📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 কুরআন ও হাদীসে উমর রা.-এর খেলাফতের প্রতি ইশারা

📄 কুরআন ও হাদীসে উমর রা.-এর খেলাফতের প্রতি ইশারা


সুতরাং শূরা এবং জনমত দুটো পদ্ধতি মিলিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হয়েছিলেন। তিনি খলীফা হয়েছেন আর কেউ তার বিরোধিতা করেছে কিংবা অভিযোগ করেছে এমন তথ্য ইতিহাসের কোথাও নেই। তিনি যেভাবে সর্বসম্মতি এবং জনমতের ভিত্তিতে খলীফা হয়েছিলেন। তেমনইভাবে মুসলিম উম্মাহ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের শেষ দিন পর্যন্ত তার পেছনে একতাবদ্ধ হয়ে ছিল।
এক। কুরআন মাজীদের তিনটি আয়াতে আবু বকর, উমর রাযিয়াল্লাহু এবং উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের কথা আছে। কেবল তা-ই নয়, মুসলিম উম্মাহ তাদের আনুগত্য করতে বাধ্য—তারও ইশারা আছে। বেদুইনদের প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেছেন,
فَإِنْ رَّجَعَكَ اللَّهُ إِلَى طَائِفَةٍ مِّنْهُمْ فَاسْتَأْذَنُوكَ لِلْخُرُوجِ فَقُلْ لَّنْ تَخْرُجُوا مَعِيَ أَبَدًا وَ لَنْ تُقَاتِلُوا مَعِيَ عَدُوًّا إِنَّكُمْ رَضِيتُمْ بِالْقُعُودِ أَوَّلَ مَرَّةٍ فَاقْعُدُوا مَعَ الْخُلِفِينَ
বস্তুত আল্লাহ যদি তোমাকে তাদের মধ্য থেকে কোনো শ্রেণিবিশেষের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যান এবং অতঃপর তারা তোমার কাছে অভিযানে বেরোবার অনুমতি কামনা করে, তবে তুমি বলো যে, তোমরা কখনো আমার সাথে বেরোবে না এবং আমার পক্ষ হয়ে কোনো শত্রুর সাথে যুদ্ধ করবে না।
আয়াতটি সূরা আত-তাওবার। তাবুক অভিযানের পরে এই সূরা অবতীর্ণ হয়েছিল, এ নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এখানে তিন ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যারা অভিযানে যাওয়া থেকে বিরত ছিল। পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তা'আলা তাদের মাফ করে দেন। উল্লেখ্য যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জীবদ্দশায় তাবুক অভিযানের পরে আর কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। আরেকটি আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
سَيَقُولُ الْمُخَلَّفُونَ إِذَا انْطَلَقْتُمْ إِلَى مَغَانِمَ لِتَأْخُذُوهَا ذَرُونَا نَتَّبِعُكُمْ يُرِيدُونَ أَنْ يُبَدِّلُوا كَلَمَ اللهِ قُلْ لَّن تَتَّبِعُونَا كَذلِكُمْ قَالَ اللهُ مِنْ قَبْلُ فَسَيَقُولُونَ بَلْ تَحْسُدُ و نَنَا بَلْ كَانُوا لَا يَفْقَهُونَ إِلَّا قَلِيلًا
তোমরা যখন যুদ্ধলব্ধ ধন-সম্পদ সংগ্রহের জন্য যাবে, তখন যারা পশ্চাতে থেকে গিয়েছিল, তারা বলবে : আমাদেরকেও তোমাদের সাথে যেতে দাও। তারা আল্লাহর কালাম পরিবর্তন করতে চায়। বলুন, তোমরা কখনো আমাদের সাথে যেতে পারবে না। আল্লাহ্ পূর্ব থেকেই এরূপ বলে দিয়েছেন।
এখানে দেখা যাচ্ছে, আল্লাহ তা'আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ওই ব্যক্তিদের যে কোনো অভিযানে যেতে নিষেধ করেছেন। আবার তারপর বলেছেন যে, তারা এর পরে আর কোনো জিহাদেও যেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বের না হয়।
আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, قُلْ لِلْمُخَلَّفِينَ مِنَ الْأَعْرَابِ سَتُدْعَوْنَ إِلَى قَوْمٍ أُولِي بَأْسٍ شَدِيدٍ تُقَاتِلُونَهُمْ أَوْ يُسْلِمُونَ فَإِنْ تُطِيعُوا يُؤْتِكُمُ اللهُ أَجْرًا حَسَنًا وَإِنْ تَتَوَلَّوْا كَمَا تَوَلَّيْتُمْ مِنْ قَبْلُ يُعَذِّبُكُمْ عَذَابًا أَلِيْمَانَ
গৃহে অবস্থানকারী মরুবাসীদের বলে দিন: আগামীতে তোমরা এক প্রবল পরাক্রান্ত জাতির সাথে যুদ্ধ করতে আহ্বত হবে। তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করবে, যতক্ষণ না তারা মুসলিম হয়ে যায়। তখন যদি তোমরা নির্দেশ পালন কর, তবে আল্লাহ তোমাদেরকে উত্তম পুরস্কার দিবেন। আর যদি পৃষ্ঠপ্রদর্শন করেছ, তবে তিনি তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দিবেন।
এখানে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বদলে অতি শীঘ্র অন্য কেউ আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের আহ্বান জানাবেন। হয় তারা জিহাদে লড়বে, নয়তো আত্মসমর্পণ করবে। এখন আল্লাহ তা'আলা ওয়াদা করেছেন, ওই ব্যক্তির ডাকে সাড়া দিলে তাদের ন্যায্য পুরস্কার দেওয়া হবে। অন্যদিকে আল্লাহ তা'আলা সাবধান করেছেন, যারা তাকে অমান্য করবে তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
মুহাম্মাদ ইবনে হাযম উদ্ধৃত করেছেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পরে আবু বকর, উমর এবং উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুম ছাড়া আর কেউ জিহাদের আহ্বান জানাননি। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু আরবের বনু হানীফার মুরতাদ (ধর্মত্যাগী); আল আসওয়াদ, সাজ্জাহ এবং তুলাইহার সমর্থক; বাইজেন্টাইন এবং আরও পারসিকদের বিরুদ্ধে জিহাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বাইজেন্টাইন এবং পারসিকদের বিরুদ্ধে জিহাদে অংশগ্রহণের জন্য বেদুইনদের আহ্বান করেছিলেন। সবশেষে উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু বাইজেন্টাইন, পারসিকদের এবং তুর্কিদের বিরুদ্ধে জিহাদের আহ্বান জানান। সুতরাং দেখা যাচ্ছে আম-জনতা সাধারণত খলীফাদের প্রতি অনুগত থাকতে বাধ্য ছিল। কুরআনের আয়াত বিশ্লেষণ করলে আর কোনো দ্বিমত থাকে না। ফলে দেখা যাচ্ছে-জনগণের আনুগত্য থেকেই প্রমাণিত হয় যে, তারা প্রত্যেকে খলীফা হওয়ার যোগ্য ছিলেন।
■ দুই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'ঘুমের মধ্যে আমি দেখলাম, আমি একটি কূপ থেকে পানি তুলছি। আবু বকর এসে দুই-এক বালতি পানি তুললেন। তার উত্তোলনে দুর্বলতা ছিল। আল্লাহ তাকে মাফ করুন। এরপরে উমর ইবনুল খাত্তাব এলেন আর তার হাতে বালতিটি বিশাল আকার ধারণ করল। আমি তার মতো এত শক্তির সাথে কাউকে এভাবে পানি তুলতে দেখিনি। লোকেরা তৃপ্তি নিয়ে পানি পান করল, তাদের বসে থাকা উটগুলোকেও পানি পান করালো।'
এখানে খেলাফত প্রসঙ্গে (আবু বকর এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমের) দুজনের দিকে ইশারা করা হয়েছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামল এবং তার মহাসাফল্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই ভবিষ্যদ্বাণী পরবর্তীকালে আবু বকর এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমের জীবনে প্রতিফলিত হয়েছে। তারা যে সফল হবেন, তাদের প্রভাব অনেক দূরে যাবে এবং সাধারণ মানুষ যে তাদের মাধ্যমে উপকৃত হবে তা এই স্বপ্ন থেকে পরিষ্কার বোঝা গেছে। তাদের ওপরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গভীর প্রভাব ছিল। তিনি ইসলামের ভিত প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ছোট বড়সব বিষয়ে রীতি-নীতি পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যাখ্যা করেছেন এবং এখানেই শষ নয় সেগুলো বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করে হাতেকলমে শিখিয়ে গেছেন। ফলে দলে দলে লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা তার ওহী নাযিল করলেন:
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে পছন্দ করে দিলাম।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পরে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বছর দুয়েকের পরেও কয়েকমাস পর্যন্ত খেলাফত পরিচালনা করেছেন। ফলে 'আবু বকর এসে দুই-এক বালতি পানি তুললেন'-এই উক্তি থেকে তার খেলাফতের সময়কালের দিকে যে ইশারা ছিল তা নিয়ে আর কোনো সন্দেহ থাকে না। বর্ণনাকারী নিশ্চিত না হলেও আরেকটি বর্ণনা থেকে এর স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার খেলাফতকালে ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং তাদের ষড়যন্ত্রকে সমূলে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে ইসলাম আরও বিস্তৃতি লাভ করে, অনেক নতুন বিধি-বিধান জারি করা হয় যা ইতোপূর্বে করা হয়নি। কারণ তার খেলাফতকাল ছিল দীর্ঘ এবং অনেক নতুন ভূখণ্ডে ইসলামের পতাকা উত্তোলিত হয়। একই সঙ্গে যুদ্ধের গনীমত ও অন্যান্য উপায়ে অনেক সম্পদ রাষ্ট্রের কোষাঘারে জমা হয়। এই হাদীসে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের বৈধতা, তার শাসন পদ্ধতি ও তা থেকে মুসলিম উম্মাহর উপকৃত হওয়ার বিষয়ে ইশারা রয়েছে।
■ তিন। হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে বসে ছিলাম। তিনি বললেন, 'আমি জানি না, আমি আর কতদিন তোমাদের মাঝে জীবিত থাকবো। সুতরাং আমার অবর্তমানে তোমরা আমার পরে এই দুজনকে অনুসরণ করবে।'
এ কথা বলে তিনি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু ও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে ইশারা করলেন। অতঃপর বললেন, 'আর তোমরা আম্মারের অনুসৃত পন্থার অনুসরণ করবে এবং ইবনে মাসউদ তোমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করলে তোমরা তা বিশ্বাস করবে।'
এই হাদীসের পরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফত নিয়ে আর কোনো সন্দেহ থাকে না। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমার পরে এই দুজনের অনুসরণ করবে'—এর অর্থ তার পরে এই দুজন খলীফা আসবেন, তারা আবু বকর এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুম। আবার তাদের অনুসরণ করার কথা বলে এক অর্থে তিনি তাদের প্রশংসাও করেছেন। তারা অনুসরণযোগ্য। তারা আদেশ-নিষেধ করার ক্ষমতা রাখেন। ফলে তাদের সুন্দর আখলাক এবং আন্তরিকতার প্রশংসা করা হয়েছে। এই যোগ্যতাবলে তারা পরবর্তী খলীফা হবেন, এখানে এই ইশারা আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বরাবর তার উম্মতদের উৎসাহিত করে এসেছেন তারা যেন প্রথম যুগের মুসলিমদের অনুসরণ করে। কারণ, তারা উত্তম আখলাক এবং আচরণের অধিকারী ছিলেন। কারণ, তার পরে সাহাবায়ে কেরামগণই শ্রেষ্ঠ উম্মত। কেয়ামত পর্যন্ত তাদের এই মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে।
■ চার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমি ঘুমাচ্ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম, আমার জন্য এক পেয়ালা দুধ আনা হলো। আমার আঙুলের ডগা থেকে দুধ গড়িয়ে না পড়া পর্যন্ত আমি পান করতে লাগলাম। অতঃপর বাকিটুকু উমরকে দিলাম।' সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, এই স্বপ্নের কী তাবীর (ব্যাখ্যা) করবেন?' তিনি বললেন, '(এর অর্থ হচ্ছে) জ্ঞান।'
এ হাদীস থেকে স্পষ্টতই খলীফা হিসেবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর যোগ্যতা প্রমাণিত হয়। জ্ঞান ও দুধ, পরস্পর রূপক। ইমাম ইবনে হাজার রহমাতুল্লাহি আলাইহি মন্তব্য করেছেন, 'এখানে জ্ঞান বলতে, আল্লাহ তা'আলার কুরআন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহর আলোকে নেতৃত্ব ও শাসনের জন্য পর্যাপ্ত জ্ঞানকে বোঝানো হয়েছে।'
খুলাফায়ে রাশেদীনের মধ্যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর তুলনায় তার খেলাফত দীর্ঘ ছিল, আবার উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর তুলনায় মানুষ তার প্রতি বেশি অনুগত এবং শ্রদ্ধাশীল ছিল। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সংক্ষিপ্ত শাসনামলে খুব বেশি অঞ্চল জয় করতে পারেননি। এদিকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনকাল দীর্ঘ হলেও কেউ তার বিরোধিতাও করেনি। উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু অল্প কিছু অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এর মধ্যেই মতবিরোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো জনসমর্থনও তিনি পাননি। তাছাড়া মানুষ তার প্রতি অনুগত ছিল না। অবাধ্য লোকজনের কবলে পড়ে উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু মানুষের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে মত-পার্থক্য, বিরোধ এবং ফিতনা চরম আকার ধারণ করেছিল। তাই বলা যায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকেই হাদীসের স্পষ্ট ইশারা ছিল।
| পাঁচ। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের বললেন, 'তোমাদের মধ্যে কেউ কোনো স্বপ্ন দেখেছ কী?' এক ব্যক্তি বলল, 'আমি দেখেছি। দেখলাম একটি দাঁড়িপাল্লা আকাশ থেকে নেমে এসেছে। তারপর আপনাকে আর আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ওজন করা হলো। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর চেয়ে আপনার ওজন ভারী হলো। তারপর আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু ও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ওজন করা হলো। তাতে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওজন ভারী হলো। তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ওজন করা হলো। ওজনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ছাড়িয়ে গেলেন। তারপর দাঁড়িপাল্লা উঠিয়ে নেওয়া হলো।' আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা মোবারকে অসন্তুষ্টি লক্ষ্য করলাম।
এখানে নিঃসন্দেহে প্রথম তিনজন খুলাফায়ে রাশেদীনের পর্যায়ক্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের মধ্যে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু শ্রেষ্ঠতম। তারপরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং ক্রমে উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবস্থান। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরে দাঁড়িপাল্লা উঠে যাওয়ার অর্থ ছিল, উম্মতের সমস্যা আসন্ন এবং একে একে ফিতনায় তারা জর্জরিত হবে। এই কারণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা মোবারকে অসন্তুষ্টি দেখা গিয়েছিল।
■ ছয়। ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে বলল, 'আমি রাতে স্বপ্নে দেখি যে, এক টুকরো মেঘ থেকে ঘি আর মধু বর্ষিত হচ্ছে। তারপর আমি দেখি যে, লোকজন হাত বাড়িয়ে তা সংগ্রহ করছে। কেউ বেশি আর কেউ কম। এরপর আমি আসমান থেকে জমিন পর্যন্ত একটি ঝুলন্ত রশি দেখতে পাই। আমি দেখলাম, আপনি সে রশি ধরে উপরে উঠে গেলেন। এরপরে আরেক ব্যক্তি রশি ধরে উপরে উঠে গেলেন। এরপর এক ব্যক্তি সে রশি ধরতেই তা ছিঁড়ে গেল, পরে আবার জোড়াও লাগল।' এ কথা শুনে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার পিতা আপনার জন্য কুরবান হোক। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে আপনি এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা করার অনুমতি দিন।' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: 'আচ্ছা, তুমি এর ব্যাখ্যা রো।'
আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'মেঘের টুকরা হলো দ্বীন ইসলাম; আর যে ঘি ও মধু বর্ষিত হচ্ছে তা হলো কুরআনের মিষ্টি-মধুর কথা। এবং কম-বেশি সংগ্রহকারীরা হলো কুরআনের ইলম কম-বেশি অর্জনকারী। আর আসমান ও যমিনের মাঝে ঝুলন্ত রশির অর্থ হলো—ওই সত্য দ্বীন যার ওপর আপনি প্রতিষ্ঠিত। তারপর আল্লাহ আপনাকে উঠিয়ে নিলে, খেলাফতের দায়িত্ব আরেক ব্যক্তি গ্রহণ করবেন, তাঁকেও উঠিয়ে নেওয়া হবে। তারপরে আরেকজন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, তার রশি ছিঁড়ে যাবে। পরে তা জোড়া লাগবে। দায়িত্ব গ্রহণের পরে তাকেও উঠিয়ে নেওয়া হবে।' তারপরে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ আমার পিতা আপনার জন্য কুরবান হোন, আমি কি স্বপ্নের তা'বীর সঠিকভাবে বর্ণনা করতে পেরেছি? না ভুল হয়েছে?' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি কিছু ঠিক, কিছু ভুল বর্ণনা করেছ।' তখন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম। আমি যা ভুল করেছি, তা আপনি আমাকে বলে দিন।' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তুমি কসম করো না।' 'তারপরে আল্লাহ আপনাকে উঠিয়ে নিলে, খেলাফতের ওই দায়িত্ব আরেক ব্যক্তি গ্রহণ করবেন, তাকেও উঠিয়ে নেওয়া হবে'-এই উক্তিতে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের দিকে ইশারা আছে। আর, 'তারপরে আরেক ব্যক্তি দায়িত্ব গ্রহণ করবে, তাকেও উঠিয়ে নেওয়া হবে।' এই উক্তিটি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে ইশারা করে।
সাত। আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন: একদিন বনু আল- মুস্তালিক গোত্রের লোকেরা আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে পাঠাল। তারা জানতে চাচ্ছিল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অবর্তমানে তারা কাকে যাকাত প্রদান করবে? আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে (তাদের পক্ষ থেকে) প্রশ্ন করলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আবু বকরের কাছে।' আমি ফিরে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জবাব পেশ করলাম। তখন তারা বলল, 'আবার জিজ্ঞেস করে এসো, আবু বকরের যদি কিছু হয় তবে কার কাছে দেব?' আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে হাজির হয়ে আবারও প্রশ্ন করলাম। তিনি বললেন, 'উমরের কাছে।' আমি ফিরে গিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জবাব পৌঁছে দিলাম। এই হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খলীফা হওয়া নির্ধারিতই ছিল।
আট। শ্রেষ্ঠ মনে না করলে সাহাবা রাযিয়াল্লাহু আনহুম উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে একমত হতে পারতেন না। তাকে নিয়ে আবু বকর এবং আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুমের বক্তব্যও এর পক্ষে প্রমাণ বহন করে। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'ইয়া আল্লাহ, আমি আপনার শ্রেষ্ঠ বান্দাকে তাদের জন্য নিযুক্ত করলাম। বুখারী রহমুতুল্লাহি আলাইহি আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর ছেলে মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যাহ থেকে বর্ণনা করেছেন : 'একদিন আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে কে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি?' তিনি বললেন, 'আবু বকর।' আমি বললাম, 'তারপর কে?' তিনি রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'উমর।' আমার মনে হলো এবার তিনি উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাম বলবেন। আমি বললাম, 'তারপরে আপনি?' তিনি রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি একজন সাধারণ মুসলিমমাত্র।'
এই হাদীসও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষে যায়।
আস-সাফারিনী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, 'উল্লেখ যে, আবু বকর আস-সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের সাথে আমীরুল মুমিনীন, উমর ইবনে খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর দায়িত্ব গ্রহণ করা সম্পর্কযুক্ত ঘটনা ছিল। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের পক্ষে ইজমা, কুরআনের আয়াত আর সুন্নাহর মতো দলিল বিদ্যমান। লক্ষণীয় যে, মূল উৎসের জন্য যে নিয়ম, তার শাখা-প্রশাখার জন্যও একই নিয়ম। এখানে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যদি মূল উৎস ধরা হয়, তবে তার শাখা ছিলেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু। বিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম ভালোমতোই জানেন যে, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিয়োগ নিয়ে সাহাবীদের মধ্যে কোনো মতভেদ ছিল না। তাদের কাছে যেহেতু অকাট্য দলিল আছে তাই বিভ্রান্ত এবং বিপথগামীরা এর বাইরে অন্যকিছু দাবি করতে পারবে না।'

টিকাঃ
৩৫৬. প্রাগুক্ত।
৩৫৭. সূরা আত-তাওবা, ৯: ৮৩।
৩৫৮. আদ-দুর আল-মানসূর ফী আত-তাফসীর আল-মাসুর, ৪/১১৯, ১২২।
৩৫৯. সূরা ফাতহ, ৪৮: ১৫।
৩৬০. সূরা ফাতহ, ৪৮: ১৬।
৩৬১. আকীদাত আহলে সুন্নাহ ওয়া আল-জামাআ ফী আস সাহাবা আল-কিরাম, ২/৬৩৪।
৩৬২. আল-'আইতিকদ, আল-বাইহাকি, পৃ. ১৭৩।
৩৬৩. আল-ফাসল ফিল-মিলাল ওয়াল-আহউয়া ওয়াল-নিহাল, ৪/১০৯-১১০।
৩৬৪. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৯৩। সে সময় মুসলমানেরা কথায় কথায় 'আল্লাহ তাঁকে মাফ করুন' বাক্যটি খুব ব্যবহার করতেন। আবু বকরের রা. এর বেলায়ও এ কথা প্রযোজ্য।
৩৬৫. আল-ফাসল ফিআল-মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল, ৪/১০৯, ১১০।
৩৬৬. সূরা মায়িদা, ৫: ৩।
৩৬৭. আকীদাত আহলে সুন্নাহ ওয়া আল-জামাআ ফী আস সাহাবা আল-কিরাম, ২/৬৩৫।
৩৬৮. সিলসিলাত আল-আহাদীস, শায়খ আলবানি ৩/২৩৩, ২৩৬; সহীহ ইবনে হিব্বান (১৫/৩২৮); মুসান্নাফ ইবনে আবু শায়বা, ৭/৪৩৩; শায়খ আলবানী এই বর্ণনাগুলোকে (৩/৩৩৩, ৩৩৬) সহীহ বলেছেন।
৩৬৯. ফায়েদ আল-কাদীর, আল মানউয়ি, ২/৫৬।
৩৭০. সহীহ, মুসলিম, ১৮৫৯, ১৮৬০।
৩৭১. আকীদাত আহলে সুন্নাহ ওয়া আল-জামাআ ফী আস সাহাবা আল-কিরাম, ২/৬৩৭।
৩৭২. সুনান, আবু দাউদ, ২/৫১২; সুনান, তিরমিযী, ৪/৫৪0।
৩৭৩. আউনুল মাবুদ শারহু সুনান আবি দাউদ, ১৩/৩৮৭।
৩৭৪. সহীহ, মুসলিম, ১৭৭৭, ১৭৭৮।
৩৭৫. আকীদাহ আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামআহ, ২/৬৩৮।
৩৭৬. আল-মুস্তাদরাক, ৩/৭৭। এর সনদ সহীহ।
৩৭৭. আকীদাহ আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামআহ, ২/৬৩৯।
৩৭৮. কিতাব আল-ইমামা ওয়া আর-রাদ্দ আলা আর-রাফিদা, পৃ. ২৭৪।
৩৭৯. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৬৭১।
৩৮০. আকীদাহ আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামআহ, ২/৬৪০।
৩৮১. শারহ আত-তাহাবী, পৃ. ৫৩৯।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 উমর রা.-এর খেলাফতের অধিকার নিয়ে উলামায়ে কেরামের ঐকমত্য

📄 উমর রা.-এর খেলাফতের অধিকার নিয়ে উলামায়ে কেরামের ঐকমত্য


উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের ব্যাপারে যে সাহাবায়ে কেরাম একমত ছিলেন এ ব্যাপারে একাধিক দলিল রয়েছে।
ইসলামী শরিয়তে মজবুত দলিল হিসেবে কুরআন এবং সুন্নাহর পরই ইজমার স্থান। যে কোনো যুগে বিশিষ্ট উলামায়ে কেরাম যখন শরীয়তের কোনো বিষয়ে একমত পোষণ করেন তখন তাকে ইজমা বলে। নিচে এগুলো উল্লেখ করা হলো:
■ এক। আবু বকর আহমাদ ইবনুল হুসাইন আল বাইহাকীর বর্ণনায়, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছুরিকাহত হওয়ার পর আমি তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। তাকে বললাম, 'হে আমীরুল মুমিনীন, জান্নাতের সুখবর গ্রহণ করুন। যখন অধিকাংশ মানুষ কাফের ছিল, আপনি তখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সবাই ছেড়ে গেছে, তখন আপনি তার পাশে থেকে লড়াই করেছেন। ইন্তেকালের আগে তিনি আপনার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। আপনার খেলাফত নিয়ে কারও দ্বিমত ছিল না। আর আপনি শহীদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে যাচ্ছেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আরেকবার বলো।' আমি কথাগুলো আবারও বললাম। অতঃপর তিনি বললেন, 'আল্লাহর কসম, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। আমার কাছে যদি পৃথিবীর সব সোনা-রূপাও থাকত, তবে হাশরের ময়দানে আল্লাহর আযাব দেখার আগেই মুক্তিপণ হিসেবে সব বিলিয়ে দিতাম।'
| দুই। আবু নাঈম আল-ইস্পাহানী লিখেছেন, 'দীর্ঘকাল এক সাথে থাকার ফলে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মহত্ত্ব, আন্তরিকতা এবং শক্তি সম্পর্কে পূর্ণ অবগত ছিলেন। তার শাসনামলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পরামর্শ এবং কাজ দিয়ে যেমন উদাত্তভাবে তাকে সহযোগিতা করেছেন এবং তার ও আল্লাহ তা'আলার প্রতি অনুগত থেকেছেন, এরপরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ছাড়া তিনি আর কাউকে নিয়োগ দেবার কথা ভাবতেই পারেননি। তিনি জানতেন, অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তার মতোই কদর করেন। তাকে ভালোভাবে জানার কারণে তার নিয়োগ নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ ছিল না। তারপরও তিনি জনগণের মতামত জানতে চাইলেন, এবং তারাও সমর্থন দিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর যোগ্যতা নিয়ে কারও মনে তিল পরিমাণ দ্বিধা থাকলেও তারা তা অবশ্যই প্রকাশ করত। তা না হলে তারা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যেভাবে অনুসরণ করত পরবর্তীকালে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সেভাবে অনুসরণ করতে পারত না। সুতরাং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতোই তার খেলাফতও সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার নিয়োগের বেলায় উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেছেন। শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন। আর জনগণও সন্তুষ্টচিত্তে তা মেনে নিয়েছে।'
তিন। আবু উসমান আস-সাবুনীর উদ্ধৃত করেছেন: আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু মনোনয়ন এবং জনমত দুটোর ভিত্তিতে খলীফার পদে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়োগ দিলেন। সুতরাং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে সাহাবায়ে কেরামের সম্মতিক্রমে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খলীফার পদ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহ সুবহানাহু তা'আলা তার মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী করেছেন।'
চার। ইমাম নববী রহ. উদ্ধৃত করেছেন: 'সাহাবা রাযিয়াল্লাহু আনহুম সর্বসম্মতিক্রমে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে খলীফা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তারা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে উত্তরসূরি নিযুক্ত করার সিদ্ধান্তকেও একইভাবে স্বাগত জানিয়েছিলেন।'
পাঁচ। ইবনে তাইমিয়াহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি উদ্ধৃত করেছেন : আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে উত্তরসূরি হিসেবে নিয়োগ দিলেন। অতঃপর মুসলিমরা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে বাইআত গ্রহণ করে তাকে অনুসরণ করেছে। বাইয়াতের অধিকারবলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম উম্মাহর খলীফা হয়েছিলেন।'
| ছয়। আত-তাহহাউয়িয়ার সংকলক উদ্ধৃত করেছেন, ‘আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইন্তেকালের পরে খেলাফত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল। এর প্রথম কারণ, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজে তাকে নিয়োগ দিয়ে গেছেন। দ্বিতীয় কারণ, মুসলিম উম্মাহ সর্বসম্মতিক্রমে এই সিদ্ধান্তকে গ্রহণ করেছে এবং অনুমোদন দিয়েছে।'
উপর্যুক্ত বক্তব্যগুলো থেকে প্রমাণ হয় যে, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সিদ্ধান্ত নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের যে সম্মতি ছিল এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। আর এই ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়া জামাআতও একমত। পরবর্তীকালে আহলে সুন্নাত ওয়া জামাআতের বিশিষ্ট আলেমগণও এ বিষয়ে একমত যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন এবং তাকে খলীফার পদে সকল সাহাবী একযোগে গ্রহণ করেছিলেন।
ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, শুধুমাত্র রাফিযী শিয়াগোষ্ঠী আর তাদের কিছু সমর্থক এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল। তারা গুরুত্বপূর্ণ কেউ ছিল না। বিপথগামী লোকগুলো কোনো কোনো সাহাবীর প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করত।
আরেকটি ঘটনার প্রেক্ষিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ব্যাপারে যে সাহাবায়ে কেরামের পূর্ণ সম্মতি ছিল এর বিরুদ্ধে কেউ কেউ কথা তুলতে পারে। কয়েকজন সাহাবীর বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, আব্দুর রহমান আল-আউফ এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুম আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাড়িতে গিয়েছিলেন। তখন একজন বলেছিলেন, 'আপনার রব যখন জানতে চাইবেন, উমরের রুক্ষ মেজাজের কথা জেনেও তাকে আমাদের জন্য কেন নিযুক্ত করেছেন, তখন এর জবাব কী দেবেন?' আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমাকে বসতে সাহায্য করো।' তারপর জবাব দিলেন, 'আল্লাহর কসম, তুমি কী আমাকে ভয় দেখাচ্ছ? কেউ যদি তোমাদের (মুসলিম উম্মাহর) বিষয়ে অসৎ এবং নির্মম সিদ্ধান্ত নেয় তবে সে অবশ্যই হতভাগা। (তোমার প্রশ্নের) আমি আল্লাহকে বলব, ইয়া আল্লাহ, আমি আপনার শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে তাদের জন্য নিযুক্ত করলাম। যাও আমার এই কথাগুলো যারা বাইরে আছে সবার কাছে পৌঁছে দাও।'
এই বর্ণনা যদি আমরা সহীহ বলে ধরে নিই তারপরেও লক্ষ্যণীয় যে, প্রশ্নকারী উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দৃঢ় ঈমান, উত্তম আখলাক আর সাহাবীদের মধ্যে উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তিনি কিন্তু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে অযোগ্য বলেননি। তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আন্তরিকতা, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বা বিশ্বস্ততা নিয়েও কোনো প্রশ্ন তোলেননি; বরং তার কঠোর মেজাজ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।

টিকাঃ
৩৮২. সুনান আল-বায়হাকী, ১০/১১৪; মুস্তাদরাক আল-হাকিম, ৩/৯৫।
৩৮৩. কিতাব আল-ইমামা ওয়া আর-রাদ্দ আলা আর-রাফিদা, পৃ.২৭৪।
৩৮৪. আকীদাতুস সালাফ ওয়া আসহাবুল হাদীস, মাজমুআতুর-রাসাঈল আল-মিনবারিয়া, ১/১২৯।
৩৮৫. শরহুন নববী আলা সহীহ মুসলিম, ১২/২০৬।
৩৮৬. মিনহাজ আস-সুন্নাহ, ১/১৪৩।
৩৮৭. শরহ আত-তাহাবী, পৃ. ৫৩৯।
৩৮৮. আত-তাবাকাত, ৩/২৭৫।
৩৮৯. কিতাব আল-ইমামা ওয়ার-রদ্দ আ'লাল-রাফিদা, পৃ. ২৭৬।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 উমর রা.-এর স্বাভাবিক ভাষণ

📄 উমর রা.-এর স্বাভাবিক ভাষণ


মুসলিম রাষ্ট্রের খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর স্বাগতিক ভাষণ নিয়ে একাধিক বর্ণনা আছে। একদল বর্ণনাকারী বলেছেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মিম্বরে উঠে বললেন, 'ইয়া আল্লাহ, আমি তো কঠোর, আমাকে নম্র করুন; আমি দুর্বল, আমাকে শক্তি দিন; আমি কৃপণ, আমাকে উদার করুন।'
কোনো কোনো বর্ণনাকারীর মতে, তিনি বলেছিলেন, 'আমার মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের পরীক্ষা করছেন। আর আমার দুজন সাথী আল্লাহ তা'আলার কাছে চলে গেছেন। আল্লাহর কসম, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি নিজে তোমাদের দায়িত্ব সরাসরি পালন করতে পারব ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য কারও হাতে তোমাদের ছেড়ে দেব না। আর যেসব কাজ সরাসরি করতে পারব না সেসবের দায়িত্ব আমি যোগ্য এবং নির্ভরযোগ্য লোকের হাতে দেব। আল্লাহর কসম, তারা (গভর্নরেরা) যদি ঠিকমত দায়িত্ব পালন করে, তবে আমি তাদের পুরস্কৃত করব। আর অন্যায় করলে কঠিন শাস্তি পাবে।' ভাষণের সময় উপস্থিত ছিল এমন একজন ব্যক্তি বলেছে, 'আল্লাহর কসম, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার ওয়াদা রক্ষা করে গেছেন।'
আরেকটি বর্ণনায় আছে: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হবার পরে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু মিম্বরের যে সিঁড়িতে বসতেন সেখানে বসতে যাচ্ছিলেন। তখন বলে উঠলেন, 'আমি চাই না, আল্লাহ তা'আলা আমাকে দেখুন যে, আমি নিজেকে আবু বকরের সমান মনে করছি।' তাই তিনি একধাপ নিচে নেমে বসলেন। অতঃপর আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা আর গুণ বর্ণনা করে বললেন, 'কুরআন তিলাওয়াত করতে থাকবে, ফলে এর মাধ্যমে তোমাদের চিনে নেওয়া হবে (কুরআন আঁকড়ে থাকলে); কুরআনের শিক্ষা কাজে লাগাতে পারলে তোমরা কুরআনওয়ালা হয়ে যাবে। তোমার আমলের হিসাব নেবার আগে, নিজেই নিজের আমলের হিসাব রাখবে। সেই মহাদিবসের জন্য নিজেদের প্রস্তুত কর-কারণ সেদিন আল্লাহ তা'আলার সামনে কোনো কিছু গোপন থাকবে না। আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে তোমাদের মানার অধিকার নেই। আমার দায়িত্বে থাকা আল্লাহর সম্পদ (রাষ্ট্রীয় কোষাগারের) সম্পর্কে বলব, এগুলো এমনভাবে গচ্ছিত থাকবে যেভাবে একজন অভিভাবকের কাছে ইয়াতিমের মাল গচ্ছিত থাকে। আমার সচ্ছল থাকা অবস্থায় এই সম্পদ ছুঁয়েও দেখব না। কখনো এর প্রয়োজন হলে আমি আইনসঙ্গতভাবে তা গ্রহণ করব।'
উপর্যুক্ত বর্ণনার কোনোটিই পরস্পরবিরোধী নয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিশাল জনসমাবেশের সামনে ভাষণ দিয়েছিলেন। ফলে ভাষণের একেক অংশ, একেক শ্রোতার মনে গেঁথে ছিল। তাই স্থানভেদে ভিন্ন ভিন্ন উদ্ধৃতি পাওয়া যায়।
খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ভাষণে আমরা রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক নীতির মধ্যে দ্বীনের যে সংমিশ্রণ দেখি তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ, তৎকালীন ইমামগণ আল্লাহভীতি এবং আল্লাহর আইনের বাইরে কোনো কিছু চিন্তাও করতে পারতেন না। তাছাড়া তিনি যেভাবে তার পূর্বসূরি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে সম্মান প্রদর্শন করেছেন তাতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। তিনি নিজেকে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জায়গায় বসার যোগ্য মনে করেননি, তিনি চাননি জনগণ তাকে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সমকক্ষ মনে করুক। তাই এক ধাপ নিচে বসে পড়েন।
আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা হওয়ার দুদিন পর থেকেই লোকজন তার রুক্ষ মেজাজ এবং শাস্তির আশংকা নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেছিল। তাদের সংশয় দেখে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু উপলব্ধি করলেন যে, তাদের অসার ভয় দূর করা দরকার। তাই মিম্বরে উঠে তিনি এক হৃদয়গ্রাহী ভাষণ দিলেন। তাদের মনে করিয়ে দিলেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সবার সাথে কেমন আচরণ করতেন। তারা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রতি যে সন্তুষ্ট ছিলেন তা-ও মনে করিয়ে দিলেন। অতঃপর বললেন, 'হে লোকসকল, আমি তোমাদের দায়িত্ব নিয়েছি। আর জেনে রাখো, আমার কঠোরতা কমে গেছে। তবে অপরাধী এবং যুলুমকারীদের কথা ভিন্ন। কেউ কাওকে যুলুম করবে কিংবা অন্যের হক নষ্ট করবে, আমি তা হতে দেব না। কেউ এ কাজ করলে সত্য স্বীকার না করা পর্যন্ত তার এক গাল থাকবে মাটিতে, আরেক গাল আমার পায়ের নিচে। আর আমি এমন কঠিন আচরণ করব বলে, শান্তিপ্রিয় এবং নিরীহ লোকেদের জন্য আমার গাল মাটিতে রাখব। হে লোকসকল, আজ আমি যে ওয়াদাগুলো করব সেগুলো যেন আঁকড়ে থাকতে পারি সে জন্য তোমাদের সাহায্য প্রয়োজন। আমি ওয়াদা করছি যে, আমি কখনো অন্যায়ভাবে তোমাদের কর কিংবা আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত গনীমত গ্রহণ করব না। আদায়কৃত সম্পদ থেকে অন্যায়ভাবে খরচ করা হবে না। তোমাদের ভাতা বৃদ্ধির ওয়াদা করছি। তোমাদের সীমানারক্ষা করার ওয়াদাও রইল। বিপদসংকুল জায়গায় তোমাদের ঠেলে দেবার অধিকার আমার নেই। সীমানা রক্ষার নামে পরিবার থেকে অযথা দীর্ঘদিন দূরে সরিয়ে রাখব না। আর তোমরা যতদিন সেনাঅভিযানে থাকবে, না ফেরা পর্যন্ত আমি তোমাদের সন্তানদের দায়িত্ব পালন করব। হে আল্লাহর বান্দারা, আল্লাহকে ভয় করবে। তোমরা অপকর্ম থেকে আমাকে সরিয়ে রাখবে, আর ভালো-মন্দ সব বিষয়ে আমাকে মতামত দেবে। রাষ্ট্রপরিচালনায় আমাকে আন্তরিক পরামর্শ দেবে। আমার যা বলার ছিল বলেছি। আল্লাহ তা'আলা আমাকে এবং তোমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন।'
আরেকটি বর্ণনামতে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আরবদের উদাহরণ হলো নিরীহ ও উপকারী সেই উটের মতো, যা সহজেই আরোহীর নির্দেশ মেনে চলে। ফলে আরোহী নিশ্চিন্তে পথের নির্দেশ দিতে পারে। কা'বার রবের কসম, আমি তোমাদের সরল পথে পরিচালিত করব।'
উপর্যুক্ত বর্ণনাসমূহের শিক্ষা ও মূল বক্তব্য
এই বর্ণনাগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে, খলীফা হওয়ার পরে তার স্বাগতিক ভাষণে তার শাসনপদ্ধতি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছিল। তিনি তার ওয়াদা থেকে কখনো সরেননি। এই বর্ণনাগুলো থেকে পাওয়া শিক্ষণীয় বিষয়গুলো উল্লেখ করা হলো:
এক। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে খেলাফত একটি পরীক্ষা ছিল। কারণ, তার বিশ্বাস ছিল দায়িত্ব নিয়ে হাশরের ময়দানে তাকে পাকড়াও করা হবে। খুলাফায়ে রাশেদীন নেতৃত্বকে কখনো মর্যদা, যশ, খ্যাতির উৎস মনে করতেন না; বরং তাদের কাছে নেতৃত্ব ছিল দায়িত্ব, কর্তব্য ও পরীক্ষার আরেক নাম।
দুই। খেলাফতের নামে মদীনাসহ পুরো মুসলিম রাষ্ট্র পরিচালনার এক বড় দায়িত্ব উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওপরে অর্পিত হয়েছে। দূর-দূরান্তের মুসলিম এলাকার জন্য গভর্নর পদে তিনি শ্রেষ্ঠ ও যোগ্যতম লোকদের নিয়োগ দিতেন। এখানেই শেষ নয়। গভর্নরদের কড়া নজরে রাখতেন। তাদের কাছ থেকে প্রত্যেক কাজের কৈফিয়ত নিতেন। আর দুর্নীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে তা কঠোরহাতে দমন করেছেন। সৎ এবং দায়িত্বশীল গভর্নরদের জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা ছিল। অন্যদিকে দুর্নীতি ধরা পড়লে তাদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতেন যে কেউ আর দ্বিতীয়বার সে কাজ করার সাহস পেত না। গভর্নরদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উদাহরণ পাঠক অন্য অংশে পাবেন, ইনশাআল্লাহ।
■ তিন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর রুক্ষতা এবং কাঠিন্য নম্রতায় পরিণত হতে থাকল। তবে তাকে যেহেতু ইনসাফ করতে হবে তাই তিনি এর মধ্যে ভারসাম্য আনতে চাইলেন। তাই মুসলিম উম্মাহর কাছে তিনি শুরুতেই বিষয়টি পরিষ্কার করতে চাইলেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, অবাধ্য আর যালিমদের প্রতি তিনি যথারীতি কঠিন ও রুষ্ট থাকবেন। তবে বাকি সবাই তাকে সদয় এবং নম্র হিসেবে দেখতে পাবে। মুসলিম উম্মাহর প্রতি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ন্যায়পরায়ণতা ও আইনের শাসন কেমন ছিল, ইনশাআল্লাহ তার বিচারব্যবস্থার অধ্যায়ে বর্ণনা করা হবে।
চার। খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সীমানারক্ষা এবং বিপদ মোকাবিলা করে মুসলিম উম্মাহ এবং ইসলামের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। যোদ্ধাদের সাথে অন্যায় আচরণ করলে তার এই লক্ষ্য পূরণ হবে না, তিনি জানতেন। সুতরাং সীমান্ত রক্ষার নামে তাদের দিনের পর দিন দূরে রাখার কোনো মানে ছিল না। প্রসঙ্গত ওয়াদা করেছিলেন, সেনারা ফিরে না আসা পর্যন্ত পিতার মতো তাদের পরিবারের দায়িত্ব পালন করবেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যেভাবে মুসলিম সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন তাতে তার ইসলামী রাষ্ট্র সে যুগের অদ্বিতীয় পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল।
পাঁচ। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কর ও গনীমত যথাযথভাবে বিলি-বণ্টন করবেন বলে ওয়াদা করেছিলেন। আর তাদের মালামাল সঠিকভাবে খরচ করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন। যুদ্ধে থাকাকালীন তিনি প্রয়োজনমতো বেতন-ভাতা প্রদান ও বৃদ্ধি করতে থাকবেন। জনগণকে পরিশ্রম করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। নিজের হাতে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন। বায়তুল মালের পুরো দায়িত্ব নিজে তদারক করতেন বলে তা আয় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছিল।
ছয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সার্বিক লক্ষ্য অর্জনে মুসলিমদের নিজ দায়িত্বে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। জনগণ যেন তার প্রতি অনুগত থাকে, তার কথা শোনে এবং তাকে মানে—তিনি সেই আশাবাদও ব্যক্ত করেছিলেন। নিজ দায়িত্বে ভালো কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজে বাধা প্রদান করতে সবাইকে উৎসাহিত করেন। ফলে ইসলামী সমাজে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
সাত। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আসলে বোঝাতে চেয়েছেন, আল্লাহকে ভয় না করলে মুসলিম উম্মাহর কাজে স্বচ্ছতা আসবে না এবং হাশরের ময়দানে পাকড়াও হওয়ার চিন্তা না থাকলে তাদের পক্ষে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করা সম্ভব হবে না।
আট। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একটি উদাহরণ দিয়েছিলেন, ‘আরবদের উদাহরণ হলো নিরীহ ও উপকারী সেই উটের মতো, যা সহজেই আরোহীর নির্দেশ মেনে চলে। ফলে আরোহী নিশ্চিন্তে পথের নির্দেশ দিতে পারে।’ শেখ আব্দুল ওয়াহ্হাব আন-নাজ্জার বলেছেন, ‘(উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর উল্লিখিত) আনিফ উট খুব কোমল আর অনুগত হয়। চালাতে গেলে ধমক বা আঘাতের দরকার পড়ে না। উটগুলো আরোহীর নির্দেশমতো স্বতস্ফূর্তভাবে এগিয়ে যায়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়ের মুসলিমদের জন্য এর চেয়ে ভালো উদাহরণ হতে পারে না। খলীফার প্রত্যেকটি নির্দেশ তারা নিঃসঙ্কোচে মানত; কোনো কাজ থেকে বিরত থাকতে বললে তা থেকে বিরত থাকত। তাদের এমন আনুগত্যের ফলে খলীফার কাঁধ থেকে দায়িত্বের অনেক কঠিন বোঝা দূর হয়েছিল। তাকে বেপরোয়া ধ্বংসাত্মক আচরণ কিংবা দায়িত্বের প্রতি অবহেলা ঠেকানোর মতো চরম খবরদারী করতে হয়নি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, ‘আমি তাদের দৃঢ়তার সাথে (সাধারণভাবে আরবদের আর বিশেষভাবে মুসলিমদের) সরল পথে পরিচালিত করব’, এখানে পথ বলতে সত্য ও সরল পথের কথা বুঝিয়েছেন, যে পথে কোনো বক্রতা নেই। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ভাষণে প্রদত্ত প্রত্যেকটি ওয়াদা তিনি পালন করেছেন।
নয়। এবার আসা যাক নম্রতা এবং কাঠিন্য প্রসঙ্গে। একজন কঠিন ব্যক্তি যতই আন্তরিক হন না কেন, যতই কল্যাণ কামনা করুন না কেন মানুষ তাকে এড়িয়ে চলবেই। এটাই আল্লাহ তা'আলার বিধান। আল্লাহ তা'আলা এই নিয়মের কথা এভাবে বলেছেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَ لَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَ شَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল-হৃদয় হয়েছেন পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগ ও কঠিন-হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করুন এবং কাজে-কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা করুন, আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।
এই অমোঘ আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহ তা'আলার কাছে দুআ করেছেন, 'হে আল্লাহ, আমি তো কঠিন, আমাকে নম্র করুন।' আল্লাহ তা'আলা তার দুআ কবুল করেছেন। যার ফলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর হৃদয় দয়া, নম্রতা আর সহনশীলতায় পূর্ণ হয়েছিল। এ যুগের মানুষও তার কঠিন আখলাকের কথা জানে। নবীযুগে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো এত কঠোর কোনো সাহাবী ছিলেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবদ্দশাতেই এ কথা সবার জানা ছিল। কিন্তু খলীফা হওয়ার সাথে সাথে তার কাঠিন্য দয়া, সহানুভূতি এবং নম্রতায় পরিণত হয়েছিল।
■ দশ। খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে সাধারণত মদীনাবাসী শুধু বাইআত গ্রহণ করত। তবে মদীনার কাছাকাছি বসবাসকারী কিছু বেদুইন, কয়েকটি ইসলামী রাষ্ট্রের বাকি ভূখণ্ডের জনগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শহরে যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হতো, তা-ই অনুসরণ করত। এতে কিন্তু বাইআত-প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনো প্রভাব পড়ত না। সে যুগে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত সকল মুসলমানের একযোগে বাইআত গ্রহণ করা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। তাই রাষ্ট্রীয় যে কোনো কাজের জন্য অন্যান্য অঞ্চলের বাসিন্দারা মদীনাবাসীদের মতের প্রতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমর্থন জানাত। খলীফা হিসেবে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ও উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিয়োগের বেলায় তা-ই হয়েছিল। যাহোক, ইসলামের প্রথম দিকে খলীফা নির্বাচনের এই পদ্ধতি থেকে এটা স্পষ্ট যে, রাষ্ট্র এবং এর বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম তখন উন্নয়নের পথে চলছিল।
এগারো। নারীদের বাইআত প্রসঙ্গে : আমি আমার ব্যক্তিগত গবেষণার কাজ করতে গিয়ে খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে নারীরা বাইআত-গ্রহণ করেছে এমন তথ্য পাইনি। আমর জানা মতে, ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার সময় নারীদের বাইআত গ্রহণ কিংবা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগহণের অধিকার কিংবা দায়িত্বের কথা ইতিহাসের পুরনো কোনো কিতাবে পাইনি। বাইয়াত গ্রহণ কেবল পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এর জন্য নারীদের যেমন উৎসাহিত করা হয়নি, আবার নারীরাও কখনো এর দাবী তোলেনি। তৎকালীন সমাজে ছির এগুলো খুব স্বাভাবিক ব্যাপার।
তবে সবকিছুর ওপরে আমাদের মনে রাখতে হবে, ঐতিহাসিক ঘটনা ও প্রথাগত রীতি-রেওয়াজ এক জিনিস আর ইসলামী আইনের শাসন আরেক জিনিস। কুরআন ও সুন্নাহর মতো অকাট্য দলীলে কিন্তু মুসলিম খলীফার কাছে নারীদের বাইআত গ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়নি।
বারো। আরব যুদ্ধবন্দীনীদের ফিরিয়ে দেওয়া: আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার খেলাফতের শুরুতে মুরদাতদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শাসনভার নেবার শুরুর দিকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তৎকালীন সব যুদ্ধবন্দীনীকে তাদের পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তিনি বলেছেন, 'আমি চাই না, যুদ্ধবন্দীনীদের দাসী বানানোর প্রথা আরবদের মাঝে প্রতিষ্ঠিত হোক।'
তার এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপের ফলে আরবরা বুঝতে পেরেছিল যে, আল্লাহ তা'আলার কাছে সবাই সমান। কোনো গোত্র নিজেদের ঢালাওভাবে শ্রেষ্ঠ বলে দাবী করতে পারবে না। বলতে পারত না। আল্লাহ তা'আলার প্রতি আনুগত্যের চেষ্টা, উত্তম আমল এবং মুসলিমদের সাথে উত্তম আচরণের মাধ্যমে সম্মান অর্জন করে নিতে হয়েছে। তিনি মুরতাদদের প্রায়শ্চিত্ত করার সুবর্ণ সুযোগ দিয়েছিলেন। অনুতপ্ত ধর্মত্যাগীরা সেবার বিদেশী শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদের অনুমতি পেয়েছিল। বহু মুরতাদ মুসলিমদের পক্ষে আন্তরিকতা এবং বীরত্বের সাথে লড়েছে। ফলে রাষ্ট্রের প্রতি তাদের অসামান্য আনুগত্য প্রকাশ পেয়েছিল।
তেরো। খেলাফত-পদ্ধতি মুসলিমদের অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল। খুলাফায়ে রাশেদীন ছিলেন শক্তি এবং একতার প্রতীক। সাহাবায়ে কেরাম যে শ্রেষ্ঠ যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন এবং খাঁটি মনে কাজ করতেন, তা যে কোনো গবেষকই বুঝতে পারবেন। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তারা আবু বকর রাযিয়ালাহু আনহুকে খলীফা নিয়োগ করেন। তা ধ্বংস করতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সিকি শতাব্দী লেগে গেছে। ব্রিটিশেরা অটোমান সাম্রাজ্যকে 'অসুস্থ বুড়ো' বলে ডাকত। আদতেও তারা 'অসুস্থ' এবং 'দুর্বল' ছিল। তাদের শাসনব্যবস্থা সাহাবীদের খেলাফতের ধারে-কাছেও ছিল না। তারপরেও তা শেষ করতে ব্রিটিশদের পঁচিশ বছর লেগে যায়। ভেবে দেখুন, শত শত বছর আগে খেলাফত প্রতিষ্ঠাকারীরা কেমন শক্তিশালী ছিলেন।
চৌদ্দ। রাজা এবং খলীফার মধ্যে পার্থক্য: উমর রাযিয়াল্লাহু একবার বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি খলীফা, না রাজা-জানিনা। যদি রাজা হই তবে তো গুরুতর ব্যাপার।' এক ব্যক্তি তাকে বলল, 'দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে। একজন খলীফা তার হক বুঝে বৈধভাবে উপার্জন করেন আর হক বুঝে বৈধভাবে তা থেকে ব্যয় করেন। আলহামদুলিল্লাহ, আপনি তেমন মানুষ। অন্যদিকে রাজা একজনেরটা আরেকজনকে দিয়ে দেয়, যুলুম করে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ কথা শুনে চুপ করে থাকলেন।
আরেকটি রেওয়াতে বর্ণিত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সালমান আল-ফারিসি রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে জানতে চাইলেন, 'আমি রাজা, না খলীফা?' সালমান রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আপনি রাষ্ট্র থেকে এক দিরহাম বা কম-বেশি কর যা-ই আদায় করেন না কেন, তা ঠিক খাতে খরচ না করলে আপনি খলীফা নন, রাজা।' এ কথা শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কাঁদতে লাগলেন।

টিকাঃ
৩৯০. মানাকিব আমীর আল-মু'মিনীন, ইবনুল জাউযি, পৃ. ১৭০-১৭১।
৩৯১. আত-তাবাকাত, ৩/২৭৫।
৩৯২. সূরা আল-হাক্কাহ, ৬৯: ১৮।
৩৯৩. কানযুল উম্মাল, নং ৪৪২১৪; আদ-দাউলাহ আল ইসলামিয়্যাহ, ড. হামদি শাহীন, পৃ. ১২০।
৩৯৪. কানযুল উম্মাল, নং ৪৪২১৪; আদ-দাউলাহ আল ইসলামিয়্যাহ, ড. হামদী শাহীন, পৃ. ১২০।
৩৯৫. আল-ইদারাহ আল-আ'সকারিয়‍্যাহ ফি আ'হদ আল-ফারুক, পৃ. ১০৬।
৩৯৬. আস-সিয়াসাহ আশ-শারীয়াহ, ড. ইসমাঈল বাদাউয়ী, পৃ. ১৬০; তাফসীর আত-তাবারি।
৩৯৭. আদ-দাউলাহ আল ইসলামিয়‍্যাহ ফি আ'সর আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, পৃ. ১২১।
৩৯৮. প্রাগুক্ত; মাহদুস সাওয়াব, ১/৩৮৫, পৃ. ১১৬, টীকা নং ৪ দ্রষ্টব্য।
৩৯৯. প্রগুক্ত।
৪০০. আদ-দাউলাহ আল ইসলামিয়্যাহ, ড. হামদি শাহীন, পৃ. ১২২।
৪০১. আদ-দাউলাহ আল ইসলামিয়‍্যাহ ফি আ'সর আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, পৃ. ১২২; আ'সর আল- খুলাফা আর-রাশিদীন, পৃ. ১২৩।
৪০২. আ'সর আল-খুলাফা আর-রাশিদূন, পৃ. ১২৩।
৪০৩. আস-সুনান আল-ইলাহিয়া মিন আল-উমাম ওয়া আর-কামাআত ওয়া আল-আফরাদ, যায়েদান, পৃ. ২৮২।
৪০৪. সূরা আল-ইমরান, ৩: ১৫৯।
৪০৫. আল-ইদারাহ আল-ইসলামিয়্যাহ ফি আ'হদ উমার ইবনে খাত্তাব রা., পৃ. ১০৭।
৪০৬. নিদহাম আল-হুকম ফিশ-শারীয়াহ ওয়াত-তারীখ আল-ইসলামী, পৃ. ২৬০।
৪০৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ১/২৭৭।
৪০৮. আল-খিলাফাহ ওয়াল-খুলাফা আর-রাশিদীন, পৃ. ১৬০।
৪০৯. জাউলাহ তারীখিয়্যাহ ফি আ'সরিল-খুলাফা আর-রাশিদীন, ড. মুহাম্মাদ আস-সায়্যিদ আল-ওয়াকীল, পৃ. ৮৯; আশ-শাইখান আবু বকর আস-সিদ্দীক এন্ড উমর ইবনে খাত্তাব, আল-বালাযিরীর বর্ণনা, পৃ. ২৫৭।
৪১০. আল-হাদারাহ আল-ইসলামিয়্যাহ, ড. মুহাম্মাদ আদিল, পৃ. ৩০।
৪১১. আশ-শাইখান: আবু বকর আস-সিদ্দীক এন্ড উমর ইবনে আল-খাত্তাব, আল-বালাযিরীর বর্ণনা, পৃ. ২৫৭।
৪১২. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৫৬।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 শূরা

📄 শূরা


ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো-এর শাসক এবং নেতাগণ সাধারণ মুসলিমদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। জনগণের কাছে ইতিহাচক মনে হয় এমন সিদ্ধান্তই তারা গ্রহণ করেন। এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে শূরানীতির প্রয়োগ অব্যাহত থাকে। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَ اسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ
আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন পক্ষান্তরে আপিন যদি রাগ ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছে থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করুন এবং কাজে-কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোনো কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তা'আলার উপর ভরসা করুন, আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালোবাসেন।
۞ وَالَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِرَبِّهِمْ وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ وَمِمَّا رَزَقْنَهُمْ يُنْفِقُونَ ۞
'যারা তাদের পালনকর্তার আদেশ মান্য করে, নামায কায়েম করে; পারস্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে।
এখানে 'নামায কায়েম' করার পাশাপাশি, মুসলিমদের সাথে 'পারস্পরিক আলোচনা' বা 'শূরা' প্রতিষ্ঠার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। সুতরাং শরীয়তে নামায এবং পারস্পরিক আলোচনা দুটোই ফরয।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার রাষ্ট্রে শূরা-পদ্ধতির অনুসরণ করতেন। তিনি একা কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সাধারণ মুসলিমদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতেন। সমস্যা দেখা দিলে তিনি মুসলিমদের সাথে বসে আলোচনা করতেন। তাদের মতামত ও পরামর্শ নিতেন। তারপরে তিনি সিদ্ধান্ত নিতেন।
বেশ কিছু বর্ণনায় আছে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের-মনে-চলা নেতৃত্বের তুলনায় পারস্পরিক আলোচনায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য ছিলেন। উল্লেখ্য, তিনি বলেছিলেন, 'পারস্পরিক আলোচনা ছাড়া কোনো ভালো সিদ্ধান্ত আসে না।' আরেকটি বর্ণনায়, তিনি বলেছেন, 'একক পরামর্শ হলো একটি বিচ্ছিন্ন সুতার মতো। দুজনের নেওয়া পরামর্শ যেন গিঁট দেওয়া দুটো সুতা। আর তিনজনের পরামর্শ হলো মজবুত গিঁটওয়ালা সুতার মতো, যা সহজে খোলা যায় না।'
তিনি বলেছেন, 'আল্লাহ তা'আলাকে ভয় পায়-এমন লোকের পরামর্শ নেবে তোমরা।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'মানুষ তিন ধরনের হয়। এক ধরনের মানুষ নিজেই তার সমস্যার সমাধান করে। আরেক ধরনের মানুষ দ্বিধায় পড়লে অন্যের সাথে আলোচনা করে এবং বিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছ থেকে ভালো পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়। আর কিছু মানুষ দ্বিধায় পড়ে, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়েও না বিজ্ঞজনের মতামত নেয়, আর না নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।'
তিনি আরও বলতেন, 'মুসলিমদের উচিত—জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে বসে শূরার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করা। আর সাধারণ মানুষ তাদের অনুসরণ করবে। তারা যতদিন এক হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে থাকবে, ততদিনই লোকজন তাদের অনুসরণ করবে। তারা যে সিদ্ধান্তই নিক না কেন, তাতে সাধারণ মুসলিমদের স্বার্থ সবার আগে রক্ষা করতে হবে; যুদ্ধের জন্য যে সিদ্ধান্ত নেবে, তাতেও জনগণ তাদের কথা মেনে চলবে।'
বিশাল ভূখণ্ডের আমীর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আলেমদের পরামর্শ নিতে সেনাপতিদেরও উৎসাহিত করতেন। তিনি আবু উবায়েদ আস-সাকাফী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পারসিকদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য ইরাকে পাঠিয়েছিলেন। তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে উপদেশ দিলেন, 'সাহাবায়ে কেরামের কথা শুনবে এবং তাদের মানবে। তাদের মন্তব্য করার সুযোগ দিয়ো, বিশেষ করে যারা বদরে অংশগ্রহণ করেছিলেন।'
ইরাকে নিয়োজিত সেনাপতিদের কাছে লেখা চিঠিতে আমর ইবনে মাদিকারব এবং তালহা আল-আসাদী রাযিয়াল্লাহু আনহুমের পরামর্শ নেবার কথা উল্লেখ করেছিলেন। তাতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লিখেছিলেন, 'যুদ্ধের সময় আমর ইবনে মাদিকারব এবং তালহা আল-আসাদীর পরামর্শ নিও। তবে তাতের হাতে কোনো দায়িত্ব ছেড়ে দিও না। কারণ, প্রত্যেক দক্ষ লোক তার নিজের কাজে অভিজ্ঞ।'
তিনি সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে বলেছেন, 'আরবদের মধ্যে যাদের বিশ্বস্ত মনে কর তাদের কয়েকজনকে কাছে কাছে রেখো। কারণ, মিথ্যাবাদীরা মাঝে মাঝে সত্য বললেও, তাদের কাছে ভালো কিছু আশা করা বৃথা। মুনাফিকরা তোমার জন্য নয়, বরং তোমার বিরুদ্ধে কাজ করবে।'
উতবা ইবনে গাযওয়ানকে বসরা অভিমুখে পাঠানোর সময় উরওয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আমি আল-আলা আল-হাযরামীকে বলেছি, সে যেন তোমার কাছে আরফাজা ইবনে হারসামাকে পাঠায়। আরফাজা সমরকৌশল এবং পরিকল্পনা, দুটোতেই দক্ষ। তার পরামর্শ নিয়ো, তাকে কাছাকাছি রেখো।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শূরা-পদ্ধতি খুব সুন্দর ছিল। তিনি প্রথমে সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠী থেকে অন্তত একজন প্রতিনিধিকে ডাকতেন। সমস্যার সমাধানে প্রত্যেকের মতামত নেওয়া হতো। অতঃপর বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ প্রধান সাহাবীদের একত্র করতেন। আগের মতামতের উপর ভিত্তি করে তাদের সাথে আলোচনা হতো। সমাধানপদ্ধতি নিয়ে সবাই একমত হলে তবেই তিনি তা গ্রহণ করতেন। এ যেন এই যুগের সাংবিধানিক পদ্ধতি। এখন যেমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হলে আগে জন প্রিতিনিধিরা মিটিংয়ে বসেন। অতঃপর সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতামত সিনেটর, হাউজ অব লর্ডস প্রমুখের সামনে উপস্থাপন করা হয়। তারা কোনো বিষয়ে একমত হওয়ার পরে রাজা বা সম্রাট তা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেন। আজকের পদ্ধতি আর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য হলো তিনি ইসলামী শরীয়তের ওপরে ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতেন; কারণ, তখন অনেক আইনের প্রবর্তন ঘটেনি।
প্রায়ই দেখা যেত যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কোনো একটি সমস্যা নিয়ে আগে নিজে পর্যালোচনা করতেন, ভাবতেন এবং নিজের মতামত জানাতেন। তার মতামত নিয়ে সাধারণ লোকজন জোরাল প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সুযোগ পেত। প্রমাণ এবং তর্কে দৃঢ়তা থাকলে তিনি তার কথা মেনে নিতেন। সাথে নিজের ভুলও স্বীকার করতেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে শূরার প্রচলন ছিল চোখে পড়ার মতো। পূর্ববর্তীদের তুলনায় তাকে অনেক নতুন সমস্যায় পড়তে হয়েছিল, ফলে তিনি এই পদ্ধতির ওপরে নির্ভরশীল ছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে খুব দ্রুত মুসলিম ভূখণ্ডের প্রসার ঘটতে থাকে। ফলে নানা জাতি, ঐতিহ্য এবং প্রথার লোকজন অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। তাদের ভাষা যেমন আলাদা ছিল, তেমন রীতি-রেওয়াজেও ছিল ভিন্নতা। নতুন নীতির আওতায় কেমন ভাতা দেওয়া হবে, গণিতমত সংগ্রহ এবং বণ্টন করা হবে কীভাবে—এমন সব নতুন নতুন সমস্যা সমাধানের জন্য বার বার ইজতেহাদের প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন তিনি বুযুর্গ সাহাবায়ে কেরাম এবং বদরী সাহাবীদের সাথে বসে শূরার মাধ্যমে সমাধান করতেন। গুণাবলী, জ্ঞান এবং মর্যাদার কারণে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বদরী সাহাবীদের অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন।
তিনি এক সময় তরুণ সাহাবীদেরও তার আলোচনায় থাকার সুযোগ দিতে শুরু করেন। তিনি জানতেন যে, বুযুর্গেরা একে একে এই দুনিয়া ছেড়ে পরকালের স্থায়ী আবাসে পাড়ি জমাবেন। ফলে নবীনদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করতে হবে। নবীনদের মধ্যে যারা ধর্মভীরু এবং জ্ঞানী সাহাবীদের পরামর্শ নিতে শুরু করেছিলেন। তাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অন্যতম। যারা কুরআনভিত্তিক জ্ঞানের ওপরে ভিত্তি করে তিনি তরুণদের গুরুত্ব নির্ধারণ করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, কুরআন সম্পর্কে যাদের ভালো জ্ঞান ছিল কেবল তারাই উমরের কাউন্সিল-সদস্য এবং উপদেষ্টা হতে পারত। সেখানে বয়স কোনো ব্যাপার ছিল না।
ইমাম আয-যুহরী রহমাতুল্লাহি আলাইহি একবার কয়েকজন ছেলেকে ডেকে বললেন, 'বয়স কম বলে নিজেদের তুচ্ছ মনে করো না। কারণ, উমর ইবনুল খাত্তাব কঠিন সমস্যায় পড়লে তরুণদের পরামর্শ নেন। তারা চটপটে ও প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন হয় বলে তাদের ওপরে ভরসা করেন।'
মুহাম্মাদ ইবনে সিরীন রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ভালো পরামর্শের খোঁজ করতেন। এমনকি তিনি নারীদের পরামর্শও গ্রহণ করতেন। তাদের পরামর্শ লাভজনক মনে করলে তিনি অবশ্যই তা গ্রহণ করতেন। নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে বর্ণিত, তিনি উম্মুল মুমিনীন হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহার পরামর্শ নিয়েছিলেন।'
উলামায়ে কেরাম এবং সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে কয়েকজন তার বিশেষ উপদেষ্টা ছিলেন। তাদের মধ্যে আল-আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব এবং তার পুত্র আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুম, তাকে তিনি সব সময় নিজের সাথে রাখতেন, মদীনা তো বটেই, সফরেও প্রায়ই সাথে নিতেন; উসমান ইবনে আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহু; আব্দুর রহমান ইবনে আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু; আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু; মু'আয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু; উবাই ইবনে কাব রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং যায়েদ ইবনে সাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অন্যতম। এমন আরও অনেকের পরামর্শ নিতেন। খলীফার উপদেষ্টারা খোলাখুলিভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করতেন। এ জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কখনো তাদের আখলাক কিংবা সততা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন না।
কুরআন বা হাদীসে কোনো বিষয়ে স্পষ্ট সমাধান না পেলে তিনি পরামর্শ নিতেন। কারণ, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের হাদীসটি তিনি না জানলেও অন্য কোনো কোনো সাহাবীর জানা থাকতে পারে।
কুরআনে কোনো আয়াতের যদি একাধিক অর্থ থাকত সেক্ষেত্রেও উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহাবায়ে কেরামের মতামত নিতেন। এজন্য প্রয়োজন বুঝে এক বা একাধিক সাহাবীর সাথে আলোচনা করা হতো।
সমস্যায় পড়লে সাহাবায়ে কেরামদের মধ্যে যতজনে পরামর্শ নেওয়া সম্ভব হতো তিনি নিতেন। প্লেগে আক্রান্ত সিরিয়ায় যাওয়ার সময়ও তিনি এই পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন। সিরিয়ার নিকটবর্তী সারাগে তার যাত্রাবিরতি ছিল। গভর্নরেরা তার সাথে দেখা করতে এলে তিনি প্লেগের খবর পান। আনসার-মুহাজিরগণ সফরে তার সাথেই ছিলেন। তিনি তাদের কাছে জানতে চাইলেন, এমন অবস্থায় কী করা উচিত। তারা পরস্পরবিরোধী মতামত দিচ্ছিলেন। একদল বললেন, 'আপনি আল্লাহ তা'আলার কাজে বের হয়েছেন। প্লেগের খবর আপনার কাজ যেন বাধাগ্রস্ত না করে।' আরেক দল বললেন, 'এমন কঠিন পরীক্ষায় এগিয়ে যাওয়া মানে নিশ্চিত মৃত্যু। আমাদের মতে, আপনার যাওয়া উচিত নয়।'
অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কয়েকজন কুরাইশ মুহাজিরদের পরামর্শ নিলেন। তারা সবাই ফেরার পক্ষে ছিলেন। সবার মতামত শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘোষণা করলেন, 'আমরা সকালে ফিরে যাচ্ছি।' আবু উবাইদা রাযিয়াল্লাহু আনহু অবাক হয়ে বললেন, 'আপনি কি আল্লাহর ফয়সালা থেকে পালাচ্ছেন?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর এক ফয়সালা থেকে পালিয়ে আরেক ফয়সালার দিকে যাচ্ছি। মনে করো, কোনো উপত্যকায় তোমাদের উট চরাতে গেছ। এর একদিকে সবুজ ঘাস আর আরেক দিক বিরানভূমি। এখন উট যদি সবুজ ঘাস খায় তা যেমন আল্লাহর হুকুম, আবার সেগুলো অনুর্বর জমির দিকে যায় তা-ও কি আল্লাহর হুকুম নয়?'
আব্দুর রহমান আল আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের আলোচনা শুনে এগিয়ে এলেন। বললেন, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা যখন শুনতে পাবে কোনো এলাকায় মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে তখন তোমরা সেখানে যেয়ো না। আর যখন কোনো এলাকায় মহামারী ছড়িয়ে পড়ে আর তোমরা সেখানে উপস্থিত থাক, তবে সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করো না।'
অনেক ধরনের বিষয় শূরার অন্তর্ভুক্ত ছিল। রাজনৈতিক; প্রশাসনিক সমস্যা, যেমন— প্রতিনিধি এবং গভর্নরদের নিয়োগ; সমরনীতি; শরীয়তের বিষয়, যেমন— কোনোটা হালাল, কোনোটা হারাম; বিচারিক বিষয়াদি, যেমন— রায় ঘোষণা ইত্যাদি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শূরার প্রয়োগ হতো সেগুলো নিয়ে পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে। এগুলোর পক্ষে দলিলও পাওয়া যাবে, ইনশাআল্লাহ। খুলাফায়ে রাশেদীন কুরআন আর সুন্নাহর আলোকে শূরা প্রয়োগ করতেন।
মুসলিম রাষ্ট্রের খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খেয়ালখুশিমতো রাষ্ট্র পরিচালনা করেননি। ইসলামের অকাট্যনীতির ভিত্তিতে তিনি কাজ করে গেছেন।

টিকাঃ
৪১৩. সূরা আল-ইমরান, ৩: ১৫৯।
৪১৪. সূরা আশ-শূরা, ৪২: ৩৮।
৪১৫. নিদহাম আস-সিয়াসী ফিল-ইসলাম, আবু ফারিস, পৃ. ৯।
৪১৬. আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, আন-নাজ্জার, পৃ. ২৪৬।
৪১৭. সিরাজ আল-মামলুক, আত-তারতুশী, পৃ. ১৩২।
৪১৮. আল-ইদারাহ আল-আসকারিয়‍্যাহ ফিদ-দাওলাহ আল-ইসলামিয়্যাহ, সুলাইমান আল-কামাল, ১/২৭৩।
৪১৯. প্রাগুক্ত।
৪২০. আত-তাবারি, ৩/৪৮১।
৪২১. মুরূজ আয-যাহাব, ২/৩১৫।
৪২২. মুরূজ আয-যাহাব, ২/৩১৫।
৪২৩. নিহায়াত আল-আরাব, ৬/১৬৯।
৪২৪. আল-ইদারা আল-আসকারিয়া ফিদ-দাওলা আল-ইসলামিয়া, সুলাইমান আল-কামাল, ১/২৭৪।
৪২৫. আল-ইসাবা, ২/৪৯১।
৪২৬. আল-ইদারা আল-আসকারিয়া ফিদ-দাওলা আল-ইসলামিয়া, সুলাইমান আল-কামাল, ১/২৭৫।
৪২৭. আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, আন-নাজ্জার, পৃ. ২৪৭।
৪২৮. প্রাগুক্ত।
৪২৯. আ'সর আল-খিলাফা আর-রাশিদীন, পৃ. ৯০।
৪৩০. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪৭।
৪৩১. আ'সর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ৯০।
৪৩২. প্রাগুক্ত।
৪৩৩. আস-সুনান আল-কুবরা, আল-বাইহাকী, ৯/২৯; আ'সর আল-খুলাফা আর-রাশিদূন, পৃ. ৯০ থেকে উদ্ধৃত।
৪৩৪. আল-খুলাফা আর-রাশিদীন, আন-নাজ্জার, পৃ. ২৪৭।
৪৩৫. আ'সর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ৯০।
৪৩৬. আ'সর আল-খিলাফা আর-রাশিদা, পৃ. ৯১।
৪০৭. সহীহ, মুসলিম, ৪/১৭৪০, হাদীস নং ২২১৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00