📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 গভর্নরদের দায়িত্ব

📄 গভর্নরদের দায়িত্ব


আল্লাহ তা'আলা যেভাবে তাদের মর্যাদা ও সম্মান দিয়েছিলেন, একই ভাবে তাদের কাঁধে অর্পণ করেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অনেক দায়িত্ব। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের গুরুত্বপূর্ণ যেসব দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ রাখতেন, তার বিবরণ এখানে উল্লেখ করা হলো।

২.৪.১। দ্বীন প্রতিষ্ঠা
ইসলামের প্রচার-প্রসার, নামায কায়েম, দ্বীন এবং তার মূলনীতি ও তার শাখাপ্রশাখা রক্ষণাবেক্ষণ, মসজিদ নির্মাণ, হজ-ব্যবস্থাপনা সহজীকরণ, শরয়ি দণ্ডবিধি কার্যকর করার মতো বিষয়গুলো দ্বীন প্রতিষ্ঠার অন্তর্ভুক্ত। এর প্রত্যেকটির ব্যাপারে এখানে বিস্তারিত আলোকপাত করা হবে।
ইসলামের প্রচার-প্রসার: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকাল ছিল মহাবিজয়ের যুগ। এ জন্য অবস্থা ও সময়ের দাবি ছিল তার নিয়োগকৃত গভর্নরগণ বিজিত অঞ্চলে অন্যান্য সাহাবীর সহযোগিতা নিয়ে ইসলামের প্রচার-প্রসারে অবদান রাখবেন। ১৩৪
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে শামের গভর্নর ছিলেন ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি একবার এক পত্রে লেখেন :
শামের আবাদ অঞ্চল যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। শহরে লোকজনের উপস্থিতি বেড়ে গেছে। তাদের জন্য এমন ব্যক্তির প্রয়োজন, যিনি তাদের কুরআন শিক্ষা দেবেন। দ্বীনের ফিকহ ও ইলম শিক্ষা দেবেন। আপনি এমন একজন শিক্ষক পাঠিয়ে আমাদের সাহায্য করুন।
এই চিঠি পাওয়ার পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পাঁচ জন বিশিষ্ট আলেম সাহাবীকে সেখানে পাঠালেন। ১৩৫
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে এ-কথা বেশ প্রসিদ্ধ যে তিনি গভর্নরদের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠাবার সময় সাধারণ লোকদের বলতেন, হে লোকসকল, শুনে নাও। আল্লাহর কসম, আমি তাদের এ জন্য গভর্নর পাঠাচ্ছি না যে তারা তোমাদের চামড়া তুলে ফেলবে। আর তোমাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেবে। তাদের বরং এ জন্য পাঠানো হচ্ছে, যাতে তারা তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে পারে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ সম্পর্কে অবগত করতে পারে। ১৩৬
আর তিনি গভর্নরদের সম্বোধন করে বলতেন,
আমি তোমাদের মুসলিমদের ওপর যুলুম করতে, তাদের চামড়া তুলে ফেলতে গভর্নর বানিয়ে পাঠাচ্ছি না; বরং আমি তোমাদের এ জন্য এই দায়িত্ব অর্পণ করেছি, যাতে তোমরা মানুষকে নামায পড়াতে পার। কুরআন শিক্ষা দিতে পার। ১৩৭
মোটকথা, তিনি বিভিন্ন ইসলামী শহর-নগরে বহু শিক্ষক ও মুবাল্লিগ পাঠিয়েছিলেন। তারা সেখানে গিয়ে বিখ্যাত-সব মাদরাসার ভিত্তি স্থাপন করেন। এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা ইতিপূর্বে করা হয়েছে।
নামায কায়েম : উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু তার গভর্নরদের উদ্দেশে পাঠানো পত্রে লিখতেন,
আমার নিকট তোমাদের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, নামায প্রতিষ্ঠা করা। যে-ব্যক্তি নামাযের পাবন্দি করবে এবং অন্যদেরও করাবে, সে তার দ্বীন হেফাজত করল। আর যে লোক নামায ছেড়ে দিল, সে অন্যান্য দ্বীনী ব্যাপারে অনীহা ও উদাসীনতা দেখাবে। ১৩৮
এমনিভাবে তিনি গভর্নরদের সাধারণ মানুষের ইমামতি করার তাগিদ দিতেন। তাদের বলতেন,
আমি তোমাকে এ জন্য গভর্নর বানাচ্ছি, যাতে তুমি মানুষদের নামায পড়াও এবং তাদের শরিয়তের ইলম ও কুরআন শিক্ষা দাও। ১৩৯
পাশাপাশি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব নির্দেশনা প্রদান করতেন, তার মধ্যে এটাও ছিল যে অমুকে নামাযের ইমামতি করবে আর অমুকে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেবে। এই নির্দেশনার আলোকে আম্মার ইবনে ইয়াসার রাযিয়াল্লাহু আনহুর দায়িত্ব ছিল নামাযের ইমামতি আর যুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদান। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বিচার ও বায়তুল মালের প্রধান নিযুক্ত করা হয়েছিল। ১৪০
যে-সকল ফকিহ ইসলামী রাজনীতি বিষয়ে কিতাব রচনা করেছেন, তারা আমিরদের নামাযের ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। নামাযের পাবন্দির দ্বীন-দুনিয়ার সুফল ও উপকারিতা প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন। ১৪১
দ্বীন এবং তার মৌলিক বিষয়াবলির হেফাজত : উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলামের মূল বিষয়সমূহ যেভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতীর্ণ হয়েছে, ঠিক সেভাবে তার হেফাজত ও সংরক্ষণের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী ও যত্নবান ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত পুনরুজ্জীবিতকরণ ও এর ওপর আমল এবং বিদআতের মূলোৎপাটন ও আল্লাহর দ্বীনের সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে পূর্ণরূপে চেষ্টা-মেহনত করতেন। একবার একলোক কুরআন মাজীদের অস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থবোধক আয়াতের ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয় প্রকাশ করত। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে দেশান্তর করার নির্দেশ দেন। ১৪২ ইতিপূর্বে এ-ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
শরীয়তের মৌলিক নীতিমালা রক্ষা করার জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বত্র রমযান মাসে জামাতের সঙ্গে তারাবির নামায পড়ার সাধারণ ঘোষণা জারি করেন। ১৪৩
একবার আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুর নামে এক পত্রে তিনি লেখেন:
শুনলাম তোমার ওখানকার কিছু লোক 'ইয়া আলে যাব্বা' তথা যাব্বার দোহাই দিয়ে জাহিলি যুগের লোকেদের মতো ডাকাডাকি করে। আমার চিঠি পাওয়ার পর তাদের বড়ধরনের আর্থিক জরিমানা করবে। কঠিন দৈহিক শাস্তি দেবে। এতে তারা সহীহ বুঝ না-পেলেও অন্তত ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে এ-ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকবে। ১৪৪
মসজিদ নির্মাণ: বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে কেবল আরব উপদ্বীপের বিভিন্ন শহরে প্রায় ৪ হাজার মসজিদ নির্মাণ করা হয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর গভর্নররাও তাদের শাসনাধীন বিভিন্ন এলাকায় মসজিদ নির্মাণ করেন। যেমন: ইয়াজ ইবনে গানাম রাযিয়াল্লাহু আনহু আলজাজিরার বিভিন্ন এলাকায় বহুসংখ্যক মসজিদ নির্মাণ করেন।
হজ পালনের ব্যবস্থাপনা সহজ-সাধ্য করা: খেলাফতে রাশেদার যুগের সকল গভর্নর নিজ নিজ প্রদেশে এ-বিষয়ের দায়িত্বশীল ছিলেন যে তারা হাজি সাহেবদের জন্য হজের ব্যবস্থাপনা সহজ করবেন এবং তাদের জন্য হজের সমস্ত কাজ পরিপালনের বিষয়টি নিশ্চিত করবেন। তাই তারা হজ-কাফেলাগুলোর জন্য আমির নিযুক্ত করতেন। তাদের সফরের সময় নির্দিষ্ট করে দিতেন। যার ফলে হাজি সাহেবগণ গভর্নরদের অনুমোদনের পরেই কেবল শহর থেকে বের হতে পারতেন। পরবর্তী সময়ে ফকিহগণ গভর্নরদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের মধ্যে এ-বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করেছেন যে তাদের জন্য হাজি সাহেবদের গমনাগমনসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা আবশ্যক। আল্লামা মাওয়ারদির উক্তি হলো, হাজি সাহেবদের নিজ নিজ তত্ত্বাবধানে রওনা করানো এবং তাদের দেখাশোনা করা গভর্নরদের দায়িত্বের আওতায় পড়ে। কারণ, এটা জনকল্যাণের একটি অংশ। ১৪৫
শরয়ি হদ বা দণ্ডবিধি কার্যকর: মিসরের গভর্নর আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু মিসরে উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর এক ছেলের ওপর শরয়ি দণ্ড কার্যকর করেন। তারপর খোদ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুও তাকে দোররা মেরে শাস্তি প্রদান করেন। বর্ণিত আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই শাস্তির কিছুদিন পরে তার সেই ছেলের মৃত্যু হয়। ১৪৬
খেলাফতের প্রথম দিকে গভর্নরদের এই অধিকার ছিল যে তারা খলিফার অনুমতি ছাড়াই কেসাস কার্যকর করতে পারতেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরদের জন্য এই মর্মে আদেশ জারি করেন যে আমার অনুমতি ছাড়া কারও ওপর কেসাসের হদ কার্যকর করবে না।১৪৭ এর পর থেকে গভর্নরগণ কেসাস কার্যকর করার পূর্বে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অনুমতি গ্রহণ করতেন। কেননা, শরয়ি দণ্ডবিধি প্রয়োগ দুনিয়া ও আখেরাত—উভয়ের সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট। এ-কারণে তারা দ্বীনের অন্যান্য বিষয়ের প্রতি যেভাবে গুরুত্ব প্রদান করতেন, এ ক্ষেত্রেও তারা সমান গুরুত্ব প্রদান করতেন। ১৪৮

২.৪.২। জনসাধারণের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
প্রদেশজুড়ে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা গভর্নরদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তারা একে সুদৃঢ় ও নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন মাধ্যম অবলম্বন করবেন। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অপরাধী, ফাসেক ও ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীদের ওপর তাদের কৃতকর্মের জন্য শরয়ি দণ্ডবিধি কার্যকর করা, যাতে সাধারণ মানুষের জীবনমান ও ধনসম্পদ বিনষ্টকারী অপরাধের মূল উপড়ে ফেলা যায়। ১৪৯
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে এক পত্রে লেখেন :
ফাসেক ও অপরাধীদের ভয় ও আতঙ্কের মধ্যে রাখবে। তাদের এক হাত এক পা কেটে শাস্তি দেবে। ১৫০
এ কথা স্পষ্ট যে ইসলামী রাষ্ট্র ও শহর-নগরে শান্তি ও নিরাপত্তা বহাল রাখার ক্ষেত্রে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদের ফরয বিধান অব্যাহত রাখার অনেক বড় প্রভাব ও অবদান রয়েছে। ১৫১

২.৪.৩। আল্লাহর পথে জিহাদ
আমরা যদি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালের সূচনাকাল থেকে নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকাল পর্যন্ত সময়কার আমির ও গভর্নরদের প্রতি হালকাভাবে দৃষ্টি বুলাই, তাহলে বিভিন্ন অঞ্চল বিজয়ের ক্ষেত্রে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কীর্তি ও অবদান সুস্পষ্টরূপে দেখতে পাব। অধিকন্তু যেসব অঞ্চল সে-সময় পর্যন্ত বিজিত হয়নি, সেখানকার লোকেরা তাদের বাহিনীর কমান্ডারদের সেই দিকে মনোযোগ আকৃষ্ট করার চেষ্টা করত। তারাও সেদিকে ছুটে যেতেন। এবং সেসব অঞ্চল জয় করতেন। তারপর তারা সেখানকার শৃঙ্খলা ও পুনর্গঠনে মনোযোগ দিতেন। এ ক্ষেত্রে শামদেশীয় মুসলিম বাহিনীর প্রধান আবু উবাইদাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু, আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু, ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং শুরাহবিল ইবনে হাসানা রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে ছিলেন ইরাক অঞ্চলীয় বাহিনীর প্রধান মুসান্না ইবনে হারিসা রাযিয়াল্লাহু আনহু, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু, ইয়াজ ইবনে গানাম রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রমুখ। ১৫২
খুলাফায়ে রাশেদিনের সময়কার গভর্নরদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, তারা তাদের রাজ্যের পুনর্গঠন ও ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি শত্রুর বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন যুদ্ধাভিযানেও একজন বাহাদুর মুজাহিদের ন্যায় অংশগ্রহণ করতেন। প্রাদেশিক অন্যান্য দায়িত্ব ও কর্তব্য তাদের যুদ্ধযাত্রার পথে মোটেই অন্তরায় হতো না। মুজাহিদদের তৎপরতা ও কার্যক্রম আরও বেগবান করার জন্য গভর্নরদের যেসব কীর্তি ও অবদান ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে, সেরকম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিচে উল্লেখ করা হলো।
যুদ্ধক্ষেত্রে সাহায্যকারী বাহিনী পাঠানো: এই সাহায্যকারী বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ যেসব কাজ আনজাম দিয়ে থাকে, তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো।
রাজ্যের পক্ষ হতে শত্রুদের প্রতিহত করা: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমার দায়িত্ব হলো তোমাদের সীমান্ত নিরাপদ রাখা। শহর-নগরে দুর্গ নির্মাণ করা: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মিসরের জিজা নগরীতে আগমনকারী বিজয়ীদের সেখানে দুর্গ নির্মাণ করার আদেশ দিয়েছিলেন, যাতে শত্রুর অতর্কিত আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব হয়। ১৫৩
শত্রুর গতিবিধির প্রতি লক্ষ রাখা: আবু উবাইদাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে প্রসিদ্ধ আছে, শামের বিভিন্ন শহরে রোমান বাহিনীর গোপন সৈন্যসমাবেশ ঘটাবার ব্যাপারে তিনি সতর্ক থাকতেন। সব সময় তিনি তাদের গতিবিধির প্রতি দৃষ্টি রাখতেন। গোপন খবরের ভিত্তিতে তিনি শত্রুসেনাদের চমকে দেওয়ার জন্য পরকল্পিতভাবে সেনাদলকে পশ্চাৎপদ হতে বলতেন। ১৫৪
ইসলামী শহরগুলোতে জঙ্গি ঘোড়া সরবরাহ করা : ইসলামী শহরগুলোতে জিহাদের জন্য তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী জঙ্গি ঘোড়ার সরবরাহ-ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে সমগ্র রাজ্যে একটি সাধারণ রীতি জারি ছিল। এই নীতি বাস্তবায়ন করার জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বসরার কিছু লোকের জন্য জমিজমার ব্যবস্থা করে দেন, যাতে তারা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ঘোড়া লালনপালন করতে পারে এবং সেগুলোকে যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষিত করে তুলতে পারে।১৫৫
শিশুদের শিক্ষা এবং তাদের জিহাদের জন্য তৈরি করা : উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে লোকদের নিকট চিঠি প্রেরণ করেন। তাতে তাদের ছেলেমেয়েদের অশ্ব পরিচালনা, সাতার এবং তির নিক্ষেপের প্রশিক্ষণ দিতে নির্দেশ জারি করেন। সিরিয়াতে এক বালক প্রশিক্ষণের সময় তীরের আঘাতে আহত হয় এবং মৃত্যুবরণ করে। লোকেরা এ বিষয়ে খলীফাকে অবহিত করলেও তার এই নির্দেশের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ১৫৬
সৈনিকদের নথিপত্র পর্যবেক্ষণ: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈনিকদের জিহাদে অংশ্রগহণ সংক্রান্ত নথিপত্র সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি মনে করতেন, শত্রুসীমানার নিকটবর্তী এলাকায় এই নথিপত্র সংরক্ষণ খুবই জরুরি। কারণ, এসব এলাকার সৈনিকদের প্রতিনিয়ত জিহাদে শরীক হতে হতো। ১৫৭
সামরিক নথিপত্র সংরক্ষণে ব্যক্তিগতভাবে গভর্নরগণ সরাসরি দায়বদ্ধ ছিলেন, যদিও এ বিষয় দেখভাল করার জন্য আলাদা লোক নিযুক্ত ছিল। গভর্নরগণ যেহেতু একই সাথে সামরিক কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করতেন, এ জন্য তারা খলীফার প্রতিনিধি হিসাবে এসব নথিপত্র সংরক্ষণে দায়ী ছিলেন। ১৫৮
চুক্তি সম্পাদন : সিরিয়ার কিছু অঞ্চলের সঙ্গে আবু উবাইদা ইবনুল জাররা রাযিয়াল্লাহু আনহুর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়; একই ঘটনা ইরাকের গভর্নরদের বেলায়ও সংঘটিত হয়, যেমন: সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু, আবু মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আরও অনেকে। এতৎসঙ্গে গভর্নরগণ যিম্মিদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অধিকার রক্ষা এবং শরীয়ত অনুযায়ী চুক্তি বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রেও দায়বদ্ধ ছিলেন। ১৫৯ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যিম্মিদের অধিকার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করেন এবং বলেন, 'আমি তোমাদের ওইসব লোকদের যত্ন নিতে বলি, যারা আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিরাপত্তায় রয়েছে। তাদের শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা তোমাদের নৈতিক দায়িত্ব এবং তাদের ওপর সাধ্যের অতীত বোঝা আরোপ করবে না। ১৬০

২.৪.৪। জনগণের ভাতাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে কঠোর পরিশ্রম
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'যদি আমি হায়াত পাই, তাহলে আমার মৃত্যুর পর ইরাকের বিধবাদের কারও নিকট মুখাপেক্ষী করে যাব না।' রমাদাহর বছরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আচরণ ভুলে গেলে চলবে না যখন চারিদিকে দুর্ভিক্ষ প্রকট আকার ধারণ করেছিল। তিনি রাষ্ট্রের সকল সম্পদ যথাযথভাবে বণ্টন করে দুর্ভিক্ষ কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করেন এবং ক্ষুধার্তদের অন্ন সরবরাহ করেন। বাইহাকী তার সুনান কিতাবে বর্ণনা করেন, আর-রামাদাহর দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষদের পেছনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খরচ করতে থাকেন যতদিন না বৃষ্টি হয় এবং তারা মদীনা থেকে স্বদেশে ফিরে যেতে থাকে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের সঙ্গে বের হন। এ-সময় তিনি ঘোড়ায় চড়ে তাদের চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। বনু মুহারিব ইবনে খাসফাহ গোত্রের একজন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রশংসা করে বলে উঠল, 'আমি সাক্ষী দিচ্ছি, আপনি এখন দায়ভার মুক্ত এবং আপনি কোনো কৃতদাসীর সন্তান নন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে জবাবে বলেন, 'তোমার জন্য দুর্ভোগ, আমি তোমার এই প্রশংসা গ্রহণ করতাম যদি আমি এ কাজে আমার নিজের অথবা আল-খাত্তাবের সম্পদ ব্যয় করতাম। কিন্তু আমি তো আল্লাহর সম্পদ ব্যয় করেছি। ১৬১ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আরও বলেন, 'আমার ওপর তোমাদের এই অধিকার যে, আমি তোমাদের নিকট থেকে কোনো ট্যাক্স আদায় করব না এবং সঠিক পদ্ধতির বাইরে আল্লাহ তোমাদের যে যুদ্ধলব্ধ গনীমত (ফায়) দিয়েছেন তা থেকে কিছুই নেব না। আমার ওপর তোমাদের এই অধিকার যে, আমি যদি তোমাদের নিকট থেকে কিছু আদায় করি, তাহলে সঠিক পদ্ধতি ছাড়া সেগুলো ব্যয় করব না। আমার ওপর তোমাদের এই অধিকার যে, আমি তোমাদের ভাতা এবং রসদ সরবরাহ ইনশাআল্লাহ বৃদ্ধি করেই যাব।’১৬২
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে সাংগঠনিকভাবেই প্রতিনিয়ত জনগণের ভাতা বণ্টন করা হতো। এটি কেবল লোকালয়ের বসতিদের জন্যই প্রযোজ্য ছিল না; বরং তিনি দূর মরুভূমিতে বসবাসরত বিভিন্ন গোত্রের লোকদেরও ভাতা প্রদান করতেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনার নিকটবর্তী গোত্রের নিকট গমন করতেন এবং নিজেই তাদের ভাতা বণ্টন করে দিতেন। আবার তিনি তার গভর্নরদের কয়েকজনকে চিঠি লিখে ভাতা ও রসদ বণ্টনের নির্দেশ দিতেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চিঠিতে উল্লেখ করতেন যে, এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য নির্ধারিত গনীমতের সম্পদ; এগুলো উমর কিংবা তার পরিবারের জন্য নয়। সুতরাং এগুলো লোকদের মধ্যে বণ্টন করে দাও। ১৬৩
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকদের প্রাপ্য বণ্টন করেই ক্ষান্ত হতেন না; বরং তিনি নিশ্চিত হতেন যে, তারা যথেষ্ট পরিমাণ খাদ্য-দ্রব্য লাভ করেছে। সিরিয়া সফরের সময় তার নিকট বিলাল ইবনে রাবাহ এসে বলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর কসম, সিরিয়ায় সামরিক বাহিনীর কমান্ডারগণ পাখির গোশত আর মসৃণ রুটি ছাড়া অন্য কিছু ভক্ষণ করে না। অথচ সাধারণ জনগণ এসব কিছুই পায় না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করেন, 'বিলাল যা বলছে তা কি সত্য?' ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান বলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, এ দেশে খাদ্য-দ্রব্যের দাম কম এবং বিলাল যেসব খাদ্যেও কথা বলেছে, সেগুলো আমাদের পরিবারের খরচ নির্বাহের জন্য যা দেওয়া হয়, তা দিয়ে সেগুলো কেনা সম্ভব।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, প্রতিমাসে মুসলমানদের রসদ সরবরাহের নিশ্চয়তা না দেওয়া পর্যন্ত আমি এখান থেকে যাব না।' তারপর তিনি বললেন, 'দেখো তো তার পছন্দের খাদ্য-দ্রব্য কিনতে কত প্রয়োজন।' তারা বলল, 'প্রতিমাসের শুরুতে দুই সা' পরিমাণে গম এবং এর সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে যয়তুন ও সিরকা।' সুতরাং তারা খলীফাকে এ পরিমাণ ভাতা ও রসদ প্রদানের নিশ্চয়তা প্রদান করে। তারপর তিনি বলেন, 'হে মুসলিম লোকসকল, এটি তোমাদের প্রাপ্ত ভাতার অতিরিক্ত। আমি যা বরাদ্দ দিয়েছি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যদি প্রতিমাসে তা তোমাদের প্রদান করে, তাহলে ভালো এবং আমি তা-ই চাই। আর যদি তারা তা না করে, তাহলে আমাকে অবহিত করবে। আমি তাদের পরিবর্তে অন্য কাউকে দায়িত্বে নিয়োজিত করব। ১১৬৪
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রত্যেক প্রদেশে খাদ্য-দ্রব্যের সরবরাহও নিশ্চিত করতেন। বাজার-দর পর্যবেক্ষণ ও শস্য মজুদ করে রাখতে নিষেধ করতেন। তার গভর্নরগণও নিয়মিত বাজার-দর পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন দেশ সফর করে মুসলমানদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি স্থানীয় বাজারে সহজলভ্য করার তাগিদ দিতেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং তার গভর্নরগণ নিশ্চিত খাদ্য-দ্রব্য সরবরাহ এবং বাজার-দর পর্যবেক্ষণ করেই ক্ষান্ত হতেন না; বরং বসবাসের জন্য বাড়ি-ঘর নির্মাণ ও তা বণ্টনের দায়িত্ব প্রতিটি শহর ও লোকালয়ে গভর্নরদের ওপরই ন্যস্ত ছিল। যখনই কোনো নতুন শহরের গোড়াপত্তন করা হতো, তিনি সেখানে লোকদের বসবাসের জন্য ভূমি বণ্টন করে দিতেন। কুফা, বসরা এবং ফুস্তাতে এমনই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। হিমস, দামেস্ক, আলেকজান্দ্রিয়া ইত্যাদি বিজিত এলাকায় অধিকৃত বাড়ি-ঘর বণ্টনেও গভর্নরগণ দেখভাল করতেন। ১৬৫

২.৪.৫। সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ
গভর্নরদের আরেকটি অন্যতম দায়িত্ব ছিল সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ দায়িত্ব তাদের ওপরই অর্পণ করা হতো। ১৬৪ ফুতুহুশ শাম, আল-আজদি, পৃ. ২৫৭; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৭৮; ১৬৫ ফুতুহুল বুলদান, বালাযুরি, পৃ. ১৪৩, ২২৪। একটি প্রদেশ সাধারণত একটি রাজধানী, অন্যান্য শহর ও এলাকা নিয়ে গঠিত হতো। এ জন্য প্রদেশজুড়ে সরকারি কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা জরুরি ছিল। এ জন্য গভর্নরগণ তাদের প্রতিনিধি হিসাবে সেসব এলাকায় সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিযুক্ত করতেন। তারা স্থানীয় নেতা কিংবা রাজস্ব আদায়কারী হিসাবে কাজ করত। এ ধরনের নিয়োগ সাধারণত খলীফা ও গভর্নরদের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতেই সম্পন্ন হতো।১৬৬

২.৪.৬। যিম্মিদের নিরাপত্তা
যিম্মিদের দেখভাল করা, তাদের সঙ্গে কৃত চুক্তির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন, শরীয়ত অনুযায়ী তাদের অধিকার নিশ্চিত করা, মুসলমানদের প্রতি যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করা, তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ, তাদের ওপর অন্যায়-অবিচার সংঘটিত হলে শরীয়ত অনুযায়ী এর প্রতিকার করা—এসবই ছিল গভর্নরদের দায়িত্ব। খলীফাগণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে যিম্মিদের সঙ্গে কোনো চুক্তি করার আগে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু শর্তারোপ করতেন। তারপর তারা তার নিশ্চয়তা দিতেন এবং তাদের সেগুলো অনুসরণ করার নির্দেশ দিতেন।১৬৭

২.৪.৭। বিজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করা এবং সমাজের প্রসিদ্ধ লোকদের সম্মান করা
ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত বিজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন। গভর্নরগণ এ মূলনীতি মেনে চলতেন এবং যখনই কোনো পরামর্শের প্রয়োজন হতো, তখন বিজ্ঞদের ডেকে পরামর্শ-সভার আয়োজন করতেন। তিনি তার গভর্নরদের প্রতিনিয়ত বিজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ ১৬৮ এবং তাদের যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতেও নির্দেশ দিতেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এক চিঠিতে মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লেখেন, 'আমি জানতে পেরেছি যে, তুমি সকল শ্রেণির লোকদের তোমার কাছে আসার অনুমতি দাও। এই চিঠি তোমার হস্তগত হওয়ার পর থেকে কেবল সমাজের বিজ্ঞ লোক, কুরআনে পারদর্শী, ধার্মিক ও একনিষ্ঠ লোকদেরই প্রথমে আসতে দেবে। তারা তাদের নির্দিষ্ট আসন গ্রহণ করার পর সাধারণ জনগণকে আসার নির্দেশ দেবে।' তিনি আরও লেখেন, 'লোকজন সাধারণ তাদের সমস্যাদি সমাজের প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের নিকট উপস্থাপন করে থাকে। সুতরাং এসব ব্যক্তিদের সম্মান করবে। এতে সমাজের দুর্বল মুসলমানদের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ ও সম্পদ বণ্টন করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে। ১৬৯

২.৪.৮। প্রদেশের উন্নতিতে অবদান
গভর্নর থাকাকালীন সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু কয়েকজন পার্সিয়ান নেতার অনুরোধে কৃষকদের সুবিধার্থে একটি খাল খনন করেন। ১৭০ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বসরার লোকদের জন্য অনুরূপ একটি খাল খনন করার জন্য আবু মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নির্দেশ দেন। আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু বসরার অধিবাসীদের পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে চার ফারসাখ ১৭১ দীর্ঘ একটি খাল খনন করেন। ১৭২ কুফা, বসরা ও ফুস্তাতে শহরের গোড়াপত্তনের আগে গভর্নরগণ শহরের রাস্তা-ঘাট, ভূমির সঠিক বণ্টন, মসজিদ নির্মাণ, পানির সরবরাহ এবং অন্যান্য সামাজিক অবকাঠামো নির্মাণের ব্যাপারে গুরুত্ব দেন। শত্রুর নিকটবর্তী অঞ্চল কিংবা অন্য কোনো কারণে এসব এলাকায় বসতি তোলার ক্ষেত্রে লোকজনের তেমন আগ্রহ ছিল না। গভর্নরগণ লোকদের এ ব্যাপারে উৎসাহিত করতে থাকেন। এ জন্য তাদের ভাতা ও জমি বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু আনতাকিয়া ও মেসোপটমিয়ার কিছু অঞ্চলে লোকজনের আবাস গড়ে তুলতে অনুরূপ প্রতিশ্রুতি দেন।

২.৪.৯। প্রদেশের সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রতি গুরুত্বারোপ
প্রদেশ থেকে কোনো প্রতিনিধিদল মদীনায় এলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের গভর্নরও সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন এবং তারা তাদের ভালো ছাড়া মন্দ কিছু বলত না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন সুনির্দিষ্টভাবে জিজ্ঞাসা করতেন, তিনি কি অসুস্থদের দেখতে যান? তারা বলত, হ্যাঁ। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করতেন, কোনো দাস-দাসী অসুস্থ হলে তিনি কি তাদের দেখতে যান? এবং তারা জবাবে হ্যাঁ বলত। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবার জিজ্ঞাসা করতেন, তিনি দুর্বলদের সঙ্গে কেমন আচরণ করেন? তারা কি তার বাড়িতে প্রবেশের অনুমতির জন্য অপেক্ষায় থাকে? এসব প্রশ্নের কোনো একটিতে তারা না-বোধক জবাব দিলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি ওই গভর্নরকে বরখাস্ত করতেন। ১৭৩ যদি কোনো গভর্নর অসুস্থদের দেখতে না যান কিংবা দুর্বলদের গুরুত্ব না দেন—এটা জানতে পারলেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ওইসব গভর্নরকে পদচ্যুত করতেন। ১৭৪ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এটাও চাইতেন যে, তার নিযুক্ত গভর্নরগণ জনগণের প্রতি বিনয়ী হবে যাতে লোকজন তাকে তাদের মতোই একজন মনে করে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আশা করতেন, তার গভর্নরগণ দেশের সাধারণ জনগণের মতোই বাহন ব্যবহার করবে এবং একই পোশাক পরিধান করবে। তিনি তাদের বাড়িতে দারোয়ান কিংবা প্রহরী নিযুক্ত করতে নিষেধ করতেন। ১৭৫

২.৪.১০। আরব-অনারবের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণ
গভর্নরগণ তাদের অধীন সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে ন্যায়সংগত আচরণ করতে বাধ্য ছিলেন। আরব এবং অনারব মুসলমানদের মধ্যে বৈষম্যমূলক কোনো আচরণ করার সুযোগ ছিল না। একবার কিছু লোক উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এক গভর্নরের নিকট এলে গভর্নরও আরব মুসলমানদের হাদিয়া-তোহফা প্রদান করেন। কিন্তু অনারব মুসলমানদের কিছুই দেননি। এ সংবাদ পেয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে লিখে পাঠান, 'এটা খুবই ঘৃণিত কাজ যে, কেউ তার মুসলিম ভাইদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে।' আরেক বর্ণনায় আছে, তিনি লেখেন, 'তুমি কেন তাদের সাথে একই আচরণ করোনি? ১৭৬
ইসলামে এমন আরও অনেক মানবিক দায়িত্ব রয়েছে। যেমন : চুক্তি বাস্তবায়ন করা, দায়িত্বসচেতন হওয়া, প্রতিমুহূর্তে আল্লাহকে স্মরণ রাখা যে, তিনি সবকিছু দেখছেন, ভালো ও ন্যায়সংগত কাজে অন্যকে সহায়তা করা, আল্লাহ, তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং মুসলিম ও সমাজের নেতৃবৃন্দের প্রতি অনুগত ও নিষ্ঠাবান থাকা—এগুলোতে সবার জন্যই উপকার নিহিত রয়েছে। ১৭৭ ব্যক্তিগতভাবে এসব অনুসরণ করার পরেও গভর্নরগণ নিজ নিজ প্রদেশে খুতবা, লেখা ও বক্তৃতার মাধ্যমে তা প্রচার-প্রসার করার দায়িত্বও পালন করতেন। খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে গভর্নরগণ এসব মানবিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সকলের নমুনা ও আদর্শ ছিলেন—ব্যক্তিগতভাবেও এবং পারস্পরিক আচার-আচরণের ক্ষেত্রেও। ১৭৮

টিকাঃ
১৩৪ ইলামুল মুয়াক্বিয়ীন, ২/২৪৮।
১৩৫ সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/২৪৭।
১৩৬ আসসিয়াসাতুশ শারইয়্যাহ, ১৫০।
১৩৭ আলমাওয়ারদিকৃত নাসিহাতুল মুলুক, ৭২; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৬৫।
১৩৮ আততারিকাতুল হাকামিয়‍্যা, ২৪০; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৬৭।
১৩৯ নাসিহাতুল মুলুক, ৭২।
১৪০ আলআহকামুস সুলতানিয়‍্যা, ৩৩।
১৪১ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৬৭।
১৪২ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৬৮।
১৪৩ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৬৮।
১৪৪ মাওসুআতু ফিকহি উমর ইবনুল খাত্তাব, ১২৩।
১৪৫ আলআহকামুস সুলতানিয়‍্যা, ৩৩।
১৪৬ ইবনুল জাওযিকৃত মানাকিবু উমর ইবনুল খাত্তাব, ২৪০, ২৪২।
১৪৭ আলওয়াসাইকুস সিয়াসিয়‍্যাতি লিল আহদিন নাববি ওয়াল খিলাফাতির রাশিদা, ৫২১।
১৪৮ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৭০।
১৪৯ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৭০।
১৫০ উয়ুনুল আখবার, ১/১১।
১৫১ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৭১।
১৫২ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৭১।
১৫৩ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৭৭।
১৫৪ ইবনে আসাম, আলফুতুহ, ২১০।
১৫৫ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৭৪।
১৫৬ আল-ওয়াসাইকুস সিয়াসিয়া লিল আহদিন নববী ওয়াল খিলাফাতির রাশিদাহ, পৃ. ৪৮৬।
১৫৭ আন-নাযমুল ইসলামিয়া, সুবহি আস-সালিহ, পৃ. ৪৮৮, ৪৯১।
১৫৮ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৭৭।
১৫৯ প্রাগুক্ত, ২/৭৭।
১৬০ মাওসুআতু ফিকহি উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ১৩৩।
১৬১ সুনান, বায়হাকি, ৬/৩৫৭; মাওসুআতু ফিকহি উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ১৩৫।
১৬২ মাওসুআতু ফিকহি উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ১৩৭।
১৬৩ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৭৭।
১৬৬ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৭৯;
১৬৭ প্রাগুক্ত, ২/৮০;
১৬৮ প্রাগুক্ত।
১৬৯ নাসিহাতুল মুলুক, আল-মাওয়ারদি, পৃ. ২০৭; মাওসুআতু ফিকহি উমর, পৃ. ১৩৪।
১৭০ ফুতুহুল বুলদান, বালাযুরি, পৃ. ২৭৩; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৮৭।
১৭১ এক ফারসাখ = তিন মাইল।
১৭২ ফুতুহুল বুলদান, বালাযুরি, পৃ. ৩৫১, ৩৫২।
১৭৩ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৮২।
১৭৪ প্রাগুক্ত।
১৭৫ প্রাগুক্ত।
১৭৬ আল-ওয়াসাইকুস সিয়াসিয়া লিল আহদিন নববী ওয়াল খিলাফাতির রাশিদাহ, পৃ. ৫২৩।
১৭৭ আন-নাজরিয়াতুস সিয়াসিয়াতুল ইসলামিয়া, মুহাম্মাদ দিয়ার রিস, পৃ. ৩০৭-৩০৮।
১৭৮ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/৮৫।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 দোষত্রুটির প্রয়োজনীয়তা এবং গভর্নরদের কর্মপন্থা

📄 দোষত্রুটির প্রয়োজনীয়তা এবং গভর্নরদের কর্মপন্থা


২.৫.১। প্রদেশে দোভাষীর প্রয়োজনীয়তা
খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে গভর্নরদের সাহায্য করার একটি প্রক্রিয়া ছিল তাদের জন্য দোভাষী নিযুক্ত করা। অনেক ক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থেই এটি খুব প্রয়োজন হয়ে পড়ত। একবার উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইরাকের গভর্নরকে কয়েকজন পার্সিয়ান গোত্রপ্রধানকে মদীনা পাঠাতে বলেন, যাতে তাদের সঙ্গে খারাজের ব্যাপারে আলোচনা করা সম্ভব হয়। ইরাক থেকে এসব নেতৃবৃন্দের সঙ্গে একজন দোভাষীও প্রেরণ করা হয়। ১৭৯ বর্ণিত আছে, আল-মুগিরা ইবনে শু'বাহ সামান্য একটু পার্সিয়ান ভাষা রপ্ত করেছিলেন এবং তিনিই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ও হরমুযের মধ্যে কথোপকথন ভাষান্তরে সাহায্য করেন। ১৮০
খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে এবং এর পূর্বেও অনুবাদক ও দোভাষীদের খুব কদর ছিল। স্মৃতব্য যে, খারাজের নথিপত্রসমূহ আরবি ভাষায় লেখা হতো না। এ থেকে বোঝা যায়, অনুবাদ সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের প্রয়োজনীয়তা ছিল ব্যাপক। আর প্রশাসনে খারাজের বেশিরভাগ কর্মকর্তা ছিলেন পারসিক অথবা অনারব। ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে নওমুসলিমদের বিস্তৃতির কারণে বিচারকার্য ও অন্যান্য বিষয়ে দোভাষীদের প্রয়োজনীয়তা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে। অনুরূপভাবে মুসলিম সেনাপতিদের—যারা বেশিরভাগ গভর্নর ছিলেন—বিজিত অঞ্চলে লোকজনের সঙ্গে কথোপকথনে দোভাষী ছিল প্রধান মাধ্যম। ১৮১

২.৫.২। গভর্নরদের কর্মঘণ্টা
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কোনো কর্মঘণ্টা নির্ধারিত ছিল না। খলীফা এবং গভর্নরগণ দিন-রাত কাজ করতেন এবং তাদের বাড়ির দরজায় কোনো প্রহরী নিযুক্ত ছিল না। তাদের কেউ রাতে শহরে টহল দিতেন এবং এ ব্যাপারে তাদের জন্য নমুনা ছিলেন স্বয়ং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেই। তিনি মদীনায় রাতে হেঁটে হেঁটে টহল দেওয়ার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। লোকেরা বিভিন্ন সময় গভর্নরের সঙ্গে দেখা করতে আসত, তাকে তাদের প্রয়োজন মেটাতে অনুরোধ করত এবং অসময়েও তারা এ কাজে কোনো বাধার সম্মুখীন হতো না। গভর্নররা যেকোনো কাজ দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে খুবই পরিচিত ছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ ব্যাপারে আবু মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে এক চিঠিতে লেখেন, ‘আজকের কাজ আগামীকালের জন্য ফেলে রেখো না। এতে কাজ জমে যাবে এবং তুমি তোমার লক্ষ্যে উপনীত হতে ব্যর্থ হবে।’ ১৮২

টিকাঃ
১৭৯ আল-খারাজ, আবু ইউসুফ, পৃ. ৪০-৪১; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/১০৫।
১৮০ প্রাগুক্ত।
১৮১ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ২/১০৪।
১৮২ মানাকিবু আমীরুল মুমিনিন, ইবনে আল-জাওযি, পৃ. ১২৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00