📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 উমর রা.-এর খেলাফতের অধিকার নিয়ে উলামায়ে কেরামের ঐকমত্য

📄 উমর রা.-এর খেলাফতের অধিকার নিয়ে উলামায়ে কেরামের ঐকমত্য


উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের ব্যাপারে যে সাহাবায়ে কেরাম একমত ছিলেন এ ব্যাপারে একাধিক দলিল রয়েছে।
ইসলামী শরিয়তে মজবুত দলিল হিসেবে কুরআন এবং সুন্নাহর পরই ইজমার স্থান। যে কোনো যুগে বিশিষ্ট উলামায়ে কেরাম যখন শরীয়তের কোনো বিষয়ে একমত পোষণ করেন তখন তাকে ইজমা বলে। নিচে এগুলো উল্লেখ করা হলো:
■ এক। আবু বকর আহমাদ ইবনুল হুসাইন আল বাইহাকীর বর্ণনায়, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছুরিকাহত হওয়ার পর আমি তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। তাকে বললাম, 'হে আমীরুল মুমিনীন, জান্নাতের সুখবর গ্রহণ করুন। যখন অধিকাংশ মানুষ কাফের ছিল, আপনি তখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সবাই ছেড়ে গেছে, তখন আপনি তার পাশে থেকে লড়াই করেছেন। ইন্তেকালের আগে তিনি আপনার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। আপনার খেলাফত নিয়ে কারও দ্বিমত ছিল না। আর আপনি শহীদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে যাচ্ছেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আরেকবার বলো।' আমি কথাগুলো আবারও বললাম। অতঃপর তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আমার কাছে যদি পৃথিবীর সব সোনা-রূপাও থাকত, তবে হাশরের ময়দানে আল্লাহর আযাব দেখার আগেই মুক্তিপণ হিসেবে সব বিলিয়ে দিতাম।'
| দুই। আবু নাঈম আল-ইস্পাহানী লিখেছেন, 'দীর্ঘকাল এক সাথে থাকার ফলে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মহত্ত্ব, আন্তরিকতা এবং শক্তি সম্পর্কে পূর্ণ অবগত ছিলেন। তার শাসনামলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পরামর্শ এবং কাজ দিয়ে যেমন উদাত্তভাবে তাকে সহযোগিতা করেছেন এবং তার ও আল্লাহ তা'আলার প্রতি অনুগত থেকেছেন, এরপরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ছাড়া তিনি আর কাউকে নিয়োগ দেবার কথা ভাবতেই পারেননি। তিনি জানতেন, অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তার মতোই কদর করেন। তাকে ভালোভাবে জানার কারণে তার নিয়োগ নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ ছিল না। তারপরও তিনি জনগণের মতামত জানতে চাইলেন, এবং তারাও সমর্থন দিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর যোগ্যতা নিয়ে কারও মনে তিল পরিমাণ দ্বিধা থাকলেও তারা তা অবশ্যই প্রকাশ করত। তা না হলে তারা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যেভাবে অনুসরণ করত পরবর্তীকালে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সেভাবে অনুসরণ করতে পারত না। সুতরাং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতোই তার খেলাফতও সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার নিয়োগের বেলায় উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেছেন। শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন। আর জনগণও সন্তুষ্টচিত্তে তা মেনে নিয়েছে।'
তিন। আবু উসমান আস-সাবুনীর উদ্ধৃত করেছেন: আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু মনোনয়ন এবং জনমত দুটোর ভিত্তিতে খলীফার পদে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ দিলেন। সুতরাং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে সাহাবায়ে কেরামের সম্মতিক্রমে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খলীফার পদ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা তার মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করেছেন।'
চার। ইমাম নববী রহ. উদ্ধৃত করেছেন: 'সাহাবা রাযিয়াল্লাহু আনহুম সর্বসম্মতিক্রমে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে খলীফা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তারা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে উত্তরসূরি নিযুক্ত করার সিদ্ধান্তকেও একইভাবে স্বাগত জানিয়েছিলেন।'
পাঁচ। ইবনে তাইমিয়াহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি উদ্ধৃত করেছেন : আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে উত্তরসূরি হিসেবে নিয়োগ দিলেন। অতঃপর মুসলিমরা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে বাইআত গ্রহণ করে তাকে অনুসরণ করেছে। বাইয়াতের অধিকারবলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম উম্মাহর খলীফা হয়েছিলেন।'
| ছয়। আত-তাহহাউয়িয়ার সংকলক উদ্ধৃত করেছেন, ‘আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে খেলাফত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। এর প্রথম কারণ, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজে তাকে নিয়োগ দিয়ে গেছেন। দ্বিতীয় কারণ, মুসলিম উম্মাহ সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্তকে গ্রহণ করেছে এবং অনুমোদন দিয়েছে।'
উপর্যুক্ত বক্তব্যগুলো থেকে প্রমাণ হয় যে, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সিদ্ধান্ত নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের যে সম্মতি ছিল এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। আর এই ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়া জামাআতও একমত। পরবর্তীকালে আহলে সুন্নাত ওয়া জামাআতের বিশিষ্ট আলেমগণও এ বিষয়ে একমত যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন এবং তাকে খলীফার পদে সকল সাহাবী একযোগে গ্রহণ করেছিলেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, শুধুমাত্র রাফিযী শিয়াগোষ্ঠী আর তাদের কিছু সমর্থক এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল। তারা গুরুত্বপূর্ণ কেউ ছিল না। বিপথগামী লোকগুলো কোনো কোনো সাহাবীর প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করত।
আরেকটি ঘটনার প্রেক্ষিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে যে সাহাবায়ে কেরামের পূর্ণ সম্মতি ছিল এর বিরুদ্ধে কেউ কেউ কথা তুলতে পারে। কয়েকজন সাহাবীর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, আব্দুর রহমান আল-আউফ এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুম আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে গিয়েছিলেন। তখন একজন বলেছিলেন, 'আপনার রব যখন জানতে চাইবেন, উমরের রুক্ষ মেজাজের কথা জেনেও তাকে আমাদের জন্য কেন নিযুক্ত করেছেন, তখন এর জবাব কী দেবেন?' আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমাকে বসতে সাহায্য করো।' তারপর জবাব দিলেন, 'আল্লাহর কসম, তুমি কী আমাকে ভয় দেখাচ্ছ? কেউ যদি তোমাদের (মুসলিম উম্মাহর) বিষয়ে অসৎ এবং নির্মম সিদ্ধান্ত নেয় তবে সে অবশ্যই হতভাগা। (তোমার প্রশ্নের) আমি আল্লাহকে বলব, ইয়া আল্লাহ, আমি আপনার শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে তাদের জন্য নিযুক্ত করলাম। যাও আমার এই কথাগুলো যারা বাইরে আছে সবার কাছে পৌঁছে দাও।'
এই বর্ণনা যদি আমরা সহীহ বলে ধরে নিই তারপরেও লক্ষ্যণীয় যে, প্রশ্নকারী উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দৃঢ় ঈমান, উত্তম আখলাক আর সাহাবীদের মধ্যে উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তিনি কিন্তু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অযোগ্য বলেননি। তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আন্তরিকতা, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বা বিশ্বস্ততা নিয়েও কোনো প্রশ্ন তোলেননি; বরং তার কঠোর মেজাজ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।

টিকাঃ
৩৮২. সুনান আল-বায়হাকী, ১০/১১৪; মুস্তাদরাক আল-হাকিম, ৩/৯৫।
৩৮৩. কিতাব আল-ইমামা ওয়া আর-রাদ্দ আলা আর-রাফিদা, পৃ.২৭৪।
৩৮৪. আকীদাতুস সালাফ ওয়া আসহাবুল হাদীস, মাজমুআতুর-রাসাঈল আল-মিনবারিয়া, ১/১২৯।
৩৮৫. শরহুন নববী আলা সহীহ মুসলিম, ১২/২০৬।
৩৮৬. মিনহাজ আস-সুন্নাহ, ১/১৪৩।
৩৮৭. শরহ আত-তাহাবী, পৃ. ৫৩৯।
৩৮৮. আত-তাবাকাত, ৩/২৭৫।
৩৮৯. কিতাব আল-ইমামা ওয়ার-রদ্দ আ'লাল-রাফিদা, পৃ. ২৭৬।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 উমর রা.-এর স্বাভাবিক ভাষণ

📄 উমর রা.-এর স্বাভাবিক ভাষণ


মুসলিম রাষ্ট্রের খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর স্বাগতিক ভাষণ নিয়ে একাধিক বর্ণনা আছে। একদল বর্ণনাকারী বলেছেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মিম্বরে উঠে বললেন, 'ইয়া আল্লাহ, আমি তো কঠোর, আমাকে নম্র করুন; আমি দুর্বল, আমাকে শক্তি দিন; আমি কৃপণ, আমাকে উদার করুন।'
কোনো কোনো বর্ণনাকারীর মতে, তিনি বলেছিলেন, 'আমার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের পরীক্ষা করছেন। আর আমার দুজন সাথী আল্লাহ তা'আলার কাছে চলে গেছেন। আল্লাহর কসম, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি নিজে তোমাদের দায়িত্ব সরাসরি পালন করতে পারব ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য কারও হাতে তোমাদের ছেড়ে দেব না। আর যেসব কাজ সরাসরি করতে পারব না সেসবের দায়িত্ব আমি যোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য লোকের হাতে দেব। আল্লাহর কসম, তারা (গভর্নরেরা) যদি ঠিকমত দায়িত্ব পালন করে, তবে আমি তাদের পুরস্কৃত করব। আর অন্যায় করলে কঠিন শাস্তি পাবে।' ভাষণের সময় উপস্থিত ছিল এমন একজন ব্যক্তি বলেছে, 'আল্লাহর কসম, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার ওয়াদা রক্ষা করে গেছেন।'
আরেকটি বর্ণনায় আছে: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হবার পরে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু মিম্বরের যে সিঁড়িতে বসতেন সেখানে বসতে যাচ্ছিলেন। তখন বলে উঠলেন, 'আমি চাই না, আল্লাহ তা'আলা আমাকে দেখুন যে, আমি নিজেকে আবু বকরের সমান মনে করছি।' তাই তিনি একধাপ নিচে নেমে বসলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা আর গুণ বর্ণনা করে বললেন, 'কুরআন তিলাওয়াত করতে থাকবে, ফলে এর মাধ্যমে তোমাদের চিনে নেওয়া হবে (কুরআন আঁকড়ে থাকলে); কুরআনের শিক্ষা কাজে লাগাতে পারলে তোমরা কুরআনওয়ালা হয়ে যাবে। তোমার আমলের হিসাব নেবার আগে, নিজেই নিজের আমলের হিসাব রাখবে। সেই মহাদিবসের জন্য নিজেদের প্রস্তুত কর-কারণ সেদিন আল্লাহ তা'আলার সামনে কোনো কিছু গোপন থাকবে না। আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে তোমাদের মানার অধিকার নেই। আমার দায়িত্বে থাকা আল্লাহর সম্পদ (রাষ্ট্রীয় কোষাগারের) সম্পর্কে বলব, এগুলো এমনভাবে গচ্ছিত থাকবে যেভাবে একজন অভিভাবকের কাছে ইয়াতিমের মাল গচ্ছিত থাকে। আমার সচ্ছল থাকা অবস্থায় এই সম্পদ ছুঁয়েও দেখব না। কখনো এর প্রয়োজন হলে আমি আইনসঙ্গতভাবে তা গ্রহণ করব।'
উপর্যুক্ত বর্ণনার কোনোটিই পরস্পরবিরোধী নয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিশাল জনসমাবেশের সামনে ভাষণ দিয়েছিলেন। ফলে ভাষণের একেক অংশ, একেক শ্রোতার মনে গেঁথে ছিল। তাই স্থানভেদে ভিন্ন ভিন্ন উদ্ধৃতি পাওয়া যায়।
খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ভাষণে আমরা রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক নীতির মধ্যে দ্বীনের যে সংমিশ্রণ দেখি তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, তৎকালীন ইমামগণ আল্লাহভীতি এবং আল্লাহর আইনের বাইরে কোনো কিছু চিন্তাও করতে পারতেন না। তাছাড়া তিনি যেভাবে তার পূর্বসূরি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সম্মান প্রদর্শন করেছেন তাতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। তিনি নিজেকে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জায়গায় বসার যোগ্য মনে করেননি, তিনি চাননি জনগণ তাকে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সমকক্ষ মনে করুক। তাই এক ধাপ নিচে বসে পড়েন।
আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হওয়ার দুদিন পর থেকেই লোকজন তার রুক্ষ মেজাজ এবং শাস্তির আশংকা নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেছিল। তাদের সংশয় দেখে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু উপলব্ধি করলেন যে, তাদের অসার ভয় দূর করা দরকার। তাই মিম্বরে উঠে তিনি এক হৃদয়গ্রাহী ভাষণ দিলেন। তাদের মনে করিয়ে দিলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সবার সাথে কেমন আচরণ করতেন। তারা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি যে সন্তুষ্ট ছিলেন তা-ও মনে করিয়ে দিলেন। অতঃপর বললেন, 'হে লোকসকল, আমি তোমাদের দায়িত্ব নিয়েছি। আর জেনে রাখো, আমার কঠোরতা কমে গেছে। তবে অপরাধী এবং যুলুমকারীদের কথা ভিন্ন। কেউ কাওকে যুলুম করবে কিংবা অন্যের হক নষ্ট করবে, আমি তা হতে দেব না। কেউ এ কাজ করলে সত্য স্বীকার না করা পর্যন্ত তার এক গাল থাকবে মাটিতে, আরেক গাল আমার পায়ের নিচে। আর আমি এমন কঠিন আচরণ করব বলে, শান্তিপ্রিয় এবং নিরীহ লোকেদের জন্য আমার গাল মাটিতে রাখব। হে লোকসকল, আজ আমি যে ওয়াদাগুলো করব সেগুলো যেন আঁকড়ে থাকতে পারি সে জন্য তোমাদের সাহায্য প্রয়োজন। আমি ওয়াদা করছি যে, আমি কখনো অন্যায়ভাবে তোমাদের কর কিংবা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত গনীমত গ্রহণ করব না। আদায়কৃত সম্পদ থেকে অন্যায়ভাবে খরচ করা হবে না। তোমাদের ভাতা বৃদ্ধির ওয়াদা করছি। তোমাদের সীমানারক্ষা করার ওয়াদাও রইল। বিপদসংকুল জায়গায় তোমাদের ঠেলে দেবার অধিকার আমার নেই। সীমানা রক্ষার নামে পরিবার থেকে অযথা দীর্ঘদিন দূরে সরিয়ে রাখব না। আর তোমরা যতদিন সেনাঅভিযানে থাকবে, না ফেরা পর্যন্ত আমি তোমাদের সন্তানদের দায়িত্ব পালন করব। হে আল্লাহর বান্দারা, আল্লাহকে ভয় করবে। তোমরা অপকর্ম থেকে আমাকে সরিয়ে রাখবে, আর ভালো-মন্দ সব বিষয়ে আমাকে মতামত দেবে। রাষ্ট্রপরিচালনায় আমাকে আন্তরিক পরামর্শ দেবে। আমার যা বলার ছিল বলেছি। আল্লাহ তা'আলা আমাকে এবং তোমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন।'
আরেকটি বর্ণনামতে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আরবদের উদাহরণ হলো নিরীহ ও উপকারী সেই উটের মতো, যা সহজেই আরোহীর নির্দেশ মেনে চলে। ফলে আরোহী নিশ্চিন্তে পথের নির্দেশ দিতে পারে। কা'বার রবের কসম, আমি তোমাদের সরল পথে পরিচালিত করব।'
উপর্যুক্ত বর্ণনাসমূহের শিক্ষা ও মূল বক্তব্য
এই বর্ণনাগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে, খলীফা হওয়ার পরে তার স্বাগতিক ভাষণে তার শাসনপদ্ধতি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছিল। তিনি তার ওয়াদা থেকে কখনো সরেননি। এই বর্ণনাগুলো থেকে পাওয়া শিক্ষণীয় বিষয়গুলো উল্লেখ করা হলো:
এক। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে খেলাফত একটি পরীক্ষা ছিল। কারণ, তার বিশ্বাস ছিল দায়িত্ব নিয়ে হাশরের ময়দানে তাকে পাকড়াও করা হবে। খুলাফায়ে রাশেদীন নেতৃত্বকে কখনো মর্যদা, যশ, খ্যাতির উৎস মনে করতেন না; বরং তাদের কাছে নেতৃত্ব ছিল দায়িত্ব, কর্তব্য ও পরীক্ষার আরেক নাম।
দুই। খেলাফতের নামে মদীনাসহ পুরো মুসলিম রাষ্ট্র পরিচালনার এক বড় দায়িত্ব উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওপরে অর্পিত হয়েছে। দূর-দূরান্তের মুসলিম এলাকার জন্য গভর্নর পদে তিনি শ্রেষ্ঠ ও যোগ্যতম লোকদের নিয়োগ দিতেন। এখানেই শেষ নয়। গভর্নরদের কড়া নজরে রাখতেন। তাদের কাছ থেকে প্রত্যেক কাজের কৈফিয়ত নিতেন। আর দুর্নীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে তা কঠোরহাতে দমন করেছেন। সৎ এবং দায়িত্বশীল গভর্নরদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা ছিল। অন্যদিকে দুর্নীতি ধরা পড়লে তাদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতেন যে কেউ আর দ্বিতীয়বার সে কাজ করার সাহস পেত না। গভর্নরদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উদাহরণ পাঠক অন্য অংশে পাবেন, ইনশাআল্লাহ।
■ তিন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর রুক্ষতা এবং কাঠিন্য নম্রতায় পরিণত হতে থাকল। তবে তাকে যেহেতু ইনসাফ করতে হবে তাই তিনি এর মধ্যে ভারসাম্য আনতে চাইলেন। তাই মুসলিম উম্মাহর কাছে তিনি শুরুতেই বিষয়টি পরিষ্কার করতে চাইলেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, অবাধ্য আর যালিমদের প্রতি তিনি যথারীতি কঠিন ও রুষ্ট থাকবেন। তবে বাকি সবাই তাকে সদয় এবং নম্র হিসেবে দেখতে পাবে। মুসলিম উম্মাহর প্রতি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ন্যায়পরায়ণতা ও আইনের শাসন কেমন ছিল, ইনশাআল্লাহ তার বিচারব্যবস্থার অধ্যায়ে বর্ণনা করা হবে।
চার। খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সীমানারক্ষা এবং বিপদ মোকাবিলা করে মুসলিম উম্মাহ এবং ইসলামের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। যোদ্ধাদের সাথে অন্যায় আচরণ করলে তার এই লক্ষ্য পূরণ হবে না, তিনি জানতেন। সুতরাং সীমান্ত রক্ষার নামে তাদের দিনের পর দিন দূরে রাখার কোনো মানে ছিল না। প্রসঙ্গত ওয়াদা করেছিলেন, সেনারা ফিরে না আসা পর্যন্ত পিতার মতো তাদের পরিবারের দায়িত্ব পালন করবেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যেভাবে মুসলিম সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন তাতে তার ইসলামী রাষ্ট্র সে যুগের অদ্বিতীয় পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল।
পাঁচ। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কর ও গনীমত যথাযথভাবে বিলি-বণ্টন করবেন বলে ওয়াদা করেছিলেন। আর তাদের মালামাল সঠিকভাবে খরচ করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন। যুদ্ধে থাকাকালীন তিনি প্রয়োজনমতো বেতন-ভাতা প্রদান ও বৃদ্ধি করতে থাকবেন। জনগণকে পরিশ্রম করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। নিজের হাতে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন। বায়তুল মালের পুরো দায়িত্ব নিজে তদারক করতেন বলে তা আয় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছিল।
ছয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সার্বিক লক্ষ্য অর্জনে মুসলিমদের নিজ দায়িত্বে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। জনগণ যেন তার প্রতি অনুগত থাকে, তার কথা শোনে এবং তাকে মানে—তিনি সেই আশাবাদও ব্যক্ত করেছিলেন। নিজ দায়িত্বে ভালো কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজে বাধা প্রদান করতে সবাইকে উৎসাহিত করেন। ফলে ইসলামী সমাজে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
সাত। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আসলে বোঝাতে চেয়েছেন, আল্লাহকে ভয় না করলে মুসলিম উম্মাহর কাজে স্বচ্ছতা আসবে না এবং হাশরের ময়দানে পাকড়াও হওয়ার চিন্তা না থাকলে তাদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করা সম্ভব হবে না।
আট। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একটি উদাহরণ দিয়েছিলেন, ‘আরবদের উদাহরণ হলো নিরীহ ও উপকারী সেই উটের মতো, যা সহজেই আরোহীর নির্দেশ মেনে চলে। ফলে আরোহী নিশ্চিন্তে পথের নির্দেশ দিতে পারে।’ শেখ আব্দুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার বলেছেন, ‘(উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর উল্লিখিত) আনিফ উট খুব কোমল আর অনুগত হয়। চালাতে গেলে ধমক বা আঘাতের দরকার পড়ে না। উটগুলো আরোহীর নির্দেশমতো স্বতস্ফূর্তভাবে এগিয়ে যায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ের মুসলিমদের জন্য এর চেয়ে ভালো উদাহরণ হতে পারে না। খলীফার প্রত্যেকটি নির্দেশ তারা নিঃসঙ্কোচে মানত; কোনো কাজ থেকে বিরত থাকতে বললে তা থেকে বিরত থাকত। তাদের এমন আনুগত্যের ফলে খলীফার কাঁধ থেকে দায়িত্বের অনেক কঠিন বোঝা দূর হয়েছিল। তাকে বেপরোয়া ধ্বংসাত্মক আচরণ কিংবা দায়িত্বের প্রতি অবহেলা ঠেকানোর মতো চরম খবরদারী করতে হয়নি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, ‘আমি তাদের দৃঢ়তার সাথে (সাধারণভাবে আরবদের আর বিশেষভাবে মুসলিমদের) সরল পথে পরিচালিত করব’, এখানে পথ বলতে সত্য ও সরল পথের কথা বুঝিয়েছেন, যে পথে কোনো বক্রতা নেই। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ভাষণে প্রদত্ত প্রত্যেকটি ওয়াদা তিনি পালন করেছেন।
নয়। এবার আসা যাক নম্রতা এবং কাঠিন্য প্রসঙ্গে। একজন কঠিন ব্যক্তি যতই আন্তরিক হন না কেন, যতই কল্যাণ কামনা করুন না কেন মানুষ তাকে এড়িয়ে চলবেই। এটাই আল্লাহ তা'আলার বিধান। আল্লাহ তা'আলা এই নিয়মের কথা এভাবে বলেছেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَ لَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَ شَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল-হৃদয় হয়েছেন পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগ ও কঠিন-হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করুন এবং কাজে-কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা করুন, আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।
এই অমোঘ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহ তা'আলার কাছে দুআ করেছেন, 'হে আল্লাহ, আমি তো কঠিন, আমাকে নম্র করুন।' আল্লাহ তা'আলা তার দুআ কবুল করেছেন। যার ফলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর হৃদয় দয়া, নম্রতা আর সহনশীলতায় পূর্ণ হয়েছিল। এ যুগের মানুষও তার কঠিন আখলাকের কথা জানে। নবীযুগে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো এত কঠোর কোনো সাহাবী ছিলেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবদ্দশাতেই এ কথা সবার জানা ছিল। কিন্তু খলীফা হওয়ার সাথে সাথে তার কাঠিন্য দয়া, সহানুভূতি এবং নম্রতায় পরিণত হয়েছিল।
■ দশ। খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে সাধারণত মদীনাবাসী শুধু বাইআত গ্রহণ করত। তবে মদীনার কাছাকাছি বসবাসকারী কিছু বেদুইন, কয়েকটি ইসলামী রাষ্ট্রের বাকি ভূখণ্ডের জনগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শহরে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হতো, তা-ই অনুসরণ করত। এতে কিন্তু বাইআত-প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনো প্রভাব পড়ত না। সে যুগে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত সকল মুসলমানের একযোগে বাইআত গ্রহণ করা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। তাই রাষ্ট্রীয় যে কোনো কাজের জন্য অন্যান্য অঞ্চলের বাসিন্দারা মদীনাবাসীদের মতের প্রতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমর্থন জানাত। খলীফা হিসেবে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ও উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিয়োগের বেলায় তা-ই হয়েছিল। যাহোক, ইসলামের প্রথম দিকে খলীফা নির্বাচনের এই পদ্ধতি থেকে এটা স্পষ্ট যে, রাষ্ট্র এবং এর বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম তখন উন্নয়নের পথে চলছিল।
এগারো। নারীদের বাইআত প্রসঙ্গে : আমি আমার ব্যক্তিগত গবেষণার কাজ করতে গিয়ে খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে নারীরা বাইআত-গ্রহণ করেছে এমন তথ্য পাইনি। আমর জানা মতে, ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার সময় নারীদের বাইআত গ্রহণ কিংবা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগহণের অধিকার কিংবা দায়িত্বের কথা ইতিহাসের পুরনো কোনো কিতাবে পাইনি। বাইয়াত গ্রহণ কেবল পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এর জন্য নারীদের যেমন উৎসাহিত করা হয়নি, আবার নারীরাও কখনো এর দাবী তোলেনি। তৎকালীন সমাজে ছির এগুলো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার।
তবে সবকিছুর ওপরে আমাদের মনে রাখতে হবে, ঐতিহাসিক ঘটনা ও প্রথাগত রীতি-রেওয়াজ এক জিনিস আর ইসলামী আইনের শাসন আরেক জিনিস। কুরআন ও সুন্নাহর মতো অকাট্য দলীলে কিন্তু মুসলিম খলীফার কাছে নারীদের বাইআত গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়নি।
বারো। আরব যুদ্ধবন্দীনীদের ফিরিয়ে দেওয়া: আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার খেলাফতের শুরুতে মুরদাতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শাসনভার নেবার শুরুর দিকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তৎকালীন সব যুদ্ধবন্দীনীকে তাদের পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তিনি বলেছেন, 'আমি চাই না, যুদ্ধবন্দীনীদের দাসী বানানোর প্রথা আরবদের মাঝে প্রতিষ্ঠিত হোক।'
তার এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপের ফলে আরবরা বুঝতে পেরেছিল যে, আল্লাহ তা'আলার কাছে সবাই সমান। কোনো গোত্র নিজেদের ঢালাওভাবে শ্রেষ্ঠ বলে দাবী করতে পারবে না। বলতে পারত না। আল্লাহ তা'আলার প্রতি আনুগত্যের চেষ্টা, উত্তম আমল এবং মুসলিমদের সাথে উত্তম আচরণের মাধ্যমে সম্মান অর্জন করে নিতে হয়েছে। তিনি মুরতাদদের প্রায়শ্চিত্ত করার সুবর্ণ সুযোগ দিয়েছিলেন। অনুতপ্ত ধর্মত্যাগীরা সেবার বিদেশী শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদের অনুমতি পেয়েছিল। বহু মুরতাদ মুসলিমদের পক্ষে আন্তরিকতা এবং বীরত্বের সাথে লড়েছে। ফলে রাষ্ট্রের প্রতি তাদের অসামান্য আনুগত্য প্রকাশ পেয়েছিল।
তেরো। খেলাফত-পদ্ধতি মুসলিমদের অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল। খুলাফায়ে রাশেদীন ছিলেন শক্তি এবং একতার প্রতীক। সাহাবায়ে কেরাম যে শ্রেষ্ঠ যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন এবং খাঁটি মনে কাজ করতেন, তা যে কোনো গবেষকই বুঝতে পারবেন। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা আবু বকর রাযিয়ালাহু আনহুকে খলীফা নিয়োগ করেন। তা ধ্বংস করতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সিকি শতাব্দী লেগে গেছে। ব্রিটিশেরা অটোমান সাম্রাজ্যকে 'অসুস্থ বুড়ো' বলে ডাকত। আদতেও তারা 'অসুস্থ' এবং 'দুর্বল' ছিল। তাদের শাসনব্যবস্থা সাহাবীদের খেলাফতের ধারে-কাছেও ছিল না। তারপরেও তা শেষ করতে ব্রিটিশদের পঁচিশ বছর লেগে যায়। ভেবে দেখুন, শত শত বছর আগে খেলাফত প্রতিষ্ঠাকারীরা কেমন শক্তিশালী ছিলেন।
চৌদ্দ। রাজা এবং খলীফার মধ্যে পার্থক্য: উমর রাযিয়াল্লাহু একবার বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি খলীফা, না রাজা-জানিনা। যদি রাজা হই তবে তো গুরুতর ব্যাপার।' এক ব্যক্তি তাকে বলল, 'দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে। একজন খলীফা তার হক বুঝে বৈধভাবে উপার্জন করেন আর হক বুঝে বৈধভাবে তা থেকে ব্যয় করেন। আলহামদুলিল্লাহ, আপনি তেমন মানুষ। অন্যদিকে রাজা একজনেরটা আরেকজনকে দিয়ে দেয়, যুলুম করে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ কথা শুনে চুপ করে থাকলেন।
আরেকটি রেওয়াতে বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সালমান আল-ফারিসি রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে জানতে চাইলেন, 'আমি রাজা, না খলীফা?' সালমান রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আপনি রাষ্ট্র থেকে এক দিরহাম বা কম-বেশি কর যা-ই আদায় করেন না কেন, তা ঠিক খাতে খরচ না করলে আপনি খলীফা নন, রাজা।' এ কথা শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কাঁদতে লাগলেন।

টিকাঃ
৩৯০. মানাকিব আমীর আল-মু'মিনীন, ইবনুল জাউযি, পৃ. ১৭০-১৭১।
৩৯১. আত-তাবাকাত, ৩/২৭৫।
৩৯২. সূরা আল-হাক্কাহ, ৬৯: ১৮।
৩৯৩. কানযুল উম্মাল, নং ৪৪২১৪; আদ-দাউলাহ আল ইসলামিয়্যাহ, ড. হামদি শাহীন, পৃ. ১২০।
৩৯৪. কানযুল উম্মাল, নং ৪৪২১৪; আদ-দাউলাহ আল ইসলামিয়্যাহ, ড. হামদী শাহীন, পৃ. ১২০।
৩৯৫. আল-ইদারাহ আল-আ'সকারিয়‍্যাহ ফি আ'হদ আল-ফারুক, পৃ. ১০৬।
৩৯৬. আস-সিয়াসাহ আশ-শারীয়াহ, ড. ইসমাঈল বাদাউয়ী, পৃ. ১৬০; তাফসীর আত-তাবারি।
৩৯৭. আদ-দাউলাহ আল ইসলামিয়‍্যাহ ফি আ'সর আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, পৃ. ১২১।
৩৯৮. প্রাগুক্ত; মাহদুস সাওয়াব, ১/৩৮৫, পৃ. ১১৬, টীকা নং ৪ দ্রষ্টব্য।
৩৯৯. প্রগুক্ত।
৪০০. আদ-দাউলাহ আল ইসলামিয়্যাহ, ড. হামদি শাহীন, পৃ. ১২২।
৪০১. আদ-দাউলাহ আল ইসলামিয়‍্যাহ ফি আ'সর আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, পৃ. ১২২; আ'সর আল- খুলাফা আর-রাশিদীন, পৃ. ১২৩।
৪০২. আ'সর আল-খুলাফা আর-রাশিদূন, পৃ. ১২৩।
৪০৩. আস-সুনান আল-ইলাহিয়া মিন আল-উমাম ওয়া আর-কামাআত ওয়া আল-আফরাদ, যায়েদান, পৃ. ২৮২।
৪০৪. সূরা আল-ইমরান, ৩: ১৫৯।
৪০৫. আল-ইদারাহ আল-ইসলামিয়্যাহ ফি আ'হদ উমার ইবনে খাত্তাব রা., পৃ. ১০৭।
৪০৬. নিদহাম আল-হুকম ফিশ-শারীয়াহ ওয়াত-তারীখ আল-ইসলামী, পৃ. ২৬০।
৪০৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ১/২৭৭।
৪০৮. আল-খিলাফাহ ওয়াল-খুলাফা আর-রাশিদীন, পৃ. ১৬০।
৪০৯. জাউলাহ তারীখিয়্যাহ ফি আ'সরিল-খুলাফা আর-রাশিদীন, ড. মুহাম্মাদ আস-সায়্যিদ আল-ওয়াকীল, পৃ. ৮৯; আশ-শাইখান আবু বকর আস-সিদ্দীক এন্ড উমর ইবনে খাত্তাব, আল-বালাযিরীর বর্ণনা, পৃ. ২৫৭।
৪১০. আল-হাদারাহ আল-ইসলামিয়্যাহ, ড. মুহাম্মাদ আদিল, পৃ. ৩০।
৪১১. আশ-শাইখান: আবু বকর আস-সিদ্দীক এন্ড উমর ইবনে আল-খাত্তাব, আল-বালাযিরীর বর্ণনা, পৃ. ২৫৭।
৪১২. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৬।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 শূরা

📄 শূরা


ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো-এর শাসক এবং নেতাগণ সাধারণ মুসলিমদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। জনগণের কাছে ইতিহাচক মনে হয় এমন সিদ্ধান্তই তারা গ্রহণ করেন। এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে শূরানীতির প্রয়োগ অব্যাহত থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَ اسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন পক্ষান্তরে আপিন যদি রাগ ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করুন এবং কাজে-কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা করুন, আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।
۞ وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَهُمْ يُنْفِقُونَ ۞
'যারা তাদের পালনকর্তার আদেশ মান্য করে, নামায কায়েম করে; পারস্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।
এখানে 'নামায কায়েম' করার পাশাপাশি, মুসলিমদের সাথে 'পারস্পরিক আলোচনা' বা 'শূরা' প্রতিষ্ঠার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। সুতরাং শরীয়তে নামায এবং পারস্পরিক আলোচনা দুটোই ফরয।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার রাষ্ট্রে শূরা-পদ্ধতির অনুসরণ করতেন। তিনি একা কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সাধারণ মুসলিমদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেন। সমস্যা দেখা দিলে তিনি মুসলিমদের সাথে বসে আলোচনা করতেন। তাদের মতামত ও পরামর্শ নিতেন। তারপরে তিনি সিদ্ধান্ত নিতেন।
বেশ কিছু বর্ণনায় আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের-মনে-চলা নেতৃত্বের তুলনায় পারস্পরিক আলোচনায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য ছিলেন। উল্লেখ্য, তিনি বলেছিলেন, 'পারস্পরিক আলোচনা ছাড়া কোনো ভালো সিদ্ধান্ত আসে না।' আরেকটি বর্ণনায়, তিনি বলেছেন, 'একক পরামর্শ হলো একটি বিচ্ছিন্ন সুতার মতো। দুজনের নেওয়া পরামর্শ যেন গিঁট দেওয়া দুটো সুতা। আর তিনজনের পরামর্শ হলো মজবুত গিঁটওয়ালা সুতার মতো, যা সহজে খোলা যায় না।'
তিনি বলেছেন, 'আল্লাহ তা'আলাকে ভয় পায়-এমন লোকের পরামর্শ নেবে তোমরা।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'মানুষ তিন ধরনের হয়। এক ধরনের মানুষ নিজেই তার সমস্যার সমাধান করে। আরেক ধরনের মানুষ দ্বিধায় পড়লে অন্যের সাথে আলোচনা করে এবং বিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে ভালো পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। আর কিছু মানুষ দ্বিধায় পড়ে, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েও না বিজ্ঞজনের মতামত নেয়, আর না নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।'
তিনি আরও বলতেন, 'মুসলিমদের উচিত—জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে বসে শূরার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করা। আর সাধারণ মানুষ তাদের অনুসরণ করবে। তারা যতদিন এক হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে থাকবে, ততদিনই লোকজন তাদের অনুসরণ করবে। তারা যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, তাতে সাধারণ মুসলিমদের স্বার্থ সবার আগে রক্ষা করতে হবে; যুদ্ধের জন্য যে সিদ্ধান্ত নেবে, তাতেও জনগণ তাদের কথা মেনে চলবে।'
বিশাল ভূখণ্ডের আমীর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আলেমদের পরামর্শ নিতে সেনাপতিদেরও উৎসাহিত করতেন। তিনি আবু উবায়েদ আস-সাকাফী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পারসিকদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য ইরাকে পাঠিয়েছিলেন। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে উপদেশ দিলেন, 'সাহাবায়ে কেরামের কথা শুনবে এবং তাদের মানবে। তাদের মন্তব্য করার সুযোগ দিয়ো, বিশেষ করে যারা বদরে অংশগ্রহণ করেছিলেন।'
ইরাকে নিয়োজিত সেনাপতিদের কাছে লেখা চিঠিতে আমর ইবনে মাদিকারব এবং তালহা আল-আসাদী রাযিয়াল্লাহু আনহুমের পরামর্শ নেবার কথা উল্লেখ করেছিলেন। তাতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লিখেছিলেন, 'যুদ্ধের সময় আমর ইবনে মাদিকারব এবং তালহা আল-আসাদীর পরামর্শ নিও। তবে তাতের হাতে কোনো দায়িত্ব ছেড়ে দিও না। কারণ, প্রত্যেক দক্ষ লোক তার নিজের কাজে অভিজ্ঞ।'
তিনি সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে বলেছেন, 'আরবদের মধ্যে যাদের বিশ্বস্ত মনে কর তাদের কয়েকজনকে কাছে কাছে রেখো। কারণ, মিথ্যাবাদীরা মাঝে মাঝে সত্য বললেও, তাদের কাছে ভালো কিছু আশা করা বৃথা। মুনাফিকরা তোমার জন্য নয়, বরং তোমার বিরুদ্ধে কাজ করবে।'
উতবা ইবনে গাযওয়ানকে বসরা অভিমুখে পাঠানোর সময় উরওয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আমি আল-আলা আল-হাযরামীকে বলেছি, সে যেন তোমার কাছে আরফাজা ইবনে হারসামাকে পাঠায়। আরফাজা সমরকৌশল এবং পরিকল্পনা, দুটোতেই দক্ষ। তার পরামর্শ নিয়ো, তাকে কাছাকাছি রেখো।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শূরা-পদ্ধতি খুব সুন্দর ছিল। তিনি প্রথমে সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠী থেকে অন্তত একজন প্রতিনিধিকে ডাকতেন। সমস্যার সমাধানে প্রত্যেকের মতামত নেওয়া হতো। অতঃপর বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ প্রধান সাহাবীদের একত্র করতেন। আগের মতামতের উপর ভিত্তি করে তাদের সাথে আলোচনা হতো। সমাধানপদ্ধতি নিয়ে সবাই একমত হলে তবেই তিনি তা গ্রহণ করতেন। এ যেন এই যুগের সাংবিধানিক পদ্ধতি। এখন যেমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হলে আগে জন প্রিতিনিধিরা মিটিংয়ে বসেন। অতঃপর সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামত সিনেটর, হাউজ অব লর্ডস প্রমুখের সামনে উপস্থাপন করা হয়। তারা কোনো বিষয়ে একমত হওয়ার পরে রাজা বা সম্রাট তা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেন। আজকের পদ্ধতি আর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য হলো তিনি ইসলামী শরীয়তের ওপরে ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতেন; কারণ, তখন অনেক আইনের প্রবর্তন ঘটেনি।
প্রায়ই দেখা যেত যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কোনো একটি সমস্যা নিয়ে আগে নিজে পর্যালোচনা করতেন, ভাবতেন এবং নিজের মতামত জানাতেন। তার মতামত নিয়ে সাধারণ লোকজন জোরাল প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সুযোগ পেত। প্রমাণ এবং তর্কে দৃঢ়তা থাকলে তিনি তার কথা মেনে নিতেন। সাথে নিজের ভুলও স্বীকার করতেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে শূরার প্রচলন ছিল চোখে পড়ার মতো। পূর্ববর্তীদের তুলনায় তাকে অনেক নতুন সমস্যায় পড়তে হয়েছিল, ফলে তিনি এই পদ্ধতির ওপরে নির্ভরশীল ছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে খুব দ্রুত মুসলিম ভূখণ্ডের প্রসার ঘটতে থাকে। ফলে নানা জাতি, ঐতিহ্য এবং প্রথার লোকজন অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। তাদের ভাষা যেমন আলাদা ছিল, তেমন রীতি-রেওয়াজেও ছিল ভিন্নতা। নতুন নীতির আওতায় কেমন ভাতা দেওয়া হবে, গণিতমত সংগ্রহ এবং বণ্টন করা হবে কীভাবে—এমন সব নতুন নতুন সমস্যা সমাধানের জন্য বার বার ইজতেহাদের প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন তিনি বুযুর্গ সাহাবায়ে কেরাম এবং বদরী সাহাবীদের সাথে বসে শূরার মাধ্যমে সমাধান করতেন। গুণাবলী, জ্ঞান এবং মর্যাদার কারণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বদরী সাহাবীদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন।
তিনি এক সময় তরুণ সাহাবীদেরও তার আলোচনায় থাকার সুযোগ দিতে শুরু করেন। তিনি জানতেন যে, বুযুর্গেরা একে একে এই দুনিয়া ছেড়ে পরকালের স্থায়ী আবাসে পাড়ি জমাবেন। ফলে নবীনদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করতে হবে। নবীনদের মধ্যে যারা ধর্মভীরু এবং জ্ঞানী সাহাবীদের পরামর্শ নিতে শুরু করেছিলেন। তাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অন্যতম। যারা কুরআনভিত্তিক জ্ঞানের ওপরে ভিত্তি করে তিনি তরুণদের গুরুত্ব নির্ধারণ করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, কুরআন সম্পর্কে যাদের ভালো জ্ঞান ছিল কেবল তারাই উমরের কাউন্সিল-সদস্য এবং উপদেষ্টা হতে পারত। সেখানে বয়স কোনো ব্যাপার ছিল না।
ইমাম আয-যুহরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি একবার কয়েকজন ছেলেকে ডেকে বললেন, 'বয়স কম বলে নিজেদের তুচ্ছ মনে করো না। কারণ, উমর ইবনুল খাত্তাব কঠিন সমস্যায় পড়লে তরুণদের পরামর্শ নেন। তারা চটপটে ও প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন হয় বলে তাদের ওপরে ভরসা করেন।'
মুহাম্মাদ ইবনে সিরীন রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ভালো পরামর্শের খোঁজ করতেন। এমনকি তিনি নারীদের পরামর্শও গ্রহণ করতেন। তাদের পরামর্শ লাভজনক মনে করলে তিনি অবশ্যই তা গ্রহণ করতেন। নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে বর্ণিত, তিনি উম্মুল মুমিনীন হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহার পরামর্শ নিয়েছিলেন।'
উলামায়ে কেরাম এবং সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কয়েকজন তার বিশেষ উপদেষ্টা ছিলেন। তাদের মধ্যে আল-আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব এবং তার পুত্র আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুম, তাকে তিনি সব সময় নিজের সাথে রাখতেন, মদীনা তো বটেই, সফরেও প্রায়ই সাথে নিতেন; উসমান ইবনে আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহু; আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু; আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু; মু'আয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু; উবাই ইবনে কাব রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং যায়েদ ইবনে সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অন্যতম। এমন আরও অনেকের পরামর্শ নিতেন। খলীফার উপদেষ্টারা খোলাখুলিভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করতেন। এ জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কখনো তাদের আখলাক কিংবা সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন না।
কুরআন বা হাদীসে কোনো বিষয়ে স্পষ্ট সমাধান না পেলে তিনি পরামর্শ নিতেন। কারণ, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের হাদীসটি তিনি না জানলেও অন্য কোনো কোনো সাহাবীর জানা থাকতে পারে।
কুরআনে কোনো আয়াতের যদি একাধিক অর্থ থাকত সেক্ষেত্রেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহাবায়ে কেরামের মতামত নিতেন। এজন্য প্রয়োজন বুঝে এক বা একাধিক সাহাবীর সাথে আলোচনা করা হতো।
সমস্যায় পড়লে সাহাবায়ে কেরামদের মধ্যে যতজনে পরামর্শ নেওয়া সম্ভব হতো তিনি নিতেন। প্লেগে আক্রান্ত সিরিয়ায় যাওয়ার সময়ও তিনি এই পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন। সিরিয়ার নিকটবর্তী সারাগে তার যাত্রাবিরতি ছিল। গভর্নরেরা তার সাথে দেখা করতে এলে তিনি প্লেগের খবর পান। আনসার-মুহাজিরগণ সফরে তার সাথেই ছিলেন। তিনি তাদের কাছে জানতে চাইলেন, এমন অবস্থায় কী করা উচিত। তারা পরস্পরবিরোধী মতামত দিচ্ছিলেন। একদল বললেন, 'আপনি আল্লাহ তা'আলার কাজে বের হয়েছেন। প্লেগের খবর আপনার কাজ যেন বাধাগ্রস্ত না করে।' আরেক দল বললেন, 'এমন কঠিন পরীক্ষায় এগিয়ে যাওয়া মানে নিশ্চিত মৃত্যু। আমাদের মতে, আপনার যাওয়া উচিত নয়।'
অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কয়েকজন কুরাইশ মুহাজিরদের পরামর্শ নিলেন। তারা সবাই ফেরার পক্ষে ছিলেন। সবার মতামত শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘোষণা করলেন, 'আমরা সকালে ফিরে যাচ্ছি।' আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু অবাক হয়ে বললেন, 'আপনি কি আল্লাহর ফয়সালা থেকে পালাচ্ছেন?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর এক ফয়সালা থেকে পালিয়ে আরেক ফয়সালার দিকে যাচ্ছি। মনে করো, কোনো উপত্যকায় তোমাদের উট চরাতে গেছ। এর একদিকে সবুজ ঘাস আর আরেক দিক বিরানভূমি। এখন উট যদি সবুজ ঘাস খায় তা যেমন আল্লাহর হুকুম, আবার সেগুলো অনুর্বর জমির দিকে যায় তা-ও কি আল্লাহর হুকুম নয়?'
আব্দুর রহমান আল আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের আলোচনা শুনে এগিয়ে এলেন। বললেন, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা যখন শুনতে পাবে কোনো এলাকায় মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে তখন তোমরা সেখানে যেয়ো না। আর যখন কোনো এলাকায় মহামারী ছড়িয়ে পড়ে আর তোমরা সেখানে উপস্থিত থাক, তবে সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করো না।'
অনেক ধরনের বিষয় শূরার অন্তর্ভুক্ত ছিল। রাজনৈতিক; প্রশাসনিক সমস্যা, যেমন— প্রতিনিধি এবং গভর্নরদের নিয়োগ; সমরনীতি; শরীয়তের বিষয়, যেমন— কোনোটা হালাল, কোনোটা হারাম; বিচারিক বিষয়াদি, যেমন— রায় ঘোষণা ইত্যাদি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শূরার প্রয়োগ হতো সেগুলো নিয়ে পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর পক্ষে দলিলও পাওয়া যাবে, ইনশাআল্লাহ। খুলাফায়ে রাশেদীন কুরআন আর সুন্নাহর আলোকে শূরা প্রয়োগ করতেন।
মুসলিম রাষ্ট্রের খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খেয়ালখুশিমতো রাষ্ট্র পরিচালনা করেননি। ইসলামের অকাট্যনীতির ভিত্তিতে তিনি কাজ করে গেছেন।

টিকাঃ
৪১৩. সূরা আল-ইমরান, ৩: ১৫৯।
৪১৪. সূরা আশ-শূরা, ৪২: ৩৮।
৪১৫. নিদহাম আস-সিয়াসী ফিল-ইসলাম, আবু ফারিস, পৃ. ৯।
৪১৬. আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, আন-নাজ্জার, পৃ. ২৪৬।
৪১৭. সিরাজ আল-মামলুক, আত-তারতুশী, পৃ. ১৩২।
৪১৮. আল-ইদারাহ আল-আসকারিয়‍্যাহ ফিদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়্যাহ, সুলাইমান আল-কামাল, ১/২৭৩।
৪১৯. প্রাগুক্ত।
৪২০. আত-তাবারি, ৩/৪৮১।
৪২১. মুরূজ আয-যাহাব, ২/৩১৫।
৪২২. মুরূজ আয-যাহাব, ২/৩১৫।
৪২৩. নিহায়াত আল-আরাব, ৬/১৬৯।
৪২৪. আল-ইদারা আল-আসকারিয়া ফিদ-দাওলা আল-ইসলামিয়া, সুলাইমান আল-কামাল, ১/২৭৪।
৪২৫. আল-ইসাবা, ২/৪৯১।
৪২৬. আল-ইদারা আল-আসকারিয়া ফিদ-দাওলা আল-ইসলামিয়া, সুলাইমান আল-কামাল, ১/২৭৫।
৪২৭. আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, আন-নাজ্জার, পৃ. ২৪৭।
৪২৮. প্রাগুক্ত।
৪২৯. আ'সর আল-খিলাফা আর-রাশিদীন, পৃ. ৯০।
৪৩০. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৭।
৪৩১. আ'সর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ৯০।
৪৩২. প্রাগুক্ত।
৪৩৩. আস-সুনান আল-কুবরা, আল-বাইহাকী, ৯/২৯; আ'সর আল-খুলাফা আর-রাশিদূন, পৃ. ৯০ থেকে উদ্ধৃত।
৪৩৪. আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, আন-নাজ্জার, পৃ. ২৪৭।
৪৩৫. আ'সর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ৯০।
৪৩৬. আ'সর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ৯১।
৪০৭. সহীহ, মুসলিম, ৪/১৭৪০, হাদীস নং ২২১৯।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 ন্যায়পরায়ণতা এবং সমতা বিধান

📄 ন্যায়পরায়ণতা এবং সমতা বিধান


মুসলিম সমাজে ইসলামী নীতি প্রতিষ্ঠা করাটাও ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। তার মধ্যে ন্যায়বিচার এবং সমতাবিধান অন্যতম। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার স্বাগতিক ভাষণে এই মূল্যবোধগুলো আঁকড়ে থাকার প্রত্যয় ঘোষণা করেছিলেন। তিনি উপলদ্ধি করেছিলেন যে মুসলিম সমাজ এবং নীতির মূলভিত্তি হচ্ছে ইসলামী ন্যায়বিচার। ইনসাফ ভুলে গিয়ে অরাজকতা চালাতে থাকলে ইসলামের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।
একজন স্বেচ্ছাচারী শাসক কখনো ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জনগণের মধ্যে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। অন্যদিকে জনগণের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হলো ইসলামের দৃষ্টিতে পবিত্রতম ফরয কাজ। উম্মতমাত্রই স্বীকার করবে যে, সমাজে প্রত্যেক মানুষের জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ফরয। ইমাম আল-ফাখর আল-রাযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, উলামায়ে কেরামের মতে, রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা একজন খলীফার জন্য ওয়াজিব।
ইমাম আল-ফাখর আর-রাযী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, 'শাসককে (বিচারককে) ন্যায়বিচারক হতে হবে এই ব্যাপারে সকলেই (উলামায়ে কেরাম) একমত।'
কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এই বক্তব্যের স্বপক্ষে দলিল উল্লেখ করা হয়েছে। একটি মুসলিম রাষ্ট্রের লক্ষ্য থাকে অত্যাচার, অপরাধ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। একজন ভুক্তভোগী যেন শ্রম এবং অর্থ অপচয় ছাড়াই সহজে এবং দ্রুত ন্যায়বিচার পায় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ইসলামী রাষ্ট্রের ওপরে বর্তায়। অধিকার আদায়ের পথে যত বাধা আসে রাষ্ট্র যেন তা দূর করতে সক্ষম হয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর রাষ্ট্র তেমনই ছিল। মানুষের হক আদায়ের জন্য সম্ভাব্য সব দুয়ার তিনি উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। তিনি নিজে মানুষের অবস্থা তদারক করতেন, সব রকম যুলুম থেকে তাদের রক্ষা করতেন। তিনি সফলভাবে গর্ভনর এবং জনগণের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কে আপনজন, কে শত্রু, কে ধনী আর কে গরীব তিনি কখনো এসবের পরোয়া করেননি। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোনো সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনো ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার করো— এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে খুবই জ্ঞাত।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার উদাহরণ যে কারও মন ও মননে জায়গা করে নেবে। মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া এবং ঈমানের দিকে তাদের হৃদয় উন্মুক্ত করাকে তিনি ন্যায়বিচার বলে মনে করতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পদ্ধতিই তার পদ্ধতি ছিল। সবার প্রতি ন্যায়বিচারের সাথে সুতরাং সমাজের প্রত্যেক মানুষ উন্নতি করছিল। দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানোর বেলায় তিনি ছিলেন অনবদ্য। ফলে ন্যায়বিচার এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাম একাকার হয়ে আছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবন সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা আছে এমন ব্যক্তিও ন্যায়বিচারক বলতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাম উচ্চারণ করবে। তার এই সাফল্যের পেছনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর কয়েকটি হলো :
আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর তুলনায় তার খেলাফত ছিল দীর্ঘ। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দশ বছর ধরে খলীফার পদে ছিলেন। যেখানে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু দুই বছরের কিছু বেশি শাসনের সুযোগ পান।
তিনি দৃঢ়তার সাথে সত্য আঁকড়ে ছিলেন। বাইরের লোকদের তুলনায় নিজের সাথে এবং পরিবারের সদস্যদের সাথে অনেক ছিলেন সবচেয়ে বেশি কঠোর।
আল্লাহ তা'আলার সাথে সাক্ষাতের চিন্তায় তিনি মগ্ন থাকতেন। যে কারণে তিনি মানুষের খুশির আগে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি খুঁজেছেন এবং একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় পাননি।
সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়ীনগণ শরীয়তের খুব পাবন্দী করতেন। ফলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের পূর্ণ সমর্থন এবং সহযোগিতা পেয়েছেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু স্বয়ং ন্যায়বিচার এবং নিরপেক্ষতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
এখানে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতার কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো :
ক। একবার তিনি একজন মুসলমানের বিপরীতে একজন ইহুদির পক্ষে রায় দেন। বিধর্মী বলে ইহুদি ব্যক্তির প্রতি তিনি কোনো রকম অবিচার করেননি। ইমাম মালিক রহ. সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘একজন মুসলিম এবং একজন ইহুদি অভিযোগ নিয়ে আসার পরে উমর ইবনে খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে ইহুদি ব্যক্তিকে সঠিক বলে মনে হলো। তাই তিনি তার পক্ষেই রায় দেন। অতঃপর ইহুদি ব্যক্তি বলল, ‘আল্লাহর শপথ, আপনি সঠিক বিচার করেছেন।’
খ। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিভিন্ন সময়ে প্রতিনিধিদের এসে তার সাথে দেখা করতে বলতেন। এমন এক সময়ের কথা। প্রতিনিধিদের একত্র করে বললেন, ‘হে লোকসকল, তোমাদের আঘাত দেবার জন্য কিংবা সম্পদ ছিনিয়ে নিতে আমি প্রতিনিধিদের নিয়োগ দিইনি। বরং যে কোনো ধরনের যুলুম থেকে তোমাদের নিরাপদ রাখতে এবং গনিমতের মাল সঠিকভাবে বণ্টন করে দিতে তাদের পাঠানো হয়েছে। যদি কারও সাথে কোনো অন্যায় আচরণ হয়ে থাকে তাকে দাঁড় করাও।’ এক ব্যক্তি দাঁড়াল। বলল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আপনার গভর্নর আমাকে একশ বেত্রাঘাত করেছেন।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অভিযুক্ত গভর্নরের দিকে ফিরে বললেন, ‘তুমি কেন তাকে বেত্রাঘাত করেছ? এখনই এর সুরাহা করে ফেল।’ তখন আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি এমন সুযোগ দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। মানুষ আপনার এই নযীর অনুসরণ করতে থাকবে।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে মানুষকে তার সমাধান করার সুযোগ দিতেন, সেখানে আমারও কি তা-ই করা উচিত নয়?’ আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘তাহলে অন্তত এই লোকটির সাথে আমাদের চুক্তিতে আসার সুযোগ দিন।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘ঠিক আছে, সমাধান করো।’ প্রতি বেত্রাঘাতের বিনিময়ে দুই দিনার করে দেওয়া হলো। সুতরাং দুশো দিনারে তাদের মামলা মিটে যায়। সেদিন তাদের প্রস্তাবে যদি ওই ব্যক্তি রাজী না হতো তবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ঠিকই একশো বেত্রাঘাতের মাধ্যমে বদলা নেবার হুকুম দিতেন।
গ। এক মিসরীয় ব্যক্তি আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আসে। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখনো মিসরের গভর্নর। অভিযোগকারী উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, যুলুমের শিকার হয়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছি।' তিনি বললেন, 'তোমাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হবে।' লোকটি বলল, 'আমি আমর ইবনে আসের ছেলেকে দৌড়ে হারিয়েছি। হেরে গিয়ে সে আমাকে মারতে শুরু করে। তখন বলছিল—আমি সম্ভ্রান্ত লোকের সন্তান।' অভিযোগ শোনার পরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখনই ছেলেকে নিয়ে আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহুকে মদীনায় আসার জন্য চিঠি পাঠালেন।
আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু হাজির হলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'সেই মিসরীয় কোথায়?' বেত তুলে নাও, তাকে আঘাত কর।' লোকটি যখন আঘাত করছিল তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতে লাগলেন, 'সম্ভ্রান্ত লোকের সন্তানকে আঘাত কর।' আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু পরে বলেছিলেন, 'আমরের ছেলেকে যখন আঘাত করছিল, আল্লাহর কসম, তাতে আমরা সন্তুষ্ট ছিলাম (কারণ, সে তার অপরাধের যোগ্য শাস্তি পেয়েছে)। লোকটা তার মন শান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাকে আঘাত করতেই থাকে।'
উপরন্তু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকটিকে নির্দেশ দিলেন, 'এবার আমরের টেকো মাথায় মারো।' লোকটি বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমাকে তার ছেলে মেরেছে। তার বদলা নিয়ে আমি সন্তুষ্ট।' এবার উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে ফিরে বললেন, 'জন্মসূত্রে স্বাধীন মানুষদের তুমি কবে থেকে দাস ভাবতে শুরু করেছ?' আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমি এই ঘটনার কিছুই জানি না। লোকটি আমার কাছে কোনো অভিযোগ নিয়ে আসেনি।'
খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে মুসলিম-রাষ্ট্র পুরোপুরি ন্যায়বিচারের ওপরে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইবনে তাইমিয়া রহমাতুল্লাহি আলাইহি কত সুন্দর করেই না বলেছেন, 'নিশ্চয়ই, আল্লাহ তা'আলা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকারী জাতিকে সাহায্য করেন যদিও তা বিধর্মী হয়। আর আল্লাহ যুলুমকারী কোনো জাতিকে সাহায্য করেন না যদি তা মুসলিমরাষ্ট্র হয়.. আর জনগণ মুসলিম হলেও তিনি অন্যায়কারী, অত্যাচারী দেশকে হেফাযত করেন না। ন্যায়বিচারের মাধ্যমে মানুষ মহৎ হয় এবং সম্পদের প্রবৃদ্ধি ঘটে।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সমতা-বিধানের বেলায় খুব যত্নশীল ছিলেন। সম- অধিকার ইসলামে কতটা গুরুত্বপূর্ণ নিচের এই আয়াত তার প্রমাণ, يَأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْتُكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَ انْثَى وَجَعَلْنَكُمْ شُعُوبًا وَقَبَابِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَنقُكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ
হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাদিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।
ইসলামে শাসক-শাসিত, নারী-পুরুষ, আরব-অনারব, সাদা-কালোয় কোনো ভেদাভেদ নেই। ইসলামে জাতি, বর্ণ, সামাজিক মর্যাদা আলাদা গুরুত্ব পায় না। শরীয়তের দৃষ্টিতে শাসক-শাসিত সবাই সমান। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তার সমতা বিধানের কয়েকটি উদাহরণ:
ক। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে মদীনা একবার ভয়াবহ খরার কবলে পড়ল। চারপাশ এমন শুষ্ক হয়ে উঠল যে ধুলো ছাইয়ের মতো বাতাসে উড়ত। বছরটি আম আর-রামাদা, ‘ভস্মের বা ছাইয়ের বছর’, নামে পরিচিত। এমন অবস্থায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শপথ করলেন যে, মানুষের অবস্থার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তিনি ঘি, দুধ বা দই মুখে তুলবেন না। মদীনার বাজারে খাবার আসতে শুরু করলে তার খাদেম চল্লিশ দিরহাম দিয়ে সেসব কিনে আনে। তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সামনে খাবারগুলো পরিবেশন করে বলল, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহ আপনার ওয়াদা পূর্ণ করেছেন এবং আপনাকে উত্তম বদলা দিয়েছেন। বাজারে ঘি-দুধের আমদানী হয়েছে। তাই আপনার জন্য চল্লিশ দিনার দিয়ে সেগুলোর কিছু কিনে এনেছি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি এগুলোর পেছনে বেশি খরচ করে ফেলেছ। যা এনেছ, পুরোটা দান করে দাও। আমি খাবার নিয়ে বিলাসিতা পছন্দ করি না। মানুষের কষ্ট নিজে ভোগ না করলে তা অনুভব করব কীভাবে?'
■খ। খরার বছর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনযাপন এমন ছিল। একইভাবে 'মূল্যস্ফীতির বছরেও' তিনি নিজেকে সব রকম সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে রাখেন। ঘির দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি জয়তুন-তেল খেতে শুরু করেন। তার পেটে আওয়াজ হতো। তিনি তখন পেটের দিকে তাকিয়ে বলতেন, 'যতই আওয়াজ করো, আল্লাহর কসম, দেশের লোকেরা ঘী না খাওয়া পর্যন্ত তুমি এর স্বাদ পাবে না।'
■গ। খলীফারা সে যুগে সব জনগণের মধ্যে সমতা-বিধান করেই ক্ষান্ত ছিলেন না। মনিব-খadেমের মতো সামাজিক সম্পর্কগুলোতেও তারা সমতাবিধানে সচেষ্ট ছিলেন। ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন একটি ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি বলেছেন : উমর ইবনুল খাত্তাব হজ পালন করতে গেলে তার জন্য সাফওয়ান ইবনে উমাইয়্যা খাবার প্রস্তুত করেন। চারজন খাদেম তার সামনে বিশাল থালাভর্তি খাবার নিয়ে হাজির হলো মেহমানের সামনে খাবার রেখে তারা দাঁড়িয়ে রইল। উমর বললেন, 'তুমি কি চাও না তারা খাওয়ায় শরীক হোক?' তখন সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ বললেন, 'না, হে আমীরুল মুমিনীন, আল্লাহর কসম। এগুলো আমরাই খাব।' এ কথা শুনে উমর ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। তিনি বললেন, 'খাদেমদের ওপরে নিজেদের গুরুত্ব দেওয়ার তারা কে? আল্লাহ তাদের শাস্তি দিন!' এবার খাদেমদের দিকে ফিরে বললেন, 'বসে খাও।' খাদেমরা খেতে লাগল কিন্তু উমর খাবার মুখে তোলেননি।
■ ঘ। সাধারণ মুসলিমরা যা খেতে পারত না, এমন খাবারও তিনি গ্রহণ করেননি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দিনের পর দিন রোজা রাখতেন। দুর্ভিক্ষের সময় তেলে ভেজানো রুটি খেতেন। তখন একবার একটি উট যবেহ করা হয়েছিল। সবার মাঝে গোশত বিলি করে এর উৎকৃষ্ট অংশ—কুঁজ আর কলিজা—তার সামনে হাজির করা হলো। তিনি জানতে চাইলেন, ‘এগুলো কোথায় পেলে?’ তারা বলল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, আজ আমরা উট যবেহ করেছি। সেই গোশত।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘ইশ! তা হয় না! জনগণকে নিকৃষ্ট জিনিস দিয়ে আমি অধম আমীর উৎকৃষ্ট অংশ খাব? এগুলো নিয়ে যাও। আমার জন্য অন্য কিছু আনো।’ তার সামনে রুটি আর জয়তুন-তেল আনা হলো। তিনি রুটি ছিঁড়ে তেলে ভেজাতে লাগলেন।
■ ঙ। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনাসহ অন্যান্য অঞ্চলেও সমান অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার ছিলেন। দূর অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা গভর্নর এবং প্রতিনিধিদেরও তিনি এই শিক্ষা দিয়েছিলেন। খাওয়া-দাওয়ার বেলাতেও এই নিয়ম বহাল ছিল। উতবা ইবনে ফারকাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আযারবাইজানে গেলে তাকে ‘খাবীস’ নামের বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হয়। ‘খাবীস’ এক ধরনের সুস্বাদু মিষ্টি খাবার। তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি আমীরুল মুমিনীনের জন্য এমন খাবার তৈরি করব।’ তিনি দুটি পাত্রে সেই খাবার ভরে খলীফার জন্য পাঠিয়ে দিলেন। দুজন প্রতিনিধি এগুলো নিয়ে মদীনায় এসে পৌঁছল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খাবারের ঢাকনা তুলে বললেন, ‘এটা কী?’ তারা বলল, ‘খাবীস।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একটুখানি চেখে দেখলেন তা মিষ্টি স্বাদের। তিনি বললেন, ‘মুসলিমরা কি ঘরে ঘরে এই জিনিস খেতে পায়?’ একজন জবাব দিল, ‘না।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘এগুলো ফেরত নিয়ে যাও।’ তিনি উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চিঠি পাঠালেন, ‘তুমি যে জীবনযাপন করছ, তা তোমার মা-বাবার কষ্টার্জিত নয়। তুমি নিজের বাড়িতে বসে যা দিয়ে উদরপূর্তি করছ, লক্ষ্য রাখবে সব মুসলিম যেন তা খেতে পায়।’
চ। সম্পদ বণ্টনের বেলায়ও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সমতা-বিধানের চেষ্টা করতেন। তিনি সাধারণ লোকজনের মাঝে বসে বিলি-বণ্টন করতে বসতেন। এমন এক পরিস্থিতিতে একদিন সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ভিড় ঠেলে তার কাছে এসে দাঁড়ালেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে বললেন, 'আল্লাহর দুনিয়ায় (খলীফাদের প্রতি) কোনো সম্মান আর রাখলে না। তোমার প্রতিও যে কোনো সম্মান দেখাতে পারব না, তোমাকে শিক্ষা দিতে চাচ্ছি।' উল্লেখ্য যে, সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন একাধারে দুনিয়াতে জান্নাতের সুখবর পাওয়া সাহাবী, খসরুর রাজধানী ইরাক বিজয়ী, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আহত হওয়ার পরে খলীফার নিয়োগকৃত অন্যতম শূরা-সদস্য, ইন্তেকালের আগে তার ওপরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সন্তুষ্ট ছিলেন এমন সাহাবী, ইসলামের যোদ্ধা খেতাবপ্রাপ্ত বুযুর্গ। অথচ সমতা-বিধানের বেলায় তার ক্ষেত্রেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কোনো ছাড় দেননি।
ছ। ইবনুল জাউযী থেকে বর্ণিত, খলীফা উমর ইবনে খাত্তাবের ছেলে আবদুর রহমান মিসরে ছিলেন। সেখানে মদ পান করার কারণে মিসরের তৎকালীন গভর্নর আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে শাস্তি দেন। তখন নগর-চত্বরে সাধারণ মানুষের সামনে শাস্তি কার্যকর করার নিয়ম ছিল। আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের ঘরে খলীফাপুত্রকে শাস্তি দিয়েছিলেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে এই খবর চলে গেল। তিনি আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে চিঠি দিলেন, 'আল্লাহর বান্দা আমীরুল মুমিনীন উমরের পক্ষ থেকে অপরাধী ইবনে আসের প্রতি। হে আসের পুত্র, তোমার দুঃসাহস এবং আমার আইনের বিরুদ্ধাচরণ দেখে আমি অবাক হয়েছি। উত্তম হওয়া সত্ত্বেও আমি তোমাকে বদরী সাহাবীদের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। এর কারণ, আমার মনে হয়েছিল—তুমি আমার আইন প্রয়োগ করতে পারবে। অথচ তুমি আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ। তুমি এত নিচে নেমে গেছ যে, চূড়ান্ত অপমান করে তোমাকে পদচ্যুত করব বলে ভাবছি। তুমি আমার অবাধ্য হয়ে আব্দুর রহমানকে ঘরে নিয়ে শাস্তি দিয়েছ। আব্দুর রহমান তোমার অধীনে সাধারণ মানুষ ছাড়া আর কিছুই নয়। তার সাথে আর দশজন মুসলমানের মতো আচরণ করা উচিত ছিল। কিন্তু তুমি হয়তো ভেবেছ, সে তো আমীরুল মুমিনীনের সন্তান! অথচ তুমি ভালো করে জান, আমি আল্লাহর আদিষ্ট শাস্তি (হাদ্দ) কার্যকরের বেলায় কাউকে ছাড় দিই না। আমার চিঠি পাওয়া মাত্র তাকে এক কাপড়ে পাঠিয়ে দেবে। অপরাধের শাস্তি কেমন হয় তা সে জানুক।' আব্দুর রহমান রাযিয়াল্লাহু আনহু মদীনায় পৌঁছলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের হাতে আল্লাহর আদিষ্ট পন্থায় হাদ্দ কার্যকর করেছেন। তা-ও সবার সামনে। ইবনে সা'দ এবং ইবনে যুবায়েরের বরাত দিয়ে আব্দুর রায্যাক এর দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন। ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষ থেকে তিনি এর বর্ণনা দেন। এর সনদ সহীহ।
শরীয়তে সমতা-বিধান যে কতখানি জরুরী এখানে তার স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। এখানে অপরাধী স্বয়ং খলীফার পুত্র। তা স্বত্ত্বেও গভর্নর শাস্তি মওকুফ করেননি। কেবল ভিন্নভাবে তা কর্যকর করেছিলেন। এতটুকু স্বজনপ্রীতি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে কষ্ট দিয়েছে। যার রেশ ধরে তিনি গভর্নরকে শাস্তি দেন। অথচ আমর ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন মিসর জয় করা সেনাপতি। আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য যা অসম্ভব ছিল, তিনি তা করে দেখিয়েছেন। একই সাথে ছেলেকেও মঙ্গলের জন্য শাসন করেছেন। নিজের সন্তানের সাথে যিনি এমন আচরণ করতে পারেন, তিনি অন্যদের বেলায় কেমন ন্যায়পরায়ণ ছিলেন তা সহজেই অনুমেয়।
জ। ইতিহাস ঘাঁটলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এমন আরেকটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। অনেক কিতাবে এই ঘটনা গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। জাবালা ইবনে আইহামের ঘটনা। তিনি সম্রাট হেরাক্লিয়াসের পক্ষ থেকে গাসসানের সর্বশেষ শাসক ছিলেন। গাসসানের গোত্রগুলো সংঘবদ্ধভাবে সিরিয়ায় বসবাস করত। ইসলাম আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত তারা রোম সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। ইসলাম প্রসারের শুরুর দিকে রোম সম্রাটের প্ররোচনায় তারা প্রায়ই আরবে লুটপাট করত। এক সময় ইসলাম শক্তিশালী হয়ে চারদিকে ছড়াতে শুরু করল। তখন মুসলিমদের কাছে রোমানরা হেরে যায়। সিরিয়ার ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলো এক এক করে ইসলাম কবুল করতে থাকে। গাসসানের প্রভাবশালী নেতা জাবালা ইবনে আইহামও সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি ইসলাম গ্রহণ করবেন। তিনি মুসলিম হওয়ার পরে তার স্বজনরাও এগিয়ে এলো।
জাবালা মদীনায় যাওয়ার অনুমতি চেয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে চিঠি দিয়েছিলেন। ইসলাম গ্রহণের কথা শুনে খলীফা তার ওপর খুব সন্তুষ্ট ছিলেন। ফলে তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানান। অনুমতি পেয়ে জাবালাহ মদীনায় যান এবং সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং বেশ সমাদর করেছিলেন।
জাবালা স্বতস্ফূর্তভাবে হজ করতে যান। কাবার চারপাশে তাওয়াফ করার সময় বনু ফাযারা গোত্রের এক লোকের পায়ে লেগে তার ইহরামের কাপড় খুলে পড়ে। সদ্য ইসলাম কবুল করা গাসসানী নেতা প্রচণ্ড রেগে যান। লোকটিকে এমন মারধর করেন যে, তার নাক ফেটে যায়।
ফাযারী লোকটি যথারীতি আমীরুল মুমিনীনের কাছে অভিযোগ নিয়ে গেল। সব শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জাবালাকে ডেকে পাঠান। জabala আসার পরে তিনি ঘটনার সত্যতা জানতে চাইলেন। জাবালাও সবকিছু স্বীকার করলেন। এমনকি নাকে আঘাতের কথাও অস্বীকার করেননি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এমন কী হয়েছিল যে তুমি ভাইয়ের নাক ফাটানোর মতো অপরাধ করেছ?' তিনি বললেন, 'আপনি এই বেদুইনের প্রতি বেশি দয়াপরবশ হয়ে আছেন। কাবার পবিত্রতার কথা ভেবে তাকে ছেড়ে দিয়েছি। নয়তো তার মাথা কেটে ফেলতাম।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তুমি তোমার অপরাধ স্বীকার করেছ। এখন লোকটির সাথে মামলা মিটিয়ে ফেল, নয়তো এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে আমি তোমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা (কাসাস) নেব।'
জাবালা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, 'তা কী করে হয়? সে একজন সাধারণ প্রজা, আর আমি রাজা।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'ইসলাম তোমাদের দুজনকে এক কাতারে দাঁড় করিয়েছে।' জাবালা বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আমার মনে হয়েছিল ইসলামে প্রবেশের পরে আমি অন্তত জাহেলী যুগের তুলনায় বেশি সম্মান পাব।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তর্ক করা বন্ধ করো। তুমি নিজে এর সমাধান না করলে আমি তাকে বদলা নেওয়ার সুযোগ করে দেব।'
জাবালা এবার হুমকি দিলেন, 'তাহলে আমি আবার খ্রিস্টান হয়ে যাব।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু উল্টো হুমকি দিলেন, 'তুমি ধর্মত্যাগ করলে আমি তোমাকে হত্যা করব। কারণ, তুমি ইসলাম কবুল করে ফেলেছ। এখন ইসলাম ছেড়ে গেলে তুমি মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে যাবে। তখন তোমাকে হত্যা করতে বাধ্য হব।'
এই পর্যায়ে এসে জাবালা বুঝতে পারল—অসার তর্ক আর হুমকিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সিদ্ধান্ত বদলাবেন না। সুতরাং তিনি খলীফার কাছে এই ব্যাপারে ভেবে দেখার জন্য সময় চাইলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে সুযোগ দেন। অনেক চিন্তার পরে জাবালা একটি ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসলেন। তিনি তার লোকজন নিয়ে রাতের অন্ধকারে মক্কা ছেড়ে কনস্টান্টিনোপলে পালিয়ে যান। খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। পরে অবশ্য তিনি তার এই আচরণের জন্য তীব্রভাবে অনুতপ্ত হয়েছিলেন। প্রচণ্ড অনুতাপ থেকে তিনি মর্মস্পর্শী কবিতা রচনা করেন। তার কবিতা আজও আরব বিশ্বে সমাদৃত এবং বহুল পঠিত।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শরীয়ত মেনে সমতা-বিধানের উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই ঘটনা। ইসলামের দৃষ্টিতে রাজা-প্রজা সবাই সমান। সুতরাং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিশ্বাস করতেন সমতা বিধানকে কাগজে-কলমে বন্দী করে রাখলে চলবে না। এর বাস্তবায়নও সমান জরুরী।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহ তা'আলা আদিষ্ট শরীয়তের গুরুত্ব দিয়েছেন। এগুলোর বাস্তবায়নও করেছেন। জনগণও তাদের জীবনে এর প্রতিফলন দেখেছে। পিতৃত্বের বন্ধন, মর্যাদাপূর্ণ খেতাব, ধর্মের পার্থক্য কিংবা দিগ্বিজয়ী যোদ্ধার অবস্থান কোনো কিছুই তাকে প্রতিহত করতে পারেনি। এই মহান নীতি বাস্তবায়নের ফলে সকলেই যুলুম-অবিচারের বিপরীতে ন্যায়বিচার লাভ করেছিল।
খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে সমাজে সমতার বিধান কার্যকর ছিল। মানুষের মনে এর এমন প্রভাব ছিল যে, জাতিগত সংঘাত, শ্রেষ্ঠত্বের দাবিসহ বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব দূর হয়ে যায়। জাতিগত বৈষম্য লোপ পেতে শুরু করে। ফলে কোনো সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক সাধারণ লোকজনের ফায়দা নিতে পারত না। আর অসহায় ব্যক্তিমাত্রই নিজের অধিকার আদায় করতে সক্ষম ছিল। দায়িত্ব-কর্তব্যের বেলাতেও সবার সমান অধিকার ছিল। খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে সমান অধিকারের আলোয় চারপাশে আলো ছড়াতে শুরু করে। ফলে তৎকালীন সমাজের ভিত মজবুত হয়ে ওঠে।

টিকাঃ
৪৪২. নিদহাম আল-হুকম ফি আ'হদ আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, হামদ মুহাম্মাদ আস-সামাদ, পৃ. ১৪৫।।
৪৪৩. আল-ওয়াসাতিয়া ফিল-কুরআন আল-কারীম, আস-সাল্লাবী, পৃ. ৯৬।
৪৪৪. আল-মুয়াত্তা, আইন বিষয়ক অধ্যায়, নং ২।
৪৪৭. আত-তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সা'দ, ৩/২৯৩-২৯৪।
৪৪৮. পবিত্র কুরআন দ্রষ্টব্য, ২ : ২১।
৪৪৯. সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১৩।
৪৫০. ফিকহুত-তামকীন ফিল-কুরআন আল-কারীম, আস-সাল্লাবী, পৃ. ৫০১।
৪৫১. প্রাগুক্ত।
৪৫২. তারীখ আত-তাবারী, ৪/৯৮; নিদহাম আল-হুকম ফিশ-শারীয়াহ ওয়াত তারীখ আল ইসলামী, ১/৮৭।
৪৫৩. মানাকীব আমীর আল-মুমিনীন, ইবনে জাউযী, পৃ. ১০১।
৪৫৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ১০১।
৪৫৫. নিদহাম আল-হুকম ফিশ-শারীয়াহ ওয়াত-তারীখ আল-ইসলামী, ১/৮৭।
৪৫৬. নিদহাম আল-হুকম ফিশ-শারীয়াহ ওয়াত-তারীখ আল-ইসলামী, ১/৮৮।
৪৫৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮৮।
৪৫৮. মানাকীব আমীর আল-মুমিনীন, ইবনে জাউযী, পৃ. ১৪৭।
৪৯. আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, আন-নাজ্জার, পৃ. ২৪৩।
৫০. নিদহাম আল-হুকম ফিশ-শারীয়াহ ওয়াত-তারীখ আল-ইসলামী, ১/৮৮।
৪৬১. মানাকীব আমীর আল-মুমিনীন, ইবনে জাউযী, পৃ. ২৩৫।
৪৬২. আল-খিলাফাহ আর-রাশিদাহ ওয়াদ-দাওলাহ আল-উমাউয়িয়্যাহ, ইয়াহিয়া আল-ইয়াহিয়া, পৃ. ৩৪৫।
৪৬৩. ফান আল-হুকম ফিল-ইসলাম, ড. মুস্তাফা আবু যায়েদ, পৃ. ৪৭৫-৪৭৬।
৪৬৪. আল-মুগনি, ইবনে কুদামা, ৯/১৯০; ফান আল-হুকম, পৃ. ৪৭৭।
৪৬৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭৭।
৪৬৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭৮।
৪৬৭. আল-মুজতামা আল-ইসলামি দাআইমুহুওয়া আদাবুহু, ড. মুহাম্মাদ আবু আজওয়া, পৃ.১৬৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00