📄 বসরা
উমর ইবনে খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বসরা আবাদ ও আবাসযোগ্য হওয়ার পূর্বে সেখানে কুতাবা ইবনে কাতাদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাহায্যে সাদ ইবনে বকর গোত্রের শুরাইহ ইবনে আমের রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পাঠিয়েছিলেন। তারপর তাকেই বসরা ও তার আশপাশের গভর্নর নিযুক্ত করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কোনো এক জিহাদে শহিদ হয়েছিলেন।৫২
শুরাইহ ইবনে আমের রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাতের পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু উতবা ইবনে গাজওয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে একটি সেনাদলের সঙ্গে সেখানকার আমির নিযুক্ত করে পাঠালেন। এই ঘটনা ১৬ হিজরির নয়; বরং ১৪ হিজরি-সনের। সালেহ আহমদ আলি ১৪ হিজরির মতটি গ্রহণযোগ্য সাব্যস্ত করতে গিয়ে বলেন, 'কোনো কোনো ইতিহাসবিদের ধারণা উতবা ইবনে গাজওয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে কাদিসিয়া বা জালুলার যুদ্ধের পরে ১৬ হিজরি-সনে বসরা ও তার আশপাশের এলাকার গভর্নর বানিয়ে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু অধিকাংশ ইতিহাসবিদের বক্তব্য হলো, তাকে ১৪ হিজরি-সনে পাঠানো হয়েছিল। আর আমরা এ কারণেই অধিকাংশ ইতিহাসবিদের বক্তব্যটিই প্রাধান্য দিয়েছি।৫৩
বসরার জন্য উতবা ইবনে গাজওয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুর গভর্নর নিযুক্তি ও তার শাসনকালটি ছিল প্রকৃতপক্ষে বসরার প্রতিষ্ঠা এবং তার জীবনে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত করা। সেখানে তাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও কাজের মুখোমুখি হতে হয়। তার শাসনামলে দজলা-ফুরাতের উপকূলে পারস্যের কিছু এলাকার বিজয়লাভ ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ৫৪
একবার হজের সময় উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রশাসনিক দায়দায়িত্ব থেকে পদত্যাগপত্র জমা দিলেন। কিন্তু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করলেন না। তিনি বরং বললেন, 'আপনি এখন ফিরে যান। আর দায়িত্ব পালন করতে থাকুন।' তারপর উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহু ফিরে গেলেন ঠিক; কিন্তু বসরায় পৌঁছার পূর্বেই তিনি ইনতিকাল করলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট যখন তার ইনতিকালের সংবাদ পৌঁছল তখন তিনি বললেন, মৃত্যুর যদি নির্ধারিত সময় না থাকত (তবে আমি মনে করতাম), আমিই তাকে মেরে ফেলেছি। তারপর তিনি তার ব্যাপারে ভালো ভালো কথা বললেন। ১৭ হিজরি-সনে উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহু ইনতিকাল করেন। ৫৫
উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরে মুগিরা ইবনে শুবা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বসরার গভর্নর নিযুক্ত করা হলো। দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সর্বপ্রথম তিনি দিওয়ান বা রেজিস্টার চালু করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সুচারুরূপে দায়িত্ব পালন করে যান। কিন্তু ১৭ হিজরি-সনে একবার তার প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করা হয়। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে গভর্নরের পদ থেকে বরখাস্ত করেন। তারপর অপবাদের সত্যাসত্য তদন্ত করতে থাকেন। তদন্ত ও অনুসন্ধানের পর মুগিরা রাযিয়াল্লাহু আনহু নিরপরাধ প্রমাণিত হন। বিরুদ্ধবাদী তিন সাক্ষীর ওপর অপবাদের শাস্তি প্রয়োগ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সংশোধন ও সতর্কতামূলকভাবে মুগিরা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তার পদ থেকে অপসারণ করেছিলেন ঠিকই তবে পরবর্তী সময়ে তাকে অন্যত্র গভর্নর ও সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। ৫৬
মুগিরা ইবনে শুবা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বসরা থেকে সরিয়ে আনার পরে আবু মুসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করে পাঠান। উল্লেখ্য, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে যাদের বসরার গভর্নর নিয়োগ করা হয়েছিল, আবু মুসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের মধ্যে সর্বাধিক খ্যাতি ও প্রসিদ্ধি অর্জন করেন। তার শাসনামলে পারস্যের বহু এলাকা মুসলিমদের হাতে বিজিত হয়। অনেক সময় তিনি সরাসরি জিহাদে অংশগ্রহণ করতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন আঞ্চলিক অভিযানে তিনি বসরা থেকে সেনা-অফিসারদের পাঠাতেন। তার শাসনামলে আহওয়ায এবং তার আশপাশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বসরার মুজাহিদদের হাতে বিজিত হয়। তার আমলে মুসলিমরা জিহাদি চেতনায় উজ্জীবিত ছিল। বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি তার পার্শ্ববর্তী গভর্নরদের সহযোগিতা গ্রহণ করতেন। বিজিত এলাকার শৃঙ্খলাবিধান, গভর্নর নিয়োগ, বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকাণ্ড ও ব্যবস্থাপনা এবং সেখানকার লোকদের নিরাপত্তা প্রদানের ব্যাপারে তিনি অনেক পরিশ্রম করতেন। বহু বিষয়ে তার ও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মাঝে চিঠিপত্র আদানপ্রদান হতো। কোনো কোনো চিঠিতে তিনি আবু মুসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে এই নির্দেশনা প্রদান করেন যে আমিরদের মজলিসে তাদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে, কীভাবে তাদের খুশি রাখতে হবে। কোনো কোনো চিঠিতে তিনি তাকওয়া অবলম্বন এবং জনগণকে খুশি রাখার ব্যাপারে দিকনির্দেশনা প্রদান করতেন। তার প্রতিটি নির্দেশনাই ছিল অত্যন্ত মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ।
এক চিঠিতে তিনি লেখেন: 'হামদ ও সালাতের পর। মানুষের মধ্যে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যার প্রতি তার প্রজারা সন্তুষ্ট ও আস্থাশীল থাকে। আর সবচেয়ে হতভাগা সেই ব্যক্তি, যার প্রতি তার প্রজারা বিরক্ত ও অসন্তুষ্ট। তুমি নিজেকে ক্ষমতার মোহ থেকে দূরে রাখবে। অন্যথায় তোমার অধীন কর্মকর্তারা তোমার মতোই ক্ষমতার পেছনে দৌড়াতে থাকবে। তারপর তোমার দৃষ্টান্ত হয়ে যাবে এমন চতুষ্পদ প্রাণীর মতো, যেগুলো শ্যামল-সবুজ ঘাস-পাতা দেখলেই খেতে নেমে পড়ে। এভাবেই ওগুলো মোটাতাজা হয়ে ওঠে। অথচ এই হৃষ্টপুষ্টতাই তাদের মৃত্যু ডেকে আনে।'৫৭
উমর ফারুক রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আবু মুসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুর মাঝে এ-ধরনের আরও কিছু চিঠি আদানপ্রদান হয়েছিল। তাতে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপারে আবু মুসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়া হতো। সে সকল চিঠি ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ তার আলওয়াসাইকুস সিয়াসিয়্যাহ গ্রন্থে একত্র করেছেন। ৫৮
বসরায় আবু মুসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলকে সবচেয়ে উত্তম বিবেচনা করা হতো। তার কালের উন্নয়নের বর্ণনা দিতে গিয়ে হাসান বসরি রাহিমাহুল্লাহ স্পষ্টত বলেন, বসরাবাসীদের জন্য আবু মুসা রাযিয়াল্লাহু আনহুর চেয়ে বড় কল্যাণকামী কোনো আমির হতে পারে না। ৫৯
আবু মুসা রাযিয়াল্লাহু আনহুর সততা ও কর্মনিষ্ঠার এই স্বীকৃতি সম্পূর্ণই সত্য। কেননা, আবু মুসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বসরার প্রশাসনিক দায়িত্ব সম্পন্ন করার পাশাপাশি তিনি সেখানকার লোকদের কুরআন এবং দ্বীন শিক্ষা দিতেন।৬০
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে পারস্যের কয়েকটি বিজিত অঞ্চল বসরার অধীন ছিল। বসরার গভর্নরই সেসব স্থানে কর্মকর্তা- কর্মচারী নিয়োগ দিতেন। তারা সবাই বসরার আইন ও প্রশাসনের অনুগামী হয়ে থাকতেন। এভাবে আবু মুসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বিবেচিত হন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গভর্নর হিসাবে। এসব চিঠির মাধ্যমে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনের বিভিন্ন দিক এবং গভর্নরদের সঙ্গে তার আচরণ কীরূপ ছিল তা জানা যায়। ৬১
টিকাঃ
৫২ তারিখু খালিফা ইবনে খাইয়াত, ১৫৫।
৫৩ আততানযিমাতুল আজতিমাইয়্যাহ ওয়াল ইকতিসাদিয়্যাহ ফিল বাসরাহ, ৩৬।
৫৪ তারিখু খালিফা ইবনে খাইয়াত, ১২৭, ১২৮।
৫৫ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১১৫।
৫৬ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১১৫।
৫৭ ইবনুল জাওযিকৃত মানাকিবু উমর, ১৩০।
৫৮ গ্রন্থটির পূর্ণ নাম আলওয়াসাইকুস সিয়াসাতি লিল আসরিন নাববি ওয়াল খিলাফাতির রাশিদাহ। উর্দু ভাষায় মাওলানা তাকি আমিনি হযরত উমর ফারুক রাযিয়াল্লাহু আনহু কে স্যরকারি খুতুত নামে সংকলন করেন।
৫৯ সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/৩৮৯।
৬০ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১২০।
৬১ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১২০।
📄 কুফা
কুফা নগরী সম্পূর্ণ আবাদ ও বসবাসের উপযোগী হওয়ার পর সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু সেখানকার প্রথম গভর্নর নিযুক্ত হন। মূলত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রথম তিনিই কুফা নগরীর গোড়াপত্তন করেন। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু কুফা আবাদ করার পূর্ব থেকেই কুফা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর গভর্নর ছিলেন। অত্যন্ত সুন্দর সুচারুরূপে তিনি তার দায়িত্ব পালন করেন। গভর্নর হিসাবে তিনি কুফাকেই নিজের আবাসরূপে গ্রহণ করেন। তার পর থেকেই পারস্যের দিকে তার গুরুত্বপূর্ণ বিজয়ের ধারা শুরু হয়।
তিনি তার প্রাদেশিক অঞ্চলসমূহে কৃষি ও চাষাবাদের ক্ষেত্রে কিছু সংস্কার-কার্যক্রম গ্রহণ করেন। তার মধ্যে অন্যতম হলো, একবার একদল ভূমি-মালিক তাদের এলাকার কৃষকদের জন্য খাল খননের দাবি জানায়। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের খাল খননের নির্দেশ প্রদান করেন। তারপর এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র একত্র করা হয়। এবং তারপর খাল-খনন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। কুফার অধীন অঞ্চলসমূহে সামগ্রিক কার্যক্রম ও নিয়ম-শৃঙ্খলা তিনিই দেখাশোনা ও পর্যবেক্ষণ করতেন। উমর ইবনে খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিনিধি পাঠাতেন। কুফার জ্ঞানী ও বিচক্ষণ লোকেরা সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট ছিলেন। তারা তার সংস্কারধর্মী কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করতেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার কুফার একজন বিখ্যাত ও বিশিষ্ট ব্যক্তির নিকট সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সেই ব্যক্তি জবাব দিয়েছিলেন, 'খারাজ ইত্যাদি আদায়ের বেলায় তিনি বেশ বিনয়ী। বীরত্ব ও সাহসিকতার বেলায় তিনি একজন খালেস আরব। ভাব-গাম্ভীর্যের ক্ষেত্রে তিনি বাঘের মতো। বিবাদ-মীমাংসার ক্ষেত্রে তিনি ন্যায়-নিষ্ঠা বজায় রাখেন। বণ্টনের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করেন। বিভিন্ন অঞ্চলে সৈন্য প্রেরণ করেন। এবং তাদের সঙ্গে মহানুভব মায়ের মতো আচরণ করেন। আর আমাদের জন্য পিপীলিকার ন্যায় খাদ্য আহরণ করেন।
ফুতুহুল বুলদান, ১৩৯; তারিখুল ইয়াকুবি, ২/১৫১।
আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১২৩।
এমনিভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জারির ইবনে আবদুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর দায়িত্ব পালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। জারির রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাব দিলেন, 'আমি তাকে তার রাজ্যে এই অবস্থায় দেখে এসেছি যে তিনি যোগ্যতা ও শক্তিমত্তায় সবার ওপরে। জনগণের প্রতি তিনি সবচেয়ে কম কঠোরতা দেখান। তাদের সঙ্গে মমতাবান মায়ের মতো আচরণ করেন। পিপীলিকার ন্যায় খাবার সংগ্রহ করেন। শত্রুর মোকাবিলায় তিনি ভীষণ কঠোর। আর সাধারণ মানুষের চোখে তিনি কুরাইশের সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি। ৬৪
কুফার বিচক্ষণ ও বিশিষ্ট লোকদের নিকট তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও প্রশংসিত। এর পরেও কিছুলোক তার বিরুদ্ধে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট অভিযোগ দায়ের করে। যার ফলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বরখাস্ত করেন। ইনশাআল্লাহ সামনে 'গভর্নরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ' শিরোনামে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
কুফা থেকে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করার পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেখানকার ইমামতির দায়িত্ব পালন করার জন্য আম্মার ইবনে ইয়াসার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিযুক্ত করেন। উল্লেখ্য, আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর অধীন কুফার অন্যতম সামরিক কর্মকর্তা। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু তার দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন বিষয়ে তার সহযোগিতা গ্রহণ করতেন। এ জন্য তিনি গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বেই রাজ্য পরিচালনার ব্যাপারে বেশ দক্ষ ও অভিজ্ঞ হয়ে উঠতে পেরেছিলেন।
এখানে এ কথাও উল্লেখ করা দরকার যে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহুর রাজ্য পরিচালনা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনেক পার্থক্য ছিল। যেমন: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে কুফার গভর্নর নিযুক্ত করার 'পাশাপাশি আরও কিছুলোককে বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োগ দান করেন। আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নামাযের ইমামতির দায়িত্ব প্রদান করেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে প্রদান করেন সরকারি কোষাগারের দায়িত্ব। উসমান ইবনে হুনাইফ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ভূমি-ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রদান করেন (অথচ সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগে এই বিভাগগুলো মোটেই এভাবে ছিল না)। এ জন্য তাদের উভয়ের রাজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বিস্তর পার্থক্য লক্ষ করা যায়। অন্য কোনো প্রদেশে রাজ্য পরিচালনার এই নতুন ধারা আমরা দেখতে পাই না।
দায়িত্ব বণ্টন হওয়ার পর সকলেই যার যার দায়িত্ব পালন করতে লাগলেন। আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহু নামাযের ইমামতি শুরু করলেন। পাশাপাশি তিনি প্রাদেশিক ব্যবস্থাপনা এবং সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করেন। বিভিন্ন যুদ্ধাভিযানেও তিনি অংশগ্রহণ করতেন। তার সময়ে কুফাবাসীরা কয়েকবার পারসিক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এবং প্রতিবারই তারা জয়লাভ করে। এভাবেই আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী রাজ্যশাসন করতে লাগলেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সহযোগিতায় তিনি রাজ্যের অন্যান্য দায়িত্বও সুন্দর সুচারুরূপে আনজাম দিতে থাকলেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু অর্থ-ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানুষকে কুরআন ও ইসলামের শিক্ষাও প্রদান করতেন। ৬৫
কুফায় আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহুর গভর্নরের দায়িত্বকাল ছিল প্রায় এক বছর নয় মাস। তারপর আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে কুফাবাসীদের অভিযোগের ভিত্তিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে গভর্নরের দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করেন। এ-ব্যাপারে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'গভর্নরের পদ থেকে বরখাস্তের কারণে কি তোমার মন খারাপ হয়েছে?' আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাব দিলেন, 'আপনি যখন আমাকে গভর্নর নিয়োগ দিয়েছিলেন, তখন আমার কোনো খুশি লাগেনি। তবে যখন আমাকে বরখাস্ত করা হয়, তখন একটু খারাপ লেগেছিল।'
অন্য বর্ণনায় আছে, তিনি এভাবে জবাব দিয়েছিলেন, 'যখন আপনি আমাকে গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন, তখন যেমন আমার খুশি লাগেনি, তারপর যখন আমাকে বরখাস্ত করলেন তখনো আমার কোনো দুঃখ লাগেনি।'
কোনো কোনো ইতিহাসগ্রন্থে আছে, আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন বুঝতে পারলেন কুফার লোকজন তার শাসন পছন্দ করছে না তখন তিনি নিজে থেকেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট পদত্যাগপত্র জমা দিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুও তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করলেন। তিনি তাকে বরখাস্ত করেননি। ৬৬
আম্মার রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জুবাইর ইবনে মুতয়িম রাযিয়াল্লাহু আনহুকে কুফার গভর্নর নিযুক্ত করেন। কিন্তু তার কুফায় পৌঁছার পূর্বেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার এই আদেশ প্রত্যাহার করে নিলেন। কারণ, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেছিলেন গভর্নর নিয়োগের বিষয়টি আপনি এখনই কাউকে বলবেন না। কিন্তু তিনি এটা ফাঁস করে দিলেন। লোকজনের মাঝে যখন এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ভীষণ অসন্তুষ্ট হলেন। এবং এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিলেন। তারপর মুগিরা ইবনে শুবা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে কুফার গভর্নর নিযুক্ত করলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনিই সেখানকার গভর্নর ছিলেন। ৬৭
টিকাঃ
৬৪ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১২৩।
৬৫ আত-তাবাকাত, ৩/১০৫৭।
৬৬ নিহায়াতুল আরিব, ১৯/৩৬৮।
৬৭ তারিখ খালিফা, ১৫৫; তারিখ আত-তাবারি, ৫/২৩৯।
📄 মাসলাইন
মাদাইন ছিল কিসরার রাজধানী। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু এলাকাটি জয় করেছিলেন। দীর্ঘদিন তিনি সেখানে অবস্থান করেছিলেন। তারপর যখন কুফা নগরী প্রতিষ্ঠা লাভ করল, তিনি সেখানে চলে গেলেন। সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে একটি মুজাহিদ বাহিনী ছিল। তাদের সঙ্গে সালমান ফারেসি রাযিয়াল্লাহু আনহুও ছিলেন। তিনি পারসিকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি যুদ্ধে বরাবর অংশগ্রহণ করেছিলেন। পারসিকদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পূর্বে তাদের ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার কাজে সালমান ফারেসি রাযিয়াল্লাহু আনহুর বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। উমর ইবনে খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে মাদাইনের গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি সেখানে শান্তি-সুখে জীবনযাপন করতে থাকলেন। ইসলামের শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন এক জীবন্ত নমুনা।
বর্ণিত আছে, সালমান ফারেসি রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য রাজি ছিলেন না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে এই দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে একরকম বাধ্য করেন। তার পরেও তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট অব্যাহতি দেওয়ার জন্য বারবার আবেদন জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কোনো আবেদন গ্রহণ করেননি। সালমান ফারেসি রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অত্যন্ত দুনিয়াবিমুখ, আল্লাহওয়ালা মানুষ। তিনি সব সময় উলের পোশাক পরতেন। গাধার পিঠে আসন ছাড়াই বসতেন। যবের মোটা রুটি খেতেন। অনেক ইবাদত করতেন। হারাম থেকে বেঁচে থাকতেন। ৬৮
সালমান ফারেসি রাযিয়াল্লাহু আনহু একজন গভর্নর হিসাবে মাদাইনে জীবনযাপন করতে থাকলেন। গ্রহণযোগ্য অভিমত অনুযায়ী ৩২ হিজরি-সনে উসমান ইবনে আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে তিনি ইনতিকাল করেন। সালমান রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের শেষ দিন পর্যন্ত গভর্নর-পদে বহাল থাকেননি। কেননা, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শেষ দিকে হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মাদাইনের গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু ইতিহাসবিদরা এ কথা কোথাও লেখেননি যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সালমান ফারেসি রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করেছিলেন। তার সম্ভাব্য কারণ হলো, সালমান রাযিয়াল্লাহু আনহু যেভাবে বারবার অব্যাহতি চাচ্ছিলেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কয়েকবার তার প্রত্যাখ্যান করার পর হয়তো একপর্যায়ে তার অব্যাহতিপত্র গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। তার পর হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সেখানকার গভর্নর বানিয়ে পাঠিয়েছিলেন।
মাদাইনে হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসন সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। তার একটি হলো, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মাদাইনের অধিবাসীদের নামে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি পত্র পাঠিয়ে তাদের অবগত করেছিলেন যে হুযাইফা ইবনে ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তাদের গভর্নর বানিয়ে পাঠানো হলো। মাদাইনবাসীদের উচিত হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহুর আনুগত্য ও অনুসরণ করা। তার পর থেকে হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এবং উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর পূর্ণ খেলাফতকাল পর্যন্ত সেখানকার গভর্নর- পদে বহাল ছিলেন। ৬৯
টিকাঃ
৬৮ মুরাওয়াজুয-যাহাব, ২/২০৬; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১৩১।
৬৯ সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/৩৬৪।
📄 আজারবাইযান
আজারবাইযানের প্রথম গভর্নর ছিলেন হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহু। তারপর যখন তাকে মাদাইনে বদলি করা হলো, তখন তার স্থলে উতবা ইবনে ফারকাদ সুলামি রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নর নিযুক্ত হলেন। উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মাঝে কয়েকবার পত্রমারফত মতবিনিময় হয়।
একবারের ঘটনা। উতবা ইবনে ফারকাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নর হয়ে আজারবাইযান পৌঁছলেন। তিনি লক্ষ করলেন সেখানকার লোকজন একধরনের উন্নত ও সুস্বাদু হালুয়া প্রস্তুত করে। স্থানীয় লোকেরা তাকে হুবাইস বলত। তিনি চিন্তা করলেন এই হালুয়া বানিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট পাঠানো উচিত। তারপর তিনি হালুয়া প্রস্তুত করালেন। এবং তারপর সেগুলোকে বাক্সবদ্ধ করে চামড়া দিয়ে মুখ আটকে দিয়ে মদীনায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট পাঠিয়ে দিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেগুলো গ্রহণ করলেন এবং তার স্বাদও চেখে দেখলেন। এই হালুয়া তিনি অত্যন্ত পছন্দ করলেন। তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হালুয়া বহনকারীকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'সেখানকার মুহাজিররা কি তৃপ্তিসহকারে এ-ধরনের হালুয়া খেতে পায়?' বাক্স বহনকারী নেতিবাচক জবাব দিলেন। আর বললেন, 'এগুলো কেবল আপনার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে।'
এ কথা শোনার পর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আজারবাইযানে উতবা ইবনে ফারকাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট হালুয়াগুলো ফেরত পাঠালেন। তারপর উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সম্বোধন করে পত্র লিখলেন :
উতবা, তোমার পাঠানো উপহার তোমার আর তোমার বাবার কামাই না। সফরকালে তুমি যেই খাদ্য গ্রহণ করবে, সকল মুসলমানের জন্য সেই খাদ্যের বন্দোবস্ত করবে। আরাম-আয়েশ পরিহার করে চলবে। মুশরিকদের পোশাক পরবে না। রেশমি কাপড় থেকে দূরে থাকবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রেশমি কাপড় পরতে নিষেধ করেছেন। ৭০
ঘটনাটি বিভিন্ন রেওয়ায়েতে বর্ণিত আছে। সেগুলো একটি অপরটির সমার্থক।
তার পর থেকে উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের বাকি দিনগুলো এবং উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের প্রথম দিকে আজারবাইজানের গভর্নর ছিলেন। এ ছাড়াও ইরাক ও পারস্যের বিভিন্ন অঞ্চলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিয়োগকৃত আরও একাধিক গভর্নর ছিল। কিছু গভর্নর এমনও ছিল, যারা নিজ নিজ প্রদেশে অনেকটা স্বাধীন ছিলেন। কিছু অঞ্চল ইরাকের দুই বড় শহর কুফা ও বসরার অধীন ছিল। কেননা, এই দুই প্রদেশ ছিল ইরাক ও পারস্যের আইন-শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার প্রধান কেন্দ্র। এই আলোচনায় উল্লেখিত প্রদেশগুলো ছাড়াও ছোট ছোট আরও কিছু প্রদেশ ছিল, যার জন্য আলাদা গভর্নর ছিল। যেমন: মসুল, হালওয়ান, কাসকার ইত্যাদি।
টিকাঃ
৭০ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/১৩৩।