📄 জাহেলী যুগে তার জীবন
জাহেলী যুগেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অর্ধেক জীবন পার হয়ে যায়। অন্যান্য কুরাইশ ছেলের মতোই তিনি বেড়ে ওঠেন। তাদের সাথে তার একটাই পার্থক্য ছিল, তিনি পড়তে শিখেছিলেন। খুব কম মানুষই তখন পড়তে জানত। খুব ছোট থাকতেই তার কাঁধে দায়িত্বের বোঝা এসে পড়ে। ফলে সহায়-সম্পদ আর ভোগবিলাস- বর্জিত কঠিন অবস্থার মাঝে তিনি বড় হন। পিতা আল-খাত্তাব তাকে উট চরাতে বাধ্য করতেন। তার পিতার রূঢ় আচরণ তার জীবনে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল তা তিনি কোনোদিনও ভুলতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে আব্দুর রহমান ইবনে হাতিব বলেছেন, 'আমি উমর ইবনুল খাত্তাবের সাথে দাজনানে ছিলাম, তখন তিনি বলে ওঠেন, 'আমি এখানে আল-খাত্তাবের গবাদিপশু চরাতে আসতাম। সে যে কী কঠোর ছিল! কখনো আমি পশু চরাতাম আবার কখনো জ্বালানি কাঠ কুড়াতাম।'
জীবনের এই কঠিন সময়ের কথা তিনি প্রায়ই স্মরণ করতেন। সাদ ইবনুল মুসাইয়াবের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হজ করতে গিয়েছিলেন। তখন দাজনানে থাকার সময় বলেন, 'আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, তিনি উচ্চ মর্যাদাশীল, তিনি সুমহান। তিনি যাকে যা ইচ্ছা দান করেন। পশমী কাপড় গায়ে এই উপত্যকায় আল-খাত্তাবের পশু চরাতে আসতাম। সে অনেক নিষ্ঠুর ছিল। খাটাতে খাটাতে আমাকে বিধ্বস্ত করে ফেলত। কাজে ঘাটতি থাকলে শুরু হতো মারধর। আর এখন আমাকে দেখ, আমার আর আল্লাহর মাঝে আর কেউ নেই।'
আল-খাত্তাবের পুত্র উমর শুধু যে তার পিতার পশু চরাতেন তা নয়। বনু মাখযুম গোত্রে তার যে খালারা ছিলেন তাদের পশুও চরাতে হতো। খলীফা হওয়ার পরেও তিনি নিজের মনে সেসব দিনের কথা তুলতেন। এ কাজ আর কে করতে পারবে? তিনি কখনও অতীত ভোলেননি। মুসলিমদের সামনে দাঁড়িয়েও অকপটে নিজের অতীত স্মরণ করতেন। তিনি নিজেকে একজন রাখাল বলে উল্লেখ করতেন, বনু মাখযুমি খালাদের পশু চরানোর কথা বলতেন। মুহাম্মাদ ইবনে উমর আল-মাখযূমি তার পিতার কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন: উমর ইবনুল খাত্তাব নামাযের আগে আযান দিলেন। সবাই একত্র হয়ে তাকবীর দিল। তিনি মিম্বরে উঠে প্রথমে মহান আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করেন, অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপরে দরূদ পাঠ করে বলতে লাগলেন, 'হে লোকসকল, আমি এক সময় আমার বনু মাখযুমি খালাদের পশু চরাতাম। তারা আমাকে তখন একমুঠো খেজুর নয়তো কিসমিস দিত। ঐটুকু দিয়েই আমার চলত। কেমন দিন ছিল!'
তিনি মিম্বর থেকে নেমে এলে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি কি নিজেকে হেয় করার জন্য এ কাজ করলেন?' উমর বলেছিলেন, 'হে আওফের পুত্র, তোমাকে অভিশাপ! আমি নিজের মনেই ভাবছিলাম—তুমি এখন খলীফা হয়েছ, তোমার চেয়ে উত্তম আর কে আছে? আমি কী তা নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিলাম।' ভিন্ন বর্ণনামতে, 'আমি নিজের মধ্যে কিছু একটা দেখছি, তাই নিজেকে দুই-এক ধাপ নিচে নামাতে চাচ্ছিলাম।'
মক্কার জীবনে, ইসলাম গ্রহণের আগে তিনি পশু চরানোর কাজই করেছেন। এই কাজ নিঃসন্দেহে তার চরিত্রে ধৈর্য, সহনশীলতা আর দৃঢ়তা যোগ করেছিল। তবে জাহেলী যুগে আল-খাত্তাবের পুত্রের শুধু পশু চরাননি। কিশোর বয়সেই কুস্তি আর অশ্বচালনার মতো খেলাধূলায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তিনি কবিতা ভালোবাসতেন, আবৃত্তিও করতেন, তাছাড়া ইতিহাস জানা লোকদের ব্যাপারেও তার অনেক আগ্রহ ছিল। উকায, মিজান্না, যুল মাজাযের মতো বড় বড় আরব মেলায় অংশগ্রহণের জন্য তিনি অধীর আগ্রহে বসে থাকতেন। সেখানে ব্যবসার পাশাপাশি আরবদের ইতিহাস জানা এবং বিভিন্ন আরব-গোত্রের মধ্যে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা ছিল তার অন্যতম আগ্রহের বিষয়। নামী গোত্রের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের সামনে খুব কাব্যিক মেজাজে মেলাগুলোর নানা পর্ব অনুষ্ঠিত হতো। তার ফলে সেখানে আরবের ইতিহাস নিয়ে এতবার আলোচনা করা হতো যে তা সহজে কারও ভোলার কথা নয়। এসব আলাপ-আলোচনার রেশ ধরে মাঝে মাঝেই যুদ্ধ বেঁধে যেত। এর মধ্যে শুধু উকায মেলা থেকেই চারটি যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। এগুলো আল- ফিজারের যুদ্ধ নামে পরিচিত।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ব্যবসা-বাণিজ্যে খুব উন্নতি করেছিলেন। এক সময় তিনি মক্কার অন্যতম ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন। ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে বিভিন্ন দেশে যাতায়াতের ফলে অনেক লোকজনের সাথে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন। তিনি গ্রীষ্মে সিরিয়া আর শীতে ইয়েমেন যেতেন। জাহেলীয়া যুগে তিনি মক্কার একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। তখনকার নানা ঘটনায় তার কার্যকর ভূমিকা ছিল লক্ষ্যণীয়। পূর্বপুরুষদের গৌরবময় ঐতিহ্য তার জন্য সহায়ক হয়ে ওঠে। তার পিতামহ নুফায়েল ইবনে আব্দুল উযযা কুরাইশদের বিচার-সালিশ করতেন। তারও পূর্বপুরুষ কাব ইবনে লুআয়্যি আরবদের মধ্যে খুবই সম্মানিত ছিলেন। তার মৃত্যুর বছর থেকে হাতি-সন পর্যন্ত আরবেরা ইতিহাস সংরক্ষণ করেছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু উত্তরাধিকারসূত্রে আরব ইতিহাসে পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। সেই সাথে জ্ঞানী ও করিৎকর্মা হয়ে ওঠার পেছনেও পূর্বপুরুষদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সুতরাং সমস্যা হলেই আরবেরা তার কাছে হাজির হতেন। ইবনে সাদ বলেছেন, 'ইসলামপূর্ব যুগেও উমর আরবদের দ্বন্দ্ব মেটাতেন।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন একাধারে জ্ঞানী, বাকপটু, স্পষ্টভাষী, শক্তিশালী, অভিজাত এবং মানুষকে খুব সহজেই বোঝাতে পারতেন। কুরাইশদের মুখপাত্র হওয়ার জন্য যা দরকার তার সবকিছু তার মধ্যে ছিল। অন্য গোত্রের সাথে আলোচনার সময় তিনি কুরাইশদের পক্ষ থেকে কথা বলতেন। ইবনুল জাওযী বলেছেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাবের কাঁধে প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব এসে পড়ে। কুরাইশের সাথে অন্য গোত্রের যুদ্ধ বেঁধে গেলে তারা তাকে দূত হিসেবে পাঠাত। অন্য পক্ষ যতই তোড়জোড় করুক না কেন, তার সদয় আচরণের সামনে সেগুলো টিকতে পারত না। বরং উমরের আচরণে সবাই মুগ্ধ হয়ে যেত।'
তিনি কুরাইশ গোত্রের ঐতিহ্য, প্রার্থনা এবং প্রথাগত আইনকানুন সযত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন। তিনি যা বিশ্বাস করতেন তা রক্ষার জন্য তিক্ততার মুখোমুখি হতে হলেও তার পরোয়া করতেন না। যা তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তার আশংকা ছিল, নতুন ধর্মের আবির্ভাব হলে মক্কার প্রথাগত ঐতিহ্যের ভিত নড়ে যাবে। তাতে আরবদের মধ্যে মক্কার গৌরবময় অবস্থান হুমকির মুখে পড়ার আশংকা ছিল। এ কারণেই তিনি ইসলাম আবির্ভাবের শুরুতে প্রচণ্ড রকম বাঁধা দিয়েছিলেন। পবিত্র কাবার অবস্থান এই মক্কাতেই। কতশত মানুষের তীর্থস্থান। পবিত্র নগরীর বাসিন্দা হিসেবে আরবদের মধ্যে কুরাইশদের বিশেষ মর্যাদা ছিল। তাছাড়া তীর্থযাত্রীদের আনাগোনায় মক্কাবাসী আত্মিক এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়েও উন্নতি করছিল। ফলে মক্কার ধনীরাই আগে ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত দুর্বল লোকজন তাদের যুলুমের শিকার হয়। যুলুমকারীদের মধ্যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাম আসবে সবার আগে।
ইসলাম গ্রহণ করার জন্য তিনি এক খাদেমাকে বেধড়ক পিটিয়েছিলেন। ক্লান্ত হাত থেকে লাঠিটা যখন পড়ে গেল, তখন তিনি বিশ্রাম নেবার জন্য বসে পড়েন। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। অত্যাচারের ভয়াবহতা সহ্য করতে না পেরে তিনি সেই খাদেমাকে কিনে আযাদ করে দেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জাহেলী যুগের মানুষ ছিলেন। ফলে সে যুগের সবকিছুই তার নখদর্পণে ছিল। তিনি সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সে সময়ের রীতি-রেওয়াজ, ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে গেছেন। আবার ইসলাম গ্রহণের পরে তিনি এর সৌন্দর্যের সাথে পরিচিত হলেন। ফলে সঠিক নির্দেশনা ও ভ্রান্তি, কুফর ও ঈমান এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য ধরতে পারলেন। তার একটি বিখ্যাত উক্তি, 'ইসলামের কোনো একটি প্রজন্ম যখন জাহেলী যুগের কথা না জেনেই বড় হবে তখন থেকে ইসলামের বন্ধনগুলো একে একে শিথিল হয়ে পড়বে।'
টিকাঃ
৪০. আল-ইদারা আল-ইসমিয়া ফি আহদ উমর ইবনে আল-খাত্তাব, ফারুক আল-মাজদালাওয়ি, পৃ. ৯০।
৪১. দাজনান-মক্কার কাছাকাছি একটি পাহাড়। বলা হয়, এটা ২৫ কি.মি. দূরে অবস্থিত।
৪২. ইবনে আসাকিরের তারীখ গ্রন্থে বর্ণিত, ৫২/২৬৮; হালাকাত ইবনে সা'দ, ৩/২৬৬। ড. আতিফ লামাদা এর সনদগুলোকে সহীহ বলেছেন।
৪৩. আত-তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সাদ ৩/২৯৩। সুনিশ্চিত জনশ্রুতি আছে যেটা একে আরেও জোরালো করেছে।
৪৪. আল ফারূক মাআ আন-নবী, পৃ. ৬।
৪৫. আত-তারীখুল ইসলামী আল আম, আলী হাসান ইবরাহীম, পৃষ্ঠা ২২৬; আল-ইদারা আল-ইসমিয়া ফী আহদ উমর ইবনে আল-খাত্তাব, পৃ. ৯০।
৪৬. উমর ইবনে আল-খাত্তাব: হায়াতুহু, ইলমুহু, আদাবুহু, ড. আলী আহমাদ, পৃ. ১৫৩।
৪৭. উমর ইবনে আল-খাত্তাব, ড. মুহাম্মাদ আহমাদ আবু আন-নাসের, পৃ. ১৭১।
৪৮. আল-খালীফা আল-ফারূক উমর ইবনে আল-খাত্তাব, ড. আল-আনি, পৃ. ১৬।
৪৯. তারীখ খালীফা ইবনে খায়্যাত, ১/৭। ড. আল-আনি থেকে উদ্ধৃত, পৃ. ১৬।
৫০. আল-খালীফা আল-ফারুক, ড. আল-আনি, পৃ. ১৬।
৫১. প্রাগুক্ত।
৫২. মানাকিব উমর, পৃ. ১১।
৫৩. আল-ফারূক উমর, আব্দুর রাহমান আশ-শারকাউই, পৃ. ৮।
৫৪. প্রাগুক্ত।
৫৫. আল-ফাতাওয়া, ১৫/৩৬, ফারাইদ আল-কালাম লিল-খুলাফা আল-কারাম, পৃ. ১৪৪।