📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 যাকাত থেকে ব্যয়

📄 যাকাত থেকে ব্যয়


আল্লাহ তা’আলা আট শ্রেণির লোককে যাকাত দিতে বলেছেন, তিনি বলেছেন:
إِنَّمَا الصَّدَقْتُ لِلْفُقَرَاءِ وَ الْمَسْكِينِ وَالْعَمِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَ في الرِّقَابِ وَالْغُرِمِينَ وَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَ ابْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ وَ اللهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
যাকাত হলো কেবল ফকির, মিসকীন, যাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং দাস-মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জিহাদকারীদরে জন্য এবং মুসাফিরদের জন্য, এই হলো আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। [cite: ১৩০১]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে গরীব-অভাবীদের দরিদ্রতা দূর করতে এবং তারা যেন ন্যূনতম স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে এবং উন্নতি লাভ করে তাই যথেষ্ট পরিমাণে ধন-সম্পদ দেওয়া হতো। [cite: ১৩০২] এ কারনেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, ‘যখন দান করবে এই পরিমাণে দান করবে যেন একজন দরিদ্র ব্যক্তি সচ্ছল হয়ে ওঠে’। [cite: ১৩০৩]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এমন নীতিবোধ ছিল। কেউ অসুস্থতার সাময়িকভাবে অকর্মণ্য হয়ে পড়লে তাকে অনেক বেশি দান করতেন। কেউ চিরতরে কর্মক্ষমতা হারালে তাদের যাকাত দিয়ে যেতেন। জিযিয়া আরোপের পর থেকে মুসলিমদের পাশাপাশি আহলে-কিতাবদের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করা হয়েছিল। [cite: ১৩০৪]
যারা যাকাত আদায়ে নিযুক্ত ছিলেন তাদের খরচও এখান থেকে বহন করা হতো। যাকাত পরিচালনা, গণনা, হকদার নির্ণয় করা, কত দিতে হবে নির্ধারণ করা, কাকে দিতে হবে তা খুঁজে বের করা, কোন কোন জিনিসের ওপর যাকাত দিতে হবে, কত বাকি, কার কতটুকু প্রয়োজন এবং কার জন্য কতটুকু যথেষ্ট হবে এমন অনেক কিছু জানতে এবং কাজ করতে হলে অভিজ্ঞ এবং বিশেষজ্ঞ দল এবং তাদের সহযোগিতা করার মতো লোকবল দরকার ছিল। [cite: ১৩০৫]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার শাসনামলে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করতে যাকাত প্রদান রহিত করে দেন। কারণ, তার খেলাফতকালীন ইসলাম অনেক মজবুত হয়ে উঠেছিল। তাই এই ক্ষেত্রে তিনি যাকাত দেবার কোনো প্রয়োজন বোধ করেননি। উপর্যুক্ত আয়াতে যে আটটি শ্রেণির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি সেখান থেকে এই শ্রেণিকে বাদ দিয়েছিলেন। [cite: ১৩০৬] তবে এ যুগে মানুষকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য ব্যয় করার প্রয়োজনীয়তা আবারও দেখা দিয়েছে, সেই সাথে আয়াতে উল্লিখিত অন্যান্য শ্রেণির হক তো আছেই। [cite: ১৩০৭] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই সিদ্ধান্তের পরে ইসলামের শত্রুরা তার বিরুদ্ধে কথা তুলেছিল। তিনি কুরআনের আইন অমান্য করছেন বলে তারা অপপ্রচার চালায়। তাদের এই দাবি একেবারেই সত্য নয়। শুরুতে ইসলাম দুর্বল ছিল বলে এর প্রয়োজন ছিল। ইসলাম বিজয়ী এবং দৃঢ় হওয়ার পরে এর কোনো প্রয়োজনীয়তা তিনি অনুভব করেননি। [cite: ১৩০৮] সাহাবায়ে কেরামও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে একমত পোষণ করেছেন। এবং তারা চিন্তাভাবনা ছাড়া কোনো কাজ করতেন না। যেখানে দলে দলে লোকজন ইসলাম গ্রহণ করছিল সেখানে গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন গুটিকয় মানুষকে আকৃষ্ট করতে যাকাতের অর্থ-সম্পদ খরচ করার কোনো যুক্তি ছিল না। হাতেগোনা সেসব লোকজনকে ভয় পাওয়ারও কোনো কারণ ছিল না। বরং তারা অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে পড়লে বিপদের আশংকা ছিল। তাছাড়া যাকাতের এই অংশ বংশ পরম্পরায় ভোগ করার মতো বিষয় ছিল না। [cite: ১৩০৯]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যে কঠোরতার সাথে এই আয়াত বিশ্লেষণ করেছিলেন তা-ও নয়। তিনি এই আয়াতের আক্ষরিক অর্থে না গিয়ে ভাবার্থ বিশ্লেষণ করেছেন। সে সময় আরব নেতাদের ঈমানের দাওয়াত দিতে এবং নও-মুসলিমদের ইসলামে অটল রাখতে গিয়ে যেন যাকাত প্রদান করা হয়, এই আয়াত সেদিকে আলোকপাত করেছে। আল্লাহ তা’আলা ইসলামকে বিজয় দান করছিলেন এবং বিস্তৃতি দান করছিলেন। এই অবস্থার মধ্যে যদি এই উদ্দেশ্যে অর্থ ব্যয় করা হতো, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে তা বরং অপমানের শামিল ছিল। আল্লাহ তা’আলা যে কারণে তাদের যাকাত দিতে বলেছেন, তখন সে কারণ অবশিষ্ট ছিল না।
এই উপলব্ধি থেকে আমরা বলতে পারি না যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কুরআনের আয়াত অমান্য করেছেন। কুরআন অমান্য করা মানে হলো তা রদ করা। আর তা রদ করার অধিকার কেবল আইনপ্রণেতাদের আছে। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পর থেকে এই অধিকার বাতিল হয়ে যায়। [cite: ১৩১০] উপর্যুক্ত ঘটনায় দেখা গেছে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পরিস্থিতির পরিবর্তনকে আমলে নিয়েছিলেন। [cite: ১৩১১]
দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্তকে সাহায্য করা, আল্লাহর রাহে জিহাদ পরিচালনা এবং মুসাফিরদের সহযোগিতার জন্য যাকাত দেওয়ার কথা কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনে মুসাফিরদের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। যে কারণে তাদের জন্য যাকাত, ফায় এবং যুদ্ধলব্ধ গনীমতের খুমুস থেকে অংশ প্রদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মুসাফির, অতিথি এবং নিরীহ-অসহায় লোকজনের বেলায় ইসলাম একই নিয়ম জুড়ে দিয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শিক্ষা দ্বারা এই আইন প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার খেলাফতকালে দার আদ-দাকীক গড়ে তোলেন। সেখানে মুসাফির, অতিথি, এবং খলীফার কাছে আসা অভ্যাগতদের জন্য আটা (দাকিক), সাওয়ীক, খেজুর, কিশমিশ এবং প্রয়োজনীয় নানা পণ্য রাখা হতো। মরূদ্যানে চলার পথে একজন অসহায় মুসাফিরের যা কিছু প্রয়োজন এর সবকিছু মক্কা-মদীনার মাঝপথে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। [cite: ১৩১২]
এখন এই আটটি শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত লোকের নাম ও সংখ্যার তথ্য রাষ্ট্রের দরকার ছিল। তাই বিভিন্ন প্রদেশে এবং রাজধানীতে তথ্যাদি সংগ্রহ শুরু হয়। খলীফাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এর জন্য আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। আর অন্যান্য অঞ্চলে এর শাখা খোলা হয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময় জনসাধারণের তথ্য সংগ্রহ করে তবেই প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল। [cite: ১৩১৩]
আয়াতটি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং সামাজিক স্বার্থে আল্লাহর জন্য জিহাদ পরিচালনা, সেনাবাহিনী গঠন, দরিদ্রতা দূর করা, ঋণ শোধ করা এবং অভাব দূর করার উদ্দেশ্যে আটটি শ্রেণবিন্যাস করা হয়েছে। এক কথায় বলতে গেলে সমাজের প্রয়োজন মেটাতে, নিরাপত্তা বিধান করতে এবং ভালোবাসাও সম্প্রীতি বৃদ্ধির জন্য যা প্রয়োজন এখানে তার ব্যবস্থাপত্র বিদ্যমান। [cite: ১৩১৪]

টিকাঃ
১৩০১. সূরা তওবা, ৯: ৬০।
১৩০২. আল-নিদহাম আল-ইসলামি আল-মুকারিন, পৃ. ১১২, সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ১৭১।
১৩০৩. আল-আমওয়াল, আবু উবায়দ, ৪/৬৭৬; সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ১৭১।
১৩০৪. সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ১৭২।
১৩০৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৩।
১৩০৬. আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ২০২।
১৩০৭. সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ১৭৫।
১৩০৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭৭, ১৭৮।
১৩০৯. আল-আবআদ আস-সিয়াসাইয়া আল আমন ফীল ইসলাম, পৃ. ৩০৬।
১৩১০. আল-ইজতিহাদ ফীল ফিকহ আল ইসলামি, পৃ. ১৩২, ১৩৩।
১৩১১. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৪।
১৩১২. আত-তাবাকাত, ৩/২৮৩।
১৩১৩. সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ১৮৪।
১৩১৪. প্রাগুক্ত।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 জিযিয়া, খারাজ এবং উশর থেকে ব্যয়

📄 জিযিয়া, খারাজ এবং উশর থেকে ব্যয়


এই উৎসগুলো থেকে খলীফা, গভর্নর, সেনাবাহিনী, আহলে বাইত, মুজাহিদদের স্ত্রী প্রমূখের বেতন-ভাতা প্রদান করা হতো।

১। খলীফার সম্মানী : খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য পাঁচ হাজার দিরহাম (কোনো কোনো বর্ণনামতে ছয় হাজার দিরহাম) বরাদ্দ করা হয়েছিল।
২। গভর্নরদের সম্মানী : একেক অঞ্চলের গভর্নরকে একেক রকম সম্মানী প্রদান করা হতো। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার খেলাফতকালে একেকটি প্রদেশ শাসনের জন্য শক্তিধর এবং দৃঢ়চেতা শাসক নিয়োগ করেছিলেন। আবার খারাজ ও যাকাত সংগ্রহ এবং অন্যান্য কাজে তাদের সাহযোগিতা করার জন্য সহকারি, কর সংগ্রাহক বা কালেক্টর, বিচারক, লেখক, কর্মী নিয়োগ করেছিলেন। গভর্নরেরা সাধারণত নামাযে ইমামতি করতেন এবং যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতেন। তাঁর অধীন প্রতিনিধিরা অর্থ সংগ্রহ করতেন। আরেক দল দক্ষ এবং অভিজ্ঞ লোকজনের কাজ ছিল জমি পরিমাপ করা, করের হিসাব কষা এবং ভাতা-গ্রহণকারীদের নাম তুলে রাখা। পদ, কাজের ধরণ, কর্মক্ষেত্রের দূরত্ব, কাজে উন্নতি, জীবনযাপনের খরচ ইত্যাদি বিবেচনা করে বেতন ধার্য করা হতো। আর ভাতা প্রদানের জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিন-তারিখ ছিল না। [cite: ১৩১৫] আল-উম্মালদের (প্রতিনিধি) প্রসঙ্গে আলোচনার সময় কর্মী এবং প্রতিনিধিদের তথ্য আলোচনা করা হবে।
৩। সেনাবাহিনীর বেতন : সেনাবাহিনীর প্রতি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুব যত্নবান ছিলেন। তাই তিনি সেনাবাহিনীর তথ্যাদি গুছিয়ে ফেলেন (দিওয়ান)। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে নৈকট্য এবং ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামিতার ভিত্তিতে তাদের সম্পদ ভাগ করতেন। [cite: ১৩১৬] সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারবর্গ ছিলেন নিয়মিত বেতনের তালিকার শীর্ষে, যেমন বনু হাশিম। আল-আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের পক্ষ থেকে সম্পদ গ্রহণ ও বণ্টন করতেন। এরপরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণের নাম ছিল। আহলে বাইতের বাইরে তাদের জন্য আলাদা করে বেতন ধার্য করা হয়েছিল।
বাকি মুসলিমরা জিহাদে কীভাবে অংশ নিয়েছিলেন তার ওপরে ভিত্তি করে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। যেমন বদরের যুদ্ধ থেকে হুদায়বিয়ায় অংশগ্রহণকারীগণ, হুদায়বিয়া থেকে রিদ্দায় অংশগ্রহণকারীগণ, অতঃপর যারা কদিসিয়া এবং আল-ইয়ারমুকে অংশগ্রহণ করেছেন এভাবে ক্রম সাজানো হয়েছিল। মুজাহিদদের স্ত্রী এবং জন্মগ্রহণমাত্রই সন্তানেরা বিশেষ ভাতা পেত। দাস-দাসী এবং কুড়িয়ে পাওয়া অজ্ঞাতনামা শিশুরাও এর বাইরে ছিল না, তাদের ন্যূনতম এক হাজার দিরহাম করে দেওয়া হতো। বয়োপ্রাপ্ত হওয়ার সাথে সাথে তাদের ভাতাও বৃদ্ধি পেত। [cite: ১৩১৭] মুক্ত দাস-দাসীরা এক থেকে দুই হাজার দিরহাম পেয়েছে। [cite: ১৩১৮]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ বছরে দশ হাজার দিরহাম সম্মানী পেতেন। তবে জুয়াইরিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহা, সাফিয়্যা রাযিয়াল্লাহু আনহা এবং মায়মূনা রাযিয়াল্লাহু আনহার ছিলেন ব্যতিক্রম। তাদের ভাতা কম ছিল। সাফিয়্যা রাযিয়াল্লাহু আনহা এবং জুয়াইরিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহা পেতেন ছয় হাজার করে। অন্যদিকে মায়মূনা রাযিয়াল্লাহু আনহার ভাতা বৃদ্ধি করে বারো হাজার দিরহাম বরাদ্দ করা হয়েছিল। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহুমা উম্মুল মুমিনীনদের সমান ভাতা প্রদানের প্রস্তাব দিলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তা মেনে নেন। আনসার এবং মুহাজিরদের প্রত্যেককে বছরে চার হাজার দিরহাম ভাতা দেওয়া হতো। এর ব্যতিক্রম ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি পেতেন সাড়ে তিন হাজার দিরহাম। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, হিজরতের সময় তিনি তার পিতার সাথে এসেছিলেন, একা হিজরত করেননি। [cite: ১৩১৯] হিজরতের সময় তিনি শিশু ছিলেন। পরবর্তী সময়ে মুহাজিরদের আরও এক হাজার দিরহাম বেশি দেওয়া হয়েছে। সেই হিসেবে তারা বছরে পাঁচ হাজার দিরহাম পেতেন। [cite: ১৩২০] বদরে উপস্থিত আনসার-মুহাজিরদের বেলায় এমন ঘটতে দেখা গেছে। [cite: ১৩২১] আর যারা হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় উপস্থিত ছিলেন বছরে তাদের তিন হাজার দিরহাম ভাতা দেওয়া হতো। [cite: ১৩২২]
প্রত্যেক নবজাতককে একশ দিরহাম করে দেওয়া হতো। প্রথমদিকে যারা দুগ্ধপোষ্য ছিল না তাদের জন্য এই ভাতা ধার্য করা হতো। এই নিয়মের কারণে বাবা-মা যেন সময়ের আগেই বাচ্চাদের স্তন্যদান বন্ধ না করে দেয় সেই চিন্তা থেকে পরে সব শিশুর জন্যই ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
মুক্তিলাভের পরে যেসব দাসেরা তুলনামূলক সম্ভ্রান্ত ছিল, যেমন হরমুযান, তারা মুসলিম হয়ে গেলে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাসহ দুই হাজার দিরহাম করে পেত। [cite: ১৩২৩]
বার্ষিক ভাতা ছাড়াও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আরও অনেক খাতে খরচ করতেন। [cite: ১৩২৩] উপর্যুক্ত ভাতা ছাড়াও তিনি প্রত্যেক ব্যক্তিকে প্রতিমাসে গম দিতেন। [cite: ১৩২৪] খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার খেলাফতের শেষদিকে বলেছিলেন, ‘সম্পদ বৃদ্ধি পেতে থাকলে আমি প্রত্যেক লোককে চার হাজার দিরহাম করে দেব: এক হাজার তার সফরের জন্য, এক হাজার তার অস্ত্রের জন্য, এক হাজার তার পরিবারের জন্য, এবং এক হাজার তার ঘোড়া-খচ্চরের জন্য।’ [cite: ১৩২৫]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিশ্বাস করতেন যে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বায়তুল মালের ওপরে প্রত্যেক মুসলমানের হক আছে। তিনি তার এই নীতির ঘোষণা এভাবে দিয়েছেন, ‘আল্লাহর কসম, তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই (তিনি এ কথা তিনবার বললেন), এই সম্পদের ওপরে এমন কেউ নেই-যার হক নেই, তাকে দেওয়া হোক বা না হোক। এদিক দিয়ে আমিও আপনাদের মতো একজন। আল্লাহর কিতাবের বর্ণনা অনুসারে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নৈকট্যের ভিত্তিতে সবারই এর ওপরে কম-বেশি হক আছে। জেষ্ঠ্যতা, কিংবা ইসলামের জন্য কে কতটুকু কাজ করছে এবং মুসলিমদের কতটা উপকার করছে এর ভিত্তিতে, অথবা যে নিরাপত্তা দান করছে, অথবা কেউ কতটা অভাবী এর ওপরে ভিত্তি করে তাকে তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আল্লাহর কসম, আমি যতদিন বেঁচে থাকব সানা পাহাড়ের একজন মেষপালকও যদি এর হকদার হয়ে থাকে তবে তাকে তার হক তার মৃত্যুর আগেই বুঝিয়ে দেব।’ [cite: ১৩২৬]
এখানে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বের সাথে বিশ্লেষণ করতে হবে। কেন তিনি সবাইকে সমান অংশ দেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আত্মীয়স্বজন, বুযুর্গ সাহাবায়ে কেরাম, আনসার-মুহাজিরগণ এবং আগে আগে ইসলাম গ্রহণকারী ও মুজাহিদগণ তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। যাদের কাঁধে ভর দিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল নিঃসন্দেহে তাদের জন্য অনেক বেশি সম্পদ বরাদ্দ করেছিলেন। তারা ইসলামকে এবং এর লক্ষ্যকে অনেক বেশি উপলব্ধি করতেন, ঘনিষ্ঠভাবে আইন আঁকড়ে থাকতেন, সম্পদ পরিচালনার বেলায় অনেক বেশি ধর্মনিষ্ঠ ও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন এবং ব্যয়ের বেলায়ও সামাজিক লক্ষ্য পূরণে সচেষ্ট থেকেছেন। এই শ্রেণিকে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলায় সমাজ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধাদান সহজ হয়ে গেছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই নীতিতে পরিবর্তন আনতে চাচ্ছিলেন, তিনি সবাইকে সমান অংশ দিতে আগ্রহী ছিলেন। তার খেলাফতের শেষদিকে তিনি এই কথা পরিষ্কার জানিয়ে দেন, ‘আমি আগামী বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকলে, আমি আগে সবচেয়ে শেষের লোকটিকে প্রথম লোকটির পর্যায়ে নিয়ে আসব। তারপরে সবাইকে সমান অংশ বুঝিয়ে দেব।’ [cite: ১৩২৭]
তিনি জনসাধারণের সম্পদ নিয়ে কী ভাবেন তা তার এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, ‘আল্লাহ তা’আলা আমাকে এই সম্পদের রক্ষক এবং বণ্টনকারী বানিয়েছেন।’ তিনি বলতে লাগলেন, ‘আল্লাহ তা’আলা এর বণ্টন পদ্ধতিও বলে দিয়েছেন। [cite: ১৩২৮] পারস্য থেকে যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ বায়তুল মালে আনা হয়েছিল সেগুলো দেখে তিনি খুব কেঁদেছিলেন। তখন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে মনে করিয়ে দিলেন যে, দিনটি আনন্দের এবং শোকরের। এ কথা শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘না। এগুলো মানুষকে কখনো দেওয়া হয়নি। এই সম্পদ বরং তাদের মধ্যে ঘৃণা আর বিদ্বেষ জন্ম দিয়েছিল। [cite: ১৩২৯] জালুলার অভিযান থেকে পাওয়া সম্পদ দেখে তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করতে লাগলেন:
زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ الشَّهَوَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَالْبَنِينَ وَالْقَنَاطِيرِ الْمُقَنْطَرَةِ مِنَ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ
মানবকুলকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী, সন্তান-সন্ততি, রাশিকৃত স্বর্ণ-রৌপ্য। [cite: ১৩৩০]
তিনি দুআ করতে লাগলেন, ‘হে আল্লাহ, আমাদের সামনে যা সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে তার আনন্দ প্রকাশ না করে পারছি না। আমি যেন এগুলো সঠিকভাবে ব্যয় করতে পারি এবং এগুলোর বিপদ থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’ [cite: ১৩৩১]

টিকাঃ
১৩১৫. সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ১৯৮।
১৩১৬. আল-আহকাম আস-সুলতানিয়া, পৃ. ২২৭; সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ১১৯।
১৩১৭. আত-তাবাকাত, ৩/৩০১।
১৩১৮. তারীক আল-ইয়াকুবি, ২/১৫৩, ১৫৪।
১৩১৯. আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ২১৪।
১৩২০. প্রাগুক্ত।
১৩২১. প্রাগুক্ত।
১৩২২. প্রাগুক্ত, পৃ. ২১৫।
১৩২৩. প্রাগুক্ত।
১৩২৪. সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ২০২।
১৩২৫. সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ২০০, আত-তাবাকাত আল-কুবরা, ৩/২৯৮।
১৩২৬. আত-তাবাকাত আল-কুবরা, ৩/২৯৯; কিতাব আল-খারাজ, আবু ইউসুফ, পৃ. ৫০।
১৩২৭. আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ২১৬; আল-আমওয়াল, ইবনে জানজাওয়ে, ২/৫৭৬।
১৩২৮. এর সনদ সহীহ। আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ২১৬।
১৩২৯. আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ২১৭, এর সনদ সহীহ।
১৩৩০. সূরা আল-ইমরান, ৩: ১৪।
১৩৩১. আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ২১৭, এর সনদ হাসান।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 যুদ্ধলব্ধ গনীমত থেকে ব্যয়

📄 যুদ্ধলব্ধ গনীমত থেকে ব্যয়


আল্লাহ তা’আলার এই আয়াতের ভিত্তিতে যুদ্ধলব্ধ গনীমতের মাল বণ্টন করা হতো:
وَ اعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِّنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَ لِلرَّسُولِ وَ لِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَى وَ الْمَسْكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ
আর এ কথাও জেনে রাখ যে, কোনো বস্তু-সমাগ্রীর মধ্য থেকে যা কিছু তোমরা গনীমত হিসাবে পাবে, তার এক-পঞ্চমাংশ হলো আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য, তার নিকটাতামীয়-স্বজনের জন্য এবং ইয়াতিম-অসহায় ও মুসাফিরদের জন্য। [cite: ১৩৩২]
গনীমতের অবশিষ্ট চার-পঞ্চমাংশ যোদ্ধারা পেতেন, এদের মধ্যে অশ্বারোহীরা পেতেন তিন ভাগ- দুই ভাগ তার ঘোড়ার জন্য আর এক ভাগ নিজের জন্য—এবং প্রত্যেক পদাতিক সৈন্য পেতেন এক ভাগ। [cite: ১৩৩৩]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনি এর একভাগ নিজের এবং স্ত্রীদের জন্য ব্যয় করতেন। আর বাকি যা থাকত তা জনস্বার্থে অর্থাৎ, দরিদ্র এবং অভাবীদের জন্য ব্যয় করতেন। দ্বিতীয় অংশ পেতেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আত্মীয়-স্বজন, যেমন- বনু হাশিম এবং বনু আব্দুল মুত্তালিব, কারণ, তারা ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয়েছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পরে এই দুটো ভাগ নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। কেউ কেউ বললেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অংশ পরবর্তী খলীফাকে দেওয়া হোক এবং আত্মীয়দের অংশ তার আত্মীয়দের দেওয়া হোক। আবার কেউ বললেন, তার আত্মীয়দের অংশ খলীফার আত্মীয়দের দেওয়া হোক। পরে অবশ্য সর্বসম্মতিক্রমে বাহন এবং অস্ত্রের পেছনে এই অংশ ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। [cite: ১৩৩৪] সুতরাং দুটো অংশই মুসলিমদের স্বার্থে ব্যয় করা হতো। এর মধ্যে ছিল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করা, সীমান্ত পাহারা দেওয়া এবং দ্বিতীয় খলীফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা। [cite: ১৩৩৪]
দরিদ্র, অভাবী আর মুসাফিরদের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে যেভাবে খরচ করা হতো সেভাবেই খরচ অব্যাহত রইল। দ্বিতীয় খলীফার সময়ে এতে কোনো রকম পরিবর্তন আনা হয়নি। [cite: ১৩৩৫]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের সময় এগুলোই ছিল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। তিনি নিজ হাতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জনসাধারণের তহবিল নিয়ে তিনি খুব সাবধান থাকতেন। তার বক্তব্যে এর প্রমাণ পাওয়া যায়, ‘আমি আল্লাহর মাল থেকে নিজের জন্য কী রাখছি তা তোমাদের জানিয়ে রাখি : শীতের একটি পোশাক, গরমের একটি পোশাক, হজ ও উমরা পালনের জন্য একটি বাহন, আর দশটা সাধারণ কুরাইশের মতো—যারা ধনীও নয় আবার দরিদ্রও নয়—পরিবারের জন্য খাবার। আমি একজন মুসলিম। তোমাদের দিন যেভাবে কাটে, আমার দিনও সেভাবে কাটে।’ [cite: ১৩৩৬] তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘আল্লাহর কসম, তোমরা জান যে, আমি নিজের খাবার ছাড়া অন্য কোনো কিছু খাই না এবং আমার নিজের পোশাক ছাড়া অন্য কিছু পরি না এবং আমার হকের বাইরে কোনো কিছু গ্রহণ করি না।’ [cite: ১৩৩৭] তিনি এও বলতেন, ‘আমি আল্লাহর মালকে একজন ইয়াতিমের মাল মনে করি : وَمَنْ كَانَ غَنِيًّا فَلْيَسْتَعْفِفْ ۖ وَمَنْ كَانَ فَقِيرًا فَلْيَأْكُلْ بِالْمَعْرُوفِ যারা সচ্ছল তারা অবশ্যই ইয়াতিমের মাল খরচ করা থেকে বিরত থাকবে। আর যে অভাগ্রস্ত সে সঙ্গত পরিমাণ খেতে পারে। [cite: ১৩৩৮]

টিকাঃ
১৩৩২. সূরা আল-আনফাল, ৮: ৪১।
১৩৩৩. আল-খারাজ, আবু ইউসুফ, পৃ. ২২১।
১৩৩৪. প্রাগুক্ত।
১৩৩৫. সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ২০৫, ২০৬।
১৩৩৬. তারীখ আল-মাদীনা, ইবনে শিবাহ, ২/৬৯৮; আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ২১৮।
১৩৩৭. আত-তাবাকাত, ৩/৩১৩; আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ৩১৮।
১৩৩৮. সূরা আন-নিসা, ৪: ৬।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ত বিষয়

📄 রাষ্ট্রের অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ত বিষয়


ইসলামী মুদ্রার প্রচলন
সোনা-রূপায় তৈরি মুদ্রা ছিল সামাজিক জীবনের অন্যতম অনুসঙ্গ। বিশেষ করে দুটো জাতি এবং রাষ্ট্রের মধ্যে লেনদেনের জন্য এর গুরুত্ব অপরিসীম। লক্ষণীয় বিষয় হলো, মুসলিম এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠি মিলে যখন ইসলামী রাষ্ট্র গঠিত হলো, তখন প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ছিল ভিন্ন প্রথা এবং সংস্কৃতির। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং অন্যান্য খলীফা ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিন রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্থাপিত হলো। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুদ্রা প্রচলনের, নিজের রাষ্ট্রের মধ্যে এবং অন্য রাষ্ট্রের সাথে লেনদেনের জন্য, ব্যবস্থা নিলেন। [cite: ১৩৩৯] ঐতিহাসিক তথ্য থেকে জানা যায় যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে প্রচলিত মুদ্রা পরিবর্তন করেননি। খ্রিস্টানদের লেখা সংবলিত বাইজেন্টাইনদের মুদ্রা যেমন প্রচলিত ছিল, তেমনই পারসিকদের জরথুস্ট্রীয় লেখা সংবলিত মুদ্রাও ছিল। এর অর্থ, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে প্রচলিত মুদ্রা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছিলেন এবং জাল মুদ্রা ঠেকাতে এগুলোকে জায়েয বলে উল্লেখ করেছিলেন। [cite: ১৩৪০] রাষ্ট্রের বাইরে লেনদেনের জন্য নতুন করে মুদ্রা ছাপানেরা পেছনেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবদান ছিল। আল-মাওয়ারদী বলেছেন, ‘উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলামী দিরহামের গুরুত্ব বিবেচনা করে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। [cite: ১৩৪১] আল-মাকরীযিব উল্লেখ করেছেন, ‘উমর ইবনুল খাত্তাব ১৮ হিজরীতে সর্বপ্রথম ইসলামী মুদ্রা ছাপান। পারসিক মুদ্রা ওপরেই তিনি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ (সকল প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার) নয়তো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই) ছাপিয়েছিলেন। এর একাংশে খলীফা উমরের নাম উল্লেখ করা হয়।’ [cite: ১৩৪২] সুতরাং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিমসহ অন্যান্যদের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। জীবনযাপনে অগ্রগতিতে এবং সভ্যতার উন্নয়নে খুলাফায়ে রাশেদীনসহ বহু মানুষ তাকে অনুসরণ করেছেন। [cite: ১৩৪৩]

জমি বরাদ্দ করা
আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাধারণ লোকের জন্য জমি বরাদ্দ করতে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদ্ধতি অনুসরণ করতেন। তিনি আয-যুবায়র ইবনুল আওয়ামকে আল-জারফ ও কনাতের [cite: ১৩৪৪] মধ্যবর্তী অব্যবহৃত জমি দান করেন এবং মাজাহ ইবনে মারারা আল-হানাফীকে আল-খাদরামা (আল-ইয়ামামার একটি গ্রাম) দিয়ে দেন। তিনি উয়ায়না ইবনে হাসন আল-ফাজারী এবং আল-আকরা ইবনে হাবিস আত-তামীমিকে কিছু বিরাণ ভূমি দিতে চাচ্ছিলেন। ওই জমিতে ঘাস জন্মাত না এবং তা কোনো কাজেও লাগত না। তারা ওই জমিটি কাজে লাগাতে চাচ্ছিলেন। তবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরামর্শে তিনি মত পরিবর্তন করলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন যে, এখন ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করতে এমন কাজ করার দিন ফুরিয়েছে। তিনি লোকগুলোকে বলে দিলেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের অন্তরকে আকৃষ্ট করতে চাইতেন, তখন ইসলাম দুর্বল ছিল। আল্লাহ তা’আলা ইসলামকে এখন বিজয় দান করেছেন, যাও, পরিশ্রম কর গিয়ে।’ [cite: ১৩৪৫]
এখানে স্পষ্ট যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিনা কারণে জমি বরাদ্দের বিরোধিতা করেননি। বরং লোকেরাই নিজেরা নিজেদের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছিল। তার মতে, এদের আকৃষ্ট করার কোনো কারণ ছিল না। বরং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নীতি অনুসরণ করে যারা জমি যথার্থভাবে কাজে লাগাতে পারবে এমন লোকদের বরাদ্দ দিতেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘হে লোকসকল, মৃত জমি যে আবাদ করতে পারবে, সেটা তার।’ [cite: ১৩৪৬] বর্ণনা দুর্বল হলেও এখান থেকে এটা নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জমির অপব্যবহার দেখলে তা ফেরত নিয়ে অন্য কাউকে দিয়ে দিতেন। তিনি খাওয়াত ইবনে যুবায়রকে [cite: ১৩৪৭] অনাবাদি জমি দিয়েছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাছাড়া তিনি যুবায়র ইবনুল আওয়ামকে আল-আকিকের জমি বরাদ্দ করে দেন। আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তিনি ইয়ানবুতে জমি দেন, এর উপর দিয়ে মিঠাপানির ধারা বইতে শুরু করেছিল। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু ওই জমি দরিদ্রদের দান করে দেন। বেশ কিছু দুর্বল বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কয়েকজন সাহাবায়ে কেরামকে জমি বরাদ্দ দিয়েছিলেন। [cite: ১৩৪৮]

টিকাঃ
১৩৩৯. আল-ইদারা আল-ইসলামিয়া ফী আহদ উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ৩৬৪।
১৩৪০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৬৬।
১৩৪১. আল-আহকাম আস-সুলতানিয়া, পৃ. ১৪৭।
১৩৪২. শুযূর আল-উকুদ ফী যিকর আন-নুকুদ, পৃ. ৩১-৩৩।
১৩৪৩. আল-ইদারা আল-আস্কারিয়া ফী আহদ উমর, পৃ. ৩৬৭।
১৩৪৪. আত-তাবাকাত আল-কুবরা, ৩/৩১৩- এর সনদ সহীহ; আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ২২০।
১৩৪৫. সহীহ, বুখারী, ১/৮১; আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ২২১।
১৩৪৬. আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ২২১, এর সনদ সহীহ।
১৩৪৭. প্রাগুক্ত।
১৩৪৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ২২২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00