📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 খলীফার বেতন-ভাতা; হিজরী বর্ষপঞ্জীর প্রবর্তন; ‘আমীরুল মু'মিনীন’ খেতাবের প্রচলন

📄 খলীফার বেতন-ভাতা; হিজরী বর্ষপঞ্জীর প্রবর্তন; ‘আমীরুল মু'মিনীন’ খেতাবের প্রচলন


১.৮.১। খলীফার বেতন
মুসলিমরাষ্ট্রে খেলাফত দ্বীনি দায়িত্ব হিসেবে পরিগণিত হয়। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার সাথে নৈকট্য লাভ করা সম্ভব। খলীফা হিসেবে কেউ আনুগত্য, আন্তরিকতা, ত্যাগ এবং দায়বদ্ধতার সাথে কাজ করলে আল্লাহ তা'আলা নিশ্চিতভাবে তাকে আখেরাতে পুরস্কৃত করবেন। আবার পাপীদের শাস্তিও আল্লাহ তা'আলা নির্ধারণ করে রেখেছেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: فَمَنْ يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَا كُفْرَانَ لِسَعْيِهِ وَإِنَّا لَهُ كَاتِبُوْنَ অতঃপর যে বিশ্বাসী অবস্থায় সৎকর্ম সম্পাদন করে, তার প্রচেষ্টা অস্বীকৃত হবে না এবং আমি তা লিপিবদ্ধ করে রাখি।
আল্লাহ তা'আলা আখেরাতে পুরস্কার দেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। একজন খলীফা যখন উম্মতের স্বার্থে কষ্ট করেন এবং নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে যান তখন তিনি দ্বিগুণ পুরস্কারের হকদার হয়ে যান। প্রথমত আল্লাহ তা'আলা তাকে আখেরাতে পুরস্কার দেবেন, তার সাথে তিনি মানুষের জন্য কাজ করেন বলে দুনিয়াবী পুরস্কার হিসেবে তাকে আর্থিক বেতন-ভাতা লাভের সুযোগ করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি জনস্বার্থে কাজ করবেন তাকে মুফতি, কাজী কিংবা ওয়ালীগণও সাহায্য করবেন বলে শরীয়তে বলা হয়েছে। মানুষের জন্য কাজ করার বিনিময়ে উপযুক্ত সম্মানী পাওয়া শরীয়তমতে জায়েয। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে যারা মুসলিম কিংবা বা সমাজের জন্য কাজ করতেন তাদের জন্য বেতন ধার্য করে দিয়েছিলেন।
খেলাফতের শুরুর দিকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কোনো বেতন নেননি। নিজের ব্যবসার লভ্যাংশ থেকে সংসারের জন্য খরচ করতেন। রাষ্ট্রীয় কাজে তিনি ক্রমশ ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এতে করে ব্যবসায় সময় দিতে পারছিলেন না। স্বাভাবিকভাবে তার ব্যবসায় লোকসান হতে থাকে। এভাবে তিনি চরম অর্থকষ্টে পড়ে যান।
শেষ পর্যন্ত তিনি এ বিষয়ে সাহাবীদের পরামর্শ চাইলেন। তিনি বললেন, 'আমি খেলাফতের কাজে ব্যস্ত থাকি বলে আয়-রোজগার করতে পারছি না। এখন আমি কতটুকু কী পেতে পারি?'
উসমান ইবনে আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'নিজে খাবার গ্রহণ করুন এবং পরিবারকেও দিন।' সাঈদ ইবনে যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়েল রাযিয়াল্লাহুও তার সাথে একমত ছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবার আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে ফিরে বললেন, 'আপনার কী মন্তব্য?' আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'সকাল এবং রাতের খাবার।' তিনি এ কথা অনুসরণ করেছিলেন। বায়তুল মাল থেকে তিনি কী কী নেবার হকদার সে প্রসঙ্গে বলেছেন, 'বায়তুল মাল থেকে আমি ইয়াতীমের অভিভাবকের মতো ভাতা নেব। আমার প্রয়োজন না হলে কিছুই নেব না। আর প্রয়োজন হলে আইন মেনে তা গ্রহণ করব।'
আরেকটি বর্ণনায় আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহাবায়ে কেরামের সাথে দেখা করে বললেন, 'আল্লাহর মাল (মুসলিম রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বায়তুল মাল থেকে) কতটুকু নেওয়া আমার জন্য বৈধ বলে আপনারা মনে করেন?' তারা বললেন, 'আমীরুল মুমিনীন আমাদের চাইতে এ সম্পর্কে ভালো জানেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তোমরা চাইলে আমি বলতে পারি, আল্লাহর মাল থেকে আমার জন্য কতটুকু নিতে পারি। হজ বা উমরা করার জন্য একটা সওয়ারী, শীতবস্ত্র, গরমের পোশাক, পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর মতো খাবার, একজন সাধারণ মুসলমানের সমান ভাতা। কারণ, আমি একজন সাধারণ মুসলিম ছাড়া ভিন্ন কিছু নই।' মুআম্মার রাযিাল্লাহু আনহু বলেছেন, 'হজ এবং উমরা পালনের জন্য তিনি একটিমাত্র উট ব্যবহার করতেন।'
মুসলমানের মধ্যে মাল বণ্টনের ক্ষেত্রে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ন্যায়পরায়ণতার মূর্ত প্রতীক। মালিক ইবনে আওস ইবনুল হাদাসানের বরাত দিয়ে আবু দাউদ মন্তব্য করেছেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একদিন ফাঈ প্রসঙ্গে বয়ান করছিলেন। ফাঈ বিশেষ ধরনের যুদ্ধলব্ধ মাল বা গনীমত। যুদ্ধের আগেই শত্রু পরাজয় স্বীকার করে নিলে বা আত্মসমর্পণ করলে সেই মালামালকে ফাঈ বলা হয়। এ প্রসঙ্গে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলছিলেন, 'আমার তুলনায় তোমরা ফাঈর অধিক হকদার। এর ওপরে অন্যদের তুলনায় আমাদের মধ্যকার লোকের হক আগে। কারণ, গনীমতের মাল বণ্টনের জন্য কুরআনের উপরে ভিত্তি করে আমাদের পদমর্যাদা নির্ধারণ করা হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বয়স, দ্বীনের প্রতি একাগ্রতা, প্রতিপাল্যের সংখ্যা এবং প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে মালামাল ভাগ করে দিতেন।'
আর-রাবী ইবনে যায়েদ আল-হারিসি রাযিয়াল্লাহু আনহু উল্লেখ করেছেন, তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেদমতে হাজির হয়ে বলেছিলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, উত্তম খাদ্য, উত্তম বাহন এবং উত্তম পোশাক ব্যবহারের হক আপনার সবচেয়ে বেশি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার মাথায় খেজুরের শুকনো ডাল দিয়ে বাড়ি দিলেন। বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমার মনে হচ্ছে তুমি আল্লাহ তা'আলার জন্য এই কথা বলোনি। বরং আমার তোষামোদি করতে এ কথা বলেছ। আমি তোমাকে ভালো মনে করেছিলাম। অভিশাপ তোমাকে! তুমি কী জান, আমি আর এই মুসলিমরা কেমন?' আর-রাবী জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'মনে করো, কিছু লোক সফরে বের হয়েছে। তারা তাদের পথখরচ একজনের হাতে তুলে দিয়ে বলল, 'আমাদের জন্য খরচ করবে।' তখন ওই ব্যক্তি সেই সম্পদ নিজের জন্য রেখে দিলে কাজটি কি সঠিক হবে?' আর-রাবী বললেন, 'না, হে আমীরুল মুমিনীন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমার আর মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদাহরণ এমন।'
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ফকীহগণ খলীফাদের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত এই ফাতওয়া দিয়েছেন:
✓ খলীফাকে তার কাজের বিনিময়ে সম্মানী দিতে হবে। ইমাম নববী, ইবনুল আরাবী, আল বুহূতি এবং ইবনে মুফলি তা সমর্থন করেছেন।
আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা থাকাকালীন কাজের বিনিময়ে সম্মানী নিতেন।
মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য খলীফারা যে সময় ব্যয় করেন তার বিনিময়ে বেতন গ্রহণ করতে পারেন। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বেতন নিতেন।
ইবনে মুনীর মনে করেন একজন খলীফার চাহিদা থাকুক চাই না থাকুক—বেতন পাওয়ার হক তার আছে। খলীফার বেতন নেওয়া বরং ভালো। কারণ, বেতনের নিশ্চয়তা পেলে তারা নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন। এখানে আনুগত্যের কথা আসছে না। কাজের বিনিময়ে বেতন-ভাতা প্রদান করা হলে মানুষ সাধারণত আরও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। কারণ, তখন বেতনের হক আদায় করার ফিকির চলে আসে।
১.৮.২। মুসলিম বর্ষপঞ্জী
মুসলিম সভ্যতার পরিচয় ও বিকাশে ইসলামী বর্ষপঞ্জী একটি মাইলফলক। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সর্বপ্রথম হিজরী সনের প্রবর্তন করেন।
মাইমুন ইবনে মেহরান বলেছেন: একবার উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে কিছু ব্যবসায়িক কাগজপত্র আসে। সেগুলো শা'বান মাসের উল্লেখ ছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, কোন বর্ষপঞ্জীর শা'বান মাস উল্লেখ করা হয়েছে। তখন তিনি জানতে চাইলেন, 'গত বছরের শা'বান, না এই শা'বান, নাকি আগামী শা'বান?' তিনি সাহাবীদের বললেন, 'আপনারা সবার সুবিধার্থে একটি বর্ষপঞ্জী চালু করুন।' একজন বললেন রোমানদের বর্ষপঞ্জী অনুসরণ করতে। ততদিনে রোমান বর্ষপঞ্জীর ছয়শ বছর পার হয়ে গেছে। অর্থাৎ জুলকারনাইনের সময় থেকে এর গণনা শুরু হয়েছিল।
আরেকজন পারসিকদের বর্ষপঞ্জী অনুসরণের কথা বললেন। অন্যরা বলে উঠলেন, 'নতুন রাজা আসলেই তারা চলমান বর্ষপঞ্জী বাতিল করে আবার নতুনভাবে গণনা শুরু করে। আগেরটা বাতিল করে দেয়।' সবাই তখন মুসলিমদের একটি একক বর্ষপঞ্জীর প্রয়োজন বোধ করলেন। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় হিজরত করার কথা আলোচনায় আনেন। দেখা গেল ততদিনে দশ বছর পার হয়ে গেছে। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের ওপরে ভিত্তি করে হিজরী সনের প্রবর্তন করা হয়।
আরেকটি বর্ণনামতে, উসমান ইবনে উবায়দুল্লাহ সাঈদ ইবনে মুসায়্যিবকে বলতে শুনেছেন: উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু আনসার-মুহাজিরদের ডেকে জিজ্ঞেস করলেন কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বর্ষপঞ্জীর প্রবর্তন করলে ভালো হয়। আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রস্তাব করলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুশরিকদের দেশ ত্যাগ করার (মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের) দিন থেকে শুরু করা যেতে পারে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার প্রস্তাব শুনে হিজরী সনের প্রবর্তন করলেন।
সাঈদ ইবনে মুসায়্যিব বলেছেন, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম বর্ষপঞ্জীর প্রবর্তক। তিনি খলীফা হবার আড়াই বছরের মাথায় এর সূচনা করেছিলেন। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরামর্শক্রমে ১৬ই মুহাররম থেকে মুসলিম বর্ষপঞ্জীর যাত্রা শুরু হয়।'
আবু আয-যানাদ উল্লেখ করেছেন: মুসলিম বর্ষপঞ্জীর জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শ নিয়েছিলেন। সবার মতামত নিয়ে হিজরী সন প্রবর্তিত হয়েছে।
এ তো গেল হিজরী সন প্রবর্তনের ঘটনা। এবার, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রথম মাস হিসেবে মুহাররমকে কেন বেছে নিয়েছিলেন সেই প্রসঙ্গে আসা যাক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রবিউল আউয়াল মাসে মদীনায় পৌঁছেন। তা সত্ত্বেও মুহাররম বছরের প্রথম মাস কেন? উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট সাহাবায়ে কেরাম চারটি মাসের নাম প্রস্তাব করেছিলেন-নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম-তারিখ, তার ওপরে প্রথম ওহী নাযিলের মাস, তার হিজরতের মাস এবং ইন্তেকালের মাস।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম-তারিখ এবং প্রথম ওহী নাযিল হওয়ার সময় নিয়ে মতভেদ ছিল। আবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের বছর থেকে বর্ষপঞ্জীর সূচনা হোক তা কেউই চাননি। কারণ, তাতে মুসলিম উম্মাহ ব্যথাতুর হয়ে পড়বে। বাকি থাকলো হিজরতের ঘটনা। রবিউল আয়াল থেকে শুরু করে মুহাররম পর্যন্ত মাসগুলো সাজানো হলো। কারণ, মুহাররম মাসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। জিলহজ মাসে আল-আকাবার দ্বিতীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই ঘটনা হিজরতের প্রথম ধাপ ছিল। এই চুক্তির পরেই তিনি মদীনায় হিজরতের ব্যাপারে তিনি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন। তারপরে যে চান্দ্র-মাস শুরু হয়েছিল, তা ছিল মুহাররম। তাই মুহাররমকে সকলে হিজরী সনের প্রথম মাস হিসেবে যথাযথ মনে করলেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে একাত্মতা সৃষ্টি করেছিলেন। আরব ভূখণ্ডজুড়ে নিজস্ব মুসলিম বর্ষপঞ্জী থাকায় তারা নিজেদের জাতিগত ঐতিহ্য, গর্ব এবং ইতিহাস একত্রে সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। এতে করে শত্রু দমন ও বিজয় অর্জন করা সহজ হয়ে যায়।
১.৮.৩। আমীরুল মুমিনীন খেতাব
শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সকলে 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খলীফা' বলে ডাকতো। তার ইন্তেকালের পরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে কী নামে ডাকা হবে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। প্রথমে প্রস্তাব করা হলো, 'রাসূলুল্লাহর খলীফার খলীফা' ডাকা যেতে পারে। স্বাভাবিকভাবে এই উপাধি যুক্তিপূর্ণ ছিল না। কারণ, পরবর্তী খলীফাদের 'রাসূলুল্লাহর খলীফার খলীফার খলীফার খলীফা' এভাবে ডাকতে গেলে তা দীর্ঘ এবং একঘেয়ে শোনাবে।
অতঃপর কয়েকজন সাহাবা রাযিয়াল্লাহু আনহুম ভেবে-চিন্তে একটি সুন্দর সমাধান বের করলেন। তারা এমন এক উপাধির কথা ভাবলেন যা পরবর্তী সব খলীফার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে। তারা বললেন, 'আমরা মুমিন। আর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আমাদের আমীর (নেতা)।' ফলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে 'আমীরুল মুমিনীন' বলে সম্বোধন করা হলো।
ইবনে শিহাব উল্লেখ করেছেন, উমর ইবনে আব্দুল আযীয রাযিয়াল্লাহু আনহু সুলায়মান ইবনে আবি খাইসামাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উত্তরসূরি আবু বকর হতে-এমন কেন লিখতেন? উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুও লিখতেন, আবু বকরের উত্তরসূরি উমর হতে। দাপ্তরিক কাগজপত্র কে সর্বপ্রথম 'আমীরুল মুমিনীন' উপাধী লিখতে শুরু করেছিলেন?'
সুলায়মান বললেন, 'আমার দাদী/নানী আশশিফা বিনতে আব্দুল্লাহ আল-আদউইয়া রাযিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন প্রথম হিজরতকারীদের একজন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বাজারে গেলেই নিয়মিত তার সাথে দেখা করতেন এবং খোঁজখবর নিতেন। তিনি বলেছিলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব ইরাকের গভর্নরের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, 'আমার কাছে দুজন শক্তিশালী এবং সৎ লোক পাঠাবে। তাদের কাছ থেকে আমি ইরাক এবং এর জনগণের তথ্য নেব।'
গভর্নর তখন লাবীদ ইবনে রাবীয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আদীই ইবনে হাতিম রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পাঠান। তারা মদীনায় পৌঁছে তাদের উটগুলো মসজিদপ্রাঙ্গনে নতজানু করে বসালেন। অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করলেন। তারা আ'মর ইবনুল আ'স রাযিয়াল্লাহুকে দেখতে পেয়ে বললেন, 'আমর, আমীরুল মুমিনীনের কাছ থেকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে আসুন।' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ভিতরে গিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, 'আসসালামু আলাইকুম, হে আমীরুল মুমিনীন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে চাইলেন, 'কী ব্যাপার হে ইবনে আমর। আমাকে এই নামে ডাকছো কেন? এই শব্দগুলো এলো কোত্থেকে?' তিনি বললেন, 'জি (বলছি), লাবীদ ইবনে রাবীয়া এবং আদীই ইবনে হাতিম এসেছেন। তারা বললেন, আমীরুল মুমিনীনের কাছ থেকে আমাদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে আসুন। তাদের কথা শুনে আমি বলেছি, আল্লাহর কসম, আপনারা তাকে উপযুক্ত নামে ডেকেছেন। নিশ্চয়ই তিনি আমীর আর আমরা মুমিন।' সেদিন থেকে দাপ্তরিক চিঠিপত্রে আমীরুল মুমিনীন উপাধি ব্যবহারের সূচনা ঘটে।
অন্য একটি বর্ণনা এমন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জনসমাবেশে বলেছিলেন, 'তোমরা হলে মুমিন আর আমি তোমাদের আমীর।' তিনি নিজেই এই উপাধির প্রবর্তন করেন। ঘটনা যাই হোক না কেন, খলীফাদের মধ্যে সর্বপ্রথম উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আমীরুল মুমিনীন উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। সাহাবায়ে কেরাম তার এই উপাধি নিয়ে একমত ছিলেন। দূরবর্তী ভূখণ্ডের মুসলিমরাও তাকে এই নামে ডাকতে শুরু করে।

টিকাঃ
৫৪১. আস-সুলতাহ আত-তানফীদিয়া, ১/২১৫।
৫৪২. সূরা আম্বিয়া, ২১: ৯৪।
৫৪৩. আল-মাবসূত, ১৫/১৪৭, ১৬৬; আল-মুঘনি, ৫/৪৪৫।
৫৪৪. আস-সুলতাহ আত-তানফীদিয়া, ১/২১৫।
৫৪৫. প্রাগুক্ত, ১/২১৬।
৫৪৬. সাঈদ ইবনে যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়েল রা. ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদ লাভকারী দশজন সাহাবীর অন্যতম।
৫৪৭. কানয আল-উম্মাল (৪৪২১৪) এবং আদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়্যাহ, ড. হামদী শাহীন (পৃ. ১২০)।
৫৪৮. মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, নং, ২০০৪৬।
৫৪৯. সুনান, আবু দাউদ, ২৯৫০।
৫৫০. মাহদুস সাওয়াব (১/৩৮৩) এবং আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৩/২৮০, ২৮১।
৫৫১. রওদাতুত-তালিবীন, ১১/ ১৩৭।
৫৫২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১২/২২৮, ২২৯।
৫৫৩. আল-আ'লাম, আয-যারকালী, ৮/২৪৯।
৫৫৪. আস-সুলতাহ আত-তানফীদিয়‍্যাহ, ১/২১৮।
৫৫৫. প্রাগুক্ত, ১/২১৯।
৫৫৬. শরহে মুসলিম, আন-নববী, ৭/১৩৭।
৫৫৭. মাহদুস সাওয়াব, ১/৩১৬; ইবনে জাউযি, পৃ. ৬৯। তিনি ইবনে আবি রাফাই'।
৫৫৮. তিনি ইবনে আবি রাফি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দাসত্ব থেকে আযাদ করেছিলেন। তিনি তার পিতার বরাত দিয়ে হাদীসটি বর্ণনা করেছিলেন।
৫৫৯. তারীখ আল-ইসলাম, আয-যাহাবী, পৃ. ১৬৪। তার পুরো নাম আব্দুল্লাহ ইবনে যাকওয়ান আল-কুরেশী। তিনি একজন বিজ্ঞ এবং নির্ভযোগ্য ফকীহ। আত-তাকরীব, পৃ. ৩০২।
৫৬০. পুরো নাম আব্দুল্লাহ ইবনে যাকওয়ান আল-কুরেশী। তিনি একজন বিজ্ঞ এবং নির্ভযোগ্য ফকীহ। আত-তাকরীব, পৃ. ৩০২।
৫৬১. মাহদুস সাওয়াব, ১/৩১৮।
৫৬২. ফাতহুল বারী, ৭/২৬৮; আল খিলাফাহ আর-রাশিদাহ, ইয়াহিয়া আল-ইয়াহিয়া, পৃ. ২৬৮।
৫৬৩. জাউলা তারীখিয়া ফি আ'সরিল-খুলাফা আর-রাশিদীন, ড. মুহাম্মাদ আস-সায়্যিদ আল-ওয়াকীল, পৃ. ৯০।
৫৬৪. আত-তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সা'দ, ৩/ ২৮১।
৫৬৫. তিনি আল-আদাউই আল-মাদানী। তিনি একজন নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিস। আত-তাকরীব, পৃ. ৬০৭।
৫৬৬. আশশিফা বিনতে আব্দুল্লাহ আল-আদাউইয়া হিজরতের আগেই মুসলিম হয়েছিলেন।
৫৬৭. মাহদুস সাওয়াব, ১/৩১২।
৫৬৮. আল-মুস্তাদরাক, ৩/৮১, ৮২।
৫৬৯. মাহদুস সাওয়াব, ১/৩১২।
৫৭০. প্রাগুক্ত, ১/৩১৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00