📄 আগন্তুক এবং তার জিজ্ঞাসা প্রসঙ্গে উমর রা.-কে নবী সা.-এর প্রশ্ন
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত: উমর ইবনুল খাত্তাব আমাকে বলেছেন, তারা একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বসে ছিলেন। সাদা পোশাকের সুদর্শন, সুন্দর চুলের এক ব্যক্তি এলো। উপস্থিত লোকজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল এবং বলতে লাগল, 'তাকে তো আমরা চিনি না। আবার মুসাফিরের মতোও লাগছে না।' লোকটি বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি কি আপনার কাছে আসব?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' তখন লোকটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাঁটুর সাথে হাঁটু লাগিয়ে বসল, তার উরুর উপর হাত দু-টি রাখল। তারপর জিজ্ঞেস করল, 'ইসলাম কী?' তিনি (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, 'এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, নামায পড়া, যাকাত দেওয়া, রোযা রাখা এবং কাবা শরীফে হজে যাওয়া।' তারপর সে জিজ্ঞেস করল, 'ঈমান কী?' তিনি উত্তর দিলেন, 'আল্লাহকে সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করা, ফেরেশতাকূল, জান্নাত-জাহান্নাম, পুনরুত্থান ও তাকদীরে বিশ্বাস করা।' সে (লোকটি) জিজ্ঞেস করল, 'ইহসান কী?' তিনি জবাব দিলেন, 'এমনভাবে ইবাদত করা যেন মনে হয় আপনি আল্লাহকে দেখছেন, যদি আপনি নাও দেখতে পারেন তবে এই মনে করা যে, আল্লাহ আপনাকে দেখছেন।' সে আবার জিজ্ঞেস করল, 'কিয়ামত কখন হবে?' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, 'এ ব্যাপারে উত্তরদাতা প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশি জানে না।' সে জিজ্ঞেস করল, 'এর লক্ষণগুলো কী?' মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, 'বিবস্ত্র, নগ্নপদ, নিঃস্ব রাখালেরা বহুতল বিশিষ্ট ভবন নির্মাণের জন্য প্রতিযোগিতা করবে এবং দাসীরা মনিব প্রসব করবে।' তারপর তিনি বললেন, 'লোকটাকে আবার ডাক।' তারা খুঁজলেন কিন্তু লোকটিকে আর পাওয়া গেল না।' দু-তিন দিন পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে আল-খাত্তাবের পুত্র, তুমি কি জান আমাকে যে এই এই প্রশ্ন করেছিলেন তিনি কে?' তিনি (উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, 'আল্লাহ এবং তার রাসূলই ভালো জানেন।' তিনি বললেন, 'তিনি ছিলেন জিবরাইল, তিনি তোমাদের ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।'
টিকাঃ
২৫১. শায়খ আহমদ শাকিরের মতে, উপপত্নীদের কথা বলা হয়েছে।
২৫২. বুখারী এবং মুসলিম মতে এর সনদ সহীহ। মুসনাদ, আহমাদ, হাদীস নং ১৮৪।
📄 মদীনার সমাজে উমর রা.
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সান্নিধ্যলাভের সুযোগ খুঁজতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কখনও কোনো মাহফিলে বসার সুযোগ পেলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি উঠতেন না। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বয়ান করছিলেন। তখনো তার সামনে অল্প কয়েকজন উপস্থিত। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুও সেখানে ছিলেন। এমন সময় মদীনায় কোনো কাফেলা হাজির হলেও তারা নড়তেন না। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে শিক্ষালাভের জন্য জমায়েতে বসে থাকতেন, আগ্রহের সাথে সেগুলোর ব্যাখ্যা জানতে চাইতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ব্যক্তিগত এবং সর্বজনীন—সব বিষয়ে প্রশ্ন করতেন। এভাবে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে পাঁচশ ঊনচল্লিশটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। অপর একটি রেওয়ায়েত অনুসারে তার বর্ণনাকৃত হাদীসের সংখ্যা পাঁচশ সাইত্রিশ। বুখারী এবং মুসলিমে এগুলোর ছাব্বিশটিকে সহীহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বুখারী আরও চৌত্রিশটি এবং মুসলিম একুশটি বর্ণনা করেছেন। বাকী হাদীসগুলো অন্যান্য হাদীসের কিতাবে পাওয়া যায়। আল্লাহ তা'আলা তাকে নিম্নোক্ত বিষয়ে হাদীস বর্ণনার সুযোগ দিয়েছেন-ইসলাম, ঈমান, ইহসান, তাকদির, জ্ঞান, যিকির, দুআ, পাক-সাফ হওয়া, নামায, জানাযা, যাকাত, সাদকা, রোযা, হজ, বিয়ে, তালাক, বংশধারা, উত্তরাধিকারের বণ্টন, অসিয়তনামা, সামাজিক সমস্যা, পারস্পরিক মেলামেশা, শাস্তি (হাদ্দ), পোশাক-পরিচ্ছদ, খানাপিনা, পশু জবেহ, নৈতিকতা ও আচরণ, আত্মসংযম (যুহুদ), হৃদয় গলানো বয়ান (আর-রাকাইক), জীবনী, ফিতনা, পুনরুত্থান এবং খলিফা-শাসক-বিচারকদের নিয়োগ। এই হাদীসগুলো জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বর্ণিত আছে এবং আজও এগুলো মানুষকে উপকৃত করছে। মদীনায় থাকাকালীন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে যেসব শিক্ষা লাভ করেছিলেন তার কিছু উদাহরণ এখানে উল্লেখ করা হলো :
টিকাঃ
২৪৪. আল-ইহসান ফী তাকরীব সহীহ ইবনে হিব্বান, ১৫/৩, হাদীস নং ৮৬৩।
২৪৫. উমর ইবনে আল-খাত্তাব, ড. আলী আল-খতীব, পৃ. ১০৮।
২৪৬. তারীখুল খুলাফাগুয়ূতি, পৃ. ১৩৩।
২৪৭. উমর ইবনে আল-খাত্তাব. ড. আলী আল-খতীব, পৃ. ১০৯।
২৪৮. দালীল আল-ফালিহীন লি তুরুক রিয়ায আস-সালেহীন, ১/৪০।
২৪৯. উমর ইবনে আল-খাত্তাব. ড. আলী আল-খতীব, পৃ. ১০৯।
২৫০. প্রাগুক্ত, পৃ. ১১২।
📄 উমর রা.-এর সাথে রাসূল সা.-এর সম্মত পোষণ করা
বর্ণিত আছে যে, আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ঘিরে বসে ছিলাম। উমর এবং আবু বকরও ছিলেন আমাদের সাথে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের রেখে উঠে গেলেন। তিনি ফিরছিলেন না বলে আমরা চিন্তায় পড়ে গেলাম। সবার আগে আমি তাকে খুঁজতে বের হলাম। বনু আন-নাজ্জারের এক আনসারের বাগানে এসে পড়লাম। সেখানে ঢোকার কোনো রাস্তা পাচ্ছিলাম না। তবে বাগানের ভেতরে ঝর্ণা চোখে পড়ল। অতঃপর ঝর্ণার পানি বের হওয়ার ফাঁকা স্থান দিয়ে কোনো রকমে বাগানে ঢুকেছি। সেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাওয়া গেল। তিনি বললেন, 'আবু হুরায়রা?' আমি বললাম, 'জী, রাসূলুল্লাহ।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'কি হয়েছে?' আমি বললাম, 'আপনি তো আমাদের সাথে ছিলেন। অনেকক্ষণ হয়ে গেল, আপনি ফিরছেন না দেখে আমরা আপনাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলাম। আমিই প্রথমে আপনাকে খুঁজতে বের হয়েছি। এই বাগানে এসে শেয়ালের মতো গর্ত দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। অন্যরা আমার পেছনে।' তিনি তার জুতা-জোড়া আমার হাতে দিয়ে বললেন, 'হে আবু হুরায়রা, আমার এই জুতা-জোড়া ধরো। বাগানের বাইরে যার দেখা পাবে সে যদি সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং এই কথা সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করে তবে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেবে।'
প্রথমেই উমরের সাথে আমার দেখা হলো। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আবু হুরায়রা, এই জুতা-জোড়া কী জন্য?' আমি জবাব দিলাম, 'এগুলো রাসূলুল্লাহর জুতা। তিনি আমাকে একথা বলে পাঠিয়েছেন যে, বাগানের বাইরে যার দেখা পাবে সে যদি সাক্ষ্য দেয় যে আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং এই কথা সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করে তবে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেবে।' উমর হাত দিয়ে আমার বুকে এত জোরে চাপড় দিলেন যে আমি উল্টে পড়ে গেলাম। তিনি বললেন, 'ফিরে যাও, আবু হুরায়রা।' আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ফিরে গিয়ে কাঁদতে লাগলাম। আমার পেছন পেছন উমরও এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবারও জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হলো, আবু হুরায়রা?' আমি বললাম, 'উমরের সাথে আমার দেখা হয়েছে। আপনি যা করতে বলেছেন আমি তা-ই করলাম। তিনি বুকে চাপড় দিয়ে আমাকে উল্টে ফেলে দিয়েছেন। তারপরে বললেন, যেন ফিরে যাই।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে উমর, এ কাজ করলে কেন?' উমর বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কি আবু হুরায়রাকে আপনার জুতাসহ এ কথা বলে পাঠিয়েছেন যে, বাগানের বাইরে সে যার দেখা পাবে সে যদি সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং এই কথা সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করে তবে তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দেবে?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ।' তিনি (উমর) বললেন, 'এ কাজ করবেন না। আমি ভয় পাচ্ছি যে, লোকজন শুধু এর উপরই নির্ভর করে থাকবে। তার চেয়ে বরং তাদের কঠোর সাধনা করতে দিন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, '(ঠিক আছে,) তারা তা-ই করুক।'
টিকাঃ
২৫৩. মাহদুস সাওয়াব ফী ফাদাইল আমীরুল মু'মিনীন উমর ইবনে আল-খাত্তাব, ১/২৫৮।
২৫৪. সহীহ, মুসলিম, কিতাব আল-ঈশান, হাদীস নং ৩১।
📄 রাসূল সা. একটিমাত্র উরস থেকে জানাজার জন্য সাহাবীদের জোর দিলেন
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে তাওরাতের একটি পৃষ্ঠা দেখেন। বললেন, 'আল-খাত্তাবের পুত্র, তুমি কি পাগল হয়ে গেছ? আমি তোমাদের কাছে সত্য-শুভ্র জিনিস পৌঁছাচ্ছি। মূসা বেঁচে থাকলে তিনিও আমার অনুসরণ করতেন।' আরেকটি বর্ণনামতে, 'যদি মূসা বেঁচে থাকতেন আর তুমি আমাকে ত্যাগ করে তার অনুসরণ করতে, তবে তুমি পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে।'
টিকাঃ
২৫৫. আল-ফাতওয়া, ১১/২৩২; মুসনাদ, আহমাদ, ৩/৩৮৭, জাবির থেকে বর্ণিত।