📄 তার কিছু গুণাবলী
গুণাবলীর দিক দিয়ে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাম চলে আসে। নবী-রাসূলগণ এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরে তিনি শ্রেষ্ঠ মানব। আহলে সুন্নাত ওয়া জামাত তো বটেই মুসলিমমাত্রই তার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে। তার গুণাবলী নিয়ে একাধিক হাদীস এবং বর্ণনা পাওয়া যায়।
২.৪.১। তার ঈমান, জ্ঞান এবং দ্বীনী দায়বদ্ধতা
আব্দুল্লাহ ইবনে হিশাম তার ঈমান প্রসঙ্গে বলেছেন: আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। তিনি উমর ইবনুল খাত্তাবের হাত ধরে ছিলেন। উমর তাকে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আমার পরে আপনাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।' তিনি বললেন, 'না, যার হাতে আমার জীবন সেই পবিত্র সত্তার কসম, যতক্ষণ তুমি আমাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালো না বাসবে।' এবার উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'না, আল্লাহর কসম, আমি আপনাকে আমার নিজের চাইতেও বেশি ভালোবাসি।' তিনি বললেন, 'এবার (ঠিক আছে), হে উমর।'
আর তার জ্ঞানের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমি ঘুমাচ্ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম, আমার জন্য এক পেয়ালা দুধ আনা হলো। আমার আঙ্গুলের ডগা থেকে দুধ গড়িয়ে না পড়া পর্যন্ত আমি পান করতে লাগলাম। অতঃপর বাকিটুকু উমরকে দিলাম।' সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, এই স্বপ্নের কী তাবীর (ব্যাখ্যা) করবেন?' তিনি বললেন, '(এর অর্থ হচ্ছে) জ্ঞান।' জ্ঞান ও দুধ, পরস্পর রূপক। কারণ, দু-টিই অত্যন্ত উপকারী, দু-টিই স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। দুধ শরীরে পুষ্টি যোগায়, আর জ্ঞান পুষ্টি যোগায় অন্তর- আত্মায়। এই হাদীসে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জ্ঞানের দিকে ইশারা করা হয়েছে।
নবীদের স্বপ্ন মূলত এক ধরনের ওহী। তাই এর আক্ষরিক ব্যাখ্যা হয় না। এখানে জ্ঞান বলতে কুরআন এবং সুন্নাহর অনুকরণে মেনে রাষ্ট্রশাসনের জ্ঞান বোঝানো হয়েছে। আর এ কথা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জন্য প্রযোজ্য। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর তুলনায় তিনি দীর্ঘদিন রাষ্ট্রশাসনের সুযোগ পেয়েছেন। আবার উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর তুলনায় জনগণ তাকে ঘিরে একতাবদ্ধ এবং অনুগত ছিল। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামল খুব সংক্ষিপ্ত ছিল, তাছাড়া তিনি খুব বেশি ভূখণ্ড জয় করতে পারেন নি। এগুলো ছিল মানুষের মধ্যে বিভেদ আর দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ। অন্য দিকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামল দীর্ঘ ছিল এবং তিনি বিস্তৃত অঞ্চল জয় করেছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি সফলভাবে সব বিভেদ, দ্বন্দ্ব দূর করে সফলতার সাথে রাষ্ট্রপরিচালনা করেছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দীর্ঘ খেলাফতের সময় কেউ তার বিরোধিতা করেনি। উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে আরও কিছু অভিযান সংঘটিত হয়েছে। তবে নানা মত আর ধারণা ছড়িয়ে পড়ায় তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো রাষ্ট্রপরিচালনা করতে পারেননি। তাকে মানুষের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হতে হয়। তার পরে এলেন আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু। তার সময়ে মত-পার্থক্য, বিরোধ এবং পরীক্ষা চরম আকার ধারণ করেছিল।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দ্বীনী দায়বদ্ধতা প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম অনেক মানুষ। কারও পোশাক বুক পর্যন্ত লম্বা, কারওটা আরও খাটো। আর উমরকে দেখলাম লম্বা পোশাক পরা। তার পোশাক এত লম্বা ছিল যে তা মাটিতে গড়াচ্ছিল।' তারা জানতে চাইলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, এর ব্যাখ্যা কী হবে?' তিনি বললেন, '(এর অর্থ) দ্বীনী দায়বদ্ধতা।'
২.৪.২। মানুষ তো মানুষ, শয়তানও তাকে ভয় পেত
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস বর্ণনা করেছেন: উমর ইবনুল খাত্তাব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে দেখা করার অনুমতি চাইলেন। তখন বেশ কয়েকজন কুরাইশ নারী তার সাথে কথা বলছিল, প্রশ্নের পর প্রশ্ন করছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে তাদের কণ্ঠ জোরে শোনা যাচ্ছিল। উমর যখন ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চেয়ে পাঠান, তখন তারা দৌড়ে পালাল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। তিনি ঘরে ঢুকে দেখলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঠোঁটে মৃদু হাসি। তিনি দুআ করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহ আপনাকে সব সময় হাসি-খুশি রাখুন।' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আমি এই নারীদের কাণ্ড দেখে অবাক হচ্ছি। তোমার আওয়াজ পেতেই সব দৌড়ে পালাল।' উমর বললেন, 'আপনি তাদের ভয়ের অধিক হকদার, ইয়া রাসূলাল্লাহ।' তারপরে তিনি বললেন, 'হে নিজের দুশমনেরা! তোমরা রাসূলকে ভয় না পেয়ে আমাকে ভয় পাচ্ছ?' তারা জবাব দিল, 'জি। কারণ, আপনি রাসূলুল্লাহর চেয়ে বেশি কঠোর আর একরোখা।' তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে খাত্তাবের পুত্র, যে পবিত্র সত্তার হাতে আমার জীবন তার কসম, শয়তানও তোমাকে দেখলে আরেক রাস্তা ধরে।'
এই হাদীসে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আরেকটি অনবদ্য গুণের কথা বলা হয়েছে। তিনি সত্যকে এমনভাবে আঁকড়ে থাকতেন যে শয়তানও তাকে কোনোভাবে প্রভাবিত করতে পারত না।
ইবনে হাজার উল্লেখ করেছেন: তার এই গুণের কারণে তার ওপরে শয়তানের কোনো প্রভাব পড়ত না। তার মানে এই নয় যে, তিনি একেবারে ত্রুটিমুক্ত ছিলেন। এখানে বরং বোঝানো হয়েছে যে, শয়তান কখনো উমরের সাথে এক রাস্তায় হাঁটত না। তবে শয়তান যে ওয়াসওয়াসা দিত না, তা নয়। এই হাদীস থেকে মনে হতে পারে যে, শয়তান যেহেতু উমরের সাথে এক রাস্তায় হাঁটতো না, তার মানে তাকে ওয়াসওয়াসাও দিত না; সুতরাং তিনি হয়তো শয়তান থেকে মুক্ত মানুষ ছিলেন এবং তার কোনো ভুল হতো না। আসলে তা নয়।'
তাবারানী তার আদ-আওসাত কিতাবে হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহুমের এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম হওয়ার পর থেকে শয়তান তার সাথে দেখা করেনি। তার কাছ থেকে শুধু পালিয়ে বেড়ায়।' এখানে আসলে দ্বীন আঁকড়ে থাকার প্রবণতা এবং সত্যকে গুরুত্ব দেওয়াকে এভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
ইমাম নববী বলেছেন, 'এই হাদীসের মূল বক্তব্য বুঝতে হবে। বলা হয়েছে শয়তান তাকে দেখে পালাত।' ফযল ইবনে ইয়ায উল্লেখ করেছেন, 'এই হাদীসের উপমা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, উমর শয়তানের পথ ছেড়ে সত্য পথ ধরেছিলেন। সুতরাং শয়তান যা পছন্দ করে, তিনি সেগুলোর উল্টোটা করতেন।' ইবনে হাজার বলেছেন, 'প্রথম ব্যাখ্যাটি বেশি গ্রহণযোগ্য।'
২.৪.৩। উম্মতের মধ্যে মুহাদ্দাস (যাদের অন্তরে সত্য কথা বা ইলহাম নাযিল হয়)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'পূর্ববর্তী উম্মতের মধ্যে কিছু লোক ছিল হাদ্দাস (যাদের অন্তরে সত্য কথা নাযিল হয়)। আমার উম্মতের মধ্যে যদি এমন কেউ থেকে থাকে তবে সে ব্যক্তি উমর।'
এই হাদীসে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আরেকটি উল্লেখযোগ্য গুণ প্রকাশ পেয়েছে। এখানে মুহাদ্দাস শব্দটির অর্থ নিয়ে উলামায়ে কেরামের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যায়। কারও মতে, এর অর্থ হলো এমন ব্যক্তি যে স্বতস্ফূর্তভাবে সত্য কথা বলে অথবা যিনি নবী না হলেও তার সাথে ফেরেশতারা কথা বলেন। অর্থাৎ, ফেরেশতাদের সাথে সরাসরি দেখা না হলেও তাদের অন্তরে অন্তরে কথা হয়। কেউ কেউ মুহাদ্দাসের প্রতিশব্দ হিসেবে বিশেষ অনুভূতি বুঝিয়েছেন।
ইবনে হাজারের মতে, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় কুরআনের সাথে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অনেক কথা মিলে গিয়েছিল। আবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পরে নিয়তগুলে অনেক কাজ সঠিকভাবে করতে পেরেছিলেন। তার এই গুণ অন্য কোনো সাহাবির মধ্যে দেখা যায়নি। তার মানে এই নয় যে তিনি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর তুলনায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন।'
ইবনুল কয়্যিমের মতে, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অনবদ্য গুণ ছিল বলে তিনি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তুলনায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন, এমন ভাবা যাবে না। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই গুণ না থাকাটাও তার জন্য ভালো ছিল। কারণ, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সোহবতে থেকে এত কিছু শিখেছিলেন যে, তার জন্য কোনো ইলহাম বা কোনো বিশেষ অনুভূতির দরকার পড়েনি।'
২.৪.৩। 'এত শক্তির সাথে কাউকে এভাবে পানি তুলতে দেখিনি'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'ঘুমের মধ্যে আমি দেখলাম, আমি একটি কূপ থেকে পানি তুলছি। আবু বকর এসে দুই-এক বালতি পানি তুললেন। তার উত্তোলনে দুর্বলতা ছিল। আল্লাহ তাকে মাফ করুন। এরপরে উমর ইবনুল খাত্তাব এলেন আর তার হাতে বালতিটি বিশাল আকার ধারণ করল। আমি তার মতো এত শক্তির সাথে কাউকে এভাবে পানি তুলতে দেখিনি। লোকেরা তৃপ্তি নিয়ে পানি পান করল, তাদের বসে থাকা উটগুলোকেও পানি পান করালো।'
এই হাদীসে স্পষ্টভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে। 'উমর ইবনুল খাত্তাব এলেন আর তার হাতে বালতিটি বিশাল আকার ধারণ করল'-এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শক্তি বলতে নেতৃত্বের কথা বলেছেন। 'উটগুলোকেও পানি পান করালো'-এর অর্থ হলো, লোকেরা তাদের উটগুলোকে পানি দিয়ে তাদের বিশ্রামের জায়গায় ফেরত গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই স্বপ্ন নিঃসন্দেহে আবু বকর এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমের খেলাফত, সংগ্রাম, নানা বিষয় পরিচালনা এবং জনকল্যাণের দিকে ইশারা করেছে। খেলাফতের সময় আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু অনেকদিন ধরে আহলে রিদ্দার মুরতাদদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। এক-সময় লড়াইয়ে ক্ষান্ত দিয়ে তিনি ইসলাম প্রচার করতে শুরু করেন। তার খেলাফতের মেয়াদ ছিল দু-বছর আর কয়েক মাস। তা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলা তার এই অল্প সময়ে অনেক বরকত দিয়েছেন। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরে এলেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু। তার সময়ে ইসলাম সবচেয়ে বেশি প্রচার-প্রসার লাভ করেছিল। শরীয়তের আইন প্রয়োগ এবং নতুন পরিস্থিতির জন্য নতুন নতুন আইন প্রণয়নও হয়েছে তার সময়ে। তার খেলাফত অনেক দীর্ঘ হওয়ায় জনসাধারণ অনেক উপকৃত হয়েছিল। তিনি নতুন নতুন শহর প্রতিষ্ঠা করেছেন, রাষ্ট্রীয় কার্যাবলী গুছিয়ে নেন। অনেক অভিযানের কারণে বিপুল পরিমাণে যুদ্ধলব্ধ সম্পদও তার সময়ে সংগ্রহ করা হয়েছিল।
'তার মতো এত শক্তির সাথে কাউকে এভাবে পানি তুলতে দেখিনি'- এর অর্থ হচ্ছে, কোনো নেতাকে এভাবে পরিশ্রম করতে আর এত বেশি আয় করতে দেখিনি। 'লোকেরা তৃপ্তি নিয়ে পানি পান করল'-এই উক্তির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আল-কদি আইয়্যাদ বলেছেন, 'এখানে আবু বকর এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমের চিন্তাশক্তি, পরিচালনা, মুসলিমদের স্বার্থে কাজ করা বোঝানো হয়েছে, এমন বলা হয়। আমার মতে, এখানে বিশেষ ভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বোঝানো হয়েছে। 'লোকেরা তৃপ্তি নিয়ে পানি পান করল'- অর্থাৎ, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুরতাদদের বিরুদ্ধে লড়ে মুসলিমদের একজোট করলেন। তার এই প্রচেষ্টা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য কাজ সহজ হয়ে যায় এবং তার জন্য সুফল বয়ে আনে।
২.৪.৫। উমর রা.-এর রক্ষণশীল মনোভাব এবং রাসূল সা.-এর কাছ থেকে জান্নাতে প্রাসাদ লাভের সুখবর
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমি (স্বপ্নে) দেখলাম জান্নাতে প্রবেশ করছি। সেখানে আবু তুলায়হার স্ত্রী, রুমায়সাকেও দেখেছি। সেখানে কারও পায়ের আওয়াজ পেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কে?' সে বলল, 'আমি বেলাল।' আমি একটি প্রাসাদও দেখলাম, তার দরবারে একজন নারীকে দেখা গেল। আমি জানতে চাইলাম, 'এটি কার প্রাসাদ?' তারা বলল, 'উমরের।' আমি ভেতরে ঢুকে দেখতে চাইলাম। তখন হঠাৎ করে তোমার রক্ষণশীল মনোভাবের কথা মনে পড়ল। তখন উমর বলে উঠল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার বাবা-মা আপনার ওপরে কুরবান হোক। আমি কি আপনার সাথেও এমন আচরণ করব?'
আরেকটি বর্ণনামতে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমি (স্বপ্নে) দেখলাম জান্নাতে প্রবেশ করছি, আর সেখানে প্রাসাদের পাশে একজন নারী অযু করছিল। আমি জানতে চাইলাম, 'এটি কার প্রাসাদ?' তারা বলল, 'উমরের।' তখন হঠাৎ করে তোমার রক্ষণশীল মনোভাবের কথা মনে পড়ল। তাই আমি ফিরে গেলাম।' উমর কাঁদতে লাগল আর বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি কি আপনার সাথে এমন আচরণ করতে পারি?'
হাদীস দু-টিতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জান্নাতে প্রাসাদ-লাভের সুসংবাদ দিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার কাছে তার উঁচু মর্যাদার কথাও এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
২.৪.৬। আবু বকর রা.-এর পরে তিনি ছিলেন রাসূল সা.-এর সবচেয়ে প্রিয়
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন যে-তিনি একবার জানতে চাইলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে?' তিনি বললেন, 'আয়েশা।' আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, পুরুষদের মধ্যে কে?' তিনি বললেন, 'তার পিতা।' আমি আবারও বললাম, 'তারপরে কে?' তিনি বললেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব।' এর পরে তিনি আরও কয়েকজনের নাম বললেন।
২.৪.৭। উমর রা.-কে জান্নাতের সুসংবাদ
আবু মুসা আল-আশআরী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মদীনার এক বাগানে ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি এসে দরজা খুলে দিতে বলল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'দরজা খুলে দাও আর তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।' আমি দরজা খুলে আবু বকরকে দেখলাম। আমি তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুসংবাদ দিলাম। তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন। তারপর আরেকজন লোক এসে দরজা খুলে দিতে বলল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'দরজা খুলে দাও আর তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।' আমি দরজা খুলে এবার উমরকে দেখলাম। আমি তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুসংবাদ দিলাম। তিনিও আল্লাহর প্রশংসা করলেন। আবারও কেউ এলো আর দরজা খুলে দিতে বলল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'দরজা খুলে দাও আর তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।' আমি দরজা খুলে উসমানকে পেলাম। তাকেও যথারীতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুসংবাদ দিলাম। তিনিও আল্লাহর প্রশংসা করলেন আর বললেন, 'আমি আল্লাহর কাছেই সাহায্য আশা করি।'
টিকাঃ
২৮০. আকীদাত আহলুস-সুন্নাহ ওয়া আল-জামাআ ফী আস-সাহাবা আল-কারিম, ড. নাসির ইবনে আলী আইদ হাসান আশ-শায়খ, ১/২৪৩।
২৮১. সহীহ আল মুসনাদ ফী ফাদাইল আস-সাহাবা, ৬৬।
২৮২. ফাতহুল বারি, ৭/৪৬।
২৮৩. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৯০।
২৮৪. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৬৮২। সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৮৬।
২৮৫. আকীদাত আহলুস-সুন্নাহ ওয়া আল-জামাআ ফী আস-সাহাবা আল-কারিম, ১/৩৪৮।
২৮৬. ফাতহুল বারি, ৭/৪৭-৪৮; শারহ আন-নবুওয়া, ১৫/১৬৫-১৬৭।
২৮৭. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৬৮৯। সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৯৮।
২৮৮. ফাতহুল বারি, ৭/৫০; শারহ আন-নাবাউয়ি, ১৫/১৬৬। আকীদাত আহলুস-সুন্নাহ ওয়া আল-জামাআ ফী আস-সাহাবা আল-কারিম, ১/২৫১।
২৮৯. ফাতহুল বারি, ৭/৫০; শারহ আন-নাবাউয়ি, ১৫/১৬৬।
২৯০. মিফতা দারুস-সাআদা, ১/২৫৫।
২৯১. সে সময় মুসলমানেরা কথায় কথায় 'আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করুন' বাক্যটি খুব ব্যবহার করতেন। আবু বকরের রা. এর বেলায়ও এ কথা প্রযোজ্য।
২৯২. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৯৩।
২৯৩. শারহ আন-নবুওয়া, ১৫/১৬১-১৬২।
২৯৪. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৯৪; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৪৭৬, ৬৬২০।
২৯৫. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৯৫।
২৯৬. আকীদাত আহলুস-সুন্নাহ ওয়া আল-জামাআ ফী আস-সাহাবা আল-কারিম, ১/২৪৫।
২৯৭. আল-ইহসান ফী সহীহ ইবনে হিব্বান, ১৫/২০৯; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৮৪; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪১০০।
২৯৮. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৬৯৩; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪০৩।
📄 রাসূল সা.-এর অসুস্থতা এবং তার ইন্তেকালের দিনে উমর রা.-এর আচরণ
২.৫.১। রাসূল সা.-এর অসুস্থতার সময় উমর রা.-এর আচরণ
আব্দুল্লাহ ইবনে যামআ বলেছেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, বেলাল নামায পড়ানোর জন্য তাকে ডাকতে এসেছিল। তিনি বললেন, 'অন্য কাউকে নামায পড়াতে বলো।' তাই আমি বাইরে বের হলাম। লোকজনের মধ্যে উমরকে দেখা গেল। আমি আবু বকরকে পেলাম না। তার কাছে গিয়ে বললাম, 'উমর, উঠে এসো আর লোকদের নামায পড়াও।' তিনি উঠে দাঁড়ালেন, তাকবির দিলেন। তার খুব দরাজ গলা ছিল। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কণ্ঠ শুনে বলতে লাগলেন, 'আবু বকর কোথায়? না আল্লাহ তা কবুল করবেন, আর না মুসলিমরা।' তিনি আবু বকরকে ডাকতে পাঠালেন। এদিকে তিনি আসার আগেই উমরের নামায পড়ানো শেষ। পরে আব্দুল্লাহ ইবনে যামআকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'তোমার ধ্বংস হোক! ইবনে যামআ, এ তুমি কী করলে? তুমি আমাকে যখন নামায পড়াতে বলেছ, আমি তখন ভাবলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয়তো এই নির্দেশ দিয়েছেন। তা না হলে আমি নামায পড়াতাম না।' আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ নির্দেশ দেননি। আমি আবু বকরকে না পেয়ে তোমাকে এই কাজ করতে বলেছি। কারণ, সেখানে যারা ছিল তাদের মধ্যে তোমাকে আমার সবচেয়ে যোগ্য মনে হয়েছে।'
ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যথা তীব্র হয়ে উঠল। তখন তিনি বললেন, 'আমার কাছে কাগজ নিয়ে এসো। তোমরা যাতে পথভ্রষ্ট না হয়ে যাও তার জন্য কিছু নির্দেশনা লিখে দিতে চাচ্ছি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখন খুব কষ্ট পাচ্ছেন। আর আমাদের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট।' এবার এই নিয়ে তর্কবিতর্ক শুরু হয়ে গেল। সবার গলাও চড়তে লাগল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা আমার কাছে থেকে সরে যাও। এই অবস্থায় আমার সামনে তর্ক করো না।' ইবনে আব্বাস বলতে বলতে বের হলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার বক্তব্য লেখা থেকে বাধা দেওয়া হলো, এ আমাদের চরম দুর্ভাগ্য।'
উলামায়ে কেরাম এই হাদীসটিকে খুব সহজভাবে বর্ণনা করেছেন। মুসলিমের ওপরে মন্তব্য করতে গিয়ে ইমাম নববী রহ. এই হাদীসের বেশ দীর্ঘ এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন: লক্ষ্যণীয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন নিখুঁত মানুষ। সুস্থ বা অসুস্থ কোনো অবস্থাতেই তিনি শরীয়তের কোনো আইন বিকৃত বা পরিবর্তন করতেন না, এটাই স্বাভাবিক। আল্লাহ-প্রদত্ত কোনো আয়াতের অবিকল প্রচার করেছেন। যেখানে ব্যাখ্যার দরকার হয়নি তিনি ব্যাখ্যা করেননি, যা যতটুকু প্রচারের নির্দেশ পেয়েছেন তার ততটুকুই মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তবে তিনি রোগ-ব্যাধিমুক্ত ছিলেন না, এ কথাও ঠিক। শারীরিক অসুবিধার জন্য তো তার মর্যাদার কোনো কমতি হয়নি। আর তিনি এর প্রকোপে প্রতিষ্ঠিত আইনেও কোনো পরিবর্তন আনতেন না। তিনি যখন যাদু-টোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তখন মনে করেছিলেন, যা করা উচিত নয় তিনি হয়তো তেমন কিছু করে ফেলেছেন। ওই অবস্থাতেও তিনি প্রতিষ্ঠিত কোনো আইনের বিরুদ্ধে কিছু করেননি। তাই এই মূল বিষয় নিয়ে আমদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই, ওই বিষয়টি সবার মাথায় রাখতে হবে। আলেমগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের লেখার বিষয় নিয়ে বিভিন্ন মত দিয়েছেন। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি দ্বন্দ্ব আর ঝামেলা এড়ানোর জন্য হয়তো খেলাফতের দায়িত্ব নির্দিষ্ট কাউকে দেবার কথা উল্লেখ করতে চেয়েছিলেন। আবার কারও মতে তিনি সবচেয়ে জরুরী আইন-কানুন সংক্ষিপ্তাকারে উল্লেখ করতে চেয়েছেন। যাতে সেগুলো নিয়ে পরবর্তী সময়ে কারও কোনো দ্বিমত না থাকে। তিনি লিখিত আকারে হয়তো এ জন্য প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, যেন তার উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা যায়, অথবা এও হতে পারে—তিনি এভাবে কাজ করার জন্য ওহীর মাধ্যমে নির্দেশ পেয়েছিলেন। পরে হয়তো তিনি ভেবেছেন যে, সেভাবে না করলেই ভালো, অথবা হতে পারে আগের নির্দেশমতো কাজ না করার জন্য তিনি ওহী পেয়েছিলেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দ্বীনী জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং সূক্ষ্মদর্শীতা নিয়ে উলামায়ে কেরামের কারও কোনো দ্বিমত নেই। ফলে তার ওই মুহূর্তের আচরণ নিয়েও কারও সন্দেহ নেই। তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি এমন কিছু লিখে ফেলেন যা করা দুঃসাধ্য, তবে শাস্তি যেমন অনিবার্য তেমনই পরবর্তী সময়ে তা নিয়ে ইজতিহাদ করারও সুযোগ থাকবে না। তাই তিনি বলেছিলেন যে, 'আল্লাহর কিতাবই আমাদের জন্য যথেষ্ট।' কারণ, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَبِ مِنْ شَيْءٍ আমি কোনো কিছু লিখতে ছাড়িনি।
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণ করে দিলাম।
তিনি জানতেন, আল্লাহ তার দ্বীনকে নিঁখুত করে দিয়েছেন এবং উম্মত পথভ্রষ্টতা থেকে নিরাপদ। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বাড়তি কষ্ট করা থেকে বিরত রাখতে চেয়েছিলেন। ইবনে আব্বাস কিংবা অন্য যে সাহাবীগণ এ বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন তাদের তুলনায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অনেক বেশি সূক্ষ্মদর্শী ছিলেন। আল-খাত্তাবি বলেছেন, 'এখানে যেন কেউ না ভাবে যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ভেবেছিলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভুল করতে পারেন; বরং তিনি যখন দেখলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যথা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে এবং মৃত্যু আসন্ন তখন এমন অবস্থায় তার সাথে কথা বললে মনে হতে পারে তিনি ঠিকমতো কথা বলার অবস্থায় নেই। তাছাড়া এমন আচরণ নিয়ে মুনাফেক লোকজন সমালোচনা শুরু করবে। সাহাবায়ে কেরাম যখন কোনো কিছু নিয়ে তার সাথে আলোচনা করতেন, তখন তিনি খুব স্পষ্টভাবে সমাধান দিতেন। তিনি কুরাইশদের সাথে হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় এভাবে কথা বলেছেন। আর যখন কোনো বিষয়ে তিনি আগেই স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে ফেলতেন তখন তা নিয়ে আর কোনো আলোচনার প্রয়োজন ছিল না।'
'আল্লাহর কিতাব আমাদের জন্য যথেষ্ট'-এই কথা তিনি তর্কে লিপ্ত সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন। এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে তিনি কিছু বলেননি। শায়খ আলী আল-তানতাবী এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে দীর্ঘদিন ছিলেন। তার সাহচার্যে থেকে তিনি এভাবে বক্তব্য দিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। তিনি এভাবে মন্তব্য করতেন; কারণ, তিনি জানতেন, তার এ কাজের অনুমতি আছে। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার মতামত জানানোর ধরন, অনুরোধ করার ধরন এবং কোনো কিছু চাওয়ার ধরন আমাদের কাছে স্পষ্ট। তার কথা সঠিক মনে হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা যেমন গ্রহণ করতেন আবার ভুল হলেও তা শুধরে দিতেন। সুতরাং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কাগজ চাইলেন তখন তিনিও তার স্বভাবমতো মন্তব্য করলেন যে, আল্লাহর কিতাব আমাদের জন্য যথেষ্ট। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও একমত পোষণ করলেন। কারণ, তিনি লেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে ঠিকই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে থামিয়ে দিয়ে তার কাজ শেষ করতেন।'
২.৫.২। রাসূল সা.-এর ইন্তকালের দিনে উমর রা.-এর আচরণ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের খবরে মানুষের মধ্যে বিষাদের ছায়া নেমে আসে। এমন খবর অনেক মুসলমানের জন্য প্রচন্ড আঘাতের ছিল। বিশেষ করে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তা মানতে পারছিলেন না। বিখ্যাত সাহাবী আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর মুখে শোনা যাক:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের খবর শুনে উমর ইবনুল খাত্তাব দাঁড়িয়ে গেলেন। বলতে লাগলেন, 'মুনাফিকেরা দাবি করছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেছেন। তিনি ইন্তেকাল করেননি; বরং মুসা ইবনে ইমরানের আলাইহিস সালামের মতো তিনি তার রবের সাথে দেখা করতে গেছেন। তিনিও চল্লিশ দিন ধরে সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তখন লোকেরা বলাবলি করেছিল যে, তিনি ইন্তেকাল করেছেন। তিনি ঠিকই ফিরে এসেছিলেন। আল্লাহর কসম, মুসা আলাইহিস সালামের মতো তিনিও ফিরে আসবেন। যে বলবে 'রাসূল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেছেন' আমি তার হাত-পা কেটে ফেলব।'
এই খবর শুনে আবু বকর মসজিদের দোরগোড়ায় এসে নামলেন। উমর তখনো সবার সাথে কথা বলে যাচ্ছিলেন। তিনি কোনোদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে সোজা আয়েশার ঘরে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিছানায় শোওয়া। ঘরের একাট কোণে ডোরাকাটা জোব্বা দিয়ে তার শরীর ঢাকা ছিল। কাপড় সরিয়ে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা মোবারকে চুমু দিলেন। আর বললেন, 'আমার বাবা-মা আপনার জন্য কুরবান হোক। আল্লাহ আপনার জন্য যে মৃত্যু নির্ধারণ করে রেখেছিলেন, আপনি তার স্বাদ পেয়েছেন। এর পরে আপনার আর মৃত্যু হবে না।' তিনি কাপড় দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা মোবারক ঢেকে দিলেন। বাইরে গিয়ে দেখেন-উমর তখনো কথা বলে যাচ্ছেন। তাকে বললেন, 'শান্ত হও উমর, আমার কথা শোনো!' উমর কথা বলেই গেলেন। উমরকে থামাতে না পেরে তিনি বাধ্য হয়ে উপস্থিত লোকজনের সামনে কথা বলা শুরু করলেন। তখন সবাই তার দিকে ঘুরে শুনতে লাগল। আবু বকর আল্লাহ তা'আলার গুণ এবং প্রশংসা করে বলতে লাগলেন: 'হে লোকসকল, যারা মুহাম্মাদের ইবাদত করতে তারা জেনে রাখো তিনি ইন্তেকাল করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করো, তারা জেনে রাখো, আল্লাহ চিরঞ্জীব। কেবল তার মৃত্যু নেই।' অতঃপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করতে লাগলেন:
আর মুহাম্মাদ একজন রাসূল বৈ তো নয়! তার পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি য মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন তবে তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুত কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছু ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ আল্লাহ তাদের সওয়াব দান করবেন।
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আল্লাহর কসম, মনে হলো সেদিনই যেন এই আয়াত নাযিল হয়েছে। তার আগে যেন কেউ এই আয়াত সম্পর্কে জানত না। আবু বকরের কাছ থেকে শুনে তারা এই কথা বলাবলি করতে লাগল।' আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলে উঠলেন, 'আল্লাহর কসম, আবু বকর যখন এই আয়াত তিলাওয়াত করল, তখন আমার মাথা ঘোরাতে লাগল। আমার পা নিয়ন্ত্রণ হারাল, আর আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। আর আমি জানলাম যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসলেই ইন্তেকাল করেছেন।'
টিকাঃ
২৯৯. সুনান, আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৬৬০। এর সনদ সহীহ।
৩০০. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ১১৪।
৩০১. সূরা আনআম, ৬: ৩৮।
৩০২. সূরা মায়িদা, ৫: ৩।
৩০৩. সহীহ আস-সীরাহ আন-নবুওয়া, পৃ. ৭৫০, শারহ মুসলিম থেকে উদ্ধৃত, ১১/৯০।
৩০৪. শারহ আন-নবুওয়া, ১১/৯০; ফাসল আর কিতাব ফী মাওয়াকিফ আল-আসহাব, আল-ঘারসি, পৃ...
৩০৫. আখবার উমর, পৃ. ৩৬।
৩০৬. আস-সীরাহ আন-নবুওয়া, ইবনে আবি শায়বা, ২/৫৯৪।
৩০৭. সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪৪।
৩০৮. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ১২৪২; তারীখ আত-তাবারি, ৩/১৯৯।