📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 উমর রা.-এর সময়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন

📄 উমর রা.-এর সময়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন


উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মসজিদ বড় করতে গিয়ে আব্বাস ইবনে আব্দুল-মুত্তালিবের বাড়ি নিয়ে নেন। কিবলার দিকে দশ হাত, পশ্চিমে বিশ হাত আর উত্তরে সত্তর হাত বাড়ানো হয়। ইট ও খেজুর পাতা দিয়ে মসজিদ পুনঃনির্মাণ করা হয়েছিল। মসজিদের ভিত ছিল কাঠের আর ছাউনি ছিল খেজুর পাতার। বৃষ্টি থেকে বাঁচতে এর ওপরে পলেস্তারা লাগিয়ে নেন। তিনি লাল বা হলুদ রঙে মসজিদ সাজাতে নিষেধ করেছিলেন। কারণ, এতে নামাযে মনোযোগ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ছিল। [cite: ১০৩৫] নামাযীদের পরিচ্ছন্নতা এবং হাঁটার সুবিধার্থে তিনি মাটির মেঝেতে পাথর বিছিয়ে দেন। [cite: ১০৩৬]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মক্কার মসজিদুল হারামেও কিছু পরিবর্তন এনেছিলেন। তাওয়াফ এবং নামাযের সুবিধার্থে তিনি মাকামে ইবরাহীম সরিয়ে বর্তমান জায়গায় নিয়ে আসেন এবং এর চারদিক ঘিরে দেন। মাকামে ইবরাহীম আগে কাবার সাথে লাগানো ছিল। [cite: ১০৩৭] মসজিদের পরিধি বাড়ানোর জন্য চারপাশের বাড়িঘর কিনে সেগুলো ভেঙে ফেলেন। মসজিদের আশেপাশে যারা বাড়ি বিক্রি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, তিনি তাদের বাড়িও ভেঙে ফেলেন। তবে তাদের টাকাপয়সা তার কাছে গচ্ছিত রাখেন, যেন তারা পরে এসে নিতে পারে। লণ্ঠন রাখার জন্য মসজিদের চারপাশ নিচু দেয়াল দিয়ে ঘিরে দিয়েছিলেন। [cite: ১০৩৮]
জাহেলী যুগে চামড়া দিয়ে কাবার গিলাফ তৈরি করা হতো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসে ইয়েমেনি কাপড় দিয়ে কাবা ঢেকে দেন। আর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ব্যবহার করেন কিবাতি [cite: ১০৩৯] নামে পাতলা সাদা রঙের মিসরীয় কাপড়। [cite: ১০৪০]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের সময় নগরে নগরে মসজিদ তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু কুফায়, উতবা ইবনে গাযওয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু বসরায়, আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু ফুস্তাতে জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বড় মসজিদগুলোয় নামায আদায়ের পাশাপাশি দেখা-সাক্ষাৎ করার এবং দ্বীন শেখার কেন্দ্রে পরিণত হয়। এছাড়া সেখানে বিচার-সালিশ করা হতো এবং খলীফার ফরমান জারির জায়গাও ছিল মসজিদ। [cite: ১০৪১]

৫.১.১। জল ও স্থলপথে পরিবহনব্যবস্থা
ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্গত অঞ্চলগুলোর মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা মজবুত করার লক্ষ্যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিমদের সরকারি কোষাগারের একাংশ বরাদ্দ করেছিলেন। এ কাজের জন্য তিনি বিপুল সংখ্যক উট আলাদা করে রাখেন। পরিবহনের জন্য তখন উটই ছিল একমাত্র সহজলভ্য বাহন। উটে করে আরব উপদ্বীপ, সিরিয়া এবং ইরাকের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা হতো। এছাড়া দার আদ-দাকিক (আটা-ঘর) নামে তিনি কতগুলো স্থাপনা গড়ে তোলেন। সাওয়ীক (ছাতু), খেজুর, কিসমিস এবং জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় মালামাল সেখানে মজুদ রাখা হতো যাতে অসহায় মুসাফির ও আগন্তুকরা তা থেকে উপকৃত হতে পারে। মক্কা এবং মদীনার মাঝে এক মরুদ্যান থেকে আরেক মরুদ্যানে চলাচলে সুবিধার জন্য তিনি প্রয়োজনীয় মালামাল এবং বাহনের ব্যবস্থা করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী সভ্যতার উন্নয়নে কার্যকরী যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন যাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এতে মুসাফিরদের পানি কিংবা অন্য কোনো রসদপত্র বহন করার প্রয়োজন ছিল না। [cite: ১০৪২] বিভিন্ন গোত্র, সাধারণ মানুষ এবং গভর্নরদেরও তিনি একইভাবে কাজ করার নির্দেশ দিতেন।
কাসীর ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি তার বাবার বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন: উমর ইবনুল খাত্তাবের সাথে আমরা ১৭ হিজরীতে উমরা পালন করতে যাই। পথে তাকে পেয়ে মরুদ্যানবাসী একটি আর্জি পেশ করেছিল। তারা মক্কা এবং মদীনার মাঝে ঘরবাড়ি বানানোর অনুমতি চাচ্ছিল। এর আগে সেখানে কিছুই ছিল না। তিনি অনুমতি দিয়েছিলেন, তবে শর্ত সাপেক্ষে। বাড়িঘর করলেও তাদের তুলনায় পানি আর ছাউনির ওপরে মুসাফিরদের হক সবসময় বেশি থাকবে, এ কথাটি জানিয়ে দিলেন। [cite: ১০৪৩]
বিজিত নতুন ভূখণ্ডের গভর্নরদের সাথে করা চুক্তিতে রাস্তাঘাট সংস্কারের ব্যাপারে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সচেতনতা দেখা গেছে। নাহাওয়ান্দ বিজয়ের পরে বাহরাযান এবং দিনার এই দুটি নদী-তীরবর্তী বাসিন্দারা হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামানের কাছে নিরাপত্তার আর্জি নিয়ে আসে। তারা জিযিয়ার বিনিময়ে সুরক্ষা চাচ্ছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি তাদের জন্য আলাদা আলাদা সন্ধিপত্র পাঠান। তাতে বলা হয়েছিল: ‘পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। এটা দিনার নদী-তীরবর্তী বাসিন্দাদের প্রতি হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামানের বক্তব্য। তিনি তাদের জান, মাল এবং ভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। তাদের ধর্ম পরিবর্তনের জন্য কোনো রকম বল প্রয়োগ করা হবে না, এবং তাদের রীতি-রেওয়াজেও কোনো রকম বাধা দেওয়া হবে না।’ [cite: ১০৪৪] যতদিন পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিরা তাদের সামর্থ্য অনুসারে গভর্নরের কাছে প্রতি বছর জিযিয়া প্রদান করতে থাকবে, মুসাফিরদের পথ দেখাবে, রাস্তাঘাটের যত্ন নেবে, মুসলিম সেনাবাহিনী আসলে অন্তত একদিন এবং একরাতের আতিথেয়তা করবে এবং অনুগত থাকবে তাদের পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের সাথে কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করলে এবং ধোঁকা দিলে এই সন্ধি রদ হয়ে যাবে। আল-কাদা ইবনে আমর এবং নুয়ায়ম ইবনে মুকরিম এর সাক্ষী। মুহররম, ১৯ হিজরী। [cite: ১০৪৫]
মানবসভ্যতার মূলনীতি সম্পর্কে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ধারণা খুব স্পষ্ট ছিল। এই সন্ধিপত্রটি তার প্রমাণ। ব্যবসা কিংবা যুদ্ধ, যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ পরিচালনা করতে হলে ভূখণ্ডগুলোর মধ্যে যোগাযোগের জন্য রাস্তাঘাটের রক্ষণাবেক্ষণ কতটা জরুরী তিনি উপলব্ধি করতেন। সুতরাং ১৬ হিজরী থেকে তিনি ইরাকে একের পর এক নগর তৈরি করেন এবং জলপথ খনন ও সেতু তৈরির প্রতি মনোযোগী হয়ে ওঠেন। [cite: ১০৪৬]
আর-রাহাবাসীর সাথে করা ইয়াদের সন্ধিতে বলা হয়েছিল: আল্লাহর নামে শুরু করছি, ইয়াদ ইবনে গানামের পক্ষ থেকে আর-রাহার ধর্মাধ্যক্ষের প্রতি। আপনার এলাকায় বসবাসকারী প্রত্যেক ব্যক্তির পক্ষ থেকে এক দিনার এবং দুই মুদ্দ করে গম দেবার শর্তে যদি নগরীর দরজা খোলেন তবে আপনার জান, মাল এবং আপনার সাথে থাকা সবার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদের। পথহারাদের পথ দেখানো, সেতু রক্ষণাবেক্ষণ এবং মুসলিমদের প্রতি অনুগত থাকার দায়িত্ব আপনাকে দেওয়া হলো। আল্লাহ তা’আলা আমার সাক্ষী এবং সাক্ষী হিসেবে তিনিই যথেষ্ট। [cite: ১০৪৭]
উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে পেরেছিলেন যে নীলনদের সাথে লোহিত সাগর সংযোগকারী একটি জলপথ ছিল। ব্যবিলনের কোনো একটি দুর্গ থেকে এই পথ ধরে মিসরের হিজাযে যাওয়া যেত। এই জলপথে ব্যবসা-বাণিজ্য ত্বরান্বিত হয়ে ওঠে। তবে বাইজেন্টাইনদের অবহেলায় তা ভরাট হয়ে গেছে। তিনি আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নতুন করে ওই জলপথ খননের নির্দেশ দেন। খনন করার পর থেকে জলপথটি হিজায এবং আল-ফুস্তাতের মধ্যে, পরবর্তী সময়ে মিসরের সাথে সংযুক্ত হয়। এই পথ ধরে নীলনদ এবং লোহিত সাগরের দুইপাশে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছিল। আল-ফুস্তাতে এক সময় খাল ঘেঁষে পার্ক, বাগান এবং বসতি গড়ে ওঠে। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু এর নাম দেন খালীজ আমীরুল মুমিনীন (আমীরুল মুমিনীনের জলপথ)। [cite: ১০৪৮]
মিসরের গভর্নর এ পথ দিয়ে সহজেই মক্কা এবং মদীনায় খাদ্যসামগ্রী পাঠাতে পারতেন। এর অসিলায় আল্লাহ তা’আলা পবিত্রনগরী দুটোয় বরকত দান করেন। উমর ইবনুল আব্দুল আযিযের সময় পর্যন্ত এই পথে খাদ্যসামগ্রী আমদানি-রপ্তানি করা হয়েছে। পরবর্তী গভর্নরদের অবহেলায় আরেকবার তা ভরাট হয়ে কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। ইরাক থেকে বসরার আল-খাওর পর্যন্ত তিন প্যরাসাং (দৈর্ঘ্যের রোমান একক) দীর্ঘ একটি খাল খনন করা হয়েছিল। এই পথে তাইগ্রিসের পানি বসরায় বয়ে আসত। [cite: ১০৪৯] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে খাল ও নদী খনন, রাস্তা সংস্কার, বাঁধ ও সেতু তৈরির জন্য বড় অংকের অর্থসম্পদ বরাদ্দ করা হয়েছিল। [cite: ১০৫০]

৫.১.২। সীমানাখুঁটি স্থাপন, সামরিক ঘাঁটি হিসেবে নতুন শহর নির্মাণ এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রসার
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে একের পর এক সফল অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে সীমান্ত এলাকায় নতুন নতুন শহর গড়ে তোলা হয়েছিল। ওই অঞ্চলগুলোর উন্নয়ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিসাধনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষ যেন সামরিক ঘাঁটি এবং নতুন ভূখণ্ডে বসবাস শুরু করে সেই লক্ষ্যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু উৎসাহিত করতেন। এতে করে ইসলামের প্রচার-প্রসারে যেমন সুবিধা হতো, তেমনই মুজাহিদদের লোকবল এবং রসদের সরবরাহ নিয়ে চিন্তা করতে হতো না। বসরা, কৃষ্ণা, মসুল, আল-ফুস্তাত, গিয়া এবং সিরত [cite: ১০৫১] সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগর হিসেবে গড়ে উঠেছিল। [cite: ১০৫২] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুব পরিকল্পনার সাথে কাজ করতেন। সামরিক বিভাগ এবং গোত্রগুলোর অবস্থা বুঝে বুঝে সেনাদল পাঠানো হতো। জনসাধারনের সুবিধার্থে নগরে নগরে মসজিদ, বাজার এবং নগরের বাইরের দিকে সার্বজনীন চারণভূমি (আল-হিমা) তৈরি করান। এসব চারণভূমিতে মুজাহিদদের উট-ঘোড়া চরে বেড়াত। তিনি হিজায নগরীসহ আরবের সব প্রান্ত থেকে স্ত্রী-সন্তানসহ আসার জন্য লোকজনকে উৎসাহিত করতে থাকেন। এ পদ্ধতিতে বিজিত অঞ্চলগুলো শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়। জনবল এবং রসদের অভাব হতো না, সেই সাথে শত্রুরাষ্ট্রে ঢুকে পড়া সহজ হয়ে যায়, ইসলাম প্রচারে সহায়ক হয়।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশে সেনাপতিরা নগর পরিকল্পনার সময় সাগর এবং নদীবিহীন অঞ্চলের সাথে খেলাফত-নগরের যোগাযোগ সহজ করার জন্য রাস্তা অন্তর্ভুক্ত করতেন। জলপথের ব্যাপারে আরবদের অজ্ঞতা সম্পর্কে তার জানা ছিল। তবে তিনি যখন আবিষ্কার করলেন মিসরের মুসলিম সেনারা সাগর আর নদী থেকে সংযোগকারী খাল খনন করতে শিখে গেছে তখন আমর ইবনুল-আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নীলনদ আর লোহিত সাগরের মাঝে খাল খননের নির্দেশ দেন। এই পথে হিজাযে খাদ্যসামগ্রী পাঠানো সহজ হয়ে যায়। [cite: ১০৫৩]
নতুন ভূখণ্ড বিজয় ও বিস্তৃতির ফলে মুসলিম রাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমশ দূরত্ব বাড়তে থাকে। সুতরাং নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি সৈন্যসংখ্যা বাড়িয়ে দেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া ক্লান্ত সৈন্যদের জন্য স্বভাবতই ছাউনির দরকার হতো। এছাড়া যে কোনো অভিযান শেষে এবং শীতকালে অবস্থানের জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই দরকার ছিল। এসব প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে এই নগরগুলো গড়ে ওঠে। ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে ইসলামের বার্তা প্রচারের জন্য ইসলামী জীবনযাপনের নযীর স্থাপন করার প্রয়োজন দেখা দেয়, এতে মানুষজন হাতেকলমে অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারবে। সুতরাং ইসলামী নগরগুলো পরিপূর্ণ ইসলামী বৈশিষ্ট্যের ওপরে ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সুতরাং বলা যায় কুফা, বসরা, আল-ফুস্তাত এবং মসুল পুরোপুরি ইসলামী শহর।
এই মডেল সমাজে ইসলামের শক্তি এবং ভিত্তি—দুটিই দৃশ্যমান ছিল; এর একটি ছিল সামরিক শক্তি এবং আরেকটি আল্লাহর কিতাবের শক্তি। প্রত্যেক কথা আর কাজে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর আইন মানা হতো। এই সমাজের মানুষেরা ছিল আল্লাহর পথে জীবন দিতে সদা তৎপর। ইসলামী শহরগুলো থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ইসলামের আলো ছড়িয়েছে; মানুষ পথনির্দেশনা লাভ করেছে, শাসনব্যবস্থায় ন্যায়বিচার বিরাজ করেছে এবং নব্য মুসলিমদের আপন করে নিয়েছে। যারা ইসলাম সম্পর্কে জানত না, তাদের মধ্যে দ্বীন প্রচারের এবং প্রকাশের জন্য এর চেয়ে ভালো পদ্ধতি আর কি হতে পারত!
তবে সিরিয়ায় ইসলামী নগর ছিল না। বাইজেন্টাইনদের ফেলে যাওয়া ঘরবাড়ি এক সময় মুসলিমদের দখলে চলে আসে। সুতরাং নতুন করে বাড়িঘর তৈরির প্রয়োজন পড়েনি। তাছাড়া আরবদের অনেক আত্মীয়-স্বজন আগে থেকেই সিরিয়ায় বসবাস করত। তাই প্রত্যেক গোত্রের লোকজন সেখানে কোনো-না-কোনো আত্মীয়-স্বজন পেয়ে গেছে। [cite: ১০৫৪]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময় গড়ে ওঠা শহরগুলোর বর্ণনা এখানে দেওয়া হলো:

বসরা
বসরা একটি আরবি শব্দ। এর মানে, কঠিন পাথুরে এলাকা; নুড়িময় এলাকা বা কোমল সাদা পাথরের এলাকা। তাইগ্রিস আর ইউফ্রেতিস নদীর সংযোগস্থলে বসরা নগরীর উৎপত্তি। নদীসংযোগস্থলটি শাত আল-আরব নামে পরিচিতি লাভ করে। [cite: ১০৫৫] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আরব জীবনযাপনের কায়দায় নগর প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। পানি এবং চারণভূমির কাছাকাছি এলাকাটি গড়ে ওঠে। চাষাবাদের উপযুক্ত জমি এবং বনভূমির মাঝামাঝি এর অবস্থান ছিল। প্রথমে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময় মুসলিমরা এখানে ঘাঁটি করে। বিভিন্ন বর্ণনামতে, বসরায় কুতবা ইবনে কাতাদা আয-যুহালি বা সুয়াইদ ইবনে কুতবা তার কিছু লোকজন নিয়ে পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। পরে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে নেতা এবং গভর্নরের দায়িত্ব নিয়ে সেখানে থেকে যেতে বলেন। খলীফা হওয়ার পরে উমর সেখানে উতবা ইবনে গাযওয়ানকে একই সাথে গভর্নর এবং সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রবীণ সাহাবী ছিল। খলীফা তাকে নির্দেশ দেন, ‘যুদ্ধের মাধ্যমে আল-আহওয়ায, পারস্য এবং মায়সানবাসীকে ব্যস্ত রাখবেন। তারা যেন তাদের ভাইদের সাহায্য করার কথা ভাবতেও না পারে।’ তিনি কুতবা বা সুয়াইদকেও যোগ দিতে বলেন। সুতরাং উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহু তিনশরও বেশি লোক নিয়ে সেখানে যান এবং বাকর ইবনে ওয়াইল এবং তামীমসহ কুতবা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সাথে যোগ দেন। ১৪ হিজরীর রবিউল আওয়াল বা রবিউল আখেরের দিকে তারা সেখানে ঘাঁটি স্থাপন করেছিলেন। [cite: ১০৫৬]
উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এ অঞ্চলে একটি শহর প্রতিষ্ঠার কথা তোলেন। তার কথা শুনে খলীফা পানি এবং চারণভূমি আছে এমন উপযুক্ত জায়গা খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। উপযোগী জায়গা পছন্দ করে তিনি খলীফাকে লিখলেন, ‘চাষাবাদের জমি এবং বনভূমির মাঝে একটি জায়গা পছন্দ করেছি। বনাঞ্চলে পুকুর আছে, এর পাড় নলখাগড়ায় ছাওয়া।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চিঠি মারফত তাকে সেখানে থাকার অনুমতি দেন। তিনি থেকে গেলেন। নলখাগড়া দিয়ে মসজিদ এবং গভর্নরের বাড়ি তৈরি করলেন। সেখানে এত নলখাগড়া ছিল যে লোকজন তা দিয়ে সাতটি আবাসিক এলাকা গড়ে তুলতে সক্ষম হন। সেনা অভিযানে যাওয়ার সময় তারা নলখাগড়ার ঘরগুলো খুব সহজেই গুটিয়ে স্তূপাকারে রাখতেন পারতেন। আবার ফিরে এসে ঘর তুলতেন। তবে একটাই ঝামেলা ছিল। নলখাগড়া খুব দাহ্য পদার্থ। তাই তারা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে রোদ-পাকা ইটের ঘর-বাড়ি তৈরির অনুমতি চাইলেন। তিনিও অনুমতি দিয়ে দেন। ১৭ হিজরীতে উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে আবু মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নর হন। তিনি এসে রোদ-পাকা ইট আর কাদা মাটি দিয়ে মসজিদ এবং গভর্নরের বাড়ি তৈরি করে নিলেন। উপরে ছিল খড়ের। আরও পরে ইট আর পাথর দিয়ে এগুলো পুনঃনির্মাণ করেন এবং প্রত্যেক গোত্রের জন্য ভিন্ন ভিন্ন জায়গা বরাদ্দ করে দেন। তার তৈরি করা প্রধান সড়কটি ছিল ষাট হাত চওড়া। বাকিগুলো ছিল বিশ হাত চওড়া আর গলিপথ ছিল সাত হাত করে। বাড়িঘেরা মাঝের জায়গায় ঘোড়া বাঁধার জন্য এবং মৃতের দাফনের জন্য অনেকটা করে জায়গা রাখা হয়। বাড়িগুলো গায়ে গায়ে তৈরি করা হয়েছিল। [cite: ১০৫৭]
বসরাবাসীর জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খাল খনন করে দিতে বলেন। আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু আল-আবলা থেকে বসরার দিকে তিন প্যারাসাঙ দীর্ঘ খাল খনন করেন। [cite: ১০৫৮]
সুতরাং বলা যায় নগর পরিকল্পনায় মুসলিমরা অগ্রণী ছিলেন। আল-আবলা, দাস্ত এবং মায়সান জয়ের পরে বসরা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। [cite: ১০৫৯] লোকজন সেখানে বসবাস করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। আগে সবাই আসত জিহাদের লক্ষ্যে, আর পরে সবাই ধন-সম্পদের আশায় আসতে শুরু করেছিল। সুতরাং ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের এবং ভিন্ন ভিন্ন মন-মানসিকতার লোকজন, ব্যবসায়ীরা বসরায় আসতে শুরু করে। ফলে জনসংখ্যা খুব দ্রুত বাড়ছিল। [cite: ১০৬০]
ঐতিহাসিক দলিলের ভিত্তিতে গবেষকেরা সামরিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়ে নিচের এই সিদ্ধান্তগুলো দিয়েছেন:
আরবের কিনারা ঘেঁষে অর্থাৎ, অনারব অঞ্চলের পাশে এই শহরগুলো গড়ে উঠেছে। এতে করে কোনো দিক দিয়ে শত্রু অনুপ্রবেশের সুযোগ ছিল না। আরবদের জন্য জায়গাগুলো খুবই উপযোগী ছিল। আল্লাহর পথে জিহাদের জন্য তখন সবচেয়ে বেশি সেনাদল গঠন করা হয়েছিল। আর উটের জন্য উপযুক্ত চারণভূমি ছাড়া সেখানে থাকতে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাখ্যা এমন ছিল। [cite: ১০৬১]
বনভূমির কিনার ঘেঁষে নগর প্রতিষ্ঠার জায়গা নির্বাচন করা হয়েছিল। গবাদি পশু পালনের সুবিধা বিবেচনা করে জায়গা পছন্দ করা হতো। তাছাড়া পাশেই অনারব গ্রাম থাকায় দই, পশম, শস্য এবং ফলমূল সহজলভ্য হয়ে ওঠে। বসরা প্রসঙ্গে সব দিক বিবেচনা করে উতবা ইবনে গাযওয়ান রাযিয়াল্লাহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে লিখেছিলেন, ‘জায়গাটি সবুজ, এর কাছাকাছি পানি, চারণভূমি এবং জ্বালানি-কাঠ আছে।’ [cite: ১০৬১] এখানে সুষ্ঠু সামরিক পরিকল্পনার চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। যুদ্ধ এবং শান্তি সব অবস্থায় যা কিছু প্রয়োজন, তা নগর পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করা হতো। কারণ, পানি সরবরাহের জন্য নালা এবং জ্বালানি-কাঠ প্রত্যেক নগরের জন্য আবশ্যকীয় উপকরণ ছিল। [cite: ১০৬২]
তাছাড়া খেলাফত-নগর থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার পথে নদীর মতো কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা যেন না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখাও জরুরী ছিল। [cite: ১০৬২]
প্রত্যেক সৈন্যদল তাদের গোত্র-প্রথা মেনে নগর পরিচালনা করত। প্রত্যেক গোত্রের জন্য আলাদা আবাসন ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল। [cite: ১০৬৩]

কুফা সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু কুফা নগরীর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। এই তথ্য নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। আল-মাদাইন থেকে পারসিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক সফল যুদ্ধের পরে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু এখানে একটি নগর তৈরি করতে চাইলেন। [cite: ১০৬৪] তার নির্দেশে নগর-পরিকল্পনার কাজ শুরু হয়। তিনিও বসরার মতো একই বিষয় মাথায় রেখে জায়গা নির্বাচন করেছিলেন। সবার আগে মুজাহিদদের ক্যাম্পের সুবিধা ভাবা হয়েছে। [cite: ১০৬৪] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশ পেয়ে তিনি কাজ শুরু করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যেসব বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন সেগুলোর ভিত্তিতে কুফার জায়গা নির্বাচন করা হয়েছিল। আল-কাদিসিয়া এবং আল-মাদাইন থেকে ফিরে যাওয়া মানুষের চোখেমুখে বাজে আবহাওয়ার যে ছাপ পড়েছিল তা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নজর এড়ায়নি। এজন্য তাদের এবং তাদের উটের উপযোগী জায়গা নির্বাচনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সালমান আল-ফারিসী এবং হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহুমকে কুফার জন্য ভালো জায়গা খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারা আল-হীরা এবং ইউফ্রেতিসের মধ্যবর্তী জায়গা পছন্দ করেন। জায়গাটি বালিময় আর পাথুরে ছিল। এমন জায়গা আরবিতে কূফা নামে পরিচিত। [cite: ১০৬৫] সেই থেকে কুফা নামটি রয়ে গেছে।
সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ১৭ হিজরীর মুহররম মাসে আল-মাদাইন ছেড়ে কুফায় চলে আসেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চাইতেন তার সৈন্যরা যেন সব সময় তাঁবুতে অবস্থান করেন। তাতে শত্রুদের কাছে মনে হবে তারা লড়াইয়ের জন্য সব সময় প্রস্তুত আছেন, সুতরাং শত্রুরা ভয়ে দুর্বল হয়ে পড়বে। তা সত্ত্বেও বসরা আর কূফায় তারা যখন নলখাগড়ার ঘর তুলতে চাইলেন খলীফা নিষেধ করেননি। অনুমতি পেয়ে তারা নলখাগড়ার ঘর তুলে থাকতে লাগলেন। তবে বসরা আর কূফায় আগুন লেগে সেগুলো পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তখন তারা খলীফার কাছে রোদ-পাকা ইট দিয়ে ঘরবাড়ি তৈরির অনুমতি চাইলেন। তিনি অনুমতি দিলেও শর্ত দিয়ে দেন, ‘তা করতে পার। তবে কেউ যেন বাড়িতে তিনটির বেশি ঘর না বানায়, এবং উঁচু বাড়ি বানানোর প্রতিযোগিতা করবে না।’ উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং বসরাবাসীর জন্যও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর একই নির্দেশ ছিল। আসিম ইবনে আদ-দুলাফ আবু আল-জারদাকে কূফায় বসতিস্থাপন এবং নির্মাণকাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আবু আল-হাইয়াজ ইবনে মালিককে দেওয়া হয়েছিল বসরার সংস্থাপন এবং নির্মাণের দায়িত্ব। উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশ মোতাবেক আবু আল-হাইয়াজ কুফা নগরীর পরিকল্পনা করেছেন। প্রস্থের দিক দিয়ে প্রধান সড়ক চল্লিশ হাত, দ্বিতীয় প্রধান সড়ক বিশ হাত এবং গলি পথগুলো সাত হাত চওড়া করে বানানো হয়। এর কম প্রস্থের কোনো রাস্তা করা হতো না। সবার আগে মসজিদের পরিকল্পনা করা হতো। একজন দক্ষ তীরন্দাজ নগরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে ডানে, বাঁয়ে, সামনে এবং পেছনে তীর ছুঁড়তেন। তীরের প্রান্ত থেকে মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু করা হতো। ছায়ার জন্য উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মসজিদের সামনে একটা শামিয়ানা ঝুলিয়ে দেন। চারটি মার্বেলের কলামের ওপরে টাঙানো শামিয়ানা দুইশ’ বর্গহাত বিস্তৃত ছিল। মসজিদের কাছে সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর জন্য একটা বাড়ি বানানো হয়েছিল। মসজিদ আর তার বাড়ির মাঝে একটি রাস্তাও করা হয়েছিল। ওই বাড়িতে বায়তুল মালের অর্থসম্পদ গচ্ছিত থাকত। রুবা আল-ফারিসি নির্মাণ কাজের দায়িত্বে ছিলেন।
নগরী প্রতিষ্ঠার পরে সেখানে সবার আগে মুজাহিদারা থাকতে শুরু করেন। অতঃপর সেখানে চার হাজার পারসিক বসবাস করতে আসে। তারা শাহেনশাহ সেনানাহিনী নামে পরিচিত ছিল। তারা ইচ্ছেমতো ঘাঁটি স্থাপন করত আর অল্প কিছু ভাতা দিলেই এর বিনিময়ে যে কারও সাথে সন্ধি গড়ে তুলত। তাদের যা কিছু দরকার পড়ত সাদ দিয়ে দিতেন। তাদের দলনেতার নাম ছিল দায়লাম। সুতরাং সেনাদলটি হামরা দায়লাম নামে পরিচিত ছিল। [cite: ১৩০৬] আরব থেকে বহিষ্কৃত নাজরানের ইহুদি-খ্রিস্টানেরাও কুফায় বসতি স্থাপন করেছিল। কুফার যে জায়গায় তারা থাকত তা এক সময় নাজরানিয়া নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। [cite: ১৩০৭]
প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে থেকে আরববিশ্বের মধ্যে বসরা এবং কুফা জিহাদ, জ্ঞান এবং সাহিত্যে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। এমনকি আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু নির্বাচনকেন্দ্র সরিয়ে কুফায় আনার পরে ক্ষমতাও হিজায থেকে সরে সাধারণ শহরগুলোয় চলে আসে। [cite: ১০৬৯]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে বসরা এবং কৃফা গড়ে তুলেছিলেন। এর রাস্তাগুলো ছিল প্রশস্ত যা তার চমৎকার নির্মাণশৈলীর প্রমাণ। এগুলোর ভালো তদারকি করা হতো। কুফা নগরীতে শহর আর গ্রামের সুন্দর মেলবন্ধন ছিল লক্ষণীয়। একদিকে ছিল শহুরে অবকাঠামো, আরেকদিকে গ্রামীণ উর্বর মাটি আর নির্মল বাতাসের আনাগোনা। সুস্থ ও আরামদায়ক পরিবেশ ছিল। প্রশস্ত রাস্তাগুলো ছিল কুফার ফুসফুস। আগেই বলা হয়েছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চাইতেন কুফাবাসী যেন তাঁবুতে বসবাস করে। এতে করে জায়গা বদল করা সহজ হতো এবং শত্রুদের তটস্থ রাখা যেত। তবে প্রয়োজনের সাথে তাল মিলিয়ে সেখানে ইটের ঘরবাড়িও গড়ে ওঠে। [cite: ১০৭০]

উমর রা. আশঙ্কা করতেন, মুসলিমরা আরামদায়ক এবং বিলাসবহুল জীবনে ঢুকে পড়বে
মুসলিমরা বিলাসবহুল এবং আরামের জীবনে ঢুকে পড়বে, এই ভয় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তাড়া করত। এমন ঘটতে শুরু করলে দুনিয়া এবং আখেরাতে মুসলিমদের জন্য কঠিন পরিণতি অপেক্ষা করবে। কৃফা এবং বসরায় বসতি স্থাপনের পর থেকে লোকজনের মধ্যে পুরনো অভ্যাসগুলো মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। কূফার পরে বসরাবাসীও নলখাগড়ার ঘরবাড়ি তৈরির অনুমতি চেয়ে বসেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘তাঁবু তোমাদের জন্য উত্তম। কারণ, তোমরা এখনো যুদ্ধের পরিস্থিতিতে আছ। তবে তোমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও আমি যেতে চাই না। নলখাগড়া কী জিনিস?’ তারা তাকে নলখাগড়ার বর্ণনা দিলেন। তিনি সব শুনে বললেন, ‘তোমাদের ইচ্ছা।’ সুতরাং এই দুই শহরের লোকজন নলখাগড়া দিয়ে ঘরবাড়ি বানাতে শুরু করলেন। [cite: ১০৭১]
কূফা আর বসরার ঘরবাড়িতে আগুন লেগে যায়। দুটোর মধ্যে কুফার অবস্থা বেশি ভয়াবহ ছিল। সেখানে একাধারে আশিটি বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিছুই বাঁচেনি। এই নিয়ে লোকজনের মধ্যে গুঞ্জন তৈরি হয়। তারা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে রোদ-পাকা ইটের বাড়ি বানানোর অনুমতি চাইল। সাদ তাদের আর্জি নিয়ে খলীফার কাছে লোকজন পাঠিয়ে দিলেন। খলীফার কাছে তারা তাদের পরিস্থিতি ও প্রয়োজন তুলে ধরলেন। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, তা-ই কর। তবে কারও বাড়িতে যেন তিনটির বেশি ঘর না থাকে। আর তোমরা উঁচু বাড়ি বানানোর প্রতিযোগিতায় লেগে যেয়ো না। সুন্নত আঁকড়ে থাকবে, তাতে লাভবান হবে।’ লোকজন এই বার্তা নিয়ে কূফায় ফিরে গেলেন। বসরাবাসীর জন্য উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছেও তিনি একই বার্তা লিখে পাঠালেন। বার্তাবাহককে তিনি আলাদা করে বলে দিলেন, লোকজন যেন পরিমিত পরিমাণের বাইরে উঁচু বাড়ি না বানায়। লোকটি জানতে চাইল, ‘পরিমিত পরিমাণের অর্থ কী?’ তিনি বললেন, ‘এমন পরিমাণ যা তোমাদের সীমালঙ্ঘনের ধারে-কাছে নেবে না আবার ইচ্ছাও পূরণ করবে।’ [cite: ১০৭২]
এই বর্ণনা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে তখনকার লোকজন নিজেকে প্রকাশ করা নিয়ে মোটেও মশগুল ছিল না।। তারা শুধু রোদ, বৃষ্টি, ঠান্ডা, গরম থেকে বাঁচতে মাথা গোঁজার ঠাঁই চেয়েছিল। সুরম্য প্রাসাদ বা উঁচু দালানকোঠার পরোয়া করেনি। পরিস্থিতির শিকার হয়ে তারা ইটের বাড়ি বানিয়েছিল। তার আগে নলখাগড়া সহজলভ্য ছিল বলে তারা তা দিয়েই ঘর বানিয়েছে। অন্যদিকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সৌখিন দালানকোঠা তৈরির ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এখানে আমার তার দূরদৃষ্টির প্রতিফলন দেখতে পাই। তিনি জানতেন অভিযানের পরে উম্মতের হাতে অর্থবিত্ত চলে আসবে। এগুলো পেয়ে তারা যেন বিলাসিতায় গা না ভাসায় এবং জীবনযাপনে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে, এই জন্য আগে থেকেই দিকনির্দেশনা দিয়ে দেন। বিলাসিতা আর মধ্যপন্থার মধ্যে কী পার্থক্য তিনি তা-ও স্পষ্ট করে বলে দেন। বাড়িঘর তৈরি করার প্রবণতা হলো নিজেকে জাহির করার অন্যতম পন্থা। বিলাসবহুল বাড়ি তৈরির প্রতিযোগিতায় লিপ্ত মানুষ এর পেছনে প্রচুর সময় এবং সম্পদ অপচয় করে ফেলে। কারও মাথায় একবার এসব ঢুকে গেলে এগুলো তার ধ্যানজ্ঞানে পরিণত হয়। [cite: ১০৭৩] এই কারণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার খেলাফতের সময় থেকেই মানুষের পার্থিব সমৃদ্ধি দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েন। এগুলোর পেছনে দৌড়-ঝাঁপ করা থেকে তিনি বিরত রাখার চেষ্টা করে গেছেন। তিনি সব সময় চাইতেন মানুষ যেন কম সময়ে সাদামাটা ঘরবাড়ি বানায়। আর এখন এমন এক অবস্থা এসে গেছে যখন একটা বাড়ি বানাতে বছরের পর বছর পার হয়ে যায়, লোকজন ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়ে। সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও যাকাতের জন্য একটি পয়সাও বের করতে পারে না। কারণ, প্রাসাদোপম বাড়িতে প্রতিযোগিতা করে বিলাসবহুল আসবাব এবং অন্যান্য আনুসঙ্গিক জিনিসপত্র গড়তে গিয়ে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে তাদের জীবনীশক্তি নিঃশেষ হয়ে আসে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে ইসলামের অর্থনৈতিক ফরয কাজগুলো অবহেলিত হয়। এর মধ্যে সবার আগে আসে যাকাতের কথা আর তার পরই আসে মুজাহিদদের জন্য খরচের বিষয়। পার্থিব চাহিদা মেটাতে গিয়ে নামায এবং জ্ঞান অর্জনের মতো দায়িত্ব থেকেও তারা সরে আসে। [cite: ১০৭৪]

‘এমন পরিমাণ যা তোমাদের সীমালঙ্ঘনের ধারে-কাছে নেবে না আবার ইচ্ছাও পূরণ করবে’
এই কথার একটাই অর্থ, ইসলাম অতটুকু পরিমাণে বাড়ি তৈরির অনুমতি দেয় যতটুকু তৈরি করলে অপচয় হবে না এবং ইসলামে বর্ণিত মধ্যমপন্থার সীমা লঙ্ঘন করবে না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতেন অঞ্চলভেদে অপচয়, মধ্যমপন্থা এবং কৃপণতার সংজ্ঞা একেক রকম। তাই তিনি এ পরিমাণ নির্দিষ্ট করে বলে দেননি। তাই যে কোনো দেশের প্রথা অনুসারে একজন ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তি মধ্যমপন্থা হিসেবে যা অবলম্বন করে তাকে পরিমিত হিসেবে গণ্য কার যেতে পারে। [cite: ১০৭৫]

‘সুন্নত আঁকড়ে থাকবে, বিজয়ী হবে’
এর অর্থ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত আঁকড়ে থাকলে সে মানুষের ওপরে বিজয়ী হবে, সেই সাথে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাও পাবে। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন:
وَ عَدَ اللهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصُّلِحَتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَلَيُمَكِّنَنَّ لَهُمْ دِينَهُمُ الَّذِي ارْتَضَى لَهُمْ وَلَيُبَدِّلَنَّهُمْ مِنْ بَعْدِ خَوْفِهِمْ أَمْنًا يَعْبُدُونَنِي لَا يُشْرِكُونَ بِي شَيْئًا وَ مَنْ كَفَرَ بَعْدَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفُسِقُونَ
তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন। যেমন তিনি শাসনকর্তৃত্ব দান করেছেন তার পূর্ববর্তীদের এবং তিনি অবশ্যই তাদেরকে শান্তি দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে এবং আমার সাথ কাউকে শরিক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে তারাই অবাধ্য। [cite: ১০৭৬]
তৎকালীন মুসলিমরা কে কতটা সংযমী জীবনযাপন করতে পারেন এবং পার্থিব চাহিদা বর্জন করতে পারেন-এ প্রতিযোগিতা করতেন। তা সত্ত্বেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পার্থিব চাহিদা বাদ দিতে উৎসাহ প্রদান করে গেছেন। তাহলে পরবর্তী সময়ে যারা পার্থিব প্রতিযোগিতায় মত্ত হয়ে গেছে তাদের কী অবস্থা হবে? তাছাড়া উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জাগতিক আসবাব জমিয়ে রাখার প্রবণতাও নিজের হাতে প্রতিহত করতেন। পারস্য এবং বাইজেন্টাইনের কিছু অংশ বিজয়ের পরে আল্লাহর তা’আলা হুকুমে গনিমতের মালামাল এবং বিজিত অঞ্চলের কর থেকে মুসলিমদের হাতে প্রচুর অর্থবিত্ত এসে পড়ে। তিনি একটি হৃদয়গ্রাহী খুতবার মাধ্যমে এই নতুন পরিস্থিতির ব্যাখ্যা এবং সে সময়ে মুসলিমদের কর্তব্য উল্লেখ করেছিলেন।
তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তোমাদের জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা ফরয করেছেন। কেন তা করবে তিনি এর প্রমাণও দিয়ে রেখেছেন। যেমন, তোমরা না চাইতেই তিনি তোমাদের দুনিয়া এবং আখেরাতের সম্মানজনক রাস্তা দেখিয়েছেন। শূন্য থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন। তিনি চাইলে তোমাদের নিকৃষ্ট করেও তৈরি করতে পারতেন। অথচ তার সব সৃষ্টিকে কেবল তোমাদের জন্যই তৈরি করেছেন এবং তোমাদের তৈরি করেছেন কেবল তার নিজের জন্য। জলে-স্থলে যা কিছু আছে তিনি সবকিছুকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন এবং তার সব নেয়ামত দিয়ে দিয়েছেন যেন তোমরা তার শোকর করতে পার। তিনি তোমাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি দান করেছেন। তিনি তার কিছু নেয়ামত সমস্ত আদম-সন্তানের মধ্যে ভাগ করে দেয়েছেন আর বাকি সবকিছু দিয়েছেন কেবল তোমাদের ধর্ম অনুসারীদের। আর এখন তো তার সব নেয়ামতের নিয়ন্ত্রণ তোমাদের হাতে। তিনি কোনো একজন মানুষকে নির্দিষ্ট করে কোনো নেয়ামত দেননি। তার একটিমাত্র নেয়ামতও যদি সবার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো তার পরেও সবাই মিলে এর উপযুক্ত শোকর আদায় করতে পারবে না। আর আল্লাহ তা’আলার সাহায্য ছাড়া এবং আল্লাহ তা’আলা ও তার রাসূলের প্রতি বিশ্বাস না করলে তোমরা ধন্যবাদও দিতেও অক্ষম। তোমরা এই রাষ্ট্রের ক্ষমতা পেয়েছ। এর লোকেরা তোমাদের আজ্ঞাবহ। আল্লাহ তা’আলা তোমাদের ধর্মকে সাফল্য দান করেছেন। এখন শুধু দুই শ্রেণির লোক রয়ে গেছে; একদল ইসলাম এবং মুসলিমদের অধীনস্থ, তারা তোমাদের জন্য তাদের সম্পদ থেকে যথাসাধ্য জিযিয়া প্রদান করছে, পরিশ্রম করছে এবং তোমাদের সুবিধা দিয় যাচ্ছে। আর আরেক দল দিন-রাত সারাক্ষণ আল্লাহর হুকুমের ভয়ে ভীত, তাদের অন্তর ভয়ে কাঁপছে; আল্লাহ তা’আলার সেনাদল যে কোনো সময় ঝাঁপিয়ে পড়বে, তাদের দেশ দখল করে নেবে। তাদের পালানোর বা লুকানোর কোনো জায়গা নেই।
সুতরাং সম্পদের প্রাচুর্য, বিজয়ের ধারাবাহিকতা, আল্লাহর হুকুমে সুরক্ষিত সীমান্ত, ইসলামের শুরু থেকেই অভূতপূর্ব সুন্দর জীবনযাপন এবং প্রত্যেকটি ভূখণ্ড বিজয়ের জন্য আল্লাহ তা’আলার প্রশংসা করতেই হবে। এমন অসংখ্য নেয়ামতের জন্য আমাদের কেমন কৃতজ্ঞ হওয়া দরকার? একমাত্র আল্লাহ তা’আলার সাহায্য ছাড়া উপযুক্ত ধন্যবাদ জ্ঞাপনের কারও কোনো ক্ষমতাই নেই। আমরা আল্লাহ তা’আলার কাছে দুআ করছি যিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই-তিনি যেন আমাদের দয়া করে তাকে মেনে চলার তাওফীক দেন এবং সর্বদা তাকে সন্তুষ্ট করার সুযোগ দেন। হে আল্লাহর বান্দারা, তোমাদের প্রতি আল্লাহ তা’আলার অনুগ্রহের কথা মনে রাখবে এবং তার সব নেয়ামতের জন্য প্রশংসা করবে। আল্লাহ তা’আলা মূসা আলাইহিস সালামকে বলেছেন: أَنْ أَخْرِجُ قَوْمَكَ مِنَ الظُّلُمَتِ إِلَى النُّوْرِ وَذَكِّرْهُمْ بِأَيْمِ اللَّهِ স্বজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোয় আনুন এবং তাদেরকে আল্লাহর দিনসমূহ স্মরণ করান। [cite: ১০৭৭]
এবং তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লামকে বলেছেন: وَاذْكُرُوا إِذْ أَنْتُمْ قَلِيلٌ مُّسْتَضْعَفُونَ فِي الْأَرْضِ আর স্মরণ কর যখন তোমরা ছিলে অল্প, পরাজিত অবস্থায় পড়েছিলে দেশে। [cite: ১০৭৮]
ঈমানের শাখা আঁকড়ে ধরা, তাতে বিশ্বাস রাখা ও এর মধ্যেই আনন্দ খুঁজে নেওয়া, আল্লাহ ও তার ধর্মের জ্ঞান অর্জন এবং আখেরাতের আশা করে যদি দুর্বল হয়ে পড় এবং এই পার্থিব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে যাও, তা-ও ভালো। তোমরা কিন্তু কঠিন জীবনযাপন করছিলে এবং আল্লাহ সম্পর্কেও অজ্ঞ ছিলে। আল্লাহ তা’আলা যদি তোমাকে শুধুমাত্র ইসলাম দিয়ে থাকেন এবং এর মধ্যে কোনো পার্থিব সুযোগ সুবিধা না-ও থাকে, তারপরেও এর মধ্যে আখেরাতের সুখবর রয়েছে। আর আখেরাতই সবার গন্তব্য। মুসলিম হওয়ার আগে তোমরা যেমন কঠিন জীবন পার করছিলে, এখনো যদি তেমন জীবনযাপন কর, তা-ও ইসলাম আঁকড়ে থাকবে এবং এর পক্ষে থাকতে হবে। এখন ভেবে দেখ, তোমাদের যখন দুনিয়া ও আখেরাতের শ্রেষ্ঠ জিনিস দেওয়া হচ্ছে, তখন কে এগুলো না চাইবে? তোমাদের মনে করিয়ে দিতে চাচ্ছি, আল্লাহ তা’আলা তোমাদের অন্তরের খবর জানেন। সুতরাং তোমাদেরও উচিত তার হক সম্পর্কে জানা, তার জন্য সংগ্রাম করা এবং তার অনুগত থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। তার রহমতের মধ্যে আনন্দ খুঁজে নাও। সেই সাথে এই ভয়ও করো যে, তা তিনি যে কোনো মুহূর্তে ফিরিয়ে নিতে পারেন। আল্লাহ তা’আলা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন আমি যেন তোমাদের ভালো কাজের আদেশ দিই এবং মন্দ কাজে নিষেধ করি। [cite: ১০৭৯]

আল-ফুস্তাত
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু কুফার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। একইভাবে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে ফুস্তাত শহরের গোড়পত্তন ঘটে। আলেকজান্দ্রিয়া বিজয়ের পরে তিনি সেখানেই থেকে যেতে চাচ্ছিলেন। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কাছে লিখলেন, ‘আমার আর আপনার মধ্যে যেন পানি না থাকে। তাহলে আপনার কাছে আসতে পারব।’ সুতরাং তিনি যা তার চমৎকার নির্মাণশৈলীর প্রমাণ। ফুস্তাতে চলে গেলেন। [cite: ১০৮০]
সেখানে গিয়ে তিনি সবার আগে একটি মসজিদ তৈরি করেন—যেমনটি আলেকজান্দ্রিয়ায় করেছিলেন। তার নামে মসজিদের নাম রাখা হয়। এর পরে উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য একটি বাড়ি বানালেন। সম্ভবত খলীফাদের থাকার জন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল। পরে অবশ্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ওই বাড়িটিকে মুসলিমদের জন্য বাজারে পরিণত করার নির্দেশ দেন। [cite: ১০৮১] আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু মসজিদের কাছে নিজের জন্য দুটি বাড়ি তৈরি করেছিলেন। ইবনে আব্দুল হাকিম থেকে বর্ণিত, মসজিদের দোরগোড়ায় আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু তার প্রথম বাড়ির ভিত স্থাপন করেছিলেন। এগুলোর মধ্য দিয়ে যে রাস্তা চলে গেছে, তার আরেক পাশে আরেকটি বাড়ি ছিল। [cite: ১০৮২] একটি বাড়ি ছিল তার নিজের থাকার জন্য। আরেকটি বাড়ি তিনি হয়তো প্রশাসনিক কাজের জন্য তৈরি করেছিলেন। তবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশে দ্বিতীয়টি ভেঙে ফেলা হয়।
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু কয়েকজন সাহাবায়ে কেরামকে প্রতিনিধির পদে নিযুক্ত করেন। তারা তার সাথেই থাকতেন। প্রত্যেক গোত্রের জন্য আলাদা আলাদা আবাসন ব্যবস্থা করে দেন। অনেকটা এ যুগের কোয়ার্টারের মতো। তবে সেগুলোর পরিসর খুব বড় ছিল না। তাই গোত্রগুলোর মধ্যে যাতায়াতের জন্য বড় কোনো রাস্তার দরকার পড়েনি। এক কোয়ার্টার থেকে আরেকটায় যাওয়ার জন্য ফুটপাতের মতো সরু পথ ছিল। মুয়াবিয়া ইবনে খাদীজ আত-তাজেবী, শারীক ইবনে সুম্মি আল-গুতায়ফী, আমর ইবনুল মাহরাম আল-খাওলানী এবং হুয়াইল ইবনে নাশিরা আল-মুআফিরী রাযিয়াল্লাহু আনহুম সেখানে থাকতেন। তারা ২১ হিজরীতে গোত্রগুলোর জন্য আলাদা জায়গা বরাদ্দ করে দেন। [cite: ১০৮৩] জায়গার অভাবে এখানে সবগুলো গোত্রের নাম উল্লেখ করা সম্ভব নয়, তাই অল্প কয়েকটির নাম দেওয়া হলো: আসলাম, আল-লায়তুন, বনি মুআয, বালি, বনি বাহর, মাহরান, লাখম, গাফিক, আস-সামাফ, হাদরামাওত, তাজীব, খাওলান, মুযহাজ, মুরাদ, ইয়াফী, মুআফির এবং আল-আশআরীঊন। [cite: ১০৮৪] এই নামগুলো থেকে গবেষকেরা বুঝতে পারবেন যে, মিসর বিজয়ে আরব এবং অনারবসহ নানা গোত্রের অবদান রয়েছে। এই গোত্রগুলোর জন্যই কোয়ার্টার তৈরি হয়েছিল। স্বাধীনভাবে নিজেদের কাজ পরিচালনার জন্য প্রত্যেক গোত্র আলাদা জায়গা দাবি করে। সুতরাং তাদের জন্য আলাদা আলাদা জায়গা বরাদ্দ করে দিয়ে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। [cite: ১০৮৫]
প্রত্যেক কোয়ার্টারের মাঝখানে একটা করে মসজিদ তৈরি করা হয়। ইবনে যাহীরার আল-ফাদাইল আল-বাহিরা ফী মাহাসিন মাসর ওয়া আল-কহিরা কিতাবে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এখানে তিনি ইবনে যাওলাকের বর্ণনায় আল-ফুস্তাতের প্রাচীন মসজিদের কথা উল্লেখ করেছেন। সেখানে বলা হয়েছে যে, আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মসজিদটি সবার আগে তৈরি করা হয়েছিল। বাকি মসজিদগুলোও এককজনের নামানুসারে নামকরণ করা হয়। [cite: ১০৮৬] এরপরে তিনি উল্লেখ করেছেন: উপর্যুক্ত মসজিদ ছাড়াও মিসর বিজয়ের সময় সাহাবায়ে কেরাম আরও দুশো তেত্রিশটি মসজিদ তৈরি করেন। প্রত্যেক গোত্রের মানুষদের স্থান সংকুলানের জন্য সেগুলো তৈরি করা হয়েছিল। [cite: ১০৮৭]
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু খুব সুন্দরভাবে জায়গা বরাদ্দ করতেন। তিনি এমনভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন যেন খেলাফতনগরের সাথে তো বটেই, রাষ্ট্রের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সাথেও এই অঞ্চল থেকে সহজে যোগাযোগ রক্ষা করা যায়। এর খুব কাছেই ছিল নীলনদ। [cite: ১০৮৮]

প্রত্যেক বিজিত অঞ্চলে সেনানিবাস স্থাপন
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রত্যেকটি বিজিত অঞ্চলে সেনানিবাস স্থাপন করেছিলেন, বিশেষ করে সিরিয়ায়। প্রত্যেক নগরে সেনা ব্যারাক করা হয়, সেখানে ঘোড়ার আস্তাবলও থাকত। প্রত্যেক আস্তাবলে কমপক্ষে চার হাজার ঘোড়া সব রকমের যুদ্ধোপকরণসহ প্রস্তুত থাকত। [cite: ১০৮৯] ফলে সেনাপতিরা যেকোনো জরুরী অবস্থায় ছুটতে সক্ষম ছিলেন এবং ন্যূনতম সময়ে কেবল সিরিয়া থেকেই ছত্রিশ হাজার সেনাসহ যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছা সম্ভব হতো। ঘোড়া চরানোর সুবিধার্থে চারণভূমির কাছাকাছি সেনা ব্যারাক গড়ে তোলা হয়েছিল। ঘোড়াগুলোর ঊরুতে জায়শ ফী সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর জন্য সেনাদল) লেখা থাকত। আর এটি লেখার কারণ ছিল এই আয়াত: وَ أَعِدُّوا لَهُمْ مَّا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ وَ مِنْ رِبَاطِ الْخَيْلِ تُرْهِبُونَ بِهِ عَدُوَّ اللَّهِ وَعَدُوَّكُمْ وَاخَرِينَ مِنْ دُونِهِمْ لَا تَعْلَمُونَهُمْ اللَّهُ يَعْلَمُهُمْ আর প্রস্তুত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যাই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যের মধ্যে থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে, যেন প্রভাব পড়ে আল্লাহর শত্রুদের উপর এবং তোমাদের শত্রুদের উপর আর তাদেরকে ছাড়া অন্যান্যদের উপর ও যাদেরকে তোমরা জান না; আল্লাহ তাদেরকে চেনেন। [cite: ১০৯০]

সিরিয়ার সেনানিবাসসমূহ
সিরিয়ায় অবস্থিত সেনানিবাসসমূহের বর্ণনা দেওয়া হলো:
দামেস্কের সেনানিবাস: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময় ইয়াযীদ ইবনে আবি সুফিয়ান, সুয়ায়দ ইবনে কুলসূম এবং মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুম সেনানিবাসের নেতৃত্ব দেন।
হিমসের সেনানিবাস: প্রথমে উবায়দা আমির ইবনুল জাররা, অতঃপর উবাদা ইবনুস সামিত, অতঃপর সাম ইবনে আমির ইবনে হুযায়ম, অতঃপর উমায়র ইবনে সাম, অতঃপর আব্দুল্লাহ ইবনে করাত রাযিয়াল্লাহু আনহুম নেতৃত্ব দেন।
কিন্নাসরীনের সেনানিবাস: প্রথমে খালীদ ইবনে ওয়ালিদ, অতঃপর উমায়র ইবনে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুম নেতৃত্ব দেন।
ফিলিস্তিনের সেনানিবাস: প্রথমে ইয়াযীদ ইবনে আবি সুফিয়ান, অতঃপর আলকিমা ইবনে মাজযায রাযিয়াল্লাহু আনhুম নেতৃত্ব দেন।
জর্ডানের সেনানিবাস: তাইবেরিয়াসের মধ্যবর্তী এলাকায় প্রথমে শূরাহবীল ইবনে হাসানা, অতঃপর ইয়াযীদ ইবনে আবি সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুম দামেস্ক এবং জর্ডানে নেতৃত্ব দেন। আমওয়াসের প্লেগে ইয়াযীদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকাল হলে এই অঞ্চলের গ্যারিসনের দায়িত্ব চলে আসে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে। [cite: ১০৯১]
সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়ীনগণ কেবলমাত্র জিহাদ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিলাভের আকাঙ্ক্ষায় এই শহরগুলোতে থাকতে আসেন। তাই এই শহরগুলো সুগুর (ফাঁড়ি) নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। এখান থেকেই ইসলামের প্রচার-প্রসার ঘটেছে, আল্লাহর জন্য জিহাদ পরিচালিত হয়েছে, কুরআন এবং হাদীস শেখানো হয়েছে। এক সময় মদীনা, বসরা, কুফা, দামেস্ক এবং আল-ফুস্তাত মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। জ্ঞান অর্জন হোক কিংবা জিহাদ, সেনাবাহিনীতে নাম লেখানোর জন্য হোক কিংবা ভাতা, ব্যবসা হোক কিংবা নতুন নতুন কাজে দক্ষতা অর্জন- সবক্ষেত্রে এই শহরগুলোয় লোকজন আসতে শুরু করে। সুতরাং এগুলো সংস্কৃতি ও উন্নয়নে শীর্ষস্থান দখল করে। কালক্রমে সেখানে জ্ঞানের বিস্তার ঘটেছে এবং বিভিন্ন ধরনের পেশা ও কারিগরি দক্ষতার উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। [cite: ১০৯২]

টিকাঃ
১০৩৯. মিসরের এক ধরনের কাপড় যা কিবত জাতি তৈরি করত।
১০৪০. আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, ড. আকরাম জিয়া আল-উমারি, পৃ. ২২৮।
১০৪১. নিদহাম আল-হুকমা আল-ইসলামিয়া, ড. আব্দুল্লাহ কাদিরি, ২/১৮৬; আস-সুলতাত আত-তানফীদিয়া, ১/৩৮৯।
১০৪২. আল-মুজতামা আল-ইসলামি, মুহাম্মাদ আবু আজওয়া, পৃ. ১০৯।
১০৪৩. আসর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, ড. আকরাম জিয়া আল-উমারি, পৃ. ২২৮।
১০৪৪. আশহার মাশাহীর আল-ইসলাম, ২/৩৪৩; আল-ইদারা আল-আস্কারিয়া, ড. সুলাইমান কামাল, ২/৫৫৩।
১০৪৫. আশহার মাশাহীর আল-ইসলাম, ২/৩৪৩।
১০৪৬. তারীখ আদ-দাওয়া আল-ইসলামিয়া, ড. জামীল আল-মাসরি, পৃ. ৩৪৩।
১০৪৭. আশহার মাশাহীর আল-ইসলাম, ২/৩৪৪।
১০৪৮. প্রাগুক্ত, ২/৩৪৪-৩৩৫।
১০৪৯. তারীখ আদ-দাওয়া আল-ইসলামিয়া, ড. জামীল আল-মাসরি, পৃ. ৩৪৩-৩৪৪।
১০৫০. আল-ইদারা আল-আস্কারিয়া, ড. সুলাইমান কামাল, ২/৫৫৮।
১০৫১. সিরত হচ্ছে এমন এক শহর যা লিবিয়া এবং তিউনিসিয়ার মাঝামাঝি অবস্থিত।
১০৫২. আল-ইদারা আল-আস্কারিয়া, ড. সুলাইমান কামাল, ২/৬৫৫।
১০৫৩. প্রাগুক্ত, ২/৫৬৩-৫৬৪।
১০৫৪. ফুতুহ আল-বুলদান, আল-বালাযুরি, পৃ. ১৩৭; আল-ইদারা আল-আস্কারিয়া, ড. সুলাইমান কামাল, ২/৫৬৪।
১০৫৫. আল-ইকতিফা, ৩/৩২০।
১০৫৬. ফুতুহ আল-বুলদান, পৃ. ৩৪৫, ৩৪৬; আল-ইকতিফা, আল-কালাই, ৩/৩১৯-৩২০।
১০৫৭. ফুতুহ আল-বুলদান, পৃ. ৩৪৪, ৩৪৭; আল-ইকতিফা, আল-কালাই, ৩/৩২২-৩২৩।
১০৫৮. আল-ইকতিফা, ৩/৩২৩; সিয়াসাত আল-মাল ফীল ইসলাম, আব্দুল্লাহ জামআন, পৃ. ১৭৩।
১০৫৯. ফুতুহ আল-বুলদান, পৃ. ৩৪৭।
১০৬০. ইকতিসাদিয়াত আল-হারব ফীল ইসলাম, ড. গাযী ইবনে সালিম, পৃ. ২৪৭।
১০৬১. প্রাগুক্ত।
১০৬২. প্রাগুক্ত।
১০৬৩. প্রাগুক্ত।
১০৬৪. ফুতুহ আল-বুলদান, পৃ. ২৬৬; দিরাসাত ফী তারীখ আল-মুদুন আল-আরাবিয়া আল-ইসলামিয়া, ড. আব্দুল জাব্বার নাজি, পৃ. ১৭৯।
১০৬৫. আল-ইকতিফা, আল-কালাই, ৩/২৫০।
১০৬৬. আল-মাদাইন পারস্যের সম্রাট খসরুর রাজধানী।
১০৬৭. প্রাগুক্ত।
১০৬৮. আল-মাদাইন ইরাকের একটি শহর।
১০৬৯. আল-ইকতিফা, আল-কালাই, ৩/২৫২।
১০৭০. ইকতিসাদিয়াত আল-হারব ফীল ইসলাম, ড. গাযী ইবনে সালিম, পৃ. ২৪৮।
১০৭১. আল-ইকতিফা, আল-কালাই, ৩/২৫১।
১০৭২. প্রাগুক্ত, ৩/২৫২; তারীখ আত-তাবারি, ৫/২১৬।
১০৭৩. প্রাগুক্ত।
১০৭৪. প্রাগুক্ত।
১০৭৫. প্রাগুক্ত।
১০৭৬. প্রাগুক্ত।
১০৭৭. প্রাগুক্ত।
১০৭৮. প্রাগুক্ত।
১০৭৯. প্রাগুক্ত।
১০৮০. ফতহে মিসর, আব্দুল হাকাম, পৃ. ৪২।
১০৮১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৫।
১০৮২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৯৬।
১০৮৩. আল-ইকতিফা, আল-কালাই, ৩/৩০১-৩০২।
১০৮৪. ফতহে মিসর, আব্দুল হাকাম, পৃ. ৯৮-১১২।
১০৮৫. আল-ইকতিফা, আল-কালাই, ৩/৩০১।
১০৮৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯।
১০৮৭. প্রাগুক্ত।
১০৮৮. ইকতিসাদিয়াত আল-হারব, ড. গাযী ইবনে সালিম, পৃ. ২৪৮।
১০৮৯. ফুতুহ আল-বুলদান, পৃ. ১৫১।
১০৯০. প্রাগুক্ত।
১০৯১. আল-ইকতিফা, আল-কালাই, ৩/৩১৬।
১০৯২. ইকতিসাদিয়াত আল-হারব, ড. গাযী ইবনে সালিম, পৃ. ২৫২।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 অর্থনৈতিক সংকট

📄 অর্থনৈতিক সংকট


উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে ইসলামী রাষ্ট্র বেশ কয়েকটি পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছিল। জাতি-গোষ্ঠী, রাষ্ট্র, জনসাধারণ এবং সমাজকে এক সময় না এক সময় এগুলোর ভেতর দিয়ে যেতে হয়। মুসলিম উম্মতকেও এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। কারণ, আল্লাহর আইনের কোনো বিকল্প নেই, আর না কোনো পরিবর্তন আছে। দুর্ভিক্ষ এবং আমওয়াস বা প্লেগের বছর ছিল এমনই পরীক্ষার বছর। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এসময় কীভাবে কঠিন সমস্যাগুলো মোকাবিলা করেছিলেন, কীভাবে আল্লাহ তা’আলার কাছে আকুতি জানিয়েছেন এবং তার সাহায্য চেয়েছেন এই অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে। [cite: ১০৯৩]
১৮ হিজরীর ঘটনা। পুরো আরব উপদ্বীপ ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এবং খরার কবলে পড়ে যায়। ক্ষুধার যন্ত্রণায় বন্য পশু পর্যন্ত শহরে চলে আসে। খাদ্যের অভাবে পালে পালে গবাদিপশু মরতে শুরু করে। হাড্ডিসার ভেড়াগুলো জবাইয়ের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। এই বছরটি আর-রমাদার বছর নামে পরিচিত। কারণ, বাতাসে ছাইয়ের (আর-রমাদ) মতো বালি উড়তে দেখা যেত। খরার প্রকোপে খাদ্যসংকট প্রকট হয়ে পড়ে। লোকজন দূরদূরান্তের মরুভূমি থেকে মদীনায় এবং এর কাছাকাছি অঞ্চলে এসে থাকতে শুরু করে। সবাই খলীফার সাহায্যের আশায় ভিড় করতে থাকে। এই বিপদের সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন তা বলা বাহুল্য। তিনি তার বিশাল দায়িত্ব সম্পর্কেও অবহিত ছিলেন। [cite: ১০৯৩] এমন বিপদে তিনি যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছিলেন এখানে সেগুলোর বর্ণনা দেওয়া হলো:

৫.২.১। মানুষের সামনে নিজের নযীর স্থাপন করলেন
দুর্ভিক্ষের বছর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সামনে ঘী মাখা রুটি পরিবেশন করা হয়েছিল। তিনি একজন বেদুইনকে সাথে নিয়ে খেতে বসেন। প্রত্যেক লোকমা মুখে দেওয়ার পরে লোকটি আঙুল দিয়ে মুছে মুছে ঘী খাচ্ছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘মনে হচ্ছে অনেকদিন ঘী খাওয়া হয়নি।’ বেদুইন বলল, ‘অমুক সময়ের পর থেকে এ পর্যন্ত আমি ঘী বা যয়তুন তেল খাইনি, এমনকি কাউকে খেতেও দেখিনি।’ এই কথা শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কসম করে বসলেন যে, দুর্ভিক্ষ দূর না হওয়া পর্যন্ত এবং মানুষের জীবন স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তিনি ঘী বা গোশত মুখে তুলবেন না। বর্ণনাকারীরা সবাই তার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। [cite: ১০৯৪]
এর উদাহরণ হিসেবে এই ঘটনাটি উল্লেখ করা যেতে পারে। মদীনার বাজারে চামড়ার এক মশকভর্তি দই ও ঘী এসেছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খাদেম চল্লিশ দিরহাম দিয়ে তা কিনে আনেন। এগুলো পরিবেশন করে সে বলতে লাগল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহ তা’আলা আপনার শপথ পূর্ণ করেছেন এবং এজন্য আপনি অনেক বড় পুরস্কার পাবেন। বাজারে কিছু দই ও ঘী এসেছে। আমি আপনার জন্য তা চল্লিশ দিরহাম দিয়ে কিনে এনেছি।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘এগুলোর দাম খুব বেশি; সদকা করে দাও, কারণ, আমি বিলাসিতা করে কিছু খেতে চাচ্ছি না।’ অতঃপর বললেন, ‘মানুষের কষ্টই যদি তাদের মতো করে না বুঝি তবে তাদের খেয়াল রাখব কীভাবে?’ [cite: ১০৯৫]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই বক্তব্য মানবসভ্যতার ইতিহাসে শাসননৈপুণ্যের যে নীতি ফুটে উঠেছে তা বিরল। সত্যিই তো, সাধারণ মানুষের কষ্ট না বুঝলে তাদের প্রতি যত্নশীল হওয়া কি আদৌ সম্ভব? [cite: ১০৯৫]
আর-রমাদার বছর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওপরেও বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল। তার ত্বকের রঙ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যায়। ইয়াদ ইবনে খলীফা থেকে বর্ণিত, আর-রমাদার বছর আমি উমরের চেহারা দেখেছি। তার মুখ কালো হয়ে গিয়েছিল। তিনি ঘী-দই খাওয়া আরব ছিলেন। অথচ দুর্ভিক্ষের সময় এগুলো থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন। অনেক ক্ষুধা লাগার পরে তিনি খেতে বসতেন এবং যয়তুন তেল খেতেন। [cite: ১০৯৬] এক পর্যায়ে তার শরীরের রঙ নষ্ট হয়ে যায়।’ বর্ণিত আছে, আসলাম বলেছিলেন, ‘আমরা উমরকে নিয়ে ভয়ে ছিলাম। কারণ, আল্লাহ তা’আলা সে বছর দুর্ভিক্ষ দূর না করলে মুসলিমদের চিন্তায় তিনি হয়তো ইন্তেকাল করতেন।’ [cite: ১১০১]
আর-রমাদার বছরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু টানা রোযা রাখতেন আর যায়তুন তেলে ভেজানো সামান্য রুটি দিয়ে ইফতার করতেন। সাধারণ মানুষের জন্য একদিন একটি উট জবাই করেছিলেন। লোকেরা ভালো অংশগুলো তার জন্য তুলে রাখে। তার সামনে উটের কলিজা এবং কুঁজ পরিবেশন করতে দেখে তিনি জানতে চাইলেন, ‘এগুলো কোত্থেকে এসেছে?’ তারা বললেন, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আমরা আজ যে উটটি জবাই করলাম, সেখান থেকে।’ তিনি বলে উঠলেন, ‘না, না, মানুষের জন্য হাড় রেখে উটের উৎকৃষ্ট অংশ খেলে আমার মতো নিকৃষ্ট শাসক আর কে হবে? এই থালা নিয়ে যাও, অন্য খাবার নিয়ে এসো।’ অতঃপর তার সামনে রুটি আর তেল আনা হলো। তিনি রুটি ছিঁড়ে তেলে ডুবিয়ে খেতে খেতে বললেন, ‘তোমাকে অভিশাপ, হে ইয়ারফা [cite: ১০৯৮]! ইয়াসমাগের বাড়িতে থালাটি পৌঁছে দাও, তিনদিন হলো তাদের ওখানে যেতে পারছি না। তাদের বাড়িতে খাওয়ার কিছু নেই বলে মনে হচ্ছে, ওদের বাড়িতে এগুলো দিয়ে এসো।’ [cite: ১০৯৯]
এমন ছিলেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থাও এমন শৈল্পিক। এখানে একজন শাসক নিজের আগে মানুষের মুখে ভালো খাবার তুলে দিতে উদ্যত হন। যদিও মানুষের তুলনায় তার দায়-দায়িত্বের বোঝা অনেক বেশি, তাদের তুলনায় তাকে বেশি কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। তা সত্ত্বেও তিনি পরিবারের সব সদস্যসহ নিজে কঠিন জীবন-যাপন করে গেছেন। সাধারণ মানুষের তুলনায় তার পরিবার অনেক বেশি কষ্ট করতেন। আর-রমাদার সময়ে তিনি তার ছেলের হাতে তরমুজ দেখে বলেছিলেন, ‘না, না, হে আমীরুল মুমিনীনের সন্তান, উম্মতে মুহাম্মদী যেখানে না খেয়ে দিন পার করছে সেখানে তুমি ফল খাবে?’ ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গেল। এই ফলের উৎস সম্পর্কে না জানা পর্যন্ত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শান্তি পাচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি তার জবাব পান, তার ছেলে এক মুঠো খেজুরের বিনিময়ে তরমুজটি কিনেছিল। [cite: ১১০০]
আল্লাহর উপস্থিতিতে শাসনভার পরিচালনা করা নিয়ে তিনি খুব তটস্থ থাকতেন। বৃষ্টিপাতের অভাব এবং দুর্ভিক্ষ সামাল দিতে গিয়ে তিনি জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক যা যা পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব তার সবকিছুই সাধ্যমতো করে গেছেন। তিনি একটানা নামায আদায় করতেন এবং ক্ষমাপ্রার্থনা করতেন। এবং মুসলিমদের খাওয়ানো নিয়ে উদগ্রীব থাকতেন। তারা কি নিজের মানুষ, মদীনার না অন্য মরুভূমির তা বিচার করতেন না। যথাসাধ্য সমস্যার মোকাবিলা করতেন। কাজ শেষে নিজেকে কঠিনভাবে যাচাই করতে বসতেন। তার অবস্থা দেখে তার কাছের লোকেরা তাই একবার বলেই ফেলেছেন, ‘আল্লাহ তা’আলা সে বছর দুর্ভিক্ষ দূর না করলে, মুসলিমদের চিন্তায় তিনি হয়তো ইন্তেকাল করতেন।’ [cite: ১১০১]

৫.২.২। দুর্ভিক্ষের বছর তিনি শরণার্থী শিবির তৈরি করলেন
আবু আসলাম থেকে বর্ণিত, দুর্ভিক্ষের বছর সব দিকে থেকে আরবরা দলে দলে মদীনায় এসে জড়ো হতে লাগল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের দেখাশোনার জন্য লোক নিয়োগ করেন। এক রাতে আমি তাকে বলতে শুনলাম, ‘গুনে দেখ আমাদের সাথে কয়জন খেতে বসেছে।’ তারা গুনে দেখল সেখানে সাত হাজার লোক ছিল। অসুস্থ এবং শিশু মিলে মোট চল্লিশ হাজার লোক হয়েছিল। কিছুদিন পরে শিশুসহ ষাট হাজার লোক হয়ে যায়। অল্প কয়দিনের মধ্যেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বৃষ্টি দিলেন। বৃষ্টির পরে দেখলাম তিনি শরণার্থীদের মরুভূমিতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য লোক নিয়োগ করেছেন। তাদের সাথে খাবার এবং ভেড়াও দিয়ে দেন। তবে ততদিনে মৃত্যু তাদের কড়া নাড়তে শুরু করেছিল। আমার মতে, তখন দুই-তৃতীয়াংশ লোক মারা গিয়েছিল। লোকজন শেষরাতে উঠে উমরের হাঁড়ি-পাতিল চড়িয়ে দিত। এগুলোতে সুরুয়া আর এক ধরনের রুটি বানানো হতো। [cite: ১১০২] উমর তার কর্মীদের মধ্যে কাজ ভাগ করে দেন। শরণার্থীদের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন। এই প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা জানতেন কার কী দায়িত্ব এবং একে অন্যের কাজের কোনো রকম পুনরাবৃত্তি করত না। [cite: ১১০৩] খরা আর দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে খাবারের খোঁজে যারা মদীনায় আসত তাদের খোঁজখবর রাখার জন্য একদল লোক নিয়োজিত ছিলেন। খাবার বিলি-বণ্টনও তারাই করতেন। সন্ধ্যা হলে খলীফার কাছে তাদের কাজের বর্ণনা দিতে হতো এবং তার কাছ থেকে তারা পরবর্তী নির্দেশনা বুঝে নিতেন। [cite: ১১০৪]
দার আদ-দাকিক ছিল অন্যতম অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বেদুইনেরা যখন খাবারের খোঁজে মদীনায় এসে ভীড় করছিল তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই প্রতিষ্ঠান থেকে সবার জন্য আটা, সাওয়ীক, খেজুর এবং কিশমিশ সরবরাহ করেন। তখনো মিসর, সিরিয়া এবং ইরাক থেকে খাবার আমদানী শুরু হয়নি। দার আদ-দাকীক ক্রমশ সম্প্রসারিত হয়। বৃষ্টিপাত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত যতদিন সবার অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি, ততদিন পর্যন্ত টানা নয় মাস দশ হাজার মানুষের খাবার এখান থেকেই সরবরাহ করা হয়েছিল। [cite: ১১০৫]
অর্থনৈতিক হোক কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান, এগুলো গড়ে তোলার প্রয়াস থেকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি ক্যাম্পে উপস্থিত থেকে নিজ হাতে কাজ করতেন। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘আল্লাহ তা’আলা ইবনে হান্তামাকে (উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে) রহম করুন। আর-রমাদার বছর, আমি নিজে তাকে কাঁধে করে দুটি বস্তা এবং হাতে তেলের পাত্র বহন করতে দেখেছি। আসলামের সাথে পালাক্রমে তিনি এগুলো বহন করছিলেন। আমাকে দেখে বললেন, ‘তুমি কোত্থেকে আসলে, হে আবু হুরায়রা?’ আমি বললাম, ‘এই তো কাছে থেকেই।’ আমিও তাকে সাহায্য করতে লাগলাম। দিরারে পৌঁছার আগ পর্যন্ত এভাবে মালামাল বয়ে নিই। সেখানে মুহারিব গোত্রের প্রায় বিশটি পরিবার দেখা গেল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা এখানে কেন?’ তারা বলল, ‘ক্ষুধা।’ তারা একটি মৃত পশুর চামড়া সেঁকে খাচ্ছিল। চামড়াটি এনে দেখাল। কেউ কেউ হাড় গুঁড়ো করে খাচ্ছিল। দেখলাম, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জোব্বা খুলে রেখে রান্না করতে বসলেন। অতঃপর সবাইকে উদরপূর্তি করে খাওয়ালেন। তিনি আসলামকে মদীনায় পাঠিয়ে কিছু উট আনিয়ে নেন। উটে করে তিনি সবাইকে আল-জাব্বানায় নিয়ে আসলেন। তাদের জন্য পোশাকের ব্যবস্থা করলেন। আল্লাহর হুকুমে খরা না কাটা পর্যন্ত তিনি তাদের দেখাশোনা করেছেন। [cite: ১১০৬]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইশার নামাযে ইমামতি করতেন। নামায আদায় শেষ হলে বাড়ি ফিরে সারা রাত জেগে নামায আদায় করতেন। শেষরাতের দিকে আল-আনকাব গোত্রের খোঁজখবর নিতে বের হতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, একরাতে তাকে দুআ করতে শুনলাম, ‘হে আল্লাহ, আমার খেলাফতকালে উম্মতে মুহাম্মদীকে ধ্বংস করবেন না।’ এবং, ‘হে আল্লাহ, দুর্ভিক্ষ দিয়ে আমাদের ধ্বংস করবেন না; আমাদের ওপর থেকে এই বিপদ দূর করে দিন।’ তিনি এই কথাগুলো বার বার বলতেন। [cite: ১১০৭]
বনু আন-নসরের মালিক ইবনে আওস বলেছেন, আর-রমাদার সময় আমার লোকজন একশ পরিবার নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে হাজির হয়। তারা আল-জাব্বানার ক্যাম্পে উঠেছিল। যারা তার কাছে আসত তাদের নিজে খাওয়াতেন আর যারা আসতে পারত না তাদের জন্য আটা, খেজুর এবং অন্যান্য জিনিসপত্র পাঠিয়ে দিতেন। আমার লোকজনকে তিনি মাসের পর মাস প্রয়োজনীয় মালামাল সরবরাহ করে গেছেন। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সেবাযত্ন করেছেন এবং মৃত্যুবরণ করলে কাফন পাঠিয়েছেন। তিনি নিজে মৃতের জানাজা পড়াতে যেতেন। আমি তাকে একদিনে দশজনের জানাজা পড়াতে দেখেছি। দুর্ভিক্ষ কেটে যাওয়ার পরে বললেন, ‘এবার শহর ছেড়ে মরুভূমিতে নিজেদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাও।’ দুর্বল লোকজনকে পৌঁছে দেবার জন্য বাহন দিয়ে দেন। [cite: ১১০৮]
আযম ইবনে হিশাম তার পিতার বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন, আর- রমাদার সময়ের কথা। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে এক নারীর পাশ দিয়ে যেতে দেখলাম। ওই নারী আসীদা (আটা, মাখন আর মধু মেশানো জাউ) বানাচ্ছিল। তাকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘আসীদা এভাবে বানাবে না।’ তিনি একটি চামচ নিয়ে বললেন, ‘এভাবে।’ তিনি বানানোর পদ্ধতি শিখিয়ে দিলেন। বলতে লাগলেন, ‘পানি গরম না হওয়া পর্যন্ত এতে আটা দেওয়া যাবে না: নয়তো দলা হয়ে যাবে।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর একজন স্ত্রী বলেছিলেন, আর-রমাদা পার না হওয়া পর্যন্ত দুশ্চিন্তার কারণে তিনি তার কোনো স্ত্রীর সাথে অন্তরঙ্গ হতে পারেননি। [cite: ১১০৯] আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আর-রমাদার সময় ক্ষুধার কারণে উমর ইবনুল খাত্তাবের পেটে গড়গড় শব্দ হতো। তিনি ঘীয়ের বদলে যয়তুন তেল খেতেন। আর পেট চাপড়ে বলতেন, ‘যতই গড়গড় করো দুর্ভিক্ষ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো খাবার পাবে না।’ [cite: ১১১০]

৫.২.৩। অন্য অঞ্চলের লোকদের কাছ থেকে সাহায্য চাইলেন
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ধনী অঞ্চলে নিয়োগকৃত গভর্নরদের কাছে চিঠি দিয়ে দ্রুত সাহায্য পাঠাতে বলেন। মিসরের গভর্নর আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে লিখলেন, ‘আল্লাহর বান্দা, উমর ইবনুল খাত্তাব, আমীরুল মুমিনীনের কাছ থেকে আমর ইবনুল আসের প্রতি। আপনার ওপরে শান্তি বর্ষিত হোক। আপনি এবং আপনার চারপাশের লোকজন বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন এবং আপনারা কি চান যে আমি এবং আমার চারপাশের লোকজন মারা যাই? সাহায্য করুন, সাহায্য করুন!’ আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে লিখলেন, ‘আল্লাহর বান্দা আমীরুল মুমিনীনের প্রতি, আমর ইবনুল আসের পক্ষ থেকে। আমি আল্লাহ তা’আলার প্রশংসা করছি, তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। একটু অপেক্ষা করুন, সাহায্য যাচ্ছে। আমি মালামাল বহনের প্রথম গাড়িটি পাঠিয়ে দিয়েছি। আর শেষ গাড়িটি এখনো আমার এখানে। আমি সাগরপথে সাহায্য পাঠানোর পথও পেয়ে যাব আশা করছি।’ [cite: ১১১১] তিনি আটাসহ এক হাজার উট এবং চর্বিসহ বিশটি জাহাজ ও পাঁচ হাজার পোশাক পাঠিয়ে দেন। [cite: ১১১২]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার প্রত্যেক গভর্নরের কাছে চিঠি দিয়েছিলেন, ‘আমাদের সাথে যারা আছে তাদের জন্য খাবার পাঠান। আল্লাহ দয়া না করলে তারা মারা যাবে।’ [cite: ১১১৩] ইরাক এবং পারস্যের প্রতিনিধিদের কাছেও তিনি একইভাবে সাহায্যের আহ্বান জানান। তারা সাধ্যমতো সাহায্য পাঠিয়েছিলেন। [cite: ১১১৪] আত-তাবারী উল্লেখ করেছেন, ‘সবার আগে খাবারসহ চার হাজার উট নিয়ে আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু হাজির হন। মদীনায় সেই খাবার বিলি-বণ্টনের দায়িত্বও তাকে দেওয়া হয়েছিল। তিনি কাজ শেষ করে ফিরে আসার পরে খলীফা তাকে চার হাজার দিরহাম দিতে চাইলেন। তিনি বললেন, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, এর কোনো প্রয়োজন নেই। আমি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই, এই পার্থিব পুরস্কার নয়।’ খলীফা বললেন, ‘এটা রাখুন। যেহেতু এর প্রতি আপনার কোনো চাহিদা নেই তাই এগুলো নিলেও কোনো ক্ষতি হবে না।’ তিনি আবারও অস্বীকৃতি জানালেন। খলীফা এবার বললেন, ‘রেখে দিন। আমি একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য এমন কাজ করার পরে তিনিও একই কথা বলেছিলেন এবং আমাকে তা দিয়ে দেন।’ এই কথার পরে আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু পুরস্কার গ্রহণ করলেন এবং তার লোকজন নিয়ে ফিরে গেলেন। [cite: ১১১৫]
মুআবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু ইরাক থেকে খাবারসহ তিন হাজার উট এবং আটাসহ এক হাজার উট পাঠিয়ে দেন। [cite: ১১১৬] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনাবাসী এবং বাইরে থেকে আসা বেদুইনদের মধ্যে এই খাবার ভাগ করে দিয়েছিলেন। কিছু খাদ্যসামগ্রী মরুবাসীদের মধ্যে ভাগ করে দেবার জন্য পাঠিয়ে দেন। যুবায়র ইবনুল আওয়াম বলেছেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আর-রমাদার সময় আমাকে বলেছিলেন, ‘মরুবাসীর জন্য আটা, চর্বি আর তেল দিয়ে উটের গাড়ি পাঠানো হয়েছে। গাড়ির দায়িত্বে যে আছে তার কাছে কাছে যান এবং আন-নাজদে গিয়ে ওই জায়গার প্রত্যেকটি পরিবারকে আমার কাছে নিয়ে আসুন। যে পরিবারগুলো আসতে অক্ষম তাদের পরিবার প্রতি একটি করে উট দিয়ে দিন। উটের পিঠে যা মালপত্র আছে রেখে দিতে বলবেন। আর সদস্যদের প্রত্যেককে শীতের জন্য একটি এবং গরমের জন্য একটি করে পোশাক রাখতে বলবেন। আর উটটিকে জবাই করে এর গোশত এবং চর্বি যেন শুকিয়ে সংরক্ষণ করে রাখে। আল্লাহ তা’আলা পরবর্তী নেয়ামত না পাঠানো পর্যন্ত তারা এই আটা আর চর্বি রান্না করে খেতে থাকুক। [cite: ১১১৭]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অন্যান্য অঞ্চল থেকে পাঠানো খাবার ও পোশাক মাসের পর মাস বিলি করেছেন। দক্ষ লোকজন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিশাল বিশাল হাড়িতে ফজরের পর থেকেই রান্না বসাতেন। সবার মধ্যে সে খাবার ভাগ করা হতো। তিনি ঘোষণা দিয়ে দিলেন, ‘আল্লাহ তা’আলা দুর্ভিক্ষ দূর না করা পর্যন্ত যতক্ষণ সামর্থ্য থাকবে ঘরে ঘরে সমান সংখ্যক লোক নিয়োগ করে খাওয়ার ব্যবস্থা করে যাব। আল্লাহ তা’আলা যতদিন বৃষ্টি না দেবেন, যাদের ঘরে খাবার নেই প্রয়োজন হলে তাদেরকে খাবার আছে এমন সব ঘরে পাঠানো হবে।’ [cite: ১১১৮]
আরেকটি বর্ণনামতে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, ‘দুর্ভিক্ষ চলতে থাকলে আমি অভুক্ত মানুষজনকে মুসলিমদের পরিবারে দিয়ে দেব। আধাপেট করে খেলে কেউ মরে যাবে না।’ [cite: ১১১৯] তিনি কমিটি গঠন করে খাবার এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিভিন্ন গোত্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর উট আরবে ঢোকার সময় সিরিয়ার বর্ডারে পৌঁছার সাথে সাথে তিনি সেগুলোর বিলি-বণ্টন পর্যবেক্ষণ করতে লোক পাঠিয়ে দেন। তারা খাবার বণ্টন থেকে শুরু করে, উট জবাই, আটা এবং পোশাক বিতরণের যাবতীয় কাজ করেছিলন। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু সাগরপথে মিসর থেকে যে খাবার পাঠিয়েছিলেন সেগুলো তিহামায় পৌঁছে দিয়ে লোকজনের খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। [cite: ১১২০]

৫.২.৪। আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা এবং বৃষ্টির নামায (সালাতুল ইস্তিস্কা) আদায়
সুলায়মান ইবনে ইয়াসার থেকে বর্ণিত, আর-রমাদার সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকজনের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হে লোকসকল, নিজেদের ব্যাপারে এবং তোমরা গোপনে যা কর সে বিষয়ে আল্লাহকে ভয় কর। কারণ, তোমাদের দিয়ে আমাকে এবং আমাকে দিয়ে তোমাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে। আমি জানি না, আমাকে বাদ দিয়ে তোমাদের ওপরে নাকি তোমাদের বাদ দিয়ে আমার ওপরে কোনো পূর্বনির্ধারিত আযাব আপতিত হয়েছে কি না। আসো, আমরা আল্লাহ তা’আলার কাছে দুআ করি তিনি যেন আমাদের অন্তরকে সঠিক পথ দেখান, আমাদের ওপরে দয়া করেন এবং এই খরা থেকে আমাদের রক্ষা করেন।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হাত তুলে আল্লাহ তা’আলাকে ডেকেছেন, লোকজনও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে আল্লাহ তা’আলাকে ডাকছিল। তার কান্না দেখে লোকজনের মধ্যে কান্নার রোল আরও প্রবল হয়ে উঠল। এক সময় তিনি নিচে নেমে আসলেন। [cite: ১১২১]
আসলাম থেকে বর্ণিত, আমি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলতে শুনেছি, ‘হে লোকসকল, আল্লাহকে ভয় কর। আমার মনে হচ্ছে আমাদের ওপরে আযাব নেমে এসেছে। তাই সবাই মিলে তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকো, গুনাহ ছেড়ে দাও, অনুশোচনা করতে থাকো এবং ভালো কাজ কর।’ [cite: ১১২২]
আব্দুল্লাহ ইবনে সাইদা বলেছেন, আমি দেখেছি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মাগরিবের নামায আদায় করে বলে উঠলেন, ‘হে লোকসকল, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং অনুশোচনা কর, তার কাছে নেয়ামত চাইতে থাকো এবং আযাবের বৃষ্টি নয়, রহমতের বৃষ্টি প্রার্থনা কর।’ আল্লাহ তা’আলা সে অবস্থা থেকে মুক্ত না করা পর্যন্ত তিনি দুআ জারি রেখেছিলেন। [cite: ১১২৩]
আবু ইমাম আশ-শা’বী থেকে বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বৃষ্টির জন্য দুআ করতে বের হন। তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন:
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًانَ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مدْرَارًان
অতঃপর বলেছি: তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা প্রর্থনা কর। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। [cite: ১১২৪]
وَاسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ إِنَّ رَبِّي رَحِيمٌ وَدُودٌ
এবং তোমাদের পালনকর্তার কাছে মার্জনা চাও এবং তারই পানে ফিরে এসো। নিশ্চয়ই আমার রব মেহেরবান, মহব্বতকারী। [cite: ১১২৫]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একদিন তার লোকজন নিয়ে ইস্তিস্কার নামায আদায়ের পরিকল্পনা করেছিলেন। গভর্নরদের কাছে লিখেলেন তারও যেন ওই একই দিনে লোকজন নিয়ে এই নামায আদায় করে আল্লাহ তা’আলার আশ্রয় প্রার্থনা করতে থাকেন এবং খরা থেকে মুক্তির জন্য দুআ করেন। নির্ধারিত দিনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আলখাল্লা গায়ে দিয়ে বের হলেন। নামাযের জায়গায় লোকজনসহ দুআ করতে লাগলেন। নারীরাও দুআর জন্য হাত তুলেছিলেন। তিনি খুব বেশি করে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলেন। দুআর শেষের দিকে তিনি আলাখাল্লা উল্টো করে পরলেন। এবার দু-হাত তুলে তিনি আল্লাহ তা’আলার কাছে এত দুআ করতে লাগলেন এবং এত কাঁদতে লাগলেন যে তার দাড়ি মোবারক ভিজে গেল। [cite: ১১২৬]
সহীহ বুখারীতে উল্লেখ আছে, আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেদিন আল-আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের অসিলা দিয়ে বৃষ্টি চেয়েছিলেন। তিনি দুআ করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আমরা আপনার কাছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অসিলা দিয়ে বৃষ্টি চেয়েছিলাম, আপনি বৃষ্টি দিয়েছিলেন। [cite: ১১২৭] আজ আমরা আপনার কাছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচার অসিলা দিয়ে বৃষ্টি প্রার্থনা করছি। আপনি আমাদের বৃষ্টি দিয়ে দিন। [cite: ১১২৮]
বর্ণিত আছে, দুর্ভিক্ষের সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বৃষ্টির দুআ এই বলে শেষ করতেন, ‘হে আল্লাহ, আমি আমার অক্ষমতা স্বীকার করছি এবং তাদের জন্য উত্তম নেয়ামতগুলো আপনার কাছেই আছে।’ অতঃপর তিনি আল-আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাত ধরে বলতেন, ‘আপনার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচার অসিলা দিয়ে আপনার নৈকট্য আশা করছি, কারণ, আপনি তা বলেছেন, এবং আপনি যা বলেন তা সত্য:
وَ أَمَّا الْجِدَارُ فَكَانَ لِغُلَمَيْنِ يَتِيمَيْنِ فِي الْمَدِينَةِ وَكَانَ تَحْتَهُ كَنُزٌ لَّهُمَا وَ كَانَ أَبُوهُمَا صَالِحًا
প্রাচীরের ব্যাপার-সেটি ছিল নগরের দুজন পিতৃহীন বালকের। এর নীচে ছিল তাদের গুপ্তধন এবং তাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ। [cite: ১১২৯]
তাদের পিতার সৎকর্মের কারণে আপনি তাদের দেখাশোনা করেছেন।’ অতঃপর আল-আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু অশ্রুসিক্ত নয়নে দুআ করতে লাগলেন, ‘হে আল্লাহ, একমাত্র গোনাহের কারণে বিপদ আসে এবং একমাত্র অনুতাপ দিয়েই মুক্তি লাভ করা সম্ভব। লোকজন আমার অসিলা দিয়ে আপনার কাছে প্রার্থনা করছেন, এর কারণ, আমি আপনার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আত্মীয়। আমাদের হাত আপনার দিকে ক্ষমার আশায় প্রসারিত হয়েছে, এবং অনুতপ্ত হৃদয় নিয়ে আমরা আপনার দিকে ফিরেছি। হে দয়াশীলদের প্রতি দয়াময়, আমাদের বৃষ্টি দিয়ে দিন এবং আমাদের হতভাগ্যদের অন্তর্ভুক্ত করবেন না। হে আল্লাহ, আপনি তো আমাদের অভিভাবক, আপিন তো পথভ্রষ্টদেরও অবহেলা করেন না, আবার দুর্বলদেরও শাস্তি দিতে ছাড় দেন না। কচি মানুষগুলো কাঁদছে আর বৃদ্ধেরা আতঙ্কিত, সবাই আপনার কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছে। গোপন- প্রকাশ্য সবকিছু আপনার জানা। হে আল্লাহ, দুর্ভাগ্যে পতিত হওয়ার আগেই আপনি তাদের ওপরে রহমত নাযিল করুন, কারণ, অবিশ্বাসী ছাড়া আর কাউকে আপনি আপনার রহমত থেকে বঞ্চিত করেন না।’ [cite: ১১৩০]
এমন সময়ে এক টুকরো মেঘ উড়ে এলো আর লোকেরা বলাবলি করতে লগল, ‘তোমরা ওটা দেখতে পাচ্ছ?’ মেঘটা বড় হতে লাগল, সাথে ঝড়ো বাতাসও ছাড়ল। বাতাস থেমে যেতেই শুরু হলো বৃষ্টিপাত। আল্লাহর কসম, দেয়াল আঁকড়ে ধরে হাঁটতে হয় এবং কোমরের কাপড় টেনে ধরতে হয় এমন অবস্থার আগ পর্যন্ত সেদিন কেউ তার জায়গা ছেড়ে ওঠেনি। লোকজন আল-আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলতে লাগল, ‘দুই পুণ্যভূমিতে বৃষ্টি আনয়নকারীকে শুভেচ্ছা।’
আরেকটি বর্ণনামতে, আল-আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু সেদিন তার দুআয় বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, একমাত্র গুনাহের কারণে বিপদ আসে এবং একমাত্র অনুতাপ দিয়েই মুক্তিলাভ করা সম্ভব। লোকজন আমার অসিলা দিয়ে আপনার কাছে প্রার্থনা করছেন, এর কারণ, আমি আপনার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আত্মীয়। আমাদের হাত আপনাদের দিকে ক্ষমা প্রার্থনার আশায় প্রসারিত হয়েছে, এবং অনুতপ্ত হৃদয় নিয়ে আমরা আপনার দিকে ফিরেছি। হে দয়াশীলদের প্রতি দয়াময়, আমাদের বৃষ্টি দিয়ে দিন।’ এতটুকু বলার সাথে সাথে সেদিন এত বৃষ্টি হয়েছিল যে খরা দূর হয়ে যায়। [cite: ১১৩১]

৫.২.৫। দুর্ভিক্ষের সময় হদ্দ শাস্তি মওকুফ করা হলো
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আর-রমাদার সময় চুরির শাস্তি হিসেবে হদ্দ মওকুফ করে দেন। কেউ কেউ দাবি করেছেন যে, তখন স্থায়ীভাবে শাস্তি বাতিল করা হয়নি। বরং ওই শাস্তি দেবার মতো কোনো কারণ না থাকায় কিছুদিনের জন্য স্থগিত রাখা হয়। খাদ্যের অভাবে এবং ক্ষুধার তাড়নায় কেউ যদি অন্য কারও খাবার খেয়ে ফেলে তবে একে ইচ্ছাকৃত চুরি বলে গণ্য করা যায় না। এ কারণেই ক্রীতদাসেরা একবার একটি উট চুরি ও জবাই করার কারণে তিনি শাস্তি হিসেবে তাদের হাত কেটে ফেলার বদলে তাদের মনিব হাতিবকে এর মূল্য পরিশোধ করে দিতে বলেছিলেন। [cite: ১১৩২]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলে দিলেন, ‘খেজুর গাছ থেকে (এক গোছা খেজুর) নিয়ে নিলে [cite: ১১৩৩] অথবা দুর্ভিক্ষের সময় কারও হাত কাটা যাবে না।’ [cite: ১১৩৪] উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই ফিকহ দ্বারা মাযহাবগুলো অনুপ্রাণিত হয়েছে। আল-মুগনি কিতাবে ইমাম আহমদ উল্লেখ করেছেন, ‘দুর্ভিক্ষের সময় কারও হাত কাটা যাবে না’- বলতে বোঝানো হয়েছে যে, অভাবী মানুষ খাবার চুরি করলে তার হাত কাটা যাবে না, কারণ, অভাবের কাছে মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে। আল-জাওযানি বর্ণনা করেছেন : উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘দুর্ভিক্ষের সময় কারও হাত কাটা যাবে না।’ আমি এ প্রসঙ্গে আহমদের কাছে জানতে চেয়েছি। আমি জিজ্ঞেস করেছি, ‘এ বিষয়ে আপনারও কি একই মত?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ অবশ্যই। কঠিন বিপদ এবং দুর্ভিক্ষের সময় অভাবের তাড়নায় কেউ এমন কাজ করলে আমিও তার হাত কাটার পক্ষে ফাতওয়া দেব না।’ [cite: ১১৩৫]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শরীয়তের মূল লক্ষ্য সম্পর্কে কেমন অভিজ্ঞ ছিলেন তা বোঝা যাচ্ছে। বাইরে থেকে নয় বরং সমস্যার গভীরে ঢুকে তা যাচাই করতেন। মানুষ কোন পরিস্থিতিতে চুরি করছে তার মূল কারণ জানার প্রতি তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। ক্ষুধার যন্ত্রণায় করা নাজায়েয কাজও জায়েয হিসেবে মেনে নিতে হয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হাতিবের ক্রীতদাসদের ঘটনায় এর প্রমাণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তুমি তাদের খাটিয়ে নিচ্ছ এবং ক্ষুধার্ত রাখছ, সুতরাং এই অবস্থায় সে অন্যের জিনিস খেয়ে ফেললে তা জায়েয বলে গণ্য হবে।’ [cite: ১১৩৬]

৫.২.৬। আর-রমাদার সময় যাকাতের সময় বাড়িয়ে দেওয়া হলো
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আর-রমাদার বছর যাকাত আদায় করা স্থগিত রাখেন। এক সময় দুর্ভিক্ষ দূর হয়ে দেশে ফসল উৎপন্ন হতে লাগল। তখন আর-রমাদার বছর থেকে যাকাত হিসাব করে তা আদায় করেছিলেন। সচ্ছল লোকদের বেলায় আগের বছরের যাকাত ঋণ হিসেবে ধরা হয়েছিল। এতে করে অভাবীরা উপকৃত হয়। আরেকদিকে সব খরচ বাদ দিয়েও বায়তুল মালে বাড়তি অর্থসম্পদ জমা হলো। [cite: ১১৩৭]
ইয়াহিয়া ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে হাতিব থেকে বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আর-রমাদার বছরের যাকাত দেরিতে আদায় করেছিলেন। সে বছর তিনি কোনো কর-সংগ্রাহককে পাঠাননি। আল্লাহ তা’আলা যখন এর পরবর্তী বছর দুর্ভিক্ষ তুলে নিলেন তখন কর- সংগ্রাহকদের পাঠিয়ে এক সাথে দুই বছরের যাকাত আদায় করেন। তিনি এক বছরের সাথে তার পরের বছরের যাকাত নিয়ে আসতে নির্দেশ দেন। [cite: ১১৩৮]

টিকাঃ
১০৯৩. ইকনমিক্স অফ ওয়ার ইন ইসলাম, ড. গাজি ইবনে সালিম, পৃ. ২৫০।
১০৯৪. আল-হিলইয়া, ১/৪৮।
১০৯৫. আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ৩২০।
১০৯৬. আত-তাবাকাত, ৩/৩১৪।
১০৯৭. আত-তাবাকাত, ৩/৩১৫; মাহদুস সাওয়াব, ১/৩৬৩।
১০৯৮. ইয়ারফা ছিলেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দাঁড়োয়ান। তিনি জাহিলি যুগের সাক্ষী এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে হজ্জ্ব করেছিলেন।
১০৯৯. আত-তাবাকাত, ৩/৩১৩; আশ-শায়খান মিন রিওয়ায়াত আল-বালাযুরি, পৃ. ২৯৪।
১১০০. আত-তারীখ আল-ইসলামি, ১৯,২০/৪৩।
১১০১. আত-তাবাকাত, ৩/৩১৫; মাহদুস সাওয়াব, ১/৩৬৩।
১১০২. আল-ইকতিফা, আল-কালাই, ৩/৩২৫; তারীখ আত-তাবারি, ৫/৮১।
১১০৩. আল-ইদারা আল-ইসলামিয়া, ড. আব্দুল্লাহ কাদিরি, পৃ. ১১৫।
১১০৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৫।
১১০৫. আল-মাদীনা আন-নবুওয়া ফাজর আল-ইসলাম, ২/৩৭, ৩৮।
১১০৬. আখবার উমর, পৃ. ১১১।
১১০৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৬।
১১০৮. প্রাগুক্ত পৃ. ১১২; ইবনুল জাউযি, পৃ. ৬১।
১১০৯. প্রাগুক্ত পৃ. ১১৬।
১১১০. আল-হিলইয়া, ১/৪৮।
১১১১. আখবার উমর, পৃ. ১১৫।
১১১২. আল-ফারুক উমর, আশ-শারকউয়ি, পৃ. ২৬১।
১১১৩. প্রাগুক্ত পৃ. ২৬২।
১১১৪. প্রাগুক্ত পৃ. ২৬৩।
১১১৫. তারীখ আত-তাবারি, ৫/৮০।
১১১৬. আল-ফারুক উমর, আশ-শারকউয়ি, পৃ. ২৬২।
১১১৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬৩।
১১১৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৬৩।
১১১৯. আস-সিয়াসাত আশ-শারিয়া, ড. ইসমাঈল বাদাউয়ি, পৃ. ৪০৩; মাহদুস সাওয়াব, ১/৩৬৪।
১১২০. আখবা উমর, পৃ. ১১০।
১১২১. আত-তাবাকাত, ৩/৩২২; আশ-শায়খান মিন রিওয়ায়াত আল-বালাযুরি, পৃ. ৩২৩।
১১২২. আত-তাবাকাত, ৩/৩২২; আখবার উমর, পৃ. ১১৬।
১১২৩. আশ-শায়খান মিন রিওয়ায়াত আল-বালাযুরি, পৃ. ৩১৯।
১১২৪. সূরা নুহ, ৭১: ১০-১১।
১১২৫. সূরা হ্রদ, ১১: ৯০।
১১২৬. আত-তাবাকাত, ৩/৩২০; তারীখ আল-মাদীনা আল-মুনাওয়ারা, ইবনে শিবহ, ২/৭৪২।
১১২৭. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেঁচে থাকতে এভাবে তার ওয়াস্তা দিয়ে দুআ করা হয়েছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পরে তার ওয়াস্তা দিয়ে দুআ করার অনুমতি থাকলে তিনি নিশ্চয়ই তা করতেন। তখন তার চাচা আল-আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওয়াস্তা দিতে হতো না।
১১২৮. সূরা কাহফ, ১৮: ৮২।
১১২৯. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং. ১০১।
১১৩০. আল-ফারূক উমর ইবননুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ রাশীদ রিদা, পৃ. ২১৭।
১১৩১. আল-খিলাফা আর-রাশিদা ওয়া আদ-দাওলা আল-উমাউয়িয়া, ড. ইয়াহিয়া আল-ইয়াহিয়া, পৃ. ৩০২।
১১৩২. আল-খিলাফা ওয়া আল-খুলাফা আর-রাশিদূন, সালিম বাহনাসাউয়ি, পৃ. ১৬৫।
১১৩৩. কারণ তা তখনো গাছে ঝুলছিল এবং নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ করা হয়নি।
১১৩৪. আল-মিসবাহ আল-মুনির, পৃ. ২৯২।
১১৩৫. আল-মুগনি, ইবনে কুদামা, ৮/২৭৮।
১১৩৬. আলাম আল-মুয়াকিঈন, ৩/১১; আল-ইজতিহাদ ফীল ফিকহ আল ইসলামি, পৃ. ১৩৬।
১১৩৭. আল-খিলাফা ওয়া আল-খুলাফা আর-রাশিদূন, সালিম বাহনাসাউয়ি, পৃ. ১৬৬।
১১৩৮. আশ-শায়খান মিন রিওয়ায়াত আল-বালাযুরি, পৃ. ৩২৪।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 প্লেগ

📄 প্লেগ


১৮ হিজরীতে [cite: ১১৩৯] আরেকটি মারাত্মক বিপদ এসে হানা দিল। প্লেগ ছড়িয়ে পড়ল। সূত্রমতে, এটি আমওয়াসের (ইমাউসের) প্লেগ নামে পরিচিতি। জেরুযালেম এবং রমলার মাঝামাঝি আমওয়াস নামে একটি ছোট্ট শহর ছিল। সেই শহর থেকে প্লেগ ছড়িয়েছিল বলে এই নামটি রয়ে গেছে। প্লেগ সম্পর্কে বিভিন্ন উদ্ধৃতি পড়ার পরে, আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান দিয়ে এই রোগ সম্পর্কে যা বুঝেছি তা হলো, ইবনে হাজার বলেছিলেন, ‘আরবি ভাষায় অভিজ্ঞজনের মন্তব্য শুনে, ফিকহ এবং চিকিৎসাবিদ্যার সংজ্ঞা থেকে প্লেগের (আত-তাউনের) ধারণা পেয়েছি। রক্তে সমস্যার কারণে অথবা অঙ্গপ্রত্যঙ্গে হঠাৎ করে রক্তপ্রবাহ বেড়ে ফুলে ওঠাকে প্লেগ বলা হয়। আবার দূষিত বাতাসের মাধ্যমে কোনো রোগ ছড়িয়ে পড়লে তাকেও প্লেগ বলা হয়। প্লেগের প্রাদুর্ভাবে একই ধরনের রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় অথবা অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটে থাকে।’ [cite: ১১৪০] প্লেগ (তাউন) এবং মহামারীর (ওয়াবা) মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসটি উল্লেখ করতে হবে। তিনি বলেছেন যে, মদীনা কখনই প্লেগে আক্রান্ত হবে না। তবে মহামারী এখানে আঘাত হানতে পারে কারণ, অতীতেও এখানে মহামারী দেখা দিয়েছিল। [cite: ১১৪১]
মূলত মুসলিম এবং বাইজেন্টাইনদের লড়াই থেকে প্লেগের উৎপত্তি ঘটে। তখন বহু মানুষ নিহত হয়েছিল এবং লাশের দুর্গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল। আল্লাহর হুকুমে প্রকৃতির নিয়মে তখন প্লেগ ছড়িয়ে পড়েছিল। [cite: ১১৪২]

৫.৩.১। আল-হিজায এবং সিরিয়ার সীমান্তে অবস্থিত সারগ থেকে উমর রা.-এর প্রত্যাবর্তন
১৭ হিজরী। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দ্বিতীয়বারের মতো সিরিয়া যেতে চাইলেন। সুতরাং পরিকল্পনা মাফিক আনসার-মুহাজিরদের নিয়ে তিনি সিরিয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। আল-হিজায এবং সিরিয়ার সীমান্তে অবস্থিত সারগে পৌঁছে তারা যাত্রা বিরতি দেন। সেখানে থাকা অবস্থায় সেনাপতিদের কাছে সিরিয়ার খবর পেলেন। সিরিয়া রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে এবং সেখানে প্লেগ ছড়াচ্ছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সবার সাথে পরামর্শ করে ফিরে যেতে উদ্যত হন। শূরা প্রসঙ্গে আলোচনার সময় বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। [cite: ১১৪৩]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চলে যাওয়ার পরে আমওয়াসের প্লেগও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এর ভয়াবহ ছোবলে সিরিয়া আক্রান্ত হয়ে পড়ে। অসংখ্য মানুষ মারা যেতে লাগল। সিরিয়ার গভর্নর উবায়দা ইবনুল জাররা, এবং মুআয ইবনুল জাবাল, ইয়াযীদ ইবনে আবি সুফিয়ান, আল-হারিস ইবনে হিশাম (কারও কারও মতে তিনি ইয়ারমুকের যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন), সুহায়ল ইবনে আমর, উতবা ইবনে সুহায়ল রাযিয়াল্লাহু আনহুমসহ অনেক নেতৃস্থানীয় সাহাবায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেন। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু গভর্নরের দায়িত্ব নেবার পরে মহামারী দূর হয়েছিল। লোকজনকে লক্ষ্য করে তিনি বলেছিলেন, ‘হে লোকসকল, এই রোগটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। তোমরা পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নাও।’ সুতরাং লোকজন নিয়ে তিনি চলে গেলেন। আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে এই অবস্থা থেকে মুক্তিদানের আগ পর্যন্ত তারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কানে এই কথা গেল। তবে তিনি আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেননি। [cite: ১১৪৪]

৫.৩.২। আবু উবায়দা রা.-এর ইন্তেকাল
প্লেগের খবর পাওয়ামাত্রই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ফিরে আসার জন্য চিঠি দেন। তিনি বলেন, ‘আপনার ওপরে শান্তি বর্ষিত হোক। আপনার সাথে আমার কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করা দরকার। আমি চাই আপনি এই চিঠি পাওয়ামাত্র এটা হাতে থাকা অবস্থায় আমার কাছে চলে আসবেন।’ আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু বুঝতে পারলেন যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু স্নেহবশত তাকে প্লেগ থেকে দূরে রাখতে চাচ্ছেন এবং তার জীবন রক্ষা করতে চাচ্ছেন। বললেন, ‘আমীরুল মুমিনীনকে আল্লাহ তা’আলা ক্ষমা করুন।’ তিনি চিঠির জবাব দিতে বসলেন, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি; কিন্তু এই মুহূর্তে আমি কয়েকটি মুসলিম সেনাদলের সাথে আছি। আল্লাহ তা’আলার হুকুম না হওয়া পর্যন্ত নিজের জীবন বাঁচাতে আমি তাদের ফেলে যেতে চাচ্ছি না। হে আমীরুল মুমিনীন, দয়া করে আমাকে ফিরে আসার নির্দেশ থেকে অব্যাহতি দিন এবং আমাকে আমার সেনাদলের সাথে থাকার সুযোগ দিন।’ তার চিঠি পেয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুব কেঁদেছিলেন। তার কান্না দেখে উপস্থিত লোকজন বলতে লাগলেন, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আবু উবায়দা কি মারা গেছেন?’ তিনি বললেন, ‘অনেকটা তেমনই।’ তিনি আবার চিঠি দিলেন, ‘আপনার ওপরে শান্তি বর্ষিত হোক। আপনি এখন সেনাবাহিনীর সাথে নিম্নাঞ্চলে অবস্থান করছেন। তাদের নিয়ে নির্মল বাতাস আছে এমন উঁচু এলাকায় চলে যান।’ তার চিঠি হাতে পেয়ে আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, ‘হে আবু মূসা, আমীরুল মুমিনীনের কাছ থেকে এই চিঠি এসেছে। আপনি লোকগুলোর জন্য ক্যাম্পের জায়গা খুঁজে বের করুন। আমি তাদের নিয়ে আসছি।’ আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে দেখলেন, তার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি ফিরে গিয়ে আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে খবর দিলেন। খবর শুনে তিনি তখনই একটি উট তার জন্য তৈরি করতে বললেন। উটে উঠতে গিয়ে টের পেলেন যে তিনিও আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কসম, আমিও আক্রান্ত।’ [cite: ১১৪৫]
বর্ণিত আছে, উরওয়া বলেছেন, আবু উবায়দা এবং তার পরিবার আমওয়াসের রোগ থেকে মুক্ত ছিল। তখন তিনি দুআ করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আবু উবায়দার পরিবারকে তাদের অংশ দিয়ে দেন।’ অতঃপর তার চামড়ায় ফোঁড়া দেখা গেল এবং তিনি সেগুলো দেখতে লাগলেন। একজন বলে উঠল, ‘এ কিছু না।’ তিনি বললেন, ‘আশা করি আল্লাহ তাদের রহম করবেন।’ [cite: ১১৪৬]
তিনি আক্রান্ত হয়ে পড়লে লোকদের লক্ষ্য করে বললেন, ‘হে লোকসকল, এই রোগ তোমাদের ওপরে আল্লাহ তা’আলার একটি নেয়ামত এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুআর জবাব এবং এভাবেই ধর্মভীরুদের অনেকে ইন্তেকাল করেছেন।’ [cite: ১১৪৭]
আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার অংশ আল্লাহ তা’আলার কাছ থেকে চেয়ে নেন এবং তিনি আক্রান্ত হওয়ার পরে মুসলিমদের ডাকলেন, তারা তাকে দেখতে আসলেন। তিনি বললেন, ‘আমি তোমাদের কিছু উপদেশ দেব। তোমরা এই উপদেশ গ্রহণ করলে বেঁচে থাকতে তো বটেই মৃত্যুর পরেও সুফল পাবে। নিয়মিত নামায আদায় করবে, যাকাত দেবে, রোযা রাখবে, সাদকা করবে, হজ ও উমরা পালন করবে, একে অপরের সাথে সম্পর্ক ধরে রাখবে, একে অপরকে ভালোবাসবে, শাসকের অনুগত হয়ে চলবে এবং তাদের ধোঁকা দেবে না, এবং দুনিয়ার পাল্লায় পড়ে বিভ্রান্ত হবে না। কারও এক হাজার বছর হায়াত থাকলেও তাকে আমার অবস্থায় (মৃত্যুর কবলে) পড়তেই হবে। আল্লাহ তা’আলা আদম সন্তানের জন্য মৃত্যুকে অবধারিত করেছেন, সুতরাং তার মৃত্যু নিশ্চিত। যারা তার রবের প্রতি অনুগত থাকবে এবং আখেরাতের জন্য কষ্ট করবে তারাই সবচেয়ে বুদ্ধিমান।’ অতঃপর তিনি মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, ‘হে মুআয, নামাযের ইমামতি করুন।’ মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু নামাযের ইমামতি করলেন এবং আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু ইন্তেকাল করলেন (আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন এবং রহম করুন)। [cite: ১১৪৮]
মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, ‘হে লোকসকল, আল্লাহ তা’আলার কাছে অন্তর থেকে তওবা করো। কারণ, তওবা করা অবস্থায় আল্লাহ তা’আলার সাথে সাক্ষাৎ হলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেনই। কারও ঋণ থেকে গেলে তার পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ করবে, কারণ, মানুষ তার ঋণের জন্য দায়বদ্ধ। তোমাদের মধ্যে কেউ কোনো মুসলমানের সাথে যেন সম্পর্কচ্ছেদ না করে, এমন হলে তাদের দেখা করাবে এবং বিবাদ মেটানোর চেষ্টা করবে, তাদের হাত মিলিয়ে দেবে। কারণ, এক মুসলমানের সাথে আরেক মুসলমানের তিন দিনের বেশি সম্পর্কচ্ছেদ করে থাকা উচিত নয়। আল্লাহ তা’আলার কাছে তা চরম গুনাহ বলে গণ্য হয়। তোমরা মুসলিমরা একজনকে হারিয়েছ। হে আল্লাহর বান্দারা, আল্লাহর কসম, আমি তার মতো এত বিনয়ী, সৎ, প্রতারণাবিমুখ, মানুষের প্রতি এত সহানুভূতিশীল এবং দয়াপরবশ ব্যক্তি দেখিনি। তোমরা তার জন্য রহমতের দুআ করবে এবং তার জানাযায় অংশগ্রহণ করবে। আল্লাহ তা’আলা তার সব গুনাহ মাফ করে দিন। আল্লাহর কসম, তোমরা তার মতো নেতা পাবে না।’ লোকজন একত্রিত হলো, আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বের করা হলো, এবং মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু তার জানাযা পড়ালেন। তাকে কবরস্থানে আনা হলো। মুআয, আমর ইবনুল আস এবং আদ-দাহহাক ইবনে কয়েস রাযিয়াল্লাহু আনহুম কবরে নামলেন। তার দাফন সম্পন্ন করে মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতে লাগলেন, ‘আল্লাহ আপনাকে রহম করুন, হে আবু উবায়দা। আল্লাহর কসম, আপনি যেমন আমি আপনার তেমনি প্রশংসা করব এবং আল্লাহর কসম, আমি আপনার সম্পর্কে মিথ্যা বলব না। কারণ, আমি আল্লাহর ক্রোধকে ভয় পাই। আল্লাহর কসম, আমি যতদূর জানি, আল্লাহকে অনেক বেশি স্মরণকারী লোকদের মধ্যে আপনি অন্যতম এবং ওইসব লোকদের একজন—যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের সাথে যখন মূর্খরা কথা বলতে থাকে, তখন তারা বলেন, সালাম। [cite: ১১৪৯] আর তাদের একজন—যারা রাত্রি যাপন করে পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সেজদাবনত হয়ে এবং দণ্ডায়মান হয়ে; [cite: ১১৫০] তাদেরও একজন—যারা যখন ব্যয় করে, তখন অযথা ব্যয় করে না, কৃপণতাও করে না এবং তাদের পন্থা হয় এতদুভয়ের মধ্যবর্তী। [cite: ১১৫১] আল্লাহর কসম, আমার জানামতে আপনি তাদের একজন—যারা নম্রভাবে আল্লাহকে স্মরণ করেন, দরিদ্র এবং ইয়াতিমদের প্রতি দয়ার্দ্র, আর যারা রূক্ষ এবং দন্তকারীদের ঘৃণা করেন। [cite: ১১৫২]
আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালে মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন। [cite: ১১৫৩] মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠির মাধ্যমে তার মৃত্যু সংবাদ দেন। তিনি লিখেছিলেন : আল্লাহ তা’আলার প্রতি অনুগত এবং আল্লাহ তা’আলার ভয়ে ভীত-হৃদয়ের এই মানুষটির জন্য পুরস্কারের দুআ করুন। হে আমীরুল মুমিনীন, তিনি আপনার এবং আমাদের খুব প্রিয় ছিলেন : আবু উবায়দা আল-জাররা, আল্লাহ তা’আলা তার সব গুনাহ মাফ করে দিন। প্রকৃতই আমরা আল্লাহ তা’আলার এবং তার কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। আমরা তার পক্ষ থেকে আল্লাহ তা’আলার কাছে পুরস্কারের দুআ করছি, এবং আল্লাহ তা’আলার ওপর ভরসা করছি। আমি এমন একটি সময়ে এই চিঠি লিখতে বসেছি যখন চারদিক মৃত্যুর হাতছানি এবং চারপাশে মহামারী ছড়িয়ে পড়ছে। কেউ তার নির্ধারিত মৃত্যুর হাত থেকে পালাতে পারবে না। এখনো যারা ইন্তেকাল করেনি, একদিন না একদিন ইন্তেকাল করবে। আল্লাহ যেন তাকে এই পৃথিবী থেকে উত্তম জিনিস দান করেন। আমরা বাঁচি বা মরি, আল্লাহ তা’আলা যেন আপনাকে সমস্ত মুসলিম, সমস্ত সম্ভ্রান্ত এবং সাধারণ লোকের পক্ষ থেকে উত্তম পুরস্কার দেন। আপনার প্রতি তিনি তার দয়া, তার ক্ষমা, তার সন্তুষ্টি এবং তার রহমত নাযিল করুন। [cite: ১১৫৪]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই চিঠি পেয়ে খুব কাঁদলেন। তার পাশে উপস্থিত লোকজনকে আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যুসংবাদ দিলেন। [cite: ১১৫৫] এই সংবাদে সবার চোখে পানি এসে গেল এবং সবাই শোকতপ্ত হয়ে পড়েন। তবে আল্লাহর হুকুমকেও গ্রহণ করে নিয়েছিলেন।

৫.৩.৩। মুআয ইবনে জাবাল রা.-এর ইন্তেকাল
আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে তিনি লোকজনকে বেশ কয়েকদিন নামায পড়িয়েছেন। প্লেগের অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে লাগল। একের পর এক মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিল। তিনি দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিলেন, ‘হে লোকসকল, এই রোগ তোমাদের ওপরে আল্লাহ তা’আলার একটি রহমত এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুআর জবাব এবং এভাবেই ধর্মভীরুদের অনেকে ইন্তেকাল করেছেন। হে আল্লাহ, আমার পরিবারেও এই রহমতের অংশ দান কর।’ [cite: ১১৫৬]
এরপরে তার ছেলে আব্দুর রহমান ইবনে মুআয [cite: ১১৫৬] প্লেগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। তিনি তার নিকট যান। তখন তার ছেলে কুরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করে: الْحَقُّ مِنْ رَّبِّكَ فَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِينَ বাস্তব সত্য সেটাই যা তোমার পালনকর্তা বলেন। কাজেই তুমি সন্দিহান হয়ো না। [cite: ১১৫৭] তিনি বললেন, হে আমার সন্তান, سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصُّبِرِينَ আল্লাহ চাহে তো তুমি আমাকে সবরকারী পাবে। [cite: ১১৫৮]
অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তার ছেলে ইন্তেকাল করলেন। মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজে জানাযা পড়ালেন এবং দাফন সম্পন্ন করলেন। বাড়ি ফিরে তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। তার ব্যথা সহ্যের বাইরে চলে গেল। সাথীরা একজনেরর পর একজন এসে তাকে দেখে যেতে লাগলেন। তিনি তাদের দিকে ফিরে বলতেন, ‘সময় ও সুযোগ পেলে কষ্ট করতে থাকুন। এখনো আপনাদের হায়াত বাকি আছে। ভালো যা কিছু করতে চান করে ফেলুন। নয়তো কেবল আশা করবেন, থাকবেন এবং তা হয়তো করার সুযোগ পাবেন না। নিজের যা আছে তা থেকেই খরচ করুন এবং আপনাদের পরে যারা আসবে তাদের জন্য উত্তরাধিকার রেখে যান। মনে রাখবেন, যা খাবেন, যা পরবেন আর যা খরচ করবেন তা-ই আপনার সম্পদ। আর বাকি সবকিছু আপনার উত্তরাধিকারীর।’ ব্যথা আরও বেড়ে গেল। তিনি বললেন, ‘ইয়া রব, আপনি যেভাবে ইচ্ছা আমাকে মৃত্যু দিন।’ [cite: ১১৫৯] আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনাকে আমি কতটুকু ভালোবাসি আপনি তা জানেন। [cite: ১১৬০]
মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি বলতে লাগলেন, ‘এই মুহূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অতিথিকে (মৃত্যুকে) স্বাগতম। যে আফসোস করবে সে সফল হতে পারবে না। হে আল্লাহ, আপনি তো জানেন খাল তৈরি কিংবা গাছ লাগানোর উদ্দেশ্যে আমি এই পৃথিবীতে থাকতে আগ্রহী নই; বরং নামাযের মাধ্যমে দীর্ঘ রাত পার করে এবং দিনে রোযা রেখে, তপ্ত গরমে তৃষ্ণার অনুভূতি নিয়ে এবং যিকিরের মজলিসের কারণে এখানে থাকার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলাম।’ [cite: ১১৬১]
তিনি ৩৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। [cite: ১১৬২] তিনি তার অবর্তমানে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ দিয়ে যান। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু তার জানাযা পড়ান এবং দাফন সম্পন্ন করতে তার কবরে নামেন। আরও কয়েকজন মুসলিম তার সাথে কবরে নেমেছিলেন। তিনি উঠে এসে বলতে লাগলেন, ‘আল্লাহ তা’আলা আপনাকে দয়া করুন, হে মুআয। আমার জানামতে, আপনি অন্যতম অনুগত এবং শ্রেষ্ঠ মুসলিম। আপনি মূর্খদের জ্ঞান দান করেছেন, অপরাধীদের প্রতি কঠোর এবং মুমিনদের প্রতি নম্র আচরণ করেছেন।’ [cite: ১১৬৩]
আবু উবায়দা এবং মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুমের ইন্তেকালের পরে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতির দায়িত্ব নেন। এরপরে সবার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হে লোকসকল, এই রোগ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে সবাই পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নাও।’ সুতরাং তিনি লোকজনসহ পাহাড়ে চলে গেলেন এবং আল্লাহ তা’আলা এই বিপদ থেকে মুক্ত না করা পর্যন্ত সবাই বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিল। [cite: ১১৬৪]
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠি দেন, ‘আপনার ওপরে শান্তি নাযিল হোক। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু ইন্তেকাল করেছেন এবং মুসলিমদের মধ্যে মৃত্যু ছড়িয়ে পড়ছে। তারা আমার কাছে উন্মুক্ত গ্রামের দিকে চলে যাবার অনুমতি চাচ্ছে। আমি জানি, আমরা এখন যেখানে আছি সেখানে থাকলে মৃত্যুকে যেমন আহ্বান করা যাবে না, তেমনই পালিয়ে গেলেও মৃত্যুকে দূরে ঠেলা কিংবা আল্লাহ তা’আলার হুকুম টলানো সম্ভব নয়। আপনার ওপরে আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি এবং রহমত বর্ষিত হোক।’ [cite: ১১৬৫]
আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরপর মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যু সংবাদে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুষড়ে পড়েন। তিনি এবং উপস্থিত মুসলিমরা কান্না ধরে রাখতে পারেননি। তার জন্য সবাই দুঃখ প্রকাশ করতে লাগল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দুআ করলেন, ‘আল্লাহ তা’আলা তাকে রহম করুন। মুআযের মৃত্যুতে মুসলিম উম্মত জ্ঞানের দিক দিয়ে বিরাট ক্ষতির মধ্যে পড়ল। আমরা যতবার তার সৎ উপদেশ গ্রহণ করেছি ততবার বরকত এবং রহমত লাভ করেছি। তার কাছ থেকে আমরা যা কিছু শিখেছি তাতে সুফল পেয়েছি, এবং তিনি সব সময় আমাদের ভালো নির্দেশনা দিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা তাকে ধর্মনিষ্ঠদের পুরস্কারে পুরস্কৃত করুন।’ [cite: ১১৬৬]
এরপরে মুসলিমদের তৃতীয় বিখ্যাত নেতা প্লেগের কবলে পড়লেন। তিনি ইয়াযীদ ইবনে আবি সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু, আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুর সন্তানদের মধ্যে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। ইয়াযীদ আল-খায়র নামে তিনি বেশি প্রসিদ্ধ। আমওয়াসের প্লেগে আরেক মহান নেতা শাহাদাত বরণ করেন। শূরাহবীল ইবনে হাসানা। [cite: ১১৬৭]

৫.৩.৪। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে উমর রা.-এর সিরিয়াযাত্রা
সিরিয়ায় প্লেগের কবলে একের পর এক নেতা এবং সাহসী সৈনিকদের মৃত্যুসংবাদে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছিলেন। মৃত ব্যক্তিদের ফেলে যাওয়া সম্পদের উত্তরাধিকার এবং এমন অসংখ্য বিষয় নিয়ে সিরিয়ার গভর্নর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠি দিতে লাগলেন। নিত্যনতুন সমস্যা নিয়ে তিনি সাথীদের সাথে আলোচনায় বসতে লাগলেন। শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি নিজে গিয়ে মুসলিমদের সমস্যা মোকাবিলা করে আসবেন। মাজলিস আশ-শূরার সাথে আলোচনা শেষ করে তিনি সিরিয়া যাওয়ার জন্য মনস্থির করেন। তিনি বললেন, ‘সিরিয়ায় মানুষের উত্তরাধিকারীদের সম্পদ অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে, এজন্য আমি সেখানে যাব। উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পদ ভাগ-বাটোয়ারা করে দেব এবং যেভাবে যা করলে ভালো হয় সমাধান করে দিয়ে আসব। সেখান থেকে ফিরে এসে অন্যান্য ভূখণ্ডের দিকে যাব এবং নির্দেশনা দেব।’ সুতরাং কথামতো তিনি মদীনা ছাড়লেন। তার অবর্তমানে আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মদীনার দায়িত্ব দিয়ে আসেন। [cite: ১১৬৮] সিরিয়ায় গিয়ে খাদ্যসামগ্রী বিলি-বণ্টন করলেন, শীত এবং গ্রীষ্মে অভিযান চালানোর মতো সেনাদল গঠন করলেন, সীমান্তের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সুসংগঠিত করলেন। গভর্নরদের নিয়োগ দিলেন। উপকূলীয় সীমান্ত এলাকায় আব্দুল্লাহ ইবনে কয়েস রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং দামেস্কে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেন। সেনাবাহিনী, নেতা এবং সাধারণ মানুষের জন্য যাবতীয় কর্মকাণ্ড সুসংগঠিত করে আসেন। এবং জীবিতদের মাঝে মৃতদের সম্পদ ভাগ করে দেন। [cite: ১১৬৯]
নামাযের ওয়াক্ত হয়ে আসলে লোকজন বলতে লাগল, ‘আপনি বিলালকে আযান দিতে বলছেন না কেন?’ তিনি নির্দেশ দিলেন এবং আযান দেওয়া হলো। বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু আযান দেবার পরে সেখানে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে যতজন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ পেয়েছিলেন প্রত্যেকে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। তাদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা খুব মনে পড়ছিল। [cite: ১১৭০]
মদীনায় ফিরে যাওয়ার আগে তিনি সবার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমাদের দায়িত্ব আমার হাতে দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ তা’আলা তোমাদের ব্যাপারে আমাকে যেসব দায়িত্ব দিয়েছেন ইনশাআল্লাহ, আমি আমার সাধ্যমতো সবকিছু করার চেষ্টা করেছি। তোমাদের খাদ্যসামগ্রী তোমাদের মধ্যে ভাগ করে দিলাম, বাড়ি বরাদ্দ করেছি এবং সেনাবাহিনী সুসংগঠিত করেছি। আমরা যা করতে চেয়েছিলাম সব করা শেষ। তোমাদের হেফাযতের জন্য সেনাবাহিনী নিয়োগ করেছি এবং সীমান্ত আটকে দিয়েছি। গনিমতের মাল থেকে তোমাদের প্রাপ্য অংশ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। তোমাদের জন্য ভাতা এবং খাদ্যসামগ্রীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারও যদি মনে হয় যে আরও কিছু করা বাকি রয়ে গেছে, তবে আমাদের জানিয়ে দিলে আমরা তা করে দেব, ইনশাআল্লাহ। এবং আল্লাহ তা’আলা ছাড়া আমাদের আর কোনো শক্তি নেই।’ [cite: ১১৭১] নামাযের আগে এই খুতবা দিয়েছিলেন। তার পরপরই উল্লিখিত ঘটনাটি ঘটেছিল।
আমওয়াসের প্লেগ মুসলিমদের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছিল। এর ছোবলে বিশ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। বাইজেন্টাইনদের সাথে এর সম্পর্ক ছিল। মুসলিমরা বিপদ আঁচ করতে পারছিল। কারণ, সিরিয়ায় মুসলিমসেনার সংখ্যা যে হারে হ্রাস পাচ্ছিল তা বাইজেন্টাইনদের জানতে বাকি ছিল না। সুতরাং এমন দুর্বল মুহূর্তে তারা যে কোনো সময় হানা দিতে সক্ষম। তবে সাধারণ মানুষ মুসলিম শাসনপদ্ধতি এবং তাদের ন্যায়পরায়ণ ও সুন্দর আচরণ পেয়ে সন্তুষ্ট ছিল। সম্ভবত এই বিষয় বিবেচনা করে বাইজেন্টাইনেরা আঘাত হানতে আসেনি। কারণ, সাধারণ মানুষের সাহায্য ছাড়া সিরিয়ায় হামলা করা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া যুদ্ধে যুদ্ধে লোকজন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই আরবের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধের পরে সবাই একটু শান্তি চাচ্ছিল। মুসলিমদের বিজয় এবং তাদের প্রতি ভয় মানুষের মনে গেঁথে বসে। [cite: ১১৭২]

৫.৩.৫। প্লেগে আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ এবং ত্যাগের ফাতওয়া
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কোথাও এই রোগের কথা শুনলে সে অঞ্চলে যাবে না। তবে তোমরা থাকা অবস্থায় রোগ দেখা দিলে সে অঞ্চল ত্যাগ করবে না এবং তা থেকে পালানোর চেষ্টা করবে না।’ [cite: ১১৪৪]
আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ এবং ত্যাগ করা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ কেউ একে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেছেন আবার কেউ কেউ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। যারা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাদের মতে আক্রান্ত এলাকা থেকে বেরিয়ে যাওয়া জায়েয। এখানে আমরা দেখতে পেয়েছি যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চাচ্ছিলেন, আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু যেন বেরিয়ে আসেন। তিনি বরং মাফ চেয়ে নেন এবং সেখানে থেকে যাওয়ার অনুমতি চান। অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে নিম্নাঞ্চল থেকে সরে নির্মল বাতাসপূর্ণ পাহাড়ের দিকে চলে যেতে বলেন। তিনি তাই করলেন। সারগে বসে আব্দুর রহমান রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ এবং ত্যাগ না করা বিষয়ে হাদীস বর্ণনা করার পরে আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে চিঠি পৌঁছেছিল।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেবার মদীনায় ফিরে গিয়েছিলেন। মহামারী সবে শুরু হয়েছে, তখনো দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েনি। মদীনায় পৌঁছামাত্রই এর ভয়াবহ ছোবলে অগণিত প্রাণহানির খবর পান। আক্রান্ত অঞ্চল ত্যাগের পক্ষে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মত ছিল। এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামও সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে সিরিয়ায় ছিলেন এবং এই রোগ থেকে বেঁচে যান। উদাহরণ হিসেবে আমর ইবনুল আস এবং আবু মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুমের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।
আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ এবং ত্যাগ করা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কেউ বললেন, যারা বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহর হুকুম থেকে পালানো যায় না এবং পালিয়ে মৃত্যুকে দূরে ঠেলা যায় না তাদের জন্য আক্রান্ত অঞ্চল ত্যাগ করা জায়েয আছে। সেই অঞ্চল ত্যাগের জন্য উপযুক্ত কারণ থাকলে তা জায়েয হবে। চিকিৎসালাভের আশায় বের হয়ে আসা জায়েয হবে। প্লেগে আক্রান্ত অঞ্চলের চেয়ে ভালো কোথাও যাওয়ার অনুমতি আছে এবং যাওয়া উচিত।
আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে সেখানে থেকে যেতে চেয়েছিলেন। তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বাস্থ্যগত, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং নেতৃত্বের দায়বদ্ধতার চরম নযীর স্থাপন করেছেন। আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কারণগুলো উল্লেখ করে দিয়েছিলেন, ‘আমি বর্তমানে মুসলিম সেনাদের সাথে আছি। নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে তাদের ফেলে আসতে পারি না।’ আক্রান্ত অঞ্চল ত্যাগের বিপক্ষে যেসব উলামায়ে কেরাম মত দিয়েছেন তাদের যুক্তিও মজবুত। আক্রান্ত অঞ্চল থেকে যদি সবাই চলে যেতে থাকে তবে দুর্বল অক্ষম লোকজনের কী হবে? অসুস্থ বা অন্য যেকোনো কারণে সরতে অক্ষম লোকজনকে দেখাশোনা করার কেউ থাকবে না। চলে যাওয়ার অনুমতি পেলে শক্ত-সামর্থ্য লোকেরা চলে যাবে এবং অসহায়রা পড়ে থাকবে। এতে করে দুর্বলদের অসহায়ত্ব বেড়ে যাবে। এ জন্যই যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানোর ওপরে কঠিন নিষেধাজ্ঞা ছিল। এমন করলে পেছনে পড়ে থাকা মানুষগুলো আরও অসহায় হয়ে যেত এবং অবহেলিত মানুষকে আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাতে হতো।
পরিশিষ্ট সুতরাং আক্রান্ত অঞ্চলে থেকে যাওয়া কিংবা ত্যাগ করা দুটোর পক্ষেই যুক্তি বিদ্যমান। মহামরীতে একবার আক্রান্ত হয়ে পড়লে সেখান থেকে পালানোর মধ্যে কোনো যুক্তি নেই। তাতে বরং সুস্থ মানুষদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে। আর যারা সুস্থ ব্যক্তি তাদের মধ্যে কিছু লোক রোগীদের সেবায় ব্যস্ত থাকলে দু-একজন চিকিৎসার খোঁজে বের হতেই পারে। [cite: ১১৭৩]

টিকাঃ
১১৩৯. তারীখ আল-কুদাই, পৃ. ২৯৪।
১১৪০. আল-ফাতহ, ১০/১৮০।
১১৪১. আবু উবায়দা আমির ইবনে আল-জাররা, মুহাম্মাদ শাররাব, পৃ. ২২০।
১১৪২. আল-খুলাফা আর-রাশিদূন, আন-নাজ্জার, পৃ. ২২৪।
১১৪৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ২২২, ২২৩।
১১৪৪. আল-খুলাফা আর-রাশিদূন, আন-নাজ্জার, পৃ. ২২৫; তারীখ আত-তাবারি, ৫/৩৬।
১১৪৫. তারীখ আত-তাবারি, ৫/৩৫।
১১৪৬. তারীখ আত-তাবারি, পৃ. ১৭৪।
১১৪৭. তারীখ আত-তাবারি, ৫/৩৬।
১১৪৮. আল-ইকতিফা, পৃ. ৩/৩০৬।
১১৪৯. সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৩।
১১৫০. সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৪।
১১৫১. সূরা ফুরকান, ২৫: ৬৭।
১১৫২. আল-ইকতিফা, পৃ. ৩/৩০৭।
১১৫৩. প্রাগুক্ত।
১১৫৪. প্রাগুক্ত, ৩/৩০৯।
১১৫৫. প্রাগুক্ত, ৩/৩১০।
১১৫৬. তারীখ আত-তাবারি, ৫/৩৬।
১১৫৭. সূরা বাকারা, ২: ১৪৭।
১১৫৮. সূরা আস-সফ্ফাত, ৩৭: ১০২।
১১৫৯. আল-ইকতিফা, ৩/৩০৮।
১১৬০. প্রাগুক্ত।
১১৬১. হিলইয়াত আল-আওলিয়া, ১/২২৮-২৪৪।
১১৬২. প্রাগুক্ত।
১১৬৩. আল-ইকতিফা, ৩/৩০৯।
১১৬৪. আল-বিদায়া ওয়া আন-নিহায়া, ৭/৯৫।
১১৬৫. মাজমূআত আল-ওয়াসাইক আস-সিয়াসিয়া, পৃ. ৪৯০।
১১৬৬. আল-ইকতিফা, ৩/৩১০।
১১৬৭. আল-কামীল ফী আত-তারীখ, ১/১৭১,১৭২; তারীখ আয-যাহাবি, পৃ. ১৮১।
১১৬৮. আল-ফারূক উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ রিদা, পৃ. ২৩০।
১১৬৯. আল-খুলাফা আর-রাশিদূন, আন-নাজ্জার, পৃ. ৩২৫; আল-ফারূক উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ রাশিদ রিদা, পৃ. ২৩০।
১১৭০. খুলাসাত তারীখ ইবনে কাসীর, আল-খিলাফা আর রাশিদা, পৃ. ২৩৬।
১১৭১. আল-বিদায়া ওয়া আন-নিহায়া, ৭/৭৯।
১১৭২. আশহার আল-মাশাহীর, ২/৩৬১।
১১৭৩. আবু উবায়দা আমির ইবনুল জাররা, শাররাব, পৃ. ২৩২-২৩৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00