📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 প্লেগ

📄 প্লেগ


১৮ হিজরীতে [cite: ১১৩৯] আরেকটি মারাত্মক বিপদ এসে হানা দিল। প্লেগ ছড়িয়ে পড়ল। সূত্রমতে, এটি আমওয়াসের (ইমাউসের) প্লেগ নামে পরিচিতি। জেরুযালেম এবং রমলার মাঝামাঝি আমওয়াস নামে একটি ছোট্ট শহর ছিল। সেই শহর থেকে প্লেগ ছড়িয়েছিল বলে এই নামটি রয়ে গেছে। প্লেগ সম্পর্কে বিভিন্ন উদ্ধৃতি পড়ার পরে, আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান দিয়ে এই রোগ সম্পর্কে যা বুঝেছি তা হলো, ইবনে হাজার বলেছিলেন, ‘আরবি ভাষায় অভিজ্ঞজনের মন্তব্য শুনে, ফিকহ এবং চিকিৎসাবিদ্যার সংজ্ঞা থেকে প্লেগের (আত-তাউনের) ধারণা পেয়েছি। রক্তে সমস্যার কারণে অথবা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে হঠাৎ করে রক্তপ্রবাহ বেড়ে ফুলে ওঠাকে প্লেগ বলা হয়। আবার দূষিত বাতাসের মাধ্যমে কোনো রোগ ছড়িয়ে পড়লে তাকেও প্লেগ বলা হয়। প্লেগের প্রাদুর্ভাবে একই ধরনের রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় অথবা অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটে থাকে।’ [cite: ১১৪০] প্লেগ (তাউন) এবং মহামারীর (ওয়াবা) মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসটি উল্লেখ করতে হবে। তিনি বলেছেন যে, মদীনা কখনই প্লেগে আক্রান্ত হবে না। তবে মহামারী এখানে আঘাত হানতে পারে কারণ, অতীতেও এখানে মহামারী দেখা দিয়েছিল। [cite: ১১৪১]
মূলত মুসলিম এবং বাইজেন্টাইনদের লড়াই থেকে প্লেগের উৎপত্তি ঘটে। তখন বহু মানুষ নিহত হয়েছিল এবং লাশের দুর্গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল। আল্লাহর হুকুমে প্রকৃতির নিয়মে তখন প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছিল। [cite: ১১৪২]

৫.৩.১। আল-হিজায এবং সিরিয়ার সীমান্তে অবস্থিত সারগ থেকে উমর রা.-এর প্রত্যাবর্তন
১৭ হিজরী। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দ্বিতীয়বারের মতো সিরিয়া যেতে চাইলেন। সুতরাং পরিকল্পনা মাফিক আনসার-মুহাজিরদের নিয়ে তিনি সিরিয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। আল-হিজায এবং সিরিয়ার সীমান্তে অবস্থিত সারগে পৌঁছে তারা যাত্রা বিরতি দেন। সেখানে থাকা অবস্থায় সেনাপতিদের কাছে সিরিয়ার খবর পেলেন। সিরিয়া রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে এবং সেখানে প্লেগ ছড়াচ্ছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সবার সাথে পরামর্শ করে ফিরে যেতে উদ্যত হন। শূরা প্রসঙ্গে আলোচনার সময় বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। [cite: ১১৪৩]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চলে যাওয়ার পরে আমওয়াসের প্লেগও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এর ভয়াবহ ছোবলে সিরিয়া আক্রান্ত হয়ে পড়ে। অসংখ্য মানুষ মারা যেতে লাগল। সিরিয়ার গভর্নর উবায়দা ইবনুল জাররা, এবং মুআয ইবনুল জাবাল, ইয়াযীদ ইবনে আবি সুফিয়ান, আল-হারিস ইবনে হিশাম (কারও কারও মতে তিনি ইয়ারমুকের যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন), সুহায়ল ইবনে আমর, উতবা ইবনে সুহায়ল রাযিয়াল্লাহু আনহুমসহ অনেক নেতৃস্থানীয় সাহাবায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরের দায়িত্ব নেবার পরে মহামারী দূর হয়েছিল। লোকজনকে লক্ষ্য করে তিনি বলেছিলেন, ‘হে লোকসকল, এই রোগটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। তোমরা পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নাও।’ সুতরাং লোকজন নিয়ে তিনি চলে গেলেন। আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে এই অবস্থা থেকে মুক্তিদানের আগ পর্যন্ত তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কানে এই কথা গেল। তবে তিনি আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেননি। [cite: ১১৪৪]

৫.৩.২। আবু উবায়দা রা.-এর ইন্তেকাল
প্লেগের খবর পাওয়ামাত্রই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ফিরে আসার জন্য চিঠি দেন। তিনি বলেন, ‘আপনার ওপরে শান্তি বর্ষিত হোক। আপনার সাথে আমার কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা দরকার। আমি চাই আপনি এই চিঠি পাওয়ামাত্র এটা হাতে থাকা অবস্থায় আমার কাছে চলে আসবেন।’ আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু বুঝতে পারলেন যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু স্নেহবশত তাকে প্লেগ থেকে দূরে রাখতে চাচ্ছেন এবং তার জীবন রক্ষা করতে চাচ্ছেন। বললেন, ‘আমীরুল মুমিনীনকে আল্লাহ তা’আলা ক্ষমা করুন।’ তিনি চিঠির জবাব দিতে বসলেন, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি; কিন্তু এই মুহূর্তে আমি কয়েকটি মুসলিম সেনাদলের সাথে আছি। আল্লাহ তা’আলার হুকুম না হওয়া পর্যন্ত নিজের জীবন বাঁচাতে আমি তাদের ফেলে যেতে চাচ্ছি না। হে আমীরুল মুমিনীন, দয়া করে আমাকে ফিরে আসার নির্দেশ থেকে অব্যাহতি দিন এবং আমাকে আমার সেনাদলের সাথে থাকার সুযোগ দিন।’ তার চিঠি পেয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুব কেঁদেছিলেন। তার কান্না দেখে উপস্থিত লোকজন বলতে লাগলেন, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আবু উবায়দা কি মারা গেছেন?’ তিনি বললেন, ‘অনেকটা তেমনই।’ তিনি আবার চিঠি দিলেন, ‘আপনার ওপরে শান্তি বর্ষিত হোক। আপনি এখন সেনাবাহিনীর সাথে নিম্নাঞ্চলে অবস্থান করছেন। তাদের নিয়ে নির্মল বাতাস আছে এমন উঁচু এলাকায় চলে যান।’ তার চিঠি হাতে পেয়ে আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, ‘হে আবু মূসা, আমীরুল মুমিনীনের কাছ থেকে এই চিঠি এসেছে। আপনি লোকগুলোর জন্য ক্যাম্পের জায়গা খুঁজে বের করুন। আমি তাদের নিয়ে আসছি।’ আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে দেখলেন, তার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি ফিরে গিয়ে আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে খবর দিলেন। খবর শুনে তিনি তখনই একটি উট তার জন্য তৈরি করতে বললেন। উটে উঠতে গিয়ে টের পেলেন যে তিনিও আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কসম, আমিও আক্রান্ত।’ [cite: ১১৪৫]
বর্ণিত আছে, উরওয়া বলেছেন, আবু উবায়দা এবং তার পরিবার আমওয়াসের রোগ থেকে মুক্ত ছিল। তখন তিনি দুআ করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আবু উবায়দার পরিবারকে তাদের অংশ দিয়ে দেন।’ অতঃপর তার চামড়ায় ফোঁড়া দেখা গেল এবং তিনি সেগুলো দেখতে লাগলেন। একজন বলে উঠল, ‘এ কিছু না।’ তিনি বললেন, ‘আশা করি আল্লাহ তাদের রহম করবেন।’ [cite: ১১৪৬]
তিনি আক্রান্ত হয়ে পড়লে লোকদের লক্ষ্য করে বললেন, ‘হে লোকসকল, এই রোগ তোমাদের ওপরে আল্লাহ তা’আলার একটি নেয়ামত এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুআর জবাব এবং এভাবেই ধর্মভীরুদের অনেকে ইন্তেকাল করেছেন।’ [cite: ১১৪৭]
আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার অংশ আল্লাহ তা’আলার কাছ থেকে চেয়ে নেন এবং তিনি আক্রান্ত হওয়ার পরে মুসলিমদের ডাকলেন, তারা তাকে দেখতে আসলেন। তিনি বললেন, ‘আমি তোমাদের কিছু উপদেশ দেব। তোমরা এই উপদেশ গ্রহণ করলে বেঁচে থাকতে তো বটেই মৃত্যুর পরেও সুফল পাবে। নিয়মিত নামায আদায় করবে, যাকাত দেবে, রোযা রাখবে, সাদকা করবে, হজ ও উমরা পালন করবে, একে অপরের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখবে, একে অপরকে ভালোবাসবে, শাসকের অনুগত হয়ে চলবে এবং তাদের ধোঁকা দেবে না, এবং দুনিয়ার পাল্লায় পড়ে বিভ্রান্ত হবে না। কারও এক হাজার বছর হায়াত থাকলেও তাকে আমার অবস্থায় (মৃত্যুর কবলে) পড়তেই হবে। আল্লাহ তা’আলা আদম সন্তানের জন্য মৃত্যুকে অবধারিত করেছেন, সুতরাং তার মৃত্যু নিশ্চিত। যারা তার রবের প্রতি অনুগত থাকবে এবং আখেরাতের জন্য কষ্ট করবে তারাই সবচেয়ে বুদ্ধিমান।’ অতঃপর তিনি মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, ‘হে মুআয, নামাযের ইমামতি করুন।’ মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু নামাযের ইমামতি করলেন এবং আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু ইন্তেকাল করলেন (আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন এবং রহম করুন)। [cite: ১১৪৮]
মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, ‘হে লোকসকল, আল্লাহ তা’আলার কাছে অন্তর থেকে তওবা করো। কারণ, তওবা করা অবস্থায় আল্লাহ তা’আলার সাথে সাক্ষাৎ হলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেনই। কারও ঋণ থেকে গেলে তার পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ করবে, কারণ, মানুষ তার ঋণের জন্য দায়বদ্ধ। তোমাদের মধ্যে কেউ কোনো মুসলমানের সাথে যেন সম্পর্কচ্ছেদ না করে, এমন হলে তাদের দেখা করাবে এবং বিবাদ মেটানোর চেষ্টা করবে, তাদের হাত মিলিয়ে দেবে। কারণ, এক মুসলমানের সাথে আরেক মুসলমানের তিন দিনের বেশি সম্পর্কচ্ছেদ করে থাকা উচিত নয়। আল্লাহ তা’আলার কাছে তা চরম গুনাহ বলে গণ্য হয়। তোমরা মুসলিমরা একজনকে হারিয়েছ। হে আল্লাহর বান্দারা, আল্লাহর কসম, আমি তার মতো এত বিনয়ী, সৎ, প্রতারণাবিমুখ, মানুষের প্রতি এত সহানুভূতিশীল এবং দয়াপরবশ ব্যক্তি দেখিনি। তোমরা তার জন্য রহমতের দুআ করবে এবং তার জানাযায় অংশগ্রহণ করবে। আল্লাহ তা’আলা তার সব গুনাহ মাফ করে দিন। আল্লাহর কসম, তোমরা তার মতো নেতা পাবে না।’ লোকজন একত্রিত হলো, আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বের করা হলো, এবং মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু তার জানাযা পড়ালেন। তাকে কবরস্থানে আনা হলো। মুআয, আমর ইবনুল আস এবং আদ-দাহহাক ইবনে কয়েস রাযিয়াল্লাহু আনহুম কবরে নামলেন। তার দাফন সম্পন্ন করে মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতে লাগলেন, ‘আল্লাহ আপনাকে রহম করুন, হে আবু উবায়দা। আল্লাহর কসম, আপনি যেমন আমি আপনার তেমনি প্রশংসা করব এবং আল্লাহর কসম, আমি আপনার সম্পর্কে মিথ্যা বলব না। কারণ, আমি আল্লাহর ক্রোধকে ভয় পাই। আল্লাহর কসম, আমি যতদূর জানি, আল্লাহকে অনেক বেশি স্মরণকারী লোকদের মধ্যে আপনি অন্যতম এবং ওইসব লোকদের একজন—যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের সাথে যখন মূর্খরা কথা বলতে থাকে, তখন তারা বলেন, সালাম। [cite: ১১৪৯] আর তাদের একজন—যারা রাত্রি যাপন করে পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হয়ে এবং দণ্ডায়মান হয়ে; [cite: ১১৫০] তাদেরও একজন—যারা যখন ব্যয় করে, তখন অযথা ব্যয় করে না, কৃপণতাও করে না এবং তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী। [cite: ১১৫১] আল্লাহর কসম, আমার জানামতে আপনি তাদের একজন—যারা নম্রভাবে আল্লাহকে স্মরণ করেন, দরিদ্র এবং ইয়াতিমদের প্রতি দয়ার্দ্র, আর যারা রূক্ষ এবং দন্তকারীদের ঘৃণা করেন। [cite: ১১৫২]
আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালে মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন। [cite: ১১৫৩] মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠির মাধ্যমে তার মৃত্যু সংবাদ দেন। তিনি লিখেছিলেন : আল্লাহ তা’আলার প্রতি অনুগত এবং আল্লাহ তা’আলার ভয়ে ভীত-হৃদয়ের এই মানুষটির জন্য পুরস্কারের দুআ করুন। হে আমীরুল মুমিনীন, তিনি আপনার এবং আমাদের খুব প্রিয় ছিলেন : আবু উবায়দা আল-জাররা, আল্লাহ তা’আলা তার সব গুনাহ মাফ করে দিন। প্রকৃতই আমরা আল্লাহ তা’আলার এবং তার কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। আমরা তার পক্ষ থেকে আল্লাহ তা’আলার কাছে পুরস্কারের দুআ করছি, এবং আল্লাহ তা’আলার ওপর ভরসা করছি। আমি এমন একটি সময়ে এই চিঠি লিখতে বসেছি যখন চারদিক মৃত্যুর হাতছানি এবং চারপাশে মহামারী ছড়িয়ে পড়ছে। কেউ তার নির্ধারিত মৃত্যুর হাত থেকে পালাতে পারবে না। এখনো যারা ইন্তেকাল করেনি, একদিন না একদিন ইন্তেকাল করবে। আল্লাহ যেন তাকে এই পৃথিবী থেকে উত্তম জিনিস দান করেন। আমরা বাঁচি বা মরি, আল্লাহ তা’আলা যেন আপনাকে সমস্ত মুসলিম, সমস্ত সম্ভ্রান্ত এবং সাধারণ লোকের পক্ষ থেকে উত্তম পুরস্কার দেন। আপনার প্রতি তিনি তার দয়া, তার ক্ষমা, তার সন্তুষ্টি এবং তার রহমত নাযিল করুন। [cite: ১১৫৪]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই চিঠি পেয়ে খুব কাঁদলেন। তার পাশে উপস্থিত লোকজনকে আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যুসংবাদ দিলেন। [cite: ১১৫৫] এই সংবাদে সবার চোখে পানি এসে গেল এবং সবাই শোকতপ্ত হয়ে পড়েন। তবে আল্লাহর হুকুমকেও গ্রহণ করে নিয়েছিলেন।

৫.৩.৩। মুআয ইবনে জাবাল রা.-এর ইন্তেকাল
আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে তিনি লোকজনকে বেশ কয়েকদিন নামায পড়িয়েছেন। প্লেগের অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে লাগল। একের পর এক মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিল। তিনি দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন, ‘হে লোকসকল, এই রোগ তোমাদের ওপরে আল্লাহ তা’আলার একটি রহমত এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুআর জবাব এবং এভাবেই ধর্মভীরুদের অনেকে ইন্তেকাল করেছেন। হে আল্লাহ, আমার পরিবারেও এই রহমতের অংশ দান কর।’ [cite: ১১৫৬]
এরপরে তার ছেলে আব্দুর রহমান ইবনে মুআয [cite: ১১৫৬] প্লেগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। তিনি তার নিকট যান। তখন তার ছেলে কুরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করে: الْحَقُّ مِنْ رَّبِّكَ فَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِينَ বাস্তব সত্য সেটাই যা তোমার পালনকর্তা বলেন। কাজেই তুমি সন্দিহান হয়ো না। [cite: ১১৫৭] তিনি বললেন, হে আমার সন্তান, سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصُّبِرِينَ আল্লাহ চাহে তো তুমি আমাকে সবরকারী পাবে। [cite: ১১৫৮]
অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তার ছেলে ইন্তেকাল করলেন। মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজে জানাযা পড়ালেন এবং দাফন সম্পন্ন করলেন। বাড়ি ফিরে তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। তার ব্যথা সহ্যের বাইরে চলে গেল। সাথীরা একজনেরর পর একজন এসে তাকে দেখে যেতে লাগলেন। তিনি তাদের দিকে ফিরে বলতেন, ‘সময় ও সুযোগ পেলে কষ্ট করতে থাকুন। এখনো আপনাদের হায়াত বাকি আছে। ভালো যা কিছু করতে চান করে ফেলুন। নয়তো কেবল আশা করবেন, থাকবেন এবং তা হয়তো করার সুযোগ পাবেন না। নিজের যা আছে তা থেকেই খরচ করুন এবং আপনাদের পরে যারা আসবে তাদের জন্য উত্তরাধিকার রেখে যান। মনে রাখবেন, যা খাবেন, যা পরবেন আর যা খরচ করবেন তা-ই আপনার সম্পদ। আর বাকি সবকিছু আপনার উত্তরাধিকারীর।’ ব্যথা আরও বেড়ে গেল। তিনি বললেন, ‘ইয়া রব, আপনি যেভাবে ইচ্ছা আমাকে মৃত্যু দিন।’ [cite: ১১৫৯] আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনাকে আমি কতটুকু ভালোবাসি আপনি তা জানেন। [cite: ১১৬০]
মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি বলতে লাগলেন, ‘এই মুহূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অতিথিকে (মৃত্যুকে) স্বাগতম। যে আফসোস করবে সে সফল হতে পারবে না। হে আল্লাহ, আপনি তো জানেন খাল তৈরি কিংবা গাছ লাগানোর উদ্দেশ্যে আমি এই পৃথিবীতে থাকতে আগ্রহী নই; বরং নামাযের মাধ্যমে দীর্ঘ রাত পার করে এবং দিনে রোযা রেখে, তপ্ত গরমে তৃষ্ণার অনুভূতি নিয়ে এবং যিকিরের মজলিসের কারণে এখানে থাকার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলাম।’ [cite: ১১৬১]
তিনি ৩৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। [cite: ১১৬২] তিনি তার অবর্তমানে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ দিয়ে যান। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু তার জানাযা পড়ান এবং দাফন সম্পন্ন করতে তার কবরে নামেন। আরও কয়েকজন মুসলিম তার সাথে কবরে নেমেছিলেন। তিনি উঠে এসে বলতে লাগলেন, ‘আল্লাহ তা’আলা আপনাকে দয়া করুন, হে মুআয। আমার জানামতে, আপনি অন্যতম অনুগত এবং শ্রেষ্ঠ মুসলিম। আপনি মূর্খদের জ্ঞান দান করেছেন, অপরাধীদের প্রতি কঠোর এবং মুমিনদের প্রতি নম্র আচরণ করেছেন।’ [cite: ১১৬৩]
আবু উবায়দা এবং মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুমের ইন্তেকালের পরে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতির দায়িত্ব নেন। এরপরে সবার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হে লোকসকল, এই রোগ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে সবাই পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নাও।’ সুতরাং তিনি লোকজনসহ পাহাড়ে চলে গেলেন এবং আল্লাহ তা’আলা এই বিপদ থেকে মুক্ত না করা পর্যন্ত সবাই বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিল। [cite: ১১৬৪]
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠি দেন, ‘আপনার ওপরে শান্তি নাযিল হোক। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু ইন্তেকাল করেছেন এবং মুসলিমদের মধ্যে মৃত্যু ছড়িয়ে পড়ছে। তারা আমার কাছে উন্মুক্ত গ্রামের দিকে চলে যাবার অনুমতি চাচ্ছে। আমি জানি, আমরা এখন যেখানে আছি সেখানে থাকলে মৃত্যুকে যেমন আহ্বান করা যাবে না, তেমনই পালিয়ে গেলেও মৃত্যুকে দূরে ঠেলা কিংবা আল্লাহ তা’আলার হুকুম টলানো সম্ভব নয়। আপনার ওপরে আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি এবং রহমত বর্ষিত হোক।’ [cite: ১১৬৫]
আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরপর মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যু সংবাদে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুষড়ে পড়েন। তিনি এবং উপস্থিত মুসলিমরা কান্না ধরে রাখতে পারেননি। তার জন্য সবাই দুঃখ প্রকাশ করতে লাগল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দুআ করলেন, ‘আল্লাহ তা’আলা তাকে রহম করুন। মুআযের মৃত্যুতে মুসলিম উম্মত জ্ঞানের দিক দিয়ে বিরাট ক্ষতির মধ্যে পড়ল। আমরা যতবার তার সৎ উপদেশ গ্রহণ করেছি ততবার বরকত এবং রহমত লাভ করেছি। তার কাছ থেকে আমরা যা কিছু শিখেছি তাতে সুফল পেয়েছি, এবং তিনি সব সময় আমাদের ভালো নির্দেশনা দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা তাকে ধর্মনিষ্ঠদের পুরস্কারে পুরস্কৃত করুন।’ [cite: ১১৬৬]
এরপরে মুসলিমদের তৃতীয় বিখ্যাত নেতা প্লেগের কবলে পড়লেন। তিনি ইয়াযীদ ইবনে আবি সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু, আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুর সন্তানদের মধ্যে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। ইয়াযীদ আল-খায়র নামে তিনি বেশি প্রসিদ্ধ। আমওয়াসের প্লেগে আরেক মহান নেতা শাহাদাত বরণ করেন। শূরাহবীল ইবনে হাসানা। [cite: ১১৬৭]

৫.৩.৪। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে উমর রা.-এর সিরিয়াযাত্রা
সিরিয়ায় প্লেগের কবলে একের পর এক নেতা এবং সাহসী সৈনিকদের মৃত্যুসংবাদে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছিলেন। মৃত ব্যক্তিদের ফেলে যাওয়া সম্পদের উত্তরাধিকার এবং এমন অসংখ্য বিষয় নিয়ে সিরিয়ার গভর্নর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠি দিতে লাগলেন। নিত্যনতুন সমস্যা নিয়ে তিনি সাথীদের সাথে আলোচনায় বসতে লাগলেন। শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি নিজে গিয়ে মুসলিমদের সমস্যা মোকাবিলা করে আসবেন। মাজলিস আশ-শূরার সাথে আলোচনা শেষ করে তিনি সিরিয়া যাওয়ার জন্য মনস্থির করেন। তিনি বললেন, ‘সিরিয়ায় মানুষের উত্তরাধিকারীদের সম্পদ অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে, এজন্য আমি সেখানে যাব। উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পদ ভাগ-বাটোয়ারা করে দেব এবং যেভাবে যা করলে ভালো হয় সমাধান করে দিয়ে আসব। সেখান থেকে ফিরে এসে অন্যান্য ভূখণ্ডের দিকে যাব এবং নির্দেশনা দেব।’ সুতরাং কথামতো তিনি মদীনা ছাড়লেন। তার অবর্তমানে আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মদীনার দায়িত্ব দিয়ে আসেন। [cite: ১১৬৮] সিরিয়ায় গিয়ে খাদ্যসামগ্রী বিলি-বণ্টন করলেন, শীত এবং গ্রীষ্মে অভিযান চালানোর মতো সেনাদল গঠন করলেন, সীমান্তের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সুসংগঠিত করলেন। গভর্নরদের নিয়োগ দিলেন। উপকূলীয় সীমান্ত এলাকায় আব্দুল্লাহ ইবনে কয়েস রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং দামেস্কে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেন। সেনাবাহিনী, নেতা এবং সাধারণ মানুষের জন্য যাবতীয় কর্মকাণ্ড সুসংগঠিত করে আসেন। এবং জীবিতদের মাঝে মৃতদের সম্পদ ভাগ করে দেন। [cite: ১১৬৯]
নামাযের ওয়াক্ত হয়ে আসলে লোকজন বলতে লাগল, ‘আপনি বিলালকে আযান দিতে বলছেন না কেন?’ তিনি নির্দেশ দিলেন এবং আযান দেওয়া হলো। বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু আযান দেবার পরে সেখানে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে যতজন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ পেয়েছিলেন প্রত্যেকে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। তাদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা খুব মনে পড়ছিল। [cite: ১১৭০]
মদীনায় ফিরে যাওয়ার আগে তিনি সবার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমাদের দায়িত্ব আমার হাতে দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ তা’আলা তোমাদের ব্যাপারে আমাকে যেসব দায়িত্ব দিয়েছেন ইনশাআল্লাহ, আমি আমার সাধ্যমতো সবকিছু করার চেষ্টা করেছি। তোমাদের খাদ্যসামগ্রী তোমাদের মধ্যে ভাগ করে দিলাম, বাড়ি বরাদ্দ করেছি এবং সেনাবাহিনী সুসংগঠিত করেছি। আমরা যা করতে চেয়েছিলাম সব করা শেষ। তোমাদের হেফাযতের জন্য সেনাবাহিনী নিয়োগ করেছি এবং সীমান্ত আটকে দিয়েছি। গনিমতের মাল থেকে তোমাদের প্রাপ্য অংশ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। তোমাদের জন্য ভাতা এবং খাদ্যসামগ্রীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারও যদি মনে হয় যে আরও কিছু করা বাকি রয়ে গেছে, তবে আমাদের জানিয়ে দিলে আমরা তা করে দেব, ইনশাআল্লাহ। এবং আল্লাহ তা’আলা ছাড়া আমাদের আর কোনো শক্তি নেই।’ [cite: ১১৭১] নামাযের আগে এই খুতবা দিয়েছিলেন। তার পরপরই উল্লিখিত ঘটনাটি ঘটেছিল।
আমওয়াসের প্লেগ মুসলিমদের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছিল। এর ছোবলে বিশ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। বাইজেন্টাইনদের সাথে এর সম্পর্ক ছিল। মুসলিমরা বিপদ আঁচ করতে পারছিল। কারণ, সিরিয়ায় মুসলিমসেনার সংখ্যা যে হারে হ্রাস পাচ্ছিল তা বাইজেন্টাইনদের জানতে বাকি ছিল না। সুতরাং এমন দুর্বল মুহূর্তে তারা যে কোনো সময় হানা দিতে সক্ষম। তবে সাধারণ মানুষ মুসলিম শাসনপদ্ধতি এবং তাদের ন্যায়পরায়ণ ও সুন্দর আচরণ পেয়ে সন্তুষ্ট ছিল। সম্ভবত এই বিষয় বিবেচনা করে বাইজেন্টাইনেরা আঘাত হানতে আসেনি। কারণ, সাধারণ মানুষের সাহায্য ছাড়া সিরিয়ায় হামলা করা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া যুদ্ধে যুদ্ধে লোকজন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই আরবের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধের পরে সবাই একটু শান্তি চাচ্ছিল। মুসলিমদের বিজয় এবং তাদের প্রতি ভয় মানুষের মনে গেঁথে বসে। [cite: ১১৭২]

৫.৩.৫। প্লেগে আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ এবং ত্যাগের ফাতওয়া
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কোথাও এই রোগের কথা শুনলে সে অঞ্চলে যাবে না। তবে তোমরা থাকা অবস্থায় রোগ দেখা দিলে সে অঞ্চল ত্যাগ করবে না এবং তা থেকে পালানোর চেষ্টা করবে না।’ [cite: ১১৪৪]
আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ এবং ত্যাগ করা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ কেউ একে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেছেন আবার কেউ কেউ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। যারা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাদের মতে আক্রান্ত এলাকা থেকে বেরিয়ে যাওয়া জায়েয। এখানে আমরা দেখতে পেয়েছি যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চাচ্ছিলেন, আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু যেন বেরিয়ে আসেন। তিনি বরং মাফ চেয়ে নেন এবং সেখানে থেকে যাওয়ার অনুমতি চান। অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে নিম্নাঞ্চল থেকে সরে নির্মল বাতাসপূর্ণ পাহাড়ের দিকে চলে যেতে বলেন। তিনি তাই করলেন। সারগে বসে আব্দুর রহমান রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ এবং ত্যাগ না করা বিষয়ে হাদীস বর্ণনা করার পরে আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে চিঠি পৌঁছেছিল।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেবার মদীনায় ফিরে গিয়েছিলেন। মহামারী সবে শুরু হয়েছে, তখনো দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েনি। মদীনায় পৌঁছামাত্রই এর ভয়াবহ ছোবলে অগণিত প্রাণহানির খবর পান। আক্রান্ত অঞ্চল ত্যাগের পক্ষে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মত ছিল। এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামও সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে সিরিয়ায় ছিলেন এবং এই রোগ থেকে বেঁচে যান। উদাহরণ হিসেবে আমর ইবনুল আস এবং আবু মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুমের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।
আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ এবং ত্যাগ করা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কেউ বললেন, যারা বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহর হুকুম থেকে পালানো যায় না এবং পালিয়ে মৃত্যুকে দূরে ঠেলা যায় না তাদের জন্য আক্রান্ত অঞ্চল ত্যাগ করা জায়েয আছে। সেই অঞ্চল ত্যাগের জন্য উপযুক্ত কারণ থাকলে তা জায়েয হবে। চিকিৎসালাভের আশায় বের হয়ে আসা জায়েয হবে। প্লেগে আক্রান্ত অঞ্চলের চেয়ে ভালো কোথাও যাওয়ার অনুমতি আছে এবং যাওয়া উচিত।
আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে সেখানে থেকে যেতে চেয়েছিলেন। তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বাস্থ্যগত, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং নেতৃত্বের দায়বদ্ধতার চরম নযীর স্থাপন করেছেন। আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কারণগুলো উল্লেখ করে দিয়েছিলেন, ‘আমি বর্তমানে মুসলিম সেনাদের সাথে আছি। নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে তাদের ফেলে আসতে পারি না।’ আক্রান্ত অঞ্চল ত্যাগের বিপক্ষে যেসব উলামায়ে কেরাম মত দিয়েছেন তাদের যুক্তিও মজবুত। আক্রান্ত অঞ্চল থেকে যদি সবাই চলে যেতে থাকে তবে দুর্বল অক্ষম লোকজনের কী হবে? অসুস্থ বা অন্য যেকোনো কারণে সরতে অক্ষম লোকজনকে দেখাশোনা করার কেউ থাকবে না। চলে যাওয়ার অনুমতি পেলে শক্ত-সামর্থ্য লোকেরা চলে যাবে এবং অসহায়রা পড়ে থাকবে। এতে করে দুর্বলদের অসহায়ত্ব বেড়ে যাবে। এ জন্যই যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানোর ওপরে কঠিন নিষেধাজ্ঞা ছিল। এমন করলে পেছনে পড়ে থাকা মানুষগুলো আরও অসহায় হয়ে যেত এবং অবহেলিত মানুষকে আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাতে হতো।
পরিশিষ্ট সুতরাং আক্রান্ত অঞ্চলে থেকে যাওয়া কিংবা ত্যাগ করা দুটোর পক্ষেই যুক্তি বিদ্যমান। মহামরীতে একবার আক্রান্ত হয়ে পড়লে সেখান থেকে পালানোর মধ্যে কোনো যুক্তি নেই। তাতে বরং সুস্থ মানুষদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে। আর যারা সুস্থ ব্যক্তি তাদের মধ্যে কিছু লোক রোগীদের সেবায় ব্যস্ত থাকলে দু-একজন চিকিৎসার খোঁজে বের হতেই পারে। [cite: ১১৭৩]

টিকাঃ
১১৩৯. তারীখ আল-কুদাই, পৃ. ২৯৪।
১১৪০. আল-ফাতহ, ১০/১৮০।
১১৪১. আবু উবায়দা আমির ইবনে আল-জাররা, মুহাম্মাদ শাররাব, পৃ. ২২০।
১১৪২. আল-খুলাফা আর-রাশিদূন, আন-নাজ্জার, পৃ. ২২৪।
১১৪৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ২২২, ২২৩।
১১৪৪. আল-খুলাফা আর-রাশিদূন, আন-নাজ্জার, পৃ. ২২৫; তারীখ আত-তাবারি, ৫/৩৬।
১১৪৫. তারীখ আত-তাবারি, ৫/৩৫।
১১৪৬. তারীখ আত-তাবারি, পৃ. ১৭৪।
১১৪৭. তারীখ আত-তাবারি, ৫/৩৬।
১১৪৮. আল-ইকতিফা, পৃ. ৩/৩০৬।
১১৪৯. সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৩।
১১৫০. সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৪।
১১৫১. সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৭।
১১৫২. আল-ইকতিফা, পৃ. ৩/৩০৭।
১১৫৩. প্রাগুক্ত।
১১৫৪. প্রাগুক্ত, ৩/৩০৯।
১১৫৫. প্রাগুক্ত, ৩/৩১০।
১১৫৬. তারীখ আত-তাবারি, ৫/৩৬।
১১৫৭. সূরা বাকারা, ২: ১৪৭।
১১৫৮. সূরা আস-সফ্ফাত, ৩৭: ১০২।
১১৫৯. আল-ইকতিফা, ৩/৩০৮।
১১৬০. প্রাগুক্ত।
১১৬১. হিলইয়াত আল-আওলিয়া, ১/২২৮-২৪৪।
১১৬২. প্রাগুক্ত।
১১৬৩. আল-ইকতিফা, ৩/৩০৯।
১১৬৪. আল-বিদায়া ওয়া আন-নিহায়া, ৭/৯৫।
১১৬৫. মাজমূআত আল-ওয়াসাইক আস-সিয়াসিয়া, পৃ. ৪৯০।
১১৬৬. আল-ইকতিফা, ৩/৩১০।
১১৬৭. আল-কামীল ফী আত-তারীখ, ১/১৭১,১৭২; তারীখ আয-যাহাবি, পৃ. ১৮১।
১১৬৮. আল-ফারূক উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ রিদা, পৃ. ২৩০।
১১৬৯. আল-খুলাফা আর-রাশিদূন, আন-নাজ্জার, পৃ. ৩২৫; আল-ফারূক উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ রাশিদ রিদা, পৃ. ২৩০।
১১৭০. খুলাসাত তারীখ ইবনে কাসীর, আল-খিলাফা আর রাশিদা, পৃ. ২৩৬।
১১৭১. আল-বিদায়া ওয়া আন-নিহায়া, ৭/৭৯।
১১৭২. আশহার আল-মাশাহীর, ২/৩৬১।
১১৭৩. আবু উবায়দা আমির ইবনুল জাররা, শাররাব, পৃ. ২৩২-২৩৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00