📄 খারাজ
খারাজের দুটো অর্থ। মুসলিমরা যাকাতের বাইরে বায়তুল মালে যে সম্পদ জমা দিত তা খারাজ নামে পরিচিত ছিল। সুতরাং তা ফায়ের অন্তর্ভুক্ত, এর মধ্যে জিযিয়া, উশর ইত্যাদিও পড়ে। এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা আছে। যেমন, মুসলিমরা পেশিশক্তির জোরে যে দেশগুলো দখল করতে সক্ষম হয়েছিল, কিংবা কোনো দেশের শাসক যখন তার দেশের আয়-রোজগার সবকিছু মুসলিমদের কাছে আজীবনের জন্য ছেড়ে দিয়েছিল সেসব দেশ থেকে যে আয় হতো সেগুলো এর আওতায় আসে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময় ইরাকের আস-সাওয়াদ এবং সিরিয়ার ক্ষেত্রে এমন হয়েছিল। [cite: ১২৩০] ইবনে রজব আল-হাম্বালী বলেছেন, ‘কোনো ভূখণ্ডের মূল্য কিংবা এর ভাড়া থেকে যে আয় হতো খারাজ এগুলোর ওপরে নির্ভরশীল ছিল না। এমনকি ওই দেশের ওপরেও এগুলো নির্ভর করত না। [cite: ১২৩১]
লাগাতার বিজয়ের পরে, বিশেষ করে পারস্য এবং বাইজেন্টাইনের মতো দুটো পরাশক্তিকে পরাজিত করার পরে, ইসলাম অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। ফলে মুসলিমরাষ্ট্রে আয় এবং সেই সাথে ব্যয় বৃদ্ধি পায়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ইসলামী রাষ্ট্রের একতা ধরে রাখতে, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষার জন্য ব্যক্তিগত ও সরকারি পর্যায়ে বুদ্ধিদীপ্ত এবং বিচক্ষণ নীতিমালার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। এ কারণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মনে হয়েছিল, একটি সুনির্দিষ্ট এবং নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা থাকলে এই লক্ষ্যগুলো অর্জন করা যাবে। এই ভাবনা থেকে খারাজের উৎপত্তি ঘটেছে। তবে বিজয়ীরা বিজিত অঞ্চল এবং এর গনীমত নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে চাইতেন। কারণ, কুরআনে গনীমত প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
وَ اعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِّنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَ لِلرَّسُوْلِ وَ لِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَى وَ الْمَسْكِينِ وَ ابْنِ السَّبِيْلِ إِنْ كُنْتُمْ آمَنْتُمْ بِاللَّهِ وَ مَا أَنْزَلْنَا عَلَى عَبْدِنَا يَوْمَ الْفُرْقَانِ يَوْمَ الْتَقَى الْجَمْعُنِ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
আর এ কথাও জেনে রাখ যে, কোনো বস্তু-সামগ্রীর মধ্য থেকে যা কিছু তোমরা গনীমত হিসাবে পাবে, তার এক-পঞ্চমাংশ হলো আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য, তার নিকট আত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং ইয়াতিম-সহায় ও মুসাফিরদের জন্য; যদি তোমাদের বিশ্বাস থাকে আল্লাহর উপর এবং সে বিষয়ের উপর যা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছি ফয়সালার দিনে, যেদিন সম্মুখীন হয়ে যায় উভয় সেনাদল। আর আল্লাহ সবকিছুর উপরই ক্ষমতাশীল। [cite: ১২৩২]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কিন্তু প্রথমদিকে বিজিত অঞ্চলগুলোকে বিজয়ীদের মধ্যে ভাগ করে দিতে চেয়েছিলেন। আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু এতে বাধা দেন। মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুও তাকে সমর্থন দেন। তিনিও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে এমন করা থেকে বিরত থকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। আবু উবায়দ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আল-জাবিয়ায় গিয়ে মুসলিমদের মধ্যে ওই ভূখণ্ড ভাগ করে দিতে চান। তখন মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু কললেন, ‘আল্লাহর কসম, এর ফলাফল খুব ভালো হবে না। আপনি এভাবে জমি ভাগ করে দিতে থাকলে এগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এর মালিকানা শেষ পর্যন্ত একজন পুরুষ বা মহিলার হাতে গিয়ে ঠেকবে। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধের জন্য কোনো কিছু অবশিষ্ট থাকবে না (কারণ, সব ভূখণ্ড বিজিত হবে বলে তখন শুধু আত্মরক্ষার্থে মানুষ লড়াই করবে)। সুতরাং বর্তমান ও ভবিষ্যত মুসলিমদের সুবিধা হয়—এমন কোনো পন্থা বের করতে হবে।’ [cite: ১২৩৩]
মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। অতএব, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ নিয়ে কুরআন থেকে গবেষণা শুরু করেন। তিনি প্রত্যেক শব্দ ধরে ধরে বিশ্লেষণ করতে লাগলেন। অবশেষে সূরা হাশরে গিয়ে তিনি ফায় বিলি-বণ্টনের উল্লেখ পান। তিনি বুঝতে পারলেন যে, সেখানে তৎকালীন মুসলিমদের পাশাপাশি ভবিষ্যত মুসলিমদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতামত গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। এই খবর মুসলিমদের কানে চলে গেল। তার সাথে সাহাবীদের একাংশের মতবিরোধ দেখা দেয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং তার সমর্থকেরা ভূখণ্ড ভাগের বিরুদ্ধে ছিলেন। অন্যদিকে বিলাল ইবনে রাবা এবং যুবায়র ইবনে আউয়াম রাযিয়াল্লাহু আনহুমসহ কয়েকজন এগুলো ভাগ করার পক্ষে ছিলেন। গনীমতের মালামাল ভাগ করে দেওয়া গেলে এগুলোও ভাগ করে দেওয়া উচিত বলে তারা মনে করলেন। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও গনীমতের সাথে খায়বারেরর জমি ভাগ করে দিয়েছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। তিনি সূরা হাশর থেকে আল-খুমুসের এই আয়াত তিলাওয়াত করে শোনালেন :
وَ مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلَا رِكَابٍ وَلَكِنَّ اللَّهَ يُسَلِّطُ رُسُلَهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
আল্লাহ (বনু-যায়রের কাছ থেকে) তার রাসূলকে যে ধন-সম্পদ দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা ঘোড়ায় কিংবা উটে চড়ে যুদ্ধ করনি, কিন্তু আল্লাহ যার উপর ইচ্ছা, তার রাসূলগণকে প্রাধান্য দান করেন। আল্লাহ সবকিছুর উপরে সর্বশক্তিমান। [cite: ১২৩৪]
তারপর বনু আন-নাযীরের আলোচনা করে তিলাওয়াত করলেন :
مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُوْلِ وَلِذِي الْقُرْبِي وَ الْيَتَى وَ الْمَسْكِينِ وَ ابْنِ السَّبِيلِ لَنْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ وَ مَا اتْكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَ مَا نَهُكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَ اتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তাঁর রাসূলকে যা দিয়েছেন, তা আল্লাহর, রাসূলের, আত্মীয়-স্বজনের, ইয়াতিমদের, অভাবগ্রস্তদের এবং মুসাফিরদের জন্য, যাতে ধনৈশ্বর্য কেবল তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যেই পুঞ্জীভূত না হয়। রাসূল তোমাদের যা দেন, তা গ্রহণ করো এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা। [cite: ১২৩৫]
এখানে সব নগরের কথা বলা হয়েছে। অতঃপর আল্লাহ তা’আলা বলেন, لِلْفُقَرَاءِ الْمُهْجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَ أَمْوَالِهِمْ يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا وَ يَنْصُرُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ هُمُ الصُّدِقُونَ
এই ধন-সম্পদ দেশত্যাগী নিঃস্বদের জন্য, যারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টিলাভের অন্বেষণে এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের সাহায্যার্থে নিজেদের বাস্তুভিটা ও ধন-সম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছে। তারাই সত্যবাদী। [cite: ১২৩৬]
পরবর্তী সময়ে যারা আসবে এখানে তাদের কথা বলা হয়েছে। মুসলিমদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে ফায়ের হক থেকে বঞ্চিত হবে। অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু বললেন, ‘আমি যতদিন বেঁচে আছি, সানার (ইয়েমেনের সানা) কোনো মেষপালককে পর্যন্ত, দাবি করার আগেই তাকে ফায়ের অংশ দিয়ে দেওয়া হবে। [cite: ১২৩৮]
আরেকটি বর্ণনামতে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, ‘মুসলিমরা এসে দেখবে, তাদের জমি তাদের লোকদের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে এবং বংশানুক্রমে বাবার কাছ থেকে ছেলে পেয়ে একাই ভোগ করে যাচ্ছে, তখন ওই মসলমানদের কী হবে? কাজটা ভালো হবে না।’ আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আপনার কী ধারণা? আল্লাহ মানুষকে ফায় হিসেবে যা দিয়েছেন এর বাইরে এই ভূখণ্ড এবং অধিবাসীদের আর কোনো হক নেই?’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘এটা আপনার ধারণা, আমার নয়। আল্লাহর কসম, আমার পরে এমন কোনো ভূখণ্ড জয় হবে না যেখান থেকে প্রচুর ফায় আসবে। এগুলো বরং মুসলিমদের ওপরে বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। ইরাককে এবং সিরিয়াকে যদি এর অধিবাসীদের মধ্যে ভাগ করে দিই তবে সীমানা কারা পাহারা দেবে? বিধবা আর তাদের সন্তানদের জন্য আমাদের দেশ, ইরাক আর সিরিয়ার ভূখণ্ড থেকে কী কিছু অবশিষ্ট থাকবে?’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে তাদের বেশ কিছুক্ষণ তর্ক-বিতর্ক চলার পরে তারা বললেন, ‘আল্লাহ তা’আলা আমাদের তরবারির বদৌলতে যা দিয়েছেন, আপনি এখন সেগুলো এমন লোকদের এবং তাদের সন্তানদের ও তাদের সন্তানদের সন্তানকে দিয়ে যেতে চাচ্ছেন যারা এখন উপস্থিত নেই?’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কথা বাড়ালেন না। তিনি বলে দিলেন, ‘এটা আমার মতামত।’ তারা বললেন, ‘অন্যদের সাথে আলোচনা করে নিন।’ তিনি দশজন আনসার এবং আল-আওস আর আল-খারাজের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের ডেকে পাঠালেন। তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আমি আপনাদের মতো একজন। আজ আপনাদের কাছে যা সঠিক মনে হবে তা-ই বলবেন। কে আমার সাথে একমত পোষণ করছে, বা করছে না সেদিকে লক্ষ্য রাখার দরকার নেই। আমার ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষার সাথে সামঞ্জস্য রেখেও কিছু বলতে হবে না।’ এর পরে কয়েকটি বিষয়ে আলোচনার পরে তিনি বলতে লাগলেন, ‘আমি ভুল করছি বলে যারা দাবি করছেন তাদের বক্তব্য আপনারা শুনেছেন। তবে খসরুর দেশ জয় করার পরে আর কোনো দেশ জয় করা বাকি থাকবে না। আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে তাদের সম্পদ, জমি এবং জনগণ দিয়ে দিয়েছেন। সেই সম্পদ গনীমত হিসেবে হকদার সবার মধ্যে ভাগ করে দিয়েছি। আর খুমুস নিয়েও যথার্থভাবে কাজে লাগিয়েছি। আমি ভাবলাম ওই ভূখণ্ড এবং এর মানুষগুলোকে তাদের মতো করে থাকতে দেব এবং তাদের ওপরে খারাজ আরোপ করব, জিযিয়া আরোপ করব। তারা যা খরচ করবে সেগুলো যোদ্ধা এবং তাদের সন্তান, অতঃপর তাদের পরে যারা আসবে সেসব মুসলমানের জন্য ফায় হিসেবে গণ্য হবে। এই সীমান্তগুলোর দিকে চেয়ে দেখুন, এগুলো রক্ষার জন্য লোকবল দরকার। এই বড় বড় নগরীর দিকে লক্ষ্য করুন, এগুলো রক্ষার জন্য প্রচুর সেনাবাহিনী দরকার, আর এর জন্য দরকার অর্থকড়ি। এখন আমি যদি এই ভূখণ্ড আর এর মানুষগুলোকে ভাগ করে দেই তবে অর্থ আসবে কোত্থেকে?’ সবাই একবাক্যে বলে উঠলেন, ‘আপনার দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক এবং আপনি সঠিক কথা বলেছেন। এই সীমানাগুলো এবং নগরী পাহারা না দিলে এবং এগুলোর জন্য ব্যয় না করলে রক্ষণাবেক্ষণ করা যাবে না। কাফিরেরা ফিরে এসে এগুলো দখল করে নেবে।’ [cite: ১১২৩৯]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যোগ করলেন, ‘আমি যদি তাদের মধ্যে এগুলো ভাগ করে দিই তবে তোমাদের মধ্যে যারা ধনী তারা আরও ধনবান হয়ে উঠবে (সূরা হাশর, ৫৯ : ৭), আর তোমাদের পরে যে মুসলিমদের আগমন ঘটবে তাদের জন্য কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। আল্লাহ তা’আলা তাদের হকও নির্ধারণ করে রেখেছেন, যেহেতু তিনি বলেছেন: আর এই সম্পদ তাদের জন্য, যারা তাদের পরে আগমন করেছে। তারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে এবং ঈমানে আগ্রহী আমাদের ভ্রাতাদেরকে ক্ষমা কর এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোনো বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি দয়ালু, পরম করুনাময়। [cite: ১২৪০]
তিনি বলতে লাগলেন, ‘কেয়ামতের আগ পর্যন্ত সবার জন্য এই কথা প্রযোজ্য।’ অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বুযুর্গ সাহাবায়ে কেরামের সাথে মিলে ওই জমি ভাগ না করার পক্ষে সিদ্ধান্ত দেন। [cite: ১২৪১]
এই আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, সাহাবায়ে কেরামের সাথে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কীভাবে বিতর্ক করতেন। তিনি শক্ত দলীলের ভিত্তিতে সুন্দরভাবে তার যুক্তি উপস্থাপন করতে জানতেন। এখানে আনসারদের সাথে আস-সাওয়াদের জমি নিয়ে আলোচনার সময় বিপক্ষের মন কীভাবে গলাতে চেষ্টা করতেন এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। কোনো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ যদি সংসদে বসে কোনো প্রতিনিধির মন জিতে নিতে চান, তবে এর চেয়ে সুন্দর বাকপটুত্ব হতে পারে না। সর্বোপরি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যা বলেছেন, তা প্রকৃত অর্থেই তার মনের কথা ছিল। রাজনীতিবিদদের চাতুর্য তার মধ্যে দেখা যায়নি। তার পদ্ধতিই ছিল অনন্য। [cite: ১২৪২]
খারাজের জমির ব্যাপারে উমর রা. নবী সা.-এর বিপরীত সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন?
কারও কারও মতে, খারাজের জমি ভাগ না করার মাধ্যমে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিপরীত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বারের জমি ভাগ করে দিয়ে গেছেন। তাদের অভিমত, কোনো শাসক শক্তির জোরে বিজিত ভূখণ্ড এভাবে ফেলে রাখলে তা সুন্নতের পরিপন্থী বলে গণ্য হবে। তবে কথাটি সঠিক নয় এবং তা খুলাফায়ে রাশেদীনের বিরুদ্ধে এগুলো ধৃষ্টতাপূর্ণ অভিযোগ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বার নিয়ে যা করেছিলেন তা জায়েয ছিল; তাই বলে কাজটি ফরয হয়ে যায়নি। কাজটি ফরয ছিল কি না এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ না থাকলেও আমাদের খুলাফায়ে রাশেদীন অর্থাৎ, উমর, উসমান এবং আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুমের কাজও এর ফরয না হওয়ার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। অনেক হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে যে মক্কাকে পেশিশক্তির মাধ্যমে জয় করা হয়েছিল। তবে মাগাযী এবং সীরাহের উলামায়ে কেরামের বর্ণনা থেকে এগুলো মুতাওয়াতিরের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। কুরাইশেরা চুক্তিভঙ্গের পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে মার আয-যাহরানে ক্যাম্প ফেলেন। তার সাথে শান্তিচুক্তি করার জন্য যেমন কেউ আসল না তেমনই তিনিও শান্তিচুক্তির জন্য কাউকে পাঠাননি; বরং আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রাথমিক খোঁজখবর নিতে গিয়ে আল-আব্বাসের কাছে ধরা পড়ে যান। তাকে বন্দী করা হয়েছিল। অথবা বলা যেতে পারে যে, আল-আব্বাস তাকে নিরপত্তার সাথে তার হেফাযতে রাখলেন। অতঃপর তিনি মুসলিম হয়ে গেলেন। এখানে কি চিন্তা করা যায় যে সদ্য মুসলিম হওয়া কেউ কাফিরদের পক্ষ থেকে এবং কাফিরদের অনুমতি ছাড়া শান্তিচুক্তি করতে পারবে? এখানে একটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছু শর্তের বিনিময়ে কাফেরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন এই বলে, ‘যে আবু সুফিয়ানের ঘরে প্রবেশ করবে সে নিারপদ; যে মসজিদে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ; যে তার ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখবে সে নিরাপদ।’ [cite: ১২৪৩] যারা তার সাথে লড়তে আসেনি তারা নিরাপদ ছিল; আগেই শান্তিচুক্তি করা হলে এমন ঘোষণার দরকার পড়ত না। [cite: ১২৪৫]
উপরন্ত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের তুলাকা (মুক্ত মানুষ) বলে অভিহিত করেছিলেন। কারণ, বন্দী করার বদলে তিনি তাদের মুক্ত করে দেন। এখানে সামামা এবং ইবনে আসালের কথা বলা যেতে পারে। তিনি অল্প কয়েকজন নারী-পুরুষকে হত্যার অনুমতি দিয়েছিলেন। সহীহ কিতাবগুলোয় এসেছে যে, তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘আমার আগে এবং পরে মক্কায় লড়াই করা আর কারও জন্য জায়েয নয়, আমাকেও সামান্য সময়ের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’ [cite: ১২৪৪] তিনি শিরস্ত্রাণ পরে মক্কায় প্রবেশ করলেন। তার পরনে ইহরাম ছিল না। শান্তিচুক্তি করা হলে তার জন্য এগুলোর অনুমতি থাকত না। পুণ্যভূমির বাইরে অন্য কোনো এলাকার সাথে শান্তিচুক্তি করা থাকলেও যুদ্ধ সংক্রান্ত কোনো আচরণ করা জায়েয ছিল না। সেখানে মক্কার মতো পবিত্র ভূমি, যেখানে লোকজনও তার সাথে শান্ত আচরণ করেছে সেখানে কি এমন করা সম্ভব হতো? উপরন্তু, তারা খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে লড়াই করেছিল এবং এই লড়াইয়ে একদল মুসলমানের হাতে কয়েকজন কাফের নিহত হয়। শেষ কথা হলো, এই বর্ণনাগুলো বিশ্লেষণ করলে যে কেউই দেখতে পাবে যে মক্কা পেশিজোরে দখল করার পরেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিন্তু এর জমি ভাগ-বাটোয়ারা করতে যাননি। সুতরাং দুটো কাজই জায়েয। [cite: ১২৪৫]
সুতরাং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জমি ভাগ না করে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধাচরণ করেননি। কয়েকটি বিষয়ের প্রতি নজর রেখে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন :
১। সূরা হাশরে ফায় সংক্রান্ত আয়াত।
২। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শক্তির জোরে মক্কা বিজয়ের পরে ওই ভূখণ্ড এর অধিবাসীদের জন্য ছেড়ে দেন এবং খারাজও আরোপ করেননি।
৩। আলোচনা এবং যুক্তি-তর্কের পরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মাজলিস আশ-শূরার সাথে আলোচনাসাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। [cite: ১২৫৬]
মুসলিমদের মধ্যে বিজিত ভূখণ্ড নিয়ে করণীয় প্রসঙ্গে এসব পদ্ধতি গৃহীত হয়েছিল। স্পষ্টত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গনীমত এবং ভূখণ্ড নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ, ছিল কুরআনের আয়াত, পারস্পরিক আলোচনা এবং মূল বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ বোঝাপড়া। এর বাইরে আরেকটি বিষয় ছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চাইতেন বিজিত অঞ্চলের লোকজন তাদের সম্পদ তাদের কাছেই রাখুক, এবং মুসলিম সেনারা যেন পার্থিব সম্পদ এবং লোভ থেকে মুক্ত হয়ে সহায়-সম্পদ নিয়ে লড়াইয়ের ফিতনা, অলসতার ফিতনা থেকে রেহাই পান। [cite: ১২৪৬] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কুরআনের দিকে ফিরে যান। একের পর এক আয়াত বিশ্লেষণ করে এগুলোর গূঢ় অর্থ বের করার চেষ্টা করেছেন। তিনি একসাথে সেদিকে দৃষ্টি দেন। যতক্ষণ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাচ্ছিলেন না, ততক্ষণ একটির পরিপ্রেক্ষিতে আরেকটি আয়াতের ব্যাখ্যা করতে থাকেন। আয়াতের বাহ্যিক অর্থে না গিয়ে তিনি শরীয়তের আলোকে এগুলো বোঝার চেষ্টো করেছিলেন। শরীয়তের লক্ষ্য সম্পর্কে তিনি অভিজ্ঞ ছিলেন বলে এই আয়াতগুলি বুঝতে সুবিধা হয়েছিল। ইজতিহাদে অভিজ্ঞ ব্যক্তি, যার বোঝার ভালো ক্ষমতা আছে এবং সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছার সাহস আছে এমন ব্যক্তি না হলে যে কারও জন্য এই প্রক্রিয়া খুব জটিল মনে হবে। কেউ কেউ মনে করেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ঐশী বাণী এড়িয়ে গেছেন, তবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন কাজ করার লোক নন। বরং তিনি ছিলেন ইজতিহাদে অভিজ্ঞ ব্যক্তি এবং শরীয়ত সম্পর্কে তার অগাধ জ্ঞান ছিল, তা এমন পর্যায়ের ছিল যে তিনি কোনো মন্তব্য করে বসলে তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয়াত নাযিল হতো। এই ঘটনা থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি যে, কুরআনের এক অংশে অন্য অংশের ব্যাখ্যা বিদ্যমান, হাদীসের ক্ষেত্রেও তাই। সুতরাং শরীয়তের আইন খোঁজার মুজতাহিদ থাকলে তখন একে একে সব আয়াত বিশ্লেষণ করলে তবেই উত্তর পাওয়া সম্ভব। নয়তো তার ইজতিহাদে সীমাবদ্ধতা চলে আসবে এবং তার সিদ্ধান্ত ভুল এবং অকার্যকর বলে প্রমাণিত হবে।
উমর রা.-এর সময়ে খারাজ কীভাবে ধার্য করা হতো? [cite: ১২৪৭]
বুযুর্গ সাহাবায়ে কেরাম উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। জমি মালিকের কাছেই থাকবে এবং হস্তান্তরযোগ্য সম্পদ বিজয়ীদের মাঝে ভাগ করে দিতে হবে। এই কাজ তদারকির জন্য তিনি দুজন প্রতিনিধি নিয়োগ করেছিলেন। তারা ছিলেন উসমান ইবনে হুনায়ফ এবং হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহুম। তারা ইরাকের আস-সাওয়াদে গিয়ে জমি পরিমাপ করেন। তাদের মিশনে পাঠানোর আগে সুস্পষ্ট ধারণা এবং বুদ্ধিদীপ্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তারা যেন প্রত্যেক ব্যক্তির সম্পদের হিসাব, কতটা জমি উর্বর বা অনুর্বর, সেখানে কোন ধরনের গাছপালা জন্মায় ইত্যাদি তথ্য লিপিবদ্ধ করে আনেন এবং মানুষের সাথে নম্র আচরণ করেন। কারও ওপরে যেন অতিরিক্ত বোঝা চাপানো না হয় তা-ও বলে দেন। বরং লোকজনের সমস্যা দূর করার জন্য তারা যেন নিত্যপ্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র দিয়ে আসতে বলেন। তিনি যেন ন্যায়পূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন সেজন্য এই নির্দেশনাগুলো দিয়েছিলেন। ইরাকে অভিযানের আগে তিনি এর প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলেন। তাই তিনি উসমান ইবেন হুনায়ফ এবং হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহুমকে বলে দেন তারা যেন আস-সাওয়াদের একজন প্রতিনিধিকে তার কাছে পাঠিয়ে দেন। তারা প্রতিনিধি পাঠালেন। তিনি তার কাছে জানতে চাইলেন, ‘আপনারা আপনাদের ভূখণ্ডের জন্য (কর হিসেবে) পারসিকদের কত দিতেন?’ তারা বলল, ‘সাতাশ দিরহাম।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আমি আপনার কাছ থেকে তা নেব না।’ [cite: ১২৪৮] এখান থেকেই বোঝা যায় যে ইসলামী অভিযানগুলো ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য কতটা ন্যায়পূর্ণ ছিল। তার কাছে মনে হয়েছিল, ভূখণ্ডের পরিমাণ অনুযায়ী খারাজ আরোপ করলে তাদের সাথে ইনসাফ করা হবে। এতে রাষ্ট্রের আয় হবে আবার তাদের ওপরে কোনো বাড়তি চাপ পড়বে না। উসমান ইবেন হুনায়ফ এবং হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহুম তাদের দায়িত্ব পালন করলেন। দেখা গেল আস-সাওয়াদের আয়তন ৩৬,০০০,০০০। [cite: ১২৪৯] আঙ্গুর-ক্ষেতের জন্য দশ দিরহাম, খেজুর-বাগানের জন্য আমি দিরহাম, নলখাগড়ার মাঠের জন্য ছয় দিরহাম, গম-ক্ষেতের জন্য চার দিরহাম এবং বার্লি-ক্ষেতের জন্য দুই দিরহাম ধার্য করা হলো। [cite: ১২৫০] তারা চিঠির মাধ্যমে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সব জানালেন। তিনিও আনুমোদন দিলেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ওই ভূখণ্ডগুলোর জনসাধারণের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন। তাদের মধ্যে ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন। যে কারণে উসমান ইবেন হুনায়ফ এবং হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহুম তাদের ওপরে কোনো বোঝা চাপিয়ে এসেছেন কি না খলীফা তা জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। তাই জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমরা কীভাবে জমির কর নির্ধারণ করেছ? হতে পারে লোকজনের ওপরে বেশি চাপ দিয়ে ফেলেছ?’ হুযায়ফা রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আমি দরিদ্রদের জন্য জিনিসপত্র রেখে এসেছি।’ উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আমি যা নিয়েছি তার দ্বিগুণ দিয়ে এসেছি। আপনি চাইলে ওগুলো নিয়ে আসতে পারি।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘আল্লাহর কসম, যতদিন বেঁচে থাকবো ইরাকের বিধবাদের যেন অন্য কোনো শাসকের প্রয়োজন না পড়ে সেদিকে লক্ষ্য রাখবো।’ [cite: ১২৫১]
ইরাকের অন্তর্গত আস-সাওয়াদের এই পদ্ধতি মিসরেও প্রয়োগ করা হয়েছিল। দুটো জিনিসে ভিন্নতা ছিল—তাদের গভর্নর ছিলেন আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং খারাজের জন্য তাদের জমি একরে (ফেদ্দান) পরিমাপ করা হয়েছিল। [cite: ১২৫২] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়াতেও এই পদ্ধতির প্রচলন করেন। তবে এক্ষেত্রে ইতিহাসবিদেরা কোনো স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেননি। সেখানে কোনো এককে জমি মাপা হয়েছিল এবং কী ধরনের ফল ও ফসল উৎপন্ন হতো, সেগুলোর ওপরে কেমন খারাজ ধার্য করা হয়েছিল এসব নিয়ে তেমন কোনো তথ্য নেই। [cite: ১২৫৩]
তবে আর যাই হোক, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার গভর্নরদের নিয়োগ দেবার আগে তাদের সম্পদের কড়ায়-গণ্ডায় সুস্পষ্ট হিসাব কষেছিলেন। বিশেষ করে দায়িত্বরত অবস্থায় কোনো সফর থেকে তাদের যে আয় হতো তার স্পষ্ট হিসাব দিতে না পারলে বেতন থেকে তা কেটে নিতেন। [cite: ১২৫৪] গভর্নরদের আলোচনার সময় এর বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। ইরাক, সিরিয়া এবং মিসরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় বায়তুল মাল অর্থ-সম্পদে ভরপুর হয়ে উঠছিল। রাষ্ট্রীয় অর্থ-ভাণ্ডারে, বিশেষ করে মিসরে সবচেয়ে বেশি আয় হয়। কারণ, কৃষি-নির্ভর প্রাচীন মিসর ছিল সম্পদ-প্রাচুর্যে ভরপুর। [cite: ১২৫৫]
খারাজ-ভূমি ভাগ না করায় যেসব নিরাপত্তা অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল।
খলীফা এবং তার সমর্থকেরা ভূখণ্ড ভাগ না করায় বেশ কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা লাভ করা সম্ভব হয়েছিল। এগুলোকে আমি দুটো শ্রেণিতে ভাগ করেছি। প্রথমত মুসলিমদের মধ্যে ঝগড়া-লড়াই বন্ধ হয়ে যায় এবং তারা নিয়মিত আয়-রোজগারের সন্ধান পায়, যা দিয়ে ভবিষ্যত প্রজন্মের পার্থিব প্রয়োজন মেটানো সম্ভাবনা ছিল। দ্বিতীয়ত বাহ্যিক সুবিধা অর্জনের সম্ভাবনা দেখা দেয়। যেমন মুসলিমদের সীমান্তরক্ষা করতে লোকবল ও রসদের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ-সম্পদের যোগান নিশ্চিত হয়ে যায়। সেনাবাহিনীর জন্য জিনিসপত্র, বেতন-ভাতাদি, অস্ত্র-শস্ত্র এবং সরঞ্জামাদির খরচ, দলে দলে রাষ্ট্রীয় সীমানা ও আভ্যন্তরীণ ভূখণ্ড রক্ষার জন্য যে রসদ দরকার ছিল এগুলোর যোগান দেওয়া সম্ভব হলো। [cite: ১২৫৬]
লক্ষ্যণীয় যে, খলীফা কিন্তু এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত রচনা করতে চেয়েছিলেন। এর মাধ্যমে কেবল তার যুগে নয় বরং আসন্ন পরবর্তী যুগগুলোতেও স্থিতিশীলতা নিশ্চিতের চেষ্টা করেছেন। তার বক্তব্যগুলো, বিশেষ করে তিনি যখন বলেছিলেন, ‘ওই মুসলিমদের কী হবে যারা এখনো আসেনি?’ এবং ‘আমি চাই না কোনো মুসলিম বঞ্চিত থাকুক’, এগুলো থেকে বোঝা যায় যে, তিনি দূরদর্শী ছিলেন এবং নিরাপত্তা মজবুত করার লক্ষ্যে কাজ করেছেন। দ্বিতীয় খলীফার দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক উন্নয়নে কতটা সঠিক ছিল তার খেলাফতই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। [cite: ১২৫৭]
কেবলমাত্র ভূখণ্ড ভাগ করার সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে যে কয়টি ধাপে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল তা থেকে দুটো বিষয় তো স্পষ্ট: (এক) মুসলিমদের স্বার্থে বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গেলে পর্যাপ্ত পরিমাণে সময় এবং প্রচেষ্টা দরকার। সেই সাথে মতের আদান-প্রদানও জরুরী। তা না হলে তর্ক-বিতর্ক এবং দূরত্ব বাড়তেই থাকবে। সেই সাথে বর্তমান এবং ভষ্যিত উম্মতের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে যাবে। (দুই) আরেকটি বিষয় হচ্ছে, জটিল বিতর্ক, সমালোচনা এবং বিশৃংখলা পার হয়ে কিন্তু বড় সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এক্ষেত্রে শাসককে চাপের মধ্যে থেকে মতবিরোধ কমানোর মাধ্যমে দূরত্ব কমিয়ে আনার গুরু দায়িত্ব পালন করতে হয়। খলীফাকেও তর্ক-বিতর্কের বিষয়টিকে শরীয়তের আইনের মাধ্যমে সমাধান করে মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষা করতে হয়েছিল। [cite: ১২৫৭]
খলীফা এবং সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কিন্তু তাদের মতামত এবং কুরআনের আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে মতের আদান-প্রদান ঘটেছিল। সুতরাং বলা যায় যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হলে, তা সাধারণভাবে হোক কিংবা মুসলিমদের কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে হোক, কুরআনের আয়াতের আলোকে মতামত প্রকাশ করতে হবে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ফিকহে এবং শরীয়তে অভিজ্ঞ সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শ নিয়েছিলেন। তারা খলীফাকে অকপট পরামর্শ দিতেন। এখানে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, বিশেষ গুণসম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে শূরা গঠন করা জরুরী। যাদের পরামর্শ নেওয়া হবে তাদের বুদ্ধিমান এবং জ্ঞানী হওয়া জরুরী, তারা যেন নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে, যুগের হাওয়ায় যারা চলেন না এবং সত্য বলা ও সত্য মানার ব্যাপারে যারা সচেষ্ট থাকেন, যারা শাসক কিংবা অন্য কারও তিরস্কার বা সমালোচনাকে ভয় পান না এমন ব্যক্তিরাই যোগ্য। [cite: ১২৫৭]
ভূখণ্ড ভাগাভাগি প্রসঙ্গে সাহাবায়ে কেরাম যেভাবে শিষ্টাচার এবং নৈতিকতা বজায় রেখে বিতর্ক করেছেন, ভিন্ন দৃষ্টিতে তা যাচাই করেছেন এবং চিন্তাশক্তি প্রয়োগ করেছেন তা-ও উল্লেখযোগ্য। এখানে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আচরণ ছিল সবচেয়ে লক্ষ্য করার মতো। তার মতের বিরোধিতা করা সত্ত্বেও তিনি শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ করেননি। [cite: ১২৫৭]
উল্টো বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, একজন শাসক শূরা কাউন্সিলের সাধারণ একজন সদস্য ছাড়া ভিন্ন কিছু নন। উম্মতের শূরা কাউন্সিল তার সাথে একমত পোষণ করুক বা না করুক, তিনি তাদের প্রতি ভরসার কথা ব্যক্ত করেছেন এবং এও বলেছেন যে, তিনি আল্লাহর কিতাব থেকে তার পক্ষে উদ্ধৃতি দেবেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আপনাদের মতোই একজন। আপনারা একমত পোষণ করুন বা না করুণ আজ সত্যের ভিত্তিতে আপনারা সিদ্ধান্ত দেবেন। আপনাদের কাছে আল্লাহর কিতাব আছে, যা সত্য বলে।’ [cite: ১২৫৮]
দাওয়াতের সিদ্ধান্তের প্রভাব
সামন্তপ্রথা বিলোপে এই পদ্ধতির প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই অন্যায় প্রথা বিলুপ্ত করে দেন। কারণ, চাষাবাদের বিনিময়ে কৃষকদের নিঃস্ব করে দিয়ে ভূমি-মালিকেরা একচেটিয়া সুবিধা ভোগ করে এসেছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আস-সাওয়াতের জমি কৃষকদের হাতে ছেড়ে দেন। এর বিনিময়ে তাদের কাছ থেকে যৎসামান্য কর (খারাজ) নেওয়া হতো। খলীফার এই সিদ্ধান্তে কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছিল। কারণ, খারাজের বিনিময়ে তারা জমি-চাষের সুযোগ লাভ করেছিল, যা ছিল তাদের জন্য সহজসাধ্য। তারা জীবনে প্রথমবারের মতো জমির প্রকৃত মালিক হওয়ার সুযোগ পায়। এর আগ পর্যন্ত কৃষকেরা কেবল শ্রমিক হিসেবে খেটে গেছে এবং কাজের বিনিময়ে কিছুই পায়নি। তাদের কষ্টের অর্জনগুলো জমা হতো জমিদারদের পকেটে। খুব বেশি হলে যৎসামান্য কিছু পেত। [cite: ১২৫৯]
বাইজেন্টাইন এবং পারসিকদের বহিষ্কার করার পরে কেউ যেন তাদের সশস্ত্র আহ্বানে সাড়া না দেয় তার পূর্ব প্রস্তুতি
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কৃষকদের জমির মালিকানা দেওয়ায় তারা কতটা খুশি হয়েছিল—তা উপর্যুক্ত ঘটনায় দৃশ্যমান। তারা স্বভাবতই প্রাক্তন শাসকদের, অর্থাৎ, বাইজেন্টাইন এবং পারসিকদের ঘৃণা করতে শুরু করেছিল। সুতরাং কৃষকেরা তাদের সাহায্য করতে রাজি ছিল না। অন্যদিকে তারা মুসলিমদের সাহায্য করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। পারসিকদের সেনাপতি রুস্তম আল-হীরাবাসীকে বলেছিলেন, ‘হে ঈশ্বরের শত্রুরা, আরবেরা আমাদের দেশ দখল করায় তোমরা উল্লসিত হয়েছ, আমাদের বিরুদ্ধে তাদের সাহায্য করে যাচ্ছ, এমনকি অর্থ দিয়েও সাহায্য করছ!’ [cite: ১২৬০]
বিজিত ভূখণ্ডের অধিবাসীরা দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করছিল
কৃষকদের হাতে জমি ছেড়ে দেওয়ায় আরেকটি সুবিধা হয়েছিল। তারা দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করেছিল। তাদের সামনে ইনসাফ এবং সত্য দিন দিন মূর্ত হয়ে উঠছিল। তারা মুসলিমদের আচরণে তাদের প্রতি মানবিক মর্যাদাবোধ দেখতে পেয়েছে। [cite: ১২৬১]
সীমান্তরক্ষায় সম্পদ পরিচালনা
ইসলামী রাষ্ট্র চারদিকে বিস্তার লাভ করছিল এবং এর সীমান্তও প্রসারিত হচ্ছিল। এগুলোর মধ্যে উইফ্রেতিসের সীমান্ত ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সীমান্ত বাইজেন্টাইন এবং অন্যান্য দেশ থেকে ইসলামী রাষ্ট্রকে খুব জটিলভাবে আলাদা করে রেখেছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার প্রদেশগুলোয় প্রচুর অশ্বারোহী প্রস্তুত রাখতেন। আর সীমান্তে মোতায়েন রাখতেন প্রায় ত্রিশ হাজার অশ্বারোহী। সেই সাথে পদাতিক বাহিনীর পাশাপাশি উষ্ট্রারোহী বাহিনী তো ছিলই। মুসলিম সীমান্ত রক্ষার জন্য তিনি সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। তাছাড়া জিহাদ থেকে সৈন্যদের মন যেন সরে না যায় সেজন্য সব ধরনের উপায়-উপকরণের যোগান দিতেন। ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য তিনি এসব দায়িত্ব পালন করতেন। আল্লাহ তা’আলা খারাজের মাধ্যমে বাহিনীগুলোর রসদ এবং বেতন-ভাতাদির ব্যবস্থা করে দেন। [cite: ১২৬২]
রাষ্ট্রীয় কোষাগারে খারাজ থেকে আয়ের ব্যবস্থা করতে গিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করেন। এই উৎস থেকে বায়তুল মালে যে ধনরাশি জমা হতো সেগুলো মূলত উম্মতের জন্য যেমন: সীমান্ত পাহারা, রাস্তার রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি কাজে ব্যয় করা হতো। মুসলিমদের দখলকৃত ভূখণ্ডে এর অধিবাসীদের থাকার সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে তাদের ফসলের কিছু অংশ পাওয়া যেত। তারা সাবেক শাসকদের করের চাপে এতটাই ক্লান্ত থাকত যে, কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলেছিল। মুসলিম শাসনব্যবস্থায় তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সময় আর শ্রম দিতে শুরু করে। [cite: ১২৬৩]
টিকাঃ
১২৩০. আল-খারাজ, আবু ইউসূফ, পৃ. ২৪,২৫; ইকতিসাদিয়াত আল-হারব পৃ. ২১৫।
১২৩১. আল-ইস্তিখরাজ লি আহকাম আল-খারাজ, পৃ. ৪০; ইকতিসাদিয়াত আল-হারব পৃ. ২১৫।
১২৩২. সূরা আনফাল, ৮:৪১।
১২৩৩. আল-আমওয়াল, আবু উবায়দ, পৃ. ৭৫; সিয়াসা আল-মাল, পৃ. ১০৩।
১২৩৪. সূরা হাশর, ৫৯:৬।
১২৩৫. সূরা হাশর, ৫৯:৭।
১২৩৬. সূরা হাশর, ৫৯:৮।
১২৩৮. আল-খারাজ, আবু ইউসুফ, পৃ. ৬৭; ইকতিসাদিয়াত আল-হারব পৃ. ২১৭।
১২৩৯. আল-খারাজ, আবু ইউসুফ, পৃ. ৬৭; ইকতিসাদিয়াত আল-হারব পৃ. ২১৭।
১২৪০. সূরা হাশর, ৫৯ : ১০।
১২৪১. সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম ফী আহদ উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ১০৫।
১২৪২. আখবার উমর, পৃ. ২১০।
১২৪৩. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৭৮০।
১২৪৪. নাসাই, আল-কুবরা ফীল হাজ্জ থেকে, ২/৩৮; আল-ফাতওয়া, ২০/৩১৩।
১২৪৫. আল-ফাতওয়া, ২০/৩১৩।
১২৪৬. আল-ইজতিহাদ ফীল ফিকহ আল-ইসলামি, পৃ. ১৩১।
১২৪৭. আল-ইজতিহাদ ফীল ফিকহ আল-ইসলামি, পৃ. ১৩১, ১৩২।
১২৪৮. আল-খারাজ, আবু ইউসূফ, পৃ. ৪০, ৪১।
১২৪৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮।
১২৫০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯; সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ১০৮।
১২৫১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪০; সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ১০৮।
১২৫২. আদ-দাওলা আল-আব্বাসিয়া, আল-খাদারি, পৃ. ১৪৪, সিয়াসাত আল-মাল, পৃ. ১০৯।
১২৫৩. সিয়াসাত আল-মাল, পৃ. ১১১।
১২৫৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৪।
১২৫৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৮।
১২৫৬. আল-আবআদ আস-সিয়াসিয়া লি মাফহুম আল-আমন ফীল ইসলাম, মুস্তাফা মানজুদ, পৃ. ৩১৭, ৩১৮।
১২৫৭. প্রাগুক্ত।
১২৫৮. আদ-দাওর আস-সিয়াসি, আস-সাফওয়ান, পৃ. ১৮৫।
১২৫৯. আদ-দাওয়া আল-ইসলামিয়া ফী আহদ উমর ইবনুল-খাত্তাব, হোসনি গায়তাস, পৃ. ১৩০।
১২৬০. আদ-দাওয়া আল-ইসলামিয়া ফী আহদ উমর ইবনুল-খাত্তাব, হোসনি গায়তাস, পৃ. ১৩১।
১২৬১. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩২।
১২৬২. আল-খারাজ, আবু ইউসূফ, পৃ. ২৭১; ইকতিসাদিয়িাত আল-হারব, পৃ. ২২৩।
১২৬৩. সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ৬৫১।
📄 উশর (খাজনা)
ইসলামি রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে ব্যবসায়ীরা আসা-যাওয়ার সুযোগের বিনিময়ে যে কর দিত তা উশরনামে পরিচিত ছিল। অনেকটা এ যুগের কাস্টম-শুল্কের মতো। উশরআদায়ে নিয়োজিত ব্যক্তিকে আল-আশির বলা হতো। [cite: ১২৬৪]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিংবা প্রথম খলীফা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে এর প্রচলন ছিল না। কারণ, তাদের সময়ে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া, ঈমান প্রচার করতে গিয়ে জিহাদ করা এবং ইসলামিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিয়ে সবাই ব্যস্ত ছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রসার ঘটল এবং এর সীমান্তগুলো পূবে-পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ল। সেই সাথে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যের প্রসার ঘটছিল। জনস্বার্থে দিন দিন এর প্রয়োজনীয়তা বাড়তে থাকে। সুতরাং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিদ্ধান্ত নিলেন যারা আহলুল হারব (যে অমুসলিমেরা আগে মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল) তারা মুসলিম রাষ্ট্রে ব্যবসা করতে আসলে তাদের ওপরে কর ধার্য করা হবে। কারণ, তারাও মুসলিমদের ওপরে কর ধার্য করেছিল।
ইতিহাসবিদদের [cite: ১২৬৫] মতে উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু সর্বপ্রথম উশর আরোপ করেছিলেন। মানবাজবাসী (সিরিয়ার আলেপ্পোর নিকটবর্তী) এবং ইয়েমেন সাগরের ওপারের অধিবাসীরা তার কাছে চিঠি লিখেছিল। ব্যবসার এক-দশমাংশ অর্থের (উশরের) বিনিময়ে তারা তাদের পণ্য আরবদেশে আনার অনুমতি চেয়েছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহাবায়ে কেরামের সাথে আলোচনাসাপেক্ষে অনুমতি প্রদান করেছিলেন। সুতরাং বলা যায় যে, তিনিই প্রথম উশর আদায় করেছিলেন। রাষ্ট্রের সীমানা অতিক্রমের সময় তারা মুসলিমদের কাছ থেকে কী পরিমাণে কর আদায়ে করে থাকে তিনি আগে থেকে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলেন। তাই মুসলিমদের কাছে জানতে চাইলেন, ‘তোমরা ইথিওপিয়ায় প্রবেশ করলে তারা তোমাদের সাথে কেমন আচরণ করে?’ তারা বললেন, ‘আমাদের সাথে যা থাকে তার এক-দশমাংশ নিয়ে থাকে।’ তিনি বললেন, ‘তবে আমরাও তাদের কাছ থেকেও একই পরিমাণ কর আদায় করব। [cite: ১২৬৬] তিনি উসমান ইবনে হুনায়ফ রাযিয়াল্লাহু আনহুকেও জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আহলুল হারবদের দেশে প্রবেশ করলে তারা আপনাদের কাছ থেকে কত করে নেয়?’ তিনি বললেন, ‘এক-দশমাংশ।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘তাদের কাছ থেকেও একই পরিমাণে আদায় করুন। [cite: ১২৬৭]
বর্ণিত আছে, আবু মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লিখেছিলেন, ‘আমাদের মুসলিম ব্যবসায়ীরা আহলুল হারবে যান এবং তারা এক-দশমাংশ আদায় করে নেয়।’ খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে লিখলেন, ‘তারা মুসলিম ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যেমন নেয় তেমন আদায় করে নিন। আহল আয-যিম্মার কাছ থেকে এক-দশমাংশের অর্ধেক এবং মুসলিমদের কাছ থেকে প্রতি চল্লিশ দিরহাম থেকে এক দিরহাম করে নেবেন। তবে তাদের কাছে দুইশ দিরহামের কম থাকলে কিছুই নেবেন না। দুইশ থাকলে পাঁচ দিরহাম দিতে হবে, এর বেশি থাকলে সেই অনুপাতে আদায় করতে হবে।’ [cite: ১২৬৮]
এই নতুন আইন প্রণয়নের পর থেকে ভিন রাষ্ট্রের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্কে শৃংখলা চলে আসে। ইসলামী রাষ্ট্রে বাণিজ্যের দরজা খুলে যাওয়ায় মুসলিম ব্যবসায়ীদের আয়ও বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে পণ্য আসতে শুরু করে। স্বভাবতই মুসলিম এবং অমুসলিম ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি-রপ্তানির ব্যাপারে প্রচণ্ড আগ্রহী হয়ে ওঠে। ফলে আরব উপদ্বীপসহ ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যান্য বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো সরগরম হয়ে ওঠে। পণ্য বোঝাই গাড়ির আসা-যাওয়া বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ইন্ডিয়া, চায়না, পূর্ব আফ্রিকা এবং লাডেন থেকে বহু মূল্যবান পণ্যসামগ্রী মুসলিম বন্দরে ভিড়তে শুরু করে। খুলাফায়ে রাশেদীন এবং উমাইয়াহ শাসনামলে বাণিজ্যের প্রসার ছিল লক্ষ্যণীয়। [cite: ১২৬৯]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে, ধনী ব্যবসায়ীরা কর সংগ্রাহকদের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় যাকাত দিয়ে যেতেন। তবে বছর পুরো হলো কি না এই প্রান্তিকমান ঠিক রেখে যাকাত আদায় করা হতো। আনাস ইবনে মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, উমর ইবনুল খাত্তাব আমাকে যাকাত সংগ্রহের জন্য ইরাকে পাঠিয়েছিলেন। তখন বলেছিলেন, ‘কোনো মুসলমানের সম্পদ দুইশ দিরহামের বেশি হলে তার কাছ থেকে পাঁচ দিরহাম নেবেন। আর দুইশ দিরহামের বেশি হলে প্রতি চল্লিশ দিরহামের জন্য এক দিরহাম করে নেবেন।’ [cite: ১২৭০]
আশ-শায়বানী বর্ণনা করেছেন যে উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু যিয়াদ ইবনে জারীরকে (কিংবা যিয়াদ ইবনে হাদীরকে) আয়নুত তামর থেকে যাকাত আদায় করতে পাঠানো হয়। তাকে এক-দশমাংশের এক-চতুর্থ ভাগ (২.৫%) আদায় করতে বলা হয়। আর আহল আয-যিম্মার ব্যবসা ভালো চললে তাদের কাছ থেকে এক-দশমাংশের অর্ধেক এবং আহল আল-হারবের কাছ থেকে এক-দমশাংশ আদায় করতে বলা হয়। আশিরদের সংগৃহীত কর থেকে তাদের বেতন প্রদান করা হতো। [cite: ১২৭১]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যেভাবে কর আরোপ করেছিলেন তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, তিনি আহলুল হারবকে তাদের পদ্ধতি অনুসরণ করে উশর ধার্য করতেন। তারা মুসলিমদের কাছ থেকে এই পরিমাণ কর নিত বলে তাদের সাথে পাল্টাপাল্টি আচরণ করা হয়েছিল। মুসলিমদের সাথে পার্থক্য বজায় রাখতে গিয়ে আহল আয-যিম্মার কাছ থেকে এক-দশমাংশ কর আদায় করা হয়েছে এবং বনু তাগলিবের খ্রিস্টানদের মতামত নিয়ে তাদের ওপরে দ্বিগুণ যাকাত ধার্য করা হয়েছে। মুসলিমদের কাছ থেকে যাকাতের মতো কিছু একটা আদায় করা হতো এবং ব্যবসা-পণ্যের ওপরে যে যাকাত দিতে হয় তা সবার জানা। মুসলিম এবং আহল আয-যিম্মার মূলধন বৃদ্ধি না পাওয়া পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে তা একবারই অর্থ আদায় করা হতো। এক বছর পার হওয়ার পরে কারও মূলধন বৃদ্ধি পেলে তবে সে অনুপাতে বাড়তি অর্থ নেওয়া হতো। যে যেমন তার সাথে তেমন আচরণই করা হতো।
আহলুল হারব যখন অতিরিক্ত কর নেওয়া শুরু করল তখন তাদের পথ অনুসরণ করে মুসলিম রাষ্ট্রে তারা পণ্য নিয়ে আসার পরে তাদের কাছ থেকেও একই পরিমাণে কর নেওয়া হয়েছে। তাদের কারণেই মুসলিমরা কর বাড়াতে বাধ্য হন। এ যুগেও কিন্তু এই নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হয়। এই পদ্ধতি বর্তমানে শুল্ক বাধা দূরীকরণ নামে পরিচিত। [cite: ১২৭২]
মুসলিমদের মধ্যে কোনো পণ্যের চাহিদা বেড়ে গেলে তার ওপর থেকে কর হ্রাস করা হতো অথবা ব্যবসায়ীদের বাড়তি সুবিধা দেওয়া হতো। এতে করে ওই পণ্য আরও বেশি আমদানি করা সম্ভব হয়। আহলুল হারবেরা যখন যয়তুন তেল এবং খাদ্যশস্য আনতে শুরু করেছিল তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার প্রতিনিধিদের নির্দেশ দেন তারা যেন এক-দশমাংশের অর্ধেক কর আদায় করে। এর বিনিময়ে ভিন্ন ক্ষেত্রে তারাও এই সুবিধা পেত। [cite: ১২৭৩]
ইমাম যুহরী উল্লেখ করেছেন, সালিম তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন সূতি পণ্যের বিনিময়ে নাবাতিয়ানদের কাছ থেকে এক-দশমাংশ কর নিতেন সেখানে মদীনায় গম, যয়তুন তেল এবং এ ধরনের অন্যান্য পণ্য আমদানির বিপরীতে এক-দশমাংশের অর্ধেক কর নেবার নির্দেশ দেন। [cite: ১২৭৩]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রবর্তিত অর্থনীতির সুবাদে মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বাণিজ্যে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। চাহিদা সম্পন্ন পণ্যের আমদানি বৃদ্ধির পাশাপাশি বায়তুল মাল সুগঠিত হয়ে ওঠে। তবে বায়তুল মাল সুগঠিত করা তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল না। বায়তুল মাল যেন দিন দিন সমৃদ্ধ হয়ে মুসলিমদের জীবনকে সহজ ও সমৃদ্ধ করে তোলে সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছেন। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং বণিকদের সাথে তিনি সুন্দর আচরণ করতেন, প্রতিনিধি এবং গভর্নরদের সাথে চিঠিপত্রের মাধ্যমে তাদের খোঁজখবর নিতেন। কারও সাথে কঠিন হয়ে যেন রাষ্ট্রীয় অর্থ-সম্পদ আয় করতে না হয় সে চেষ্টা করতেন। [cite: ১২৭৪]
টিকাঃ
১২৬৪. সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ৬৫১।
১২৬৫. সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ১২৮।
১২৬৬. মাওসূআ ফিকহ উমর ইবনুল খাত্তাব, পৃ. ৬৫১।
১২৬৭. প্রাগুক্ত।
১২৬৮. আল-খারাজ, আবু ইউসূফ, পৃ. ১৪৫, ১৪৬; সিয়াসাত আল-মাল, পৃ. ১২৮।
১২৬৯. আত-তিজারা ওয়া তুরুকুহা ফীল জাযিরা আল-আরাবিয়া, ড. মুহাম্মাদ আল-ইমাদি, পৃ. ৩৩২।
১২৭০. আল-হায়াত আল-ইকতিসাদিয়া ফীল উসূর আল-ইসলামিয়া আল-উলা, পৃ. ১০১।
১২৭১. শারহ আস-সিয়ার আল-কাবীর, ৫/২১৩৩, ২১৩৪; আল-হায়াত আল-ইকতিসাদিয়া ফীল উসূর আল-ইসলামিয়া আল-উলা, পৃ. ১০১।
১২৭২. সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, পৃ. ১৩২।
১২৭৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৩।
১২৭৪. প্রাগুক্ত।
📄 ফাই এবং গনায়ম বা যুদ্ধলব্ধ গনীমত (গনীমতের শ্রেণিবিন্যাস)
মুশরিকদের সাথে যুদ্ধ ছাড়া অর্জিত সব ধরনের সম্পদ হলো ফায়। যারা খুমসের [cite: ১২৭৫] হকদার তাদেরকে ফায়ের এক-পঞ্চমাংশ (খুমস) বুঝিয়ে দেওয়া হতো। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার কিতাবে এই শ্রেণির লোক সম্পর্কে বলেছেন, আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তার রাসূলকে যা দিয়েছেন, তা আল্লাহর, রাসূলের, আত্মীয়-স্বজনের, ইয়াতিমদের, অভাবগ্রস্তদের এবং মুসাফিরদের জন্য। [cite: ১২৭৬] আর গানায়েম হলো আহলুল হারবের সাথে লড়াইয়ের পরে যুদ্ধলব্ধ গনীমত। [cite: ১২৭৭] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন:
আর এ কথাও জেনে রাখ যে, কোনো বস্তু সামগ্রীর মদ্য থেকে যা কিছু তোমরা গনীমত হিসেবে পাবে তার এক পঞ্চমাংশ হলো আল্লাহর জন্য, রাসূলের জন্য, নিকটাত্মীয়-স্বজনের জন্য এবং ইয়াতিম-অসহায় এবং মুসাফিরদের জন্য; যদি তোমাদের বিশ্বাস থাকে আল্লাহর উপর যা আমি আমার বান্দার উপর অবতীর্ণ করেছি ফয়সালার দিনে, যেদিন সম্মুখীন হয়ে যায় উভয় সেনাদল। আর আল্লাহ সবকিছুর উপরই ক্ষমতাশীল। [cite: ১২৭৮]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খেলাফতের সময় বিস্তৃত অঞ্চল জয় করেছিলেন। ফলে প্রচুর গনীমতের মালামাল অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। পারসিক এবং রোমান নেতৃবৃন্দ তাদের সব অর্থবিত্ত সাথে নিয়ে যুদ্ধ করতে আসত। এগুলোই মুসলিমদের হাতে চলে আসে। এগুলোর মূল্যমান ছিল ১৫,০০০ দিরহাম থেকে শুরু করে ৩০,০০০ দিরহাম পর্যন্ত। [cite: ১২৭৯]
আল-মাদাইন, জাল্লা, হামযান, আর-রায়, আস্তাখারের মতো বড় বড় নগরী থেকে মুসলিমরা অনেক মূল্যবান মালামাল পেয়েছিলেন। এর মধ্যে খসরুর কার্পেট ছিল অন্যতম। ৩৬০০ বর্গহাত সোনায় মোড়ানো কার্পেটটিতে মূল্যবান পাথর বসানো ছিল। এর ওপরে মণিমুক্তা খচিত রেশমের ফলমূল আঁকা। আর স্বর্ণে আঁকা পানির ঝর্নাধারা ছিল। এই একটি কার্পেটই বিক্রি হয়েছিল বিশ হাজার দিরহামে। তাছাড়া জাল্লা এবং নাহাওয়ান্দ থেকে সোনা-রূপা সহ মূল্যবান পাথর মুসলিমদের হাতে আসে। জাল্লার খুমস ষাট লাখ দিরহামে পৌঁছেছিল। [cite: ১২৮০]
তবে সবচেয়ে বেশি গনীমত পাওয়া গেছে আস-সাওয়াদ থেকে। এগুলোকে তিনি রাষ্ট্রের স্বার্থে ওয়াকফ করে দেন। আস-সাওয়াফিরা নিহত হয়েছিল আর বাকিরা পালিয়ে গিয়েছিল বলে তাদের দেশ বিরান হয়ে পড়ে। তাদের দেশ এবং খসরু ও তার পরিবারের দেশ থেকে যে অর্জিত বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ বায়তুল মালে উদ্বৃত্ত হিসেবে জমা থাকত। কথিত আছে, ঐ অঞ্চল থেকে সত্তর লাখ পর্যন্ত আয় হতে দেখা গেছে। [cite: ১২৮১]
সুতরাং গনীমত থেকে প্রচুর আয় হয়েছে। এই আয় থেকে মুসলিমরা ব্যক্তিগতভাবে ধনবান হতে শুরু করে এবং তাদের জীবনযাপনের মান উন্নত হচ্ছিল। উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের সময় তাদের উন্নতি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে। [cite: ১২৮১]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে এগুলোই ছিল রাষ্ট্রীয় আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।