📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 কুরআনের আয়াতের সাথে উমর রা.-এর মতামত মিলে যাওয়া, ওহী নাযিলের কারণ সম্পর্কে তার জ্ঞান এবং কিছু আয়াতে তার তাফসীর

📄 কুরআনের আয়াতের সাথে উমর রা.-এর মতামত মিলে যাওয়া, ওহী নাযিলের কারণ সম্পর্কে তার জ্ঞান এবং কিছু আয়াতে তার তাফসীর


১.২.১। কুরআনের আয়াতের সাথে উমর রা.-এর মতামত মিলে যাওয়া
সাহাবীদের মধ্যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন দুর্দান্ত সাহসী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোনো সিদ্ধান্ত তিনি না বুঝতে পারলে প্রশ্ন করতে ভয় পেতেন না। প্রয়োজন বোধ করলে তিনি পরিপূর্ণ সততা এবং স্বচ্ছতার সাথে তার মতামত ও ইজতিহাদ প্রকাশ করতেন। কুরআনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তার খুব স্পষ্ট ধারণা ছিল। ফলে দেখা যেত, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতামত কখনো কখনো কুরআনের কিছু আয়াতের সাথে মিলে গেছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আল্লাহ তা'আলা—আমার রবের সাথে তিনবার আমার মতের মিল ঘটেছিল। আমি একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, মাকামে ইবরাহীমকে ইবাদতের জায়গা বানাচ্ছেন না কেন?' তারপরে আল্লাহ তা'আলা ওহী নাযিল করলেন। আরেকবার আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনার কাছে ভালো-মন্দ সব ধরনের লোক আসে। আপনি উম্মুল মুমিনীনদের হিজাবে আবৃত থাকতে বলেন না কেন?' অতঃপর আল্লাহ তা'আলা হিজাবের আয়াত নাযিল করলেন।
একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার কয়েকজন স্ত্রীকে তিরস্কার করেছেন, এমন কথা কানে এলো। তাই আমি গিয়ে বললাম, 'আপনারা এগুলো বন্ধ না করলে কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তার রাসূলকে আপনাদের চেয়ে উত্তম স্ত্রী দান করবেন।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন স্ত্রীর কাছে গেলাম। তিনি আমাকে বললেন, 'হে উমর, আপনার কি মনে হয় না, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার স্ত্রীদের বোঝাতে সক্ষম? তাহলে আপনি কেন তাদের সাথে কথা বলতে গেলেন?' তারপর আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতগুলো নাযিল করেন:
عَلَى رَبُّكَ إِنْ طَلَّقَكُنَّ أَنْ يُبْدِلَةَ أَزْوَاجًا خَيْرًا مِنْكُنَّ مُسْلِمَةٍ مُّؤْمِنَتٍ قنِتْتٍ نَبْتٍ عُبِدَتٍ سَحْتٍ ثَيْبَةٍ وَ ابْكَارًا
যদি নবী তোমাদের সকলকে পরিত্যাগ করেন, তবে সম্ভবত তার পালনকর্তা তাকে তার পরিবর্তে দিবেন তোমাদের চাইতে উত্তম স্ত্রী, যারা হবেন আজ্ঞাবহ, ঈমানদার, নামাযী তওবাকারিণী, ইবাদতকারিণী, রোযাদার, অকুমারী ও কুমারী।
১.২.২। মুনাফিকদের জানাযা না পড়া
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই মৃত্যুবরণ করলে তার জানাযা পড়ানোর জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলা হলো। তিনি সেখানে গেলেন এবং তার জানাযা পড়ানোর জন্য দাঁড়ালেন। আমিও গেলাম। তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, 'ইয়া রাসুলাল্লাহ, আপনি কি আল্লাহ তা'আলার শত্রু, এই আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের জানাযা পড়বেন? সে তো অমুক অমুক দিনে এই এই বলেছিল?' আমি তার কুকীর্তির ফিরিস্তি দিয়ে গেলাম। ততক্ষণে আমি অনেক বেশি বলে ফেলেছি। এর আগ পর্যন্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখে মৃদু হাসি লেগে ছিল। এবার তিনি বললেন, 'উমর, তুমি আমার কাছ থেকে সরে যাও। আমাকে পছন্দ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, আমি আমারটা পছন্দ করেছি। আমাকে বলা হয়েছে,
اسْتَغْفِرْ لَهُمْ أَوْ لَا تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ إِنْ تَسْتَغْفِرْ لَهُمْ سَبْعِينَ مَرَّةً فَلَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَهُمْ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَسِقِينَ
তুমি তাদের জন্য ক্ষমা, প্রার্থনা কর আর না করো। যদি তুমি তাদের জন্য সত্তর বারও ক্ষমা প্রার্থনা কর, তথাপি কখনোই তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। তা এজন্য যে, তারা আল্লাহকে এবং তাঁর রসূলকে অস্বীকার করেছে। বস্তুতঃ আল্লাহ না-ফারমানদেরকে পথ দেখান না।
যদি আমি জানতে পারতাম যে, সত্তরবারের বেশি ক্ষমা চাইলে তাকে ক্ষমা করা হবে তাহলে আমি সত্তরবারের বেশি ক্ষমা চাইতাম।' অতঃপর তিনি জানাযা পড়ালেন এবং তার দাফন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কবরের কাছাকাছি ছিলেন। আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে আমার বেয়াদবির কথা ভেবে অবাক হচ্ছিলাম। কারণ, রাসূলুল্লাহ তো ভালো জানেন। এই ঘটনার অল্প কিছুদিনের মধ্যে এই আয়াত নাযিল হলো:
وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُمْ مَّاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُوْلِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَسِقُونَ
আর তাদের মধ্য থেকে কারও মৃত্যু হলে তার উপর কখনও নামায পড়বেন না এবং তার কবরে দাঁড়াবেন না। তারা তো আল্লাহর প্রতি অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছে এবং রাসূলের প্রতিও। বস্তুত তারা না-ফরমান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে।
এই ঘটনার পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর কখনো মুনাফিকদের জানাযা পড়াননি, আর আল্লাহ তা'আলা তাদের জান কবজের আগে তিনি তাদের কবরের পাশে অবস্থান করেননি।
১.২.৩। বদরের বন্দীরা
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, বদরের দিন আল্লাহ তা'আলা মুশরিকদের পরাজিত করলেন। তাদের মধ্যে সত্তর জন নিহত হলো আর সত্তরজন বন্দী হলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর, উমর, উসমান এবং আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুমের সাথে আলোচনায় বসলেন। তিনি আমাকে বললেন, 'আল-খাত্তাবের পুত্র, তোমার কী মত?' আমি বললাম, 'আমার মনে হয়, আপনি আমার হাতে অমুক এবং অমুককে—উমরের আত্মীয়দের ছেড়ে দেওয়া উচিত। আমি তাদের গর্দান নামিয়ে দেব। আর আকীলকে ছেড়ে দেবেন আলীর হাতে। সে তার গর্দান নামাবে। আর এই এই ব্যক্তিকে হামযার কাছে ছেড়ে দিন। আল্লাহ তা'আলা জানবেন, সর্দার হোক অথবা নেতা, মুশরিকদের জন্য আমাদের মনে বিন্দুমাত্র মায়া নেই।' আমার কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালো লাগেনি। তিনি তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ গ্রহণ করলেন। পরেরদিন আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে দেখা করলাম। দেখি, তিনি এবং আবু বকর বসে বসে কাঁদছেন। আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, কোন জিনিস আপনাকে এবং আপনার সাথীকে কাঁদাচ্ছে? কান্না এলে আমিও আপনার সাথে কাঁদতে বসব। আর কান্না না এলে কান্নার অভিনয় করব।' রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'তোমার সাথীরা মুক্তিপণ গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছিল। ফলে আমাকে তোমাদের শান্তি দেখানো হয়েছে। এই গাছের চেয়েও কাছে থেকে সে দৃশ্য দেখেছি।' আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করেছেন,
مَا كَانَ لِنَبِيٌّ أَنْ يَكُونَ لَهُ أَسْرَى حَتَّىٰ يُثْخِنَ فِي الْأَرْضِ ۚ تُرِيدُونَ عَرَضَ الدُّنْيَا وَاللَّهُ يُرِيدُ الْآخِرَةَ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ﴿٦٨﴾ لَوْلَا كِتَابٌ مِنَ اللَّهِ سَبَقَ لَمَسَّكُمْ فِيمَا أَخَذْتُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
নবীর পক্ষে উচিত নয় বন্দীদিগকে নিজের কাছে রাখা, যতক্ষণ না দেশময় প্রচুর রক্তপাত ঘটাবে। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর, অথচ আল্লাহ চান আখেরাত। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরাক্রমশালী হেকমতওয়ালা। যদি একটি বিষয় না হতো যা পূর্ব থেকেই আল্লাহ লিখে রেখেছেন, তাহলে তোমরা যা গ্রহণ করছ সেজন্য বিরাট আযাব এসে পৌঁছত।
সেই বছর তাদের সত্তরজন নিহত হয়েছিল আর সাহাবীরা পালিয়ে যান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাঁত মোবারক শহীদ হয়, তার শিরস্ত্রাণ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়, তার চেহারা মোবারক রক্তে ভিজে যায়। আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত নাযিল করলেন,
أَوَلَمَّا أَصَابَتْكُمْ مُصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُمْ مِثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّىٰ هَٰذَا ۖ قُلْ هُوَ مِنْ عِنْدِ أَنْفُسِكُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
যখন তোমাদের উপর একটি মুসীবত এসে পৌঁছল, অথচ তোমরা তার পূর্বেই দ্বিগুণ কষ্টে পৌঁছে গিয়েছ, তোমরা বলেছিলে, 'এটা কোত্থেকে আসল'? (তাদেরকে) বলো, 'ওটা তোমাদের নিজেদের নিকট থেকেই এসেছে', নিশ্চয় আল্লাহ সকল বস্তুর উপর ক্ষমতাবান। (সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৬৫)
১.২.৪। ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাওয়া নিয়ে উমর রা.-এর দুআ
কোনো এক দুপুরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ডাকার জন্য একজন আনসার খাদেমকে পাঠালেন। সে যখন বাড়িতে প্রবেশ করল তখন তিনি ঘুমাচ্ছিলেন, তার শরীরের কিছু অংশ উন্মুক্ত ছিল। তিনি দুআ করলেন, 'ইয়া আল্লাহ, ঘুমের সময় আমাদের ঘরে লোকদের প্রবেশ করতে নিষেধ করে দিন।' আরেকটি বর্ণনামতে, তিনি বলেছিলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, কোথাও প্রবেশের আগে অনুমতি চাওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা যদি আমাদের কিছু আদেশ-নিষেধ দিতেন!' আল্লাহ তা'আলা নাযিল করলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِيَسْتَأْذِنُكُمُ الَّذِينَ مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ وَ الَّذِينَ لَمْ يَبْلُغُوا الْحُلُمَ مِنْكُمْ ثَلثَ مَرَّتٍ مِنْ قَبْلِ صَلوةِ الْفَجْرِ وَ حِينَ تَضَعُونَ ثِيَابَكُمْ مِّنَ الظَّهِيرَةِ وَ مِنْ بَعْدِ صَلوةِ الْعِشَاءِ ثَلَثُ عَوْرَاتٍ لَكُمْ لَيْسَ عَلَيْكُمْ وَلَا عَلَيْهِمْ جُنَاحٌ بَعْدَهُنَّ طُوفُونَ عَلَيْكُمْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَعْضٍ كَذلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْأَيْتِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
হে মুমিনগণ, তোমাদের দাসদাসীরা এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্ত-বয়স্ক হয়নি তারা যেন তিন সময়ে তোমাদের কাছে অনুমতি গ্রহণ করে, ফজরের নামাযের পূর্বে, দুপুরে যখন তোমরা বস্ত্র খুলে রাখ এবং এশার নামাযের পর। এই তিন সময় তোমাদের দেহ খোলার সময়। এ সময়ের পর তোমাদের ও তাদের জন্য কোনো দোষ নেই। তোমাদের একে অপরের কাছে তো যাতায়াত করতেই হয়, এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ বিবৃত করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
১.২.৫। মদ নিষিদ্ধকরণের জন্য উমর রা.-এর দুআ
আল্লাহ তা'আলা যখন এই আয়াতগুলো নাযিল করলেন:
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ قُلْ فِيهِمَا إِثْمٌ كَبِيرٌ وَ مَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَ إِثْمُهُمَا أَكْبَرُ مِنْ نَفْعِهِمَا وَيَسْأَلُونَكَ مَا ذَا يُنْفِقُونَ قUL الْعَفْوَ كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْأَيْتِ لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ *
তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্য উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়। আর তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, কী তারা ব্যয় করবে? বলে দাও, নিজেদের প্রয়োজনীয় ব্যয়ের পর যা বাঁচে তাই খরচ করবে। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য নির্দেশ সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা চিন্তা করতে পার।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু দুআ করলেন, 'ইয়া আল্লাহ, মদের বিষয়টা সবার জন্য পরিষ্কার (বোঝার মতো) করে দিন।' তখন সূরা নিসার এই আয়াত নাযিল হলো,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَقْرَبُوا الصَّلوةَ وَ أَنْتُمْ سُكْرَى حَتَّى تَعْلَمُوا مَا تَقُولُونَ وَلَا جُنُبًا إِلَّا عَابِرِي سَبِيلٍ حَتَّى تَغْتَسِلُوا وَإِنْ كُنْتُمْ مَّرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِنْكُمْ مِّنَ الْغَابِطِ أَوْ لَمَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَفُوًا غَفُورًا
হে ঈমানদারগণ, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাতের কাছেও যেও না, যখন নিজের উচ্চারিত বাক্যের অর্থ নিজেই বুঝতে সক্ষম নও- এ অবস্থায় অথবা গোসল জরুরী হলে তা সমাপ্ত না করে সালাতের জন্য দণ্ডায়মান হয়ো না। কিন্তু মুসাফির অবস্থার কথা স্বতন্ত্র। যদি তোমরা অসুস্থ হয়ে থাক কিংবা সফরে থাক অথবা তোমাদের মধ্য থেকে কেউ যদি প্রস্রাব-পায়খানা থেকে এসে থাকে কিংবা নারী গমন করে থাকে এবং পানি না পাওয়া যায় তাহলে পাক-পবিত্র মাটির অন্বেষণ কর, তদ্বারা তোমাদের মুখমণ্ডল ও হস্তসমূহ মাসেহ কর; নিশ্চয়ই আল্লাহ মার্জনাকারী, ক্ষমাশীল।
নামাযে ইকামতের (নামায শুরুর সাথে সাথেই যে আহবান করা হয়) সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘোষক চিৎকার করে বলতেন, কোনো মদ্যপ লোক যেন নামায পড়তে না আসে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে তার সামনে এই আয়াত তিলাওয়াত করা হলো। তখন তিনি দুআ করেছিলেন, তিনি বললেন, 'ইয়া আল্লাহ, মদের বিষয়টা সবার জন্য পরিষ্কার (বোঝার মত) করে দিন।' অতঃপর সূরা আল-মায়িদার আয়াত নাযিল হলো। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ডেকে এই আয়াতও তিলাওয়াত করা হলো। তার সামনে যখন এই আয়াতগুলো এলো :
إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَنُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَ الْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَ الْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَ عَنِ الصَّلَوةِ ۚ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ
শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদের বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখনো কি নিবৃত্ত হবে?
তিনি বলে উঠলেন, 'আমরা নিবৃত হয়েছি! আমরা নিবৃত হয়েছি!' সুতরাং, এই আয়াত থেকে : অতএব, তোমরা এখনো কি নিবৃত্ত হবে?' মদ্যপানের ওপরে নিষেধাজ্ঞা ধীরে ধীরে এসেছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বুঝতে পেরেছিলেন যে, নিষেধাজ্ঞার রূপক হিসেবে এই প্রশ্ন করা হয়েছে। কারণ, গতানুগতিক ভঙ্গিতে নিষেধের চেয়ে প্রশ্নটা অনেক বেশি শক্তিশালী এবং বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল। ভাষা এবং প্রেক্ষিত অনুযায়ী এটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে এই আয়াত মূলত নিষেধাজ্ঞা।
১.২.৬। ওহী নাযিলের কারণ সম্পর্কে তার জ্ঞান
কথোপকথনের দিন থেকে শুরু করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকাল পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করেছিলেন। আয়াত নাযিলের কারণসহ তিনি কুরআন মুখস্থ করেন। তিনি মুসলিম হওয়ার আগে নাযিল হওয়া আয়াতগুলো কেবল সাধারণ-ভাবেই মুখস্থ করেছিলেন।
বলা বাহুল্য, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার ইসলামী জীবদ্দশায় বহু আয়াত নাযিলের কারণ সম্পর্কে খুব ভালো জ্ঞান রাখতেন। কেননা, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তিনি সরাসরি তার কাছে শিক্ষালাভ করেন, কুরআনের কোনো অংশ বুঝতে না পারলে তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে জেনে নিতেন। তার সামনে একটু একটু করে কুরআন নাযিল হয়েছিল। ফলে আয়াত নাযিলের কারণও তার জানা ছিল। এ জন্য বিষয়টি তার নখদপর্ণে ছিল।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কারণেও একাধিক আয়াত নাযিল হয়েছিল। আলেমদের ঐকমত্য থেকে জানা যায়, এর মধ্যে কতগুলো মক্কায় নাযিল হয়েছিল বলে আলেমগণ একমত। কতগুলো নাযিল হয়েছিল মদীনায়। কতগুলো আয়াত নাযিলের স্থান-কাল-পাত্র সম্পর্কে তিনি একদম সঠিকভাবে তথ্য দিতে পারতেন। যেমন, তিনি এই আয়াত সম্পর্কে বলেছেন,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَ أَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম।
'আল্লাহর কসম, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপরে এই আয়াত নাযিলের দিনটি আমার মনে আছে। এবং এই আয়াত কখন নাযিল হয়েছিল তাও আমি ঠিকভাবে জানি। আরাফায় এক জুমআবারের সন্ধ্যায় নাযিল হয়েছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-একক আবার সমবেতভাবে-বেশ কিছু আয়াত নাযিলের প্রত্যক্ষ কারণ ছিলেন, যেখানে আল্লাহ বলেছেন,
أَجَعَلْتُمْ سِقَايَةَ الْحَاجِ وَعِمَارَةَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ كَمَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَ الْيَوْمِ الْآخِرِ وَجْهَدَ فِي سَبِيلِ اللهِ لَا يَسْتَوْنَ عِنْدَ اللَّهِ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّلِمِينَ الَّذِينَ آمَنُوا وَهَاجَرُوا وَجْهَدُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ أَعْظَمُ دَرَجَةً عِنْدَ اللَّهِ وَ أُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ يُبَشِّرُهُمْ رَبُّهُمْ بِرَحْمَةٍ مِّنْهُ وَ رِضْوَانٍ وَ جَنْتٍ لَّهُمْ فِيهَا نَعِيمٌ مُقِيمٌ خَلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا إِنَّ اللَّهَ عِنْدَةً أَجْرٌ عَظِيمٌ
হাজীদের জন্য পানি সরবরাহ এবং মসজিদুল হারামের রক্ষণাবেক্ষণ করাকে তোমরা কি তাদের পুণ্যের সমজ্ঞান কর, যারা আল্লাহ ও আখেরাতে ঈমান আনে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করে? আল্লাহর নিকট এগুলো সমতুল্য নয়। আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না। যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে, আর আল্লাহর পথে নিজদের মাল ও জান দিয়ে জিহাদ করেছে, আল্লাহর কাছে তারা বড়ই মর্যাদাবান আর তারাই সফলকাম। তাদের প্রতিপালক তাদের সংবাদ দিচ্ছেন, স্বীয় দয়া ও সন্তোষের এবং জান্নাতের, যেখানে আছে তাদের জন্য স্থায়ী সুখ-শান্তি। সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট আছে মহাপুরস্কার।
আস-সহীহ থেকে বর্ণিত: একজন লোক বলল, 'মুসলিম হওয়ার পরে আমি মসজিদুল হারামের দেখাশোনা ছাড়া কোনো কাজ না পেলেও আমার কিছু আসে যায় না।' আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা হলো সবচেয়ে উত্তম কাজ।' উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মিম্বরের কাছে জোরে কথা বলো না। নামায শেষ হোক, আমি তাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করব।' অতঃপর তিনি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন এবং আল্লাহ তা'আলা আলোচ্য আয়াত নাযিল করলেন। এখানে বলা হয়েছে যে, মসজিদুল হারামের দেখাশোনা করা, হজ, উমরা, তাওয়াফ ও হজযাত্রীদের পানি পান করানো থেকে ঈমান ও জিহাদই উত্তম। এজন্যই আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'আমার কাছে একরাত আল্লাহ তা'আলার ওয়াস্তে সীমান্ত পাহারা দেওয়া, হজরে আসওয়াদের পাশে শবে কদরের নামাযের চেয়েও প্রিয়।'
১.২.৭। কিছু আয়াত সম্পর্কে নবী সা.-কে উমর রা.-এর জিজ্ঞাসা
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বিভিন্ন আয়াত সম্পর্কে জানতে চাইতেন। আবার অন্যান্য সাহাবায়ে কেরামও আয়াতের তাৎপর্য শিখতে আসতেন। তখন তিনি একাধারে সব আত্মস্থ করে নিতেন। যাতে তালেবে ইলমদের শেখাতে পারেন।
বর্ণিত আছে যে, ইয়ালা ইবনে উমইয়াহ বলেছেন: আমি উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, وَإِذَا ضَرَبْتُمْ فِي الْأَرْضِ فَلَيْسَ عَلَيْكُمْ جُنَاحٌ أَنْ تَقْصُرُوا مِنَ الصَّلوةِ إِنْ خِفْتُمْ أَنْ يَفْتِنَكُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنَّ الْكَافِرِينَ كَانُوا لَكُمْ عَدُوًّا مُّبِينًا যখন তোমরা কোনো দেশ সফর কর, তখন নামাযে কিছুটা হ্রাস করলে তোমাদের কোনো গোনাহ নেই, যদি তোমরা আশংকা কর যে কাফেররা তোমাদের উত্ত্যক্ত করবে। নিশ্চয় কাফেররা তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।
কিন্তু লোকজন তো এখন নিরাপদ।' উমর বললেন, 'আমারও একই কথা মনে হয়েছিল। তাই আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বলেছেন, 'এটা আল্লাহর তরফ থেকে তোমাদের জন্য এক অনন্য দান, সুতরাং তোমরা তা গ্রহণ করো।'
আবার উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুকে নিম্নোক্ত আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, وَ إِذْ أَخَذَ رَبُّكَ مِنْ بَنِي آدَمَ مِنْ ظُهُورِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَ أَشْهَدَهُمْ عَلَى أَنْفُسِهِمْ أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَى شَهِدْنَا ۚ أَنْ تَقُولُوا يَوْمَ الْقِيمَةِ إِنَّا كُنَّا عَنْ هَذَا غُفِلِينَ *
আর স্মরণ করো, যখন তোমার রব বনী-আদমের পৃষ্ঠদেশ হতে তাদের বংশধরকে বের করলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজদের উপর সাক্ষী করলেন যে, 'আমি কি তোমাদের রব নই'? তারা বলল, 'হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম।' যাতে কিয়ামতের দিন তোমরা বলতে না পার যে, নিশ্চয় আমরা এ বিষয়ে অনবহিত ছিলাম।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এই আয়াত সম্পর্কে জানতে চাইলে তাকে বলতে শুনেছি, 'আল্লাহ তা'আলা আদমকে সৃষ্টি করলেন, তারপর আল্লাহ ডানহাত দিয়ে তার (আদমের) পিঠ ঘষলেন। এরপর সেখান থেকে তার বংশধরদের নিয়ে আসলেন। আল্লাহ তা'আলা বললেন, আমি এদেরকে জান্নাতের জন্য তৈরী করেছি এবং তারা জান্নাতীদের মতোই আমল করবে। অতঃপর তিনি বামহাত দিয়ে তার পিঠ ঘষলেন। সেখান থেকে তার আরও বংশধর নিয়ে আসলেন। বললেন, আমি এদের জাহান্নামের ন্য তৈরী করেছি এবং তারা জাহান্নামীদের মত কাজ করবে।' একজন বলে ফেলল, 'হে আল্লাহর রাসূল, তাহলে আর চেষ্টা করে লাভ কী?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'যদি আল্লাহ কোনো লোককে জান্নাতের জন্য তৈরী করে থাকেন, তাহলে তিনি তাকে জান্নাতীদের ন্যায় কাজ করার সুযোগ দেবেন যতক্ষণ না সে জান্নাতী হিসেবেই মৃত্যুবরণ করে এবং পরিণতিতে তাকে জান্নাতে দাখিল করা হবে। আবার যদি আল্লাহ কোনো লোককে জাহান্নামের জন্য তৈরী করে থাকেন, তাহলে তিনি তাকে জাহান্নামীদের ন্যায় কাজ করার সুযোগ দিবেন যতক্ষণ না সে জাহান্নামী হিসেবেই মৃত্যুবরণ করে এবং পরিণতিতে তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করানো হবে।'
আল্লাহ যখন এই আয়াত নাযিল করলেন, سَيُهْزَمُ الْجَمْعُ وَيُوَلُّونَ الدُّبُرَ এই সংঘবদ্ধ দল তো শীঘ্রই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে।
তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে কেউ একজন জিজ্ঞেস করল, 'সংখ্যায় কত হলে পালানো যাবে? আর সংখ্যায় কত হলে পরাজিত হবে?' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'বদরের দিনে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তার ঢাল হতে দৃঢ়চিত্তে দাঁড়িয়ে এই আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনলাম : سَيُهْزَمُ الْجَمْعُ وَيُوَلُّونَ الدُّبْرَ﴿। তারপর আমি এই আয়াতের অর্থ বুঝতে পারলাম।'
১.২.৮। উমর রা.-এর তাফসীর
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কুরআনের আয়াত নিয়ে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতেন। অতঃপর তাকে যখন এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, শপথ সেই বাতাসের যা ধূলাবালি উড়ায়, তিনি বললেন, 'এর অর্থ হলো, বাতাস। আমি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে না শুনতাম তাহলে কখনও বলতাম না।' আরেকবার তাকে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, অতঃপর, পানির বোঝা বহনকারী, তিনি বললেন, 'এখানে মেঘের কথা বলা হয়েছে। আমি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে না শুনতাম তাহলে কখনও বলতাম না। তাকে যখন এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, আর যা ধীর ও শান্ত গতিতে বয়ে চলে, তিনি বললেন, 'এটার মানে হচ্ছে জাহাজ। আমি যদি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে না শুনতাম তাহলে কখনও বলতাম না।' তাকে যখন এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, আর যারা কর্ম বণ্টন করে, তিনি বললেন, 'এখানে ফেরেশতাদের কথা বলা হয়েছে। আমি যদি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে না শুনতাম তাহলে কখনও বলতাম না।'
কুরআনের তাফসীর করার জন্য উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিজস্ব পদ্ধতি ছিল। তিনি যদি জানতেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো আয়াতের তাফসীর করেছেন তাহলে তিনি তা অনুসরণ করতেন। কারণ, এটাই সর্বোত্তম পন্থা। আমরা উপর্যুক্ত ঘটনার একটা বাস্তব উদাহরণ দিই। যদি তিনি কখনো কোনো ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাফসীর না জানতেন তাহলে অন্যান্য জ্ঞানী সাহাবী যেমন: ইবনে আব্বাস, উবায় ইবনে কাব, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, মুয়ায রাযিয়াল্লাহু আনহুমের শরণাপন্ন হতেন।
একদিন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের বললেন, যে আয়াতটি নাযিল হয়েছে সে ব্যাপারে আপনারা কী ভাবছেন:
أَيَوَدُّ أَحَدُكُمْ أَنْ تَكُونَ لَهُ جَنَّةٌ مِنْ نَخِيلٍ وَأَعْنَابٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ لَهُ فِيهَا مِنْ كُلِّ الثَّمَرَاتِ وَأَصَابَهُ الْكِبَرُ وَلَهُ ذُرِّيَّةٌ ضُعَفَاءُ
فَأَصَابَهَا إِعْصَارٌ فِيْهِ نَارٌ فَاحْتَرَقَتْ كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ
তোমাদের কেউ কি কামনা করে, তার জন্য আঙুর ও খেজুরের এমন একটি বাগান থাকবে, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদ-নদী, সেখানে তার জন্য থাকবে সব ধরনের ফল-ফলাদি, আর বার্ধক্য তাকে আক্রান্ত করবে এবং তার জন্য থাকবে দুর্বল সন্তান-সন্ততি। অতঃপর বাগানটিতে আঘাত হানল ঘূর্ণিঝড়, যাতে রয়েছে আগুন, ফলে সেটি জ্বলে গেল? এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জন্য আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা চিন্তা কর।
তারা বললেন, 'আল্লাহ তা'আলা ভালো জানেন।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রেগে বললেন, 'বলুন, আমরা জানি অথবা আমরা জানি না।' ইবনে আব্বাস বললেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, এই ব্যাপারে আমার কিছু ধারণা আছে বলে মনে হচ্ছে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'ভাতিজা, বলো এবং নিজেকে ছোট করো না।' ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এটা হচ্ছে কিছু কাজের উপমা।' উমর জিজ্ঞেস করলেন, 'কোন কাজ?' ইবনে আব্বাস বললেন, 'কিছু কাজ।' তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'এটা হচ্ছে একজন ধনী ব্যক্তির উপমা, যে আল্লাহর আনুগত্য করার জন্য খুব চেষ্টা করত। আল্লাহ তারপর তার কাছে শয়তানকে পাঠালেন। তার সব ভালো আমল শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে পাপে লিপ্ত ছিল। অন্য বর্ণনা অনুসারে, ইবনে আব্বাস বলেছেন, 'এখানে কৃতকর্মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আদম সন্তানের বয়স হয়ে গেলে দুনিয়াতে সন্তান-সন্ততি ভরা সংসারের প্রয়োজন বোধ করে। আর আদম সন্তানকে যখন পুনরুত্থিত করা হবে তখন সে নেক আমলের প্রয়োজন বোধ করবে।' উমর বললেন, 'তুমি সঠিক কথাই বলেছ, ভাতিজা। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এমন আরও অনেক আয়াতের তাফসীর করেছেন:
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ أُولَبِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَبِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তারই সান্নিধ্যে ফিরে যাব। তারা সে সমস্ত লোক, যাদের প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হেদায়েতপ্রাপ্ত।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'কী উত্তম পুরস্কার আর কেমন বাড়তি লাভ। এখানে তিনি পুরস্কার বলতে রহমত এবং ক্ষমা আর বাড়তি লাভ বলতে সঠিক পথের নির্দেশনা বুঝিয়েছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এক ব্যক্তিকে এই আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনলেন :
يَأَيُّهَا الْإِنْسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ
হে মানুষ কীসে তোমাকে তোমার মহামহিম পালনকর্তা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করল?
তিনি বললেন, 'এর অর্থ, অজ্ঞতা। আরেকটি আয়াত :
وَإِذَا النُّفُوسُ زُوجَتْ
যখন আত্মাসমূহকে যুল করা হবে।
তিনি এর তাফসীর করলেন, 'বদকার বদকারের সাথে, নেককার নেককারের সাথে।'
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا
মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো-আন্তরিক তওবা।
তিনি এর তাফসীর করলেন, ‘(এর মানে) অনুশোচনা করা এবং পাপ কাজে আবার ফিরে না যাওয়া—পরিপূর্ণ তওবার জন্য এটাই প্রয়োজন। একদিন উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু এক সন্ন্যাসীর আস্তানার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাকে ডাকলেন, ‘সন্ন্যাসী!’ সন্ন্যাসী তাকালো। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে দেখতে দেখতে কেঁদে ফেললেন। কেউ একজন বলল, ‘হে আমীরুল মুমিনীন, তার জন্য কাঁদছেন?’ তিনি বললেন, ‘আমার আল্লাহর কিতাব থেকে এই আয়াতগুলো মনে পড়ল—ক্লিষ্ট, ক্লান্ত। তারা জ্বলন্ত আগুনে পতিত হবে’ —এ কথা আমাকে কাঁদাচ্ছে। আরেকটি আয়াত:
يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ
যারা মান্য করে প্রতিমা ও শয়তানকে।
এখানে তিনি ‘জিবত’-কে জাদুবিদ্যা এবং ‘তাগুত’-কে শয়তান বলে উল্লেখ করেছেন।

টিকাঃ
১২৫. সহীহ, বুখারী, নং ৪২১৩।
১২৬. সূরা আত-তাহরিম, ৬৬: ৫।
১২৭. সূরা আত-তাওবা, ৯: ৮০।
১২৮. সূরা আত-তাওবা, ৯: ৮৪।
১২৯. সহীহ, মুসলিম, নং ২৪০০; আখবার উমর, আত-তানতায়িয়ান, পৃ. ৩৮০,৩৮১।
১৩০. আকীল ইবনে আবি তালিব আল-হাশিমি; তিনি মক্কা বিজয়ের দিন মুসলিম হন এবং ইয়াযিদের খেলাফতের শুরুতে ইন্তেকাল করেন।
১৩১. সূরা আনফাল, ৮: ৬৭-৬৮।
১৩২. মুসনাদ, আহমাদ, ১/২৫০, হাদীস নং ২২১। আহমাদ শাকির এটিকে সহীহ উল্লেখ করেছেন।
১৩৩. আর-রিয়াদ আন-নাদরা, পৃ. ৩৩২। এর সনদ দুর্বল এবং আল-ওয়াকিদি কোনো সনদ ছাড়াই এটি বর্ণনা করেছেন।
১৩৪. সূরা আন-নূর, ২৪: ৫৮।
১৩৫. সূরা আল-বাকারা, ২: ২১৯।
১৩৬. সূরা আন-নিসা, ৪:৪৩।
১৩৭. সূরা আল-মায়েদা, ৫: ৯১।
১৩৮. মুসনাদ, আহমাদ ইবনে হাম্বল, নং ৩৭৮।
১৩৯. সূরা আল-মায়েদা, ৫: ৯১।
১৪০. শহীদ আল-মিহরাব, তালমাসানি, পৃ. ১০১।
১৪১. উমর ইবনে আল-খাত্তাব, ড. আলী আল-খতীব, পৃ. ৯০-৯২।
১৪২. সূরা আল-মায়েদা, ৫: ৩।
১৪৩. আল-মাওসুআ আল-হাদীসিয়্যা, মুসনাদ আহমাদ, নং ১৮৮।
১৪৪. সূরা আত-তাওবা, ৯ : ১৯-২২।
১৪৫. আল-ফাতওয়া, ৬/১৩৬।
১৪৬. সূরা আন-নিসা, ৪: ১০১।
১৪৭. মুসনাদ, আহমাদ ইবনে হাম্বল, নং ১৭৪১।
১৪৮. সূরা আল-আরাফ, ৭: ১৭২।
১৪৯. মুসনাদ, আহমাদ ইবনে হাম্বল, নং ৩১১।
১৫০. সূরা কামার, ৫৪:৪৫।
১৫১. তাফসীর ইবনে কাসির, ৪/২৬৬।
১৫২. সূরা যারিয়াত, ৫১: ১।
১৫৩. সূরা যারিয়াত, ৫১: ২।
১৫৪. সূরা যারিয়াত, ৫১: ৩।
১৫৫. সূরা যারিয়াত, ৫১:৪।
১৫৬. আখবার উমর ইবনে আল-খাত্তাব, আত-তানতায়িয়ান, পৃ. ৩০৮। রিয়াদ আন-নাদরা থেকে উদ্ধৃত।
১৫৭. সূরা আল-বাকারা, ২: ২৬৬।
১৫৮. ফাতহ আল-বারি, ৮/৪৯।
১৫৯. আল-খিলাফা আর-রাশিদা ওয়া আল-দাওলা আল-উমাউয়িয়া, ড. ইয়াহিয়া আল- ইয়াহিয়া, পৃ. ৩০৫।
১৬০. সূরা বাকারা, ২: ১৫৬, ১৫৭।
১৬১. আল-মুস্তাদরাক, ২/২৭০।
১৬২. আল-খিলাফা আর-রাশিদা ওয়া আল-দাওলা আল-উমাইয়হ্যা, ড. ইয়াহিয়া, পৃ. ৩০৫।
১৬৩. সূরা আল-ইনফিতার, ৮২: ৬।
১৬৪. তাফসীর ইবনে কাসীর, ৪/৫১৩।
১৬৫. সূরা তাকউয়ির, ৮১: ৭।
১৬৬. আল-ফাতওয়া, ৭/৪৪।
১৬৭. সূরা তালাক, ৬৬ : ৮।
১৬৮. প্রাগুক্ত, ১১/৩৮২।
১৬৯. সূরা গাশিয়া, ৮৮ : ৩-৪।
১৭০. তাফসীর ইবনে কাসীর, ৪/৫১৩।
১৭১. সূরা নিসা, ৪ : ৫১।
১৭২. প্রাগুক্ত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00