📄 তিন মদীনকে ফাতওয়া এবং ফিকহ-এর মূলকেন্দ্রে পরিণত করেন
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকাল হলো। মদীনা তখন ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল। এর পাশাপাশি এ পুণ্যভূমি খলীফাদের নির্বাচনকেন্দ্রও ছিল। নতুন অভিযানের ফলে বিজিত নতুন অঞ্চলগুলোয় নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। তখন সাবাহায়ে কেরাম এই মদীনাতে বসেই সেগুলো সমাধানের জন্য ইসলামী শরীয়ত অনুসরণ করতে শুরু করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে মদীনার সমাজে বসবাস করে গেছেন এবং এখান থেকেই মানবজাতির পথনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখানে এমন এক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যার ধারেকাছেও অন্য কোনো সমাজব্যবস্থা এসে দাঁড়াতে পারেনি। খেলাফতের দশ বছর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার আখলাক এবং শাসনপদ্ধতির বদৌলতে মদীনায় হাদীস, ফিকহ এবং তাশরিয়ের (আইন প্রণয়নের) প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। প্রথম এবং দ্বিতীয় শতকেই এগুলো গঠিত হয়। নিচের এই বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে এগুলো গঠিত হয়েছিল:
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময় সাহাবায়ে কেরামের মিলনকেন্দ্র ছিল মদীনা। প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এমন প্রধান সাহাবায়ে কেরামের উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যণীয়। শাসনপ্রক্রিয়ায় সাহায্য নিতে এবং এবং অন্যান্য বিষয়ে নির্ভরযোগ্য পরামর্শ ও মতামতের জন্য তিনি প্রধান সাহাবীদের কাছাকাছি রাখতে পছন্দ করতেন। সুতরাং অভিজ্ঞ সাহাবায়ে কেরাম মদীনায় থেকে যান। তখন সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে ফকীহদের সংখ্যা ১৩০-এ পৌঁছে যায়। সে সময় ফাতওয়ার জন্য এই সাতজন সাহাবী বিখ্যাত হয়ে ওঠেন : উমর, আলী, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আয়েশা, যায়েদ ইবনে সাবিত, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস এবং আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুম রাযিয়াল্লাহু আনহা। আবু মুহাম্মাদ ইবনে হাযম উল্লেখ করেছেন, 'তাদের একেকজনের ফাতওয়া নিয়ে আলাদা আলাদা করে বিশাল কিতাব রচনা সম্ভব।'
তারপরেই ফাতওয়ার সংখ্যার দিক দিয়ে এই সাহাবায়ে কেরামের নাম উল্লেখযোগ্য : আবু বকর (কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে তিনি খুব কম সময় বেঁচে ছিলেন), উম্মে সালামা, আনাস ইবনে মালিক, আবু সাঈদ আল-খুদরি, আবু হুরায়রা, উসমান ইবনে আফফান, আব্দুল্লাহ ইবনে আয-যুবায়ের, আবু মূসা আল-আশআরী, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস, জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ, মুআয ইবনে জাবাল, তালহা ও আয-যুবায়ের, আবদুর রহমান ইবনে আউফ, ইমরান ইবনে হুসাইন এবং উবাদা ইবনে সামিত রাযিয়াল্লাহু আনহুম রাযিয়াল্লাহু আনহা। তাদের ফাতওয়া নিয়ে ছোট কিতাব রচনা করা সম্ভব।
এখানে যতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তাদের বেশিরভাগই মদীনায় থাকতেন। শিক্ষার প্রসার কিংবা জিহাদেরর জন্য অন্য জায়গায় পাঠানোর দরকার না পড়লে তারা মদীনা ছাড়তেন না। নতুন ভূখণ্ডে কেবল কুরআন ও সুন্নাহ শেখানোর জন্য গিয়েছিলেন।
মদীনাকে ফিকহ, জ্ঞান, পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার যে সিদ্ধান্ত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিয়েছিলেন তা সুফল বয়ে এনেছিল। ইবনে আব্বাসের এই বর্ণনা থেকে তা স্পষ্ট হয়েছে: কয়েকজন মুহাজিরের সাথে আমি কুরআন পড়ায় ব্যস্ত ছিলাম। তাদের একজন ছিলেন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ। তিনি উমরের সাথে হজ করার সময় আমি তার মিনার বাড়িতে থেকেছি। আব্দুর রহমান ফিরে এসে আমাকে বলেছিলেন, 'কী ঘটেছে, আপনি যদি দেখতেন! এক লোক আজ আমীরুল মুমিনীনের কাছে এসে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনার এই লোকের সাথে কথা বলা উচিত; সে বলছিল, উমর যদি ইন্তেকাল করেন তবে আমি অমুকের কাছে বাইআত গ্রহণ করব। আল্লাহর কসম, আবু বকরের কাছ থেকে আমরা কত স্বতঃস্ফূর্তভাবে না বাইআত গ্রহণ করেছিলাম।' এই কথা শুনে উমর রেগে গেলেন। তিনি বললেন, 'ইনশাআল্লাহ, আমি ইশার পরে সবার সামনে বয়ান করব। যারা অন্যায়ভাবে ক্ষমতা হাতে নিতে চাচ্ছে তাদের সাবধান করে দেব।' আব্দুর রহমান বললেন, 'না, ইয়া আমীরাল মুমিনীন, এ কাজ করতে যাবেন না। এই মুহূর্তে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক মূর্খ এবং ঝামেলা তৈরির লোকও আছে। তারা আপনার আশেপাশেই থাকবে। আমার ভয় হচ্ছে, আপনি যা বলবেন তা ভুলভাবে উপস্থাপন করা হলে লোকজন বিভ্রান্ত হয়ে পড়বে। আপনি মদীনায় যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। কারণ, মদীনা হিজরত আর সুন্নতের পুণ্যভূমি। সেখানে ফকীহ এবং ইমামদের মতো উত্তম লোকজন আছেন। সেখানে আপনি যা বলবেন এবং যে অর্থে বলবেন উলামায়ে কেরামগণ তা যথাযথভাবে সবার কাছে পৌঁছে দেবেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, যদি আল্লাহ তা'আলা চান তো, আমি মদীনা পৌঁছেই কাজটি করব।'
ইবনে হাজার উল্লেখ করেছেন: এই হাদীস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, মদীনাবাসী তাদের জ্ঞানবুদ্ধির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। এ বিষয়ে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমও একমত ছিলেন। তবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালীন মদীনার যে চিত্র ছিল তা অন্য কোনো সময়ের জন্য প্রযোজ্য নয়।
নতুন ভূখণ্ড এবং সমাজে তার খেলাফতের প্রভাব ছিল। মদীনার সমাজ ও পরিবেশে থাকার ফলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মাদরাসার ছাত্রেরা জ্ঞানবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। সদ্য মুসলিম হওয়া জনগোষ্ঠীকে শিক্ষাদানের জন্য তারা পরবর্তী কালে নতুন ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। জ্ঞান ও ফিকহের কেন্দ্র, মদীনা, পরবর্তী সময়ে বসরা, কুফা এবং অন্যান্য অঞ্চলের শিক্ষাকেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। মদীনার পরে যে অঞ্চলগুলো ফিকহকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল সেগুলোর ক্রম এখানে উল্লেখ করা হলো:
মদীনায় যেমন ওহী নাযিল হয়েছিল তেমনই শরীয়তের উৎপত্তিও ঘটেছিল। খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মদীনা অপ্রতিদ্বন্দ্বী নগরীতে পরিণত হয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছাড়াও সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে যারা ফকীহ ছিলেন তারাও মদীনাতে থাকতেন।
৩৫ হিজরীতে উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে হত্যা করা হয়। আর আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু কুফায় চলে যান। তারপরেও মদীনা জ্ঞানের আলো ছড়াতে থাকে। কারণ, ফকীহ সাহাবায়ে কেরাম তখনো জীবিত ছিলেন এবং মদীনায় বসবাস করতেন। তারা প্রথম শতকের শেষার্ধ্ব পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন।
তাছাড়া বুযুর্গ তাবেঈনদের অবস্থানও এই মদীনাতেই ছিল। তাদের মধ্যে সাতজন ছিলেন অনবদ্য ফকীহ: উবায়দুল্লাহ, কাসিম, উরওয়া, সাঈদ, আবু বকর, সুলায়মান এবং আল-খারিজা।
দ্বিতীয় শতকের শেষ পর্যন্ত পরবর্তী তাবেঈনদের জোয়ার বয়ে গেছে। তাদের মধ্যে ইবনে শিহাব আয-যুহরি, নাফি ইবনে আসলাম এবং ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদ আল-আনসারী উল্লেখযোগ্য।
এর পরের যুগে এলেন ইমাম মালিক। তিনি তাবেঈনদের উত্তরসূরী ছিলেন। ছোট-বড় সকল তাবেঈনদের ইলম সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত ছিলেন।
অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীরা হিজাযবাসীর জ্ঞানের মুখাপেক্ষি ছিল-এ তথ্য থেকেই মদীনাবাসীদের জ্ঞানের উৎকর্ষতা সম্পর্কে জানা যায়। অন্য যে কোনো এলাকার তুলনায় তারাই সবচেয়ে বেশি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে মদীনায় যাওয়া-আসা করত। মুসলিম ভূখণ্ডের উলামায়ে কেরাম জ্ঞানার্জনের জন্য মদীনায় যেতেন। মদীনাবাসী উলামায়ে কেরামের সাথে তারা নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতেন। আর এদিকে মদীনার আলেমগণ অন্য অঞ্চলে গিয়ে শিক্ষক এবং বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশে কুরআন ও সুন্নাহ শেখানোর জন্য সদ্যবিজিত সিরিয়া এবং ইরাকে চলে যান। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান, আম্মার ইবনে ইয়াসির, ইমরান ইবনে হুসাইন এবং সালমান আল-ফারিসি রাযিয়াল্লাহু আনহুম ইরাকে গিয়েছিলেন; এবং মুআয ইবনে জাবাল, উবাদা ইবনে ইবনু সামিত, আবু আদ-দারদা, বিলাল ইবনে রাবা রাযিয়াল্লাহু আনহুমসহ কয়েকজন যান সিরিয়ায়। উসমান, আলী, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, উবাই ইবনে কাব, মুহাম্মাদ ইবনে মাসলামা, যায়েদ ইবনে সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুম এবং বাকিরা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে মদীনায় থেকে যান। ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন প্রখর জ্ঞানী। তিনি চলে যান ইরাকে। তিনি সেখানে ফাতওয়া দিতেন। তবে মদীনায় আসলে তার ফাতওয়া যাচাই করতে ভুলতেন না। উলামায়ে কেরাম তার কোনো ফাতওয়াকে ঠিক মনে না করলে তিনি তাদের মতো গ্রহণ করতেন।
অন্যান্য বিদ্যাপীঠও মদীনার দর্শন অনুসরণ করেছে। একমাত্র কুফা ছাড়া বাকি সব এলাকার বাসিন্দা মদীনাবাসীর উদ্ধৃতি দিত। তাছাড়া সিরিয়া, মিসরবাসী বিশেষ করে আউযায়ী এবং তার (সিরিয়ান) পূর্ব ও উত্তরসূরি এবং লাইস ইবনে সাদ এবং তার (মিসরীয়) পূর্ব ও উত্তরসূরিগণ নিজেদের মদীনাবাসীর সমকক্ষ পর্যন্ত ভাবতে পারতেন না। মদীনাবাসীর প্রতি তাদের প্রচণ্ড শ্রদ্ধাবোধ ছিল এবং তারা স্পষ্টভাবে তাদের মাযহাব মেনে গেছে। বসরার উলামায়ে কেরামগণ যেমন: আইউব, হাম্মাদ ইবনে যায়েদ, আব্দুর রহমান ইবনে মাহদী এবং অন্যেরাও একই মাযহাব অনুসরণ করতেন। সুতরাং বলা যায় মদীনারা মাযহাবই সেসব জায়গায় অনুসৃত হয়েছে।
মদীনাবাসীর জ্ঞানের ওপরে মানুষের অগাধ শ্রদ্ধা তাদের উঁচু মর্যাদা দান করেছে। খতীব আল-বাগদাদী উল্লেখ করেছেন, মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আশ শায়বানি যখন ইমাম মালিকের কোনো কিছু বয়ান করতেন তখন তার বাড়ি লোকে লোকারণ্য হয়ে যেত। আর ইমাম মালিকের পরিবর্তে অন্য কারও বয়ানের সময় নামে মাত্র লোকসমাগম দেখা গেছে। তিনি বলেছেন, 'আমার জানামতে অন্য কারও বেলায় তোমাদের এমন দেখিনি। আমি ইমাম মালিকের বয়ান করতে গেলে তোমাদের ভিড়ে আমার বাড়ি ভরে যায়। আর তোমাদেরই কোনো সাথীর কথা বলতে গেলে তোমরা কালেভদ্রে আসো।'
মদীনা থেকে কে কতটুকু জ্ঞানার্জন করতে পেরেছিল তার ওপরে তাদের জ্ঞানের পর্যায় নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। তাদের কাছে মদীনার উলামায়ে কেরাম ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। মক্কার মুজাহিদ, উমর ইবনে দিনারসহ আরও কয়েকজন উল্লেখ করেছেন, 'আতা ইবনে আবি রাবা মদীনায় যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা সবাই সমান ছিলাম। সে ফিরে আসার পরে তার জ্ঞানের উঁচু পরিধি ছিল লক্ষণীয়।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে যার অবদানে মদীনায় ফিকহের চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে, তিনি স্বয়ং উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কাছ থেকে বরাবর অব্যর্থ ও সঠিক মতামত পেয়ে তার গুণের প্রশংসা করে গেছেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একটি রাজধানীকে বিদ্যাপীঠে পরিণত করেন। সেখান থেকে অগণিত আলেম, দাঈ, গভর্নর এবং বিচারক পাশ করে বের হন। মুসলিম বিশ্বের প্রথমদিকের বিদ্যাপীঠগুলো লক্ষ্য করলে সেগুলোতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রভাব খুব সহজেই উপলব্ধি করা যায়। কারণ, সেগুলোর প্রতিষ্ঠাতারা কম বেশি সবাই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ফিকহ দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। নিচে এগুলোর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরা হলো।
৪.২.১। মক্কার বিদ্যাপীঠ
হজ পালনের কারণে এমনিতেই আল্লাহ তা'আলার এই পবিত্রভূমি এবং এর বিদ্যাপীঠ হাজী-পর্যটকদের অন্তরে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। যে মুমিনেরা মক্কায় যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন কিংবা যাওয়ার আশা রাখেন তাদের কাছে মক্কা খুবই খাস একটি জায়গা। তবে শুরুর দিকে, সাহাবায়ে কেরামের যুগে মক্কায় শিক্ষার তেমন একটা প্রসার ঘটেনি। পরবর্তী সময়ে সাহাবায়ে কেরামদের শেষ দিকে, তাবেঈন এবং তাবে তাবঈনদের সময় অর্থাৎ, ইবনে নুজায় এবং ইবনে জুরায়জের সময় সেখানে শিক্ষার প্রসার ঘটেছিল। তবে স্বীকার করতে হবে যে তাবেঈনদের যুগে বিশিষ্ট আলেম এবং কুরআনের তাফসীরবিদ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর উপস্থিতিতে জ্ঞান প্রভূত বরকত লাভ করেছিল। তার একমাত্র সাধনা ছিল তাফসীর শেখা এবং সাথীদের তা শেখানো। তার অনেক ছাত্র পরবর্তী সময়ে বিশিষ্ট তাফসীরবিদ এবং ইমাম হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাফল্যের পেছনে অবশ্য যথেষ্ট কারণ ছিল। তিনি কুরআন বোঝা এবং তরজমার বেলায় অন্য সব সাহাবীকে ছাড়িয়ে যান; বুযুর্গ সাহাবায়ে কেরামের কাছ থেকে শিক্ষালাভ করে তিনি ইজতেহাদ এবং ফাতওয়ার বিষয়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। তাফসীরের প্রতি তার আগ্রহ এবং তার বিশেষ শিক্ষাদান পদ্ধতি, জ্ঞানবিতরণের আকাঙ্ক্ষা, তার সফরসমূহ, দীর্ঘায়ু এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ঘনিষ্ঠ সোহবত তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
তার প্রতিভা এবং জ্ঞান প্রকাশ পাওয়ার পেলে তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সুনজরে পড়ে যান। বয়সের দিক দিয়ে নবীন হওয়া সত্ত্বেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সভাগুলোতে প্রায়ই তাকে দাওয়াত দিতেন, কাছাকাছি রাখতেন, তার সাথে পরামর্শ করতেন এবং কুরআনের আয়াতের অর্থ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে তার মতামত নিতেন। তার ওপরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অনেক প্রভাব ছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর উৎসাহে জ্ঞানর্জনের দিকে তিনি প্রবলভাবে ধাবিত হন এবং ব্যুৎপত্তি লাভ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি তাফসীরসহ জ্ঞানের ভিন্ন ভিন্ন শাখায় মনোনিবেশ করেন। আমির ইমাম আশ-শা'বী বর্ণনা করেছেন, ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আব্বা আমাকে বললেন, 'হে আমার পুত্র, আমীরুল মুমিনীন তোমাকে কাছে-কাছে রাখছেন দেখছি। তিনি অন্য সাহাবায়ে কেরামের সাথে তোমাকেও রাখেন, আলোচনা করেন। আমার কাছ থেকে তিনটি জিনিস শিখে রাখো, আল্লাহকে ভয় করবে এবং উমরের কোনো তথ্য কখনো ফাঁস করবে না; তার সাথে কখনো মিথ্যা বলবে না; এবং তার কাছে কারও নামে গীবত করবে না।'
তার জ্ঞানের গভীরতা, পরিষ্কার চিন্তাশক্তি এবং তীক্ষ্ণ দূরদৃষ্টি দেখে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বুযুর্গ সাহাবীদের পাশাপাশি রাখতেন। ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের পাশাপাশি উমর আমারও পরামর্শ নিতেন। তিনি আমাকে প্রায়ই বলতেন, 'তাদের কথা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তুমি কিছু বলবে না।' আর আমার কথা শেষ হলে তিনি বলতেন, 'আপনারা এই অপরিণত ছেলেটির মতো কোনো বুদ্ধি দিতে পারলেন না দেখে আমি হতাশ হলাম।'
বুযুর্গদের সাথে বসার কারণে ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের আচার-আচরণ নিয়ে খুব বেশি সতর্ক থাকতেন। তাই অনুমতি না পাওয়া পর্যন্ত মুখ খুলতেন না। তার মনের এই অবস্থা বুঝতে পেরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে কথা বলতে এবং পরামর্শ দিতে উৎসাহ দিতেন।
আমরা এর আগে এই আয়াতগুলো উল্লেখ করেছি:
أَيَوَدُّ أَحَدُكُمْ أَنْ تَكُونَ لَهُ جَنَّةٌ مِّنْ نَّخِيلٍ وَ أَعْنَابٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهرُ
তোমাদের কেউ কি পছন্দ করে যে, তার একটি খেজুর ও আঙ্গুরের বাগান হবে, এর তলদেশ দিয়ে নহর প্রবাহিত হবে।
এবং
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ
যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য (হে মুহাম্মাদ, আপনার শত্রুদের বিরুদ্ধে) ও বিজয় (মক্কার)।
আলোচনার জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নবীনদের সাথেও বসতেন। তাদের কথা শুনতেন এবং শেখাতেন। তাদের মধ্যে ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু তার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আব্দুর রহমান ইবনে যায়েদ থেকে বর্ণিত, 'উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু নফল নামায আদায় করে মিরবাদে যান। সেখানে ইবনে আব্বাসসহ কয়েকজন নবীনকে ডেকে পাঠান। তারা একসাথে বসে কুরআন তিলাওয়াত করলেন, পড়াশোনা করলেন। দুপুরে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করছিলেন। তিলাওয়াতের সময় এই আয়াত আসল :
وَاِذَا قِيْلَ لَهُ اتَّقِ اللّٰهَ اَخَذَتْهُ الْعِزَّةُ بِالْاِثْمِ فَحَسْبُهٗ جَهَنَّمُ وَلَبِئْسَ الْمِهَادُ وَ مِنَ النَّاسِ مَنْ يَّشْرِيْ نَفْسَهُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللّٰهِ وَاللّٰهُ رَءُوْفٌ بِالْعِبَادِ
আর যখন তাকে বলা হয় যে, আল্লাহকে ভয় করো, তখন তার পাপ তাকে অহংকারে উদ্বুদ্ধ করে। সুতরাং তার জন্য দোযখই যথেষ্ট। আর নিঃসন্দেহে তা হলো নিকৃষ্টতর ঠিকানা। আর মানুষের মাঝে এক শ্রেণির লোক রয়েছে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টিকল্পে নিজেদের জানের বাজি রাখে। আল্লাহ হলেন তার বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান।
ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন পাশের জনকে বললেন, 'লোকদুটোর মধ্যে লড়াই অবধারিত।' তার কথা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কানে গেলে তিনি জানতে চাইলেন, 'কী বললে?' তিনি জবাব দিলেন, 'কিছু না, আমীরুল মুমিনীন।' তিনি আবার জানতে চাইলেন, 'লোকদুটোর মধ্যে লড়াই অবধারিত, এ কথা বলেছ?' ইবনে আব্বাস বলতে লাগলেন, 'এই আয়াতে দেখতে পাচ্ছি যে, যাকে আল্লাহকে ভয় পাওয়ার কথা বলা হয়েছে সে অন্যায় দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। আর যে নিজেকে বিক্রি করল, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি তালাশ করছে, সে উঠে গিয়ে অন্যদের বলছে তারা যেন আল্লাহকে ভয় পায়। অন্য লোকটি এ কথা মানল না, ফলে সে অন্যায়ভাবে পরিচালিত হবে। ভালো লোকটি বলবে, 'আমি (আল্লাহর জন্য) নিজেকে বিক্রি করেছি।' এখন তার সাথে তো অন্য লোকটির লড়াই হবেই।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'কী চমৎকার ভেবেছ, হে ইবনে আব্বাস।'
কুরআনের কোনো বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে বলতেন, 'হে ডুবুরি, এবার ডুব দাও।'
কোনো কঠিন সমস্যা দেখা দিলে তিনি ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলতেন, 'হে আবু আব্বাস, আমাদের সামনে সমস্যা দেখা দিয়েছে, একমাত্র তুমি সামলাতে পারবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার মতামত গ্রহণ করতেন। কঠিন সমস্যা উপস্থিত হলে তিনি অন্য কারও পরামর্শ নিতেন না।
বর্ণিত আছে, আবি ওয়াক্কাস বলেছেন, আমি ইবনে আব্বাসের চেয়ে ত্বরিত বোধসম্পন্ন বা চৌকস বা জ্ঞানী কিংবা ধৈর্যশীল কাউকে দেখিনি। কঠিন সমস্যা এসে পড়লে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখতাম—তিনি ইবনে আব্বাসকে ডেকে পরামর্শ করতেন এবং বলতেন, 'এই নাও, তোমার জন্য কঠিন ঝামেলা এসে গেছে।' তিনি ইবনে আব্বাসের মতামত গ্রহণ করতেন। তার পাশে আনসার-মুহাজির তো বটেই, বদরী সাহাবীগণ থাকলেও তার কথাই বেশি গুরুত্ব পেত। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে 'জিজ্ঞাসু জিহ্বা এবং বোধসম্পন্ন হৃদয়ের নবীন বুড়ো’ বলে ডাকতেন। তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ বলেছেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর কেউ ছিলেন না। ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু অধিকাংশ সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে থাকতেন। তার কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জ্ঞানার্জন করতেন। ফলে তিনিই তাফসীর আর ইলমের ক্ষেত্রে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি ইলম হাসিল করেছিলেন এ বিষয়ে অনেক উলামায়ে কেরাম একমত। মক্কা বিদ্যাপীঠের ইমাম ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কত ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তা এখান থেকে বোঝা যায়। তার সোহবতে ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু সাধারণ ইলমের পাশাপাশি তাফসীরে পরদর্শী হয়ে ওঠেন।
৪.২.২। মদীনার বিদ্যাপীঠ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনাকে ফাতওয়া, ফিকহ এবং জ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে কি করে গেছেন আমরা তার একটা চিত্র পেয়েছি। মদীনায় জ্ঞান বিস্তারের ক্ষেত্রে যায়েদ ইবনে সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবদান সবচেয়ে বেশি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে মদীনাতে রেখে দেন, ফলে সেখানে তার অনেক সাথী তৈরি হয়েছিল। ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'উমর অনেক দেশেই সাহাবায়ে কেরামদের পাঠিয়েছিলেন। তবে মদীনাবাসীর স্বার্থে ফাতওয়ার জন্য তিনি যায়েদ ইবনে সাবিতকে মদীনাতেই রেখে দেন।' হুমায়দ ইবনুল আসওয়াদ উল্লেখ করেছেন, 'মদীনাবাসী যায়েদ ইবনে সাবিতের পরে ইমাম মালিকের মতো আর কারও মতামতকে সেভাবে গ্রহণ করতে পারেনি।' তিনি ছিলেন এমন সাহাবী যার মতামত সংরক্ষণ এবং প্রচার ও বর্ণনার জন্য আল্লাহ তা'আলা যথেষ্ট পরিমাণে মানুষ পাঠিয়েছেন।'
আমীর ইমাম আশ-শা'বী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেছেন, 'উত্তরাধিকার আইন এবং কুরআনের দিক দিয়ে যায়েদ সবার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন।'
স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরাধিকার আইন প্রসঙ্গে যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর জ্ঞান সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘উত্তরাধিকার আইনের ব্যাপারে যায়েদ সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী’।
যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনার অন্যতম ফকীহ ছিলেন। তার কাছ থেকে জ্ঞানার্জনের করেছিলেন এমন ছয়জন তাবেঈনের নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে। ইবনুল মাদীনী বর্ণনা করছেন, 'যারা নিশ্চিতভাবেই যায়েদেও সোহবত লাভ করেছিলেন তারা হলেন : সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, উরওয়া ইবনে আয-যুবায়ের, কুবায়সা ইবনে যুহায়ব, খারিজা ইবনে যায়েদ, আবার ইবনে উসমান এবং সুলায়মান ইবনে ইয়াসার।'
অন্যান্য বিদ্যাপীঠের আলোচনা করলে তখন মদীনার সগর্ব অবস্থান সম্পর্কে বোঝা যায়।
৪.২.৩। বসরার বিদ্যাপীঠ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশে উতবা ইবনে গাযওয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু ১৪ হিজরীতে বসরা নগরের পত্তন করেন। বসরা নগর উন্নয়নের নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা ইনশাআল্লাহ এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে পারব। বয়সের দিক দিয়ে এ নগরী কুফার তিন বছরের বড় এবং জ্ঞানের দিক দিয়ে কুফার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনেক সাহাবায়ে কেরাম সেখানে বসতি স্থাপন করেন। তাদের মধ্যে আবু মূসা আল-আশআরী এবং ইমরান ইবনে হুসাইনসহ আরও অনেক সাহাবী রাযিয়াল্লাহু আনহুমের নাম চলে আসবে। সর্বশেষ আনাস ইবনে মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু সেখানে বসবাস শুরু করেন। সবার মধ্যে আবু মূসা আল-আশআরী এবং আনাস ইবনে মালিক রাযিয়াল্লাহু আনhুম সুপ্রসিদ্ধ ছিলেন। আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু মক্কায় গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আরও কয়েকজনের সাথে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। বসরায় থাকতে আসা এবং শিক্ষা প্রচার করতে আসা সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তিনি ছিলেন প্রসিদ্ধতম আলেম। তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে অনুপ্রেরণা লাভ করেন। এই দুজনের মধ্যে খুব যোগাযোগ ছিল। নগরশাসন এবং বিচারব্যস্থার আলোচনায় এগুলোও আসবে। আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার জ্ঞান, ইবাদত, ধর্মনিষ্ঠতা, নম্রতা, স্বাধীনতচেতা মনোভাব, দুনিয়াবি লক্ষ্যের প্রতি নির্লিপ্ততা এবং ইসলামের প্রতি দৃঢ় আসক্তির জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। তিনি ছিলেন একাধারে আলেম, ফকীহ- আইনজ্ঞ-মুফতি সাহাবী। ইমাম যাহাবী তার তাযকিরা আল-হুফফাযে তাকে বুযুর্গ সাহাবী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং বলেছেন, তিনি জ্ঞানী, সক্রিয়, ধর্মনিষ্ঠ এবং কুরআন তিলাওয়াতকারী ছিলেন; তার মতো এত মিষ্টি করে আর কেউ কুরআন তিলাওয়াত করতে পারতেন না। তিনি ভালো এবং বরকতময় জ্ঞান লাভ করেছিলেন। বসরাবাসীর মধ্যে কুরআন আর ইসলাম বিষয়ে তিনি সবচেয়ে জ্ঞানী ছিলেন।
তার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দীর্ঘ সোহবৎ লাভ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। তাছাড়া উমর, আলী, উবাই ইবনে কাব এবং আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুমের কাছেও জ্ঞানার্জনের সুযোগ পান। বিশেষ করে উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি বসরার গভর্নর থাকাকালীন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চিঠিপত্র এবং উপদেশ দিয়ে তাকে খুব সহযোগিতা করেছেন। আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সব কথা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জানাতেন। ইমাম আশ শাবীর মতে, মুসলিম উম্মতের মধ্যে এ যাবতকালে যে চারজন শ্রেষ্ঠ বিচারকের আবির্ভাব ঘটেছিল তিনি তার অন্যতম। সে চারজন বিচারক হলেন: 'উমর, আলী, যায়েদ ইবনে সাবিত এবং আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহুম।'
মদীনায় যাওয়ার পরে তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে দেখা করার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠেন এবং তার সাথে অনেক দীর্ঘ সময় কাটান। আবু বকর আবি মূসা থেকে বর্ণিত, আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু ইশার নামাযের পরে উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে দেখা করতে আসেন। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'কোন জিনিস আপনাকে টেনে আনল?' তিনি বললেন, 'আপনার সাথে কথা বলতে এসেছি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এই সময়?' তিনি বললেন, 'ফিকহ প্রসঙ্গে কথা ছিল।' এ কথা শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বসে পড়েন। অতঃপর তারা দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করলেন। আবু মূসা বললেন, 'নামায, হে আমীরুল মুমিনীন।' খলীফা জবাব দিলেন, 'আমরা ইবাদতের হালতেই আছি।'
আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু জ্ঞানানুসন্ধান এবং অর্জনের মতোই তা প্রসার ও শেখানোর ব্যাপারে সমান আগ্রহী ছিলেন। খুতবার মধ্যেই শেখা ও শেখানোর প্রতি গুরুত্ব আরোপ করতেন। আবুল মুহাল্লাব থেকে বর্ণিত, মিম্বরে দাঁড়িয়ে আবু মূসাকে বলতে শুনেছি, 'আল্লাহ তা'আলা যাকে জ্ঞান দিয়েছেন সে যেন তা শেখায়। তবে যে বিষয়ে সে অজ্ঞ তা যেন না শেখায়। এমন করলে সে সীমালঙ্ঘন করে বসবে এবং ইসলামের আহকামের বাইরে চলে যাবে।'
আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু বসরাকে বুদ্ধিদীপ্ত কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করেন। তার জীবনের এককটি বড় সময় পার হয়েছে জ্ঞান অর্জন করে। তবে এই নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি। মানুষকে শিক্ষিত করে তুলতে তিনি চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেননি। নামায আদায় শেষে সালাম ফেরানোর পর বসার দিকে ঘুরে বসামাত্রই কুরআন তিলাওয়াত সহীহ করানোর চেষ্টা শুরু হয়ে যেত। ইবনে শাওযাব বলেছেন, 'ফজরের নামায আদায় করামাত্রই আবু মূসা ঘুরে বসে এক এক করে সবার তিলাওয়াত শুনতেন এবং তা সহীহ করে দিতেন।'
সুন্দর কণ্ঠ এবং চমৎকার তিলাওয়াতের জন্য তিনি খুব প্রসিদ্ধ ছিলেন। তার তিলাওয়াত শোনার জন্য তার চারপাশে লোকজন জড়ো হয়ে যেত। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পাশে বসলেই তিনি আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তিলাওয়াত করতে বলতেন। আল্লাহ তা'আলার রহমতে তিনি মুসলিমদের শিক্ষিত করে তোলার যোগ্যতা লাভ করেছিলেন এবং তিনিও তার সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে দেশে দেশে কুরআন শেখান ও প্রচার করে যান। তার সমধুর কণ্ঠে সুন্দর তিলাওয়াত শুনে লোকজন জড়ো হয়ে যেত। তালেবে ইলমেরা বসরার মসজিদে তাকে ঘিরে বসে থাকতেন। তিনি লোকজনকে ছোট ছোট দলে ভাগ করে তাদের বৃত্তাকারে বসিয়ে দিতেন। নিজে তিলাওয়াত শোনাতেন এবং ঘুরে ঘরে তাদের তিলাওয়াত শুনে ভুল শুধরে দিতেন। বাড়িতে হোক কিংবা সফরে কুরআন মাজিদ ছিল তার ব্যস্ততার অসিলা। তার বেশিরভাগ সময় কেটেছে কুরআন নিয়ে। বর্ণিত আছে, আনাস ইবনে মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আল-আশআরীর নির্দেশে আমি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সাক্ষাতে তিনি জানতে চাইলেন, 'আল-আশআরীকে কী অবস্থায় রেখে এসেছ?' আমি বললাম, 'লোকজনকে কুরআন শেখাচ্ছিলেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'সে খুব চৌকস। তাকে আবার এ কথা বলতে যেয়ো না।'
তিনি জিহাদে গেলেও শেখানো বাদ দিতেন না। বর্ণিত আছে, 'হাত্তান ইবনে আব্দুল্লাহ আর-রিকাশি বলেছেন, তাইগ্রিস নদীর পাড়ে আবু মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সৈন্যদের মাঝে থাকার সুযোগ হয়েছিল। নামাযের সময় হয়ে এলো। মুয়ায্যিন যোহরের আযান দিলে লোকজন অযু করতে উঠল। তিনিও অযু করলেন এবং নামাযের ইমামতি করলেন। নামায আদায় শেষ করে সবাইকে নিয়ে গোল হয়ে বসে যান। এক সময় আসরের ওয়াক্ত হয়ে গেল। মুয়ায্যিন আসরের আযান দিলেন। আবারও সবাই অযুর জন্য উঠতে উদ্যত হতেই তনি বললেন, 'না, অযু নয়। যাদের অযু ভেঙে গেছে শুধু তারা উঠবে।'
তার এসব প্রচেষ্টা সুফল বয়ে এনেছে। কেবল বসরাতেই তার কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করা হাফেয এবং আলেমের সংখ্যা তিনশ ছাড়িয়ে যায়। বিষয়টি তার জন্য খুব আনন্দের ছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে চিঠি দিয়েছিলেন। তিনি কুরআন আত্মস্থকারী হাফেযদের নাম চেয়ে পাঠান। তাদের সম্মানিত করার এবং ভাতা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য খলীফা তাদের নামের তালিকা চাচ্ছিলেন। আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে লিখে পাঠালেন, 'এই নগরে বর্তমানে তিনশজনেরও বেশি লোক কুরআন আত্মস্থ করেছেন।'
আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু হাদীস বর্ণনা এবং শিক্ষার প্রতিও সচেতন ছিলেন। কারও বর্ণনায় কোনো রকম ভুল আছে কি না সে ব্যাপারে খুব সচেতন থাকতেন। তিনি নিজে সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং বুযুর্গ সাহাবায়ে কেরামের কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। আবার তার কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন অনেক সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেঈনগণ। ইমাম যাহাবী রহমাতুল্লাহি আলাইহি উল্লেখ করেছেন, বুরায়দা ইবনুল হুসায়ব, আবু উমামা আল-বাহিলি, আবু সাঈদ আল-খুদরি, আনাস ইবনে মালিক, তারিক ইবনে শিহাব, সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, আল-আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদ, আবু ওয়াইল শাকিক ইবনে সালামা, আবু উসমান আন-নাহদী এবং আরও অনেকে তার কাছ থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
আবু মূসা খুব দৃঢ়ভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত অনুসরণ করতেন। এমনকি তার অন্তিম সময়েও তিনি সন্তানদের এ নিয়ে উপদেশ দিয়ে যান। তবে যেভাবে সুন্নত আঁকড়ে ছিলেন সে অনুযায়ী তিনি খুব বেশি হাদীস বর্ণনা করেননি। অন্যান্য বুযুর্গ সাহাবায়ে কেরামও একই কাজ করে গেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস বর্ণনা করতে গেলে কোনো ভুল হয়ে যায় কি না, এই ভয়ে তারা সাধারণত বর্ণনা করতে চাইতেন না। এমনকি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পর্যন্ত তার গভর্নরদের নির্দেশ দিয়েছিলেন তারা যেন হাদীস বর্ণনার তুলনায় কুরআনের দিকে বেশি মন দেন। সুতরাং আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি খুব বেশি আনুগত্যের কারণে তাকে অনুসরণ করেছেন।
এখানে আনাস ইবনে মালিক আন-নাজ্জারী আল-খাযরাজীর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাদেম। তিনি এ নিয়ে বেশ গর্ব করতেন, যা গর্ব করার মতো ঘটনাও বটে। তিনি বলতেন, 'আমি দশ বছরের বালক ছিলাম তখন থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমত করেছি।' বলতেন, 'আমার বয়স যখন দশ তখন তিনি এখানে আসেন। আর আমার বিশ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জন্য সম্পদ, সন্তান এবং বরকতময় জীবনের জন্য দুআ করে গেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুআ করতেন, 'হে আল্লাহ, তাকে যথেষ্ট ধন-সম্পদ, অনেক সন্তান এবং রহমত দান করুন।'
ইমাম যাহাবী উদ্ধৃত করেছেন, আত-তাহযীব কিতাবের লেখক আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছ থেকে হাদীস-বর্ণনাকারী প্রায় দুইশ লোকের নাম তালিকাভুক্ত করেছেন। তার বর্ণিত ২২৮৬টি হাদীসের মধ্যে বুখারী এবং মুসলিম ১৮০টির ব্যাপারে একমত পোষণ করেছেন। বুখারী নিজে ৮০টি এবং মুসলিম নিজে ৯০টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। আনাস ইবনে মালিক ছিলেন হাসান আল-বসরী, সুলায়মান আত-তাইমী, সাবিত আল-বানানী, ইমাম আয-যুহরী, রাবীআ ইবনে আবি আব্দুর রহমান, ইবরাহীম ইবনে মায়সারা, ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদ আল-আনসারী, মুহাম্মাদ ইবনে সিরীন, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, কাতাদাসহ আরও অনেক তাবেঈনের শায়খ হিসেবে পরিগণিত হন।
হাদীস বর্ণনা এবং শেখানোর বেলায় আনাসের আগ্রহ ছিল লক্ষ্য করার মতো। তাছাড়া খুলাফায়ে রাশেদীনের খেলাফতকালে তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে আবু বকর এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুম তাকে মুসলিম রাষ্ট্রে উঁচু পদ দান করেছিলেন। আবু মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বসরার গভর্নর নিযুক্ত করার পরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন এবং অন্যতম ঘনিষ্ঠজনের মর্যাদা দেন। সাবিত থেকে বর্ণিত, আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আবু মূসার সাথে সফরে থাকাকালীন লোকজন দুনিয়াবী কথায় মশগুল হয়ে ওঠে। আবু মূসা তখন বলে উঠলেন, 'হে আনাস, লোকগুলো বেশি কথা বলছে। চলুন আমরা আল্লাহর যিকির করি।' তিনি জানতে চাইলেন, 'কোন জিনিস নিয়ে তারা এমন নিচে নামছে (বা তাদের পিছুটান দিচ্ছে)?' আমি বললাম, 'দুনিয়া এবং শয়তান, তাদের লোভ এবং আকাঙ্ক্ষা।' তিনি বললেন, 'নাহ, এই দুনিয়া তাদের কাছে চলে এসেছে আর আখেরাত অনেক দূরে চলে গেছে। আল্লাহর কসম, তারা যদি নিজের চোখে ওসব দেখতে পেত তবে কখনো মুখ ফেরাতে পারত না।'
আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহুও তাকে অনেক বিশ্বাস করতেন। তাই খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে যোগাযোগের জন্য তাকে দূত হিসেবে নিয়োগ দেন। আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আবু মূসা আল- আশআরী আমাকে বসরা থেকে উমরের কাছে পাঠাতেন। এবং উমর আমাকে লোকজনের অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করতেন।'
তস্তর বিজয়ের পরে আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু বন্দীসহ গনীমতের মালামাল উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে পৌঁছানোর মতো গুরুদায়িত্ব আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওপরে ন্যস্ত করেন। নির্দেশমতো তিনি তস্তরের গভর্নর হরমুযানকে নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে যান।
সাহাবা এবং তাবেঈনগণ আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু কাছ থেকে অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন। বিশেষ করে বসরায়। যুহদ এবং আশেপাশের লোকজনের ইবাদাতে তার অনেক অবদান ছিল। চরম উদ্দীপনার সাথে সাথীদের শিক্ষাদান করেছেন। তার ছাত্ররা তার খুব প্রিয় ছিলেন। তিনি তাদের কাছে-কাছে রাখতেন এবং অনেক সম্মান প্রদর্শন করতেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলতেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবায়ে কেরামের সাথে আপনাদের কতই না মিল! আল্লাহর কসম, আপনারা আমার সন্তানের চাইতেও প্রিয়, যদি না তারা আপনাদের মতো হয়ে থাকে। আমি শেষরাতে বসে আপনাদের জন্য দুআ করি।'
তার এই মহব্বতের জন্য আলেম প্রজন্ম তৈরি হয়েছিল। এই বুযুর্গের প্রেরণায় তারা হাদীসের জ্ঞানে উদ্ভাসিত হন এবং পরবর্তীদের কাছে হাদীস পৌঁছে দেন। তার পরবর্তী লোকেরা পরের লোকজনকে হাদীস পৌঁছে দেন। আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর ঘনিষ্ঠজনেরা ১৫০ হিজরী পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন।
৪.২.৪। কুফার বিদ্যাপীঠ
বাইআতে রিদওয়ান বৃক্ষের নিকট বাইআত গ্রহণকারীদের মধ্যে তিনশজন এবং আরও সত্তরজন বদরী সাহাবী কূফায় বসবাস করতেন। কূফাবাসীর নিকট উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একটি চিঠি প্রেরণ করেছিলেন। তাতে লেখা ছিল: হে কুফাবাসী, তোমরা আরবদের মাথা ও খুলি। তোমরা আমার তীর—আমাকে কেউ আঘাত করতে আসলে যা দিয়ে আমি তা প্রতিহত করি। আমি তোমাদের কাছে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদকে পাঠালাম। তাকে আমি তোমাদের জন্য পছন্দ করেছি এবং নিজের ওপর তোমাদের প্রাধান্য দিয়েছি। আরেকটি বর্ণনামতে, তিনি বলেছিলেন, 'আমি আম্মারকে তোমাদের গভর্নর হিসেবে এবং আব্দুল্লাহকে তোমাদের শিক্ষক ও পরামর্শক হিসেবে পাঠালাম। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শ্রেষ্ঠ বুযুর্গ সাহাবী। সুতরাং তাদের কথা শুনবে এবং তাদের অনুসরণ করবে। আর নিজের ওপর তোমাদের প্রাধান্য দিয়ে তোমাদের জন্য আব্দুল্লাহকে পছন্দ করেছি।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কূফার প্রতি বেশ নজর রাখতেন। তিনি সেখানে ইবনে মাসউদকে পাঠিয়েছিলেন। একবার তার কাছে লিখলেন, 'কুরআন কুরাইশদের (আঞ্চলিক) ভাষায় নাযিল হয়েছে, সুতরাং হুযায়লদের ভাষায় নয় বরং কুরাইশদের ভাষায় লোকদের শেখাবেন।'
কূফার পথে রওয়ানা দেওয়া সাহাবায়ে কেরামকে বিদায় জানানোর সময় তিনি বলেছিলেন, 'আপনারা নগরবাসীর কাছে, অর্থাৎ কূফায় যাচ্ছেন; তারা মৌমাছির মতো গুনগুনিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করে। হাদীস দিয়ে তাদের মনযোগ নষ্ট করবেন না। কুরআনের দিকে মন দেবেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস খুব বেশি বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই। যান, আপনাদের জন্য আমার শুভ কামনা রইল।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হাদীসের তুলনায় কুরআনের প্রতি বেশি মনোযোগী ছিলেন। তিনি হাদীস লেখার আগে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবায়ে কেরামের সাথে আলোচনা করে নিতেন। তারা হাদীস লেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এ জন্য তিনি প্রায় এক মাস ইস্তিখারার নামায আদায় করেছিলেন। অতঃপর একদিন সিদ্ধান্ত নিয়ে বললেন, 'আমি হাদীস লিখে রাখতে চেয়েছিলাম। তারপরে মনে পড়ল, আপনাদের আগেও কিছু মানুষ এসেছিলেন। তারাও কিতাব লিখেছিল। শেষে আল্লাহর কিতাবকেই তারা অবহেলা করে বসেছে। আল্লাহর কসম, আমি কখনই কোনোভাবেই আল্লাহর কিতাব নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করতে চাই না।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর একটাই উদ্দেশ্য ছিল, কুরআনকে মানুষের অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। যার জন্য তিনি কুরআন থেকে তাদের মন অন্য কোনো দিকে যেন ঘুরে যেতে না পারে সে ব্যাপারে সচেতন থাকতেন। কুরআনের বক্তব্য সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিকভাবে সমাজে এর প্রয়োগ এবং মানুষের মধ্যে কুরআনের সাথে ইসলাম-বিজ্ঞানের বিশেষ করে হাদীসের পার্থক্য পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এ নিয়ে খুব বেশি সচেতন ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় থেকেই কুরআনের প্রতি এমন মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া কোনোভাবেই যেন কুরআন থেকে কারও মন সরে না যায় সেদিকে খুব লক্ষ্য রাখা হতো। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সোজাসাপ্টাভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ করে গেছেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন একটা প্রজন্ম তৈরি করতে চাচ্ছিলেন যারা জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে আল্লাহ তা'আলার কথা সবার কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হবেন। তিনি তার সাথী এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের অন্তরে বিশেষ জায়গা দখল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার জ্ঞান সম্পর্কে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুও সাক্ষ্য দিয়েছেন। বর্ণিত আছে, যায়েদ ইবনে ওয়াহাব বলেছেন, আমি অনেক লোকজনসহ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সামনে উপস্থিত ছিলাম। একজন ছোটখাটো, হালকা গড়নের ব্যক্তি সেখানে আসলেন। তাকে দেখে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর চোখেমুখে আনন্দ ছড়িয়ে পড়ল। তিনি বলতে লাগলেন, 'জ্ঞানপূর্ণ পাত্র, জ্ঞানপূর্ণ পাত্র, জ্ঞানপূর্ণ পাত্র।' ইবনে মাসউদ সেই ব্যক্তি ছিলেন।
কুফায় ইবনে মাসঊদের খুব প্রভাব বিস্তার হয়েছিল। তার জীবদ্দশায় তো বটেই তার মৃত্যুর পরেও লোকজন যেভাবে তাকে অনুসরণ করেছে তা অন্য কারও বেলায় দেখা যায়নি। তিনিও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কোনো মত প্রকাশের করলে তিনি নিজের বদলে তার মতামতকে নির্দ্বিধায় গ্রহণ করতেন। তার একটি বিখ্যাত উক্তি, 'দাঁড়িপাল্লার একদিকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং অন্যদিকে সারা পৃথিবীর মানুষের জ্ঞান মাপা হলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জ্ঞানের পাল্লা বেশি ভারী হবে।'
সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তার কুরআন তিলাওয়াত খুব শ্রুতিমধুর ছিল। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে প্রায় সত্তরটির মতো সূরা সরাসরি শিখেছিলেন। শাকীক ইবনে সালামা থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আমাদের লক্ষ্য করে বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে সরাসরি সত্তরটির মতো সূরা শিখেছি, এবং আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবায়ে কেরাম সাক্ষী আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে আমার মতো জ্ঞান আর কারও ছিল না। তাই বলে আমি কিন্তু শ্রেষ্ঠ নই।'
মাসরূক থেকে বর্ণিত, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই হাদীস শোনার পর থেকে লোকটিকে আমি খুব ভালোবাসি। তিনি বলেছেন, 'এই চার ব্যক্তির কাছ থেকে কুরআন শিখবে-আবব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ, আবু হুযায়ফার আযাদকৃত খাদেম সালিম, উবাই ইবনে কাব এবং মুআয ইবনে জাবাল।'
ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কুরআন বিশেষজ্ঞ বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর অনেক ছাত্র ফিকহ, জ্ঞান, যুহদ, ধর্মনিষ্ঠতার দিক দিয়ে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাদের মধ্যে আলকামা ইবনে কায়েস, মাসরূক ইবনুল আজদা, উবায়দা আস-সালমানি, আবু মায়সারা ইবনে শূরাহবীল, আল-আসওয়াদ ইবনে ইয়াযীদ, আল-হারিস আল-জাফি এবং মুররাহ আল-হামদানির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
৪.২.৫। সিরিয়ার বিদ্যাপীঠ
সিরিয়িা বিজয়ের পরে ইয়াযীদ ইবনে আবি সুফিয়ান উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে লিখেছিলেন: সিরিয়ায় অনেক মানুষ, নগরটিও লোকে লোকরণ্য; এখানে কুরআন এবং ইসলাম শেখানোর জন্য লোক লাগবে। হে আমীরুল মুমিনীন, তাদের জ্ঞান দেবার মতো লোক পাঠিয়ে 'আমাকে সাহায্য করুন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুআয ইবনে জাবাল, উবাদা ইবনে ইবনু সামিত এবং আবু আদ-দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহুমকে এই মহান দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। তিনি উপদেশ দিয়েছিলেন, 'হমস থেকে শেখানো শুরু করবেন। মানুষ যে কত বিচিত্রভাবে জ্ঞানার্জন করে তা সেখানে গেলে দেখতে পাবেন; কেউ কেউ অনেক দ্রুত শিখে ফেলে। এমন লোকদের পেলে তাদের আগে শেখাবেন। তাদের জ্ঞানার্জন সন্তোষজনক হলে তাদের কাছে একজন থেকে যাবেন এবং একজন যাবেন দামেস্কে, আরেকজন ফিলিস্তিনে।' তারা ঠিক তাই করেছিলেন। তারা আগে হমসে যান। লোকজনের বিদ্যাশিক্ষা তাদের মনের মতো হওয়া পর্যন্ত তারা সেখানে ছিলেন। অবশেষে উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে যান এবং আবু আদ-দারদা চলে গেলেন দামেস্ক এবং মুআয চলে গেলেন ফিলিস্তিনে।
বিজিত ভূখণ্ডের অধিবাসীদের শিক্ষিত করে তোলার পেছনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অসামান্য অবদান ছিল। মুআয, আবু আদ-দারদা এবং উবাদা ইবনে ইবনু সামিতসহ বেশ কয়েকজন সাহাবী রাযিয়াল্লাহু আনহুমের প্রচেষ্টায় সিরিয়ায় ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দামেস্কের মসজিদে আবু আদ-দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহুর শিক্ষাচক্রে ছয়শরও বেশি লোকসমাগম ঘটত। সেখানে দশজন দশজন করে কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং আবু আদ-দারদা রাযিয়াল্লাহু আলাদা আলাদা করে কুরআনের সবক দিতেন। অন্য যেকোনো সাহাবীর তুলনায় সিরিয়া এবং দামেস্কে তার প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। কুরআনের জ্ঞানে সুশিক্ষিত অল্প কয়েকজন সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে তিনি একজন। তিনি সিরিয়াবাসীকে এভাবে উদ্বুদ্ধ করতেন-'এমন কেন দেখছি? তোমাদের জ্ঞানীজন মারা যাচ্ছেন আর অজ্ঞরা কিছুই শিখছে না। জ্ঞান তুলে নেবার আগেই তা শিখে নাও। জ্ঞানীদের সাথেই কিন্তু জ্ঞানের মৃত্যু ঘটে।'
আর জ্ঞানপিপাসুদের বলতেন, 'আলেম হও নয়তো ছাত্র হও, অথবা (জ্ঞানের) প্রেমিক হও নয়তো অনুসারী হও। পঞ্চমটা হতে যেয়ো না, নয়তো ধ্বংস হয়ে যাবে।' হাসান আল-বসরী বলেছেন, 'এখানে পঞ্চমটা বলতে বিদআত সৃষ্টিকারী বোঝানো হয়েছে।'
তিনি বলতেন, 'জ্ঞানের খোঁজে থাক; তা না পারলে জ্ঞানীদের ভালোবাসো; ত-ও যদি না পারো তাহলে অন্তত তাদের ঘৃণা কর না। শেখো এবং শেখাও, কারণ, আলেম (জ্ঞানী) এবং তালেব (ছাত্র) সমান নেকী অর্জন করে। জ্ঞানী হতে হলে আগে তো ছাত্র হতে হবে, আর ছাত্র হতে হলে তার জ্ঞান কাজে লাগাতে হবে। তার আরেকটি বিখ্যাত উক্তি, 'কুরআনের ভিন্ন ভিন্ন তরজমা না দেখলে ফিকহ বুঝতে পারবে না।'
বর্ণিত আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে আবু আদ-দারদাকে নিযুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে জোর দিলে তিনি বলেছিলেন, 'আপনি যদি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নত শেখানোর এবং নামাযের ইমামতির দায়িত্ব দিয়ে আমাকে পাঠান তবে আমি যেতে রাজী আছি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কথা মেনে নেন।
জ্ঞানের বহু শাখায় আবু আদ-দারদার জ্ঞানগর্ভ বিচরণ ছিল। ফলে মানুষের চোখে তার মর্যাদা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তার চারপাশে বহু ছাত্র জড়ো হতে থাকে। উত্তরাধিকারীর সম্পদ এবং এর ভাগাভাগি কিংবা হাদীস বা কোনো কঠিন সমস্যা অথবা কবিতা, যা-ই হোক না কেন যে কোনো প্রয়োজনে লোকজন তার কাছে আসতে শুরু করে। সাধারণ শিক্ষাদীক্ষা বিশেষ করে কুরআন শেখার বিষয়ে তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। তার বয়ানও খুব হৃদয়গ্রাহী ছিল। সিরিয়াবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি একবার বলেছিলেন, 'হে সিরিয়াবাসী, তোমরা সম্পদ জমিয়ে রাখো কেন? বসবাস করবে না জেনেও বাড়ি বানাও কেন? আর যা পাওয়ার নয়, তা আশা কর কেন? বসরা আর আদেনের (ইয়েমেনের একটি শহর) মাঝে আদ আর সামূদ জাতি কত সহায়-সম্পদ, সন্তান আর গবাদিপশু ফেলে গেছে! দুই দিরহামের বিনিময়েও কি আজ ওগুলো কেউ কিনতে চাইবে? এগুলো ছিল উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নীতি ও শিক্ষার ফলাফল। তিনি এমন উম্মত তৈরি করে গেছেন, যারা সবসময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকত।
মুআয ইবনে জাবাল আল খাযরাজী রাযিয়াল্লাহু আনহুর মাধ্যমে ইয়েমেনবাসী এবং তারপর সিরিয়বাসী অনেক উপকৃত হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সাথীদের কাছে প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছিলেন, 'মুআয হলো—তিনি ছিলেন এক সম্প্রদায়ের প্রতীক, সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে এক আল্লাহরই অনুগত এবং তিনি শিরককারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না—এই আয়াতের সাথে তুলনীয় ব্যক্তিত্ব।'
তারা জানতে চাইল, 'উম্মতের মানে কী?' তিনি বললেন, 'যে মানুষকে কেবল ভালো জিনিস শেখায়।' অতঃপর তিনি বললেন, 'তোমরা কী আল-কুনিতের (অনুগত) অর্থ জান?' তারা না-সূচক জবাব দিলেন। তিনি বললেন, আল-কুনিত অর্থ হলো, যে আল্লাহ তা'আলার প্রতি অনুগত। মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন ছিলেন। ফিকহের অগাধ জ্ঞান এবং উত্তম আখলাকের কারণে ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে নবী ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সাথে তুলনা করতেন। ইসলাম সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান ছিল বলে কঠিন যেকোন প্রশ্নের তিনি খুব সহজ জবাব দিতে পারতেন। তার এই গুণের কারণে মুসলিমদের কাছে তিনি খুব গ্রহণযোগ্য এবং শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। তার সম্পর্কে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'আর কোনো মায়ের গর্ভে মুআযের মতো সন্তান জন্মাবে না।'
কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শূরায় আনসারদের মধ্যে থেকে মুআয ইবনে জাবাল, উবাই ইবনে কাব এবং যায়েদ ইবনে সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহুম উপস্থিত থাকতেন। ফিকহ ও তাফসীরের জ্ঞান, বাস্তব জ্ঞান এবং যেকোন পরিস্থিতি বোঝার ক্ষমতা, অভিজ্ঞতা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় থেকে তাদের জারিকৃত ফাতওয়ার কারণে তারা বিরল যোগ্যতা লাভ করেছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই দুজনের, মুআয এবং আবু আদ-দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহুমের আলোচনা শুনতে খুব ভালোবাসতেন। তাদের সম্পর্কে বলতেন, 'দুই জ্ঞানীর খবর বলুন।' তারা বলত, 'কোন জ্ঞানীদের কথা বলছেন?' তিনি বলতেন, 'মুআয এবং আবু আদ-দারদা।'
আল-জাবিয়া থেকে বর্ণিত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু কোনো এক খুতবায় বলেছিলেন, 'ফিকহ সম্পর্কে কারও কোনো কিছু জানার থাকলে সে মুআয ইবনে জাবালের কাছে পাঠাবে।' খলীফা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ছাড়া খেলাফত পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই তাকে মদীনার বাইরে পাঠানোয় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অমত ছিল। মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু সিরিয়ায় চলে যাওয়ার পরে তিনি প্রায়ই বলতেন, 'তার প্রস্থানে মদীনাবাসী এবং ফিকহকেন্দ্রিক লোকজনের জন্য বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল। মানুষের জন্য তারা ফাতওয়া জারি করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। কেবল মদীনার স্বার্থে তাকে রেখে দিতে চাইতাম দেখে আবু বকর বলতেন, 'শহীদ হওয়ার প্রতি যার এমন তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে ধরে রাখা উচিত নয়।' আমি বলতাম, 'আল্লাহর কসম, সে তার বিছানায় ইন্তেকাল করলেও যেন তাকে শহীদ হিসেবে গণ্য করা হয়।'
তবে পরবর্তী সময়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়েছিল। সিরিয়াবাসীকে শিক্ষিত করে তোলার জন্য তিনি তাকে সিরিয়ায় পাঠিয়ে দেন। সিরিয়ায় জ্ঞান এবং ফিকহ প্রসারে তার অবদান আসামান্য। আবু মুসলিম আল-খাওলানী বলেছেন, হিমসের মসজিদে রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লামের অন্তত ত্রিশজন বৃদ্ধ সাহাবী বসেছিলেন। তাদের মধ্যে এক তরুণকে দেখেছি। চোখে কাজল, উজ্জল দাঁতবিশিষ্ট লোকটি চুপচাপ বসে ছিলেন। কেউ কোনো প্রসঙ্গে নিশ্চিত হতে না পারলে তাকে জিজ্ঞেস করছিলেন। সেখানে বসা একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, 'লোকটি কে?' তিনি বললেন, 'মুআয ইবনে জাবাল।'
মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু মানুষকে জ্ঞানের খোঁজ করতে উৎসাহিত করে গেছেন। তিনি বলতেন, 'জ্ঞান তালাশ করতে থাকো। কারণ, আল্লাহ তা'আলার জন্য জ্ঞানার্জন করা হলো দ্বীনি কাজ, আর জ্ঞান তালাশ করা হলো ইবাদত, জ্ঞানের আলোচনা হলো তাসবীহ, জ্ঞান অনুসরণ করা হলো জিহাদ এবং যারা জানে না তাদের শেখানো হলো সাদাকা। জ্ঞান আমাদের হালাল এবং হারাম জানতে শেখায় এবং জান্নাতীদের নূর। জ্ঞান হলো একাকীত্মের সাথী আর সহজ-কঠিন সব অবস্থায় আচরণ সংশোধনকারী। জ্ঞান শত্রু প্রতিহত করে। আল্লাহ তা'আলা জ্ঞানের বরকতে মানুষকে উঁচু মর্যাদা দান করেন। গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং নেতারা জ্ঞানীকে অনুসরণ করেন এবং তাদের মতামত প্রাধান্য দেন।'
তিনি সিরিয়ায় বসে মানুষকে দ্বীন শেখানো অবস্থাতেই তার কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি আমওয়াসের মহামারীতে আক্রান্ত হন। তার অবস্থা দেখে সাথীরা ভেঙে পড়েছিলেন। তাদের কান্না দেখে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, 'তোমরা কাঁদছ কেন?' তারা বলেছেন, 'আপনার সাথে সাথে জ্ঞানের মৃত্যু হবে, আমরা সেই কষ্টে কাঁদছি।' তখন তিনি বোঝালেন, 'কেয়ামত পর্যন্ত ঈমান এবং জ্ঞান টিকে থাকবে। যার এগুলো দরকার পড়বে সে কুরআন এবং হাদীসে সবকিছু পেয়ে যাবে। কুরআনবিরোধী কোনো কথা শুনলে অবশ্যই যাচাই-বাছাই করবে; কিন্তু কানেশোনা সবকিছুর পক্ষ নিয়ে কুরআন যাচাই করতে যেয়ো না।' মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে কুরআন ছিল সবকিছুর মানদণ্ড। এভাবেই তিনি কুরআন শেখাতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি কুরআন আঁকড়ে ছিলেন। জ্ঞান হারানোর পর থেকে একটু জ্ঞান ফিরলেই বলতেন, 'হে আমার রব, আপনার মর্জিমাফিক যেন আমার মৃত্যু হয়। আপনার শানের কসম, আপনি তো জানেন আমার হৃদয়ে আপনার জন্য কত ভালোবাসা।'৯৭৪
মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি বলতে লাগলেন, 'এই মুহূর্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অতিথিকে (মৃত্যুকে) স্বাগতম। যে আফসোস করবে সে সফল হতে পারবে না। হে আল্লাহ, আপনি তো জানেন খাল তৈরি কিংবা গাছ লাগানোর উদ্দেশ্যে আমি এই পৃথিবীতে থাকতে আগ্রহী নই; বরং নামাযের মাধ্যমে দীর্ঘ রাত পার করে এবং দিনে রোযা রেখে, তপ্ত গরমে তৃষ্ণার অনুভূতি নিয়ে এবং যিকিরের মজলিসের কারণে এখানে থাকার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলাম।'
তিনি ৩৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তিনি তার অবর্তমানে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ দিয়ে যান। আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু তার জানাযা পড়ান এবং দাফন সম্পন্ন করতে তার কবরে নামেন। আরও কয়েকজন মুসলিম তার সাথে কবরে নেমেছিলেন। তিনি উঠে এসে বলতে লাগলেন, 'আল্লাহ তা'আলা আপনাকে দয়া করুন, হে মুআয। আমার জানামতে, আপনি অন্যতম অনুগত এবং শ্রেষ্ঠ মুসলিম। আপনি মূর্খদের জ্ঞান দান করেছেন, অপরাধীদের প্রতি কঠোর এবং মুমিনদের প্রতি নম্র আচরণ করেছেন।'
আবু উবায়দা এবং মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুমের ইন্তেকালের পরে আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতির দায়িত্ব নেন। এরপরে সবার উদ্দেশ্যে বললেন, 'হে লোকসকল, এই রোগ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে সবাই পাহাড়ে গিয়ে আশ্রয় নাও।' সুতরাং তিনি লোকজনসহ পাহাড়ে চলে গেলেন এবং আল্লাহ তা'আলা এই বিপদ থেকে মুক্ত না করা পর্যন্ত সবাই বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিল।
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠি দেন, 'আপনার ওপরে শান্তি নাযিল হোক। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু ইন্তেকাল করেছেন এবং মুসলিমদের মধ্যে মৃত্যু ছড়িয়ে পড়ছে। তারা আমার কাছে উন্মুক্ত গ্রামের দিকে চলে যাবার অনুমতি চাচ্ছে। আমি জানি, আমরা এখন যেখানে আছি সেখানে থাকলে মৃত্যুকে যেমন আহ্বান করা যাবে না, তেমনই পালিয়ে গেলেও মৃত্যুকে দূরে ঠেলা কিংবা আল্লাহ তা'আলার হুকুম টলানো সম্ভব নয়। আপনার ওপরে আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি এবং রহমত বর্ষিত হোক।'
আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরপর মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যু সংবাদে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুষড়ে পড়েন। তিনি এবং উপস্থিত মুসলিমরা কান্না ধরে রাখতে পারেননি। তার জন্য সবাই দুঃখ প্রকাশ করতে লাগল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দুআ করলেন, 'আল্লাহ তা'আলা তাকে রহম করুন। মুআযের মৃত্যুতে মুসলিম উম্মত জ্ঞানের দিক দিয়ে বিরাট ক্ষতির মধ্যে পড়ল। আমরা যতবার তার সৎ উপদেশ গ্রহণ করেছি ততবার বরকত এবং রহমত লাভ করেছি। তার কাছ থেকে আমরা যা কিছু শিখেছি তাতে সুফল পেয়েছি, এবং তিনি সব সময় আমাদের ভালো নির্দেশনা দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা তাকে ধর্মনিষ্ঠদের পুরস্কারে পুরস্কৃত করুন।'
এরপরে মুসলিমদের তৃতীয় বিখ্যাত নেতা প্লেগের কবলে পড়লেন। তিনি ইয়াযীদ ইবনে আবি সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু, আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুর সন্তানদের মধ্যে তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন। ইয়াযীদ আল-খায়র নামে তিনি বেশি প্রসিদ্ধ। আমওয়াসের প্লেগে আরেক মহান নেতা শাহাদাত বরণ করেন। শূরাহবীল ইবনে হাসানা।
৫.৩.৪। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে উমর রা.-এর সিরিয়াযাত্রা
সিরিয়ায় প্লেগের কবলে একের পর এক নেতা এবং সাহসী সৈনিকদের মৃত্যুসংবাদে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ছিলেন। মৃত ব্যক্তিদের ফেলে যাওয়া সম্পদের উত্তরাধিকার এবং এমন অসংখ্য বিষয় নিয়ে সিরিয়ার গভর্নর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠি দিতে লাগলেন। নিত্যনতুন সমস্যা নিয়ে তিনি সাথীদের সাথে আলোচনায় বসতে লাগলেন। শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি নিজে গিয়ে মুসলিমদের সমস্যা মোকাবিলা করে আসবেন। মাজলিস আশ-শূরার সাথে আলোচনা শেষ করে তিনি সিরিয়া যাওয়ার জন্য মনস্থির করেন। তিনি বললেন, 'সিরিয়ায় মানুষের উত্তরাধিকারীদের সম্পদ অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে, এজন্য আমি সেখানে যাব। উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পদ ভাগ-বাটোয়ারা করে দেব এবং যেভাবে যা করলে ভালো হয় সমাধান করে দিয়ে আসব। সেখান থেকে ফিরে এসে অন্যান্য ভূখণ্ডের দিকে যাব এবং নির্দেশনা দেব।' সুতরাং কথামতো তিনি মদীনা ছাড়লেন। তার অবর্তমানে আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মদীনার দায়িত্ব দিয়ে আসেন। সিরিয়ায় গিয়ে খাদ্যসামগ্রী বিলি-বণ্টন করলেন, শীত এবং গ্রীষ্মে অভিযান চালানোর মতো সেনাদল গঠন করলেন, সীমান্তের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সুসংগঠিত করলেন। গভর্নরদের নিয়োগ দিলেন। উপকূলীয় সীমান্ত এলাকায় আব্দুল্লাহ ইবনে কয়েস রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং দামেস্কে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুকে গভর্নর পদে নিয়োগ দেন। সেনাবাহিনী, নেতা এবং সাধারণ মানুষের জন্য যাবতীয় কর্মকাণ্ড সুসংগঠিত করে আসেন। এবং জীবিতদের মাঝে মৃতদের সম্পদ ভাগ করে দেন।
নামাযের ওয়াক্ত হয়ে আসলে লোকজন বলতে লাগল, 'আপনি বিলালকে আযান দিতে বলছেন না কেন?' তিনি নির্দেশ দিলেন এবং আযান দেওয়া হলো। বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু আযান দেবার পরে সেখানে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে যতজন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষাৎ লাভের সুযোগ পেয়েছিলেন প্রত্যেকে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। তাদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা খুব মনে পড়ছিল।
মদীনায় ফিরে যাওয়ার আগে তিনি সবার উদ্দেশ্যে বললেন, 'তোমাদের দায়িত্ব আমার হাতে দেওয়া হয়েছে এবং আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ব্যাপারে আমাকে যেসব দায়িত্ব দিয়েছেন ইনশাআল্লাহ, আমি আমার সাধ্যমতো সবকিছু করার চেষ্টা করেছি। তোমাদের খাদ্যসামগ্রী তোমাদের মধ্যে ভাগ করে দিলাম, বাড়ি বরাদ্দ করেছি এবং সেনাবাহিনী সুসংগঠিত করেছি। আমরা যা করতে চেয়েছিলাম সব করা শেষ। তোমাদের হেফাযতের জন্য সেনাবাহিনী নিয়োগ করেছি এবং সীমান্ত আটকে দিয়েছি। গনিমতের মাল থেকে তোমাদের প্রাপ্য অংশ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। তোমাদের জন্য ভাতা এবং খাদ্যসামগ্রীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারও যদি মনে হয় যে আরও কিছু করা বাকি রয়ে গেছে, তবে আমাদের জানিয়ে দিলে আমরা তা করে দেব, ইনশাআল্লাহ। এবং আল্লাহ তা'আলা ছাড়া আমাদের আর কোনো শক্তি নেই।'
নামাযের আগে এই খুতবা দিয়েছিলেন। তার পরপরই উল্লিখিত ঘটনাটি ঘটেছিল।
আমওয়াসের প্লেগ মুসলিমদের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছিল। এর ছোবলে বিশ হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়। বাইজেন্টাইনদের সাথে এর সম্পর্ক ছিল। মুসলিমরা বিপদ আঁচ করতে পারছিল। কারণ, সিরিয়ায় মুসলিমসেনার সংখ্যা যে হারে হ্রাস পাচ্ছিল তা বাইজেন্টাইনদের জানতে বাকি ছিল না। সুতরাং এমন দুর্বল মুহূর্তে তারা যে কোনো সময় হানা দিতে সক্ষম। তবে সাধারণ মানুষ মুসলিম শাসনপদ্ধতি এবং তাদের ন্যায়পরায়ণ ও সুন্দর আচরণ পেয়ে সন্তুষ্ট ছিল। সম্ভবত এই বিষয় বিবেচনা করে বাইজেন্টাইনেরা আঘাত হানতে আসেনি। কারণ, সাধারণ মানুষের সাহায্য ছাড়া সিরিয়ায় হামলা করা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া যুদ্ধে যুদ্ধে লোকজন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। এই আরবের বিরুদ্ধে দীর্ঘ যুদ্ধের পরে সবাই একটু শান্তি চাচ্ছিল। মুসলিমদের বিজয় এবং তাদের প্রতি ভয় মানুষের মনে গেঁথে বসে।
৫.৩.৫। প্লেগে আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ এবং ত্যাগের ফাতওয়া
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'কোথাও এই রোগের কথা শুনলে সে অঞ্চলে যাবে না। তবে তোমরা থাকা অবস্থায় রোগ দেখা দিলে সে অঞ্চল ত্যাগ করবে না এবং তা থেকে পালানোর চেষ্টা করবে।'
আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ এবং ত্যাগ করা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ কেউ একে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করেছেন আবার কেউ কেউ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। যারা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাদের মতে আক্রান্ত এলাকা থেকে বেরিয়ে যাওয়া জায়েয। এখানে আমরা দেখতে পেয়েছি যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চাচ্ছিলেন, আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু যেন বেরিয়ে আসেন। তিনি বরং মাফ চেয়ে নেন এবং সেখানে থেকে যাওয়ার অনুমতি চান। অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে নিম্নাঞ্চল থেকে সরে নির্মল বাতাসপূর্ণ পাহাড়ের দিকে চলে যেতে বলেন। তিনি তাই করলেন। সারগে বসে আব্দুর রহমান রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ এবং ত্যাগ না করা বিষয়ে হাদীস বর্ণনা করার পরে আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে চিঠি পৌঁছেছিল।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেবার মদীনায় ফিরে গিয়েছিলেন। মহামারী সবে শুরু হয়েছে, তখনো দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েনি। মদীনায় পৌঁছামাত্রই এর ভয়াবহ ছোবলে অগণিত প্রাণহানির খবর পান। আক্রান্ত অঞ্চল ত্যাগের পক্ষে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মত ছিল। এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামও সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে সিরিয়ায় ছিলেন এবং এই রোগ থেকে বেঁচে যান। উদাহরণ হিসেবে আমর ইবনুল আস এবং আবু মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুমের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।
আক্রান্ত অঞ্চলে প্রবেশ এবং ত্যাগ করা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কেউ বললেন, যারা বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহর হুকুম থেকে পালানো যায় না এবং পালিয়ে মৃত্যুকে দূরে ঠেলা যায় না তাদের জন্য আক্রান্ত অঞ্চল ত্যাগ করা জায়েয আছে। সেই অঞ্চল ত্যাগের জন্য উপযুক্ত কারণ থাকলে তা জায়েয হবে। চিকিৎসালাভের আশায় বের হয়ে আসা জায়েয হবে। প্লেগে আক্রান্ত অঞ্চলের চেয়ে ভালো কোথাও যাওয়ার অনুমতি আছে এবং যাওয়া উচিত।
আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে সেখানে থেকে যেতে চেয়েছিলেন। তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বাস্থ্যগত, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং নেতৃত্বের দায়বদ্ধতার চরম নযীর স্থাপন করেছেন। আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কারণগুলো উল্লেখ করে দিয়েছিলেন, 'আমি বর্তমানে মুসলিম সেনাদের সাথে আছি। নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে তাদের ফেলে আসতে পারি না।' আক্রান্ত অঞ্চল ত্যাগের বিপক্ষে যেসব উলামায়ে কেরাম মত দিয়েছেন তাদের যুক্তিও মজবুত। আক্রান্ত অঞ্চল থেকে যদি সবাই চলে যেতে থাকে তবে দুর্বল অক্ষম লোকজনের কী হবে? অসুস্থ বা অন্য যেকোনো কারণে সরতে অক্ষম লোকজনকে দেখাশোনা করার কেউ থাকবে না। চলে যাওয়ার অনুমতি পেলে শক্ত-সামর্থ্য লোকেরা চলে যাবে এবং অসহায়রা পড়ে থাকবে। এতে করে দুর্বলদের অসহায়ত্ব বেড়ে যাবে। এ জন্যই যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানোর ওপরে কঠিন নিষেধাজ্ঞা ছিল। এমন করলে পেছনে পড়ে থাকা মানুষগুলো আরও অসহায় হয়ে যেত এবং অবহেলিত মানুষকে আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাতে হতো।
পরিশিষ্ট সুতরাং আক্রান্ত অঞ্চলে থেকে যাওয়া কিংবা ত্যাগ করা দুটোর পক্ষেই যুক্তি বিদ্যমান। মহামরীতে একবার আক্রান্ত হয়ে পড়লে সেখান থেকে পালানোর মধ্যে কোনো যুক্তি নেই। তাতে বরং সুস্থ মানুষদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশংকা থাকে। আর যারা সুস্থ ব্যক্তি তাদের মধ্যে কিছু লোক রোগীদের সেবায় ব্যস্ত থাকলে দু-একজন চিকিৎসার খোঁজে বের হতেই পারে।
টিকাঃ
৭৯১. আস-সুলতা আত-তানফীদিয়া, ১/৪০৮।
৭৯২. আর-রিকাবা আল-মালিয়া ফীল ইসলাম, ড. আউফ আল-কাফরাউয়ি, পৃ. ৬৬।
৭৯৩. আত-তাবাকাত আল-কুবরা, ৩/৩৩০।
৭৯৪. তারীখ আল-ইসলাম, আহদ আর-রাশিদীন, পৃ. ২৬৮।
৭৯৫. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৫৮৬।
৭৯৬. আল-হিসবা ফীল ইসলাম, ইবনে তাইমিয়া, পৃ.৬০; আল-হিসবা, ড. ফযল ইলাহি, পৃ. ২৪।
৭৯৭. মাওসূআত ফিকহ উমর ইবনে আল-খাত্তাব, কালআজি, পৃ. ২৮।
৭৯৮. প্রাগুক্ত, পৃ.২৯।
৭৯৯. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৯।
৮০০. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৯।
৮০১. তারীখ আল-মাদীনা আল-মুনাওয়ারা, ২/৭৪৯; মাওসূআত ফিকহ উমর ইবনে আল-খাত্তাব, কালআজি, পৃ. ১৭৭।
৮০২. নিদহাম আল-হুকুমা আল-ইসলামিয়া, আল-কাতানি, ২/১৭।
৮০৩. প্রাগুক্ত।
৮০৪. শাহীদ আল-মিহরাব, পৃ. ২০৯।
৮০৫. প্রাগুক্ত।
৮০৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ২১০।
৮০৭. নিযাম আল-হুকূমা আন-নবুওয়্যাহ, ২/২০১
৮০৮. প্রাগুক্ত।
৮০৯. প্রাগুক্ত।
৮১০. প্রাগুক্ত।
৮১১. ফারাইদ আল-কালাম, পৃ. ১২৯; তানবীহ আল-গাফিলীন, আস-সামারকান্দি, পৃ. ২১১।
৮১২. নিদহাম আল-হুকুমা আল-ইসলামিয়া, আল-কাতানি, ২/২০।
৮১৩. সূরা জুমুআ, ৬২ : ১০।
৮১৪. নিদহাম আল-হুকুমা আল-ইসলামিয়া, আল-কাতানি, ২/২০।
৮১৫. নিদহাম আল-হুকুমা আল-ইসলামিয়া, আল-কাতানি, ২/২০।
৮১৬. সূরা আল-মুযাম্মিল, ৭৩ : ২০।
৮১৭. আল-ফারুক উমর, আশ-শারকউই, পৃ. ১৫১।
৮১৮. প্রাগুক্ত।
৮১৯. প্রাগুক্ত।
৮২০. ফান আল-হুকম, পৃ. ২৬৪।
৮২১. আল-বিদায়া ওয়া আর-নিহায়া, ৭/১৪০।
৮২২. মাহদুস সাওয়াব, ১/৩৮৮।
৮২৩. মানাকিব আমীর আল-মু'মিনীন, ইবনুল জাউযি, পৃ. ৮৯।
৮২৪. মানাকিব আমীর আল-মু'মিনীন, ইবনুল জাউযি, পৃ. ৮৯; আওয়ালিয়াত আল-ফারূক, পৃ. ২৮৯।
৮২৫. আওয়ালিয়াত আল-ফারুক, পৃ. ২৮৯।
৮২৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭০।
৮৩০. প্রাগুক্ত ৯২, ৯৩।
৮৩১. আশ-শায়খান মিন রিওয়ায়াত আল-বালাযুরি, পৃ. ২১১, ২১২।
৮৩২. আওয়ালিয়াত আল-ফারুক, পৃ. ৮৩।
৮৩৩. 'কাল আগ্নেয়শিলায় গঠিত ভূখন্ডকে হাররা বলা হয়। মদীনা এমন দুটো হাররার মাঝে অবস্থিত।
৮৩৪. মদীনা থেকে দুই মাইল দূরে অবস্থিত।
৮৩৫. আখবার উমর, পৃ. ১০৯; আল-হিলইয়া, ১/৫৩।
৮৩৬. আল-বিদায়া ওয়া আন-নিহায়া, ৭/১৪০।
৮৩৭. মানাকিব আমীর আল-মু'মিনীন, ইবনুল জাউযি, পৃ. ৮৯, ৯০।
৮৩৮. মাহদুস সাওয়াব, ১/৩৯১।
৮৩৯. শাহীদ আল-মিহরাব, পৃ. ২২৬।
৮৪০. মাহদুস সাওয়াব, ২/৪৬৯।
৮৪১. নিদহাম আল-হুকম ফী আশ-শারীয়া ওয়া আত-তারীখ, ২/৬০৫।
৮৪২. আখবার উমর, পৃ. ৩৪৩।
৮৪৩. আর-রিয়াদ আন-নাদরা, পৃ.৪০৮।
৮৪৪. আত-তাবাকাত, ৩/২১৫।
৮৪৫. শাহীদ আল-মিহরাব, পৃ. ২৮৮।
৮৪৬. প্রাগুক্ত, পৃ.২২৯।
৮৪৭. ফারাইদ আল-কালাম, পৃ. ১৪০।
📄 উমর রা. এবং কবি ও কবিতা
আমাদের জানামতে উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে মদীনায় কবিতার অস্তিত্ব ছিল, এবং ভালোমতোই ছিল। আরবি কবিতা নিয়ে ইতিহাসের এমন কোনো কিতাব নেই যেখানে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাম উল্লেখ করা হয়নি। বিশেষ করে সাহিত্য সমালোচনায় তার নাম বার বার এসেছে। সেসব তথ্য থেকে জানা গেছে যে তার সময়ে কবিতা আবৃত্তি এবং শোনার রেওয়াজ ছিল। সাহিত্য নিয়ে যে খুব বিশ্বাসযোগ্য এবং ধারাবাহিক বর্ণনা পাওয়া যাবে এমন ভাবার অবকাশ নেই। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এবং হাদীসে প্রবাদ-প্রবচনের পাশাপাশি নাবিঘা আল-জাদী, উমাইয়া ইবনে আবি আস-সালত এবং হাসান ইবনে সাবিতের কবিতার উল্লেখ আছে। এগুলোর বাইরেও খুলাফায়ে রাশেদীন, তাবেয়ীন এবং তাবে তাবেয়ীনদের সময়কার সাহিত্যের যেসব সমালোচনা ও পর্যালোচনা পাওয়া গেছে, সেগুলো থেকে জানা যায়, তখন কবিতার চল ছিল।
এখানে সাহিত্যের কিতাব এবং বিদ্বান ব্যক্তিরা মূলত এসব তথ্যের উৎস। নিঃসন্দেহে তথ্যগুলো মূল্যবান।
৪.৩.১। উমর রা. এবং কবিতা
খুলাফায়ে রাশেদীনের মধ্যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কবিতার প্রতি সবচেয়ে বেশি ঝোঁক ছিল। তিনি কবিতার সমালোচনা করতেন এবং সুযোগ পেলেই বিভিন্ন উপলক্ষে কবিতা আবৃত্তি করতেন। তার প্রসঙ্গে বলা হয়, 'উমর ইবনুল খাত্তাবের সামনে কোনো ঘটনা ঘটেছে আর তিনি তা নিয়ে কবিতা আবৃত্তি করেননি তা কখনো হয়নি।'
বর্ণিত আছে, একবার নতুন আলখাল্লা পরে তিনি বের হন। লোকজন তাকে দেখছিল বলে তিনি বলেছিলেন (কবিতায়),
হরমুষের ধন-দৌলত কাজে আসেনি; আদ জাতি অমরত্বের স্বাদ নিতে গিয়ে হার মেনেছে। চারদিক থেকে সৈন্য পাঠানো সম্রাটরা আজ কোথায়? যে জলাধার থেকে পান করেছে সবাই, আমরাও তা থেকে পান করব নিশ্চয়ই।'
গবেষকমাত্রই জানেন যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অসংখ্য কবিতা আত্মস্থ করেছিলেন। সমসাময়িক হোক কিংবা প্রাচীন যে কোনো কবিতা তিনি খুব দ্রুত মনে করতে পারতেন এবং আবৃত্তি করে ফেলতেন। বলা যায়, তিনি ক্ষুরধার এবং গোছানো স্মরণশক্তির অধিকারী ছিলেন। যে কোনো অবস্থায় কবিতা তার ঠোঁটে প্রস্তুত থাকত। খুব সহজে বলে ফেলতেন। হিন্দ বিনতে উতবা একবার অন্যান্য মুসলিম এবং হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে কী বলেছিলেন সে কথা তিনি হাসান ইবনে সাবিতকে কবিতার মাধ্যমে জানান। এর ফলে হাসানের প্রতিহিংসাপরায়ণ অন্তরে তিনি মায়া জাগাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সুতরাং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে শুদ্ধ অনুভূতিসম্পন্ন স্পর্শকাতর ব্যক্তি বলা যেতে পারে। তিনি কবিতা ভালোবাসতেন, আবৃত্তি করতেন এবং এর মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করতে জানতেন। কোনো কোনো গবেষকের মতে, তিনি কবি ছিলেন; তথ্যটি সঠিক নয়। নিরপেক্ষভাবে বিচার করলে তাকে কবি বলা যাবে না। কারণ, তার জীবনযাপন ছিল খোলা কিতাবের মতো। মানুষের কাছ থেকে কখনো কিছু আড়াল করেননি। তিনি বহু লোকজন নিয়ে চলাফেরা করতেন। সুতরাং কোনোদিন কোনো কবিতা রচনা করে থাকলে তা অবশ্যই জানা যেত এবং লোকেরা তা আবৃত্তি করত। তা প্রচার হতে সময় লাগত না। কোনো না কোনোভাবে বর্ণনাকারীদের কাছ থেকে সে তথ্য আমরাও পেয়ে যেতাম। দেখা গেছে প্রবীণ সমালোচকেরা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কবি ছিলেন এমন দাবি করেননি। ইবনে সাল্লাম তার তাবাকাতে অথবা ইবনে কুতায়দা তার আশ-শায়র ওয়া আশ-শুআরাতেও এ প্রসঙ্গে কিছু বলেননি। আল-জাহিয তার কিতাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাকপটুত্ব এবং জ্ঞান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন, সেখানেও এ কথা আসেনি। আল-মুবাররাদ উল্লেখ করেছেন—তার সাথে মুতাম্মাম ইবনে নুওয়ায়রা তার মালিক ইবনে নুওয়ায়রার আখ্যানেও একমত পোষণ করেছেন—উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুতাম্মামকে বলেছিলেন, ‘আপনি আপনার ভাইকে নিয়ে যেমন স্তুতি লিখেছেন আমিও যদি এমন লিখতে পারতাম।
ইসলামি জীবনের সৌন্দর্য, ইসলামী নীতিবহুল বর্ণনা, নতুন ধর্মের শিক্ষা এবং মূল্যবোধের কথা আছে এমন কবিতা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খুব বেশি প্রিয় ছিল। মুসলিমরা যেন সুন্দর সুন্দর কবিতা শেখে তার প্রতি উৎসাহ দিয়ে বলতেন, 'কবিতা শিখবে, কারণ, তাতে সুন্দরের খোঁজ পাওয়া যায়, অসুন্দর বিদূরিত হয় এবং জ্ঞানীদের জন্য জ্ঞান থাকে, এবং সুন্দর আচরণের অনুপ্রেরণা দেয়।'
মিসরের গভর্নর আবু মূসা আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে তিনি লিখেছিলেন, 'লোকদের কবিতা শিখতে বলবে, কারণ, কবিতা সুন্দর চরিত্র গঠন করে, মন উন্নত করে এবং বংশানুক্রমে জ্ঞান বৃদ্ধি করে।'
এখানেই শেষ নয়; তার কাছে কবিতা ছিল ভালো কাজের প্রতি হৃদয় উৎসারিত করার চাবিকাঠি। কবিতার উপকারিতা এবং গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, 'কবিতা রচনার করতে জানা মানুষের শ্রেষ্ঠতম দক্ষতা। মনের সাধ কবিতার মাধ্যমে মেটানো যায়। কবিতা অভিজাতদের সমবেদনা অর্জন করে এবং যারা অভিজাত নয় তাদেরও মন গলাতে সক্ষম।'
সন্তানদের শিক্ষাদীক্ষায় পরিপূর্ণতা আনার জন্য তিনি পিতামাতাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন তারা যেন সুন্দর সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করে শোনায়। তিনি বলেছিলেন, 'তোমরা সন্তানদের সাঁতার এবং ধনুর্বিদ্যা শেখাও, ঘোড়াচালনায় দক্ষ হতে প্রশিক্ষণ দাও এবং সুন্দর সুন্দর কবিতা শেখাও।'
জাহেলী যুগের কবিতা কুরআন-সংশ্লিষ্ট ছিল বলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তা পছন্দ করতেন। তার বক্তব্য ছিল, 'নিজের ঐতিহাসিক দলিল আঁকড়ে থাকার চেষ্টা করবে, তাহলে পথ হারাবে না।' তার কথা শুনে লোকেরা জানতে চাইল, 'আমাদের ঐতিহাসিক দলিল কোনগুলো?' তিনি বললেন, 'জাহেলী যুগের কবিতা। সেগুলোতে তোমাদের কিতাবের ব্যাখ্যা আছে এবং ভাষার অর্থ আছে।'
কুরআনের বিখ্যাত তাফসীরবিদ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর মুখেও একই কথা শোনা গেছে। তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ছাত্রও বটে। তিনি বলেছেন, 'আল্লাহর কিতাব থেকে কোনো কিছু বুঝতে না পারলে আরবদের কবিতা থেকে তা অর্থ করার চেষ্টা করো। কারণ, সে কবিতাগুলো আরবদের ঐতিহাসিক দলিল।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিশ্বাস করতেন জাহেলী যুগে কেবল কবিতার মাধ্যমে জ্ঞানের সুস্থ চর্চা করা হতো। বর্ণিত আছে, তিনি বলতেন, 'মানুষের জ্ঞান কবিতায় ফুটে উঠত। এর বাইরে তাদের কোনো সুস্থ জ্ঞানচর্চা ছিল না। অতঃপর ইসলামের আবির্ভাব ঘটার পর থেকে আরবেরা কবিতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাইজেন্টাইনদের লড়াই-জিহাদের কারণে তারা কবিতা থেকে সরে আসে। ইসলামের জয় হলো, নতুন ভূখণ্ড বিজিত হলো। আরবরা বিভিন্ন জায়গায় বসতি স্থাপন করল। এবার যখন তারা কবিতার দিকে ফিরে যেতে লাগল তখন আর রচনা করার মতো কোনো বিষয় খুঁজে পাচ্ছিল না। তারা এই অবস্থার সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে শুরু করে। এরপরে আরবদের অনেকেই নিহত হয়েছে এবং মৃত্যুবরণ করেছে। ফলে অধিকাংশ কবিতা হারিয়ে গিয়ে কিঞ্চিৎ রক্ষা পেয়েছে।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এমন কবিরা কদর পেতেন যাদের অন্তর ঈমানে পরিপূর্ণ ছিল এবং যারা ইসলামী মূল্যবোধ তুলে ধরতেন। তাদের ছত্রে ছত্রে ইসলামের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রতিফলিত হয়েছে এবং ইসলাম-উদ্ভূত গুণাবলী প্রকাশ পেয়েছে। এর বাইরে কোনো কবিতায় ইসলামের বিরুদ্ধে বক্তব্য থাকলে তিনি তখনই তা বাতিল করে কবির বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নিতেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তীক্ষ্ণ অনুভূতি এবং সুন্দর রুচিবোধসম্পন্ন ছিলেন। তার এই গুণাবলীর ভিত্তিতে তিনি খুব সহজেই কবিতার গহীনে ডুব দিতে সক্ষম ছিলেন। ফলে কবিতা ইসলামী মূল্যবোধ এবং শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা সহজেই উপলব্ধি করতে পারতেন।
৪.৩.২। উমর রা. এবং হুতায়া ও আয-যাবারকান ইবনে বদর
কথিত আছে কবি আল-হুতায়া—আবু মুলায়কা-জারওয়াল ইবনে আওস বনু কুতায়া ইবনে আবাস গোত্রের লোক ছিলেন। দুর্ভিক্ষের প্রকোপ থেকে বাঁচার জন্য সে পরিবারসহ ইরাকের উদ্দেশ্যে বের হন। তার সাথে আয-যাবারকান ইবনে বদর ইবনে ইমরুল কয়েস ইবনে খালাফ আত-তামীমি আস-সাদির দেখা হয়। সে তার লোকেদের পক্ষ থেকে যাকাত নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে যাচ্ছিল। আয-যাবারকান তাকে চিনতে সক্ষম হয় এবং তার দুরাবস্থা অনুভব করছিল। সে আল-হুতায়াকে তার জন্য অপেক্ষা করতে বলে চলে গেল। তার অনুরোধে আল-হুতায়া তার লোকজনের মাঝে অপেক্ষা করতে থাকে। সেখানে বাগীদ ইবনে আমির ইবনে শাম্মাস ইবনে লুআয় ইবনে জাফার আনফ আন-নাকা নামে এক ব্যক্তিও ছিল। সে ছিল আয-যাবারকানের ঘোর শত্রু। কোনোভাবে লোকটি আল-হুতায়ার মন থেকে আয-যাবারকানকে সরিয়ে দিতে সফল হয়। আল-হুতায়া তার পক্ষে চলে যায়। সুতরাং আল-হুতায়া কবিতার মাধ্যমে আয-যাবারকানকে অপমান করে বনু আনফ আন-নাকার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে। এর ছত্রে ছত্রে অবমাননাকর কথা ছিল। আয-যাবারকান এর কয়েকছত্র তুলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে পাঠিয়ে দেন। এর একটি ছত্র এমন ছিল :
উচ্চাশা নিয়ে চিন্তিত হয়ো না; আর এজন্য সফরও করো না। বসে থাক, খাবার আর পোশাক এমনিতেই পাবে।
ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লেখার অভিযোগ নিয়ে সে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দরবারে হাজির হলো। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'সে কি বলেছে?' সে উপর্যুক্ত অংশ উল্লেখ করল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'সামান্য তিরস্কার ছাড়া আমি এতে অপমানের কিছু দেখছি না।' সে বলল, 'আমার লক্ষ্য কি কেবল খাওয়া-পরায় সীমাবদ্ধ?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হাসানকে আমার কাছে নিয়ে এসো।' তিনি হাসানকে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'তাকে অপমান করা হয়নি, পঁচানো হয়েছে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে হাজতে পুরে দিলেন। সন্দেহ নেই কাব্যরসিকদের মধ্যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সবচেয়ে জ্ঞানী ছিলেন।
তবে এবার যেহেতু বিচারকের দায়িত্ব পালন করছিলেন তাই সাক্ষ্য প্রদানের জন্য তিনি বিশেষজ্ঞের মতামত নিতে চাইলেন। আল-আক্কাদ এই ঘটনা প্রসঙ্গে বলেছেন, 'তিনি কবিতায় পারদর্শী ছিলেন, কবিতার সমালোচক ছিলেন। অথচ বিচার করতে গিয়ে তিনি সামান্যতম সন্দেহের অবকাশ রাখতে চাননি। নিজের কাব্যগুণের ওপরে নির্ভর না করে ওই বিষয়ে বিজ্ঞজনের পরামর্শ গ্রহণ করেছেন।'
আল-হুতায়া কারাগারে থাকার সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মন গলানোর চেষ্টা করতে থাকে। খলীফাকে লেখা কবিতায় সে নিজের অপরাধ অস্বীকার করেছিল; কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার ক্ষমার আর্জি গ্রহণ করেননি। এরপরে সে একর পর এক ছত্র লিখে যেতে থাকে। তার সন্তানদের কথা খুব করুণভাবে বর্ণনা করতে থাকে। সে তার সন্তানদের পালকহীন অসহায় পাখির বাচ্চা বলে উল্লেখ করেছে, যাদের মুখে খাবার তুলে দেবার এবং দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই; কারণ, সে তার পরিবারের একমাত্র উপার্জক্ষম ব্যক্তি ছিল। তাকে অন্ধাকারে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে বলে সে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে।
তার এই পঙক্তিগুলোয় কাজ হলো। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এগুলো পড়ে কাঁদতে লাগলেন। তিনি তাকে ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেন। তার মুখ বন্ধ রাখার জন্য তিনি তার কাছ থেকে তিন হাজার দিনারের বদলে মুসলিমদের সম্মান কিনে নেন। অথচ আল-হুতায়া এ নিয়েও অভিযোগ করে একের পর এক কবিতা রচনা করতে লাগল।
তার এমন আচরণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বুঝতে পারলেন যে আল- হুতায়ার মধ্যে কোনোকিছুর আসর পড়েনি। তাই তিনি লোকটির বিরুদ্ধে ফরমান জারি করে ডেকে আনেন। সামনে বসিয়ে তার জিহ্বা কেটে ফেলার হুমকি দেন। তখন আল-হুতায়া বলে উঠল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর কসম, আমি আমার বাবা-মাকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেছি। আমার স্ত্রী এমনকি আমার নিজেকে নিয়েও এ কাজ করেছি।’ তার কথা শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হাসলেন এবং তাকে ছেড়ে দিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে সে আর কোনোদিন ব্যঙ্গাত্মক কবিতা রচনা করেনি।
যাহর আল-আদাব কিতাবেও এমন একটি ঘটনার উল্লেখ আছে। লেখক উদ্ধৃত করেছেন : বনু আল-আজলানের লোকেরা তাদের নাম নিয়ে খুব গর্ব করত। আব্দুল্লাহ ইবনে কাব নামে তাদের একজন পূর্বপুরুষ ছিল। সে মেহমানদের খুব দ্রুত (তা'জীলের সাথে) আপ্যায়ন করতে পারত বলে তাকে আল-আজলান উপাধি দেওয়া হয়। বিষয়টি তাদের জন্য খুব গর্বের ছিল। এর মধ্যে আন-নাজাশী—যার আরেক নাম ছিল কয়েস ইবনে আমর ইবনে কাব—তাদের নাম নিয়ে বিদ্রূপাত্মক কবিতা রচনা করতে থাকে। সেখানে তাদের নামের উৎপত্তির প্রসঙ্গে বলেছে, ‘হে দাস, যাও দ্রুত পশুর দুধ দোহন করে আন!’ অর্থাৎ, এমন কাজ করত বলে তাদের পূর্বপুরুষকে ওই উপাধি দেওয়া হয়েছে।
বর্ণনাকারীরা উল্লেখ করেছেন যে বনু আজলানের লোকেরা আন-নাজাশীর নামে নালিশ নিয়ে যায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে কারাগারে পুরে দেন এবং কারও কারও মতে খলীফা তাকে বেত্রাঘাতও করেছিলেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মানুষকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করার জন্য যেমন শাস্তি দিতেন তেমনই কবিতার ধরনে গড়মিল হলেও তাদের রক্ষা ছিল না। মুসলিমদের অপমান করা হলে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করলে এবং মুসলিম নারীদের কথা উল্লেখ করলেও তিনি শাস্তি দিতেন।
৪.৩.৩। কঠিন উমর রা. কবিতার প্রভাবে নম্র ও সমব্যথী হয়ে উঠতেন
উমাইয়া ইবনুল আস্কার আল-কিনানী নামে এক নেতা ছিলেন। তার এক সন্তানের নাম ছিল কিলাব। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে তিনি মদীনায় হিজরত করে আসেন এবং কিছুদিন অবস্থান করেন। তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ এবং আয-যুবায়র ইবনুল আওয়ামের সাথে দেখা হলে তাদের কাছে জানতে চাইলেন, 'ইসলামের কোন কাজটি শ্রেষ্ঠ?' একজন বললেন, 'জিহাদ।' একজন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অনুরোধ করলেন তাকে যেন পারস্যে লড়তে যাওয়া সৈন্যদের সাথে পাঠানো হয়। উমাইয়া উঠে দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমার বয়স বাধা না হলে আমি আজই জিহাদের জন্য চলে যেতাম।' তার ছেলে কিলাব খুব ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন। তিনি দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আখেরাতের খাতিরে আমি আল্লাহ তা'আলার কাছে আমার প্রাণ এবং এই পৃথিবী বিক্রি করে দিতে রাজি আছি।' তার বাবা তাকে জড়িয়ে ধরে খেজুর গাছের ছায়ায় চলে গেলেন। বলতে লাগলেন, 'তোমার বৃদ্ধ, দুর্বল বাবা-মাকে এভাবে ফেলে যেয়ো না। সেই ছোট্টটি ছিল। তোমাকে এত আদর-যত্নে বড় করেছি। এখন তাদের প্রয়োজনের সময় কিনা তুমি তাদের ফেলে যেতে চাচ্ছ।' তিনি বললেন 'আরও ভালো কিছুর আশায় আমি তাদের রেখে যেতে চাচ্ছি।' ছেলেটি তার বাবার অনুমতি নিয়ে জিহাদের উদ্দেশ্যে চলে যান। তার বাবা তখনো সেই খেজুরগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে রইলেন। এমন সময় একটা কবুতর তার বাচ্চাদের জন্য ডেকে ওঠে। ওই ডাক শুনে বৃদ্ধ বাবার মন হুহু করে ওঠল। তিনি কাঁদতে লাগলেন, বৃদ্ধা মা-ও কাঁদতে শুরু করলেন।
উমাইয়া অন্ধ ছিলেন। তার পথপ্রদর্শক তাকে হাতে ধরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে নিয়ে যান। খলীফা তখন মসজিদে অবস্থান করছিলেন। বৃদ্ধ বাবা কবিতার পঙক্তি সাজিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে ছেলেকে ফেরত চাইতে লাগলেন। তার কথায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর চোখে অশ্রু বয়ে যায়। তিনি আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে পত্র মারফত কিলাবকে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন। আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু সাথে সাথে কিলাবকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথামতো কিলাব তার সাথে আগে দেখা করতে যান। তিনি উমাইয়াকে ডাকতে পাঠিয়ে কিলাবের সাথে কথা বলতে লাগলেন। উমাইয়া হাজির হলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'আজ কোনো জিনিস পেলে আপনি সবচেয়ে খুশি হবেন?' বৃদ্ধ বাবা বললেন, 'কিলাবকে। তাকে পেলে আমি তার গায়ের ঘ্রাণ নিতাম।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কিলাবকে বেরিয়ে আসতে বললেন। তার বাবা দাঁড়িয়ে গেলেন, সন্তানের গায়ের ঘ্রাণ নিতে লাগলেন, ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। এমন দৃশ্য উপস্থিত সবাইকে কাঁদিয়ে দিল। তারা কিলাবকে বলতে লাগল, 'বাবা-মায়ের কাছে থেকে যাও এবং তারা যতদিন বেঁচে থাকবেন তাদের খুশি রাখার চেষ্টা কর। তারা যখন থাকবেন না তখন না হয় যা খুশি কর।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার জন্য ভাতার নির্দেশ দিয়ে বিদায় দিলেন। কিলাব একজন সেরা মুসলিম ছিলেন। তার বাবা-মা যতদিন বেঁচে ছিলেন তিনি তাদের সাথে থাকতেন।
এমন ঘটনা আরেকবার ঘটেছিল। শায়বান ইবনুল মুখাব্বাল আস-সাদী নামে একজন বিখ্যাত কবি ছিলেন। তিনি সাদ ইবনে ওয়াক্কাসের সাথে পারসিকদের বিরুদ্ধে লড়তে চলে যান। এদিকে তার বৃদ্ধ পিতা, আল- মুখাব্বাল, খুব দুর্বল ছিলেন। তিনি সন্তানের অনুপস্থিতি মেনে নিতে পারছিলেন না। সারাক্ষণ আতংকে থাকতেন। নিজের ভয় এবং দুঃখের কথা কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন। তার কবিতা শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মন ব্যথিত হয়ে ওঠে। তিনি এক পর্যায়ে কেঁদে ফেলেন। তিনি সাদের কাছে চিঠি লিখে শায়বানকে ফেরত পাঠাতে বলেন। শায়বান ফিরে এলে তাকে তার বাবার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কবিতায় আপ্লুত হওয়ার ঘটনার এখানেই শেষ নয়। এমন বহুবার ঘটতে দেখা গেছে। খাররাশ ইবনে আবি খাররাশ আল- হুযালী উমর ইবনুল খাত্তাবের খেলাফতকালে হিজরত করে মদীনায় এসেছিলেন। তিনি মুসলিমদের সাথে একটি সেনা অভিযানে যোগ দেন। তারা এক পর্যায়ে শত্রুর এলাকায় ঢুকতে সক্ষম হন। এমন সময় আবু খাররাশ এসে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সামনে বসে পড়লেন এবং তার ছেলেকে কি পরিমাণে মনে পড়ছে তা বলতে লাগলেন। তিনি এমন এক ব্যক্তি ছিলেন যার পরিবারের সবাই নিহত হয়েছিল, তার ভাইয়েরাও নিহত হয়। তার সন্তান খাররাশ ছাড়া তাকে দেখাশোনা করার মতো এবং সাহায্য করার মতো আর কেউ ছিল না। সে-ও তাকে ফেলে মুসলিমদের সাথে অভিযানে চলে গেছে। তার কবিতার ছত্রে ছত্রে মনের ব্যথা ও ব্যকুলতা ফুটে উঠতে থাকে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কবিতা শুনেও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। এবারও তিনি চিঠি দিয়ে খাররাশকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন এবং বৃদ্ধ পিতার কাছে পাঠিয়ে দেন। সেবার তিনি একটি ফরমান জারি করেন। নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাদের বয়োবৃদ্ধ বাবা আছে তারা যেন তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে।
দেখা যাচ্ছে যে কঠিন এবং দৃঢ়চেতা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুও কবিতা শুনে আপ্লুত হতেন, এমনকি কাঁদতেন পর্যন্ত। এখানে তার মানবিক অনুভূতি এবং স্পর্শকাতরতার পরিচয় পাওয়া যায়। দুর্বল এবং বৃদ্ধ পিতাদের জন্য তার সমবেদনা ফুটে উঠেছে। কারণ, তারা তাদের সন্তানের ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তাছাড়া নির্যাতিত এবং অসহায় মানুষের জন্যও তার সমবেদনা ছিল লক্ষ্যণীয়। তাদের কষ্ট তিনি খুব অনুভব করতেন। ব্যঙ্গাত্মক কবিতা নিয়ে যেসব পরিস্থিতি তৈরি হতো সেখানেও তার সমবেদনা নজরে পড়েছে।
৪.৩.৪। উমর রা.-এর কাব্য সমালোচনার গুণ
উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লাম দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। ফলে তাকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করতেন। সাহিত্য কিংবা কবি ও কাব্য সমালোচনাও তার ওপরে এমন প্রভাব বিস্তার করেছিল। একাধিক বর্ণনায় তার সাহিত্য বিষয়ক মতামত এবং সাহিত্য সমালোচনার প্রসঙ্গ এসেছে। এর সময়সীমা তার খেলাফত থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দশ বছর পর্যন্ত বিস্তৃত। সাহিত্যের প্রতি তার কেমন ঝোঁক ছিল, তার শিক্ষাদীক্ষা এবং অভিজ্ঞতার আলোকে কীভাবে তার দৃষ্টিভঙ্গির উত্তরণ ঘটেছে বিভিন্ন বর্ণনা থেকে এসব তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাব্য সমালোচনার গুণ তৈরি এবং উত্তরণের পেছনে যেসব কারণ, বিদ্যমান সেগুলো জানতে হলে তার জীবনের দুটি পর্যায় বিশ্লেষণ করতে হবে—জাহেলী এবং ইসলামী। এখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
জাহেলী যুগে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জাহেলী প্রথার অন্যতম ধারক এবং বাহক ছিলেন। আরবদের মধ্যে কুরাইশেরা খুব প্রভাবশালী ছিল। আর কুরাইশদের মধ্যে তিনি উঁচু স্থান দখল করে ছিলেন। আরবদের মধ্যমণি ছিলেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনিও আরবদের যেমন ভালোবাসতেন তেমনই তাদের প্রতি খুব শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। আবার খেলাফতকালীন তিনি ইসলামের প্রতিও একইরকম বিশ্বস্ত থেকেছেন।
জাহেলী এবং ইসলামী, দুই যুগেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কবিতায় দক্ষ ছিলেন। সুতরাং মুশরিক, মুরতাদের মতো ইসলামের শত্রুরা কবিতার মাধ্যমে নতুন ধর্ম সম্পর্কে কি বার্তা দিচ্ছে তা তিনি খুব সহজেই ধরতে পারতেন।
সন্দেহ নেই, তিনি জাহেলী এবং ইসলামী, দুই যুগ সম্পর্কেই জানতেন। মানুষের বিশ্বাস, ইতিহাস, বংশানুক্রম, আচরণ এবং জ্ঞান সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান ছিল। ফলে তিনি বক্তব্য বিশ্লেষণ এবং প্রকাশ করতে পারতেন।
অল্প বয়স থেকেই তিনি সাহিত্যচক্রের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। এগুলো সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, আবৃত্তি, সমালোচনা, মূল্যায়ন এবং মত-বিনিময় নিয়ে মুখর থাকত। মুসলিম হওয়ার পরেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সুন্দর ফল বেছে নেবার মতো করে সুন্দর শব্দচয়ন করে যারা কথা বলতেন তাদের সাথে ওঠাবসা করতে পছন্দ করতেন। ইবাদত এবং আল্লাহর জন্য জিহাদের পরেই এই কাজ তার সবচেয়ে প্রিয় ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কথা বলে সময় কাটাতেন যে কয়জন সাহাবী তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম ছিলেন। তিনি খলীফা থাকাকালীন মসজিদের পাশে একটি আলোচনাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আল-বাতহা নামে পরিচিতি লাভ করে। সেখানে কাব্যপ্রেমী এবং কবিতার শিক্ষার্থীরা জড়ো হতো।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লামের সাহাবী উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দূরদর্শী, প্রতিভাধর, অসাধারণ বুদ্ধিমান এবং উৎসাহী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি খুব সহজেই সঠিক অর্থ বের করে ফেলতেন, এক্ষেত্রে তার কখনো ভুল হতো না। উপরন্তু তিনি সুন্দর পংক্তি শুনলে আপ্লুত হয়ে পড়তেন। তিনি এমন কবিতার কদর করতেন, প্রশংসা করতেন। বর্ণিত আছে মুতাম্মান ইবনে নুওয়ায়রা তার ভাই মালিককে নিয়ে স্তুতি রচনা করেছিলেন। রিদ্দার যুদ্ধে সে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সেনাদের হাতে নিহত হয়। তার স্তুতিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এতটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন যে তার সাথে দেখা করতে চলে যান। কবিকে বললেন, 'আপনি আপনার ভাই মালিককে নিয়ে যেভাবে স্তুতি রচনা করেছেন আমিও যদি আমার ভাই যায়দ ইবনুল খাত্তাবকে নিয়ে এমন লিখতে পারতাম।' খলীফাকে তিনি বললেন, 'হে আবু হাফস, আল্লাহর কসম আমার ভাইয়ের পরিণতি আপনার ভাইয়ের মতো হবে জানলে তার স্তুতি লেখার প্রয়োজন পড়ত না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আপনার মতো করে আমাকে এভাবে কেউ এমন সান্ত্বনা দেয়নি।'
স্পষ্টতা
বর্ণিত আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হারাম ইবনে সিনানের এক ছেলেকে বলেছিলেন, 'যুহায়র তোমার প্রশংসা করতে গিয়ে যা রচনা করেছে আমাকে তার কিছু শোনাও।' সে আবৃত্তি করল। এবার তিনি বললেন, 'সে তোমার প্রশংসা করেছে এবং বেশ ভালোভাবে করেছে।' ছেলেটি বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমরা তাকে প্রচুর পুরস্কার দিয়েছি।' এবার তিনি বললেন, 'তোমরা যা দিয়েছ তা শেষ হয়ে গেছে। আর সে যা দিয়েছে তা টিকে আছে।'
রচনাশৈলীর মানের ওপরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কবিতা ও কবি ভালো লাগার মান নির্ভর করত। ভাষার সুষ্ঠু প্রয়োগ তার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ, তার নিজের ভাষাও গড়ে উঠেছিল আরবী ভাষার সৌন্দর্য ও বাগ্মীতার ভিত্তিতে। ব্যাকরণগত ভুলত্রুটি তিনি অপছন্দ করতেন। সুতরাং কোনো লেখা বাতিল করার জন্য এই ত্রুটিই যথেষ্ট ছিল। ব্যাকরণগত ভুল করার জন্য লোকজনকে শাস্তি দেবার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
অস্পষ্ট ও জটিল শব্দের বদলে পরিচিত ও সহজ শব্দের ব্যবহার
বর্ণিত আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যুহায়রের কবিতা পছন্দ করতেন বলে তার কাছে যেতেন। তার সহজ-সাবলীল কবিতায় কোনো ঘোরপ্যাঁচ থাকত না। তাই তার কবিতা তিনি পছন্দ করতেন। আর সত্য না বললে তিনি কারও প্রশংসা করতেন না।
ইসলামে কেমন কবিতা গ্রহণযোগ্যতা পায় এখানে তা স্পষ্ট হয়েছে। যে কবিতার অর্থ সহজে বোঝা যায়, যেখানে পরিচিত শব্দ ব্যবহার করা হয়, জীবনঘনিষ্ঠ এবং বাহুল্যবর্জিত সেগুলোই গ্রহণযোগ্য। কারণ, কবিতা সাধারণত বিপুল সংখ্যক মানুষকে উদ্দেশ্য করে লেখা হয় এবং সেখানে তাদের জন্য বার্তা থাকে। তাই এগুলো বুদ্ধিদীপ্ত হওয়া প্রয়োজন।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ভাষার অলংকার কতটুকু থাকবে তা-ও এ বিষয়ে যারা পারদর্শী তারা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নির্দেশক্রমে এর সীমারেখা নির্ধারণ করে দেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের কাছে চিঠি লিখলেন, 'আপনার শত্রুদের অবস্থান এবং আপনার পরিস্থিতি জানা ছিল না বলে চিঠি দিতে পারছিলাম না। মুসলিমরা কোথায় ঘাঁটি স্থাপন করেছে এবং আপনাদের ও আল-মাদাইনের মাঝে কোনো অঞ্চল পড়েছে তা সবিস্তারে জানাবেন। আমি আপনার পরিস্থিতির স্পষ্ট এবং সম্পূর্ণ চিত্র চাচ্ছি।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দৃষ্টিতে স্পষ্টতা কতটা জরুরী ছিল তা চিঠির শেষের অংশে 'আমি স্পষ্ট চিত্র চাই'–এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়।
শব্দ অর্থপূর্ণ হতে হবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর একটি উদ্ধৃতি, ‘ঘোরপ্যাঁচ থেকে সাবধান থাকবে।’ ইমাম আদ-দারিমি বলেছেন, 'এখানে তিনি লম্বা-চওড়া বক্তব্য প্রসঙ্গে বলেছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অতিরিক্ত কথা অপছন্দ করতেন; কারণ, তাতে মূল বক্তব্য হারিয়ে যায় এবং বিকৃত হয়ে যায়।'
সঠিক জায়গায় সঠিক শব্দ প্রয়োগের সৌন্দর্য শব্দের ভুল প্রয়োগ দেখলেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিরক্ত হতেন। তাতে অর্থ নষ্ট হয়ে যায় এবং বিকৃতি ঘটে। বনু আর-হাসহাসের খাদেম সুহায়ম তার কবিতায় বলেছিল :
পাকা চুল আর ইসলাম মানুষকে (গোনাহ থেকে) প্রতিহত করার জন্য যথেষ্ট।
এর পরিপ্রেক্ষিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'তুমি পাকা চুলের আগে ইসলামের কথা বললে আমার বেশি ভালো লাগত।' এই বক্তব্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর উন্নত রুচিবোধের দলিল। মানুষের পাকা চুলের তুলনায়, চাই আগে পাকুক অথবা পরে, ইসলাম মানুষকে গুনাহ থেকে বাঁচাতে সক্ষম। সুতরাং গুরুত্বের বিচারে এবং মানুষের অন্তর প্রভাবিত করতে হলে ইসলামের নাম আগে আসা উচিত ছিল বলে তিনি মত দিয়েছেন। তার কবিতার পংক্তিতে এই দুর্বলতা ছিল।
টিকাঃ
৯৯৯. মাজমা আয-যাওয়াইদ, ৮/১২৬।
১০০০. আল-মাদীনা আন-নবুওয়া ফাজর আল-ইসলাম, ২/৯৮।
১০০১. আল-বায়ান, আল-জাহিয, ১/২৪১; আল-আদাব ফীল ইসলাম, নায়িফ মারূফ, পৃ. ১৬৯।
১০০২. প্রাগুক্ত।
১০০৩. আল-আদাব ফীল ইসলাম, নায়িফ মারূফ, পৃ. ১৭০।
১০০৪. আল-আদাব ফীল ইসলাম, নায়িফ মারূফ, পৃ. ১৭১।
১০০৫. আল-কামিল ফীল আদাব, আল-মুবাররাদ, ২/৩০১; আদাব সাদরুল ইসলাম, পৃ. ৮৭।
১০০৬. আদাব আল-ইমলা, আবু আস-সামামি, পৃ. ৭১।
১০০৭. আল-উমদা, আবু রাশীক, ১/১৫।
১০০৮. আল-আদাব ফীল ইসলাম, নায়িফ মারূফ, পৃ. ১৭১।
১০০৯. আল-কামিল ফীল আদাব, ২/২২৭।
১০১০. আল-মুজাম আল-কাবীর, আত-তাবরানি, ৭/১২৯; আল-আদাব আল-ইসলামি, পৃ. ১৭১।
১০১১. আল-আদাব আল-ইসলামি, পৃ. ১৭১; আল-উমদা, আবু রাশীক, ১/১৭।
১০১২. তাবাকাত আশ-শুআরা, ইবনে সাল্লাম, ১/২৫; আদাব সাদrুল ইসলাম, পৃ. ৮৭।
১০১৩. উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ আবু আন-নাসর, পৃ. ২১৮।
১০১৪. প্রাগুক্ত, পৃ.২১৯।
১০১৫. আল-আদাব ফীল ইসলাম, নায়িফ মারূফ, পৃ. ১৭২।
১০১৬. আবকারিয়া উমর, পৃ. ২৪৬।
১০১৭. আল-কামিল ফীল আদাব, ২/৭২৫।
১০১৮. যাহর আল-আদাব, আল-কয়রাওয়ানি, ১/৫৪; আল-আদাব ফীল ইসলাম, পৃ. ৯২।
১০১৯. আদাব সাদরুল ইসলাম, ড. ওয়াদি আস-সামাদ, পৃ. ৯২, ৯৩।
১০২০. আল-আদাব আল-ইসলামি, পৃ. ১৮০।
১০২১. উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ আবু আন-নাসর, পৃ. ২২৮।
১০২২. আদাব সাদrুল ইসলাম, ড. ওয়াদি আস-সামাদ, পৃ. ৯০।
১০২৩. আল-আঘানি আল-আসফাহানি, ১৩/১৮৯।
১০২৪. আদাব সাদrুল ইসলাম, ড. ওয়াদি আস-সামাদ, পৃ. ৯০।
১০২৫. উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ আবু আন-নাসর, পৃ. ২৪৪।
১০২৬. যেখানে মালিকের গন্তব্য হলো জাহান্নাম আর যায়দ যাবেন জান্নাতে।
১০২৭. উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ আবু আন-নাসর, পৃ. ২৪৪; আল-কামিল, আল-মুবাররাদ, ২/৩০০।
১০২৮. আল-মাদীনা আন-নাবাউয়িয়া ফাজর আল-ইসলাম ওয়া আল-আসর আর-রাশিদি, ২/১০২।
১০২৯. উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ আবু আন-নাসর, পৃ. ২৪৮।
১০৩০. আল-মাদীনা আন-নবুওয়া ফাজর আল-ইসলাম ওয়া আল-আসর আর-রাশিদি, ২/১০২।
১০৩১. প্রাগুক্ত, ২/১০২।
১০৩২. উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ আবু আন-নাসর, পৃ. ২৪৮।
১৩০৩. মাজমুআ আল-ওয়াসাইক আস-সিয়াসিয়া, পৃ. ৪১৪।
১৩০৪. সুনান আদ-দারিমি, ১/৯, উমর ইবনুল খাত্তাব, মুহাম্মাদ আবু আন-নাসর, পৃ. ২৫২ দ্রষ্টব্য।