📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 বিচারকদের যোগ্যতা

📄 বিচারকদের যোগ্যতা


একজন বিচারকের যোগ্যতা কেমন হওয়া উচিত তা জানার জন্য উলামায়ে কেরামের কাছে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনীই যথেষ্ট।
১। শরীয়া আইনে অভিজ্ঞ : এ বিষয়ে অভিজ্ঞ না হলে বিচারক মামলা পরিচালনা করতে পারবেন না।
২। তাকওয়া: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আপনাদের মধ্য থেকে একজন মুত্তাকিকে খুঁজে বের করবেন এবং তাকে বিচারক হিসিবে নিয়োগ দেবেন।’ [cite: ১৩৭১]
৩। মানুষের কী আছে না আছে সে ব্যাপারে উদাসীনতা: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, ‘মানুষকে সন্তুষ্ট করার প্রবণতা এবং লোকদেখানোর চেষ্টা বন্ধ না করলে এবং জাগতিক মোহ ত্যাগ না করলে সে আল্লাহ তা’আলার হুকুম প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।’ [cite: ১৩৭২]
৪। বুদ্ধিমত্তা: সূক্ষ্ম জিনিসও নজর এড়ায় না, বিচারককে এমন চৌকষ এবং বুদ্ধিমান হতে হয়। ইমাম আশ-শা’বী থেকে বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে কাব ইবনে সিওয়ার বসে ছিলেন। তখন এক নারী এসে বলল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আমার স্বামীর তুলনায় কোনো উত্তম পুরুষ দেখিনি। আল্লাহর কসম, তিনি রাত কাটান নামায আদায় করে এবং দিন পার করেন রোযা রেখে। তপ্ত গরমেও তিনি রোযা ভাঙেন না।’ তিনি ওই নারীর ক্ষমার জন্য দুআ করে তার প্রশংসা করলেন এবং বললেন, ‘আপনি আপনার স্বামী সম্পর্কে ভালো কথা বলছেন।’ ওই নারী লজ্জা পেলেন এবং চলে গেলেন। কাব বললেন, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি তার সমস্যার সমাধান করলেন না কেন?’ তিনি বললেন, ‘তিনি কি কোনো অভিযোগ করেছেন?’ কাব বললেন, ‘তিনি তার স্বামীকে নিয়ে গুরুতর অভিযোগ করেছেন।’ তিনি বললেন, ‘তাই কি?’ কাব বললেন, ‘জী।’ তিনি এবার বললেন, ‘তাকে ডেকে আনা হোক।’ তিনি ওই নারীকে বললেন, ‘সত্য বলতে দোষ নেই। এই লোক বলছেন, আপনি আপনার স্বামীকে নিয়ে অভিযোগ করেছেন এবং বলেছেন যে তিনি আপনার বিছানা পরিহার করছেন। তাই কি?’ (নারী) জবাব দিলেন, ‘জী। আমি বয়সে তরুণী। আমার বয়সী নারীরা যা পায় আমিও তা চাই।’ খলীফা তার স্বামীকে ডেকে পাঠান। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কাবকে বললেন আপনি এর সমাধান করুন। তিনি (কাব) বললেন, ‘তাদের মধ্যে সুরাহা করার জন্য খলীফাই অধিক যোগ্য।’ তিনি বললেন, ‘আমি চাই আপনি তাদের সুরাহা করে দিন। কারণ, আমি যা বুঝিনি আপনি তা বুঝেছেন।’ এবার তিনি (কাব) বললেন, ‘যদি তার আরও তিনজন স্ত্রী থেকে থাকে এবং ইনি হন চতুর্থজন তবে প্রত্যেক চতুর্থ রাতটি তার ভাগের। তাই তিনি যেন তিন দিন এবং তিন রাত নিজের জন্য রেখে এই স্ত্রীর জন্য একদিন এক রাত কাটান।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আপনি যেভাবে তার ইশারা থেকে সমস্যা ধরতে পেরেছেন এর তুলনায় আপনার পরামর্শটি বেশি চমকপ্রদ। যান, আপনাকে বসরার বিচারক নিযুক্ত করা হলো।’ [cite: ১৩৭৩]
৫। রুক্ষতাবর্জিত কাঠিন্য: দুর্বলতাবর্জিত সদাশয়তা: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে এই চারটি গুণ না থাকলে তাকে এই পদ দেওয়া যাবে না: দুর্বলতাবর্জিত সদাশয়তা, রুক্ষতাবর্জিত কাঠিন্য, কার্পণ্যবর্জিত উদারতা এবং বাহুল্যবর্জিত সরলতা।’ [cite: ১৩৭৪]
৬। চারিত্রিক দৃঢ়তা: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘আমি আবু মারিয়মকে বরখাস্ত করব এবং তার জায়গায় এমন একজনকে নিয়োগ দেব যাকে দেখলে অপরাধীরা ভয় পেয় যাবে।’ [cite: ১৩৭৫] তাকে বরখাস্ত করার পরে কা’ব ইবনে সূরকে সেখানে নিয়োগ দেন।
৭। বিত্তবান এবং ভালো বংশের হতে হবে: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কয়েকজন গভর্নরকে পত্রমারফত নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘সচ্ছল এবং ভালো বংশের কাউকে ছাড়া নিয়োগ দেবেন না। কারণ, সচ্ছলের মনে অন্যের সম্পদের প্রতি লোভ থাকবে না এবং ভালো বংশের লোকেরা কাউকে ভয় পায় না।’ [cite: ১৩৭৬]

টিকাঃ
১৩৭১. মাউসূআ ফিকহ উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ২৭৩; আল-মুগনি, ৯/৩৭।
১৩৭২. নিযাম আল-হুকম ফী আশ-শারিয়া ওয়া আত-তারীখ আল-ইসলামি, ২/ ১০২।
১৩৭৩. মাউসূআ ফিকহ উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ২৭৩।
১৩৭৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৭২৪।
১৩৭৫. প্রাগুক্ত।
১৩৭৬. প্রাগুক্ত।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 বিচারকদের কাছে কী আশা করা হতো

📄 বিচারকদের কাছে কী আশা করা হতো


ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য একজন বিচারকের কী করণীয় সে প্রসঙ্গে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কিছু বিষয় পরিষ্কার করে দেন। এগুলো হলো:
১। যে কোনো কাজে আল্লাহকে ভয় পাওয়া: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু মূসা আল-আশআরীকে বলেছিলেন, ‘ন্যায়বিচার করলে আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার পাওয়া যাবে এবং দুনিয়া ও আখেরাতের জন্য পুরস্কার জমা থাকবে। কেউ খাঁটি নিয়তে সত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করলে, তা যদি স্ববিরোধীও হয় তবুও, আল্লাহ তা’আলা তার জন্য যথেষ্ট হবেন এবং তাকে মানুষের কাছ থেকে নিরাপদ রাখবেন। কেউ অভিনয় করলে আল্লাহ তাকে লজ্জা দেবেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আনুগত্যহীন আমল কবুল করেন না। দুনিয়া এবং আখেরাতে আল্লাহর পুরস্কারের কথা যেন মনে থাকে।’ [cite: ১৩৭৭]
২। অভিযোগ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা: ফাতওয়া দেবার আগে তাকে অবশ্যই পুরো বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে। সত্য সামনে না আসা পর্যন্ত কোনো রকম ফাতওয়া দেওয়া যাবে না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লিখেছিলেন, ‘আপনার সামনে মামলা পেশ করা হলে তা ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করবেন।’ কোনো একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, ‘সত্য দিন ও রাতের মতো স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত ফাতওয়া দেওয়া যাবে না।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কানে এ কথা পৌঁছলে তিনি বলেছিলেন, ‘আবু মূসা সত্য বলেছেন।’ [cite: ১৩৭৮]
৩। ইসলামি শরীয়ত মোতাবেক বিচার করা: বিরোধপূর্ণ দলগুলো মুসলিম হোক বা না হোক: যায়দ ইবনে আসলাম থেকে বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে একজন ইহুদি নারী এসে বলেছিলেন, ‘আমার ছেলেরা মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের সম্পত্তিতে আমার কোনো হক নেই বলে অন্য ইহুদিরা দাবি করছে।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের ডেকে বললেন, ‘তোমরা তার হক দিচ্ছ না কেন?’ তারা বলল, ‘আমাদের কিতাবে তার হকের কথা উল্লেখ করা নেই।’ তিনি বললেন, ‘তোমরা কি তাওরাতের কথা বলছ? তারা বলল, ‘না, মিশনাহ।’ তিনি জানতে চাইলেন, ‘মিশনাহ কী?’ তারা জবাব দিল, ‘জ্ঞানী এবং অভিজ্ঞ লোকেদের লেখা কিতাব।’ তাদের কথা শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অভিশাপ দিলেন এবং ওই নারীকে তার হক দিয়ে দিতে বললেন। [cite: ১৩৭৯]
৪। নিশ্চিত হতে না পারলে অন্যদের সাথে আলোচনা করা: উমর বিচারকদের কাছে লিখেছিলেন, ‘আপনার ধর্মে যারা আল্লাহকে ভয় পান তাদের সাথে আলোচনা করবেন।’ [cite: ১৩৮০] তিনি শুরায়হর কাছে লিখেছেন, ‘আমার সাথে আলোচনা করতে চাইলে (করতে পারেন), আমার মতে, তা আপনার জন্য উত্তম হবে।’ [cite: ১৩৮১] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এত বেশি আলোচনা করতেন যে, ইমাম আশ-শা’বী বলেছেন, ‘সর্বোৎকৃষ্ট ন্যায়বিচার পেতে মানুষ উমরের পরামর্শ নিত, কারণ, তিনি অন্যদের সাথে আলোচনা করতেন।’ [cite: ১৩৮২]
৫। বাদী-বিবাদী সবার সাথে সমান আচরণ করা: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু মূসা আল-আশআরীকে পত্রমারফত নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘লোকদের সমানভাবে সম্বোধন করবেন, যাতে সম্ভ্রান্ত লোকেরা না ভাবে যে, আপনি তাদের পক্ষে আছেন এবং দুর্বলেরা হতাশ না হয়ে যায়।’ তিনি এও বলেছিলেন, ‘চেনা-অচেনা সবার সাথে সত্য অনুসারে ব্যবহার করবেন।’ একবার উবাই ইবেন কাব রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে একটি বাগান নিয়ে অভিযোগ করে বসেন। এই বাগান সম্পর্কে খলীফার কোনো ধারণা ছিল না। তারা যায়দ ইবনে সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুকে এর বিচার করতে বললেন। তারা যায়দ রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে যান এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন যে, ‘আমরা বিচারের আশায় এখানে এসেছি।’ যায়দ রাযিয়াল্লাহু আনহু সরে গিয়ে সবচেয়ে ভালো আসনটিতে বসতে দেন-ভিন্ন বর্ণনামতে, একটি গদি এনে তার সামনে রেখে বলেছিলেন, ‘এই নিন, হে আমীরুল মুমিনীন।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘হে যায়দ, আপনি শুরুতেই পক্ষপাতিত্ব করে বসলেন। আমাকে বরং আমার প্রতিপক্ষের সাথেই বসতে দিন।’ অতঃপর তারা দুজন বিচারকের সামনে বসলেন। [cite: ১৩৮৩]
৬। দুর্বলকে উৎসাহপ্রদান: তারা যেন নির্ভয়ে কথা বলতে পারে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লিখেছিলেন, ‘দুর্বলদের প্রতি সদয় আচরণ করবেন, তারা যেন সত্য বলতে উৎসাহিত হয়।’ [cite: ১৩৮৪]
৭। অতিথির মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে, নয়তো তার মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সহযোগিতা করতে হবে: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুর চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন, ‘অতিথিদের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। কারণ, পরিবার থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকলে হাল ছেড়ে দিয়ে ফিরে যাবে।’ [cite: ১৩৮৫]
৮। ধৈর্য : উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লিখে জানান, ‘বিচার করার সময় একঘেয়েমি, ক্রোধ, উৎকণ্ঠা, এবং বিরক্ত হওয়া থেকে সাবধান! বিচারকের মধ্যে এগুলোর কোনোকিছু দেখা দিলে তা দূর না হওয়া পর্যন্ত বিচার করা জায়েয হবে না। তা না হলে বিচারে তার মানসিক অবস্থার প্রভাব পড়ে যাবে।’ তিনি আবু মূসা আল-আশআরীকে বলেছিলেন, ‘রাগের মাথায় বিচার করতে যাবেন না।’ [cite: ১৩৮৬] শুরায়হ থেকে বর্ণিত, আমাকে বিচারক নিযুক্ত করার সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাগের মাথায় বিচার না করার শর্ত দিয়েছিলেন। [cite: ১৩৮৭] ক্ষুধা, তৃষ্ণার মতো বিষয়গুলোও একজন বিচারককে প্রভাবিত করবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, ‘পরিমিত পানাহার না করে বিচারকের বিচারকাজ চালানো উচিত নয়।’ [cite: ১৩৮৮]
৯। বিচারককে প্রভাবমুক্ত থাকতে হবে : ঘুষ, অথবা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বা বাজার থেকে সুবিধা নেওয়া, অথবা উপহার নেওয়া যাবে না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু মূসা আল-আশআরীকে লিখেছিলেন, ‘বিচারের সাথে সম্পৃক্ত অবস্থায় বেচাকেনা, বিনিয়োগ করা কিংবা ঘুষ গ্রহণ করা যাবে না।’ শুরায়হ বলেছেন, ‘আমাকে বিচারক নিযুক্ত করার সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন আমি কেনাবেচা করতে পারব না, ঘুষ কিনতে পারব না। তিনি বলেছিলেন, ‘খেয়ালখুশিমতো বিচার করা এবং ঘুষ নেওয়া থেকে সাবধান থাকবেন।’ [cite: ১৩৮৯]
১০। আন্দাজে নয়, বিচার করতে হবে স্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকজনের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় থেকে আমরা তোমাদের চিনি। আয়াত নাযিল হয়েছে এবং সেখানে তোমাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে। আর এখন তোমাদের কথার ভিত্তিতে তোমাদের সম্পর্কে ধারণা করি। সুতরাং যে ভালো আচরণ করে তাকে ভালো বলে মনে করি এবং তার সাথেও ভালো আচরণ করি। আর যে মন্দ আচরণ করে আমরা তাকে মন্দ মনে করে তার সাথে মন্দ আচরণ করি। তোমাদের মনের খবর তোমাদের এবং আল্লাহ তা’আলার মধ্যে সীমাবদ্ধ। [cite: ১৩৯০]
১১। বাদী-বিবাদী দুপক্ষকে সন্তুষ্ট করার প্রতি আগ্রহ: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘বাদী-বিবাদী সবাই যেন সন্তুষ্টচিত্তে ফিরে যায় সে চেষ্টা করতে হবে। কারণ, মনোমালিন্য নিয়ে তারা আদালতে হাজির হয়। আল্লাহর আইন মেনে সমাধান করা সম্ভব হলে, বিচারক এর অনুমোদন দেবেন আর শরীয়তবিরোধী সমাধানে পৌঁছলে, তিনি তা বাতিল করবেন।’ তিনি বলতেন, ‘মুসলিমদের মধ্যে হারাম কিংবা হালাল নয় এমন সমাধান বাদে সব রকম সন্ধি জায়েয। [cite: ১৩৯১]
১২। মিল করিয়ে দেবার ব্যাপারে উৎসাহী হতে হবে: বিশেষ করে যখন দুপক্ষের মধ্যে কে সঠিক আর কে ভুল তা বোঝা না গেলে তখন এই আচরণ প্রযোজ্য। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লিখেছিলেন, ‘কারও দোষ-গুণ বোঝা না গেলে সমঝোতা করানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। কারণ, আদালতে বিচার চলাকালীন দুই পক্ষের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি হয়।’ [cite: ১৩৯২]
১৩। সত্যের কাছে ফিরে আসা: কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফাতওয়া দেওয়া হয়ে গেলে, পরবর্তী সময়ে বিচারক যদি সেগুলো নিয়ে তদন্ত করেন এবং মত পরিবর্তন করতে চান তবে তা অনুমোদনযোগ্য নয়। এমনকি তিনি তার ফাতওয়া ফিরিয়ে নিতে পারবেন না। সালিম ইবনে আবি আল-জাদ বলেছেন, ‘উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে যদি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রদত্ত রায় পরিবর্তন করার ক্ষমতা থাকত তবে তিনি নাজরানবাসীকে দেওয়া সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং নাজরানবাসীর মধ্যে করা চুক্তির লেখক ছিলেন আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময় তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকত। তিনি লোকগুলোকে নিয়ে উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। কারণ, তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বাড়ছিল। তারা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে বসে। তিনি অবশ্য দাবি পূরণ করেছিলেন। এক সময় তারা অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে এবং তাদের ছেড়ে দেবার আর্জি জানায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তা প্রত্যাখ্যান করেন। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে তারা আবারও একই আর্জি নিয়ে দেখা করে। তারা বলতে লাগল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি আমাদের মধ্যস্থতা করেছিলেন এবং আপনার ডান হাত দিয়ে শর্ত লিখেছিলেন।’ আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘অভিশাপ তোমাদের! উমর সঠিক কাজ করেছিলেন।’ [cite: ১৩৯৩]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার রায় পরিবর্তন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। তার ইন্তেকালের পরে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুও তার পূর্বসূরির রায় পরিবর্তনের প্রতি অনীহা প্রকাশ করেন। [cite: ১৩৯৪] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অবশ্য অনেক বিষয়ে মত পরিবর্তন করেছিলেন। যেমন, মৃত ব্যক্তির ভাইয়েরা বেঁচে থাকতে তাদের দাদার উত্তরাধিকার, অথবা সম্পত্তি না থাকার কারণে সৎ ভাইয়ের এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তিতে আপন ভাইদের হক ধার্য করে দেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে, তিনি কখনই তার কোনো রায়ে পরিবর্তন আনেননি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন করে রায় দেবার সময় প্রয়োজনবোধে তাতে নতুন ইজতিহাদ যোগ করেছেন। সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরে তিনি পুরনো রায় আঁকড়ে নতুনটির পথে বাধা রাখেননি। যে কারণে তিনি আবু মূসা আল-আশাআরীকে লিখেছিলেন, ‘আজ কোনো রায় দেবার পরে যদি মত পাল্টাতে চান এবং আপনি সঠিক পথে থাকেন তবে সত্য গ্রহণের বেলায় পিছপা হবেন না। কারণ, সত্য চিরন্তন এবং কোনো কিছুর বিনিময়ে তা অগ্রাহ্য করা যাবে না। মিথ্যায় বসবাস করার চেয়ে সত্যের দিকে ফিরে যাওয়া উত্তম। [cite: ১৩৯৫]
অনেক কিছু বিবেচনা করে তিনি দাদার উত্তরাধিকার সম্পর্কে ফাতওয়া দিয়েছিলেন। তিনি ফাতওয়া দিয়েছেন যে, স্বামী, মা, বাবার দিক দিয়ে দুজন সৎভাই, মায়ের দিক দিয়ে দুজন সৎভাই, বাবার দিক দিয়ে দুজন সৎভাই রেখে কোনো নারী ইন্তেকাল করলে মা-বাবার দিক দিয়ে তার আপন ভাই এবং মায়ের দিক দিয়ে সৎভাইয়েরা তার সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পাবে। এক ব্যক্তি তাকে বলল, ‘ওই বছরে সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে কিন্তু আপনি এই ফাতওয়া দেননি।’ তিনি বললেন, ‘সেটা ওই সময়ের রায় ছিল, আর এটা এখনকার।’ [cite: ১৩৯৬]
১৪। প্রমাণ ব্যতিরেকে অভিযুক্ত ব্যক্তি নির্দোষ: আব্দুল্লাহ ইবনে আমির বলেছেন, ‘আমি একটি দলের সাথে মরুযাত্রায় বের হয়েছিলাম। যুল মারওয়ায় পৌঁছে দেখি, আমার জোব্বাটি চুরি হয়ে গেছে এবং তাদের একজন তখনো আমাদের সাথে ছিল। আমার সাথীরা তাকে বলল, ‘হে অমুক, তার জোব্বাটি ফিরিয়ে দাও।’ সে বলল, ‘আমি নিইনি।’ আমি উমর ইবনুল খাত্তাবের সাথে দেখা করে পুরো ঘটনা বললাম। তিনি জানতে চাইলেন, ‘সেখানে কে কে ছিল?’ আমার সাথে যারা ছিল সবার নাম বললাম। যাকে সন্দেহ করছিলাম তার কথা বললাম, ‘আমি তাকে বেঁধে আনতে চাচ্ছিলাম।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘তোমার কাছে প্রমাণ নেই, তারপরেও তাকে বেঁধে আনার কথা বল কীভাবে? [cite: ১৩৯৭]
১৫। সংশ্লিষ্ট কোনো আয়াত থাকলে ইজতিহাদের প্রয়োজন নেই: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘কুরআন বা সুন্নাহে না পেলে একই রকম মামলা খুঁজে দেখবেন, যেখানে কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করা হয়েছে।’ [cite: ১৩৯৮]
বিচারকদের এই বিষয়গুলো আঁকড়ে থাকতে হবে।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 বিচারকগণ নিজেদের রায়ও আইনের অধীন

📄 বিচারকগণ নিজেদের রায়ও আইনের অধীন


খেলাফতের শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেও বিচারকদের অধীনে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। বিচারকেরা সঠিক বিচার করলে তিনি সরাসরি প্রশংসা করতেন এবং রায় তার বিপক্ষে গেলেও তিনি বিচারককে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাতেন। [cite: ১৩৯৯] এমন কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো:
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এক বেদুইনের ঘোড়া কিনতে চাচ্ছিলেন। তাই ঘোড়ায় চড়ে পরখ করতে বের হন। এর মধ্যে তা খোঁড়া হয়ে গেল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘তোমার ঘোড়া নিয়ে যাও।’ লোকটি বলল, ‘না।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘তবে আমাদের জন্য বিচারক ডাকো।’ সে বলল, ‘শুরায়হ।’ সুতরাং তাকে ডেকে বিচার করতে বললেন। সবকিছু শুনে তিনি বললেন, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, যা কিনেছেন আপনার কাছে রেখে দিন, নয়তো যে অবস্থায় নিয়েছিলেন সেভাবে ফেরত দিন।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘এভাবেই ফাতওয়া দিতে হয়।’ এরপরে তিনি তাকে কূফার বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। [cite: ১৪০০]

টিকাঃ
১৩৯৯. আত-তাবাকাত, ৩/২৯০।
১৪০০. আল-ইকতিফা, ৩/২৭৬; আত-তাবাকাত, ৬/১৩০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00