📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 যুদ্ধক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সা.-এর সঙ্গে উমর রা.

📄 যুদ্ধক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সা.-এর সঙ্গে উমর রা.


উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বদর এবং উহুদসহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অংশগ্রহণ করা প্রত্যেকটি যুদ্ধে তিনি উপস্থিত ছিলেন। এ ব্যাপারে উলামায়ে কেরাম একমত। তিনি এমন কোনো যুদ্ধ অথবা সামরিক অভিযানে অনুপস্থিত থাকেননি যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অংশগ্রহণ করেছেন।
২.১.১। বদরের যুদ্ধ
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যখন আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের সাথে আলোচনায় বসার পরে প্রথমে আবু বকর আস-সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু আনহু কথা বললেন। তিনি হৃদয়গ্রাহী বক্তব্য দেন। এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আহবান জানান। এরপরে কথা বললেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু, তিনিও সুন্দর বক্তব্য রাখেন এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ডাক দিলেন। এই যুদ্ধে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আযাদকৃত গোলাম, মিহজা মুসলিমদের মধ্যে প্রথম শহীদ হয়েছিলেন। উমর ইবনুল খাত্তাব নিজে তার মামা আল-আস ইবনে হিশামকে হত্যা করেছিলেন। তার কাছে ঈমানের দায়বদ্ধতার তুলনায় আত্মীয়তার সম্পর্ক নগণ্য হয়ে উঠেছিল। এ নিয়ে তিনি গর্ববোধ করতেন। ফলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে তিনি মুশরিক যুদ্ধবন্দীদের হত্যা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এই ঘটনার অসামান্য শিক্ষা প্রসঙ্গে আমি আমার আস-সীরাহ আন-নাবউয়িয়া আরাদ ওয়াকাই ওয়া তাহলীল আহাদাস নামক রাসূলের জীবনীতে উল্লেখ করেছি।
যখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আল-আব্বাসকে বন্দী করা হলো, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুব চাচ্ছিলেন তিনি যেন মুসলিম হয়ে যান। তিনি বললেন, 'আব্বাস, মুসলিম হয়ে যাও। আল্লাহর কসম, তুমি যদি মুসলিম হও, তাহলে সেটি আমার কাছে আল-খাত্তাবের মুসলিম হওয়ার চেয়ে বেশি ভালো লাগবে। এর একমাত্র কারণ, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখছি তিনি চাচ্ছেন—তুমি মুসলিম হয়ে যাও।'
বন্দীদের মধ্যে কুরাইশদের মুখপাত্র সুহায়েল ইবনে আমরও ছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর রাসূলকে বলেছিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, সুহায়েল ইবনে আমরের সামনের দাঁত ভেঙে দিই? তার জিহ্বা বের হয়ে যাবে, কোথাও দাঁড়িয়ে আপনার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারবে না।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি নবী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ আমার অঙ্গহানি না করা পর্যন্ত, আমিও তার অঙ্গহানি করব না। বলা যায় না, একদিন হয়তো এমন সময় আসবে যখন তার কথা আর কাজের কোনো সমালোচনা করতে পারবে না।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা সত্য হয়েছিল। ততদিনে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। মক্কার কিছু লোক ইসলাম ত্যাগ করার কথা ভাবছিল। তখন মক্কার শাসক আতাব ইবনে উসায়েদ ভয়ে লুকিয়ে ছিলেন। সুহায়েল ইবনে আমর উঠে দাঁড়ালেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের কথা উল্লেখ করলেন। অতঃপর বললেন, 'ইসলামের ক্ষতি করতে চাইলে তা উল্টো ইসলামকে আরও মজবুত করে তোলে। যে ঝামেলা করতে আসবে আমি তার গর্দান নামিয়ে দেব।' এ কথা শুনে লোকজন তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বদরে নিহত মক্কার মুশরিকদের উদ্দেশ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে শোনা একটি হাদীস বর্ণনা করলেন। আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমরা মক্কা ও মদীনার মাঝামাঝি জায়গায় উমরের সাথে ছিলাম। নতুন চাঁদের অপেক্ষা করছি। আমার দৃষ্টিশক্তি খুব প্রখর ছিল বলে আমি আগে দেখতে পেলাম। উমরকে বললাম, 'তুমি দেখতে পাচ্ছ না?' তিনি বললেন, 'আমি বিছানায় শুলে দেখতে পাব।' এরপর তিনি বদরবাসীর কথা বলতে লাগলেন। তিনি বললেন, 'মুশরিকরা পরের দিন কোথায় নিহত হবে রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে জায়গাগুলো দেখাতে লাগলেন। তিনি বলতে লাগলেন, 'যদি আল্লাহ তা'আলা চান, এখানে আগামীকাল অমুক অমুক পড়ে থাকবে।' আর তারা ঠিক সে জায়গাতেই নিহত হয়ে পড়ে ছিল। আমি বললাম, 'আপনাকে যিনি সত্য দিয়ে পাঠিয়েছেন, সেই সত্তার কসম, তারা সেখানেই পড়ে ছিল।' তারা নিহত হওয়ার পর তাদের লাশ একটা শুকনো কূপের মধ্যে ফেলার নির্দেশ দিলেন। অতঃপর তিনি লাশগুলোর কাছে গিয়ে বললেন, 'হে অমুক, ও অমুক, দেখলে তো—তোমাদের দেব-দেবীর ওয়াদার কী অবস্থা হলো? আমি তো দেখছি, আমার রব যে ওয়াদা করেছেন তা-ই সত্যি হয়েছে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আপনি পঁচা-গলা লাশের সাথে কথা বলছেন?' তিনি বললেন, 'আমার কথা তারা তোমারে চেয়ে ভালো শুনতে পাচ্ছে। পার্থক্য হলো তারা জবাব দিতে পারছে না।'
বদর যুদ্ধের পরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহাবায়ে কেরামের সাথে বসে এই প্রসঙ্গে কথা বলছিলেন। আল্লাহ তা'আলা মুসলিমদের কেমন সুন্দর বিজয় ও সাফল্য দিয়েছে, সবাই কৃতজ্ঞতাভরে তা স্মরণ করছিলেন। এর মধ্যে উমায়ের ইবনে ওয়াহাব এসে হাজির। তিনি তখনো মুসলিম হননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যার উদ্দেশ্যে তিনি মদীনায় এসেছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দেখলেন, মসজিদ-প্রাঙ্গনে তার উট হাঁটু গেড়ে বসেছে, আর তার পাশে তরবারি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলে উঠলেন, 'উমায়ের ইবনে ওয়াহাব, এই কুকুরটা আল্লাহর শত্রু! ও নিশ্চয়ই কোনো বদ মতলব নিয়ে এসেছে। বদরের দিনে সে-ই যত ঝামেলা করেছে।' তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর নবী, এই আল্লাহর শত্রু উমায়ের ইবনে ওয়াহাব তরবারি হাতে নিয়ে এসেছে।' তিনি বললেন, 'তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার কাঁধে থাকা তরবারির ফিতা টেনে ধরে সাথের আনসারদের বললেন, 'তোমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে বসো। এই পাপীর দিকে নজর রাখবে। একে বিশ্বাস করা ঠিক হবে না।' তাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দেখলেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার তরবারির ফিতা ধরে রেখেছেন, তখন বললেন, 'হে উমর, তাকে ছেড়ে দাও। এদিকে আসো উমায়ের।' অতঃপর তিনি কাছে এসে বললেন, 'আনইম সাবাহান (সুপ্রভাত)।' জাহেলী যুগের এভাবে শুভেচ্ছা বিনিময় করা হতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'উমায়ের, আল্লাহ তা'আলা আমাদের তোমার চাইতেও সুন্দর শুভেচ্ছা- বাণী দিয়ে ধন্য করেছেন। তা হলো, সালাম, জান্নাতীদের শুভেচ্ছা- বাণী। তারপরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি কেন এসেছ, উমায়ের?' তিনি বললেন, 'আপনার কাছে যে বন্দী হয়ে আছে তার জন্য এসেছি। তার সাথে ভালো ব্যবহার করুন।' তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার কাঁধে এই তরবারি কেন?' সে বলল, 'এই তরবারিগুলো কি কোনো কাজের?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, 'সত্যি করে বলো, কেন এসেছ?' তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি শুধু তার (বন্দী) জন্য এসেছি। তিনি বললেন, 'না। তুমি তো আল-হিজরে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়্যার সাথে বসে ছিলে। বদরে কূপের মধ্যেকার লোকদের কথা আলোচনা করছিলে। সেখানে তুমি বলেছ যে, 'আমার মাথায় ঋণ আর সংসারের বোঝা না থাকলে মুহাম্মাদকে খুন করে আসতাম।' তখন আমাকে হত্যার শর্তে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়্যা তোমার ঋণ আর সংসারের দায়িত্ব নিয়েছে। অথচ দেখ, আল্লাহ তা'আলা ঠিকই তোমার কাছ থেকে আমাকে রক্ষা করছেন।' উমায়ের বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লহ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি আল্লাহর রাসূল। আপনার গায়েবি সংবাদ- লাভের কথা এবং ওহী নাযিলের কথা শুনে আমরা বিশ্বাস করিনি। আমরা অবিশ্বাস করেছিলাম যে, আপনি ঊর্ধ্বাকাশ থেকে সংবাদ আনেন এবং আপনার উপর ওহী অবতীর্ণ হয়। আমাদের আলোচনার সময় আমি এবং সাফওয়ান ছাড়া সেখানে আর কেউ উপস্থিত ছিল না। আল্লাহর কসম, একমাত্র আল্লাহ তা'আলা ছাড়া আর কেউ আপনাকে এই খবর দেননি। আলহামদুলিল্লাহ, তিনি আমাকে হেদায়েত দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলাই আমাকে এখানে টেনে এনেছেন।' অতঃপর তিনি সত্যের বাণী উচ্চারণ করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দেশ দিলেন, 'তাকে দ্বীন শেখাও, কুরআন শেখাও এবং তার বন্দীকে মুক্ত করে দাও।' তারা তা-ই করলেন।
এখানে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পেয়েছে। তিনি উমায়ের ইবনে উমাইয়াকে দেখে সবাইকে সতর্ক করে দেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, সে একটা শয়তান এবং তার উদ্দেশ্য নেক ছিল না। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে ভালোভাবেই চিনতেন। তিনি মক্কার মুসলিমদের নির্যাতন করেছেন। বদরে মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য মুশরিকদের খেপিয়ে তোলার পেছনে তার হাত ছিল। তিনি মুসলিমদের সংখ্যার তথ্য সংগ্রহ করতেন। অতএব, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে কোনো অনভিপ্রেত পরিস্থিতি থেকে রক্ষার পদক্ষেপ নেন। তাই কাঁধের সাথে ঝোলানো তরবারির ফিতা ধরে উমায়েরকে কাবু করে রাখেন যেন তিনি তরবারি ব্যবহার করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আক্রমণ করতে না পারেন। সেই সাথে সাহাবায়ে কেরামকে নির্দেশ দেন তারা যেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পাহারা দিয়ে রাখেন।
২.১.২। উহুদ, বনু আল-মুস্তালাক এবং খন্দকের যুদ্ধ
জিহাদের ময়দানে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মধ্যে প্রবল উচ্চাশা, হীনমন্যতা-বর্জিত দৃঢ়তা এবং পরাজয় নিশ্চিত জেনেও লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যেত। উহুদের যুদ্ধেও এর প্রতিফলন ঘটেছিল। এই যুদ্ধ ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তার দ্বিতীয় যুদ্ধ। যুদ্ধ শেষে যখন আবু সুফিয়ান দাঁড়িয়ে বলল, 'এদের মধ্যে কি মুহাম্মাদ আছে?' আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তার কথার উত্তর দিয়োনা।' সে (আবু সুফিয়ান) আবার জিজ্ঞেস করল, 'এদের মধ্যে আবু কুহাফার পুত্র আছে?' তিনি বললেন, 'কোনো উত্তর দিয়োনা।' আবু সুফিয়ান আবার জিজ্ঞেস করল, 'এখানে কি আল-খাত্তাবের পুত্র আছে?' তারপর আবু সুফিয়ান বলল, 'এই লোকগুলোকে অবশ্যই হত্যা করা হয়েছে, তারা জীবিত থাকলে তারা আমার কথার উত্তর দিত।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আর চুপ থাকতে পারলেন না, বললেন, 'হে আল্লাহর শত্রু! তোমার কথা সত্য নয়। আল্লাহ তা'আলা তোমার জন্য চরম অপমান রেখে দিয়েছেন।' আবু সুফিয়ান বলল, 'হুবাল বিজয়লাভ করেছে।' নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তার জবাব দাও।' তারা জিজ্ঞেস করলেন, 'আমরা কী বলব?' তিনি বললেন, 'বলো, আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং অধিক মহিমান্বিত।' আবু সুফিয়ান বলল, 'উয্যা এখন আমদের, তোমাদের নয়।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তার জবাব দাও।' তারা জিজ্ঞেস করলেন, 'আমরা কী বলব?' তিনি বললেন, 'বলো, আল্লাহ আমাদের অভিভাবক, আর তোমরা অভিভাবকহীন।' আবু সুফিয়ান বলল, 'বদরের এক দিনের বদলে একদিন, যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। আমি নির্দেশ দিইনি, তারপরেও তোমাদের অঙ্গচ্ছেদ করা হবে। এজন্য আমার বিন্দুমাত্র দুঃখ নেই।'
আরেকটি বর্ণনামতে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'এখানে তুলনা করা অবান্তর। আমাদের নিহত লোকেরা জান্নাতে আর তোমাদের নিহতরা জাহান্নামে। আবু সুফিয়ান তার কাছে এসে বলল, 'আল্লাহর কসম দিচ্ছি, বলো তো আমরা কি মুহাম্মাদকে হত্যা করেছি?' উমর বললেন, 'আল্লাহর কসম, না। তিনি এখন তোমার এই কথাও শুনতে পাচ্ছেন।' সে (আবু সুফিয়ান) বলল, 'আমি ইবনে কামিয়ার চেয়েও তোমাকে বেশি বিশ্বাস করি। কারণ, ইবনে কামিয়া তাদের বলেছে, 'আমি মুহাম্মাদকে হত্যা করেছি।'
এই ঘটনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আবু বকর ও উমরকে নিয়ে আবু সুফিয়ানের প্রশ্ন এটা প্রমাণ করে যে, তারা তিনজনই মুশরিকদের মাথাব্যথার কারণ ছিলেন। কারণ, তারা ছিলেন ইসলামের কর্ণধার এবং তাদের প্রচেষ্টায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা পাচ্ছিল। তারা ইসলামী রাষ্ট্র এবং সমাজ-ব্যবস্থার ভিত্তি ছিলেন। মুশরিকরা জানত, তারা মারা গেলে ইসলাম টিকে থাকতে পারবে না। আবু সুফিয়ানের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশের জন্য তারা শুরুতে চুপ ছিলেন। কিন্তু তার আনন্দ এবং ঔদ্ধত্য দেখে তারা সত্য প্রকাশ করলেন এবং সাহসিকতার সাথে পাল্টা জবাব দিলেন।
বনু আল-মুসতালাকের যুদ্ধে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার কথা একজন প্রত্যক্ষ্যদর্শীর মুখ থেকেই শোনা যাক। জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ আল আনসারী বলেছেন: আমরা একটা অভিযানে ছিলাম। একজন মুহাজির একজন আনসারীকে লাথি দেয়। আনসারী বলল, 'আনসারেরা, আমাকে সাহায্য করো।' আবার মুহাজির বলল, 'মুহাজিরেরা, আমাকে সাহায্য করো।' (লড়াইয়ের জন্য যে যার মতো সাহায্য চাইল)। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ঘটনা শুনলেন এবং বললেন, 'বন্ধ করো এসব। কাজগুলো (গোত্রপ্রীতি) ভালো হচ্ছে না।' আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই একথা শুনে বলল, 'তাদের ঘটনা এতদূর গড়িয়েছে? মদীনায় ফিরে গিয়ে, অধিক মর্যাদাবানেরা (নিজেকে বুঝিয়েছে) মর্যাদাহীনদের (রাসূলকে বুঝিয়েছে) বের করে দেবে।' এই ঘটনা শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে গিয়ে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে এই মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দেওয়ার অনুমতি দিন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তাকে ছেড়ে দাও। মুহাম্মাদ তার সাহাবীদের হত্যা করছে, কেউ যেন এ কথা না বলে।'
অন্য আরেকটি বর্ণনা অনুসারে, উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, আব্বাদ ইবনে বিশরকে নির্দেশ দিন—সে যেন তাকে (আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইকে) হত্যা করে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘উমর, কী বলছ তুমি। যদি লোকজন বলতে শুরু করে যে মুহাম্মাদ তার সাথীদেরকে হত্যা করছে? না। তার চেয়ে বরং লোকদের বলে দাও, এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার সময়।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আচরণ এবং নির্দেশনা থেকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বুঝতে পারলেন যে এখন ভেবে-চিন্তে কাজ করতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বক্তব্য— ‘উমর, কী বলছো তুমি। যদি লোকজন বলতে শুরু করে যে, মুহাম্মাদ তার সাথীদেরকে হত্যা করছে?’ থেকে পরিষ্কার বুঝে গেছেন যে, রাজনৈতিক সুখ্যাতি রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্য সংরক্ষণ করা মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিল। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি তার সাহাবীদের ভালোবাসা সর্বজনবিদিত ছিল। এ প্রসঙ্গে তাদের নেতা আবু সুফিয়ান স্বীকার করেছেন, ‘মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীরা তাকে যেভাবে ভালোবাসে এমন করে অন্য কাউকে ভালোবাসতে দেখিনি।’ অন্যদিকে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহাবীদের হত্যা করছেন, এমন কথা ছড়িয়ে পড়লে বিপদ ছিল। সন্দেহ নেই, এমন ঘটলে শত্রুরা মদীনার মুসলিমদের মগজ ধোলাই করে দিত। সুতরাং মানুষ তাকে ভালোবেসে কিংবা তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে ভালো কিছু অর্জনের স্পৃহা হারিয়ে ফেলত।
খন্দকের যুদ্ধে জাবির বর্ণনা করেছেন, খন্দকের দিন সন্ধ্যাবেলা উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু কুরাইশ কাফেরদের অভিশাপ দিতে লাগলেন। বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, সূর্যাস্তের আগে নামায পড়া কঠিন হয়ে উঠেছিল।’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আল্লাহর কসম, আমিও এখন পর্যন্ত নামায পড়িনি।’ অতঃপর আমরা নীচে বুত-হান উপত্যকায় নামলাম। তিনি অযু করলেন, আমরাও করে নিলাম। সূর্যাস্তের পরে তিনি আগে আসরের নামায পড়ালেন, তারপরে মাগরিবের নামায পড়ালেন।
২.১.৩। হুদায়বিয়ার সন্ধি, হাওয়াযিনের দিকে যাত্রা এবং খায়বার যুদ্ধ
হুদায়বিয়ায় বসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে পাঠান। তিনি চাচ্ছিলেন তার এখানে আসার উদ্দেশ্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যেন মক্কায় গিয়ে কুরাইশ নেতাদের বলে আসেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, কুরাইশেরা আমাকে হত্যা করতে পারে বলে আমি আশংকা করছি। কারণ, আমাকে রক্ষা করার মতো বনু আদিয়্যি ইবনে কাবের কেউই এই মুহূর্তে মক্কায় নেই। কুরাইশেরা তাদের প্রতি আমার বিদ্বেষ আর রুক্ষ মনোভাবের কথা জানে। এক ব্যক্তি আছে, যে আমার চেয়ে ভালোভাবে এই কাজ করতে পারবে। উসমান ইবনে আফফান।'
অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উসমান ইবনে আফফানকে ডেকে পাঠালেন। তার মারফত আবু সুফিয়ানসহ অন্যান্য কুরাইশ নেতার কাছে খবর পাঠানো হলো যে, তিনি যুদ্ধ বাঁধাতে আসেননি। তিনি শুধু কাবায় যেতে চাচ্ছেন, এর পবিত্রতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চাচ্ছেন। সমঝোতা হলো। কিন্তু সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করার আগে মুসলিমদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুটি শর্তে রাজি হওয়ায় মতভেদ তৈরি হয়েছিল। প্রথমত মদীনায় যোগদান করা মুসলিমদের ফেরত পাঠাতে হবে, যেখানে কুরাইশেরা তাদের সাথে যোগদানকারী ধর্মত্যাগী মুসলিমদের ফেরত পাঠাতে বাধ্য থাকবে না; আরেকটি শর্ত ছিল, মুসলিমরা সেই বছর মক্কায় প্রবেশ না করেই হুদায়বিয়া থেকে মদীনায় ফিরে যেতে বাধ্য থাকবে। উমর ইবনুল খাত্তাব, আল-আওসের প্রধান উসায়েদ ইবনে হুদায়ের, আল-খাযরাজের প্রধান সাদ ইবনে উবাদা রাযিয়াল্লাহু আনহুম কঠোরভাবে এই চুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন।
ইতিহাসবিদগণের মতে, উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু এই চুক্তির প্রতি দ্বিমত প্রকাশ করতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়েছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কি আল্লাহর রাসূল নন?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ।' তিনি (উমর) জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কি মুসলিম নন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, 'তারা কি মুশরিক নয়?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, 'তাহলে কেন আমরা এই অপমানজনক চুক্তি মেনে নিচ্ছি?' তিনি বললেন, 'আমি আল্লাহর রাসূল এবং আমি তাকে (আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) অমান্য করতে পারব না।'
অন্য বর্ণনামতে, তিনি বলেছিরেন, 'আমি আল্লাহর বান্দা এবং রাসূল। আমি কখনই তার আদেশের অন্যথা করব না। আর তিনিও আমাকে ত্যাগ করবেন না।' (উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু) জানতে চাইলেন, 'আপনি কি আমাদের কাবাঘরে যাওয়ার এবং তাওয়াফ করার কথা বলেননি?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ, বলেছি। কিন্তু আমি কি বলেছি আমাদের এ বছরই যেতে হবে?' আমি বললাম, 'না।' মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আমরা অবশ্যই যাব এবং তাওয়াফ করব।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবার আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গিয়ে বললে, 'হে আবু বকর, তিনি কি আল্লাহর রাসূল নন?' তিনি (আবু বকর) বললেন, 'হ্যাঁ।' তিনি (উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু) জিজ্ঞেস করলেন, 'আমরা কি মুসলিম নই?' তিনি উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, 'তারা কি মুশরিক নয়?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, 'তাহলে কেন আমরা এই অপমানজনক চুক্তি মেনে নিচ্ছি?' আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তর্ক করতে নিষেধ করলেন এবং বিরোধিতা না করার উপদেশ দিলেন। তিনি বললেন, 'তার কথা মেনে নাও। কারণ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর রাসূল এবং তিনি যা সঠিক তা-ই বলেন। তিনি কখনোই আল্লাহর আদেশের বিপক্ষে যাবেন না। আর আল্লাহও তাকে কখনো ত্যাগ করবেন না।'
আবু জানদালের করুণ পরিণতির পরে সাহাবায়ে কেরাম আবারও এই সন্ধির বিরুদ্ধে আপত্তি জানান। আপত্তির কথা নতুন করে বলার জন্য আবারও উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু অন্য সাহাবীদের নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হাজির হন। তিনি আল্লাহ তা'আলা-প্রদত্ত ধৈর্য, প্রজ্ঞা, সহনশীলতা এবং মানুষকে বোঝানোর ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই চুক্তির যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। ফলে সবাইকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, মুসলিমদের স্বার্থেই এই চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছে এবং এর মধ্যেই মুসলিমদের বিজয় নিহিত। আবু জানদালের মতো দুর্বল এবং নিপীড়িতদের জন্য আল্লাহ একটা না একটা পথ দেখাবেন। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর কাছ থেকে গঠনমূলক বিরোধিতাকে সম্মান করতে শিখেছিলেন। পরবর্তীকালে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সুস্থভাবে প্রতিবাদ করতে এবং জনস্বার্থকে সবার আগে অগ্রাধিকার দিতে উৎসাহিত করেছেন। ইসলামী সমাজে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। শাসক কিংবা খলীফার সাথে মতের মিল না থাকলেও যে কেউ সেখানে স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে পারে। স্বৈরতন্ত্রের পরোয়া না করে মুক্তচিন্তা এবং মত প্রকাশ করতে পারা হলো মুসলিম নাগরিকের অন্যতম অধিকার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিজের অমতের কথা বলেছিলেন। ফলে দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে কোনো বিষয়ে মতের অমিল হওয়াটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়; আর না এমন কিছু যার জন্য কাউকে কারাগারে অদৃশ্য করে দিতে হবে।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই আচরণ তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলেনি। বরং এখানে স্পষ্ট যে তিনি উদ্ভূত পরিস্থিতির একটা ব্যাখ্যা খুঁজছিলেন। ইসলামের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে তিনি কাফিরদের লাঞ্ছনাকর পরিণতি দেখার জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। এই চুক্তির অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞার ব্যাপারে যখন তিনি বুঝতে পারলেন তখন হুদায়বিয়ার সময়ে এমন আচরণ করা নিয়ে পরে বলেছিলেন, 'সেইদিন কথা আর কাজের পরিণাম নিয়ে শংকিত হয়ে আমি দান, রোযা, নামায এবং দাস মুক্ত করতে থাকলাম। আশা করছি যে এর মাধ্যমে ভালো কিছুর সূচনা হয়েছিল।'
সপ্তম হিজরীর শাবান মাস। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ত্রিশজনের একটা দল নিয়ে তুরবায় পাঠান। তুরবা ছিল কবালার কাছাকাছি একটি জায়গা। সেখান থেকে মক্কা যেতে হলে আরও চার জায়গায় থামতে হয়। হাওয়াযিনবাসী পিছিয়ে পড়েছিল দেখে তাদের কাছে পাঠানো হলো। বনু হিলাল থেকে একজন পথপ্রদর্শক নিয়ে তিনি রওনা দিলেন। দিনে লুকিয়ে থেকে তারা রাতে পথ চলতেন। হাওয়াযিনদের কানে খবর যেতেই তারা পালিয়ে গেল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু গন্তব্যে পৌঁছে কাউকে পেলেন না। অগত্যা মদীনায় ফিরে যান। আরেক বর্ণনামতে, বনু হিলালের পথপ্রদর্শক উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করেছিল, 'আপনি কি তবে খাশআম গোত্রকে আক্রমণ করবেন? খরার জন্য তারা দেশ ছেড়ে যাচ্ছে।' তিনি বললেন, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে তাদের ব্যাপারে কিছু বলেননি। তুরবায় গিয়ে হাওয়াযিনদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বলেছেন।'
এই অভিযান তিনটি যুদ্ধ কৌশল শিক্ষা দিয়েছে :
১। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সেনা পরিচলনার যোগ্য হয়ে উঠেছিলেন। তা না হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন বিপদসঙ্কুল এলাকায় মুসলিম অভিযানের দায়িত্ব তাকে দিতেন না। যেখানে হাওয়াযিনেরা ছিল সবচেয়ে শক্তিধর আরবগোত্র।
২। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দিনে লুকিয়ে থেকে রাতে যাত্রা করতেন। শত্রুদের অসতর্ক অবস্থায় ধরার জন্য এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রণনীতি। এই কৌশল তাকে পাহারাবিহীন অবস্থায় শত্রু ধরতে সক্ষম করেছিল, ফলে তারা পালাতে বাধ্য হয়। এইভাবেই তার ছোট্ট সেনাবাহিনী দুর্দণ্ড প্রতাপ মুশরিক বাহিনীর উপরে বিজয়লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল।
৩। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার উর্ধ্বতনের আদেশ পুরোপুরি পালন করতেন। সব সময়, সব অবস্থায় নির্দেশ পালন করা সামরিক শৃঙ্খলার মূলনীতি।
খায়বারের যুদ্ধে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায় হেরে যাচ্ছিলেন তখন তিনি উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাতে পতাকা তুলে দিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কয়েকজন লোক নিয়ে খায়বারবাসীকে আক্রমণ করতে যান। এক পর্যায়ে তারা পিছিয়ে যান এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ফিরে আসেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আগামীকাল আমি এমন একজনের হাতে পতাকা দেব যে আল্লাহ ও তার নবীকে ভালোবাসে এবং আল্লাহ ও তার নবীও তাকে ভালোবাসে।'
পরেরদিন আবু বকর এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুম দু-জনই পতাকা পাওয়ার আশায় ছিলেন। অথচ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ডাকলেন আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুকে। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন চোখের অসুখে ভুগছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর চোখে হালকা করে মুখের লালা লাগিয়ে দিলেন এবং তার হাতে পতাকা তুলে দিলেন। কিছু লোক তার সাথে উঠে দাঁড়াল এবং তারা খায়বারের লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলেন। তাদের মধ্যে মারহাব নামে এক লোক গা-জ্বালানো কবিতা আবৃত্তি করছিল। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সাথে দ্বৈত লড়াই করলেন। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু তার মাথায় এমন প্রচণ্ড আঘাত করলেন যে, মারহাবের শিরস্ত্রাণের উপরে তার তরবারি ভেঙে পড়ল। শিবিরে থাকা সৈন্যরা পর্যন্ত সে আঘাতের শব্দ শুনতে পেয়েছিল। এর পরে বাকি সৈন্যরা আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে যোগ দিল। আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে বিজয়ী করার আগ পর্যন্ত তারা লড়াই চালিয়ে যান।
তারা খায়বার থেকে ফিরে আসার পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কয়েকজন সাহাবী বলতে লাগলেন, 'অমুক অমুক শহীদ হয়েছে।' অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'না, সে শহীদ নয়। আমি তাকে জাহান্নামে দেখেছি। তার গায়ে গনীমতের মাল থেকে চুরি করা আলখাল্লা ছিল।' তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে খাত্তাবের পুত্র, যাও এবং লোকদের কাছে ঘোষণা করো যে, মুমিন ছাড়া আর কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।' অতঃপর আমি বের হলাম এবং ঘোষণা করলাম যে, মুমিন ছাড়া আর কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।
২.১.৪। মক্কা বিজয় এবং হুনাইন ও তাবুকের যুদ্ধ
মদীনার অভিজ্ঞতার কারণে কুরাইশেরা হুদায়বিয়ার সন্ধিভঙ্গ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে। সুতরাং তারা চুক্তি নবায়ন করে এর মেয়াদ বাড়ানোর জন্য আবু সুফিয়ানকে পাঠালো। সে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গেল, তার কন্যা উম্মে হাবীবার বাড়িতে গিয়ে তার সাথে দেখা করল। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। আবু সুফিয়ান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কথা বলতে চাইল। কিন্তু তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। তারপর সে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে গেল। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তার পক্ষ থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে কথা বলতে বলল। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলে দিলেন, 'আমি এ কাজ করব না।' এরপরে উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে কথা বলতে গেল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে আমি তোমার জন্য মধ্যস্থতা করব? আল্লাহর কসম, আমার কাছে যদি কেবল একটামাত্র পিঁপড়া থাকে তবে তা-ই নিয়ে তোমাদের সাথে যুদ্ধ করব।'
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেন, এই খবর হাতিব ইবনে আবি বালতাআ মক্কার লোকদের অগ্রসর চিঠি মারফত জানিয়ে দিল। আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমে তার নবীকে ঐ চিঠির কথা জানিয়ে দিলেন। সুতরাং এই সমস্যা তিনি অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলী এবং আল-মিকদাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুমকে পাঠালেন। তারা মদীনা থেকে বারো মাইল দূরে রাওদাত খাখ নামক স্থানে চিঠি বহনকারী নারীকে ধরে ফেললেন। চিঠি না দিলে তাকে তল্লাশি করা হবে, এমন হুমকির মুখে সে চিঠিটি দিয়ে দিল। বিষয়টি তদন্ত করার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতিবকে ডেকে পাঠালেন। হাতিব বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে নিয়ে অস্থির হবেন না। আমি কুরাইশ না হলেও তাদের বন্ধু ছিলাম। আপনার সাথে যেসব মুহাজির আছে তাদের আত্মীয়-স্বজনেরা তাদের পরিবার-পরিজন এবং ধন-সম্পদ রক্ষা করবে। কিন্তু আমার রক্তের সম্পর্কের কেউ সেখানে নেই। তাই আমি তাদের উপকার করতে চেয়েছি যেন তারা আমার সেখানকার আত্মীয়দেরকে রক্ষা করে। নিজের ধর্ম থেকে খারিজ হওয়ার কারণে কিংবা একবার মুসলিম হওয়ার পরে আবারও কুফরিতে ফিরে যাওয়ার জন্য আমি এ কাজ করিনি।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'সে সত্যি কথা বলছে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে এই মুনাফিকের শিরোচ্ছেদ করার অনুমতি দিন!' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'সে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, আর তুমি জান না, হতে পারে বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের দিকে আল্লাহ তা'আলা ক্ষমার দৃষ্টিতে তাকিয়েছেন এবং বলেছেন, 'তোমাদের যা ইচ্ছা করো, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি।'
হাতিবের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর আলোচনা থেকে আমরা শিখলাম :
✓ গুপ্তচরবৃত্তির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তা উল্লেখ করার পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তা অস্বীকার করেননি। কিন্তু তিনি তাকে এই শাস্তি কার্যকর করতে দেননি; কারণ, সে (হাতিব) বদরের যুদ্ধে উপস্থিত ছিল।
✓ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ধর্মীয় ব্যাপারগুলো খুব গুরুত্বের সাথে নিতেন। হাতিবকে শিরোচ্ছেদ করতে চাওয়ার ইচ্ছা থেকে তা ভালোভাবে বোঝা গেছে।
কবীরা গুনাহর মাধ্যমে ঈমান একেবারে শূন্য হয়ে যায় না। হাতিব যা করেছে (গুপ্তচরবৃত্তি) তা কবীরা গুনাহ ছিল। কিন্তু তারপরেও সে তখনো ঈমানহারা হয়নি।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এখানে হাতিবকে মুনাফিক বলেছেন। শব্দটির ভাষাগত অর্থে, শরঈ পরিভাষায় মুনাফিক বলতে যা বোঝায় (যে ব্যক্তি অন্তরে কুফরি গোপন করে বাইরে মুসলিমের মতো আচরণ করে) সেই অর্থে বলেননি। উমর যে অর্থে বলেছেন তা হচ্ছে, হাতিব মনে মনে ভেবেছেন একটা কিন্তু কাজের বেলায় করেছেন আরেকটা। যে ঈমানের জোরে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলেন এবং নিজের রক্ত ঝরিয়েছেন তার সাথে এই চিঠি পাঠানোর কাজটি পরস্পরবিরোধী ছিল।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা শুনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শান্ত হয়ে যান। হাতিবকে যেখানে তার কবীরা গোনাহের জন্য শাস্তি দিতে চেয়েছিলেন, মুহূর্তের মধ্যেই তিনি রাগ প্রশমিত করে এমন এক ব্যক্তিতে পরিণত হলেন যে, আল্লাহর ভয়ে চোখের পানি ফেলতে লাগলেন। তিনি বলেছিলেন, 'আল্লাহ এবং তার রাসূল সবচেয়ে ভালো জানেন।' এর কারণ হচ্ছে, তার রাগও আল্লাহ এবং তার রাসূলের জন্যই। তিনি যখন বুঝলেন যে, আল্লাহ এবং তার রাসূলের কাছে অন্য কোনো ফয়সালায় সন্তুষ্টি রয়েছে, তখন তিনি হাতিবের ভুলকে উপেক্ষা করলেন, তার জিহাদে অংশগ্রহণের প্রমাণের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে তার সাথে উদার আচরণ করলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মার আয-যাহরানে যাত্রাবিরতি করেন। তখন আবু সুফিয়ান জীবন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে উঠলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আব্বাস ইবনে মুত্তালিব তার কাছে আবু সুফিয়ানের নিরাপত্তা চাইলেন। তিনি তাতে সম্মত হন। আল-আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণনামতে : আমি বললাম, 'হে আবু সুফিয়ান, তোমার দুর্ভাগ্য, এই যে আল্লাহর রাসুল, তার লোকজন নিয়ে হাজির। আজ কুরাইশদের জন্য কতই না ভয়ানক দিন!' আবু সুফিয়ান বললেন, 'তোমার উপর আমার মাতা-পিতা কুরবান হোক! তাহলে এখন উপায় কী?' আমি বললাম, 'তোমাকে এখন হাতের কাছে পেলেই তোমার শিরোচ্ছেদ করবে। কাজেই আমার সাথে এই খচ্চরের পিঠে চড়ে বসো। আমি তোমাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিয়ে যাব এবং তার কাছে তোমার নিরাপত্তার আবেদন করব।' তারপর তিনি আমার পেছনে সওয়ার হলেন এবং তার সাথী দু-জন ফিরে গেল।
আমি তাকে নিয়ে রওনা হলাম। যখনই মুসলিমদের তাঁবুর আগুনের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলাম তখনই লোকজন জিজ্ঞেস করছিল, 'ইনি কে?' তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খচ্চর আর এর পিঠে আমাকে দেখে বলছিল, 'রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা তার খচ্চরের উপর সওয়ার।' এমনকি যখন আমি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আগুনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন তিনিও জিজ্ঞেস করলেন, 'ইনি কে?' আমাকে দেখে সে এগিয়ে এলো। আমার পেছনে আবু সুফিয়ানকে দেখে বলে উঠলেন, 'আল্লাহর দুশমন, আবু সুফিয়ান! আল্লাহর অসংখ্য প্রশংসা যে, কোনো চুক্তি আর ওয়াদা ছাড়াই আল্লাহ তোমাকে আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছেন।'
অতঃপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ছুটলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পেয়ে বললেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, এই যে আবু সুফিয়ান! আল্লাহ তা'আলা কোনো চুক্তি আর ওয়াদা ছাড়াই তাকে আমাদের কাছে এনে দিয়েছেন। তাকে হত্যা করার জন্য আমাকে অনুমতি দিন।' আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি কিন্তু তাকে নিরাপত্তার ওয়াদা দিয়েছি।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু সুফিয়ানকে নিয়ে যখন খুব বেশি বেশি পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন, তখন আমি বললাম, 'থামো, হে উমর, আল্লাহর কসম, যদি সে বনু আদিয়্যি ইবনে কাবের কোনো ব্যক্তি হতো, তাহলে তুমি এমন করতে না। আবু সুফিয়ান বনু আবদে মানাফের লোক বলে তুমি এমন করছ।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আব্বাস, থামুন! আল্লাহর কসম, আপনি যেদিন মুসলিম হলেন, সেদিন যদি আমার পিতা খাত্তাবও মুসলিম হতেন, তাহলে আপনার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা আমার পিতার ইসলামগ্রহণের চাইতে আমার কাছে বেশি প্রিয় ছিল। এর একমাত্র কারণ, আমি জানি যে, আপনার ইসলাম গ্রহণ খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণের চাইতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে অধিকতর প্রিয়।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আব্বাস, আপনি এখন তাকে আপনার তাঁবুতে নিয়ে যান। সকালে আপনি তাকে নিয়ে আসবেন।'
মুসলিমদের মধ্য দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চাচা আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর জিম্মায় আল্লাহর শত্রুকে অপমানিত ও ভীত অবস্থায় দেখে তিনি এমন রুদ্রমূর্তি হয়ে ওঠেন। মূলত আল্লাহর নৈকট্য এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জিহাদের অংশ হিসেবে তিনি আল্লাহর শত্রুকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তা'আলা আবু সুফিয়ানকে সৌভাগ্য দান করেছিলেন। তিনি তার অন্তরকে ইসলামের দিকে প্রসারিত করে দেন। ফলে তার রক্ত, তার জীবন রক্ষা পায়।
হুনাইনের যুদ্ধে মুশরিকরা অতর্কিতে মুসলিম বাহিনীর উপর আক্রমণ করে। ফলে মুসলিমরা হতবুদ্ধি হয়ে পালাতে থাকে। কেউ কারো দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিল না। এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ডান দিকে একটু সরে গিয়ে বলতে লাগলেন: 'হে লোকসকল, তোমরা যাচ্ছ কোথায়? আমার দিকে ফিরে এসো, আমি আল্লাহর রাসূল, আমি আব্দুল্লাহর পুত্র মুহাম্মাদ!' কিন্তু কেউ তার কথা শুনল না, বরং পলায়নকালে তাদের উটগুলো একটা আরেকটার উপরে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে অল্পসংখ্যক আনসার, মুহাজির এবং তার পরিবারের (আহলে বাইত) কয়েকজন সদস্য রয়ে গেল। আহলে বাইতের মধ্যে ছিলেন: আলী ইবনে আবি তালিব, আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস ইবনে আব্দিল মুত্তালিব, তার ভাই রাবীয়া ইবনে হারিস ইবনে আব্দিল মুত্তালিব, আব্বাস ইবনে আব্দিল মুত্তালিব এবং তার ছেলে ফযল ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমসহ আরও কয়েকজন। আর মুহাজিরদের মধ্যে ছিলেন: আবু বকর এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুম।
আবু কাতাদা রাযিয়াল্লাহু আনহু এই যুদ্ধে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অবস্থান সম্পর্কে এভাবে বর্ণনা করেছেন, 'আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে হুনাইনে যাই। আমরা যখন শত্রুদের মুখোমুখি হলাম, তখন মুসলিমরা কিছুটা বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিল। আমি দেখলাম, এক মুশরিক একজন মুসলমানের উপর চড়াও হয়ে তাকে প্রায় কাবু করে ফেলছে। আমি তখন পেছন দিক থেকে সেই মুশরিকের কাঁধের উপরে তরবরি চালিয়ে দিলাম। তার লৌহবর্ম ভেদ করে হাত কাটা পড়ল। লোকটি ঘুরে গিয়ে আমাকে এমনভাবে জাপটে ধরল যে আমি প্রায় মারা যাচ্ছিলাম। এরপর লোকটি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল, আমাকেও ছেড়ে দিল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে দেখা হতেই বললাম, 'লোকজনের কী হয়েছে?' তিনি বললেন, 'সবই আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা।' এরপরে মুসলিমরা ফিরে গেল।
এই যুদ্ধ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন,
لَقَدْ نَصَرَكُمُ اللَّهُ فِي مَوَاطِنَ كَثِيرَةٍ وَ يَوْمَ حُنَيْنٍ إِذْ أَعْجَبَتْكُمْ كَثْرَتُكُمْ فَلَمْ تُغْنِ عَنْكُمْ شَيْئًا وَ ضَاقَتْ عَلَيْكُمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ ثُمَّ وَلَّيْتُمْ مُّدْبِرِينَ অবশ্যই আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছেন বহু জায়গায় এবং হুনাইনের দিনে, যখন তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের উৎফুল্ল করেছিল, অথচ তা তোমাদের কোনো কাজে আসেনি। আর যমীন প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের উপর সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে পলায়ন করেছিলে।
মুমিনরা প্রায় পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়ার পরে আল্লাহ তাদের অনুশোচনা কবুল করলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ফিরে এসে তার চারপাশে জড়ো হওয়ার পরে আল্লাহ তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের বিজয় দান করলেন। আল্লাহ তাদেরকে আশ্বাস দিলেন এবং তার সেনাদলের জন্য সাহায্য পাঠালেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেছেন:
ثُمَّ أَنْزَلَ اللَّهُ سَكِينَتَهُ عَلَى رَسُولِهِ وَعَلَى الْمُؤْمِنِينَ وَأَنزَلَ جُنُودًا لَّمْ تَرَوْهَا وَعَذَّبَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَذَلِكَ جَزَاءُ الْكَافِرِينَ
তারপর আল্লাহ তাঁর পক্ষথেকে প্রশান্তি নাযিল করলেন তার রাসূলের উপর ও মুমিনদের উপর এবং নাযিল করলেন এমন সৈন্যবাহিনী যাদেরকে তোমরা দেখনি, আর কাফিরদেরকে শাস্তি দিলেন। আর এটা কাফিরদের কর্মফল।
হুনাইনের যুদ্ধের পরে মুসলিমরা মদীনায় ফিরে গেলেন। আল-জিরানা অতিক্রমের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহুর আলখাল্লার মধ্য থেকে মুঠি মুঠি রূপা তুলে বিলিয়ে দিচ্ছিলেন। এক লোক এসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলল, 'হে মুহাম্মাদ, পক্ষপাতমুক্ত থাকুন!' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'ধ্বংস হোক তোমার! আমি যদি পক্ষপাতমুক্ত না থাকি তবে আর কে থাকবে? আমি ন্যায়পরায়ণ না হলে তোমরা ধংস হয়ে যাবে।' উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে এই মুনাফিকের শিরোচ্ছেদ করতে দিন!' তিনি বললেন, 'আল্লাহ তা'আলা নিষেধ করেছেন। কারণ, লোকেরা বলবে আমি আমার সাথীদের হত্যা করছি। এই লোক আর তার সাথীরা কুরআন পড়ে কিন্তু তা তাদের গলার নিচে নামে না। তীর যেভাবে লক্ষ্যভেদ করে বেরিয়ে যায় তারাও ঠিক সেভাবে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। এখানে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অন্যরকম বৈশিষ্ট্য চিত্রিত হয়েছে : হারাম কোনোকিছু ঘটতে দেখলে তিনি কিছুতেই সহ্য করতে পারতেন না। লোকটা নবুয়তের পবিত্রতার ব্যাপারে সীমালঙ্ঘন করেছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখনই বলেছেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমাকে এই মুনাফিকের শিরোচ্ছেদ করতে দিন!' নবুয়াতের পবিত্রতার সীমালংঘনকারীর বিরুদ্ধে তিনি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
আল-জিরানায় থাকাকালীন প্রসিদ্ধ সাহাবী ইয়ালা ইবনে উমাইয়্যা আত- তামীমী উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপরে ওহী নাযিল হওয়া দেখার অনুরোধ জানালেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাতে সাড়া দেন। সাফওয়ান ইবনে ইয়ালা থেকে বর্ণিত আছে, ইয়ালা বলতেন, 'আমার খুব ইচ্ছা, আমি যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর ওহী নাযিল হওয়া দেখতে পেতাম। তিনি বললেন, 'আল-জিরানায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলখাল্লায় আবৃত অবস্থায় ছিলেন। কয়েকজন সাহাবীও তার সাথে বসে ছিলেন। জোব্বা পরে, সুগন্ধি ছড়িয়ে এক বেদুইন আসল। সে জিজ্ঞেস করল, 'হে আল্লাহর রাসূল, উমরা পালনের জন্য যদি কেউ জোব্বা পরে আর সুগন্ধি মেখে ইহরাম করে তবে তার ব্যাপারে আপনার কী মাসআলা?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ইয়ালাকে আসতে ইশারা করলেন। অতঃপর ইয়ালা এসে দেখলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে আর তিনি খুব দ্রুত দম ফেলছেন। কিছুক্ষণ পর্যন্ত এরকম চলতে থাকল। তার অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে এলে তিনি বললেন, 'সুগন্ধি তিনবারে ধুয়ে ফেলবে, আর জোব্বা খুলে ফেলে হজের সময় যা পরো তাই পরে উমরা করবে।'
তাবুক অভিযানের সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সম্পত্তির অর্ধেক সাদকা করে দেন। তিনি দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে রহমতের দোয়া চাইলেন। বর্ণিত আছে যে, আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: তাবুকের অভিযানের সময় লোকজন দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হয়েছিল। তারা বলল, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাদের উটগুলো জবাই করে মাংস খাওয়ার এবং চর্বি জমিয়ে রাখার অনুমতি দিন।' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুমতি দিলেন। তারপর উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এসে বললেন, 'এ কাজ করলে আরোহী পশুর সংখ্যা অনেক কমে যাবে। তার চেয়ে বরং তাদের বলুন অতিরিক্ত রসদ থাকলে তা নিয়ে আসুক।'
অতঃপর এক লোক একমুঠো শস্য আনল, আরেকজন আনল একমুঠো খেজুর, আবার কেউ আনল একটুকরা রুটি। এভাবে চামড়ার মাদুরের একাংশ খাবারে ভরে উঠল। এবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বরকতের জন্য দুআ করলেন এবং বললেন, 'তোমরা পাত্র ভরতে থাকো।' তারা তাঁবুতে রাখা সব পাত্র একে একে ভরতে লাগল। এবার পাত্র থেকে তারা খেতে লাগল। সবার খাওয়া শেষ হওয়ার পরেও পাত্রে অনেক খাবার রয়ে যায়। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। যে ব্যক্তি এই দু-টি বাক্যের প্রতি কোনো সন্দেহ না রেখেই তার রবের সাথে মিলিত হবে সে কখনই জান্নাত থেকে দূরে থাকতে পারে না।'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণের সময় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন আচরণ ছিল লক্ষ্যণীয়। যুদ্ধ অংশগ্রহণ করার ফলে তিনি অনেক কিছু শিখেছিলেন। এগুলো পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বদানে এবং দিক নির্দেশনা দিতে কাজে লাগে।

টিকাঃ
১৮৯. মানাকিবু আমীরিল মু'মিনীন ইমর ইবনে আল-খাত্তাব, ইবনে জাউযি, পৃ. ৮৯।
১৯০. আল-ফারুক মাআ আন-নাবি, ড. আতিফ লামাদা, পৃ. ৩২।
১৯১. আত-তাবাকাত, ইবনে সাদ, ৩/৩৯১, ৩৯২; সনদের ধারাবাহিকতা না থাকায় হাদীসটি দুর্বল।
১৯২. আস-সীরাহ আন-নাবাউয়িয়া, ইবনে হিশাম, ২/৩৮৮; সহীহ আত-তাওসীক, পৃ. ১৮৭
১৯৩. আল-খিলাফা ওয়া আল-খুলাফা আর রাশিদীন, আল-বাহনাসাউয়ি, পৃ. ১৫৪।
১৯৪. আল-বিদায়া ওয়া-আন-নিহায়া, ৩/২৯৮।
১৯৫. প্রাগুক্ত, ৩/৩১১।
১৯৬. আত-তারীখুল ইসলামী, আল-হুমাইদি, ৪/১৮১।
১৯৭. মুসনাদ, আহমাদ, হাদীস নং. ১৮২, আল মাউসূআহ আল-ফিকহিয়া। বুখারী এবং মুসলিম-এর শর্তমতে হাদীসের সনদ সহীহ।
১৯৮. সহীহ আস-সীরাহ আন-নাবাউয়িয়া, আল-আলি, পৃ. ২৫৯।
১৯৯. সহীহ আস-সীরাহ আন-নabauয়িয়া, আল-আলি, পৃ. ৩৬০।
২০০. আস-সীরাহ আন-নাবাউয়িয়া, আরাদ ওয়াকি ওয়া তাহলীল আহাদিস, ড. আলী মুহাম্মাদ আস-সাল্লাবী, পৃ. ৮৬৮।
২০১. সহীহ, বুখারী, আল-মাঘাযি, নং ৪০৪০; আস-সীরাহ আন-নবুওয়া, ২/৩৯২।
২০২. আস-সীরাহ আন-নাবাউয়িয়া আস-সাহীহা, ২/৩৯২।
২০৩. সহীহ আত-তাওসীক ফী সিরাহ ওয়া হায়াত আল-ফারুক, পৃ. ১৮৯।
২০৪. আস-সীরাহ আন-নবুওয়া আস-সহীহা, ২/৩৯২।
২০৫. প্রাগুক্ত, ২/৪০৯।
২০৬. আস-সিরাহ আন-নবুওয়া, ইবনে হিশাম, ২/৩৯২।
২০৭. আস-সিরাহ আন-নবুওয়া আস-সহীহা, ২/৪০৯।
২০৮. আত-তারবিয়্যাহ আল-কাইদিয়‍্যাহ, ৩/৪৬৩।
২০৯. প্রাগুক্ত, ৩/৪৬৩।
২১০. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৫৭১।
২১১. আস-সিরাহ আন-নাবাউয়িয়া, ইবনে হিশাম, ২/২২৮; আখবার উমর, পৃ. ৩৪।
২১২. মাঈন থেকে, আস-সিরাহ, আশ-শামি, পৃ. ৩৩৩।
২১৩. সহীহ, বুখারী, নং ৩০১১; তারীখ আত-তাবারি, ২/৬৩৪
২১৪. আস-সিরাহ আন-নাবাউয়িয়া, ইবনে হিশাম, ৩/৬৩৪।
২১৫. সুলহ আল-হুদায়বিয়া, বাশামীল, পৃ. ২৭০।
২১৬. আল কিয়াদা আল-আসকারিয়া ফী আহদ রাসূলুল্লাহ, পৃ. ৪৯৫।
২১৭. গাযওয়াত আল-হুদায়বিয়া, আবু ফারিস, পৃ. ১৩৪-৩৫।
২১৮. সহীহ আদ-তাওসীক ফী সীরাত ওয়া হায়াত আল-ফারুক, পৃ. ১৯১।
২১৯. মুখতাসার মিনহাজ আল-কাসিদীন, পৃ. ২৮৩; ফারাইদ আল-কালাম লিল খুলাফা, পৃ. ১৩৯।
২২০. তুরবা হিজাযের পূর্বদিকে একটি উপত্যকা এবং এটি নাজদের দিকে বিস্তৃত।
২২১. হিলাল ইবনে আমির আস-সাসাআ ইবনে মুয়াইবিয়া ইবনে বকর ইবনে হাওয়াযিন।
২২২. আত-তাবাকাত, ইবনে সাদ, ৩/২৭২।
২২৩. আস-সিরাহ আন-নবুওয়া, ইবনে হিশাম, ২/২২৮; আখবার উমর, পৃ. ৩৪।
২২৪. আল-ফারুক আল-কুয়াইদ, শীত খাত্তাব, পৃ. ১১৭-১১৮।
২২৫. আল-মাওসূআ আয-যাহাবিয়া মুসনাদ আহমাদ, নং ২০৩। এর সনদ হাসান।
২২৬. আস-সিরাহ আন-নবুওয়া, ইবনে হিশাম, ২/২৬৫; আখবার উমর, পৃ. ৩৭।
২২৭. বুখারী, আল মাঘাযি, হাদীস নং ৪২৭৪।
২২৮. আস-সিরাহ আন-নবুওয়া, ইবনে ফারিস, পৃ. ৪০৪।
২২৯. আত-তারীখুল ইসলামী, ৭/১৭৬, ১৭৭।
২০০. আস-সিরাহ আন-নবুওয়া, পৃ. ৫১৮-৫২০।
২০১. আল-ফারুক মাআ আন-নাবী, ড. আতীফ লামাযা, পৃ. ৪২।
২০২. আস-সিরাহ আন-নবুওয়া, ইবনে হিশাম, ২/২৮৯; আখবার উমর, পৃ. ৪১
২২৩. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪০৬৬, ৪০৬৭।
২৩৪. সূরা আত-তাওবা, ৯: ২৫।
২৩৫. সূরা আত-তাওবা, ৯: ২৬।
২৩৬. আল-জিরানা মক্কা থেকে নব্বই কি.মি. উত্তর-পূর্বে অবস্থিত।
২৩৭. এর দুটি অর্থ: হতে পারে, এর অর্থ তারা বুঝতে পারে না এবং এর তিলাওয়াতেও তাদের কোনো লাভ হয় না; অথবা, তাদের কোনো নেক আমল বা তিলাওয়াত কবুল হবে না।
২৩৮. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১০৬৩; বুখারী, হাদীস নং. ৩১৩৮।
২৩৯. সহীহ আত-তাওসীক ফী সিরাহ ওয়া হায়াত আল-ফারুক, পৃ. ২০০।
২৪০. মাহদুস সাওয়াব ফী ফাদাইল আমীরুল মুমিনীন উমর ইবনুল খাত্তাব, ২/৪০৮।
২৪১. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৭০০; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ১১৮০।
২৪২. তাবুক-ওয়াদি আল-কুরা এবং সিরিয়ার মধ্যবর্তী একটি জায়গার নাম।
২৪৩. সহীহ, মুসলিম, কিতাব আল-ঈমান, হাদীস নং ২৭, ইংরেজি থেকে অনূদিত; ভলিউম ১, পৃ. ২১, হাদীস নং, ৪২।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 রাসূল সা. এবং তার স্ত্রীদের মতবিরোধে উমরা রা.-এর আচরণ

📄 রাসূল সা. এবং তার স্ত্রীদের মতবিরোধে উমরা রা.-এর আচরণ


ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত, রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুজন স্ত্রী প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেছেন, তোমাদের অন্তর অন্যায়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছে বলে যদি তোমরা উভয়ে তওবা করো, তবে ভালো কথা।
আমি তাদের ব্যাপারে জানতে আগ্রহী ছিলাম। আমি একবার তার সাথে হজ করতে যাচ্ছিলাম। কিছুদূর গিয়ে তিনি একপাশে দাঁড়ালেন। আমি পানি নিয়ে তার খেদমতে লেগে গেলাম। তিনি ফারেগ হয়ে এলেন। তারপর তিনি হাত ধুয়ে অযু করতে বসলেন আর আমি তার জন্য পানি ঢেলে দিচ্ছিলাম। সুযোগ বুঝে আমি তখন আমার প্রশ্নটি করে ফেলি। তাকে বললাম, 'হে আমীরুল মুমিনীন, নবী আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন দুজন স্ত্রী প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেছেন?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আমি তোমার আচরণে অবাক হচ্ছি, ইবনে আব্বাস।' আয-যুহরি রহমুল্লাহি আলাইহির মতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিরক্ত হয়ে এ কথা বলেছিলেন। তিনি বললেন, 'আয়েশা এবং হাফসা।'
তিনি বলতে লাগলেন, 'মক্কায় থাকার সময় আমরা কুরাইশরা নারীদের ওপরে কর্তৃত্ব করতাম। আর মদীনায় এসে দেখি নারীরা পুরুষদের ওপরে খবরদারি করছে। আমাদের মেয়েরাও এখন এসব শিখছে। আল- আওয়ালির বনু উমাইয়া ইবনে যায়েদে আমার বাড়ি ছিল। আমি আমার স্ত্রীর সাথে রাগারাগি করছিলাম। একটু পরে আমাকে অবাক করে দিয়ে সে-ও পাল্টা জবাব দিতে লাগল। আমি বিরক্ত হচ্ছিলাম দেখে সে বলতে লাগল, 'আমার তর্ক করা দেখে আপনার ভালো লাগছে না, তাই না? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীরাও তো তার সাথে তর্ক করেন। একজন তো রাতের আগে সামনেই আসেন না।' তাই আমি হাফসার কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম, 'তুমি কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তর্ক কর?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' আবার বললাম, 'তোমাদের মধ্যে এমন কেউ আছে যে সারাদিন তার থেকে আলাদা থাকেন?' সে বলল, 'হ্যাঁ।' আমি বললাম, 'যারা এমন করেন তারা সকলেই বিপথে আছেন, ধ্বংসের পথে আছেন। তোমার কি মনে হয় না, তার ওপরে রাসূলুল্লাহ রাগ করেন বলে আল্লাহও তার ওপরে রাগ করেন? তাহলে তার ধ্বংস তো অনিবার্য। তুমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তর্ক করবে না, আর তার কাছে কোনো কিছু চাইবে না। আর তোমার প্রতিবেশী আয়েশা—তোমার চেয়ে বেশি সুন্দরী এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বেশি প্রিয় বলে মন খারাপ করবে না।' আমার একজন আনসার প্রতিবেশী ছিল। সে আর আমি পালা করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে যেতাম। ওহী নাযিল থেকে শুরু করে সব বিষয়ে তার সঙ্গে আমার তথ্যের আদান-প্রদান হতো। তখন গাসসানদের নিয়ে চারদিকে খুব কথা চলছিল। কারণ, আমাদের আক্রমণ করার জন্য তারা ঘোড়ায় নাল পরিয়ে তৈরি হচ্ছিল।
এক সন্ধ্যাবেলা আমার সেই প্রতিবেশী এসে আমার দরজা ধাক্কাতে শুরু করল। আমাকে ডাকছিল। বলতে লাগল, 'সর্বনাশ হয়েছে!' আমি বললাম, 'কী হয়েছে? গাসসানেরা এসে পড়েছে নাকি?' আমি জানতাম, এমন কিছু ঘটবে। সে বলল, 'তার চেয়েও বড় অঘটন ঘটেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন।' আমি বললাম, 'হাফসা শেষ, সে ধ্বংস হয়ে গেছে। আমি জানতাম এমন কিছু হবে।'
ফজরের নামায পড়ে আমি হাফসার সাথে দেখা করতে গেলাম। আমি ঘরে ঢুকে দেখি, সে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি তোমাকে তালাক দিয়েছেন?' সে বলল, 'আমি জানি না। তিনি এই ছোট ঘরটাতে একাকী বসে আছেন।' আমি তার খাদেমের কাছে গিয়ে বললাম, 'গিয়ে বলো যে, উমর দেখা করার অনুমতি চাচ্ছে।' খাদেম ফিরে এসে বলল, 'আমি আপনার নাম বলেছি, তিনি কিছু বলেননি।' আমি মিম্বরে গিয়ে দেখি সেখানে লোকজন জড়ো হয়ে গেছে। কেউ কেউ কাঁদছিল। কিছুক্ষণ বসে থাকলাম, দেখি আমার মন আরও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমি খাদেমের কাছে গিয়ে আবারও অনুমতি নিয়ে আসার অনুরোধ করলাম। সে এবারও একই কথা বলল। আমি চলে যাচ্ছিলাম। তখন খাদেম পেছন থেকে ডাক দিয়ে বলল, 'আপনি ভেতরে যান। তিনি আপনাকে অনুমতি দিয়েছেন।' আমি ভেতরে গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি কি আপনার স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন?' তিনি মাথা তুলে বললেন, 'না।' আমি বলে উঠলাম, 'আল্লাহু আকবার। ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনার কি মনে আছে, আমরা কুরাইশেরা নারীদের ওপরে কর্তৃত্ব করতাম। আর এখানে মদীনায় এসে দেখি নারীরা পুরুষেদের ওপরে কর্তৃত্ব করছে। আমাদের মেয়েরাও এগুলো শিখছে। আমি আমার স্ত্রীর সাথে একদিন রাগারাগি করেছি। একটু পরে আমাকে সে-ও পাল্টা জবাব দিতে লাগল। আমি বিরক্ত হচ্ছিলাম দেখে সে বলতে লাগল, 'আমার তর্ক করা দেখে আপনার ভালো লাগছে না, তাই না? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীরাও তো তার সাথে তর্ক করেন। একজন তো রাতের আগে সামনেই আসেন না।' আমি বললাম, 'যারা এমন করেন তারা সকলেই বিপথে আছেন, ধ্বংসের পথে আছেন। তারা কি জানে না যে, ওপরে রাসূলুল্লাহ রাগ করেন, আল্লাহও তার ওপরে রাগ করেন? তাহলে তার ধ্বংস তো অনিবার্য। এবার তিনি হাসতে লাগলেন।'
তখন আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি হাফসাকে বলেছি যে, প্রতিবেশী আয়েশা তার চেয়ে বেশি সুন্দর এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বেশি প্রিয় বলে যেন মন খারাপ না করে।' তিনি আবারও হাসলেন। আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি কি বসতে পারি?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' আমি সেই ঘরের চারদিকে তাকালাম। আল্লাহর কসম, সেখানে তিন টুকরো কাঁচা চামড়া ছাড়া আর কিছু ছিল না।
আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি আল্লাহ তা'আলার দুআ করুন। তিনি যেন আপনার উম্মতকে বেশি বেশি নেয়ামত দান করেন। পারসিক আর বাইজান্টাইনেরা তো আল্লাহর ইবাদত করে না। তারপরও আল্লাহ তা'আলা তাদের কত নেয়ামত দিয়েছেন।' এবার তিনি সোজা হয়ে বসলেন। বললেন, 'হে খাত্তাবের পুত্র, তোমার কি সন্দেহ হচ্ছে? আল্লাহ কেবল এই দুনিয়াতে তাদের সবকিছু দিচ্ছেন।' আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার ভুল হয়ে গেছে। আপনি আমার মাগফিরাতের জন্য দুআ করুন।' অতঃপর তিনি তখন কসম করে বলতে লাগলেন যে, এক মাস ধরে স্ত্রীদের সাথে দেখা করেন না। আল্লাহ তা'আলা তাগাদা দেবার আগ পর্যন্ত তিনি খুব অসন্তুষ্ট হয়ে ছিলেন।'

টিকাঃ
২৭৮. সূরা আত-তাহরিম, ৬৬: ৪।
২৭৯. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪৯১৩।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 তার কিছু গুণাবলী

📄 তার কিছু গুণাবলী


গুণাবলীর দিক দিয়ে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাম চলে আসে। নবী-রাসূলগণ এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরে তিনি শ্রেষ্ঠ মানব। আহলে সুন্নাত ওয়া জামাত তো বটেই মুসলিমমাত্রই তার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে। তার গুণাবলী নিয়ে একাধিক হাদীস এবং বর্ণনা পাওয়া যায়।
২.৪.১। তার ঈমান, জ্ঞান এবং দ্বীনী দায়বদ্ধতা
আব্দুল্লাহ ইবনে হিশাম তার ঈমান প্রসঙ্গে বলেছেন: আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। তিনি উমর ইবনুল খাত্তাবের হাত ধরে ছিলেন। উমর তাকে বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আমার পরে আপনাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি।' তিনি বললেন, 'না, যার হাতে আমার জীবন সেই পবিত্র সত্তার কসম, যতক্ষণ তুমি আমাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালো না বাসবে।' এবার উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'না, আল্লাহর কসম, আমি আপনাকে আমার নিজের চাইতেও বেশি ভালোবাসি।' তিনি বললেন, 'এবার (ঠিক আছে), হে উমর।'
আর তার জ্ঞানের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমি ঘুমাচ্ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম, আমার জন্য এক পেয়ালা দুধ আনা হলো। আমার আঙ্গুলের ডগা থেকে দুধ গড়িয়ে না পড়া পর্যন্ত আমি পান করতে লাগলাম। অতঃপর বাকিটুকু উমরকে দিলাম।' সাহাবায়ে কেরাম বললেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, এই স্বপ্নের কী তাবীর (ব্যাখ্যা) করবেন?' তিনি বললেন, '(এর অর্থ হচ্ছে) জ্ঞান।' জ্ঞান ও দুধ, পরস্পর রূপক। কারণ, দু-টিই অত্যন্ত উপকারী, দু-টিই স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। দুধ শরীরে পুষ্টি যোগায়, আর জ্ঞান পুষ্টি যোগায় অন্তর- আত্মায়। এই হাদীসে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জ্ঞানের দিকে ইশারা করা হয়েছে।
নবীদের স্বপ্ন মূলত এক ধরনের ওহী। তাই এর আক্ষরিক ব্যাখ্যা হয় না। এখানে জ্ঞান বলতে কুরআন এবং সুন্নাহর অনুকরণে মেনে রাষ্ট্রশাসনের জ্ঞান বোঝানো হয়েছে। আর এ কথা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জন্য প্রযোজ্য। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর তুলনায় তিনি দীর্ঘদিন রাষ্ট্রশাসনের সুযোগ পেয়েছেন। আবার উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর তুলনায় জনগণ তাকে ঘিরে একতাবদ্ধ এবং অনুগত ছিল। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামল খুব সংক্ষিপ্ত ছিল, তাছাড়া তিনি খুব বেশি ভূখণ্ড জয় করতে পারেন নি। এগুলো ছিল মানুষের মধ্যে বিভেদ আর দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ। অন্য দিকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামল দীর্ঘ ছিল এবং তিনি বিস্তৃত অঞ্চল জয় করেছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি সফলভাবে সব বিভেদ, দ্বন্দ্ব দূর করে সফলতার সাথে রাষ্ট্রপরিচালনা করেছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দীর্ঘ খেলাফতের সময় কেউ তার বিরোধিতা করেনি। উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামলে আরও কিছু অভিযান সংঘটিত হয়েছে। তবে নানা মত আর ধারণা ছড়িয়ে পড়ায় তিনি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো রাষ্ট্রপরিচালনা করতে পারেননি। তাকে মানুষের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হতে হয়। তার পরে এলেন আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু। তার সময়ে মত-পার্থক্য, বিরোধ এবং পরীক্ষা চরম আকার ধারণ করেছিল।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দ্বীনী দায়বদ্ধতা প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম অনেক মানুষ। কারও পোশাক বুক পর্যন্ত লম্বা, কারওটা আরও খাটো। আর উমরকে দেখলাম লম্বা পোশাক পরা। তার পোশাক এত লম্বা ছিল যে তা মাটিতে গড়াচ্ছিল।' তারা জানতে চাইলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, এর ব্যাখ্যা কী হবে?' তিনি বললেন, '(এর অর্থ) দ্বীনী দায়বদ্ধতা।'
২.৪.২। মানুষ তো মানুষ, শয়তানও তাকে ভয় পেত
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস বর্ণনা করেছেন: উমর ইবনুল খাত্তাব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে দেখা করার অনুমতি চাইলেন। তখন বেশ কয়েকজন কুরাইশ নারী তার সাথে কথা বলছিল, প্রশ্নের পর প্রশ্ন করছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে তাদের কণ্ঠ জোরে শোনা যাচ্ছিল। উমর যখন ভেতরে প্রবেশের অনুমতি চেয়ে পাঠান, তখন তারা দৌড়ে পালাল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। তিনি ঘরে ঢুকে দেখলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঠোঁটে মৃদু হাসি। তিনি দুআ করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আল্লাহ আপনাকে সব সময় হাসি-খুশি রাখুন।' নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'আমি এই নারীদের কাণ্ড দেখে অবাক হচ্ছি। তোমার আওয়াজ পেতেই সব দৌড়ে পালাল।' উমর বললেন, 'আপনি তাদের ভয়ের অধিক হকদার, ইয়া রাসূলাল্লাহ।' তারপরে তিনি বললেন, 'হে নিজের দুশমনেরা! তোমরা রাসূলকে ভয় না পেয়ে আমাকে ভয় পাচ্ছ?' তারা জবাব দিল, 'জি। কারণ, আপনি রাসূলুল্লাহর চেয়ে বেশি কঠোর আর একরোখা।' তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হে খাত্তাবের পুত্র, যে পবিত্র সত্তার হাতে আমার জীবন তার কসম, শয়তানও তোমাকে দেখলে আরেক রাস্তা ধরে।'
এই হাদীসে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আরেকটি অনবদ্য গুণের কথা বলা হয়েছে। তিনি সত্যকে এমনভাবে আঁকড়ে থাকতেন যে শয়তানও তাকে কোনোভাবে প্রভাবিত করতে পারত না।
ইবনে হাজার উল্লেখ করেছেন: তার এই গুণের কারণে তার ওপরে শয়তানের কোনো প্রভাব পড়ত না। তার মানে এই নয় যে, তিনি একেবারে ত্রুটিমুক্ত ছিলেন। এখানে বরং বোঝানো হয়েছে যে, শয়তান কখনো উমরের সাথে এক রাস্তায় হাঁটত না। তবে শয়তান যে ওয়াসওয়াসা দিত না, তা নয়। এই হাদীস থেকে মনে হতে পারে যে, শয়তান যেহেতু উমরের সাথে এক রাস্তায় হাঁটতো না, তার মানে তাকে ওয়াসওয়াসাও দিত না; সুতরাং তিনি হয়তো শয়তান থেকে মুক্ত মানুষ ছিলেন এবং তার কোনো ভুল হতো না। আসলে তা নয়।'
তাবারানী তার আদ-আওসাত কিতাবে হাফসা রাযিয়াল্লাহু আনহুমের এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন: উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম হওয়ার পর থেকে শয়তান তার সাথে দেখা করেনি। তার কাছ থেকে শুধু পালিয়ে বেড়ায়।' এখানে আসলে দ্বীন আঁকড়ে থাকার প্রবণতা এবং সত্যকে গুরুত্ব দেওয়াকে এভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
ইমাম নববী বলেছেন, 'এই হাদীসের মূল বক্তব্য বুঝতে হবে। বলা হয়েছে শয়তান তাকে দেখে পালাত।' ফযল ইবনে ইয়ায উল্লেখ করেছেন, 'এই হাদীসের উপমা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, উমর শয়তানের পথ ছেড়ে সত্য পথ ধরেছিলেন। সুতরাং শয়তান যা পছন্দ করে, তিনি সেগুলোর উল্টোটা করতেন।' ইবনে হাজার বলেছেন, 'প্রথম ব্যাখ্যাটি বেশি গ্রহণযোগ্য।'
২.৪.৩। উম্মতের মধ্যে মুহাদ্দাস (যাদের অন্তরে সত্য কথা বা ইলহাম নাযিল হয়)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'পূর্ববর্তী উম্মতের মধ্যে কিছু লোক ছিল হাদ্দাস (যাদের অন্তরে সত্য কথা নাযিল হয়)। আমার উম্মতের মধ্যে যদি এমন কেউ থেকে থাকে তবে সে ব্যক্তি উমর।'
এই হাদীসে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আরেকটি উল্লেখযোগ্য গুণ প্রকাশ পেয়েছে। এখানে মুহাদ্দাস শব্দটির অর্থ নিয়ে উলামায়ে কেরামের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা যায়। কারও মতে, এর অর্থ হলো এমন ব্যক্তি যে স্বতস্ফূর্তভাবে সত্য কথা বলে অথবা যিনি নবী না হলেও তার সাথে ফেরেশতারা কথা বলেন। অর্থাৎ, ফেরেশতাদের সাথে সরাসরি দেখা না হলেও তাদের অন্তরে অন্তরে কথা হয়। কেউ কেউ মুহাদ্দাসের প্রতিশব্দ হিসেবে বিশেষ অনুভূতি বুঝিয়েছেন।
ইবনে হাজারের মতে, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় কুরআনের সাথে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অনেক কথা মিলে গিয়েছিল। আবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পরে নিয়তগুলে অনেক কাজ সঠিকভাবে করতে পেরেছিলেন। তার এই গুণ অন্য কোনো সাহাবির মধ্যে দেখা যায়নি। তার মানে এই নয় যে তিনি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর তুলনায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন।'
ইবনুল কয়্যিমের মতে, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অনবদ্য গুণ ছিল বলে তিনি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তুলনায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন, এমন ভাবা যাবে না। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর এই গুণ না থাকাটাও তার জন্য ভালো ছিল। কারণ, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সোহবতে থেকে এত কিছু শিখেছিলেন যে, তার জন্য কোনো ইলহাম বা কোনো বিশেষ অনুভূতির দরকার পড়েনি।'
২.৪.৩। 'এত শক্তির সাথে কাউকে এভাবে পানি তুলতে দেখিনি'
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'ঘুমের মধ্যে আমি দেখলাম, আমি একটি কূপ থেকে পানি তুলছি। আবু বকর এসে দুই-এক বালতি পানি তুললেন। তার উত্তোলনে দুর্বলতা ছিল। আল্লাহ তাকে মাফ করুন। এরপরে উমর ইবনুল খাত্তাব এলেন আর তার হাতে বালতিটি বিশাল আকার ধারণ করল। আমি তার মতো এত শক্তির সাথে কাউকে এভাবে পানি তুলতে দেখিনি। লোকেরা তৃপ্তি নিয়ে পানি পান করল, তাদের বসে থাকা উটগুলোকেও পানি পান করালো।'
এই হাদীসে স্পষ্টভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে। 'উমর ইবনুল খাত্তাব এলেন আর তার হাতে বালতিটি বিশাল আকার ধারণ করল'-এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শক্তি বলতে নেতৃত্বের কথা বলেছেন। 'উটগুলোকেও পানি পান করালো'-এর অর্থ হলো, লোকেরা তাদের উটগুলোকে পানি দিয়ে তাদের বিশ্রামের জায়গায় ফেরত গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই স্বপ্ন নিঃসন্দেহে আবু বকর এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমের খেলাফত, সংগ্রাম, নানা বিষয় পরিচালনা এবং জনকল্যাণের দিকে ইশারা করেছে। খেলাফতের সময় আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু অনেকদিন ধরে আহলে রিদ্দার মুরতাদদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। এক-সময় লড়াইয়ে ক্ষান্ত দিয়ে তিনি ইসলাম প্রচার করতে শুরু করেন। তার খেলাফতের মেয়াদ ছিল দু-বছর আর কয়েক মাস। তা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলা তার এই অল্প সময়ে অনেক বরকত দিয়েছেন। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরে এলেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু। তার সময়ে ইসলাম সবচেয়ে বেশি প্রচার-প্রসার লাভ করেছিল। শরীয়তের আইন প্রয়োগ এবং নতুন পরিস্থিতির জন্য নতুন নতুন আইন প্রণয়নও হয়েছে তার সময়ে। তার খেলাফত অনেক দীর্ঘ হওয়ায় জনসাধারণ অনেক উপকৃত হয়েছিল। তিনি নতুন নতুন শহর প্রতিষ্ঠা করেছেন, রাষ্ট্রীয় কার্যাবলী গুছিয়ে নেন। অনেক অভিযানের কারণে বিপুল পরিমাণে যুদ্ধলব্ধ সম্পদও তার সময়ে সংগ্রহ করা হয়েছিল।
'তার মতো এত শক্তির সাথে কাউকে এভাবে পানি তুলতে দেখিনি'- এর অর্থ হচ্ছে, কোনো নেতাকে এভাবে পরিশ্রম করতে আর এত বেশি আয় করতে দেখিনি। 'লোকেরা তৃপ্তি নিয়ে পানি পান করল'-এই উক্তির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আল-কদি আইয়্যাদ বলেছেন, 'এখানে আবু বকর এবং উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমের চিন্তাশক্তি, পরিচালনা, মুসলিমদের স্বার্থে কাজ করা বোঝানো হয়েছে, এমন বলা হয়। আমার মতে, এখানে বিশেষ ভাবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বোঝানো হয়েছে। 'লোকেরা তৃপ্তি নিয়ে পানি পান করল'- অর্থাৎ, আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুরতাদদের বিরুদ্ধে লড়ে মুসলিমদের একজোট করলেন। তার এই প্রচেষ্টা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্য কাজ সহজ হয়ে যায় এবং তার জন্য সুফল বয়ে আনে।
২.৪.৫। উমর রা.-এর রক্ষণশীল মনোভাব এবং রাসূল সা.-এর কাছ থেকে জান্নাতে প্রাসাদ লাভের সুখবর
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমি (স্বপ্নে) দেখলাম জান্নাতে প্রবেশ করছি। সেখানে আবু তুলায়হার স্ত্রী, রুমায়সাকেও দেখেছি। সেখানে কারও পায়ের আওয়াজ পেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'কে?' সে বলল, 'আমি বেলাল।' আমি একটি প্রাসাদও দেখলাম, তার দরবারে একজন নারীকে দেখা গেল। আমি জানতে চাইলাম, 'এটি কার প্রাসাদ?' তারা বলল, 'উমরের।' আমি ভেতরে ঢুকে দেখতে চাইলাম। তখন হঠাৎ করে তোমার রক্ষণশীল মনোভাবের কথা মনে পড়ল। তখন উমর বলে উঠল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার বাবা-মা আপনার ওপরে কুরবান হোক। আমি কি আপনার সাথেও এমন আচরণ করব?'
আরেকটি বর্ণনামতে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমি (স্বপ্নে) দেখলাম জান্নাতে প্রবেশ করছি, আর সেখানে প্রাসাদের পাশে একজন নারী অযু করছিল। আমি জানতে চাইলাম, 'এটি কার প্রাসাদ?' তারা বলল, 'উমরের।' তখন হঠাৎ করে তোমার রক্ষণশীল মনোভাবের কথা মনে পড়ল। তাই আমি ফিরে গেলাম।' উমর কাঁদতে লাগল আর বলল, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি কি আপনার সাথে এমন আচরণ করতে পারি?'
হাদীস দু-টিতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জান্নাতে প্রাসাদ-লাভের সুসংবাদ দিয়েছেন। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার কাছে তার উঁচু মর্যাদার কথাও এখানে প্রকাশ পেয়েছে।
২.৪.৬। আবু বকর রা.-এর পরে তিনি ছিলেন রাসূল সা.-এর সবচেয়ে প্রিয়
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন যে-তিনি একবার জানতে চাইলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে?' তিনি বললেন, 'আয়েশা।' আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, পুরুষদের মধ্যে কে?' তিনি বললেন, 'তার পিতা।' আমি আবারও বললাম, 'তারপরে কে?' তিনি বললেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব।' এর পরে তিনি আরও কয়েকজনের নাম বললেন।
২.৪.৭। উমর রা.-কে জান্নাতের সুসংবাদ
আবু মুসা আল-আশআরী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে মদীনার এক বাগানে ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি এসে দরজা খুলে দিতে বলল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'দরজা খুলে দাও আর তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।' আমি দরজা খুলে আবু বকরকে দেখলাম। আমি তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুসংবাদ দিলাম। তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন। তারপর আরেকজন লোক এসে দরজা খুলে দিতে বলল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'দরজা খুলে দাও আর তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।' আমি দরজা খুলে এবার উমরকে দেখলাম। আমি তাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুসংবাদ দিলাম। তিনিও আল্লাহর প্রশংসা করলেন। আবারও কেউ এলো আর দরজা খুলে দিতে বলল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'দরজা খুলে দাও আর তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।' আমি দরজা খুলে উসমানকে পেলাম। তাকেও যথারীতি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুসংবাদ দিলাম। তিনিও আল্লাহর প্রশংসা করলেন আর বললেন, 'আমি আল্লাহর কাছেই সাহায্য আশা করি।'

টিকাঃ
২৮০. আকীদাত আহলুস-সুন্নাহ ওয়া আল-জামাআ ফী আস-সাহাবা আল-কারিম, ড. নাসির ইবনে আলী আইদ হাসান আশ-শায়খ, ১/২৪৩।
২৮১. সহীহ আল মুসনাদ ফী ফাদাইল আস-সাহাবা, ৬৬।
২৮২. ফাতহুল বারি, ৭/৪৬।
২৮৩. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৯০।
২৮৪. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৬৮২। সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৮৬।
২৮৫. আকীদাত আহলুস-সুন্নাহ ওয়া আল-জামাআ ফী আস-সাহাবা আল-কারিম, ১/৩৪৮।
২৮৬. ফাতহুল বারি, ৭/৪৭-৪৮; শারহ আন-নবুওয়া, ১৫/১৬৫-১৬৭।
২৮৭. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৬৮৯। সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৯৮।
২৮৮. ফাতহুল বারি, ৭/৫০; শারহ আন-নাবাউয়ি, ১৫/১৬৬। আকীদাত আহলুস-সুন্নাহ ওয়া আল-জামাআ ফী আস-সাহাবা আল-কারিম, ১/২৫১।
২৮৯. ফাতহুল বারি, ৭/৫০; শারহ আন-নাবাউয়ি, ১৫/১৬৬।
২৯০. মিফতা দারুস-সাআদা, ১/২৫৫।
২৯১. সে সময় মুসলমানেরা কথায় কথায় 'আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করুন' বাক্যটি খুব ব্যবহার করতেন। আবু বকরের রা. এর বেলায়ও এ কথা প্রযোজ্য।
২৯২. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৯৩।
২৯৩. শারহ আন-নবুওয়া, ১৫/১৬১-১৬২।
২৯৪. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৯৪; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৪৭৬, ৬৬২০।
২৯৫. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৯৫।
২৯৬. আকীদাত আহলুস-সুন্নাহ ওয়া আল-জামাআ ফী আস-সাহাবা আল-কারিম, ১/২৪৫।
২৯৭. আল-ইহসান ফী সহীহ ইবনে হিব্বান, ১৫/২০৯; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৮৪; সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৪১০০।
২৯৮. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ৩৬৯৩; সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৪০৩।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 রাসূল সা.-এর অসুস্থতা এবং তার ইন্তেকালের দিনে উমর রা.-এর আচরণ

📄 রাসূল সা.-এর অসুস্থতা এবং তার ইন্তেকালের দিনে উমর রা.-এর আচরণ


২.৫.১। রাসূল সা.-এর অসুস্থতার সময় উমর রা.-এর আচরণ
আব্দুল্লাহ ইবনে যামআ বলেছেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, বেলাল নামায পড়ানোর জন্য তাকে ডাকতে এসেছিল। তিনি বললেন, 'অন্য কাউকে নামায পড়াতে বলো।' তাই আমি বাইরে বের হলাম। লোকজনের মধ্যে উমরকে দেখা গেল। আমি আবু বকরকে পেলাম না। তার কাছে গিয়ে বললাম, 'উমর, উঠে এসো আর লোকদের নামায পড়াও।' তিনি উঠে দাঁড়ালেন, তাকবির দিলেন। তার খুব দরাজ গলা ছিল। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কণ্ঠ শুনে বলতে লাগলেন, 'আবু বকর কোথায়? না আল্লাহ তা কবুল করবেন, আর না মুসলিমরা।' তিনি আবু বকরকে ডাকতে পাঠালেন। এদিকে তিনি আসার আগেই উমরের নামায পড়ানো শেষ। পরে আব্দুল্লাহ ইবনে যামআকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন, 'তোমার ধ্বংস হোক! ইবনে যামআ, এ তুমি কী করলে? তুমি আমাকে যখন নামায পড়াতে বলেছ, আমি তখন ভাবলাম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয়তো এই নির্দেশ দিয়েছেন। তা না হলে আমি নামায পড়াতাম না।' আমি বললাম, 'আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ নির্দেশ দেননি। আমি আবু বকরকে না পেয়ে তোমাকে এই কাজ করতে বলেছি। কারণ, সেখানে যারা ছিল তাদের মধ্যে তোমাকে আমার সবচেয়ে যোগ্য মনে হয়েছে।'
ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যথা তীব্র হয়ে উঠল। তখন তিনি বললেন, 'আমার কাছে কাগজ নিয়ে এসো। তোমরা যাতে পথভ্রষ্ট না হয়ে যাও তার জন্য কিছু নির্দেশনা লিখে দিতে চাচ্ছি। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এখন খুব কষ্ট পাচ্ছেন। আর আমাদের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট।' এবার এই নিয়ে তর্কবিতর্ক শুরু হয়ে গেল। সবার গলাও চড়তে লাগল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমরা আমার কাছে থেকে সরে যাও। এই অবস্থায় আমার সামনে তর্ক করো না।' ইবনে আব্বাস বলতে বলতে বের হলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার বক্তব্য লেখা থেকে বাধা দেওয়া হলো, এ আমাদের চরম দুর্ভাগ্য।'
উলামায়ে কেরাম এই হাদীসটিকে খুব সহজভাবে বর্ণনা করেছেন। মুসলিমের ওপরে মন্তব্য করতে গিয়ে ইমাম নববী রহ. এই হাদীসের বেশ দীর্ঘ এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন: লক্ষ্যণীয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন নিখুঁত মানুষ। সুস্থ বা অসুস্থ কোনো অবস্থাতেই তিনি শরীয়তের কোনো আইন বিকৃত বা পরিবর্তন করতেন না, এটাই স্বাভাবিক। আল্লাহ-প্রদত্ত কোনো আয়াতের অবিকল প্রচার করেছেন। যেখানে ব্যাখ্যার দরকার হয়নি তিনি ব্যাখ্যা করেননি, যা যতটুকু প্রচারের নির্দেশ পেয়েছেন তার ততটুকুই মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তবে তিনি রোগ-ব্যাধিমুক্ত ছিলেন না, এ কথাও ঠিক। শারীরিক অসুবিধার জন্য তো তার মর্যাদার কোনো কমতি হয়নি। আর তিনি এর প্রকোপে প্রতিষ্ঠিত আইনেও কোনো পরিবর্তন আনতেন না। তিনি যখন যাদু-টোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তখন মনে করেছিলেন, যা করা উচিত নয় তিনি হয়তো তেমন কিছু করে ফেলেছেন। ওই অবস্থাতেও তিনি প্রতিষ্ঠিত কোনো আইনের বিরুদ্ধে কিছু করেননি। তাই এই মূল বিষয় নিয়ে আমদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই, ওই বিষয়টি সবার মাথায় রাখতে হবে। আলেমগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের লেখার বিষয় নিয়ে বিভিন্ন মত দিয়েছেন। কেউ কেউ মনে করেন, তিনি দ্বন্দ্ব আর ঝামেলা এড়ানোর জন্য হয়তো খেলাফতের দায়িত্ব নির্দিষ্ট কাউকে দেবার কথা উল্লেখ করতে চেয়েছিলেন। আবার কারও মতে তিনি সবচেয়ে জরুরী আইন-কানুন সংক্ষিপ্তাকারে উল্লেখ করতে চেয়েছেন। যাতে সেগুলো নিয়ে পরবর্তী সময়ে কারও কোনো দ্বিমত না থাকে। তিনি লিখিত আকারে হয়তো এ জন্য প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন, যেন তার উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা যায়, অথবা এও হতে পারে—তিনি এভাবে কাজ করার জন্য ওহীর মাধ্যমে নির্দেশ পেয়েছিলেন। পরে হয়তো তিনি ভেবেছেন যে, সেভাবে না করলেই ভালো, অথবা হতে পারে আগের নির্দেশমতো কাজ না করার জন্য তিনি ওহী পেয়েছিলেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর দ্বীনী জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং সূক্ষ্মদর্শীতা নিয়ে উলামায়ে কেরামের কারও কোনো দ্বিমত নেই। ফলে তার ওই মুহূর্তের আচরণ নিয়েও কারও সন্দেহ নেই। তিনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি এমন কিছু লিখে ফেলেন যা করা দুঃসাধ্য, তবে শাস্তি যেমন অনিবার্য তেমনই পরবর্তী সময়ে তা নিয়ে ইজতিহাদ করারও সুযোগ থাকবে না। তাই তিনি বলেছিলেন যে, 'আল্লাহর কিতাবই আমাদের জন্য যথেষ্ট।' কারণ, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَبِ مِنْ شَيْءٍ আমি কোনো কিছু লিখতে ছাড়িনি।
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণ করে দিলাম।
তিনি জানতেন, আল্লাহ তার দ্বীনকে নিঁখুত করে দিয়েছেন এবং উম্মত পথভ্রষ্টতা থেকে নিরাপদ। তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বাড়তি কষ্ট করা থেকে বিরত রাখতে চেয়েছিলেন। ইবনে আব্বাস কিংবা অন্য যে সাহাবীগণ এ বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন তাদের তুলনায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অনেক বেশি সূক্ষ্মদর্শী ছিলেন। আল-খাত্তাবি বলেছেন, 'এখানে যেন কেউ না ভাবে যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ভেবেছিলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভুল করতে পারেন; বরং তিনি যখন দেখলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যথা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে এবং মৃত্যু আসন্ন তখন এমন অবস্থায় তার সাথে কথা বললে মনে হতে পারে তিনি ঠিকমতো কথা বলার অবস্থায় নেই। তাছাড়া এমন আচরণ নিয়ে মুনাফেক লোকজন সমালোচনা শুরু করবে। সাহাবায়ে কেরাম যখন কোনো কিছু নিয়ে তার সাথে আলোচনা করতেন, তখন তিনি খুব স্পষ্টভাবে সমাধান দিতেন। তিনি কুরাইশদের সাথে হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় এভাবে কথা বলেছেন। আর যখন কোনো বিষয়ে তিনি আগেই স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে ফেলতেন তখন তা নিয়ে আর কোনো আলোচনার প্রয়োজন ছিল না।'
'আল্লাহর কিতাব আমাদের জন্য যথেষ্ট'-এই কথা তিনি তর্কে লিপ্ত সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন। এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে তিনি কিছু বলেননি। শায়খ আলী আল-তানতাবী এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, 'উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে দীর্ঘদিন ছিলেন। তার সাহচার্যে থেকে তিনি এভাবে বক্তব্য দিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। তিনি এভাবে মন্তব্য করতেন; কারণ, তিনি জানতেন, তার এ কাজের অনুমতি আছে। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার মতামত জানানোর ধরন, অনুরোধ করার ধরন এবং কোনো কিছু চাওয়ার ধরন আমাদের কাছে স্পষ্ট। তার কথা সঠিক মনে হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা যেমন গ্রহণ করতেন আবার ভুল হলেও তা শুধরে দিতেন। সুতরাং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কাগজ চাইলেন তখন তিনিও তার স্বভাবমতো মন্তব্য করলেন যে, আল্লাহর কিতাব আমাদের জন্য যথেষ্ট। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও একমত পোষণ করলেন। কারণ, তিনি লেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে ঠিকই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে থামিয়ে দিয়ে তার কাজ শেষ করতেন।'
২.৫.২। রাসূল সা.-এর ইন্তকালের দিনে উমর রা.-এর আচরণ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের খবরে মানুষের মধ্যে বিষাদের ছায়া নেমে আসে। এমন খবর অনেক মুসলমানের জন্য প্রচন্ড আঘাতের ছিল। বিশেষ করে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তা মানতে পারছিলেন না। বিখ্যাত সাহাবী আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুর মুখে শোনা যাক:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের খবর শুনে উমর ইবনুল খাত্তাব দাঁড়িয়ে গেলেন। বলতে লাগলেন, 'মুনাফিকেরা দাবি করছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেছেন। তিনি ইন্তেকাল করেননি; বরং মুসা ইবনে ইমরানের আলাইহিস সালামের মতো তিনি তার রবের সাথে দেখা করতে গেছেন। তিনিও চল্লিশ দিন ধরে সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। তখন লোকেরা বলাবলি করেছিল যে, তিনি ইন্তেকাল করেছেন। তিনি ঠিকই ফিরে এসেছিলেন। আল্লাহর কসম, মুসা আলাইহিস সালামের মতো তিনিও ফিরে আসবেন। যে বলবে 'রাসূল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকাল করেছেন' আমি তার হাত-পা কেটে ফেলব।'
এই খবর শুনে আবু বকর মসজিদের দোরগোড়ায় এসে নামলেন। উমর তখনো সবার সাথে কথা বলে যাচ্ছিলেন। তিনি কোনোদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে সোজা আয়েশার ঘরে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিছানায় শোওয়া। ঘরের একাট কোণে ডোরাকাটা জোব্বা দিয়ে তার শরীর ঢাকা ছিল। কাপড় সরিয়ে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা মোবারকে চুমু দিলেন। আর বললেন, 'আমার বাবা-মা আপনার জন্য কুরবান হোক। আল্লাহ আপনার জন্য যে মৃত্যু নির্ধারণ করে রেখেছিলেন, আপনি তার স্বাদ পেয়েছেন। এর পরে আপনার আর মৃত্যু হবে না।' তিনি কাপড় দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেহারা মোবারক ঢেকে দিলেন। বাইরে গিয়ে দেখেন-উমর তখনো কথা বলে যাচ্ছেন। তাকে বললেন, 'শান্ত হও উমর, আমার কথা শোনো!' উমর কথা বলেই গেলেন। উমরকে থামাতে না পেরে তিনি বাধ্য হয়ে উপস্থিত লোকজনের সামনে কথা বলা শুরু করলেন। তখন সবাই তার দিকে ঘুরে শুনতে লাগল। আবু বকর আল্লাহ তা'আলার গুণ এবং প্রশংসা করে বলতে লাগলেন: 'হে লোকসকল, যারা মুহাম্মাদের ইবাদত করতে তারা জেনে রাখো তিনি ইন্তেকাল করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করো, তারা জেনে রাখো, আল্লাহ চিরঞ্জীব। কেবল তার মৃত্যু নেই।' অতঃপর তিনি এই আয়াত তিলাওয়াত করতে লাগলেন:
আর মুহাম্মাদ একজন রাসূল বৈ তো নয়! তার পূর্বেও বহু রাসূল অতিবাহিত হয়ে গেছেন। তাহলে কি তিনি য মৃত্যুবরণ করেন অথবা নিহত হন তবে তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুত কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছু ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ আল্লাহ তাদের সওয়াব দান করবেন।
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আল্লাহর কসম, মনে হলো সেদিনই যেন এই আয়াত নাযিল হয়েছে। তার আগে যেন কেউ এই আয়াত সম্পর্কে জানত না। আবু বকরের কাছ থেকে শুনে তারা এই কথা বলাবলি করতে লাগল।' আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলে উঠলেন, 'আল্লাহর কসম, আবু বকর যখন এই আয়াত তিলাওয়াত করল, তখন আমার মাথা ঘোরাতে লাগল। আমার পা নিয়ন্ত্রণ হারাল, আর আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। আর আমি জানলাম যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আসলেই ইন্তেকাল করেছেন।'

টিকাঃ
২৯৯. সুনান, আবু দাউদ, হাদীস নং ৪৬৬০। এর সনদ সহীহ।
৩০০. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ১১৪।
৩০১. সূরা আনআম, ৬: ৩৮।
৩০২. সূরা মায়িদা, ৫: ৩।
৩০৩. সহীহ আস-সীরাহ আন-নবুওয়া, পৃ. ৭৫০, শারহ মুসলিম থেকে উদ্ধৃত, ১১/৯০।
৩০৪. শারহ আন-নবুওয়া, ১১/৯০; ফাসল আর কিতাব ফী মাওয়াকিফ আল-আসহাব, আল-ঘারসি, পৃ...
৩০৫. আখবার উমর, পৃ. ৩৬।
৩০৬. আস-সীরাহ আন-নবুওয়া, ইবনে আবি শায়বা, ২/৫৯৪।
৩০৭. সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১৪৪।
৩০৮. সহীহ, বুখারী, হাদীস নং ১২৪২; তারীখ আত-তাবারি, ৩/১৯৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00