📄 নাম, বংশপরিচয়, ডাকনাম
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পূর্ণ নাম ছিল উমর ইবনুল খাত্তাব ইবনে নুফায়েল ইবনে আব্দিল-উযযা ইবনে রিয়াহ ইবনে আব্দিল্লাহ ইবনে কুরুত ইবনে রাযাহ ইবনে আদিয়্যি ইবনে কাব ইবনে লুআয়ি ইবনে গালিব আল-কুরাইশি আল-আদাওয়ি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে তার বংশানুক্রম তুলনা করলে দেখা যায়, কাব ইবনে লুআয় ইবনে গালিব দু-জনেরই পূর্বপুরুষ ছিলেন। তার আরেক নাম আবু হাফস। তাছাড়া তিনি মক্কায় প্রকাশ্যে ইসলাম পালনের জন্য আল-ফারুক নামেও পরিচিত। কারণ, আল্লাহ তা'আলা তার মাধ্যমে বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মধ্যে ফারাক বা পার্থক্য তৈরি করেছিলেন।
টিকাঃ
১৭. আত-তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সা'দ, ৩/২৬৫; মাহদুস সাওয়াব, ইবনে আব্দিল হাদী, ১/১৩১।
১৮. মাহদুস সাওয়াব ফি ফাযাইলি আমীলির মুমিনীন উমর ইবনিল খাত্তাব, ১/১৩১।
১৯. প্রাগুক্ত, ১/১৩১।
২০. সহীহ আত-তাওসিক ফি সীরাতি ওয়া হায়াতিল ফারুক উমর ইবনিল খাত্তাব, পৃ. ১৫।
২১. প্রাগুক্ত।
২২. প্রাগুক্ত।
📄 জন্ম এবং শারীরিক গঠন
হাতি-সনের তেরো বছর পরে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জন্মগ্রহণ করেন। তার গায়ের রং ছিল লাল আভাময় সাদা; সুন্দর গাল, নাক ও চোখের অধিকারী এবং তার হাত-পা ছিল বড়সড়। তিনি ছিলেন পৌরুষদীপ্ত, দীর্ঘদেহী, টেকোমাথার একজন শক্তপোক্ত মানুষ। তিনি স্বাভাবিকের তুলনায় দীর্ঘদেহী ছিলেন। তাকে দেখলে মনে হতো যেন সওয়ারীতে বসে আছেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুব শক্তিশালী ছিলেন বলে দুর্বল বা নাজুক মনে হতো না। চুল মেহেদী দিয়ে রাঙাতেন, গোঁফের দুপাশ লম্বা ছিল। খুব দ্রুত হাঁটতেন, কথা বলতেন স্পষ্টভাবে আর কাউকে আঘাত করলে তাতে ব্যথা লাগতই।
টিকাঃ
২৩. তারীখুল খুলাফা, সুয়ূতি, পৃ. ১৩৩।
২৪. আল-খলিফাতুল ফারূক উমর ইবনুল খাত্তাব, আল-আনি, পৃ. ১৫।
২৫. তিনি কারও ওপরে রেগে গেলে বা ক্ষেপে গেলে তার রক্ষা ছিল না।
২৬. তাহযীবুল আসমা, আন-নববী, ২/১৪; আওয়ালিয়াত আল-ফারূক, আল-কুরেশি, পৃ. ২৪।
📄 পরিবার
তাঁর বাবার নাম ছিল আল-খাত্তাব ইবনে নুফায়েল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পিতামহ নুফায়েল ইবনে আব্দিল-উযযার কাছে কুরাইশরা বিচার-সালিশের জন্য আসত। তার মায়ের নাম ছিল হান্নামা বিনতে হাশিম ইবনুল মুগীরা। প্রচলিত আছে, তিনি হাশিমের কন্যা এবং আবু জাহেলের বোন ছিলেন। তবে বেশিরভাগ ইতিহাসবিদের মতে, তিনি হাশিমের কন্যা এবং আবু জাহেল ইবনে হিশামের চাচাত বোন ছিলেন।
তাঁর স্ত্রী এবং ছেলেমেয়ে সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়: জাহেলীয়াতের সময় তিনি উসমান ইবনে মাযউনের বোন যায়নাব বিনতে মাযউনকে বিয়ে করেন। তার ঘরে আব্দুল্লাহ, বড় আব্দুর রহমান এবং হাফসার জন্ম হয়। অতঃপর মালিকা বিনতে জারওয়ালের গর্ভে উবাইদুল্লাহর জন্ম হয়। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়, পরে আবু আল-জাহম ইবনে হুযাইফার সাথে মালিকার বিয়ে হয়। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কুরাইবা বিনতে আবি-উমাইয়া আল-মাখযুমিকেও বিয়ে করেছিলেন। তাঁকেও হুদাইবিয়ার সময় তালাক দেন; আব্দুর রহমান ইবনে আবি বকরের সাথে তার বিয়ে হয়। ইকরিমা ইবনে আবি জাহেল সিরিয়ায় নিহত হওয়ার পরে তার স্ত্রী উম্মে হাকীম বিনতে আল-হারিস ইবনে হিশামের সাথে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ফাতিমা নামে এক কন্যার জন্ম দেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে তালাক দিয়েছিলেন কি না তা স্পষ্ট নয়।” এরপর তিনি বিয়ে করেন আল- আওসের জামিলা বিনতে আসিম ইবনে সাবিত ইবনে আবি আল- আকলাহকে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আব্দুল্লাহ ইবনে আবি বকরের প্রাক্তন স্ত্রী আতিকা বিনতে যায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়েলকে বিয়ে করেছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাতের পরে তিনি যুবায়ের ইবনুল আওয়ামকে বিয়ে করেন। বলা হয়ে থাকে, তিনি তার পুত্র ইয়্যাদের জননী ছিলেন। আল্লাহই ভালো জানেন।
আবু বকর আস-সিদ্দীকের কন্যা উম্মে কুলসুম যখন খুব ছোট ছিলেন তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তিনি তাকে আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে দিয়ে সম্বন্ধ পাঠিয়েছিলেন। উম্মে কুলসুম বলেছিলেন, 'তাকে আমার প্রয়োজন নেই'। তখন আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'তুমি কি আমিরুল মুমিনীনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিচ্ছ?' তিনি জবাব দেন, 'হ্যাঁ। কারণ, তিনি খুব কঠিন জীবনযাপন করেন।' আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা আমর ইবনুল আসের মাধ্যমে খবর পাঠালেন। তিনি তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে পরামর্শ দিলেন আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর কন্যা উম্মে কুলসুমের পরিবর্তে আলী ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহার কন্যা উম্মে কুলসুমকে বিয়ে করতে পারেন। তার মা ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কন্যা। সুতরাং মায়ের দিক থেকে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশধর ছিলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে তার মেয়ের জন্য প্রস্তাব পাঠালে তিনি রাজী হন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চল্লিশ হাজার দিরহাম দেনমোহর ধার্য করে তাকে বিয়ে করেন। উম্মে কুলসুমের গর্ভে যায়েদ এবং রুকাইয়ার জন্ম হয়।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু লুহাইয়া নামে একজন ইয়েমেনি নারীকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর গর্ভে ছোট আব্দুর রহমানের জন্ম হয়, কারও মতে, তিনি মেজ আব্দুর রহমানও হতে পারেন। আল ওয়াকিদি উদ্ধৃত করেছেন, তিনি তার স্ত্রী নন, বরং তিনি ছিলেন একজন উম্মে ওয়ালাদ (যে খাদেমা তার মনিবের সন্তান ধারণ করে)। ফাকিহা নামে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আরেকজন খাদেমা ছিলেন বলে প্রচলিত আছে। তার গর্ভে যায়নাবের জন্ম হয়। আল-ওয়াকিদি যায়নাবকে সবার ছোট সন্তান বলে উল্লেখ করেছেন।
তার সর্বমোট তেরোজন সন্তান ছিল। তারা হলেন: বড় যায়েদ, ছোট যায়েদ, আসিম, আব্দুল্লাহ, বড় আব্দুর রহমান, মেজ আব্দুর রহমান ছোট আব্দুর রাহমান, উবাইদুল্লাহ, ইয়্যাদ, হাফসা, রুকাইয়া, যায়নাব এবং ফাতিমা রাযিয়াল্লাহু আনহুম। ইসলাম গ্রহণের আগে-পরে মিলিয়ে তালাকপ্রাপ্তা হয়েছেন বা ইন্তেকাল করেছেন এবং রেখে যাওয়া স্ত্রীর সংখ্যা ছিল মোট সাতজন। মূলত অনেক সন্তান-সন্ততি তথা উত্তরসূরির আশায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এতজনকে বিয়ে করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, 'আমি কখনো বাসনা চরিতার্থের জন্য নারীদের নিকটবর্তী হইনি। আমার যদি সন্তানলাভের আকাঙ্ক্ষা না থাকত, আমি আমার দু-চোখ দিয়ে কোনো নারীর দিকে তাকাতামও না। তিনি বলেছেন, 'আল্লাহ তা'আলা আমার মাধ্যমে এমন রূহের জন্ম দেবেন যে তার প্রশংসা করবে, তাকে স্মরণ করবে। কেবল এই আশায় আমি অনেকটা জোর করে স্ত্রীদের সাথে ঘনিষ্ঠ হই।'
টিকাঃ
২৭. নাসাব কুরাইশ, আয-যুবাইরি, পৃ. ৩৪৭।
২৮. আওয়ালিয়াত আল-ফারূক, আল কুরেশি, পৃ. ২২
২৯. প্রাগুক্ত।
৩০. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/১৪৪১।
৩১. প্রাগুক্ত।
৩২. তারতীব ওয়া তাহযীব আল-বিদায়া ওয়া আন-নিহায়া; খিলাফাত উমর, আস-সুলামি, পৃ. ৭।
৩৩. প্রাগুক্ত।
৩৪. আল-কামীল ফি আত-তারীখ, ২/২১২।
৩৫. তারীখ আল-উমাম ওয়া আল-মুলুক, আত-তাবারি, ৫/১৯১।
৩৬. প্রাগুক্ত, ৫/১৯২।
৩৭. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৭/১৪৪
৩৮. আশ-শায়খান আবু বকর ওয়া উমর, ড. ইহসান সাদাকি সম্পাদিত, পৃ. ২২৭।
৩৯. ফাওয়ায়িদ আল-কালাম লিল খুলাফা আল-কারাম, কাসিম আশুর, পৃ. ১১২।
📄 জাহেলী যুগে তার জীবন
জাহেলী যুগেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর অর্ধেক জীবন পার হয়ে যায়। অন্যান্য কুরাইশ ছেলের মতোই তিনি বেড়ে ওঠেন। তাদের সাথে তার একটাই পার্থক্য ছিল, তিনি পড়তে শিখেছিলেন। খুব কম মানুষই তখন পড়তে জানত। খুব ছোট থাকতেই তার কাঁধে দায়িত্বের বোঝা এসে পড়ে। ফলে সহায়-সম্পদ আর ভোগবিলাস- বর্জিত কঠিন অবস্থার মাঝে তিনি বড় হন। পিতা আল-খাত্তাব তাকে উট চরাতে বাধ্য করতেন। তার পিতার রূঢ় আচরণ তার জীবনে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল তা তিনি কোনোদিনও ভুলতে পারেননি। এ প্রসঙ্গে আব্দুর রহমান ইবনে হাতিব বলেছেন, 'আমি উমর ইবনুল খাত্তাবের সাথে দাজনানে ছিলাম, তখন তিনি বলে ওঠেন, 'আমি এখানে আল-খাত্তাবের গবাদিপশু চরাতে আসতাম। সে যে কী কঠোর ছিল! কখনো আমি পশু চরাতাম আবার কখনো জ্বালানি কাঠ কুড়াতাম।'
জীবনের এই কঠিন সময়ের কথা তিনি প্রায়ই স্মরণ করতেন। সাদ ইবনুল মুসাইয়াবের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হজ করতে গিয়েছিলেন। তখন দাজনানে থাকার সময় বলেন, 'আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, তিনি উচ্চ মর্যাদাশীল, তিনি সুমহান। তিনি যাকে যা ইচ্ছা দান করেন। পশমী কাপড় গায়ে এই উপত্যকায় আল-খাত্তাবের পশু চরাতে আসতাম। সে অনেক নিষ্ঠুর ছিল। খাটাতে খাটাতে আমাকে বিধ্বস্ত করে ফেলত। কাজে ঘাটতি থাকলে শুরু হতো মারধর। আর এখন আমাকে দেখ, আমার আর আল্লাহর মাঝে আর কেউ নেই।'
আল-খাত্তাবের পুত্র উমর শুধু যে তার পিতার পশু চরাতেন তা নয়। বনু মাখযুম গোত্রে তার যে খালারা ছিলেন তাদের পশুও চরাতে হতো। খলীফা হওয়ার পরেও তিনি নিজের মনে সেসব দিনের কথা তুলতেন। এ কাজ আর কে করতে পারবে? তিনি কখনও অতীত ভোলেননি। মুসলিমদের সামনে দাঁড়িয়েও অকপটে নিজের অতীত স্মরণ করতেন। তিনি নিজেকে একজন রাখাল বলে উল্লেখ করতেন, বনু মাখযুমি খালাদের পশু চরানোর কথা বলতেন। মুহাম্মাদ ইবনে উমর আল-মাখযূমি তার পিতার কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন: উমর ইবনুল খাত্তাব নামাযের আগে আযান দিলেন। সবাই একত্র হয়ে তাকবীর দিল। তিনি মিম্বরে উঠে প্রথমে মহান আল্লাহ তা'আলার প্রশংসা করেন, অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপরে দরূদ পাঠ করে বলতে লাগলেন, 'হে লোকসকল, আমি এক সময় আমার বনু মাখযুমি খালাদের পশু চরাতাম। তারা আমাকে তখন একমুঠো খেজুর নয়তো কিসমিস দিত। ঐটুকু দিয়েই আমার চলত। কেমন দিন ছিল!'
তিনি মিম্বর থেকে নেমে এলে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'হে আমীরুল মুমিনীন, আপনি কি নিজেকে হেয় করার জন্য এ কাজ করলেন?' উমর বলেছিলেন, 'হে আওফের পুত্র, তোমাকে অভিশাপ! আমি নিজের মনেই ভাবছিলাম—তুমি এখন খলীফা হয়েছ, তোমার চেয়ে উত্তম আর কে আছে? আমি কী তা নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিলাম।' ভিন্ন বর্ণনামতে, 'আমি নিজের মধ্যে কিছু একটা দেখছি, তাই নিজেকে দুই-এক ধাপ নিচে নামাতে চাচ্ছিলাম।'
মক্কার জীবনে, ইসলাম গ্রহণের আগে তিনি পশু চরানোর কাজই করেছেন। এই কাজ নিঃসন্দেহে তার চরিত্রে ধৈর্য, সহনশীলতা আর দৃঢ়তা যোগ করেছিল। তবে জাহেলী যুগে আল-খাত্তাবের পুত্রের শুধু পশু চরাননি। কিশোর বয়সেই কুস্তি আর অশ্বচালনার মতো খেলাধূলায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তিনি কবিতা ভালোবাসতেন, আবৃত্তিও করতেন, তাছাড়া ইতিহাস জানা লোকদের ব্যাপারেও তার অনেক আগ্রহ ছিল। উকায, মিজান্না, যুল মাজাযের মতো বড় বড় আরব মেলায় অংশগ্রহণের জন্য তিনি অধীর আগ্রহে বসে থাকতেন। সেখানে ব্যবসার পাশাপাশি আরবদের ইতিহাস জানা এবং বিভিন্ন আরব-গোত্রের মধ্যে আয়োজিত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা ছিল তার অন্যতম আগ্রহের বিষয়। নামী গোত্রের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের সামনে খুব কাব্যিক মেজাজে মেলাগুলোর নানা পর্ব অনুষ্ঠিত হতো। তার ফলে সেখানে আরবের ইতিহাস নিয়ে এতবার আলোচনা করা হতো যে তা সহজে কারও ভোলার কথা নয়। এসব আলাপ-আলোচনার রেশ ধরে মাঝে মাঝেই যুদ্ধ বেঁধে যেত। এর মধ্যে শুধু উকায মেলা থেকেই চারটি যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। এগুলো আল- ফিজারের যুদ্ধ নামে পরিচিত।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ব্যবসা-বাণিজ্যে খুব উন্নতি করেছিলেন। এক সময় তিনি মক্কার অন্যতম ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হন। ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে বিভিন্ন দেশে যাতায়াতের ফলে অনেক লোকজনের সাথে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন। তিনি গ্রীষ্মে সিরিয়া আর শীতে ইয়েমেন যেতেন। জাহেলীয়া যুগে তিনি মক্কার একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। তখনকার নানা ঘটনায় তার কার্যকর ভূমিকা ছিল লক্ষ্যণীয়। পূর্বপুরুষদের গৌরবময় ঐতিহ্য তার জন্য সহায়ক হয়ে ওঠে। তার পিতামহ নুফায়েল ইবনে আব্দুল উযযা কুরাইশদের বিচার-সালিশ করতেন। তারও পূর্বপুরুষ কাব ইবনে লুআয়্যি আরবদের মধ্যে খুবই সম্মানিত ছিলেন। তার মৃত্যুর বছর থেকে হাতি-সন পর্যন্ত আরবেরা ইতিহাস সংরক্ষণ করেছে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু উত্তরাধিকারসূত্রে আরব ইতিহাসে পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। সেই সাথে জ্ঞানী ও করিৎকর্মা হয়ে ওঠার পেছনেও পূর্বপুরুষদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সুতরাং সমস্যা হলেই আরবেরা তার কাছে হাজির হতেন। ইবনে সাদ বলেছেন, 'ইসলামপূর্ব যুগেও উমর আরবদের দ্বন্দ্ব মেটাতেন।'
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন একাধারে জ্ঞানী, বাকপটু, স্পষ্টভাষী, শক্তিশালী, অভিজাত এবং মানুষকে খুব সহজেই বোঝাতে পারতেন। কুরাইশদের মুখপাত্র হওয়ার জন্য যা দরকার তার সবকিছু তার মধ্যে ছিল। অন্য গোত্রের সাথে আলোচনার সময় তিনি কুরাইশদের পক্ষ থেকে কথা বলতেন। ইবনুল জাওযী বলেছেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাবের কাঁধে প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব এসে পড়ে। কুরাইশের সাথে অন্য গোত্রের যুদ্ধ বেঁধে গেলে তারা তাকে দূত হিসেবে পাঠাত। অন্য পক্ষ যতই তোড়জোড় করুক না কেন, তার সদয় আচরণের সামনে সেগুলো টিকতে পারত না। বরং উমরের আচরণে সবাই মুগ্ধ হয়ে যেত।'
তিনি কুরাইশ গোত্রের ঐতিহ্য, প্রার্থনা এবং প্রথাগত আইনকানুন সযত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করেছেন। তিনি যা বিশ্বাস করতেন তা রক্ষার জন্য তিক্ততার মুখোমুখি হতে হলেও তার পরোয়া করতেন না। যা তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তার আশংকা ছিল, নতুন ধর্মের আবির্ভাব হলে মক্কার প্রথাগত ঐতিহ্যের ভিত নড়ে যাবে। তাতে আরবদের মধ্যে মক্কার গৌরবময় অবস্থান হুমকির মুখে পড়ার আশংকা ছিল। এ কারণেই তিনি ইসলাম আবির্ভাবের শুরুতে প্রচণ্ড রকম বাঁধা দিয়েছিলেন। পবিত্র কাবার অবস্থান এই মক্কাতেই। কতশত মানুষের তীর্থস্থান। পবিত্র নগরীর বাসিন্দা হিসেবে আরবদের মধ্যে কুরাইশদের বিশেষ মর্যাদা ছিল। তাছাড়া তীর্থযাত্রীদের আনাগোনায় মক্কাবাসী আত্মিক এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়েও উন্নতি করছিল। ফলে মক্কার ধনীরাই আগে ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল। ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত দুর্বল লোকজন তাদের যুলুমের শিকার হয়। যুলুমকারীদের মধ্যে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নাম আসবে সবার আগে।
ইসলাম গ্রহণ করার জন্য তিনি এক খাদেমাকে বেধড়ক পিটিয়েছিলেন। ক্লান্ত হাত থেকে লাঠিটা যখন পড়ে গেল, তখন তিনি বিশ্রাম নেবার জন্য বসে পড়েন। আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। অত্যাচারের ভয়াবহতা সহ্য করতে না পেরে তিনি সেই খাদেমাকে কিনে আযাদ করে দেন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জাহেলী যুগের মানুষ ছিলেন। ফলে সে যুগের সবকিছুই তার নখদর্পণে ছিল। তিনি সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সে সময়ের রীতি-রেওয়াজ, ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে গেছেন। আবার ইসলাম গ্রহণের পরে তিনি এর সৌন্দর্যের সাথে পরিচিত হলেন। ফলে সঠিক নির্দেশনা ও ভ্রান্তি, কুফর ও ঈমান এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য ধরতে পারলেন। তার একটি বিখ্যাত উক্তি, 'ইসলামের কোনো একটি প্রজন্ম যখন জাহেলী যুগের কথা না জেনেই বড় হবে তখন থেকে ইসলামের বন্ধনগুলো একে একে শিথিল হয়ে পড়বে।'
টিকাঃ
৪০. আল-ইদারা আল-ইসমিয়া ফি আহদ উমর ইবনে আল-খাত্তাব, ফারুক আল-মাজদালাওয়ি, পৃ. ৯০।
৪১. দাজনান-মক্কার কাছাকাছি একটি পাহাড়। বলা হয়, এটা ২৫ কি.মি. দূরে অবস্থিত।
৪২. ইবনে আসাকিরের তারীখ গ্রন্থে বর্ণিত, ৫২/২৬৮; হালাকাত ইবনে সা'দ, ৩/২৬৬। ড. আতিফ লামাদা এর সনদগুলোকে সহীহ বলেছেন।
৪৩. আত-তাবাকাতুল কুবরা, ইবনে সাদ ৩/২৯৩। সুনিশ্চিত জনশ্রুতি আছে যেটা একে আরেও জোরালো করেছে।
৪৪. আল ফারূক মাআ আন-নবী, পৃ. ৬।
৪৫. আত-তারীখুল ইসলামী আল আম, আলী হাসান ইবরাহীম, পৃষ্ঠা ২২৬; আল-ইদারা আল-ইসমিয়া ফী আহদ উমর ইবনে আল-খাত্তাব, পৃ. ৯০।
৪৬. উমর ইবনে আল-খাত্তাব: হায়াতুহু, ইলমুহু, আদাবুহু, ড. আলী আহমাদ, পৃ. ১৫৩।
৪৭. উমর ইবনে আল-খাত্তাব, ড. মুহাম্মাদ আহমাদ আবু আন-নাসের, পৃ. ১৭১।
৪৮. আল-খালীফা আল-ফারূক উমর ইবনে আল-খাত্তাব, ড. আল-আনি, পৃ. ১৬।
৪৯. তারীখ খালীফা ইবনে খায়্যাত, ১/৭। ড. আল-আনি থেকে উদ্ধৃত, পৃ. ১৬।
৫০. আল-খালীফা আল-ফারুক, ড. আল-আনি, পৃ. ১৬।
৫১. প্রাগুক্ত।
৫২. মানাকিব উমর, পৃ. ১১।
৫৩. আল-ফারূক উমর, আব্দুর রাহমান আশ-শারকাউই, পৃ. ৮।
৫৪. প্রাগুক্ত।
৫৫. আল-ফাতাওয়া, ১৫/৩৬, ফারাইদ আল-কালাম লিল-খুলাফা আল-কারাম, পৃ. ১৪৪।