📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 উমর রা. এবং কবি ও কবিতা

📄 উমর রা. এবং কবি ও কবিতা


আমাদের জানামতে উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে মদীনায় কবিতার অস্তিত্ব ছিল, এবং ভালোমতোই ছিল। আরবি কবিতা নিয়ে ইতিহাসের এমন কোনো কিতাব নেই যেখানে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাম উল্লেখ করা হয়নি। বিশেষ করে সাহিত্য সমালোচনায় তার নাম বার বার এসেছে। সেসব তথ্য থেকে জানা গেছে যে তার সময়ে কবিতা আবৃত্তি এবং শোনার রেওয়াজ ছিল। সাহিত্য নিয়ে যে খুব বিশ্বাসযোগ্য এবং ধারাবাহিক বর্ণনা পাওয়া যাবে এমন ভাবার অবকাশ নেই। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এবং হাদীসে প্রবাদ-প্রবচনের পাশাপাশি নাবিঘা আল-জাদী, উমাইয়া ইবনে আবি আস-সালত এবং হাসান ইবনে সাবিতের কবিতার উল্লেখ আছে। এগুলোর বাইরেও খুলাফায়ে রাশেদীন, তাবেয়ীন এবং তাবে তাবেয়ীনদের সময়কার সাহিত্যের যেসব সমালোচনা ও পর্যালোচনা পাওয়া গেছে, সেগুলো থেকে জানা যায়, তখন কবিতার চল ছিল।
এখানে সাহিত্যের কিতাব এবং বিদ্বান ব্যক্তিরা মূলত এসব তথ্যের উৎস। নিঃসন্দেহে তথ্যগুলো মূল্যবান।
৪.৩.১। উমর রা. এবং কবিতা
খুলাফায়ে রাশেদীনের মধ্যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কবিতার প্রতি সবচেয়ে বেশি ঝোঁক ছিল। তিনি কবিতার সমালোচনা করতেন এবং সুযোগ পেলেই বিভিন্ন উপলক্ষে কবিতা আবৃত্তি করতেন। তার প্রসঙ্গে বলা হয়, 'উমর ইবনুল খাত্তাবের সামনে কোনো ঘটনা ঘটেছে আর তিনি তা নিয়ে কবিতা আবৃত্তি করেননি তা কখনো হয়নি।'
বর্ণিত আছে, একবার নতুন আলখাল্লা পরে তিনি বের হন। লোকজন তাকে দেখছিল বলে তিনি বলেছিলেন (কবিতায়),
হরমুষের ধন-দৌলত কাজে আসেনি; আদ জাতি অমরত্বের স্বাদ নিতে গিয়ে হার মেনেছে। চারদিক থেকে সৈন্য পাঠানো সম্রাটরা আজ কোথায়? যে জলাধার থেকে পান করেছে সবাই, আমরাও তা থেকে পান করব নিশ্চয়ই।'
গবেষকমাত্রই জানেন যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অসংখ্য কবিতা আত্মস্থ করেছিলেন। সমসাময়িক হোক কিংবা প্রাচীন যে কোনো কবিতা তিনি খুব দ্রুত মনে করতে পারতেন এবং আবৃত্তি করে ফেলতেন। বলা যায়, তিনি ক্ষুরধার এবং গোছানো স্মরণশক্তির অধিকারী ছিলেন। যে কোনো অবস্থায় কবিতা তার ঠোঁটে প্রস্তুত থাকত। খুব সহজে বলে ফেলতেন। হিন্দ বিনতে উতবা একবার অন্যান্য মুসলিম এবং হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে কী বলেছিলেন সে কথা তিনি হাসান ইবনে সাবিতকে কবিতার মাধ্যমে জানান। এর ফলে হাসানের প্রতিহিংসাপরায়ণ অন্তরে তিনি মায়া জাগাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সুতরাং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে শুদ্ধ অনুভূতিসম্পন্ন স্পর্শকাতর ব্যক্তি বলা যেতে পারে। তিনি কবিতা ভালোবাসতেন, আবৃত্তি করতেন এবং এর মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করতে জানতেন। কোনো কোনো গবেষকের মতে, তিনি কবি ছিলেন; তথ্যটি সঠিক নয়। নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে তাকে কবি বলা যাবে না। কারণ, তার জীবনযাপন ছিল খোলা কিতাবের মতো। মানুষের কাছ থেকে কখনো কিছু আড়াল করেননি। তিনি বহু লোকজন নিয়ে চলাফেরা করতেন। সুতরাং কোনোদিন কোনো কবিতা রচনা করে থাকলে তা অবশ্যই জানা যেত এবং লোকেরা তা আবৃত্তি করত। তা প্রচার হতে সময় লাগত না। কোনো না কোনোভাবে বর্ণনাকারীদের কাছ থেকে সে তথ্য আমরাও পেয়ে যেতাম। দেখা গেছে প্রবীণ সমালোচকেরা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কবি ছিলেন এমন দাবি করেননি। ইবনে সাল্লাম তার তাবাকাতে অথবা ইবনে কুতায়দা তার আশ-শায়র ওয়া আশ-শুআরাতেও এ প্রসঙ্গে কিছু বলেননি। আল-জাহিয তার কিতাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাকপটুত্ব এবং জ্ঞান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, সেখানেও এ কথা আসেনি। আল-মুবাররাদ উল্লেখ করেছেন—তার সাথে মুতাম্মাম ইবনে নুওয়ায়রা তার মালিক ইবনে নুওয়ায়রার আখ্যানেও একমত পোষণ করেছেন—উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুতাম্মামকে বলেছিলেন, ‘আপনি আপনার ভাইকে নিয়ে যেমন স্তুতি লিখেছেন আমিও যদি এমন লিখতে পারতাম।
ইসলামি জীবনের সৌন্দর্য, ইসলামী নীতিবহুল বর্ণনা, নতুন ধর্মের শিক্ষা এবং মূল্যবোধের কথা আছে এমন কবিতা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খুব বেশি প্রিয় ছিল। মুসলিমরা যেন সুন্দর সুন্দর কবিতা শেখে তার প্রতি উৎসাহ দিয়ে বলতেন, 'কবিতা শিখবে, কারণ, তাতে সুন্দরের খোঁজ পাওয়া যায়, অসুন্দর বিদূরিত হয় এবং জ্ঞানীদের জন্য জ্ঞান থাকে, এবং সুন্দর আচরণের অনুপ্রেরণা দেয়।'
মিসরের গভর্নর আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে তিনি লিখেছিলেন, 'লোকদের কবিতা শিখতে বলবে, কারণ, কবিতা সুন্দর চরিত্র গঠন করে, মন উন্নত করে এবং বংশানুক্রমে জ্ঞান বৃদ্ধি করে।'
এখানেই শেষ নয়; তার কাছে কবিতা ছিল ভালো কাজের প্রতি হৃদয় উৎসারিত করার চাবিকাঠি। কবিতার উপকারিতা এবং গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, 'কবিতা রচনার করতে জানা মানুষের শ্রেষ্ঠতম দক্ষতা। মনের সাধ কবিতার মাধ্যমে মেটানো যায়। কবিতা অভিজাতদের সমবেদনা অর্জন করে এবং যারা অভিজাত নয় তাদেরও মন গলাতে সক্ষম।'
সন্তানদের শিক্ষাদীক্ষায় পরিপূর্ণতা আনার জন্য তিনি পিতামাতাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন তারা যেন সুন্দর সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করে শোনায়। তিনি বলেছিলেন, 'তোমরা সন্তানদের সাঁতার এবং ধনুর্বিদ্যা শেখাও, ঘোড়াচালনায় দক্ষ হতে প্রশিক্ষণ দাও এবং সুন্দর সুন্দর কবিতা শেখাও।'
জাহেলী যুগের কবিতা কুরআন-সংশ্লিষ্ট ছিল বলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তা পছন্দ করতেন। তার বক্তব্য ছিল, 'নিজের ঐতিহাসিক দলিল আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করবে, তাহলে পথ হারাবে না।' তার কথা শুনে লোকেরা জানতে চাইল, 'আমাদের ঐতিহাসিক দলিল কোনগুলো?' তিনি বললেন, 'জাহেলী যুগের কবিতা। সেগুলোতে তোমাদের কিতাবের ব্যাখ্যা আছে এবং ভাষার অর্থ আছে।'
কুরআনের বিখ্যাত তাফসীরবিদ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মুখেও একই কথা শোনা গেছে। তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ছাত্রও বটে। তিনি বলেছেন, 'আল্লাহর কিতাব থেকে কোনো কিছু বুঝতে না পারলে আরবদের কবিতা থেকে তা অর্থ করার চেষ্টা করো। কারণ, সে কবিতাগুলো আরবদের ঐতিহাসিক দলিল।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিশ্বাস করতেন জাহেলী যুগে কেবল কবিতার মাধ্যমে জ্ঞানের সুস্থ চর্চা করা হতো। বর্ণিত আছে, তিনি বলতেন, 'মানুষের জ্ঞান কবিতায় ফুটে উঠত। এর বাইরে তাদের কোনো সুস্থ জ্ঞানচর্চা ছিল না। অতঃপর ইসলামের আবির্ভাব ঘটার পর থেকে আরবেরা কবিতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাইজেন্টাইনদের লড়াই-জিহাদের কারণে তারা কবিতা থেকে সরে আসে। ইসলামের জয় হলো, নতুন ভূখণ্ড বিজিত হলো। আরবরা বিভিন্ন জায়গায় বসতি স্থাপন করল। এবার যখন তারা কবিতার দিকে ফিরে যেতে লাগল তখন আর রচনা করার মতো কোনো বিষয় খুঁজে পাচ্ছিল না। তারা এই অবস্থার সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে শুরু করে। এরপরে আরবদের অনেকেই নিহত হয়েছে এবং মৃত্যুবরণ করেছে। ফলে অধিকাংশ কবিতা হারিয়ে গিয়ে কিঞ্চিৎ রক্ষা পেয়েছে।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এমন কবিরা কদর পেতেন যাদের অন্তর ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল এবং যারা ইসলামী মূল্যবোধ তুলে ধরতেন। তাদের ছত্রে ছত্রে ইসলামের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রতিফলিত হয়েছে এবং ইসলাম-উদ্ভূত গুণাবলী প্রকাশ পেয়েছে। এর বাইরে কোনো কবিতায় ইসলামের বিরুদ্ধে বক্তব্য থাকলে তিনি তখনই তা বাতিল করে কবির বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নিতেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তীক্ষ্ণ অনুভূতি এবং সুন্দর রুচিবোধসম্পন্ন ছিলেন। তার এই গুণাবলীর ভিত্তিতে তিনি খুব সহজেই কবিতার গহীনে ডুব দিতে সক্ষম ছিলেন। ফলে কবিতা ইসলামী মূল্যবোধ এবং শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা সহজেই উপলব্ধি করতে পারতেন।
৪.৩.২। উমর রা. এবং হুতায়া ও আয-যাবারকান ইবনে বদর
কথিত আছে কবি আল-হুতায়া—আবু মুলায়কা-জারওয়াল ইবনে আওস বনু কুতায়া ইবনে আবাস গোত্রের লোক ছিলেন। দুর্ভিক্ষের প্রকোপ থেকে বাঁচার জন্য সে পরিবারসহ ইরাকের উদ্দেশ্যে বের হন। তার সাথে আয-যাবারকান ইবনে বদর ইবনে ইমরুল কয়েস ইবনে খালাফ আত-তামীমি আস-সাদির দেখা হয়। সে তার লোকেদের পক্ষ থেকে যাকাত নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে যাচ্ছিল। আয-যাবারকান তাকে চিনতে সক্ষম হয় এবং তার দুরাবস্থা অনুভব করছিল। সে আল-হুতায়াকে তার জন্য অপেক্ষা করতে বলে চলে গেল। তার অনুরোধে আল-হুতায়া তার লোকজনের মাঝে অপেক্ষা করতে থাকে। সেখানে বাগীদ ইবনে আমির ইবনে শাম্মাস ইবনে লুআয় ইবনে জাফার আনফ আন-নাকা নামে এক ব্যক্তিও ছিল। সে ছিল আয-যাবারকানের ঘোর শত্রু। কোনোভাবে লোকটি আল-হুতায়ার মন থেকে আয-যাবারকানকে সরিয়ে দিতে সফল হয়। আল-হুতায়া তার পক্ষে চলে যায়। সুতরাং আল-হুতায়া কবিতার মাধ্যমে আয-যাবারকানকে অপমান করে বনু আনফ আন-নাকার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে। এর ছত্রে ছত্রে অবমাননাকর কথা ছিল। আয-যাবারকান এর কয়েকছত্র তুলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে পাঠিয়ে দেন। এর একটি ছত্র এমন ছিল :
উচ্চাশা নিয়ে চিন্তিত হয়ো না; আর এজন্য সফরও করো না। বসে থাক, খাবার আর পোশাক এমনিতেই পাবে।
ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লেখার অভিযোগ নিয়ে সে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দরবারে হাজির হলো। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'সে কি বলেছে?' সে উপর্যুক্ত অংশ উল্লেখ করল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'সামান্য তিরস্কার ছাড়া আমি এতে অপমানের কিছু দেখছি না।' সে বলল, 'আমার লক্ষ্য কি কেবল খাওয়া-পরায় সীমাবদ্ধ?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হাসানকে আমার কাছে নিয়ে এসো।' তিনি হাসানকে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'তাকে অপমান করা হয়নি, পঁচানো হয়েছে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে হাজতে পুরে দিলেন। সন্দেহ নেই কাব্যরসিকদের মধ্যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সবচেয়ে জ্ঞানী ছিলেন।
তবে এবার যেহেতু বিচারকের দায়িত্ব পালন করছিলেন তাই সাক্ষ্য প্রদানের জন্য তিনি বিশেষজ্ঞের মতামত নিতে চাইলেন। আল-আক্কাদ এই ঘটনা প্রসঙ্গে বলেছেন, 'তিনি কবিতায় পারদর্শী ছিলেন, কবিতার সমালোচক ছিলেন। অথচ বিচার করতে গিয়ে তিনি সামান্যতম সন্দেহের অবকাশ রাখতে চাননি। নিজের কাব্যগুণের ওপরে নির্ভর না করে ওই বিষয়ে বিজ্ঞজনের পরামর্শ গ্রহণ করেছেন।'
আল-হুতায়া কারাগারে থাকার সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মন গলানোর চেষ্টা করতে থাকে। খলীফাকে লেখা কবিতায় সে নিজের অপরাধ অস্বীকার করেছিল; কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার ক্ষমার আর্জি গ্রহণ করেননি। এরপরে সে একর পর এক ছত্র লিখে যেতে থাকে। তার সন্তানদের কথা খুব করুণভাবে বর্ণনা করতে থাকে। সে তার সন্তানদের পালকহীন অসহায় পাখির বাচ্চা বলে উল্লেখ করেছে, যাদের মুখে খাবার তুলে দেবার এবং দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই; কারণ, সে তার পরিবারের একমাত্র উপার্জক্ষম ব্যক্তি ছিল। তাকে অন্ধাকারে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে বলে সে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে।
তার এই পঙক্তিগুলোয় কাজ হলো। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এগুলো পড়ে কাঁদতে লাগলেন। তিনি তাকে ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেন। তার মুখ বন্ধ রাখার জন্য তিনি তার কাছ থেকে তিন হাজার দিনারের বদলে মুসলিমদের সম্মান কিনে নেন। অথচ আল-হুতায়া এ নিয়েও অভিযোগ করে একের পর এক কবিতা রচনা করতে লাগল।
তার এমন আচরণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বুঝতে পারলেন যে আল- হুতায়ার মধ্যে কোনোকিছুর আসর পড়েনি। তাই তিনি লোকটির বিরুদ্ধে ফরমান জারি করে ডেকে আনেন। সামনে বসিয়ে তার জিহ্বা কেটে ফেলার হুমকি দেন। তখন আল-হুতায়া বলে উঠল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর কসম, আমি আমার বাবা-মাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেছি। আমার স্ত্রী এমনকি আমার নিজেকে নিয়েও এ কাজ করেছি।’ তার কথা শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হাসলেন এবং তাকে ছেড়ে দিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে সে আর কোনোদিন ব্যঙ্গাত্মক কবিতা রচনা করেনি।
যাহর আল-আদাব কিতাবেও এমন একটি ঘটনার উল্লেখ আছে। লেখক উদ্ধৃত করেছেন : বনু আল-আজলানের লোকেরা তাদের নাম নিয়ে খুব গর্ব করত। আব্দুল্লাহ ইবনে কাব নামে তাদের একজন পূর্বপুরুষ ছিল। সে মেহমানদের খুব দ্রুত (তা'জীলের সাথে) আপ্যায়ন করতে পারত বলে তাকে আল-আজলান উপাধি দেওয়া হয়। বিষয়টি তাদের জন্য খুব গর্বের ছিল। এর মধ্যে আন-নাজাশী—যার আরেক নাম ছিল কয়েস ইবনে আমর ইবনে কাব—তাদের নাম নিয়ে বিদ্রূপাত্মক কবিতা রচনা করতে থাকে। সেখানে তাদের নামের উৎপত্তির প্রসঙ্গে বলেছে, ‘হে দাস, যাও দ্রুত পশুর দুধ দোহন করে আন!’ অর্থাৎ, এমন কাজ করত বলে তাদের পূর্বপুরুষকে ওই উপাধি দেওয়া হয়েছে।
বর্ণনাকারীরা উল্লেখ করেছেন যে বনু আজলানের লোকেরা আন-নাজাশীর নামে নালিশ নিয়ে যায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে কারাগারে পুরে দেন এবং কারও কারও মতে খলীফা তাকে বেত্রাঘাতও করেছিলেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মানুষকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করার জন্য যেমন শাস্তি দিতেন তেমনই কবিতার ধরনে গড়মিল হলেও তাদের রক্ষা ছিল না। মুসলিমদের অপমান করা হলে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করলে এবং মুসলিম নারীদের কথা উল্লেখ করলেও তিনি শাস্তি দিতেন।
৪.৩.৩। কঠিন উমর রা. কবিতার প্রভাবে নম্র ও সমব্যথী হয়ে উঠতেন
উমাইয়া ইবনুল আস্কার আল-কিনানী নামে এক নেতা ছিলেন। তার এক সন্তানের নাম ছিল কিলাব। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে তিনি মদীনায় হিজরত করে আসেন এবং কিছুদিন অবস্থান করেন। তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ এবং আয-যুবায়র ইবনুল আওয়ামের সাথে দেখা হলে তাদের কাছে জানতে চাইলেন, 'ইসলামের কোন কাজটি শ্রেষ্ঠ?' একজন বললেন, 'জিহাদ।' একজন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অনুরোধ করলেন তাকে যেন পারস্যে লড়তে যাওয়া সৈন্যদের সাথে পাঠানো হয়। উমাইয়া উঠে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমার বয়স বাধা না হলে আমি আজই জিহাদের জন্য চলে যেতাম।' তার ছেলে কিলাব খুব ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন। তিনি দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আখেরাতের খাতিরে আমি আল্লাহ তা'আলার কাছে আমার প্রাণ এবং এই পৃথিবী বিক্রি করে দিতে রাজি আছি।' তার বাবা তাকে জড়িয়ে ধরে খেজুর গাছের ছায়ায় চলে গেলেন। বলতে লাগলেন, 'তোমার বৃদ্ধ, দুর্বল বাবা-মাকে এভাবে ফেলে যেয়ো না। সেই ছোট্টটি ছিল। তোমাকে এত আদর-যত্নে বড় করেছি। এখন তাদের প্রয়োজনের সময় কিনা তুমি তাদের ফেলে যেতে চাচ্ছ।' তিনি বললেন 'আরও ভালো কিছুর আশায় আমি তাদের রেখে যেতে চাচ্ছি।' ছেলেটি তার বাবার অনুমতি নিয়ে জিহাদের উদ্দেশ্যে চলে যান। তার বাবা তখনো সেই খেজুরগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে রইলেন। এমন সময় একটা কবুতর তার বাচ্চাদের জন্য ডেকে ওঠে। ওই ডাক শুনে বৃদ্ধ বাবার মন হুহু করে ওঠল। তিনি কাঁদতে লাগলেন, বৃদ্ধা মা-ও কাঁদতে শুরু করলেন।
উমাইয়া অন্ধ ছিলেন। তার পথপ্রদর্শক তাকে হাতে ধরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে নিয়ে যান। খলীফা তখন মসজিদে অবস্থান করছিলেন। বৃদ্ধ বাবা কবিতার পঙক্তি সাজিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে ছেলেকে ফেরত চাইতে লাগলেন। তার কথায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর চোখে অশ্রু বয়ে যায়। তিনি আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে পত্র মারফত কিলাবকে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন। আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু সাথে সাথে কিলাবকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথামতো কিলাব তার সাথে আগে দেখা করতে যান। তিনি উমাইয়াকে ডাকতে পাঠিয়ে কিলাবের সাথে কথা বলতে লাগলেন। উমাইয়া হাজির হলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'আজ কোনো জিনিস পেলে আপনি সবচেয়ে খুশি হবেন?' বৃদ্ধ বাবা বললেন, 'কিলাবকে। তাকে পেলে আমি তার গায়ের ঘ্রাণ নিতাম।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কিলাবকে বেরিয়ে আসতে বললেন। তার বাবা দাঁড়িয়ে গেলেন, সন্তানের গায়ের ঘ্রাণ নিতে লাগলেন, ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। এমন দৃশ্য উপস্থিত সবাইকে কাঁদিয়ে দিল। তারা কিলাবকে বলতে লাগল, 'বাবা-মায়ের কাছে থেকে যাও এবং তারা যতদিন বেঁচে থাকবেন তাদের খুশি রাখার চেষ্টা কর। তারা যখন থাকবেন না তখন না হয় যা খুশি কর।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার জন্য ভাতার নির্দেশ দিয়ে বিদায় দিলেন। কিলাব একজন সেরা মুসলিম ছিলেন। তার বাবা-মা যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনি তাদের সাথে থাকতেন।
এমন ঘটনা আরেকবার ঘটেছিল। শায়বান ইবনুল মুখাব্বাল আস-সাদী নামে একজন বিখ্যাত কবি ছিলেন। তিনি সাদ ইবনে ওয়াক্কাসের সাথে পারসিকদের বিরুদ্ধে লড়তে চলে যান। এদিকে তার বৃদ্ধ পিতা, আল- মুখাব্বাল, খুব দুর্বল ছিলেন। তিনি সন্তানের অনুপস্থিতি মেনে নিতে পারছিলেন না। সারাক্ষণ আতংকে থাকতেন। নিজের ভয় এবং দুঃখের কথা কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। তার কবিতা শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মন ব্যথিত হয়ে ওঠে। তিনি এক পর্যায়ে কেঁদে ফেলেন। তিনি সাদের কাছে চিঠি লিখে শায়বানকে ফেরত পাঠাতে বলেন। শায়বান ফিরে এলে তাকে তার বাবার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কবিতায় আপ্লুত হওয়ার ঘটনার এখানেই শেষ নয়। এমন বহুবার ঘটতে দেখা গেছে। খাররাশ ইবনে আবি খাররাশ আল- হুযালী উমর ইবনুল খাত্তাবের খেলাফতকালে হিজরত করে মদীনায় এসেছিলেন। তিনি মুসলিমদের সাথে একটি সেনা অভিযানে যোগ দেন। তারা এক পর্যায়ে শত্রুর এলাকায় ঢুকতে সক্ষম হন। এমন সময় আবু খাররাশ এসে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সামনে বসে পড়লেন এবং তার ছেলেকে কি পরিমাণে মনে পড়ছে তা বলতে লাগলেন। তিনি এমন এক ব্যক্তি ছিলেন যার পরিবারের সবাই নিহত হয়েছিল, তার ভাইয়েরাও নিহত হয়। তার সন্তান খাররাশ ছাড়া তাকে দেখাশোনা করার মতো এবং সাহায্য করার মতো আর কেউ ছিল না। সে-ও তাকে ফেলে মুসলিমদের সাথে অভিযানে চলে গেছে। তার কবিতার ছত্রে ছত্রে মনের ব্যথা ও ব্যকুলতা ফুটে উঠতে থাকে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কবিতা শুনেও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এবারও তিনি চিঠি দিয়ে খাররাশকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন এবং বৃদ্ধ পিতার কাছে পাঠিয়ে দেন। সেবার তিনি একটি ফরমান জারি করেন। নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাদের বয়োবৃদ্ধ বাবা আছে তারা যেন তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে।
দেখা যাচ্ছে যে কঠিন এবং দৃঢ়চেতা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুও কবিতা শুনে আপ্লুত হতেন, এমনকি কাঁদতেন পর্যন্ত। এখানে তার মানবিক অনুভূতি এবং স্পর্শকাতরতার পরিচয় পাওয়া যায়। দুর্বল এবং বৃদ্ধ পিতাদের জন্য তার সমবেদনা ফুটে উঠেছে। কারণ, তারা তাদের সন্তানের ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তাছাড়া নির্যাতিত এবং অসহায় মানুষের জন্যও তার সমবেদনা ছিল লক্ষ্যণীয়। তাদের কষ্ট তিনি খুব অনুভব করতেন। ব্যঙ্গাত্মক কবিতা নিয়ে যেসব পরিস্থিতি তৈরি হতো সেখানেও তার সমবেদনা নজরে পড়েছে।
৪.৩.৪। উমর রা.-এর কাব্য সমালোচনার গুণ
উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। ফলে তাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করতেন। সাহিত্য কিংবা কবি ও কাব্য সমালোচনাও তার ওপরে এমন প্রভাব বিস্তার করেছিল। একাধিক বর্ণনায় তার সাহিত্য বিষয়ক মতামত এবং সাহিত্য সমালোচনার প্রসঙ্গ এসেছে। এর সময়সীমা তার খেলাফত থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দশ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত। সাহিত্যের প্রতি তার কেমন ঝোঁক ছিল, তার শিক্ষাদীক্ষা এবং অভিজ্ঞতার আলোকে কীভাবে তার দৃষ্টিভঙ্গির উত্তরণ ঘটেছে বিভিন্ন বর্ণনা থেকে এসব তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাব্য সমালোচনার গুণ তৈরি এবং উত্তরণের পেছনে যেসব কারণ, বিদ্যমান সেগুলো জানতে হলে তার জীবনের দুটি পর্যায় বিশ্লেষণ করতে হবে—জাহেলী এবং ইসলামী। এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
জাহেলী যুগে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জাহেলী প্রথার অন্যতম ধারক এবং বাহক ছিলেন। আরবদের মধ্যে কুরাইশেরা খুব প্রভাবশালী ছিল। আর কুরাইশদের মধ্যে তিনি উঁচু স্থান দখল করে ছিলেন। আরবদের মধ্যমণি ছিলেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনিও আরবদের যেমন ভালোবাসতেন তেমনই তাদের প্রতি খুব শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। আবার খেলাফতকালীন তিনি ইসলামের প্রতিও একইরকম বিশ্বস্ত থেকেছেন।
জাহেলী এবং ইসলামী, দুই যুগেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কবিতায় দক্ষ ছিলেন। সুতরাং মুশরিক, মুরতাদের মতো ইসলামের শত্রুরা কবিতার মাধ্যমে নতুন ধর্ম সম্পর্কে কি বার্তা দিচ্ছে তা তিনি খুব সহজেই ধরতে পারতেন।
সন্দেহ নেই, তিনি জাহেলী এবং ইসলামী, দুই যুগ সম্পর্কেই জানতেন। মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস, বংশানুক্রম, আচরণ এবং জ্ঞান সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান ছিল। ফলে তিনি বক্তব্য বিশ্লেষণ এবং প্রকাশ করতে পারতেন।
অল্প বয়স থেকেই তিনি সাহিত্যচক্রের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। এগুলো সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, আবৃত্তি, সমালোচনা, মূল্যায়ন এবং মত-বিনিময় নিয়ে মুখর থাকত। মুসলিম হওয়ার পরেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সুন্দর ফল বেছে নেবার মতো করে সুন্দর শব্দচয়ন করে যারা কথা বলতেন তাদের সাথে ওঠাবসা করতে পছন্দ করতেন। ইবাদত এবং আল্লাহর জন্য জিহাদের পরেই এই কাজ তার সবচেয়ে প্রিয় ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কথা বলে সময় কাটাতেন যে কয়জন সাহাবী তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম ছিলেন। তিনি খলীফা থাকাকালীন মসজিদের পাশে একটি আলোচনাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আল-বাতহা নামে পরিচিতি লাভ করে। সেখানে কাব্যপ্রেমী এবং কবিতার শিক্ষার্থীরা জড়ো হতো।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লামের সাহাবী উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দূরদর্শী, প্রতিভাধর, অসাধারণ বুদ্ধিমান এবং উৎসাহী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি খুব সহজেই সঠিক অর্থ বের করে ফেলতেন, এক্ষেত্রে তার কখনো ভুল হতো না। উপরন্তু তিনি সুন্দর পংক্তি শুনলে আপ্লুত হয়ে পড়তেন। তিনি এমন কবিতার কদর করতেন, প্রশংসা করতেন। বর্ণিত আছে মুতাম্মান ইবনে নুওয়ায়রা তার ভাই মালিককে নিয়ে স্তুতি রচনা করেছিলেন। রিদ্দার যুদ্ধে সে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সেনাদের হাতে নিহত হয়। তার স্তুতিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এতটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন যে তার সাথে দেখা করতে চলে যান। কবিকে বললেন, 'আপনি আপনার ভাই মালিককে নিয়ে যেভাবে স্তুতি রচনা করেছেন আমিও যদি আমার ভাই যায়দ ইবনুল খাত্তাবকে নিয়ে এমন লিখতে পারতাম।' খলীফাকে তিনি বললেন, 'হে আবু হাফস, আল্লাহর কসম আমার ভাইয়ের পরিণতি আপনার ভাইয়ের মতো হবে জানলে তার স্তুতি লেখার প্রয়োজন পড়ত না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আপনার মতো করে আমাকে এভাবে কেউ এমন সান্ত্বনা দেয়নি।'
স্পষ্টতা
বর্ণিত আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হারাম ইবনে সিনানের এক ছেলেকে বলেছিলেন, 'যুহায়র তোমার প্রশংসা করতে গিয়ে যা রচনা করেছে আমাকে তার কিছু শোনাও।' সে আবৃত্তি করল। এবার তিনি বললেন, 'সে তোমার প্রশংসা করেছে এবং বেশ ভালোভাবে করেছে।' ছেলেটি বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমরা তাকে প্রচুর পুরস্কার দিয়েছি।' এবার তিনি বললেন, 'তোমরা যা দিয়েছ তা শেষ হয়ে গেছে। আর সে যা দিয়েছে তা টিকে আছে।'
রচনাশৈলীর মানের ওপরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কবিতা ও কবি ভালো লাগার মান নির্ভর করত। ভাষার সুষ্ঠু প্রয়োগ তার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, তার নিজের ভাষাও গড়ে উঠেছিল আরবী ভাষার সৌন্দর্য ও বাগ্মীতার ভিত্তিতে। ব্যাকরণগত ভুলত্রুটি তিনি অপছন্দ করতেন। সুতরাং কোনো লেখা বাতিল করার জন্য এই ত্রুটিই যথেষ্ট ছিল। ব্যাকরণগত ভুল করার জন্য লোকজনকে শাস্তি দেবার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
অস্পষ্ট ও জটিল শব্দের বদলে পরিচিত ও সহজ শব্দের ব্যবহার
বর্ণিত আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যুহায়রের কবিতা পছন্দ করতেন বলে তার কাছে যেতেন। তার সহজ-সাবলীল কবিতায় কোনো ঘোরপ্যাঁচ থাকত না। তাই তার কবিতা তিনি পছন্দ করতেন। আর সত্য না বললে তিনি কারও প্রশংসা করতেন না।
ইসলামে কেমন কবিতা গ্রহণযোগ্যতা পায় এখানে তা স্পষ্ট হয়েছে। যে কবিতার অর্থ সহজে বোঝা যায়, যেখানে পরিচিত শব্দ ব্যবহার করা হয়, জীবনঘনিষ্ঠ এবং বাহুল্যবর্জিত সেগুলোই গ্রহণযোগ্য। কারণ, কবিতা সাধারণত বিপুল সংখ্যক মানুষকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয় এবং সেখানে তাদের জন্য বার্তা থাকে। তাই এগুলো বুদ্ধিদীপ্ত হওয়া প্রয়োজন।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ভাষার অলংকার কতটুকু থাকবে তা-ও এ বিষয়ে যারা পারদর্শী তারা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশক্রমে এর সীমারেখা নির্ধারণ করে দেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের কাছে চিঠি লিখলেন, 'আপনার শত্রুদের অবস্থান এবং আপনার পরিস্থিতি জানা ছিল না বলে চিঠি দিতে পারছিলাম না। মুসলিমরা কোথায় ঘাঁটি স্থাপন করেছে এবং আপনাদের ও আল-মাদাইনের মাঝে কোনো অঞ্চল পড়েছে তা সবিস্তারে জানাবেন। আমি আপনার পরিস্থিতির স্পষ্ট এবং সম্পূর্ণ চিত্র চাচ্ছি।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দৃষ্টিতে স্পষ্টতা কতটা জরুরী ছিল তা চিঠির শেষের অংশে 'আমি স্পষ্ট চিত্র চাই'–এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়।
শব্দ অর্থপূর্ণ হতে হবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর একটি উদ্ধৃতি, ‘ঘোরপ্যাঁচ থেকে সাবধান থাকবে।’ ইমাম আদ-দারিমি বলেছেন, 'এখানে তিনি লম্বা-চওড়া বক্তব্য প্রসঙ্গে বলেছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অতিরিক্ত কথা অপছন্দ করতেন; কারণ, তাতে মূল বক্তব্য হারিয়ে যায় এবং বিকৃত হয়ে যায়।'
সঠিক জায়গায় সঠিক শব্দ প্রয়োগের সৌন্দর্য শব্দের ভুল প্রয়োগ দেখলেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিরক্ত হতেন। তাতে অর্থ নষ্ট হয়ে যায় এবং বিকৃতি ঘটে। বনু আর-হাসহাসের খাদেম সুহায়ম তার কবিতায় বলেছিল :
পাকা চুল আর ইসলাম মানুষকে (গোনাহ থেকে) প্রতিহত করার জন্য যথেষ্ট।
এর পরিপ্রেক্ষিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'তুমি পাকা চুলের আগে ইসলামের কথা বললে আমার বেশি ভালো লাগত।' এই বক্তব্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর উন্নত রুচিবোধের দলিল। মানুষের পাকা চুলের তুলনায়, চাই আগে পাকুক অথবা পরে, ইসলাম মানুষকে গুনাহ থেকে বাঁচাতে সক্ষম। সুতরাং গুরুত্বের বিচারে এবং মানুষের অন্তর প্রভাবিত করতে হলে ইসলামের নাম আগে আসা উচিত ছিল বলে তিনি মত দিয়েছেন। তার কবিতার পংক্তিতে এই দুর্বলতা ছিল।

টিকাঃ
৯৯৯. মাজমা আয-যাওয়াইদ, ৮/১২৬।
১০০০. আল-মাদীনা আন-নবুওয়া ফাজর আল-ইসলাম, ২/৯৮।
১০০১. আল-বায়ান, আল-জাহিয, ১/২৪১; আল-আদাব ফীল ইসলাম, নায়িফ মারূফ, পৃ. ১৬৯।
১০০২. প্রাগুক্ত।
১০০৩. আল-আদাব ফীল ইসলাম, নায়িফ মারূফ, পৃ. ১৭০।
১০০৪. আল-আদাব ফীল ইসলাম, নায়িফ মারূফ, পৃ. ১৭১।
১০০৫. আল-কামিল ফীল আদাব, আল-মুবাররাদ, ২/৩০১; আদাব সাদরুল ইসলাম, পৃ. ৮৭।
১০০৬. আদাব আল-ইমলা, আবু আস-সামামি, পৃ. ৭১।
১০০৭. আল-উমদা, আবু রাশীক, ১/১৫।
১০০৮. আল-আদাব ফীল ইসলাম, নায়িফ মারূফ, পৃ. ১৭১।
১০০৯. আল-কামিল ফীল আদাব, ২/২২৭।
১০১০. আল-মুজাম আল-কাবীর, আত-তাবরানি, ৭/১২৯; আল-আদাব আল-ইসলামি, পৃ. ১৭১।
১০১১. আল-আদাব আল-ইসলামি, পৃ. ১৭১; আল-উমদা, আবু রাশীক, ১/১৭।
১০১২. তাবাকাত আশ-শুআরা, ইবনে সাল্লাম, ১/২৫; আদাব সাদrুল ইসলাম, পৃ. ৮৭।
১০১৩. উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ আবু আন-নাসর, পৃ. ২১৮।
১০১৪. প্রাগুক্ত, পৃ.২১৯।
১০১৫. আল-আদাব ফীল ইসলাম, নায়িফ মারূফ, পৃ. ১৭২।
১০১৬. আবকারিয়া উমর, পৃ. ২৪৬।
১০১৭. আল-কামিল ফীল আদাব, ২/৭২৫।
১০১৮. যাহর আল-আদাব, আল-কয়রাওয়ানি, ১/৫৪; আল-আদাব ফীল ইসলাম, পৃ. ৯২।
১০১৯. আদাব সাদরুল ইসলাম, ড. ওয়াদি আস-সামাদ, পৃ. ৯২, ৯৩।
১০২০. আল-আদাব আল-ইসলামি, পৃ. ১৮০।
১০২১. উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ আবু আন-নাসর, পৃ. ২২৮।
১০২২. আদাব সাদrুল ইসলাম, ড. ওয়াদি আস-সামাদ, পৃ. ৯০।
১০২৩. আল-আঘানি আল-আসফাহানি, ১৩/১৮৯।
১০২৪. আদাব সাদrুল ইসলাম, ড. ওয়াদি আস-সামাদ, পৃ. ৯০।
১০২৫. উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ আবু আন-নাসর, পৃ. ২৪৪।
১০২৬. যেখানে মালিকের গন্তব্য হলো জাহান্নাম আর যায়দ যাবেন জান্নাতে।
১০২৭. উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ আবু আন-নাসর, পৃ. ২৪৪; আল-কামিল, আল-মুবাররাদ, ২/৩০০।
১০২৮. আল-মাদীনা আন-নাবাউয়িয়া ফাজর আল-ইসলাম ওয়া আল-আসর আর-রাশিদি, ২/১০২।
১০২৯. উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ আবু আন-নাসর, পৃ. ২৪৮।
১০৩০. আল-মাদীনা আন-নবুওয়া ফাজর আল-ইসলাম ওয়া আল-আসর আর-রাশিদি, ২/১০২।
১০৩১. প্রাগুক্ত, ২/১০২।
১০৩২. উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ আবু আন-নাসর, পৃ. ২৪৮।
১৩০৩. মাজমুআ আল-ওয়াসাইক আস-সিয়াসিয়া, পৃ. ৪১৪।
১৩০৪. সুনান আদ-দারিমি, ১/৯, উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ আবু আন-নাসর, পৃ. ২৫২ দ্রষ্টব্য।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00