📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 বোনের বাড়িতে উমরের হামলা এবং ভাইয়ের সামনে ফাতিমা বিনতে আল-খাত্তাবের দৃঢ়তা

📄 বোনের বাড়িতে উমরের হামলা এবং ভাইয়ের সামনে ফাতিমা বিনতে আল-খাত্তাবের দৃঢ়তা


উমর যখন শুনলেন তার বোন এবং ভগ্নিপতি মুসলিম হয়ে গেছেন তিনি রাগে ফেটে পড়েন। তাদের বাড়িতে চলে যান। দরজায় করাঘাত শুনে তারা জানতে চাইলেন, 'কে?' তিনি বললেন, 'আল-খাত্তাবের পুত্র।' তারা একটা কাগজ হাতে নিয়ে পড়ছিলেন। তারা যখন বুঝতে পারলেন যে, উমর এসে গেছেন, তখন তাড়াতাড়ি কাগজটিকে লুকাতে চাইলেন। ঘরে ঢোকামাত্রই তার চেহারা দেখে তার বোন বুঝতে পারলেন যে তার মধ্যে কোনো অশুভ উদ্দেশ্য কাজ করছে। তিনি কাগজটাকে দুই পায়ের মধ্যে লুকিয়ে রাখলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমরা কী নিয়ে বিড়বিড় করছিলে? ফিসফিস করে কী পড়ছিলে তোমরা? আমি তোমাদের বাড়িতে ঢোকার সময় শুনতে পেয়েছি?' তারা তখন সুরা ত-হা পড়ছিলেন। তারা উত্তর দিলেন, 'আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলাম।' উমর বললেন, 'সম্ভবত তোমরা ধর্ম পরিবর্তন করেছ?' তার ভগ্নিপতি বললেন, 'হে উমর, যদি আপনার ধর্ম ছাড়া অন্যকিছুর মধ্যে সত্য থেকে থাকে তাহলে কী হবে?' উমর তখনই তার ভগ্নিপতি সাঈদকে আক্রমণ করে বসেন। তিনি তার দাড়ি ধরে টান দিলে তাদের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। উমর ছিলেন প্রচণ্ড শক্তিশালী। তিনি সাঈদকে ধরাশায়ী করে তার বুকে চেপে বসলেন। তার বোন স্বামীকে বাঁচাতে এগিয়ে আসলেন। উমর তাকে দূরে ছুঁড়ে ফেললেন। তার মুখ ফেটে রক্ত পড়তে লাগল। ফাতিমা রেগে চিৎকার করতে লাগলেন, 'ও আল্লাহর শত্রু, আমি একমাত্র আল্লাহর ওপরে ঈমান এনেছি বলে কি এভাবে আঘাত করছ?' তিনি বললেন, 'হ্যাঁ।' তার বোন বললেন, 'তবে তোমার যা ইচ্ছা কর। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল। আমরা মুসলিম হয়ে গেছি। তোমার ভালো লাগুক আর নাই লাগুক।'
এ কথা শুনে উমর হঠাৎ করে কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে লাগলেন। ফলে ভগ্নিপতির উপর থেকে সরে বসেন। অতঃপর বললেন, 'তোমাদের কাগজটি আমাকে দাও।' তার বোন বললেন, 'দেব না।' তিনি বললেন, 'অভিশাপ তোমাকে! তোমার কথা আমাকে নাড়া দিয়েছে। ওটা আমাকে দেখতে দাও। কথা দিচ্ছি, আমি তোমার সাথে প্রতারণা করব না। তোমাকে ওটা ফিরিয়ে দেব, তুমি যেখানে খুশি রেখে দিও। সেখানে রাখতে পারবে ওটাকে।' ফাতিমা বললেন, 'তুমি নাপাক হয়ে আছ, আর : 'যারা পাক-পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না।' ওঠ, পাক হয়ে এসো।' উমর বাইরে গেলেন, হাত-পা ধুয়ে আসলেন। তারপরে বোনের কাছ থেকে কাগজটি নিলেন। সেখানে সূরা ত-হাসহ বেশ কয়েকটি সূরা লেখা ছিল। কাগজে-বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম (পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে)-লেখা ছিল। আর-রাহমান এবং আর-রাহীম শব্দ দুটি পড়ে তিনি একেবারে অস্থির হয়ে পড়লেন। কাগজটি ফেলে দিলেন। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে কাগজটা আবার তুলে নিয়ে পড়তে লাগলেন,
طهُ مَا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ لِتَشْقَى إِلَّا تَذْكِرَةً لِمَنْ يَخْشُونَ تَنْزِيلًا مِمَّنْ خَلَقَ الْأَرْضَ وَ السَّمَوَاتِ الْعُلَى الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى لَهُ
مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَ مَا تَحْتَ الثَّرَى وَإِنْ تَجْهَرُ بِالْقَوْلِ فَإِنَّهُ يَعْلَمُ السِّرَّ وَ اَخْفَى اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى
ত্ব-হা। আপনাকে ক্লেশ দেবার জন্য আমি আপনার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করিনি। কিন্তু তাদেরই উপদেশের জন্য যারা ভয় করে। এটা তাঁর কাছ থেকে অবতীর্ণ, যিনি ভূমণ্ডল ও সমুচ্চ নভোমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন। তিনি পরম দয়াময়, আরশে সমাসীন হয়েছেন। নভোমণ্ডলে, ভূমণ্ডলে, এতদুভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে এবং সিক্ত ভূগর্ভে যা আছে, তা তাঁরই। যদি তুমি উচ্চকণ্ঠেও কথা বলো, তিনি তো গুপ্ত ও তদাপেক্ষাও গুপ্ত বিষয়বস্তু জানেন। আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য ইলাহ নেই। সব সৌন্দর্যমণ্ডিত নাম তাঁরই।
তিনি এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা অনুভব করলেন। বললেন, 'এই জিনিস থেকেই কি কুরাইশেরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে?' এরপর কাগজটা থেকে আরও একটু পড়লেন, এই শব্দগুলো তার চোখে পড়ল,
انَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُنِي وَأَقِمِ الصَّلُوةَ لِذِكْرِي إِنَّ السَّاعَةَ اتِيَةٌ أَكَادُ أُخْفِيْهَا لِتُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا تَسْعَى فَلَا يَصُدَّنَّكَ عَنْهَا مَنْ لَّا يُؤْمِنُ بِهَا وَ اتَّبَعَ هَوَاهُ فَتَرْدَى
আমিই আল্লাহ, আমি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। অতএব, আমার ইবাদত করো এবং আমার স্মরণার্থে নামায কায়েম করো। কেয়ামত অবশ্যই আসবে, আমি তা গোপন রাখতে চাই; যাতে প্রত্যেকেই তার কর্মানুযায়ী ফল লাভ করে। সুতরাং যে ব্যক্তি কেয়ামতে বিশ্বাস রাখে না এবং নিজ খাহেশের অনুসরণ করে, সে যেন তোমাকে তা থেকে নিবৃত্ত না করে। নিবৃত্ত হলে তুমি ধবংস হয়ে যাবে।
উমর বললেন, 'তিনি বলেছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। মুহম্মাদ কোথায়?'

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 উমর রা. মুহাম্মদ সা.-এর কাছে গেলেন এবং তার ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেন

📄 উমর রা. মুহাম্মদ সা.-এর কাছে গেলেন এবং তার ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেন


খাব্বাব রাযিয়াল্লাহু আনহু একটি বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন। এই ঘটনা শুনে বেরিয়ে এসে বললেন, উমর, আনন্দিত হও। সোমবার মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দুআ করেছিলেন এ বুঝি সেই দুআর ফল। তিনি বলেছিলেন, 'হে আল্লাহ, আবু জাহেল ইবনে হিশাম আর উমর ইবনুল খাত্তাব, এই দুই ব্যক্তির মধ্যে যাকে তোমার বেশি পছন্দ তার মাধ্যমে ইসলামকে সাহায্য করো।
উমর জিজ্ঞেস করলেন, 'আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ এখন কোথায়?' উমরের এ জিজ্ঞাসার মধ্যে কোনো কপটতা ছিল না। তারা এটা বুঝতে পেরে বলে দিলেন, 'তিনি সাফা পাহাড়ের পাদদেশে আছেন।' উমর তরবারি হাতে রওনা দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবীরা যেখানে ছিলেন, সেখানে পৌঁছে দরজায় করাঘাত করলেন। উমরের কণ্ঠ শুনে ভয়ে কেউ দরজা খুলতে সাহস পাচ্ছিলেন না। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি তার বিরূপ মনোভাবের কথা সবার জানা ছিল। সবাইকে ভয় পেতে দেখে হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তোমাদের কী হয়েছে?' তারা জবাব দিলেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব এসেছে।' হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব? দরজা খুলে দাও। আল্লাহ তার ভালো চাইলে সে মুসলিম হবে। আর যদি তিনি অন্যকিছু চান, তাহলে আমরা তাকে সহজেই হত্যা করতে পারব।' তারা দরজা খুলে দিলেন। হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আরেকজন উমরের বাহু ধরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে হাজির করলেন। তিনি বললেন, 'তাকে ছেড়ে দাও। তিনি উমরের তার কাপড়ের গিঁট জোরে টান দিয়ে বললেন, 'হে আল-খাত্তাবের পুত্র, কোন জিনিস তোমাকে এখানে টেনে আনল? আল্লাহর কসম, তোমার ওপর আল্লাহর গজব না নামা পর্যন্ত মনে হয় থামবে না।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল, আমি আল্লাহ আর তার রাসূলের প্রতি এবং আপনি আল্লাহর কাছ থেকে যা পেয়েছেন তার প্রতি ঈমান এনেছি।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম 'আল্লাহু আকবর' বলে উঠলেন। সাহাবা রাযিয়াল্লাহু আনহুমের বুঝতে বাকি রইল না যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম হয়ে গেছেন। হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম হয়ে গেলেন বলে সাহাবায়ে কেরামের আনন্দের সীমা ছিল না। কারণ, এই দুজন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হেফাযতের পাশাপাশি শত্রুদের সাথে বোঝাপড়া করতে পারবেন।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 উমর রা-এর প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াতের উদ্যোগ এবং এ কাজে কষ্ট সহ্য করে যাওয়া

📄 উমর রা-এর প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াতের উদ্যোগ এবং এ কাজে কষ্ট সহ্য করে যাওয়া


উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তীব্র আন্তরিকতার সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ফলে ইসলামের ভিত মজবুত করার জন্য তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তিনি বলেছিলেন, 'ইয়া রসুল্লাহ, আমরা বাঁচি আর মরি, সত্যকেই তো অনুসরণ করছি, তাই না?' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, 'হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আমার প্রাণ যে সত্তার হাতে তার কসম, তুমি বাঁচ অথবা মর, সত্যের পথেই আছ।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, 'তাহলে আমরা কেন লুকোচুরি করছি? যিনি আপনাকে সত্যের দিশা দিয়েছেন সেই সত্তার কসম, আপনার এখন বেরিয়ে পড়া উচিত (এবং প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিন)।' রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও এ কথা ভাবছিলেন। প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের সময় এসে গেছে। দাওয়াত যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। সুতরাং তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের অনুমতি দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু-টি দল গঠন করলেন। একটির দায়িত্ব দিলেন হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে, আরেকটির দায়িত্বে থাকলেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু। দুটি দলের সামনে ছিলেন স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি ধূলো উড়িয়ে সদলবলে মসজিদে প্রবেশ করলেন। কুরাইশেরা উমর এবং হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহুমকে একসাথে দেখে হতবাক হয়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐদিন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আল-ফারুক উপাধি দেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ধর্মান্তরিত করে আল্লাহ তা'আলা ইসলাম এবং মুসলিমদের শক্তিশালী করেন। আগে-পিছে কী হবে তিনি তার পরোয়া করতেন না, এমন অদম্য ছিলেন। তার এবং হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহুমার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবায়ে কেরাম নিরাপদ বোধ করতেন।
কুরাইশ মুশরিকদের দিকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। কাবায় নামায পড়ার অধিকার আদায়ের আগ পর্যন্ত তিনি তাদের সাথে লড়াই করে গেছেন। মুসলিমরাও তার সাথে নামায পড়তে শুরু করে। ইসলামের শত্রুদের যতভাবে বিরক্ত করা যায়, তার সবই করতেন। তিনি নিজে এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন:
'আমি চাচ্ছিলাম মুসলিম হিসেবে যেন আমার ওপরে মানুষ বিরক্ত হয়ে যায়। আমি আমার মামা আবু জাহেল এর কাছে গেলাম। তিনি খুব সম্ভ্রান্ত কুরাইশ ছিলেন। তার দরজায় টোকা দিলাম পরে সে বলল, 'কে?' আমি বললাম, 'আল-খাত্তাবের ছেলে।' সে বের হয়ে এলে তাকে বললাম, 'আপনি কি শুনেছেন, আমি ধর্ম বদলে ফেলেছি?' সে বলল, 'তাই নাকি?' বললাম, 'হ্যাঁ।' সে বলল, 'ও কাজ করো না।' জবাব দিলাম আমি, 'করে ফেলেছি।' সে আবারো বলল, 'ও কাজ করো না।' তারপর সে দড়াম করে আমার মুখের উপর দরজা দিয়ে দিল। আমি 'ব্যাপার না' বলে চলে এলাম। তারপর আমি কুরাইশদের আরেক সম্ভ্রান্ত লোকের বাড়িতে গেলাম। সে বলল, 'কে?' আমি বললাম, 'আল-খাত্তাবের ছেলে।' সে বের হলো। তাকে বললাম, 'আপনি কি বুঝতে পারছেন, আমি ধর্ম পরিবর্তন করেছি?' সে বলল, 'তাই নাকি?' বললাম, 'হ্যাঁ।' সেও বলল, 'ও কাজ করো না।' জবাব দিলাম আমি, 'করে ফেলেছি।' সেও দড়াম করে আমার মুখের উপর লাগিয়ে দিল। আমি বললাম, 'ব্যাপার না।' এক লোক আমাকে বলতে লাগল, 'তুমি যে মুসলিম হয়ে গেছ, তুমি চাও এ কথা লোকজন জানুক?' আমি 'হ্যাঁ' বললাম। সে বলল, 'যখন লোকজন আল-হিজরের মেলায় জড়ো হবে তখন তুমি জামীল ইবনে মুআম্মার আল-জুমাহির পাশে বসে তাকে বলবে, 'তুমি কি জান আমি আমার ধর্ম ত্যাগ করেছি?' আমি ঠিক তাই করলাম।
আর সাথে সাথে লোকটা দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, 'আল-খাত্তাবের ছেলে তার ধর্ম পরিবর্তন করেছে!' লোকজন আমার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমিও তাদেরকে পাল্টা মার দিলাম।'
এক বর্ণনায় আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যে মুসলিম হয়ে গেছেন কুরাইশেরা তা জানত না। তিনি একবার জিজ্ঞেস করলেন, 'মক্কাবাসীর মধ্যে কথা ছড়ানোয় কে সবচেয়ে পটু?' তাকে জামিল ইবনে মুআম্মার আল-জুমাহির নাম বলা হলো। তিনি তার কাছে গেলেন। তিনি কী করেন দেখার জন্য আমিও তার পেছনে গেলাম। তখন আমি ছোট। কিন্তু কিছু দেখলে বা শুনলে বোঝার মতো বুদ্ধি হয়েছিল। তিনি লোকটার কাছে গিয়ে বললেন, 'জামীল শোন, আমি মুসলিম হয়েছি।' আল্লাহর কসম, লোকটি কিছু না বলে উঠে দাঁড়াল। তার কাপড় টেনেটুনে ঠিক করল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে অনুসরণ করলেন আর আমি আমার বাবাকে। লোকটি মসজিদের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল, তারপরে জোরে চিৎকার করে কাবার চারপাশে জড়ো হয়ে থাকা কুরাইশদের বলতে লাগল: 'হে কুরাইশগণ, উমর ইবনুল খাত্তাব স্বধর্ম ত্যাগ করেছে।' উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পেছন থেকে বলে উঠলেন, 'সে মিথ্যা বলছে। আমি মুসলিম হয়েছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।' লোকজন আক্রমণ করে বসল। কিন্তু উমর লাফ দিয়ে উতবা ইবনে রাবীয়ার উপর চেপে বসলেন। তিনি উতবাকে মারতে শুরু করলেন। এক পর্যায়ে আংগুল দিয়ে তার দুইচোখ খোঁচাতে লাগলেন। উতবা ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল। এই দৃশ্য দেখে লোকজন ভয়ে সরে যেতে লাগল। উমর উঠে দাঁড়ালেন। জাহেলীয়াতের সময় যাদের সাথে তার ওঠাবসা করতেন তাদের কাছে গিয়ে ঘোষণা দিতে লাগলেন যে, তিনি মুসলিম হয়ে গেছেন।
তিনি সূর্য মধ্যগগণে না ওঠা পর্যন্ত, ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি এভাবে ইসলামের প্রচার করে লড়াই করতেন। তার চারপাশে লোকজন জড়ো হলে তিনি বলে উঠতেন, 'কী চাও তোমরা?' এমন অবস্থা চলছিল।
একদিন একজন লোক এলেন। তার পরনে কারুকাজ করা রেশমী পোশাক। তিনি লোকজনকে বললেন, 'কী শুরু করেছ তোমরা?' তারা বলল, 'আল-খাত্তাবের পুত্র ধর্ম ত্যাগ করেছে।' লোকটা বলল, 'তাতে কী? একজন মানুষ যে কোনো ধর্ম গ্রহণ করতে পারে। আর বনু আদিয়্যির কোনো সাথীকে মেরে ফেললে তারা মনে হয় তোমাদের ছেড়ে দেবে?' তার কথা শুনে সবাই চলে গেল।
আমি (ইবনে উমর) একবার মদীনায় বসে তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, 'বাবা, সেদিন কে আপনার কাছ থেকে লোকদের সরিয়ে দিয়েছিলেন?' তিনি বললেন, 'তিনি ছিলেন আল-আস ইবনে ওয়াইল আস-সাহমি।'

টিকাঃ
৭১. আল-খলিফা আল-ফারুক উমর ইবনে আল-খাত্তাব, পৃ. ২৬-২৭।
৭২. আর-রিয়াদ আন-নাদরা, মুহিব আত-তাবারি, ১/২৫৭
৭৩. শারহ আল-মাওয়াহিব, ১/৩২০; আত-তানতাওয়িয়াত, পৃষ্ঠা ১৯।
৭৪. আর-রিয়াদ আন-নাদরাহ, পৃ. ৩১৯।
৭৫. ফাযায়েল আস-সাহাবা, ইমাম আহমাদ ১/৩৪৬, এর সনদ হাসান।

📘 উমর ইবনুল খাত্তাব রা: জীবন ও কর্ম > 📄 ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে উমর রা.-এর মুসলিম হওয়ার প্রভাব

📄 ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে উমর রা.-এর মুসলিম হওয়ার প্রভাব


আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'উমর মুসলিম হওয়ায় আমরা গর্ববোধ করছিলাম। কারণ, তিনি মুসলিম না হওয়া পর্যন্ত আমরা কাবাঘর তাওয়াফ করতে বা সেখানে নামায পড়তে পারছিলাম না। আমাদের ছেড়ে না দেওয়া পর্যন্ত উমর লড়াই করে গেছেন। তারপর থেকে আমরা কাবাঘর তাওয়াফ করতাম, নামায পড়তাম।'
সুহাইব ইবনে সিনান উদ্ধৃত করেছেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব মুসলিম হওয়ার পরে ইসলাম প্রকাশ্যে চলে এলো। প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার হতে লাগল। আমরা কাবা ঘিরে বসতে শুরু করলাম। কাবার তাওয়াফ শুরু করলাম। যারা আমাদের বিরোধিতা করত তাদের সাথে সমস্যা মেটাতে লাগলাম। প্রয়োজনে পাল্টা আঘাত করতে লাগলাম।'

টিকাঃ
৭৬. ফাযায়েল আস-সাহাবা, ইমাম আহমাদ ১/৩৪৪, এর সনদ হাসান।
৭৭. আশ-শায়খান আবু বকর ওয়া উমর, পৃ. ১৪১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00