📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 যুদ্ধলব্ধ গনীমত থেকে ব্যয়

📄 যুদ্ধলব্ধ গনীমত থেকে ব্যয়


আল্লাহ তা’আলার এই আয়াতের ভিত্তিতে যুদ্ধলব্ধ গনীমতের মাল বণ্টন করা হতো:
وَ اعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِّنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَ لِلرَّسُولِ وَ لِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَى وَ الْمَسْكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ
আর এ কথাও জেনে রাখ যে, কোনো বস্তু-সমাগ্রীর মধ্য থেকে যা কিছু তোমরা গনীমত হিসাবে পাবে, তার এক-পঞ্চমাংশ হলো আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য, তার নিকটাতামীয়-স্বজনের জন্য এবং ইয়াতিম-অসহায় ও মুসাফিরদের জন্য। [cite: ১৩৩২]
গনীমতের অবশিষ্ট চার-পঞ্চমাংশ যোদ্ধারা পেতেন, এদের মধ্যে অশ্বারোহীরা পেতেন তিন ভাগ- দুই ভাগ তার ঘোড়ার জন্য আর এক ভাগ নিজের জন্য—এবং প্রত্যেক পদাতিক সৈন্য পেতেন এক ভাগ। [cite: ১৩৩৩]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনি এর একভাগ নিজের এবং স্ত্রীদের জন্য ব্যয় করতেন। আর বাকি যা থাকত তা জনস্বার্থে অর্থাৎ, দরিদ্র এবং অভাবীদের জন্য ব্যয় করতেন। দ্বিতীয় অংশ পেতেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আত্মীয়-স্বজন, যেমন- বনু হাশিম এবং বনু আব্দুল মুত্তালিব, কারণ, তারা ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয়েছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পরে এই দুটো ভাগ নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। কেউ কেউ বললেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অংশ পরবর্তী খলীফাকে দেওয়া হোক এবং আত্মীয়দের অংশ তার আত্মীয়দের দেওয়া হোক। আবার কেউ বললেন, তার আত্মীয়দের অংশ খলীফার আত্মীয়দের দেওয়া হোক। পরে অবশ্য সর্বসম্মতিক্রমে বাহন এবং অস্ত্রের পেছনে এই অংশ ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। [cite: ১৩৩৪] সুতরাং দুটো অংশই মুসলিমদের স্বার্থে ব্যয় করা হতো। এর মধ্যে ছিল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করা, সীমান্ত পাহারা দেওয়া এবং দ্বিতীয় খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা। [cite: ১৩৩৪]
দরিদ্র, অভাবী আর মুসাফিরদের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে যেভাবে খরচ করা হতো সেভাবেই খরচ অব্যাহত রইল। দ্বিতীয় খলীফার সময়ে এতে কোনো রকম পরিবর্তন আনা হয়নি। [cite: ১৩৩৫]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের সময় এগুলোই ছিল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। তিনি নিজ হাতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জনসাধারণের তহবিল নিয়ে তিনি খুব সাবধান থাকতেন। তার বক্তব্যে এর প্রমাণ পাওয়া যায়, ‘আমি আল্লাহর মাল থেকে নিজের জন্য কী রাখছি তা তোমাদের জানিয়ে রাখি : শীতের একটি পোশাক, গরমের একটি পোশাক, হজ ও উমরা পালনের জন্য একটি বাহন, আর দশটা সাধারণ কুরাইশের মতো—যারা ধনীও নয় আবার দরিদ্রও নয়—পরিবারের জন্য খাবার। আমি একজন মুসলিম। তোমাদের দিন যেভাবে কাটে, আমার দিনও সেভাবে কাটে।’ [cite: ১৩৩৬] তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘আল্লাহর কসম, তোমরা জান যে, আমি নিজের খাবার ছাড়া অন্য কোনো কিছু খাই না এবং আমার নিজের পোশাক ছাড়া অন্য কিছু পরি না এবং আমার হকের বাইরে কোনো কিছু গ্রহণ করি না।’ [cite: ১৩৩৭] তিনি এও বলতেন, ‘আমি আল্লাহর মালকে একজন ইয়াতিমের মাল মনে করি : وَمَنْ كَانَ غَنِيًّا فَلْيَسْتَعْفِفْ ۖ وَمَنْ كَانَ فَقِيرًا فَلْيَأْكُلْ بِالْمَعْرُوفِ যারা সচ্ছল তারা অবশ্যই ইয়াতিমের মাল খরচ করা থেকে বিরত থাকবে। আর যে অভাগ্রস্ত সে সঙ্গত পরিমাণ খেতে পারে। [cite: ১৩৩৮]

টিকাঃ
১৩৩২. সূরা আল-আনফাল, ৮: ৪১।
১৩৩৩. আল-খারাজ, আবু ইউসুফ, পৃ. ২২১।
১৩৩৪. প্রাগুক্ত।
১৩৩৫. সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ২০৫, ২০৬।
১৩৩৬. তারীখ আল-মাদীনা, ইবনে শিবাহ, ২/৬৯৮; আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ২১৮।
১৩৩৭. আত-তাবাকাত, ৩/৩১৩; আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ৩১৮।
১৩৩৮. সূরা আন-নিসা, ৪: ৬।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ত বিষয়

📄 রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ত বিষয়


ইসলামী মুদ্রার প্রচলন
সোনা-রূপায় তৈরি মুদ্রা ছিল সামাজিক জীবনের অন্যতম অনুসঙ্গ। বিশেষ করে দুটো জাতি এবং রাষ্ট্রের মধ্যে লেনদেনের জন্য এর গুরুত্ব অপরিসীম। লক্ষণীয় বিষয় হলো, মুসলিম এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠি মিলে যখন ইসলামী রাষ্ট্র গঠিত হলো, তখন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ছিল ভিন্ন প্রথা এবং সংস্কৃতির। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং অন্যান্য খলীফা ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিন রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপিত হলো। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুদ্রা প্রচলনের, নিজের রাষ্ট্রের মধ্যে এবং অন্য রাষ্ট্রের সাথে লেনদেনের জন্য, ব্যবস্থা নিলেন। [cite: ১৩৩৯] ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায় যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে প্রচলিত মুদ্রা পরিবর্তন করেননি। খ্রিস্টানদের লেখা সংবলিত বাইজেন্টাইনদের মুদ্রা যেমন প্রচলিত ছিল, তেমনই পারসিকদের জরথুস্ট্রীয় লেখা সংবলিত মুদ্রাও ছিল। এর অর্থ, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে প্রচলিত মুদ্রা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছিলেন এবং জাল মুদ্রা ঠেকাতে এগুলোকে জায়েয বলে উল্লেখ করেছিলেন। [cite: ১৩৪০] রাষ্ট্রের বাইরে লেনদেনের জন্য নতুন করে মুদ্রা ছাপানেরা পেছনেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবদান ছিল। আল-মাওয়ারদী বলেছেন, ‘উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলামী দিরহামের গুরুত্ব বিবেচনা করে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। [cite: ১৩৪১] আল-মাকরীযিব উল্লেখ করেছেন, ‘উমর ইবনুল খাত্তাব ১৮ হিজরীতে সর্বপ্রথম ইসলামী মুদ্রা ছাপান। পারসিক মুদ্রা ওপরেই তিনি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ (সকল প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার) নয়তো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই) ছাপিয়েছিলেন। এর একাংশে খলীফা উমরের নাম উল্লেখ করা হয়।’ [cite: ১৩৪২] সুতরাং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিমসহ অন্যান্যদের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। জীবনযাপনে অগ্রগতিতে এবং সভ্যতার উন্নয়নে খুলাফায়ে রাশেদীনসহ বহু মানুষ তাকে অনুসরণ করেছেন। [cite: ১৩৪৩]

জমি বরাদ্দ করা
আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাধারণ লোকের জন্য জমি বরাদ্দ করতে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। তিনি আয-যুবায়র ইবনুল আওয়ামকে আল-জারফ ও কনাতের [cite: ১৩৪৪] মধ্যবর্তী অব্যবহৃত জমি দান করেন এবং মাজাহ ইবনে মারারা আল-হানাফীকে আল-খাদরামা (আল-ইয়ামামার একটি গ্রাম) দিয়ে দেন। তিনি উয়ায়না ইবনে হাসন আল-ফাজারী এবং আল-আকরা ইবনে হাবিস আত-তামীমিকে কিছু বিরাণ ভূমি দিতে চাচ্ছিলেন। ওই জমিতে ঘাস জন্মাত না এবং তা কোনো কাজেও লাগত না। তারা ওই জমিটি কাজে লাগাতে চাচ্ছিলেন। তবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরামর্শে তিনি মত পরিবর্তন করলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন যে, এখন ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করতে এমন কাজ করার দিন ফুরিয়েছে। তিনি লোকগুলোকে বলে দিলেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের অন্তরকে আকৃষ্ট করতে চাইতেন, তখন ইসলাম দুর্বল ছিল। আল্লাহ তা’আলা ইসলামকে এখন বিজয় দান করেছেন, যাও, পরিশ্রম কর গিয়ে।’ [cite: ১৩৪৫]
এখানে স্পষ্ট যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিনা কারণে জমি বরাদ্দের বিরোধিতা করেননি। বরং লোকেরাই নিজেরা নিজেদের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছিল। তার মতে, এদের আকৃষ্ট করার কোনো কারণ ছিল না। বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নীতি অনুসরণ করে যারা জমি যথার্থভাবে কাজে লাগাতে পারবে এমন লোকদের বরাদ্দ দিতেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘হে লোকসকল, মৃত জমি যে আবাদ করতে পারবে, সেটা তার।’ [cite: ১৩৪৬] বর্ণনা দুর্বল হলেও এখান থেকে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জমির অপব্যবহার দেখলে তা ফেরত নিয়ে অন্য কাউকে দিয়ে দিতেন। তিনি খাওয়াত ইবনে যুবায়রকে [cite: ১৩৪৭] অনাবাদি জমি দিয়েছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাছাড়া তিনি যুবায়র ইবনুল আওয়ামকে আল-আকিকের জমি বরাদ্দ করে দেন। আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তিনি ইয়ানবুতে জমি দেন, এর উপর দিয়ে মিঠাপানির ধারা বইতে শুরু করেছিল। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু ওই জমি দরিদ্রদের দান করে দেন। বেশ কিছু দুর্বল বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কয়েকজন সাহাবায়ে কেরামকে জমি বরাদ্দ দিয়েছিলেন। [cite: ১৩৪৮]

টিকাঃ
১৩৩৯. আল-ইদারা আল-ইসলামিয়া ফী আহদ উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ৩৬৪।
১৩৪০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৬৬।
১৩৪১. আল-আহকাম আস-সুলতানিয়া, পৃ. ১৪৭।
১৩৪২. শুযূর আল-উকুদ ফী যিকর আন-নুকুদ, পৃ. ৩১-৩৩।
১৩৪৩. আল-ইদারা আল-আস্কারিয়া ফী আহদ উমর, পৃ. ৩৬৭।
১৩৪৪. আত-তাবাকাত আল-কুবরা, ৩/৩১৩- এর সনদ সহীহ; আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ২২০।
১৩৪৫. সহীহ, বুখারী, ১/৮১; আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ২২১।
১৩৪৬. আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ২২১, এর সনদ সহীহ।
১৩৪৭. প্রাগুক্ত।
১৩৪৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ২২২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00