📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 আহলে বাইত (রাসূল সা.-এর পরিবারবর্গ)-এর প্রতি শ্রদ্ধা ও অনুরাগ

📄 আহলে বাইত (রাসূল সা.-এর পরিবারবর্গ)-এর প্রতি শ্রদ্ধা ও অনুরাগ


নিঃসন্দেহে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারবর্গ ছিলেন শ্রেষ্ঠ সম্মানের হকদার। তারা আহলে সুন্নাত ওয়া জামাতের কাছ থেকে আল্লাহর নির্ধারিত যথাযোগ্য সম্মান পেয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গাদীরে খুমের দিনে যা বলেছিলেন তারা তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। তিনি বলেছিলেন, 'আমার পরিবারবর্গের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলার আদেশের কথা তোমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।' ফলে তারা আহলে বাইতের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত এবং বন্ধু ভাবাপন্ন ছিলেন। এই উপদেশ মানতে পেরে তারাও খুব সন্তুষ্ট ছিলেন। তবে রাফেজীদের মতো আহলে বাইতের সদস্যদের নিয়ে তারা বাড়াবাড়িও করেননি। আবার নাসিবীদের মতো অপমান অবজ্ঞাও দেখাননি। আহলে বাইতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা ফরয এবং কথা বা কাজ দিয়ে তাদের অসম্মান করা হারাম, এ সম্পর্কে আহলে সুন্নাতের কোনো দ্বিমত নেই। আহলে বাইতের প্রতি আমদের কেমন কেমন মনোভাব হওয়া উচিত তা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার নকথা ও কাজ দিয়ে শিখিয়ে গেছেন।
২.৩.১। রাসূল সা.-এর স্ত্রীদের সঙ্গে আচরণ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদের খুব খোঁজ-খবর নিতেন। প্রচুর হাদিয়া পাঠাতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদের কাছে পাঠানোর আগে তিনি কোনো ভালো খাবার বা ফল-ফলাদি মুখে দিতেন না। উম্মুল মুমিনীনদের মধ্যে সবার শেষে হাদিয়া পাঠাতেন হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহার ঘরে। আর কম পড়ে গেলে দেখা যেত তিনিই বাদ পড়ে গেছেন। তাছাড়া নিয়মিত ভাতা প্রদান করতেন। এবারের ঘটনাটি উম্মুল মুমিনীন যায়নাব বিনতে জাহশ রাযিয়াল্লাহু আনহার। মুসলিমদের মালামাল বিলির সময় যায়নাব বিনতে জাহশ রাযিয়াল্লাহু আনহার জন্য তার নির্ধারিত অংশ পাঠানো হলো। এগুলো পেয়ে তিনি বললেন, 'উমরকে আল্লাহ তা'আলা মাফ করুন। আমার বোনেরা আমার চাইতে এগুলো ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারবে।' তারা বললেন, 'এগুলো সব আপনার।' 'সুবহানাল্লাহ, এগুলো নামিয়ে রেখে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিন,' এই বলে তিনি পর্দার আড়ালে গেলেন। আড়াল থেকে বারযাহ বিনতে রাফিকে নির্দেশ দিলেন, 'ভিতরে হাত ঢুকিয়ে এক মুঠো বের করে এই এই লোককে (তার অধীনস্থ আত্মীয় এবং ইয়াতিমদের) দিয়ে দাও।' শেষে মাত্র এক মুঠো বাকি ছিল। বারযাহ বলে ফেলল, 'আল্লাহ তা'আলা আপনাকে মাফ করুন, হে উম্মুল মুমিনীন। আল্লাহর কসম এটুকুর উপরে তো আমাদের হক আছে।' তিনি বললেন, 'কাপড়ের নিচ থেকে যতটুকু ইচ্ছা নিয়ে যাও।' সে ঢাকনা তুলে দেখল পাত্রে পঁচাশি দিরহাম পড়ে আছে। তিনি আকাশের দিকে হাত তুলে দু'আ করলেন, 'হে আল্লাহ তা'আলা, পরবর্তী সময়ে উমরের হাদিয়া আসার আগেই আপনি আমাকে তুলে নিয়েন।' এর পরই তিনি ইন্তেকাল করেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদের মধ্যে তিনিই সবার আগে ইন্তেকাল করেছিলেন--আল্লাহ তা'আলা তাকে কবুল করে নিন।
উম্মুল মুমিনীনদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আরেকটি ঘটনায় আসা যাক। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা উদ্ধৃত করেছেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব আমার কাছে জবেহকৃত পশুর রান আর মাথা পাঠিয়ে দিতেন।'
উম্মুল মুমিনীনগণ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে হজে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তিনি সহজে রাজী হতেন না। খুব করে বললে তিনি জবাব দিতেন, 'এ বছর না। পরের বার যেতে পারবেন।' হজের সফরে উম্মুল মুমিনীনদের সাথে তিনি উসমান ইবনে আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পাঠাতেন। তার নির্দেশমতো একজন সামনে আরেকজন পেছনে থাকতেন। তারা যেন কখনই পাশাপাশি না থাকেন, এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। দরকার পড়লে তারা শুধু গিরিপথে থামতে পারতেন। সাহাবায়ে কেরাম দুজন গিরিপথের মুখ পর্যন্ত যেতেন। তারা পাহারা দিতেন, যেন বাইরের কেউ উম্মুল মুমিনীনদের কাছে যেতে কিংবা দেখা করতে না পারে। তারা যখন কাবার তাওয়াফ করতেন তখন অন্য কারও তাওয়াফ করার অনুমতি ছিল না।
২.৩.২। আলী ইবনে আবি তালিব রা. এবং তার সন্তানগণ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবারবর্গ ছিল নিজের সন্তান-পরিবারের চাইতেও অনেক বেশি সম্মানের। নিচে এরকম কিছু দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হলো।
হুসাইন ইবনুল আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু উল্লেখ করেছেন যে, উমর তাকে সম্বোধন করে বললেন, 'হে আমার পুত্র, তুমি মাঝে মাঝে আমাদের ঘরে আসতে পারো না?' একদিন আমি তার কাছে গেলাম। গিয়ে দেখি তার সাথে মুআবিয়া বসা। আর ইবনে উমর দরজায় দাঁড়ানো। তাকে ভেতারে ঢোকার অনুমতি দেওয়ার হয়নি। আমিও ফিরে গেলাম। পরে এরকদিন তার সাথে আমার দেখা হলো। তিনি বললেন, 'হে আমার পুত্র, তোমাকে তো আসতে দেখলাম না।' আমি বললাম, 'আমি গিয়েছিলাম। আপনি মুআবিয়ার সাথে বসেছিলেন। ইবনে উমর ফিরে গেল বলে আমিও চলে এসেছি।' তিনি বললেন, 'আব্দুল্লাহ ইবনে উমর অপেক্ষা তুমি আমার ঘরে প্রবেশের অধিক হকদার। কারণ, আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে তোমাদের (আহলে বাইতের) কারণে আমাদের উপরে রহমত বর্ষিত হচ্ছে।' এই বলে তিনি তার মাথার ওপরে তার হাত রাখলেন।
মুহাম্মাদ আল-বাকিরের পিতার বরাত দিয়ে ইবনে সা'দ বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, আলী ইবনে হুসাইন বলেছেন, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইয়েমেন থেকে আসা কতগুলো পোশাক সাধারণ লোকজনের মধ্যে বিলি করছিলেন। তারা সেগুলো পরে দেখতে লাগল। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজা শরীফ এবং মিম্বরের মাঝে বসা ছিলেন। লোকজন তার সাথে কুশল বিনিময় করছিল, তার জন্য দু'আ করছিলো। মা ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহার ঘর থেকে হাসান এবং হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহু বের হয়ে আসেন। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লক্ষ করলেন, বিতরণকৃত পোশাক তাদের পরনে নেই। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ভ্রু কুঁচকে বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের যা দিয়েছি তাতে মোটেই সন্তুষ্ট নই। তারা বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি আপনার লোকদের পোশাক দিয়েছেন, ঠিকই তো করেছেন।' তিনি বললেন, 'পোশাক ছোট-বড় হওয়ার কারণে দুজন তরুণ সেগুলো না পরেই লোকজনের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তাই আমার খারাপ লাগছে।' তিনি অতিসত্বর হাসান এবং হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুর মাপের পোশাক পাঠানোর জন্য ইয়েমেনে চিঠি পাঠালেন। পরে পোশাকগুলো এসে পৌঁছালে তিনি তাদের হাদিয়া পাঠিয়ে দিলেন।'
আবু জাফর বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর হুকুমে রাষ্ট্র বিজয়ের পরে মুসলিমদের মাঝে সম্পদ বিলি-বণ্টনের ব্যাপারে খলীফা সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছিলেন। সাহাবায়ে কেরামের সাথে আলোচনায় বসার পরে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আপনাকে দিয়ে শুরু করুন।' তিনি বললেন, 'তা হয় না। আল্লাহর কসম, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকটবর্তী লোকজন এবং তার গোত্র বনু হাশিম দিয়ে শুরু করতে চাই।' তিনি সেই মোতাবেক প্রথমে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু, অতঃপর আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু ক্রমানুসারে পাঁচটি গোত্রের মধ্যে সম্পদ ভাগ করে বনু আদি ইবনে কা'বকে দিয়ে থামলেন। তিনি লিস্টে লিখলেন, তারপরে বনু হাশিম থেকে যারা বদরে উপস্থিত ছিলেন, অতঃপর বনু উমাইয়্যাহ ইবনে আব্দুশ শামস থেকে যারা বদরে উপস্থিত ছিলেন, তারপরের নিকটবর্তীরা, তারপরের নিকটবর্তীরা। তিনি ক্রমানুসারে যার যার অংশ বুঝিয়ে দিলেন। তাদের পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পারিবারিক সম্পর্কে ভিত্তিতে হাসান এবং হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুর অংশ বুঝিয়ে দিলেন।
বিখ্যাত আলেম শিবলী নু'মানী রহমাতুল্লাহি আলাইহির কিতাব আল-ফারুক-এর একটি শিরোনাম 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবার এবং সাহাবীদের পারস্পরিক হক এবং আদব'। এই পরিচ্ছেদে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে আলোচনা না করে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে পরামর্শ দিতেন। জেরুযালেমের বায়তুল মাকদাসে যাওয়ার আগে তিনি আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মদীনার ভারপ্রাপ্ত খলীফা হিসেবে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহার কন্যা উম্মে কুলসুমের সাথে বিয়ের মাধ্যমে তাদের সম্পর্কের বন্ধন এবং মাধুর্য চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করেছিল। আবার আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু তার এক ছেলের নাম উমর রেখেছিলেন। একই কারণে তিনি তার আরও দুই ছেলের মধ্যে একজনের নাম আবু বকর এবং আরেকজনের নাম উসমান রেখেছিলেন। এটা তো স্পষ্ট যে, কাউকে তীব্রভাবে ভালো না বাসলে কিংবা সম্মান না করলে কেউ তাদের নামে নিজের সন্তানদের নাম রাখত না।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছোট-বড় যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার আগে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে আলোচনা করে নিতেন। এর মধ্যে মুসলিমদের জেরুযালেম এবং মাদা'ইন বিজয়, নাহাওয়ান্দে যাওয়ার সিদ্ধান্ত, পারসিকদের ও বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, হিজরী সনের প্রবর্তনসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের পেছনে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সুপারিশ ছিল।
আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু জীবনভর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খাস পরামর্শক ছিলেন। তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবন নিয়ে শংকিত থাকতেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুও তাকে খুব স্নেহ করতেন। তাদের মধ্যে চমৎকার বোঝাপড়া ছিল। অথচ কিছু মানুষ তাদের খেয়াল-খুশিমতো ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে যাচ্ছে। যেখানে দেখা যায়, খুলাফায়ে রাশেদীন পরস্পর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন।
ড. আল-বুতী বলেছেন, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফত নিয়ে গবেষণা করতে গেলে তার এবং আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর মধ্যকার হৃদ্যতা এবং খাঁটি আত্মিক সম্পর্ক যে কারও নজর কাড়বে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর যেকোনো সমস্যার বেলায় আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন প্রধান পরামর্শক। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু যে মতামতই দিতেন তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তা গ্রহণ করতেন। 'আলী না থাকলে উমরের সর্বনাশ হয়ে যেত,' খলীফার এই বক্তব্য তাদের সম্পর্ক বোঝার জন্য যথেষ্ট। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সব ব্যাপারে তিনিও সমান আন্তরিক ছিলেন। পারসিকদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় সেনাবাহিনীর অগ্রভাগে অবস্থান না নিয়ে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আড়ালে থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তা ছিল উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর মহব্বত এবং উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ। খলীফার পদ খালি করে সম্মুখ সমরে অংশ নিতে গেলে আরও বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। এই আশঙ্কা থেকে তিনি খলীফাকে এমন পরামর্শ দিয়েছিলেন। আপনাদের কি মনে হয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পরবর্তী খলীফা হিসেবে ঘোষণা দিয়ে গেলে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশের বিরোধিতা করতেন আর খলীফা হতে গিয়ে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে তার হক এবং দায়িত্বের বিরোধিতা করেছে, তাদের সমর্থন দিতে পারতেন কিংবা তাদের প্রতি তিনি অনুগত এবং আন্তরিক থাকতে পারতেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবায়ে কেরামের পক্ষে কি এ কাজ করা সম্ভব? আর আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে তারা এমন কাজ করতে রাজী হবেন, তা-ও কী ভাবা যায়? সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বের শেষ দিন পর্যন্ত—এমনকি আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বের শেষ পর্যন্ত মুসলিমদের মধ্যে খলীফঅদের খেলাফতের যোগ্যতা নিয়ে কারও মনে কোনো দ্বিধা ছিল না।'
২.৩.৩ বনু নুদাইর থেকে রাসূল সা.-এর সম্পদ নিয়ে আলী রা. এবং আব্বাস রা.-এর বিরোধ
মালিক ইবনে আউস বলেছেন, 'দুপুরের আগ দিয়ে পরিবারের সাথে বসে ছিলাম। তখন উমর ইবনুল খাত্তাবের দূত এসে বলল, 'আপনাকে আমীরুল মুমিনীন যেতে বলেছেন।' তার সাথে গিয়ে দেখি, উমর গদিহীন বিছানায় একটা চামড়ার তাকিয়ায় কাত হয়ে আছেন। তাকে সালাম দিয়ে আমিও বসে পড়লাম। তিনি বললেন, 'হে মালিক, তোমার দিক থেকে কয়েকটি পরিবার এসেছিল। আমি তাদের জন্য কিছুটা সম্পদ বরাদ্দের হুকুম দিয়েছি। এগুলো নিয়ে তাদের মধ্যে ভাগ করে দাও।' আমি বললাম, 'হে আমীরুল মুমিনীন, অন্য কাউকে যদি দায়িত্বটা দিতেন।' তিনি বললেন, 'ধরো (তুমিই করো)।' আমি তখনো উঠে যাইনি। এর মধ্যে দারোয়ান ইয়ারফা' এসে বলল, 'উসমান, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ, যুবায়ের এবং সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে কি ভেতরে আসার অনুমতি দেবেন?' তিনি অনুমতি দিলেন। তারা ভেতরে এসে বসলেন। ইয়ারফা' একটু সময় বসে আবার বলল, 'আলী আর আব্বাসকে কি প্রবেশের অনুমতি দেবেন?' তিনি অনুমতি দিলেন। তারাও যথারীতি সালাম দিয়ে ভেতরে বসলেন।
আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমার আর তার বিচার করুন।' বনু নুদাইর থেকে আল্লাহ প্রদত্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্পদ নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধ চলছিল।
উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুসহ অপর সাহাবায়ে কেরাম বলে উঠলেন, 'ইয়া আমীরাল মুমিনীন, তাদের বিচার করুন। একজনকে আরেকজন থেকে রেহাই দিন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'একটু থামো। আসমান-যমীনের মালিক আল্লাহ তা'আলার কসম, তোমরা কি জান যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে গেছেন, 'আমরা যা কিছু ছেড়ে যাই (সম্পদ), কেউ তার ওয়ারিশ হবে না। সবই সাদকাহ।' আর এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের কথা বলেছেন। সবাই বলে উঠলেন, 'তিনি এ কথা বলেছেন।' এবার উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আলী এবং আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে ফিরে বললেন, 'এবার আল্লাহর ওয়াস্তে তোমাদের কাছে জানতে চাই, তোমরা এই কথা জান না?' তারা বললেন, 'তিনি এ কথা বলেছেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এ প্রসঙ্গে তোমাদের আরও কিছু বলার আছে। আল্লাহ তা'আলা এই সম্পদ এতই খাস যে, তিনি এমন আর কাউকে তা দেননি।' অতঃপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করলেন:
আল্লাহ তাঁর রাসূলকে যে ধন-সম্পদ দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা ঘোড়ায় কিংবা উটে চড়ে যুদ্ধ করনি, কিন্তু আল্লাহ যার উপরে ইচ্ছা, তাঁর রাসূলগণকে প্রাধান্য দান করেন। আল্লাহ সবকিছুর উপরে সর্বশক্তিমান।
অতঃপর বললেন, শুধুমাত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষেত্রে এ তা প্রযোজ্য। অথচ আল্লাহর কসম, তিনি তা নিজের জন্য রাখেননি। আবার তোমাদেরকেও বঞ্চিত করেননি; বরং তোমাদের সবার মাঝে ভাগ করে দিয়েছেন। ওই সম্পদের এতটুকু অংশই কেবল বাকি ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের পরিবারে জন্য সারা বছরের খোরাক রেখে বাকিটা বায়তুল মালে জমা দিয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জীবদ্দশায় এ কাজ করে গেছেন। আল্লাহর কসম, আপনারা তা জানেন তো?' সাহাবায়ে কেরাম তাদের জানার কথা বললেন। তিনি আলী এবং আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে ফিরে একই কথা জিজ্ঞেস করলেন। তারাও জানার কথা স্বীকার করলেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলে গেলেন, 'তারপরে আল্লাহ তা'আলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে গেলেন। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উত্তরসূরি।' আল্লাহর কসম, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদাঙ্ক অনুসরণ করে একইভাবে এ সম্পদ ব্যবহার করেছেন। আল্লাহ তা'আলা জানেন, তিনি কেমন সৎ এবং আনুগত ছিলেন। তিনি সব সময় সঠিক কাজ করতেন। আর এখন আমি আবু বকরের উত্তরসূরি। আমার খেলাফতকালীন বছর দুয়েক আমিও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকরের মতোই এই সম্পদ ব্যবহার করেছি। আল্লাহ তা'আলা জানেন আমি কতটা সৎ এবং অনুগত। এর উপরে আমার হক ছিল বলে আমি মনে করি। যাই-হোক, শর্তের ভিত্তিতে এই সম্পদ নিয়েছিলে। তা সত্ত্বেও এখন আবার আমার কাছে অভিযোগ নিয়ে এসেছ। হে আব্বাস, এখন তুমি তোমার ভাইয়ের ছেলের অংশ দাবী করছ। আর সে (আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে ইশারা করলেন) তার স্ত্রীর অংশ দাবী করছে। তোমাদের দুজনকেই বলেছি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে গেছেন, 'আমরা যা কিছু ছেড়ে যাই (সম্পদ), কেউ তার ওয়ারিশ হবে না। সবই সাদাকা।' আমি যখন নিজ থেকে এ সম্পদ তোমাদের হাতে দিতে চেয়েছি তখন বলেছিলাম, 'তোমরা চাইলে আমি দুজনকেই সম্পদ বুঝিয়ে দেব। তবে শর্ত আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবু বকর এবং আমি যেভাবে ব্যবহার করে এসেছি তোমাদেরও তা-ই করতে হবে।' তোমরা শর্ত মেনে নেবার পরে আমি দিয়ে দিয়েছি। আমি আপনাদের কাছে জানতে চাই, শর্ত মোতাবেক তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দিয়েছি কি না?' সাহাবায়ে কেরাম এক বাক্যে তা স্বীকার করলেন। আলী এবং আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকেও একই প্রশ্ন করলেন। তারাও কথার সত্যতা স্বীকার করেন। অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এখন ভিন্ন ফায়সালার আশায় আমার কাছে এসেছ? তোমরা এই সম্পদের সঠিক ব্যবহার না জানলে আমার কাছে বুঝিয়ে দাও। আমি এর তদারক করব।'
২.৩.৪। আব্বাস রা. এবং তার পুত্র আব্দুল্লাহ রা.-এর প্রতি উমর রা.- এর শ্রদ্ধাবোধ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহুর খুব প্রশংসা করতেন। মুসলিম উম্মাহর সামনে তার গুণগান করতেন। তার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি হক রক্ষার ব্যাপারেও খুব যত্নশীল ছিলেন। তিনি কসম খেয়ে বলেছিলেন, আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম কবুল করায় তিনি যত খুশি হয়েছিলেন, নিজের পিতা মুসলিম হলেও হয়তো অতটা খুশি হতেন না। এর একটাই কারণ। আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইসলাম কবুলের ঘটনা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বিশেষ কিছু ছিল।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচাতো ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তিনি এতটাই পছন্দ করতেন যে, বুযুর্গ এমনকী বদরী সাহাবায়ে কেরামদের মধ্যে তাকে থাকার অনুমতি দিতেন। যেখানে বুযুর্গ সাহাবীদের কম বয়সী ছেলেরাও থাকার অনুমতি পেতেন না, সেখানে এটা ছিল তার বাড়তি পাওনা। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার গুণাবলী আর জ্ঞান-বুদ্ধির কদর করতেন। ইবনে আব্বাসের বরাত দিয়ে ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেছেন, 'বদরে ছিলেন এমন সাহাবীদের সাথে আমাকে থাকার অনুমতি দেওয়ায় তাদের কেউ কেউ বলে বসলেন, 'আমাদের সমবয়সী ছেলে থাকা সত্ত্বেও আপনি আমাদের মাঝে শুধু তাকে রাখেন কেন?' তিনি বললেন, 'এর কারণ আপনারাও জানেন।' তাদের সাথে আমাকেও একদিন ডেকে আনলেন। সম্ভবত আমার জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্যই সেদিন সবাইকে ডাকা হয়েছিল। তিনি জানতে চাইলেন: এই আয়াতগুলো সম্পর্কে আপনাদের কী ধারণা?
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَ الْفَتْحُ وَ رَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَ اسْتَغْفِرْهُ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا
যখন আসবে আল্লঅহর সাহায্য ও বিজয়। এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন, তখন আপনি আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ননা করুন এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাকারী।
কয়েকজন বললেন, 'আমরা জানি না।' আর বাকিরা কিছুই বললেন না। তিনি আমাকে বললেন, 'হে আব্বাসের পুত্র, তোমারও কি একই মন্তব্য?' আমি বললাম, 'না।' তিনি জানতে চাইলেন, 'তাহলে তোমার মন্তব্য কী?' আমি বললাম, 'এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাকে বলেছেন, যখন আল্লাহ তা'আলার সাহায্য এলো এবং মক্কা বিজিত হলো এর অর্থ আপনার মৃত্যু আসন্ন। তাই আপনার রবের প্রশংসা করুন এবং তার কাছে ক্ষমা-প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই তিনি অনুশোচনা কবুলকারী এবং ক্ষমা প্রদানকারী।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলে উঠলেন, 'আমারও ঠিক এ কথাই মনে হয়েছে।'
হাফিয ইবনে হাজার উদ্ধৃত করেছেন, আল-বাগাভী তার মু'জাম আস- সাহাবা গ্রন্থে যায়েদ ইবনে আসলামের মাধ্যমে উল্লেখ করেছেন: ইবনে উমর থেকে বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু প্রায়ই আনহু ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে কাছে টেনে বলতেন, 'আমি দেখেছি, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাকে ডেকে মাথায় হাত বুলাচ্ছেন আর বলছেন, 'হে আল্লাহ, আপনি তাকে ইসলামের জ্ঞান দিন এবং কুরআনের অর্থ শিখিয়ে দিন।'
এভাবে তিনি ইবনে আব্বাসের গুণ, জ্ঞান এবং বুদ্ধির প্রশংসা করতেন।
হাফিয ইবনে কাসির উদ্ধৃত করেছেন : উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রায়ই বলতেন, 'আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস কুরআনের কী চমৎকার তাফসীর করে।' আর তাকে দেখলে বলতেন, 'বুযুর্গ ব্যক্তির তরুণ ছেলেটি এসেছে। যে প্রশ্ন করে করে জানতে চায় আবার বোঝেও।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবার এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মধ্যে দৃঢ় আত্মিক বন্ধন ছিল।

টিকাঃ
৬৩৫. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪০৮।
৬৩৬. আল-আকিদাহ ফি আহলে বাইত বাইনা আল-ইফরাত ওয়াল তাফরিত, পৃ. ৫৯।
৬৩৭. আয-যুহদ, পৃ. ১৬৬। বর্ণনাটি সহীহ।
৬৩৮. ইবনে সা'দ, বর্ণনাটি হাসান, ৮/১৯০; আখবার উমর, পৃ. ১০০।
৬৩৯. ইবনে সা'দ, বর্ণনাটি সহীহ, ৩/৩০৩
৬৪০. আল-ইদারাহ ফি আহদ উমর ইবনে আল-খাত্তাব, পৃ. ১২৬; আল-ফাতহ, ৪/৮৭।
৬৪১. আল-মুরতাদা, আন-নদভী, পৃ.১১৮।
৬৪২. প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৮।
৬৪৩. আল-মুরতাদা, আন-নদভী, পৃ.১১৯।
৬৪৪. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৯/৩৩১-৩৩২।
৬৪৫. আল-মুরতাদা, আন-নদভী, পৃ.১১৯।
৬৪৬. আলী ইবনে আবি তালিব মুসতুসর আমীন আল-খুলাফা আর-রাশেদীন, মুহাম্মাদ আল-হাজি, পৃ. ৯৯।
৬৪৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৩৮।
৬৪৮. ফিকহুস সিরাহ আন-নবুওয়‍্যাহ, পৃ. ৫২৯।
৬৪৯. দেখুন সূরা হাশর, ৫৯: ৬।
৬৫০. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১৭৫৭। আরেক বর্ণনায় হাদীসের শেষাংশে বলা হয়েছে, তারা তাকে সেটি ফেরত দিয়েছিল।
৬৫১. আল-আকিদাহ ফি আহলে বাইত বাইনা আল-ইফরাত ওয়াল তাফরিত, পৃ. ২১০।
৬৫২. সূরা নসর, ১১০: ১-৩।
৬৫৩. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪২৯৪।
৬৫৪. আল-আকিদাহ ফি আহলে বাইত বাইনা আল-ইফরাত ওয়াল তাফরিত, পৃ. ২১০।
৬৫৫. ফতহুল বারি, ১/১৭০।
৬৫৬. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৮/৩০৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00