📄 উমর রা.-এর সামাজিক জীবন
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সামাজিক জীবন ছিল কুরআন এবং সুন্নাহর জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তার জীবনে ইসলাম কীভাবে বিরাজমান ছিল, এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়ে গেছে। এখানে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা বর্ণনা করা হলো:
৩.১.১। সমাজে নারীদের অবস্থান নিয়ে তার উদ্বেগ
সমাজে মুসলিম পরিবারের কন্যাশিশু, তরুণী, বৃদ্ধাদের নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর চিন্তার অন্ত ছিল না। তাদের অধিকার রক্ষায় এবং তাদের প্রতি যে কোনো যুলুমের বিরুদ্ধে তিনি সদা তৎপর ছিলেন। যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেনাদের স্ত্রীদের ভরণপোষণ এবং বিধবাদের অধিকার নিশ্চিতের বেলায় তিনি খুব যত্নবান ছিলেন। তার একটি বিখ্যাত উক্তি, 'আল্লাহর কসম, আমি যদি বেঁচে থাকি তবে এ বছরের পরে ইরাকি বিধবাদের জন্য আর কাউকে প্রয়োজন হবে না।' নারীদের প্রতি তার সদাচারের কিছু উজ্জ্বল উদাহরণ নিচে উল্লেখ করা হলো।
'তোমার মৃত্যু হোক, তুমি উমরের ভুল খুঁজে বেড়াচ্ছ?'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যথারীতি রাতের আঁধারে টহল দিতে বের হন। তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে তার দেখা হলো। অতঃপর তিনি একটি ঘরে গেলেন, তারপরে আরেকটি ঘরে গেলেন। পরের দিন তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু সেই ঘরে গিয়ে একজন অন্ধ বৃদ্ধার দেখা পান। তিনি বৃদ্ধার কাছে জানতে চাইলেন, 'আপনার কাছে যে লোকটি আসে তিনি কে?' বৃদ্ধা জবাব দিল, 'তিনি অমুক দিন থেকে আমার দেখ-ভাল করছেন। তিনি আমার প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্তর এনে দেন এবং যাওয়ার সময় ময়লা আবর্জনা নিয়ে যান।' এ কথা শুনে তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন, 'তোমার মৃত্যু হোক, তুমি উমরের ভুল খুঁজে বেড়াচ্ছ!'
সমাজে অবস্থানরত দুস্থদের প্রতি উদ্বেগের মধ্যেই সাফল্য বিদ্যমান। আবার একইসাথে তা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্যেরও অন্যতম চাবিকাঠি। তাই সমাজের এই শ্রেণির লোকদের প্রতি ইসলামী বিপ্লবের নেতা, মুসলিম জনগোষ্ঠীর শাসক থেকে শুরু করে মসজিদের ইমাম ও সাধারণ মুসলিম-নির্বিশেষে সবার নযর দিতে হবে।
'আল্লাহ তা'আলা আরশ থেকে এই নারীর ফরিয়াদ শুনতে পেয়েছেন'
একদিন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মসজিদ থেকে বের হলেন। আল-জারুদ আল-আব্দিও তার সাথে ছিলেন। একজন নারী রাস্তায় বের হয়ে এলেন। উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে সালাম দেন। সালামের জবাব দিয়ে সেই নারী বলতে লাগলেন, 'ইয়া উমর, আমার মনে আছে উকায বাজারে আপনি লাঠি নিয়ে ছেলেপুলেদের তাড়া করতেন। আপনাকে তখন 'উমায়ের' নামে ডাকা হতো। এর অল্প সময় পরেই, আপনি 'উমর' হয়ে উঠলেন, আমীরুল মুমিনীন হয়ে উঠলেন। মানুষের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন। মনে রাখবেন, যে হাশরের বিচারকে ভয় পাবে, তার জন্য কঠিন জিনিসও সহজ করা হবে। আর যে মৃত্যুকে ভয় পাবে কোনো মূল্যেই সে কোনো ভালো কাজ ছাড়বে না।' আল-জারুদ বলে উঠলেন, 'হে নারী, আপনি আমীরুল মুমিনীনের সাথে রুক্ষ আচরণ করছেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বাধা দিলেন। বললেন, 'তাকে বলতে দাও। তুমি জান তিনি কে? তিনি খাওলা বিনতে সালাবা। আল্লাহ তা'আলা পর্যন্ত আরশ থেকে তার কথা শুনেছেন। সুতরাং আমি উমরও তার কথা শুনতে বাধ্য।'
আরেকটি বর্ণনামতে তিনি বলেছিলেন, 'আল্লাহর কসম, তিনি যদি এখানে দাঁড়িয়ে সারা রাতও কথা বলেন, তবে একমাত্র নামায পড়তে যাওয়া ছাড়া আমি সরব না। নামায পড়ে এসে আবারও তার কথা শুনব। আল্লাহ তা'আলা খাওলার একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাযিল করেছেন:
যে নারী তার স্বামীর বিষয়ে আপনার সাথে বাদানুবাদ করছে এবং অভিযোগ পেশ করছে আল্লাহর দরবারে, আল্লাহ তার কথা শুনেছেন। আল্লাহ আপনাদের উভয়ের কথাবার্তা শোনেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শোনেন, সবকিছু দেখেন।
'হে আমাদের নিকটাত্মীয়, স্বাগতম'
যায়েদ ইবনে আসলামের বর্ণনা থেকে জানা যায়, তার বাবা বলেছেন : আমি উমর ইবনুল খাত্তাবের সাথে বাজারে গিয়েছিলাম। এক তরুণী তার কাছে ছুটে এসে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, স্বামী মারা গেছেন। আমার ছোট ছোট বাচ্চা আছে। আল্লাহর কসম, ওরা নিজেদের যত্ন নেবার মতো হয়নি। এদিকে তাদের সম্পদ বলতে কিছুই নেই। আমার ভয় হচ্ছে, হায়েনার কবলে না ওদের জান যায়। আমি খুফাফ ইবনে ঈমা আল- গিফারির কন্যা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তিনি হুদায়বিয়ায় উপস্থিত ছিলেন।' এ কথা শুনে তিনি নড়লেন না। সেই তরুণীকে সম্বোধন করে বললেন, 'হে আমাদের নিকটাত্মীয়, স্বাগতম।' অতঃপর তিনি বাড়ির কাছে বাঁধা সবচেয়ে শক্তিশালী উটটির বাঁধন খুললেন। ওগুলোর পিঠে দুটি বড় পাত্র ভরে খাবার তুলে দিলেন। পাত্রগুলোর মাঝে পোশাক আর টাকাপয়সা রাখলেন। উটের রশি তরুণীর হাতে দিয়ে বললেন, 'এগুলো নিয়ে যাও। আর এগুলো শেষ হবার আগেই আল্লাহ তা'আলা আরও পাঠিয়ে দেবেন।' এক ব্যক্তি এসব দেখে বলে উঠলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি তাকে বেশি দিয়ে ফেললেন।' তিনি বললেন, 'তোমার মা তোমার মতো সন্তান না পায়! আমি এই নারীর বাবা আর ভাইকে দেখেছি। তারা দীর্ঘ সময় সেই দুর্গ অবরোধ করে রাখার পরে আমরা বিজয় লাভ করেছিলাম। তাদের বীরত্বের কারণে আমরা গনীমত পেয়েছি। সেগুলো পরে সবার মধ্যে বিলি-বণ্টন করা হয়।'
ইসলামের জন্য কেউ কিছু করলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার প্রতি খুব আন্তরিক আচরণ করতেন। তা যত সামান্য কাজই হোক না কেন। এমন আন্তরিকতার আজ কত অভাব। এখন কারও মধ্যে এমন আচরণ তেমন একটা দেখা যায় না।
আবু বকর রা.-এর কন্যা উম্মে কুলসুমকে বিয়ের প্রস্তাব
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার কাছে তার ছোট বোন উম্মে কুলসুমকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বোনের মতামত নিতে গেলে তিনি জবাব দিলেন, 'আমি এর কোনো প্রয়োজন দেখছি না।' তখন আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বললেন, 'তুমি কি আমীরুল মুমিনীনকে ফিরিয়ে দিচ্ছ?' তিনি বললেন, 'জি। তিনি অনেক কঠিন জীবনযাপন করেন। তাছাড়া নারীদের সাথে তার আচরণ খুব রুক্ষ।' আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাহায্য চাইলেন। সবকিছু শুনে তিনি বললেন, 'হে উম্মুল মুমিনীন, আপনি এ নিয়ে ভাববেন না। আমি সামলে নেব।' তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমি কিছু কথা শুনলাম। আপনি কিন্তু এ নিয়ে রাগ করবেন না।' তিনি বললেন, 'কী ব্যাপার?' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আপনি কী আবু বকরের কন্যা উম্মে কুলসুমকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ। তিনি কি মনে করছেন যে, তিনি আমার যোগ্য নন কিংবা আমি তাঁর যোগ্য নই।' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এর কোনোটাই নয়। তিনি উম্মুল মুমিনীন আয়েশার আদর-আহ্লাদে বড় হয়েছেন। এদিকে আপনি কঠোর প্রকৃতির। আপনাকে আমরাই এত ভয় পাই যে, আপনার সামনে ঠিকমতো কেউ দাঁড়াতে পর্যন্ত পারি না। কখনো আপনি তাঁর প্রতি রুষ্ট হলে তিনি যদি আপনার অবাধ্য হন, তখন কী হবে? আবু বকরের সন্তানের সাথে তো তাহলে অন্যায় করা হবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি যে আয়েশার সাথে কথা বলে ফেলেছি, তার কী হবে?' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমার ওপরে ছেড়ে দিন, ইয়া আমীরাল মুমিনীন।'
আরেকটি বর্ণনামতে, আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি বিয়ে করছেন না কেন?' তিনি বলেছিলেন, 'এইতো কিছুদিনের মধ্যেই করব মনে হয়।' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আপনি কার কথা ভাবছেন?' তিনি বললেন, 'উম্মে কুলসুম বিনতে আবু বকর।' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'দিন-রাত বাবার শোকে কাতর থাকে, এমন মেয়েকে বিয়ে করে কী হবে?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে চাইলেন, 'আয়েশা কী তোমাকে এ কথা বলতে বলেছে?' তিনি বললেন, 'জ্বী।' অতঃপর তিনি এ চিন্তা বাদ দিলে তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহর সাথে উম্মে কুলসুমের বিয়ে হয়।
একজন নেতাকে বিয়ে করার স্বপ্ন কার না থাকে। অথচ একজন খলীফা কোনো রকম জোর-জবরদস্তি না করে, কত সাধারণভাবে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেছেন। আবার পাত্রীও স্বাধীনভাবে তার মত প্রকাশ করেছেন। প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ায় খলীফা দ্বিতীয়বার এ নিয়ে কোনো কথা বলেননি। রাগ, ক্ষোভ, হুমকি কোনোকিছুর আশ্রয় নেননি। কারণ, তিনি জানতেন যে, ইসলামে একজন নারীকে মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যেমন সুকৌশলে বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুও খুব বুদ্ধিমান ছিলেন বলে সব বুঝে গেছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেও নারীর অধিকার রক্ষায় সোচ্চার ছিলেন। কোনো মেয়ের অমতে বিয়ে দিতে গেলে তিনি বাধা দিতেন। তিনি বলতেন, 'কুৎসিত লোকেদের বিয়ে করার জন্য তোমরা তোমাদের কন্যার ওপরে চাপ সৃষ্টি কোরো না। কারণ, তোমাদের মতোই তাদেরও পছন্দ-অপছন্দ আছে।'
রাস্তায় দাঁড়িয়ে একজন নারীর সাথে একজন পুরুষের আলাপচারিতা
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনার রাস্তায় হাঁটছিলেন। তখন একজন পুরুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে একজন নারীর সাথে কথা বলছিল। তিনি লোকটিকে হাতের লাঠি দিয়ে এক ঘা বসিয়ে দিলেন। সে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমার স্ত্রী।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'স্ত্রীর সাথে এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলছ কেন? কেন তোমাদের নিয়ে অন্য মুসলিমদের কথা বলার সুযোগ দিচ্ছ?' লোকটি কারণ দেখাল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমরা মাত্রই মদীনায় এসেছি। কোথায় উঠব এ নিয়ে আলোচনা করছিলাম।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যথারীতি তার লাঠি লোকটির হাতে দিয়ে বললেন, 'এটা ধর, হে আল্লাহর বান্দা, বদলা নাও।' লোকটি বলল, 'অসুবিধা নেই, আমীরুল মুমিনীন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এভাবে তিনবার একই কথা বললেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে আল্লাহর ওয়াস্তা দিচ্ছিলেন। শেষে লোকটি বলল যে, তিনিও আল্লাহর জন্যই বাদ দিতে বলছেন। এ কথা শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন।'
স্বামীর ব্যাপারে উমর রা.-এর কাছে এক নারীর অভিযোগ
এক নারী উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এসে অভিযোগ করতে লাগল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমার স্বামী খুব খারাপ। মোটেও ভালো নন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে চাইলেন, 'আপনার স্বামী কে?' নারী বললেন, 'আবু সালামা।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে ভালভাবে চিনতেন। কারণ, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবী ছিলেন। তিনি বললেন, 'আমরা তো তার সম্পর্কে ভালো ছাড়া খারাপ কিছু জানি না।' তিনি তার পাশে থাকা একজনকে জিজ্ঞেস করলেন। তিনিও একই মন্তব্য করলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমরাও তা-ই জানি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার স্বামীকে ডাকতে পাঠালেন আর তাকে বললেন তার (খলীফার) পেছনে বসে থাকতে। একটু পরেই অভিযুক্ত ব্যক্তি আসলেন। তাকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কি একে চেনেন?' তিনি বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, ইনি কে?' খলীফা বললেন, 'তিনি আপনার স্ত্রী।' লোকটি বললেন, 'তিনি কী বলতে চান?' খলীফা বললেন, 'তিনি অভিযোগ করেছেন যে আপনি খুব খারাপ, মোটেও ভালো নন।' লোকটি বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, সে খুব খারাপ কথা বলেছে। আল্লাহর কসম, সে সবার চেয়ে উত্তম পোশাক পরে আর আরামদায়ক বাড়িতে থাকে। তবে তার স্বামী এখন অক্ষম।' এবার উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু (নারীকে) জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার কী মন্তব্য?' জবাব আসল, 'তিনি সত্য বলছেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার লাঠি তুলে পেটাতে শুরু করলেন আর বললেন, 'হায়রে, নিজের শত্রু! তার তারুণ্য পেয়ে, সহায়-সম্পদ ভোগ করে এখন তার সম্পর্কে উল্টা-পাল্টা কথা?' সে বলতে লাগল, 'আমার ভুল হয়ে গেছে, হে আমীরুল মুমিনীন। এবারের মতো আমাকে ছেড়ে দিন। আল্লাহর কসম, আমাকে আর এ কাজ করতে দেখবেন না।' তিনি বললেন, 'আল্লাহকে ভয় করুন আর বৃদ্ধ লোকটির ভালো সাথী হয়ে থাকুন।' এবার লোকটির দিকে ফিরে বললেন, 'আজকে তিনি যা করেছেন তা যেন তার সাথে ভালো ব্যবহার করতে বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।' বৃদ্ধ সাহাবী বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমি মনে রাখব।'
এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে তালাক দিতে চায়। তাকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি তাকে তালাক দিতে চাচ্ছ কেন?' লোকটি বলল, 'আমি তাকে ভালোবাসি না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'সংসার কি শুধু ভালোবাসা দিয়ে টেকে? সেখানে বিশ্বাস আর সম্মানের কি কোনো মূল্য নেই?'
আল-খানসার ছেলেদের ভাতা
আল-খানসার চার ছেলেই শহীদ হয়ে যায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই খবর পাওয়ামাত্রই নির্দেশ দিলেন, 'আল-খানসাকে যেন আমৃত্যু তার চার ছেলের ভাতা দেওয়া হয়। এই শহীদ-মাতাকে আমৃত্যু দুশো দিরহাম করে দেওয়া হতো।'
ব্যবসার উদ্দেশ্যে বায়তুল মাল থেকে হিন্দ বিনতে উতবার ঋণগ্রহণ
তিনি ছিলেন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী। তবে এর আগে তার বিয়ে হয়েছিল খালিদ বিন ওয়ালিদের চাচা হাফস ইবনুল মুগিরার সাথে। সেটা জাহেলী সময়ের কথা। হিন্দ ছিলেন কুরাইশ বংশের সবচেয়ে সুন্দরী এবং চৌকস নারী। আবু সুফিয়ান তাকে তালাক দেবার পরে তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে বায়তুল মাল থেকে চার হাজার দিনার ধার চেয়ে আবেদন জানান। এই দিনার নিয়ে তিনি কাল্বে চলে যান এবং ব্যবসা শুরু করেন। এর পরে তিনি তার ছেলে মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে চলে আসেন। তিনি তখন সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন। হিন্দ তার ছেলেকে বলেছিলেন, 'উমর যা করেন, কেবল আল্লাহর জন্য করেন।'
খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে ইসলাম নারীদের উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছিল। নারীরা তখন বিদ্যা, বুদ্ধি, ব্যবসা- সব ক্ষেত্রে সম্মানের সাথে করতেন। তিনি সমান গুরুত্বের সাথে নারীদের মতামত নিতেন। তাদের মধ্যে আশ-শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ আল-আদাউয়িয়া ছিলেন উল্লেখযোগ্য। খলীফা নিজে যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নারীর মতামত নিয়েছেন এবং সানন্দে তা গ্রহণ করেছেন, সেখানে নারীর মর্যাদা প্রকাশের জন্য আর কী বাকি থাকতে পারে? উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেকে সবার অভিভাবক মনে করতেন। কারও স্বামী অনুপস্থিত থাকলে তিনি তাদের দরজায় দাঁড়িয়ে বলতেন, 'আপনাদের কিছু লাগবে কি? কোনো কিছু কিনতে হবে? কেনা-বেচায় কেউ আপনাদের ঠকিয়ে দিলে আমার ভালো লাগবে না।' তারা প্রয়োজন থাকলে বাড়ির খাদেমাকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে পাঠিয়ে দিত। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এভাবে বাজারে গেলে তার পেছনে খাদেমার একটা দল তার সাথে থাকত। তিনি তাদের পক্ষ থেকে কেনাকাটা করে দিতেন। কেউ মূল্য পরিশোধ করতে না পারলে নিজের কাছ থেকে তা দিয়ে দিতেন। সীমান্ত থেকে কোনো পত্রবাহক আসলে তিনি নিজে গিয়ে সৈনিকদের চিঠিপত্র যার যার বাড়িতে নিয়ে যেতেন আর বলতেন, 'আপনাদের স্বামী আল্লাহর জন্য লড়ছেন, আর আপনারা স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র ভূমিতে আছেন। পড়তে জানলে স্বামীর পত্র নিয়ে যান। আর না জানলে এসে দরজার কাছে দাঁড়ান। আমি পড়ে দিচ্ছি।' পত্রবাহকেরা কোনো কোনো দিন ফিরে যাবে তা আগেই বলে দিতেন। যাতে করে সবাই চিঠি লিখে রাখতে পারে। তিনি কাগজ-কলম নিয়ে বাড়ি বাড়ি যেতেন আর বলতেন, 'এখানে কাগজ-কলম আছে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলে দিন কী লিখতে হবে।' এভাবে সবার চিঠি যার যার স্বামীর কাছে পাঠিয়ে দিতেন।
৩.১.২। ভালো কাজের মূল্যায়ান ও স্মরণ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অগ্রজ মুসলিমদের ভালো কাজ যেমন মূল্যায়ন করতেন, তেমন মনেও রাখতেন। তিনি মানুষ চিনতেন। বলতেন, 'মানুষের মিষ্টি কথার ধোঁকায় পড়ো না। বরং যারা বিশ্বাস অর্জন করে এবং মানুষকে অসম্মান করা থেকে নিজেকে বিরত রাখে তারাই প্রকৃত মুসলিম। ' তিনি প্রায়ই বলতেন যে, 'কারও নামায, রোযার দিকে লক্ষ্য রেখ না। নিয়ত এবং সততা লক্ষ্য কর। আরও বলতেন, 'আমি তোমাদের ব্যাপারে দুই শ্রেণির লোক থেকে শঙ্কামুক্ত: দৃঢ় ঈমান সম্পন্ন মুমিন এবং স্পষ্ট কুফরে লিপ্ত কাফের। বরং ভয় হয় মোনাফেকদের নিয়ে, তারা বিশ্বাসের আড়ালে অন্য উদ্দেশ্য নিয়ে ঘোরাফেরা করে। একবার এক ব্যক্তি সাক্ষ্য দিতে এসেছিল। তার সম্পর্কে জানার জন্য তিনি লোক খুঁজছিলেন। এক ব্যক্তি এসে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমি তার সম্পর্কে বলতে পারব।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি তার প্রতিবেশী?' লোকটি বলল, 'না।' এর পরে তিনি বললেন, 'তার সাথে একদিন মিশেই কি তার আখলাক জানাতে এসেছ?' লোকটি বলল, 'না।' তিনি এবার বললেন, 'তুমি কি তার সাথে কখনো সফরে গেছ? কারণ, দূর সফরে বের হলে মানুষের প্রকৃত চেহারা চেনা যায়।' এবারও লোকটি বলল, 'না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তাহলে তুমি তাকে মসজিদে দাঁড়ানো, বসা আর নামায অবস্থায় দেখেছ, তাই না?' লোকটি বলল, 'জ্বী।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'দূর হও। তুমি তাকে চেনই না।'
যারা আল্লাহর হুকুমে ইসলামের জন্য কঠিন পরিশ্রম করে গেছেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন মুসলিমদের ভূয়সী প্রশংসা করতেন। এর কয়েকটি উদাহরণ:
'যখন তারা বিশ্বাস করেনি, আপনি করেছিলেন, যখন তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, আপনি এগিয়ে এসেছেন, আর যখন তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল আপনি বিশ্বস্ত হয়ে ছিলেন'
আদি ইবনে হাতিম থেকে বর্ণিত: আমি আমার লোকজন নিয়ে উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে গেলাম। তিনি 'তায়' থেকে আসা প্রত্যেক লোকের হাতে দুই হাজার দিরহাম দিতে লাগলেন। আমি তার কাছে গেলে তিনি ঘুরে দাঁড়ান। এবার আমি আবার তার মুখের সামনে দাঁড়ালাম। আবারও তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আমি বললাম, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি আমাকে চিনতে পারেননি?' তিনি অনেক জোরে হেসে উঠলেন। হাসির দমকে তিনি প্রায় পড়ে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, 'হ্যাঁ। আল্লাহর কসম, আপনাকে চিনতে পেরেছি। যখন তারা বিশ্বাস করেনি, আপনি করেছিলেন, যখন তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল আপনি এগিয়ে এসেছেন, আর যখন তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল আপনি বিশ্বস্ত হয়ে ছিলেন। 'তায়' থেকে পাওয়া গনীমত ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবীদের পাওয়া প্রথম শক্তি এবং আনন্দের উৎস। আর তা এনেছিলেন আপনি।' অতঃপর তিনি মাফ চেয়ে বললেন, 'যারা চরম হত-দরিদ্র, তাদের গোত্রপ্রধানদের হাতে এগুলো ভাগ করে দিচ্ছি। কারণ, মানুষগুলোর দায়িত্ব তাদের ওপরে।'
আরেকটি বর্ণনায় এসেছে আদিই বলেছিলেন, 'তবে, আমি কিছু মনে করিনি।'
'সব মুসলমানের উচিত আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাফার মাথায় চুমু দেওয়া, আর এ কাজ সবার আগে আমি করব।'
বিখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস-সাহামী রোমানদের হাতে বন্দী হন। সম্রাটের সামনে তাকে হাজির করা হলে সে বলল, 'খ্রিস্টান হয়ে যাও। তাহলে আমার রাজ্যের অর্ধেক আর আমার কন্যার হাত তোমাকে দিয়ে দেব।' তিনি (আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'আপনার যা আছে তার সাথে আরবদের যা কিছু আছে তার সবকিছু যদি আমাকে দিয়ে দেওয়া হয়, তবুও আমি এক পলকের জন্যও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধর্ম থেকে সরে আসব না।' সে হুমকি দিল, 'তবে তোমাকে আমি হত্যা করব।' তিনি বললেন, 'আপনার ব্যাপার।' সম্রাট তাকে ক্রুশবিদ্ধ করার নির্দেশ দেয়। তীরন্দাজেরা তার হাত-পায়ের কাছে তীর ছুঁড়ে ছুঁড়ে খ্রিস্টান হওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছিল। তিনি বার বার তা প্রত্যাখ্যান করতে থাকেন। না পেরে তাকে নামিয়ে আনতে বলা হয়। অতঃপর বিশাল এক তামার পাত্র গরম করা হয়। সেই তপ্ত পাত্রে একজন মুসলিমকে ছুঁড়ে ফেলা হলো। তিনি দেখলেন সেখানে হাড় ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আবারও তাকে খ্রিস্টান হতে বলা হল। তিনি যথারীতি প্রত্যাখ্যান করলেন। শেষে তাকে ওই হাড়িতে ছুঁড়ে ফেলার নির্দেশ আসে। তাকে তুলে ধরা হলে চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াতে শুরু করে। এই দৃশ্য দেখে সম্রাট ভাবল এবার হয়তো তিনি মত পাল্টাবেন। সম্রাট আরেকবার তাকে খ্রিস্টান হওয়ার আহ্বান জানায়। তখন আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর খাতিরে আমার একটামাত্র প্রাণ এই হাড়িতে ছুঁড়ে ফেলা হবে! হায়, আমার যদি শরীরের লোম-সংখ্যক প্রাণ থাকত, তবে সবগুলোকে আমি আল্লাহর জন্য নির্যাতন ভোগ করতে করতে কুরবান করে দিতে পারতাম। তা পারছিনা বলে কষ্টে কাঁদছি।'
কোনো কোনো বর্ণনায় আছে যে বন্দী অবস্থায় দিনের পর দিন তাকে অভুক্ত রাখা হয়েছিল। অতঃপর একদিন তাকে শুকর এবং মদ খেতে দেওয়া হয়। তিনি সেগুলো ছুঁয়েও দেখেননি। সম্রাট তার কাছে জানতে চেয়েছিল, 'এগুলো খাওনি কেন?' তিনি জবাব দিয়েছেন, 'আমার এই অবস্থায় ওগুলো খাওয়া জায়েয আছে। কিন্তু আপনাকে পরিতৃপ্তি দিতে ইচ্ছে করল না।' সম্রাট হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, 'আমার মাথায় চুমু দিলে আমি মুক্তি দিয়ে দেব।' তিনি জানতে চাইলেন, 'আর আমার সাথে বাকি মুসলিম বন্দীরাও কি মুক্তি পাবে?' সম্রাট বলল, 'হ্যাঁ।' সুতরাং তিনি সম্রাটের মাথায় চুমু দিলেন এবং সম্রাটও সব মুসলিমকে মুক্তি দিলেন। তিনি যখন ফিরে আসলেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'সব মুসলমানের উচিত আব্দুল্লাহ ইবনে হুযাফার মাথায় চুমু দেওয়া। আর এ কাজ সবার আগে আমি করব।' এই বলে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তার মাথায় চুমু দিলেন।
'আপনাদের সাথে উয়ায়েস ইবনে আমির এসেছেন কি?'
ইয়েমেন থেকে কয়েকজন প্রতিনিধি এসেছিলেন। তাদের কাছে উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে চাইলেন, 'আপনাদের সাথে উয়ায়েস ইবনে আমির এসেছেন কি?' তার খোঁজ পেয়ে তিনি বললেন, 'আপনি উয়ায়েস ইবনে আমির?' তিনি বললেন, 'জী।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'প্রথমে 'মুরাদ', এরপর 'কারন' থেকে এসেছেন?' তিনি বললেন, 'জী।' এবার তিনি জানতে চাইলেন, 'আপনার কুষ্ঠ রোগ হয়েছিল। এক দিরহাম পরিমাণ জায়গা ছাড়া আপনার পুরো শরীর সুস্থ হয়ে গেছে?' তিনি বললেন, 'জী।' তিনি আবারও জানতে চাইলেন, 'আপনার মা বেঁচে আছেন?' তিনি বললেন, 'জী।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, 'তোমার কাছে ইয়েমেন, মুরাদ আর কারন থেকে কয়েকজন প্রতিনিধি আসবে। তাদের মধ্যে উয়ায়েস ইবনে আমির থাকবে। তার কুষ্ঠ রোগ হয়েছিল। এক দিরহাম পরিমাণ জায়গা ছাড়া তার শরীরের পুরোটাই সুস্থ হয়ে যাবে। তার মা আছে, যাকে সে অনেক শ্রদ্ধা করে। সে আল্লাহর কাছে যা দুআ করে, কবুল হয়ে যায়। তুমি চাইলে সে তোমার জন্য ক্ষমার দুআ করে দেবে।' আপনি আমার জন্য ক্ষমার দুআ করে দিন।' সুতরাং তিনি আল্লাহ তা'আলার কাছে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য দুআ করলেন। অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনারা এখন কোথায় যাবেন?' তিনি বললেন, 'কূফা।' তিনি বললেন, 'আমি আপনার জন্য গভর্নরের কাছে চিঠি লিখে দেই?' তিনি বললেন, 'আমি দরিদ্রদের সাথে থাকতে পছন্দ করি।'
পরের বছর কূফা থেকে একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির আগমন ঘটল। তার কাছে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু উয়ায়েসের খবর জানতে চান। তিনি বললেন, 'আমি তাকে ন্যূনতম জিনিসপত্রসহ হত-দরিদ্রদের মাঝে দেখে এসেছি।' তাকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, 'তোমার কাছে ইয়েমেন, মুরাদ আর কারন থেকে কয়েকজন প্রতিনিধি আসবে। তাদের মধ্যে উয়ায়েস ইবনে আমির থাকবে। তার কুষ্ঠ হয়েছিল। এক দিরহাম পরিমাণ জায়গা বাদে তার শরীরের পুরোটাই সুস্থ হয়ে যাবে। তার মা আছে, যাকে সে অনেক শ্রদ্ধা করে। সে আল্লাহর কাছে যা দুআ করে কবুল হয়ে যায়। তুমি চাইলে সে তোমার জন্য ক্ষমার দুআ করে দেবে।' লোকটি উয়ায়েসের কাছে গিয়ে তার ক্ষমার জন্য দুআ চাইলেন। তখন উল্টো উয়ায়েস তাকে বললেন, 'আমার জন্য বরং আপনার দুআ করা উচিত। কারণ, আপনি এমন একটা সুন্দর উদ্দেশ্য নিয়ে এতদূর সফর করে এসেছেন। আপনি আমার ক্ষমার জন্য দুআ করুন।' লোকটি আবারও বললেন, 'আপনি আমার গোনাহ মাফের জন্য দুআ করুন।' এবার উয়ায়েস বললেন, 'উমরের সাথে কি আপনার দেখা হয়েছিল?' তিনি বললেন, 'জি।' অতঃপর তার গোনাহ মাফের জন্য উয়ায়েস দুআ করলেন। লোকমুখে এই ঘটনা ছড়িয়ে পড়ল। এর মধ্যে উয়ায়েস পালিয়ে যান।'
উমর রা. এবং মা-ভক্ত মুজাহিদ
সিরিয়া থেকে একদল মুজাহিদ (যোদ্ধা) আসেন। তাদেরর পরের গন্তব্য ইয়েমেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের জন্য খাবার নিয়ে বসে ছিলেন। ফজরের পরেই তিনি চলে যাবেন। তাদের একজন বসে খেতে শুরু করলেন। তিনি বাঁ হাত দিয়ে খাচ্ছিলেন। কেউ খেতে বসলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে খুব লক্ষ্য করতেন। তিনি বললেন, 'আপনি ডান হাত দিয়ে খান।' লোকটি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করলেন না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবারও বললেন। এবার তিনি বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমার হাত এখন ব্যস্ত।' তার খাওয়া শেষ হলে খলীফা তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার ডান হাত কী কাজে ব্যস্ত ছিল?' তখন তিনি তার হাত বের করে দেখান। তার হাত কাটা ছিল। তিনি জানতে চাইলেন, 'এ কী?' লোকটি বললেন, 'ইয়ারমুকের দিনে আমি আমার হাত হারিয়েছি।' তিনি বললেন, 'আপনি অযু কীভাবে করেন?' লোকটি জবাব দিলেন, 'বাঁ হাত দিয়ে অযু করি, আল্লাহ তা'লা আমাকে সাহায্য করেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এবার কোথায় যাবেন?' লোকটি বললেন, 'ইয়েমেন। মায়ের কাছে। মাকে দেখি না বহু বছর।' 'আপনি আপনার মাকেও শ্রদ্ধা করেন,' এই বলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে একজন খাদেম এবং পাঁচটি উট দান করলেন।'
‘লোকটি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের সময় মুখে আঘাত পেয়েছে’।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একবার ভাতা প্রদান করছিলেন। মাথা তুলে একজনের চেহারা দেখতে পান। তার মুখে ক্ষত ছিল। তিনি ক্ষতের কারণ জানতে চাইলে লোকটি বললেন যে, অভিযানে থাকাকালীন এমন হয়েছে। খলীফা তখন নির্দেশ দিলেন, ‘তাকে এক হাজার দাও।’ সুতরাং লোকটিকে অতিরিক্ত এক হাজার দিরহাম দেওয়া হল। এভাবে তিনি চারবার নির্দেশ দিলেন। ফলে প্রতিবার তাকে এক হাজার দিরহাম করে দেওয়া হলো। এতে লোকটি বিব্রত হয়ে চলে যায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কথা জানতে চাইলে উপস্থিত লোকেরা বলল, ‘আমরা দেখলাম, তিনি খুব বিব্রতবোধ করছেন। তাই চলে গেছেন।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম, তিনি যদি দাঁড়িয়ে থাকতেন তবে সব দিনার শেষ না হওয়া পর্যন্ত দিতে থাকতাম। লোকটি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের সময় মুখে আঘাত পেয়েছে’।
উমর রা.-এর ইচ্ছা
বর্ণিত আছে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সাথীদের বলেছিলেন: ‘একটা ইচ্ছার কথা বলুন।’ একজন বললেন, ‘এই বাড়িটি যদি স্বর্ণে পরিপূর্ণ থাকত তবে আমি তা আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে দিতাম!’ আরেকজন বললেন, ‘আমার যদি বাড়ি ভরা হীরা-জহরত থাকত তবে তা আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে দিতাম!’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবার বললেন, ‘একটা ইচ্ছার কথা বলুন।’ তারা বললেন, ‘ইয়া আমীরাল মুমিনীন, কী যে চাইব বুঝতে পারছি না।’ তিনি বললেন, ‘এই বাড়ি যদি আবু উবায়দা ইবনুল জারা, মুয়ায ইবনে জাবাল, আবু হুযায়ফার মুক্ত করা খাদেম সালিম আর হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহুমের মতো মানুষ দিয়ে ভরা থাকত। তবে তাদের সবাইকে আল্লাহর কাজে ব্যস্ত করে দিতাম।’ তারা সবাই ছিলেন তার দ্বীনি ভাই। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার আস্থাভাজন সাথীদের কথা এভাবে বলতেন, ‘বিশ্বাসী সাথীর খোঁজে থাকবে। কারণ, তাদের সঙ্গ আনন্দদায়ক। সুখের সময় তারা যেমন শান্তি দেবে, তেমনই বিপদের সময় তারা ভরসা দেবে। যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া তাদের প্রতি সব সময় ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখতে হবে। অবিশ্বস্ত বন্ধু থেকে সাবধান। আল্লাহকে ভয় পায় এমন লোককেই কেবল ভরসা করা যায়। অসৎ লোকের সাথে মিশবে না। নয়তো প্রভাবিত হয়ে যাবে। তাদের সাথে গোপনীয়তা বজায় রাখবে। কোনো ব্যাপারে পরামর্শ নিতে হলে আল্লাহকে ভয় পায় এমন কারও সাথে আলোচনা করবে।'
কোনো মুমিন ভাইয়ের কথা মনে পড়লে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'রাতটা কত যে দীর্ঘ!' ফজরের নামায পড়েই তিনি দেখা করতে ছুটতেন।'
তিনি আরও বলতেন, 'যদি আল্লাহ তা'আলার জন্য চলতে না হতো, আল্লাহ তা'আলার জন্য জমিনে ঘুমাতে না হতো, আর আল্লাহ তা'আলার জন্য এমন লোকদের সাথে ওঠাবসা করতে না হতো যারা উৎকৃষ্ট ফল বেছে নেবার মতো উৎকৃষ্ট শব্দ চয়ন করে (খুব সুন্দর করে কথা বলেন), তবে আমি আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করতে চাইতাম (মৃত্যু)।'
তার মতে একমাত্র ভালো আমলের বিচারে মানুষের মধ্যে পার্থক্য করা যেতে পারে।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতে ভালো আমল বা সৎ কাজ দিয়ে কেবল মানুষকে পার্থক্য করা উচিত। একবার কয়েকজন কুরাইশী উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এগিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে সুহাইল ইবনে হারিস এবং আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের মতো নেতা যেমন ছিলেন, তেমনি কুরাইশদের এক সময়ের গোলাম সুহায়ব এবং বিলালও ছিলেন। দেখা করার অনুমতি চাইলে তিনি আযাদকৃত দরিদ্র গোলামদের সাথে দেখা আগে করেন। ওদিকে সম্ভ্রান্ত কুরাইশী নেতাদের পরে দেখা করার অনুমতি দেন। এতে তারা বেশ রেগে যান। আবু সুফিয়ান তার সাথীদের বলতে লাগলেন, 'আমি আজকের মতো ঘটনা আগে দেখিনি। আমাদের দরজায় দাঁড় করিয়ে রেখে তিনি কিনা গোলামদের ঢোকার অনুমতি দিলেন?’ সুহাইল বললেন, ‘হে লোক সকল, আল্লাহর কসম, আমি আপনাদের চোখ-মুখের ভাষা পড়তে পারছি। রাগ যদি করতেই হয় তবে নিজেদের সাথে করুন। তাদের মতো আপনাদেরও ইসলামের দাওয়াত দেওয়া হয়ছিল। তারা এগিয়ে গিয়েছিল, অথচ আপনারা পেছনে থেকে যান। শেষ বিচারের দিনে যখন আপনাদের ফেলে তাদের ডেকে নেওয়া হবে তখন কেমন লাগবে?’
উমর রা. জানাযায় অংশ নিতেন
আবু আল-আওয়াদ থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, আমি মদীনায় পৌঁছে দেখলাম কোনো একটা রোগে একের পর এক মানুষ মারা যাচ্ছে। আমি উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে বসে ছিলাম। আমাদের সামনে দিয়ে একটা লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আমরা মৃতের জন্য দুআ করলাম। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলনে, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।’ এরপরে আরেকটা লাশ গেল। আমরা দুআ করলাম। তিনি আবারও বললেন, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।’ তৃতীয়বারের মতো লাশ গেল। লোকেরা তার ব্যাপারে খুব বাজে মন্তব্য করছিল। এবারও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।’ আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি কী বলছেন?’ তিনি বললেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা বলেছিলেন, আমিও তা বললাম। তিনি বলেছেন, ‘যদি চারজন লোক কোনো মুসলমানের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়, তবে আল্লাহ তা'আলা তাকে জান্নাত দেবেন।’ আমরা তার কাছে জানতে চাইলাম, ‘যদি তিনজন সাক্ষ্য দেয়?’ তিনি বললেন, ‘তিনজন দিলেও।’ আমরা আবার বললাম, ‘যদি দুজন দেয়?’ তিনি বললেন, ‘দুজন দিলেও।’ আমরা একজনের ব্যাপারে আর জানতে চাইনি।”
উমর রা. এবং হাকীম ইবনে হিযাম রা.-এর অংশ
উরওয়া ইবনে আয-যুবায়ের বর্ণনা করেছেন। হাকীম ইবনে হিযাম বললেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে চাইলাম, তিনি দিলেন। আমি তার কাছে চাইলাম, তিনি দিলেন। আমি তার কাছে চাইলাম, তিনি দিলেন। অতঃপর তিনি হাকীমকে বললেন, 'হে হাকীম, এই সম্পদ খুব তাজা এবং সুমিষ্ট। লোভ ছাড়া কেউ এই সম্পদ গ্রহণ করলে এটা তার জন্য বরকতময় হবে। আর লোভের বশবর্তী হয়ে নিলে তার জন্য এতে কোনো বরকত থাকবে না। তার অবস্থা সেই লোকের মতো যে খেত ঠিকই কিন্তু তার তৃপ্ত হলো না। আর উপরের হাত তো নিচের হাতের চেয়ে উত্তম।' হাকীম বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, যিনি আপনাকে সত্য ধর্ম দিয়ে পাঠিয়েছেন তার কসম, আমি আজকের পরে আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আর কারও কাছ থেকে অর্থকড়ি নেব না।' আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হাকীমকে অনেকবার সাহায্য দেওয়ার জন্য ডেকেছেন, কিন্তু তিনি কখনো তা গ্রহণ করেননি। তিনি হাকীম সম্পর্কে বলেছিলেন, 'হে মুসলিমরা, আল্লাহ নির্ধারিত গনীমত থেকে আমি তার অংশ তুলে রাখতাম। কিন্তু হাকীম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দানের পর থেকে আর কারও কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করেননি।'
উমর রা. আলী রা.-এর মাথায় চুমু দিলেন
এক ব্যক্তি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে গেল। তিনি এ প্রসঙ্গে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, 'হে আবুল হাসান, আপনি অভিযোগকারীর মুখোমুখি বসুন।' আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর চেহারায় পরিবর্তন দেখা গেল। অতঃপর তিনি ফয়সালা করে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে ফিরে বললেন, 'দুজনের সাথেই আমি অভিন্ন আচরণ করেছি বলে কি আপনি রাগ করেছেন?' আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'ইয়া আমীরাল মুমিনীন, আপনি আমাদের সাথে অভিন্ন আচরণ করেননি। আপনি আমাকে আমার উপনাম, আবুল হাসান, ধরে ডেকেছেন। অথচ তাকে কিন্তু তার উপনামে ডাকেননি।' এ কথা শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার মাথায় চুমু দিলেন আর বললেন, 'যে ভূমিতে আবুল হাসান নেই আল্লাহ যেন আমাকে সে ভূমিতে না রাখেন।'
উমর রা.-কে জারীর আল-বাজালির উপদেশ
আসিম ইবনে বাহদালা থেকে বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর একজন সাথী বলেছেন: আমরা উমর ইবনুল খাত্তাবের সাথে ছিলাম। এক ব্যক্তির বায়ু নির্গত হলো। নামাযের সময় হয়েছে দেখে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যার বায়ু নির্গত হয়েছে তাকে অযু করতে হবে।' তখন জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমাদের সবাইকে অযু করতে বলুন। তাহলে গোপনীয়তা বজায় থাকবে।' তিনি তা-ই করলেন।'
কুরাইশ নারীকে বিয়ে করার জন্য এক আযাদকৃত গোলামের প্রস্তাব
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সুসম্পর্ক স্থাপনের জন্য ভিন্ন গোত্রে বিয়ে করতে উৎসাহিত করতেন। একবার একজন আযাদকৃত গোলাম একজন কুরাইশ ব্যক্তির বোনকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠান। কুরাইশি লোকটি তা প্রত্যাখ্যান করে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার বোনকে তার সাথে বিয়ের দেবার ক্ষেত্রে কোনো জিনিস তোমাকে বাধা দিচ্ছে? লোকটি সৎ। তাছাড়া সে এই দুনিয়ার জন্য যা প্রয়োজন (সম্পদ) আর আখেরাতের জন্য যা প্রয়োজন (ধর্মানুরাগ) তার সবকিছুই দিতে প্রস্তুত। তোমার বোন রাজি থাকলে তার সাথে বিয়ে দিয়ে দাও।' অতঃপর লোকটি তার সাথে বোনের বিয়ে দিল।
৩.১.৩। সমাজে উমর রা.-এর সম্মান এবং মানুষের প্রয়োজন মেটাতে তার প্রচেষ্টা
সমাজে উমর রা.-এর সম্মান
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মানুষের মন ও মননে জায়গা করে নিয়েছিলেন। সবার শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। তার জন্য আশা-আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিতেও কারও বাধতো না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ঘটনাটি। খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অবস্থায় পদচ্যুত করেছিলেন। অথচ এই সোনপতি প্রত্যেক যুদ্ধে সফল ছিলেন। ফলে সবার অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হন। মানুষের সবচেয়ে প্রয়োজনের সময় তাকে পদহারা হতে হয়। ইয়ারমুকের দিনে তখন বাইজেন্টাইনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তার বদলে যখন আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সেনাপতি নিযুক্ত করা হলো, তখনো তিনি বলেছিলেন, 'আমরা আমীরুল মুমিনীনের কথা শুনি এবং তাকে মানি।' কয়েকজন সৈন্য তখন মন্তব্য করে বসেন যে, এই ঘটনার ফলে ফিতনা ছড়াবে। এর জবাবে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'উমরের খেলাফতকালে কখনো ফিতনা ছড়াবে না।' এই ঘটনা খলীফার প্রতি খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর চরম আনুগত্যের প্রমাণ। জনপ্রিয় এবং সফল সেনাপতি হয়েও তিনি খলীফার আদেশ মাথা পেতে গ্রহণ করেন। মুহূর্তেই নেতৃত্ব ছেড়ে দেন। নিজের অবমাননা নিয়ে ভাবিত হননি। যুদ্ধের ইতিহাসে এমন ঘটনা নযীরবিহীন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দায়িত্ব পালনে কেমন দৃঢ় ছিলেন এখানে তা-ও প্রতীয়মান। তার প্রতি সবার গভীর শ্রদ্ধা ছিল। গাসান আল-বসরি উল্লেখ করেছেন:
কিছু লোক এক নারীকে নিয়ে আলোচনা শুরু করে। এ কথা উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর কানে যায়। তিনি সেই নারীকে ডেকে পাঠান। খবর পেয়ে সে নারী জানতে চাইল, 'আমাকে উমরের কী দরকার পড়ল?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মানুষের কাছে এতটাই সম্মানের পাত্র ছিলেন যে, সেই নারী তার প্রসববেদনা নিয়েই দেখা করতে রওনা হন। পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় অন্যান্য নারী তার কষ্ট বুঝতে পারছিল। পথিমধ্যেই তার পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু মাত্র একবার কাঁদার পরই শিশুটি মারা যায়। এই খবর শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আনসার-মুহাজিরদের ডেকে পরামর্শ চান। তারা বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি তো আপনার জায়গা থেকে তাকে সংশোধন করতে চেয়েছিলেন।' তিনি পেছনে বসা একজনকে লক্ষ্য করে বললেন, 'আপনার কী মত?' তিনি বললেন, 'আমি বলব, কেউ যদি আপনাকে খুশি করার জন্য এখন এসব বলে থাকে, তবে আল্লাহর কসম, তারা আপনার প্রতি অনুগত নন। আর তারা যদি প্রকৃত অর্থে এই উপদেশ দিয়ে থাকেন, তবে আল্লাহর কসম, তারা ভুল করছেন।' তিনি বলতে লাগলেন, 'আমি আপনাকে বলব, তার লোকদের মধ্যে দিয়াত ভাগ করে দিন।' আল-হাসানের কাছে কেউ জানতে চেয়েছিল, 'ওই ব্যক্তি কে ছিলেন?' তিনি উত্তর দেন, 'আলী ইবনে আবি তালিব।'
একবার আলী, উসমান, তালহা, আয-যুবায়ের, আব্দুর রহমান এবং সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুম একত্রিত হন। তাদের মধ্যে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সামনে দ্বিধাহীনভাবে কথা বলতেন। এজন্য সবাই মিলে তাকে বললেন, 'হে আব্দুর রহমান, আপনি মানুষের সমস্যা নিয়ে আমীরুল মুমিনীনের সাথে কথা বলেন না কেন? তারা ভয়ে উমরের সামনে কথা বলতে পারে না। অনেক সময় সমাধান ছাড়াই ফিরে যায়।' তিনি এই প্রসঙ্গে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে কথা বলতে গেলেন। খলীফা বললেন, 'হে আব্দুর রহমান, আমি আপনাকে আল্লাহর ওয়াস্তা দিচ্ছি। আলী, উসমান, তালহা, আয-যুবায়ের এবং সাদ, তারা সকলে কিংবা তাদের মধ্যে কেউ কি আপনাকে এই কথা বলতে বলেছে?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, জি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হে আব্দুর রহমান, আল্লাহর কসম, আমি মানুষের সাথে খুব বেশি নম্র হওয়ার ব্যাপারেও যেমন আল্লাহ তা'লাকে ভয় পাই, আবার তাদের সাথে খুব বেশি কঠোর হওয়ার ব্যাপারেও আল্লাহ তা'লাকে খুব ভয় পাই। এর সমাধান কী?' এ কথা শুনে আব্দুর রহমান রাযিয়াল্লাহু আনহু কাঁদতে কাঁদতে উঠে দাঁড়ালেন। তার কোমরবন্ধ মাটিতে গড়াচ্ছিল। তিনি হাত দিয়ে এমন একটা ভঙ্গি করলেন যেন তিনি বলতে চাইলেন, 'আপনি যাওয়ার পরে তাদের যে কি করুণ দশা হবে!'
বর্ণিত আছে, উমর ইবনে মুররাহ বলেছেন: এক কুরাইশি ব্যক্তি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে দেখা করে বললেন, 'আমাদের সাথে সদয় ব্যবহার করুন। কারণ, আপনার জন্য আমাদের মনে প্রচণ্ড সমীহ (সশ্রদ্ধ ভীতি) কাজ করে।' তিনি বললেন, 'এর মধ্যে কি খারাপ কিছু আছে?' লোকটি বলল, 'না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তবে আল্লাহ তা'লা আমার প্রতি তোমাদের সমীহ আরও বাড়িয়ে দিন।'
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, 'আমি উমরের প্রতি সশ্রদ্ধ ভীতির কারণে একটি আয়াত সম্পর্কে বছরখানেক কোনো প্রশ্ন করতে পারিনি।'
তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা দেখে বলতেন, 'হে আল্লাহ তা'আলা, আপনি তো জানেন, তারা আমাকে যত ভয় পায়, তার চেয়ে আপনাকে আমি অনেক বেশি ভয় পাই।'
মানুষের প্রয়োজন মেটাতে তার প্রচেষ্টা
ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নামাযের পরে বসে লোকজনের সাথে দেখা করতেন, তাদের খোঁজখবর নিতেন। সাহায্যের চেষ্টা করতেন। একবার তিনি নামাযের পরে আর বসলেন না (কারও সাথে দেখা করেননি)। আমি দরজায় দাঁড়িয়ে জানতে চাইলাম, 'হে ইয়ারফা, আমীরুল মুমিনীন কি অসুস্থ?' সে বলল, 'না।' তখন উসমান আসলেন। ইয়ারফা ভেতর থেকে ঘুরে এলো। বলল, 'হে আফফান-পুত্র উঠুন, হে আব্বাস-পুত্র উঠুন।' আমরা ভেতরে গেলাম। দেখলাম, উমরের সামনে টাকা-পয়সার স্তূপ। তিনি বললেন, 'অনেক চিন্তা করে দেখলাম যে, আপনাদের দু-জনের মতো মদীনাবাসীকে ভালোভাবে আর কেউ চেনে না। এগুলো নিয়ে সবার মাঝে ভাগ করে দিন। যা বেঁচে যাবে ফেরত আনবেন।' আমি নতজানু হয়ে জানতে চাইলাম, 'এগুলো যথেষ্ট না হলে কি আরও দেবেন?' তিনি বললেন, 'আখযামের কাছ থেকেও এ কথা শুনেছি। এমন ঘটলে তখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবীদের শুকনো গোশত খাওয়ার ঘটনার কথা স্মরণ করবেন।' আমি বললাম, 'আল্লাহ তা'লা তাকে এমন পরিস্থিতিতে ফেললে তিনি হয়তো আপনি যা করছেন তার চেয়ে ভিন্ন কাজ করতেন।'
তিনি জানতে চাইলেন, 'তিনি কী করতেন?' আমি বললাম, 'তিনি নিজেও খেতেন আর আমাদেরও খাওয়াতেন।' তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন। আর বললেন, 'আমি যদি লাভ-লোকসান ছাড়াই খলীফার এই দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেতাম!'
সাঈম ইবনে মুসায়্যিব রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: গনিমতের একটি উট আহত হয়। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এটাকে যবেহ করে কিছু গোশত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রীদের ঘরে পাঠিয়ে দেন। বাকিটা রান্না করে করেন। অতঃপর তিনি কয়েকজন মুসলিমকে খেতে ডাকেন। তাদের মধ্যে আব্বাস ইবনে আব্দিল মুত্তালিবও ছিলেন। আব্বাস বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি রোজ এমন আয়োজন করেন না কেন? তাতে আমরা খেতেও পাব, আবার আপনার সাথে আলাপের সুযোগও হবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি আর দ্বিতীয়বার এ কাজ করব না। আমার দুজন সাথী চলে গেছেন। তারা নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করতেন, নির্ধারিত কাজ করতেন। আমি এর বাইরে কিছু করতে গেলে আমার পথ ভিন্ন হয়ে যাবে।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আযাদকৃত গোলাম আসলাম বর্ণনা করেছেন, তিনি তার একজন আযাদকৃত গোলামকে পশুর চারণভূমির দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তখন তাকে উপদেশ দিয়েছিলেন, 'হে হুনাই, মুসলিমদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। মাজলুমের বদ-দুআকে ভয় পাবে। কারণ, তা কখনো বৃথা যায় না। যারা দুর্বল আর কমসংখ্যক ভেড়ার মালিক, কেবল তাদের চরানোর সুযোগ দিও। আর ইবনে আউফ, ইবনে আফফানের ভেড়াগুলো যেন সেখানে সুযোগ না পায়। কারণ, তাদের কোনোটা যদি মরেও যায়, তবে জীবনধারণের মতো যথেষ্ট জমি আর খেজুর বাগান আছে। অন্যদিকে দুর্বলদের একটা ভেড়াও যদি মরে, তবে তারা বাল- বাচ্চা-সহ আমাকে এসে ধরবে, 'হে আমীরুল মুমিনীন,' বলে ডাকাডাকি শুরু করবে। তখন কি তাদের ফেলে দিতে পারব? আমার জন্য সোনা- রূপার চেয়ে ঘাস-পানি দেওয়া সহজ। আল্লাহর কসম, এই জমি তাদের। জাহেলী সময়ে তারা এই ভূখণ্ডের জন্য লড়েছে। তারা মুসলিম হয়েছে। এখনো এই ভূখণ্ড তাদের। যার হাতে আমার জীবন সেই সত্তার কসম, আল্লাহর রাস্তায় যদি আমাকে কাজ করতে না হতো তবে তাদের ভূখণ্ডে পশুর চারণভূমি তৈরি করতাম না। এই কাজে এক বিঘত পরিমাণ জায়গাও ব্যবহার করতাম না।'
মুসা ইবনে আনাস ইবনে মালিক থেকে বর্ণিত, মুহাম্মাদ ইবনে সিরীনের বাবা, সিরীন একবার আনাসের কাছে দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য চুক্তির আবেদন জানান। কারণ, তিনি খুব ধনী ছিলেন। কিন্তু মালিক তাতে রাজি হয়নি। তাই সিরীন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গিয়ে বিচার চান। তখন খলীফা বললেন, 'তাকে আযাদ করে দিন।' লোকটি রাজি হলেন না। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিচের এই আয়াত তিলাওয়াত করতে করতে তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করতে থাকেন:
তোমাদের অধিকারভুক্তদের মধ্যে যারা মুক্তির জন্য লিখিত চুক্তি করতে চায়, তাদের সাথে তোমরা লিখিত চুক্তি করো-যদি জানো যে, তাদের মধ্যে কল্যাণ আছে। -এবার তাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন।'
শেষোক্ত ঘটনায় দেখা যাচ্ছে যে একজন গোলাম তার মুক্তির জন্য আবেদন জানাচ্ছে, মনিব তা দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে আর একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক মনিবের অসম্মতি সত্ত্বেও গোলামের ইচ্ছা পূরণ করছেন। ইতিহাসে আর কোথাও কি এমন ঘটনা খুঁজে পাওয়া যাবে?
৩.১.৪। সমাজে অবস্থানকারী নেতাদের সংশোধন
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার খেলাফতকালে তার অধীনস্থ নেতারা অন্যায় কিংবা অহংকার করার সুযোগ পাননি। এমনকি সমাজ নিয়ন্ত্রণের সম্পূর্ণ দায়িত্বও তাদের হাতে কখনো ছেড়ে দেননি। এমন কিছু দৃষ্টান্ত নিচে উল্লেখ করা হলো:
আবু সুফিয়ান রা. এবং তার মক্কার বাড়ি
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মক্কায় যাওয়ার পরে মক্কাবাসী তার কাছে ছুটে যায়। তারা বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আবু সুফিয়ান এমন এক জায়গায় বাড়ি করেছেন যে পানি আটকা পড়েছে। আমাদের বাড়িতে পানি ঢুকে যায়। এমন চলতে থাকলে বসতবাড়ি ধ্বংস হয়ে যাবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লাঠি হাতে সেখানে উপস্থিত হন। গিয়ে দেখেন যে আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু পানি যাওয়ার পথে পাথর স্তূপ করে রেখেছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এগুলো সরান।' তিনি কয়েকটা পাথর সরালেন। খলীফা আবারও বললেন, 'এটা এটা সরান..' এবার পাঁচ-ছয়টার মতো সরানো হলো। অতঃপর তিনি কাবার দিকে ঘুরে বলতে লাগলেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার, যিনি উমরকে মক্কায় বুকে দাঁড়িয়ে আবু সুফিয়ানকে হুকুম দেবার যোগ্য করেছেন আর তিনিও সে কথা মেনে নিলেন।'
উয়ায়না ইবনে হুসন এবং মালিক ইবনে আবি জাফর
একবার উয়ায়না ইবনে হুসন তার সাথে মালিক ইবনে জাফর নামে এক দরিদ্র মুসলিমকে নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে হাজির হন। তিনি এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ মন্তব্য করে বসেন, 'দুর্বলেরা সবল হয়ে গেছে, আর নীচু লোকেদের মান বেড়ে গেছে।' তখন মালিক প্রতিবাদ করে উঠলেন, 'তার পূর্বপুরুষেরা জাহান্নামে বসে আছে, তা সত্ত্বেও কি তিনি আমাদের সাথে অহংকার দেখাচ্ছেন?' উয়ায়না তার পাল্টাপাল্টি মন্তব্য শুনে যখন বাধ সাধে তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'ইসলামে বিনয়ী হতে হবে, আল্লাহর কসম, মালিক মধ্যস্থতা না করা পর্যন্ত আমি তোমাকে গ্রহণযোগ্য মনে করব না।' উয়ায়নার কাছে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। সুতরাং মালিককে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে মধ্যস্থতা করিয়ে দিতে তিনি অনুরোধ জানান।
আল-জারুদ রা. এবং উবাই ইবনে কাব রা.
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে আল-জারূদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আসেন। এক ব্যক্তি বলল, 'তিনি রাবীয়াদের নেতা।' এ কথা শুনে তিনি তার লাঠি দিয়ে পেটাতে লাগলেন। বললেন, 'এতে আপনার ক্ষতি হবে বলে আমার ভয় হচ্ছে (রূহানী ক্ষতির কথা বোঝালেন)।' উবাই ইবনে কাব রাযিয়াল্লাহু আনহু মসজিদ থেকে বের হওয়ার পরেও লোকজন তাকে ঘিরে ধরল এবং একের পর এক প্রশ্ন করতে লাগল। তখন তার সাথেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একই আচরণ করলেন। তিনি বলেন, 'আপনারা যা করছেন তা একজন নেতার জন্য ফিতনা ছাড়া আর কিছু নয় এবং এমন কাজ অনুসারীদের জন্যও অবমাননাকর।'
৩.১.৪। সমাজের কিছু প্রথার বিরুদ্ধে অভিযুক্তকরণ
আয-যুবায়ের ইবনুল আওম রা.-এর যবেহখানা
মদীনায় একটিমাত্র যবেহখানা ছিল। এর মালিক ছিলেন আয-যুবায়ের ইবনুল আওম রাযিয়াল্লাহু আনহু। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লাঠি হাতে সেখানে যেতেন। কাউকে একসাথে দুদিনের গোশত কিনতে দেখলেই তাকে লাঠিপেটা করতেন আর বলতেন, 'পাড়া-প্রতিবেশী আর জ্ঞাতি ভাইদের জন্য রাখছ না কেন?'
'এখন ইচ্ছামতো চাইতে থাক'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দেখলেন এক ভিখারি খাবার-ভর্তি বস্তা কাঁধে ফেলে ভিক্ষা করে বেড়াচ্ছে। তিনি তার বস্তা ধরে যাকাতের উটদের দিয়ে দিলেন। তারপরে বললেন, 'এখন ইচ্ছামত চাইতে থাক।'
এভাবে হাঁটা বন্ধ করা
এক ব্যক্তি বেশ হাত দুলিয়ে হাঁটছিল। এভাবে হেলেদুলে হাঁটতে দেখে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এভাবে হাঁটা বন্ধ করো।' সে বলল, 'আমি পারবো না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এক ঘা দিয়ে বসলেন। আবার সে হেলেদুলে হাঁটল। আবারও পেটালেন। এবার লোকটি কথা শুনল। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি যদি লোককে না পেটাই তবে আর কে পেটাবে?' লোকটি তাকে বলল, 'আল্লাহ তা'আলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিক। আল্লাহ তা'আলা আপনার মাধ্যমে তো শয়তান তাড়িয়েছেন।'
'আমাদের ধর্মকে এভাবে মেরে ফেলো না'
কৃচ্ছতাসাধন করতে গিয়ে এক লোক মরতে বসেছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে বললেন, 'আমাদের ধর্মকে এভাবে মেরে ফেল না। তার চেয়ে বরং আল্লাহ তা'আলা তোমাকে মেরে ফেলুন।'
আশ-শিফা বিনতে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি তার সময়ে কিছু লোককে দেখতেন যারা খুব আস্তে কথা বলত আর ধীরে চলত। তিনি তাদের পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন। তারা জবাব দিয়েছিল, 'কৃচ্ছতা অবলম্বনকারী।' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, উমর ইবনুল খাত্তাব কথা বললে তা স্পষ্ট শোনা যেত। তিনি দ্রুত হাঁটতেন, আর কাউকে পেটালে সে চরম ব্যথা পেত। আল্লাহর কসম, তিনিও খাঁটি সংযমী ছিলেন।'
জনসাধারণের সুস্থতা নিয়ে উমর রা.-এর সচেতনতা
খলীফা হিসেবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জনগণের সুস্থতা নিয়ে অনেক সচেতন ছিলেন। মুটিয়ে যাওয়ার অপকারিতা এবং ক্ষতি নিয়ে তিনি সবাইকে বরাবর সতর্ক করতেন। ওজন কমিয়ে পূর্ণোদ্যমে কাজ করার পরামর্শ দিতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, হে লোকসকল, অতিরিক্ত খাওয়া থেকে বিরত থাক। নয়তো নামাযে আলসেমি আসবে, শরীরের জন্যও তা ক্ষতিকর। তোমাদের অসুস্থ করে তুলবে। খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করো। কারণ, তা ঠিক থাকার নিকটবর্তী পন্থা। তাতে বাড়াবাড়ি থেকে বাঁচবে আর আল্লাহ তা'আলার ইবাদতেও শক্তি পাবে। নিজের সাধ-আহ্লাদকে ধর্মীয় দায়িত্বের কাছে বিসর্জন দিতে পারলে তাকে শাস্তি পেতে হবে না।
ইবনুল জাউযি উল্লেখ করেছেন যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিশাল ভুড়িওয়ালা এক লোককে দেখে বলেছিলেন, 'এটা কী?' সে বলল, 'আল্লাহ তা'আলার নেয়ামত।' তিনি বললেন, 'এটা তো বরং আল্লাহ তা'আলার শাস্তি।'
কারও পেটের অসুখ দেখা দিলে তা ছড়িয়ে পড়ার আশংকায় তিনি অসুস্থ লোকদের অন্যদের সাথে মিশতে বারণ করতেন। সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাকে বাড়িতে থাকার পরামর্শ দিতেন। বর্ণিত আছে, একবার এক নারী কুষ্ঠরোগ নিয়ে কাবার দিকে যাচ্ছিল। পথে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর বান্দী, বাড়িতে থাকছেন না কেন? অন্যদের ক্ষতি হবে না?' সুতরাং তিনি বাড়ি ফিরে গেলেন। সেখানে থাকাকালীন এক লোক তাকে খবর দিল, 'আল্লাহর কসম, আপনাকে যিনি বাইরে বের হতে নিষেধ করেছিলেন তিনি ইন্তেকাল করেছেন। আপনি বের হন।' ঐ নারী জবাব দিল, 'আল্লাহর কসম, আমি তার জীবদ্দশাতেও তাকে অমান্য করিনি আর ইন্তেকালের পরেও অমান্য করব না।'
তাছাড়া উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ব্যায়াম এবং ঘোড়া চালানোর ব্যাপারেও জোর দিতেন। তিনি বলতেন, 'তোমরা সন্তানদের সাঁতার কাটা এবং ধনুর্বিদ্যা শেখাও। ঘোড়া চালানো এবং সুন্দর সুন্দর কবিতা আবৃত্তি শেখাও।'
মদে আসক্ত ব্যক্তির প্রতি উপদেশ
সিরিয়া থেকে আগত এক ব্যক্তি খুব শক্তিশালী ছিলেন। তাকে অনুপস্থিত দেখে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার খোঁজ করেন। শুনলেন, লোকটি মদে আসক্ত হয়ে পড়েছে। তিনি তার লিপিকারকে লিখতে বললেন:
উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছ থেকে অমুকের প্রতি। আসসালামু আলাইকুম। সকল প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার, তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। হা-মীম। কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে, যিনি পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ। পাপ ক্ষমাকারী, 'তওবা কবুলকারী, কঠোর শাস্তিদাতা ও সামর্থ্যবান। তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। তারই দিকে হবে প্রত্যাবর্তন।
অতঃপর তিনি চিঠিতে সীল লাগিয়ে পত্রবাহকের হাতে দিয়ে বললেন, 'সংযত অবস্থায় পেলে তবেই তার হাতে দিয়ো।' আর উপস্থিত সবাইকে তার হেদায়েতের জন্য দুআ করতে বললেন। চিঠিটি হাতে পেয়ে লোকটি পড়তে পড়তে বলল, 'আমার রব আমাকে ক্ষমা করে দেবার ওয়াদা করেছেন, শাস্তির ভয়ও দেখিয়েছেন।' কান্নায় ভেঙে পড়া পর্যন্ত তিনি এ কথা বার বার বলতে লাগলেন। লোকটি মদ্যপান ছেড়ে দেয়। এগুলো থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে শুরু করে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার এই খবর পেয়ে বললেন, 'তোমাদেরও এমন করা উচিত। তোমাদের কেউ পদস্খলিত হলে তাকে শুধরে দাও, তার জন্য দুআ করো এবং (তাকে অপমান করে) তার বিরুদ্ধে শয়তানকে লেলিয়ে দিয়ো না।'
মানুষকে সংশোধন করার ব্যাপারে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পদ্ধতি তার প্রজ্ঞার স্বাক্ষর বহন করে। মানব-চরিত্র তার নখদর্পণে ছিল। লোক বুঝে সে অনুযায়ী শোধরানোর ব্যবস্থা নিতে জানতেন। তিনি জানতেন, একজনের জন্য যা কল্যাণকর, সেই একই পদ্ধতি আরেকজনের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। বড় বড় দায়-দায়িত্ব এবং কাজের ফাঁকেও নিয়মিত উপস্থিত থাকা একজনমাত্র ব্যক্তির অনুপস্থিতি তার নজর এড়ায়নি। বিষয়টিকে ফেলে না রেখে তার খোঁজখবর নেন। তাকে সাহায্য করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন। বর্তমানে কেউ অনুপস্থিত হলে কে তার ভাইয়ের খোঁজ রাখে? সাহায্যের তো প্রশ্নই আসে না। মুসলিমবিশ্বের মধ্যে এমন ভ্রাতৃত্বের অভাবই আজ ধ্বংস ডেকে আনছে। যে নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করবে তার ক্ষেত্রে ভাইদের প্রতি এমন অবহেলা থাকার কথা না। কেউ কি এর দিকে নজর দেবে? আশা করতে দোষ নেই।
ব্যক্তিগত জমায়েত নিয়ে তার মন্তব্য
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে জনসমক্ষে একত্রে হতে উৎসাহিত করতেন। ব্যক্তিগত আড্ডা বা জমায়েত তার খুব অপছন্দ ছিল। কারণ, এতে করে ভিন্ন মত তৈরির সুযোগ ঘটে। যা পরবর্তীকালে দ্বন্দ্ব-সংঘাত টেনে আনে বলে তিনি মনে করতেন।
ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কুরাইশিদের ডেকে বলেছিলেন, 'তোমাদের ব্যক্তিগত জমায়েতের ব্যাপারে শুনেছি। কেউ এভাবে আলাদাভাবে জমায়েত হবে না। তখন অমুক লোক অমুকের সাথী, এমন কথা প্রতিষ্ঠিত হবে। সুতরাং এগুলো বর্জন করতে হবে। আল্লাহর কসম, এমন জমায়েত তোমাদের দ্বীনি দায়বদ্ধতা, তোমাদের সম্মান এবং একাত্মতার জন্য ক্ষতিকর। আমি দেখতে পাচ্ছি তোমাদের পরবর্তী লোকেরা বলবে, 'এগুলো অমুক ও অমুকের মন্তব্য ছিল।' তখন তো ইসলাম দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়বে। সুতরাং সবার সামনে একত্রিত হবে, সবার সাথে বসবে। তাতে সবার সাথে মহব্বত দীর্ঘস্থায়ী হবে, তোমাদের সম্মানও বৃদ্ধি পাবে।'
আসলেই তাই। গুরুত্বপূর্ণ লোকেরা যখন সাধারণ মানুষ থেকে নিজেদের আলাদা করে রাখেন এবং নির্দিষ্ট লোকেদের সাথে ওঠাবসা করেন তখন তা ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হয়। সাধারণ মানুষকে নির্দেশনা দেবার দায়িত্ব যাদের হাতে তাদের সাধারণ মানুষের সাথে মেলামেশা করা খুব জরুরী। এভাবে তারা নিজেদের মতামত সঠিকভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে আলাদা জমায়েত হলে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় নানা মত তৈরি হয়। নিজের সময়ের এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এই আশংকা করতেন।
টিকাঃ
৬৬৯. আল-মুয়াত্তা, ২/৫৩০; আল-মুহাল্লা, ৯/৪৪৩।
৬৭০. আখবার উমর, পৃ. ৩২০; আল-মুয়াত্তা, ২/৭৪৫।
৬৭১. আল-বায়ান ওয়া আত-তাবাঈন, ২/১০১; ফারাইদ আল-কালাম, পৃ. ১১৩।
৬৭২. আল-ইদারা আল-আ'সকারিয়্যা ফি আ'হদ আল-ফারুক, ড. সুলায়মান আল কালাম, ২/৭৬৪।
৬৭৩. তারীখ আল-ইসলাম: আহদ আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, পৃ.২৯৮, ২৯৯।
৬৭৪. শাহীদ আল-মিহরাব, পৃ. ২০৫।
৬৭৫. আখবার উমর, পৃ. ৩৩৯; সিরাজ আল-মুলুক, পৃ. ১০৯।
৬৭৬. ফিকহ আল-ইতিলাফ, মাহমুদ মুহম্মদ আল-খাযান্দার, পৃ. ১৬৪।
৬৭৭. উমর ইবনুল খাত্তাব, সালিহ ইবনে আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ, পৃ. ৬৬।
৬৭৮. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৫২৩; মুসনাদ, আহমাদ, হাদীস নং ৩১৬।
৬৭৯. আল-খিলাফা আর-রাশিদা, ড. ইয়াহিয়া আল-ইয়াহিয়া, পৃ. ২৯৭; ফাতহুল বারি, ৭/৭০৬।
৬৮০. তাফসীর ইবনে কাসীর, ২/৬১০।
৬৮১. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৫৪২।
৬৮২. আশ-শায়খান আবু বকর ওয়া উমর মিন রিওয়ায়াত আল-বালাযুরি, পৃ. ১৭৪, ১৭৫।
৬৮৩. মানকিবু উমর, আল-জাউযি, পৃ. ৭৪। এর সনদ যয়ীফ; মহিদ আস-সাওয়াব, ১/৩৬৮।
৬৮৪. আল-হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ৩/২৬৬- আয-যাহাবি, আসহাব আর-রাসূল, ১/১৭৪।
৬৮৫. তাহযীব আল-কামাল, আল-মায্যি, ৫/৫০৫; হুযায়ফা ইবনে আল- ইয়ামান, ইবরাহীম মুহাম্মাদ আল-আলি, পৃ. ৬২।
৬৬. মুখতাসার মানহাজ আল-কসিদীন, পৃ. ১০০; ফারাইদ আল-কালাম, পৃ. ১৩৯।
৬৭. আখবার উমর, পৃ. ৩২১।
৬৮. আশ-শায়খান মিন রিওয়ায়অত আর-বালাযুরি, পৃ. ২২৫।
৬৮৯. মানাকিব উমর, পৃ. ১২৯; ফান আল-হুকম, পৃ. ৩৬৭।
৬৯০. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৬৪৩; মুসনাদ, আহমাদ, হাদীস নং. ১৩৯; আল-মাওসূআ আল-হাদীসিয়া।
৬৯১. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৯৭৪; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং. ১০৩৫।
৬৯২. উমর ইবনুল খাত্তাব, সালিহ আব্দুর রহমান, পৃ. ৭৯।
৬৯৩. আশ-শায়খাইন ফী রিওয়ায়াত আল-বালাযুরি, পৃ. ২১৯।
৬৯৪. আল-মুরতাদা, আন-নাদাউয়ি, পৃ. ১০৬।
৬৯৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৭।
৬৯৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৭।
৬৯৭. মানাকিবু উমর, পৃ. ১৩৫; মারাসীল আল-হাসান; মাহদুস সাওয়াব, ১/২৭৩।
৬৯৮. আশ-শাইখান রিওয়ায়াত আল-বালাযুরি, পৃ. ২২০।
৬৯৯. মানকিবু উমর, ইবনে জাউযি, পৃ. ১৩৫; মাহদ ইস-সাওয়াব, ১/২৭৩।
৭০০. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৪৭৯।
৭০১. মানকিবু উমর, ইবনে জাউযি, পৃ. ১৩৪।
৭০২. আশ-শায়খাইন ফী রিওয়ায়াত আল-বালাযুরি, পৃ. ২২১।
৭০৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ২২২।
৭০৪. আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৩/২৮৮; আশ-শায়খাইন ফী রিওয়ায়াত আল-বালাযুরি, পৃ. ২২২।
৭০৫. তারীখুয যাহাবি, আহদুল খুলাফা আর-রাশিদীন, পৃ. ২৭২।
৭০৬. সূরা আন-নূর, ২৪: ৩৩।
৭০৭. মাহদুস সাওয়াব, ৩/৯৭৫।
৭০৮. শাহীদ আল-মিহরাব, পৃ. ২২২।
৭০৯. আখবার উমর, পৃ. ৩২১; মানাকিবু আমীরিল মু'মিনীন, ইবনে জাউযি, পৃ. ১২৮।
৭১০. তারিখুল মাদীনা ওয়াল মুনাউয়ারা, ইবনে শিব, ২/৬৯০; আদ-দাউরুস সিয়াসি, আস-সাফওয়া, পৃ. ১৯১।
৭১১. প্রাগুক্ত, ২/৬৯০; আদ-দাউরুস সিয়াসি, আস-সাফওয়া, পৃ. ১৯১।
৭১২. আদ-দাওর আস-সিয়াসি, আস-সাফওয়া, পৃ. ২৩১।
৭১৩. মানাকিবু আমীরিল মু'মিনীন, ইবনুল জাউযি, পৃ. ১০১।
৭১৪. আখবার উমর, পৃ. ১৭৫।
৭১৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯০।
৭১৬. আশ-শায়খান মিন রিওয়ায়াত আল-বালাযুরি, পৃ. ২২৬।
৭১৭. আল-খলীফা আল-ফারুক, ড. আব্দুর রহমান আল-আনি, পৃ. ১২৪।
৭১৮. মানাকিবু আমীরিল মুমিনীন, ইবনুল জাউযি, পৃ. ২০০।
৭১৯. আল-খলীফা আল-ফারূক, ড. আব্দুর রহমান আল-আনি, পৃ. ১২৪।
৭২০. প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৫।
৭২১. দেখুন সূরা আল-মুমিন, ৪০: ১-৩।
৭২২. তাফসীর কুরতুবি, ১৫/২৪৬।
৭২৩. শাহীদ আল-মিহরাব, পৃ. ২০৮।
৭২৪. আল-খুলাফা আর-রাশিদূর, হাসান আইয়ূব, পৃ. ১১৫।
৭২৫. ফারাইদ আল-কালাম, পৃ. ১১৬; তারীখ আত-তাবারি, ৩/২৮১।
৭২৬. আল-খুলাফা আর-রাশিদূর, হাসান আইয়ূব, পৃ. ১১৫।
৮২০. ফান আল-হুকম, পৃ. ২৬৪।
৮২১. আল-বিদায়া ওয়া আর-নিহায়া, ৭/১৪০।
৮২২. মাহদুস সাওয়াব, ১/৩৮৮।
৮২৩. মানাকিব আমীর আল-মু'মিনীন, ইবনুল জাউযি, পৃ. ৮৯।
৮২৪. মানাকিব আমীর আল-মু'মিনীন, ইবনুল জাউযি, পৃ. ৮৯; আওয়ালিয়াত আল-ফারূক, পৃ. ২৮৯।
৮২৫. আওয়ালিয়াত আল-ফারুক, পৃ. ২৮৯।
৮২৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭০।
৮৩০. প্রাগুক্ত ৯২, ৯৩।
৮৩১. আশ-শায়খান মিন রিওয়ায়াত আল-বালাযুরি, পৃ. ২১১, ২১২।
৮৩২. আওয়ালিয়াত আল-ফারুক, পৃ. ৮৩।
৮৩৩. 'কাল আগ্নেয়শিলায় গঠিত ভূখন্ডকে হাররা বলা হয়। মদীনা এমন দুটো হাররার মাঝে অবস্থিত।
৮৩৪. মদীনা থেকে দুই মাইল দূরে অবস্থিত।
৮৩৫. আখবার উমর, পৃ. ১০৯; আল-হিলইয়া, ১/৫৩।
📄 বাজারে জনসাধারণের কর্মকান্ড তদারকি
আল্লাহ তা'আলা মূলত তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরামকে চারটি বিষয় প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা দিয়েছিলেন। নামায কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজে নিষেধ করা। এগুলো জন্যই তারা আল্লাহর হুকুমে নিজ ভূমি ছেড়ে হিজরত করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
الَّذِيْنَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ بِغَيْرِ حَقٌّ إِلَّا أَنْ يَّقُوْلُوْا رَبُّنَا اللهُ وَلَوْلَا دَفْعُ اللهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَّهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلٰوتٌ وَ مَّسْجِدُ يُذْكَرُ فِيْهَا اسْمُ اللهِ كَثِيْرًا وَّلَيَنْصُرَنَّ اللهُ مَنْ يَّنْصُرُهُ إِنَّ اللهَ لَقَوِيٌّ عَزِيْزٌ الَّذِيْنَ إِنْ مَّكَّنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلٰوةَ وَآتَوُا الزَّكٰوةَ وَأَمَرُوْا بِالْمَعْرُوْفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنْكَرِ وَلِلّٰهِ عَاقِبَةُ الْأُمُوْرِ
যাদেরকে তাদের ঘরবাড়ি থেকে অন্যায়ভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে শুধু এই অপরাধে যে, তারা বলে আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ। আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে অপর দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তবে (খ্রিস্টানদের) নির্জন গির্জা, ইবাদতখানা, ইহুদিদের উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ বিধ্বস্ত হয়ে যেত, যেগুলোতে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়। আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন, যারা আল্লাহকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী শক্তিধর। তারা এমন লোক যাদেরকে পৃথিবীতে শক্তি-সামর্থ্য দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎ কাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে। প্রত্যেক কর্মের পরিণাম আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত।
ইমাম আবু বকর জাস্সাস বলেছেন, এখানে মুহাজিরদের কথা বলা হয়েছে। কারণ, তারা তাদের বাড়িঘর থেকে অন্যায়ভাবে বিতাড়িত হয়েছিলেন। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, যদি তিনি তাদের ক্ষমতা দেন, তাহলে তারা নামায কায়েম, যাকাত আদায়, সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে বাধা দেবেন। এখানে খুলাফায়ে রাশেদীনের প্রতি ইশারা করা হয়েছে। কারণ, তারা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে ক্ষমতা লাভ করেছিলেন। বলা বাহুল্য আবু বকর, উমর, উসমান এবং আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুম এর অন্তর্ভুক্ত।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাওয়াতুর পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে এই কাজগুলো করে গেছেন বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, বিচারিক, সেনাবাহিনীর পাশাপাশি গভর্নর নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অঙ্গসংগঠনগুলোর উন্নয়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রতি তিনি খুব যত্নশীল ছিলেন। মানুষ যেন আল্লাহ ও তার রাসূলের নির্দেশ আঁকড়ে থাকতে পারে এবং নিষেধাজ্ঞা মানতে পারে তার জন্য খলীফার জায়গা থেকে তার অবদান অসামান্য। এবং এই একই ধারায় কাজ করার জন্য মুসলিম ভূখণ্ডের গভর্নরদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ইবনে তাইমিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন: সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে বাধা দেওয়াই ছিল মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার গভর্নরদের প্রধান কাজ।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করেছেন, বিদআতের বিরুদ্ধে লড়েছেন, মুসলিমসমাজে ইবাদত কায়েম করেছেন, সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ করতে গিয়ে কঠিন পরিশ্রম করেছেন।
৩.২.১। তাওহীদের বাণী এবং ফিতনা ও বিদআতের বিরুদ্ধে লড়াই
মুসলিম রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য থাকে ধর্ম রক্ষা করা। এই লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলামের মূল ভিত্তি সংরক্ষণের প্রয়োজনীতা অনুভব করেন। সুতরাং মানুষ যেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রেখে যাওয়া সুস্থ-খাঁটি আকীদা আঁকড়ে থাকতে পারে, বিদআতের বিরুদ্ধে লড়তে পারে এবং শয়তানের ফাঁদপূর্ণ সুসজ্জিত কুসংস্কার এবং আকর্ষণীয় অন্ধ বিশ্বাসের ষড়যন্ত্র যেন নস্যাৎ করতে পারে এ জন্য তিনি ইসলামের ভিতগুলো হেফাযত করেছেন। উমর কীভাবে ফিতনা-ফ্যাসাদের জড় উপড়ে ফেলে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এখানে তার উদাহরণ দেওয়া হলো:
নীলনদের বধু
আমর উবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু মিসরীয় এক প্রথার কথা জানিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে চিঠি পাঠান। মিসরীয়রা প্রতি বছর নীলনদে একজন করে কিশোরীকে ছুঁড়ে ফেলত। তাদের বক্তব্য ছিল : 'হে গভর্নর, তা না হলে যে নীলনদ আর প্রবাহিত হবে না।' তিনি এর কিছুই বুঝতে পারলেন না। জানতে চাইলেন, 'এর মানে কী?' তারা বলল, 'বছরের বারোতম মাসে আমরা বাবা-মায়ের সাথে আছে-এমন কুমারী মেয়ের খোঁজে থাকি। মেয়ে পেয়ে গেলে তার বাবা-মায়ের সাথে চুক্তি করা হয়। অতঃপর মেয়েটিকে সর্বোত্তম পোশাক আর গয়নায় সাজিয়ে আমরা তাকে নীল নদে ফেলে দিই।' আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'ইসলামে এগুলোর কোনো জায়গা নেই। আগের এসব প্রথা ইসলাম দূর করে দিচ্ছে।' ঘটনাক্রমে নীলনদের প্রবাহ সেবার বন্ধ হয়ে যায়। লোকজন বিপদে পড়ে দেশ ছাড়তে উদ্যত হয়। তখন আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চিঠি পাঠিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পুরো ঘটনা জানান। তিনি জবাবে লিখলেন, 'আপনি সঠিক কাজ করেছেন। আমি এই চিঠির সাথে একটা চিরকুট পাঠালাম। এটা নীলনদে ফেলে দেবেন। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চিঠির সাথে পাঠানো চিরকুটটি খুলে দেখেন তাতে লেখা: 'আল্লাহ তা'আলার বান্দা এবং আমীরুল মুমিনীনের পক্ষ থেকে মিসরবাসীর নীলনদের কাছে। প্রবাহিত হওয়ার সিদ্ধান্ত যদি তোমার ওপরে নির্ভর করে তবে প্রবাহিত হয়ো না, জেনে রাখো, আমাদেরও তোমাকে আর প্রয়োজন নেই। আর তোমার প্রবাহিত হওয়া না হওয়া যদি এক এবং মহাপরাক্রমশালী, আল্লাহ তা'আলা, যার নির্দেশে তুমি চলো, তার হাতে থাকে তবে আমরা আল্লাহ তা'আলার কাছে দুআ করছি তিনি যেন তোমাকে প্রবাহিত করেন।' কথামতো চিরকুটটি নীলনদে ফেলা হলো। শনিবার সকালে উঠে সবাই দেখতে পেল, আল্লাহ তা'আলার হুকুমে নীলনদ বইতে শুরু করেছে। মাত্র এক রাতের ব্যবধানে তাতে ষোলো হাত পানি উঠে যায়। এভাবে আল্লাহ তা'আলা মিসরীয়দের কুসংস্কার দূর করে দেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার চিরকুটে তাওহীদের বাণী লিখেছিলেন। নীলনদের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করেন আল্লাহ তা'আলা, সে কথাই উল্লেখ করেছেন। এভাবে মানুষের মনে গেঁথে বসা ভ্রান্ত বিশ্বাস নির্মূল করতে সক্ষম হন। তার বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপে মিসরীয়দের অন্তর থেকে অন্ধবিশ্বাস দূর হয়ে যায়।
'আমি জানি তুমি একটা পাথর ছাড়া আর কিছু নও। কারও ভালো বা ক্ষতি করার কোনো ক্ষমতাই তোমার নেই'
আবিস ইবনে রাবীয়া থেকে বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হজরে আসওয়াদে (কালো পাথর) চুমু খেয়ে বলেছিলেন, 'আমি জানি তুমি একটা পাথর ছাড়া আর কিছু নও। কারও ভালো বা ক্ষতি করার কোনো ক্ষমতাই তোমার নেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে চুমু দিতে না দেখলে আমিও চুমু দিতাম না।' তারা এমনভাবে সুন্নতের অনুসরণ করতেন। ইবনে হাজার আত-তাবারীর বরাত দিয়ে বলেছেন: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এমন বক্তব্যের পেছনে যুক্তি ছিল। মানুষ সবেমাত্র মূর্তিপূজা থেকে সরে আসতে শুরু করেছিল। তাই পূর্বের জাহেলীযুগের মতো আরবেরা আবার অজ্ঞতাবশত ওই পাথরের প্রতি ঝুঁকে পড়তে পারে বলে তার আশংকা হচ্ছিল। তাই তিনি সবাইকে বোঝাতে চাচ্ছিলেন, তিনি কেবল সুন্নতের বশবর্তী হয়ে পাথরটিতে চুমু দিয়ে থাকেন।
ইবনে হাজার উল্লেখ করেছেন: এখানে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বক্তব্য দ্বীনি আইনপ্রণেতাদের জন্য যুক্তির উৎস। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ করতে গিয়ে কোন কাজের পেছনে কী যুক্তি কাজ করছে-তা জানা না থাকলে সমস্যা হতে পারে। সাহাবায়ে কেরাম প্রত্যেকটি সুন্নত অনুসরণ করার জন্য অধীর হয়ে থাকতেন। যা তাদের অন্যতম গুণ। তারা বিশ্বাস করতেন যে সুন্নত অনুসরণ করা খুব জরুরী। আর আল্লাহ তা'আলা এই বিষয়ে সাহায্য করবেন।
রিদওয়ান গাছ কেটে ফেলা হলো
নাফি থেকে সহীহ সনদের ভিত্তিতে ইবনে সাদ বর্ণনা করেছেন যে, লোকজন রিদওয়ান গাছের কাছে নামায পড়তে শুরু করেছিল। এই ঘটনা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কানে যায়। তিনি তখনই গাছটি কেটে ফেলার নির্দেশ দেন।
সাহাবায়ে কেরাম করেননি-তাবেঈনেরা এমন সব কাজ করতে গেলেই বিদআত দূর করা এবং তাওহীদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্ভাব্য সব রকম ব্যবস্থা নিতেন। তাদের এমন আচরণের ফলে এক সময় লোকজন হয়তো ওই গাছটির উপাসনা শুরু করে দিত। তাই তিনি তা কেটে ফেলতে বলেন।
নবী দানিয়েল আ.-এর কবর
তাসতারে নবী দানিয়েল আলাইহিস সালামের কবর আবিষ্কার হওয়ার পরে আবু মূসা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সে ঘটনা জানান। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে লিখলেন, 'দিনের বেলায় তেরটি কবর খুঁড়বেন এবং রাতের বেলায় যে কোনো একটির মধ্যে তাকে দাফন করে দেবেন। তার কবরের যেন কোনো চিহ্নও না থাকে। মানুষ যেন কবরের প্রতি আকৃষ্ট না হয়, এর অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।'
'তোমরা কি নবীর জায়গাগুলোকে তীর্থস্থান বানিয়ে ফেলতে চাও?'
সহীহ সনদ থেকে বর্ণিত, উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু তার এক সফরের সময় লক্ষ্য করলেন যে, মানুষ প্রায়ই এক জায়গায় নামায আদায় করতে যায়। তিনি জানতে চাইলেন, 'এখানে কী?' তারা বলল, 'এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামায আদায় করেছিলেন।' তিনি বললেন, 'তোমাদের পূর্বসূরিরা এই কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে। তারা তাদের নবীর নামাযের জায়গাকে তীর্থস্থান বানিয়ে ফেলেছিল। সফরে থাকা অবস্থায় যদি সে জায়গা পড়ে তবে সেখানে নামায পড়তে দোষ নেই। তা না হলে সফর জারি রাখবে।'
আমি তাদের জানাতে চাই যে, একমাত্র আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাতেই সবকিছু ঘটে।
সিরিয়ায় অবস্থানকালে সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। উম্মতের বৃহৎ স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মনে হচ্ছিল জনসাধারণ খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি বেশি রকমের অনুরক্ত হয় পড়ছে। খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর সৌভাগ্য এবং যুদ্ধকৌশলের কারণে বার বার বিজয় লাভ হচ্ছে বলে জনগণ বিশ্বাস করতে শুরু করছিল। এ অবস্থা দেখে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রমাণ করতে চাইলেন যে একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই বিজয়-দানের মালিক এবং সবকিছু তার হুকুমে পরিচালিত হয়। এ কারণে তিনি তার সেনাপতিকে বরখাস্ত করেন এবং এর সত্যতা ব্যক্ত করে গভর্নরদের কাছে চিঠি পাঠান। এখানে নিখাদ তাওহীদ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ছিল। চিঠিতে তিনি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন, 'আমি রাগ কিংবা অবিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে তাকে পদচ্যুত করছি না। এর একমাত্র কারণ, জনসাধারণ তাকে নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। আমি তাদের জানাতে চাই যে, একমাত্র আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাতেই সবকিছু ঘটে।'
তারা মাটিতে বীজ বোনে এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতি বিশ্বাস রাখে।
মুয়াবিয়া ইবনে কররা থেকে বর্ণিত, উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু কয়েকজন ইয়েমেনীকে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনারা কারা?' তারা বলল, 'আমরা মুতাওয়াক্কিলুন (যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করেন)।' তিনি বললেন, 'না, আপনারা মুত্তাক্কিলুন (যারা অন্যকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে চান)। যারা আল্লাহ তা'আলাকে বিশ্বাস করেন তারা মাটিতে বীজ বোনে এবং আল্লাহ তা'আলার প্রতি বিশ্বাস রাখে।'
আমরা অনুসরণ করি এবং নতুন কোনো কিছুর প্রবর্তন করি না
একদিন মিম্বরে দাঁড়িয়ে উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতে লাগলেন, 'যারা নিজেদের মত ও পথ মেনে চলে তারা সুন্নতের শত্রু। তারা হাদীস আত্মস্থ করতে অক্ষম বলেই নিজস্ব মতামতের ওপর ভিত্তি করে ফাতওয়া দেয়। তারা নিজেরাও বিপথগামী, অন্যদেরও বিপথে নেবে। আর আমরা কেবল অনুসরণ করি, নতুন কোনো কিছুর প্রবর্তন করি না।। যতদিন আমরা সুন্নত আঁকড়ে থাকব বিপথে যাব না।'
উমর ইবনে মায়মূন থেকে বর্ণিত, তার পিতা বলেছেন: এক লোক উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এসে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, মাদাইন জয় করার সময় আমরা একটা বই পেয়েছি। এর কথাগুলো চমৎকার!' তিনি বললেন, 'সেগুলো কি আল্লাহর বই থেকে লেখা?' সে বলল, 'না।' তিনি তার লাঠিটি হাতে নিয়ে লোকটিকে পেটাতে পেটাতে তিলাওয়াত করলেন,
الرَّ تِلْكَ ايْتُ الْكِتَبِ الْمُبِينِ إِنَّا أَنزَلْتُهُ قُرْءَنَا عَرَبِيًّا لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ بِمَا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ هُذَا الْقُرْآنَ وَإِنْ كُنْتَ مِنْ قَبْلِهِ لَمِنَ الْغَفِلِينَ
'আলিফ-লা-ম-রা; এগুলো সুস্পষ্ট কিতাবের আয়াত। আমি একে আরবি ভাষায় কুরআনরূপে অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পার। আমি তোমাদের নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করেছি, যেমতে আমি এ কুরআন তোমার নিকট অবতীর্ণ করেছি। তুমি এর আগে অবশ্যই এ ব্যাপারে অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে।'
অতঃপর তিনি বললেন, 'তোমাদের পূর্বসূরিরা এভাবেই ধ্বংস হয়ে গেছে। তাওরাত আর ইঞ্জিল বাদ দিয়ে তারা তাদের জ্ঞানী, যাজকদের বই অনুসরণ করতে শুরু করেছিল। তারা শেষ পর্যন্ত অবহেলা করে কিতাবের বাণীগুলো ধ্বংস করে ছেড়েছে।'
বর্ণিত আছে, আসলাম বলেছেন, আমি উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলতে শুনেছি, 'আমরা (তাওয়াফ আর সাই করার সময়) এমন তাড়াহুড়া করি কেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে যেভাবে যা করেছি তা করা বাদ দেব না।'
হাসান আল-বসরী উল্লেখ করেছেন, ইমরান ইবনে হুসায়ন রাযিয়াল্লাহু আনহু বসরা থেকে ইহরাম বেঁধে আসেন এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সাক্ষাৎ করেন। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বেশ কঠোরভাবে এই কাজ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছিলেন, 'আপনি কি চান যে লোকেরা বলুক, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন সাহাবী ভিন্ন জায়গা থেকে ইহরাম করে এসেছিলেন?'
আবু ওয়াইল বলেছেন: আমি কাবাপ্রাঙ্গনে শায়বা ইবনে উসমানের চেয়ারে বসে ছিলাম। তিনি বললেন, 'উমর এখানে বসে বলে গেছেন, 'আমি ভাবছি, ভাগ-বাটোয়ারা না করে সোনারূপা রেখে যাব না।' আমি তাকে বললাম, 'আপনি তা করবেন না।' তিনি বললেন, 'কেন করব না?' বললাম, 'আপনার সাথীরা তা করেননি।' তিনি বললেন, 'এই দুজনের উদাহরণ আমাকে অনুসরণ করতে হবে।'
তাওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি অনেককে কষ্ট স্বীকার করেছেন, বিদআতের বিরুদ্ধে অনেক লড়াই করেছেন। ইসলামে ঠিক যেভাবে তাওহীদের কথা বলা হয়েছে তিনি তা পুঙ্খানুপঙ্খভাবে ধারণ করেছিলেন। এজন্যই মানুষের মন ও মনন থেকে মূর্তিপূজার নাম-গন্ধও মুছে ফেলতে সক্ষম হন। এর বদলে তাওহীদের ভিত তাদের চেতনায় গেঁথে দেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিমসমাজে ঈমানের ভিত প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন। যে কোনো ধরনের শিরক দূর করার পেছনে তার চেষ্টার অন্ত ছিল না। তিনি বিদআত দূর করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা ও কাজ অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করেছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতেন বিজয় অর্জন করতে হলে তাওহীদের এই নীতি জানা ও বোঝা খুব প্রয়োজন।
৩.২.২। ইবাদতের ভিন্নতা নিয়ে তার সচেতনতা
আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত থেকে তিনি অতটুকু বুঝতে পেরেছিলেন যে, ধর্মীয় যে কোনো বিষয় ইবাদতের মধ্যে চলে আসে। আল্লাহপ্রদত্ত ধর্মে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু উল্লেখ করা হয়েছে। পানাহারের আদব থেকে শুরু করে, রাষ্ট্রগঠন, শাসন, অর্থনীতি পরিচালনা, পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখা, শান্তির বিধানসহ যুদ্ধ এবং শান্তিপূর্ণ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ভারসাম্য বজায় রাখার মতো সবকিছু বিবৃত হয়েছে। ইবাদত-পদ্ধতি যেমন : নামায, রোযা, যাকাত এবং হজের গুরুত্ব সম্পর্কে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অবগত ছিলেন। তিনি এ-ও জানতেন যে এগুলো হলো আল্লাহ-নির্ধারিত ইবাদতের একটা অংশ, তবে ইবাদতের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নয়। ইবাদতের এই ধারণা বাস্তবায়ন করা হলো জাগতিক শক্তি লাভের শর্ত। তাছাড়া ইবাদত-বন্দেগি মানুষের বিশ্বাসে দৃঢ়তা আনে এবং নৈতিক মুল্যবোধের উন্নতি ঘটায়, যা সমাজ সংস্কারে মূল্যবান ভূমিকা রাখে। নামায, রোযা, যাকাত, হজ এবং যিকির নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সচেতনার কয়েকটি উদাহরণ আমরা দেখব। তিনি তার নিজের মধ্যে এবং মুসলিম সমাজে ইবাদতের পূর্ণতা নিয়ে কেমন সচেতন ছিলেন তার উজ্জ্বল উদাহরণ এগুলো।
নামায
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলিমদের নামায আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর জামাতে নামায না পড়লে তিনি তার কঠিন সমালোচনা করতেন। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে একইভাবে অনুসরণ করেছেন। পরবর্তী সময়ে খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুও এদিকে বিশেষ নজর দেন। তিনি লোকজনকে যেমন নামায পড়াতেন তেমনি নামায না পড়লে শাস্তি দিতেন। এমনকি গভর্নরদের কাছে এ বিষয়ে চিঠিও দিয়েছিলেন। তাতে লেখা ছিল, 'আমার দৃষ্টিতে নামায সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে নিয়মিত নামায পড়ছে সে কিন্তু এর সঠিক পাবন্দী করছে, তার ধর্মীয় দায়িত্বও পালন করছে। সে ঠিক কাজ করছে। আর যে তা অবহেলা করছে তার ধর্মীয় অন্যান্য দায়িত্ব-কর্তব্যেও অবহেলার প্রবণতা থাকার আশঙ্কা আছে।'
নামাযে খুশুর দিকে তার তীক্ষ্ণ নজর ছিল। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর এ প্রসঙ্গে বলেছেন, 'আমি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পেছনে নামায আদায় করতাম। তিন সারি পেছন থেকেও তার ফোঁপানোর আওয়াজ শোনা যেত।'
আরেকটি বর্ণনামতে, তিনি ফজরের নামাযে যখন এই আয়াত তিলাওয়াত করতেন, ... قَالَ إِنَّمَا أَشْكُوا بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ ‘আমি তো আমার দুঃখ-কষ্ট আল্লাহর কাছেই নিবেদন করছি...' তখন তার কান্না পেছনের সারি থেকেও শোনা যেত।
একদিন নামাযের মধ্যে এক ব্যক্তি অস্থিরভাবে হাত-পা নাড়ছিলেন। তার অবস্থা দেখে তিনি বলেছিলেন, 'মন দিয়ে নামায আদায় করলে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও বশে চলে আসে।' সেনাদের খবর না পেলে তিনি কুনূত পড়তেন। যোদ্ধাদের জন্য নামায আদায় করতেন, তাদের জন্যও কুনূত পড়তেন। আহলে-কিতাবীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময়ও তিনি ফরয নামাযের মধ্যেই তাদের প্রতিহত করার জন্য কুনূত পড়েছিলেন। তিনি নিজে যেমন খুব মন দিয়ে নামায আদায় করতেন, মানুষকেও একইভাবে নামায আদায় করা শেখাতেন। সুন্নত ধরে রাখা এবং বিদআত থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে সতর্ক করতে ভুলতেন না। ব্যস্ততার কারণে সন্ধ্যা পার হয়ে মাগরিবের নামাযে কখনো যদি দেরি হতো, তবে নামায আদায় করেই তিনি দুজন গোলাম আযাদ করে দিতেন। কারণ ছাড়া দু-ওয়াক্তের নামায এক হয়ে যাওয়া তার দৃষ্টিতে কঠিন গুনাহ ছিল। আসরের নামাযের পরে অন্য কোনো নামায আদায় করলেও তিনি তিরস্কার করতেন।
জুমআর নামাযে কেউ দেরি করে আসলে তার রক্ষা ছিল না। সালিম ইবনে আব্দুল্লাহ এবং আব্দুল্লাহ আবনে উমর থেকে বর্ণিত, কোনো এক জুমআর দিনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুতবায় ব্যস্ত ছিলেন। এমন সময় স্বনামধন্য একজন প্রবীণ মুহাজির হাজির হন। উল্লেখ্য, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরও সাহাবী ছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কয়টা বাজে?' তিনি বললেন, 'আযানের আগ পর্যন্ত ব্যস্ত ছিলাম। আযান শোনার সাথে সাথে বাড়ি গিয়ে অযু করে এসেছি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'শুধু অযু?' এর কারণ হলো, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমআর আগে গোসলের নির্দেশ দিয়েছেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মসজিদে উঁচু গলায় কথা বলায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এ প্রসঙ্গে আস-সাইব ইবনে ইয়াযিদ বলেছেন, আমি মসজিদে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি আমার দিকে পাথর ছুঁড়তে লাগল। আমি তাকে লক্ষ্য করতে গিয়ে দেখি, উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু সেখানে আছেন। তিনি বললেন, 'ওই দুটোকে ধরে আনো তো।' আমি লোক দুজনকে নিয়ে হাজির হলাম। তিনি জানতে চাইলেন, 'তোমরা কারা (কোন জায়গার)?' তারা বলল, 'তায়েফের।'
তিনি বললেন, 'তোমরা এখানকার লোক হলে এতক্ষণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মসজিদে দাঁড়িয়ে উঁচু গলায় কথা বলার জন্য তোমাদের কঠিন পিটুনি দিতাম।'
বলাবাহুল্য, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশাবলীর প্রতি খুব শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তোমাদের মধ্যে কারও স্ত্রী যদি মসজিদে যেতে চায় তবে নিষেধ করো না।' উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর স্ত্রী প্রায়ই মসজিদে নামায আদায় করতেন। তাকে তিনি বললেন, 'তুমি জান আমি কী পছন্দ করি।' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, আপনি নিষেধ না করা পর্যন্ত আমি যাব।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যখন ছুরিকাহত করা হয় তখনো তার স্ত্রী মসজিদে ছিলেন। এখানেই বোঝা যাচ্ছে যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শরীয়তের হুকুমের প্রতি কেমন শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং কুরআন ও সুন্নাহ কতটা আঁকড়ে থাকতেন। এগুলোর সামনে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দকেও গুরুত্ব দেননি।
মধ্যরাতের নামায উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খুব প্রিয় ছিল। তিনি আল্লাহর হুকুমে তখন প্রচুর নামায আদায় করতেন। আর শেষ রাতে পরিবারের সবাইকে, 'নামায, নামায!' বলে জাগিয়ে দিতেন। তখন তার মুখে এই আয়াত শোনা যেত :
وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلٰوةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا ۖ لَا نَسْـَٔلُكَ رِزْقًا ۖ نَّحْنُ نَرْزُقُكَ ۗ وَالْعَاقِبَةُ لِلتَّقْوٰى
আপিন আপনার পরিবারের লোকজনকে নামাযের আদেশ দিন এবং নিজেও এ ওপর অবিচল থাকুন। আমি আপনার কাছে কোনো রিযিক চাই না। আমি আপনাকে রিযিক দিই এবং আল্লাহভীরুতার পরিণাম শুভ।
এক রাতে তিনি কিয়ামের নামায আদায় করতে গিয়ে মানুষের কথা ভেবে বিমর্ষ হয়ে পড়েন। তিনি নামায আদায় করতে পারছিলেন না, এমনকি ঘুমাতেও পারছিলেন না। তিনি বলতে লাগলেন, 'আমি নামায আদায় করতে পারছি না। আমার ঘুমও আসছে না। কুরআন তিলাওয়াত করতে গেলে খেই হারিয়ে ফেলছি। শুরুর অংশ পড়ছি না শেষের, মাথায় আসছে না।' তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'তা কেন, আমীরুল মুমিনীন?' তিনি বললেন, 'মানুষের চিন্তায়।'
কোনো রাতে তাহাজ্জুদ নামাযের কিছু রাকাত ছুটে গেলে তা পরের দিন আদায় করে নিতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'কেউ যদি রাতের নির্ধারিত তিলাওয়াতের কোনো অংশ পড়তে না পারে, তাহলে সে যদি পরের দিন তা ফজর এবং যোহরের নামাযের মাঝামাঝি সময়ে পড়ে নেয়, তাহলে সে যেন তা রাতেই পড়ল।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খুব মুয়াযযিন হতে চাইতেন। এ প্রসঙ্গে বলতেন, 'আমি যদি খলীফা হওয়ার পাশাপাশি আযানও দিতে পারতাম! তবে তা-ই করতাম।'
তিনি আল্লাহর কাছে খুব দুআ করতেন, তাঁর আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। প্রায়ই এই দুআ করতেন, 'হে আল্লাহ তা'আলা, আমার সব আমলকে আপনি সঠিক করে দিন এবং সেগুলো যেন কেবল আপনার জন্যই হয়। আর সেগুলোতে যেন আমি আপনার বাইরে অন্য কাউকে শরিক না করি।'
তাঁর আরেকটি দুআ, 'হে আল্লাহ, আপনি জন্য শাস্তি নির্ধারণ করে থাকলে আমাকে মাফ করে দিন এবং আমাকে রহম করুন। আপনি ক্ষমা এবং কবুলের মালিক।' তিনি প্রায়ই বলতেন, 'আমি আল্লাহর অনুগ্রহ নয়, বরং তাঁর কাছে দুআ করা নিয়ে ভাবি। কারণ, দুআ করতে পারলে, তা কবুল হবেই।'
তিনি অনুগত লোকজনের সান্নিধ্য লাভের জন্য সাধারণ মানুষকে খুব উৎসাহ দিতেন। তিনি বলতেন, 'যারা আল্লাহর অনুগত বান্দা তাদের সান্নিধ্যে থাকবে এবং তাদের কথা শুনবে, কারণ, যে কোনো ব্যাপারে তাদের খুব স্পষ্ট ধারণা থাকে।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহকে স্মরণ (যিকির) করতে ভালোবাসতেন। আবু মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দেখলে বলতেন, 'হে আবু মূসা, আপনি আমাদের রবের কথা মনে করিয়ে দিন।' তখন তিনি তিলাওয়াত শুরু করতেন। তার তিলাওয়াত শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং অন্যদের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ত।
তিনি যিকিরের মজলিস ভালোবাসতেন। বর্ণিত আছে যে, আবু উসাইদের আযাদকৃত গোলাম, আবু সাঈদ বলেছেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিয়মিত ইশার পরে মসজিদের খোঁজ নিতে যেতেন। নামায আদায় করা ছাড়া কেউ সেখানে থাকলে তিনি তাকে চলে যেতে বলতেন। এক রাতে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবায়ে কেরামের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের মধ্যে উবাই ইবনে কাব রাযিয়াল্লাহু আনহুও উপস্থিত ছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'লোকগুলো কে?' তিনি বললেন, 'ইয়া আমীরাল মুমিনীন, তারা আপনার লোক।' খলীফা জানতে চাইলেন, 'নামায শেষ হয়ে গেছে। তাও এখানে বসে আছেন কেন?' তারা বললেন, 'আমরা আল্লাহকে স্মরণ (যিকির) করছি।' এ কথা শুনে তিনিও সেখানে বসে পড়লেন। বসে নিকটতম লোকটিকে বললেন, 'দুআ করা শুরু করুন।' তিনি দুআ করতে লাগলেন। ক্রমে বসে থাকা প্রত্যেককে এক এক করে দুআ করতে বললেন। এক সময় আমার পালা এলো। আমাকে তিনি বললেন, 'শুরু করুন।' কী বলব বুঝে পাচ্ছিলাম না। ভয়ে কাঁপতে লাগলাম। তিনি বললেন, 'বলুন। আপনি শুধু এটুকুই বলুন, হে আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন, হে আল্লাহ আমাদের রহমত দিন।' অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেই দুআ করতে লাগলেন। দুআর সময় তিনি সবচেয়ে বেশি কাঁদছিলেন। দুআ শেষ হলে বললেন, 'এখন বেরিয়ে পড়ুন।'
তারাবীহ
উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু জামাআতে তারাবীহ নামায আদায়ের প্রবর্তন করেন। অন্যান্য এলাকায়ও যেন একইভাবে তারাবীহ আদায় করা হয় সে নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠান। এর পেছনে অবশ্য কারণ আছে। কোনো এক রমাযানের রাতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মসজিদে গিয়ে দেখেন, সেখানে লোকজন বিক্ষিপ্তভাবে নামায আদায় করছেন। কেউ একা নামাযে ব্যস্ত ছিলেন, আবার কয়েকজন মিলে কোনো একজনের পেছনে নামায আদায় করছিলেন। এমন অবস্থা দেখে তিনি বললেন, 'আমার ধারণা, সবাই একজনের পেছনে নামায আদায় করতে পারলে ভালো হবে।' অতঃপর, তিনি সবাইকে নিয়ে উবাই ইবনে কাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর পেছনে নামায আদায় করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন, 'এই বিদআত (প্রবর্তন বা প্রচলন) কতই না ভালো হলো! তারপরেও ঘুমিয়ে থেকে তারা যে নামায ছেড়ে দেয় তা এর চেয়ে উত্তম।' এখানে শেষরাতের কিয়ামের নামাযের কথা বলা হয়েছে। মানুষ তখন রাতের প্রথম প্রহরেই এই নামায আদায় করে নিত।
এখানে কিন্তু কারও এ কথা মনে করার কোনো অবকাশ নেই যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তারাবীহ নামাযের প্রবর্তক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে তারাবীহর সূচনা ঘটেছে। আর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেবল এক ইমামের পেছনে জামাতে এই নামায আদায়ের উদ্যোগ নেন। আগে একা একা এ নামায আদায় করা হতো, পরবর্তী সময়ে একজন তিলাওয়াতকারীর পেছনে জামাতে আদায় করার প্রচলন হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষার মধ্যেই এই নামাযের গুরুত্ব এবং সূচনার প্রমাণ বিদ্যমান। তিনি রমাযানে কিয়ামের নামায আদায় করার প্রতি জোর দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, 'রমাযানের রাতে ঈমানের সাথে এবং পুরস্কারের আশায় নামায যে আদায় করবে তার পেছনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।'
উরওয়া ইবনে যুবায়ের থেকে বর্ণিত, আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা তাকে বলেছেন, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মধ্যরাতে বেরিয়ে যান। তিনি মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করেন। তাকে অনুসরণ করে কয়েকজন লোক রাতে একইভাবে নামায আদায় করতে শুরু করে। পরেরদিন এই কথা শুনে আরও কয়েকজন জমায়েত হয়ে তার সাথে নামায আদায় করেন। পরের দিন এই কথা লোকমুখে আরও ছড়ায়। সুতরাং তৃতীয় রাতে মসজিদে অনেক মানুষ অপেক্ষা করতে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসার পরে তারা নামায আদায় করলেন। চতুর্থ রাতে মসজিদে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে রাতে আর আসলেনই না। একেবারে ফজরের সময় তিনি উপস্থিত হন। নামায আদায় করে তিনি সবার দিকে ঘুরে বসলেন, কালেমা পড়লেন। অতঃপর বললেন, 'আপনারা যা করেছেন তা প্রশংসার যোগ্য। তবে এভাবে নিয়মিত নামায আদায় করতে থাকলে তা সবার জন্য ফরয হয়ে যাবে এবং যা আদায় করা কষ্টকর হবে।' এমন অবস্থা বিরাজ করছিল। এর মধ্যেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকাল হয়।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মন্তব্য করেছিলেন, 'এই বিদআত (প্রবর্তন বা প্রচলন) কতই না ভালো হলো!' এখানে তিনি সম্পূর্ণ আক্ষরিক অর্থে বিদআত শব্দটি ব্যবহার করেছেন। কারণ, আগে প্রচলিত ছিল না এমন যেকোনো নতুন প্রচলন বা প্রবর্তনকে আরবি ভাষায় বিদআত বলা হয়। তিনি যেকোনো কাজ খুব গুছিয়ে করতে ভালোবাসতেন। খুব সচেতনতার সাথে তিনি সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করতেন। এক ইমামের পেছনে সকলকে জামাতে তারাবীহ নামায আদায় করার জন্য একত্রিত করার উদ্যোগটিও তার সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্যের বহিঃপ্রকাশ। এই বৈশিষ্ট্য থেকে তিনি অন্যান্য এলাকাতেও তিনি এক নিয়ম জারি করার জন্য উদ্যোগী হয়ে ওঠেন।
যাকাত, হজ এবং রমাযান
যাকাত এবং তা আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুব উদ্বিগ্ন থাকতেন। যাকাত আদায় করা ফরয, তাছাড়া তা রাজস্ব আদায়ের অন্যতম উৎস ছিল। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে আলোচনার সময়, ইনশাআল্লাহ, এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত বলা হবে।
এবার হজের প্রসঙ্গে আসা যাক। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খেলাফতকালে তার লোকজন নিয়ে হজ করতেন। কথিত আছে, তিনি তার খেলাফতকালে দশ বছর, কোনো কোনো বর্ণনামতে, নয় বছর হজে অংশগ্রহণ করেছেন। খলীফা হিসেবে তিনি নিজে তো বটেই, অন্য গভর্নরদেরও এই দায়িত্বগুলো পালনের নির্দেশ দেন: হজের সময় হলে জনসাধারণকে তা মনে করিয়ে দেওয়া এবং সেখানে যাওয়া; শরীয়তের হুকুম মেনে হজপালনের সঠিক পদ্ধতি শেখানো; সঠিক পদ্ধতিতে হজে নেতৃত্ব দেওয়া; শরীয়ত মেনে নামায এবং খুতবায় ইমামতি করা।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হজে পালনের জন্য খুব উৎসাহিত করতেন। তিনি বলতেন, 'বিভিন্ন এলাকায় লোক পাঠাবো বলে ভাবছি। তাদের কাজ হবে হজ পালনের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা তাতে অংশগ্রহণ করছে না, তাদের খুঁজে বের করা এবং তাদের ওপরে জিযিয়া (কর) আরোপ করা।'
হজের মৌসুম ছাড়াও লোকজন যেন সারা বছর পবিত্র কাবা কেন্দ্র করে উপস্থিত থাকে তার জন্যও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর চেষ্টায় কোনো ত্রুটি ছিল না। তিনি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময় থেকে লক্ষ্য করে এসেছেন, একমাত্র হজ পালন বাদে বছরের বাকি সময়টা কাবাপ্রাঙ্গন প্রায় ফাঁকা থাকে। এমনকি উমরা পালনের উদ্দেশেও অন্য কোনো এলাকা থেকে খুব একটা লোকজন আসত না। এক অর্থে কাবাপ্রাঙ্গন সারাবছর প্রায় জনশূন্য হয়ে থাকত। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাবইকে উমরা পালনের গুরুত্ব তুলে ধরার পর থেকে বছরের বাকি সময়টাতেও মানুষ কাবা প্রাঙ্গনে জড়ো হতে শুরু করে। ইমাম মালিক এবং কয়েকজন আলেমের মতে ইফরাদ এবং কিরানের তুলনায় তামাত্তু হজই উত্তম। তা সত্ত্বেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সবার সার্বিক কল্যাণের কথা বিবেচনা করে এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, তিনি প্রতি বছর নিজের খরচে কাবা শরিফের গিলাফ (আচ্ছাদন) তৈরি করতেন এবং তা হাজিদের মধ্যে ভাগ করে দিতেন।
এখন রোযার প্রসঙ্গ। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিপূর্ণ অনুসরণ করে গেছেন। তিনি কোনো এক মেঘলা দিনে হয়তো ইফতার করে ফেলেছিলেন। মেঘ সরে গেলে দেখা গেল তখনও সূর্য ডোবেনি। তখন তিনি বলেছিলেন, 'বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। ' এক ব্যক্তি টানা রোযা রাখতে শুরু করে। তার কানে এই কথা যাওয়ামাত্র তিনি নির্দেশ দেন, 'খাও, হে যাহরি।'
তিনি ইবাদতে খুব মশগুল থাকতেন। বিশেষ করে জীবনের শেষ দিকে এসে তিনি নামায এবং রোযা দুটোই অনেক বেশি পরিমাণে আদায় করতেন। দান-সাদকাও খুব করতেন। আর খলীফা পবার পর থেকে প্রতি বছর হজে যান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় তার পাশে থেকে যেভাবে বড় বড় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, তার ইন্তেকালের পরেও তা বহাল ছিল। তিনি তার খেলাফতকালে যেভাবে সব যুদ্ধ এবং অভিযান পরিচালনা করেছেন, তার জন্য নিশ্চয়ই উত্তম পুরস্কার পাবেন।
তিনি অন্যতম যিকিরকারী ছিলেন। বর্ণিত আছে, তিনি বলতেন, 'অবশ্যই আল্লাহকে স্মরণ করবে। কারণ, যিকির উপশমকারী। আর মানুষের অগোচরে তাকে নিয়ে কথা বলা থেকে সাবধান। কারণ, তা একটা ব্যাধি। ' তিনি আরেকটি কথা প্রায়ই বলতেন, 'একাকী সময় কাটাও।'
টিকাঃ
৭২৭. সূরা হজ, ২২: ৪০-৪১।
৭২৮. আহকাম আল-কুরআন, ৩/২৪৬।
৭২৯. আল-হিসবা ফী আল-আসর আর-রাশিদি, ড. ফযল ইলাহি, পৃ. ১৫।
৭৩০. আল-হিসবা ফী আল-ইসলাম, পৃ. ৬; আস-সুলতা আত-তানফীদিয়্যাহ, ১/৩০৯।
৭৩১. আল-বিদায়া ওয়া আন-নিহায়া, ৭/১০২. আলী আত-তানতাউয়ি উল্লেখ করেছেন, যে সহীহ হওয়ার কারণে নয় বরং বিখ্যাত হওয়ার কারণে প্রকাশ করা হয়েছে।
৭৩২. ফান আল-হুকম, পৃ. ৩৪৭।
৭৩৩. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ১৫৯৭।
৭৩৪. আসহাব আর-রাসূল, ১/১৬১।
৭৩৫. ফাতহুল বারি, ৩/৫৯০, ৫৯১।
৭৩৬. মিন আখলাকিন নাসর ফী জিল্লিস-সাহাবা, পৃ. ২৩।
৭৩৭. আত-তারীখ আল-ইসলামি, ১৯, ২০/১৬০; তাবাকাত ইবনে সাদ, ২/১০০।
৭৩৮. প্রাগুক্ত, ১৯, ২০/১৬০।
৭৩৯. আল-ফাতওয়া, ১৫/৯০।
৭৪০. তারা আল্লাহ তা'আলাকে নয়, বরং সেনাপতির ক্ষমতাকে বড় করে দেখছিল।
৭৪১. আল-বিদায়া ওয়া আন-নিহায়া, ৭/৮২।
৭৪২. আসহাব আর-রাসূল, এর সনদ সহীহ (১/১৬৪)।
৭৪৩. সূরা ইউসুফ, ১২: ১-৩।
৭৪৪. এই বর্ণনাটি দুর্বল।
৭৪৫. মাহদুস সাওয়াব, ২/৫৩২।
৭৪৬. প্রাগুক্ত।
৭৪৭. শাকীক ইবনে সালামা।
৭৪৮. শায়বা ইবনে উসমান ইবনে আবি তালহা আল-কুরেশি আল-আব্দারি ছিলেন কাবার দ্বার-রক্ষক।
৭৪৯. মাহদুস সাওয়াব, ২/৫৩৭; এর সনদ সহীহ।
৭৫০. আশহার মাশাহীর আল-ইসলাম, রফীক আল-আদহম, ২/২৫৫৬, ২৫৭।
৭৫১. ফিকহ আত-তামকীন ফী আল-কুরআন আল-কারীম, আস-সাল্লাবি, পৃ. ১৮১১।
৭৫২. আল-ফাতওয়া, ১০/২৪৯; আল-মুয়াত্তা মাআ শারহিহি আওজায আল-মাসালিক, ১/১৫৪।
৭৫৩. হিলইয়া আল-আওলিয়া, ১/৫২।
৭৫৪. সূরা ইউসুফ, ১২: ৮৬।
৭৫৫. আল-ফাতওয়া, ১০/৩৭৪।
৭৫৬. প্রাগুক্ত, ১৮/১৫৪।
৭৫৭. প্রাগুক্ত, ২৩/৬২।
৭৫৮. প্রাগুক্ত, ২১/৯১।
৭৫৯. আত-তারীখুল ইসলামী, আল-হামীদি, ১৯,২০/৪২।
৭৬০. আল-ফাতওয়া, ২১/৯৮, ২২/২৩।
৭৬১. আল-ফাস, ২/৪১৫; আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ২৯৪, ড. ইয়াহিয়া আল ইয়াহিয়া।
৭৬২. আল-ফাস, ১/৬৬৮।
৭৬৩. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৮৬৫।
৭৬৪. আত-তারীখ আল-ইসলামি, ১৯, ২০/৪০১।
৭৬৫. মাহদুস সাওয়াব, ২/৬৩৫, এর সনদ যয়ীফ।
৭৬৬. সূরা ত্ব-হা, ২০: ১৩২।
৭৬৭. আল-ফারুক উমর, আশ-শারকাউয়ি, পৃ. ২১৪।
৭৬৮. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ৭৪৭।
৭৬৯. আশ-শায়খান মিন রিওয়ায়াত আল-বালাযুরি, পৃ. ২২৫।
৭৭০. আল-ফাতাওয়া, ১/২৩২।
৭৭১. আল-ফাতাওয়া, ১৪/২৪৭।
৭৭২. প্রাগুক্ত, ৮/১১৮।
৭৭৩. প্রাগুক্ত, ১৫/৬০।
৭৭৪. প্রাগুক্ত, ১০/৫১।
৭৭৫. আশ-শায়খান মিন রিওয়ায়াত আল-বালাযুরি, পৃ. ২৩৬।
৭৭৬. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২০১০।
৭৭৭. মাহদুস সাওয়াব, ১/৩৪৯।
৭৭৮. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২০০৯।
৭৭৯. প্রাগুক্ত, হাদীস নং ২০১২। আল-ফাতাওয়া, ৩১/২৩।
৭৮০. আল-ফাতাওয়া, ৩১/২৩।
৭৮১. আস-সুলতা আত-তানফীদিয়া, ১/৩৮২।
৭৮২. প্রাগুক্ত, ১/৩৮৩।
৭৮৩. ফারাইদ আল-কালাম, পৃ. ১৭৩।
৭৮৪. আল-ফাতাওয়া, ২৬/১৪৬, ১৪৭।
৭৮৫. প্রাগুক্ত, ৩১/১৪।
৭৮৬. আল-মুয়াত্তা, ১/৩০৩।
৭৮৭. আল-ফাতহ, ৪/২৬১।
৭৮৮. মাহদুস সাওয়াব, ২/৩৬৭।
৭৮৯. তাফসীর আল-কুরতুবি, ১৬/৩৩৬; মাহদুস সাওয়াব, ২/৬৭৭।
৭৯০. আয-যুহদ, ওয়াকী, ২/৫১৭; এর সনদ সহীহ।