কারও থেকে তার সঙ্গেই চুক্তি করতে পছন্দ করে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশেই আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং প্রদেশের সর্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষায় সিরিয়ার গভর্নর হিসাবে তার এই নিয়োগ ছিল যথোপযুক্ত। ২৫৪

৩.৪.২। দ্বিতীয় অপসারণ
কিন্নিসিরিনের গভর্নর পদ থেকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আবার (দ্বিতীয়বার) পদচ্যুত করা হয়। আর এটি সংঘটিত হয় ১৭ হিজরীতে। ২৫৫ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট খবর পৌঁছে যে, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আইয়ায ইবনে গানাম রাযিয়াল্লাহু আনহু বাইজেন্টাইন বর্ডার ভেদ করে অভিযান পরিচালন করেন এবং বিপুল-পরিমাণ গনীমতের মাল নিয়ে আসেন। অনেক দূর থেকে তার নিকট একজন লোক সাহায্যের আশায় আসে। তার সঙ্গে আল-আশাস ইবনে কাইসও ছিলেন, যাকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দশ হাজার দিরহাম প্রদান করেন। তিনি যা কিছু করেছেন, তার সব খবরই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কানে আসে। ২৫৬
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সেনাপতি আবু উবাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর চিঠি প্রেরণ করেন যাতে তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই বিপুল- পরিমাণ অর্থের উৎস সন্ধান করতে বলেন এবং তাকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যেকোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতে বলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মদীনায় ডেকে আনেন এবং আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর সম্মুখে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরিশেষে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গনীমতের মাল থেকে দশ হাজার দিরহাম নেওয়ার অভিযোগের ব্যাপারে পুরোপুরি নির্দোষ সাব্যস্ত হন। ২৫৭
খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পদচ্যুতির ব্যাপারে জানানো হলে তিনি সিরিয়াবাসীদের বিদায় সম্ভাষণ জানান। তার কথায় সেনাপতি ও সৈন্যদের মধ্যে চিরায়ত বিচ্ছেদের কষ্ট ফুটে ওঠে : আমীরুল মুমিনীন আমাকে সিরিয়ার গভর্নর হিসাবে নিযুক্ত করেন। যখন সব গোলযোগ শেষ হয়ে পরিস্থিতি শান্ত এবং স্থির হতে থাকে, তখন তিনি আমাকে অপসারণ করেন।' এক লোক দাঁড়িয়ে বলে ওঠে, 'হে মহান সেনাপতি, ধৈর্যধারণ করুন। এখন ফিতনার সময় ধেয়ে আসছে।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'যতদিন উমর ইবনুল খাত্তাব জীবিত থাকবেন, ততদিন কোনো ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।'২৫৮ এটি খুবই শক্তিশালী এবং একনিষ্ঠ ঈমানের প্রকাশ, যা আল্লাহর রাসূলের ঘনিষ্ঠ সাহাবীদের মধ্যে নির্বাচিত বান্দাদের ছাড়া অন্য কাউকে দেওয়া হয়নি। এক চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কি এক পরম ঐশ্বরিক শক্তি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল, যা তাকে এ রকম উত্তর দিতে সমর্থ করেছিল?২৫৯ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের সমর্থনে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ভাষ্য শুনে লোকজন শান্ত হয়ে যায়। তারা অনুধাবন করে, তাদের বহিষ্কৃত সেনাপতি এমন কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন, যে কিনা বিদ্রোহ ও ফিতনা ছড়িয়ে খলীফার বিরুদ্ধাচরণ করে নিজের গৌরব প্রকাশ করবেন; বরং তিনি ছিলেন এমন ব্যক্তিত্ব যাদের গঠনমূলক কাজ করার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং পরিস্থিতি যদি তাদের কীর্তিকে ম্লান করে দিতে চায়, তাহলে তারা আরও উঁচুতে উন্নীত হন। ২৬০
খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনায় ফিরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে দেখা করেন। তিনি খলীফাকে বলেন, 'আমি আপনার ব্যাপারে মুসলিমদের নিকট অভিযোগ করেছি যে, আপনি আমার সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করেননি, হে উমর।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, 'কোথা থেকে এ সম্পদ লাভ করেছ?' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বললেন, 'আমার গনীমতের অংশ থেকে। আর সেখানে ষাট হাজারের অধিক আপনার অংশ।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গনীমতের সম্পদ হিসাব করে দেখলেন যে, তা বিশ হাজার, যা তিনি বাইতুল মালে জমা করেন। তারপর বলেন, 'হে খালিদ, আল্লাহর কসম, তুমি আমার নিকট অনেক প্রিয় এবং আজকের পরে তুমি আমার প্রতি আর অসন্তুষ্ট থাকবে না।'২৬১
তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়াবাসীদের প্রতি এক চিঠিতে লেখেন, 'আমি খালিদকে এ জন্য অপসারণ করিনি যে, আমি তার প্রতি অসন্তুষ্ট কিংবা সে কোনো মন্দ আচরণ করেছে; বরং মানুষজন তার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আমার আশঙ্কা হয়েছে, আল্লাহ হয়তো লোকজনকে তার দিকে ধাবিত করবেন এবং তার মাধ্যমে তারা পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। আমি এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছি, আল্লাহই একমাত্র সত্তা যিনি বিজয় দান করেন এবং এ ব্যাপারে যাতে লোকজনের মনে কোনো সন্দেহ সৃষ্টি না হয়।'

৩.৪.৩। অপসারণের কারণসমূহের সারসংক্ষেপ এবং এর সুফল
রাষ্ট্র পরিচালনায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যে আদর্শ বা নীতি অনুসরণ করতেন, এর ভিত্তিতে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অপসারণের কারণসমূহ নিচে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো :
তাওহীদের সুরক্ষা : উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা-'বরং মানুষজন তার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আমার আশঙ্কা হয়েছে, আল্লাহ হয়তো লোকজনকে তার দিকে ধাবিত করবেন এবং তার মাধ্যমে তারা পরীক্ষার সম্মুখীন হবে'- থেকে এটি পরিষ্কার যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আশঙ্কা করেছেন, লোকজন খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য সন্দেহে পতিত হবে এবং তারা ধারণা করবে, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যেখানেই যাবেন সেখানেই বিজয় অর্জিত হবে, যা তাদের মূল বিশ্বাসকে দুর্বল করে তুলবে। কারণ, বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে—যুদ্ধে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অংশগ্রহণ করুন বা না করুন। কোনো একজন সেনাপতি—খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু—এর প্রতি লোকজনের অতিভক্তি থেকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেও তার ভক্তদের অনুরক্ত হয়ে যেতে পারেন; তিনি নিজেকে এমন ক্ষমতাবান মনে করতে পারেন, যা অপ্রতিরোধ্য। কারণ, তিনি ছিলেন রণকৌশলে অসম্ভব পারদর্শী এবং দান- সদকায় উদার। এটি রাষ্ট্র এবং তার নিজের জন্যও খারাপ পরিণতি ডেকে আনত। যদিও এ রকম হওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই ক্ষীণ। বস্তুত লোকজন তাদের খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি নিবদ্ধ ছিল এবং তাকে তারা খুব শ্রদ্ধা করত। আর অন্যদিকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন মহান সামরিক ব্যক্তিত্ব এবং ধর্মভীরু মানুষ। তারপরেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যুর পরে হয়তো খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো নেতার সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটতে পারত। এ জন্য ওই সময় এসব মহান ব্যক্তিদের জন্য একটি দিকনির্দেশনা প্রয়োজন ছিল। ২৬২ এ রকম পরিস্থিতিতে কম যোগ্যতাসম্পন্ন সেনাপতি—যার পরিচিতিও তেমন ব্যাপক নয়—থেকে সুদক্ষ সেনাপতিকে নিয়ে ফেতনার আশঙ্কা ছিল বেশি। ২৬৩
অর্থ ব্যয়ে পদ্ধতিগত মতপার্থক্য: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, অর্থ ও উপহারসামগ্রী দিয়ে ইসলামের দিকে মানুষের মনকে আকৃষ্ট করার সময় শেষ হয়ে গিয়েছে; ইসলামে এমন লোকজনের আর প্রয়োজন নেই এবং লোকজনকে তাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও আদর্শের ওপর ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, তার সঙ্গে এমন কিছু সাহসী মানুষ ও মুজাহিদ লড়াই করছে যারা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর পুরস্কারের আশায় লড়াই করছে না। তাদের ঈমান বৃদ্ধি ও ইসলামের দিকে আরও নিবেদিত করে তোলার জন্য তাদের পেছনে কিছু ব্যয় করার সুযোগ রয়েছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, অন্যদের চেয়ে দরিদ্র মুজাহিদরা এ সম্পদ লাভের বেশি যোগ্য। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন জাবিয়ার লোকজনকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অপসারণের কারণ ব্যক্ত করছিলেন, তখন বলেন, ‘আমি তাকে এসব অর্থ মুজাহিদদের মধ্যে দুর্বলদের জন্য খরচ করতে বলেছিলাম, কিন্তু তিনি তা শক্তিশালী ও সামর্থ্যবানদের পেছনে খরচ করেছে।’ ২৬৪ অবশ্যই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু—প্রত্যেকের মতের পক্ষে অনেক যুক্তি রয়েছে, কিন্তু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন কিছুর আঁচ করতে পেরেছিলেন যা খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বুঝতে পারেননি। ২৬৫
প্রশাসনিক কাজে উমর রা. এবং খালিদ রা.-এর মতপার্থক্য : উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরদের এই মর্মে চাপ প্রয়োগ করেন যে, তারা তাকে প্রত্যেক বিষয়েই অবহিত করবে—সেটা বড় কিংবা ছোট হোক। কিন্তু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ ক্ষেত্রে তার জন্য কারও নিকট জবাবদিহিতার প্রয়োজন নেই; তিনি মনে করতেন, যখন যা কিছু করা প্রয়োজন, এ ব্যাপারে তার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা উচিত, কারণ, বাস্তব প্রেক্ষাপটে যে উপস্থিত, সে অনুপস্থিত ব্যক্তি অপেক্ষা পরিস্থিতি বেশি পর্যবেক্ষণ ও বিবেচনা করার সুযোগ লাভ করেন। ২৬৬
সম্ভবত আরেকটি কারণ এই ছিল, নতুন নেতাদের নেতৃত্ব লাভের সুযোগ করে দেওয়া যাতে মুসলিম উম্মাহ খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু, আল-মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো আরও বীর তৈরি করতে সক্ষম হয়। আরেকটি কারণ, লোকজনের বোঝা উচিত, বিজয় কোনো একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিষয় নয়; ২৬৭ বরং ব্যক্তি এখানে কোনো ব্যাপারই নয়।
খালিদ রা.-এর অপসারণে মুসলিম সমাজের প্রতিক্রিয়া : মুসলিম সমাজ খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই অপসারণকে মেনে নেয়। কারণ, তারা মনে করে, যে কাউকে গভর্নর নিয়োগ ও বহিষ্কারে খলীফার অধিকার রয়েছে। কারও পক্ষেই ইসলামী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অথবা গভর্নর নিয়োগ ও বহিষ্কারে খলীফার অধিকারে হস্তক্ষেপ করার অধিকার ছিল না।
বর্ণিত আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একদিন মধ্যরাত্রিতে আলকামা ইবনে উলাসা আল-কিলাবির সঙ্গে দেখা করলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখতে অনেকটাই খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো মনে হতো এবং আলকামা ভাবলেন, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-ই এসেছেন। তিনি বলে উঠলেন, 'হে খালিদ, খলীফা তোমাকে পদচ্যুত করেছেন এবং এখন এর স্বপক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছেন। আমি আমার এক চাচাত ভাইকে নিয়ে তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে চাই। কিন্তু তিনি যা করার করেছেন। আমি তাকে কখনো কিছু জিজ্ঞাসা করব না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু— আরও বিস্তারিত জানার আগ্রহে যা তিনি লুকাচ্ছিলেন—বললেন, 'ঠিক আছে, এ ব্যাপারে আরও কিছু বলো।' তখন আলকামা বললেন, 'আমাদের ওপর এসব মানুষের অধিকার রয়েছে এবং আমাদের উচিত তাদের অধিকারে হস্তক্ষেপ না করা। নিশ্চয়ই আল্লাহ এতে আমাদের পুরস্কৃত করবেন।' পরের দিন সকালে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে—যখন আলকামা তাদের দুজনের দিকে তাকালেন—জিজ্ঞাসা করলেন, 'গতরাতে আলকামা তোমাকে কী বলেছে?' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, তিনি আমাকে কিছুই বলেননি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি এ জন্য কসম করছ?'
ঘটনার আকস্মিকতায় আলকামা খুব মর্মাহত হন এবং মনে মনে বলতে থাকেন, গতরাতে তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে কথা বলেননি। তারপর তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, 'হে খালিদ, তোমার কী হলো?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আলকামার প্রতি খুব দরদি ছিলেন এবং তিনি তার প্রয়োজনে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। তিনি বললেন, 'এখানে যদি এমন আরও লোকেরা থাকত যারা তোমার মতো চিন্তা করে—(মতের অমিল সত্ত্বেও যারা শাসকের প্রতি তাদের আনুগত্য বজায় রাখে)—তাহলে তারা অমুক অমুক থেকে আমার নিকট বেশি পছন্দনীয় হতো। ২৬৮
যাই হোক, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর চাচাত ভাই আবু আমর ইবনে হাফস ইবনে আল-মুগিরা এ ব্যাপারে জাবিয়ায় প্রতিবাদ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন লোকদের বললেন, 'আমি তাকে এসব অর্থ মুজাহিদদের মধ্যে দুর্বলদের জন্য খরচ করতে বলেছিলাম, কিন্তু তিনি তা শক্তিশালী ও সামর্থ্যবানদের পেছনে খরচ করেছে। এ জন্য আমি তাকে অপসারণ করেছি এবং তার পরিবর্তে আবু উবাইদা ইবনে জাররা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে গভর্নর নিয়োগ করেছি।' তখন আবু আমর ইবনে হাফস ইবনে আল-মুগিরা বলে ওঠেন, 'আল্লাহর কসম, আপনি তার ব্যাপারে ন্যায়বিচার করেননি। হে উমর ইবনুল খাত্তাব, আপনি এমন একজন সেনাপতিকে পদচ্যুত করেছেন, যাকে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেনাপতি নিয়োগ করেছিলেন; আপনি এমন এক তরবারিকে কোষবদ্ধ করেছেন, যা স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উন্মুক্ত করেছিলেন; আপনি এমন এক পতাকাকে অবনমিত করেছেন, যা স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তোলন করেছিলেন। আপনি আত্মীয়ের প্রতি দয়া করেছেন এবং আপনার চাচাত ভাইয়ের প্রতি হিংসা পোষণ করেছেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বললেন, 'তুমি তার খুবই নিকটাত্মীয়। তুমি বয়সে ছোট এবং চাচাত ভাইয়ের অপসারণে রেগেও আছ।'২৬৯
এভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর চাচাত ভাইয়ের কথায় ধৈর্যধারণ করেন, যে কিনা খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে এত বেশি বাড়াবাড়ি করছিল যে, তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে হিংসুক বলে দাবি করেছে। এতৎসত্ত্বেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সবর করেন। ২৭০
খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর মৃত্যু এবং মৃত্যুসজ্জায় উমর রা. সম্পর্কে তার মন্তব্য : আবু আদ-দরদা রাযিয়াল্লাহু আনহু অসুস্থ খলিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখতে গেলেন। খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'হে আবু দরদা, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে তুমি যা অপছন্দ করো তা-ই দেখতে পাবে।' আবু দরদা রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি তোমার সঙ্গে একমত।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি তার সঙ্গে একটি ব্যাপারে শুধু দ্বিমত পোষণ করেছিলাম। আমি যখন অসুস্থ হলাম, তখন এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছি। আমি এখন মৃত্যুসজ্জায়। আমি বিশ্বাস করি, উমর যা কিছু করে, তাতে তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টিই তালাশ করেন। আমি মর্মাহত হই যখন তিনি আমার অর্ধেক সম্পদ জব্দ করার জন্য লোক পাঠালেন। এমনকি লোকটি আমার জুতা জোড়ার একটি নিয়ে নেয় এবং অন্যটি আমার কাছে রেখে যায়। কিন্তু তিনি এটি অন্যদের সঙ্গেও করেছেন, যারা আমার আগে ইসলামে দাখিল হয়েছিলেন এবং যারা বদর যুদ্ধে শরীক ছিলেন। তিনি আমার প্রতি রূঢ় আচরণ করেছেন, কিন্তু তিনি একই রকম রূঢ় আচরণ অন্যদের সঙ্গেও করেছেন। আমি আশা করেছিলাম, তিনি আমার সঙ্গে ভালো আচরণ করবেন। কারণ, আমরা গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিলাম। আমি দেখলাম, তিনি সেসব আমলে নেননি এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় তিনি কারও পক্ষ থেকে বদনামের পরোয়া করেননি। এই একটি কারণে আমার অন্তর থেকে তার ব্যাপারে সব গ্লানি দূর হয়ে গিয়েছে। তিনিও আমার ব্যাপারে হতাশ হয়েছেন, কারণ, আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। আমি ছিলাম রণক্ষেত্রে, প্রচণ্ড শক্তিতে যুদ্ধে নিমগ্ন। আমিই সেখানে ছিলাম এবং তিনি ছিলেন না। আমি পরিস্থিতি সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতাম এবং তিনি তা পছন্দ করেননি। ২৭১ যখন মৃত্যু আসন্ন এবং তিনি তা বুঝতে পারলেন, তখন বললেন,
আমার এমন কোনো কাজ নেই যা আমাকে ওই কাজ অপেক্ষা বেশি আশান্বিত করতে পারে—কলেমা পড়ার পর–তা হলো, প্রচণ্ড শীতের রাতে বৃষ্টিতে ভিজে একটি মুজাহিদ দলের সঙ্গে প্রত্যুষে মুশরিকদের ওপর আক্রমণ চালানো। আপনাকে অবশ্যই জিহাদে অংশগ্রহণ করতে হবে। আমি অমুক অমুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি এবং আমার দেহের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে তরবারি, তির বা বর্শার দু-একটি আঘাত নেই। আর আমি এখন জরাগ্রস্ত উটের মতো বিছানায় মৃত্যুবরণ করছি। কাপুরুষ কখনো বিজয়ী হতে পারে না। আমি জিহাদের ময়দানেই মৃত্যু কামনা করেছিলাম। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন যে, আমি আমার বিছানাতেই মৃত্যুবরণ করব। ২৭২
মৃত্যুর পূর্বে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বরাবর অসীয়ত করে যান, যেখানে তিনি বলেন, 'আমি আমার যাবতীয় কিছু, সকল সম্পদ এবং অসীয়তলিপি পূর্ণ করার দায়িত্ব উমর-এর নিকট সোপর্দ করে যাচ্ছি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত হন এবং ভীষণ কান্না করেন। তার চাচাত বোনেরাও খুব কাঁদেন। লোকেরা তাদের থামাতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট অনুরোধ করলে তিনি বলেন, ‘আবু সুলাইমানের জন্য তাদের কাঁদতে দিন যতক্ষণ না তারা বিলাপ করে। আবু সুলাইমানের মতো ব্যক্তির জন্য কান্নাকারীদের কাঁদতে দাও’।২৭৩
তিনি তার সম্পর্কে আরও বলেন, ‘ইসলামের আবরণে একটি ছিদ্র তৈরি হয়েছে।’ বনু মাখযুম গোত্রের কিছু লোককে নিয়ে কবি হিশাম ইবনে আল-বাখতারি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট আসেন। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হিশামকে বলেন, ‘খালিদের ব্যাপারে তুমি তোমার কবিতা আবৃত্তি করে শোনাও’। আবৃত্তি শুনে তিনি বলেন, ‘আবু সুলাইমানের প্রশংসা ঠিকমতো করতে পারোনি। আল্লাহ তার ওপর রহম করুন। তিনি মুশরিকদের অপদস্থ ও পরাজিত করতে পছন্দ করতেন।’ তারপর তিনি বলেন, ‘আল্লাহ আবু সুলাইমানের ওপর রহম করুন। আল্লাহ তার জন্য যা রেখেছেন, সেটি তার কাছে যা ছিল (দুনিয়ায়), তা থেকে অনেক বেশি উত্তম। মৃত্যুর পরও তিনি স্মৃতিতে উজ্জ্বল এবং জীবিত থাকতেও তিনি ছিলেন প্রশংসিত। ২৭৪ কেউই চিরকাল বেঁচে থাকবে না। ২৭৫ তিনি ২১ হিজরীতে সিরিয়ার হিমসে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। আল্লাহ তা'আলার তার ওপর অশেষ রহমত নাযিল করুন এবং সালেহীনদের সঙ্গে তাকে জান্নাতে দাখিল করুন।

টিকাঃ
২৩৭ আদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়া ফি আসর আল-খুলাফা আর-রাশিদিন, পৃ. ১৫১।
২৩৮ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩২১-৩৩১।
২০৯ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১১৫।
২৪০ তারিখুল ইসলামি, ১১/৪৬।
২৪১ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৩১।
২৪২ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩২।
২৪৩ প্রাগুক্ত।
২৪৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১১৫।
২৪৫ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৩২।
২৪৬ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৩২-৩৩৩।
২৪৭ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২১।
২৪৮ প্রাগুক্ত।
২৪৯ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৪৬।
২৫০ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২৩।
২৫১ নিযামুল হিকামি ফি আহদিল খুলাফাইর রাশিমিন, পৃ. ৮৪।
২৫২ প্রাগুক্ত।
২৫৩ আবাতিল ইয়াজিব আন তুমহা মিনাত তারিখ, পৃ. ১৩২।
২৫৪ আবকারিয়াত খালিদ, আল-আক্কাদ, পৃ. ১৫৪-১৫৬।
২৫৫ তারিখ আত-তাবারি, ৫/৪১।
২৫৬ প্রাগুক্ত।
২৫৭ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩২৪।
২৫৮ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪৭।
২৫৯ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৪৭।
২৬০ প্রাগুক্ত।
২৬১ তারিখ আত-তাবারি, ৫/৪৩।
২৬২ আদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়া ফি আসর আল-খুলাফা আর-রাশিদিন, হামদি শাহীন, পৃ. ১৪৯।
২৬৩ আবকারিয়াত উমর, পৃ. ১৫৮।
২৬৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১১৫।
২৬৫ তারিখুল ইসলামি, ১১/১৪৭।
২৬৬ আল-খিলাফা ওয়াল-খুলাফা আর-রাশেদুন, সালিম আল-বাহনাসাবি, পৃ. ১৯৬।
২৬৭ আবাতিল ইয়াজিব আন তুমহা মিনাত তারিখ, পৃ. ১৩৪।
২৬৮ আদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়া ফি আসর আল-khuলাফা আর-রাশিদিন, হামদি শাহীন, পৃ. ১৫১।
২৬৯ সুনান, নাসাঈ, হাদীস নং ৮২৮৩; সুনান আল-কুবরা, মাহদুস সাওয়াব, ২/৪৯৬; এর সনদ সহীহ।
২৭০ সহীহ আত-তাওসিক ফি সিরাতি ওয়া হায়াতিল ফারুক, পৃ. ২১৯।
২৭১ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৪৯; আল-খিলাফা ওয়াল খুলাফা, পৃ. ১৯৮।
২৭২ সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১/৩৮২; আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ.৩৬৭।
২৭৩ আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ. ৩৬৬।
২৭৪ তাহযিব তারিখে দিমাশক, ৫/১১৬।
২৭৫ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৪৮।

ইসলামের শত্রুরা অবাস্তব কল্পনা ও গভীর আক্রোশের বশবর্তী হয়ে এমন- সব বর্ণনার সন্ধান লাভ করে যাতে সাহাবায়ে কেরামে চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করা সম্ভব হয়। যদি তারা তাদের পরিকল্পনা ও সন্তুষ্টি অনুযায়ী বর্ণনা খুঁজে না পেত, তাহলে বানোয়াট বর্ণনার আশ্রয় নিত। আর এতে তারা আশা করে, লোকেরা এসব গ্রহণ করবে এবং তারাই এর বর্ণনাকারী ও উৎসে পরিণত হবে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু—উভয়েই এসব বানোয়াট গল্পের শিকার হয়েছেন যেখানে ইসলামের শত্রুরা ঐতিহাসিক বর্ণনাকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পদচ্যুত করলেন এ বিষয়ে তারা সবচেয়ে বেশি নযর দিয়েছে। আর তারা এই দুই মহান ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে এবং এমন-সব বর্ণনা জুড়ে দিয়েছে যা কোনোভাবেই সত্যের ধারেকাছেও নেই।২৩৭ নিচে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর পদচ্যুতির সত্য ঘটনা তুলে ধরা হলো যা মূলত দুটি স্তরে সম্পন্ন হয়েছিল এবং এ জন্য মহান উদ্দেশ্য লুক্কায়িত ছিল।

৩.৪.১। প্রথম অপসারণ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে প্রথমে সিরিয়ার গভর্নর ও সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করেন। এটি সংঘটিত হয় ১৩ হিজরীতে যখন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এই অপসারণের মূলে ছিল গভর্নরদের নিয়ন্ত্রণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, যা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু মতো ছিল না। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরদের ইসলামী রাষ্ট্রের সাধারণ নীতির মধ্যে পুরোপুরি স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। এতে শর্ত ছিল, ব্যক্তি এবং দলের সঙ্গে তাদের সম্পূর্ণ ন্যায়সংগত ও নিরপেক্ষ আচরণ করতে হবে। তিনি নিজেই রাষ্ট্রে সুবিচার নিশ্চিত করতেন। তবে তার গভর্নরগণ ন্যায়সংগতভাবে বিচারকার্য করলেও তিনি কিছু মনে করতেন না। খলীফার অনুমতিক্রমে গভর্নরগণ তাদের নিজ নিজ প্রদেশের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন। ছোট ছোট বিষয়ে খলীফার দ্বারস্থ হতে হতো না। প্রদেশে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হলে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পদ কিংবা অন্য কোনো কারণে গভর্নরদের ক্ষমতাকে খর্ব করার প্রয়োজন মনে করতেন না।২৩৮ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পরামর্শ দেন, তিনি যেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তার অনুমতি ব্যতীত কাউকে ছাগল কিংবা উট প্রদান না করে। এই পরামর্শ অনুযায়ী আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠি প্রেরণ করেন এবং এর উত্তরে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ লিখে পাঠান: আমাকে আমার মতো কাজ করার সুযোগ দিন, নতুবা আপনাকেই তা করতে হবে।' তখন খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পদচ্যুত করার জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পরামর্শ দেন।২০৯ তবে খলীফাতুর রাসূল আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে স্বপদে বহাল রাখেন। ২৪০
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন খলীফা হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি মনে করেন, গভর্নর ও প্রশাসকদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যা প্রদেশের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে অনুসরণ করা হবে। তিনি প্রদেশে সংঘটিত ছোট-বড় সবকিছুই খলীফাকে জানানো বাধ্যতামূলক করে দেন যাতে তিনি বিষয়গুলো তদন্ত করতে পারেন এবং সে অনুযায়ী নির্দেশ জারি করতে সক্ষম হন। আর গভর্নরগণ তার নির্দেশ পালনে বাধ্য থাকবে। কারণ, তিনি মনে করতেন, ইসলামী রাষ্ট্রের খলীফা স্বয়ং যা করেন, এ জন্য তিনি যেমনভাবে দায়ী, তেমনি তার গভর্নরগণ যা কিছু করবে, তার জন্যও খলীফা দায়ী হবেন। আর এ দায়-দায়িত্ব থেকে সবচেয়ে উত্তম গভর্নর নির্বাচন করেও ছাড় পাওয়া যাবে না। তিনি খলীফা নির্বাচিত হয়ে জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি বলেন : 'আমার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের পরীক্ষা করছেন এবং তোমাদের মাধ্যমে আমাকে পরীক্ষা করছেন। আর আমার দুজন সাথি আল্লাহ তা'আলার কাছে চলে গেছেন এবং আল্লাহ আমাকে এখনো জীবিত রেখেছেন। আল্লাহর কসম, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি নিজে তোমাদের দায়িত্ব সরাসরি পালন করতে পারব ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য কারও হাতে তোমাদের ছেড়ে দেব না। আর যেসব কাজ সরাসরি করতে পারব না সেসবের দায়িত্ব আমি যোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য লোকের হাতে দেব। আল্লাহর কসম, তারা (গভর্নররা) যদি ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করে, তবে আমি তাদের পুরস্কৃত করব, আর অন্যায় করলে কঠিন শাস্তি দেব।'২৪১
তিনি আরও বলতেন, 'যদি আমি সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে তোমাদের শাসক হিসাবে নিয়োগ দিই এবং তাকে ন্যায়-পরায়ণতার সঙ্গে শাসন করতে বলি, তাহলে তোমরা কি মনে করো যে, আমি আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছি?' তারা বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'না। যতক্ষণ না আমি তার আচরণ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি এবং তাকে যা করার নির্দেশ দিয়েছি, তা সে যথাযথভাবে পালন করেছে, ততক্ষণ আমার দায়িত্ব পরিপূর্ণ হবে না।' ২৪২
খলীফা হওয়ার পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই প্রত্যাশা করলেন যে, প্রাদেশিক গভর্নরগণ তার পদ্ধতিকে অনুসরণ করবে। তাদের কেউ কেউ সেটি মেনে নিল এবং অন্যরা দ্বিমত পোষণ করল। যারা তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন, তাদের একজন ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু। ২৪৩ মালিক ইবনে আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, খলীফা হওয়ার পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লিখে পাঠান : 'আমার অনুমতি ছাড়া কাউকে একটি ছাগল কিংবা উটও দেবে না।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এই চিঠির জবাবে লেখেন : হয় আপনি আমাকে আমার মতো কাজ করার সুযোগ দেবেন, নতুবা আপনাকেই এর দায়িত্ব নিতে হবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর প্রতি আমার অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ পাবে যদি আমি যা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলাম, আমি নিজেই (সেই সুযোগ পেয়ে) তা না করি।' সুতরাং তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করলেন। ২৪৪ অধিকন্তু তিনি তাকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দায়িত্ব দিতে চেয়েছেন, কিন্তু তিনি স্বাধীনভাবে ওই দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছেন, যার অনুমতি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দেননি। ২৪৫
অতএব, রাষ্ট্র পরিচালনায় গৃহীত নীতির ওপর ভিত্তি করেই তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করেছিলেন। আর শাসকগণ রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন দিকনির্দেশনা দিতেই পারেন (শরীয়তের সীমার মধ্যে)। এ রকম ঘটনা আমাদের জীবন অহরহ ঘটছে। বিভিন্ন বর্ণনা, মতামত, নিজস্ব বিজ্ঞোচিত দর্শন ও প্রভাব বিবেচনা করে এর পেছনে জটিল কোনো কারণ খুঁজে বের করার প্রয়োজন নেই। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন এক সময় ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন যখন লোকেরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগের খুব নিকটবর্তী ছিল। মৌলিকভাবেই রাষ্ট্রের প্রাদেশিক গভর্নর ও সেনাপতি নির্বাচন খলীফার অন্যতম দায়িত্ব। স্বভাবতই তারা এমন ব্যক্তি হবেন যারা খলীফার চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করবে এবং তার অনুসৃত নীতি ও পথকে মেনে চলবে। উল্লেখ্য, তখন উম্মতের মধ্যে যোগ্য ও বিশ্বস্ত লোকের কোনো কমতি ছিল না। গভর্নর ও সেনাপতিরা চিরকাল তাদের পদে অধিষ্ঠিত থাকার অধিকার রাখেন না। আর যখন রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে গভর্নরের মতের অমিল হয়, তখন গভর্নরদের আর দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকে না যেখানে আরও অনেকেই রাষ্ট্রনায়কের মতকে অনুসরণ করে দায়িত্ব পালনে আগ্রহী ব্যক্তি-বর্গ রয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ ব্যাপারে খুবই সফল ছিলেন এবং তার গৃহীত নীতিসমূহ অকল্পনীয় সফলতা অর্জন করে। তিনি কয়েকজনকে বরখাস্ত করেন এবং তাদের পরিবর্তে অন্যদের নিয়োগ দেন। নতুন যাদের নিয়োগ দেন, তারা কোনো অংশেই পূর্ববর্তী গভর্নরদের চেয়ে যোগ্যতায় কম ছিলেন না। কারণ, তখন এ রকম দায়িত্ব পালন করার জন্য যোগ্য ও সাহসী লোকের সংখ্যা ছিল অনেক। ২৪৬
কোনো রকমের প্রতিবাদ ছাড়াই খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পদচ্যুতিকে গ্রহণ করেন এবং তিনি আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্ব মেনে চলেন। পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তা'আলা তাকে কিন্নিসিরিন বিজয়ের সুযোগ দিলে আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি খলীফাকে এই বিজয় সম্পর্কে অবহিত করেন এবং সেখানে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবদান তুলে ধরেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন তার বিখ্যাত উক্তিটি করেন : খালিদ নিজেই নিজেকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করেছে। আল্লাহ আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওপর রহম করুন, মানুষ সম্পর্কে আমার চেয়ে তার বেশি জ্ঞান ছিল।'২৪৭ এ কথা বলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সাহসী ও বীরোচিত কাজের জন্য নিজেকে এমন এক উচ্চতায় আসীন করেছিলেন, যা করতেই তিনি অভ্যস্ত—বিপজ্জনক, সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পারদর্শী। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যেন বোঝাতে চেয়েছেন, তার পরামর্শ সত্ত্বেও আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু যোগ্যতা ও সামরিক দক্ষতার কথা বিবেচনা করে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করেননি। এর মানে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ কয়েকজন বীর ছাড়া অন্য কারও পক্ষে তার স্থান পূরণ করার মতো লোক ছিল না। ২৪৮
এ-সময় খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রায় চার বছর আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে কাজ করেন এবং তিনি মুহূর্তের জন্যও তার অবাধ্য হননি। আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর মহান গুণাবলিকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবস্থাকে সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং সেভাবেই তিনি তার সঙ্গে সম্মান ও দয়ার আচরণ করেছেন। তিনি তাকে নিজের কাছাকাছি রাখতেন, যখন-তখন তার সঙ্গে পরামর্শ করতেন, তার মতামতকে গুরুত্ব দিতেন এবং কখনো কখনো তাকে নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে দিতেন। এসব কারণেই খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মনে কোনো ধরনের আক্রোশ বাসা বাঁধতে পারেনি এবং ফলে তার পক্ষে সামরিক ক্ষেত্রেও এত বীরোচিত ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়েছে। দামেস্ক, কিন্নিসিরিন এবং অহল বিজয় তার ঐশী মনোবলের সাক্ষী যা পদচ্যুতির ঘোষণা শোনার পর তার আচরণে ফুটে উঠেছিল। উভয় ক্ষেত্রেই (বরখাস্ত হওয়ার আগে এবং পরে) তিনি ছিলেন আল্লাহর তরবারি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু। ২৪৯
ইতিহাস বিস্মৃত হয়নি সেই কথা, যা খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বরখাস্তের সময় আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন: 'এটি দুনিয়ার কোনো ক্ষমতা নয় যা আমি চাই এবং আমি যা কিছু করি তা এই দুনিয়ার জন্য নয়। তুমি যা কিছু দেখছ, তা শীঘ্রই নিঃশেষ হয়ে যাবে। অথচ আমরা পরস্পর ভাই, যারা আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি এবং এটি কোনো ব্যাপার নয় যে, ভাইদের একজন অপরজনের ধর্মীয় ও দুনিয়ার বিষয়াদিতে নেতৃত্ব দেবে; বরং যার ওপর নেতৃত্বের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হলো সে-ই বেশি অস্থিরতা ও গোনাহের ঝুঁকিতে রয়েছে—তারা ব্যতীত যাদের আল্লাহ হেফাজত করেন এবং তাদের সংখ্যা খুবই কম। ২৫০
যখন আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সামরিক অভিযান পরচালনা করার নির্দেশ দিতেন, তিনি তা সানন্দেই গ্রহণ করেন এবং বলেন, 'ইনশাআল্লাহ আমি তা করব। আমি কেবল আপনার নির্দেশের অপেক্ষায়ই ছিলাম।' আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তোমাকে কিছু বলতে আমার খুব লজ্জা লাগে, হে আবু সুলাইমান।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'যদি কোনো ছোট শিশুকেও আমার ওপর নিয়োগ করা হয়, আমি তাকে মেনে চলব। আমি কেমন করে আপনার বিরুদ্ধে যাব যেখানে আপনি আমার আগে ইসলামে দাখিল হয়েছেন এবং আপনি তাদের সাথেই ঈমান এনেছেন যারা দ্রুত ইসলামে দাখিল হওয়ার জন্য উদ্‌গ্রীব ছিলেন। আর স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে 'আল-আমীন' বলে সম্বোধন করেছেন। আমি কেমন করে আপনার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হব? এখন আপনাকে আমি সাক্ষী বানাচ্ছি যে, আমি পুরোপুরিভাবে নিজেকে আল্লাহর জন্য সোপর্দ করলাম এবং আমি কখনোই আপনার অবাধ্য হব না এবং এরপরে আর কখনো গভর্নরের পদ গ্রহণ করব না।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এখানেই থেমে যাননি; বরং তিনি তা বাস্তবে করে দেখিয়েছেন এবং তাকে যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তিনি তা দ্রুত বাস্তবায়নে বেরিয়ে পড়েন। ২৫১
খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা ও কাজ থেকে এটি পরিষ্কার যে, ধর্মীয় ও মানবিক অনুভূতিই তাদের মধ্যে পারস্পরিক সদাচরণে মূল ভূমিকা রাখে। খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা ও গভর্নরের প্রতি আনুগত্যের নীতি বজায় রেখেছেন যদিও পদচ্যুতির কারণে তার ব্যক্তিগত অবস্থান ও মর্যাদা পরিবর্তিত হয়েছে-সেনাপতি থেকে সাধারণ সৈনিকে পরিণত হয়েছেন। ২৫২ গভর্নরের পদ থেকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অপসারণের মূলে তার বিরুদ্ধে কোনো বিদ্বেষ, সন্দেহ কিংবা শরীয়তের সীমালঙ্ঘন বা তার ইসলামী মূল্যবোধ ও ন্যায়পরায়ণতায় কোনো কলঙ্ক দায়ী ছিল না; বরং এখানে ইসলামের দুই মহান ব্যক্তির দুটি ভিন্ন পদ্ধতির বাস্তবায়ন প্রতিফলিত হয়েছে যেখানে উভয়ে মনে করেছেন, তাদের নিজস্ব পদ্ধতিই প্রয়োগ করা উচিত। যদি তাদের একজনকে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তাহলে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি খলীফার জন্যই এই ত্যাগ স্বীকার করবেন-কোনো হীনম্মন্যতা কিংবা কোনো ক্রোধ বা আক্রোশ ছাড়াই। ২৫৩
আল্লাহর অনুগ্রহে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ায় মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ দেন। ইয়ারমুকের যুদ্ধের পর ওই এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন ছিল যাতে মানুষের মধ্যে শত্রুতা চিরতরে শেষ হয়ে যায়, আহতরা সুস্থ হয়ে ওঠে এবং তাদের অন্তরগুলো বিবাদ-বিসংবাদ ভুলে আবার এক হয়ে ওঠে। সুযোগ পাওয়ামাত্রই আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যান, কিন্তু প্রয়োজনে লড়তে তিনি পিছপা হননি। সিরিয়ার বিভিন্ন শহরের লোকেরা আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর সহনশীলতার পরিচয় পেয়ে দলে দলে এসে তার নিকট শান্তিচুক্তি করে; তারা অন্য কারও থেকে তার সঙ্গেই চুক্তি করতে পছন্দ করে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশেই আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং প্রদেশের সর্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষায় সিরিয়ার গভর্নর হিসাবে তার এই নিয়োগ ছিল যথোপযুক্ত। ২৫৪

৩.৪.২। দ্বিতীয় অপসারণ
কিন্নিসিরিনের গভর্নর পদ থেকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আবার (দ্বিতীয়বার) পদচ্যুত করা হয়। আর এটি সংঘটিত হয় ১৭ হিজরীতে। ২৫৫ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট খবর পৌঁছে যে, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আইয়ায ইবনে গানাম রাযিয়াল্লাহু আনহু বাইজেন্টাইন বর্ডার ভেদ করে অভিযান পরিচালন করেন এবং বিপুল-পরিমাণ গনীমতের মাল নিয়ে আসেন। অনেক দূর থেকে তার নিকট একজন লোক সাহায্যের আশায় আসে। তার সঙ্গে আল-আশাস ইবনে কাইসও ছিলেন, যাকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দশ হাজার দিরহাম প্রদান করেন। তিনি যা কিছু করেছেন, তার সব খবরই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কানে আসে। ২৫৬
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সেনাপতি আবু উবাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর চিঠি প্রেরণ করেন যাতে তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই বিপুল- পরিমাণ অর্থের উৎস সন্ধান করতে বলেন এবং তাকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যেকোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতে বলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মদীনায় ডেকে আনেন এবং আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর সম্মুখে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরিশেষে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গনীমতের মাল থেকে দশ হাজার দিরহাম নেওয়ার অভিযোগের ব্যাপারে পুরোপুরি নির্দোষ সাব্যস্ত হন। ২৫৭
খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পদচ্যুতির ব্যাপারে জানানো হলে তিনি সিরিয়াবাসীদের বিদায় সম্ভাষণ জানান। তার কথায় সেনাপতি ও সৈন্যদের মধ্যে চিরায়ত বিচ্ছেদের কষ্ট ফুটে ওঠে : আমীরুল মুমিনীন আমাকে সিরিয়ার গভর্নর হিসাবে নিযুক্ত করেন। যখন সব গোলযোগ শেষ হয়ে পরিস্থিতি শান্ত এবং স্থির হতে থাকে, তখন তিনি আমাকে অপসারণ করেন।' এক লোক দাঁড়িয়ে বলে ওঠে, 'হে মহান সেনাপতি, ধৈর্যধারণ করুন। এখন ফিতনার সময় ধেয়ে আসছে।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'যতদিন উমর ইবনুল খাত্তাব জীবিত থাকবেন, ততদিন কোনো ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।'২৫৮ এটি খুবই শক্তিশালী এবং একনিষ্ঠ ঈমানের প্রকাশ, যা আল্লাহর রাসূলের ঘনিষ্ঠ সাহাবীদের মধ্যে নির্বাচিত বান্দাদের ছাড়া অন্য কাউকে দেওয়া হয়নি। এক চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কি এক পরম ঐশ্বরিক শক্তি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল, যা তাকে এ রকম উত্তর দিতে সমর্থ করেছিল?২৫৯ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের সমর্থনে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ভাষ্য শুনে লোকজন শান্ত হয়ে যায়। তারা অনুধাবন করে, তাদের বহিষ্কৃত সেনাপতি এমন কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন, যে কিনা বিদ্রোহ ও ফিতনা ছড়িয়ে খলীফার বিরুদ্ধাচরণ করে নিজের গৌরব প্রকাশ করবেন; বরং তিনি ছিলেন এমন ব্যক্তিত্ব যাদের গঠনমূলক কাজ করার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং পরিস্থিতি যদি তাদের কীর্তিকে ম্লান করে দিতে চায়, তাহলে তারা আরও উঁচুতে উন্নীত হন। ২৬০
খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনায় ফিরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে দেখা করেন। তিনি খলীফাকে বলেন, 'আমি আপনার ব্যাপারে মুসলিমদের নিকট অভিযোগ করেছি যে, আপনি আমার সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করেননি, হে উমর।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, 'কোথা থেকে এ সম্পদ লাভ করেছ?' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বললেন, 'আমার গনীমতের অংশ থেকে। আর সেখানে ষাট হাজারের অধিক আপনার অংশ।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গনীমতের সম্পদ হিসাব করে দেখলেন যে, তা বিশ হাজার, যা তিনি বাইতুল মালে জমা করেন। তারপর বলেন, 'হে খালিদ, আল্লাহর কসম, তুমি আমার নিকট অনেক প্রিয় এবং আজকের পরে তুমি আমার প্রতি আর অসন্তুষ্ট থাকবে না।'২৬১
তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়াবাসীদের প্রতি এক চিঠিতে লেখেন, 'আমি খালিদকে এ জন্য অপসারণ করিনি যে, আমি তার প্রতি অসন্তুষ্ট কিংবা সে কোনো মন্দ আচরণ করেছে; বরং মানুষজন তার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আমার আশঙ্কা হয়েছে, আল্লাহ হয়তো লোকজনকে তার দিকে ধাবিত করবেন এবং তার মাধ্যমে তারা পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। আমি এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছি, আল্লাহই একমাত্র সত্তা যিনি বিজয় দান করেন এবং এ ব্যাপারে যাতে লোকজনের মনে কোনো সন্দেহ সৃষ্টি না হয়।'

৩.৪.৩। অপসারণের কারণসমূহের সারসংক্ষেপ এবং এর সুফল
রাষ্ট্র পরিচালনায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যে আদর্শ বা নীতি অনুসরণ করতেন, এর ভিত্তিতে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অপসারণের কারণসমূহ নিচে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো :
তাওহীদের সুরক্ষা : উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা-'বরং মানুষজন তার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আমার আশঙ্কা হয়েছে, আল্লাহ হয়তো লোকজনকে তার দিকে ধাবিত করবেন এবং তার মাধ্যমে তারা পরীক্ষার সম্মুখীন হবে'- থেকে এটি পরিষ্কার যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আশঙ্কা করেছেন, লোকজন খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য সন্দেহে পতিত হবে এবং তারা ধারণা করবে, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যেখানেই যাবেন সেখানেই বিজয় অর্জিত হবে, যা তাদের মূল বিশ্বাসকে দুর্বল করে তুলবে। কারণ, বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে—যুদ্ধে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অংশগ্রহণ করুন বা না করুন। কোনো একজন সেনাপতি—খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু—এর প্রতি লোকজনের অতিভক্তি থেকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেও তার ভক্তদের অনুরক্ত হয়ে যেতে পারেন; তিনি নিজেকে এমন ক্ষমতাবান মনে করতে পারেন, যা অপ্রতিরোধ্য। কারণ, তিনি ছিলেন রণকৌশলে অসম্ভব পারদর্শী এবং দান- সদকায় উদার। এটি রাষ্ট্র এবং তার নিজের জন্যও খারাপ পরিণতি ডেকে আনত। যদিও এ রকম হওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই ক্ষীণ। বস্তুত লোকজন তাদের খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি নিবদ্ধ ছিল এবং তাকে তারা খুব শ্রদ্ধা করত। আর অন্যদিকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন মহান সামরিক ব্যক্তিত্ব এবং ধর্মভীরু মানুষ। তারপরেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যুর পরে হয়তো খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো নেতার সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটতে পারত। এ জন্য ওই সময় এসব মহান ব্যক্তিদের জন্য একটি দিকনির্দেশনা প্রয়োজন ছিল। ২৬২ এ রকম পরিস্থিতিতে কম যোগ্যতাসম্পন্ন সেনাপতি—যার পরিচিতিও তেমন ব্যাপক নয়—থেকে সুদক্ষ সেনাপতিকে নিয়ে ফেতনার আশঙ্কা ছিল বেশি। ২৬৩
অর্থ ব্যয়ে পদ্ধতিগত মতপার্থক্য: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, অর্থ ও উপহারসামগ্রী দিয়ে ইসলামের দিকে মানুষের মনকে আকৃষ্ট করার সময় শেষ হয়ে গিয়েছে; ইসলামে এমন লোকজনের আর প্রয়োজন নেই এবং লোকজনকে তাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও আদর্শের ওপর ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, তার সঙ্গে এমন কিছু সাহসী মানুষ ও মুজাহিদ লড়াই করছে যারা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর পুরস্কারের আশায় লড়াই করছে না। তাদের ঈমান বৃদ্ধি ও ইসলামের দিকে আরও নিবেদিত করে তোলার জন্য তাদের পেছনে কিছু ব্যয় করার সুযোগ রয়েছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, অন্যদের চেয়ে দরিদ্র মুজাহিদরা এ সম্পদ লাভের বেশি যোগ্য। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন জাবিয়ার লোকজনকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অপসারণের কারণ ব্যক্ত করছিলেন, তখন বলেন, ‘আমি তাকে এসব অর্থ মুজাহিদদের মধ্যে দুর্বলদের জন্য খরচ করতে বলেছিলাম, কিন্তু তিনি তা শক্তিশালী ও সামর্থ্যবানদের পেছনে খরচ করেছে।’ ২৬৪ অবশ্যই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু—প্রত্যেকের মতের পক্ষে অনেক যুক্তি রয়েছে, কিন্তু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন কিছুর আঁচ করতে পেরেছিলেন যা খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বুঝতে পারেননি। ২৬৫
প্রশাসনিক কাজে উমর রা. এবং খালিদ রা.-এর মতপার্থক্য : উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরদের এই মর্মে চাপ প্রয়োগ করেন যে, তারা তাকে প্রত্যেক বিষয়েই অবহিত করবে—সেটা বড় কিংবা ছোট হোক। কিন্তু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ ক্ষেত্রে তার জন্য কারও নিকট জবাবদিহিতার প্রয়োজন নেই; তিনি মনে করতেন, যখন যা কিছু করা প্রয়োজন, এ ব্যাপারে তার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা উচিত, কারণ, বাস্তব প্রেক্ষাপটে যে উপস্থিত, সে অনুপস্থিত ব্যক্তি অপেক্ষা পরিস্থিতি বেশি পর্যবেক্ষণ ও বিবেচনা করার সুযোগ লাভ করেন। ২৬৬
সম্ভবত আরেকটি কারণ এই ছিল, নতুন নেতাদের নেতৃত্ব লাভের সুযোগ করে দেওয়া যাতে মুসলিম উম্মাহ খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু, আল-মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো আরও বীর তৈরি করতে সক্ষম হয়। আরেকটি কারণ, লোকজনের বোঝা উচিত, বিজয় কোনো একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিষয় নয়; ২৬৭ বরং ব্যক্তি এখানে কোনো ব্যাপারই নয়।
খালিদ রা.-এর অপসারণে মুসলিম সমাজের প্রতিক্রিয়া : মুসলিম সমাজ খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই অপসারণকে মেনে নেয়। কারণ, তারা মনে করে, যে কাউকে গভর্নর নিয়োগ ও বহিষ্কারে খলীফার অধিকার রয়েছে। কারও পক্ষেই ইসলামী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অথবা গভর্নর নিয়োগ ও বহিষ্কারে খলীফার অধিকারে হস্তক্ষেপ করার অধিকার ছিল না।
বর্ণিত আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একদিন মধ্যরাত্রিতে আলকামা ইবনে উলাসা আল-কিলাবির সঙ্গে দেখা করলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখতে অনেকটাই খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো মনে হতো এবং আলকামা ভাবলেন, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-ই এসেছেন। তিনি বলে উঠলেন, 'হে খালিদ, খলীফা তোমাকে পদচ্যুত করেছেন এবং এখন এর স্বপক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছেন। আমি আমার এক চাচাত ভাইকে নিয়ে তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে চাই। কিন্তু তিনি যা করার করেছেন। আমি তাকে কখনো কিছু জিজ্ঞাসা করব না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু— আরও বিস্তারিত জানার আগ্রহে যা তিনি লুকাচ্ছিলেন—বললেন, 'ঠিক আছে, এ ব্যাপারে আরও কিছু বলো।' তখন আলকামা বললেন, 'আমাদের ওপর এসব মানুষের অধিকার রয়েছে এবং আমাদের উচিত তাদের অধিকারে হস্তক্ষেপ না করা। নিশ্চয়ই আল্লাহ এতে আমাদের পুরস্কৃত করবেন।' পরের দিন সকালে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে—যখন আলকামা তাদের দুজনের দিকে তাকালেন—জিজ্ঞাসা করলেন, 'গতরাতে আলকামা তোমাকে কী বলেছে?' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, তিনি আমাকে কিছুই বলেননি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি এ জন্য কসম করছ?'
ঘটনার আকস্মিকতায় আলকামা খুব মর্মাহত হন এবং মনে মনে বলতে থাকেন, গতরাতে তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে কথা বলেননি। তারপর তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, 'হে খালিদ, তোমার কী হলো?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আলকামার প্রতি খুব দরদি ছিলেন এবং তিনি তার প্রয়োজনে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। তিনি বললেন, 'এখানে যদি এমন আরও লোকেরা থাকত যারা তোমার মতো চিন্তা করে—(মতের অমিল সত্ত্বেও যারা শাসকের প্রতি তাদের আনুগত্য বজায় রাখে)—তাহলে তারা অমুক অমুক থেকে আমার নিকট বেশি পছন্দনীয় হতো। ২৬৮
যাই হোক, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর চাচাত ভাই আবু আমর ইবনে হাফস ইবনে আল-মুগিরা এ ব্যাপারে জাবিয়ায় প্রতিবাদ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন লোকদের বললেন, 'আমি তাকে এসব অর্থ মুজাহিদদের মধ্যে দুর্বলদের জন্য খরচ করতে বলেছিলাম, কিন্তু তিনি তা শক্তিশালী ও সামর্থ্যবানদের পেছনে খরচ করেছে। এ জন্য আমি তাকে অপসারণ করেছি এবং তার পরিবর্তে আবু উবাইদা ইবনে জাররা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে গভর্নর নিয়োগ করেছি।' তখন আবু আমর ইবনে হাফস ইবনে আল-মুগিরা বলে ওঠেন, 'আল্লাহর কসম, আপনি তার ব্যাপারে ন্যায়বিচার করেননি। হে উমর ইবনুল খাত্তাব, আপনি এমন একজন সেনাপতিকে পদচ্যুত করেছেন, যাকে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেনাপতি নিয়োগ করেছিলেন; আপনি এমন এক তরবারিকে কোষবদ্ধ করেছেন, যা স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উন্মুক্ত করেছিলেন; আপনি এমন এক পতাকাকে অবনমিত করেছেন, যা স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তোলন করেছিলেন। আপনি আত্মীয়ের প্রতি দয়া করেছেন এবং আপনার চাচাত ভাইয়ের প্রতি হিংসা পোষণ করেছেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বললেন, 'তুমি তার খুবই নিকটাত্মীয়। তুমি বয়সে ছোট এবং চাচাত ভাইয়ের অপসারণে রেগেও আছ।'২৬৯
এভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর চাচাত ভাইয়ের কথায় ধৈর্যধারণ করেন, যে কিনা খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে এত বেশি বাড়াবাড়ি করছিল যে, তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে হিংসুক বলে দাবি করেছে। এতৎসত্ত্বেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সবর করেন। ২৭০
খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর মৃত্যু এবং মৃত্যুসজ্জায় উমর রা. সম্পর্কে তার মন্তব্য : আবু আদ-দরদা রাযিয়াল্লাহু আনহু অসুস্থ খলিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখতে গেলেন। খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'হে আবু দরদা, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে তুমি যা অপছন্দ করো তা-ই দেখতে পাবে।' আবু দরদা রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি তোমার সঙ্গে একমত।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি তার সঙ্গে একটি ব্যাপারে শুধু দ্বিমত পোষণ করেছিলাম। আমি যখন অসুস্থ হলাম, তখন এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছি। আমি এখন মৃত্যুসজ্জায়। আমি বিশ্বাস করি, উমর যা কিছু করে, তাতে তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টিই তালাশ করেন। আমি মর্মাহত হই যখন তিনি আমার অর্ধেক সম্পদ জব্দ করার জন্য লোক পাঠালেন। এমনকি লোকটি আমার জুতা জোড়ার একটি নিয়ে নেয় এবং অন্যটি আমার কাছে রেখে যায়। কিন্তু তিনি এটি অন্যদের সঙ্গেও করেছেন, যারা আমার আগে ইসলামে দাখিল হয়েছিলেন এবং যারা বদর যুদ্ধে শরীক ছিলেন। তিনি আমার প্রতি রূঢ় আচরণ করেছেন, কিন্তু তিনি একই রকম রূঢ় আচরণ অন্যদের সঙ্গেও করেছেন। আমি আশা করেছিলাম, তিনি আমার সঙ্গে ভালো আচরণ করবেন। কারণ, আমরা গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিলাম। আমি দেখলাম, তিনি সেসব আমলে নেননি এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় তিনি কারও পক্ষ থেকে বদনামের পরোয়া করেননি। এই একটি কারণে আমার অন্তর থেকে তার ব্যাপারে সব গ্লানি দূর হয়ে গিয়েছে। তিনিও আমার ব্যাপারে হতাশ হয়েছেন, কারণ, আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। আমি ছিলাম রণক্ষেত্রে, প্রচণ্ড শক্তিতে যুদ্ধে নিমগ্ন। আমিই সেখানে ছিলাম এবং তিনি ছিলেন না। আমি পরিস্থিতি সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতাম এবং তিনি তা পছন্দ করেননি। ২৭১ যখন মৃত্যু আসন্ন এবং তিনি তা বুঝতে পারলেন, তখন বললেন,
আমার এমন কোনো কাজ নেই যা আমাকে ওই কাজ অপেক্ষা বেশি আশান্বিত করতে পারে—কলেমা পড়ার পর–তা হলো, প্রচণ্ড শীতের রাতে বৃষ্টিতে ভিজে একটি মুজাহিদ দলের সঙ্গে প্রত্যুষে মুশরিকদের ওপর আক্রমণ চালানো। আপনাকে অবশ্যই জিহাদে অংশগ্রহণ করতে হবে। আমি অমুক অমুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি এবং আমার দেহের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে তরবারি, তির বা বর্শার দু-একটি আঘাত নেই। আর আমি এখন জরাগ্রস্ত উটের মতো বিছানায় মৃত্যুবরণ করছি। কাপুরুষ কখনো বিজয়ী হতে পারে না। আমি জিহাদের ময়দানেই মৃত্যু কামনা করেছিলাম। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন যে, আমি আমার বিছানাতেই মৃত্যুবরণ করব। ২৭২
মৃত্যুর পূর্বে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বরাবর অসীয়ত করে যান, যেখানে তিনি বলেন, 'আমি আমার যাবতীয় কিছু, সকল সম্পদ এবং অসীয়তলিপি পূর্ণ করার দায়িত্ব উমর-এর নিকট সোপর্দ করে যাচ্ছি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত হন এবং ভীষণ কান্না করেন। তার চাচাত বোনেরাও খুব কাঁদেন। লোকেরা তাদের থামাতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট অনুরোধ করলে তিনি বলেন, ‘আবু সুলাইমানের জন্য তাদের কাঁদতে দিন যতক্ষণ না তারা বিলাপ করে। আবু সুলাইমানের মতো ব্যক্তির জন্য কান্নাকারীদের কাঁদতে দাও’।২৭৩
তিনি তার সম্পর্কে আরও বলেন, ‘ইসলামের আবরণে একটি ছিদ্র তৈরি হয়েছে।’ বনু মাখযুম গোত্রের কিছু লোককে নিয়ে কবি হিশাম ইবনে আল-বাখতারি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট আসেন। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হিশামকে বলেন, ‘খালিদের ব্যাপারে তুমি তোমার কবিতা আবৃত্তি করে শোনাও’। আবৃত্তি শুনে তিনি বলেন, ‘আবু সুলাইমানের প্রশংসা ঠিকমতো করতে পারোনি। আল্লাহ তার ওপর রহম করুন। তিনি মুশরিকদের অপদস্থ ও পরাজিত করতে পছন্দ করতেন।’ তারপর তিনি বলেন, ‘আল্লাহ আবু সুলাইমানের ওপর রহম করুন। আল্লাহ তার জন্য যা রেখেছেন, সেটি তার কাছে যা ছিল (দুনিয়ায়), তা থেকে অনেক বেশি উত্তম। মৃত্যুর পরও তিনি স্মৃতিতে উজ্জ্বল এবং জীবিত থাকতেও তিনি ছিলেন প্রশংসিত। ২৭৪ কেউই চিরকাল বেঁচে থাকবে না। ২৭৫ তিনি ২১ হিজরীতে সিরিয়ার হিমসে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। আল্লাহ তা'আলার তার ওপর অশেষ রহমত নাযিল করুন এবং সালেহীনদের সঙ্গে তাকে জান্নাতে দাখিল করুন।

টিকাঃ
২৩৭ আদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়া ফি আসর আল-খুলাফা আর-রাশিদিন, পৃ. ১৫১।
২৩৮ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩২১-৩৩১।
২০৯ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১১৫।
২৪০ তারিখুল ইসলামি, ১১/৪৬।
২৪১ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৩১।
২৪২ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩২।
২৪৩ প্রাগুক্ত।
২৪৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১১৫।
২৪৫ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৩২।
২৪৬ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৩২-৩৩৩।
২৪৭ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২১।
২৪৮ প্রাগুক্ত।
২৪৯ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৪৬।
২৫০ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২৩।
২৫১ নিযামুল হিকামি ফি আহদিল খুলাফাইর রাশিমিন, পৃ. ৮৪।
২৫২ প্রাগুক্ত।
২৫৩ আবাতিল ইয়াজিব আন তুমহা মিনাত তারিখ, পৃ. ১৩২।
২৫৪ আবকারিয়াত খালিদ, আল-আক্কাদ, পৃ. ১৫৪-১৫৬।
২৫৫ তারিখ আত-তাবারি, ৫/৪১।
২৫৬ প্রাগুক্ত।
২৫৭ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩২৪।
২৫৮ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪৭।
২৫৯ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৪৭।
২৬০ প্রাগুক্ত।
২৬১ তারিখ আত-তাবারি, ৫/৪৩।
২৬২ আদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়া ফি আসর আল-খুলাফা আর-রাশিদিন, হামদি শাহীন, পৃ. ১৪৯।
২৬৩ আবকারিয়াত উমর, পৃ. ১৫৮।
২৬৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১১৫।
২৬৫ তারিখুল ইসলামি, ১১/১৪৭।
২৬৬ আল-খিলাফা ওয়াল-খুলাফা আর-রাশেদুন, সালিম আল-বাহনাসাবি, পৃ. ১৯৬।
২৬৭ আবাতিল ইয়াজিব আন তুমহা মিনাত তারিখ, পৃ. ১৩৪।
২৬৮ আদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়া ফি আসর আল-khuলাফা আর-রাশিদিন, হামদি শাহীন, পৃ. ১৫১।
২৬৯ সুনান, নাসাঈ, হাদীস নং ৮২৮৩; সুনান আল-কুবরা, মাহদুস সাওয়াব, ২/৪৯৬; এর সনদ সহীহ।
২৭০ সহীহ আত-তাওসিক ফি সিরাতি ওয়া হায়াতিল ফারুক, পৃ. ২১৯।
২৭১ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৪৯; আল-খিলাফা ওয়াল খুলাফা, পৃ. ১৯৮।
২৭২ সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১/৩৮২; আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ.৩৬৭।
২৭৩ আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ. ৩৬৬।
২৭৪ তাহযিব তারিখে দিমাশক, ৫/১১৬।
২৭৫ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৪৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00