📄 বিচার পদ্ধতির মূলনীতি
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা অনুসরণ করতেন খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও তা অনুসরণ করা হয়েছে, অর্থাৎ, কুরআন ও সুন্নাহ এবং ইজতিহাদ। তবে এর সাথে আরও কিছু যোগ হয়েছিল: ইজতিহাদ পদ্ধতি এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে আলোচনা, শূরা, ইজমা (সর্বসম্মতি), রায় (মতামত) এবং কিয়াসের (নযীর) মতো নতুনত্ব যোগ হয়েছিল। তাছাড়া বিভিন্ন খলীফার যুগে সাহাবায়ে কেরামের উদাহরণ অনুসরণ করার বিষয়টিও নতুন ছিল, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় ছিল না। সমস্যা, মামলা এবং ফাতওয়ার বেলায় এই উৎসগুলো কিন্তু শূরা এবং পরামর্শ দ্বারা সমর্থিত। বিভিন্ন বর্ণনা এবং উদ্ধৃতি থেকে উপর্যুক্ত বক্তব্যের পক্ষে তথ্য পাওয়া গেছে। [cite: ১৪০১]
১। আশ-শাবী. বর্ণনা করেছেন যে, শুরায়হ বলেছেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আমাকে বললেন, ‘আল্লাহর কিতাব থেকে যা জানেন তার ভিত্তিতে বিচার করবেন; আল্লাহর কিতাব থেকে না পারলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফাতওয়া অনুসরণ করতে হবে; তারপরে ইমামদের ফাতওয়া অনুসরণ করতে হবে। ইমামদের কারও ফাতওয়া এর সাথে না গেলে নিজে সমাধানের চেষ্টা করবেন এবং জ্ঞানী ও ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেবেন। [cite: ১৪০২]
২। ইবনে শিহাব আয-যুহরী থেকে বর্ণিত হয়েছে, উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘হে লোকসকল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব সময় সঠিক রায় (ব্যক্তিগত মতামত) দিতেন। কারণ, আল্লাহ তা’আলা তাকে সাহায্য করেছেন। আর আমরা কল্পনা এবং ধারণা করে মতামত দিই। [cite: ১৪০৩] তার এই বক্তব্যের বর্ণনা পাওয়া যায়, তিনি বলেছিলেন, ‘এটা উমরের মতামত; সঠিক হয়ে থাকলে তা আল্লাহ প্রদত্ত এবং ভুল হলে এর দায় উমরের।’ [cite: ১৪০৪]
৩। ইবনুল কায়্যিম বলেছেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে খলীফা নিয়োগ করার সময় তিনি বলছিলেন, ‘আল্লাহ তা’আলার সামনে আবু বকরের কোনো কথা প্রত্যাখ্যান করতে আমি লজ্জাবোধ করি। [cite: ১৪০৫] শুরায়হকে লেখা একটি চিঠিতেও তার এই বক্তব্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কিতাব অনুসরণ করে বিচার করবেন। সেখান থেকে না পারলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুসরণ করবেন। সেখানে না পেলে ধর্মনিষ্ঠদের ফাতওয়া অনুসরণ করবেন।’ [cite: ১৪০৬]
৪। ইজমা (ঐকমত্য): বিচারক কুরআন এবং সুন্নাহ থেকে কোনো বিষয় খুঁজে না পেলে সাহাবায়ে কেরাম এবং ফকীহদের শরণাপন্ন হতেন। তাদের সাথে আলোচনা করার পরে তারা গবেষণার মাধ্যমে সমাধান বের করার চেষ্টা করতেন। কোনো বিষয়ে মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হলে একে ইজমা বলা হয়। কোনো একটি প্রজন্মের উম্মতে মুহাম্মাদী শরীয়তের কোনো বিষয়ে একমত হলে তা সর্বসম্মতি বা ইজমা নামে পরিচিত হয়। উলামায়ে কেরামের একমত পোষণের এই প্রক্রিয়াটি হলো ইসলামী আইন প্রণয়নের তৃতীয় উৎস। খুলাফায়ে রাশেদীনের সময়ে এই পদ্ধতির প্রচলন ঘটেছিল। এ প্রসঙ্গে ফিকহ গ্রন্থ, উসূল আল-ফিকহ এবং আইন সংক্রান্ত ইতিহাসের কিতাবে বিস্তারিত আলোচনা লক্ষণীয়। তবে খুব কম বিষয়ে এমন ঐকমত্য দেখা গেছে। কেবলমাত্র মদীনায় এগুলোর অস্তিত্ব ছিল। কারণ, মদীনা ছিল খেলাফতকালীন রাজধানী এবং সাহাবায়ে কেরাম, উলামায়ে কেরাম এবং ফকীহগণের মিলনমেলা। অন্য কোনো নগরের বেলায় এ ছিল বিরল ঘটনা। [cite: ১৪০৭]
এই তথ্যের একটি বর্ণনা এমন, ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে জানতে চান, ‘আপনাদের ভাষায় দুই ভাই (আখাওয়ান) বলতে কিন্তু ভাইদের (ইখওয়ান) বোঝানো হয় না। তাহলে এই আয়াতের ভিত্তিতে তাদের মায়ের উত্তরাধিকার সম্পত্তি এক-তৃতীয়াংশ থেকে কমিয়ে কেন এক-ষষ্ঠাংশ করা হয়েছে? : فَإِنْ كَانَ لَةَ إِخْوَةٌ فَلِأُمِّهِ السُّدُسُ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُومِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ অতঃপর যদি মৃতের কয়েকজন ভাই থাকে, তবে তার মাতা পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ অসিয়তের পর-যা করে সে ইন্তেকাল করেছে— অথবা ঋণ পরিশোধের পর। [cite: ১৪০৮]
উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘যে ফাতওয়া আমার আগে প্রদান করা হয়ে গেছে আমি সেগুলো অগ্রাহ্য করতে পারব না। তাছাড়া এগুলো প্রচলিত হয়ে গেছে এবং সবাই তা গ্রহণ করে নিয়েছে।’ এর অর্থ, ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু অভিযোগ তোলার আগেই আলোচ্য বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তাই এই বিষয়ের ওপরে তার অভিযোগের কোনো প্রভাব পড়েনি। তিনটি মূলনীতির ওপরে ভিত্তি করে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়: আলোচনা, ইজতিহাদ এবং সহমত। এর মধ্যে কোনোটির ঘাটতি থাকলে বিচারককে অন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। [cite: ১৪০৭]
৫। আইনগত নযীর: প্রাক্তন খলীফা, ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং বুযুর্গ সাহাবায়ে কেরামের ফাতওয়া। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ফাওতয়ার ঘটনা থেকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দিয়েছেন। বিচারক এবং গভর্নরদের প্রতিও তার একই নির্দেশ ছিল। [cite: ১৪০৯] ‘আমাদের মতামতের তুলনায় সাহাবায়ে কেরামের মতামত উত্তম’-এই শিরনামের অধীনে ইবনুল কায়্যিম এর স্পষ্ট ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের মতামতের তুলনায় উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের মতামত উত্তম। তা নয়তো কী? কারণ, নূর, ঈমান, জ্ঞান এবং আল্লাহ তা’আলা ও তার রাসূলের প্রতি বোধসম্পন্ন হৃদয় এবং উম্মতের প্রতি আন্তরিকতা থেকে এসব মন্তব্য উৎসারিত হয়েছে। তারা মধ্যস্থতাকারীদের এড়িয়ে সরাসরি নবীকে অনুসরণ করেছেন। তারা সরাসরি ঐশী উৎস থেকে খাঁটি এবং তরতাজা ইলম ও ঈমান লাভ করেছিলেন। সেখানে না ছিল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, আর না ছিল সংঘাত। সুতরাং কেউ যদি তার নিজস্ব মতামতকে তাদের মতো উত্তম বলে মনে করে, তবে তা মারাত্মক ভুল হবে।’ [cite: ১৪১০]
৬। সাদৃশ্য (কিয়াস) : আইনগত সাদৃশ্য পাওয়া বিরল ঘটনা। বিচারক আয়াত কিংবা ঐকমত্য, কিংবা আইনগত সাদৃশ্যপূর্ণ নযীর না পেলে তাকে ইজতিহাদের ওপরে নির্ভর করতে হয়। মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে এ কথা বলা হয়েছে। কোথাও কোনো তথ্য না পেয়ে ইজতিহাদ করতে গেলে সবার আগে সাদৃশ্য খোঁজার বিষয় চলে আসে। আইন প্রণয়ন, ফিকহ এবং ফাতওয়া প্রদানের এটি চতুর্থ উৎস। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ঠিক এই কথাটিই উল্লেখ করেছিলেন। তিনি আবু মূসা আল-আশআরীকে লিখেছিলেন, ‘তারপরে সাদৃশ্যপূর্ণ ঘটনা খুঁজে দেখবেন এবং মেলাবেন। এবং খুঁজে দেখুন কোন সিদ্ধান্তটি আল্লাহ তা’আলার কাছে গ্রহণযোগ্য এবং কোনটি তুলনামূলক সঠিক।’ [cite: ১৪১১]
৭। মতামত (রায়): তুলনা করার মতো সাদৃশ্যপূর্ণ ঘটনা পাওয়া না গেলে বিচারককে নিজ থেকে সিদ্ধান্ত দিতে হবে এবং তা হতে হবে সত্য, ইনসাফ এবং শরীয়তের মূলনীতি ও লক্ষ্যের নিকটতম। শুরায়হ এবং অন্যদের কাছে পাঠানো চিঠিগুলোয় বার বার এ কথাই বলা হয়েছে। [cite: ১৪১২]
বিচারকদের কাছে আলোচনা এবং শূরা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। উপর্যুক্ত বর্ণনা, কিতাব এবং চিঠিপত্র এর প্রমাণ। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা ও কাজ থেকেও আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে তিনি ইসলাম সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও শূরা পদ্ধতির ভক্ত ছিলেন। সাহাবায়ে কেরাম এবং ফকীহদের সাথে পরামর্শ না করে তিনি নিজে থেকে খুব একটা সিদ্ধান্ত নিতেন না। [cite: ১৪১৩] ইমাম আশ-শা’বী থেকে বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে কোনো মামলা উপস্থিত হলে, সাথীদের সাথে আলোচনা করে মাসখানেক সময় নিতেও দেখা গেছে। [cite: ১৪১৪]
টিকাঃ
১৪০১. আন-নিযাম আল-কাদাই, মান্না আল-কাত্তান, পৃ. ৮০।
১৪০২. ইলাম আল-মুয়াজ্বিঈন, ১/২২৪; তারীখ আল-কাদা ফীল ইসলাম, পৃ. ১১৯।
১৪০৩. তারীখ আল-কাদা ফীল ইসলাম, পৃ. ১২০; ইলাম আল-মুয়াঈিন, ইবনুল কয়্যিম, ১/৫৭।
১৪০৪. ইলাম আল-মুয়াজ্বিঈন, ১/৫৮; তারীখ আল-কাদা ফীল ইসলাম, পৃ. ১২০।
১৪০৫. ইলাম আল-মুয়াজ্বিঈন, ইবনুল কায়্যিম, ১/২২৪।
১৪০৬. তারীখ আল-কাদা ফীল ইসলাম, পৃ. ১২০।
১৪০৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২২।
১৪০৮. সূরা আন-নিসা, ৪:১১।
১৪০৯. তারীখ আল-কাদা ফীল ইসলাম, পৃ. ১২২, ১২৩।
১৪১০. ইলাম আল-মুয়াজ্বিঈন, ১/৮৭; তারীখ আল-কাদা ফীল ইসলাম, পৃ. ১২০।
১৪১১. তারীখ আল-কাদা ফীল ইসলাম, পৃ. ১২৪।
১৪১২. ইলাম আল-মুয়াজ্বিঈন, ১/৭০।
১৪১৩. তারীখ আল-কাদা ফীল ইসলাম, পৃ. ১২৫।
১৪১৪. প্রাগুক্ত।
📄 কেমন প্রমাণের ওপরের বিচারকরা নির্ভর করবেন
বিচারকেদরে ফাতওয়া এই বিষয়গুলোর ওপরে নির্ভর করবে :
১। স্বীকারোক্তি, এবং হাতের লেখাকেও স্বীকারোক্তি হিসেবে গণ্য করতে হবে।
২। সাক্ষ্য: সাক্ষীরা সাক্ষ্য প্রদানের যোগ্য কি না তা সবার আগে যাচাই করে নিতে হবে। বিচারক যদি সাক্ষীকে ব্যক্তিগতভাবে না চেনেন, তবে এমন কারও কাছ থেকে তার সম্পর্কে তথ্য নিতে হবে যে কিনা ওই ব্যক্তিকে চেনে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এক ব্যক্তি সাক্ষ্য দিতে এসেছিল পরে তাকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আপনাকে চিনি না। এমন কাউকে নিয়ে আসুন, যে আপনাকে চেনে।’ তাদের মধ্য থেকে এক লোক বলল, ‘আমি তাকে চিনি।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আপনি তার সম্পর্কে কী জানেন?’ সে বলল, ‘তিনি ভালো চরিত্রের অধিকারী এবং গুণবান।’ তিনি বললেন, ‘তিনি কী আপনার নিকটতম প্রতিবেশী এবং তার আসা-যাওয়া সম্পর্কে আপনার ধারণা আছে?’ সে বলল, ‘না।’ তিনি বললেন, ‘তার সাথে কী আপনার অর্থনৈতিক লেন-দেন হয়, যা থেকে তার আল্লাহভীতি সম্পর্কে আপনি অবগত?’ সে বলল, ‘না।’ তিনি বললেন, ‘তবে আপনি তাকে চেনেন না।’ [cite: ১৪১৫]
শপথের তুলনায় সাক্ষ্যপ্রদানের গুরুত্ব অনেক বেশি। এখন এই শপথ প্রতিপক্ষের আগে নিচ্ছে, না পরে, তা জরুরী নয়। অভিযোগকারীর কথামতো বিচারক যদি অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শপথ করান, অতঃপর অভিযোগকারী যদি প্রমাণ উপস্থাপন করে তখন প্রমাণ গ্রহণযোগ্যতা পাবে আর শপথ বাতিল হয়ে যাবে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, ‘স্পষ্ট প্রমাণের কাছে মিথ্যা শপথ বাতিলযোগ্য।’ [cite: ১৪১৬]
অভিযোগকারীর সাক্ষ্য গ্রহণ করতে হবে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছিলেন, ‘অভিযোগকারীকে প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে আর যে অস্বীকার করবে তাকে শপথ করাতে হবে।’ [cite: ১৪১৭] এখন অভিযোগকারীর পক্ষে একজন সাক্ষী থাকলেও তার সাক্ষ্য মঞ্জুর করতে হবে। সেই সাথে অভিযোগকারীকেও শপথ করতে হবে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাধারণত অর্থনৈতিক বিবাদ মেটানোর সময় একজনের শপথ এবং একজনের সাক্ষ্য নিয়ে ফাতওয়া দিতেন। [cite: ১৪১৮]
১। শপথ: অভিযোগকারী প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হলে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিতে শপথ করানোর অনুরোধ না করা পর্যন্ত বিচারক যেন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শপথ না করান। কারণ, একবার শপথ করে ফেললে বিচারক ওই শপথের ভিত্তিতে বিচার করতে বাধ্য থাকবেন। উমর এবং উবাই ইবনে কাব রাযিয়াল্লাহু আনহুম একটি বাগানের জের ধরে যায়দ ইবনে সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে বিচার চাইতে যান। উবাই রাযিয়াল্লাহু আনহু বাগানটি তার বলে দাবি করছিলেন। সুতরাং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শপথ করেছিলেন, এবং যায়দ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, ‘আমীরুল মুমিনীনকে ছেড়ে দিন।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘তিনি আমীরুল মুমিনীনকে ছাড় দিতে যাবেন কেন? কোনো কিছুর ওপরে আমার হক থেকে থাকলে আমি এই শপথের অসিলায় তা পাব, নয়তো তা দাবি করতে যাব না। যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই সেই সত্তার কসম, এটা আমার বাগান এবং এর ওপরে উবাইয়ের কোনো অধিকার নেই।’ মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার পরে তিনি উবাইকে উপহার হিসেবে ওই বাগান দিয়ে দেন। তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, ‘শপথের আগে বাগানটি দিয়ে দেননি কেন?’ তিনি বললেন, ‘আমি এভাবে শপথ না করলে আমার পরবর্তী লোকেরা শপথ করবে না বলে আমার ভয় ছিল। তা এক সময় প্রথায় পরিণত হয়ে যেত। [cite: ১৪১৯]
যাকে শপথ গ্রহণ করতে হবে, ধর্মনিষ্ঠতার কারণ দেখিয়ে তাকে শপথ না করালে, বিষয়টি জায়েয হবে না। কারণ, উল্লিখিত ঘটনায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পর্যন্ত শপথ নিতে দেখা গেছে। মামলায় জিতে যাওয়ার পরে তিনি তার অধিকার ছেড়ে দেন।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দুই পক্ষকেই খুব গুরুত্বের সাথে শপথ করিয়েছেন। দুই পক্ষ যে জায়গার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, এমন পবিত্র জায়গায় নিয়ে তাদের শপথ করাতেন। কারণ, তারা সেখানে মিথ্যা বলার সাহস পেত না। তিনি মুররার একটি দলকে হিজরে এবং আরেকটি দলকে রুকন এবং মাকামের মাঝখানে নিয়ে শপথ করিয়েছিলেন। [cite: ১৪২০]
২। বংশ মর্যাদার সাথে সম্পৃক্ত মামলায় পারিবারিক সখ্যের প্রতি নজর রাখা: ফাতওয়ার জন্য এটাও অন্যতম শর্ত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, খুলাফায়ে রাশেদীন এবং সাহাবায়ে কেরামগণ এই দিকে ইশারা করেছেন। উমর ইবনুল খাত্তাব, ইবনে আব্বাস এবং অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম এই প্রমাণগুলোর ভিত্তিতে ফাতওয়া প্রদানের অনুমোদন দিয়ে গেছেন। [cite: ১৪২১]
৩। পারিপার্শ্বিক প্রমাণ: পারিপার্শ্বিক প্রমাণের মধ্যে বিপুল সংখ্যক উদাহরণ বিদ্যমান। একজন বিচারককে বুদ্ধি খাটিয়ে এগুলো বের করতে হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়-অবিবাহিত নারীর গর্ভধারণ; যা যিনার প্রমাণ বহন করে। নির্ধারিত সময়ের আগেই শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়াও এমন একটি উদাহরণ। দুই মৃতব্যক্তির শরীর, একটার ওপরে আরেকটা থাকলে একেও পারিপার্শ্বিক প্রমাণ বলা হয়। কারণ, আগে মৃত্যুবরণকারীর শরীর নিচে থাকে। আমওয়াসের প্লেগের সময় এক মৃতব্যক্তির হাত বা পা আরেকজনের ওপরে ছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ফাতওয়া দিলেন, নিম্নোক্ত ব্যক্তির পরে ওপরের জন মৃত্যুবরণ করেছে। কারণ, মৃত্যুর পরে নিচে যাওয়া সম্ভব নয়। মাতাল ব্যক্তির বমি তার মদ খাওয়ার প্রমাণ বহন করে। তাই এটাও পারিপার্শ্বিক প্রমাণ। এক ব্যক্তির বমিতে মদের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল বলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে হদ্দ-দণ্ড দিয়েছিলেন। [cite: ১৪২২]
৪। বিচারকের পূর্ব অভিজ্ঞতা: হদ্দ শাস্তির বেলায়, বিচারকের পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফাতওয়া দেওয়া যাবে না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে এ কারণেই লিখেছিলেন যে, একজন ইমাম তার নিজস্ব জ্ঞান, কল্পনা বা সন্দেহের ভিত্তিতে বিচার করতে পারবেন না। [cite: ১৪২৩] তিনি আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমি যদি কাউকে হত্যা, চুরি বা যিনা করতে দেখি, তখন কী করবেন?’ তিনি বললেন, ‘আপনার সাক্ষ্যও আর দশজন সাধারণ মুসলমানের মতো গণ্য হবে।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আপনি ঠিক বলেছেন।’ [cite: ১৪২৪] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে যে, তিনি হুদূদ শাস্তির ক্ষেত্রে বিচারককে পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করতে নিরুৎসাহিত করেছেন। প্রমাণ যদি না-ও থাকে এবং বিচারর এ বিষয়ে যথেষ্ট অভিজ্ঞতাও রাখেন তবুও এমন করা যাবে না। [cite: ১৪২৫] তাছাড়া তিনি চাইতেন মানুষ যেন গুনাহ স্বীকার করার বদলে অনুতপ্ত হয় এবং বিষয়টি আল্লাহ তা’আলা এবং তার মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখে। শূরাহ ইবনে আস-সামত আল-কিন্দি আল-মাদাইনের সীমান্তরক্ষার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘হে লোকসকল, তোমাদের ভূখণ্ডে অবাধে মদ্যপান করতে দেখা যায় এবং এখানে অনেক নারীর বসবাস। তোমাদের মধ্যে কেউ হাদ্দ-শাস্তি পাওয়ার মতো অপরাধ করে থাকলে তাকে আমাদের কাছে নিয়ে আসবে। আমরা তাকে শাস্তি দেব, যাতে সে শুধরে যায়।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কানে এই খবর গেল পরে তিনি চিঠি দিলেন, ‘আল্লাহ তা’আলা যা গোপন করে রেখেছেন তা সবার সামনে প্রকাশ করা জায়েয নয়।’ [cite: ১৪২৬]
তবে রাষ্ট্রের কাছে কেউ অভিযোগ নিয়ে হাজির হলে কোনো রকম বাধা ছাড়া হাদ্দ শাস্তি দেওয়া যাবে। [cite: ১৪২৭] প্রতিপক্ষের মাঝে সুরাহা করার আগে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই দুআ করতেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি জানেন, বিচারের জন্য দুটো পক্ষ যখন আমার সামনে বসে থাকে তখন সামান্যতম ভুল যেন না হয়, আমাকে এই আশংকা পেয়ে বসে। আমাকে ক্ষণিকের জন্যও শাস্তি দেবেন না।’ [cite: ১৪২৮]
টিকাঃ
১৪১৫. সুনান আল-বায়হাকী, ১০/১২৫; মাউসূআ ফিকহ উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ৭৩১।
১৪১৬. মাউসূআ ফিকহ উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ৭৩১।
১৪১৭. সুনান আল-বায়হাকী, ১০/১৫৩, ১৫০।
১৪১৮. আল-মুগনি, ৯/১৫১; মাউসূআত ফিকহ উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ৭৩২।
১৪১৯. তারীখ আল-মাদীনা আল-মুনাওয়ারা, ২/৭৫৫; মাউসূআত ফিকহ উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ৭৩২।
১৪২০. মাউসূআত ফিকহ উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ৭৩৩।
১৪২১. নিযাম আল-কাদাই, মান্না আল-কাত্তান, পৃ. ৮১, ৮২।
১৪২২. মাউসূআত ফিকহ উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ৭৩৫।
১৪২৩. প্রাগুক্ত এবং মুসান্নাফ আব্দুর-রাযযাক, ৮/ ৩৪২।
১৪২৪. সুনান আল-বয়হাকী, ১০/১৪৪; মাউসূআত ফিকহ উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ৭৩৫।
১৪২৫. মাউসূআত ফikহ উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ৭৩৫।
১৪২৬. আল-কাদা ফী খিলাফাত আল-উমর, নাসির আত-তুরাইফি, ২/৮৬২।
১৪২৭. আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ১৪৬।
১৪২৮. আল-হিলইয়া, ৬/১৪০; আত-তাবাকাত, ৩/২৯০, এর সনদ সহীহ।
📄 ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপর রোধে বিধিনিষেধ
এটা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আরেকটি কালজয়ী ইজতেহাদ। এতে প্রমাণিত হয় যে, জনস্বার্থ ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে এবং অপচয় রোধ করতে গিয়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ওপরে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করা সম্ভব। মালিক তার আল-মুয়াত্তায় উল্লেখ করেছেন:
আমর ইবনে ইয়াহিয়া আল-মাযিনী তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, আল-আরীদ থেকে পানি আনার জন্য আদ-দাহহাক ইবনে খলীফা খাল খনন করতে চাচ্ছিলেন। মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামার জমির ওপর দিয়ে খাল খননের প্রয়োজন দেখা দেয়। অথচ মুহাম্মাদ তাতে রাজি ছিলেন না। আদ-দাহহাক তাকে বললেন, 'এতে আপনার উপকার হবে। তারপরেও কেন বাধা দিচ্ছেন? এই পানি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপনি পান করতে পারবেন। তাছাড়া এতে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না।' তারপরেও তিনি রাজি হননি। আদ-দাহহাক বিষয়টি নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে আলাপ করলেন। খলীফা মুহাম্মাদের নামে সমন জারি করলেন এবং তাকে খাল খননের সুযোগ দিতে বললেন। তাতেও কাজ হলো না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যে কাজে আপনার ও আপনার ভাই, দুজনেরই উপকার হবে তা করতে দিচ্ছেন না কেন? শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই পানি আপনার কাজে লাগবে আর এতে তো কোনো ক্ষতি নেই।' মুহাম্মাদ বললেন, 'না।' এবার উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, আপনার পেটের উপর দিয়ে হলেও সে এই খাল আনবে।' খলীফার নির্দেশে আদ-দাহহাক কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন। ১৪৭৩
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এখানে আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর একটি হাদীসের সাথে মিল খুঁজে পান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'কেউ তার প্রতিবেশীকে তার দেয়ালে কাঠের টুকরো ঠিক করা থেকে বিরত রাখতে পারবে না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ফাতওয়া খুব স্পষ্ট ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিবেশীকে তার দেয়ালের কাঠ ঠিক করায় বাধা দিতে নিষেধ করেছেন। এখানে এক প্রতিবেশীর কোনো ক্ষতি ছিল না, তবে আরেকজনের জন্য এতে উপকারও ছিল না। অথচ আলোচ্য ঘটনায় পানি আনতে পারলে দুই পক্ষেরই লাভ ছিল। সুতরাং বিষয়টি স্পষ্ট। আহমদ এবং ইবরাহীম নাখয়ীর মতে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই ফাতওয়া বর্তমান যুগে ন্যায়বিচারের মূলনীতি হিসেবে গণ্য করার মতো। ১৪৭৪
আব্দুস-সালাম আল-সুলায়মানী মনে করেন, এই ফতোয়াটি বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বে প্রচলিত 'মানবিক অধিকার রক্ষা' আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শত শত বছর আগেই মুসলিমরা এই আইন বাস্তবায়ন করে গিয়েছেন। আর এর ভিত্তি ছিল আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই হাদীস। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই হাদীস প্রয়োগ করে দুই প্রতিবেশীর কল্যাণ সাধন করেছিলেন। তবে কারও মতে প্রতিবেশীর অনুমতি না নিয়ে তা করা উচিত নয়। ১৪৭৫
এই ঘটনা থেকে আমরা এই শিক্ষা পেয়েছি:
১। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইজতিহাদ থেকে এই ফাতওয়া এসেছে। বন্ধুসুলভ আচরণ করার পরেও মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা রাজি হচ্ছিলেন না বলে আদ-দাহহাক উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে অভিযোগ নিয়ে যান। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার নামে সমন পাঠান।
২। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ফাতওয়ায় কোনো রকম ঝামেলা ছিল না। তিনি পুরোটা বিষয় তদন্ত করেছেন এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখেছেন। তিনি নিশ্চিত হয়ে নেন যে অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনো কারণ ছাড়াই ভালো কাজে বাধা দিচ্ছিলেন। এতে তার কোনো ক্ষতির আশংকাও ছিল না। বরং এই কাজে দু পক্ষই লাভবান হতো। মানুষের অধিকার বিঘ্নিত হওয়ায় বিষয়টি আর ব্যক্তি পর্যায়ে থাকেনি। আর উম্মতের অধিকার বিঘ্নিত হলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তা কখনই হালকাভাবে নিতেন না।
৩। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কিন্তু শুরুতে মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামার সাথে নম্রতা বজায় রেখে কথা বলছিলেন। তার মন পরিবর্তন করার উদ্দেশ্যে তাকে মুসলিম ভ্রাতৃত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তার সদাশয় প্রচেষ্টার প্রতি যখন একগুয়েমি প্রকাশ পেয়েছে, সেই সাথে শপথ করে বসেছে তখন খলীফার ক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। এরপরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফার ক্ষমতাবলে তাকে তার অবস্থান উপলব্ধি করাতে সচেষ্ট হন। তিনি তার যোগ্য কাজ করেছেন। এখানে সাধারণ মুসলমানের স্বার্থ এবং অধিকার রক্ষার জন্য তাকে কঠোর হতে হয়েছিল। ১৪৭৬
টিকাঃ
১৪৭৩ আল-মুয়াত্তা, কিতাব ইসাফ আল-মাবতাবি আল-মুয়াত্তা, পৃ. ৬৩৮-৬৩৯ দ্রষ্টব্য; আল-মুয়াত্তা, ২/৭৪৬।
১৪৭৪ ইলম উসূল আল-ফিকহ ওয়া তারীখ আ-তাশরী, পৃ. ৩৯।
১৪৭৫ আল-ইজতিহাদ ফীল ফিক্হ আল ইসলামী, পৃ. ১৪০, ১৪১।
১৪৭৬ আল-ইজতিহাদ ফীল ফিক্হ আল ইসলামী, পৃ. ১৪১, ১৪২।
📄 এক কথায় তিন তালাকের অনুমোদন
ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের প্রথম দুই বছর পর্যন্ত, এক সাথে তিন তালাক উচ্চারণ করাকে এক তালাক হিসেবে গণ্য করা হতো। অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যে বিষয়ে মানুষের অনেক সময় নিয়ে চিন্তা করা উচিত, তারা ওই বিষয়ে খুব তাড়াহুড়া শুরু করেছে। আমরা একে যথার্থভাবে হিসাব করলে ভালো হবে (অর্থাৎ, তিনবার উচ্চারণ করলে তিন তালাক হিসেবে গণ্য করা হবে),' তিনি তা- ই করলেন। ১৪৭৭ বর্ণিত আছে, ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে আবু আস-সাহবা জানতে চেয়েছিলেন, 'আপনি কি জানেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের প্রথম তিন বছর পর্যন্ত, এক সাথে তিন তালাক উচ্চারণ করলে তা এক তালাক হিসেবে গণ্য হতো?' ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'জী। '১৪৭৮
বর্ণনা দুটো থেকে বোঝা যাচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে এক সাথে তিন তালাক উচ্চারণ করলে এক তালাক হিসেবে গণ্য করা হতো, আর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেখানে একে তিন তালাক বলে ফাতওয়া দেন। এই ফাতওয়ার স্বপক্ষে তার যুক্তি ছিল, ওই সময় তিন তালাক উচ্চারণের হিড়িক পড়ে যায়। তিনি আল্লাহ নির্দেশিত এবং সুন্নাহ থেকে বর্ণিত তালাক থেকে তিনি লোকজনকে ফেরাতে চাচ্ছিলেন। বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তার স্ত্রীকে মুখে মুখে এক তালাক দিলে তার স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে হবে এবং স্ত্রীর ইদ্দত পালন করতে হবে; এখন কেউ তার স্ত্রীকে ফিরে পেতে চাইলে ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার আগেই তা করতে হবে, তিন তালাক সম্পন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত এমন করতে পারবে। ১৪৭৯
কেউ কেউ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই ফাতওয়াকে আয়াতের পরিপন্থী বলে মনে করেন। যেমন: ড. আতিয়া মুস্তাফা মুশরিফা বলেছেন, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আগে থেকে অনুসৃত আয়াত এবং রীতিনীতির প্রতি বিরুদ্ধাচরণের দুঃসাহস দেখাতেন। নতুন মুসলিম সমাজে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে গিয়ে নতুন ফাতওয়া দিতেন। ১৪৮০ উপর্যুক্ত তিন তালাকের ঘটনা এমন একটি উদাহরণ। ১৪৮১ তবে প্রকৃতপক্ষে তিনি প্রত্যক্ষ কোনো আয়াতের বিপক্ষে যাননি। তিনি বরং আয়াত বোঝার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। তার দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষে কয়েকটি বর্ণনা তুলে ধরা হলো:
১। ইবনুল মুসায়্যিব থেকে ইবনে শিহাব, তার কাছ থেকে ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদ, তার কাছ থেকে আল-কাসিম ইবনে আব্দুল্লাহ, তার কাছ থেকে আশহাব এবং তার কাছ থেকে মালিক বর্ণনা করেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় আসলামের এক ব্যক্তি তিন তালাকের মাধ্যমে তার স্ত্রীকে তালাক দেয়। কয়েকজন সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'আপনি স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবেন।' এদিকে তার স্ত্রী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে দেখা করে বলল, 'আমার স্বামী আমাকে একবারে তিন তালাক দিয়েছেন।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'মৌখিকভাবে আপনার তালাক হয়ে গেছে। এখন আপনাদের মধ্যে আর কোনো দায়বদ্ধতা নেই।' এই হাদীস থেকে দেখা যাচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবারে তিন তালাক উচ্চারণ করাকে তিনি তালাক হিসেবে গণ্য করেছেন।
২। নাসায়ী বর্ণনা করেছেন: এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে একবাক্যে তিন তালাক দিয়েছিল বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানানো হলো। তিনি ক্রোধে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, 'আমি বেঁচে থাকতেই আল্লাহর কিতাব নিয়ে খেলা হচ্ছে?' এক লোক দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি কি তাকে হত্যা করব? ১৪৮২ এই হাদীসে দেখা যাচ্ছে, এক বসায় কেউ তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছিল এবং ত্যাগ করেছিল বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রেগে যান। যা তালাক সম্পন্ন হওয়ার প্রতি ইশারা করে। এক বসায় তিন তালাক কার্যকর যদি না হতো, তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা স্পষ্ট করে বলে দিতেন। কারণ, প্রয়োজনের সময় ব্যাখ্যা বিলম্বিত করা না-জায়েয। ১৪৮৩
৩। নাফী ইবনে উমায়র ইবনে আব্দ ইয়াযীদ ইবনে রাকানা থেকে বর্ণিত, রাকানা ইবনে আব্দ ইয়াযীদ তার স্ত্রী সুহায়মাকে মৌখিকভাবে তালাক দেন। বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানানো হলো। লোকটি বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি একে একটা (তালাক) হিসেবে গণ্য করেছি।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আল্লাহর কসম, আপনার একটাই নিয়ত ছিল?' রাকানা বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমার নিয়তে একটাই ছিল।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার স্ত্রীকে তার সাথে ফিরিয়ে দিলেন। তিনি তার স্ত্রীকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে দ্বিতীয়বার এবং উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে তৃতীয়বারের মতো তালাক দেন। ১৪৮৪ এই হাদীসমতে, রাকানা মৌখিকভাবে তার স্ত্রীকে তালাক দেবার পরেও দাবি করেছিলেন যে, তিনি এক তালাক দিয়েছেন। তার কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে শপথ করে বলতে বলেন যে, তিনি এক তালাকই দিয়েছিলেন। তিনি শপথ করে একই কথা বলতে লাগলেন। ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার স্ত্রীকে তার কাছে পাঠিয়ে দেন। সুতরাং এখানে এটা স্পষ্ট যে, যদি নিয়তের সাথে মুখে মুখেও তিন তালাক দিয়ে দিতেন তবে তার নিয়তের কারণে তালাক কার্যকর হয়ে যেত, সেখানে শপথের কার্যকারিতা থাকত না।
টিকাঃ
১৪৭৭ মুসলিম, হাদীস নং. ১৪৭২।
১৪৭৮ প্রাগুক্ত।
১৪৭৯ আল-কাদা ফী আহদ ইমর ইবনুল খাত্তাব, ড. নাসির আত-তারীফি, ২/৭৩৩।
১৪৮০ আল-কাদা ফীল ইসলাম, পৃ. ৯৮।
১৪৮১ প্রাগুক্ত, পৃ.৯৯।
১৪৮২ আল-মুদাওয়ানা আল-কুবরা, কিতাব আ-তালাক, বাব তালাক আস-সুনান, ২/৬২।
১৪৮৩ সুনান আন-নাসাই, কিতাব আত-তালাক, আত-তালাক আস-সালাস আল-মাজমূআ, ৬/১৪২।
১৪৮৪ আল-কাদা ফী আহদ ইমর ইবনুল খাত্তাব, ড. নাসির আত-তারীফি, ২/৭৩৬।