📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 কুরআন মাজীদ সংকলন

📄 কুরআন মাজীদ সংকলন


ইয়ামামার যুদ্ধে নিহত শহীদদের অধিকাংশই কুরআনের হাফেয ছিলেন। তখন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু কুরআন সংকলন নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে আলোচনা করেছিলেন। কাপড়ের টুকরা, হাড়, খেজুর পাতা এবং মানুষের অন্তর থেকে কীভাবে কুরআনের পুরোটা সংগ্রহ করে সংকলন করা যায়—এটাই ছিল তাদের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহাবী যায়েদ ইবনে সাবিত আল-আনসারীকে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দিলেন। তিনি এর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন: ইয়ামামায় অনেক লোক শহীদ হলো। এই ঘটনার পরে আবু বকর আমাকে ডেকে পাঠান। গিয়ে দেখি সেখানে উমর ইবনুল খাত্তাবও আছেন। আবু বকর বললেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেছেন, 'ইয়ামামার ভয়াবহতায় আমরা কুরআন জাননেওয়ালাদের হারিয়েছি। আমার ভয় হচ্ছে। কারণ, সামনে এমন যুদ্ধ আরও ঘটবে। এমন চলতে থাকলে কুরআন মাজীদের অংশগুলো আবার না হারিয়ে ফেলি। আমার মতে, কুরআন মাজিদ একত্রে সংকলনের জন্য আপনার আইন জারির সময় হয়েছে।' আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে কাজ করেননি, আমি তা কীভাবে করব?' উমর বললেন, 'আল্লাহর কসম, কাজটি অতি উত্তম।' উমর নানাভাবে আমাকে বোঝাতে লাগলেন। এক পর্যায়ে আল্লাহ তা'আলা এই কাজের জন্য যেভাবে উমরের অন্তর উন্মুক্ত করেছেন, ঠিক সেভাবে আমার অন্তরও উন্মুক্ত করে দিলেন। আমিও তার মতো এই কাজের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে লাগলাম।
যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'তোমার বয়স কম এবং তুমি বুদ্ধিমান। তোমাকে নিয়ে আমরা খুব আশান্বিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপরে ওহী নাযিল হলে তুমিই তো লিখে রাখতে। যাও কুরআন মাজিদ খুঁজে বের কর এবং সংগ্রহ কর।' যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উদ্ধৃত করেছেন, 'আল্লাহর কসম, আমাকে যদি কুরআন সংগ্রহের বদলে একটা পাহাড়ও সরাতে আদেশ দিতেন তবে তা-ও আমার কাছে সহজ মনে হতো।'
কুরআন মাজীদ সংগ্রহের এই ঘটনা থেকে আমার এই শিক্ষাগুলো পাই:
✓ কুরআন জানতেন এমন ব্যক্তিদের মৃত্যুর কারণে, বিশেষ করে রিদ্দার যুদ্ধের পরে, কুরআন হারানোর আশঙ্কা থেকে তা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া এখানে এও স্পষ্ট যে উলামায়ে কেরাম এবং কুরআনের হাফেযগণ ইসলাম এবং মুসলিমদের সহায়তা করতে গিয়ে তারা তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি, আচরণ এবং তরবারি সমান তালে ব্যবহার করতেন।
✓ সাধারণ মানুষের স্বার্থে কুরআন সংরক্ষণ জরুরী হয়ে পড়ে। আবু বকর তখন উমরকে জিজ্ঞেস করলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে কাজ করেননি, আমি তা কীভাবে করব?' উমর বললেন, 'আল্লাহর কসম, কাজটি অতি উত্তম।'- এই কথোপকথন থেকে এর গুরুত্ব প্রকাশ পেয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনামতে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আল্লাহর কসম, কাজটি উত্তম এবং মুসলিমদের স্বার্থে প্রয়োজন।' যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু একই প্রশ্ন করলে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুও তাকে এই একই জবাব দিয়েছিলেন। এখানে মুসলিমদের জন্য কাজটি সহীহ কি না সে প্রসঙ্গ নয় বরং কাজটি উত্তম সে কথাই প্রকাশ পেয়েছে। মুসলিমদের ভালোর জন্যই কুরআন সংগ্রহ করা দরকার হয়ে পড়ে। প্রথমত সাধারণ মুসলিমদের স্বার্থে এই উদ্যোগ দরকার হয়। জনমত গ্রহণ করা হলে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে, সর্বসম্মতিক্রমে সকলে এর পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
✓ উলামায়ে কেরামের অনেকেই মনে বিশ্বাস করেন যে, যে কোনো বিষয়ে মতামত গ্রহণের সময় সাধারণ মুসলিমদের স্বার্থরক্ষা সবার আগে গুরুত্ব পেত। উপর্যুক্ত ঘটনা তাদের সেই বিশ্বাসে আলোকপাত করেছে। সাহাবায়ে কেরাম কেমন শান্ত হয়ে, নম্রতার সাথে পারস্পরিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন, এখানে তারও একটি সুন্দর চিত্র পাওয়া যায়। শ্রদ্ধাপূর্ণ আন্তরিক পরিবেশ বজায় রেখে তারা আলাপ করতেন। যে কোনো মূল্যে সুস্থ-সুন্দর মতামতকে তারা প্রাধান্য দিতেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। কারও মতামত গ্রহণ করার পর নিজের মতামতের মতোই তা সর্বতোভাবে সমর্থন করতেন। সুতরাং এভাবে মতামত গ্রহণ করার জন্য ইজতিহাদ করা তাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।

টিকাঃ
৩২৬. ইস্তিখলাফ আবি বকর আস-সিদ্দীক, জামিল আব্দুল-হাদি, পৃ. ১৬৬, ১৬৭।
৩২৭. প্রাগুক্ত পৃ.১৬৭।
৩২৮. হুরূব আর-রিদ্দা ওয়া বিনা আদ-দাওলা আল-ইসলামিয়া, আহমদ সাঈদ, পৃ.১৪৫।
৩২৯. ভণ্ড মুসায়লামা আর তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধ।
৩৩০. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৯৮৬।
৩৩১. আল-ইজতিহাদ ফী আল ফিকহ আল ইসলামি, আব্দুস-সালাম আস-সুলায়মানি, পৃ. ১২৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00