📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 শাম ও তার রাজ্যসমূহ

📄 শাম ও তার রাজ্যসমূহ


আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইনতিকালের সময় ইসলামী ফৌজের শামদেশীয় শাখার প্রধান এবং রাজ্যের সার্বিক শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন খেলাফতের দায়িত্ব বুঝে নিলেন, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তখন শামের গভর্নরের দায়িত্ব ও পদ থেকে বরখাস্ত করলেন। তদস্থলে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ প্রদান করলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে সেখানকার গভর্নর জেনারেল ও প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব অর্পণ করলেন।
আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৮৩। তাহযিব তারিখ দিমাশক, ১/২৫২।
আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু সেখানকার সমস্ত ব্যবস্থাপনা একদম নতুনভাবে সজ্জিত করতে শুরু করলেন। শামের নতুন এলাকাগুলোতে তিনি নতুন প্রশাসক নিয়োগদানের মতো সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। তবে কিছু কিছু এলাকায় পূর্বের গভর্নরদের স্বপদে বহাল রাখলেন। আবার কিছু এলাকার গভর্নরদের তাদের দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করলেন।
ইতিহাসবিদ খলিফা ইবনে খাইয়াত লেখেন, বিস্তীর্ণ শামের সম্পূর্ণ এলাকা যখন ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে চলে এল, তখন আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার গভর্নর থাকাকালীন ইয়াযিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ফিলিস্তিন ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। শুরাহবিল ইবনে হাসানা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিযুক্ত করলেন জর্ডানের প্রশাসক। দামেশকের প্রশাসক নিযুক্ত করলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে। হিমসে নিযুক্ত করলেন হাবিব ইবনে মাসলাম রাযিয়াল্লাহু আনহুকে। পরবর্তী কিছুদিনের মধ্যেই শেষোক্ত ব্যক্তিকে বরখাস্ত করে তদস্থলে আবদুল্লাহ ইবন কুরত সুমালি রাযিয়াল্লাহু আনহুকে প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। এমনিভাবে তিনি উবাদাহ ইবনে সামেত রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সহকারী গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। তবে কিছুদিন পরেই তিনি তাকে বরখাস্ত করে তার জায়গায় আবদুল্লাহ ইবনে কুরত রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ দেন।
কখনো কখনো তিনি তার সহযোগীদের নির্ধারিত সময়ের জন্য শামের বিভিন্ন অঞ্চলের হাকিম নিযুক্ত করতেন। যেমন: মুয়ায ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জর্ডানের জন্য এ-ধরনের হাকিম নিযুক্ত করে পাঠিয়েছিলেন। এমনিভাবে তিনি যখন কোনো জিহাদ অভিযানে বের হতেন, কাউকে নায়েব বানিয়ে যেতেন। যেমন : বায়তুল মুকাদ্দাস যাওয়ার সময় তিনি সায়িদ ইবনে যাইদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দামেশকে নিজের নায়েব নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবন কুরত সুমালি আজদি একজন সাহাবী ছিলেন। রাযিয়াল্লাহু আনহু। তার থেকে হাদিসও বর্ণিত হয়েছে। শাম বিজয়ে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফুতুহুশ শাম, ২৪৮। ইবনু আসাম কুফিকৃত আলফুতুহ, ২৮৯; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৯০।
আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু যতদিন পর্যন্ত শামের গভর্নর ছিলেন, ততদিন তিনি তার অধীন আমির, দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ জনগণের মাঝে নেককার ও দয়ালু মানুষের প্রতিচ্ছবি হয়েই ছিলেন। আমওয়াসের প্লেগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইনতিকাল করেন। তার পর মুয়ায রাযিয়াল্লাহু আনহু এখানকার গভর্নর নিযুক্ত হন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে তিনিও ইনতিকাল করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং মুয়ায রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইনতিকালের সংবাদ শুনলেন, তখন ইয়াযিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে শামের সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করেন। আরও কয়েকজনকে প্রাদেশিক দায়িত্ব দিয়ে শামের বিভিন্ন এলাকায় পাঠান। তাদের ওপর নির্ধারিত এলাকার সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল। ইয়াযিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সেনাবাহিনী পরিচালনা ও তাদের নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ ছিলেন। কারণ, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু শামের যুদ্ধক্ষেত্রে যেসব বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন, তার একটির নেতৃত্ব তিনি দিয়েছিলেন। এমনিভাবে আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু জিহাদ-অভিযানে বের হওয়ার সময় কয়েকবারই ইয়াযিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নায়েব নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন।
ইতিহাসবিদগণ লেখেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন ইয়াযিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে শামের সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করেন, তখন অন্যান্য আমির ও জেনারেলদের তার অধীনে সেখানকার বিভিন্ন এলাকায় প্রেরণ করেন। তবে ইয়াযিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ফিলিস্তিন ও জর্ডানের জন্য বিশেষভাবে নির্ধারণ করে দেন।
যেহেতু শামদেশে ইয়াযিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনকাল খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ছিল, তাই ইতিহাসের উৎসগ্রন্থসমূহে তার ব্যাপারে তেমন তথ্য পাওয়া যায় না। ১৮ হিজরি-সনে ইয়াযিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ইনতিকাল করেন। ইনতিকালের কিছুদিন পূর্বে তিনি তার ভাই মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে গভর্নরের দায়িত্ব পালনের জন্য নায়েব নিযুক্ত নির্ধারণ করে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বিষয়টি অবগত করেছিলেন। ইয়াযিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনকাল ছিল এক বছরের মতো।৪২
মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর গভর্নর নিযুক্তির বিষয়টি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গ্রহণ করলেন। পাশাপাশি তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের মাঝে কিছু রদবদল আনলেন। যেমন: মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দামেশকের মুসলিম সেনাবাহিনী এবং সেখানকার খারাজ আদায়সংক্রান্ত পূর্ণ দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত করা হয়। নামাযের ইমামত এবং বিচারিক দায়িত্ব থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তদস্থলে দুই জন নির্বাচিত আলেম সাহাবীকে সেখানে পাঠানো হয়।৪৩
এখানে গুরুত্বপূর্ণ রদবদল হলো, মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর ক্ষমতা ও স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করা। ইতিপূর্বে নামাযের ইমামতি তিনিই করতেন, যিনি প্রদেশের ওয়ালি বা আমির নিযুক্ত হতেন। এখন সেটা অন্যের দায়িত্বে চলে গেল। সম্ভবত এখানে এমন কোনো কারণ পরিলক্ষিত হয়েছে, যার কারণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে এই নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হয়। তারপর এই একই পদ্ধতি অন্যান্য প্রদেশেও কার্যকর করা হয়। মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুও এই পদ্ধতি অনুসারে কাজ করে যান (অধীন গভর্নরদের নামাযের ইমামতি ও বিচারিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন)। মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর উদারতা ও দানশীলতার বেশ প্রসিদ্ধি ছিল। যার কারণে ইরাক প্রভৃতি অঞ্চলের বহু লোক এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।৪৪
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কোনো কোনো দায়িত্বশীলকে শামের বিভিন্ন এলাকার জন্য নিযুক্ত করে পাঠান এবং তাদের মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর অধীন করে দেন। মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নর থাকাকালে কখনো কখনো শামের উত্তরাঞ্চলে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেন। এগুলোকে 'গ্রীষ্মকালীন যুদ্ধাভিযান' বলা হতো।৪৫
মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইনতিকাল পর্যন্ত শামের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সুচারুরূপে আঞ্জাম দেন। পার্শ্ববর্তী অন্যান্য এলাকার সঙ্গেও তিনি সম্পর্ক বজায় রাখতেন। অন্যান্য গভর্নর এবং মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর মাঝে পার্থক্য হলো তিনি সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। কারণ, তিনি একই সাথে বালকা, জর্ডান, ফিলিস্তিন, আনতাকিয়া, কালকিলিয়া, মাআররাহ আল-মাসাররিনসহ শামের অন্যান্য শহরের গভর্নর ছিলেন।৮৬
কোনো কোনো ঐতিহাসিক মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে একভাবে সমগ্র শামের গভর্নর হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে কোনো কোনো ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে শর্ত যুক্ত করে থাকেন। যেখানেই তারা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর গভর্নরদের নামের তালিকা উল্লেখ করেন, সেখানে তারা লেখেন, 'মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু শামের কিছু এলাকার গভর্নর ছিলেন।' তবে কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইনতিকালের পূর্বে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে গোটা শামের গভর্নর নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন।৮৯
যা-ই হোক, এ কথা মনে রাখা দরকার যে সেকালে রাষ্ট্রের পরিবেশ-পরিস্থিতি বিশেষভাবে সৈনিকদের অবস্থা প্রভৃতির প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন প্রদেশের সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও রদবদল হতে থাকত। এ জন্য জর্ডান কখনো কখনো স্বতন্ত্র প্রদেশের রূপ পরিগ্রহ করত। আবার কখনো তার সঙ্গে অন্যান্য প্রদেশও অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া হতো। কখনো এমনও হতো যে কিছু কিছু এলাকা জর্ডান থেকে বের করে শাম বা ফিলিস্তিনের অন্তর্ভুক্ত করা হতো। এ ছাড়াও বহু উদাহরণ দেওয়া যাবে। এখানে তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া উদ্দেশ্য নয়।

টিকাঃ
৪২ আল-ওয়াসাইকুস সিয়াসাতি লিল আসরিন নাববি ওয়াল খিলাফাতির রাশিদাহ, ৪৯৩।
৪৩ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৯২।
৪৪ তারিখ আত-তাবারি, ৫/২৩৯।
৪৫ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৯২।
৮৬ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৯১।
৮৯ তারিখু খালিফাতিবনি খাইয়াত, ১৫৫; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৪/৮৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00