📄 দান এবং ওয়াকফ
ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়ে উমর ইবনুল খাত্তাব তার সম্পত্তির কিছু অংশ দান করেছিলেন। একে সামগ বলা হয়। সেখানে অনেক খেজুরগাছ ছিল। উমর বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমার কিছু জমি আছে, যা আমার কাছে খুবই প্রিয়। আমি তা আল্লাহর ওয়াস্তে দান করে দিতে চাই।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমার সেই সম্পত্তি এই শর্তে ওয়াকফ করে দাও যে, এটা কখনো বিক্রি করা হবে না, দান করা হবে না, উত্তরাধিকার-সূত্রে মালিকানা পরিবর্তন করা যাবে না এবং তা থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ দাতব্য-কাজে ব্যয় করা হবে। সুতরাং উমর তার সেই প্রিয় জমি দান করে দিলেন। তার সেই উপহার আল্লাহর ওয়াস্তে দেওয়া হয়েছিল। দাসমুক্তির জন্য এবং দরিদ্র, অতিথি, মুসাফির এবং জ্ঞাতিদের কাজে তা থেকে ব্যয় করা হতো। এর তত্ত্বাবধায়ক যদি ধনী হওয়ার চেষ্টা না করে তবে ন্যায়সঙ্গত কারণে তা ভোগ করতে পারবে, আবার বন্ধু- বান্ধবদের আপ্যায়নও করতে পারবে। তাতে কোনো গুনাহ হবে না।'
অপর একটি বর্ণনা অনুসারে: উমর খায়বারে কিছু জমি পেলেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললেন, 'আমি খায়বারে কিছু জমি পেয়েছি। আর আমি এর মতো দামী জমি কখনও পাইনি। আপনি কী করতে বলেন?' তিনি বললেন, 'তুমি চাইলে দান করে দিতে পারো (ওয়াকফ হিসেবে)।' অতঃপর উমর এটাকে এই শর্তে দান করলেন যে, এটা কখনও বিক্রয় করা হবে না, দান করা হবে না, উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানা পরিবর্তন হবে না এবং এর থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশ দাতব্য কাজে ব্যয় হবে, দাসমুক্তির জন্য, গরীব, অতিথি, মুসাফির এবং জ্ঞাতিদের সতকারের জন্য ব্যবহৃত হবে। এর তত্ত্বাবধায়ক যদি ধনী হওয়ার চেষ্টা না করে এ থেকে পরিমিত পরিমাণে ব্যয় করে অথবা তাঁর বন্ধু-বান্ধবদের আপ্যায়ন করে তাতে তার কোনো গুনাহ হবে না। এই আচরণ থেকে উমরের গুণাবলি সুস্পষ্টভাবে চিত্রিত হয়েছে। তিনি ভালো কাজের প্রতি যেমন আগ্রহী ছিলেন তেমনই এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের চেয়ে চিরস্থায়ী পরকাল তার কাছে বেশি গুরুত্ব পেত।
টিকাঃ
২৬৪. মুসনাদ, আহমদ, ৪/৪১, হাদীস নং ২৮১। বুখারী এবং মুসলিমের মতে হাদীসটির সনদ সহীহ।
২৬৫. সহীহ, বুখারী, কিতাব আল-ওয়াসায়া, হাদীস নং ২৭৭৩।
📄 উমর রা. এবং তার পুত্রকে রাসূল সা.-এর উপহার
বর্ণিত আছে যে, ইবনে উমর বলেছেন: উমর রা. এক লোকের গায়ে রেশমী পোশাক দেখেন। তিনি তা নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি এমন পোশাক কেনেন না কেন? প্রতিনিধিরা আপনার সাথে যখন দেখা করতে আসে তখন পরবেন।' তিনি বললেন, 'যাদের আখেরাতে কোনো অংশ নেই তারাই কেবল রেশমী পোশাক পরবে।' এর বেশ কিছুদিন পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ওই রকম পোশাক পাঠালেন। তখন তিনি তা নিয়ে আবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললেন, 'আপনি আমাকে এই পোশাক পাঠালেন, অথচ নিজেই আতারীদের এমন পোশাক সম্পর্কে যা বলার তা বলেছিলেন।' তিনি বললেন, 'আমি তো তোমার কাছে এই পোশাক পাঠিয়েছি যেন তুমি তা থেকে অর্থ আয় করতে পারো।' আরেকটি বর্ণনামতে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মক্কায় তার এক ভাইকে সেই পোশাক দিয়েছিলেন। তার ভাই তখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবার আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে উপহার দিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে বর্ণিত আছে, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর বলেছেন: আমরা একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সফরসঙ্গী হয়েছিলাম। আমি যে বেয়াড়া উটের পিঠে চড়ে যাচ্ছিলাম, তার মালিক ছিলেন উমর। উটটা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল এবং সবাইকে ছাড়িয়ে গেল। উমর উটটাকে তাড়িয়ে নিয়ে এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমরকে বললেন, 'এটা আমার কাছে বেচে দাও।' উমর বললেন, 'এটা আপনার, ইয়া রাসুল্লাহ।' তিনি আবারও তার কাছে বিক্রি করতে বললেন। অতঃপর উমর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বিক্রি করলেন। তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, এটা তোমার জন্য। এখন তুমি ইচ্ছেমতো ব্যবহার করো।'
টিকাঃ
২৬৬. আতারিদ আত-তামীমি আদ-দারিমি।
২৬৭. সহীহ, মুসলিম, নং ২০৬৮।
২৬৮. সহীহ, বুখারী, নং ৫৬৩৬।
২৬৯. সহীহ, বুখারী, নং ২০০৯।
📄 পুত্রকে উমর রা.-এর উৎসাহদান এবং ইবনে মাসউদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'বৃক্ষকূলের মধ্যে এমন একটি বৃক্ষ আছে যার পাতা কখনও ঝরে না। এই বৃক্ষটি মুসলিমদের মতোই। এবার বলো, এটি কোন গাছ?' লোকজন মরুভূমিতে হয় এমন সব গাছের নাম বলতে লাগল। আমার কাছে মনে হলো, এর জবাব, খেজুর গাছ হতে পারে। আমি লজ্জা পাচ্ছিলাম (বলতে)। লোকেরা বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদের বলে দিন এটা কোন গাছ?' নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'এটা হচ্ছে খেজুর গাছ।' আব্দুল্লাহ বললেন, 'আমি বাবাকে আমার মনের কথা বললাম। তিনি বললেন, 'তুমি তা বলে দিলে আমার কাছে এই, এই জিনিসের চেয়ে অনেক বেশি প্রিয় হতো।'
ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদানের ব্যাপারে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন যে একবার তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ঘরে ছিলাম। সেখানে তারা মুসলিমদের বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে আলোচনায় করতে করতে অনেক রাত হয়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বের হয়ে গেলেন। তার সাথে আমরাও বের হলাম। এক-ব্যক্তি তখনো মসজিদে নামায পড়ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাঁড়িয়ে তার তিলাওয়াত শুনতে লাগলেন। আমরা তাকে চেনার আগেই বোঝার আগেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'যারা কুরআন যেভাবে নাযিল হয়েছে ঠিক সেভাবেই তিলাওয়াত করতে চায় তারা যেন ইবনে উম্ম আব্দের তিলাওয়াত অনুসরণ করে তিলাওয়াত করে।' সেই ব্যক্তি বসে দুআ করতে লাগলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলতে লাগলেন, 'চাও, তোমাকে দেওয়া হবে। চাও, তোমাকে দেওয়া হবে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমি আগামীকালই তার কাছে যাব এবং তাকে এই সুখবর দেব।' পরেরদিন তাকে সুখবর দিতে গেলাম। গিয়ে দেখি, আবু বকর আমাকে হারিয়ে দিয়েছেন। কোনো ভালো কাজের ব্যাপারে আমি কখনই তাকে হারাতে পারতাম না, তিনিই আমাকে হারিয়ে দিতেন।'
টিকাঃ
২৭০. সহীহ, বুখারী, নং ১৩১।
২৭১. মুসনাদ, আহমাদ ইবনে হাম্বল, নং ১৭৫। আল-মাওসুআ আল-হাদীসিয়া।
📄 বিদআতের বিরুদ্ধে তার সতর্কতা
আল-মিসওয়ার ইবনে মাখরামা এবং আব্দুর রাহমান ইবনে আব্দুল কারী থেকে বর্ণিত আছে, তারা উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলতে শুনেছেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় আমি একদিন হিশাম ইবনে হাকীম ইবনে হিযামকে সূরা আল ফুরকান তিলাওয়াত করতে শুনেছিলাম। তিনি বিভিন্নভাবে তিলাওয়াত করছিলেন, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের শেখাননি। সে নামায পড়ছিল বলে তার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়িনি। আমি তার সালাম ফেরানোর অপেক্ষায় ছিলাম। সালাম ফেরাতেই আমি তার গলা চেপে ধরে বললাম, 'কে তোমাকে এভাবে সূরা তিলাওয়াত করতে শিখিয়েছে?' সে বলল, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিখিয়েছেন আমাকে।' আমি বললাম, 'তুমি মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই সূরা আমাকেও শিখিয়েছেন।' আমি তাকে রাসূলের কাছে নিয়ে গেলাম। বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি আমাকেও সূরা আল- ফুরকান শিখিয়েছেন। আমি তাকে সূরা আল-ফুরকান এমনভাবে তিলাওয়াত করতে শুনেছি, যেভাবে আপনি আমাকে শেখাননি।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে হিশাম, তিলাওয়াত করো।' আমি যেভাবে শুনেছিলাম ঠিক সেভাবে সে তিলাওয়াত করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'এটা এভাবেই নাযিল হয়েছে।' তারপর তিনি আমাকে বললেন তিলাওয়াত করতে। অতঃপর তিনি আমাকে যেভাবে তিলাওয়াত করতে শিখিয়েছিলেন আমি সেইভাবে তিলাওয়াত করলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'এটা এভাবে নাযিল হয়েছে।' এরপর তিনি বললেন, 'কুরআনের সাত রকম তিলাওয়াত নাযিল হয়েছে। সুতরাং তোমার কাছে যেভাবে সহজ লাগে সেভাবেই তিলাওয়াত করতে পারো।'
টিকাঃ
২৭২. আল-যুহরী তাকে এবং তার পিতাকে চিনতেন। তিনি ৬৪ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।
২৭৩. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ২৪১৯।