📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 শূরা

📄 শূরা


ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো-এর শাসক এবং নেতাগণ সাধারণ মুসলিমদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। জনগণের কাছে ইতিহাচক মনে হয় এমন সিদ্ধান্তই তারা গ্রহণ করেন। এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে শূরানীতির প্রয়োগ অব্যাহত থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَ اسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন পক্ষান্তরে আপিন যদি রাগ ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করুন এবং কাজে-কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা করুন, আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।
۞ وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَهُمْ يُنْفِقُونَ ۞
'যারা তাদের পালনকর্তার আদেশ মান্য করে, নামায কায়েম করে; পারস্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।
এখানে 'নামায কায়েম' করার পাশাপাশি, মুসলিমদের সাথে 'পারস্পরিক আলোচনা' বা 'শূরা' প্রতিষ্ঠার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। সুতরাং শরীয়তে নামায এবং পারস্পরিক আলোচনা দুটোই ফরয।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার রাষ্ট্রে শূরা-পদ্ধতির অনুসরণ করতেন। তিনি একা কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সাধারণ মুসলিমদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেন। সমস্যা দেখা দিলে তিনি মুসলিমদের সাথে বসে আলোচনা করতেন। তাদের মতামত ও পরামর্শ নিতেন। তারপরে তিনি সিদ্ধান্ত নিতেন।
বেশ কিছু বর্ণনায় আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের-মনে-চলা নেতৃত্বের তুলনায় পারস্পরিক আলোচনায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য ছিলেন। উল্লেখ্য, তিনি বলেছিলেন, 'পারস্পরিক আলোচনা ছাড়া কোনো ভালো সিদ্ধান্ত আসে না।' আরেকটি বর্ণনায়, তিনি বলেছেন, 'একক পরামর্শ হলো একটি বিচ্ছিন্ন সুতার মতো। দুজনের নেওয়া পরামর্শ যেন গিঁট দেওয়া দুটো সুতা। আর তিনজনের পরামর্শ হলো মজবুত গিঁটওয়ালা সুতার মতো, যা সহজে খোলা যায় না।'
তিনি বলেছেন, 'আল্লাহ তা'আলাকে ভয় পায়-এমন লোকের পরামর্শ নেবে তোমরা।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'মানুষ তিন ধরনের হয়। এক ধরনের মানুষ নিজেই তার সমস্যার সমাধান করে। আরেক ধরনের মানুষ দ্বিধায় পড়লে অন্যের সাথে আলোচনা করে এবং বিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে ভালো পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। আর কিছু মানুষ দ্বিধায় পড়ে, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েও না বিজ্ঞজনের মতামত নেয়, আর না নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।'
তিনি আরও বলতেন, 'মুসলিমদের উচিত—জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে বসে শূরার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করা। আর সাধারণ মানুষ তাদের অনুসরণ করবে। তারা যতদিন এক হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে থাকবে, ততদিনই লোকজন তাদের অনুসরণ করবে। তারা যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, তাতে সাধারণ মুসলিমদের স্বার্থ সবার আগে রক্ষা করতে হবে; যুদ্ধের জন্য যে সিদ্ধান্ত নেবে, তাতেও জনগণ তাদের কথা মেনে চলবে।'
বিশাল ভূখণ্ডের আমীর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আলেমদের পরামর্শ নিতে সেনাপতিদেরও উৎসাহিত করতেন। তিনি আবু উবায়েদ আস-সাকাফী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পারসিকদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য ইরাকে পাঠিয়েছিলেন। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে উপদেশ দিলেন, 'সাহাবায়ে কেরামের কথা শুনবে এবং তাদের মানবে। তাদের মন্তব্য করার সুযোগ দিয়ো, বিশেষ করে যারা বদরে অংশগ্রহণ করেছিলেন।'
ইরাকে নিয়োজিত সেনাপতিদের কাছে লেখা চিঠিতে আমর ইবনে মাদিকারব এবং তালহা আল-আসাদী রাযিয়াল্লাহু আনহুমের পরামর্শ নেবার কথা উল্লেখ করেছিলেন। তাতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লিখেছিলেন, 'যুদ্ধের সময় আমর ইবনে মাদিকারব এবং তালহা আল-আসাদীর পরামর্শ নিও। তবে তাতের হাতে কোনো দায়িত্ব ছেড়ে দিও না। কারণ, প্রত্যেক দক্ষ লোক তার নিজের কাজে অভিজ্ঞ।'
তিনি সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে বলেছেন, 'আরবদের মধ্যে যাদের বিশ্বস্ত মনে কর তাদের কয়েকজনকে কাছে কাছে রেখো। কারণ, মিথ্যাবাদীরা মাঝে মাঝে সত্য বললেও, তাদের কাছে ভালো কিছু আশা করা বৃথা। মুনাফিকরা তোমার জন্য নয়, বরং তোমার বিরুদ্ধে কাজ করবে।'
উতবা ইবনে গাযওয়ানকে বসরা অভিমুখে পাঠানোর সময় উরওয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আমি আল-আলা আল-হাযরামীকে বলেছি, সে যেন তোমার কাছে আরফাজা ইবনে হারসামাকে পাঠায়। আরফাজা সমরকৌশল এবং পরিকল্পনা, দুটোতেই দক্ষ। তার পরামর্শ নিয়ো, তাকে কাছাকাছি রেখো।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শূরা-পদ্ধতি খুব সুন্দর ছিল। তিনি প্রথমে সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠী থেকে অন্তত একজন প্রতিনিধিকে ডাকতেন। সমস্যার সমাধানে প্রত্যেকের মতামত নেওয়া হতো। অতঃপর বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ প্রধান সাহাবীদের একত্র করতেন। আগের মতামতের উপর ভিত্তি করে তাদের সাথে আলোচনা হতো। সমাধানপদ্ধতি নিয়ে সবাই একমত হলে তবেই তিনি তা গ্রহণ করতেন। এ যেন এই যুগের সাংবিধানিক পদ্ধতি। এখন যেমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হলে আগে জন প্রিতিনিধিরা মিটিংয়ে বসেন। অতঃপর সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামত সিনেটর, হাউজ অব লর্ডস প্রমুখের সামনে উপস্থাপন করা হয়। তারা কোনো বিষয়ে একমত হওয়ার পরে রাজা বা সম্রাট তা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেন। আজকের পদ্ধতি আর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য হলো তিনি ইসলামী শরীয়তের ওপরে ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতেন; কারণ, তখন অনেক আইনের প্রবর্তন ঘটেনি।
প্রায়ই দেখা যেত যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কোনো একটি সমস্যা নিয়ে আগে নিজে পর্যালোচনা করতেন, ভাবতেন এবং নিজের মতামত জানাতেন। তার মতামত নিয়ে সাধারণ লোকজন জোরাল প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সুযোগ পেত। প্রমাণ এবং তর্কে দৃঢ়তা থাকলে তিনি তার কথা মেনে নিতেন। সাথে নিজের ভুলও স্বীকার করতেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে শূরার প্রচলন ছিল চোখে পড়ার মতো। পূর্ববর্তীদের তুলনায় তাকে অনেক নতুন সমস্যায় পড়তে হয়েছিল, ফলে তিনি এই পদ্ধতির ওপরে নির্ভরশীল ছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে খুব দ্রুত মুসলিম ভূখণ্ডের প্রসার ঘটতে থাকে। ফলে নানা জাতি, ঐতিহ্য এবং প্রথার লোকজন অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। তাদের ভাষা যেমন আলাদা ছিল, তেমন রীতি-রেওয়াজেও ছিল ভিন্নতা। নতুন নীতির আওতায় কেমন ভাতা দেওয়া হবে, গণিতমত সংগ্রহ এবং বণ্টন করা হবে কীভাবে—এমন সব নতুন নতুন সমস্যা সমাধানের জন্য বার বার ইজতেহাদের প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন তিনি বুযুর্গ সাহাবায়ে কেরাম এবং বদরী সাহাবীদের সাথে বসে শূরার মাধ্যমে সমাধান করতেন। গুণাবলী, জ্ঞান এবং মর্যাদার কারণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বদরী সাহাবীদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন।
তিনি এক সময় তরুণ সাহাবীদেরও তার আলোচনায় থাকার সুযোগ দিতে শুরু করেন। তিনি জানতেন যে, বুযুর্গেরা একে একে এই দুনিয়া ছেড়ে পরকালের স্থায়ী আবাসে পাড়ি জমাবেন। ফলে নবীনদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করতে হবে। নবীনদের মধ্যে যারা ধর্মভীরু এবং জ্ঞানী সাহাবীদের পরামর্শ নিতে শুরু করেছিলেন। তাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অন্যতম। যারা কুরআনভিত্তিক জ্ঞানের ওপরে ভিত্তি করে তিনি তরুণদের গুরুত্ব নির্ধারণ করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, কুরআন সম্পর্কে যাদের ভালো জ্ঞান ছিল কেবল তারাই উমরের কাউন্সিল-সদস্য এবং উপদেষ্টা হতে পারত। সেখানে বয়স কোনো ব্যাপার ছিল না।
ইমাম আয-যুহরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি একবার কয়েকজন ছেলেকে ডেকে বললেন, 'বয়স কম বলে নিজেদের তুচ্ছ মনে করো না। কারণ, উমর ইবনুল খাত্তাব কঠিন সমস্যায় পড়লে তরুণদের পরামর্শ নেন। তারা চটপটে ও প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন হয় বলে তাদের ওপরে ভরসা করেন।'
মুহাম্মাদ ইবনে সিরীন রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ভালো পরামর্শের খোঁজ করতেন। এমনকি তিনি নারীদের পরামর্শও গ্রহণ করতেন। তাদের পরামর্শ লাভজনক মনে করলে তিনি অবশ্যই তা গ্রহণ করতেন। নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে বর্ণিত, তিনি উম্মুল মুমিনীন হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহার পরামর্শ নিয়েছিলেন।'
উলামায়ে কেরাম এবং সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কয়েকজন তার বিশেষ উপদেষ্টা ছিলেন। তাদের মধ্যে আল-আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব এবং তার পুত্র আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুম, তাকে তিনি সব সময় নিজের সাথে রাখতেন, মদীনা তো বটেই, সফরেও প্রায়ই সাথে নিতেন; উসমান ইবনে আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহু; আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু; আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু; মু'আয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু; উবাই ইবনে কাব রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং যায়েদ ইবনে সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অন্যতম। এমন আরও অনেকের পরামর্শ নিতেন। খলীফার উপদেষ্টারা খোলাখুলিভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করতেন। এ জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কখনো তাদের আখলাক কিংবা সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন না।
কুরআন বা হাদীসে কোনো বিষয়ে স্পষ্ট সমাধান না পেলে তিনি পরামর্শ নিতেন। কারণ, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের হাদীসটি তিনি না জানলেও অন্য কোনো কোনো সাহাবীর জানা থাকতে পারে।
কুরআনে কোনো আয়াতের যদি একাধিক অর্থ থাকত সেক্ষেত্রেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহাবায়ে কেরামের মতামত নিতেন। এজন্য প্রয়োজন বুঝে এক বা একাধিক সাহাবীর সাথে আলোচনা করা হতো।
সমস্যায় পড়লে সাহাবায়ে কেরামদের মধ্যে যতজনে পরামর্শ নেওয়া সম্ভব হতো তিনি নিতেন। প্লেগে আক্রান্ত সিরিয়ায় যাওয়ার সময়ও তিনি এই পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন। সিরিয়ার নিকটবর্তী সারাগে তার যাত্রাবিরতি ছিল। গভর্নরেরা তার সাথে দেখা করতে এলে তিনি প্লেগের খবর পান। আনসার-মুহাজিরগণ সফরে তার সাথেই ছিলেন। তিনি তাদের কাছে জানতে চাইলেন, এমন অবস্থায় কী করা উচিত। তারা পরস্পরবিরোধী মতামত দিচ্ছিলেন। একদল বললেন, 'আপনি আল্লাহ তা'আলার কাজে বের হয়েছেন। প্লেগের খবর আপনার কাজ যেন বাধাগ্রস্ত না করে।' আরেক দল বললেন, 'এমন কঠিন পরীক্ষায় এগিয়ে যাওয়া মানে নিশ্চিত মৃত্যু। আমাদের মতে, আপনার যাওয়া উচিত নয়।'
অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কয়েকজন কুরাইশ মুহাজিরদের পরামর্শ নিলেন। তারা সবাই ফেরার পক্ষে ছিলেন। সবার মতামত শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘোষণা করলেন, 'আমরা সকালে ফিরে যাচ্ছি।' আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু অবাক হয়ে বললেন, 'আপনি কি আল্লাহর ফয়সালা থেকে পালাচ্ছেন?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর এক ফয়সালা থেকে পালিয়ে আরেক ফয়সালার দিকে যাচ্ছি। মনে করো, কোনো উপত্যকায় তোমাদের উট চরাতে গেছ। এর একদিকে সবুজ ঘাস আর আরেক দিক বিরানভূমি। এখন উট যদি সবুজ ঘাস খায় তা যেমন আল্লাহর হুকুম, আবার সেগুলো অনুর্বর জমির দিকে যায় তা-ও কি আল্লাহর হুকুম নয়?'
আব্দুর রহমান আল আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের আলোচনা শুনে এগিয়ে এলেন। বললেন, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা যখন শুনতে পাবে কোনো এলাকায় মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে তখন তোমরা সেখানে যেয়ো না। আর যখন কোনো এলাকায় মহামারী ছড়িয়ে পড়ে আর তোমরা সেখানে উপস্থিত থাক, তবে সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করো না।'
অনেক ধরনের বিষয় শূরার অন্তর্ভুক্ত ছিল। রাজনৈতিক; প্রশাসনিক সমস্যা, যেমন— প্রতিনিধি এবং গভর্নরদের নিয়োগ; সমরনীতি; শরীয়তের বিষয়, যেমন— কোনোটা হালাল, কোনোটা হারাম; বিচারিক বিষয়াদি, যেমন— রায় ঘোষণা ইত্যাদি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শূরার প্রয়োগ হতো সেগুলো নিয়ে পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর পক্ষে দলিলও পাওয়া যাবে, ইনশাআল্লাহ। খুলাফায়ে রাশেদীন কুরআন আর সুন্নাহর আলোকে শূরা প্রয়োগ করতেন।
মুসলিম রাষ্ট্রের খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খেয়ালখুশিমতো রাষ্ট্র পরিচালনা করেননি। ইসলামের অকাট্যনীতির ভিত্তিতে তিনি কাজ করে গেছেন।

টিকাঃ
৪১৩. সূরা আল-ইমরান, ৩: ১৫৯।
৪১৪. সূরা আশ-শূরা, ৪২: ৩৮।
৪১৫. নিদহাম আস-সিয়াসী ফিল-ইসলাম, আবু ফারিস, পৃ. ৯।
৪১৬. আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, আন-নাজ্জার, পৃ. ২৪৬।
৪১৭. সিরাজ আল-মামলুক, আত-তারতুশী, পৃ. ১৩২।
৪১৮. আল-ইদারাহ আল-আসকারিয়‍্যাহ ফিদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়্যাহ, সুলাইমান আল-কামাল, ১/২৭৩।
৪১৯. প্রাগুক্ত।
৪২০. আত-তাবারি, ৩/৪৮১।
৪২১. মুরূজ আয-যাহাব, ২/৩১৫।
৪২২. মুরূজ আয-যাহাব, ২/৩১৫।
৪২৩. নিহায়াত আল-আরাব, ৬/১৬৯।
৪২৪. আল-ইদারা আল-আসকারিয়া ফিদ-দাওলা আল-ইসলামিয়া, সুলাইমান আল-কামাল, ১/২৭৪।
৪২৫. আল-ইসাবা, ২/৪৯১।
৪২৬. আল-ইদারা আল-আসকারিয়া ফিদ-দাওলা আল-ইসলামিয়া, সুলাইমান আল-কামাল, ১/২৭৫।
৪২৭. আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, আন-নাজ্জার, পৃ. ২৪৭।
৪২৮. প্রাগুক্ত।
৪২৯. আ'সর আল-খিলাফা আর-রাশিদীন, পৃ. ৯০।
৪৩০. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৭।
৪৩১. আ'সর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ৯০।
৪৩২. প্রাগুক্ত।
৪৩৩. আস-সুনান আল-কুবরা, আল-বাইহাকী, ৯/২৯; আ'সর আল-খুলাফা আর-রাশিদূন, পৃ. ৯০ থেকে উদ্ধৃত।
৪৩৪. আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, আন-নাজ্জার, পৃ. ২৪৭।
৪৩৫. আ'সর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ৯০।
৪৩৬. আ'সর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ৯১।
৪০৭. সহীহ, মুসলিম, ৪/১৭৪০, হাদীস নং ২২১৯।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 ন্যায়পরায়ণতা এবং সমতা বিধান

📄 ন্যায়পরায়ণতা এবং সমতা বিধান


মুসলিম সমাজে ইসলামী নীতি প্রতিষ্ঠা করাটাও ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। তার মধ্যে ন্যায়বিচার এবং সমতাবিধান অন্যতম। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার স্বাগতিক ভাষণে এই মূল্যবোধগুলো আঁকড়ে থাকার প্রত্যয় ঘোষণা করেছিলেন। তিনি উপলদ্ধি করেছিলেন যে মুসলিম সমাজ এবং নীতির মূলভিত্তি হচ্ছে ইসলামী ন্যায়বিচার। ইনসাফ ভুলে গিয়ে অরাজকতা চালাতে থাকলে ইসলামের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।
একজন স্বেচ্ছাচারী শাসক কখনো ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জনগণের মধ্যে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। অন্যদিকে জনগণের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হলো ইসলামের দৃষ্টিতে পবিত্রতম ফরয কাজ। উম্মতমাত্রই স্বীকার করবে যে, সমাজে প্রত্যেক মানুষের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ফরয। ইমাম আল-ফাখর আল-রাযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, উলামায়ে কেরামের মতে, রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা একজন খলীফার জন্য ওয়াজিব।
ইমাম আল-ফাখর আর-রাযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, 'শাসককে (বিচারককে) ন্যায়বিচারক হতে হবে এই ব্যাপারে সকলেই (উলামায়ে কেরাম) একমত।'
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এই বক্তব্যের স্বপক্ষে দলিল উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মুসলিম রাষ্ট্রের লক্ষ্য থাকে অত্যাচার, অপরাধ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। একজন ভুক্তভোগী যেন শ্রম এবং অর্থ অপচয় ছাড়াই সহজে এবং দ্রুত ন্যায়বিচার পায় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ইসলামী রাষ্ট্রের ওপরে বর্তায়। অধিকার আদায়ের পথে যত বাধা আসে রাষ্ট্র যেন তা দূর করতে সক্ষম হয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর রাষ্ট্র তেমনই ছিল। মানুষের হক আদায়ের জন্য সম্ভাব্য সব দুয়ার তিনি উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তিনি নিজে মানুষের অবস্থা তদারক করতেন, সব রকম যুলুম থেকে তাদের রক্ষা করতেন। তিনি সফলভাবে গর্ভনর এবং জনগণের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কে আপনজন, কে শত্রু, কে ধনী আর কে গরীব তিনি কখনো এসবের পরোয়া করেননি। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনো ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার করো— এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে খুবই জ্ঞাত।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদাহরণ যে কারও মন ও মননে জায়গা করে নেবে। মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া এবং ঈমানের দিকে তাদের হৃদয় উন্মুক্ত করাকে তিনি ন্যায়বিচার বলে মনে করতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদ্ধতিই তার পদ্ধতি ছিল। সবার প্রতি ন্যায়বিচারের সাথে সুতরাং সমাজের প্রত্যেক মানুষ উন্নতি করছিল। দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানোর বেলায় তিনি ছিলেন অনবদ্য। ফলে ন্যায়বিচার এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাম একাকার হয়ে আছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবন সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা আছে এমন ব্যক্তিও ন্যায়বিচারক বলতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাম উচ্চারণ করবে। তার এই সাফল্যের পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর কয়েকটি হলো :
আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর তুলনায় তার খেলাফত ছিল দীর্ঘ। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দশ বছর ধরে খলীফার পদে ছিলেন। যেখানে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু দুই বছরের কিছু বেশি শাসনের সুযোগ পান।
তিনি দৃঢ়তার সাথে সত্য আঁকড়ে ছিলেন। বাইরের লোকদের তুলনায় নিজের সাথে এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে অনেক ছিলেন সবচেয়ে বেশি কঠোর।
আল্লাহ তা'আলার সাথে সাক্ষাতের চিন্তায় তিনি মগ্ন থাকতেন। যে কারণে তিনি মানুষের খুশির আগে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি খুঁজেছেন এবং একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পাননি।
সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়ীনগণ শরীয়তের খুব পাবন্দী করতেন। ফলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের পূর্ণ সমর্থন এবং সহযোগিতা পেয়েছেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু স্বয়ং ন্যায়বিচার এবং নিরপেক্ষতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
এখানে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতার কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো :
ক। একবার তিনি একজন মুসলমানের বিপরীতে একজন ইহুদির পক্ষে রায় দেন। বিধর্মী বলে ইহুদি ব্যক্তির প্রতি তিনি কোনো রকম অবিচার করেননি। ইমাম মালিক রহ. সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘একজন মুসলিম এবং একজন ইহুদি অভিযোগ নিয়ে আসার পরে উমর ইবনে খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে ইহুদি ব্যক্তিকে সঠিক বলে মনে হলো। তাই তিনি তার পক্ষেই রায় দেন। অতঃপর ইহুদি ব্যক্তি বলল, ‘আল্লাহর শপথ, আপনি সঠিক বিচার করেছেন।’
খ। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিভিন্ন সময়ে প্রতিনিধিদের এসে তার সাথে দেখা করতে বলতেন। এমন এক সময়ের কথা। প্রতিনিধিদের একত্র করে বললেন, ‘হে লোকসকল, তোমাদের আঘাত দেবার জন্য কিংবা সম্পদ ছিনিয়ে নিতে আমি প্রতিনিধিদের নিয়োগ দিইনি। বরং যে কোনো ধরনের যুলুম থেকে তোমাদের নিরাপদ রাখতে এবং গনিমতের মাল সঠিকভাবে বণ্টন করে দিতে তাদের পাঠানো হয়েছে। যদি কারও সাথে কোনো অন্যায় আচরণ হয়ে থাকে তাকে দাঁড় করাও।’ এক ব্যক্তি দাঁড়াল। বলল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আপনার গভর্নর আমাকে একশ বেত্রাঘাত করেছেন।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অভিযুক্ত গভর্নরের দিকে ফিরে বললেন, ‘তুমি কেন তাকে বেত্রাঘাত করেছ? এখনই এর সুরাহা করে ফেল।’ তখন আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি এমন সুযোগ দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। মানুষ আপনার এই নযীর অনুসরণ করতে থাকবে।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে মানুষকে তার সমাধান করার সুযোগ দিতেন, সেখানে আমারও কি তা-ই করা উচিত নয়?’ আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘তাহলে অন্তত এই লোকটির সাথে আমাদের চুক্তিতে আসার সুযোগ দিন।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘ঠিক আছে, সমাধান করো।’ প্রতি বেত্রাঘাতের বিনিময়ে দুই দিনার করে দেওয়া হলো। সুতরাং দুশো দিনারে তাদের মামলা মিটে যায়। সেদিন তাদের প্রস্তাবে যদি ওই ব্যক্তি রাজী না হতো তবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ঠিকই একশো বেত্রাঘাতের মাধ্যমে বদলা নেবার হুকুম দিতেন।
গ। এক মিসরীয় ব্যক্তি আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আসে। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখনো মিসরের গভর্নর। অভিযোগকারী উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, যুলুমের শিকার হয়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছি।' তিনি বললেন, 'তোমাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হবে।' লোকটি বলল, 'আমি আমর ইবনে আসের ছেলেকে দৌড়ে হারিয়েছি। হেরে গিয়ে সে আমাকে মারতে শুরু করে। তখন বলছিল—আমি সম্ভ্রান্ত লোকের সন্তান।' অভিযোগ শোনার পরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখনই ছেলেকে নিয়ে আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মদীনায় আসার জন্য চিঠি পাঠালেন।
আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু হাজির হলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'সেই মিসরীয় কোথায়?' বেত তুলে নাও, তাকে আঘাত কর।' লোকটি যখন আঘাত করছিল তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতে লাগলেন, 'সম্ভ্রান্ত লোকের সন্তানকে আঘাত কর।' আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু পরে বলেছিলেন, 'আমরের ছেলেকে যখন আঘাত করছিল, আল্লাহর কসম, তাতে আমরা সন্তুষ্ট ছিলাম (কারণ, সে তার অপরাধের যোগ্য শাস্তি পেয়েছে)। লোকটা তার মন শান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে আঘাত করতেই থাকে।'
উপরন্তু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকটিকে নির্দেশ দিলেন, 'এবার আমরের টেকো মাথায় মারো।' লোকটি বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমাকে তার ছেলে মেরেছে। তার বদলা নিয়ে আমি সন্তুষ্ট।' এবার উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে ফিরে বললেন, 'জন্মসূত্রে স্বাধীন মানুষদের তুমি কবে থেকে দাস ভাবতে শুরু করেছ?' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমি এই ঘটনার কিছুই জানি না। লোকটি আমার কাছে কোনো অভিযোগ নিয়ে আসেনি।'
খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মুসলিম-রাষ্ট্র পুরোপুরি ন্যায়বিচারের ওপরে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইবনে তাইমিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহি কত সুন্দর করেই না বলেছেন, 'নিশ্চয়ই, আল্লাহ তা'আলা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকারী জাতিকে সাহায্য করেন যদিও তা বিধর্মী হয়। আর আল্লাহ যুলুমকারী কোনো জাতিকে সাহায্য করেন না যদি তা মুসলিমরাষ্ট্র হয়.. আর জনগণ মুসলিম হলেও তিনি অন্যায়কারী, অত্যাচারী দেশকে হেফাযত করেন না। ন্যায়বিচারের মাধ্যমে মানুষ মহৎ হয় এবং সম্পদের প্রবৃদ্ধি ঘটে।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সমতা-বিধানের বেলায় খুব যত্নশীল ছিলেন। সম- অধিকার ইসলামে কতটা গুরুত্বপূর্ণ নিচের এই আয়াত তার প্রমাণ, يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْتُكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَ انْثَى وَجَعَلْنَكُمْ شُعُوبًا وَقَبَابِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَنقُكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাদিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।
ইসলামে শাসক-শাসিত, নারী-পুরুষ, আরব-অনারব, সাদা-কালোয় কোনো ভেদাভেদ নেই। ইসলামে জাতি, বর্ণ, সামাজিক মর্যাদা আলাদা গুরুত্ব পায় না। শরীয়তের দৃষ্টিতে শাসক-শাসিত সবাই সমান। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তার সমতা বিধানের কয়েকটি উদাহরণ:
ক। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে মদীনা একবার ভয়াবহ খরার কবলে পড়ল। চারপাশ এমন শুষ্ক হয়ে উঠল যে ধুলো ছাইয়ের মতো বাতাসে উড়ত। বছরটি আম আর-রামাদা, ‘ভস্মের বা ছাইয়ের বছর’, নামে পরিচিত। এমন অবস্থায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শপথ করলেন যে, মানুষের অবস্থার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিনি ঘি, দুধ বা দই মুখে তুলবেন না। মদীনার বাজারে খাবার আসতে শুরু করলে তার খাদেম চল্লিশ দিরহাম দিয়ে সেসব কিনে আনে। তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সামনে খাবারগুলো পরিবেশন করে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহ আপনার ওয়াদা পূর্ণ করেছেন এবং আপনাকে উত্তম বদলা দিয়েছেন। বাজারে ঘি-দুধের আমদানী হয়েছে। তাই আপনার জন্য চল্লিশ দিনার দিয়ে সেগুলোর কিছু কিনে এনেছি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি এগুলোর পেছনে বেশি খরচ করে ফেলেছ। যা এনেছ, পুরোটা দান করে দাও। আমি খাবার নিয়ে বিলাসিতা পছন্দ করি না। মানুষের কষ্ট নিজে ভোগ না করলে তা অনুভব করব কীভাবে?'
■খ। খরার বছর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনযাপন এমন ছিল। একইভাবে 'মূল্যস্ফীতির বছরেও' তিনি নিজেকে সব রকম সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে রাখেন। ঘির দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি জয়তুন-তেল খেতে শুরু করেন। তার পেটে আওয়াজ হতো। তিনি তখন পেটের দিকে তাকিয়ে বলতেন, 'যতই আওয়াজ করো, আল্লাহর কসম, দেশের লোকেরা ঘী না খাওয়া পর্যন্ত তুমি এর স্বাদ পাবে না।'
■গ। খলীফারা সে যুগে সব জনগণের মধ্যে সমতা-বিধান করেই ক্ষান্ত ছিলেন না। মনিব-খadেমের মতো সামাজিক সম্পর্কগুলোতেও তারা সমতাবিধানে সচেষ্ট ছিলেন। ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন একটি ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি বলেছেন : উমর ইবনুল খাত্তাব হজ পালন করতে গেলে তার জন্য সাফওয়ান ইবনে উমাইয়্যা খাবার প্রস্তুত করেন। চারজন খাদেম তার সামনে বিশাল থালাভর্তি খাবার নিয়ে হাজির হলো মেহমানের সামনে খাবার রেখে তারা দাঁড়িয়ে রইল। উমর বললেন, 'তুমি কি চাও না তারা খাওয়ায় শরীক হোক?' তখন সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ বললেন, 'না, হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর কসম। এগুলো আমরাই খাব।' এ কথা শুনে উমর ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। তিনি বললেন, 'খাদেমদের ওপরে নিজেদের গুরুত্ব দেওয়ার তারা কে? আল্লাহ তাদের শাস্তি দিন!' এবার খাদেমদের দিকে ফিরে বললেন, 'বসে খাও।' খাদেমরা খেতে লাগল কিন্তু উমর খাবার মুখে তোলেননি।
■ ঘ। সাধারণ মুসলিমরা যা খেতে পারত না, এমন খাবারও তিনি গ্রহণ করেননি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দিনের পর দিন রোজা রাখতেন। দুর্ভিক্ষের সময় তেলে ভেজানো রুটি খেতেন। তখন একবার একটি উট যবেহ করা হয়েছিল। সবার মাঝে গোশত বিলি করে এর উৎকৃষ্ট অংশ—কুঁজ আর কলিজা—তার সামনে হাজির করা হলো। তিনি জানতে চাইলেন, ‘এগুলো কোথায় পেলে?’ তারা বলল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আজ আমরা উট যবেহ করেছি। সেই গোশত।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘ইশ! তা হয় না! জনগণকে নিকৃষ্ট জিনিস দিয়ে আমি অধম আমীর উৎকৃষ্ট অংশ খাব? এগুলো নিয়ে যাও। আমার জন্য অন্য কিছু আনো।’ তার সামনে রুটি আর জয়তুন-তেল আনা হলো। তিনি রুটি ছিঁড়ে তেলে ভেজাতে লাগলেন।
■ ঙ। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনাসহ অন্যান্য অঞ্চলেও সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার ছিলেন। দূর অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা গভর্নর এবং প্রতিনিধিদেরও তিনি এই শিক্ষা দিয়েছিলেন। খাওয়া-দাওয়ার বেলাতেও এই নিয়ম বহাল ছিল। উতবা ইবনে ফারকাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আযারবাইজানে গেলে তাকে ‘খাবীস’ নামের বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হয়। ‘খাবীস’ এক ধরনের সুস্বাদু মিষ্টি খাবার। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি আমীরুল মুমিনীনের জন্য এমন খাবার তৈরি করব।’ তিনি দুটি পাত্রে সেই খাবার ভরে খলীফার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। দুজন প্রতিনিধি এগুলো নিয়ে মদীনায় এসে পৌঁছল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খাবারের ঢাকনা তুলে বললেন, ‘এটা কী?’ তারা বলল, ‘খাবীস।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একটুখানি চেখে দেখলেন তা মিষ্টি স্বাদের। তিনি বললেন, ‘মুসলিমরা কি ঘরে ঘরে এই জিনিস খেতে পায়?’ একজন জবাব দিল, ‘না।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘এগুলো ফেরত নিয়ে যাও।’ তিনি উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠি পাঠালেন, ‘তুমি যে জীবনযাপন করছ, তা তোমার মা-বাবার কষ্টার্জিত নয়। তুমি নিজের বাড়িতে বসে যা দিয়ে উদরপূর্তি করছ, লক্ষ্য রাখবে সব মুসলিম যেন তা খেতে পায়।’
চ। সম্পদ বণ্টনের বেলায়ও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সমতা-বিধানের চেষ্টা করতেন। তিনি সাধারণ লোকজনের মাঝে বসে বিলি-বণ্টন করতে বসতেন। এমন এক পরিস্থিতিতে একদিন সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ভিড় ঠেলে তার কাছে এসে দাঁড়ালেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে বললেন, 'আল্লাহর দুনিয়ায় (খলীফাদের প্রতি) কোনো সম্মান আর রাখলে না। তোমার প্রতিও যে কোনো সম্মান দেখাতে পারব না, তোমাকে শিক্ষা দিতে চাচ্ছি।' উল্লেখ্য যে, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন একাধারে দুনিয়াতে জান্নাতের সুখবর পাওয়া সাহাবী, খসরুর রাজধানী ইরাক বিজয়ী, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আহত হওয়ার পরে খলীফার নিয়োগকৃত অন্যতম শূরা-সদস্য, ইন্তেকালের আগে তার ওপরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তুষ্ট ছিলেন এমন সাহাবী, ইসলামের যোদ্ধা খেতাবপ্রাপ্ত বুযুর্গ। অথচ সমতা-বিধানের বেলায় তার ক্ষেত্রেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কোনো ছাড় দেননি।
ছ। ইবনুল জাউযী থেকে বর্ণিত, খলীফা উমর ইবনে খাত্তাবের ছেলে আবদুর রহমান মিসরে ছিলেন। সেখানে মদ পান করার কারণে মিসরের তৎকালীন গভর্নর আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে শাস্তি দেন। তখন নগর-চত্বরে সাধারণ মানুষের সামনে শাস্তি কার্যকর করার নিয়ম ছিল। আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের ঘরে খলীফাপুত্রকে শাস্তি দিয়েছিলেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এই খবর চলে গেল। তিনি আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে চিঠি দিলেন, 'আল্লাহর বান্দা আমীরুল মুমিনীন উমরের পক্ষ থেকে অপরাধী ইবনে আসের প্রতি। হে আসের পুত্র, তোমার দুঃসাহস এবং আমার আইনের বিরুদ্ধাচরণ দেখে আমি অবাক হয়েছি। উত্তম হওয়া সত্ত্বেও আমি তোমাকে বদরী সাহাবীদের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। এর কারণ, আমার মনে হয়েছিল—তুমি আমার আইন প্রয়োগ করতে পারবে। অথচ তুমি আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ। তুমি এত নিচে নেমে গেছ যে, চূড়ান্ত অপমান করে তোমাকে পদচ্যুত করব বলে ভাবছি। তুমি আমার অবাধ্য হয়ে আব্দুর রহমানকে ঘরে নিয়ে শাস্তি দিয়েছ। আব্দুর রহমান তোমার অধীনে সাধারণ মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। তার সাথে আর দশজন মুসলমানের মতো আচরণ করা উচিত ছিল। কিন্তু তুমি হয়তো ভেবেছ, সে তো আমীরুল মুমিনীনের সন্তান! অথচ তুমি ভালো করে জান, আমি আল্লাহর আদিষ্ট শাস্তি (হাদ্দ) কার্যকরের বেলায় কাউকে ছাড় দিই না। আমার চিঠি পাওয়া মাত্র তাকে এক কাপড়ে পাঠিয়ে দেবে। অপরাধের শাস্তি কেমন হয় তা সে জানুক।' আব্দুর রহমান রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনায় পৌঁছলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের হাতে আল্লাহর আদিষ্ট পন্থায় হাদ্দ কার্যকর করেছেন। তা-ও সবার সামনে। ইবনে সা'দ এবং ইবনে যুবায়েরের বরাত দিয়ে আব্দুর রায্যাক এর দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন। ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষ থেকে তিনি এর বর্ণনা দেন। এর সনদ সহীহ।
শরীয়তে সমতা-বিধান যে কতখানি জরুরী এখানে তার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এখানে অপরাধী স্বয়ং খলীফার পুত্র। তা স্বত্ত্বেও গভর্নর শাস্তি মওকুফ করেননি। কেবল ভিন্নভাবে তা কর্যকর করেছিলেন। এতটুকু স্বজনপ্রীতি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে কষ্ট দিয়েছে। যার রেশ ধরে তিনি গভর্নরকে শাস্তি দেন। অথচ আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন মিসর জয় করা সেনাপতি। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য যা অসম্ভব ছিল, তিনি তা করে দেখিয়েছেন। একই সাথে ছেলেকেও মঙ্গলের জন্য শাসন করেছেন। নিজের সন্তানের সাথে যিনি এমন আচরণ করতে পারেন, তিনি অন্যদের বেলায় কেমন ন্যায়পরায়ণ ছিলেন তা সহজেই অনুমেয়।
জ। ইতিহাস ঘাঁটলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এমন আরেকটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। অনেক কিতাবে এই ঘটনা গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। জাবালা ইবনে আইহামের ঘটনা। তিনি সম্রাট হেরাক্লিয়াসের পক্ষ থেকে গাসসানের সর্বশেষ শাসক ছিলেন। গাসসানের গোত্রগুলো সংঘবদ্ধভাবে সিরিয়ায় বসবাস করত। ইসলাম আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত তারা রোম সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। ইসলাম প্রসারের শুরুর দিকে রোম সম্রাটের প্ররোচনায় তারা প্রায়ই আরবে লুটপাট করত। এক সময় ইসলাম শক্তিশালী হয়ে চারদিকে ছড়াতে শুরু করল। তখন মুসলিমদের কাছে রোমানরা হেরে যায়। সিরিয়ার ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলো এক এক করে ইসলাম কবুল করতে থাকে। গাসসানের প্রভাবশালী নেতা জাবালা ইবনে আইহামও সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করবেন। তিনি মুসলিম হওয়ার পরে তার স্বজনরাও এগিয়ে এলো।
জাবালা মদীনায় যাওয়ার অনুমতি চেয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে চিঠি দিয়েছিলেন। ইসলাম গ্রহণের কথা শুনে খলীফা তার ওপর খুব সন্তুষ্ট ছিলেন। ফলে তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানান। অনুমতি পেয়ে জাবালাহ মদীনায় যান এবং সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং বেশ সমাদর করেছিলেন।
জাবালা স্বতস্ফূর্তভাবে হজ করতে যান। কাবার চারপাশে তাওয়াফ করার সময় বনু ফাযারা গোত্রের এক লোকের পায়ে লেগে তার ইহরামের কাপড় খুলে পড়ে। সদ্য ইসলাম কবুল করা গাসসানী নেতা প্রচণ্ড রেগে যান। লোকটিকে এমন মারধর করেন যে, তার নাক ফেটে যায়।
ফাযারী লোকটি যথারীতি আমীরুল মুমিনীনের কাছে অভিযোগ নিয়ে গেল। সব শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জাবালাকে ডেকে পাঠান। জabala আসার পরে তিনি ঘটনার সত্যতা জানতে চাইলেন। জাবালাও সবকিছু স্বীকার করলেন। এমনকি নাকে আঘাতের কথাও অস্বীকার করেননি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এমন কী হয়েছিল যে তুমি ভাইয়ের নাক ফাটানোর মতো অপরাধ করেছ?' তিনি বললেন, 'আপনি এই বেদুইনের প্রতি বেশি দয়াপরবশ হয়ে আছেন। কাবার পবিত্রতার কথা ভেবে তাকে ছেড়ে দিয়েছি। নয়তো তার মাথা কেটে ফেলতাম।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি তোমার অপরাধ স্বীকার করেছ। এখন লোকটির সাথে মামলা মিটিয়ে ফেল, নয়তো এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে আমি তোমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা (কাসাস) নেব।'
জাবালা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, 'তা কী করে হয়? সে একজন সাধারণ প্রজা, আর আমি রাজা।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'ইসলাম তোমাদের দুজনকে এক কাতারে দাঁড় করিয়েছে।' জাবালা বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমার মনে হয়েছিল ইসলামে প্রবেশের পরে আমি অন্তত জাহেলী যুগের তুলনায় বেশি সম্মান পাব।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তর্ক করা বন্ধ করো। তুমি নিজে এর সমাধান না করলে আমি তাকে বদলা নেওয়ার সুযোগ করে দেব।'
জাবালা এবার হুমকি দিলেন, 'তাহলে আমি আবার খ্রিস্টান হয়ে যাব।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু উল্টো হুমকি দিলেন, 'তুমি ধর্মত্যাগ করলে আমি তোমাকে হত্যা করব। কারণ, তুমি ইসলাম কবুল করে ফেলেছ। এখন ইসলাম ছেড়ে গেলে তুমি মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে যাবে। তখন তোমাকে হত্যা করতে বাধ্য হব।'
এই পর্যায়ে এসে জাবালা বুঝতে পারল—অসার তর্ক আর হুমকিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সিদ্ধান্ত বদলাবেন না। সুতরাং তিনি খলীফার কাছে এই ব্যাপারে ভেবে দেখার জন্য সময় চাইলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে সুযোগ দেন। অনেক চিন্তার পরে জাবালা একটি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসলেন। তিনি তার লোকজন নিয়ে রাতের অন্ধকারে মক্কা ছেড়ে কনস্টান্টিনোপলে পালিয়ে যান। খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। পরে অবশ্য তিনি তার এই আচরণের জন্য তীব্রভাবে অনুতপ্ত হয়েছিলেন। প্রচণ্ড অনুতাপ থেকে তিনি মর্মস্পর্শী কবিতা রচনা করেন। তার কবিতা আজও আরব বিশ্বে সমাদৃত এবং বহুল পঠিত।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শরীয়ত মেনে সমতা-বিধানের উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই ঘটনা। ইসলামের দৃষ্টিতে রাজা-প্রজা সবাই সমান। সুতরাং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিশ্বাস করতেন সমতা বিধানকে কাগজে-কলমে বন্দী করে রাখলে চলবে না। এর বাস্তবায়নও সমান জরুরী।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহ তা'আলা আদিষ্ট শরীয়তের গুরুত্ব দিয়েছেন। এগুলোর বাস্তবায়নও করেছেন। জনগণও তাদের জীবনে এর প্রতিফলন দেখেছে। পিতৃত্বের বন্ধন, মর্যাদাপূর্ণ খেতাব, ধর্মের পার্থক্য কিংবা দিগ্বিজয়ী যোদ্ধার অবস্থান কোনো কিছুই তাকে প্রতিহত করতে পারেনি। এই মহান নীতি বাস্তবায়নের ফলে সকলেই যুলুম-অবিচারের বিপরীতে ন্যায়বিচার লাভ করেছিল।
খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে সমাজে সমতার বিধান কার্যকর ছিল। মানুষের মনে এর এমন প্রভাব ছিল যে, জাতিগত সংঘাত, শ্রেষ্ঠত্বের দাবিসহ বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব দূর হয়ে যায়। জাতিগত বৈষম্য লোপ পেতে শুরু করে। ফলে কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক সাধারণ লোকজনের ফায়দা নিতে পারত না। আর অসহায় ব্যক্তিমাত্রই নিজের অধিকার আদায় করতে সক্ষম ছিল। দায়িত্ব-কর্তব্যের বেলাতেও সবার সমান অধিকার ছিল। খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে সমান অধিকারের আলোয় চারপাশে আলো ছড়াতে শুরু করে। ফলে তৎকালীন সমাজের ভিত মজবুত হয়ে ওঠে।

টিকাঃ
৪৪২. নিদহাম আল-হুকম ফি আ'হদ আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, হামদ মুহাম্মাদ আস-সামাদ, পৃ. ১৪৫।।
৪৪৩. আল-ওয়াসাতিয়া ফিল-কুরআন আল-কারীম, আস-সাল্লাবী, পৃ. ৯৬।
৪৪৪. আল-মুয়াত্তা, আইন বিষয়ক অধ্যায়, নং ২।
৪৪৭. আত-তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সা'দ, ৩/২৯৩-২৯৪।
৪৪৮. পবিত্র কুরআন দ্রষ্টব্য, ২ : ২১।
৪৪৯. সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১৩।
৪৫০. ফিকহুত-তামকীন ফিল-কুরআন আল-কারীম, আস-সাল্লাবী, পৃ. ৫০১।
৪৫১. প্রাগুক্ত।
৪৫২. তারীখ আত-তাবারী, ৪/৯৮; নিদহাম আল-হুকম ফিশ-শারীয়াহ ওয়াত তারীখ আল ইসলামী, ১/৮৭।
৪৫৩. মানাকীব আমীর আল-মুমিনীন, ইবনে জাউযী, পৃ. ১০১।
৪৫৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১০১।
৪৫৫. নিদহাম আল-হুকম ফিশ-শারীয়াহ ওয়াত-তারীখ আল-ইসলামী, ১/৮৭।
৪৫৬. নিদহাম আল-হুকম ফিশ-শারীয়াহ ওয়াত-তারীখ আল-ইসলামী, ১/৮৮।
৪৫৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮৮।
৪৫৮. মানাকীব আমীর আল-মুমিনীন, ইবনে জাউযী, পৃ. ১৪৭।
৪৯. আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, আন-নাজ্জার, পৃ. ২৪৩।
৫০. নিদহাম আল-হুকম ফিশ-শারীয়াহ ওয়াত-তারীখ আল-ইসলামী, ১/৮৮।
৪৬১. মানাকীব আমীর আল-মুমিনীন, ইবনে জাউযী, পৃ. ২৩৫।
৪৬২. আল-খিলাফাহ আর-রাশিদাহ ওয়াদ-দাওলাহ আল-উমাউয়িয়্যাহ, ইয়াহিয়া আল-ইয়াহিয়া, পৃ. ৩৪৫।
৪৬৩. ফান আল-হুকম ফিল-ইসলাম, ড. মুস্তাফা আবু যায়েদ, পৃ. ৪৭৫-৪৭৬।
৪৬৪. আল-মুগনি, ইবনে কুদামা, ৯/১৯০; ফান আল-হুকম, পৃ. ৪৭৭।
৪৬৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭৭।
৪৬৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭৮।
৪৬৭. আল-মুজতামা আল-ইসলামি দাআইমুহুওয়া আদাবুহু, ড. মুহাম্মাদ আবু আজওয়া, পৃ.১৬৫।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 স্বাধীনতা

📄 স্বাধীনতা


খুলাফায়ে রাশেদীন স্বাধীন-নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। এর ওপরে ভিত্তি করে তারা রাষ্ট্র-শাসন করে গেছেন। শরীয়তের সীমারেখার মধ্যে থেকে জনগণের স্বাধীনতা রক্ষা করা এই নীতির মূলমন্ত্র। জনগণের জন্য ইসলাম যে স্বাধীনতার দাওয়াত দিয়েছিল তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এমন ঘটনার নযীর ইতিহাসে সহজে চোখে পড়ে না। প্রথমেই এক আল্লাহ তা'আলার প্রতি ঈমান আনা এবং একমাত্র তার ইবাদতের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছানো হয়েছিল। আল্লাহর কোনো শরীক নেই। তাওহীদের এই ডাকের মধ্যেই সবার স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের অধিকার নিহিত। এর ইতিবাচক অর্থ করলে দেখা যায়- এখানে ভালো কাজের আদেশ এবং খারাপ কাজের নিষেধের প্রতি নির্দেশনা নিহিত। আবার নেতিবাচক অর্থ করলে দেখা যায় যে, মানুষকে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করা যাবে না। এই একটি কথার মাঝে অনেকগুলো অর্থ রয়েছে। তাই বলা যায় দয়া, ন্যায়বিচার, শূরা এবং সমতা-বিধানের নীতি তখনই বাস্তবায়ন করা সম্ভব, যদি সবার আগে স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায়।
খুলাফায়ে রাশেদীন স্বাধীনতার মন্ত্রবলে ইসলাম প্রচার-প্রসারে সফল হয়েছিলেন। ইসলাম মানুষকে যেভাবে সম্মানিত করেছে, যে বিপুল স্বাধীনতা দিয়েছে তার ফলে নতুন ভূখণ্ড জয় করা সহজ হয়ে যায়। ইসলাম সহজে প্রসার লাভ করে। তাছাড়া বাইজেন্টাইন এবং পারসিকদের মতো যারা তখন রাজ্য-শাসন করত, তারা একনায়কতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিল।
সেসময়ে জনসাধারণ বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা চরম নির্যাতনের শিকার হতো। তখন মিসর ও সিরিয়াবাসী ইয়াকুবী ধর্মের অনুসারী ছিল। বাইজেন্টাইন সরকার তাদের রাষ্ট্রীয় ধর্ম অর্থাৎ, মিলকানীর অনুসরণ করতে বাধ্য করত। অবাধ্য হলে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা ছিল সাধারণ ব্যাপার। মেসিডোনিয়ান কাউন্সিল যা নির্ধারণ করত বাকি সবাই তা অনুসরণ করতে বাধ্য ছিল। তা না হলে বালির বস্তায় ভরে অতল সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া হতো। রোম সম্রাটের পৃষ্ঠপোষকতায় এসব হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়।
ইতিহাস সাক্ষী যে, পারসিকদের হাতেও ভিন্নধর্মের লোকেরা নির্যাতিত এবং নিগৃহীত হয়েছে। বাইজেন্টাইন এবং পারসিকদের মাঝে যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর থেকে খ্রিস্টানরা সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হয়েছে। এমন একটা সময়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং খুলাফায়ে রাশেদীন তাদের শাসনকালে জনগণের স্বাধীনতা পূর্ণমাত্রায় রক্ষা করে গেছেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কীভাবে জনসাধারণের স্বাধীনতা সংরক্ষণ করেছিলেন তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা তুলে ধরা হলো।
১.৭.১। ধর্মীয় স্বাধীনতা
মুসলিমরাষ্ট্রে কাউকে ইসলাম কবুলের জন্য কখনো বাধ্য করা হয়নি। বরং আল্লাহ তা'আলার সৃষ্টি এবং সত্য ধর্ম নিয়ে ভাবতে উৎসাহিত করা হয়। বিধর্মীদের সাথে মুসলিমরা যেন সুন্দরভাবে যুক্তি উপস্থাপন করে বিতর্কে লিপ্ত হয়, এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। মানুষ নিজ ধর্ম পালন করতে দেওয়ার আদেশ নিয়ে এই আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
লَا ইকরাহা ফিদ দীন দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই।
فَإِنْ أَعْرَضُوا فَمَا أَرْسَلْنَكَ عَلَيْهِمْ حَفِيظًا إِنْ عَلَيْكَ إِلَّا الْبَلْغُ যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আপনাকে আমি তাদের রক্ষক করে পাঠাইনি। আপনার কর্তব্য কেবল প্রচার করা।
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَ هُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে উত্তমরূপে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন পছন্দযুক্ত পন্থায়। নিশ্চয়ই আপনার পালনকর্তাই ওই ব্যক্তি সম্পর্কে বিশেষভাবে জ্ঞাত রয়েছেন, যে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে এবং তিনিই ভালো জানেন তাদেরকে, যারা সঠিক পথে আছে।
وَلَا تُجَادِلُوا أَهْلَ الْكِتَبِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِلَّا الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْهُمْ وَ قُولُوا آمَنَّا بِالَّذِي أُنْزِلَ إِلَيْنَا وَ أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ وَالهُنَا وَالهُكُمْ وَاحِدٌ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ তোমরা কিতাবীদের সাথে তর্ক-বিতর্ক করবে না, কিন্তু উত্তম পন্থায়; তবে তাদের সাথে নয়, যারা তাদের মধ্যে বে-ইনসাফ। এবং বলো, আমাদের প্রতি ও তোমাদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তাতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আমাদের উপাস্য একই এবং আমরা তাঁরই আজ্ঞাবহ।
এমন আরও অনেক আয়াত আছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার রাষ্ট্রে স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ব্যাপারে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অনুসরণ করতেন। তাদের শাসনামলে আহলে-কিতাবরা পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা পেয়েছিলেন। তাদের কাছ থেকে জিযিয়া গ্রহণ করা হতো। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নানা সময়ে তাদের সাথে অনেক চুক্তি করেছিলেন। পরবর্তী অধ্যায়ে ইনশাআল্লাহ এগুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে ইহুদি ও খ্রিস্টানদের উপাসনালয়গুলো অক্ষত ছিল। আল্লাহ তা'আলার আদেশের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সেগুলোয় হাত দেওয়া হয়নি। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَاتٌ وَمَسَاجِدُ يُذْكَرُ فِيهَا اسْمُ اللَّهِ كَثِيرًا
আল্লাহ যদি মানবজাতির একদলকে আরেক দল দ্বারা প্রতিহত না করতেন, তবে (খ্রিস্টানদের) নির্জন গির্জা, ইবাদতখানা, (ইহুদীদের) উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ বিধস্ত হয়ে যেত, যেগুলোতে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে মুসলিমরা, বিশেষ করে সাহাবায়ে কেরাম বিজিত দেশগুলোর ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি বরাবর উদার ছিলেন। সাধারণ মুসলিম থেকে শুরু করে খলীফা পর্যন্ত সবাই ভিন্ন ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। মুসলিমরা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন যে, বিধর্মীদের জোরপূর্বক ইসলাম কবুল করানোর অধিকার দেওয়া হয়নি। একবার এক খ্রিস্টান বৃদ্ধা তার সমস্যা নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দ্বারস্থ হয়েছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বললেন, 'ইসলাম কবুল করুন, আপনি নিরাপদে থাকবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সত্য ধর্ম দিয়ে পাঠিয়েছেন।' বৃদ্ধা বলল, 'আমার অনেক বয়স হয়েছে। মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসেছে।' তিনি আসলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পরেও বৃদ্ধার আর্জি মোতাবেক সাহায্য করেছেন। এই ঘটনার পরে বৃদ্ধা তার প্রস্তাবটিকে আবার হুমকি না মনে করেন, তিনি সেই চিন্তা করতে লাগলেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছিল বৃদ্ধা ইসলাম গ্রহণ করলে তিনি তাকে সাহায্য করবেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি স্বাভাবিকভাবে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছিলেন। ইসলাম কবুল না করেও বৃদ্ধা তার সাহায্য পেয়েছিলেন। তাই তিনি আল্লাহ তা'আলার কাছে ক্ষমা চাইলেন। তিনি দুআ করলেন, 'আমি তাকে বাধ্য করতে চাইনি, পথ দেখাতে চেয়েছি মাত্র।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর একজন খাদেম ছিল। তার নাম ছিল আসহাক। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে সে এই ঘটনা বর্ণনা করেছে : আমি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খ্রিস্টান দাস ছিলাম। একদিন তিনি আমাকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে বললেন, 'তুমি ইসলাম কবুল করলে মুসলিমদের অনেক খেদমত করতে পারবে। যারা মুসলিম নয় তাদের কাছ থেকে সাহায্য নেওয়া উচিত নয়।' আমি রাজী হইনি। তখন তিনি তিলাওয়াত করলেন,
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই।
তিনি ইন্তেকালের আগে আমাকে মুক্ত করে দিলেন। বললেন, 'যেখানে খুশি চলে যাও।'
মুসলিম রাষ্ট্রে ইহুদী-খ্রিস্টানরা তাদের ঘরবাড়ি এবং উপাসনালয়ে অবাধে ধর্ম-চর্চা করতে পেরেছে। কেউ তাতে বাধা দিত না। কারণ, শরীয়ত নিজ নিজ ধর্ম চর্চার সুযোগ দিয়েছে। আত-তাবারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আঈলিয়াবাসীর (জেরুযালেম) সাথে সন্ধি করেছিলেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, তাদের জান, মাল, ক্রুশ এবং চার্চ সম্পদ সুরক্ষিত থাকবে।
মিসরের মুসলিম গভর্নর আ'মর ইবনে আ'স মিসরীয়দের সাথে করা সন্ধিতে উল্লেখ করেছিলেন, 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আমি আমর ইবনে আ'স মিসরীয়দের জান, মাল, ধর্ম, গীর্জা, ক্রুশ, রাষ্ট্র এবং সাগরের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছি।' তাতে আরও উল্লেখ করেন যে, 'এখানে স্বাক্ষরকারীদের পক্ষে আল্লাহ তা'আলা সাক্ষী থাকবেন; তার রাসূল, খলীফা এবং মুমিনগণ তাদের হেফাযত করবেন।'
মুসলিম ভূখণ্ডে শর্তের ভিত্তিতে বসবাসকারী বিধর্মীরা স্বাধীনভাবে নিজ ধর্মপালন করতে পারবে, এ বিষয়ে ফকীহগণও একমত। নিজেদের বাড়ি এবং উপাসনালয়ের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে তাদের কোনো বাধা ছিল না। তবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান জনসমক্ষে প্রদর্শন করা নিষিদ্ধ ছিল। যেমন, মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় জনসমক্ষে ক্রুশ পরা নিষেধ ছিল। মুসলিম ফকীহগণ বাধা দিতেন। তবে বিধর্মীদের গ্রামে বা শহরে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান খোলামেলাভাবে প্রকাশে কোনো বাধা ছিল না। বলে রাখা ভালো, মুসলিমরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত কিন্তু বিধর্মীরা বাস করত এমন শহর ও গ্রামের কথা বলা হয়েছে।
ইমাম গাযালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি মুসলিমরাষ্ট্রে-ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার প্রসঙ্গে বলেছেন, 'ইসলামী রাষ্ট্র পৃথিবীজুড়ে সর্বত্র নযীরবিহীন ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চত করেছিল। একটি ধর্মকেন্দ্রিক সরকার তার প্রত্যেক জনগণকে স্বাধীনভাবে নিজ ধর্ম চর্চা করতে দিয়েছে, ইতিহাসের কোথাও এমন উদাহরণ নেই।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিমরাষ্ট্রে বসবাসকারী ইহুদী-খ্রিস্টানদের সঙ্গে যে সন্ধি করেছিলেন তার সার-সংক্ষেপ: তারা গীর্জায় যেতে পারবে। সেখানে বসে যেভাবে ইচ্ছা প্রার্থনা করতে পারবে। ওয়াদা করছি তাদের উপরে অতিরিক্ত বোঝা চাপানো হবে না। আরও ওয়াদা করছি তাদের হয়ে তাদের শত্রুর মোকাবিলা করব। নিজেদের সমস্যা মেটাতে গিয়ে স্বেচ্ছায় আমাদের দ্বারস্থ না হওয়া পর্যন্ত তারা প্রচলিত নিজ আইনে ফয়সালা করতে পারবে। তবে আমাদের কাছে এলেও, তারা অবশ্যই ন্যায়বিচার পাবে। আর যদি তারা তাদের মতো সব সমাধান করতে চায় তবে তাতেও বাধা দেওয়া হবে না।
মুসলিম-রাষ্ট্রে বসবাসকারী বিধর্মীদের প্রতি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত উদার ছিলেন। ইতিহাস এর সাক্ষী। বিত্তহীনদের জন্য জিযিয়া প্রদান মওকুফ করে দিয়েছিলেন। আবু উবাইদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি তার কিতাব আল-আমওয়ালে একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এক বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে একজন অন্ধ বৃদ্ধকে ভিক্ষা করতে দেখেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু পেছন থেকে তার কাঁধ ধরে জানতে চাইলেন, 'আপনি কোন ধর্মের অনুসারী?' সে বলল, 'আমি ইহুদী।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'কোন জিনিস আপনাকে ভিক্ষা করতে বাধ্য করছে?' সে বলল, 'জিযিয়া পরিশোধের বোঝা। তাছাড়া আমার মৌলিক চাহিদাও পূরণ হয় না। বৃদ্ধ হয়ে গেছি বলে ভিক্ষা করতে হচ্ছে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকটিকে হাত ধরে বাড়িতে পৌঁছে দিলেন। তার খুব আদর-যত্ন করলেন। বাড়ি থেকে ছোট্ট উপহার এনে তার হাতে দিলেন। তারপর তিনি কোষাধ্যক্ষের নিকট চিঠিতে এক ফরমান জারি করলেন। তাতে লেখা ছিল, 'এই ব্যক্তির মতো যারা আছে, তাদের দিকে লক্ষ্য রেখো। আল্লাহর কসম, আমরা তাদের তরুণ বয়সের উপার্জন খেয়ে আবার বৃদ্ধ বয়সে যদি ছুঁড়ে ফেলে দিই, তবে অবশ্যই কঠিন গোনাহ হবে।' তারপর থেকে এমন বৃদ্ধদের জন্য জিযিয়া মাফ হয়ে গেল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার গভর্নরদের নতুন আইনের কথা জানিয়ে দিয়েছিলেন।
এই ঘটনা ইসলামী ন্যায়বিচারের দলিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাষ্ট্রের মুসলিম-বিধর্মী নির্বিশেষে সবার প্রতি সমান ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। তিনি একা নন, খুলাফায়ে রাশেদীনের প্রত্যেকেই ধর্মীয় স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। আল্লাহর শরীয়তে মাধ্যমে স্বাধীনতা সুরক্ষিত ছিল। আর মুসলিম রাষ্ট্র সেই স্বাধীনতার পৃষ্ঠপোষকতা করেছে।
১.৭.২। চলাচলের স্বাধীনতা
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চলাফেরার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি কিছু কারণে তাতে নিয়ম বেঁধে দেন। তবে এসব নিয়ম-কানুন অল্প কয়েকটি জায়গার জন্য প্রযোজ্য ছিল। গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে সংক্ষেপে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো:
■ এক। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বুযুর্গ সাহাবীদের সব সময় মদীনায় রাখতে চাইতেন। তাই নতুন কোনো ভূখণ্ডে কিংবা রাষ্ট্রীয় সফরে দূরে যেতে হলে খলীফার অনুমতি নিতে হতো। তিনি সংগত কারণে এই নিয়ম চালু করেছিলেন। বুযুর্গ রাযিয়াল্লাহু আনহুমগণ তার উপদেষ্টা ছিলেন। যে কোনো সমস্যায় তাদের পরামর্শ নিতে হতো। তার অনুমতি সাপেক্ষে সাহাবায়ে কেরাম গভর্নর এবং সেনাপতির দায়িত্ব নিয়ে অন্য এলাকায় যেতেন। এমন নিয়মের পেছনে সঙ্গত কারণ ছিল। বিভিন্ন সমস্যার সমাধান-লাভের জন্য তিনি সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শ নেবার সুবিধার্থে এমন নিয়ম বেঁধে দেন। তাছাড়া সাহাবায়ে কেরাম অবাধে বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করতে শুরু করলে ফিতনা ছড়ানোর আশংকা ছিল। তিনি তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং মানবচরিত্র ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতার কারণে বুযুর্গ সাহাবায়ে কেরামকে নিজের কাছাকাছি রাখা শ্রেয় মনে করেন। এই ব্যপারে তিনি বলেছেন, 'দেশে-বিদেশে তোমাদের ছড়িয়ে পড়াকে উম্মতের জন্য আমি আশংকাজনক মনে করি।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, এই ব্যাপারে তিনি নমনীয় হলে চারদিকে ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে। ফলে মানুষজন একেক সাহাবীকেন্দ্রিক হয়ে পড়বে। তখন বিভ্রান্তি ছড়াতে শুরু করবে। একেক জায়গায় একক নেতার অনুসারীদের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব লেগে যাবে।
ক্ষমতা বিকেন্দ্রীভূত হলে, অর্থাৎ, অন্যদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিলে ইসলামী রাষ্ট্রে রাজনৈতিক এবং দ্বীনী ক্ষমতা বিভক্ত হয়ে যাবে। তখন তার সরকারী ফরমান ছাপিয়ে একেকজন সাহাবীর মতনির্ভর শাসনব্যবস্থা কায়েম হওয়া অসম্ভব নয়। এমন নানা বিষয় বিবেচনা করে তিনি অন্য কারও হাতে ক্ষমতা ছাড়তে চাননি। তাই বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ সাহাবীদের কাছে রেখে তিনি ইজতেহাদ নয় বরং শূরার মাধ্যমে সরকারী সিদ্ধান্ত নিতেন। এতে ফitna এবং বিভক্তির আশংকা দূর হয়েছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শরীয়তের পথ ধরেই সব কাজ করেছেন। শরীয়তের ওপরে না থাকলে তার কাজে ন্যায়পরায়ণতা থাকত না। তিনি উম্মতের স্বার্থে কাজ করে গেছেন। তাঁর দূরে রেখে তাদের সুপরামর্শ থেকেও বঞ্চিত হতে চাননি। সুতরাং বুযুর্গ সাহাবীগণ সাধারণত মদীনাতেই থাকতেন। উপর্যুক্ত কারণ ছাড়া সাহাবীদের বিদেশযাত্রা প্রতিহত করার অধিকার উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ছিল না। বিনা কারণে ইসলামী শরীয়তের একবার ব্যতিক্রম ঘটলে তার পথ ধরে এমন ঘটনা আরও ঘটার আশংকা থাকে। তবে রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
■ দুই। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এমন আরেকটি ঘটনা। তিনি আরবের প্রাণকেন্দ্র থেকে নাজরানের খ্রিস্টান এবং খায়বারের ইহুদিদের বের করে দেন। তাদের ইরাক এবং সিরিয়ায় পাঠিয়ে দেন। কারণ, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে করা সন্ধি অমান্য করেছিল। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে সন্ধি নবায়ন করার পরে তারা আবারও তা ভঙ্গ করে। তাদের দুর্গগুলো ষড়যন্ত্র এবং কুমন্ত্রণার নার আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। সুতরাং এ তাদের বহিষ্কার করা ছাড়া উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। অন্য ইহুদী-খ্রিস্টানরা মুসলিম-রাষ্ট্রে আর দশজন নাগরিকের মতোই যাবতীয় সুযোগ পূর্ণ-মাত্রায় ভোগ করেছে।
আল-বায়হাকী তার সুনান এবং আব্দুর রাজ্জাক ইবনে হামাম আস-সানানী তার মুসান্নাফ কিতাবে এর বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ইবনে মুসায়্যিব এবং ইবনে শিহাবের বরাত দিয়ে বলেছেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আরব উপদ্বীপে দুটো ধর্ম কখনো একসাথে থাকতে পারবে না।'
ইবনে শিহাবের বরাত দিয়ে মালিক বলেছেন: উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু এই বিষয় নিয়ে বেশ চিন্তা-ভাবনা করছিলেন। অতঃপর তিনি যখন একজনের কাছে এই হাদীস জানতে পারেন তখন তিনি যেন তার সমাধান পেয়ে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে বলেছেন, 'আরব উপদ্বীপে দুটো ধর্ম কখনো এক সাথে থাকতে পারবে না।' এর ভিত্তিতে তিনি খায়বার থেকে ইহুদী এবং নাজরান ও ফাদাক থেকে খ্রিস্টানদের বহিষ্কার করেন।
সাহাবায়ে কেরামের কাছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা ছিল সাক্ষাৎ ভবিষ্যদ্বাণী। নাজরানের ইহুদী-খ্রিস্টানরা ঘৃণা, হিংসা এবং শত্রুতাবশত মুসলিমদের সাথে কোনোভাবেই মিলেমিশে চলতে পারছিল না।
আর খায়বারের ইহুদী-খ্রিস্টানদের বের করে দেবার কারণ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি বলেছেন, খায়বারবাসী যখন আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের ওপরে হামলা চালিয়েছিল তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খায়বারের ইহুদীদের সাথে সন্ধি করেছিলেন। সেই শর্ত মোতাবেক তারা তাদের সম্পদ ভোগ করতে পেরেছে। তিনি বলেছিলেন, 'আল্লাহ তা'আলা যতদিন চান তোমরা এই জায়গায় থাকতে পারবে।' আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন তার সম্পত্তির খোঁজখবর নিতে খায়বারে যান তখন রাতের অন্ধকারে তাকে হামলা করা হয়। হামলাকারীরা তার হাত-পায়ের হাড় ভেঙে দেয়। অথচ সেখানে আমাদের আর কোনো শত্রু নেই। সুতরাং তারাই আমাদের শত্রু। তাদের দেশছাড়া করার কথা ভাবছি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা শুনে বনু আল-হাকিক গোত্রের লোকজন তার কাছে গিয়ে আবেদন জানাল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, এই ভূখণ্ডে থাকা নিয়ে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আমাদের সন্ধি হয়েছিল। আমাদের মধ্যে শর্ত নির্ধারিত হয়ে ছিল। তা সত্ত্বেও আমাদের বহিষ্কার করতে চান?'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তোমাদের কি মনে হয় আমি রাসূল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই কথা ভুলে গেছি, 'তোমাদের যখন খায়বার থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হবে, উটের পিঠে তোমরা দূর-দূরান্তে পাড়ি জমাবে, রাতের পর রাত যাত্রা করবে, তখন তোমাদের কী অবস্থা হবে?' তখন ইহুদী লোকটি বলল, 'আবুল কাসিম (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মজা করে এ কথা বলেছিলেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হে আল্লাহর শত্রু, তুমি মিথ্যা বলছ।' তারপরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের খায়বার থেকে বহিষ্কার করে দিলেন। তবে তাড়িয়ে দেবার আগে তিনি তাদের উৎপাদিত ফলের মূল্য, উট, উটে চড়ার জন্য জিন, রশি ইত্যাদি দিতে ভুললেন না।
যে শর্তের ভিত্তিতে খায়বারের ইহুদীরা বসবাস করে আসছিল তারা তা রক্ষা করেনি। সুতরাং তাদের আরব ছাড়ার ঘটনাটি অবধারিত ছিল। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে করা শর্ত ভাঙার কারণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের তায়মা এবং জেরিকো পাঠিয়ে দেন।
একইভাবে নাজরানের খ্রিস্টানরাও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সন্ধি অমান্য করেছিল। দ্বিতীয়বার আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে তারা চুক্তিবদ্ধ হয়। পরে আবারও চুক্তি লঙ্ঘন করে বসে। নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা অবাধে সুদের ব্যবসা করে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের দেশছাড়া করতে বাধ্য হন। তাদের ইরাকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠান। তাতে লেখা ছিল, 'এদের কেউ যদি ইরাক কিংবা সিরিয়ার গভর্নরের কাছে যায় তবে তাদের যেন শুধু জমি দেওয়া হয়। তাতে তারা যা উৎপন্ন করবে তা সম্পূর্ণ আল্লাহর জন্য এবং এ-ই তাদের জমির উৎপাদন।' তারা কুফার উপকণ্ঠে নাজরানিয়া গ্রামে থাকতে শুরু করে।
আবু ইউসুফ বর্ণনা করেছেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খ্রিস্টানদের নিয়ে শংকিত ছিলেন। তারা মুসলিমদের ক্ষতি করতে পারে, এমন আশংকা করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী তো ছিলই। সেই সাথে আরও কয়েকটি কারণে তিনি তাদের বের করে দিতে বাধ্য হন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুব বিচক্ষণ ছিলেন বলে খায়বারের ইহুদী এবং নাজরানের খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। অথচ বহিস্কারের সময়ও তাদের সাথে কোনোরকম অন্যায় আচরণ করা হয়নি। ইসলামী রাষ্ট্র ধ্বংস করার যে জঘন্য ষড়যন্ত্র করা হচ্ছিল তার বিরুদ্ধে তিনি ব্যবস্থা নিয়েছিলেন মাত্র।
১.৭.৩। নিরাপত্তার অধিকার; বাড়িঘরের পবিত্রতা এবং ব্যক্তি মালিকানার স্বাধীনতা
ইসলাম মানুষকে নিরাপত্তা দান করে। এ সম্পর্কে কুরআন ও হাদীসে বার বার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّهِ فَإِنِ انْتَهَوْا فَلَا عُدْوَانَ إِلَّا عَلَى الظَّالِمِينَ
অতঃপর যদি তারা নিবৃত হয়ে যায় তাহলে কারো প্রতি কোনও জবরদস্তি নেই, কিন্তু যারা যালেম (তাদের ব্যাপারে আলাদা)।
আল্লাহ তা'আলা আরও উল্লেখ করেছেন,
فَمَنِ اعْتَدَى عَلَيْكُمْ فَاعْتَدُوا عَلَيْهِ بِمِثْلِ مَا اعْتَدَى عَلَيْكُمْ
বস্তুত যারা তোমার উপর জবরদস্তি করেছে, তোমরা তাদের উপর জবরদস্তি কর, যেমন তারা করেছে তোমাদের উপর।
ইসলাম জীবনের অধিকারও নিশ্চিত করে। এখানে জীবনের অধিকার বলতে জীবনের নিরাপত্তার চাইতেও ব্যাপক কিছুকে বোঝানো হয়েছে। জীবনের নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব সরকারের। কেউ কাউকে যেন যুলুম না করে আবার কেউ যেন যুলুমের শিকার না হয়। আর জীবন নিরাপদ করতে হলে রাষ্ট্রীয় যাবতীয় বিধিবিধান প্রয়োগ করতে হয়। এ কারণেই মুসলিম রাষ্ট্র নাগরিকদের জীবনের পবিত্রতা রক্ষার করতে সক্ষম।
মুসলিম-রাষ্ট্রে জীবনের পবিত্রতা রক্ষা করার দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিকের উপরেও বর্তায়। কারণ, একজনকে আঘাত করা মানে সকলকে আঘাত করা। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا
যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কুরআন এবং হাদীস অনুসরণ করেছেন। তাই প্রত্যেক নাগরিককে গুনাহ থেকে বাঁচানোর চেষ্টায় ব্রতী ছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, 'হে লোকসকল, মারধর ও অপমানের জন্য কিংবা অভিশাপ দেবার জন্য গভর্নর নিয়োগ করা হয়নি। তোমাদের আল্লাহ তা'আলার কুরআন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস শেখানোর জন্য তাদের নিয়োগ দিয়েছি। তারা তোমাদের সাথে অন্যায় করে থাকলে আমার কাছে অভিযোগ করবে। যাতে আমি তার যথার্থ বদলা নেবার সুযোগ দিতে পারি।'
তিনি বলেছেন, 'কাউকে ক্ষুধা, ব্যথা কিংবা ভয়ভীতি দিয়ে অপরাধ স্বীকার করালে সেই ব্যক্তি অবশ্যই নিরাপদ বোধ করবে না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, কোনো রকম জোর-জবরদস্তি, ভয়-ভীতি কিংবা শারীরীক নির্যাতন করে স্বীকারোক্তি আদায় করার কোনো অধিকার কারও নেই।
আবার ইসলামে মানুষের বাড়িঘরের পবিত্রতা রক্ষা করার প্রতিও জোর দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা কারও অনুমতি ছাড়া তার বাড়িতে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছেন। কেউ যেন অনৈতিকভাবে কারও ঘরে না ঢোকে সে ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা আছে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَ تُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ فَإِنْ لَّمْ تَجِدُوا
فِيهَا أَحَدًا فَلَا تَدْخُلُوهَا حَتَّى يُؤْذَنَ لَكُمْ ۚ وَ إِنْ قِيلَ لَكُمُ ارْجِعُوا فَارْجِعُوا هُوَ أَزْكَىٰ لَكُمْ ۚ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য গৃহে প্রবেশ করো না, যে পর্যন্ত আলাপ পরিচয় না কর, এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যাতে তোমরা স্মরণ রাখ। যদি তোমরা গৃহে কাউকে না পাও, তবে অনুমতি গ্রহণ না করা পর্যন্ত সেখানে প্রবেশ করো না।
আরেকটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: আর তোমরা ঘরে প্রবেশ করো দরজা দিয়ে। এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুসহ অন্যান্য খুলাফায়ে রাশেদীনও মানুষকে নিভৃতে ঘরে বসবাসের নিশ্চয়তা দিয়েছেন।
খুলাফায়ে রাশেদীনের সময়ে সম্পদের মালিকানার অধিকারও সংরক্ষিত হতো। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যখন ইহুদী-খ্রিস্টানদের বহিষ্কার করেছিলেন তখনও তাদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেননি। বরং ইরাক এবং সিরিয়ায় তারা যেন ঠিক একই রকম সম্পত্তি পায় তার ব্যবস্থা করেছিলেন। কারণ, তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ আমীর। মুসলিম-রাষ্ট্রে মুসলিম-বিধর্মী নির্বিশেষে সবার সম্পদ ও সম্পত্তির নিরাপত্তা এবং অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। এটাই স্বাভাবিক।
খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মক্কার মসজিদ আল-হারাম বড় করতে গিয়ে পার্শ্ববর্তী লোকদের জায়গা নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। এর বিনিময়ে তিনি যথাযোগ্য সম্মানের সাথে জায়গা ছেড়ে দেওয়া মালিকদের সম পরিমাণ জায়গা দিয়ে দেন। কাউকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেওয়া হবে এমন শর্তেও যেন হুট করে কারও সম্পত্তি অধিগ্রহণ না করা হয় তিনি সে ব্যাপারে খুব সচেতন ছিলেন।
খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে আবার ঢালাওভাবে যে সম্পত্তির মালিকানা দিয়ে দেওয়া হতো তা-ও নয়। তবে শরীয়তের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো না। জনস্বার্থ রক্ষা করা ছিল সবার আগে। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বিলাল ইবনে হারিস ইবনুল মুযানী এক টুকরো জমি চেয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বিশাল জমি দিয়ে দেন। অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হবার পরে তাকে বললেন, 'হে বিলাল, তুমি চাওয়ার পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাকে অনেক বড় জমি দিয়েছেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাউকে ফেরাতেন না। এখন জমির পুরোটা ব্যবহার করার মতো অবস্থায় তুমি নেই।' বিলাল বললেন, 'আপনি সত্য বলেছেন।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এবার বিষয়টি ভেবে দেখ। জমির যে অংশের রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারছ তা রেখে দাও। আর বাকিটুকু আমাদের দিয়ে দাও। আমরা তা অন্য মুসলিমদের মধ্যে ভাগ করে দেব।' বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি এ কাজ করব না। আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে যা দিয়ে গেছেন আমি তা ফেরত দেব না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, তোমাকে তা দিতেই হবে।' অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পরিত্যক্ত জমি নিয়ে অন্য মুসলিমদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন।
এখানে দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তি মালিকানাও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সাথে সম্পৃক্ত। যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ তার সম্পত্তির সঠিক পরিচর্যা করতে পারবে এবং ট্রাস্টি হিসেবে এর পূর্ণ ব্যবহার করতে পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাতে অন্য কারও হস্তক্ষেপের অধিকার নেই। এর উল্টো পরিস্থিতি দেখা দিলে শাসক সেই সম্পত্তি ফিরিয়ে নিতে পারবে। বিশেষ করে অন্য মুসলিমরা তা নিতে আগ্রহী হলে, তাদের কাজে লাগাতে পারবে।
১.৭.৪। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
ইসলাম মত প্রকাশের স্বাধীনতার নিরাপত্তা এবং নিশ্চয়তা দান করে। খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রত্যেককে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সুযোগ দিতেন।
তার এমন একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। এক ব্যক্তি তাকে বলল, 'আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এই এই ফাতওয়া দিয়েছেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি হলে এমন এমন বলতাম।' লোকটি বলল, 'আপনি তো খলীফা। তাহলে তা করছেন না কেন?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তাদের এই কথার বিপরীতে আমার কাছে যদি কুরআন বা সুন্নাহের কোনো দলিল থাকত তবে অবশ্যই আমার বক্তব্য জোরালোভাবে উপস্থাপন করতাম। যেহেতু আমার বক্তব্য কেবলই আমার চিন্তাপ্রসূত তাই কিছু বলছি না। প্রত্যেকেরই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে।'
ইজাতহাদের বেলায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহাবীদের মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। নিজের মতামত কারও ওপরে যেমন চাপাতেন না তেমনই অন্য কারও মতামত অনুসরণ করা থেকেও কাউকে বিরত রাখতেন না। তিনি স্বাধীনভাবে সবাইকে মতামত, উপদেশ, যুক্তি-তর্ক প্রকাশের জন্য উৎসাহিত করেছেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কেবল সাহাবায়ে কেরামের মতামত নিতেন, এমন নয়। সাধারণ মুসলিমদের মতামত নিতেও পছন্দ করতেন। এজন্যই তিনি একবার তার এক বক্তৃতায় বলেছিলেন, 'হে লোকসকল, আমার মধ্যে (আচরণ বা কাজে) কোনো বক্রতা দেখলে তা সোজা করে দেবে।' উপস্থিত একজন বলল, 'আল্লাহর কসম, আপনার মধ্যে বক্রতা দেখলে আমরা তরবারী দিয়ে সোজা করতাম।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহর, এই রাষ্ট্রে তিনি অন্তত এমন একজন মানুষ দিয়েছেন যে তার তরবারী দিয়ে আমার বক্রতা সোজা করতে সক্ষম।'
তিনি একবার তার ভাষণের সময় বলেছিলেন, 'তোমরা আমাকে পরামর্শ দিয়ে আমার নফসের বিরুদ্ধে কাজ করতে সাহায্য করবে। আমাকে ভালো কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজে নিষেধ করবে।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গঠনমূলক রাজনৈতিক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'হে লোকসকল, তোমাদের ওপরেও আমাদের হক আছে: তোমরা আমাদের আড়ালেও অনুগত থাকবে এবং ভালো কাজ করতে সাহায্য করবে।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মনে করতেন, খলীফাকে সৎ পরামর্শ দেওয়া সব মুসলমানের দ্বীনী এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এজন্যই তিনি বলেছিলেন, 'হে লোকসকল, আমার মধ্যে (আচরণ বা কাজে) কোনো বক্রতা দেখলে তা সোজা করে দেবে।' তার একটি বিখ্যাত উক্তি, 'যে আমার ভুল ধরিয়ে দিতে পারে সে-ই আমার অতি প্রিয়পাত্র।' তিনি এও বলতেন যে, 'আমি আশংকা করছি, তোমরা আমার আজ্ঞাবহ হয়ে থাকার কারণে হয়তো আমার ভুল ধরিয়ে দেবে না।'
এক ব্যক্তি জনসমক্ষে একবার উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছিল, 'হে উমর, আল্লাহকে ভয় করো।' তার কাণ্ড দেখে অন্যরা রেগে যায় এবং তাকে চুপ করাতে উদ্যত হলো। বরং উপস্থিত জনসাধারণকে তিনি থামিয়ে দিয়ে বললেন, 'তোমরা যদি তার মতো বলতেই না পার—হে উমর আল্লাহকে ভয় করো, তবে তোমাদের মধ্যে ভালো কিছু নেই। আর আল্লাহকে ভয় করার নির্দেশ আমরা (আমীরেরা) যদি না শুনি তবে আমরাও ভালো নই।'
আরেকদিনের ঘটনা। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ভাষণ শেষে মাত্র বললেন, 'হে লোকসকল, আমার কথা শুনবে এবং মানবে।' হঠাৎ এক ব্যক্তি বলে উঠল, 'হে উমর, আমরা শুনবও না, মানবও না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শান্তস্বরে বললেন, 'হে আল্লাহর বান্দা, তা কেন?' লোকটি বলল, 'আমাদের শরীর ঢাকার জন্য একটিমাত্র পোশাক পেয়েছি (আর তুমি কীনা দুটো পরে আছো)।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি যেখানে আছো, থাকো।' তিনি তার ছেলে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে এগিয়ে আসতে বললেন। আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু সামনে এসে বললেন যে, ভালোমতো শরীর ঢাকার জন্য তিনি নিজের ভাগের পোশাক তার পিতাকে দিয়েছেন। অর্থাৎ খলীফা অন্যায়ভাবে বাড়তি পোশাক নেননি। তিনি মানবিকতা এবং সহমর্মীতাবশত সবার মতোই একটিমাত্র পোশাক নিয়েছিলেন। এই কথা শুনে লোকটি বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, এবার আপনার কথা শুনব এবং মানব।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার খুতবায় বলেছিলেন, 'নারীদের চল্লিশ উকিয়ার বেশি দেনমোহর দেবে না। যিল-কিস্সার মেয়েকেও যদি বিয়ে করো (তিনি এখানে ইয়াযিদ ইবনে হুসেনের মেয়ের উদাহরণ দিয়েছেন। আসলে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, অতি সম্ভ্রান্ত বংশের বিত্তবান নারীকে বিয়ে করলেও দেনমোহর বেশি ধার্য করা যাবে না)। কেউ এর বেশি দেনমোহর ধার্য করলে অতিরিক্তটুকু রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নিয়ে নেওয়া হবে।'
ভিড় থেকে এক নারী বলে উঠলেন, 'আপনার এমন কাজ করার অধিকার নেই।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তা কেন?' তিনি কুরআনের একটি আয়াত তিলাওয়াত করে বললেন, 'আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেছেন:
وَإِنْ أَرَدْتُمُ اسْتِبْدَالَ زَوْجٍ مَكَانَ زَوْجٍ وَآتَيْتُمْ إِحْدَهُنَّ قِنْطَارًا فَلَا تَأْخُذُوا مِنْهُ شَيْئًا أَتَأْخُذُونَهُ بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا
যদি তোমরা এক স্ত্রীর পরিবর্তন করতে ইচ্ছে করো এবং তাদের একজনকে প্রচুর ধন-সম্পদ প্রদান করে থাক, তবে তা থেকে কিছুই ফেরত গ্রহণ করো না। তোমরা কি তা অন্যায়ভাবে ও প্রকাশ্য গুনাহের মাধ্যমে গ্রহণ করবে?
অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'একজন নারী ঠিক বলেছে আর একজন পুরুষ ভুল করেছে। আরেকটি বর্ণনামতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'ইয়া আল্লাহ, আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন। উমরের চেয়ে মানুষরা অনেক জ্ঞানী।' তারপরে মিম্বরে উঠে বললেন, 'আমি তোমাদের চল্লিশ দিরহামের বেশি দেনমোহর ধার্য করতে নিষেধ করেছিলাম। তোমরা তোমাদের সাধ্যমতো যত ইচ্ছা দেনমোহর ধার্য করতে পারো।'
তবে শরীয়তের বাইরে গিয়ে মত-প্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি। যার যা ইচ্ছা তা-ই বলতে পারবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত কারও মতামতে মুসলিম জনগোষ্ঠী কিংবা কোনো ব্যক্তি কষ্ট না পাবে ততক্ষণ পর্যন্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতা বহাল থাকবে। খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে নিম্নোক্ত বিষয়ে মতপ্রকাশে নিষেধাজ্ঞা ছিল :
১। ইসলামের বিরুদ্ধে অন্যায়, বিদআত ছড়ানো এবং বাতিলের অনুসরণ
ক। ধর্ম নিয়ে মন্তব্য
এখানে সিরিয়াবাসী নাবাতিয়ান ব্যক্তির ঘটনা আসছে। সেই ব্যক্তি ভাগ্যে বিশ্বাস করত না। লোকটি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বক্তব্যের বিরোধিতা করেছিল। একদিন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বক্তৃতায় উল্লেখ করলেন, 'আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে কেউ পথ দেখাতে পারে না।' কথা শেষ না হতেই ওই ব্যক্তি বলে উঠল, 'আল্লাহ নিশ্চয়ই কাউকে পথভ্রষ্ট করেন না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকটিকে হুমকি দিলেন। জনসমক্ষে যদি এমন কথা দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করে তবে তাকে হত্যা করা হবে বলে শাসালেন।
আস সাইব ইবনে ইয়াযিদ উদ্ধৃত করেছেন: এক ব্যক্তি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গিয়ে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, (তারপরে কুরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করল) :
وَ الذُّرِيتِ ذَرْوَانَ فَالْحَمِلْتِ وِقُرَّانَ
কসম ঝঞ্ঝাবায়ুর, অতঃপর বোঝা বহনকারী মেঘের।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি কি ওই ধরনের লোক?' এই বলে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। জামার হাতা গুটিয়ে হাতের বেত দিয়ে লোকটিকে মারতে শুরু করেন। মারতে মারতে এক সময় তার মাথার পাগড়ি খুলে যায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'যে সত্তার হাতে উমরের জীবন, তার কসম, তোমার মাথার চুল ফেলা থাকলে আমি সেখানেও পেটাতাম। এর কাপড় দিয়ে দাও। উটের পিঠে তুলে দিয়ে এসো। তাকে নিজের দেশে পাঠিয়ে দাও। সেখানে তাকে দেখামাত্র যেন লোকজন বলতে থাকে-সাবিগ জ্ঞান অর্জন করতে গিয়ে উল্টো তা হারিয়েছে।' আমৃত্যু সে এমন অবহেলিত এবং অপমানিত হয়েছে।
খ। বাক-স্বাধীনতার নামে পরনিন্দা এবং অপমানজনক বক্তব্য
আয-যাবারকান ইবনে বদরকে আল-হুতায়া অপমান করেছিলেন বলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে কারাগারে ঢুকিয়ে দেন। আল-হুতায়া তার একটি কবিতায় আয-যাবারকানকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল :
খ্যাতির লোভে ঘুরে বেড়িয়ো না, নিজের জায়গায় থাকো, খাবার আর পোশাক পৌঁছে যাবে।
আয-যাবারকানকে একজন নারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, ঘরে কাজ করার বিনিময়ে নারীদের খাবার-দাবার এবং পোশাকের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।
হুতায়া যদি এভাবে আর কাউকে অপমান করে তবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার জিহ্বা কেটে ফেলবেন বলে হুমকি দিলেন। হাজতে থাকার হুতায়া খলীফার উদ্দেশ্যে আরেকটি কবিতা লেখে। খলীফা ছাড়া তার সন্তানদের অভিভাবক বলতে আর কেউ নেই, এমন কথার উল্লেখ ছিল। তার কবিতা পড়ে খলীফার মন নরম হয়ে আসে। হুতায়া আর কাউকে অপমান না করার শর্তে কারাভোগ থেকে মুক্তি পেয়েছিল। বলা হয়ে থাকে, এমন কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য খলীফা তাকে তিন হাজার দিরহাম দিয়েছিলেন।
১.৭.৫। ইহুদি-খ্রিস্টান নারীকে বিয়ে করা প্রসঙ্গে উমর রা.-এর অভিমত
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে পারলেন, হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহু একজন ইহুদী নারীকে বিয়ে করেছেন। তখন তিনি ওই সাহাবীকে চিঠির মাধ্যমে পরামর্শ দিলেন, তিনি যেন তার স্ত্রীকে (তালাকের মাধ্যমে) ছেড়ে দেন। হুযায়ফা রাযিয়াল্লাহু আনহু উত্তরে লিখলেন, 'আমাদের বিয়েকে আপনি হারাম বলে দাবী করছেন? এই কারণে তাকে ছেড়ে দিতে হবে?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাব দিলেন, 'আমি হারাম বলছি না; বরং আমি আশংকা করছি, তোমরা (মুসলিমরা) ব্যভিচারী নারীদের বিয়ে করতে থাকবে।' অন্য বর্ণনামতে তিনি লিখেছিলেন, 'আমি আশংকা করছি তোমরা মসুলমান নারীদের ফেলে ব্যভিচারী নারীদের বিয়ে করবে।'
এই প্রসঙ্গে আবু যুহরা বলেছেন, 'এখানে মনে রাখতে হবে, একজন মুসলিম পুরুষের জন্য মুসলিম নারীই উত্তম। তাতে তাদের মধ্যে সবসময় সুসম্পর্ক বজায় থাকবে। সংগত কারণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আহলে-কিতাব নারীদের বিয়ে করা থেকে মুসলিম পুরুষদের বিরত থাকতে বলতেন। এতে মুসলিমদের মধ্যে একতা এবং সৌহার্দ সৃষ্টি হবে। অন্যরাও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হবে।'
পবিত্র কুরআন মাজীদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, একজন মুমিনা দাসী একজন আকর্ষণীয় ও সম্ভ্রান্ত মুশরিক নারীর তুলনায় উত্তম। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكَتِ حَتَّى يُؤْمِنَّ وَلَامَةٌ مُؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُشْرِكَةٍ وَ لَوْ أَعْجَبَتْكُمْ ۚ وَلَا تَنْكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّى يُؤْمِنُوا وَ لَعَبْدٌ مُؤْمِنٌ خَيْرٌ مِّنْ مُشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ أُولَئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ وَاللَّهُ يَدْعُوا إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ وَيُبَيِّنُ آيَتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ
আর তোমরা মুশরিক নারীদেরকে বিয়ে করো না, যতক্ষণ না তারা ঈমান গ্রহণ করে। অবশ্য মুসলিম ক্রীতদাসী মুশরিক নারী অপেক্ষা উত্তম, যদিও তাদেরকে তোমাদের কাছে ভালো লাগে। এবং তোমরা নারীরা কোনো মুশরিকের সাথে বিবাহ- বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে না, যে পর্যন্ত না সে ঈমান আনে। একজন মুসলিম ক্রীতদাসও একজন মুশরিকের তুলনায় অনেক ভালো, যদিও তোমরা তাদেরকে দেখে মোহিত হও। তারা দোযখের দিকে আহ্বান করে, আর আল্লাহ নিজের মাধ্যমে আহ্বান করেন জান্নাত ও ক্ষমার দিকে। আর তিনি মানুষকে নিজের নির্দেশ বাতলে দেন যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।
এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলা মুসলিম পুরুষদের নিষেধ করেছেন তারা যেন মুশরিক নারীদেরকে বিয়ে না করে। মুশরিককে বিয়ে করতে গিয়ে মুসলিম পুরুষ যেন আশা না করে যে ভবিষ্যতে সেই নারী ইসলাম গ্রহণ করবে। তাকে অবশ্যই বিয়ের আগে ইসলাম গ্রহণ করতে হবে। কালো হোক, দরিদ্র হোক, তারপরেও মুসলিম পুরুষের জন্য মুসলিম নারী উত্তম। একইভাবে আল্লাহ তা'আলা মুসলিম নারীকেও মুশরিক পুরুষ বিয়ে করতে নিষেধ করেছেন। সুদর্শন, সম্পদশালী এবং সম্ভ্রান্ত মুশরিকের তুলনায় সাধারণ মুসলিম দাসও উত্তম।
এখন জটিল বিষয় হলো, একদিকে মুশরিকদের বিয়ে করতে নিষেধ করা হয়েছে, অন্যদিকে ইহুদী-খ্রিস্টান নারীকে বিয়ে করা বৈধ বলা হয়েছে :
وَالْمُحْصَنَتُ مِنَ الْمُؤْمِنَتِ وَالْمُحْصَنَتُ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ مِنْ قَبْلِكُمْ
তোমাদের জন্য হালাল সতী-সাধ্বী মুসলিম নারী এবং তাদের সতী-সাধ্বী নারী, যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তোমাদের পূর্বে।
অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে, পূর্বোক্ত আয়াতে শরীয়তের সাধারণ নিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং পরবর্তী আয়াতে শরীয়তের এই নিয়ম শিথিল করা হয়েছে। তবে তারা এই বিষয়ে একমত যে মুসলিম পুরুষের জন্য মুসলিম নারী উত্তম। সমসাময়িক উলামায়ে কেরাম মনে করেন, ইহুদী-খ্রিস্টান নারীকে বিয়ে করলে স্বামী-সন্তান এবং সমাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশংকা থাকলে তাদের বিয়ে করা যাবে না। ঠিক এই কথা ভেবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সে যুগে এমন অসম বিয়ে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে দুটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে :
✓ প্রথমত মুসলিম পুরুষরা ঢালাওভাবে আহলে-কিতাবী নারীদের বিয়ে করতে শুরু করলে ঘরে ঘরে মুসলিম নারীরা অবিবাহিত থেকে যাবে।
✓ ইহুদি-খ্রিস্টান মায়ের প্রভাবে মুসলিম সন্তানদের ধর্ম এবং নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটবে।
অসম বিয়ে রোধের পেছনে এই দুটি কারণই যথেষ্ট। আমারা তো আমাদের সময়ে এখন এগুলোর বাইরেও আরও অনেক নতুন নতুন সমস্যা দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং এমন অসম বিয়ে নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রফেসর জামিল মুহাম্মদ মুবারাক এমন আরও অনেক কারণের ফিরিস্তি দিয়েছেন :
✓ আহলে-কিতাবী নারীরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে গুপ্তচর হয়ে কাজ করলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
✓ মুসলিম ভূখণ্ডে কাফেরদের প্রথা প্রচার ও প্রসার লাভ করতে পারে।
✓ আহলে-কিতাব নারীদের বিয়ে করার পরে অজ্ঞ মুসলিমরা স্ত্রীর হাতের পুতুল হয়ে যাবে।
✓ ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ মুসলিমরা আহলে কিতাবদের সামনে হীনমন্যতায় ভুগবে।
আমাদের যুগে আহলে-কিতাব নারীদের বিয়ে না করার পক্ষে এই কারণগুলোই যথেষ্ট।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে মুসলিমজনগোষ্ঠীর বৃহত্তর স্বার্থে ইহুদি-খ্রিস্টান নারীদের বিয়ের ব্যাপারে বাধ্য-বাধকতা ছিল। আর রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বেলায় শরীয়ত ছিল আরও কঠোর। বিধর্মীদের বিয়ে করায় রাষ্ট্র হুমকির মুখে পড়ার আশংকা ছিল। কারণ, স্বামীর কোনো কিছু স্ত্রীর কাছে সাধারণত গোপন থাকে না। সুতরাং বিধর্মী স্ত্রীরা সহজেই অন্য রাষ্ট্রের হয়ে গুপ্তচরের কাজ করতে সক্ষম। মুসলিমরাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির স্ত্রী হিসেবে গোপন তথ্যাদি জানা এবং পাচার করা কঠিন হবে না। তাছাড়া ইসলামরে মিষ্টতা থেকে বঞ্চিত নারীদের কাছ থেকে স্বামীদের প্রতি সম্মান এবং শ্রদ্ধার আশা করাও অবান্তর। বলাবাহুল্য, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এসব ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকতেন। তাই তার এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ নেতাদের জন্য শিক্ষা ছিল। মুসলিম পুরুষের জন্য আহলে-কিতাব নারীদের বিয়ে করা কোনো দিক দিয়েই সুখকর নয়। তারা নিজ ধর্ম আঁকড়ে থাকার ফলে ঈমানের মিষ্টতা থেকে যেমন বঞ্চিত থাকে, তেমনই স্বামীর প্রতি পূর্ণমাত্রায় অনুগতও থাকতে পারে না। মানুষের চরিত্র সম্পর্কে ভালোভাবে জানা ছিল বলেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অসম বিয়ের বিপক্ষে ছিলেন। আমরা ইতোমধ্যে পরিস্থিতির ভয়াবহতা চারপাশে দেখতে পাচ্ছি।
খুলফায়ে রাশেদীনের যুগে মানুষের স্বাধীনতা সুরক্ষিত ছিল। তবে তাতে কিছু বাধ্যবাধকতাও ছিল। এমন নিয়মের কারণে মুসলিমসমাজ উন্নতি লাভ করেছিল। ব্যক্তি এবং সমাজ উভয়ের জন্য স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার হিসেবে গণ্য হয়। তাই সমাজ থেকে স্বাধীনতা চলে গেলে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ইসলামে স্বাধীনতা হলো এমন এক নূর যা আল্লাহ তা'আলার সাথে মানুষের সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই নূরের বরকতে মানুষ শ্রেষ্ঠত্বের দিকে ধাবিত হয়। সঠিক কাজ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা তার ধ্যান-জ্ঞান হয়ে যায়। খুলাফায়ে রাশেদীনের সময় মানুষ সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে। এর নযীর ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

টিকাঃ
৪৬৮. নিদহাম আল-হুকম ফিশ-শারীয়াহ ওয়াত-তারীখ আল-ইসলামী, পৃ. ১৫৭,১৫৮।
৪৬৯. সূরা আল-বাকারা, ২: ২৫৬।
৪৭০. সূরা আশ-শূরা, ৪২: ৪৮।
৪৭১. সূরা আন-নাহল, ১৬: ১২৫।
৪৭২. সূরা আনকাবুত, ২৯: ৪৬।
৪৭৩. সূরা হজ, ২২: ৪০।
৪৭৪. মু'আমালা গায়র আল-মুসলিমীন ফিল-মুজতামা আল ইসলামী, এডওয়ার্ড ঘালি, পৃ. ৪১।
৪৭৫. সূরা আল-বাকারা, ২: ২৫৬।
৪৭৬. নিদহাম আল-হুকম ফিশ-শারীয়াহ ওয়াত-তারীখ আল-ইসলামী, ১/৫৮।
৪৭৭. তারীখ আত-তাবারি, ৪/১৫৮।
৪৭৮. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/৯৮।
৪৭৯. আস-সুলতাহ আত-তানফীদিয়া, ড. মুহাম্মাদ আদ-দেহলভী, ২/৭২৫।
৪৮০. প্রাগুক্ত।
৪৮১. হুকুক আল-ইনসান বাইনা তা'লীম আল-ইসলাম ওয়া-আ'ইলান আল-উমাম আল-মুতাহাদা, পৃ. ১১১।
৪৮২. নিদহাম আল-হুকম ফি আহ'দ আল খুলাফা আর-রাশিদীন, পৃ. ১১৭।
৪৮৩. আল-আমওয়াল, আবু উবাইদ, পৃ. ৫৭; আহকাম আহলুয-যিম্মাহ, ইবনে কাইয়িম, ১/৩৮।
৪৮৪. নাসবুর-রায়াহ, আয-যাইলাঈ, ৭/৪৫৩।
৪৮৫. নিদহাম আল-হুকম ফি আহ'দ আল খুলাফা আর-রাশিদীন, পৃ. ১৬০।
৪৮৬. আল-মুরতাদী সীরাহ আমীর আল-মুমিনীন, হাসান আল-নদভী, পৃ. ১০৯।
৪৮৭. প্রাগুক্ত।
৪৮৮. আল-কুদ আল-ওয়ারিদা আলা সুলতাত আদ-দাওরা, পৃ. ১৫১।
৪৮৯. আস-সুনান আল-কুবরা, আল-বায়হাকি, ৯/২০৮; মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, ৬/৫৩।
৪৯০. সহীহ, বুখারী, ৭২৩০।
৪৯১. আল-আমওয়াল, আবু উবায়েদ, পৃ. ২৪৫।
৪৯২. আল-খারাজ, আবু ইউসুফ, পৃ. ৭৯।
৪৯৩. সূরা আল-বাকারা, ২: ১৯৩।
৪৯৪. সূরা আল-বাকারা, ২: ১৯৪।
৪৯৫. নিদহাম আল-হুকম ফি আহ'দ আর-রাশিদীন, পৃ. ১৬৩।
৪৯৬. সূরা মায়েদা, ৫: ৩২।
৪৯৭. নিদহাম আল-হুকম ফি আহ'দ আর-রাশিদীন, পৃ. ১৬৪।
৪৯৮. প্রাগুক্ত, ১৬৫।
৪৯৯. সূরা আন-নূর, ২৪: ২৭-২৮।
৫০০. সূরা আল-বাকারা, ২: ১৮৯।
৫০১. সূরা হুজুরাত, ৪৯: ১২।
৫০২. নিদহাম আল-হুকম, ১৬৮।
৫০৩. প্রাগুক্ত, ১৮৯।
৫০৪. প্রাগুক্ত, ১৯০।
৫০৫. আল-মুঘনী, ৫/৫৭৯); নিদহাম আল-আদ, মুহাম্মাদ আবু ইয়াহিয়া, পৃ. ২০৭।
৫০৬. নিদহাম আল-হুকম ফি আহ'দ আল খুলাফা আর-রাশিদীন, হামাদ আস-সামাদ, পৃ. ১৯২।
৫০৭. আ'ইলাম আল-মুয়াক্কি'ঈন, ১/৬৫।
৫০৮. নিদহাম আল-হুকম ফি আহ'দ আল খুলাফা আর-রাশিদীন, পৃ. ১৯৭।
৫০৯. প্রাগুক্ত।
৫১০. প্রাগুক্ত।
৫১১. প্রাগুক্ত।
৫১২. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৮; আশ-শাইখান আবু বকর ওয়া উমর মিন রিওয়ায়াতি আল-বালাধিরী, পৃ. ২৩১।
৫১৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৮।
৫১৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ২০০।
৫১৫. উ'য়ূন আল-আখবার, ১/৫৫; মাহদুস সাওয়াব, ২/৫৭৯।
৫১৬. সূরা আন-নিসা, ৪: ২০।
৫১৭. তাফসীর ইবনে কাসীর, ২/২১৩। ইবনে কাসীর রহমাতুল্লাহি আলাইহির এই বর্ণনা আয-যুবায়ের ইবনে বক্করের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেছেন। লক্ষ্যণীয় যে, বর্ণনাটির সিলসিলা অসংযত। আবু হাতিম তার মুসনাদে এবং আল-বাইহাকী সুনানে এই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। আল-বাইহাকী বলেছেন, 'বর্ণনাটি মুরসাল হলেও ঠিক আছে।'
৫১৮. আবু ইয়া'লা এর সনদ জায়্যিদ বলে উল্লেখ করেছেন। মাজমা আয-যাওয়ায়েদ, ৪/২৮৩।
৫১৯. সিরিয়ার পথে অবস্থিত। এলাকার নাম কুস্তানতীন আল-জাসালীক।
৫২০. আল-আহওয়া ওয়াল-ফারক ওয়াল-বিদা' ওয়া-মাওকিফ আস-সালাফ মিনহা, ড. নাসির আল- আ'ল, পৃ. ২২৩।
৫২১. সূরা আয-যারিয়াত, ৫১: ১-২।
৫২২. তার পুরো নাম সাবিঘ ইবনে আসীল আল-হানযালি। কুরআনের বিভিন্ন জটিল আয়াত নিয়ে সে উমর রাযিয়াল্লঅহু আনহুকে প্রশ্ন করত। লোকটিকে তিনি (খলীফা) খাওয়ারিজদের মতাদর্শী উল্লেখ করে তিরস্কার করতেন।
৫২৩. শরহে উসূল আ'ইতিকাদ আহলুস-সুন্নাহ, লালিকাঈ, ৩০/৬৩৪-৬৩৫।
৫২৪. রাসূল সা.-এর একজন সাহাবী ছিলেন আয-যাবারকান ইবনে বদর আত-তামীমী। রাসূল সা.-এর নির্দেশে তিনি নিজের গোত্র থেকে সাদাকা সংগ্রহের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।
৫২৫. তার পুরো নাম জারওয়াল ইবনে মালিক ইবনে জারওয়াল। তিনি খাটো ছিলেন বলে তাকে সবাই আল-হুতায়া বলে ডাকতো।
৫২৬. সুলতাত আত-তানফীদিয়া, ২/৭৪৫।
৫২৭. তাফসীর আল-কুরতুবী, ১২/১৭৩-১৭৪। আশ-শা'ইর ওয়াশ-শু'আরাহ, ইবনে কতীবাহ, ১/৩২৭; উমর ইবনে আল-খাত্তাব, ড. আহমাদ আবু আন-নাসর, পৃ. ২২৩।
৫২৮. আশ-শা'ইর ওয়াশ-শু'আরাহ, ইবনে কতীবাহ, ১/৩২৭; উমর ইবনে আল-খাত্তাব, ড. আহমাদ আবু আন-নাসর, পৃ. ২২৩।
৫২৯. আসহাব আর-রাসূল, ১/১১০; মাহমুদ আল-মিসরী এবং মাহদ আস-সাওয়াব, ১/৩৭৬। হাদীসটি সহীহ।
৫৩০. হাদীসটি সহীহ। তাফসীর ইবনে কাসীর, ১/২৬৫।
২০১. আল-আহওয়াল আল-শাখসিয়া, আবু যাহরা, পৃ. ১০৪।
২০২. সূরা আল-বাকারা, ২: ২২১।
৫৩৩. ফিকহুল আওলাউয়্যাত: দিরাসা ফিদ-দাওয়াবিত, মুহাম্মাদ আল-ওয়াকীলী, পৃ. ৭৭।
৫৩৪. সূরা আল-মায়েদা, ৫ : ৫।
৫৩৫. আল-ফিকহ আ'লাল-মাযাহিব আর-আরবা'আহ, আব্দুর রহমান আল-জাযাইরী, ৫/৭৬, ৭৭।
৫৩৬. ফিকহুল আওলাউয়ি‍্যাত: দিরাসাহ ফিদ-দাওয়াবিত, মুহাম্মাদ আল-ওয়াকীলী, পৃ. ৭৭।
৫০৭. ফিকহুল আওলাউয়ি‍্যাত: দিরাসাহ ফিদ-দাওয়াবিত, মুহাম্মাদ আল-ওয়াকীলী, পৃ.৭৮।
৫০৮. শাহীদ আল-মেহরাব, আত-তিলমাসানি, পৃ. ২১৪।
৫৩৯. প্রাগুক্ত।
৫৪০. আল-মুজতামা আল-ইসলামি, ড. মুহাম্মাদ আবু আজওয়া, পৃ. ২৪৫।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 খলীফার বেতন-ভাতা; হিজরী বর্ষপঞ্জীর প্রবর্তন; ‘আমীরুল মু'মিনীন’ খেতাবের প্রচলন

📄 খলীফার বেতন-ভাতা; হিজরী বর্ষপঞ্জীর প্রবর্তন; ‘আমীরুল মু'মিনীন’ খেতাবের প্রচলন


১.৮.১। খলীফার বেতন
মুসলিমরাষ্ট্রে খেলাফত দ্বীনি দায়িত্ব হিসেবে পরিগণিত হয়। এর মাধ্যমে আল্লাহ তা'আলার সাথে নৈকট্য লাভ করা সম্ভব। খলীফা হিসেবে কেউ আনুগত্য, আন্তরিকতা, ত্যাগ এবং দায়বদ্ধতার সাথে কাজ করলে আল্লাহ তা'আলা নিশ্চিতভাবে তাকে আখেরাতে পুরস্কৃত করবেন। আবার পাপীদের শাস্তিও আল্লাহ তা'আলা নির্ধারণ করে রেখেছেন।
আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: فَمَنْ يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَا كُفْرَانَ لِسَعْيِهِ وَإِنَّا لَهُ كَاتِبُوْنَ অতঃপর যে বিশ্বাসী অবস্থায় সৎকর্ম সম্পাদন করে, তার প্রচেষ্টা অস্বীকৃত হবে না এবং আমি তা লিপিবদ্ধ করে রাখি।
আল্লাহ তা'আলা আখেরাতে পুরস্কার দেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। একজন খলীফা যখন উম্মতের স্বার্থে কষ্ট করেন এবং নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে যান তখন তিনি দ্বিগুণ পুরস্কারের হকদার হয়ে যান। প্রথমত আল্লাহ তা'আলা তাকে আখেরাতে পুরস্কার দেবেন, তার সাথে তিনি মানুষের জন্য কাজ করেন বলে দুনিয়াবী পুরস্কার হিসেবে তাকে আর্থিক বেতন-ভাতা লাভের সুযোগ করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি জনস্বার্থে কাজ করবেন তাকে মুফতি, কাজী কিংবা ওয়ালীগণও সাহায্য করবেন বলে শরীয়তে বলা হয়েছে। মানুষের জন্য কাজ করার বিনিময়ে উপযুক্ত সম্মানী পাওয়া শরীয়তমতে জায়েয। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে যারা মুসলিম কিংবা বা সমাজের জন্য কাজ করতেন তাদের জন্য বেতন ধার্য করে দিয়েছিলেন।
খেলাফতের শুরুর দিকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কোনো বেতন নেননি। নিজের ব্যবসার লভ্যাংশ থেকে সংসারের জন্য খরচ করতেন। রাষ্ট্রীয় কাজে তিনি ক্রমশ ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এতে করে ব্যবসায় সময় দিতে পারছিলেন না। স্বাভাবিকভাবে তার ব্যবসায় লোকসান হতে থাকে। এভাবে তিনি চরম অর্থকষ্টে পড়ে যান।
শেষ পর্যন্ত তিনি এ বিষয়ে সাহাবীদের পরামর্শ চাইলেন। তিনি বললেন, 'আমি খেলাফতের কাজে ব্যস্ত থাকি বলে আয়-রোজগার করতে পারছি না। এখন আমি কতটুকু কী পেতে পারি?'
উসমান ইবনে আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'নিজে খাবার গ্রহণ করুন এবং পরিবারকেও দিন।' সাঈদ ইবনে যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়েল রাযিয়াল্লাহুও তার সাথে একমত ছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবার আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে ফিরে বললেন, 'আপনার কী মন্তব্য?' আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'সকাল এবং রাতের খাবার।' তিনি এ কথা অনুসরণ করেছিলেন। বায়তুল মাল থেকে তিনি কী কী নেবার হকদার সে প্রসঙ্গে বলেছেন, 'বায়তুল মাল থেকে আমি ইয়াতীমের অভিভাবকের মতো ভাতা নেব। আমার প্রয়োজন না হলে কিছুই নেব না। আর প্রয়োজন হলে আইন মেনে তা গ্রহণ করব।'
আরেকটি বর্ণনায় আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহাবায়ে কেরামের সাথে দেখা করে বললেন, 'আল্লাহর মাল (মুসলিম রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বায়তুল মাল থেকে) কতটুকু নেওয়া আমার জন্য বৈধ বলে আপনারা মনে করেন?' তারা বললেন, 'আমীরুল মুমিনীন আমাদের চাইতে এ সম্পর্কে ভালো জানেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তোমরা চাইলে আমি বলতে পারি, আল্লাহর মাল থেকে আমার জন্য কতটুকু নিতে পারি। হজ বা উমরা করার জন্য একটা সওয়ারী, শীতবস্ত্র, গরমের পোশাক, পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর মতো খাবার, একজন সাধারণ মুসলমানের সমান ভাতা। কারণ, আমি একজন সাধারণ মুসলিম ছাড়া ভিন্ন কিছু নই।' মুআম্মার রাযিাল্লাহু আনহু বলেছেন, 'হজ এবং উমরা পালনের জন্য তিনি একটিমাত্র উট ব্যবহার করতেন।'
মুসলমানের মধ্যে মাল বণ্টনের ক্ষেত্রে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ন্যায়পরায়ণতার মূর্ত প্রতীক। মালিক ইবনে আওস ইবনুল হাদাসানের বরাত দিয়ে আবু দাউদ মন্তব্য করেছেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একদিন ফাঈ প্রসঙ্গে বয়ান করছিলেন। ফাঈ বিশেষ ধরনের যুদ্ধলব্ধ মাল বা গনীমত। যুদ্ধের আগেই শত্রু পরাজয় স্বীকার করে নিলে বা আত্মসমর্পণ করলে সেই মালামালকে ফাঈ বলা হয়। এ প্রসঙ্গে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলছিলেন, 'আমার তুলনায় তোমরা ফাঈর অধিক হকদার। এর ওপরে অন্যদের তুলনায় আমাদের মধ্যকার লোকের হক আগে। কারণ, গনীমতের মাল বণ্টনের জন্য কুরআনের উপরে ভিত্তি করে আমাদের পদমর্যাদা নির্ধারণ করা হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বয়স, দ্বীনের প্রতি একাগ্রতা, প্রতিপাল্যের সংখ্যা এবং প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে মালামাল ভাগ করে দিতেন।'
আর-রাবী ইবনে যায়েদ আল-হারিসি রাযিয়াল্লাহু আনহু উল্লেখ করেছেন, তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেদমতে হাজির হয়ে বলেছিলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, উত্তম খাদ্য, উত্তম বাহন এবং উত্তম পোশাক ব্যবহারের হক আপনার সবচেয়ে বেশি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার মাথায় খেজুরের শুকনো ডাল দিয়ে বাড়ি দিলেন। বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমার মনে হচ্ছে তুমি আল্লাহ তা'আলার জন্য এই কথা বলোনি। বরং আমার তোষামোদি করতে এ কথা বলেছ। আমি তোমাকে ভালো মনে করেছিলাম। অভিশাপ তোমাকে! তুমি কী জান, আমি আর এই মুসলিমরা কেমন?' আর-রাবী জানতে চাইলে তিনি বললেন, 'মনে করো, কিছু লোক সফরে বের হয়েছে। তারা তাদের পথখরচ একজনের হাতে তুলে দিয়ে বলল, 'আমাদের জন্য খরচ করবে।' তখন ওই ব্যক্তি সেই সম্পদ নিজের জন্য রেখে দিলে কাজটি কি সঠিক হবে?' আর-রাবী বললেন, 'না, হে আমীরুল মুমিনীন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমার আর মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদাহরণ এমন।'
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ফকীহগণ খলীফাদের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত এই ফাতওয়া দিয়েছেন:
✓ খলীফাকে তার কাজের বিনিময়ে সম্মানী দিতে হবে। ইমাম নববী, ইবনুল আরাবী, আল বুহূতি এবং ইবনে মুফলি তা সমর্থন করেছেন।
আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা থাকাকালীন কাজের বিনিময়ে সম্মানী নিতেন।
মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য খলীফারা যে সময় ব্যয় করেন তার বিনিময়ে বেতন গ্রহণ করতে পারেন। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বেতন নিতেন।
ইবনে মুনীর মনে করেন একজন খলীফার চাহিদা থাকুক চাই না থাকুক—বেতন পাওয়ার হক তার আছে। খলীফার বেতন নেওয়া বরং ভালো। কারণ, বেতনের নিশ্চয়তা পেলে তারা নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারবেন। এখানে আনুগত্যের কথা আসছে না। কাজের বিনিময়ে বেতন-ভাতা প্রদান করা হলে মানুষ সাধারণত আরও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। কারণ, তখন বেতনের হক আদায় করার ফিকির চলে আসে।
১.৮.২। মুসলিম বর্ষপঞ্জী
মুসলিম সভ্যতার পরিচয় ও বিকাশে ইসলামী বর্ষপঞ্জী একটি মাইলফলক। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সর্বপ্রথম হিজরী সনের প্রবর্তন করেন।
মাইমুন ইবনে মেহরান বলেছেন: একবার উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে কিছু ব্যবসায়িক কাগজপত্র আসে। সেগুলো শা'বান মাসের উল্লেখ ছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, কোন বর্ষপঞ্জীর শা'বান মাস উল্লেখ করা হয়েছে। তখন তিনি জানতে চাইলেন, 'গত বছরের শা'বান, না এই শা'বান, নাকি আগামী শা'বান?' তিনি সাহাবীদের বললেন, 'আপনারা সবার সুবিধার্থে একটি বর্ষপঞ্জী চালু করুন।' একজন বললেন রোমানদের বর্ষপঞ্জী অনুসরণ করতে। ততদিনে রোমান বর্ষপঞ্জীর ছয়শ বছর পার হয়ে গেছে। অর্থাৎ জুলকারনাইনের সময় থেকে এর গণনা শুরু হয়েছিল।
আরেকজন পারসিকদের বর্ষপঞ্জী অনুসরণের কথা বললেন। অন্যরা বলে উঠলেন, 'নতুন রাজা আসলেই তারা চলমান বর্ষপঞ্জী বাতিল করে আবার নতুনভাবে গণনা শুরু করে। আগেরটা বাতিল করে দেয়।' সবাই তখন মুসলিমদের একটি একক বর্ষপঞ্জীর প্রয়োজন বোধ করলেন। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মদীনায় হিজরত করার কথা আলোচনায় আনেন। দেখা গেল ততদিনে দশ বছর পার হয়ে গেছে। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের ওপরে ভিত্তি করে হিজরী সনের প্রবর্তন করা হয়।
আরেকটি বর্ণনামতে, উসমান ইবনে উবায়দুল্লাহ সাঈদ ইবনে মুসায়্যিবকে বলতে শুনেছেন: উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু আনসার-মুহাজিরদের ডেকে জিজ্ঞেস করলেন কোনো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বর্ষপঞ্জীর প্রবর্তন করলে ভালো হয়। আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রস্তাব করলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুশরিকদের দেশ ত্যাগ করার (মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের) দিন থেকে শুরু করা যেতে পারে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার প্রস্তাব শুনে হিজরী সনের প্রবর্তন করলেন।
সাঈদ ইবনে মুসায়্যিব বলেছেন, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম বর্ষপঞ্জীর প্রবর্তক। তিনি খলীফা হবার আড়াই বছরের মাথায় এর সূচনা করেছিলেন। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরামর্শক্রমে ১৬ই মুহাররম থেকে মুসলিম বর্ষপঞ্জীর যাত্রা শুরু হয়।'
আবু আয-যানাদ উল্লেখ করেছেন: মুসলিম বর্ষপঞ্জীর জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শ নিয়েছিলেন। সবার মতামত নিয়ে হিজরী সন প্রবর্তিত হয়েছে।
এ তো গেল হিজরী সন প্রবর্তনের ঘটনা। এবার, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রথম মাস হিসেবে মুহাররমকে কেন বেছে নিয়েছিলেন সেই প্রসঙ্গে আসা যাক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রবিউল আউয়াল মাসে মদীনায় পৌঁছেন। তা সত্ত্বেও মুহাররম বছরের প্রথম মাস কেন? উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট সাহাবায়ে কেরাম চারটি মাসের নাম প্রস্তাব করেছিলেন-নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম-তারিখ, তার ওপরে প্রথম ওহী নাযিলের মাস, তার হিজরতের মাস এবং ইন্তেকালের মাস।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম-তারিখ এবং প্রথম ওহী নাযিল হওয়ার সময় নিয়ে মতভেদ ছিল। আবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের বছর থেকে বর্ষপঞ্জীর সূচনা হোক তা কেউই চাননি। কারণ, তাতে মুসলিম উম্মাহ ব্যথাতুর হয়ে পড়বে। বাকি থাকলো হিজরতের ঘটনা। রবিউল আয়াল থেকে শুরু করে মুহাররম পর্যন্ত মাসগুলো সাজানো হলো। কারণ, মুহাররম মাসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। জিলহজ মাসে আল-আকাবার দ্বিতীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই ঘটনা হিজরতের প্রথম ধাপ ছিল। এই চুক্তির পরেই তিনি মদীনায় হিজরতের ব্যাপারে তিনি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন। তারপরে যে চান্দ্র-মাস শুরু হয়েছিল, তা ছিল মুহাররম। তাই মুহাররমকে সকলে হিজরী সনের প্রথম মাস হিসেবে যথাযথ মনে করলেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে একাত্মতা সৃষ্টি করেছিলেন। আরব ভূখণ্ডজুড়ে নিজস্ব মুসলিম বর্ষপঞ্জী থাকায় তারা নিজেদের জাতিগত ঐতিহ্য, গর্ব এবং ইতিহাস একত্রে সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। এতে করে শত্রু দমন ও বিজয় অর্জন করা সহজ হয়ে যায়।
১.৮.৩। আমীরুল মুমিনীন খেতাব
শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সকলে 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খলীফা' বলে ডাকতো। তার ইন্তেকালের পরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে কী নামে ডাকা হবে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। প্রথমে প্রস্তাব করা হলো, 'রাসূলুল্লাহর খলীফার খলীফা' ডাকা যেতে পারে। স্বাভাবিকভাবে এই উপাধি যুক্তিপূর্ণ ছিল না। কারণ, পরবর্তী খলীফাদের 'রাসূলুল্লাহর খলীফার খলীফার খলীফার খলীফা' এভাবে ডাকতে গেলে তা দীর্ঘ এবং একঘেয়ে শোনাবে।
অতঃপর কয়েকজন সাহাবা রাযিয়াল্লাহু আনহুম ভেবে-চিন্তে একটি সুন্দর সমাধান বের করলেন। তারা এমন এক উপাধির কথা ভাবলেন যা পরবর্তী সব খলীফার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে। তারা বললেন, 'আমরা মুমিন। আর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আমাদের আমীর (নেতা)।' ফলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে 'আমীরুল মুমিনীন' বলে সম্বোধন করা হলো।
ইবনে শিহাব উল্লেখ করেছেন, উমর ইবনে আব্দুল আযীয রাযিয়াল্লাহু আনহু সুলায়মান ইবনে আবি খাইসামাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উত্তরসূরি আবু বকর হতে-এমন কেন লিখতেন? উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুও লিখতেন, আবু বকরের উত্তরসূরি উমর হতে। দাপ্তরিক কাগজপত্র কে সর্বপ্রথম 'আমীরুল মুমিনীন' উপাধী লিখতে শুরু করেছিলেন?'
সুলায়মান বললেন, 'আমার দাদী/নানী আশশিফা বিনতে আব্দুল্লাহ আল-আদউইয়া রাযিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন প্রথম হিজরতকারীদের একজন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বাজারে গেলেই নিয়মিত তার সাথে দেখা করতেন এবং খোঁজখবর নিতেন। তিনি বলেছিলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব ইরাকের গভর্নরের কাছে চিঠি লিখেছিলেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, 'আমার কাছে দুজন শক্তিশালী এবং সৎ লোক পাঠাবে। তাদের কাছ থেকে আমি ইরাক এবং এর জনগণের তথ্য নেব।'
গভর্নর তখন লাবীদ ইবনে রাবীয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আদীই ইবনে হাতিম রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পাঠান। তারা মদীনায় পৌঁছে তাদের উটগুলো মসজিদপ্রাঙ্গনে নতজানু করে বসালেন। অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করলেন। তারা আ'মর ইবনুল আ'স রাযিয়াল্লাহুকে দেখতে পেয়ে বললেন, 'আমর, আমীরুল মুমিনীনের কাছ থেকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে আসুন।' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ভিতরে গিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, 'আসসালামু আলাইকুম, হে আমীরুল মুমিনীন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে চাইলেন, 'কী ব্যাপার হে ইবনে আমর। আমাকে এই নামে ডাকছো কেন? এই শব্দগুলো এলো কোত্থেকে?' তিনি বললেন, 'জি (বলছি), লাবীদ ইবনে রাবীয়া এবং আদীই ইবনে হাতিম এসেছেন। তারা বললেন, আমীরুল মুমিনীনের কাছ থেকে আমাদের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে আসুন। তাদের কথা শুনে আমি বলেছি, আল্লাহর কসম, আপনারা তাকে উপযুক্ত নামে ডেকেছেন। নিশ্চয়ই তিনি আমীর আর আমরা মুমিন।' সেদিন থেকে দাপ্তরিক চিঠিপত্রে আমীরুল মুমিনীন উপাধি ব্যবহারের সূচনা ঘটে।
অন্য একটি বর্ণনা এমন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জনসমাবেশে বলেছিলেন, 'তোমরা হলে মুমিন আর আমি তোমাদের আমীর।' তিনি নিজেই এই উপাধির প্রবর্তন করেন। ঘটনা যাই হোক না কেন, খলীফাদের মধ্যে সর্বপ্রথম উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আমীরুল মুমিনীন উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। সাহাবায়ে কেরাম তার এই উপাধি নিয়ে একমত ছিলেন। দূরবর্তী ভূখণ্ডের মুসলিমরাও তাকে এই নামে ডাকতে শুরু করে।

টিকাঃ
৫৪১. আস-সুলতাহ আত-তানফীদিয়া, ১/২১৫।
৫৪২. সূরা আম্বিয়া, ২১: ৯৪।
৫৪৩. আল-মাবসূত, ১৫/১৪৭, ১৬৬; আল-মুঘনি, ৫/৪৪৫।
৫৪৪. আস-সুলতাহ আত-তানফীদিয়া, ১/২১৫।
৫৪৫. প্রাগুক্ত, ১/২১৬।
৫৪৬. সাঈদ ইবনে যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়েল রা. ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদ লাভকারী দশজন সাহাবীর অন্যতম।
৫৪৭. কানয আল-উম্মাল (৪৪২১৪) এবং আদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়্যাহ, ড. হামদী শাহীন (পৃ. ১২০)।
৫৪৮. মুসান্নাফ আব্দুর রাযযাক, নং, ২০০৪৬।
৫৪৯. সুনান, আবু দাউদ, ২৯৫০।
৫৫০. মাহদুস সাওয়াব (১/৩৮৩) এবং আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৩/২৮০, ২৮১।
৫৫১. রওদাতুত-তালিবীন, ১১/ ১৩৭।
৫৫২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১২/২২৮, ২২৯।
৫৫৩. আল-আ'লাম, আয-যারকালী, ৮/২৪৯।
৫৫৪. আস-সুলতাহ আত-তানফীদিয়‍্যাহ, ১/২১৮।
৫৫৫. প্রাগুক্ত, ১/২১৯।
৫৫৬. শরহে মুসলিম, আন-নববী, ৭/১৩৭।
৫৫৭. মাহদুস সাওয়াব, ১/৩১৬; ইবনে জাউযি, পৃ. ৬৯। তিনি ইবনে আবি রাফাই'।
৫৫৮. তিনি ইবনে আবি রাফি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দাসত্ব থেকে আযাদ করেছিলেন। তিনি তার পিতার বরাত দিয়ে হাদীসটি বর্ণনা করেছিলেন।
৫৫৯. তারীখ আল-ইসলাম, আয-যাহাবী, পৃ. ১৬৪। তার পুরো নাম আব্দুল্লাহ ইবনে যাকওয়ান আল-কুরেশী। তিনি একজন বিজ্ঞ এবং নির্ভযোগ্য ফকীহ। আত-তাকরীব, পৃ. ৩০২।
৫৬০. পুরো নাম আব্দুল্লাহ ইবনে যাকওয়ান আল-কুরেশী। তিনি একজন বিজ্ঞ এবং নির্ভযোগ্য ফকীহ। আত-তাকরীব, পৃ. ৩০২।
৫৬১. মাহদুস সাওয়াব, ১/৩১৮।
৫৬২. ফাতহুল বারী, ৭/২৬৮; আল খিলাফাহ আর-রাশিদাহ, ইয়াহিয়া আল-ইয়াহিয়া, পৃ. ২৬৮।
৫৬৩. জাউলা তারীখিয়া ফি আ'সরিল-খুলাফা আর-রাশিদীন, ড. মুহাম্মাদ আস-সায়্যিদ আল-ওয়াকীল, পৃ. ৯০।
৫৬৪. আত-তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সা'দ, ৩/ ২৮১।
৫৬৫. তিনি আল-আদাউই আল-মাদানী। তিনি একজন নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিস। আত-তাকরীব, পৃ. ৬০৭।
৫৬৬. আশশিফা বিনতে আব্দুল্লাহ আল-আদাউইয়া হিজরতের আগেই মুসলিম হয়েছিলেন।
৫৬৭. মাহদুস সাওয়াব, ১/৩১২।
৫৬৮. আল-মুস্তাদরাক, ৩/৮১, ৮২।
৫৬৯. মাহদুস সাওয়াব, ১/৩১২।
৫৭০. প্রাগুক্ত, ১/৩১৩।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00