📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 ইয়ামান

📄 ইয়ামান


উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন খেলাফতের মসনদে অধিষ্ঠিত হন, তখন ইয়ামান অত্যন্ত নিরাপদ ও স্থিতিশীল অবস্থায় ছিল। ইয়ামান ও তার আশপাশ এলাকার আমির, অফিসার ও দায়িত্বশীলদের উন্নত নৈতিকতার কারণে সেখানকার সার্বিক অবস্থা ও ব্যবস্থাপনা বেশ ভালো ছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার খেলাফতকালে ইয়ামানেও আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিয়োগকৃত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ নিজ পদে বহাল রাখেন।১২
ইয়ালা ইবনে উমাইয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিয়োগকৃত ইয়ামানের গভর্নর। তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালেও ইয়ামানের গভর্নর ছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগে তিনি ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছিলেন। ইতিহাসবিদরা লেখেন, ইয়ালা রাযিয়াল্লাহু আনহুর সুনাম-সুখ্যাতির কারণে লোকজনের মাঝে এমনও ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল যে ইয়ামানের গভর্নরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির পর তিনিই হবেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নায়েব। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইনতিকাল পর্যন্ত বিষয়টি মানুষের মাঝে এভাবেই চর্চিত হয়ে আসছিল।১৩
ঐতিহাসিকসূত্রে ইয়ামানের গভর্নর ইয়ালা ইবনে উমাইয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে এমন কিছু ঘটনা পাওয়া যায়, যার দ্বারা প্রতীয়মান হয়, কোনো কোনো ইয়ামানির সঙ্গে কিছু বিষয়ে তার মতানৈক্যও ছিল। এমনকি কিছু কিছু বিষয়ে কোনো কোনো ইয়ামানি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট হাজির হতো। তাদের দায়েরকৃত অভিযোগ যাচাই-বাছাই এবং বিবাদ মীমাংসার জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কয়েকবারই ইয়ালা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মদীনায় তলব করেন। ফলে তাকে বাধ্য হয়ে মদীনায় আসতে হতো।১৪
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইয়ালা রাযিয়াল্লাহু আনহুর অনুপস্থিতিতে কখনো কখনো অন্যকাউকে তার নায়েব নিযুক্ত করতেন। যাকাতসংক্রান্ত কিছু বিষয়ে ইয়ালা রাযিয়াল্লাহু আনহু ও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মাঝে চিঠিপত্রের মাধ্যমে মতোবিনিময়ও হয়েছিল।১৫
ইয়ালা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি সেসব গভর্নরের একজন, যাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি স্বাভাবিক আয়-রোজগারের চেয়ে বেশি হওয়ার কারণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খেলাফতের শেষ দিনগুলোতে লোকজনের মাঝে বণ্টন করে দিয়েছিলেন।১৬
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালীন ইয়ামানের গভর্নরদের নামের তালিকায় আবদুল্লাহ ইবনে রাবিয়া মাখযুমি রাযিয়াল্লাহু আনহুকেও পাওয়া যায়। তবে সম্ভবত তিনি ইয়ামানের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের হাকিম ছিলেন। সেই অঞ্চলটির নাম জুনদ। ইমাম তাবারি উমর ফারুক রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগের শেষ সময়কার গভর্নরদের নাম উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি ইয়ালা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়ামানের গভর্নর লিখেছেন। সেখানে তিনি এ কথাও স্পষ্ট করেছেন যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষ থেকে আবদুল্লাহ ইবনে রাবিয়া মাখযুমি রাযিয়াল্লাহু আনহু ইয়ামানের জুনদ অঞ্চলের হাকিম নিযুক্ত হয়েছিলেন।১৭
উমর ইবনে খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে ইসলামী বিজয়সমূহে ইয়ামানের অধিবাসীদের মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তারা শাম, ইরাক ও মিসর বিজয়ের ক্ষেত্রে বরাবর অংশগ্রহণ করেন।১৮ এবং তারপর যখন ইরাকের বিভিন্ন এলাকা বাসযোগ্য করে কুফা ও বসরার মতো নতুন নতুন শহরের গোড়াপত্তন করা হয়, তখন বহু ইয়ামানি কবিলা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় কবিলার নাম ছিল কিনদা। তারা ব্যাপকভাবে কুফায় নিবাস স্থাপন করেছিল।১৯ এমনিভাবে বহু ইয়ামানি কবিলা শামে বসবাস শুরু করে। তা ছাড়া শাম বিজয়ে তাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। যখন মিসরের রাজধানী ফুসতাত আবাদ করার হয়, তখনও সেখানে কিছু ইয়ামানি কবিলা স্থানান্তরিত হয়ে যায়।
মোটকথা, উমর ফারুক রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগে হিজরতের জন্য কিছু কিছু ইয়ামানি কবিলার তালিকা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিল। কোন শহরে কোন কবিলা যাবে, তার তালিকা প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে ইয়ামানের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এভাবেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর যুগে ইয়ামান হয়ে উঠতে পেরেছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী প্রদেশ। এবং দেশীয় রাজনীতিতে অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় ইয়ামানের প্রভাব এবং রাজনৈতিকভাবে এখানকার সরকারি কর্মকর্তাদের অবদান বেশ গুরুত্বের দাবি রাখে।

টিকাঃ
১২ ইয়াহয়া আলহুসাইনকৃত গায়াতুল আমানি ফি আখবারিল কাতরিল ইয়ামানি, ১:৮৩
১৩ তারিখ আত-তাবারি, ২/১৫৭১।
১৪ গায়াতুল আমানি, ১/৮৩।
১৫ কাসেম ইবনে সালামকৃত আলআমওয়াল, ৪৩৬।
১৬ তারিখ আল-ইয়াকুবি, ৯/৮৩।
১৭ তারিখ আত-তাবারি, ৫/২৩৯।
১৮ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৭১।
১৯ ড. ইসামুদ্দীনকৃত আলইয়ামান ফি যিললিল ইসলাম, ৪৯।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 বাহরাইন

📄 বাহরাইন


উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিয়োগকৃত বাহরাইনের গভর্নর ছিলেন আলা ইবনে হাযরামি রাযিয়াল্লাহু আনহু। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খেলাফতের প্রথম দিনগুলোতে আলা ইবনে হাযরামি রাযিয়াল্লাহু আনহুকে স্বপদে বহাল রাখেন। আর গ্রহণযোগ্য মতানুযায়ী, এর সময়কাল ছিল ১৪ হিজরি পর্যন্ত। ২০
আলা ইবনে হাযরামি রাযিয়াল্লাহু আনহু পারস্যের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত প্রাথমিক যুদ্ধগুলোতে অংশগ্রহণ করেন। সেসব যুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। আলা ইবনে হাযরামির গভর্নর থাকার শেষদিন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বাহরাইন থেকে অপসারণ করে বসরার গভর্নর নিযুক্ত করেন। আলা ইবনে হাযরামি রাযিয়াল্লাহু আনহু পরিবর্তনের বিষয়টি খুব অপছন্দ করেছিলেন। কিন্তু বসরায় পৌঁছার পূর্বেই তার ইনতিকাল হয়ে যায়। বাহরাইনেই তাকে দাফন করা হয়। বাহরাইন থেকে তার অপসারণের কারণ হিসাবে বলা হয়, তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবগতি ও অনুমতি ছাড়াই নৌপথে পারস্যের ওপর আক্রমণ করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম সেনাদের নৌপথে সমুদ্র অতিক্রম করার ব্যাপারটি একদম পছন্দ করতেন না।
আলা ইবনে হাযরামি রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইনতিকালের পর বাহরাইনের গভর্নর নিযুক্ত হন উসমান ইবনে আবুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বাহরাইনের পার্শ্ববর্তী পারস্যের বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় হামলা করেন। ধীরে ধীরে তার বিজিত এলাকা সিন্ধু পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে আদেশ করেছিলেন বিজয় ও সামরিক কর্মকাণ্ডে বসরার গভর্নর আবু মুসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাহায্য গ্রহণ করবে। তার পর থেকে বসরার পথ ধরে পারস্যের বিভিন্ন রণাঙ্গনে উভয় প্রদেশের সেনাবাহিনী পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আক্রমণ অব্যাহত রাখেন। ২১
উসমান ইবনে আবুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অত্যন্ত আল্লাহওয়ালা, উত্তম ও সুন্দর স্বভাবের অধিকারী। তিনি সব সময় হারাম কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতেন। ২২ উসমান ইবনে আবুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষ থেকে ভিন্ন দুই সময়ে দুইবার বাহরাইনের গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন। প্রথমবার ১৫ হিজরি-সনে তাকে গভর্নর বানানো হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বসরার কিছু এলাকায় ইসলামী সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব এবং বিজয়ের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য তার প্রয়োজন অনুভূত হয়। তাই বাহরাইন থেকে তাকে ডেকে পাঠানো হয়। বাহরাইনের পরবর্তী গভর্নর নিযুক্ত করা হয় আইয়াশ ইবনে আবু সাওর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে। ২৩ আইয়াশ রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামল ছিল খুবই কম সময়ের জন্য। তার পর কুদামা ইবনে মাযউন রাযিয়াল্লাহু আনহুকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করেন। কুদামা রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহুর সঙ্গে থাকতেন। ইতিপূর্বে তিনি বাহরাইনের বিচারপতি ছিলেন। প্রাদেশিক অন্যান্য দায়িত্বও তার কাঁধে ছিল। তিনি যতদিন বাহরাইনের গভর্নর ছিলেন, মানুষ তার খুব প্রশংসা করেছে। কিন্তু গভর্নর থাকার শেষ দিনগুলোতে তার প্রতি এই অপবাদ আরোপ করা হয় যে তিনি মদ পান করেন। যাচাই-বাছাইয়ের পর অপবাদের বিষয়টা সত্য প্রমাণিত হয়। ফলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার ওপর মদ্যপানের শরয়ি দণ্ডবিধি হদ প্রয়োগ করেন। কুদামা ইবনে মাযউন রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সন্তান আবদুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং উম্মুল মুমিনীন হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহার মামা। ২৪
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই সংশোধনমূলক আচরণে কুদামা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার প্রতি ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু আমীরুল মুমিনীন তাকে বুঝাবার জন্য অবিরাম চেষ্টা করতে থাকেন। তিনি তাকে বলেছিলেন, 'দেখো, আমি স্বপ্নে দেখলাম এক ব্যক্তি এসে আমাকে বলল, 'কুদামাকে সংশোধন করে নাও। সে তোমার ভাই।”২৫ এক বর্ণনা অনুযায়ী কুদামা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ২০ হিজরি-সনে বাহরাইনের গভর্নর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। ২৬
কুদামা রাযিয়াল্লাহু আনহুর পর বাহরাইনের গভর্নরের দায়িত্ব আসে বিখ্যাত সাহাবী আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে। বিগত কুদামা ইবনে মাযউন রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামল থেকে আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রাদেশিক বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তিনি ছিলেন সেসব সাক্ষীর একজন, যারা মদ্যপানের ব্যাপারে কুদামা রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। মোটকথা, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কুদামা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করার পর আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বাহরাইনের গভর্নর নিযুক্ত করেন। ২৭
তারপর আবু হুরাইরা রাযিয়াল্লাহু আনহুর পর উসমান ইবনে আবুল আস সাকাফি রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পুনরায় বাহরাইনের গভর্নর নিযুক্ত করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইনতিকাল পর্যন্ত তিনি সেখানকার গভর্নর ছিলেন।২৮ বহু ঐতিহাসিক বর্ণনায় আম্মানকে বাহরাইন প্রদেশের একটি অঞ্চল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে কিছু কিছু বর্ণনায় যেখানে উসমান ইবনে আবুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে গভর্নর হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে এ কথাও বলা হয়েছে যে তিনি বাহরাইন ও ইয়ামামার গভর্নর ছিলেন। ২৯
শেষোক্ত উভয় বর্ণনা দ্বারা এ কথা প্রতীয়মান হয় যে বাহরাইনের সঙ্গে আম্মান ও ইয়ামামার একরকম গভীর সম্পর্ক ছিল। আর এটাও সম্ভব যে উমর ফারুক রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে এই এলাকা দুটি বাহরাইনের অংশ হিসাবেই গণ্য হতো। আর এ কথাও বিস্মৃত হলে চলবে না যে ভৌগোলিক বিবেচনায় এবং মানুষের অত্যধিক যাতায়াতের কারণে আম্মান ও ইয়ামামার সঙ্গে বাহরাইনের গড়ে উঠেছিল নিবিড় সম্পর্ক।
এ ছাড়াও বহু ইতিহাসবিদ বরাবরই ‘বাহরাইন ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল’ এমনিভাবে 'বাহরাইনের সঙ্গে সম্পৃক্ত অঞ্চল' বলে সম্ভবত আম্মান ও ইয়ামামার কথা বোঝাতেন। বাহরাইন ছিল জিযিয়া ও খারাজ আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এর দ্বারা বোঝা যায় সেকালে বাহরাইন ছিল সমৃদ্ধ ও সম্পদশালী প্রদেশ। বাহরাইনের বহু মুসলিম কবিলা এবং সেখানকার নেতৃস্থানীয় লোকজন পারস্য এবং প্রাচ্যদেশীয় বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেন। সেসব জায়গার বিজয়সমূহে তাদের বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল।৩০

টিকাঃ
২০ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৭৫।
২১ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৭৩।
২২ সিয়ারু আলামিন নুবালা, ২/৩৭৪।
২৩ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৭৩।
২৪ আত-তাবাকাত, ৫/৫৬০; তারিখ আল-মাদিনা, ৩/৮৪৩; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৭৩।
২৫ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৭৪।
২৬ আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/১০১।
২৭ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৭৫।
২৮ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৭৫।
২৯ তারিখ আত-তাবারি, ৫/২৩৯।
৩০ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৭৬।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 মিসর

📄 মিসর


আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু মিসর বিজয় করেন (ইনশাআল্লাহ, মিসরবিজয়ের বিস্তারিত আলোচনা 'বিজয় অভিযান' পরিচ্ছেদে উল্লেখ করা হবে)। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করেন। তার পরেও তিনি কিছু কিছু বিষয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। যার ফলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সাথে সংশোধনী আচরণ করেন। এর বাইরে তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের পুরো সময়ব্যাপী মিসরের গভর্নর ছিলেন। আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন মিসরের গভর্নর জেনারেল। তার অধীনে মিসরের ছোট ছোট বিভিন্ন এলাকায় স্বতন্ত্র আমীর ও ওয়ালি (গভর্নর) নিযুক্ত ছিলেন। যেমন : আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবু আসরাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে বলা হয়, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইনতিকালের সময় তিনি মিসরের 'সায়িদ' এলাকার নির্ধারিত ওয়ালি বা গভর্নর ছিলেন। ৩১
এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মিসরের গভর্নর থাকাকালে অধিকাংশ সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতেন। ৩২
আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নর থাকাকালে খারাজ ও জিযিয়ার ব্যাপারে কিবতিদের যোগ্যতা ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে উপকৃত হতেন। এভাবে তাকে নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল।৩৩ তার ব্যাপারে এ কথা প্রসিদ্ধ ছিল যে তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আদেশে সৈনিকদের চাষাবাদ ও কৃষিকাজে ব্যস্ত হতে এবং এর দ্বারা সরাসরি উপকৃত হতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। আর যারা এই আদেশের বিরোধিতা করত, তাদের শাস্তি প্রদান করতেন। ৩৪
এই নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো মুসলিম সৈনিকদের সব সময় কঠিন পরিশ্রমধর্মী কাজের জন্য প্রস্তুত থাকতে হতো, যাতে তারা অলস ও অবসাদগ্রস্ত হয়ে না পড়ে এবং শুধু কৃষি ও চাষাবাদ নিয়েই ব্যস্ত না থাকে। আর এ জন্যই তাদের সরকারি কোষাগার থেকে পর্যাপ্ত বেতন- ভাতা দেওয়া হতো। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিয়মিত তদারকি ও নজরদারির কারণে আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু কয়েক বছরের মধ্যে প্রদেশ ও তার যাবতীয় বিষয় সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে মিসর উন্নীত হতে পেরেছিল মুসলিম জাহানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশে। রাজ্যের সর্বত্র নিরাপত্তা ও শান্তি বিরাজ করার দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয়। তা সত্ত্বেও চারদিক থেকে রোমানদের প্রতিশোধমূলক আক্রমণের আশঙ্কা তাকে অস্থির করে তুলেছিল। তারা বারবার নৌপথে আলেক্সজান্দ্রিয়া আক্রমণ করে পুনরায় মিসরে আধিপত্য বিস্তার করতে চাচ্ছিল।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে ইসলামের প্রচার-প্রসারে এই অঞ্চলটি বেশ উর্বর এবং অনুকূল প্রমাণিত হয়েছিল। কেননা, এখানকার অধিবাসীরা ন্যায় ও ইনসাফ, দয়া ও অনুগ্রহের এমন বাণী ও আচরণের মুখোমুখি হয়, যা তারা কখনোই দেখেনি। তাই তারা ইসলামের সত্যতা এবং তার সহজ ও স্পষ্ট শিক্ষায় আশ্বস্ত হতে পেরেছিল। ফলে তারা ইসলাম গ্রহণ করে নিয়মতান্ত্রিক মুসলিম সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। মিসরে সরকারি এবং বিভিন্ন অফিসিয়াল কার্যক্রম অত্যন্ত সহজ ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হতো। আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন মিসরে গভর্নর জেনারেল। তিনিই খারাজ গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতেন। যদিও তিনি ছিলেন গভর্নর জেনারেল এবং প্রাদেশিক কর্মকাণ্ডের প্রধান নির্বাহী; তারপরেও তিনি মিসরের বিভিন্ন এলাকায় অধীন গভর্নর ও কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছিলেন। প্রাদেশিক কর্মকাণ্ডে তিনি তাদের থেকে সহযোগিতা গ্রহণ করতেন। তবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সামনে একটি বিশাল প্রদেশের গভর্নর জেনারেল ও প্রধান নির্বাহী হিসাবে সকল বিষয়ে আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকেই জবাবদিহি করতে হতো। খারাজসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিষয়ে তিনি রাজ্যের দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোকদের কাজে লাগাতেন।

টিকাঃ
৩১ ফুতুহু মিসর, ১৭৩।
৩২ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৭৯।
৩৩ ফুতুহু মিসর ওয়া আখবারিহা, ১৫২।
৩৪ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৮২।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 শাম ও তার রাজ্যসমূহ

📄 শাম ও তার রাজ্যসমূহ


আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইনতিকালের সময় ইসলামী ফৌজের শামদেশীয় শাখার প্রধান এবং রাজ্যের সার্বিক শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ছিলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন খেলাফতের দায়িত্ব বুঝে নিলেন, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তখন শামের গভর্নরের দায়িত্ব ও পদ থেকে বরখাস্ত করলেন। তদস্থলে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ প্রদান করলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে সেখানকার গভর্নর জেনারেল ও প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব অর্পণ করলেন।
আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৮৩। তাহযিব তারিখ দিমাশক, ১/২৫২।
আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু সেখানকার সমস্ত ব্যবস্থাপনা একদম নতুনভাবে সজ্জিত করতে শুরু করলেন। শামের নতুন এলাকাগুলোতে তিনি নতুন প্রশাসক নিয়োগদানের মতো সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। তবে কিছু কিছু এলাকায় পূর্বের গভর্নরদের স্বপদে বহাল রাখলেন। আবার কিছু এলাকার গভর্নরদের তাদের দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করলেন।
ইতিহাসবিদ খলিফা ইবনে খাইয়াত লেখেন, বিস্তীর্ণ শামের সম্পূর্ণ এলাকা যখন ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে চলে এল, তখন আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার গভর্নর থাকাকালীন ইয়াযিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ফিলিস্তিন ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। শুরাহবিল ইবনে হাসানা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিযুক্ত করলেন জর্ডানের প্রশাসক। দামেশকের প্রশাসক নিযুক্ত করলেন খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে। হিমসে নিযুক্ত করলেন হাবিব ইবনে মাসলাম রাযিয়াল্লাহু আনহুকে। পরবর্তী কিছুদিনের মধ্যেই শেষোক্ত ব্যক্তিকে বরখাস্ত করে তদস্থলে আবদুল্লাহ ইবন কুরত সুমালি রাযিয়াল্লাহু আনহুকে প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। এমনিভাবে তিনি উবাদাহ ইবনে সামেত রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সহকারী গভর্নর নিযুক্ত করেছিলেন। তবে কিছুদিন পরেই তিনি তাকে বরখাস্ত করে তার জায়গায় আবদুল্লাহ ইবনে কুরত রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ দেন।
কখনো কখনো তিনি তার সহযোগীদের নির্ধারিত সময়ের জন্য শামের বিভিন্ন অঞ্চলের হাকিম নিযুক্ত করতেন। যেমন: মুয়ায ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জর্ডানের জন্য এ-ধরনের হাকিম নিযুক্ত করে পাঠিয়েছিলেন। এমনিভাবে তিনি যখন কোনো জিহাদ অভিযানে বের হতেন, কাউকে নায়েব বানিয়ে যেতেন। যেমন : বায়তুল মুকাদ্দাস যাওয়ার সময় তিনি সায়িদ ইবনে যাইদ ইবনে আমর ইবনে নুফাইল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দামেশকে নিজের নায়েব নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবন কুরত সুমালি আজদি একজন সাহাবী ছিলেন। রাযিয়াল্লাহু আনহু। তার থেকে হাদিসও বর্ণিত হয়েছে। শাম বিজয়ে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফুতুহুশ শাম, ২৪৮। ইবনু আসাম কুফিকৃত আলফুতুহ, ২৮৯; আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৯০।
আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু যতদিন পর্যন্ত শামের গভর্নর ছিলেন, ততদিন তিনি তার অধীন আমির, দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাধারণ জনগণের মাঝে নেককার ও দয়ালু মানুষের প্রতিচ্ছবি হয়েই ছিলেন। আমওয়াসের প্লেগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ইনতিকাল করেন। তার পর মুয়ায রাযিয়াল্লাহু আনহু এখানকার গভর্নর নিযুক্ত হন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে তিনিও ইনতিকাল করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং মুয়ায রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইনতিকালের সংবাদ শুনলেন, তখন ইয়াযিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে শামের সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করেন। আরও কয়েকজনকে প্রাদেশিক দায়িত্ব দিয়ে শামের বিভিন্ন এলাকায় পাঠান। তাদের ওপর নির্ধারিত এলাকার সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল। ইয়াযিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সেনাবাহিনী পরিচালনা ও তাদের নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ ছিলেন। কারণ, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু শামের যুদ্ধক্ষেত্রে যেসব বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন, তার একটির নেতৃত্ব তিনি দিয়েছিলেন। এমনিভাবে আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু জিহাদ-অভিযানে বের হওয়ার সময় কয়েকবারই ইয়াযিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নায়েব নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন।
ইতিহাসবিদগণ লেখেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন ইয়াযিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে শামের সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করেন, তখন অন্যান্য আমির ও জেনারেলদের তার অধীনে সেখানকার বিভিন্ন এলাকায় প্রেরণ করেন। তবে ইয়াযিদ ইবনে আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ফিলিস্তিন ও জর্ডানের জন্য বিশেষভাবে নির্ধারণ করে দেন।
যেহেতু শামদেশে ইয়াযিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনকাল খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ছিল, তাই ইতিহাসের উৎসগ্রন্থসমূহে তার ব্যাপারে তেমন তথ্য পাওয়া যায় না। ১৮ হিজরি-সনে ইয়াযিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ইনতিকাল করেন। ইনতিকালের কিছুদিন পূর্বে তিনি তার ভাই মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে গভর্নরের দায়িত্ব পালনের জন্য নায়েব নিযুক্ত নির্ধারণ করে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বিষয়টি অবগত করেছিলেন। ইয়াযিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনকাল ছিল এক বছরের মতো।৪২
মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর গভর্নর নিযুক্তির বিষয়টি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গ্রহণ করলেন। পাশাপাশি তিনি সরকারি কর্মকর্তাদের মাঝে কিছু রদবদল আনলেন। যেমন: মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দামেশকের মুসলিম সেনাবাহিনী এবং সেখানকার খারাজ আদায়সংক্রান্ত পূর্ণ দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত করা হয়। নামাযের ইমামত এবং বিচারিক দায়িত্ব থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তদস্থলে দুই জন নির্বাচিত আলেম সাহাবীকে সেখানে পাঠানো হয়।৪৩
এখানে গুরুত্বপূর্ণ রদবদল হলো, মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর ক্ষমতা ও স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করা। ইতিপূর্বে নামাযের ইমামতি তিনিই করতেন, যিনি প্রদেশের ওয়ালি বা আমির নিযুক্ত হতেন। এখন সেটা অন্যের দায়িত্বে চলে গেল। সম্ভবত এখানে এমন কোনো কারণ পরিলক্ষিত হয়েছে, যার কারণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে এই নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হয়। তারপর এই একই পদ্ধতি অন্যান্য প্রদেশেও কার্যকর করা হয়। মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুও এই পদ্ধতি অনুসারে কাজ করে যান (অধীন গভর্নরদের নামাযের ইমামতি ও বিচারিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন)। মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর উদারতা ও দানশীলতার বেশ প্রসিদ্ধি ছিল। যার কারণে ইরাক প্রভৃতি অঞ্চলের বহু লোক এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।৪৪
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কোনো কোনো দায়িত্বশীলকে শামের বিভিন্ন এলাকার জন্য নিযুক্ত করে পাঠান এবং তাদের মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর অধীন করে দেন। মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নর থাকাকালে কখনো কখনো শামের উত্তরাঞ্চলে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেন। এগুলোকে 'গ্রীষ্মকালীন যুদ্ধাভিযান' বলা হতো।৪৫
মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইনতিকাল পর্যন্ত শামের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সুচারুরূপে আঞ্জাম দেন। পার্শ্ববর্তী অন্যান্য এলাকার সঙ্গেও তিনি সম্পর্ক বজায় রাখতেন। অন্যান্য গভর্নর এবং মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর মাঝে পার্থক্য হলো তিনি সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। কারণ, তিনি একই সাথে বালকা, জর্ডান, ফিলিস্তিন, আনতাকিয়া, কালকিলিয়া, মাআররাহ আল-মাসাররিনসহ শামের অন্যান্য শহরের গভর্নর ছিলেন।৮৬
কোনো কোনো ঐতিহাসিক মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে একভাবে সমগ্র শামের গভর্নর হিসেবে উল্লেখ করেন। অন্যদিকে কোনো কোনো ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে শর্ত যুক্ত করে থাকেন। যেখানেই তারা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর গভর্নরদের নামের তালিকা উল্লেখ করেন, সেখানে তারা লেখেন, 'মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু শামের কিছু এলাকার গভর্নর ছিলেন।' তবে কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইনতিকালের পূর্বে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে গোটা শামের গভর্নর নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন।৮৯
যা-ই হোক, এ কথা মনে রাখা দরকার যে সেকালে রাষ্ট্রের পরিবেশ-পরিস্থিতি বিশেষভাবে সৈনিকদের অবস্থা প্রভৃতির প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন প্রদেশের সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও রদবদল হতে থাকত। এ জন্য জর্ডান কখনো কখনো স্বতন্ত্র প্রদেশের রূপ পরিগ্রহ করত। আবার কখনো তার সঙ্গে অন্যান্য প্রদেশও অন্তর্ভুক্ত করে দেওয়া হতো। কখনো এমনও হতো যে কিছু কিছু এলাকা জর্ডান থেকে বের করে শাম বা ফিলিস্তিনের অন্তর্ভুক্ত করা হতো। এ ছাড়াও বহু উদাহরণ দেওয়া যাবে। এখানে তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া উদ্দেশ্য নয়।

টিকাঃ
৪২ আল-ওয়াসাইকুস সিয়াসাতি লিল আসরিন নাববি ওয়াল খিলাফাতির রাশিদাহ, ৪৯৩।
৪৩ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৯২।
৪৪ তারিখ আত-তাবারি, ৫/২৩৯।
৪৫ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৯২।
৮৬ আল-বিলায়াতু আলাল বুলদান, ১/৯১।
৮৯ তারিখু খালিফাতিবনি খাইয়াত, ১৫৫; সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৪/৮৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00