📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 মাসলাইন

📄 মাসলাইন


মাদাইন ছিল কিসরার রাজধানী। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু এলাকাটি জয় করেছিলেন। দীর্ঘদিন তিনি সেখানে অবস্থান করেছিলেন। তারপর যখন কুফা নগরী প্রতিষ্ঠা লাভ করল, তিনি সেখানে চলে গেলেন। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে একটি মুজাহিদ বাহিনী ছিল। তাদের সঙ্গে সালমান ফারেসি রাযিয়াল্লাহু আনহুও ছিলেন। তিনি পারসিকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি যুদ্ধে বরাবর অংশগ্রহণ করেছিলেন। পারসিকদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পূর্বে তাদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার কাজে সালমান ফারেসি রাযিয়াল্লাহু আনহুর বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। উমর ইবনে খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে মাদাইনের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি সেখানে শান্তি-সুখে জীবনযাপন করতে থাকলেন। ইসলামের শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক জীবন্ত নমুনা।
বর্ণিত আছে, সালমান ফারেসি রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য রাজি ছিলেন না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে এই দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে একরকম বাধ্য করেন। তার পরেও তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট অব্যাহতি দেওয়ার জন্য বারবার আবেদন জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কোনো আবেদন গ্রহণ করেননি। সালমান ফারেসি রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অত্যন্ত দুনিয়াবিমুখ, আল্লাহওয়ালা মানুষ। তিনি সব সময় উলের পোশাক পরতেন। গাধার পিঠে আসন ছাড়াই বসতেন। যবের মোটা রুটি খেতেন। অনেক ইবাদত করতেন। হারাম থেকে বেঁচে থাকতেন। ৬৮
সালমান ফারেসি রাযিয়াল্লাহু আনহু একজন গভর্নর হিসাবে মাদাইনে জীবনযাপন করতে থাকলেন। গ্রহণযোগ্য অভিমত অনুযায়ী ৩২ হিজরি-সনে উসমান ইবনে আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে তিনি ইনতিকাল করেন। সালমান রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের শেষ দিন পর্যন্ত গভর্নর-পদে বহাল থাকেননি। কেননা, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শেষ দিকে হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মাদাইনের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসবিদরা এ কথা কোথাও লেখেননি যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সালমান ফারেসি রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করেছিলেন। তার সম্ভাব্য কারণ হলো, সালমান রাযিয়াল্লাহু আনহু যেভাবে বারবার অব্যাহতি চাচ্ছিলেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কয়েকবার তার প্রত্যাখ্যান করার পর হয়তো একপর্যায়ে তার অব্যাহতিপত্র গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। তার পর হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সেখানকার গভর্নর বানিয়ে পাঠিয়েছিলেন।
মাদাইনে হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসন সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। তার একটি হলো, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মাদাইনের অধিবাসীদের নামে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি পত্র পাঠিয়ে তাদের অবগত করেছিলেন যে হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তাদের গভর্নর বানিয়ে পাঠানো হলো। মাদাইনবাসীদের উচিত হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহুর আনুগত্য ও অনুসরণ করা। তার পর থেকে হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এবং উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর পূর্ণ খেলাফতকাল পর্যন্ত সেখানকার গভর্নর- পদে বহাল ছিলেন। ৬৯

টিকাঃ
৬৮ মুরাওয়াজুয-যাহাব, ২/২০৬; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১৩১।
৬৯ সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/৩৬৪।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 আজারবাইযান

📄 আজারবাইযান


আজারবাইযানের প্রথম গভর্নর ছিলেন হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহু। তারপর যখন তাকে মাদাইনে বদলি করা হলো, তখন তার স্থলে উতবা ইবনে ফারকাদ সুলামি রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নর নিযুক্ত হলেন। উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মাঝে কয়েকবার পত্রমারফত মতবিনিময় হয়।
একবারের ঘটনা। উতবা ইবনে ফারকাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নর হয়ে আজারবাইযান পৌঁছলেন। তিনি লক্ষ করলেন সেখানকার লোকজন একধরনের উন্নত ও সুস্বাদু হালুয়া প্রস্তুত করে। স্থানীয় লোকেরা তাকে হুবাইস বলত। তিনি চিন্তা করলেন এই হালুয়া বানিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট পাঠানো উচিত। তারপর তিনি হালুয়া প্রস্তুত করালেন। এবং তারপর সেগুলোকে বাক্সবদ্ধ করে চামড়া দিয়ে মুখ আটকে দিয়ে মদীনায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট পাঠিয়ে দিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেগুলো গ্রহণ করলেন এবং তার স্বাদও চেখে দেখলেন। এই হালুয়া তিনি অত্যন্ত পছন্দ করলেন। তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হালুয়া বহনকারীকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'সেখানকার মুহাজিররা কি তৃপ্তিসহকারে এ-ধরনের হালুয়া খেতে পায়?' বাক্স বহনকারী নেতিবাচক জবাব দিলেন। আর বললেন, 'এগুলো কেবল আপনার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে।'
এ কথা শোনার পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আজারবাইযানে উতবা ইবনে ফারকাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট হালুয়াগুলো ফেরত পাঠালেন। তারপর উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সম্বোধন করে পত্র লিখলেন :
উতবা, তোমার পাঠানো উপহার তোমার আর তোমার বাবার কামাই না। সফরকালে তুমি যেই খাদ্য গ্রহণ করবে, সকল মুসলমানের জন্য সেই খাদ্যের বন্দোবস্ত করবে। আরাম-আয়েশ পরিহার করে চলবে। মুশরিকদের পোশাক পরবে না। রেশমি কাপড় থেকে দূরে থাকবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রেশমি কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন। ৭০
ঘটনাটি বিভিন্ন রেওয়ায়েতে বর্ণিত আছে। সেগুলো একটি অপরটির সমার্থক।
তার পর থেকে উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের বাকি দিনগুলো এবং উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের প্রথম দিকে আজারবাইজানের গভর্নর ছিলেন। এ ছাড়াও ইরাক ও পারস্যের বিভিন্ন অঞ্চলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিয়োগকৃত আরও একাধিক গভর্নর ছিল। কিছু গভর্নর এমনও ছিল, যারা নিজ নিজ প্রদেশে অনেকটা স্বাধীন ছিলেন। কিছু অঞ্চল ইরাকের দুই বড় শহর কুফা ও বসরার অধীন ছিল। কেননা, এই দুই প্রদেশ ছিল ইরাক ও পারস্যের আইন-শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার প্রধান কেন্দ্র। এই আলোচনায় উল্লেখিত প্রদেশগুলো ছাড়াও ছোট ছোট আরও কিছু প্রদেশ ছিল, যার জন্য আলাদা গভর্নর ছিল। যেমন: মসুল, হালওয়ান, কাসকার ইত্যাদি।

টিকাঃ
৭০ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১৩৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00