📄 গভর্নরদের পর্যবেক্ষণ
সঠিক এবং যোগ্য লোককে সরকারি কর্মকর্তা এবং গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দিয়েই আমীরুল মুমিনীন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ক্ষান্ত হতেন না; বরং তিনি তাদের কর্মকাণ্ড দেখভাল করার জন্য কঠিন পরিশ্রম করতেন। নিশ্চিত হতেন যে, তার নিয়োগকৃত ব্যক্তিবর্গ সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করছে এবং কোনো কারণে যেন তাদের পদস্খলন বা বিচ্যুতি না ঘটে। তার বিখ্যাত স্লোগান ছিল: কোনো অপকর্মকারীকে স্বপদে এক মিনিটও বহাল রাখার চেয়ে প্রতিদিন একজন করে গভর্নর পদচ্যুত করাকে আমি ভালো মনে করি। ১৮৩ তিনি বলেন : 'যদি কোনো গভর্নর কারও প্রতি অবিচার করে এবং এটি আমার কানে আসে, তারপর যদি আমি তাকে পদচ্যুত না করি, তাহলে এটি তার প্রতি অবিচার করা হবে। ১৮৪ একদিন তিনি লোকদের উদ্দেশে বললেন, 'যদি আমি সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে তোমাদের শাসক হিসাবে নিয়োগ দিই এবং তাকে ন্যায়-পরায়ণতার সঙ্গে শাসন করতে বলি, তাহলে তোমরা কি মনে করো, আমি আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছি?' তারা বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'না। যতক্ষণ না আমি তার আচরণ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি এবং তাকে যা করার নির্দেশ দিয়েছি, তা সে যথাযথভাবে পালন করেছে—ততক্ষণ আমার দায়িত্ব পরিপূর্ণ হবে না।'১৮৫
গভর্নর এবং অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুবই কঠোর নীতি অবলম্বন করতেন। তার শাসনপদ্ধতি ছিল, তিনি গভর্নরদের লোকাল বিষয়াদিতে পূর্ণ ক্ষমতা দিতেন এবং সাধারণ জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতেন। তারপর তিনি এসব ব্যাপারে তাদের কর্মপদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করতেন। আর এ কাজের জন্য তিনি গোয়েন্দা নিয়োগ করতেন। ঐতিহাসিক সূত্রসমূহ থেকে এটি নিশ্চিতভাবেই জানা যায় যে, আধুনিক গোয়েন্দা সংস্থার মতো যাবতীয় কার্যক্রমই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগে কার্যকরী ছিল। তিনি দূরবর্তী অঞ্চলে কর্মরত গভর্নরদের এমনভাবে জানতেন, যেমন জানতেন একই রুমে তার পাশে ঘুমন্ত ব্যক্তি সম্পর্কে। এমন কোনো এলাকা বা প্রদেশ ছিল না যেখানে কোনো গভর্নর বা সামরিক কমান্ডার নিয়োজিত আছে, অথচ তার কর্মকাণ্ড অনবরত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে না এবং পূর্ব-পশ্চিমে যে কেউ যা কিছু উচ্চারণ করুক না কেন, তা সকাল-সন্ধ্যায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট পেশ করা হতো। গভর্নর এবং প্রশাসকদের প্রতি তার লিখিত চিঠি-পত্র থেকে এ বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। তথ্য সংগ্রহে তিনি এতটাই দক্ষ ছিলেন যে, প্রশাসকগণ তাদের সবচেয়ে কাছের মানুষদের থেকেও নিরাপদ ছিলেন না।১৮৬ গভর্নরদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অনেকগুলো পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। নিচে তার কয়েকটি বর্ণনা করা হলো:
৩.১.১। মদীনায় দিনের বেলায় প্রবেশ করতে গভর্নরদের নির্দেশ
যখন কোনো গভর্নর মদীনায় আসতে চাইত, তখন তিনি তাদের রাতের পরিবর্তে দিনের আলোয় মদীনায় প্রবেশ করতে বলতেন যাতে তারা যে সম্পদ এবং গনীমতের মাল সঙ্গে নিয়ে আসতেন, তা সবাই দেখতে পায়। ফলে তাদের এ বিষয়ে প্রশ্ন করা এবং হিসাব নেওয়া সহজ হতো। ১৮৭
৩.১.২। গভর্নরদের প্রতিনিধি প্রেরণ করার নির্দেশ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরদের সাধারণ জনগণের মধ্য থেকে প্রতিনিধিদল প্রেরণ করার নির্দেশ দিতেন যাতে তিনি তাদের জমি এবং খারাজ-যা তাদের ওপর আরোপ করা হয়েছে-সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। এ থেকে তাদের ওপর অন্যায় করা হয়েছে কি না, তা জানার চেষ্টা করতেন। তিনি তাদের অঞ্চলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সাক্ষী পেশ করতে বলতেন। কুফা অঞ্চলের খারাজ সেখানকার দশ জন বহন করে আনে এবং একই সংখ্যক বসরাবাসী বসরার খারাজ নিয়ে আসে। তারা তার সম্মুখে এসব হাজির করে আল্লাহর নামে শপথ করে বলে যে, এগুলো হালাল সম্পদ এবং এতে কোনো মুসলমান কিংবা যিম্মির প্রতি অবিচার করা হয়নি। ১৮৮ জনগণের প্রতি অন্যায় আচরণ প্রতিরোধে এটিই যথেষ্ট ছিল। আর যদি সে রকম কিছু ঘটত, তাহলে সেখানকার অধিবাসীরা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট অভিযোগ পেশ করে তা অবহিত করত। সাধারণ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা করতেন এবং তাদের গভর্নর, তার আচরণ ও অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতেন। ১৮৯
৩.১.৩। চিঠি-পত্র আদান-প্রদান
ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে গভর্নরদের নিকট উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চিঠি-পত্র প্রেরণ করতেন। পত্রবাহক মদীনায় ফিরে আসতে চাইলে তিনি তাকে সেখানকার জনগণের মধ্যে একটি সাধারণ ঘোষণা দেওয়ার জন্য বলতেন। এ ঘোষণায় খলীফার প্রতি কারও কোনো চিঠি থাকলে তা তাকে দেওয়ার জন্য বলা হতো। এতে সাধারণ জনগণ তাদের গভর্নরের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই তার মাধ্যমে সরাসরি খলীফার নিকট পত্র প্রেরণ করতে পারতেন। পত্রবাহক এসব চিঠি বা এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। সুতরাং এভাবে রাজ্যে কোনো অবিচার বা অন্যায় সংঘটিত হলে সাধারণ জনগণ গভর্নর বা তার নিয়োজিত লোকজনের অজ্ঞাতসারেই খলীফার নিকট অভিযোগ করতে পারতেন। পত্রবাহক মদীনায় ফিরে এসেই এসব চিঠি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে দিতেন এবং একান্ত ব্যক্তিগতভাবেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন চিঠির বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবহিত হতেন। ১৯০
৩.১.৪। পরিদর্শক (মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ)
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আনসার সাহাবী মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে গভর্নরদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের জন্য পরিদর্শক হিসাবে নিযুক্ত করেন। তিনি গভর্নরদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা যাচাই করতেন। ইসলামী শাসনব্যবস্থায় মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ভূমিকা ছিল সাধারণ পরিদর্শকের মতোই। তিনি গভর্নরদের কর্মকাণ্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন এবং দায়িত্ব পালনে কারও মধ্যে কোনো দুর্বলতা পরিলক্ষিত হলে তাকে জবাবদিহি করতেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে সিনিয়র গভর্নরদের যাচাই ১৯১, অভিযোগ তদন্ত করা, সাধারণ জনগণের সঙ্গে দেখা করা ও তাদের মতামত জানা এবং গভর্নরদের ব্যাপারে তাদের মতামত সরাসরি খলীফাকে অবহিত করার জন্য প্রেরণ করতেন। মুহাম্মাদ ইবনে সালামাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর অধীনেও কিছু লোক কাজ করতেন।
৩.১.৫। হজের মৌসুম
বিভিন্ন প্রদেশের লোকজন ও গভর্নরদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার ক্ষেত্রে হজের মৌসুম ছিল উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। তিনি এ মৌসুমকে ইসলামী রাষ্ট্রের সকল অঞ্চল থেকে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নির্ধারণ করেছিলেন। এ-সময় অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে অভিযোগকারীরা একত্র হতো এবং বিভিন্ন প্রদেশ ও এলাকায় তার নিয়োজিত সকল পরিদর্শকরা সরকারি কর্মকর্তা ও গভর্নরদের ব্যাপারে তাকে রিপোর্ট প্রদান করতেন। কর্মকর্তারাও স্বয়ং হাজির হয়ে তাদের গৃহীত পদক্ষেপ ও যাবতীয় কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে খলীফাকে অবহিত করতেন। হজের মৌসুম অনেকটা আধুনিককালের সংসদীয় এসেম্বলির আকার ধারণ করত। ১৯২
হজের মৌসুমে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকজনের প্রতি গভর্নরদের দায়িত্ব সম্পর্কে বক্তব্য দিতেন। তারপর তিনি বলতেন, 'যার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে, সে যেন উঠে দাঁড়ায়।' উপস্থিত জনতার মধ্য থেকে একজন ছাড়া আর কেউই উঠে দাঁড়ায়নি। এ থেকে গভর্নরদের ন্যায়-পরায়ণতা ও জনপ্রিয়তা বোঝা যায়। ওই লোকটি দাঁড়িয়ে বলে, 'আপনার অমুক গভর্নর অন্যায়ভাবে আমাকে এক শ বেত্রাঘাত করেছে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন সংশ্লিষ্ট গভর্নরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে সমুচিত জবাব না পেয়ে লোকটিকে বললেন, 'দাঁড়াও এবং এর প্রতিশোধ (কিসাস) নাও।' তখন আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি যদি এমন করেন, তাহলে এ সংখ্যা বাড়তেই থাকবে এবং আপনার তিরোধানের পরে এটি সাধারণ রসমে পরিণত হবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন বললেন, 'আমি কেমন করে এ কাজ করব না যেটি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের বেলায় করে গেছেন?' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'বিষয়টি আমাদের ওপর ছেড়ে দিন। আমরা তার সঙ্গে ফায়সালা করে নিই।' তিনি বললেন, 'এই যে সেই লোক। তার সঙ্গে মীমাংসা করো।' এভাবে এজেন্ট কর্তৃক লোকটিকে প্রতিটি বেত্রাঘাতের জন্য দুই দিনার করে তাকে মোট দু'শ দিনার দেওয়া হয়। ১৯৩
৩.১.৬। প্রতিনিয়ত আঞ্চলিক পরিদর্শন
নিহত হওয়ার আগে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেই ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রদেশ পরিদর্শন করার চিন্তা-ভাবনা করছিলেন। এতে উম্মতের অবস্থা ও গভর্নরদের পর্যবেক্ষণ এবং এত বড় রাষ্ট্রে সবকিছু শরীয়ত অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে-তা স্বচক্ষে দেখা সম্ভব হতো। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'ইনশাআল্লাহ যদি আমি বেঁচে থাকি, তাহলে পুরো এক বছর লোকজনের মধ্যে ঘুরে বেড়াব যেন আমি তাদের এমন-সব প্রয়োজনের কথা জানতে পারি, যা আমার কাছে পৌঁছে না। তাদের এজেন্টরা আমার নিকট সে তথ্য প্রেরণ করে না এবং তারাও আমার নিকট পৌঁছতে পারে না। সুতরাং আমি সিরিয়া গমন করব এবং সেখানে দুই মাস অবস্থান করব, কুফাতে দুই মাস থাকব। তারপর আমি বসরায় গিয়ে দুই মাস থাকব। আল্লাহর কসম, এটা কতই-না সুন্দর একটি বছর হবে! ১৯৪
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পরিকল্পনার কিছু অংশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন; বিশেষভাবে সিরিয়ার ক্ষেত্রে। তিনি সিরিয়ায় বেশ কয়েকবার গমন করেছেন। সেখানকার পরিবেশ-পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং গভর্নর ও এজেন্টদের বাড়িতেও গিয়েছেন যাতে তাদের অবস্থা নিবিড়ভাবে জানা সম্ভব হয়। ১৯৫ তিনি আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে যান এবং তার সন্ন্যাসী জীবন-যাপন দেখে অবাক হন। তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট সন্ন্যাসব্রতের এই কঠিন জীবন-যাপন সম্পর্কে অভিযোগ পেশ করেন। তিনি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতেও গমন করেন এবং তিনি সেখানে আকর্ষণীয় কিছু দেখতে পাননি। তার সম্বল বলতে কেবল তার অস্ত্রটিই ছিল, যা তিনি মেরামতের কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
তিনি যখন রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ লোকদের বাড়িতে যেতেন, তা কাউকে না জানিয়েই ঝটিকা সফর করতেন। তিনি সঙ্গে একজনকে রাখতেন, যে কিনা নির্দিষ্ট বাড়ির দরজায় নক করতেন এবং তার ও সঙ্গীর জন্য অনুমতি প্রার্থনা করতেন। কিন্তু কিছুতেই সঙ্গীটি যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু, তা প্রকাশ করতেন না। এভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গৃহে প্রবেশ করে সেখানকার বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হতেন। ১৯৬
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শুনতে পেলেন, ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান বিভিন্ন রকমের খাবার খেয়ে থাকেন। এ জন্য তিনি ডিনার পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। তারপর তিনি অনুমতি নিয়ে তার গৃহে গমন করেন। তার খাদ্যের বাহার দেখে তিনি তাকে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে বিলাসিতা পরিহার করতে নির্দেশ দেন। ১৯৭ এ ধরনের ঝটিকা সফরের মাধ্যমেই তার পর্যবেক্ষণ সীমিত ছিল না। তিনি আরও একটি পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। তিনি গভর্নরের নিকট কিছু সম্পদ পাঠাতেন। তারপর লোকজন পাঠিয়ে এ সম্পদের বণ্টনপদ্ধতি জানতেন। একবার তিনি আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট ৫০০ দিনার পাঠালেন এবং আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু সবগুলো দিনারই লোকজনের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। তার স্ত্রী তাকে বলত, ‘আল্লাহর কসম, এসব দিনার আমাদের উপকার করার চেয়ে ক্ষতিই বেশি করত।’ আবু উবাইদা নিজের ছেঁড়া জামা—যা পরে তিনি নামায আদায় করতেন—কেটে টুকরো টুকরো করতেন। দিনারগুলো টুকরো কাপড়ে বেঁধে গরিবদের নিকট পাঠাতেন যতক্ষণ না দিনার বণ্টন শেষ হতো। ১৯৮
সিরিয়ার ওই সফরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অন্যান্য গভর্নরদের সঙ্গেও একই আচরণ করেন। তিনি এ-সময় গভর্নরদের কেবল পরীক্ষাই করেননি; বরং সঙ্গে করে তাদের মদীনায়ও নিয়ে এসেছেন। তারপর তারা মদীনায় কী খায় ও পান করে, কী ধরনের পোশাক পরিধান করে—এগুলো দেখার জন্য লোক নিযুক্ত করেন। পাশাপাশি তিনি নিজেও তাদের পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। ১৯৯
৩.১.৭। আর্কাইভ বা রাষ্ট্রীয় নথিপত্র
রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড এবং গভর্নরদের ব্যাপারে তথ্য সংরক্ষণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুবই যত্নবান ছিলেন। তিনি বিজিত অঞ্চলসমূহের সঙ্গে গভর্নরদের চুক্তিপত্র সংরক্ষণে সবচেয়ে বেশি নযর দিতেন, যাতে কারও ওপর যুলুম করা না হয়। বর্ণিত আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিজের কাছে একটি বাক্স বা ফাইল সংরক্ষিত থাকত, যাতে তিনি তার সঙ্গে অন্যদের করা চুক্তিসমূহ রাখতেন। এটাকে আমরা আর্কাইভ বা রাষ্ট্রীয় নথিপত্র বলতে পারি। গভর্নরদের নিকটও এ রকম একটি বাক্স বা ফাইল থাকত যেখানে তারা তাদের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র মজুদ রাখতেন। ফলে প্রয়োজনে তা বের করা সম্ভব হতো এবং যেকোনো প্রকার সন্দেহ এড়িয়ে চলা সম্ভব হতো। ২০০
টিকাঃ
১৮৩ আন-নাজমুল ইসলামিয়া, সুবহি আস-সালিহ, পৃ. ৮৯।
১৮৪ মানাকিবু আমীরুল মুমিনিন, ইবনে আল-জাওযি, পৃ. ১২৯।
১৮৫ আল-ইদারাতুল ইসলামিয়া, পৃ. ২১৫।
১৮৬ আত-তায ফি আখলাকিল মুলুক, পৃ. ১৬৮।
১৮৭ ফান্ন আল-হুকম, পৃ. ১৭৪।
১৮৮ আল-খারাজ, আবু ইউসুফ, পৃ. ১২৪; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১৫৭।
১৮৯ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১০৫।
১৯০ তারিখুল মদীনা, ২/৭৬১।
১৯১ আল-আনসার ফিল আসরির রাশিদি, পৃ. ১২৩-১২৬।
১৯২ আবকারিতু উমর, আল-আক্কাদ, পৃ. ৮২।
১৯৩ আত-তাবাকাত, ইবনে সাদ, ৩/২২২।
১৯৪ তারিখ আত-তাবারি, ৫/১৮; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১৬১।
১৯৫ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১৬১।
১৯৬ তারিখুল মদীনা, ৩/৮৩৭।
১৯৭ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১৬১২।
১৯৮ তারিখুল মদীনা, ৩/৮৩৭।
১৯৯ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১৬১।
২০০ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১৬৩।
সঠিক এবং যোগ্য লোককে সরকারি কর্মকর্তা এবং গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দিয়েই আমীরুল মুমিনীন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ক্ষান্ত হতেন না; বরং তিনি তাদের কর্মকাণ্ড দেখভাল করার জন্য কঠিন পরিশ্রম করতেন। নিশ্চিত হতেন যে, তার নিয়োগকৃত ব্যক্তিবর্গ সঠিকভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করছে এবং কোনো কারণে যেন তাদের পদস্খলন বা বিচ্যুতি না ঘটে। তার বিখ্যাত স্লোগান ছিল: কোনো অপকর্মকারীকে স্বপদে এক মিনিটও বহাল রাখার চেয়ে প্রতিদিন একজন করে গভর্নর পদচ্যুত করাকে আমি ভালো মনে করি। ১৮৩ তিনি বলেন : 'যদি কোনো গভর্নর কারও প্রতি অবিচার করে এবং এটি আমার কানে আসে, তারপর যদি আমি তাকে পদচ্যুত না করি, তাহলে এটি তার প্রতি অবিচার করা হবে। ১৮৪ একদিন তিনি লোকদের উদ্দেশে বললেন, 'যদি আমি সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে তোমাদের শাসক হিসাবে নিয়োগ দিই এবং তাকে ন্যায়-পরায়ণতার সঙ্গে শাসন করতে বলি, তাহলে তোমরা কি মনে করো, আমি আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছি?' তারা বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'না। যতক্ষণ না আমি তার আচরণ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি এবং তাকে যা করার নির্দেশ দিয়েছি, তা সে যথাযথভাবে পালন করেছে—ততক্ষণ আমার দায়িত্ব পরিপূর্ণ হবে না।'১৮৫
গভর্নর এবং অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুবই কঠোর নীতি অবলম্বন করতেন। তার শাসনপদ্ধতি ছিল, তিনি গভর্নরদের লোকাল বিষয়াদিতে পূর্ণ ক্ষমতা দিতেন এবং সাধারণ জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়াদিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতেন। তারপর তিনি এসব ব্যাপারে তাদের কর্মপদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করতেন। আর এ কাজের জন্য তিনি গোয়েন্দা নিয়োগ করতেন। ঐতিহাসিক সূত্রসমূহ থেকে এটি নিশ্চিতভাবেই জানা যায় যে, আধুনিক গোয়েন্দা সংস্থার মতো যাবতীয় কার্যক্রমই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগে কার্যকরী ছিল। তিনি দূরবর্তী অঞ্চলে কর্মরত গভর্নরদের এমনভাবে জানতেন, যেমন জানতেন একই রুমে তার পাশে ঘুমন্ত ব্যক্তি সম্পর্কে। এমন কোনো এলাকা বা প্রদেশ ছিল না যেখানে কোনো গভর্নর বা সামরিক কমান্ডার নিয়োজিত আছে, অথচ তার কর্মকাণ্ড অনবরত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে না এবং পূর্ব-পশ্চিমে যে কেউ যা কিছু উচ্চারণ করুক না কেন, তা সকাল-সন্ধ্যায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট পেশ করা হতো। গভর্নর এবং প্রশাসকদের প্রতি তার লিখিত চিঠি-পত্র থেকে এ বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। তথ্য সংগ্রহে তিনি এতটাই দক্ষ ছিলেন যে, প্রশাসকগণ তাদের সবচেয়ে কাছের মানুষদের থেকেও নিরাপদ ছিলেন না।১৮৬ গভর্নরদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অনেকগুলো পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। নিচে তার কয়েকটি বর্ণনা করা হলো:
৩.১.১। মদীনায় দিনের বেলায় প্রবেশ করতে গভর্নরদের নির্দেশ
যখন কোনো গভর্নর মদীনায় আসতে চাইত, তখন তিনি তাদের রাতের পরিবর্তে দিনের আলোয় মদীনায় প্রবেশ করতে বলতেন যাতে তারা যে সম্পদ এবং গনীমতের মাল সঙ্গে নিয়ে আসতেন, তা সবাই দেখতে পায়। ফলে তাদের এ বিষয়ে প্রশ্ন করা এবং হিসাব নেওয়া সহজ হতো। ১৮৭
৩.১.২। গভর্নরদের প্রতিনিধি প্রেরণ করার নির্দেশ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরদের সাধারণ জনগণের মধ্য থেকে প্রতিনিধিদল প্রেরণ করার নির্দেশ দিতেন যাতে তিনি তাদের জমি এবং খারাজ-যা তাদের ওপর আরোপ করা হয়েছে-সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। এ থেকে তাদের ওপর অন্যায় করা হয়েছে কি না, তা জানার চেষ্টা করতেন। তিনি তাদের অঞ্চলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সাক্ষী পেশ করতে বলতেন। কুফা অঞ্চলের খারাজ সেখানকার দশ জন বহন করে আনে এবং একই সংখ্যক বসরাবাসী বসরার খারাজ নিয়ে আসে। তারা তার সম্মুখে এসব হাজির করে আল্লাহর নামে শপথ করে বলে যে, এগুলো হালাল সম্পদ এবং এতে কোনো মুসলমান কিংবা যিম্মির প্রতি অবিচার করা হয়নি। ১৮৮ জনগণের প্রতি অন্যায় আচরণ প্রতিরোধে এটিই যথেষ্ট ছিল। আর যদি সে রকম কিছু ঘটত, তাহলে সেখানকার অধিবাসীরা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট অভিযোগ পেশ করে তা অবহিত করত। সাধারণ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনা করতেন এবং তাদের গভর্নর, তার আচরণ ও অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতেন। ১৮৯
৩.১.৩। চিঠি-পত্র আদান-প্রদান
ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে গভর্নরদের নিকট উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চিঠি-পত্র প্রেরণ করতেন। পত্রবাহক মদীনায় ফিরে আসতে চাইলে তিনি তাকে সেখানকার জনগণের মধ্যে একটি সাধারণ ঘোষণা দেওয়ার জন্য বলতেন। এ ঘোষণায় খলীফার প্রতি কারও কোনো চিঠি থাকলে তা তাকে দেওয়ার জন্য বলা হতো। এতে সাধারণ জনগণ তাদের গভর্নরের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই তার মাধ্যমে সরাসরি খলীফার নিকট পত্র প্রেরণ করতে পারতেন। পত্রবাহক এসব চিঠি বা এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। সুতরাং এভাবে রাজ্যে কোনো অবিচার বা অন্যায় সংঘটিত হলে সাধারণ জনগণ গভর্নর বা তার নিয়োজিত লোকজনের অজ্ঞাতসারেই খলীফার নিকট অভিযোগ করতে পারতেন। পত্রবাহক মদীনায় ফিরে এসেই এসব চিঠি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে দিতেন এবং একান্ত ব্যক্তিগতভাবেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন চিঠির বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবহিত হতেন। ১৯০
৩.১.৪। পরিদর্শক (মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ)
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আনসার সাহাবী মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে গভর্নরদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের জন্য পরিদর্শক হিসাবে নিযুক্ত করেন। তিনি গভর্নরদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে তা যাচাই করতেন। ইসলামী শাসনব্যবস্থায় মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ভূমিকা ছিল সাধারণ পরিদর্শকের মতোই। তিনি গভর্নরদের কর্মকাণ্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন এবং দায়িত্ব পালনে কারও মধ্যে কোনো দুর্বলতা পরিলক্ষিত হলে তাকে জবাবদিহি করতেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে সিনিয়র গভর্নরদের যাচাই ১৯১, অভিযোগ তদন্ত করা, সাধারণ জনগণের সঙ্গে দেখা করা ও তাদের মতামত জানা এবং গভর্নরদের ব্যাপারে তাদের মতামত সরাসরি খলীফাকে অবহিত করার জন্য প্রেরণ করতেন। মুহাম্মাদ ইবনে সালামাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর অধীনেও কিছু লোক কাজ করতেন।
৩.১.৫। হজের মৌসুম
বিভিন্ন প্রদেশের লোকজন ও গভর্নরদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার ক্ষেত্রে হজের মৌসুম ছিল উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। তিনি এ মৌসুমকে ইসলামী রাষ্ট্রের সকল অঞ্চল থেকে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নির্ধারণ করেছিলেন। এ-সময় অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে অভিযোগকারীরা একত্র হতো এবং বিভিন্ন প্রদেশ ও এলাকায় তার নিয়োজিত সকল পরিদর্শকরা সরকারি কর্মকর্তা ও গভর্নরদের ব্যাপারে তাকে রিপোর্ট প্রদান করতেন। কর্মকর্তারাও স্বয়ং হাজির হয়ে তাদের গৃহীত পদক্ষেপ ও যাবতীয় কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে খলীফাকে অবহিত করতেন। হজের মৌসুম অনেকটা আধুনিককালের সংসদীয় এসেম্বলির আকার ধারণ করত। ১৯২
হজের মৌসুমে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকজনের প্রতি গভর্নরদের দায়িত্ব সম্পর্কে বক্তব্য দিতেন। তারপর তিনি বলতেন, 'যার প্রতি অন্যায় করা হয়েছে, সে যেন উঠে দাঁড়ায়।' উপস্থিত জনতার মধ্য থেকে একজন ছাড়া আর কেউই উঠে দাঁড়ায়নি। এ থেকে গভর্নরদের ন্যায়-পরায়ণতা ও জনপ্রিয়তা বোঝা যায়। ওই লোকটি দাঁড়িয়ে বলে, 'আপনার অমুক গভর্নর অন্যায়ভাবে আমাকে এক শ বেত্রাঘাত করেছে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন সংশ্লিষ্ট গভর্নরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে সমুচিত জবাব না পেয়ে লোকটিকে বললেন, 'দাঁড়াও এবং এর প্রতিশোধ (কিসাস) নাও।' তখন আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি যদি এমন করেন, তাহলে এ সংখ্যা বাড়তেই থাকবে এবং আপনার তিরোধানের পরে এটি সাধারণ রসমে পরিণত হবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন বললেন, 'আমি কেমন করে এ কাজ করব না যেটি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের বেলায় করে গেছেন?' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'বিষয়টি আমাদের ওপর ছেড়ে দিন। আমরা তার সঙ্গে ফায়সালা করে নিই।' তিনি বললেন, 'এই যে সেই লোক। তার সঙ্গে মীমাংসা করো।' এভাবে এজেন্ট কর্তৃক লোকটিকে প্রতিটি বেত্রাঘাতের জন্য দুই দিনার করে তাকে মোট দু'শ দিনার দেওয়া হয়। ১৯৩
৩.১.৬। প্রতিনিয়ত আঞ্চলিক পরিদর্শন
নিহত হওয়ার আগে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেই ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রদেশ পরিদর্শন করার চিন্তা-ভাবনা করছিলেন। এতে উম্মতের অবস্থা ও গভর্নরদের পর্যবেক্ষণ এবং এত বড় রাষ্ট্রে সবকিছু শরীয়ত অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে-তা স্বচক্ষে দেখা সম্ভব হতো। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'ইনশাআল্লাহ যদি আমি বেঁচে থাকি, তাহলে পুরো এক বছর লোকজনের মধ্যে ঘুরে বেড়াব যেন আমি তাদের এমন-সব প্রয়োজনের কথা জানতে পারি, যা আমার কাছে পৌঁছে না। তাদের এজেন্টরা আমার নিকট সে তথ্য প্রেরণ করে না এবং তারাও আমার নিকট পৌঁছতে পারে না। সুতরাং আমি সিরিয়া গমন করব এবং সেখানে দুই মাস অবস্থান করব, কুফাতে দুই মাস থাকব। তারপর আমি বসরায় গিয়ে দুই মাস থাকব। আল্লাহর কসম, এটা কতই-না সুন্দর একটি বছর হবে! ১৯৪
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পরিকল্পনার কিছু অংশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন; বিশেষভাবে সিরিয়ার ক্ষেত্রে। তিনি সিরিয়ায় বেশ কয়েকবার গমন করেছেন। সেখানকার পরিবেশ-পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং গভর্নর ও এজেন্টদের বাড়িতেও গিয়েছেন যাতে তাদের অবস্থা নিবিড়ভাবে জানা সম্ভব হয়। ১৯৫ তিনি আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে যান এবং তার সন্ন্যাসী জীবন-যাপন দেখে অবাক হন। তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট সন্ন্যাসব্রতের এই কঠিন জীবন-যাপন সম্পর্কে অভিযোগ পেশ করেন। তিনি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতেও গমন করেন এবং তিনি সেখানে আকর্ষণীয় কিছু দেখতে পাননি। তার সম্বল বলতে কেবল তার অস্ত্রটিই ছিল, যা তিনি মেরামতের কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
তিনি যখন রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ লোকদের বাড়িতে যেতেন, তা কাউকে না জানিয়েই ঝটিকা সফর করতেন। তিনি সঙ্গে একজনকে রাখতেন, যে কিনা নির্দিষ্ট বাড়ির দরজায় নক করতেন এবং তার ও সঙ্গীর জন্য অনুমতি প্রার্থনা করতেন। কিন্তু কিছুতেই সঙ্গীটি যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু, তা প্রকাশ করতেন না। এভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গৃহে প্রবেশ করে সেখানকার বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হতেন। ১৯৬
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শুনতে পেলেন, ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান বিভিন্ন রকমের খাবার খেয়ে থাকেন। এ জন্য তিনি ডিনার পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। তারপর তিনি অনুমতি নিয়ে তার গৃহে গমন করেন। তার খাদ্যের বাহার দেখে তিনি তাকে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে বিলাসিতা পরিহার করতে নির্দেশ দেন। ১৯৭ এ ধরনের ঝটিকা সফরের মাধ্যমেই তার পর্যবেক্ষণ সীমিত ছিল না। তিনি আরও একটি পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। তিনি গভর্নরের নিকট কিছু সম্পদ পাঠাতেন। তারপর লোকজন পাঠিয়ে এ সম্পদের বণ্টনপদ্ধতি জানতেন। একবার তিনি আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট ৫০০ দিনার পাঠালেন এবং আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু সবগুলো দিনারই লোকজনের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। তার স্ত্রী তাকে বলত, ‘আল্লাহর কসম, এসব দিনার আমাদের উপকার করার চেয়ে ক্ষতিই বেশি করত।’ আবু উবাইদা নিজের ছেঁড়া জামা—যা পরে তিনি নামায আদায় করতেন—কেটে টুকরো টুকরো করতেন। দিনারগুলো টুকরো কাপড়ে বেঁধে গরিবদের নিকট পাঠাতেন যতক্ষণ না দিনার বণ্টন শেষ হতো। ১৯৮
সিরিয়ার ওই সফরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অন্যান্য গভর্নরদের সঙ্গেও একই আচরণ করেন। তিনি এ-সময় গভর্নরদের কেবল পরীক্ষাই করেননি; বরং সঙ্গে করে তাদের মদীনায়ও নিয়ে এসেছেন। তারপর তারা মদীনায় কী খায় ও পান করে, কী ধরনের পোশাক পরিধান করে—এগুলো দেখার জন্য লোক নিযুক্ত করেন। পাশাপাশি তিনি নিজেও তাদের পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন। ১৯৯
৩.১.৭। আর্কাইভ বা রাষ্ট্রীয় নথিপত্র
রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড এবং গভর্নরদের ব্যাপারে তথ্য সংরক্ষণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুবই যত্নবান ছিলেন। তিনি বিজিত অঞ্চলসমূহের সঙ্গে গভর্নরদের চুক্তিপত্র সংরক্ষণে সবচেয়ে বেশি নযর দিতেন, যাতে কারও ওপর যুলুম করা না হয়। বর্ণিত আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিজের কাছে একটি বাক্স বা ফাইল সংরক্ষিত থাকত, যাতে তিনি তার সঙ্গে অন্যদের করা চুক্তিসমূহ রাখতেন। এটাকে আমরা আর্কাইভ বা রাষ্ট্রীয় নথিপত্র বলতে পারি। গভর্নরদের নিকটও এ রকম একটি বাক্স বা ফাইল থাকত যেখানে তারা তাদের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র মজুদ রাখতেন। ফলে প্রয়োজনে তা বের করা সম্ভব হতো এবং যেকোনো প্রকার সন্দেহ এড়িয়ে চলা সম্ভব হতো। ২০০
টিকাঃ
১৮৩ আন-নাজমুল ইসলামিয়া, সুবহি আস-সালিহ, পৃ. ৮৯।
১৮৪ মানাকিবু আমীরুল মুমিনিন, ইবনে আল-জাওযি, পৃ. ১২৯।
১৮৫ আল-ইদারাতুল ইসলামিয়া, পৃ. ২১৫।
১৮৬ আত-তায ফি আখলাকিল মুলুক, পৃ. ১৬৮।
১৮৭ ফান্ন আল-হুকম, পৃ. ১৭৪।
১৮৮ আল-খারাজ, আবু ইউসুফ, পৃ. ১২৪; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১৫৭।
১৮৯ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১০৫।
১৯০ তারিখুল মদীনা, ২/৭৬১।
১৯১ আল-আনসার ফিল আসরির রাশিদি, পৃ. ১২৩-১২৬।
১৯২ আবকারিতু উমর, আল-আক্কাদ, পৃ. ৮২।
১৯৩ আত-তাবাকাত, ইবনে সাদ, ৩/২২২।
১৯৪ তারিখ আত-তাবারি, ৫/১৮; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১৬১।
১৯৫ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১৬১।
১৯৬ তারিখুল মদীনা, ৩/৮৩৭।
১৯৭ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১৬১২।
১৯৮ তারিখুল মদীনা, ৩/৮৩৭।
১৯৯ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১৬১।
২০০ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১৬৩।
📄 জনগণের পক্ষ থেকে গভর্নরদের বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহ
জনগণের পক্ষ থেকে গভর্নরদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু স্বয়ং সেটি তদন্ত করতেন। তিনি এ ব্যাপারে খুবই পারদর্শী ছিলেন এবং রাষ্ট্রের জ্ঞানী ও বিজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শও করতেন। তারপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য পুরস্কার বা শাস্তির ঘোষণা দিতেন। এতে ব্যক্তি সাধারণ না উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, তা গণ্য করা হতো না।২০১ নিচে এ রকম কিছু অভিযোগ ও সমাধান বর্ণনা করা হলো।
৩.২.১। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.-এর বিরুদ্ধে কুফার লোকদের অভিযোগ
আল-জাররাহ ইবনে সিনান আল-আসাদীর নেতৃত্বে কুফার কতিপয় লোক একত্র হয়ে তাদের গভর্নর সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে আমীরুল মুমিনীন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট অভিযোগ উত্থাপন করে। এটা এমন এক সময় সংঘটিত হয় যখন পারসিক অগ্নিপূজকরা নিহাওয়ান্দে মুসলমানদের আক্রমণ করার জন্য জমা হচ্ছিল। কিন্তু এসব লোকজন মুসলমানদের সম্মুখ বিপদ দেখেও তাদের হীন উদ্দেশ্য থেকে বিরত থাকেনি।
সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার অধীন লোকজনের প্রতি ন্যায়-পরায়ণ ও সহনশীল ছিলেন; তিনি সমাজের মিথ্যাবাদী ও ত্রাস সৃষ্টিকারীদের প্রতি কঠোর ছিলেন এবং সত্যবাদী ও একনিষ্ঠ লোকদের প্রতি দয়ালু ছিলেন। এতৎসত্ত্বেও যারা তার সত্য ও ন্যায় শাসন মেনে নিতে পারছিল না, তারা সমস্যা সৃষ্টির চক্রান্ত করে এবং তারা তাদের হীন স্বার্থকে চরিতার্থ করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। তারা অভিযোগ পেশ করার জন্য এমন এক সময় নির্ধারণ করে যখন খলীফার তা না শুনে উপায় ছিল না। কারণ, তখন মুসলমানরা জিহাদের প্রস্তুতি নিচ্ছিল যেখানে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বজায় রাখা ছিল জরুরি। তারা জানত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সর্বদা মুসলমাদের ঐক্য সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট ছিলেন; বিশেষ করে এ রকম যুদ্ধাবস্থায়। সুতরাং তারা আশা করে, তারা তাদের উদ্দেশ্যে সফল হবে। খলীফা তাদের অভিযোগ শোনেন এবং এটি তদন্ত করেন, যদিও তিনি নিশ্চিতভাবেই জানতেন যে, অভিযোগকারীরা দুষ্ট লোক, যারা তাদের নফসের অনুসরণ করে। তিনি তাদের সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করতেন, তা তিনি গোপন রাখেননি; বরং তিনি তা প্রকাশ্যে এবং দৃঢ়ভাবেই ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, এটা জানা থাকা সত্ত্বেও যে তারা তাদের গভর্নরের প্রতি অবিচার করছে এবং মিথ্যা অভিযোগ পেশ করছে তাকে এ অভিযোগ তদন্ত করতে তিনি পিছপা হবেন না। তিনি তাদের হীন উদ্দেশ্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, 'এমন এক সময় তোমরা এ অভিযোগ উত্থাপন করেছ যা থেকে তোমাদের হীন উদ্দেশ্যই প্রমাণিত হয়। কারণ, এ মুহূর্তে শত্রুরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আল্লাহর কসম, এ জটিল পরিস্থিতি সত্ত্বেও আমি এ অভিযোগ তদন্তে পিছপা হব না; এমনকি শত্রুরা তোমাদের ওপর আক্রমণ করলেও। ২০২
পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে জিহাদের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ অভিযোগ তদন্ত করতে মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে প্রেরণ করেন। উল্লেখ্য, তখন পার্সিয়ানরাও মুসলমানদের আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে সরকারি কর্মকর্তা ও গভর্নরদের বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহ তদন্ত করার জন্য মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিযুক্ত ছিলেন। মুহাম্মাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু কুফায় এসে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সঙ্গে নিয়ে কুফার বিভিন্ন জায়গায় যান এবং মুসলমান সৈনিকরা নিহাওয়ান্দের দিকে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে কুফার মসজিদে নিয়ে যান এবং তিনি কাউকে তার সম্পর্কে গোপনে কিছু জিজ্ঞাসা করেননি। কারণ, তখন প্রকাশ্যেই তদন্তের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হতো। ২০৩ এ থেকে কর্মকর্তা ও অধীনদের বিরোধ তদন্তে সাহাবীদের কর্মপন্থা সম্পর্কে জানা যায়। শাসক ও অধীনদের উপস্থিতিতেই এ তদন্ত পরিচালিত হতো। তিনি কোনো মসজিদেই থামেননি এবং কাউকে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসাও করেননি। তারপরেও লোকেরা বলল, 'আমরা তার সম্পর্কে ভালো ছাড়া ভিন্ন কিছু জানি না এবং তার পরিবর্তে আমরা অন্য কাউকে (গভর্নর হিসেবে) চাইও না। আমরা তার বিরুদ্ধে কিছু বলব না এবং আমরা তার বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করব না।'
তবে আল জাররাহ ইবনে সিনান এবং তার পক্ষের লোকেরা এর ব্যতিক্রম আচরণ করল; তার নীরবতা অবলম্বন করল এবং মন্দ কিছুই বলতে পারল না; কারণ, তাদের সেটি করার যুক্তিসংগত কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু তারা ইচ্ছা করেই তার কোনো প্রশংসা করল না।
তারপর তারা বনু আবস গোত্রের নিকট এল। মুহাম্মাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, যদি কেউ সত্য জেনে থাকে, সে যেন তা বলে।' উসামা ইবনে কাতাদাহ বললেন, 'আল্লাহর কসম, আপনি যদি অভয় দেন তাহলে বলতে পারি। তিনি বণ্টনে সমতা রক্ষা করেন না এবং লোকদের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করেন না এবং তিনি আমাদের জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করেন না।' সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, সে যদি লোক-দেখানোর জন্য মিথ্যা বলে, তাহলে আল্লাহ যেন তাকে অন্ধ করে দেন, তার পরিবারের সদস্য-সংখ্যা বৃদ্ধি করে দেন এবং তাকে ফিতনায় নিপতিত করেন।' এ বদদুআর ফলে সে অন্ধ হয়ে যায়, আল্লাহ তাকে দশটি কন্যাসন্তান দিয়ে দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত করেন এবং যখনই সে কোনো মহিলার সংবাদ পেত, সে তাকে পাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে উঠত। এ জন্য যখন তাকে পাকড়াও করা হতো, তখন সে বলত, 'এটি সেই পবিত্র আত্মা সাদের দুআর পরিণতি।'
তারপর সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের বিরুদ্ধে বদদুআ করেন, 'হে আল্লাহ, যদি তারা ঔদ্ধত্য ও অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে, তাহলে তাদের ওপর তোমার আযাব দিয়ে পাকড়াও করো।' সুতরাং এ দুআও আল্লাহ তা'আলা কবুল করে নেন। তাদের ওপর বিপদ নেমে আসে। আল-হাসান ইবনে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও তাকে হত্যার চেষ্টা করলে আল-জাররাকে তরবারির আঘাতে হত্যা করা হয়। কাবিসা পাথরের আঘাতে মৃত্যুবরণ করে। আরবাদ তরবারির খাপের আঘাতে নিহত হয়। এ বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের কীভাবে সাহায্য করে থাকেন। এখানে তিনি সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর দুআ ওইসব লোকদের ব্যাপারে কবুল করেছেন যারা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিল এবং এ দুআর পরিণতি হিসাবে তারা সকলেই নির্মমভাবে নিহত হয়েছিল। এখান থেকে এটাও জানা যায় যে, আল্লাহ কীভাবে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর দুআ কবুল করতেন এবং তার মতো অন্যদেরও। এসবই আল্লাহর নিকটতম বান্দাদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহের প্রকাশ।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যেসব লোকদের বিরুদ্ধে বদদুআ করেছিলেন, তাদের অন্তরে শয়তান বদ্ধমূল জায়গা করে নিয়েছিল। এ জন্য তারা খারাপ পরিণতির শিকার হয়েছে। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, 'আমিই প্রথম মুশরিকদের রক্ত ঝরিয়েছি এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার ব্যাপারে তার পিতা-মাতার কুরবানির কথা উল্লেখ করেছেন এবং এটি তিনি আমার পূর্বে আর কারও জন্য করেননি যখন উহুদের রণাঙ্গনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আমার মা-বাবা তোমার প্রতি উৎসর্গিত হোক, তুমি যথাসাধ্য তির ছুড়তে থাক।' আমি ইসলামে প্রথম পাঁচ জনের একজন এবং বনু আসাদ দাবি করে, আমি ঠিকমতো নামায আদায় করি না অথবা শিকারি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছে।'
মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা তাকে সঙ্গে করে নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট হাজির হন এবং তাকে পুরো ঘটনা খুলে বলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, 'তুমি কীভাবে নামায পড়ো?' সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি প্রথম দুই রাকাত লম্বা করি এবং শেষ দুই রাকাত ছোট করি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমিও তা-ই ভেবেছিলাম।' তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যদি সতর্কতা অবলম্বন করা না হতো তাহলে তাদের (চক্রান্তের) পথ পরিষ্কার হয়ে যেত।' তারপর তিনি জিজ্ঞাসা করেন, 'হে সাদ, তোমার অনুপস্থিতিতে কুফার গভর্নর হিসাবে তুমি কার ওপর দায়িত্ব অর্পণ করে আসো?' তিনি বললেন, 'আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে উতবা।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকেই কুফার গভর্নর হিসাবে নিযুক্ত করেন। ২০৪
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা—'যদি সতর্কতা অবলম্বন করা না হতো তাহলে তাদের (চক্রান্তের) পথ পরিষ্কার হয়ে যেত-মানে তারা ছিল অজ্ঞ দুষ্কৃতিকারী। এটা নিশ্চিত যে তারা সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উত্থাপন করেছে, তা থেকে তিনি মুক্ত। কিন্তু উম্মতের জন্য এটি জরুরি ছিল ফেতনা দূর করা এবং এর মূলোৎপাটন করা, যা ব্যাপক আকার ধারণ করে মুসলমানদের মধ্যে ত্রাস, বিভক্তি এবং মারামারি সৃষ্টি করতে পারে। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে তিনি যদি নিরপরাধ হন, তাহলে অভিযোগ তদন্ত করলেও তার কোনো ক্ষতি নেই। তারা গভর্নর পদকে কঠিন বোঝা হিসাবেই দেখতেন, কখনো এটাকে সুযোগ মনে করতেন না; এটাকে তারা এমন এক দায়িত্ব মনে করতেন যে জন্য তারা আল্লাহর নিকট পুরস্কারের আশা করতেন। কারও ওপর উম্মতের কোনো দায়িত্ব অর্পিত হলে এটি তার জন্যই নেক আমল, যে কিনা আল্লাহকে ভয় পান, তার সন্তুষ্টি এবং আখেরাতে সফলতা কামনা করেন। আর যদি এটি ফেতনার কারণ হয়, তাহলে হেকমত হচ্ছে এ দায়িত্বে বহাল না থাকা, যা এখানে সংঘটিত হয়েছে। এ জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে গভর্নরের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন এবং সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর পছন্দের ব্যক্তিকে ওই পদে নিযুক্ত করেছেন। ২০৫ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মদীনায় রেখে তারই মনোনীত ব্যক্তিকে কুফার গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দিয়েছেন। এভাবে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরামর্শক হিসাবে কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। ২০৬ তারপর যখন তিনি ছুরির আঘাতে জখম হন, তখন তিনি পরবর্তী খলীফা নির্বাচনে যে ছয় সদস্য-বিশিষ্ট শূরা-কমিটি গঠন করেন, সেখানে তিনি সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অন্তর্ভুক্ত করেন। আর পরবর্তী খলীফার প্রতি তাকে গভর্নর নিযুক্ত করারও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, 'আমি কোনো মন্দ অভিযোগের ভিত্তিতে সাদকে গভর্নর পদ থেকে বরখাস্ত করিনি; বরং উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে তার সুনামের ক্ষতির আশঙ্কা করেছি মাত্র। ২০৭
৩.২.২। মিসরের গভর্নর আমর ইবনুল আস রা.-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর কর্মকাণ্ডের ওপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুবই সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন এবং বিভিন্ন উপলক্ষ্যে তার প্রদেশের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতেন। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার নিজের জন্য একটি মিম্বর নির্মাণ করেন। এ খবর পেয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে লিখে পাঠান, 'আমি শুনেছি তুমি নিজের জন্য একটি মিম্বর তৈরি করেছ, যাতে তুমি নিজের অবস্থান মুসলমানদের থেকে ওপরে তুলে ধরতে পার। এটা কি তোমার জন্য যথেষ্ট নয় যে, তুমি তাদের সঙ্গে নিজের পায়ের ওপর ভর করে দাঁড়াবে? আমি সেটি ভেঙে ফেলার জন্য তাগিদ দিচ্ছি।'২০৮
আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই কথায় ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি জানতেন, মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কত কঠোর এবং শরীয়তই এর সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা তিনি প্রাণপণ অনুসরণ করে থাকেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অসন্তুষ্টিমূলক কোনো খবর যেন তার নিকট না পৌঁছে এ জন্য তিনি সব রকমের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।
একবার আব্দুর রহমান ইবনে উমর ইবনে আল-খাত্তাব এবং আরেকজন না জেনেই মদ পান করে এবং নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তারপর তারা এসে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তাদের ওপর হদ শাস্তি প্রয়োগ করতে বলেন। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের তিরস্কার করেন এবং তাদের বের করে দেন। আব্দুর রহমান তাকে বলেন, 'আপনি যদি এটি না করেন, তাহলে আমি আমার পিতাকে বলে দেব।' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি উপলব্ধি করি যে যদি আমি তাদের ওপর হদ প্রয়োগ না করি, তাহলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রেগে যাবেন এবং আমাকে পদচ্যুত করবেন।' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের জনসম্মুখে চাবুক দিয়ে নির্দিষ্ট-সংখ্যক প্রহার করেন, কিন্তু তার ঘরে নিয়ে তাদের মাথার চুল কামিয়ে দেন। তবে সাধারণ নিয়ম ছিল, কেউ মদ পান করলে শাস্তিস্বরূপ জনসম্মুখেই তার মাথার চুল কামিয়ে দেওয়া হতো, আবার চাবুক দিয়ে নির্দিষ্ট-সংখ্যক প্রহারও করা হতো। পরে তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষ থেকে পত্র লাভ করেন যেখানে তাকে জনসম্মুখে মাথার চুল না কামানোর জন্য তিরস্কার করা হয়। চিঠিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তুমি আব্দুর রহমানকে জনসম্মুখে বেত্রাঘাত করেছ, আর নিজের ঘরে নিয়ে তার মাথার চুল কামিয়েছ—যদিও তুমি জানো যে, এটি আমার ইচ্ছার বিপরীত। আব্দুর রহমান তোমার অধীনদের একজন এবং তাকে তোমার অন্যান্য মুসলমানদের মতোই দেখা উচিত। কিন্তু তুমি মনে করেছ, সে খলীফার সন্তান। যদিও তুমি জানো যে আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব পালনে আমি কারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব করি না।'২০৯
গভর্নর থাকাকালীন আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হয়; এর মধ্যে কিছু অভিযোগ মুসলিম সৈনিকদের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয় এবং কিছু মিসরীয়দের পক্ষ থেকে। এ জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বেশ কয়েকবার ডেকে পাঠান, তাকে তিরস্কার করেন এবং অনেক সময় তার কৃতকর্মের জন্য শাস্তিও প্রয়োগ করেন। উদাহরণস্বরূপ, একবার মিসরের এক ব্যক্তি অভিযোগ পেশ করেন, আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর ছেলে তাকে চাবুক দিয়ে আঘাত করেছে। এতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তার ছেলে তলব করেন। তারপর তিনি মিসরীয় ব্যক্তিকে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ছেলের ওপর প্রতিশোধ নিতে বললেন। তিনি তাকে বললেন, 'যদি তুমি তার পিতা আমরকে মারতে, তাহলেও আমরা তোমাকে থামাতাম না।' তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে ফিরে বললেন, 'তোমরা কখন লোকদের দাস বানালে? অথচ তাদের মায়েরা তো তাদের স্বাধীন হিসেবে জন্ম দিয়েছে।' ২১০
এ ব্যাপারে আরেকটি ঘটনা প্রসিদ্ধ আছে। একবার এক সৈনিক আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে মুনাফিক বলে অপবাদ দেওয়ার অভিযোগ করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চিঠিতে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি নির্দেশ জারি করেন যে, তিনি জনসম্মুখে হাজির হবেন এবং সৈনিকটি তাকে চাবুক দিয়ে আঘাত করবে, যদি সাক্ষী কর্তৃক তার অভিযোগ সত্য বলে প্রমাণিত হয়। সৈনিকটির অভিযোগ সাক্ষী দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে মুনাফিক বলেছেন। লোকেরা সৈনিকটিকে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চাবুক দিয়ে আঘাত করা থেকে বিরত থাকতে এবং এর পরিবর্তে অর্থ নেওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু সে এতে রাজি হয়নি। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আঘাত করার জন্য সৈনিকটি যখন তার সামনে দাঁড়ায়, তখন তাকে বলে, 'এমন কেউ আছে যে আপনাকে আঘাত করা থেকে আমাকে ফেরাবে?' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'না। তোমাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা করো।' সৈনিকটি বলল, 'আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিলাম।' ২১১
৩.২.৩। বসরার গভর্নর মুসা আল-আশআরী রা.-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ
জারির ইবনে আব্দুল্লাহ আল-বাযালি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: একবার তেজস্বী কণ্ঠের অধিকারী ও শত্রুর বিরুদ্ধে খুবই কঠোর এক ব্যক্তি মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে ছিল। তারা কিছু গনীমতের সম্পদ লাভ করল এবং মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকটিকে তার পাওনার কিছু অংশ প্রদান করেন। কিন্তু সে তার অংশের পুরোটাই দাবি করছিল। এতে মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বিশটি বেত্রাঘাত করেন এবং তার মাথার চুল কামিয়ে দেন। লোকটি তার মাথার চুলগুলো জমা করে এবং সেগুলো নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দরবারে গিয়ে হাজির হয়। জারির বলেন, আমি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খুব কাছাকাছি ছিলাম। লোকটি তার চুলগুলো উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কোলের ওপর ছুড়ে মারে এবং বলে, 'যদি জাহান্নাম না থাকত...।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তা ঠিক। যদি জাহান্নাম না থাকত...।' লোকটি বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমার কণ্ঠ খুব তেজস্বী এবং যুদ্ধে আমি শত্রুর বিরুদ্ধে খুবই কঠোর।' তারপর সে তার পুরো ঘটনা তুলে ধরল। সে বলল, 'মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বিশটি বেত্রাঘাত করেছেন এবং তার মাথার চুল কামিয়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, কেউ তার বিরুদ্ধে এর প্রতিশোধ নিতে পারবে না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'যদি সবাই এই লোকটির মতো দৃঢ় হতো, তাহলে আল্লাহ আমাদের যে গনীমতের সম্পদ দিয়েছেন, তা থেকে আমি বেশি খুশি হতাম।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠিতে লেখলেন, 'আসসালামু আলাইকুম। অমুক ব্যক্তি আমাকে এই এই ঘটনা বলেছে। তুমি যদি তা লোকদের সম্মুখে করে থাক, তাহলে আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি, তুমিও লোকদের সম্মুখে হাজির হয়ে তাকে এর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ করে দাও। আর যদি তাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে শাস্তি দিয়ে থাক, তাহলে তাকে নিয়ে এমন জায়গায় বসো যেখানে কোনো লোকজন নেই এবং তাকে তার প্রতিশোধ নিতে দাও।' লোকটি ফিরে এল এবং সবাই তাকে গভর্নরকে ক্ষমা করে দিতে বলল। সে বলল, 'আল্লাহর কসম, আমি কারও জন্য তাকে ক্ষমা করব না।' যখন মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকটির সঙ্গে ফায়সালা করার জন্য বসল, তখন লোকটি তার মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, 'হে আল্লাহ, আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম। ২১২
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমরা এক সফরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি দৌড়ে এল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, এই লোকটি সম্ভবত আমাদের খোঁজ করছে। লোকটি কাছে এসে কাঁদতে লাগল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-ও কাঁদতে লাগলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, 'কী ব্যাপার?' সে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমি মদ পান করেছিলাম। আবু মূসা আমাকে চাবুক দিয়ে মেরেছেন। তারপর আমার চেহারায় কালি মেখে লোকদের মধ্যে হাঁটিয়েছেন। আর সবাইকে বলে দিয়েছেন যেন কেউ আমার সঙ্গে না বসে। আমি আমার তরবারি দিয়ে আবু মূসাকে আঘাত করতে চেয়েছিলাম অথবা আপনার নিকট ছুটে যেতে চেয়েছি যেন আপনি আমাকে এমন ভূখণ্ডে প্রেরণ করেন যেখানে আমাকে কেউ চেনে না, অথবা মুশরিকদের কোনো দেশে গিয়ে বসবাস করার কথাও ভেবেছি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কাঁদলেন এবং বললেন, 'আমি মুশরিকদের ভূখণ্ডে বসবাস পছন্দ করি না যদিও আমি এই এই অবস্থার মুখোমুখি হই।' তারপর তিনি বললেন, 'যদি মদ পান করাই তোমার একমাত্র অপরাধ হয়, তাহলে তা অনেকে জাহেলি যুগে মদ পান করেছে।' তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পত্র প্রেরণ করেন। তিনি তাতে লেখেন, 'অমুক ব্যক্তি আমার নিকট এই এই ঘটনা বর্ণনা করেছে। আমার এই চিঠি যখন তোমার নিকট পৌঁছবে, তখন তুমি লোকদের ডেকে তার সঙ্গে মেলামেশা করতে বলবে। যদি সে অনুতপ্ত হয়, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে কিছু কাপড়-চোপড় হাদিয়া দেন এবং তাকে আরও ২০০ দিরহাম দেওয়া নির্দেশ দেন। ২১৩
আরেক বর্ণনামতে, তিনি বলেন, 'বনু তামিম গোত্রের অমুক ব্যক্তির ছেলে অমুক আমাকে এই এই ঘটনা বলেছে। আল্লাহর কসম, তুমি যদি আবার এ রকম করো, তাহলে আমি তোমার চেহারায় কালি মেখে লোকদের মধ্যে ঘোরাব। আমি যা বলেছি তা যদি তোমার পরখ করার ইচ্ছা হয়, তাহলে আবার সেটি করে দেখো। আর লোকদের মধ্যে ঘোষণা করে দাও, তারা যেন তার সঙ্গে বসে ও মেলামেশা করে। আর যদি সে অনুতপ্ত হয়, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দাও।। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে কিছু কাপড় ও বাহন দান করেন এবং তাকে দু শ দিরহাম দেওয়ার নির্দেশ দেন। ২১৪ এ থেকে বোঝা যায়, তিনি গভর্নরদের প্রতি কত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেন এবং অপরাধীকে শরীয়ত অনুযায়ী শাস্তি দিতে গিয়ে কেউ সামান্য পরিমাণও বাড়াবাড়ি করতে পারত না। ২১৫
৩.২.৪। সাইদ ইবনে আমির রা.-এর বিরুদ্ধে হিমসবাসীর অভিযোগ
খালিদ ইবনে মাদান বলেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু হিমসের গভর্নর হিসাবে সাইদ ইবনে আমির রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিযুক্ত করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হিমস সফরে এসে লোকদের জিজ্ঞাসা করেন, 'হে হিমসবাসী, তোমাদের গভর্নরের অবস্থা কী?' লোকেরা তখন গভর্নরের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করে। গভর্নরের বিরুদ্ধে অনবরত অভিযোগ করায় হিমসবাসীরা 'ছোট কুফা' নামে পরিচিত ছিল। তারা বলল, তার বিরুদ্ধে আমাদের চারটি অভিযোগ রয়েছে। তিনি অনেক বেলা করে ঘর থেকে বের হন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এটি খুবই গুরুতর অভিযোগ। আর কী অভিযোগ?' তারা বলল, 'তিনি রাতে কারও ডাকে সাড়া দেন না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এটি খুবই গুরুতর অভিযোগ। আর কী অভিযোগ?' তারা বলল, 'মাসে একদিন তিনি আমাদের কারও সঙ্গে দেখা করেন না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এটি খুবই খুবই গুরুতর অভিযোগ। আর কী অভিযোগ?' তারা বলল, 'কখনো কখনো তিনি অজ্ঞান হয়ে যান।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকজন জমা করে গভর্নরকে নিয়ে সালিসে বসলেন। তিনি বলে ওঠেন, 'হে আল্লাহ, আমি তার সম্পর্কে যা ধারণা রাখি আজ যেন তা মিথ্যা না হয়।' তারপর গভর্নরের সামনে লোকজনকে জিজ্ঞাসা করেন, 'তার বিরুদ্ধে তোমাদের কী অভিযোগ?' তারা বলল, “তিনি অনেক বেলা করে ঘর থেকে বের হন।” উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাইদ ইবনে আমির রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এ প্রশ্নের জবাবে তোমার বক্তব্য কী?” সাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আল্লাহর কসম, আমি এটি বলতে চাইনি। আমার বাড়িতে কোনো কাজের লোক নেই। এ জন্য আমি নিজেই রুটির খামির তৈরি করি এবং ফুলে ওঠার জন্য অপেক্ষা করি। তারপর আমি রুটি তৈরি করি। তারপর অযু করে তাদের নিকট আসি।” উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন, “তার বিরুদ্ধে তোমাদের আর কী অভিযোগ?” তারা বলল, “তিনি রাতে কারও ডাকে সাড়া দেন না।” উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাইদ ইবনে আমির রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এ প্রশ্নের জবাবে তোমার বক্তব্য কী?” সাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আল্লাহর কসম, আমি এটি বলতে চাইনি। আমি তাদের জন্য দিনকে নির্দিষ্ট করেছি এবং রাত কেবল আল্লাহর জন্য রেখেছি।”
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন, “তার বিরুদ্ধে তোমাদের আর কী অভিযোগ?” তারা বলল, “মাসে একদিন তিনি আমাদের কারও সঙ্গে দেখা করেন না।” উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাইদ ইবনে আমির রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এ প্রশ্নের জবাবে তোমার বক্তব্য কী?” সাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমার কোনো কাজের লোক নেই যে আমার কাপড়-চোপড়গুলো ধুয়ে দেবে এবং এই একটি জামা ছাড়া আমার আর অন্য কোনো জামাও নেই। সুতরাং এটি শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করি। তারপর এটি পরে দিন শেষে ঘর থেকে বের হই।”
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন, “তার বিরুদ্ধে তোমাদের আর কী অভিযোগ?” তারা বলল, “কখনো কখনো তিনি অজ্ঞান হয়ে যান।” উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাইদ ইবনে আমির রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এ প্রশ্নের জবাবে তোমার বক্তব্য কী?” সাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমি মক্কায় খুবাইব আল-আনসারিকে নির্মমভাবে হত্যার দৃশ্য স্বচক্ষে দেখেছি। কুরাইশরা তার শরীরের গোশত কেটে একটা গাছের গুঁড়ির সাথে ঝুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করছে, ‘তুমি কি তোমার জায়গায় মুহাম্মাদকে শাস্তি দিলে খুশি হবে?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি চাই না আমার পরিবার-পরিজনের সঙ্গে থাকার পরিবর্তে মুহাম্মাদের গায়ে একটা কাঁটাও বিদ্ধ হোক।’ তারপর তিনি জোরে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠেন, ‘হে মুহাম্মাদ!’ যখনই আমার ওইদিনের কথা মনে পড়ে যে, আমি কীভাবেই-না তাকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হয়েছিলাম—আমি ওইসময় মুশরিক ছিলাম ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর ঈমান আনতে পারিনি এবং আমার মনে হয়, এ জন্য আল্লাহ আমাকে কখনোই ক্ষমা করবেন না—তখনই আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।’
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘মহান আল্লাহ তা’আলার জন্য সকল প্রশংসা। তিনি আমার ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত করেননি।’ তিনি তার জন্য এক হাজার দিনার পাঠান এবং বলেন, ‘এগুলো নিজের জন্য ব্যবহার করো।’ সাঈদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সবগুলো দিনার লোকদের মধ্যে বিলি করে দেন। ২১৬
৩.২.৫। হাসি-ঠাট্টা করায় একজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত
কাইস ইবনে আবি হাযিম রহ. বর্ণনা করেন: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আনসারদের এক ব্যক্তিকে কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ দেন যে হিরাবাসীদের নেতা আমর ইবনে হাইয়ান ইবনে বাকিলার সঙ্গে অবস্থান করে। তিনি আনসারি কর্মকর্তার ইচ্ছানুযায়ী ভালো খাদ্য ও পানীয় পরিবেশন করেন। তারপর ওই কর্মকর্তা হাসি-ঠাট্টা শুরু করে। একপর্যায়ে সে তাকে কাছে ডেকে তার দাড়িতে হাত মোছে। তারপর আমর ইবনে হাইয়ান উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গমন করে এবং বলে, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আমি কায়সার ও কিসরার সেবা করেছি। আমি আপনার রাজ্যের মতো কখনো এমন অপমানবোধ করিনি।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘কী হয়েছে?’ সে বলল, ‘আপনার কর্মকর্তা আমার বাড়িতে অবস্থান করেছে। আমি তার পছন্দানুযায়ী খাবার পরিবেশন করেছি। তারপর তিনি হাসি-ঠাট্টা শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি আমাকে কাছে ডেকে আমার দাড়িতে তার হাত মোছেন।’
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ওই আনসারি ব্যক্তিকে ডেকে পাঠান। তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ব্যাপার কী? সে তোমাকে তোমার ইচ্ছামতো খাবার- ২১৬ হিলয়াতুল আউলিয়া, ১/২৪৫; আখবার উমর, ১৫২।
পানীয় দিয়েছে। আর তুমি তার দাড়িতে হাত মুছেছ? আল্লাহর কসম, যদি এটা রীতি হয়ে যাওয়ার ভয় না থাকত তাহলে আমি তোমার প্রতিটি দাড়ি টেনে টেনে উপড়ে ফেলতাম। যাও, ভাগো। তোমাকে আর আমার কোনো কাজ করতে হবে না। ২ ১৭
টিকাঃ
২০১ আল-ইদারাতুল ইসলামিয়া, পৃ. ২১৫।
২০২ তারিখ আত-তাবারি, ৫/১০৩।
২০৩ প্রাগুক্ত।
২০৪ তারিখ আত-তাবারি, ৫/১০৪।
২০৫ তারখিল ইসলামি, আল-হুমাইদি, ১১/২২২।
২০৬ দাওরুল হিজাজ ফিল হায়াতিস সিয়াসিয়া, পৃ. ২৫৭।
২০৭ তারিখ আত-তাবারি, ৫/২২৫।
২০৮ ফুতুহু মিসর ওয়া আখবারুহা, পৃ. ৯২।
২০৯ তারখিল মদীনা, ৩/৮৪১।
২১০ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৮১।
২১১ তারিখুল মদীনা, ৩/৮০৭; এর সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।
২১২ মাহজুস সাওয়াব, ২/৪৬৭; এর সনদ হাসান।
২১৩ মাহজুস সাওয়াব, ২/৫৫৩।
২১৪ সহিহৃত তাওসিকি সিরাতি ওয়া হায়াতিল ফারুক, পৃ. ১৩৪; এর সনদ হাসান।
২১৫ প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৩।
২ ১৭ তারিখুল মদীনা, ৩/৮১৩; বর্ণনাটি সহীহ; আল-ফারুক আল-হাকিম আল-আদিল, পৃ. ১১।
জনগণের পক্ষ থেকে গভর্নরদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু স্বয়ং সেটি তদন্ত করতেন। তিনি এ ব্যাপারে খুবই পারদর্শী ছিলেন এবং রাষ্ট্রের জ্ঞানী ও বিজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শও করতেন। তারপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য পুরস্কার বা শাস্তির ঘোষণা দিতেন। এতে ব্যক্তি সাধারণ না উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, তা গণ্য করা হতো না।২০১ নিচে এ রকম কিছু অভিযোগ ও সমাধান বর্ণনা করা হলো।
৩.২.১। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা.-এর বিরুদ্ধে কুফার লোকদের অভিযোগ
আল-জাররাহ ইবনে সিনান আল-আসাদীর নেতৃত্বে কুফার কতিপয় লোক একত্র হয়ে তাদের গভর্নর সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে আমীরুল মুমিনীন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট অভিযোগ উত্থাপন করে। এটা এমন এক সময় সংঘটিত হয় যখন পারসিক অগ্নিপূজকরা নিহাওয়ান্দে মুসলমানদের আক্রমণ করার জন্য জমা হচ্ছিল। কিন্তু এসব লোকজন মুসলমানদের সম্মুখ বিপদ দেখেও তাদের হীন উদ্দেশ্য থেকে বিরত থাকেনি।
সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার অধীন লোকজনের প্রতি ন্যায়-পরায়ণ ও সহনশীল ছিলেন; তিনি সমাজের মিথ্যাবাদী ও ত্রাস সৃষ্টিকারীদের প্রতি কঠোর ছিলেন এবং সত্যবাদী ও একনিষ্ঠ লোকদের প্রতি দয়ালু ছিলেন। এতৎসত্ত্বেও যারা তার সত্য ও ন্যায় শাসন মেনে নিতে পারছিল না, তারা সমস্যা সৃষ্টির চক্রান্ত করে এবং তারা তাদের হীন স্বার্থকে চরিতার্থ করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। তারা অভিযোগ পেশ করার জন্য এমন এক সময় নির্ধারণ করে যখন খলীফার তা না শুনে উপায় ছিল না। কারণ, তখন মুসলমানরা জিহাদের প্রস্তুতি নিচ্ছিল যেখানে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বজায় রাখা ছিল জরুরি। তারা জানত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সর্বদা মুসলমাদের ঐক্য সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট ছিলেন; বিশেষ করে এ রকম যুদ্ধাবস্থায়। সুতরাং তারা আশা করে, তারা তাদের উদ্দেশ্যে সফল হবে। খলীফা তাদের অভিযোগ শোনেন এবং এটি তদন্ত করেন, যদিও তিনি নিশ্চিতভাবেই জানতেন যে, অভিযোগকারীরা দুষ্ট লোক, যারা তাদের নফসের অনুসরণ করে। তিনি তাদের সম্পর্কে যে ধারণা পোষণ করতেন, তা তিনি গোপন রাখেননি; বরং তিনি তা প্রকাশ্যে এবং দৃঢ়ভাবেই ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, এটা জানা থাকা সত্ত্বেও যে তারা তাদের গভর্নরের প্রতি অবিচার করছে এবং মিথ্যা অভিযোগ পেশ করছে তাকে এ অভিযোগ তদন্ত করতে তিনি পিছপা হবেন না। তিনি তাদের হীন উদ্দেশ্যের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, 'এমন এক সময় তোমরা এ অভিযোগ উত্থাপন করেছ যা থেকে তোমাদের হীন উদ্দেশ্যই প্রমাণিত হয়। কারণ, এ মুহূর্তে শত্রুরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আল্লাহর কসম, এ জটিল পরিস্থিতি সত্ত্বেও আমি এ অভিযোগ তদন্তে পিছপা হব না; এমনকি শত্রুরা তোমাদের ওপর আক্রমণ করলেও। ২০২
পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে জিহাদের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ অভিযোগ তদন্ত করতে মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে প্রেরণ করেন। উল্লেখ্য, তখন পার্সিয়ানরাও মুসলমানদের আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে সরকারি কর্মকর্তা ও গভর্নরদের বিরুদ্ধে অভিযোগসমূহ তদন্ত করার জন্য মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিযুক্ত ছিলেন। মুহাম্মাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু কুফায় এসে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সঙ্গে নিয়ে কুফার বিভিন্ন জায়গায় যান এবং মুসলমান সৈনিকরা নিহাওয়ান্দের দিকে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে কুফার মসজিদে নিয়ে যান এবং তিনি কাউকে তার সম্পর্কে গোপনে কিছু জিজ্ঞাসা করেননি। কারণ, তখন প্রকাশ্যেই তদন্তের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হতো। ২০৩ এ থেকে কর্মকর্তা ও অধীনদের বিরোধ তদন্তে সাহাবীদের কর্মপন্থা সম্পর্কে জানা যায়। শাসক ও অধীনদের উপস্থিতিতেই এ তদন্ত পরিচালিত হতো। তিনি কোনো মসজিদেই থামেননি এবং কাউকে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসাও করেননি। তারপরেও লোকেরা বলল, 'আমরা তার সম্পর্কে ভালো ছাড়া ভিন্ন কিছু জানি না এবং তার পরিবর্তে আমরা অন্য কাউকে (গভর্নর হিসেবে) চাইও না। আমরা তার বিরুদ্ধে কিছু বলব না এবং আমরা তার বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্যও করব না।'
তবে আল জাররাহ ইবনে সিনান এবং তার পক্ষের লোকেরা এর ব্যতিক্রম আচরণ করল; তার নীরবতা অবলম্বন করল এবং মন্দ কিছুই বলতে পারল না; কারণ, তাদের সেটি করার যুক্তিসংগত কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু তারা ইচ্ছা করেই তার কোনো প্রশংসা করল না।
তারপর তারা বনু আবস গোত্রের নিকট এল। মুহাম্মাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, যদি কেউ সত্য জেনে থাকে, সে যেন তা বলে।' উসামা ইবনে কাতাদাহ বললেন, 'আল্লাহর কসম, আপনি যদি অভয় দেন তাহলে বলতে পারি। তিনি বণ্টনে সমতা রক্ষা করেন না এবং লোকদের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করেন না এবং তিনি আমাদের জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করেন না।' সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, সে যদি লোক-দেখানোর জন্য মিথ্যা বলে, তাহলে আল্লাহ যেন তাকে অন্ধ করে দেন, তার পরিবারের সদস্য-সংখ্যা বৃদ্ধি করে দেন এবং তাকে ফিতনায় নিপতিত করেন।' এ বদদুআর ফলে সে অন্ধ হয়ে যায়, আল্লাহ তাকে দশটি কন্যাসন্তান দিয়ে দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত করেন এবং যখনই সে কোনো মহিলার সংবাদ পেত, সে তাকে পাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে উঠত। এ জন্য যখন তাকে পাকড়াও করা হতো, তখন সে বলত, 'এটি সেই পবিত্র আত্মা সাদের দুআর পরিণতি।'
তারপর সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের বিরুদ্ধে বদদুআ করেন, 'হে আল্লাহ, যদি তারা ঔদ্ধত্য ও অন্যায়ভাবে বিদ্রোহ করে, তাহলে তাদের ওপর তোমার আযাব দিয়ে পাকড়াও করো।' সুতরাং এ দুআও আল্লাহ তা'আলা কবুল করে নেন। তাদের ওপর বিপদ নেমে আসে। আল-হাসান ইবনে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও তাকে হত্যার চেষ্টা করলে আল-জাররাকে তরবারির আঘাতে হত্যা করা হয়। কাবিসা পাথরের আঘাতে মৃত্যুবরণ করে। আরবাদ তরবারির খাপের আঘাতে নিহত হয়। এ বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের কীভাবে সাহায্য করে থাকেন। এখানে তিনি সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর দুআ ওইসব লোকদের ব্যাপারে কবুল করেছেন যারা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিল এবং এ দুআর পরিণতি হিসাবে তারা সকলেই নির্মমভাবে নিহত হয়েছিল। এখান থেকে এটাও জানা যায় যে, আল্লাহ কীভাবে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর দুআ কবুল করতেন এবং তার মতো অন্যদেরও। এসবই আল্লাহর নিকটতম বান্দাদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহের প্রকাশ।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যেসব লোকদের বিরুদ্ধে বদদুআ করেছিলেন, তাদের অন্তরে শয়তান বদ্ধমূল জায়গা করে নিয়েছিল। এ জন্য তারা খারাপ পরিণতির শিকার হয়েছে। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, 'আমিই প্রথম মুশরিকদের রক্ত ঝরিয়েছি এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার ব্যাপারে তার পিতা-মাতার কুরবানির কথা উল্লেখ করেছেন এবং এটি তিনি আমার পূর্বে আর কারও জন্য করেননি যখন উহুদের রণাঙ্গনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, 'আমার মা-বাবা তোমার প্রতি উৎসর্গিত হোক, তুমি যথাসাধ্য তির ছুড়তে থাক।' আমি ইসলামে প্রথম পাঁচ জনের একজন এবং বনু আসাদ দাবি করে, আমি ঠিকমতো নামায আদায় করি না অথবা শিকারি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছে।'
মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা তাকে সঙ্গে করে নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট হাজির হন এবং তাকে পুরো ঘটনা খুলে বলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, 'তুমি কীভাবে নামায পড়ো?' সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি প্রথম দুই রাকাত লম্বা করি এবং শেষ দুই রাকাত ছোট করি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমিও তা-ই ভেবেছিলাম।' তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যদি সতর্কতা অবলম্বন করা না হতো তাহলে তাদের (চক্রান্তের) পথ পরিষ্কার হয়ে যেত।' তারপর তিনি জিজ্ঞাসা করেন, 'হে সাদ, তোমার অনুপস্থিতিতে কুফার গভর্নর হিসাবে তুমি কার ওপর দায়িত্ব অর্পণ করে আসো?' তিনি বললেন, 'আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে উতবা।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকেই কুফার গভর্নর হিসাবে নিযুক্ত করেন। ২০৪
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা—'যদি সতর্কতা অবলম্বন করা না হতো তাহলে তাদের (চক্রান্তের) পথ পরিষ্কার হয়ে যেত-মানে তারা ছিল অজ্ঞ দুষ্কৃতিকারী। এটা নিশ্চিত যে তারা সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উত্থাপন করেছে, তা থেকে তিনি মুক্ত। কিন্তু উম্মতের জন্য এটি জরুরি ছিল ফেতনা দূর করা এবং এর মূলোৎপাটন করা, যা ব্যাপক আকার ধারণ করে মুসলমানদের মধ্যে ত্রাস, বিভক্তি এবং মারামারি সৃষ্টি করতে পারে। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে তিনি যদি নিরপরাধ হন, তাহলে অভিযোগ তদন্ত করলেও তার কোনো ক্ষতি নেই। তারা গভর্নর পদকে কঠিন বোঝা হিসাবেই দেখতেন, কখনো এটাকে সুযোগ মনে করতেন না; এটাকে তারা এমন এক দায়িত্ব মনে করতেন যে জন্য তারা আল্লাহর নিকট পুরস্কারের আশা করতেন। কারও ওপর উম্মতের কোনো দায়িত্ব অর্পিত হলে এটি তার জন্যই নেক আমল, যে কিনা আল্লাহকে ভয় পান, তার সন্তুষ্টি এবং আখেরাতে সফলতা কামনা করেন। আর যদি এটি ফেতনার কারণ হয়, তাহলে হেকমত হচ্ছে এ দায়িত্বে বহাল না থাকা, যা এখানে সংঘটিত হয়েছে। এ জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে গভর্নরের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন এবং সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর পছন্দের ব্যক্তিকে ওই পদে নিযুক্ত করেছেন। ২০৫ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মদীনায় রেখে তারই মনোনীত ব্যক্তিকে কুফার গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দিয়েছেন। এভাবে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরামর্শক হিসাবে কাজ করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। ২০৬ তারপর যখন তিনি ছুরির আঘাতে জখম হন, তখন তিনি পরবর্তী খলীফা নির্বাচনে যে ছয় সদস্য-বিশিষ্ট শূরা-কমিটি গঠন করেন, সেখানে তিনি সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অন্তর্ভুক্ত করেন। আর পরবর্তী খলীফার প্রতি তাকে গভর্নর নিযুক্ত করারও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, 'আমি কোনো মন্দ অভিযোগের ভিত্তিতে সাদকে গভর্নর পদ থেকে বরখাস্ত করিনি; বরং উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে তার সুনামের ক্ষতির আশঙ্কা করেছি মাত্র। ২০৭
৩.২.২। মিসরের গভর্নর আমর ইবনুল আস রা.-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর কর্মকাণ্ডের ওপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুবই সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন এবং বিভিন্ন উপলক্ষ্যে তার প্রদেশের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতেন। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার নিজের জন্য একটি মিম্বর নির্মাণ করেন। এ খবর পেয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে লিখে পাঠান, 'আমি শুনেছি তুমি নিজের জন্য একটি মিম্বর তৈরি করেছ, যাতে তুমি নিজের অবস্থান মুসলমানদের থেকে ওপরে তুলে ধরতে পার। এটা কি তোমার জন্য যথেষ্ট নয় যে, তুমি তাদের সঙ্গে নিজের পায়ের ওপর ভর করে দাঁড়াবে? আমি সেটি ভেঙে ফেলার জন্য তাগিদ দিচ্ছি।'২০৮
আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই কথায় ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি জানতেন, মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কত কঠোর এবং শরীয়তই এর সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা তিনি প্রাণপণ অনুসরণ করে থাকেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অসন্তুষ্টিমূলক কোনো খবর যেন তার নিকট না পৌঁছে এ জন্য তিনি সব রকমের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন।
একবার আব্দুর রহমান ইবনে উমর ইবনে আল-খাত্তাব এবং আরেকজন না জেনেই মদ পান করে এবং নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তারপর তারা এসে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তাদের ওপর হদ শাস্তি প্রয়োগ করতে বলেন। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের তিরস্কার করেন এবং তাদের বের করে দেন। আব্দুর রহমান তাকে বলেন, 'আপনি যদি এটি না করেন, তাহলে আমি আমার পিতাকে বলে দেব।' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি উপলব্ধি করি যে যদি আমি তাদের ওপর হদ প্রয়োগ না করি, তাহলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রেগে যাবেন এবং আমাকে পদচ্যুত করবেন।' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের জনসম্মুখে চাবুক দিয়ে নির্দিষ্ট-সংখ্যক প্রহার করেন, কিন্তু তার ঘরে নিয়ে তাদের মাথার চুল কামিয়ে দেন। তবে সাধারণ নিয়ম ছিল, কেউ মদ পান করলে শাস্তিস্বরূপ জনসম্মুখেই তার মাথার চুল কামিয়ে দেওয়া হতো, আবার চাবুক দিয়ে নির্দিষ্ট-সংখ্যক প্রহারও করা হতো। পরে তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষ থেকে পত্র লাভ করেন যেখানে তাকে জনসম্মুখে মাথার চুল না কামানোর জন্য তিরস্কার করা হয়। চিঠিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তুমি আব্দুর রহমানকে জনসম্মুখে বেত্রাঘাত করেছ, আর নিজের ঘরে নিয়ে তার মাথার চুল কামিয়েছ—যদিও তুমি জানো যে, এটি আমার ইচ্ছার বিপরীত। আব্দুর রহমান তোমার অধীনদের একজন এবং তাকে তোমার অন্যান্য মুসলমানদের মতোই দেখা উচিত। কিন্তু তুমি মনে করেছ, সে খলীফার সন্তান। যদিও তুমি জানো যে আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব পালনে আমি কারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব করি না।'২০৯
গভর্নর থাকাকালীন আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হয়; এর মধ্যে কিছু অভিযোগ মুসলিম সৈনিকদের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হয় এবং কিছু মিসরীয়দের পক্ষ থেকে। এ জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বেশ কয়েকবার ডেকে পাঠান, তাকে তিরস্কার করেন এবং অনেক সময় তার কৃতকর্মের জন্য শাস্তিও প্রয়োগ করেন। উদাহরণস্বরূপ, একবার মিসরের এক ব্যক্তি অভিযোগ পেশ করেন, আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর ছেলে তাকে চাবুক দিয়ে আঘাত করেছে। এতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ও তার ছেলে তলব করেন। তারপর তিনি মিসরীয় ব্যক্তিকে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ছেলের ওপর প্রতিশোধ নিতে বললেন। তিনি তাকে বললেন, 'যদি তুমি তার পিতা আমরকে মারতে, তাহলেও আমরা তোমাকে থামাতাম না।' তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে ফিরে বললেন, 'তোমরা কখন লোকদের দাস বানালে? অথচ তাদের মায়েরা তো তাদের স্বাধীন হিসেবে জন্ম দিয়েছে।' ২১০
এ ব্যাপারে আরেকটি ঘটনা প্রসিদ্ধ আছে। একবার এক সৈনিক আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে মুনাফিক বলে অপবাদ দেওয়ার অভিযোগ করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চিঠিতে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি নির্দেশ জারি করেন যে, তিনি জনসম্মুখে হাজির হবেন এবং সৈনিকটি তাকে চাবুক দিয়ে আঘাত করবে, যদি সাক্ষী কর্তৃক তার অভিযোগ সত্য বলে প্রমাণিত হয়। সৈনিকটির অভিযোগ সাক্ষী দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে মুনাফিক বলেছেন। লোকেরা সৈনিকটিকে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চাবুক দিয়ে আঘাত করা থেকে বিরত থাকতে এবং এর পরিবর্তে অর্থ নেওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু সে এতে রাজি হয়নি। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আঘাত করার জন্য সৈনিকটি যখন তার সামনে দাঁড়ায়, তখন তাকে বলে, 'এমন কেউ আছে যে আপনাকে আঘাত করা থেকে আমাকে ফেরাবে?' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'না। তোমাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা করো।' সৈনিকটি বলল, 'আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিলাম।' ২১১
৩.২.৩। বসরার গভর্নর মুসা আল-আশআরী রা.-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ
জারির ইবনে আব্দুল্লাহ আল-বাযালি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: একবার তেজস্বী কণ্ঠের অধিকারী ও শত্রুর বিরুদ্ধে খুবই কঠোর এক ব্যক্তি মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে ছিল। তারা কিছু গনীমতের সম্পদ লাভ করল এবং মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকটিকে তার পাওনার কিছু অংশ প্রদান করেন। কিন্তু সে তার অংশের পুরোটাই দাবি করছিল। এতে মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বিশটি বেত্রাঘাত করেন এবং তার মাথার চুল কামিয়ে দেন। লোকটি তার মাথার চুলগুলো জমা করে এবং সেগুলো নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দরবারে গিয়ে হাজির হয়। জারির বলেন, আমি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খুব কাছাকাছি ছিলাম। লোকটি তার চুলগুলো উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কোলের ওপর ছুড়ে মারে এবং বলে, 'যদি জাহান্নাম না থাকত...।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তা ঠিক। যদি জাহান্নাম না থাকত...।' লোকটি বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমার কণ্ঠ খুব তেজস্বী এবং যুদ্ধে আমি শত্রুর বিরুদ্ধে খুবই কঠোর।' তারপর সে তার পুরো ঘটনা তুলে ধরল। সে বলল, 'মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বিশটি বেত্রাঘাত করেছেন এবং তার মাথার চুল কামিয়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, কেউ তার বিরুদ্ধে এর প্রতিশোধ নিতে পারবে না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'যদি সবাই এই লোকটির মতো দৃঢ় হতো, তাহলে আল্লাহ আমাদের যে গনীমতের সম্পদ দিয়েছেন, তা থেকে আমি বেশি খুশি হতাম।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠিতে লেখলেন, 'আসসালামু আলাইকুম। অমুক ব্যক্তি আমাকে এই এই ঘটনা বলেছে। তুমি যদি তা লোকদের সম্মুখে করে থাক, তাহলে আমি তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি, তুমিও লোকদের সম্মুখে হাজির হয়ে তাকে এর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ করে দাও। আর যদি তাকে লোকচক্ষুর অন্তরালে শাস্তি দিয়ে থাক, তাহলে তাকে নিয়ে এমন জায়গায় বসো যেখানে কোনো লোকজন নেই এবং তাকে তার প্রতিশোধ নিতে দাও।' লোকটি ফিরে এল এবং সবাই তাকে গভর্নরকে ক্ষমা করে দিতে বলল। সে বলল, 'আল্লাহর কসম, আমি কারও জন্য তাকে ক্ষমা করব না।' যখন মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকটির সঙ্গে ফায়সালা করার জন্য বসল, তখন লোকটি তার মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, 'হে আল্লাহ, আমি তাকে ক্ষমা করে দিলাম। ২১২
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমরা এক সফরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি দৌড়ে এল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, এই লোকটি সম্ভবত আমাদের খোঁজ করছে। লোকটি কাছে এসে কাঁদতে লাগল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-ও কাঁদতে লাগলেন। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, 'কী ব্যাপার?' সে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমি মদ পান করেছিলাম। আবু মূসা আমাকে চাবুক দিয়ে মেরেছেন। তারপর আমার চেহারায় কালি মেখে লোকদের মধ্যে হাঁটিয়েছেন। আর সবাইকে বলে দিয়েছেন যেন কেউ আমার সঙ্গে না বসে। আমি আমার তরবারি দিয়ে আবু মূসাকে আঘাত করতে চেয়েছিলাম অথবা আপনার নিকট ছুটে যেতে চেয়েছি যেন আপনি আমাকে এমন ভূখণ্ডে প্রেরণ করেন যেখানে আমাকে কেউ চেনে না, অথবা মুশরিকদের কোনো দেশে গিয়ে বসবাস করার কথাও ভেবেছি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কাঁদলেন এবং বললেন, 'আমি মুশরিকদের ভূখণ্ডে বসবাস পছন্দ করি না যদিও আমি এই এই অবস্থার মুখোমুখি হই।' তারপর তিনি বললেন, 'যদি মদ পান করাই তোমার একমাত্র অপরাধ হয়, তাহলে তা অনেকে জাহেলি যুগে মদ পান করেছে।' তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পত্র প্রেরণ করেন। তিনি তাতে লেখেন, 'অমুক ব্যক্তি আমার নিকট এই এই ঘটনা বর্ণনা করেছে। আমার এই চিঠি যখন তোমার নিকট পৌঁছবে, তখন তুমি লোকদের ডেকে তার সঙ্গে মেলামেশা করতে বলবে। যদি সে অনুতপ্ত হয়, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে কিছু কাপড়-চোপড় হাদিয়া দেন এবং তাকে আরও ২০০ দিরহাম দেওয়া নির্দেশ দেন। ২১৩
আরেক বর্ণনামতে, তিনি বলেন, 'বনু তামিম গোত্রের অমুক ব্যক্তির ছেলে অমুক আমাকে এই এই ঘটনা বলেছে। আল্লাহর কসম, তুমি যদি আবার এ রকম করো, তাহলে আমি তোমার চেহারায় কালি মেখে লোকদের মধ্যে ঘোরাব। আমি যা বলেছি তা যদি তোমার পরখ করার ইচ্ছা হয়, তাহলে আবার সেটি করে দেখো। আর লোকদের মধ্যে ঘোষণা করে দাও, তারা যেন তার সঙ্গে বসে ও মেলামেশা করে। আর যদি সে অনুতপ্ত হয়, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দাও।। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে কিছু কাপড় ও বাহন দান করেন এবং তাকে দু শ দিরহাম দেওয়ার নির্দেশ দেন। ২১৪ এ থেকে বোঝা যায়, তিনি গভর্নরদের প্রতি কত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেন এবং অপরাধীকে শরীয়ত অনুযায়ী শাস্তি দিতে গিয়ে কেউ সামান্য পরিমাণও বাড়াবাড়ি করতে পারত না। ২১৫
৩.২.৪। সাইদ ইবনে আমির রা.-এর বিরুদ্ধে হিমসবাসীর অভিযোগ
খালিদ ইবনে মাদান বলেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু হিমসের গভর্নর হিসাবে সাইদ ইবনে আমির রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিযুক্ত করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হিমস সফরে এসে লোকদের জিজ্ঞাসা করেন, 'হে হিমসবাসী, তোমাদের গভর্নরের অবস্থা কী?' লোকেরা তখন গভর্নরের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করে। গভর্নরের বিরুদ্ধে অনবরত অভিযোগ করায় হিমসবাসীরা 'ছোট কুফা' নামে পরিচিত ছিল। তারা বলল, তার বিরুদ্ধে আমাদের চারটি অভিযোগ রয়েছে। তিনি অনেক বেলা করে ঘর থেকে বের হন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এটি খুবই গুরুতর অভিযোগ। আর কী অভিযোগ?' তারা বলল, 'তিনি রাতে কারও ডাকে সাড়া দেন না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এটি খুবই গুরুতর অভিযোগ। আর কী অভিযোগ?' তারা বলল, 'মাসে একদিন তিনি আমাদের কারও সঙ্গে দেখা করেন না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এটি খুবই খুবই গুরুতর অভিযোগ। আর কী অভিযোগ?' তারা বলল, 'কখনো কখনো তিনি অজ্ঞান হয়ে যান।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকজন জমা করে গভর্নরকে নিয়ে সালিসে বসলেন। তিনি বলে ওঠেন, 'হে আল্লাহ, আমি তার সম্পর্কে যা ধারণা রাখি আজ যেন তা মিথ্যা না হয়।' তারপর গভর্নরের সামনে লোকজনকে জিজ্ঞাসা করেন, 'তার বিরুদ্ধে তোমাদের কী অভিযোগ?' তারা বলল, “তিনি অনেক বেলা করে ঘর থেকে বের হন।” উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাইদ ইবনে আমির রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এ প্রশ্নের জবাবে তোমার বক্তব্য কী?” সাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আল্লাহর কসম, আমি এটি বলতে চাইনি। আমার বাড়িতে কোনো কাজের লোক নেই। এ জন্য আমি নিজেই রুটির খামির তৈরি করি এবং ফুলে ওঠার জন্য অপেক্ষা করি। তারপর আমি রুটি তৈরি করি। তারপর অযু করে তাদের নিকট আসি।” উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন, “তার বিরুদ্ধে তোমাদের আর কী অভিযোগ?” তারা বলল, “তিনি রাতে কারও ডাকে সাড়া দেন না।” উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাইদ ইবনে আমির রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এ প্রশ্নের জবাবে তোমার বক্তব্য কী?” সাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আল্লাহর কসম, আমি এটি বলতে চাইনি। আমি তাদের জন্য দিনকে নির্দিষ্ট করেছি এবং রাত কেবল আল্লাহর জন্য রেখেছি।”
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন, “তার বিরুদ্ধে তোমাদের আর কী অভিযোগ?” তারা বলল, “মাসে একদিন তিনি আমাদের কারও সঙ্গে দেখা করেন না।” উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাইদ ইবনে আমির রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এ প্রশ্নের জবাবে তোমার বক্তব্য কী?” সাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমার কোনো কাজের লোক নেই যে আমার কাপড়-চোপড়গুলো ধুয়ে দেবে এবং এই একটি জামা ছাড়া আমার আর অন্য কোনো জামাও নেই। সুতরাং এটি শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করি। তারপর এটি পরে দিন শেষে ঘর থেকে বের হই।”
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকদের জিজ্ঞাসা করলেন, “তার বিরুদ্ধে তোমাদের আর কী অভিযোগ?” তারা বলল, “কখনো কখনো তিনি অজ্ঞান হয়ে যান।” উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাইদ ইবনে আমির রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করলেন, “এ প্রশ্নের জবাবে তোমার বক্তব্য কী?” সাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, “আমি মক্কায় খুবাইব আল-আনসারিকে নির্মমভাবে হত্যার দৃশ্য স্বচক্ষে দেখেছি। কুরাইশরা তার শরীরের গোশত কেটে একটা গাছের গুঁড়ির সাথে ঝুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করছে, ‘তুমি কি তোমার জায়গায় মুহাম্মাদকে শাস্তি দিলে খুশি হবে?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি চাই না আমার পরিবার-পরিজনের সঙ্গে থাকার পরিবর্তে মুহাম্মাদের গায়ে একটা কাঁটাও বিদ্ধ হোক।’ তারপর তিনি জোরে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠেন, ‘হে মুহাম্মাদ!’ যখনই আমার ওইদিনের কথা মনে পড়ে যে, আমি কীভাবেই-না তাকে সাহায্য করতে ব্যর্থ হয়েছিলাম—আমি ওইসময় মুশরিক ছিলাম ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর ঈমান আনতে পারিনি এবং আমার মনে হয়, এ জন্য আল্লাহ আমাকে কখনোই ক্ষমা করবেন না—তখনই আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।’
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘মহান আল্লাহ তা’আলার জন্য সকল প্রশংসা। তিনি আমার ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত করেননি।’ তিনি তার জন্য এক হাজার দিনার পাঠান এবং বলেন, ‘এগুলো নিজের জন্য ব্যবহার করো।’ সাঈদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সবগুলো দিনার লোকদের মধ্যে বিলি করে দেন। ২১৬
৩.২.৫। হাসি-ঠাট্টা করায় একজন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত
কাইস ইবনে আবি হাযিম রহ. বর্ণনা করেন: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আনসারদের এক ব্যক্তিকে কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ দেন যে হিরাবাসীদের নেতা আমর ইবনে হাইয়ান ইবনে বাকিলার সঙ্গে অবস্থান করে। তিনি আনসারি কর্মকর্তার ইচ্ছানুযায়ী ভালো খাদ্য ও পানীয় পরিবেশন করেন। তারপর ওই কর্মকর্তা হাসি-ঠাট্টা শুরু করে। একপর্যায়ে সে তাকে কাছে ডেকে তার দাড়িতে হাত মোছে। তারপর আমর ইবনে হাইয়ান উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গমন করে এবং বলে, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আমি কায়সার ও কিসরার সেবা করেছি। আমি আপনার রাজ্যের মতো কখনো এমন অপমানবোধ করিনি।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘কী হয়েছে?’ সে বলল, ‘আপনার কর্মকর্তা আমার বাড়িতে অবস্থান করেছে। আমি তার পছন্দানুযায়ী খাবার পরিবেশন করেছি। তারপর তিনি হাসি-ঠাট্টা শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি আমাকে কাছে ডেকে আমার দাড়িতে তার হাত মোছেন।’
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ওই আনসারি ব্যক্তিকে ডেকে পাঠান। তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ব্যাপার কী? সে তোমাকে তোমার ইচ্ছামতো খাবার- ২১৬ হিলয়াতুল আউলিয়া, ১/২৪৫; আখবার উমর, ১৫২।
পানীয় দিয়েছে। আর তুমি তার দাড়িতে হাত মুছেছ? আল্লাহর কসম, যদি এটা রীতি হয়ে যাওয়ার ভয় না থাকত তাহলে আমি তোমার প্রতিটি দাড়ি টেনে টেনে উপড়ে ফেলতাম। যাও, ভাগো। তোমাকে আর আমার কোনো কাজ করতে হবে না। ২ ১৭
টিকাঃ
২০১ আল-ইদারাতুল ইসলামিয়া, পৃ. ২১৫।
২০২ তারিখ আত-তাবারি, ৫/১০৩।
২০৩ প্রাগুক্ত।
২০৪ তারিখ আত-তাবারি, ৫/১০৪।
২০৫ তারখিল ইসলামি, আল-হুমাইদি, ১১/২২২।
২০৬ দাওরুল হিজাজ ফিল হায়াতিস সিয়াসিয়া, পৃ. ২৫৭।
২০৭ তারিখ আত-তাবারি, ৫/২২৫।
২০৮ ফুতুহু মিসর ওয়া আখবারুহা, পৃ. ৯২।
২০৯ তারখিল মদীনা, ৩/৮৪১।
২১০ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৮১।
২১১ তারিখুল মদীনা, ৩/৮০৭; এর সনদে বিচ্ছিন্নতা রয়েছে।
২১২ মাহজুস সাওয়াব, ২/৪৬৭; এর সনদ হাসান।
২১৩ মাহজুস সাওয়াব, ২/৫৫৩।
২১৪ সহিহৃত তাওসিকি সিরাতি ওয়া হায়াতিল ফারুক, পৃ. ১৩৪; এর সনদ হাসান।
২১৫ প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৩।
২ ১৭ তারিখুল মদীনা, ৩/৮১৩; বর্ণনাটি সহীহ; আল-ফারুক আল-হাকিম আল-আদিল, পৃ. ১১।
📄 উমর রা.-এর শাসনামলে গভর্নরদের শাস্তি প্রদান
গভর্নরদের প্রতি সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখার ফলে তাদের কিছু ভুল-ভ্রান্তি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর গোচরীভূত হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিনি শরীয়ত অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাদের যথাযথ শাস্তি প্রদান করেন। পরিস্থিতি সাপেক্ষে তার শাস্তি প্রয়োগের ধরনও ছিল ভিন্ন। কারণ, এটি ছিল খলীফার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার—তিনি যা ভালো মনে করেছেন, সে পদ্ধতিই প্রয়োগ করেছেন। নিচে তার প্রয়োগকৃত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ্ধতি তুলে ধরা হলো।
৩.৩.১। শাস্তি প্রদানে ভুল হলে তার প্রতিশোধ গ্রহণ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, ‘আমি আমার গভর্নরদের এ জন্য প্রেরণ করি নাই যে, সে তোমাদের বেত্রাঘাত করবে অথবা তোমাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেবে; বরং আমি তোমাদের দ্বীন ও সুন্নাহ শেখানোর জন্যই তাদের প্রেরণ করেছি। যে কেউ এর ব্যতিক্রম আচরণ করবে, তা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে অবহিত করবে। তাঁর কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, আমি অবশ্যই এর ফায়সালা করব।' ২ ১৮ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেবল রাষ্ট্রীয়ভাবে সতর্কবার্তা প্রেরণ করেই থেমে থাকেননি যা তাদের জনগণের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণে ভীতি প্রদর্শনের জন্য যথেষ্ট ছিল; বরং তিনি তা বাস্তবে করেও দেখিয়েছেন। ওপরের উদাহরণগুলোই এর প্রমাণ; আবু মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আমর ইবনে আল-আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে খলীফার আচরণ উল্লেখ্য। ২১৯
৩.৩.২। ভুলের কারণে গভর্নরকে বরখাস্ত করা
ভুলে পতিত হওয়ার কারণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার গভর্নরদের পদচ্যুত করেছেন। তিনি তাদের এসব ভুলের অনুমোদন দেননি। একবার এক গভর্নর তার অধীন সৈনিকদের এমন ব্যাপারে নাক গলান যেখানে তার কোনো অধিকার ছিল না। এ পরিপ্রেক্ষিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ওই গভর্নরকে পদচ্যুত করেন। তাকে একটি সেনাবাহিনী পরিচালনা করার জন্য পাঠানো হয়েছিল। তিনি তাদের নিকট পৌঁছে বলেন, 'আমি তোমাদের আদেশ করছি, তোমরা যেসব গোনাহ করেছ, তা আমাকে বলো।' সুতরাং সৈনিকরা তাদের গোনাহ তার নিকট ব্যক্ত করতে থাকল। এ খবর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কানে পৌঁছলে তিনি বলেন, 'তার সমস্যাটা কী? সে বধির হয়ে যাক, আল্লাহ যা গোপন করেছেন তা সে কেন প্রকাশ করতে চাচ্ছে? আল্লাহর কসম, সে আবার কখনোই আমার প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করতে পারবে না। ১২২০
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আরেক গভর্নর নিজের কবিতায় শরাবের উল্লেখ করেছিলেন। এ খবর পেয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ওই গভর্নরের প্রতি ভীষণ রেগে যান এবং তাকে বরখাস্ত করেন। ২২১
৩.৩.৩। গভর্নরের বাড়ির কিছু অংশ ধ্বংস করা
কোথাও বাড়াবাড়ি দৃষ্টিগোচর হলে এটি করা হতো। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ ব্যাপারে খুব কঠোর ছিলেন যে, গভর্নরদের বাড়িতে কোনো গেইট থাকবে না এবং বাড়িতে কোনো প্রহরীও থাকবে না। যখনই তিনি শুনলেন যে, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বাড়িতে একটি গেইট তৈরি করেছেন, তখনই তিনি মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাকে তার নিকট প্রেরণ করেন এবং তাকে গেইটটি জ্বালিয়ে দিতে বলেন। ২২২ সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাড়ির নিকটেই বাজার ছিল। বাজারের উচ্চ আওয়াজ তাকে বিরক্ত করত। এ জন্য তিনি গেইটটি তৈরি করেছিলেন যাতে বাজারের আওয়াজ কম আসে। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাড়ি এবং তার নির্মাণকৃত গেইটের খবর খলীফার কানে আসে এবং তিনি জানতে পারেন যে, লোকজন তার বাড়িকে 'সাদ প্যালেস' নামে অভিহিত করছে। এ জন্য তিনি মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাকে কুফায় প্রেরণ করেন। তাকে বলেন, 'ওই প্যালেসে গমন করো এবং তার গেইট জ্বালিয়ে দাও। তারপর সরাসরি ফিরে আসো।' সুতরাং তিনি কুফায় গমন করেন। কিছু লাকড়ি জোগাড় করে প্যালেসে যান এবং গেইটটিতে আগুন ধরিয়ে দেন। ২২৩
ইবনে শিবহ বর্ণনা করেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুজাসা ইবনে মাসউদকে কিছু কাজের ইনচার্জ হিসাবে নিয়োগ দেন। তিনি জানতে পারেন যে, তার স্ত্রী প্রতিনিয়ত গৃহসজ্জার জন্য নতুন নতুন জিনিস (কার্পেট ও পর্দা) ক্রয় করছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে লিখে পাঠান : আল্লাহর দাস আমীরুল মুমিনীন থেকে মুজাসা ইবনে মাসউদের প্রতি; আসসালামু আলাইকুম। আমি জানতে পেরেছি, আল-খুন্দাইরা প্রতিনিয়ত গৃহসজ্জার জিনিস ক্রয় করছে। আমার এই চিঠি তোমার নিকট পৌঁছার পর তা রাখার আগেই যেন তুমি তার দেয়ালের সব পর্দা ছিঁড়ে ফেলবে।'
চিঠিটি এমন এক সময় তার নিকট পৌঁছে যখন তার সম্মুখে কিছু ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিল। তিনি চিঠির দিকে তাকালেন এবং উপস্থিত লোকজন টের পেল যে, গুরুতর কোনো সংবাদ এসেছে। তিনি চিঠিটি হাতে নিয়ে লোকজনকে বললেন, 'উঠে দাঁড়াও।' তারা উঠে দাঁড়াল। আল্লাহর কসম, তারা বুঝতে পারল না যে, কেন তাদের উঠে দাঁড়াতে বলা হলো। তিনি লোকদের বাড়ির দরজার কাছে পৌঁছে দিয়ে ভেতরে গেলেন এবং তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলেন, যে কিনা স্বামীর চেহারায় খারাপ কিছুর ইঙ্গিত পাচ্ছিলেন। স্ত্রী জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনার কী হয়েছে?' তিনি বললেন, 'সরে যাও। আমি তোমার আচরণে খুবই রাগান্বিত।' তারপর তিনি লোকদের ঘরে ডেকে আনলেন এবং তাদের বললেন, 'আপনারা প্রত্যেকে হাতের কাছে যা পাবেন, ছিঁড়ে ফেলুন।' লোকেরা সব পর্দা ছিঁড়ে ফেলল এবং সেসব ঘরের মেঝেতে ফেলে রাখল। চিঠিটি তখনো তার হাতে ধরা ছিল; তিনি সেটি তখনো হাত থেকে কোথাও রাখেননি।
সিরিয়া সফর করার সময় ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তার বাড়িতে দাওয়াত দেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার ঘরে প্রবেশ করে দেয়ালে কিছু পর্দা দেখতে পান। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সেসব ছিঁড়তে আরম্ভ করেন এবং বলেন, 'তোমার জন্য আফসোস, তুমি কি এমন কিছু দিয়ে দেয়াল সজ্জিত করেছ যা মানুষকে দিলে তারা সেগুলো পরিধান করে নিজেদের গরম-ঠান্ডা থেকে রক্ষা করতে পারত?'২২৪
৩.৩.৪। বেত্রাঘাত করে সতর্ককরণ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ পদ্ধতি বেশি প্রয়োগ করতেন। তিনি হাতে একটি লাঠি বা চাবুক নিয়ে হাঁটার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। এটি দিয়ে তিনি প্রয়োজনে লোকদের বেত্রাঘাত করতেন। কিছু ব্যতিক্রম কাজের জন্য তিনি কয়েকজন গভর্নরকে বেত্রাঘাত করেছেন। সিরিয়া সফরের সময় তিনি এক গভর্নরের বাড়িতে প্রবেশ করেন এবং তিনি সেখানে অনেক বেশি আসবাবপত্র দেখতে পান। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রেগে যান এবং তিনি তাদের বেত্রাঘাত করতে থাকেন।২২৫ ওই সফরে কয়েকজন গভর্নর তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। প্রথমে ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান ও আবু উবাইদা এবং পরে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আসেন।
খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘোড়ায় চড়ে সুন্দর চাকচিক্যময় পোশাক পড়ে আসেন, যা একজন মুজাহিদের জন্য শোভনীয় নয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বাহন থেকে নেমে কিছু পাথর কুড়িয়ে তাদের দিকে নিক্ষেপ করতে থাকেন এবং বলেন, 'কত দ্রুত তোমরা বদলে গেলে? তোমরা কি আমাকে এ অবস্থায় সম্ভাষণ জানাতে এসেছ? মাত্র দু-বছর আগ থেকে তোমরা নিজেদের উদরপূর্তি করার সুযোগ পাচ্ছ। যদি তোমরা দুশ বছর পরেও এ আচরণ করতে, তাহলে আমি তোমাদের পরিবর্তে অন্য কাউকে দায়িত্ব দিতাম।' তারা বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, এটি কেবল আমাদের বাইরের দিক, আমদের সঙ্গে এখনো অস্ত্র আগের মতোই আছে।' তিনি বললেন, 'তাহলে ঠিক আছে।১২২৬
৩.৩.৫। গভর্নর থেকে ছাগলের রাখাল—পদাবনতি
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একজন গভর্নরের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন। ইবনে শিবহ বর্ণনা করেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার গভর্নর হিসাবে আইয়ায ইবনে গানামকে নিযুক্ত করেন। তারপর তার নিকট সংবাদ এল যে, আইয়ায একটি গোসলখানা বানিয়েছেন এবং নিজের কিছু লোককে বিশেষভাবে সাক্ষাতের সুযোগ দেন। তিনি তাকে ডেকে পাঠান। পরে আইয়ায খলীফার নিকট দেখা করতে এলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তিন দিন পর্যন্ত তার সঙ্গে দেখা করা থেকে বিরত থাকলেন। তারপর তাকে অনুমতি দিলেন। তখন তিনি একটি পশমী কাপড়ের জুব্বা আনতে বললেন। এটা আনা হলে তাকে বললেন, 'এটা পরিধান করো।' তাকে একটি রাখালের ব্যাগ দিয়ে তিন শ ছাগলের রাখাল নিযুক্ত করেন। আইয়ায কিছু দূর অগ্রসর হলে তাকে বলেন, 'ফিরে আসো।' আইয়ায দৌড়ে খলীফার নিকট ফিরে আসেন। তিনি বলেন, 'এই এই কাজ করবে। যাও।' তারপর আইয়ায অনেক দূর পর্যন্ত অগ্রসর হন। খলীফা তাকে আবার ডেকে পাঠান। এভাবে তাকে যাওয়া-আসার মধ্যে রাখলেন যতক্ষণ না তার জুব্বাটি ঘামে ভিজে চপচপে হয়ে গেল। তিনি বললেন, 'ছাগলগুলো অমুক দিন আমার নিকট নিয়ে আসবে।'
সময়মতো ছাগল নিয়ে হাজির হলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এগুলোকে পানি পান করাও।' সুতরাং আইয়ায পানি সংগ্রহ করে পাত্রে ভরে ছাগলগুলোর সামনে রাখেন। তারপর বললেন, 'এগুলো নিয়ে আমার সঙ্গে অমুক অমুক দিন দেখা করবে।' এভাবে তিন মাস পর্যন্ত খলীফা এ রকম করলেন। তারপর তাকে ডেকে বললেন, 'সুতরাং তুমি একটি গোসলখানা বানিয়ে সেখানে আড্ডার আসর বসিয়েছ! আবার কি এ ধরনের কোনো কাজ করবে?' আইয়ায বললেন, 'না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যাও, কাজে ফিরে যাও।'২২৭ এ ঘটনায় তার ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ল। পরবর্তীকালে আইয়ায উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর গভর্নরদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম গভর্নরে পরিণত হন।২২৮
৩.৩.৬। গভর্নরের কিছু সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ
উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে এ পদ্ধতিটি সংশোধনের নিমিত্তে প্রয়োগ করা হতো। গভর্নরের সম্পদ বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তার মনে এই ভয় হয় যে, পদমর্যাদার কারণেই গভর্নররা এসব সম্পদ লাভ করার সুযোগ পাচ্ছে। এ ব্যাপারে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পদক্ষেপ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, 'ক্রয়, ভাড়া, বিনিয়োগ, জলসেচ, চাষাবাদ এবং এ রকম আরও অনেক কাজে গভর্নরদের ছাড় দেওয়া হলে সেটা ঘুষের পর্যায়ভুক্ত। যদিও গভর্নরদের সৎ গুণাবলি এবং ঐকান্তিক ধর্মানুরাগের কারণে তাদের মধ্যে অসদাচরণের কোনো সন্দেহ কিংবা আশঙ্কা ছিল না, তবু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এসব গভর্নর থেকে কিছু সম্পদ জব্দ করেন। মূলত এসব সম্পদ লাভের পেছনে তাদের পদমর্যাদার প্রভাব ছিল। পরিস্থিতি সাপেক্ষে খলীফা সঠিক পদক্ষেপই গ্রহণ করেছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক ছিলেন এবং সবসময়ই সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করতেন। ২২৯
যেসব গভর্নর থেকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এভাবে সম্পদ জব্দ করেছিলেন, তারা হলেন: সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু, আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু। নিয়োগের সময়ই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরদের সম্পদের হিসাব রেকর্ড করে রাখতেন। সম্পদ বৃদ্ধি হলে তিনি বর্ধিত সম্পদের অর্ধেক অথবা অনেক সময় সম্পূর্ণ অংশ জব্দ করতেন। ২৩০
ন্যায়সংগত কারণে তিনি কয়েকজন গভর্নরের আত্মীয়ের সম্পদও জব্দ করেছিলেন। তিনি একবার আবু বাকরার অর্ধেক সম্পদ জব্দ করলেন। এতে আবু বাকরা বাধা দিয়ে বললেন, 'আমি তো আপনার হয়ে কোনো কাজ করিনি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'কিন্তু তোমার ভাই বাইতুল মালের ইনচার্জ এবং তিনি তোমাকে টাকা ধার দেয়, যা তুমি তোমার ব্যবসায় বিনিয়োগ করো। ২ ৩১
৩.৩.৭। মৌখিক ও লিখিত তিরস্কার
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসা কয়েকজন গভর্নরকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মৌখিকভাবে তিরস্কার করেছেন। তিনি আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বেশ কয়েকবার তিরস্কার করেছেন। আইয়ায ইবনে গানাম, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, আবু মূসা আল-আশআরী এবং অন্যান্য গভর্নরকে তিনি তিরস্কার করেন। ২৩২
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে অনেক গভর্নরকে লিখিতভাবে তিরস্কার করতেও দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, আরব-অনারবের মধ্যে সম্পদ বণ্টনে পক্ষপাতিত্ব করায় লোকেরা অভিযোগ করলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের গভর্নরকে চিঠি লিখে সতর্ক করেন। তিনি লেখেন, 'এটা খুবই ঘৃণিত কাজ যে, কেউ তার মুসলিম ভাইদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে।' ২৩৩
ওপরের আলোচনা থেকে এটি পরিষ্কার যে, গভর্নরগণ যেকোনো মুহূর্তে তাদের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতা ও বিভিন্নভাবে আইনের মুখোমুখি হওয়া থেকে নিরাপদ ছিলেন না। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এমন সাহস ও দৃষ্টান্ত পৃথিবীবাসী কখনো দেখেনি। এ জন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে খুলফায়ে রাশেদীনের যুগ ছিল ইসলামী সভ্যতার সর্বোত্তম যুগ। ২৩৪
খলীফা ও গভর্নরের মধ্যে পারস্পরিক পরামর্শ ও আলোচনার স্বাধীনতা নতুন মাত্রা লাভ করেছিল। গভর্নরগণ খলীফার ক্ষমতাকে ভয় পেতেন না। এ ব্যাপারে কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হলো :
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ায় এলে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু অনেক লোকজন নিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দূর থেকে দেখে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘোড়া থেকে নেমে তার দিকে হেঁটে যান এবং সালাম দেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সালামের জবাব না দিয়েই সামনের দিকে যাচ্ছিলেন। মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু তার উটের পেছনে পেছনে দৌড়াতে শুরু করলেন। তার দেহ ভারী হওয়াতে অল্পতেই হাঁপাতে লাগলেন। এ দৃশ্য দেখে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি তো লোকটিকে অজ্ঞান করে ফেলবেন। আপনি তার সঙ্গে কথা বলছেন না কেন?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবার মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'এসব সভাসদ কি তোমার?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' উমর বললেন, 'তুমি লোকদের থেকে দূরে থাকো এবং লোকেরা প্রয়োজনে দেখা করতে এলে তোমার দরজায় বসিয়ে রাখো?' মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হ্যাঁ, হে আমীরুল মুমিনীন।' তিনি বললেন, 'তোমার জন্য আফসোস, কেন তুমি এমন করো?' মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বললেন, 'আমরা এমন এক ভূখণ্ডে আছি যেখানে শত্রুপক্ষের অনেক গোয়েন্দারা সক্রিয়। যদি আমরা সতর্কতা অবলম্বন না করি তাহলে শত্রুরা আমাদের ভয় করবে না এবং তারা আমাদের আক্রমণ করে বসবে। আর দ্বাররক্ষী নিয়োগের কারণ হলো, আমরা আশঙ্কা করি যে, আমাদের মান-সম্মান ক্ষুণ্ণ হবে এবং লোকজন হট্টগোল শুরু করবে। আমি এখনো আপনার অনুগত গভর্নর। আপনি যদি এ রকম করতে নিষেধ করেন, তাহলে আমি তা মেনে চলব, হে আমীরুল মুমিনীন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি তোমাকে যা-ই জিজ্ঞাসা করি, তোমার নিকট জবাব মজুদ থাকে। যদি তুমি সত্য বলে থাক, তাহলে এটি অবশ্যই ভালো যুক্তি। আর যদি তা মিথ্যা হয়ে থাকে, তাহলে এটি ভালো ট্রিকস। আমি তোমাকে তা করার জন্য হুকুম করছি না, আবার নিষেধও করছি না।' তারপর তিনি স্থান ত্যাগ করেন। ২৩৫
গভর্নরদের ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি ও সতর্ক পর্যবেক্ষণ, সন্দেহজনক কোনো কর্মকাণ্ড কিংবা অন্য কেনো অভিযোগে যখন-তখন তাদের পদচ্যুতির সম্ভাবনা সত্ত্বেও খলীফার সঙ্গে গভর্নরদের সম্পর্ক ছিল গভীর ভালোবাসার ও আনুগত্যের। খলীফার নিষ্ঠা, সদিচ্ছা, নীতি ও ন্যায়পরায়ণতার ব্যাপারে তাদের সম্পূর্ণ আস্থা ছিল। যদি কখনো রণক্ষেত্রে কোনো প্রশাসকের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতো, তাহলে কষ্ট ও অস্থিরতা তাকে মৃতবত করে ফেলত। তিনি তাদের দুর্যোগ ও ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে উঠতেন। একবার এক বড় ধরনের লড়াইয়ের সংবাদ সংগ্রহের জন্য নিজেই ছুটে যান, যাতে তার মন শান্ত হয়। অন্য সময় তিনি তাদের সঙ্গে দেখা করতেন এবং তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসার নিদর্শন ফুটে উঠত। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন জেরুযালেম বিজয় করতে যান, আল-জাবিয়া পৌঁছে তিনি সেনাপতি আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে দেখা করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বাহনে থাকা অবস্থায় তাদের সঙ্গে দেখা করেন এবং তারা তার পায়ে চুম্বন করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে কোলাকুলি করেন।২৩৬
টিকাঃ
২ ১৮ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১২৭।
২ ১৯ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১২৬-১২৭।
২২০ তারিখুল মদীনা, ৩/৮১৮।
২২১ আস-সিয়াসিয়াতুশ শারইয়া, ইবনে তাইমিয়া, পৃ. ১০৫।
২২২ ফুতুহুল বুলদান, পৃ. ৭৭; নিহায়াতুল আরিব, ১৯/৮
২২৩ আল-ইদারাতুল ইসলামিয়া, পৃ. ২১৬।
২২৪ তারিখুল মদীনা, ৩/৮৩২; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/১২৮।
২২৫ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/১২৯।
২২৬ প্রাগুক্ত।
২২৭ তারিখুল মদীনা, ৩/৮১৭; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/১৩০।
২২৮ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/১৩০।
২২৯ আল-ফাতওয়া, ২৮/১৫৭।
২৩০ ফুতুহুল বুলদান, পৃ. ২২০-২১; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/১৩১।
২৩১ শহিদুল মিহরাব, পৃ. ২৫০।
২৩২ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/১৩১।
২৩৩ ফুতুহুল বুলদান, পৃ. ৪৪৩।
২৩৪ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/১৩৩।
২৩৫ আল-ফারুক উমর ইবনুল খাত্তাব, আশ-শারকাবি, পৃ. ২৮৭।
২৩৬ আবাতিল ইয়াজিব আন তুমহা মিনাত তারিখ, ইবরাহিম শাউত, পৃ. ১২৩।
গভর্নরদের প্রতি সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখার ফলে তাদের কিছু ভুল-ভ্রান্তি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর গোচরীভূত হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিনি শরীয়ত অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাদের যথাযথ শাস্তি প্রদান করেন। পরিস্থিতি সাপেক্ষে তার শাস্তি প্রয়োগের ধরনও ছিল ভিন্ন। কারণ, এটি ছিল খলীফার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার—তিনি যা ভালো মনে করেছেন, সে পদ্ধতিই প্রয়োগ করেছেন। নিচে তার প্রয়োগকৃত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ্ধতি তুলে ধরা হলো।
৩.৩.১। শাস্তি প্রদানে ভুল হলে তার প্রতিশোধ গ্রহণ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, ‘আমি আমার গভর্নরদের এ জন্য প্রেরণ করি নাই যে, সে তোমাদের বেত্রাঘাত করবে অথবা তোমাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেবে; বরং আমি তোমাদের দ্বীন ও সুন্নাহ শেখানোর জন্যই তাদের প্রেরণ করেছি। যে কেউ এর ব্যতিক্রম আচরণ করবে, তা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে অবহিত করবে। তাঁর কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, আমি অবশ্যই এর ফায়সালা করব।' ২ ১৮ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেবল রাষ্ট্রীয়ভাবে সতর্কবার্তা প্রেরণ করেই থেমে থাকেননি যা তাদের জনগণের প্রতি আক্রমণাত্মক আচরণে ভীতি প্রদর্শনের জন্য যথেষ্ট ছিল; বরং তিনি তা বাস্তবে করেও দেখিয়েছেন। ওপরের উদাহরণগুলোই এর প্রমাণ; আবু মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আমর ইবনে আল-আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে খলীফার আচরণ উল্লেখ্য। ২১৯
৩.৩.২। ভুলের কারণে গভর্নরকে বরখাস্ত করা
ভুলে পতিত হওয়ার কারণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার গভর্নরদের পদচ্যুত করেছেন। তিনি তাদের এসব ভুলের অনুমোদন দেননি। একবার এক গভর্নর তার অধীন সৈনিকদের এমন ব্যাপারে নাক গলান যেখানে তার কোনো অধিকার ছিল না। এ পরিপ্রেক্ষিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ওই গভর্নরকে পদচ্যুত করেন। তাকে একটি সেনাবাহিনী পরিচালনা করার জন্য পাঠানো হয়েছিল। তিনি তাদের নিকট পৌঁছে বলেন, 'আমি তোমাদের আদেশ করছি, তোমরা যেসব গোনাহ করেছ, তা আমাকে বলো।' সুতরাং সৈনিকরা তাদের গোনাহ তার নিকট ব্যক্ত করতে থাকল। এ খবর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কানে পৌঁছলে তিনি বলেন, 'তার সমস্যাটা কী? সে বধির হয়ে যাক, আল্লাহ যা গোপন করেছেন তা সে কেন প্রকাশ করতে চাচ্ছে? আল্লাহর কসম, সে আবার কখনোই আমার প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করতে পারবে না। ১২২০
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আরেক গভর্নর নিজের কবিতায় শরাবের উল্লেখ করেছিলেন। এ খবর পেয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ওই গভর্নরের প্রতি ভীষণ রেগে যান এবং তাকে বরখাস্ত করেন। ২২১
৩.৩.৩। গভর্নরের বাড়ির কিছু অংশ ধ্বংস করা
কোথাও বাড়াবাড়ি দৃষ্টিগোচর হলে এটি করা হতো। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ ব্যাপারে খুব কঠোর ছিলেন যে, গভর্নরদের বাড়িতে কোনো গেইট থাকবে না এবং বাড়িতে কোনো প্রহরীও থাকবে না। যখনই তিনি শুনলেন যে, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বাড়িতে একটি গেইট তৈরি করেছেন, তখনই তিনি মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাকে তার নিকট প্রেরণ করেন এবং তাকে গেইটটি জ্বালিয়ে দিতে বলেন। ২২২ সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাড়ির নিকটেই বাজার ছিল। বাজারের উচ্চ আওয়াজ তাকে বিরক্ত করত। এ জন্য তিনি গেইটটি তৈরি করেছিলেন যাতে বাজারের আওয়াজ কম আসে। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাড়ি এবং তার নির্মাণকৃত গেইটের খবর খলীফার কানে আসে এবং তিনি জানতে পারেন যে, লোকজন তার বাড়িকে 'সাদ প্যালেস' নামে অভিহিত করছে। এ জন্য তিনি মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামাকে কুফায় প্রেরণ করেন। তাকে বলেন, 'ওই প্যালেসে গমন করো এবং তার গেইট জ্বালিয়ে দাও। তারপর সরাসরি ফিরে আসো।' সুতরাং তিনি কুফায় গমন করেন। কিছু লাকড়ি জোগাড় করে প্যালেসে যান এবং গেইটটিতে আগুন ধরিয়ে দেন। ২২৩
ইবনে শিবহ বর্ণনা করেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুজাসা ইবনে মাসউদকে কিছু কাজের ইনচার্জ হিসাবে নিয়োগ দেন। তিনি জানতে পারেন যে, তার স্ত্রী প্রতিনিয়ত গৃহসজ্জার জন্য নতুন নতুন জিনিস (কার্পেট ও পর্দা) ক্রয় করছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে লিখে পাঠান : আল্লাহর দাস আমীরুল মুমিনীন থেকে মুজাসা ইবনে মাসউদের প্রতি; আসসালামু আলাইকুম। আমি জানতে পেরেছি, আল-খুন্দাইরা প্রতিনিয়ত গৃহসজ্জার জিনিস ক্রয় করছে। আমার এই চিঠি তোমার নিকট পৌঁছার পর তা রাখার আগেই যেন তুমি তার দেয়ালের সব পর্দা ছিঁড়ে ফেলবে।'
চিঠিটি এমন এক সময় তার নিকট পৌঁছে যখন তার সম্মুখে কিছু ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিল। তিনি চিঠির দিকে তাকালেন এবং উপস্থিত লোকজন টের পেল যে, গুরুতর কোনো সংবাদ এসেছে। তিনি চিঠিটি হাতে নিয়ে লোকজনকে বললেন, 'উঠে দাঁড়াও।' তারা উঠে দাঁড়াল। আল্লাহর কসম, তারা বুঝতে পারল না যে, কেন তাদের উঠে দাঁড়াতে বলা হলো। তিনি লোকদের বাড়ির দরজার কাছে পৌঁছে দিয়ে ভেতরে গেলেন এবং তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলেন, যে কিনা স্বামীর চেহারায় খারাপ কিছুর ইঙ্গিত পাচ্ছিলেন। স্ত্রী জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনার কী হয়েছে?' তিনি বললেন, 'সরে যাও। আমি তোমার আচরণে খুবই রাগান্বিত।' তারপর তিনি লোকদের ঘরে ডেকে আনলেন এবং তাদের বললেন, 'আপনারা প্রত্যেকে হাতের কাছে যা পাবেন, ছিঁড়ে ফেলুন।' লোকেরা সব পর্দা ছিঁড়ে ফেলল এবং সেসব ঘরের মেঝেতে ফেলে রাখল। চিঠিটি তখনো তার হাতে ধরা ছিল; তিনি সেটি তখনো হাত থেকে কোথাও রাখেননি।
সিরিয়া সফর করার সময় ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তার বাড়িতে দাওয়াত দেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার ঘরে প্রবেশ করে দেয়ালে কিছু পর্দা দেখতে পান। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সেসব ছিঁড়তে আরম্ভ করেন এবং বলেন, 'তোমার জন্য আফসোস, তুমি কি এমন কিছু দিয়ে দেয়াল সজ্জিত করেছ যা মানুষকে দিলে তারা সেগুলো পরিধান করে নিজেদের গরম-ঠান্ডা থেকে রক্ষা করতে পারত?'২২৪
৩.৩.৪। বেত্রাঘাত করে সতর্ককরণ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ পদ্ধতি বেশি প্রয়োগ করতেন। তিনি হাতে একটি লাঠি বা চাবুক নিয়ে হাঁটার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। এটি দিয়ে তিনি প্রয়োজনে লোকদের বেত্রাঘাত করতেন। কিছু ব্যতিক্রম কাজের জন্য তিনি কয়েকজন গভর্নরকে বেত্রাঘাত করেছেন। সিরিয়া সফরের সময় তিনি এক গভর্নরের বাড়িতে প্রবেশ করেন এবং তিনি সেখানে অনেক বেশি আসবাবপত্র দেখতে পান। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রেগে যান এবং তিনি তাদের বেত্রাঘাত করতে থাকেন।২২৫ ওই সফরে কয়েকজন গভর্নর তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। প্রথমে ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান ও আবু উবাইদা এবং পরে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আসেন।
খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘোড়ায় চড়ে সুন্দর চাকচিক্যময় পোশাক পড়ে আসেন, যা একজন মুজাহিদের জন্য শোভনীয় নয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বাহন থেকে নেমে কিছু পাথর কুড়িয়ে তাদের দিকে নিক্ষেপ করতে থাকেন এবং বলেন, 'কত দ্রুত তোমরা বদলে গেলে? তোমরা কি আমাকে এ অবস্থায় সম্ভাষণ জানাতে এসেছ? মাত্র দু-বছর আগ থেকে তোমরা নিজেদের উদরপূর্তি করার সুযোগ পাচ্ছ। যদি তোমরা দুশ বছর পরেও এ আচরণ করতে, তাহলে আমি তোমাদের পরিবর্তে অন্য কাউকে দায়িত্ব দিতাম।' তারা বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, এটি কেবল আমাদের বাইরের দিক, আমদের সঙ্গে এখনো অস্ত্র আগের মতোই আছে।' তিনি বললেন, 'তাহলে ঠিক আছে।১২২৬
৩.৩.৫। গভর্নর থেকে ছাগলের রাখাল—পদাবনতি
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একজন গভর্নরের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন। ইবনে শিবহ বর্ণনা করেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার গভর্নর হিসাবে আইয়ায ইবনে গানামকে নিযুক্ত করেন। তারপর তার নিকট সংবাদ এল যে, আইয়ায একটি গোসলখানা বানিয়েছেন এবং নিজের কিছু লোককে বিশেষভাবে সাক্ষাতের সুযোগ দেন। তিনি তাকে ডেকে পাঠান। পরে আইয়ায খলীফার নিকট দেখা করতে এলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তিন দিন পর্যন্ত তার সঙ্গে দেখা করা থেকে বিরত থাকলেন। তারপর তাকে অনুমতি দিলেন। তখন তিনি একটি পশমী কাপড়ের জুব্বা আনতে বললেন। এটা আনা হলে তাকে বললেন, 'এটা পরিধান করো।' তাকে একটি রাখালের ব্যাগ দিয়ে তিন শ ছাগলের রাখাল নিযুক্ত করেন। আইয়ায কিছু দূর অগ্রসর হলে তাকে বলেন, 'ফিরে আসো।' আইয়ায দৌড়ে খলীফার নিকট ফিরে আসেন। তিনি বলেন, 'এই এই কাজ করবে। যাও।' তারপর আইয়ায অনেক দূর পর্যন্ত অগ্রসর হন। খলীফা তাকে আবার ডেকে পাঠান। এভাবে তাকে যাওয়া-আসার মধ্যে রাখলেন যতক্ষণ না তার জুব্বাটি ঘামে ভিজে চপচপে হয়ে গেল। তিনি বললেন, 'ছাগলগুলো অমুক দিন আমার নিকট নিয়ে আসবে।'
সময়মতো ছাগল নিয়ে হাজির হলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এগুলোকে পানি পান করাও।' সুতরাং আইয়ায পানি সংগ্রহ করে পাত্রে ভরে ছাগলগুলোর সামনে রাখেন। তারপর বললেন, 'এগুলো নিয়ে আমার সঙ্গে অমুক অমুক দিন দেখা করবে।' এভাবে তিন মাস পর্যন্ত খলীফা এ রকম করলেন। তারপর তাকে ডেকে বললেন, 'সুতরাং তুমি একটি গোসলখানা বানিয়ে সেখানে আড্ডার আসর বসিয়েছ! আবার কি এ ধরনের কোনো কাজ করবে?' আইয়ায বললেন, 'না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যাও, কাজে ফিরে যাও।'২২৭ এ ঘটনায় তার ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ল। পরবর্তীকালে আইয়ায উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর গভর্নরদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম গভর্নরে পরিণত হন।২২৮
৩.৩.৬। গভর্নরের কিছু সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ
উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে এ পদ্ধতিটি সংশোধনের নিমিত্তে প্রয়োগ করা হতো। গভর্নরের সম্পদ বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তার মনে এই ভয় হয় যে, পদমর্যাদার কারণেই গভর্নররা এসব সম্পদ লাভ করার সুযোগ পাচ্ছে। এ ব্যাপারে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পদক্ষেপ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, 'ক্রয়, ভাড়া, বিনিয়োগ, জলসেচ, চাষাবাদ এবং এ রকম আরও অনেক কাজে গভর্নরদের ছাড় দেওয়া হলে সেটা ঘুষের পর্যায়ভুক্ত। যদিও গভর্নরদের সৎ গুণাবলি এবং ঐকান্তিক ধর্মানুরাগের কারণে তাদের মধ্যে অসদাচরণের কোনো সন্দেহ কিংবা আশঙ্কা ছিল না, তবু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এসব গভর্নর থেকে কিছু সম্পদ জব্দ করেন। মূলত এসব সম্পদ লাভের পেছনে তাদের পদমর্যাদার প্রভাব ছিল। পরিস্থিতি সাপেক্ষে খলীফা সঠিক পদক্ষেপই গ্রহণ করেছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক ছিলেন এবং সবসময়ই সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করতেন। ২২৯
যেসব গভর্নর থেকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এভাবে সম্পদ জব্দ করেছিলেন, তারা হলেন: সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু, আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু। নিয়োগের সময়ই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরদের সম্পদের হিসাব রেকর্ড করে রাখতেন। সম্পদ বৃদ্ধি হলে তিনি বর্ধিত সম্পদের অর্ধেক অথবা অনেক সময় সম্পূর্ণ অংশ জব্দ করতেন। ২৩০
ন্যায়সংগত কারণে তিনি কয়েকজন গভর্নরের আত্মীয়ের সম্পদও জব্দ করেছিলেন। তিনি একবার আবু বাকরার অর্ধেক সম্পদ জব্দ করলেন। এতে আবু বাকরা বাধা দিয়ে বললেন, 'আমি তো আপনার হয়ে কোনো কাজ করিনি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'কিন্তু তোমার ভাই বাইতুল মালের ইনচার্জ এবং তিনি তোমাকে টাকা ধার দেয়, যা তুমি তোমার ব্যবসায় বিনিয়োগ করো। ২ ৩১
৩.৩.৭। মৌখিক ও লিখিত তিরস্কার
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসা কয়েকজন গভর্নরকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মৌখিকভাবে তিরস্কার করেছেন। তিনি আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বেশ কয়েকবার তিরস্কার করেছেন। আইয়ায ইবনে গানাম, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, আবু মূসা আল-আশআরী এবং অন্যান্য গভর্নরকে তিনি তিরস্কার করেন। ২৩২
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে অনেক গভর্নরকে লিখিতভাবে তিরস্কার করতেও দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, আরব-অনারবের মধ্যে সম্পদ বণ্টনে পক্ষপাতিত্ব করায় লোকেরা অভিযোগ করলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের গভর্নরকে চিঠি লিখে সতর্ক করেন। তিনি লেখেন, 'এটা খুবই ঘৃণিত কাজ যে, কেউ তার মুসলিম ভাইদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে।' ২৩৩
ওপরের আলোচনা থেকে এটি পরিষ্কার যে, গভর্নরগণ যেকোনো মুহূর্তে তাদের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতা ও বিভিন্নভাবে আইনের মুখোমুখি হওয়া থেকে নিরাপদ ছিলেন না। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এমন সাহস ও দৃষ্টান্ত পৃথিবীবাসী কখনো দেখেনি। এ জন্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে খুলফায়ে রাশেদীনের যুগ ছিল ইসলামী সভ্যতার সর্বোত্তম যুগ। ২৩৪
খলীফা ও গভর্নরের মধ্যে পারস্পরিক পরামর্শ ও আলোচনার স্বাধীনতা নতুন মাত্রা লাভ করেছিল। গভর্নরগণ খলীফার ক্ষমতাকে ভয় পেতেন না। এ ব্যাপারে কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হলো :
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ায় এলে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু অনেক লোকজন নিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দূর থেকে দেখে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘোড়া থেকে নেমে তার দিকে হেঁটে যান এবং সালাম দেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সালামের জবাব না দিয়েই সামনের দিকে যাচ্ছিলেন। মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু তার উটের পেছনে পেছনে দৌড়াতে শুরু করলেন। তার দেহ ভারী হওয়াতে অল্পতেই হাঁপাতে লাগলেন। এ দৃশ্য দেখে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি তো লোকটিকে অজ্ঞান করে ফেলবেন। আপনি তার সঙ্গে কথা বলছেন না কেন?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবার মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'এসব সভাসদ কি তোমার?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' উমর বললেন, 'তুমি লোকদের থেকে দূরে থাকো এবং লোকেরা প্রয়োজনে দেখা করতে এলে তোমার দরজায় বসিয়ে রাখো?' মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হ্যাঁ, হে আমীরুল মুমিনীন।' তিনি বললেন, 'তোমার জন্য আফসোস, কেন তুমি এমন করো?' মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বললেন, 'আমরা এমন এক ভূখণ্ডে আছি যেখানে শত্রুপক্ষের অনেক গোয়েন্দারা সক্রিয়। যদি আমরা সতর্কতা অবলম্বন না করি তাহলে শত্রুরা আমাদের ভয় করবে না এবং তারা আমাদের আক্রমণ করে বসবে। আর দ্বাররক্ষী নিয়োগের কারণ হলো, আমরা আশঙ্কা করি যে, আমাদের মান-সম্মান ক্ষুণ্ণ হবে এবং লোকজন হট্টগোল শুরু করবে। আমি এখনো আপনার অনুগত গভর্নর। আপনি যদি এ রকম করতে নিষেধ করেন, তাহলে আমি তা মেনে চলব, হে আমীরুল মুমিনীন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি তোমাকে যা-ই জিজ্ঞাসা করি, তোমার নিকট জবাব মজুদ থাকে। যদি তুমি সত্য বলে থাক, তাহলে এটি অবশ্যই ভালো যুক্তি। আর যদি তা মিথ্যা হয়ে থাকে, তাহলে এটি ভালো ট্রিকস। আমি তোমাকে তা করার জন্য হুকুম করছি না, আবার নিষেধও করছি না।' তারপর তিনি স্থান ত্যাগ করেন। ২৩৫
গভর্নরদের ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি ও সতর্ক পর্যবেক্ষণ, সন্দেহজনক কোনো কর্মকাণ্ড কিংবা অন্য কেনো অভিযোগে যখন-তখন তাদের পদচ্যুতির সম্ভাবনা সত্ত্বেও খলীফার সঙ্গে গভর্নরদের সম্পর্ক ছিল গভীর ভালোবাসার ও আনুগত্যের। খলীফার নিষ্ঠা, সদিচ্ছা, নীতি ও ন্যায়পরায়ণতার ব্যাপারে তাদের সম্পূর্ণ আস্থা ছিল। যদি কখনো রণক্ষেত্রে কোনো প্রশাসকের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতো, তাহলে কষ্ট ও অস্থিরতা তাকে মৃতবত করে ফেলত। তিনি তাদের দুর্যোগ ও ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে উঠতেন। একবার এক বড় ধরনের লড়াইয়ের সংবাদ সংগ্রহের জন্য নিজেই ছুটে যান, যাতে তার মন শান্ত হয়। অন্য সময় তিনি তাদের সঙ্গে দেখা করতেন এবং তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসার নিদর্শন ফুটে উঠত। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন জেরুযালেম বিজয় করতে যান, আল-জাবিয়া পৌঁছে তিনি সেনাপতি আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং শুরাহবিল ইবনে হাসানাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে দেখা করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বাহনে থাকা অবস্থায় তাদের সঙ্গে দেখা করেন এবং তারা তার পায়ে চুম্বন করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে কোলাকুলি করেন।২৩৬
টিকাঃ
২ ১৮ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১২৭।
২ ১৯ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১২৬-১২৭।
২২০ তারিখুল মদীনা, ৩/৮১৮।
২২১ আস-সিয়াসিয়াতুশ শারইয়া, ইবনে তাইমিয়া, পৃ. ১০৫।
২২২ ফুতুহুল বুলদান, পৃ. ৭৭; নিহায়াতুল আরিব, ১৯/৮
২২৩ আল-ইদারাতুল ইসলামিয়া, পৃ. ২১৬।
২২৪ তারিখুল মদীনা, ৩/৮৩২; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/১২৮।
২২৫ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/১২৯।
২২৬ প্রাগুক্ত।
২২৭ তারিখুল মদীনা, ৩/৮১৭; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/১৩০।
২২৮ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/১৩০।
২২৯ আল-ফাতওয়া, ২৮/১৫৭।
২৩০ ফুতুহুল বুলদান, পৃ. ২২০-২১; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/১৩১।
২৩১ শহিদুল মিহরাব, পৃ. ২৫০।
২৩২ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/১৩১।
২৩৩ ফুতুহুল বুলদান, পৃ. ৪৪৩।
২৩৪ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/১৩৩।
২৩৫ আল-ফারুক উমর ইবনুল খাত্তাব, আশ-শারকাবি, পৃ. ২৮৭।
২৩৬ আবাতিল ইয়াজিব আন তুমহা মিনাত তারিখ, ইবরাহিম শাউত, পৃ. ১২৩।
📄 খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর অপসারণ
ইসলামের শত্রুরা অবাস্তব কল্পনা ও গভীর আক্রোশের বশবর্তী হয়ে এমন- সব বর্ণনার সন্ধান লাভ করে যাতে সাহাবায়ে কেরামে চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করা সম্ভব হয়। যদি তারা তাদের পরিকল্পনা ও সন্তুষ্টি অনুযায়ী বর্ণনা খুঁজে না পেত, তাহলে বানোয়াট বর্ণনার আশ্রয় নিত। আর এতে তারা আশা করে, লোকেরা এসব গ্রহণ করবে এবং তারাই এর বর্ণনাকারী ও উৎসে পরিণত হবে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু—উভয়েই এসব বানোয়াট গল্পের শিকার হয়েছেন যেখানে ইসলামের শত্রুরা ঐতিহাসিক বর্ণনাকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পদচ্যুত করলেন এ বিষয়ে তারা সবচেয়ে বেশি নযর দিয়েছে। আর তারা এই দুই মহান ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে এবং এমন-সব বর্ণনা জুড়ে দিয়েছে যা কোনোভাবেই সত্যের ধারেকাছেও নেই।২৩৭ নিচে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর পদচ্যুতির সত্য ঘটনা তুলে ধরা হলো যা মূলত দুটি স্তরে সম্পন্ন হয়েছিল এবং এ জন্য মহান উদ্দেশ্য লুক্কায়িত ছিল।
৩.৪.১। প্রথম অপসারণ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে প্রথমে সিরিয়ার গভর্নর ও সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করেন। এটি সংঘটিত হয় ১৩ হিজরীতে যখন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এই অপসারণের মূলে ছিল গভর্নরদের নিয়ন্ত্রণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, যা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু মতো ছিল না। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরদের ইসলামী রাষ্ট্রের সাধারণ নীতির মধ্যে পুরোপুরি স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। এতে শর্ত ছিল, ব্যক্তি এবং দলের সঙ্গে তাদের সম্পূর্ণ ন্যায়সংগত ও নিরপেক্ষ আচরণ করতে হবে। তিনি নিজেই রাষ্ট্রে সুবিচার নিশ্চিত করতেন। তবে তার গভর্নরগণ ন্যায়সংগতভাবে বিচারকার্য করলেও তিনি কিছু মনে করতেন না। খলীফার অনুমতিক্রমে গভর্নরগণ তাদের নিজ নিজ প্রদেশের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন। ছোট ছোট বিষয়ে খলীফার দ্বারস্থ হতে হতো না। প্রদেশে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হলে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পদ কিংবা অন্য কোনো কারণে গভর্নরদের ক্ষমতাকে খর্ব করার প্রয়োজন মনে করতেন না।২৩৮ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পরামর্শ দেন, তিনি যেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তার অনুমতি ব্যতীত কাউকে ছাগল কিংবা উট প্রদান না করে। এই পরামর্শ অনুযায়ী আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠি প্রেরণ করেন এবং এর উত্তরে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ লিখে পাঠান: আমাকে আমার মতো কাজ করার সুযোগ দিন, নতুবা আপনাকেই তা করতে হবে।' তখন খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পদচ্যুত করার জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পরামর্শ দেন।২০৯ তবে খলীফাতুর রাসূল আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে স্বপদে বহাল রাখেন। ২৪০
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন খলীফা হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি মনে করেন, গভর্নর ও প্রশাসকদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যা প্রদেশের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে অনুসরণ করা হবে। তিনি প্রদেশে সংঘটিত ছোট-বড় সবকিছুই খলীফাকে জানানো বাধ্যতামূলক করে দেন যাতে তিনি বিষয়গুলো তদন্ত করতে পারেন এবং সে অনুযায়ী নির্দেশ জারি করতে সক্ষম হন। আর গভর্নরগণ তার নির্দেশ পালনে বাধ্য থাকবে। কারণ, তিনি মনে করতেন, ইসলামী রাষ্ট্রের খলীফা স্বয়ং যা করেন, এ জন্য তিনি যেমনভাবে দায়ী, তেমনি তার গভর্নরগণ যা কিছু করবে, তার জন্যও খলীফা দায়ী হবেন। আর এ দায়-দায়িত্ব থেকে সবচেয়ে উত্তম গভর্নর নির্বাচন করেও ছাড় পাওয়া যাবে না। তিনি খলীফা নির্বাচিত হয়ে জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি বলেন : 'আমার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের পরীক্ষা করছেন এবং তোমাদের মাধ্যমে আমাকে পরীক্ষা করছেন। আর আমার দুজন সাথি আল্লাহ তা'আলার কাছে চলে গেছেন এবং আল্লাহ আমাকে এখনো জীবিত রেখেছেন। আল্লাহর কসম, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি নিজে তোমাদের দায়িত্ব সরাসরি পালন করতে পারব ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য কারও হাতে তোমাদের ছেড়ে দেব না। আর যেসব কাজ সরাসরি করতে পারব না সেসবের দায়িত্ব আমি যোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য লোকের হাতে দেব। আল্লাহর কসম, তারা (গভর্নররা) যদি ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করে, তবে আমি তাদের পুরস্কৃত করব, আর অন্যায় করলে কঠিন শাস্তি দেব।'২৪১
তিনি আরও বলতেন, 'যদি আমি সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে তোমাদের শাসক হিসাবে নিয়োগ দিই এবং তাকে ন্যায়-পরায়ণতার সঙ্গে শাসন করতে বলি, তাহলে তোমরা কি মনে করো যে, আমি আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছি?' তারা বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'না। যতক্ষণ না আমি তার আচরণ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি এবং তাকে যা করার নির্দেশ দিয়েছি, তা সে যথাযথভাবে পালন করেছে, ততক্ষণ আমার দায়িত্ব পরিপূর্ণ হবে না।' ২৪২
খলীফা হওয়ার পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই প্রত্যাশা করলেন যে, প্রাদেশিক গভর্নরগণ তার পদ্ধতিকে অনুসরণ করবে। তাদের কেউ কেউ সেটি মেনে নিল এবং অন্যরা দ্বিমত পোষণ করল। যারা তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন, তাদের একজন ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু। ২৪৩ মালিক ইবনে আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, খলীফা হওয়ার পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লিখে পাঠান : 'আমার অনুমতি ছাড়া কাউকে একটি ছাগল কিংবা উটও দেবে না।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এই চিঠির জবাবে লেখেন : হয় আপনি আমাকে আমার মতো কাজ করার সুযোগ দেবেন, নতুবা আপনাকেই এর দায়িত্ব নিতে হবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর প্রতি আমার অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ পাবে যদি আমি যা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলাম, আমি নিজেই (সেই সুযোগ পেয়ে) তা না করি।' সুতরাং তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করলেন। ২৪৪ অধিকন্তু তিনি তাকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দায়িত্ব দিতে চেয়েছেন, কিন্তু তিনি স্বাধীনভাবে ওই দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছেন, যার অনুমতি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দেননি। ২৪৫
অতএব, রাষ্ট্র পরিচালনায় গৃহীত নীতির ওপর ভিত্তি করেই তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করেছিলেন। আর শাসকগণ রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন দিকনির্দেশনা দিতেই পারেন (শরীয়তের সীমার মধ্যে)। এ রকম ঘটনা আমাদের জীবন অহরহ ঘটছে। বিভিন্ন বর্ণনা, মতামত, নিজস্ব বিজ্ঞোচিত দর্শন ও প্রভাব বিবেচনা করে এর পেছনে জটিল কোনো কারণ খুঁজে বের করার প্রয়োজন নেই। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন এক সময় ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন যখন লোকেরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগের খুব নিকটবর্তী ছিল। মৌলিকভাবেই রাষ্ট্রের প্রাদেশিক গভর্নর ও সেনাপতি নির্বাচন খলীফার অন্যতম দায়িত্ব। স্বভাবতই তারা এমন ব্যক্তি হবেন যারা খলীফার চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করবে এবং তার অনুসৃত নীতি ও পথকে মেনে চলবে। উল্লেখ্য, তখন উম্মতের মধ্যে যোগ্য ও বিশ্বস্ত লোকের কোনো কমতি ছিল না। গভর্নর ও সেনাপতিরা চিরকাল তাদের পদে অধিষ্ঠিত থাকার অধিকার রাখেন না। আর যখন রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে গভর্নরের মতের অমিল হয়, তখন গভর্নরদের আর দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকে না যেখানে আরও অনেকেই রাষ্ট্রনায়কের মতকে অনুসরণ করে দায়িত্ব পালনে আগ্রহী ব্যক্তি-বর্গ রয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ ব্যাপারে খুবই সফল ছিলেন এবং তার গৃহীত নীতিসমূহ অকল্পনীয় সফলতা অর্জন করে। তিনি কয়েকজনকে বরখাস্ত করেন এবং তাদের পরিবর্তে অন্যদের নিয়োগ দেন। নতুন যাদের নিয়োগ দেন, তারা কোনো অংশেই পূর্ববর্তী গভর্নরদের চেয়ে যোগ্যতায় কম ছিলেন না। কারণ, তখন এ রকম দায়িত্ব পালন করার জন্য যোগ্য ও সাহসী লোকের সংখ্যা ছিল অনেক। ২৪৬
কোনো রকমের প্রতিবাদ ছাড়াই খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পদচ্যুতিকে গ্রহণ করেন এবং তিনি আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্ব মেনে চলেন। পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তা'আলা তাকে কিন্নিসিরিন বিজয়ের সুযোগ দিলে আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি খলীফাকে এই বিজয় সম্পর্কে অবহিত করেন এবং সেখানে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবদান তুলে ধরেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন তার বিখ্যাত উক্তিটি করেন : খালিদ নিজেই নিজেকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করেছে। আল্লাহ আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওপর রহম করুন, মানুষ সম্পর্কে আমার চেয়ে তার বেশি জ্ঞান ছিল।'২৪৭ এ কথা বলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সাহসী ও বীরোচিত কাজের জন্য নিজেকে এমন এক উচ্চতায় আসীন করেছিলেন, যা করতেই তিনি অভ্যস্ত—বিপজ্জনক, সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পারদর্শী। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যেন বোঝাতে চেয়েছেন, তার পরামর্শ সত্ত্বেও আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু যোগ্যতা ও সামরিক দক্ষতার কথা বিবেচনা করে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করেননি। এর মানে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ কয়েকজন বীর ছাড়া অন্য কারও পক্ষে তার স্থান পূরণ করার মতো লোক ছিল না। ২৪৮
এ-সময় খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রায় চার বছর আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে কাজ করেন এবং তিনি মুহূর্তের জন্যও তার অবাধ্য হননি। আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর মহান গুণাবলিকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবস্থাকে সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং সেভাবেই তিনি তার সঙ্গে সম্মান ও দয়ার আচরণ করেছেন। তিনি তাকে নিজের কাছাকাছি রাখতেন, যখন-তখন তার সঙ্গে পরামর্শ করতেন, তার মতামতকে গুরুত্ব দিতেন এবং কখনো কখনো তাকে নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে দিতেন। এসব কারণেই খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মনে কোনো ধরনের আক্রোশ বাসা বাঁধতে পারেনি এবং ফলে তার পক্ষে সামরিক ক্ষেত্রেও এত বীরোচিত ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়েছে। দামেস্ক, কিন্নিসিরিন এবং অহল বিজয় তার ঐশী মনোবলের সাক্ষী যা পদচ্যুতির ঘোষণা শোনার পর তার আচরণে ফুটে উঠেছিল। উভয় ক্ষেত্রেই (বরখাস্ত হওয়ার আগে এবং পরে) তিনি ছিলেন আল্লাহর তরবারি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু। ২৪৯
ইতিহাস বিস্মৃত হয়নি সেই কথা, যা খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বরখাস্তের সময় আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন: 'এটি দুনিয়ার কোনো ক্ষমতা নয় যা আমি চাই এবং আমি যা কিছু করি তা এই দুনিয়ার জন্য নয়। তুমি যা কিছু দেখছ, তা শীঘ্রই নিঃশেষ হয়ে যাবে। অথচ আমরা পরস্পর ভাই, যারা আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি এবং এটি কোনো ব্যাপার নয় যে, ভাইদের একজন অপরজনের ধর্মীয় ও দুনিয়ার বিষয়াদিতে নেতৃত্ব দেবে; বরং যার ওপর নেতৃত্বের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হলো সে-ই বেশি অস্থিরতা ও গোনাহের ঝুঁকিতে রয়েছে—তারা ব্যতীত যাদের আল্লাহ হেফাজত করেন এবং তাদের সংখ্যা খুবই কম। ২৫০
যখন আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সামরিক অভিযান পরচালনা করার নির্দেশ দিতেন, তিনি তা সানন্দেই গ্রহণ করেন এবং বলেন, 'ইনশাআল্লাহ আমি তা করব। আমি কেবল আপনার নির্দেশের অপেক্ষায়ই ছিলাম।' আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তোমাকে কিছু বলতে আমার খুব লজ্জা লাগে, হে আবু সুলাইমান।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'যদি কোনো ছোট শিশুকেও আমার ওপর নিয়োগ করা হয়, আমি তাকে মেনে চলব। আমি কেমন করে আপনার বিরুদ্ধে যাব যেখানে আপনি আমার আগে ইসলামে দাখিল হয়েছেন এবং আপনি তাদের সাথেই ঈমান এনেছেন যারা দ্রুত ইসলামে দাখিল হওয়ার জন্য উদ্গ্রীব ছিলেন। আর স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে 'আল-আমীন' বলে সম্বোধন করেছেন। আমি কেমন করে আপনার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হব? এখন আপনাকে আমি সাক্ষী বানাচ্ছি যে, আমি পুরোপুরিভাবে নিজেকে আল্লাহর জন্য সোপর্দ করলাম এবং আমি কখনোই আপনার অবাধ্য হব না এবং এরপরে আর কখনো গভর্নরের পদ গ্রহণ করব না।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এখানেই থেমে যাননি; বরং তিনি তা বাস্তবে করে দেখিয়েছেন এবং তাকে যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তিনি তা দ্রুত বাস্তবায়নে বেরিয়ে পড়েন। ২৫১
খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা ও কাজ থেকে এটি পরিষ্কার যে, ধর্মীয় ও মানবিক অনুভূতিই তাদের মধ্যে পারস্পরিক সদাচরণে মূল ভূমিকা রাখে। খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা ও গভর্নরের প্রতি আনুগত্যের নীতি বজায় রেখেছেন যদিও পদচ্যুতির কারণে তার ব্যক্তিগত অবস্থান ও মর্যাদা পরিবর্তিত হয়েছে-সেনাপতি থেকে সাধারণ সৈনিকে পরিণত হয়েছেন। ২৫২ গভর্নরের পদ থেকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অপসারণের মূলে তার বিরুদ্ধে কোনো বিদ্বেষ, সন্দেহ কিংবা শরীয়তের সীমালঙ্ঘন বা তার ইসলামী মূল্যবোধ ও ন্যায়পরায়ণতায় কোনো কলঙ্ক দায়ী ছিল না; বরং এখানে ইসলামের দুই মহান ব্যক্তির দুটি ভিন্ন পদ্ধতির বাস্তবায়ন প্রতিফলিত হয়েছে যেখানে উভয়ে মনে করেছেন, তাদের নিজস্ব পদ্ধতিই প্রয়োগ করা উচিত। যদি তাদের একজনকে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তাহলে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি খলীফার জন্যই এই ত্যাগ স্বীকার করবেন-কোনো হীনম্মন্যতা কিংবা কোনো ক্রোধ বা আক্রোশ ছাড়াই। ২৫৩
আল্লাহর অনুগ্রহে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ায় মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ দেন। ইয়ারমুকের যুদ্ধের পর ওই এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন ছিল যাতে মানুষের মধ্যে শত্রুতা চিরতরে শেষ হয়ে যায়, আহতরা সুস্থ হয়ে ওঠে এবং তাদের অন্তরগুলো বিবাদ-বিসংবাদ ভুলে আবার এক হয়ে ওঠে। সুযোগ পাওয়ামাত্রই আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যান, কিন্তু প্রয়োজনে লড়তে তিনি পিছপা হননি। সিরিয়ার বিভিন্ন শহরের লোকেরা আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর সহনশীলতার পরিচয় পেয়ে দলে দলে এসে তার নিকট শান্তিচুক্তি করে; তারা অন্য কারও থেকে তার সঙ্গেই চুক্তি করতে পছন্দ করে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশেই আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং প্রদেশের সর্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষায় সিরিয়ার গভর্নর হিসাবে তার এই নিয়োগ ছিল যথোপযুক্ত। ২৫৪
৩.৪.২। দ্বিতীয় অপসারণ
কিন্নিসিরিনের গভর্নর পদ থেকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আবার (দ্বিতীয়বার) পদচ্যুত করা হয়। আর এটি সংঘটিত হয় ১৭ হিজরীতে। ২৫৫ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট খবর পৌঁছে যে, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আইয়ায ইবনে গানাম রাযিয়াল্লাহু আনহু বাইজেন্টাইন বর্ডার ভেদ করে অভিযান পরিচালন করেন এবং বিপুল-পরিমাণ গনীমতের মাল নিয়ে আসেন। অনেক দূর থেকে তার নিকট একজন লোক সাহায্যের আশায় আসে। তার সঙ্গে আল-আশাস ইবনে কাইসও ছিলেন, যাকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দশ হাজার দিরহাম প্রদান করেন। তিনি যা কিছু করেছেন, তার সব খবরই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কানে আসে। ২৫৬
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সেনাপতি আবু উবাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর চিঠি প্রেরণ করেন যাতে তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই বিপুল- পরিমাণ অর্থের উৎস সন্ধান করতে বলেন এবং তাকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যেকোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতে বলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মদীনায় ডেকে আনেন এবং আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর সম্মুখে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরিশেষে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গনীমতের মাল থেকে দশ হাজার দিরহাম নেওয়ার অভিযোগের ব্যাপারে পুরোপুরি নির্দোষ সাব্যস্ত হন। ২৫৭
খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পদচ্যুতির ব্যাপারে জানানো হলে তিনি সিরিয়াবাসীদের বিদায় সম্ভাষণ জানান। তার কথায় সেনাপতি ও সৈন্যদের মধ্যে চিরায়ত বিচ্ছেদের কষ্ট ফুটে ওঠে : আমীরুল মুমিনীন আমাকে সিরিয়ার গভর্নর হিসাবে নিযুক্ত করেন। যখন সব গোলযোগ শেষ হয়ে পরিস্থিতি শান্ত এবং স্থির হতে থাকে, তখন তিনি আমাকে অপসারণ করেন।' এক লোক দাঁড়িয়ে বলে ওঠে, 'হে মহান সেনাপতি, ধৈর্যধারণ করুন। এখন ফিতনার সময় ধেয়ে আসছে।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'যতদিন উমর ইবনুল খাত্তাব জীবিত থাকবেন, ততদিন কোনো ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।'২৫৮ এটি খুবই শক্তিশালী এবং একনিষ্ঠ ঈমানের প্রকাশ, যা আল্লাহর রাসূলের ঘনিষ্ঠ সাহাবীদের মধ্যে নির্বাচিত বান্দাদের ছাড়া অন্য কাউকে দেওয়া হয়নি। এক চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কি এক পরম ঐশ্বরিক শক্তি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল, যা তাকে এ রকম উত্তর দিতে সমর্থ করেছিল?২৫৯ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের সমর্থনে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ভাষ্য শুনে লোকজন শান্ত হয়ে যায়। তারা অনুধাবন করে, তাদের বহিষ্কৃত সেনাপতি এমন কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন, যে কিনা বিদ্রোহ ও ফিতনা ছড়িয়ে খলীফার বিরুদ্ধাচরণ করে নিজের গৌরব প্রকাশ করবেন; বরং তিনি ছিলেন এমন ব্যক্তিত্ব যাদের গঠনমূলক কাজ করার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং পরিস্থিতি যদি তাদের কীর্তিকে ম্লান করে দিতে চায়, তাহলে তারা আরও উঁচুতে উন্নীত হন। ২৬০
খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনায় ফিরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে দেখা করেন। তিনি খলীফাকে বলেন, 'আমি আপনার ব্যাপারে মুসলিমদের নিকট অভিযোগ করেছি যে, আপনি আমার সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করেননি, হে উমর।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, 'কোথা থেকে এ সম্পদ লাভ করেছ?' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বললেন, 'আমার গনীমতের অংশ থেকে। আর সেখানে ষাট হাজারের অধিক আপনার অংশ।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গনীমতের সম্পদ হিসাব করে দেখলেন যে, তা বিশ হাজার, যা তিনি বাইতুল মালে জমা করেন। তারপর বলেন, 'হে খালিদ, আল্লাহর কসম, তুমি আমার নিকট অনেক প্রিয় এবং আজকের পরে তুমি আমার প্রতি আর অসন্তুষ্ট থাকবে না।'২৬১
তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়াবাসীদের প্রতি এক চিঠিতে লেখেন, 'আমি খালিদকে এ জন্য অপসারণ করিনি যে, আমি তার প্রতি অসন্তুষ্ট কিংবা সে কোনো মন্দ আচরণ করেছে; বরং মানুষজন তার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আমার আশঙ্কা হয়েছে, আল্লাহ হয়তো লোকজনকে তার দিকে ধাবিত করবেন এবং তার মাধ্যমে তারা পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। আমি এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছি, আল্লাহই একমাত্র সত্তা যিনি বিজয় দান করেন এবং এ ব্যাপারে যাতে লোকজনের মনে কোনো সন্দেহ সৃষ্টি না হয়।'
৩.৪.৩। অপসারণের কারণসমূহের সারসংক্ষেপ এবং এর সুফল
রাষ্ট্র পরিচালনায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যে আদর্শ বা নীতি অনুসরণ করতেন, এর ভিত্তিতে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অপসারণের কারণসমূহ নিচে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো :
তাওহীদের সুরক্ষা : উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা-'বরং মানুষজন তার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আমার আশঙ্কা হয়েছে, আল্লাহ হয়তো লোকজনকে তার দিকে ধাবিত করবেন এবং তার মাধ্যমে তারা পরীক্ষার সম্মুখীন হবে'- থেকে এটি পরিষ্কার যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আশঙ্কা করেছেন, লোকজন খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য সন্দেহে পতিত হবে এবং তারা ধারণা করবে, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যেখানেই যাবেন সেখানেই বিজয় অর্জিত হবে, যা তাদের মূল বিশ্বাসকে দুর্বল করে তুলবে। কারণ, বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে—যুদ্ধে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অংশগ্রহণ করুন বা না করুন। কোনো একজন সেনাপতি—খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু—এর প্রতি লোকজনের অতিভক্তি থেকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেও তার ভক্তদের অনুরক্ত হয়ে যেতে পারেন; তিনি নিজেকে এমন ক্ষমতাবান মনে করতে পারেন, যা অপ্রতিরোধ্য। কারণ, তিনি ছিলেন রণকৌশলে অসম্ভব পারদর্শী এবং দান- সদকায় উদার। এটি রাষ্ট্র এবং তার নিজের জন্যও খারাপ পরিণতি ডেকে আনত। যদিও এ রকম হওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই ক্ষীণ। বস্তুত লোকজন তাদের খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি নিবদ্ধ ছিল এবং তাকে তারা খুব শ্রদ্ধা করত। আর অন্যদিকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন মহান সামরিক ব্যক্তিত্ব এবং ধর্মভীরু মানুষ। তারপরেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যুর পরে হয়তো খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো নেতার সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটতে পারত। এ জন্য ওই সময় এসব মহান ব্যক্তিদের জন্য একটি দিকনির্দেশনা প্রয়োজন ছিল। ২৬২ এ রকম পরিস্থিতিতে কম যোগ্যতাসম্পন্ন সেনাপতি—যার পরিচিতিও তেমন ব্যাপক নয়—থেকে সুদক্ষ সেনাপতিকে নিয়ে ফেতনার আশঙ্কা ছিল বেশি। ২৬৩
অর্থ ব্যয়ে পদ্ধতিগত মতপার্থক্য: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, অর্থ ও উপহারসামগ্রী দিয়ে ইসলামের দিকে মানুষের মনকে আকৃষ্ট করার সময় শেষ হয়ে গিয়েছে; ইসলামে এমন লোকজনের আর প্রয়োজন নেই এবং লোকজনকে তাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও আদর্শের ওপর ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, তার সঙ্গে এমন কিছু সাহসী মানুষ ও মুজাহিদ লড়াই করছে যারা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর পুরস্কারের আশায় লড়াই করছে না। তাদের ঈমান বৃদ্ধি ও ইসলামের দিকে আরও নিবেদিত করে তোলার জন্য তাদের পেছনে কিছু ব্যয় করার সুযোগ রয়েছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, অন্যদের চেয়ে দরিদ্র মুজাহিদরা এ সম্পদ লাভের বেশি যোগ্য। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন জাবিয়ার লোকজনকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অপসারণের কারণ ব্যক্ত করছিলেন, তখন বলেন, ‘আমি তাকে এসব অর্থ মুজাহিদদের মধ্যে দুর্বলদের জন্য খরচ করতে বলেছিলাম, কিন্তু তিনি তা শক্তিশালী ও সামর্থ্যবানদের পেছনে খরচ করেছে।’ ২৬৪ অবশ্যই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু—প্রত্যেকের মতের পক্ষে অনেক যুক্তি রয়েছে, কিন্তু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন কিছুর আঁচ করতে পেরেছিলেন যা খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বুঝতে পারেননি। ২৬৫
প্রশাসনিক কাজে উমর রা. এবং খালিদ রা.-এর মতপার্থক্য : উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরদের এই মর্মে চাপ প্রয়োগ করেন যে, তারা তাকে প্রত্যেক বিষয়েই অবহিত করবে—সেটা বড় কিংবা ছোট হোক। কিন্তু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ ক্ষেত্রে তার জন্য কারও নিকট জবাবদিহিতার প্রয়োজন নেই; তিনি মনে করতেন, যখন যা কিছু করা প্রয়োজন, এ ব্যাপারে তার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা উচিত, কারণ, বাস্তব প্রেক্ষাপটে যে উপস্থিত, সে অনুপস্থিত ব্যক্তি অপেক্ষা পরিস্থিতি বেশি পর্যবেক্ষণ ও বিবেচনা করার সুযোগ লাভ করেন। ২৬৬
সম্ভবত আরেকটি কারণ এই ছিল, নতুন নেতাদের নেতৃত্ব লাভের সুযোগ করে দেওয়া যাতে মুসলিম উম্মাহ খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু, আল-মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো আরও বীর তৈরি করতে সক্ষম হয়। আরেকটি কারণ, লোকজনের বোঝা উচিত, বিজয় কোনো একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিষয় নয়; ২৬৭ বরং ব্যক্তি এখানে কোনো ব্যাপারই নয়।
খালিদ রা.-এর অপসারণে মুসলিম সমাজের প্রতিক্রিয়া : মুসলিম সমাজ খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই অপসারণকে মেনে নেয়। কারণ, তারা মনে করে, যে কাউকে গভর্নর নিয়োগ ও বহিষ্কারে খলীফার অধিকার রয়েছে। কারও পক্ষেই ইসলামী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অথবা গভর্নর নিয়োগ ও বহিষ্কারে খলীফার অধিকারে হস্তক্ষেপ করার অধিকার ছিল না।
বর্ণিত আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একদিন মধ্যরাত্রিতে আলকামা ইবনে উলাসা আল-কিলাবির সঙ্গে দেখা করলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখতে অনেকটাই খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো মনে হতো এবং আলকামা ভাবলেন, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-ই এসেছেন। তিনি বলে উঠলেন, 'হে খালিদ, খলীফা তোমাকে পদচ্যুত করেছেন এবং এখন এর স্বপক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছেন। আমি আমার এক চাচাত ভাইকে নিয়ে তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে চাই। কিন্তু তিনি যা করার করেছেন। আমি তাকে কখনো কিছু জিজ্ঞাসা করব না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু— আরও বিস্তারিত জানার আগ্রহে যা তিনি লুকাচ্ছিলেন—বললেন, 'ঠিক আছে, এ ব্যাপারে আরও কিছু বলো।' তখন আলকামা বললেন, 'আমাদের ওপর এসব মানুষের অধিকার রয়েছে এবং আমাদের উচিত তাদের অধিকারে হস্তক্ষেপ না করা। নিশ্চয়ই আল্লাহ এতে আমাদের পুরস্কৃত করবেন।' পরের দিন সকালে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে—যখন আলকামা তাদের দুজনের দিকে তাকালেন—জিজ্ঞাসা করলেন, 'গতরাতে আলকামা তোমাকে কী বলেছে?' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, তিনি আমাকে কিছুই বলেননি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি এ জন্য কসম করছ?'
ঘটনার আকস্মিকতায় আলকামা খুব মর্মাহত হন এবং মনে মনে বলতে থাকেন, গতরাতে তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে কথা বলেননি। তারপর তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, 'হে খালিদ, তোমার কী হলো?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আলকামার প্রতি খুব দরদি ছিলেন এবং তিনি তার প্রয়োজনে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। তিনি বললেন, 'এখানে যদি এমন আরও লোকেরা থাকত যারা তোমার মতো চিন্তা করে—(মতের অমিল সত্ত্বেও যারা শাসকের প্রতি তাদের আনুগত্য বজায় রাখে)—তাহলে তারা অমুক অমুক থেকে আমার নিকট বেশি পছন্দনীয় হতো। ২৬৮
যাই হোক, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর চাচাত ভাই আবু আমর ইবনে হাফস ইবনে আল-মুগিরা এ ব্যাপারে জাবিয়ায় প্রতিবাদ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন লোকদের বললেন, 'আমি তাকে এসব অর্থ মুজাহিদদের মধ্যে দুর্বলদের জন্য খরচ করতে বলেছিলাম, কিন্তু তিনি তা শক্তিশালী ও সামর্থ্যবানদের পেছনে খরচ করেছে। এ জন্য আমি তাকে অপসারণ করেছি এবং তার পরিবর্তে আবু উবাইদা ইবনে জাররা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে গভর্নর নিয়োগ করেছি।' তখন আবু আমর ইবনে হাফস ইবনে আল-মুগিরা বলে ওঠেন, 'আল্লাহর কসম, আপনি তার ব্যাপারে ন্যায়বিচার করেননি। হে উমর ইবনুল খাত্তাব, আপনি এমন একজন সেনাপতিকে পদচ্যুত করেছেন, যাকে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেনাপতি নিয়োগ করেছিলেন; আপনি এমন এক তরবারিকে কোষবদ্ধ করেছেন, যা স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উন্মুক্ত করেছিলেন; আপনি এমন এক পতাকাকে অবনমিত করেছেন, যা স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তোলন করেছিলেন। আপনি আত্মীয়ের প্রতি দয়া করেছেন এবং আপনার চাচাত ভাইয়ের প্রতি হিংসা পোষণ করেছেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বললেন, 'তুমি তার খুবই নিকটাত্মীয়। তুমি বয়সে ছোট এবং চাচাত ভাইয়ের অপসারণে রেগেও আছ।'২৬৯
এভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর চাচাত ভাইয়ের কথায় ধৈর্যধারণ করেন, যে কিনা খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে এত বেশি বাড়াবাড়ি করছিল যে, তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে হিংসুক বলে দাবি করেছে। এতৎসত্ত্বেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সবর করেন। ২৭০
খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর মৃত্যু এবং মৃত্যুসজ্জায় উমর রা. সম্পর্কে তার মন্তব্য : আবু আদ-দরদা রাযিয়াল্লাহু আনহু অসুস্থ খলিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখতে গেলেন। খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'হে আবু দরদা, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে তুমি যা অপছন্দ করো তা-ই দেখতে পাবে।' আবু দরদা রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি তোমার সঙ্গে একমত।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি তার সঙ্গে একটি ব্যাপারে শুধু দ্বিমত পোষণ করেছিলাম। আমি যখন অসুস্থ হলাম, তখন এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছি। আমি এখন মৃত্যুসজ্জায়। আমি বিশ্বাস করি, উমর যা কিছু করে, তাতে তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টিই তালাশ করেন। আমি মর্মাহত হই যখন তিনি আমার অর্ধেক সম্পদ জব্দ করার জন্য লোক পাঠালেন। এমনকি লোকটি আমার জুতা জোড়ার একটি নিয়ে নেয় এবং অন্যটি আমার কাছে রেখে যায়। কিন্তু তিনি এটি অন্যদের সঙ্গেও করেছেন, যারা আমার আগে ইসলামে দাখিল হয়েছিলেন এবং যারা বদর যুদ্ধে শরীক ছিলেন। তিনি আমার প্রতি রূঢ় আচরণ করেছেন, কিন্তু তিনি একই রকম রূঢ় আচরণ অন্যদের সঙ্গেও করেছেন। আমি আশা করেছিলাম, তিনি আমার সঙ্গে ভালো আচরণ করবেন। কারণ, আমরা গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিলাম। আমি দেখলাম, তিনি সেসব আমলে নেননি এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় তিনি কারও পক্ষ থেকে বদনামের পরোয়া করেননি। এই একটি কারণে আমার অন্তর থেকে তার ব্যাপারে সব গ্লানি দূর হয়ে গিয়েছে। তিনিও আমার ব্যাপারে হতাশ হয়েছেন, কারণ, আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। আমি ছিলাম রণক্ষেত্রে, প্রচণ্ড শক্তিতে যুদ্ধে নিমগ্ন। আমিই সেখানে ছিলাম এবং তিনি ছিলেন না। আমি পরিস্থিতি সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতাম এবং তিনি তা পছন্দ করেননি। ২৭১ যখন মৃত্যু আসন্ন এবং তিনি তা বুঝতে পারলেন, তখন বললেন,
আমার এমন কোনো কাজ নেই যা আমাকে ওই কাজ অপেক্ষা বেশি আশান্বিত করতে পারে—কলেমা পড়ার পর–তা হলো, প্রচণ্ড শীতের রাতে বৃষ্টিতে ভিজে একটি মুজাহিদ দলের সঙ্গে প্রত্যুষে মুশরিকদের ওপর আক্রমণ চালানো। আপনাকে অবশ্যই জিহাদে অংশগ্রহণ করতে হবে। আমি অমুক অমুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি এবং আমার দেহের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে তরবারি, তির বা বর্শার দু-একটি আঘাত নেই। আর আমি এখন জরাগ্রস্ত উটের মতো বিছানায় মৃত্যুবরণ করছি। কাপুরুষ কখনো বিজয়ী হতে পারে না। আমি জিহাদের ময়দানেই মৃত্যু কামনা করেছিলাম। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন যে, আমি আমার বিছানাতেই মৃত্যুবরণ করব। ২৭২
মৃত্যুর পূর্বে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বরাবর অসীয়ত করে যান, যেখানে তিনি বলেন, 'আমি আমার যাবতীয় কিছু, সকল সম্পদ এবং অসীয়তলিপি পূর্ণ করার দায়িত্ব উমর-এর নিকট সোপর্দ করে যাচ্ছি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত হন এবং ভীষণ কান্না করেন। তার চাচাত বোনেরাও খুব কাঁদেন। লোকেরা তাদের থামাতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট অনুরোধ করলে তিনি বলেন, ‘আবু সুলাইমানের জন্য তাদের কাঁদতে দিন যতক্ষণ না তারা বিলাপ করে। আবু সুলাইমানের মতো ব্যক্তির জন্য কান্নাকারীদের কাঁদতে দাও’।২৭৩
তিনি তার সম্পর্কে আরও বলেন, ‘ইসলামের আবরণে একটি ছিদ্র তৈরি হয়েছে।’ বনু মাখযুম গোত্রের কিছু লোককে নিয়ে কবি হিশাম ইবনে আল-বাখতারি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট আসেন। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হিশামকে বলেন, ‘খালিদের ব্যাপারে তুমি তোমার কবিতা আবৃত্তি করে শোনাও’। আবৃত্তি শুনে তিনি বলেন, ‘আবু সুলাইমানের প্রশংসা ঠিকমতো করতে পারোনি। আল্লাহ তার ওপর রহম করুন। তিনি মুশরিকদের অপদস্থ ও পরাজিত করতে পছন্দ করতেন।’ তারপর তিনি বলেন, ‘আল্লাহ আবু সুলাইমানের ওপর রহম করুন। আল্লাহ তার জন্য যা রেখেছেন, সেটি তার কাছে যা ছিল (দুনিয়ায়), তা থেকে অনেক বেশি উত্তম। মৃত্যুর পরও তিনি স্মৃতিতে উজ্জ্বল এবং জীবিত থাকতেও তিনি ছিলেন প্রশংসিত। ২৭৪ কেউই চিরকাল বেঁচে থাকবে না। ২৭৫ তিনি ২১ হিজরীতে সিরিয়ার হিমসে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। আল্লাহ তা'আলার তার ওপর অশেষ রহমত নাযিল করুন এবং সালেহীনদের সঙ্গে তাকে জান্নাতে দাখিল করুন।
টিকাঃ
২৩৭ আদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়া ফি আসর আল-খুলাফা আর-রাশিদিন, পৃ. ১৫১।
২৩৮ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩২১-৩৩১।
২০৯ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১১৫।
২৪০ তারিখুল ইসলামি, ১১/৪৬।
২৪১ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৩১।
২৪২ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩২।
২৪৩ প্রাগুক্ত।
২৪৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১১৫।
২৪৫ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৩২।
২৪৬ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৩২-৩৩৩।
২৪৭ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২১।
২৪৮ প্রাগুক্ত।
২৪৯ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৪৬।
২৫০ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২৩।
২৫১ নিযামুল হিকামি ফি আহদিল খুলাফাইর রাশিমিন, পৃ. ৮৪।
২৫২ প্রাগুক্ত।
২৫৩ আবাতিল ইয়াজিব আন তুমহা মিনাত তারিখ, পৃ. ১৩২।
২৫৪ আবকারিয়াত খালিদ, আল-আক্কাদ, পৃ. ১৫৪-১৫৬।
২৫৫ তারিখ আত-তাবারি, ৫/৪১।
২৫৬ প্রাগুক্ত।
২৫৭ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩২৪।
২৫৮ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪৭।
২৫৯ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৪৭।
২৬০ প্রাগুক্ত।
২৬১ তারিখ আত-তাবারি, ৫/৪৩।
২৬২ আদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়া ফি আসর আল-খুলাফা আর-রাশিদিন, হামদি শাহীন, পৃ. ১৪৯।
২৬৩ আবকারিয়াত উমর, পৃ. ১৫৮।
২৬৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১১৫।
২৬৫ তারিখুল ইসলামি, ১১/১৪৭।
২৬৬ আল-খিলাফা ওয়াল-খুলাফা আর-রাশেদুন, সালিম আল-বাহনাসাবি, পৃ. ১৯৬।
২৬৭ আবাতিল ইয়াজিব আন তুমহা মিনাত তারিখ, পৃ. ১৩৪।
২৬৮ আদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়া ফি আসর আল-khuলাফা আর-রাশিদিন, হামদি শাহীন, পৃ. ১৫১।
২৬৯ সুনান, নাসাঈ, হাদীস নং ৮২৮৩; সুনান আল-কুবরা, মাহদুস সাওয়াব, ২/৪৯৬; এর সনদ সহীহ।
২৭০ সহীহ আত-তাওসিক ফি সিরাতি ওয়া হায়াতিল ফারুক, পৃ. ২১৯।
২৭১ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৪৯; আল-খিলাফা ওয়াল খুলাফা, পৃ. ১৯৮।
২৭২ সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১/৩৮২; আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ.৩৬৭।
২৭৩ আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ. ৩৬৬।
২৭৪ তাহযিব তারিখে দিমাশক, ৫/১১৬।
২৭৫ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৪৮।
ইসলামের শত্রুরা অবাস্তব কল্পনা ও গভীর আক্রোশের বশবর্তী হয়ে এমন- সব বর্ণনার সন্ধান লাভ করে যাতে সাহাবায়ে কেরামে চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করা সম্ভব হয়। যদি তারা তাদের পরিকল্পনা ও সন্তুষ্টি অনুযায়ী বর্ণনা খুঁজে না পেত, তাহলে বানোয়াট বর্ণনার আশ্রয় নিত। আর এতে তারা আশা করে, লোকেরা এসব গ্রহণ করবে এবং তারাই এর বর্ণনাকারী ও উৎসে পরিণত হবে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু—উভয়েই এসব বানোয়াট গল্পের শিকার হয়েছেন যেখানে ইসলামের শত্রুরা ঐতিহাসিক বর্ণনাকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পদচ্যুত করলেন এ বিষয়ে তারা সবচেয়ে বেশি নযর দিয়েছে। আর তারা এই দুই মহান ব্যক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে এবং এমন-সব বর্ণনা জুড়ে দিয়েছে যা কোনোভাবেই সত্যের ধারেকাছেও নেই।২৩৭ নিচে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর পদচ্যুতির সত্য ঘটনা তুলে ধরা হলো যা মূলত দুটি স্তরে সম্পন্ন হয়েছিল এবং এ জন্য মহান উদ্দেশ্য লুক্কায়িত ছিল।
৩.৪.১। প্রথম অপসারণ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে প্রথমে সিরিয়ার গভর্নর ও সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করেন। এটি সংঘটিত হয় ১৩ হিজরীতে যখন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এই অপসারণের মূলে ছিল গভর্নরদের নিয়ন্ত্রণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, যা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু মতো ছিল না। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরদের ইসলামী রাষ্ট্রের সাধারণ নীতির মধ্যে পুরোপুরি স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। এতে শর্ত ছিল, ব্যক্তি এবং দলের সঙ্গে তাদের সম্পূর্ণ ন্যায়সংগত ও নিরপেক্ষ আচরণ করতে হবে। তিনি নিজেই রাষ্ট্রে সুবিচার নিশ্চিত করতেন। তবে তার গভর্নরগণ ন্যায়সংগতভাবে বিচারকার্য করলেও তিনি কিছু মনে করতেন না। খলীফার অনুমতিক্রমে গভর্নরগণ তাদের নিজ নিজ প্রদেশের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন। ছোট ছোট বিষয়ে খলীফার দ্বারস্থ হতে হতো না। প্রদেশে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হলে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পদ কিংবা অন্য কোনো কারণে গভর্নরদের ক্ষমতাকে খর্ব করার প্রয়োজন মনে করতেন না।২৩৮ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পরামর্শ দেন, তিনি যেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তার অনুমতি ব্যতীত কাউকে ছাগল কিংবা উট প্রদান না করে। এই পরামর্শ অনুযায়ী আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠি প্রেরণ করেন এবং এর উত্তরে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ লিখে পাঠান: আমাকে আমার মতো কাজ করার সুযোগ দিন, নতুবা আপনাকেই তা করতে হবে।' তখন খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পদচ্যুত করার জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পরামর্শ দেন।২০৯ তবে খলীফাতুর রাসূল আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে স্বপদে বহাল রাখেন। ২৪০
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন খলীফা হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি মনে করেন, গভর্নর ও প্রশাসকদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যা প্রদেশের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে অনুসরণ করা হবে। তিনি প্রদেশে সংঘটিত ছোট-বড় সবকিছুই খলীফাকে জানানো বাধ্যতামূলক করে দেন যাতে তিনি বিষয়গুলো তদন্ত করতে পারেন এবং সে অনুযায়ী নির্দেশ জারি করতে সক্ষম হন। আর গভর্নরগণ তার নির্দেশ পালনে বাধ্য থাকবে। কারণ, তিনি মনে করতেন, ইসলামী রাষ্ট্রের খলীফা স্বয়ং যা করেন, এ জন্য তিনি যেমনভাবে দায়ী, তেমনি তার গভর্নরগণ যা কিছু করবে, তার জন্যও খলীফা দায়ী হবেন। আর এ দায়-দায়িত্ব থেকে সবচেয়ে উত্তম গভর্নর নির্বাচন করেও ছাড় পাওয়া যাবে না। তিনি খলীফা নির্বাচিত হয়ে জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি বলেন : 'আমার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের পরীক্ষা করছেন এবং তোমাদের মাধ্যমে আমাকে পরীক্ষা করছেন। আর আমার দুজন সাথি আল্লাহ তা'আলার কাছে চলে গেছেন এবং আল্লাহ আমাকে এখনো জীবিত রেখেছেন। আল্লাহর কসম, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি নিজে তোমাদের দায়িত্ব সরাসরি পালন করতে পারব ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য কারও হাতে তোমাদের ছেড়ে দেব না। আর যেসব কাজ সরাসরি করতে পারব না সেসবের দায়িত্ব আমি যোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য লোকের হাতে দেব। আল্লাহর কসম, তারা (গভর্নররা) যদি ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করে, তবে আমি তাদের পুরস্কৃত করব, আর অন্যায় করলে কঠিন শাস্তি দেব।'২৪১
তিনি আরও বলতেন, 'যদি আমি সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে তোমাদের শাসক হিসাবে নিয়োগ দিই এবং তাকে ন্যায়-পরায়ণতার সঙ্গে শাসন করতে বলি, তাহলে তোমরা কি মনে করো যে, আমি আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছি?' তারা বলল, 'হ্যাঁ।' তিনি বললেন, 'না। যতক্ষণ না আমি তার আচরণ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি এবং তাকে যা করার নির্দেশ দিয়েছি, তা সে যথাযথভাবে পালন করেছে, ততক্ষণ আমার দায়িত্ব পরিপূর্ণ হবে না।' ২৪২
খলীফা হওয়ার পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই প্রত্যাশা করলেন যে, প্রাদেশিক গভর্নরগণ তার পদ্ধতিকে অনুসরণ করবে। তাদের কেউ কেউ সেটি মেনে নিল এবং অন্যরা দ্বিমত পোষণ করল। যারা তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন, তাদের একজন ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু। ২৪৩ মালিক ইবনে আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, খলীফা হওয়ার পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লিখে পাঠান : 'আমার অনুমতি ছাড়া কাউকে একটি ছাগল কিংবা উটও দেবে না।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এই চিঠির জবাবে লেখেন : হয় আপনি আমাকে আমার মতো কাজ করার সুযোগ দেবেন, নতুবা আপনাকেই এর দায়িত্ব নিতে হবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর প্রতি আমার অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ পাবে যদি আমি যা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলাম, আমি নিজেই (সেই সুযোগ পেয়ে) তা না করি।' সুতরাং তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করলেন। ২৪৪ অধিকন্তু তিনি তাকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দায়িত্ব দিতে চেয়েছেন, কিন্তু তিনি স্বাধীনভাবে ওই দায়িত্ব পালন করতে চেয়েছেন, যার অনুমতি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দেননি। ২৪৫
অতএব, রাষ্ট্র পরিচালনায় গৃহীত নীতির ওপর ভিত্তি করেই তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করেছিলেন। আর শাসকগণ রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন দিকনির্দেশনা দিতেই পারেন (শরীয়তের সীমার মধ্যে)। এ রকম ঘটনা আমাদের জীবন অহরহ ঘটছে। বিভিন্ন বর্ণনা, মতামত, নিজস্ব বিজ্ঞোচিত দর্শন ও প্রভাব বিবেচনা করে এর পেছনে জটিল কোনো কারণ খুঁজে বের করার প্রয়োজন নেই। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন এক সময় ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন যখন লোকেরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগের খুব নিকটবর্তী ছিল। মৌলিকভাবেই রাষ্ট্রের প্রাদেশিক গভর্নর ও সেনাপতি নির্বাচন খলীফার অন্যতম দায়িত্ব। স্বভাবতই তারা এমন ব্যক্তি হবেন যারা খলীফার চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করবে এবং তার অনুসৃত নীতি ও পথকে মেনে চলবে। উল্লেখ্য, তখন উম্মতের মধ্যে যোগ্য ও বিশ্বস্ত লোকের কোনো কমতি ছিল না। গভর্নর ও সেনাপতিরা চিরকাল তাদের পদে অধিষ্ঠিত থাকার অধিকার রাখেন না। আর যখন রাষ্ট্রনায়কের সঙ্গে গভর্নরের মতের অমিল হয়, তখন গভর্নরদের আর দায়িত্ব পালনের সুযোগ থাকে না যেখানে আরও অনেকেই রাষ্ট্রনায়কের মতকে অনুসরণ করে দায়িত্ব পালনে আগ্রহী ব্যক্তি-বর্গ রয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ ব্যাপারে খুবই সফল ছিলেন এবং তার গৃহীত নীতিসমূহ অকল্পনীয় সফলতা অর্জন করে। তিনি কয়েকজনকে বরখাস্ত করেন এবং তাদের পরিবর্তে অন্যদের নিয়োগ দেন। নতুন যাদের নিয়োগ দেন, তারা কোনো অংশেই পূর্ববর্তী গভর্নরদের চেয়ে যোগ্যতায় কম ছিলেন না। কারণ, তখন এ রকম দায়িত্ব পালন করার জন্য যোগ্য ও সাহসী লোকের সংখ্যা ছিল অনেক। ২৪৬
কোনো রকমের প্রতিবাদ ছাড়াই খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পদচ্যুতিকে গ্রহণ করেন এবং তিনি আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্ব মেনে চলেন। পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তা'আলা তাকে কিন্নিসিরিন বিজয়ের সুযোগ দিলে আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি খলীফাকে এই বিজয় সম্পর্কে অবহিত করেন এবং সেখানে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবদান তুলে ধরেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন তার বিখ্যাত উক্তিটি করেন : খালিদ নিজেই নিজেকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করেছে। আল্লাহ আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওপর রহম করুন, মানুষ সম্পর্কে আমার চেয়ে তার বেশি জ্ঞান ছিল।'২৪৭ এ কথা বলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যা বোঝাতে চেয়েছেন তা হলো, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সাহসী ও বীরোচিত কাজের জন্য নিজেকে এমন এক উচ্চতায় আসীন করেছিলেন, যা করতেই তিনি অভ্যস্ত—বিপজ্জনক, সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে পারদর্শী। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যেন বোঝাতে চেয়েছেন, তার পরামর্শ সত্ত্বেও আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু যোগ্যতা ও সামরিক দক্ষতার কথা বিবেচনা করে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করেননি। এর মানে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ কয়েকজন বীর ছাড়া অন্য কারও পক্ষে তার স্থান পূরণ করার মতো লোক ছিল না। ২৪৮
এ-সময় খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রায় চার বছর আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে কাজ করেন এবং তিনি মুহূর্তের জন্যও তার অবাধ্য হননি। আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর মহান গুণাবলিকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবস্থাকে সম্যক উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং সেভাবেই তিনি তার সঙ্গে সম্মান ও দয়ার আচরণ করেছেন। তিনি তাকে নিজের কাছাকাছি রাখতেন, যখন-তখন তার সঙ্গে পরামর্শ করতেন, তার মতামতকে গুরুত্ব দিতেন এবং কখনো কখনো তাকে নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে দিতেন। এসব কারণেই খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মনে কোনো ধরনের আক্রোশ বাসা বাঁধতে পারেনি এবং ফলে তার পক্ষে সামরিক ক্ষেত্রেও এত বীরোচিত ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়েছে। দামেস্ক, কিন্নিসিরিন এবং অহল বিজয় তার ঐশী মনোবলের সাক্ষী যা পদচ্যুতির ঘোষণা শোনার পর তার আচরণে ফুটে উঠেছিল। উভয় ক্ষেত্রেই (বরখাস্ত হওয়ার আগে এবং পরে) তিনি ছিলেন আল্লাহর তরবারি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু। ২৪৯
ইতিহাস বিস্মৃত হয়নি সেই কথা, যা খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বরখাস্তের সময় আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন: 'এটি দুনিয়ার কোনো ক্ষমতা নয় যা আমি চাই এবং আমি যা কিছু করি তা এই দুনিয়ার জন্য নয়। তুমি যা কিছু দেখছ, তা শীঘ্রই নিঃশেষ হয়ে যাবে। অথচ আমরা পরস্পর ভাই, যারা আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নের চেষ্টা করছি এবং এটি কোনো ব্যাপার নয় যে, ভাইদের একজন অপরজনের ধর্মীয় ও দুনিয়ার বিষয়াদিতে নেতৃত্ব দেবে; বরং যার ওপর নেতৃত্বের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হলো সে-ই বেশি অস্থিরতা ও গোনাহের ঝুঁকিতে রয়েছে—তারা ব্যতীত যাদের আল্লাহ হেফাজত করেন এবং তাদের সংখ্যা খুবই কম। ২৫০
যখন আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সামরিক অভিযান পরচালনা করার নির্দেশ দিতেন, তিনি তা সানন্দেই গ্রহণ করেন এবং বলেন, 'ইনশাআল্লাহ আমি তা করব। আমি কেবল আপনার নির্দেশের অপেক্ষায়ই ছিলাম।' আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'তোমাকে কিছু বলতে আমার খুব লজ্জা লাগে, হে আবু সুলাইমান।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'যদি কোনো ছোট শিশুকেও আমার ওপর নিয়োগ করা হয়, আমি তাকে মেনে চলব। আমি কেমন করে আপনার বিরুদ্ধে যাব যেখানে আপনি আমার আগে ইসলামে দাখিল হয়েছেন এবং আপনি তাদের সাথেই ঈমান এনেছেন যারা দ্রুত ইসলামে দাখিল হওয়ার জন্য উদ্গ্রীব ছিলেন। আর স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনাকে 'আল-আমীন' বলে সম্বোধন করেছেন। আমি কেমন করে আপনার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হব? এখন আপনাকে আমি সাক্ষী বানাচ্ছি যে, আমি পুরোপুরিভাবে নিজেকে আল্লাহর জন্য সোপর্দ করলাম এবং আমি কখনোই আপনার অবাধ্য হব না এবং এরপরে আর কখনো গভর্নরের পদ গ্রহণ করব না।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এখানেই থেমে যাননি; বরং তিনি তা বাস্তবে করে দেখিয়েছেন এবং তাকে যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তিনি তা দ্রুত বাস্তবায়নে বেরিয়ে পড়েন। ২৫১
খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা ও কাজ থেকে এটি পরিষ্কার যে, ধর্মীয় ও মানবিক অনুভূতিই তাদের মধ্যে পারস্পরিক সদাচরণে মূল ভূমিকা রাখে। খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা ও গভর্নরের প্রতি আনুগত্যের নীতি বজায় রেখেছেন যদিও পদচ্যুতির কারণে তার ব্যক্তিগত অবস্থান ও মর্যাদা পরিবর্তিত হয়েছে-সেনাপতি থেকে সাধারণ সৈনিকে পরিণত হয়েছেন। ২৫২ গভর্নরের পদ থেকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অপসারণের মূলে তার বিরুদ্ধে কোনো বিদ্বেষ, সন্দেহ কিংবা শরীয়তের সীমালঙ্ঘন বা তার ইসলামী মূল্যবোধ ও ন্যায়পরায়ণতায় কোনো কলঙ্ক দায়ী ছিল না; বরং এখানে ইসলামের দুই মহান ব্যক্তির দুটি ভিন্ন পদ্ধতির বাস্তবায়ন প্রতিফলিত হয়েছে যেখানে উভয়ে মনে করেছেন, তাদের নিজস্ব পদ্ধতিই প্রয়োগ করা উচিত। যদি তাদের একজনকে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তাহলে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি খলীফার জন্যই এই ত্যাগ স্বীকার করবেন-কোনো হীনম্মন্যতা কিংবা কোনো ক্রোধ বা আক্রোশ ছাড়াই। ২৫৩
আল্লাহর অনুগ্রহে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ায় মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি হিসাবে আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ দেন। ইয়ারমুকের যুদ্ধের পর ওই এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন ছিল যাতে মানুষের মধ্যে শত্রুতা চিরতরে শেষ হয়ে যায়, আহতরা সুস্থ হয়ে ওঠে এবং তাদের অন্তরগুলো বিবাদ-বিসংবাদ ভুলে আবার এক হয়ে ওঠে। সুযোগ পাওয়ামাত্রই আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু শান্তি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যান, কিন্তু প্রয়োজনে লড়তে তিনি পিছপা হননি। সিরিয়ার বিভিন্ন শহরের লোকেরা আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর সহনশীলতার পরিচয় পেয়ে দলে দলে এসে তার নিকট শান্তিচুক্তি করে; তারা অন্য কারও থেকে তার সঙ্গেই চুক্তি করতে পছন্দ করে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশেই আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং প্রদেশের সর্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষায় সিরিয়ার গভর্নর হিসাবে তার এই নিয়োগ ছিল যথোপযুক্ত। ২৫৪
৩.৪.২। দ্বিতীয় অপসারণ
কিন্নিসিরিনের গভর্নর পদ থেকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আবার (দ্বিতীয়বার) পদচ্যুত করা হয়। আর এটি সংঘটিত হয় ১৭ হিজরীতে। ২৫৫ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট খবর পৌঁছে যে, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আইয়ায ইবনে গানাম রাযিয়াল্লাহু আনহু বাইজেন্টাইন বর্ডার ভেদ করে অভিযান পরিচালন করেন এবং বিপুল-পরিমাণ গনীমতের মাল নিয়ে আসেন। অনেক দূর থেকে তার নিকট একজন লোক সাহায্যের আশায় আসে। তার সঙ্গে আল-আশাস ইবনে কাইসও ছিলেন, যাকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দশ হাজার দিরহাম প্রদান করেন। তিনি যা কিছু করেছেন, তার সব খবরই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কানে আসে। ২৫৬
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সেনাপতি আবু উবাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর চিঠি প্রেরণ করেন যাতে তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই বিপুল- পরিমাণ অর্থের উৎস সন্ধান করতে বলেন এবং তাকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যেকোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতে বলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মদীনায় ডেকে আনেন এবং আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর সম্মুখে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরিশেষে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গনীমতের মাল থেকে দশ হাজার দিরহাম নেওয়ার অভিযোগের ব্যাপারে পুরোপুরি নির্দোষ সাব্যস্ত হন। ২৫৭
খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পদচ্যুতির ব্যাপারে জানানো হলে তিনি সিরিয়াবাসীদের বিদায় সম্ভাষণ জানান। তার কথায় সেনাপতি ও সৈন্যদের মধ্যে চিরায়ত বিচ্ছেদের কষ্ট ফুটে ওঠে : আমীরুল মুমিনীন আমাকে সিরিয়ার গভর্নর হিসাবে নিযুক্ত করেন। যখন সব গোলযোগ শেষ হয়ে পরিস্থিতি শান্ত এবং স্থির হতে থাকে, তখন তিনি আমাকে অপসারণ করেন।' এক লোক দাঁড়িয়ে বলে ওঠে, 'হে মহান সেনাপতি, ধৈর্যধারণ করুন। এখন ফিতনার সময় ধেয়ে আসছে।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'যতদিন উমর ইবনুল খাত্তাব জীবিত থাকবেন, ততদিন কোনো ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।'২৫৮ এটি খুবই শক্তিশালী এবং একনিষ্ঠ ঈমানের প্রকাশ, যা আল্লাহর রাসূলের ঘনিষ্ঠ সাহাবীদের মধ্যে নির্বাচিত বান্দাদের ছাড়া অন্য কাউকে দেওয়া হয়নি। এক চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কি এক পরম ঐশ্বরিক শক্তি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল, যা তাকে এ রকম উত্তর দিতে সমর্থ করেছিল?২৫৯ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের সমর্থনে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ভাষ্য শুনে লোকজন শান্ত হয়ে যায়। তারা অনুধাবন করে, তাদের বহিষ্কৃত সেনাপতি এমন কোনো সাধারণ ব্যক্তি নন, যে কিনা বিদ্রোহ ও ফিতনা ছড়িয়ে খলীফার বিরুদ্ধাচরণ করে নিজের গৌরব প্রকাশ করবেন; বরং তিনি ছিলেন এমন ব্যক্তিত্ব যাদের গঠনমূলক কাজ করার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং পরিস্থিতি যদি তাদের কীর্তিকে ম্লান করে দিতে চায়, তাহলে তারা আরও উঁচুতে উন্নীত হন। ২৬০
খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনায় ফিরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে দেখা করেন। তিনি খলীফাকে বলেন, 'আমি আপনার ব্যাপারে মুসলিমদের নিকট অভিযোগ করেছি যে, আপনি আমার সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করেননি, হে উমর।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করলেন, 'কোথা থেকে এ সম্পদ লাভ করেছ?' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বললেন, 'আমার গনীমতের অংশ থেকে। আর সেখানে ষাট হাজারের অধিক আপনার অংশ।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গনীমতের সম্পদ হিসাব করে দেখলেন যে, তা বিশ হাজার, যা তিনি বাইতুল মালে জমা করেন। তারপর বলেন, 'হে খালিদ, আল্লাহর কসম, তুমি আমার নিকট অনেক প্রিয় এবং আজকের পরে তুমি আমার প্রতি আর অসন্তুষ্ট থাকবে না।'২৬১
তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়াবাসীদের প্রতি এক চিঠিতে লেখেন, 'আমি খালিদকে এ জন্য অপসারণ করিনি যে, আমি তার প্রতি অসন্তুষ্ট কিংবা সে কোনো মন্দ আচরণ করেছে; বরং মানুষজন তার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আমার আশঙ্কা হয়েছে, আল্লাহ হয়তো লোকজনকে তার দিকে ধাবিত করবেন এবং তার মাধ্যমে তারা পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। আমি এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছি, আল্লাহই একমাত্র সত্তা যিনি বিজয় দান করেন এবং এ ব্যাপারে যাতে লোকজনের মনে কোনো সন্দেহ সৃষ্টি না হয়।'
৩.৪.৩। অপসারণের কারণসমূহের সারসংক্ষেপ এবং এর সুফল
রাষ্ট্র পরিচালনায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যে আদর্শ বা নীতি অনুসরণ করতেন, এর ভিত্তিতে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অপসারণের কারণসমূহ নিচে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো :
তাওহীদের সুরক্ষা : উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা-'বরং মানুষজন তার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আমার আশঙ্কা হয়েছে, আল্লাহ হয়তো লোকজনকে তার দিকে ধাবিত করবেন এবং তার মাধ্যমে তারা পরীক্ষার সম্মুখীন হবে'- থেকে এটি পরিষ্কার যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আশঙ্কা করেছেন, লোকজন খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য সন্দেহে পতিত হবে এবং তারা ধারণা করবে, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যেখানেই যাবেন সেখানেই বিজয় অর্জিত হবে, যা তাদের মূল বিশ্বাসকে দুর্বল করে তুলবে। কারণ, বিজয় আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে—যুদ্ধে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অংশগ্রহণ করুন বা না করুন। কোনো একজন সেনাপতি—খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু—এর প্রতি লোকজনের অতিভক্তি থেকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেও তার ভক্তদের অনুরক্ত হয়ে যেতে পারেন; তিনি নিজেকে এমন ক্ষমতাবান মনে করতে পারেন, যা অপ্রতিরোধ্য। কারণ, তিনি ছিলেন রণকৌশলে অসম্ভব পারদর্শী এবং দান- সদকায় উদার। এটি রাষ্ট্র এবং তার নিজের জন্যও খারাপ পরিণতি ডেকে আনত। যদিও এ রকম হওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই ক্ষীণ। বস্তুত লোকজন তাদের খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি নিবদ্ধ ছিল এবং তাকে তারা খুব শ্রদ্ধা করত। আর অন্যদিকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন মহান সামরিক ব্যক্তিত্ব এবং ধর্মভীরু মানুষ। তারপরেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যুর পরে হয়তো খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো নেতার সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটতে পারত। এ জন্য ওই সময় এসব মহান ব্যক্তিদের জন্য একটি দিকনির্দেশনা প্রয়োজন ছিল। ২৬২ এ রকম পরিস্থিতিতে কম যোগ্যতাসম্পন্ন সেনাপতি—যার পরিচিতিও তেমন ব্যাপক নয়—থেকে সুদক্ষ সেনাপতিকে নিয়ে ফেতনার আশঙ্কা ছিল বেশি। ২৬৩
অর্থ ব্যয়ে পদ্ধতিগত মতপার্থক্য: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, অর্থ ও উপহারসামগ্রী দিয়ে ইসলামের দিকে মানুষের মনকে আকৃষ্ট করার সময় শেষ হয়ে গিয়েছে; ইসলামে এমন লোকজনের আর প্রয়োজন নেই এবং লোকজনকে তাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও আদর্শের ওপর ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, তার সঙ্গে এমন কিছু সাহসী মানুষ ও মুজাহিদ লড়াই করছে যারা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর পুরস্কারের আশায় লড়াই করছে না। তাদের ঈমান বৃদ্ধি ও ইসলামের দিকে আরও নিবেদিত করে তোলার জন্য তাদের পেছনে কিছু ব্যয় করার সুযোগ রয়েছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, অন্যদের চেয়ে দরিদ্র মুজাহিদরা এ সম্পদ লাভের বেশি যোগ্য। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন জাবিয়ার লোকজনকে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অপসারণের কারণ ব্যক্ত করছিলেন, তখন বলেন, ‘আমি তাকে এসব অর্থ মুজাহিদদের মধ্যে দুর্বলদের জন্য খরচ করতে বলেছিলাম, কিন্তু তিনি তা শক্তিশালী ও সামর্থ্যবানদের পেছনে খরচ করেছে।’ ২৬৪ অবশ্যই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু—প্রত্যেকের মতের পক্ষে অনেক যুক্তি রয়েছে, কিন্তু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন কিছুর আঁচ করতে পেরেছিলেন যা খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বুঝতে পারেননি। ২৬৫
প্রশাসনিক কাজে উমর রা. এবং খালিদ রা.-এর মতপার্থক্য : উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরদের এই মর্মে চাপ প্রয়োগ করেন যে, তারা তাকে প্রত্যেক বিষয়েই অবহিত করবে—সেটা বড় কিংবা ছোট হোক। কিন্তু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ। এ ক্ষেত্রে তার জন্য কারও নিকট জবাবদিহিতার প্রয়োজন নেই; তিনি মনে করতেন, যখন যা কিছু করা প্রয়োজন, এ ব্যাপারে তার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা উচিত, কারণ, বাস্তব প্রেক্ষাপটে যে উপস্থিত, সে অনুপস্থিত ব্যক্তি অপেক্ষা পরিস্থিতি বেশি পর্যবেক্ষণ ও বিবেচনা করার সুযোগ লাভ করেন। ২৬৬
সম্ভবত আরেকটি কারণ এই ছিল, নতুন নেতাদের নেতৃত্ব লাভের সুযোগ করে দেওয়া যাতে মুসলিম উম্মাহ খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু, আল-মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো আরও বীর তৈরি করতে সক্ষম হয়। আরেকটি কারণ, লোকজনের বোঝা উচিত, বিজয় কোনো একক ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিষয় নয়; ২৬৭ বরং ব্যক্তি এখানে কোনো ব্যাপারই নয়।
খালিদ রা.-এর অপসারণে মুসলিম সমাজের প্রতিক্রিয়া : মুসলিম সমাজ খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই অপসারণকে মেনে নেয়। কারণ, তারা মনে করে, যে কাউকে গভর্নর নিয়োগ ও বহিষ্কারে খলীফার অধিকার রয়েছে। কারও পক্ষেই ইসলামী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অথবা গভর্নর নিয়োগ ও বহিষ্কারে খলীফার অধিকারে হস্তক্ষেপ করার অধিকার ছিল না।
বর্ণিত আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একদিন মধ্যরাত্রিতে আলকামা ইবনে উলাসা আল-কিলাবির সঙ্গে দেখা করলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখতে অনেকটাই খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো মনে হতো এবং আলকামা ভাবলেন, খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-ই এসেছেন। তিনি বলে উঠলেন, 'হে খালিদ, খলীফা তোমাকে পদচ্যুত করেছেন এবং এখন এর স্বপক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছেন। আমি আমার এক চাচাত ভাইকে নিয়ে তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করতে চাই। কিন্তু তিনি যা করার করেছেন। আমি তাকে কখনো কিছু জিজ্ঞাসা করব না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু— আরও বিস্তারিত জানার আগ্রহে যা তিনি লুকাচ্ছিলেন—বললেন, 'ঠিক আছে, এ ব্যাপারে আরও কিছু বলো।' তখন আলকামা বললেন, 'আমাদের ওপর এসব মানুষের অধিকার রয়েছে এবং আমাদের উচিত তাদের অধিকারে হস্তক্ষেপ না করা। নিশ্চয়ই আল্লাহ এতে আমাদের পুরস্কৃত করবেন।' পরের দিন সকালে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে—যখন আলকামা তাদের দুজনের দিকে তাকালেন—জিজ্ঞাসা করলেন, 'গতরাতে আলকামা তোমাকে কী বলেছে?' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, তিনি আমাকে কিছুই বলেননি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি এ জন্য কসম করছ?'
ঘটনার আকস্মিকতায় আলকামা খুব মর্মাহত হন এবং মনে মনে বলতে থাকেন, গতরাতে তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে কথা বলেননি। তারপর তিনি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, 'হে খালিদ, তোমার কী হলো?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আলকামার প্রতি খুব দরদি ছিলেন এবং তিনি তার প্রয়োজনে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। তিনি বললেন, 'এখানে যদি এমন আরও লোকেরা থাকত যারা তোমার মতো চিন্তা করে—(মতের অমিল সত্ত্বেও যারা শাসকের প্রতি তাদের আনুগত্য বজায় রাখে)—তাহলে তারা অমুক অমুক থেকে আমার নিকট বেশি পছন্দনীয় হতো। ২৬৮
যাই হোক, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর চাচাত ভাই আবু আমর ইবনে হাফস ইবনে আল-মুগিরা এ ব্যাপারে জাবিয়ায় প্রতিবাদ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন লোকদের বললেন, 'আমি তাকে এসব অর্থ মুজাহিদদের মধ্যে দুর্বলদের জন্য খরচ করতে বলেছিলাম, কিন্তু তিনি তা শক্তিশালী ও সামর্থ্যবানদের পেছনে খরচ করেছে। এ জন্য আমি তাকে অপসারণ করেছি এবং তার পরিবর্তে আবু উবাইদা ইবনে জাররা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে গভর্নর নিয়োগ করেছি।' তখন আবু আমর ইবনে হাফস ইবনে আল-মুগিরা বলে ওঠেন, 'আল্লাহর কসম, আপনি তার ব্যাপারে ন্যায়বিচার করেননি। হে উমর ইবনুল খাত্তাব, আপনি এমন একজন সেনাপতিকে পদচ্যুত করেছেন, যাকে স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেনাপতি নিয়োগ করেছিলেন; আপনি এমন এক তরবারিকে কোষবদ্ধ করেছেন, যা স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উন্মুক্ত করেছিলেন; আপনি এমন এক পতাকাকে অবনমিত করেছেন, যা স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তোলন করেছিলেন। আপনি আত্মীয়ের প্রতি দয়া করেছেন এবং আপনার চাচাত ভাইয়ের প্রতি হিংসা পোষণ করেছেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বললেন, 'তুমি তার খুবই নিকটাত্মীয়। তুমি বয়সে ছোট এবং চাচাত ভাইয়ের অপসারণে রেগেও আছ।'২৬৯
এভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর চাচাত ভাইয়ের কথায় ধৈর্যধারণ করেন, যে কিনা খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে এত বেশি বাড়াবাড়ি করছিল যে, তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে হিংসুক বলে দাবি করেছে। এতৎসত্ত্বেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সবর করেন। ২৭০
খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রা.-এর মৃত্যু এবং মৃত্যুসজ্জায় উমর রা. সম্পর্কে তার মন্তব্য : আবু আদ-দরদা রাযিয়াল্লাহু আনহু অসুস্থ খলিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখতে গেলেন। খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'হে আবু দরদা, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে তুমি যা অপছন্দ করো তা-ই দেখতে পাবে।' আবু দরদা রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি তোমার সঙ্গে একমত।' খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি তার সঙ্গে একটি ব্যাপারে শুধু দ্বিমত পোষণ করেছিলাম। আমি যখন অসুস্থ হলাম, তখন এ বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছি। আমি এখন মৃত্যুসজ্জায়। আমি বিশ্বাস করি, উমর যা কিছু করে, তাতে তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টিই তালাশ করেন। আমি মর্মাহত হই যখন তিনি আমার অর্ধেক সম্পদ জব্দ করার জন্য লোক পাঠালেন। এমনকি লোকটি আমার জুতা জোড়ার একটি নিয়ে নেয় এবং অন্যটি আমার কাছে রেখে যায়। কিন্তু তিনি এটি অন্যদের সঙ্গেও করেছেন, যারা আমার আগে ইসলামে দাখিল হয়েছিলেন এবং যারা বদর যুদ্ধে শরীক ছিলেন। তিনি আমার প্রতি রূঢ় আচরণ করেছেন, কিন্তু তিনি একই রকম রূঢ় আচরণ অন্যদের সঙ্গেও করেছেন। আমি আশা করেছিলাম, তিনি আমার সঙ্গে ভালো আচরণ করবেন। কারণ, আমরা গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিলাম। আমি দেখলাম, তিনি সেসব আমলে নেননি এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় তিনি কারও পক্ষ থেকে বদনামের পরোয়া করেননি। এই একটি কারণে আমার অন্তর থেকে তার ব্যাপারে সব গ্লানি দূর হয়ে গিয়েছে। তিনিও আমার ব্যাপারে হতাশ হয়েছেন, কারণ, আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল। আমি ছিলাম রণক্ষেত্রে, প্রচণ্ড শক্তিতে যুদ্ধে নিমগ্ন। আমিই সেখানে ছিলাম এবং তিনি ছিলেন না। আমি পরিস্থিতি সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতাম এবং তিনি তা পছন্দ করেননি। ২৭১ যখন মৃত্যু আসন্ন এবং তিনি তা বুঝতে পারলেন, তখন বললেন,
আমার এমন কোনো কাজ নেই যা আমাকে ওই কাজ অপেক্ষা বেশি আশান্বিত করতে পারে—কলেমা পড়ার পর–তা হলো, প্রচণ্ড শীতের রাতে বৃষ্টিতে ভিজে একটি মুজাহিদ দলের সঙ্গে প্রত্যুষে মুশরিকদের ওপর আক্রমণ চালানো। আপনাকে অবশ্যই জিহাদে অংশগ্রহণ করতে হবে। আমি অমুক অমুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি এবং আমার দেহের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে তরবারি, তির বা বর্শার দু-একটি আঘাত নেই। আর আমি এখন জরাগ্রস্ত উটের মতো বিছানায় মৃত্যুবরণ করছি। কাপুরুষ কখনো বিজয়ী হতে পারে না। আমি জিহাদের ময়দানেই মৃত্যু কামনা করেছিলাম। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন যে, আমি আমার বিছানাতেই মৃত্যুবরণ করব। ২৭২
মৃত্যুর পূর্বে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বরাবর অসীয়ত করে যান, যেখানে তিনি বলেন, 'আমি আমার যাবতীয় কিছু, সকল সম্পদ এবং অসীয়তলিপি পূর্ণ করার দায়িত্ব উমর-এর নিকট সোপর্দ করে যাচ্ছি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত হন এবং ভীষণ কান্না করেন। তার চাচাত বোনেরাও খুব কাঁদেন। লোকেরা তাদের থামাতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট অনুরোধ করলে তিনি বলেন, ‘আবু সুলাইমানের জন্য তাদের কাঁদতে দিন যতক্ষণ না তারা বিলাপ করে। আবু সুলাইমানের মতো ব্যক্তির জন্য কান্নাকারীদের কাঁদতে দাও’।২৭৩
তিনি তার সম্পর্কে আরও বলেন, ‘ইসলামের আবরণে একটি ছিদ্র তৈরি হয়েছে।’ বনু মাখযুম গোত্রের কিছু লোককে নিয়ে কবি হিশাম ইবনে আল-বাখতারি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট আসেন। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হিশামকে বলেন, ‘খালিদের ব্যাপারে তুমি তোমার কবিতা আবৃত্তি করে শোনাও’। আবৃত্তি শুনে তিনি বলেন, ‘আবু সুলাইমানের প্রশংসা ঠিকমতো করতে পারোনি। আল্লাহ তার ওপর রহম করুন। তিনি মুশরিকদের অপদস্থ ও পরাজিত করতে পছন্দ করতেন।’ তারপর তিনি বলেন, ‘আল্লাহ আবু সুলাইমানের ওপর রহম করুন। আল্লাহ তার জন্য যা রেখেছেন, সেটি তার কাছে যা ছিল (দুনিয়ায়), তা থেকে অনেক বেশি উত্তম। মৃত্যুর পরও তিনি স্মৃতিতে উজ্জ্বল এবং জীবিত থাকতেও তিনি ছিলেন প্রশংসিত। ২৭৪ কেউই চিরকাল বেঁচে থাকবে না। ২৭৫ তিনি ২১ হিজরীতে সিরিয়ার হিমসে মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। আল্লাহ তা'আলার তার ওপর অশেষ রহমত নাযিল করুন এবং সালেহীনদের সঙ্গে তাকে জান্নাতে দাখিল করুন।
টিকাঃ
২৩৭ আদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়া ফি আসর আল-খুলাফা আর-রাশিদিন, পৃ. ১৫১।
২৩৮ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩২১-৩৩১।
২০৯ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১১৫।
২৪০ তারিখুল ইসলামি, ১১/৪৬।
২৪১ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৩১।
২৪২ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৩২।
২৪৩ প্রাগুক্ত।
২৪৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১১৫।
২৪৫ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৩২।
২৪৬ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৩২-৩৩৩।
২৪৭ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২১।
২৪৮ প্রাগুক্ত।
২৪৯ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৪৬।
২৫০ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩২৩।
২৫১ নিযামুল হিকামি ফি আহদিল খুলাফাইর রাশিমিন, পৃ. ৮৪।
২৫২ প্রাগুক্ত।
২৫৩ আবাতিল ইয়াজিব আন তুমহা মিনাত তারিখ, পৃ. ১৩২।
২৫৪ আবকারিয়াত খালিদ, আল-আক্কাদ, পৃ. ১৫৪-১৫৬।
২৫৫ তারিখ আত-তাবারি, ৫/৪১।
২৫৬ প্রাগুক্ত।
২৫৭ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩২৪।
২৫৮ প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৪৭।
২৫৯ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৪৭।
২৬০ প্রাগুক্ত।
২৬১ তারিখ আত-তাবারি, ৫/৪৩।
২৬২ আদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়া ফি আসর আল-খুলাফা আর-রাশিদিন, হামদি শাহীন, পৃ. ১৪৯।
২৬৩ আবকারিয়াত উমর, পৃ. ১৫৮।
২৬৪ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭/১১৫।
২৬৫ তারিখুল ইসলামি, ১১/১৪৭।
২৬৬ আল-খিলাফা ওয়াল-খুলাফা আর-রাশেদুন, সালিম আল-বাহনাসাবি, পৃ. ১৯৬।
২৬৭ আবাতিল ইয়াজিব আন তুমহা মিনাত তারিখ, পৃ. ১৩৪।
২৬৮ আদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়া ফি আসর আল-khuলাফা আর-রাশিদিন, হামদি শাহীন, পৃ. ১৫১।
২৬৯ সুনান, নাসাঈ, হাদীস নং ৮২৮৩; সুনান আল-কুবরা, মাহদুস সাওয়াব, ২/৪৯৬; এর সনদ সহীহ।
২৭০ সহীহ আত-তাওসিক ফি সিরাতি ওয়া হায়াতিল ফারুক, পৃ. ২১৯।
২৭১ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৪৯; আল-খিলাফা ওয়াল খুলাফা, পৃ. ১৯৮।
২৭২ সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১/৩৮২; আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ.৩৬৭।
২৭৩ আত-তারিখ ইলাল মাদায়িন, পৃ. ৩৬৬।
২৭৪ তাহযিব তারিখে দিমাশক, ৫/১১৬।
২৭৫ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ, সাদিক আরজুন, পৃ. ৩৪৮।