📄 এক কথায় তিন তালাকের অনুমোদন
ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত, এক সাথে তিন তালাক উচ্চারণ করাকে এক তালাক হিসেবে গণ্য করা হতো। অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যে বিষয়ে মানুষের অনেক সময় নিয়ে চিন্তা করা উচিত, তারা ওই বিষয়ে খুব তাড়াহুড়া শুরু করেছে। আমরা একে যথার্থভাবে হিসাব করলে ভালো হবে (অর্থাৎ, তিনবার উচ্চারণ করলে তিন তালাক হিসেবে গণ্য করা হবে),' তিনি তা- ই করলেন। ১৪৭৭ বর্ণিত আছে, ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে আবু আস-সাহবা জানতে চেয়েছিলেন, 'আপনি কি জানেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের প্রথম তিন বছর পর্যন্ত, এক সাথে তিন তালাক উচ্চারণ করলে তা এক তালাক হিসেবে গণ্য হতো?' ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'জী। '১৪৭৮
বর্ণনা দুটো থেকে বোঝা যাচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে এক সাথে তিন তালাক উচ্চারণ করলে এক তালাক হিসেবে গণ্য করা হতো, আর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেখানে একে তিন তালাক বলে ফাতওয়া দেন। এই ফাতওয়ার স্বপক্ষে তার যুক্তি ছিল, ওই সময় তিন তালাক উচ্চারণের হিড়িক পড়ে যায়। তিনি আল্লাহ নির্দেশিত এবং সুন্নাহ থেকে বর্ণিত তালাক থেকে তিনি লোকজনকে ফেরাতে চাচ্ছিলেন। বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে মুখে মুখে এক তালাক দিলে তার স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে হবে এবং স্ত্রীর ইদ্দত পালন করতে হবে; এখন কেউ তার স্ত্রীকে ফিরে পেতে চাইলে ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার আগেই তা করতে হবে, তিন তালাক সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত এমন করতে পারবে। ১৪৭৯
কেউ কেউ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই ফাতওয়াকে আয়াতের পরিপন্থী বলে মনে করেন। যেমন: ড. আতিয়া মুস্তাফা মুশরিফা বলেছেন, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আগে থেকে অনুসৃত আয়াত এবং রীতিনীতির প্রতি বিরুদ্ধাচরণের দুঃসাহস দেখাতেন। নতুন মুসলিম সমাজে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে গিয়ে নতুন ফাতওয়া দিতেন। ১৪৮০ উপর্যুক্ত তিন তালাকের ঘটনা এমন একটি উদাহরণ। ১৪৮১ তবে প্রকৃতপক্ষে তিনি প্রত্যক্ষ কোনো আয়াতের বিপক্ষে যাননি। তিনি বরং আয়াত বোঝার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। তার দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে কয়েকটি বর্ণনা তুলে ধরা হলো:
১। ইবনুল মুসায়্যিব থেকে ইবনে শিহাব, তার কাছ থেকে ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদ, তার কাছ থেকে আল-কাসিম ইবনে আব্দুল্লাহ, তার কাছ থেকে আশহাব এবং তার কাছ থেকে মালিক বর্ণনা করেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় আসলামের এক ব্যক্তি তিন তালাকের মাধ্যমে তার স্ত্রীকে তালাক দেয়। কয়েকজন সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'আপনি স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবেন।' এদিকে তার স্ত্রী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে দেখা করে বলল, 'আমার স্বামী আমাকে একবারে তিন তালাক দিয়েছেন।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'মৌখিকভাবে আপনার তালাক হয়ে গেছে। এখন আপনাদের মধ্যে আর কোনো দায়বদ্ধতা নেই।' এই হাদীস থেকে দেখা যাচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবারে তিন তালাক উচ্চারণ করাকে তিনি তালাক হিসেবে গণ্য করেছেন।
২। নাসায়ী বর্ণনা করেছেন: এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একবাক্যে তিন তালাক দিয়েছিল বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানানো হলো। তিনি ক্রোধে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, 'আমি বেঁচে থাকতেই আল্লাহর কিতাব নিয়ে খেলা হচ্ছে?' এক লোক দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি কি তাকে হত্যা করব? ১৪৮২ এই হাদীসে দেখা যাচ্ছে, এক বসায় কেউ তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছিল এবং ত্যাগ করেছিল বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রেগে যান। যা তালাক সম্পন্ন হওয়ার প্রতি ইশারা করে। এক বসায় তিন তালাক কার্যকর যদি না হতো, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা স্পষ্ট করে বলে দিতেন। কারণ, প্রয়োজনের সময় ব্যাখ্যা বিলম্বিত করা না-জায়েয। ১৪৮৩
৩। নাফী ইবনে উমায়র ইবনে আব্দ ইয়াযীদ ইবনে রাকানা থেকে বর্ণিত, রাকানা ইবনে আব্দ ইয়াযীদ তার স্ত্রী সুহায়মাকে মৌখিকভাবে তালাক দেন। বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানানো হলো। লোকটি বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি একে একটা (তালাক) হিসেবে গণ্য করেছি।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আল্লাহর কসম, আপনার একটাই নিয়ত ছিল?' রাকানা বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমার নিয়তে একটাই ছিল।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার স্ত্রীকে তার সাথে ফিরিয়ে দিলেন। তিনি তার স্ত্রীকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে দ্বিতীয়বার এবং উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে তৃতীয়বারের মতো তালাক দেন। ১৪৮৪ এই হাদীসমতে, রাকানা মৌখিকভাবে তার স্ত্রীকে তালাক দেবার পরেও দাবি করেছিলেন যে, তিনি এক তালাক দিয়েছেন। তার কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে শপথ করে বলতে বলেন যে, তিনি এক তালাকই দিয়েছিলেন। তিনি শপথ করে একই কথা বলতে লাগলেন। ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার স্ত্রীকে তার কাছে পাঠিয়ে দেন। সুতরাং এখানে এটা স্পষ্ট যে, যদি নিয়তের সাথে মুখে মুখেও তিন তালাক দিয়ে দিতেন তবে তার নিয়তের কারণে তালাক কার্যকর হয়ে যেত, সেখানে শপথের কার্যকারিতা থাকত না।
টিকাঃ
১৪৭৭ মুসলিম, হাদীস নং. ১৪৭২।
১৪৭৮ প্রাগুক্ত।
১৪৭৯ আল-কাদা ফী আহদ ইমর ইবনুল খাত্তাব, ড. নাসির আত-তারীফি, ২/৭৩৩।
১৪৮০ আল-কাদা ফীল ইসলাম, পৃ. ৯৮।
১৪৮১ প্রাগুক্ত, পৃ.৯৯।
১৪৮২ আল-মুদাওয়ানা আল-কুবরা, কিতাব আ-তালাক, বাব তালাক আস-সুনান, ২/৬২।
১৪৮৩ সুনান আন-নাসাই, কিতাব আত-তালাক, আত-তালাক আস-সালাস আল-মাজমূআ, ৬/১৪২।
১৪৮৪ আল-কাদা ফী আহদ ইমর ইবনুল খাত্তাব, ড. নাসির আত-তারীফি, ২/৭৩৬।
📄 মুতআ (অস্থায়ী) বিয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা
বর্ণিত আছে যে, উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু মুতআ বিয়ে নিষেধ করে দেন। তিনি এটাকে যিনার সমতুল্য মনে করতেন এবং এর শাস্তি ছিল বিবাহিত ব্যক্তিকে প্রস্তারাঘাত করা। কারও কারও মতে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নন, বরং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ ধরনের বিয়ের ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। আবু নাদরা থেকে বর্ণিত, 'ইবনে আব্বাস মুতআর পক্ষে ছিলেন, আর ইবনে যুবায়র ছিলেন এর বিপক্ষে।' তিনি উল্লেখ করেছেন : আমি জাবির ইবনে আব্দুল্লাহকে এই প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছেন, 'আমি এ সম্পর্কে জানি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় এই নিয়ম ছিল, তবে খলীফা হওয়ার পরে উমর বলেছিলেন, 'আল্লাহ তা'আলা তার হুকুমমতো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনেক কিছুর অনুমোদন দিয়েছেন। এখন কুরআন অবতীর্ণ হয়ে গেছে এবং সম্পূর্ণ হয়ে গেছে, সুতরাং আল্লাহ তা'আলার হুকুমমতো হজ এবং উমরা পালন কর, যে নারীদের সাথে অস্থায়ী বিয়েতে আবদ্ধ হয়েছো তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করে নাও, কারণ, অস্থায়ীভাবে কোনো নারীকে বিয়ে করেছে এমন পুরুষের খোঁজ পেলে আমি তাকে পাথর মারব। ১৪৮৭
এই বর্ণনা থেকে দেখা যাচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে মুতআ বিয়ের প্রচলন ছিল এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তা নিষেধ করে দেন। এর অর্থ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় এর প্রচলন ছিল এবং তিনি তা নিষেধ করেননি। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়েও এর প্রচলন ছিল এবং তিনিও নিষেধ করেননি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিষেধ করেছিলেন বলে মুসলিম ও আব্দুর রাযযাকের মুসান্নাফ কিতাবেও বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটিকে নিষেধ করেছিলেন। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যারা মুতআকে জায়েয বলেছেন, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে জানতেন না। একইভাবে আবু হিলাল আল-আসকারী এবং রাফীক আল-আযমের মতো উলামায়ে কেরাম দাবি করেছেন যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই নিয়মকে নাজায়েয বলেছেন। তারাও জানতেন না যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস অনুসরণ করেই তা নিষিদ্ধ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুতআ নিষিদ্ধ করেছিলেন, নিম্নোক্ত হাদীসগুলো এর প্রমাণ:
১। সহীহ মুসলিম-এ বর্ণিত আছে, সালামা বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আওতাসের বছরে তিনদিনের জন্য মুত'আর অনুমতি দেন, পরে তিনি নিষেধ করে দেন। ১৪৮৮
২। সহীহ মুসলিম-এ বর্ণিত, সাবরা বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মুত'আর অনুমতি দিয়েছিলেন। ফলে এক লোক আমাকে নিয়ে বনু আমিরের সুন্দরী এক তরুণীর কাছে গেলেন। তাকে মুত'আ বিয়ের প্রস্তাব দিলে তরুণীটি বলল, 'আপনি আমাকে কী দেবেন?' আমার সাথী বলল, 'আমার জোব্বা।' আমি বয়সে তার তুলনায় তরুণ ছিলাম, তবে তার জোব্বাটি ছিল আমারটির তুলনায় সুন্দর। তরুণী তার জোব্বা আর আমাকে পছন্দ করল। সে আমাকে বলল, 'আপনি আর আপনার জোব্বা আমার জন্য যথেষ্ট।' সুতরাং আমি তিনদিন তার সাথে কাটালাম। এরপরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'যারা মুত'আ বিয়ে করেছে তারা যেন ওই নারীদের ছেড়ে দেয়।'
৩। মুসলিমে বর্ণিত আছে, সাবরা আল-জুহারী বলেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলেন। তিনি বললেন, 'হে লোকসকল, আমি তোমাদের মুতআ বিয়ের অনুমোদন দিয়েছিলাম, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা কেয়ামতের আগ পর্যন্ত এটি নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। সুতরাং কেউ এমন বিয়ে করে থাকলে তাদের ছেড়ে দাও এবং তাদের যা কিছু দিয়েছ তা ফেরত নিয়ো না। ১৪৮৯
৪। মুসলিমে বর্ণিত আছে, আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ইবনে আব্বাস মুতআ বিয়ের ব্যাপারে সহনশীল আচরণ করছেন বলে তিনি শুনতে পেয়েছেন। তিনি বললেন, 'এক মিনিট, হে ইবনে আব্বাস, আল্লাহর রাসূল খায়বারের দিনে এটাকে নিষিদ্ধ করেছেন এবং তিনি গৃহপালিত গাধার গোশতও নিষিদ্ধ করেছেন। ১৪৯০
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কিন্তু নিজের খেয়ালের বশবর্তী হয়ে মুতআ নিষিদ্ধ করেননি। ৬ষ্ঠ হিজরীতে খায়বারে নিষিদ্ধ করার পরে, ৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবারও স্থায়ীভাবে এই পদ্ধতি বাতিল করে দেন। লোকজন পনেরো দিন পর্যন্ত মুতআ বিয়ে ধরে রাখতে শুরু করেছিল, তখন রাসূল কেয়ামত পর্যন্ত এই পদ্ধতিকে নিষিদ্ধ করে দেন। ১৪৯১
টিকাঃ
১৪৮৭ আশশার মাযাহিরুল ইসলাম, ২/৪৩২; আল-কাদা ফী আহদ ইমর ইবনুল খাত্তাব, ২/৭৫৬।
১৪৮৮ সহীহ, মুসলিম, কিতাব আন-নিকাহ, বাব আল-মুতআহ, হাদীস নং ১০৩৩।
১৪৮৯ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৪০৬।
১৪৯০ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৪০৭।
১৪৯১ যাদ আল-মাদ, ৫/২৭০।
বর্ণিত আছে যে, উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু মুতআ বিয়ে নিষেধ করে দেন। তিনি এটাকে যিনার সমতুল্য মনে করতেন এবং এর শাস্তি ছিল বিবাহিত ব্যক্তিকে প্রস্তারাঘাত করা। কারও কারও মতে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নন, বরং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ ধরনের বিয়ের ওপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। আবু নাদরা থেকে বর্ণিত, 'ইবনে আব্বাস মুতআর পক্ষে ছিলেন, আর ইবনে যুবায়র ছিলেন এর বিপক্ষে।' তিনি উল্লেখ করেছেন : আমি জাবির ইবনে আব্দুল্লাহকে এই প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছেন, 'আমি এ সম্পর্কে জানি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় এই নিয়ম ছিল, তবে খলীফা হওয়ার পরে উমর বলেছিলেন, 'আল্লাহ তা'আলা তার হুকুমমতো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনেক কিছুর অনুমোদন দিয়েছেন। এখন কুরআন অবতীর্ণ হয়ে গেছে এবং সম্পূর্ণ হয়ে গেছে, সুতরাং আল্লাহ তা'আলার হুকুমমতো হজ এবং উমরা পালন কর, যে নারীদের সাথে অস্থায়ী বিয়েতে আবদ্ধ হয়েছো তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করে নাও, কারণ, অস্থায়ীভাবে কোনো নারীকে বিয়ে করেছে এমন পুরুষের খোঁজ পেলে আমি তাকে পাথর মারব। ১৪৮৭
এই বর্ণনা থেকে দেখা যাচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে মুতআ বিয়ের প্রচলন ছিল এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তা নিষেধ করে দেন। এর অর্থ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় এর প্রচলন ছিল এবং তিনি তা নিষেধ করেননি। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়েও এর প্রচলন ছিল এবং তিনিও নিষেধ করেননি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিষেধ করেছিলেন বলে মুসলিম ও আব্দুর রাযযাকের মুসান্নাফ কিতাবেও বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটিকে নিষেধ করেছিলেন। সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যারা মুতআকে জায়েয বলেছেন, তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে জানতেন না। একইভাবে আবু হিলাল আল-আসকারী এবং রাফীক আল-আযমের মতো উলামায়ে কেরাম দাবি করেছেন যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই নিয়মকে নাজায়েয বলেছেন। তারাও জানতেন না যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস অনুসরণ করেই তা নিষিদ্ধ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুতআ নিষিদ্ধ করেছিলেন, নিম্নোক্ত হাদীসগুলো এর প্রমাণ:
১। সহীহ মুসলিম-এ বর্ণিত আছে, সালামা বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আওতাসের বছরে তিনদিনের জন্য মুত'আর অনুমতি দেন, পরে তিনি নিষেধ করে দেন। ১৪৮৮
২। সহীহ মুসলিম-এ বর্ণিত, সাবরা বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মুত'আর অনুমতি দিয়েছিলেন। ফলে এক লোক আমাকে নিয়ে বনু আমিরের সুন্দরী এক তরুণীর কাছে গেলেন। তাকে মুত'আ বিয়ের প্রস্তাব দিলে তরুণীটি বলল, 'আপনি আমাকে কী দেবেন?' আমার সাথী বলল, 'আমার জোব্বা।' আমি বয়সে তার তুলনায় তরুণ ছিলাম, তবে তার জোব্বাটি ছিল আমারটির তুলনায় সুন্দর। তরুণী তার জোব্বা আর আমাকে পছন্দ করল। সে আমাকে বলল, 'আপনি আর আপনার জোব্বা আমার জন্য যথেষ্ট।' সুতরাং আমি তিনদিন তার সাথে কাটালাম। এরপরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'যারা মুত'আ বিয়ে করেছে তারা যেন ওই নারীদের ছেড়ে দেয়।'
৩। মুসলিমে বর্ণিত আছে, সাবরা আল-জুহারী বলেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ছিলেন। তিনি বললেন, 'হে লোকসকল, আমি তোমাদের মুতআ বিয়ের অনুমোদন দিয়েছিলাম, কিন্তু আল্লাহ তা'আলা কেয়ামতের আগ পর্যন্ত এটি নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন। সুতরাং কেউ এমন বিয়ে করে থাকলে তাদের ছেড়ে দাও এবং তাদের যা কিছু দিয়েছ তা ফেরত নিয়ো না। ১৪৮৯
৪। মুসলিমে বর্ণিত আছে, আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ইবনে আব্বাস মুতআ বিয়ের ব্যাপারে সহনশীল আচরণ করছেন বলে তিনি শুনতে পেয়েছেন। তিনি বললেন, 'এক মিনিট, হে ইবনে আব্বাস, আল্লাহর রাসূল খায়বারের দিনে এটাকে নিষিদ্ধ করেছেন এবং তিনি গৃহপালিত গাধার গোশতও নিষিদ্ধ করেছেন। ১৪৯০
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কিন্তু নিজের খেয়ালের বশবর্তী হয়ে মুতআ নিষিদ্ধ করেননি। ৬ষ্ঠ হিজরীতে খায়বারে নিষিদ্ধ করার পরে, ৮ম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবারও স্থায়ীভাবে এই পদ্ধতি বাতিল করে দেন। লোকজন পনেরো দিন পর্যন্ত মুতআ বিয়ে ধরে রাখতে শুরু করেছিল, তখন রাসূল কেয়ামত পর্যন্ত এই পদ্ধতিকে নিষিদ্ধ করে দেন। ১৪৯১
টিকাঃ
১৪৮৭ আশশার মাযাহিরুল ইসলাম, ২/৪৩২; আল-কাদা ফী আহদ ইমর ইবনুল খাত্তাব, ২/৭৫৬।
১৪৮৮ সহীহ, মুসলিম, কিতাব আন-নিকাহ, বাব আল-মুতআহ, হাদীস নং ১০৩৩।
১৪৮৯ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৪০৬।
১৪৯০ সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৪০৭।
১৪৯১ যাদ আল-মাদ, ৫/২৭০।
📄 উমর রা. কর্তৃক সমর্থিত কিছু ফিকহি মতামত
কিসাস, হাদ্দ, অপরাধ এবং তা'যীর দণ্ড বিষয়ক বিচারব্যবস্থায় তার ইজতিহাদের প্রভাব অপরিসীম। তাছাড়া ফিকহ গঠনে তার অবদান থেকে তার জ্ঞানের গভীরতা এবং শরীয়ত বোঝার ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তিনি ফিকহের যে বিষয়গুলো সমর্থন করেছেন এগুলোর উদাহরণ দেওয়া হলো:
১। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে কোনো পশু জীবিত অবস্থায় পাক থাকলে এর চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা জায়েয।
২। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, শেয়ালের চামড়ায় নামায আদায় করা হারাম।
৩। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, সূর্য হেলে যাওয়ার পরে রোযাদার ব্যক্তির জন্য মিসওয়াক করা মাকরূহ নয়; বরং মুস্তাহাব।
৪। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, মোজার উপর (খুফায়ন) উপরে মাসেহ করা যে ব্যক্তি সফর করছে না তার জন্য এক দিন এবং রাত পর্যন্ত জায়েয, আর সফরকারীর জন্য তিন দিন এবং রাত পর্যন্ত জায়েয হবে।
৫। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, কারও অযু ভেঙে গেলে খুফায়নের ওপর দিয়ে মাসেহ করতে হবে।
৬। সূর্য ঢলার পরে জুমআর ওয়াক্ত শুরু হবে।
৭। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, লজ্জাস্থান স্পর্শ করলে অযু নষ্ট হয়ে যায়।
৮। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, আরাফার দিনে ফজরের পরে ঈদের তাকবীর শুরু হয় এবং আত-তাশরীকের শেষ দিনের আসর পর্যন্ত ওয়াক্ত থাকে।
৯। আবু বকর এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমের মতে, জানাযার সামনে দিয়ে হাঁটা উত্তম।
১০। তার মতে, শিশু এবং অপ্রকৃতস্থ ব্যক্তির পক্ষ থেকে যাকাত আদায় করা ফরয।
১১। একসাথে কাজ করার সময় উভয় পক্ষ চাইলে তারা তাদের লেনদেন বিষয়ক চুক্তি বাতিল করতে পারবে বলে তিনি মত দেন।
১২। পশুপাখির জন্য অগ্রিম নেওয়া বৈধ নয় বলে তিনি মত দেন।
১৩। তার মতে, সময় মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে বন্ধক রাখা জিনিসপত্র ঋণের বদলে বিক্রি হয়ে গেছে এমন চুক্তি করা হলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে।
১৪। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, পাওনাদারের মালামাল দেনাদারের কাছে পাওয়া গেলে সে (পাওনাদার) এর সর্বোচ্চ হকদার।
১৫। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, কোনো মেয়ে বালেগা হওয়ার পরে তাকে বিয়ে দেওয়া কিংবা তার সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে অথবা স্বামীর বাড়িতে এক বছর কাটানোর আগে তাকে অর্থ দেওয়া যাবে না।
১৬। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, পশুর চোখের ক্ষতিপূরণ হলো এর মূল্যের এক-চতুর্থাংশ।
১৭। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, সাধারণ সম্পত্তি যা এখনো বণ্টন করা হয়নি, তাতে শরীকদের জন্য অগ্রক্রয়াধিকার (শুফআ) বৈধ। তবে প্রতিবেশীদের এই অধিকার নেই।
১৮। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, সব ধরনের গাছ নিয়ে মুসাকা ১৪৯২ চুক্তি করা জায়েয।
১৯। আবু বকর এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমের মতে, পোশাকের বিনিময়ে শ্রমিক নিয়োগ করা জায়েয।
২০। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, উপহার (হেবা-দান) গ্রহণ করার পূর্ব পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করা নিষিদ্ধ নয়।
২১। তার মতে আত্মীয়-স্বজনের বাইরে কাউকে উপহার দেওয়া হলে তা ফিরিয়ে নেওয়া যাবে, তবে তা পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হলে ফেরত নেওয়া যাবে না। আত্মীয়-স্বজনকে উপহার দেওয়া হলে তা ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না।
২২। তার মতে, হারানো মালামাল ঘোষণার সময়সীমা এক বছর।
২৩। তার মতে, হারানো মালামাল যদি নগণ্য হয় তবে এগুলো ঘোষণা ছাড়াই ব্যবহার করা যাবে।
২৪। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, হারানো সম্পদের ঘোষণা দেবার পরে সময় পার হয়ে গেলে, তা তার সম্পদে পরিণত হবে, সে ধনী হোক বা দরিদ্র।
২৫। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, পুণ্যস্থানের বাইরে বা ভিতরে যেখান থেকেই হারানো মালামাল পাওয়া যাক না কেন একই বিধান পালিত হবে।
২৬। তার মতে, কেউ কোনো শিশু কুড়িয়ে পেলে সে যদি বিশ্বস্ত হয় তবে তার সাথেই শিশুটিকে রাখতে হবে।
২৭। তার মতে, কেউ চাইলে তার অসিয়ত পরিবর্তন করতে পারবে। তিনি বলেছেন, 'যে কেউ ইচ্ছেমাফিক তার অসিয়ত পরিবর্তন করতে পারবে।'
২৮। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, যে মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান বা পিতা-মাতা নেই সে খালালা।
২৯। তার মতে, কন্যা বা বোন থাকলে পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে তাদের হক আছে।
৩০। কারও একজন স্বামী, একজন মা, মায়ের পেটের ভাইবোন, এবং বাবা-মায়ের দিক থেকে ভাইবোন থাকলে উলামায়ে কেরাম আগে এবং পরে তার উত্তরাধিকার বণ্টন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। বর্ণিত আছে, উমর, উসমান এবং যায়দ ইবনে সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুমের মতে বাবা-মা উভয়ের এবং মায়ের সন্তানেরা এক-তৃতীয়াংশ পাবে, এখানে প্রত্যেক পুরুষ দুজন নারীর সমান অংশ পাবে।
৩১। সম্পত্তির পরিমাণ যা-ই হোক, তার মতে দাদীদের এক-ষষ্ঠাংশ পাওয়া উচিত। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুও এর পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
৩২। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, একজন মা, একজন বোন এবং একজন দাদা থাকলে পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে বোন অর্ধাংশ, অবশিষ্ট অংশ থেকে মা এক-তৃতীয়াংশ এবং এর অবশিষ্ট অংশ দাদা পাবে।
৩৩। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, একজন স্বামী এবং বাবা-মা থাকলে স্বামী অর্ধাংশ পাবে, অবশিষ্ট অংশ থেকে মা পাবে এক তৃতীয়াংশ এবং এর অবশিষ্ট অংশ বাবা পাবে। এই ফাতওয়া দুটো আল-উমারিয়া নামে পরিচিত, কারণ, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এগুলোর প্রবর্তক।
৩৪। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, আত্মীয়-স্বজনকে উত্তরাধিকার সম্পদ থেকে কিছু অংশ দেওয়া উচিত, যদিও তারা এর নির্দিষ্ট কোনো অংশ পাওয়ার অধিকার রাখে না।
ফিকহশাস্ত্রে এগুলো উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কয়েকটি মত। আমি কেবল এগুলো সংক্ষিপ্তাকারে এখানে উপস্থাপন করেছি। এসব বিষয়ে আরও অনেক গবেষণা এবং বিশ্লেষণের সুযোগ রয়েছে।
টিকাঃ
১৪৯২ আল-কাদা ফী আহদ ইমর ইবনুল খাত্তাব, ২/৭৫৬।
কিসাস, হাদ্দ, অপরাধ এবং তা'যীর দণ্ড বিষয়ক বিচারব্যবস্থায় তার ইজতিহাদের প্রভাব অপরিসীম। তাছাড়া ফিকহ গঠনে তার অবদান থেকে তার জ্ঞানের গভীরতা এবং শরীয়ত বোঝার ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তিনি ফিকহের যে বিষয়গুলো সমর্থন করেছেন এগুলোর উদাহরণ দেওয়া হলো:
১। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে কোনো পশু জীবিত অবস্থায় পাক থাকলে এর চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা জায়েয।
২। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, শেয়ালের চামড়ায় নামায আদায় করা হারাম।
৩। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, সূর্য হেলে যাওয়ার পরে রোযাদার ব্যক্তির জন্য মিসওয়াক করা মাকরূহ নয়; বরং মুস্তাহাব।
৪। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, মোজার উপর (খুফায়ন) উপরে মাসেহ করা যে ব্যক্তি সফর করছে না তার জন্য এক দিন এবং রাত পর্যন্ত জায়েয, আর সফরকারীর জন্য তিন দিন এবং রাত পর্যন্ত জায়েয হবে।
৫। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, কারও অযু ভেঙে গেলে খুফায়নের ওপর দিয়ে মাসেহ করতে হবে।
৬। সূর্য ঢলার পরে জুমআর ওয়াক্ত শুরু হবে।
৭। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, লজ্জাস্থান স্পর্শ করলে অযু নষ্ট হয়ে যায়।
৮। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, আরাফার দিনে ফজরের পরে ঈদের তাকবীর শুরু হয় এবং আত-তাশরীকের শেষ দিনের আসর পর্যন্ত ওয়াক্ত থাকে।
৯। আবু বকর এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমের মতে, জানাযার সামনে দিয়ে হাঁটা উত্তম।
১০। তার মতে, শিশু এবং অপ্রকৃতস্থ ব্যক্তির পক্ষ থেকে যাকাত আদায় করা ফরয।
১১। একসাথে কাজ করার সময় উভয় পক্ষ চাইলে তারা তাদের লেনদেন বিষয়ক চুক্তি বাতিল করতে পারবে বলে তিনি মত দেন।
১২। পশুপাখির জন্য অগ্রিম নেওয়া বৈধ নয় বলে তিনি মত দেন।
১৩। তার মতে, সময় মতো ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে বন্ধক রাখা জিনিসপত্র ঋণের বদলে বিক্রি হয়ে গেছে এমন চুক্তি করা হলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে।
১৪। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, পাওনাদারের মালামাল দেনাদারের কাছে পাওয়া গেলে সে (পাওনাদার) এর সর্বোচ্চ হকদার।
১৫। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, কোনো মেয়ে বালেগা হওয়ার পরে তাকে বিয়ে দেওয়া কিংবা তার সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে অথবা স্বামীর বাড়িতে এক বছর কাটানোর আগে তাকে অর্থ দেওয়া যাবে না।
১৬। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, পশুর চোখের ক্ষতিপূরণ হলো এর মূল্যের এক-চতুর্থাংশ।
১৭। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, সাধারণ সম্পত্তি যা এখনো বণ্টন করা হয়নি, তাতে শরীকদের জন্য অগ্রক্রয়াধিকার (শুফআ) বৈধ। তবে প্রতিবেশীদের এই অধিকার নেই।
১৮। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, সব ধরনের গাছ নিয়ে মুসাকা ১৪৯২ চুক্তি করা জায়েয।
১৯। আবু বকর এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমের মতে, পোশাকের বিনিময়ে শ্রমিক নিয়োগ করা জায়েয।
২০। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, উপহার (হেবা-দান) গ্রহণ করার পূর্ব পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করা নিষিদ্ধ নয়।
২১। তার মতে আত্মীয়-স্বজনের বাইরে কাউকে উপহার দেওয়া হলে তা ফিরিয়ে নেওয়া যাবে, তবে তা পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হলে ফেরত নেওয়া যাবে না। আত্মীয়-স্বজনকে উপহার দেওয়া হলে তা ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না।
২২। তার মতে, হারানো মালামাল ঘোষণার সময়সীমা এক বছর।
২৩। তার মতে, হারানো মালামাল যদি নগণ্য হয় তবে এগুলো ঘোষণা ছাড়াই ব্যবহার করা যাবে।
২৪। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, হারানো সম্পদের ঘোষণা দেবার পরে সময় পার হয়ে গেলে, তা তার সম্পদে পরিণত হবে, সে ধনী হোক বা দরিদ্র।
২৫। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, পুণ্যস্থানের বাইরে বা ভিতরে যেখান থেকেই হারানো মালামাল পাওয়া যাক না কেন একই বিধান পালিত হবে।
২৬। তার মতে, কেউ কোনো শিশু কুড়িয়ে পেলে সে যদি বিশ্বস্ত হয় তবে তার সাথেই শিশুটিকে রাখতে হবে।
২৭। তার মতে, কেউ চাইলে তার অসিয়ত পরিবর্তন করতে পারবে। তিনি বলেছেন, 'যে কেউ ইচ্ছেমাফিক তার অসিয়ত পরিবর্তন করতে পারবে।'
২৮। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, যে মৃত ব্যক্তির কোনো সন্তান বা পিতা-মাতা নেই সে খালালা।
২৯। তার মতে, কন্যা বা বোন থাকলে পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে তাদের হক আছে।
৩০। কারও একজন স্বামী, একজন মা, মায়ের পেটের ভাইবোন, এবং বাবা-মায়ের দিক থেকে ভাইবোন থাকলে উলামায়ে কেরাম আগে এবং পরে তার উত্তরাধিকার বণ্টন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন। বর্ণিত আছে, উমর, উসমান এবং যায়দ ইবনে সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুমের মতে বাবা-মা উভয়ের এবং মায়ের সন্তানেরা এক-তৃতীয়াংশ পাবে, এখানে প্রত্যেক পুরুষ দুজন নারীর সমান অংশ পাবে।
৩১। সম্পত্তির পরিমাণ যা-ই হোক, তার মতে দাদীদের এক-ষষ্ঠাংশ পাওয়া উচিত। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুও এর পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
৩২। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, একজন মা, একজন বোন এবং একজন দাদা থাকলে পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে বোন অর্ধাংশ, অবশিষ্ট অংশ থেকে মা এক-তৃতীয়াংশ এবং এর অবশিষ্ট অংশ দাদা পাবে।
৩৩। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, একজন স্বামী এবং বাবা-মা থাকলে স্বামী অর্ধাংশ পাবে, অবশিষ্ট অংশ থেকে মা পাবে এক তৃতীয়াংশ এবং এর অবশিষ্ট অংশ বাবা পাবে। এই ফাতওয়া দুটো আল-উমারিয়া নামে পরিচিত, কারণ, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এগুলোর প্রবর্তক।
৩৪। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে, আত্মীয়-স্বজনকে উত্তরাধিকার সম্পদ থেকে কিছু অংশ দেওয়া উচিত, যদিও তারা এর নির্দিষ্ট কোনো অংশ পাওয়ার অধিকার রাখে না।
ফিকহশাস্ত্রে এগুলো উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কয়েকটি মত। আমি কেবল এগুলো সংক্ষিপ্তাকারে এখানে উপস্থাপন করেছি। এসব বিষয়ে আরও অনেক গবেষণা এবং বিশ্লেষণের সুযোগ রয়েছে।
টিকাঃ
১৪৯২ আল-কাদা ফী আহদ ইমর ইবনুল খাত্তাব, ২/৭৫৬।