📄 মুয়াম্মর ইয়েমেন থেকে প্রত্যাবর্তন এবং উমর রা., আবু মুসলিম আল-খাওলানীকে নিয়ে তার অবাক ধারণা এবং আবান ইবনে সাঈদকে বাহরাইনের গভর্নর নিয়োগ করার ব্যাপারে তার মন্তব্য
৩.৩.১। ইয়েমেন থেকে মুআযের প্রত্যাবর্তন এবং উমর রা.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু ইয়েমেনে ছিলেন। ইসলামের প্রচারের জন্য কঠিন পরিশ্রম করেছেন। মুরতাদদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পরে তিনি মদীনায় চলে আসেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, 'তাকে ডেকে পাঠান এবং জীবনধারণের পর্যাপ্ত রসদ দিয়ে দিন। আর বাকি সব কিছু ফেরত নিন।' আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'না, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সাহায্য করেছেন। এর কোনো কিছু তিনি নিজে থেকে ফেরত না দিলে আমি তার কাছ থেকে নিতে যাব না।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ভাবলেন, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কথার গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাই বার বার বোঝাতে লাগলেন। শেষে তিনি সরাসরি মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে দেখা করলেন; কোনোভাবে যদি রাজি করানো যায়। মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে সাহায্যের জন্য এগুলো দিয়েছিলেন। আমি ফেরত দেব না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুআযের ব্যাপারে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে না গিয়ে সরাসরি তার কাছে গেলেন। কারণ, তার মনে হয়েছিল, মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং মুসলিমদের স্বার্থে তার সিদ্ধান্ত সঠিক। কিন্তু মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু রাজি হলেন না।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেও জানতেন যে, মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওপরে তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, তা সত্ত্বেও তিনি তার দায়িত্ব হিসেবে উপদেশ দিয়েছেন। তবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরে মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু একটি স্বপ্ন দেখলেন। ফলে তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে যেতে বাধ্য হন। তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে দেখা করে বললেন, 'আমি আপনার কথা মানতে রাজি আছি। আপনি যা যা বলেছেন তা-ই করব। আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি। দেখলাম, অথৈ পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছি। আমি প্রায় ডুবে যাচ্ছি। এসময় আপনি এসে আমাকে উদ্ধার করলেন।' অতঃপর তিনি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে এই ঘটনা বলতে গেলেন। তিনি কসম করে বললেন যে, তিনি ঘটনার কোনো কিছুই লুকাননি। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সবকিছু শুনে বললেন, 'আমরা তোমাকে দেওয়া উপহার ফেরত নেব না।'
আরেকটি বর্ণনামতে, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কাছে হিসাব চেয়েছিলেন। তখন মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আমাকে একবার আল্লাহর কাছে, তারপরে আবার আপনার কাছেও হিসাব বুঝিয়ে দিতে হবে? আল্লাহর কসম, আমি কখনো আপনার কোনো কাজ করব না।'
৩.৩.২। আবু মুসলিম আল-খাওলানীকে নিয়ে তার অব্যর্থ ধারণা
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। যা খুবই বিরল। আয-যাহাবী বর্ণনা করেছেন যে, ইয়েমেনে আল-আসওয়াদ আল-আনসী নামে এক ব্যক্তি নিজেকে নবী দাবি করে বসে। সে এক বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করে এবং সেখানে আবু মুসলিম আল-খাওলানীকে ধরে এনে তাতে ফেলে দেয়। কিন্তু আগুন তার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। আল-আসওয়াদকে বলা হলো, 'তুমি এই লোককে সরিয়ে না দিলে সে তোমার অনুসারীদের বিভ্রান্ত করে ছাড়বে।' তাই তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। ফলে আবু মুসলিম মদীনায় চলে আসে। উট থেকে নেমেই সে সোজা মসজিদে ঢুকে পড়ে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে দেখে পরিচিত হতে আসলেন। তিনি বললেন, 'কোথা থেকে আসা হলো?' সে বলল, 'ইয়েমেন থেকে।' তিনি জানতে চাইলেন, 'সেই ভণ্ডটা যাকে আগুনে ফেলেছিল তার কী অবস্থা হয়েছিল?' সে বলল, 'সে তো আব্দুল্লাহ ইবনে সুয়াব ছিল।' তিনি বললেন, 'আমি তোমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, তুমিই কি সেই লোক?' সে বলল, 'জি, আল্লাহর কসম।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। লোকটিকে নিয়ে গিয়ে তিনি তার এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মাঝে বসালেন। বললেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার। তিনি আমাকে এই দিন দেখার সৌভাগ্য দিয়েছেন। ইবরাহীম আল-খলীল আলাইহিস সালামের মতো ঘটনা উম্মতে মুহাম্মদীর জীবনেও ঘটল আর আমি তাকে দেখতে পেলাম।'
৩.৩.৩। আবান ইবনে সাঈদকে বাহরাইনের গভর্নর নিয়োগ করা নিয়ে তার মন্তব্য
গভর্নর নিয়োগ করার আগে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহাবায়ে কেরামের সাথে আলোচনা করে নিতেন। যথারীতি, বাহরাইনে কাকে পাঠাবেন এ নিয়ে তিনি আলোচনায় বসলেন। উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগে পাঠিয়েছিলেন এমন কাউকে পাঠানো যেতে পারে। যিনি মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন, তাকে সবাই জানে আবার তিনিও তাদের চেনেন, এমন কেউ হতে পারে।' এর সাথে যোগ করলেন, 'আবান ইবনে সাঈদ ইবনুল আসকে জোর করে পাঠিয়ে দিন। তার সাথে ওদের জানাশোনা আছে। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু জোর করে পাঠানোর পক্ষপাতি ছিলেন না। তিনি বললেন, 'যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া আর কারও হয়ে কাজ করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে, তাদের আমি জোর করতে যাব না।' তার পরিবর্তে তিনি আল-আলা ইবনে হাযরামিকে বাহরাইনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
টিকাঃ
৩২০. শাহীদ আল-মিহরাব, পৃ. ৬৯, আল-ইস্তিয়াব থেকে উদ্ধৃত, ৩/৩৩৮।
৩২১. আয়ূন আল-আখবার, ১/১২৫।
৩২২. সিয়ার আলাম আন-নুবালা, ৪/৯-৪; আসহাব আর-রাসূল, ১/১৩৭।
📄 নিহত মুসলিমদের জন্য দিয়ত গ্রহণ না করার জন্য উমর রা.-এর মত, আল-আকরা ইবনে হাবিস এবং উয়ায়না ইবনে হাসানকে আবু বকর রা. জমি দিতে চাইলে তিনি বাধা দিলেন
৩.৪.১। নিহত মুসলিমদের জন্য দিয়াত গ্রহণ না করার জন্য উমর রা.- এর মত
একবার আসাদ এবং গাতাফান থেকে বুযাখার দুজন প্রতিনিধি এসেছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে শান্তিচুক্তি করা। তারা শর্ত দিল, হয় শান্তিচুক্তি নয়তো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, যে কোনো একটা বেছে নিতে হবে। তারা বলল, 'রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অর্থ সবার জানা আছে। তাহলে কেন তা করতে যাওয়া?' তিনি বললেন, 'তোমাদের অস্ত্র এবং ঘোড়া আমাদের যিম্মায় থাকবে। আর তোমাদের সাথে যুদ্ধের পরে যেসব গনীমত পেয়েছিলাম তা-ও আমাদের কাছেই থাকবে। আর তোমরা আমাদের সব কিছু ফেরত দেবে। আমাদের শহীদদের বিনিময়ে তোমাদের দিয়াত দিতে হবে। তোমাদের মৃতেরা তো জাহান্নামে গেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খলীফা এবং মুহাজিরেরা তোমাদের যতদিন না ক্ষমা করবে ততদিন উটের লেজেরও আজ্ঞাবহ হয়ে থাকতে হবে।' তিনি যখন সাহাবায়ে কেরামের কাছে তার মন্তব্য প্রকাশ করলেন তখন উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'আমি এ বিষয়ে আমার মত দিচ্ছি। যুদ্ধ আর শান্তি প্রসঙ্গে আপনি ভালো কথা বলেছেন। আমাদের গনীমত আমরা রেখে দেব আর তাদেরটা ফেরত দিতে হবে, কথাও ঠিক ছিল। তবে আমাদের শহীদদের জন্য দিয়াত নেবার ব্যাপারে আমি বলব, আমাদের শহীদেরা আল্লাহর জন্য লড়াই করেছেন। তাদের পুরস্কার আল্লাহ তা'আলা দেবেন। তাই তাদের জন্য কোনো দিয়াত প্রয়োজন নেই।' তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরামর্শমতো চুক্তি করেছিলেন।
৩.৪.২। আল-আকরা ইবনে হাবিস এবং উয়ায়না ইবনে হাসানকে আবু বকর রা. জমি দিতে চাইলে তিনি বাধা দিলেন
একবার আল-আকরা ইবনে হাবিস এবং উয়ায়না ইবনে হাসান আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গিয়ে বলল, 'হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খলীফা, ডোবার মতো কিছু জমি পড়ে আছে। তাতে না ঘাস গজায় আর না তা কোনো কাজে আসে। এই জমিটুকু আমাদের দিয়ে দেন না কেন? তাতে চাষাবাদ করে কিছুটা লাভ হলেও হতে পারে।' তিনি উপস্থিত সবার দিকে ফিরে বললেন, 'তারা যে ডোবা আর বিরান জমির কথা বলছে এ বিষয়ে তোমাদের কী মত?' সবাই বললেন, 'আমাদের মতে তা দিয়ে দেওয়া যায়। তাতে যদি উপকার হয়, হবে।' সবার কথামতো তিনি জমিটুকু তাদের নামে লিখে দিলেন। দলিলের সাক্ষী হিসেবে তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চাচ্ছিলেন। কিন্তু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন সেখানে ছিলেন না। তাই খলীফার পক্ষ থেকে লোকগুলো তার খোঁজে বের হলো। তারা দেখল তিনি খুঁটিতে উটের রশি বাঁধতে ব্যস্ত। তাকে বলা হলো, 'আবু বকর বলে পাঠিয়েছেন, আপনি যেন এই দলিলের সাক্ষী থাকেন। এখন আমরা কি আপনাকে তা পড়ে শোনাবো না আপনি নিজেই পড়বেন?' তিনি বললেন, 'আমি তো আমিই। চাইলে পড়ে শোনাতে পারো, তা না চাইলে আমার হাতের কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করো। তখন না হয় পড়ে দেখবো।' তারা বলল, 'না, আমরা তবে পড়ে শোনাচ্ছি।' তারা যথারীতি পুরো দলিল পড়ে শোনালো। তাদের পড়া হয়ে গেলে তিনি দলিল হাতে নিয়ে তাতে থুতু দিলেন (অবজ্ঞা প্রকাশ করলেন)। তার এমন আচরণে লোকগুলো রেগে গেল এবং বাজে মন্তব্য করে বসল। তিনি জবাবে বললেন, 'তোমাদের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খুব মায়া ছিল, তাছাড়া ইসলামও তখন খুব দুর্বল ছিল। এখন আর সে দিন নেই। আল্লাহ তা'আলা ইসলামকে অনেক মজবুত করছেন। যাও, পরিশ্রম করো গিয়ে। ওই জমিতে তোমাদের পশু চরিয়ে যেন লাভ না হয়!' লোকগুলো খলীফার কাছে নালিশ নিয়ে গেল। তারা বলতে লাগল, 'আল্লাহর কসম, বলুন তো খলীফা কি আপনি না উমর?' তিনি বললেন, 'না, সে চাইলে কিন্তু খলীফা হতে পারত।' এর মধ্যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এসে হাজির। তার রাগ প্রকাশ পাচ্ছিল। তিনি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন, 'আপনি এই দুজনকে যে জমি দিয়েছেন সে বিষয়ে শুনতে এসেছি। জমি কি আপনার, না সব মুসলমানের?' তিনি জবাব দিলেন, 'সব মুসলমানের।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তাহলে সবাইকে না দিয়ে এই দুজনকে দিয়ে দিলেন যে?' খলীফা বললেন, 'আমি উপস্থিত সবার সাথে আলোচনা করেছি। তাদের পরামর্শমতো কাজ করা হয়েছে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'উপস্থিত সবার সাথে আলোচনা করেছেন। কিন্তু সব মুসলমানের সাথে কি আলোচনা করেছেন? তারা সবাই কি এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট?' আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি তোমাকে বলেছিলাম, এই পদের জন্য তুমি সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। তুমি তা মানোনি।'
এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে শূরা বা আলোচনার ভিত্তিতে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খলীফাগণ ছোট-বড় সব বিষয়ে মুসলিম জনগণের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতেন। এবং সবার দ্বীনী ভাইদের সাথে আলোচনা না করে নিজেরা এককভাবে কখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না।
সুতরাং এ কথা স্পষ্ট যে, মুসলিমদের যেকোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার আগে শূরাপ্রথার প্রচলন ছিল। আবার আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এত বড় পদে থেকেও নিজের মতের দুর্বলতা প্রকাশ করতে পিছপা হননি। আল্লাহ তা'আলার আইন মেনে, হালাল-হারাম বুঝে শূরাপ্রথার কেমন চর্চা হওয়া উচিত, এখানে তার চিত্র পাওয়া যায়। আলোচনার নামে আজকাল যে রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখা যায় সেখানে জনগণের পক্ষে কিছুই থাকে না। শোষণের তিক্ততা, অন্যায় আর ক্ষতি ছাড়া জনগণের জন্য আর কিছুই থাকে না।
টিকাঃ
৩২৩. আল-কুয়ূদআল-ওয়ারিদা আলা সুলতাত আদ-দাওলা, আব্দুল্লাহ আল কায়লানি, পৃ. ১৬৯।
৩২৪. আখবার উমর, পৃ. ৩৬২, আররিয়াদ আন-নাদরা, নায়ল আল-আওতার, ৮/২২।
৩২৫. মাহদুস সাওয়াব ফী ফাযাইল আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনে আল-খাত্তাব, ১/২৬২।
📄 কুরআন মাজীদ সংকলন
ইয়ামামার যুদ্ধে নিহত শহীদদের অধিকাংশই কুরআনের হাফেয ছিলেন। তখন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু কুরআন সংকলন নিয়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে আলোচনা করেছিলেন। কাপড়ের টুকরা, হাড়, খেজুর পাতা এবং মানুষের অন্তর থেকে কীভাবে কুরআনের পুরোটা সংগ্রহ করে সংকলন করা যায়—এটাই ছিল তাদের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহাবী যায়েদ ইবনে সাবিত আল-আনসারীকে এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দিলেন। তিনি এর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন: ইয়ামামায় অনেক লোক শহীদ হলো। এই ঘটনার পরে আবু বকর আমাকে ডেকে পাঠান। গিয়ে দেখি সেখানে উমর ইবনুল খাত্তাবও আছেন। আবু বকর বললেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেছেন, 'ইয়ামামার ভয়াবহতায় আমরা কুরআন জাননেওয়ালাদের হারিয়েছি। আমার ভয় হচ্ছে। কারণ, সামনে এমন যুদ্ধ আরও ঘটবে। এমন চলতে থাকলে কুরআন মাজীদের অংশগুলো আবার না হারিয়ে ফেলি। আমার মতে, কুরআন মাজিদ একত্রে সংকলনের জন্য আপনার আইন জারির সময় হয়েছে।' আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে কাজ করেননি, আমি তা কীভাবে করব?' উমর বললেন, 'আল্লাহর কসম, কাজটি অতি উত্তম।' উমর নানাভাবে আমাকে বোঝাতে লাগলেন। এক পর্যায়ে আল্লাহ তা'আলা এই কাজের জন্য যেভাবে উমরের অন্তর উন্মুক্ত করেছেন, ঠিক সেভাবে আমার অন্তরও উন্মুক্ত করে দিলেন। আমিও তার মতো এই কাজের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে লাগলাম।
যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'তোমার বয়স কম এবং তুমি বুদ্ধিমান। তোমাকে নিয়ে আমরা খুব আশান্বিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপরে ওহী নাযিল হলে তুমিই তো লিখে রাখতে। যাও কুরআন মাজিদ খুঁজে বের কর এবং সংগ্রহ কর।' যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উদ্ধৃত করেছেন, 'আল্লাহর কসম, আমাকে যদি কুরআন সংগ্রহের বদলে একটা পাহাড়ও সরাতে আদেশ দিতেন তবে তা-ও আমার কাছে সহজ মনে হতো।'
কুরআন মাজীদ সংগ্রহের এই ঘটনা থেকে আমার এই শিক্ষাগুলো পাই:
✓ কুরআন জানতেন এমন ব্যক্তিদের মৃত্যুর কারণে, বিশেষ করে রিদ্দার যুদ্ধের পরে, কুরআন হারানোর আশঙ্কা থেকে তা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তাছাড়া এখানে এও স্পষ্ট যে উলামায়ে কেরাম এবং কুরআনের হাফেযগণ ইসলাম এবং মুসলিমদের সহায়তা করতে গিয়ে তারা তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি, আচরণ এবং তরবারি সমান তালে ব্যবহার করতেন।
✓ সাধারণ মানুষের স্বার্থে কুরআন সংরক্ষণ জরুরী হয়ে পড়ে। আবু বকর তখন উমরকে জিজ্ঞেস করলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে কাজ করেননি, আমি তা কীভাবে করব?' উমর বললেন, 'আল্লাহর কসম, কাজটি অতি উত্তম।'- এই কথোপকথন থেকে এর গুরুত্ব প্রকাশ পেয়েছে। কোনো কোনো বর্ণনামতে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'আল্লাহর কসম, কাজটি উত্তম এবং মুসলিমদের স্বার্থে প্রয়োজন।' যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু একই প্রশ্ন করলে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুও তাকে এই একই জবাব দিয়েছিলেন। এখানে মুসলিমদের জন্য কাজটি সহীহ কি না সে প্রসঙ্গ নয় বরং কাজটি উত্তম সে কথাই প্রকাশ পেয়েছে। মুসলিমদের ভালোর জন্যই কুরআন সংগ্রহ করা দরকার হয়ে পড়ে। প্রথমত সাধারণ মুসলিমদের স্বার্থে এই উদ্যোগ দরকার হয়। জনমত গ্রহণ করা হলে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে, সর্বসম্মতিক্রমে সকলে এর পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
✓ উলামায়ে কেরামের অনেকেই মনে বিশ্বাস করেন যে, যে কোনো বিষয়ে মতামত গ্রহণের সময় সাধারণ মুসলিমদের স্বার্থরক্ষা সবার আগে গুরুত্ব পেত। উপর্যুক্ত ঘটনা তাদের সেই বিশ্বাসে আলোকপাত করেছে। সাহাবায়ে কেরাম কেমন শান্ত হয়ে, নম্রতার সাথে পারস্পরিক আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন, এখানে তারও একটি সুন্দর চিত্র পাওয়া যায়। শ্রদ্ধাপূর্ণ আন্তরিক পরিবেশ বজায় রেখে তারা আলাপ করতেন। যে কোনো মূল্যে সুস্থ-সুন্দর মতামতকে তারা প্রাধান্য দিতেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। কারও মতামত গ্রহণ করার পর নিজের মতামতের মতোই তা সর্বতোভাবে সমর্থন করতেন। সুতরাং এভাবে মতামত গ্রহণ করার জন্য ইজতিহাদ করা তাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।
টিকাঃ
৩২৬. ইস্তিখলাফ আবি বকর আস-সিদ্দীক, জামিল আব্দুল-হাদি, পৃ. ১৬৬, ১৬৭।
৩২৭. প্রাগুক্ত পৃ.১৬৭।
৩২৮. হুরূব আর-রিদ্দা ওয়া বিনা আদ-দাওলা আল-ইসলামিয়া, আহমদ সাঈদ, পৃ.১৪৫।
৩২৯. ভণ্ড মুসায়লামা আর তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধ।
৩৩০. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৯৮৬।
৩৩১. আল-ইজতিহাদ ফী আল ফিকহ আল ইসলামি, আব্দুস-সালাম আস-সুলায়মানি, পৃ. ১২৭।