📄 সাকীফা বনী সাইদায় তার মনোভাব এবং আবু বকর রা.-এর কাছে বাইআত গ্রহণ করা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পরে আনসারগণ সাকীফাহ বনী সাইদায় সা'দ ইবন উবাদার চারপাশে জড়ো হয়ে বলল, 'আমাদের মধ্য থেকে একজন নেতা আর তোমাদের মধ্য থেকে একজন নেতা।' আবু বকর, উমর ইবনুল খাত্তাব ও আবু উবায়দা ইবনুল জাররা রাযিয়াল্লাহু আনহুম তাদের কাছে গেলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কথা শুরু করতেই আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে চুপ থাকতে বললেন। এ প্রসঙ্গে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, 'আল্লাহর কসম, আমি মনে মনে কিছু ভালো কথা তৈরি করে রেখেছিলাম। আমি শুধু সেগুলোই বলতে চেয়েছি। কারণ, আমি ভয় পাচ্ছিলাম যে, আবু বকর হয়তো আসল কথা গুছিয়ে বলতে পারবেন না।' আবু বকর বলতে শুরু করলেন এবং তিনি খুব দক্ষতার সাথে কথা বলেছেন। তিনি বললেন, 'আমরা নেতা হবো আর তোমরা হবে পরামর্শক।' হাব্বাব ইবনে মুনযির বলে উঠলেন, 'না, আল্লাহর শপথ, আমরা তা করব না। আমাদের মধ্যে একজন নেতা আর তোমাদের মধ্যে থেকে একজন নেতা।' আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'না, বরং আমরা নেতা আর তোমরা পরামর্শক। তারা (উমর ও আবু উবায়দাহ) আরবদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং বংশপরম্পরায় সর্বোত্তম, তোমরা উমর ও আবু উবায়দার যে কোনো একজনের হাতে বাইআত গ্রহণ করো।' তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'বরং আমরা আপনার হাতেই বাইআত গ্রহণ করব। কারণ আপনি আমাদের নেতা, আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সবচেয়ে প্রিয়ভাজন। এরপর উমর আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাত ধরলেন এবং তার নিকট বাইআত হলেন, এবং লোকেরাও তাই করল।'
আল্লাহ তা'আলা উমরের ওপর সন্তুষ্ট হোন এবং তাকেও সন্তুষ্ট করুন। যখন আস-সাকীফায় লোকজনের মধ্যে তর্ক বেড়ে গেল এবং অনেক মতভেদ দেখা দিতে লাগল, উমর তখন বিভক্তির আশংকা করছিলেন। তিনি সবচেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছিলেন যে, কেউ যদি আনসারদের কারও হাতে বাইআত গ্রহণ করতে শুরু করে দেয় তবে বড় ধরনের বিপত্তি ঘটবে। তখন আর সহজে এর সমাধান করা যাবে না। তাই তিনি দ্রুত সমাধান দিতে উদ্যত হলেন এবং তিনি আনসারদের উদ্দেশ্যে বললেন: 'হে আনসারেরা, তোমরা কি জান না যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকরকে নামায পড়াতে নির্দেশ দিয়ে গেছেন? তোমাদের মধ্যে কে আবু বকরের ওপরে নিজেকে জায়গা দিতে পছন্দ করবে?' আনসাররা বললেন, 'আল্লাহ না করুন, আমারা নিজেদেরকে আবু বকরের ওপরে প্রাধান্য দিতে পারি না।' এরপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সময় নষ্ট না করে দ্রুত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, 'আপনার হাত বাড়িয়ে দিন।' আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার হাত এগিয়ে দিলেন এবং উমর তার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করলেন। তার সাথে মুহাজিরগণও তার প্রতি আনুগত্যের শপথ নিলেন (বাইয়াত গ্রহণ করলেন)। অতঃপর আনসারেরাও তাই করলেন।'
মঙ্গলবার, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু মিম্বরে উঠে বসলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে কথা শুরু করলেন। তিনি আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা ও গুণগান করে বললেন, 'হে লোকসকল, গতকাল আমি তোমাদের এমন কথা বলেছি, যা বলা ঠিক হয়নি; এগুলো না আমি আল্লাহর কিতাবে পেয়েছি আর না আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি। আমি ভেবেছিলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবার শেষে ইন্তেকাল করবেন এবং তার আগ পর্যন্ত তিনি নিজেই আমাদের নেতৃত্ব দিতে থাকবেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আমাদের পথ-নির্দেশের জন্য তার কিতাব এবং রাসূলের সুন্নাহ দিয়েছেন। তোমরা এগুলো আঁকড়ে থাকলে, আল্লাহ তোমাদেরও তার রাসূলের মতো পথ দেখাবেন। আল্লাহ তা'আলা তোমাদের এমন এক ব্যক্তির নেতৃত্বে তোমাদের এক করেছেন যিনি তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবী, গুহায় একসাথে থাকা দুজনের মধ্যে দ্বিতীয়জন। সুতরাং তোমরা উঠে দাঁড়াও এবং তার কাছে আনুগত্যের শপথ নাও।' আস-সাকীফায় বাইআত গ্রহণের পরে এবারই প্রথম সবাই তার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে বাইআত গ্রহণ করল।
যতদিন পর্যন্ত সব মুসলিম আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্ব একত্রিত হয়নি ততদিন পর্যন্ত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লোকজনকে উৎসাহিত করতে থাকেন এবং আবু বকরের কাছে বাইয়াত গ্রহণের জন্য আহবান করতে থাকেন। এভাবে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বিভক্তি এবং বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন। আবু বকরের রাযিয়াল্লাহু আনহু নেতৃত্বে সবাইকে একত্রিত করার লক্ষ্যে এটাই ছিল উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রচেষ্টা। তার এমন বুদ্ধিদীপ্ত প্রচেষ্টা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিমদের দ্বিধা-বিভক্তি নিয়ে ভয় পেতেন। কারণ, তাতে জাতিগত রোষানল মাথাচারা দিয়ে ওঠার আশংকা ছিল। উঠবে। এজন্য তিনি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। লোকজনকে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে বাইআত গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেন এবং প্রকাশ্যে এর প্রচার করেন। তার এই কর্মপন্থার ফলে উম্মত চরম বিশৃঙ্খলা ও উত্তেজনার কঠিন বিপদ থেকে রক্ষা পায়। এটা ছিল তার অপূর্ব দূরদর্শিতা যা কেবল আল্লাহর সাহায্যেই লাভ করা সম্ভব।
টিকাঃ
৩০৯. মুসনাদ, আহমাদ ইবনে হাম্বল, নং ১/২১৩; আহমদ শাকির এর সনদ সহীহ বলে উল্লেখ করছেন।
৩১০. আল-হিকমা ফী আদ-দাওয়া ইলাল্লাহ, সাঈদ আল-কাহতানি, পৃ. ২২৬।
৩১১. মাহদুস সাওয়াব ফী ফাযায়েল আমীরুল মু'মিনিন উমর ইবনে আল-খাত্তাব, পৃ. ২৮০।
৩১২. সহীহ, বুখারী, নং ৩৬৬৮।
৩১৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬/৩০৫-৩০৬। এর সনদ সহীহ।
৩১৪. আল-হিকমা ফী আদ-দাওয়া ইলাল্লাহ, পৃ. ২২৭।
৩১৫. আল-খুলাফা আর-রাশিদূন, আব্দুল-ওয়াহহাব আন-নাজ্জার, পৃ. ১২৩।
📄 যাকাত প্রদানে অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ এবং উসামা রা.-এর নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী প্রেরণ প্রসঙ্গে আবু বকর রা.-এর সঙ্গে আলোচনা
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকাল হলো এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফা নিযুক্ত হলেন। কোনো কোনো আরব কাফির হয়ে গেল। এমন অবস্থায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বললেন, 'হে আবু বকর, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, লোকেরা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই) না বলা পর্যন্ত আমাকে তাদের সাথে যুদ্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর যখন কেউ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে তার জান-মাল আমার কাছ থেকে নিরাপদ থাকবে। উপযুক্ত শরীয়তসম্মত কারণ না থাকলে সে নিরাপদ। তার হিসাব আল্লাহ তা'আলা করবেন। এখন তাহলে আপনি কীভাবে লোকদের সাথে যুদ্ধ করবেন?' আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, যারা নামায ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে আমি তার সাথে লড়বো। কারণ, যাকাত হল মালের হক। আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময় যারা বকরির বাচ্চা দিত অথচ এখন যদি তা না দেয় তবে তাদের সাথে আমার যুদ্ধ হবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আল্লাহর কসম, আমার বুঝতে বাকি রইল না যে, আল্লাহ তা'আলা আবু বকরের অন্তরকে প্রসারিত করে দিয়েছেন যুদ্ধের জন্য। আমার মনে হলো আবু বকরের কথাই ঠিক।'
কয়েকজন সাহাবী আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পরামর্শ দিলেন, পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার আগে তিনি যেন উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহুর অভিযান স্থগিত করে রাখেন। এমন সময় উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার আল-জারাফ ক্যাম্প থেকে লোকজনসহ মদীনায় ফেরার অনুমতি চেয়ে উমর ইবনুল খাত্তাবের মাধ্যমে খলীফার কাছে বার্তা পাঠান। তিনি বলেছিলেন, 'আমার বাহিনীতে খুব প্রসিদ্ধ এবং সবচেয়ে সম্মানিত মুসলিমরা রয়েছেন। আমি রাসূলের খলীফা, রাসূলের স্ত্রীগণ এবং মুসলিমদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। আমার ভয় হচ্ছে, মুশরিকরা তাদের আক্রমণ করে বসতে পারে। কিন্তু আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন এবং উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে যে কোনো অবস্থায় তার বাহিনী নিয়ে সিরিয়ার দিকে এগিয়ে যেতে তাগিদ দিলেন। আনসার সাহাবীগণ উসামার নেতৃত্ব নিয়ে আপত্তি করলেন। তারা তার পরিবর্তে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সেনাপতি নিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন। খলীফার কাছে তাদের আবেদন উপস্থাপনের জন্য তারা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পাঠান। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, 'আনসারদের পক্ষ থেকে উসামার পরিবর্তে একজন প্রবীণ ও অভিজ্ঞ কাউকে সেনাপতি নিয়োগের দাবী তোলা হয়েছে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কথা শেষ না হতেই আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বসা থেকে লাফ দিয়ে উঠলেন। তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দাড়ি ধরে বললেন (আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সত্যিকার অর্থে খুব রেগে গিয়েছিলেন), 'হে খাত্তাবের পুত্র, রাসূলুল্লাহ নিজে তাকে এই অভিযানের জন্য সেনাপতি নিযুক্ত করে গেছেন। আর তুমি কিনা তাকে পদচ্যুত করার জন্য আমাকে পরামর্শ দিচ্ছ?'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ কথা শুনে সেখান থেকে ফিরে এলেন। আনসার সাহাবীরা তার জন্য বাইরে অপেক্ষমাণ ছিলেন। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কিছু করতে পারলেন?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ক্রোধান্বিত হয়ে জবাব দিলেন, 'যাও, ভাগো। তোমাদের মায়েরা তোমাদের কাছ থেকে মুক্তি পাক! তোমাদের জন্য আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খলীফার কাছে কীভাবেই না লজ্জিত হলাম!'
টিকাঃ
৩১৬. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ১৩৯৯; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২০।
৩১৭. আল-কামিল, ইবনে আসীর, ২/২২৬।
৩১৮. তারীখ আত-তাবারি, ৪/৪৬।
৩১৯. প্রাগুক্ত।
📄 মুয়াম্মর ইয়েমেন থেকে প্রত্যাবর্তন এবং উমর রা., আবু মুসলিম আল-খাওলানীকে নিয়ে তার অবাক ধারণা এবং আবান ইবনে সাঈদকে বাহরাইনের গভর্নর নিয়োগ করার ব্যাপারে তার মন্তব্য
৩.৩.১। ইয়েমেন থেকে মুআযের প্রত্যাবর্তন এবং উমর রা.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু ইয়েমেনে ছিলেন। ইসলামের প্রচারের জন্য কঠিন পরিশ্রম করেছেন। মুরতাদদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পরে তিনি মদীনায় চলে আসেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন, 'তাকে ডেকে পাঠান এবং জীবনধারণের পর্যাপ্ত রসদ দিয়ে দিন। আর বাকি সব কিছু ফেরত নিন।' আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'না, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে সাহায্য করেছেন। এর কোনো কিছু তিনি নিজে থেকে ফেরত না দিলে আমি তার কাছ থেকে নিতে যাব না।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ভাবলেন, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কথার গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তাই বার বার বোঝাতে লাগলেন। শেষে তিনি সরাসরি মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে দেখা করলেন; কোনোভাবে যদি রাজি করানো যায়। মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে সাহায্যের জন্য এগুলো দিয়েছিলেন। আমি ফেরত দেব না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুআযের ব্যাপারে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে না গিয়ে সরাসরি তার কাছে গেলেন। কারণ, তার মনে হয়েছিল, মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং মুসলিমদের স্বার্থে তার সিদ্ধান্ত সঠিক। কিন্তু মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু রাজি হলেন না।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেও জানতেন যে, মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহুর ওপরে তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, তা সত্ত্বেও তিনি তার দায়িত্ব হিসেবে উপদেশ দিয়েছেন। তবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরে মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু একটি স্বপ্ন দেখলেন। ফলে তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে যেতে বাধ্য হন। তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে দেখা করে বললেন, 'আমি আপনার কথা মানতে রাজি আছি। আপনি যা যা বলেছেন তা-ই করব। আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি। দেখলাম, অথৈ পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছি। আমি প্রায় ডুবে যাচ্ছি। এসময় আপনি এসে আমাকে উদ্ধার করলেন।' অতঃপর তিনি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে এই ঘটনা বলতে গেলেন। তিনি কসম করে বললেন যে, তিনি ঘটনার কোনো কিছুই লুকাননি। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সবকিছু শুনে বললেন, 'আমরা তোমাকে দেওয়া উপহার ফেরত নেব না।'
আরেকটি বর্ণনামতে, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কাছে হিসাব চেয়েছিলেন। তখন মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আমাকে একবার আল্লাহর কাছে, তারপরে আবার আপনার কাছেও হিসাব বুঝিয়ে দিতে হবে? আল্লাহর কসম, আমি কখনো আপনার কোনো কাজ করব না।'
৩.৩.২। আবু মুসলিম আল-খাওলানীকে নিয়ে তার অব্যর্থ ধারণা
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। যা খুবই বিরল। আয-যাহাবী বর্ণনা করেছেন যে, ইয়েমেনে আল-আসওয়াদ আল-আনসী নামে এক ব্যক্তি নিজেকে নবী দাবি করে বসে। সে এক বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করে এবং সেখানে আবু মুসলিম আল-খাওলানীকে ধরে এনে তাতে ফেলে দেয়। কিন্তু আগুন তার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। আল-আসওয়াদকে বলা হলো, 'তুমি এই লোককে সরিয়ে না দিলে সে তোমার অনুসারীদের বিভ্রান্ত করে ছাড়বে।' তাই তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। ফলে আবু মুসলিম মদীনায় চলে আসে। উট থেকে নেমেই সে সোজা মসজিদে ঢুকে পড়ে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে দেখে পরিচিত হতে আসলেন। তিনি বললেন, 'কোথা থেকে আসা হলো?' সে বলল, 'ইয়েমেন থেকে।' তিনি জানতে চাইলেন, 'সেই ভণ্ডটা যাকে আগুনে ফেলেছিল তার কী অবস্থা হয়েছিল?' সে বলল, 'সে তো আব্দুল্লাহ ইবনে সুয়াব ছিল।' তিনি বললেন, 'আমি তোমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, তুমিই কি সেই লোক?' সে বলল, 'জি, আল্লাহর কসম।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন। লোকটিকে নিয়ে গিয়ে তিনি তার এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মাঝে বসালেন। বললেন, 'সকল প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার। তিনি আমাকে এই দিন দেখার সৌভাগ্য দিয়েছেন। ইবরাহীম আল-খলীল আলাইহিস সালামের মতো ঘটনা উম্মতে মুহাম্মদীর জীবনেও ঘটল আর আমি তাকে দেখতে পেলাম।'
৩.৩.৩। আবান ইবনে সাঈদকে বাহরাইনের গভর্নর নিয়োগ করা নিয়ে তার মন্তব্য
গভর্নর নিয়োগ করার আগে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহাবায়ে কেরামের সাথে আলোচনা করে নিতেন। যথারীতি, বাহরাইনে কাকে পাঠাবেন এ নিয়ে তিনি আলোচনায় বসলেন। উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগে পাঠিয়েছিলেন এমন কাউকে পাঠানো যেতে পারে। যিনি মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন, তাকে সবাই জানে আবার তিনিও তাদের চেনেন, এমন কেউ হতে পারে।' এর সাথে যোগ করলেন, 'আবান ইবনে সাঈদ ইবনুল আসকে জোর করে পাঠিয়ে দিন। তার সাথে ওদের জানাশোনা আছে। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু জোর করে পাঠানোর পক্ষপাতি ছিলেন না। তিনি বললেন, 'যারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাড়া আর কারও হয়ে কাজ করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে, তাদের আমি জোর করতে যাব না।' তার পরিবর্তে তিনি আল-আলা ইবনে হাযরামিকে বাহরাইনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন।
টিকাঃ
৩২০. শাহীদ আল-মিহরাব, পৃ. ৬৯, আল-ইস্তিয়াব থেকে উদ্ধৃত, ৩/৩৩৮।
৩২১. আয়ূন আল-আখবার, ১/১২৫।
৩২২. সিয়ার আলাম আন-নুবালা, ৪/৯-৪; আসহাব আর-রাসূল, ১/১৩৭।
📄 নিহত মুসলিমদের জন্য দিয়ত গ্রহণ না করার জন্য উমর রা.-এর মত, আল-আকরা ইবনে হাবিস এবং উয়ায়না ইবনে হাসানকে আবু বকর রা. জমি দিতে চাইলে তিনি বাধা দিলেন
৩.৪.১। নিহত মুসলিমদের জন্য দিয়াত গ্রহণ না করার জন্য উমর রা.- এর মত
একবার আসাদ এবং গাতাফান থেকে বুযাখার দুজন প্রতিনিধি এসেছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে শান্তিচুক্তি করা। তারা শর্ত দিল, হয় শান্তিচুক্তি নয়তো রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, যে কোনো একটা বেছে নিতে হবে। তারা বলল, 'রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অর্থ সবার জানা আছে। তাহলে কেন তা করতে যাওয়া?' তিনি বললেন, 'তোমাদের অস্ত্র এবং ঘোড়া আমাদের যিম্মায় থাকবে। আর তোমাদের সাথে যুদ্ধের পরে যেসব গনীমত পেয়েছিলাম তা-ও আমাদের কাছেই থাকবে। আর তোমরা আমাদের সব কিছু ফেরত দেবে। আমাদের শহীদদের বিনিময়ে তোমাদের দিয়াত দিতে হবে। তোমাদের মৃতেরা তো জাহান্নামে গেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খলীফা এবং মুহাজিরেরা তোমাদের যতদিন না ক্ষমা করবে ততদিন উটের লেজেরও আজ্ঞাবহ হয়ে থাকতে হবে।' তিনি যখন সাহাবায়ে কেরামের কাছে তার মন্তব্য প্রকাশ করলেন তখন উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে বলতে লাগলেন, 'আমি এ বিষয়ে আমার মত দিচ্ছি। যুদ্ধ আর শান্তি প্রসঙ্গে আপনি ভালো কথা বলেছেন। আমাদের গনীমত আমরা রেখে দেব আর তাদেরটা ফেরত দিতে হবে, কথাও ঠিক ছিল। তবে আমাদের শহীদদের জন্য দিয়াত নেবার ব্যাপারে আমি বলব, আমাদের শহীদেরা আল্লাহর জন্য লড়াই করেছেন। তাদের পুরস্কার আল্লাহ তা'আলা দেবেন। তাই তাদের জন্য কোনো দিয়াত প্রয়োজন নেই।' তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরামর্শমতো চুক্তি করেছিলেন।
৩.৪.২। আল-আকরা ইবনে হাবিস এবং উয়ায়না ইবনে হাসানকে আবু বকর রা. জমি দিতে চাইলে তিনি বাধা দিলেন
একবার আল-আকরা ইবনে হাবিস এবং উয়ায়না ইবনে হাসান আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গিয়ে বলল, 'হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খলীফা, ডোবার মতো কিছু জমি পড়ে আছে। তাতে না ঘাস গজায় আর না তা কোনো কাজে আসে। এই জমিটুকু আমাদের দিয়ে দেন না কেন? তাতে চাষাবাদ করে কিছুটা লাভ হলেও হতে পারে।' তিনি উপস্থিত সবার দিকে ফিরে বললেন, 'তারা যে ডোবা আর বিরান জমির কথা বলছে এ বিষয়ে তোমাদের কী মত?' সবাই বললেন, 'আমাদের মতে তা দিয়ে দেওয়া যায়। তাতে যদি উপকার হয়, হবে।' সবার কথামতো তিনি জমিটুকু তাদের নামে লিখে দিলেন। দলিলের সাক্ষী হিসেবে তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে চাচ্ছিলেন। কিন্তু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন সেখানে ছিলেন না। তাই খলীফার পক্ষ থেকে লোকগুলো তার খোঁজে বের হলো। তারা দেখল তিনি খুঁটিতে উটের রশি বাঁধতে ব্যস্ত। তাকে বলা হলো, 'আবু বকর বলে পাঠিয়েছেন, আপনি যেন এই দলিলের সাক্ষী থাকেন। এখন আমরা কি আপনাকে তা পড়ে শোনাবো না আপনি নিজেই পড়বেন?' তিনি বললেন, 'আমি তো আমিই। চাইলে পড়ে শোনাতে পারো, তা না চাইলে আমার হাতের কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করো। তখন না হয় পড়ে দেখবো।' তারা বলল, 'না, আমরা তবে পড়ে শোনাচ্ছি।' তারা যথারীতি পুরো দলিল পড়ে শোনালো। তাদের পড়া হয়ে গেলে তিনি দলিল হাতে নিয়ে তাতে থুতু দিলেন (অবজ্ঞা প্রকাশ করলেন)। তার এমন আচরণে লোকগুলো রেগে গেল এবং বাজে মন্তব্য করে বসল। তিনি জবাবে বললেন, 'তোমাদের প্রতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খুব মায়া ছিল, তাছাড়া ইসলামও তখন খুব দুর্বল ছিল। এখন আর সে দিন নেই। আল্লাহ তা'আলা ইসলামকে অনেক মজবুত করছেন। যাও, পরিশ্রম করো গিয়ে। ওই জমিতে তোমাদের পশু চরিয়ে যেন লাভ না হয়!' লোকগুলো খলীফার কাছে নালিশ নিয়ে গেল। তারা বলতে লাগল, 'আল্লাহর কসম, বলুন তো খলীফা কি আপনি না উমর?' তিনি বললেন, 'না, সে চাইলে কিন্তু খলীফা হতে পারত।' এর মধ্যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এসে হাজির। তার রাগ প্রকাশ পাচ্ছিল। তিনি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন, 'আপনি এই দুজনকে যে জমি দিয়েছেন সে বিষয়ে শুনতে এসেছি। জমি কি আপনার, না সব মুসলমানের?' তিনি জবাব দিলেন, 'সব মুসলমানের।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তাহলে সবাইকে না দিয়ে এই দুজনকে দিয়ে দিলেন যে?' খলীফা বললেন, 'আমি উপস্থিত সবার সাথে আলোচনা করেছি। তাদের পরামর্শমতো কাজ করা হয়েছে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'উপস্থিত সবার সাথে আলোচনা করেছেন। কিন্তু সব মুসলমানের সাথে কি আলোচনা করেছেন? তারা সবাই কি এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট?' আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি তোমাকে বলেছিলাম, এই পদের জন্য তুমি সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি। তুমি তা মানোনি।'
এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে শূরা বা আলোচনার ভিত্তিতে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খলীফাগণ ছোট-বড় সব বিষয়ে মুসলিম জনগণের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতেন। এবং সবার দ্বীনী ভাইদের সাথে আলোচনা না করে নিজেরা এককভাবে কখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না।
সুতরাং এ কথা স্পষ্ট যে, মুসলিমদের যেকোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবার আগে শূরাপ্রথার প্রচলন ছিল। আবার আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এত বড় পদে থেকেও নিজের মতের দুর্বলতা প্রকাশ করতে পিছপা হননি। আল্লাহ তা'আলার আইন মেনে, হালাল-হারাম বুঝে শূরাপ্রথার কেমন চর্চা হওয়া উচিত, এখানে তার চিত্র পাওয়া যায়। আলোচনার নামে আজকাল যে রাষ্ট্রব্যবস্থা দেখা যায় সেখানে জনগণের পক্ষে কিছুই থাকে না। শোষণের তিক্ততা, অন্যায় আর ক্ষতি ছাড়া জনগণের জন্য আর কিছুই থাকে না।
টিকাঃ
৩২৩. আল-কুয়ূদআল-ওয়ারিদা আলা সুলতাত আদ-দাওলা, আব্দুল্লাহ আল কায়লানি, পৃ. ১৬৯।
৩২৪. আখবার উমর, পৃ. ৩৬২, আররিয়াদ আন-নাদরা, নায়ল আল-আওতার, ৮/২২।
৩২৫. মাহদুস সাওয়াব ফী ফাযাইল আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনে আল-খাত্তাব, ১/২৬২।