📄 ভূমিকা
সকল প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার। আমরা তার প্রশংসা করি। তার কাছেই চাই সাহায্য, ক্ষমা এবং হেদায়েত। আমরা আশ্রয় চাই নফসের ধোঁকা আর মন্দ কাজ থেকে। আল্লাহ তা'আলা যাকে পথ দেখান, কেউ তাকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না; আর যাকে পথভ্রষ্ট করেন তাকে পথ দেখাবার সাধ্য কারও নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউ ইবাদাতের যোগ্য নয়, আর না আছে তার কোনো অংশীদার। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার বান্দা ও রাসূল। কুরআনে এসেছে,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِۦ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে যেমন ভয় করা উচিত ঠিক তেমনিভাবে ভয় করতে থাক। এবং অবশ্যই মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কোরো না।'
يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱتَّقُوا۟ رَبَّكُمُ ٱلَّذِى خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَٰحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَآءً ۚ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ٱلَّذِى تَسَآءَلُونَ بِهِۦ وَٱلْأَرْحَامَ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا
হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন। আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাক। আর ভয় কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন।²
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَقُولُوا۟ قَوْلًا سَدِيدًا يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَٰلَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا
হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের আমল-আচরণ সংশোধন করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যে কেউ আল্লাহ তার রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে।
এই কিতাবের নাম জীবন ও কর্ম: উমর ইবনুল খাত্তাব রা.। এজন্য সবার আগে মহান আল্লাহ তা'আলা শোকর আদায় করছি। তারপরই স্বীকার করছি বিজ্ঞ আলেম, শাইখ এবং দাঈদের অবদানের কথা। তাদের উৎসাহে আমি খুলাফায়ে রাশেদীনের জীবন গবেষণা করতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। তাদেরই একজন আমাকে বলেছিলেন, সমসাময়িক মুসলিম এবং ইসলামের প্রথম যুগের মুসলিমদের মধ্যে বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে। দাঈ, আলেম এবং বুযুর্গদের কথা অনেক মুসলিমই জানে। অথচ খুলাফায়ে রাশেদীনের কথা এক রকম অজানা। অথচ সেই যুগ ছিল রাজনৈতিক, শিক্ষাগত, গণসংযোগ, নৈতিক, অর্থনৈতিক, বুদ্ধিদীপ্ত, জিহাদী এবং ফিকহী শিক্ষায় পরিপূর্ণ। এখন এগুলোর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তাই ইসলামী রাষ্ট্রের অঙ্গ-সংগঠনগুলোর গঠনপ্রক্রিয়া এবং বিবর্তনের ইতিহাস আমাদের জানা দরকার। তৎকালীন মুসলিম রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি, খেলাফত-পদ্ধতি, সেনাব্যবস্থা, গভর্নর নিয়োগপদ্ধতি, ইজতিহাদ (মুসলিম উম্মাহ পারসিক এবং বাইজেন্টাইনদের সংস্পর্শে যাওয়ার সময় গৃহীত পদ্ধতি) এবং একের পর এক ভূখণ্ড বিজয়ের সাফল্যগাঁথা আমাদের জানতে হবে।
আমার চিন্তা-ভাবনাকে আল্লাহ তা'আলা বাস্তব রূপ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর কুদরতী হাতের স্পর্শে আমার চলার পথ সহজ করেছেন। আল্লাহর অসীম রহমতে নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত আমার হাতে পৌঁছেছে। আলহামদুলিল্লাহ।
খুলাফায়ে রাশেদীনের ইতিহাস সুশিক্ষায় ভরপুর। অথচ এই শিক্ষামূলক ঘটনাগুলো ইতিহাস, হাদীস, ফিকহ, সাহিত্য, তাফসীর নয়তো জীবনী
অথবা সংকলকদের উদ্ধৃতিতে বিক্ষিপ্তভাবে পাওয়া যায়। সম্ভাব্য সব উৎস থেকে এগুলো সংগ্রহের যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। কারণ, বিখ্যাত কোনো ইতিহাসের কিতাবে আজ পর্যন্ত এগুলো একত্রে ছাপা হয়নি। তথ্য সংগ্রহশেষে সাজানো-গোছানো, যাচাই-বাছাই আর বিশ্লেষণ করতে হয়েছে। একে একে সব ধাপ পেরোনোর পরে এই সিরিজের প্রথম কিতাব জীবন ও কর্ম: আবু বকর আস-সিদ্দীক রা. নামে প্রকাশিত হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলার রহমতে আরববিশ্বের কিতাবখানা এবং আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলায় আমার কিতাব বিপুল সাড়া পায়। উলামায়ে কেরাম, দাঈ থেকে শুরু করে তালেবে ইলমসহ মুসলিম জনগোষ্ঠীর হাতে তা পৌঁছে গেছে। অনেকেই আমাকে খুলাফায়ে রাশেদীনের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিতে থাকেন। যেন মুসলিম উম্মাহর হাতে যুগোপযোগী বর্ণনাশৈলীতে সহজ ইতিহাস তুলে দিতে পারি।
খুলাফায়ে রাশেদীনের ইতিহাসে প্রত্যেকটি ঘটনা শিক্ষণীয়। সুতরাং দুর্বল ও মনগড়া তথ্য, প্রাচ্যবাদীদের গ্রন্থাদি, ধর্মে বিশ্বাস নেই এমন লোকজন, রাফিযী এবং তাদের অনুসারীদের পক্ষপাতিত্ব বাদ দিয়ে আহলে সুন্নাতের অনুকরণে সত্যটুকু তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। তাদের সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
وَالسّٰبِقُوْنَ الْاَوَّلُوْنَ مِنَ الْمُهٰجِرِیْنَ وَالْاَنْصَارِ وَالَّذِیْنَ اتَّبَعُوْهُمْ بِاِحْسَانٍ رَضِیَ اللّٰهُ عَنْهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ وَاَعَدَّ لَهُمْ جَنّٰتٍ تَجْرِیْ تَحْتَهَا الْاَنْهٰرُ خٰلِدِیْنَ فِیْهَآ اَبَدًا ذٰلِکَ الْفَوْزُ الْعَظِیْمُ
আর যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনসারদের মাঝে পুরাতন, এবং যারা তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ সে সমস্ত লোকদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আর তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত, তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে। এটাই মহাসাফল্য।
আল্লাহ আরও বলেছেন,
مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللَّهِ وَ الَّذِينَ مَعَةَ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمُ تَرْبهُمْ رُكَعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا
মুহাম্মাদ আল্লাহর রসূল এবং তার সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু ও সেজদারত দেখবেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম সম্পর্কে বলেছেন, 'আমি যে যুগে প্রেরিত হয়েছি আমার সে যুগের উম্মতেরা হলো শ্রেষ্ঠ।'
তাদের সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'তোমাদের মধ্যে কেউ যদি উত্তম পথ অনুসরণ করতে চায়, সে যেন তাদের অনুসরণ করে যারা ইতিমধ্যে ইন্তেকাল করেছেন (রাসূলের সাহাবীগণের মধ্যে)। যারা এখনো বেঁচে আছেন, তারা ফিতনা থেকে নিরাপদ নন।'
আল্লাহর কসম, সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন সবচেয়ে বেশি অনুগত, সবচেয়ে জ্ঞানী, শুদ্ধতম তথা সর্বোত্তম উম্মত। তারা ছিলেন স্বয়ং আল্লাহ তা'আলার নির্বাচিত মানুষ। দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য তারা বিশেষভাবে মনোনীত হয়েছিলেন। সুতরাং তাদের গুণাবলীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। তারা সরল পথে পরিচালিত হয়েছিলেন। তাই তাদের নৈতিকতা এবং দ্বীনী দায়িত্ববোধের উদাহরণ আঁকড়ে থাকতে হবে।' রাযিয়াল্লাহু আনহুম কেবল ইসলামী শরীয়তের পাবন্দী করেছেন। পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ইসলামের প্রসার ঘটিয়েছেন। তারা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে কুরআন শিখিয়েছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভালো ও হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাদের চিন্তাধারা, সংস্কৃতি, জ্ঞান, জিহাদ, অভিযান এবং আচার-ব্যবহার সম্বলিত এই সমৃদ্ধ ইতিহাস, উম্মতের অমূল্য সম্পদ। এই
আলোকিত ইতিহাসে ভবিষ্যত প্রজন্ম সুস্থ, সুন্দরভাবে জীবন পরিচালনার নির্দেশনা খুঁজে পাবে। আর তখন এই পৃথিবীর বুকে খুলাফায়ে রাশেদীনের ভূমিকা এবং তাদের বার্তার মর্ম সবার বোধগম্য হবে। বলিষ্ঠ আত্মা, বিনয়ী হৃদয় আর আলোকিত মন তৈরির উপকরণ সেই যুগের মধ্যে নিহিত। সময়ের মধ্যে খুঁজে পাবে। ফলে এই ইতিহাসের চর্চা তাদের অনুপ্রাণিত করবে, সুশিক্ষিত করবে, তাদের চিন্তা-চেতনায় পরিপক্কতা আনবে। দাঈ, আলেম, শায়েখ থেকে শুরু করে যেকোনো উম্মাত এই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশিত পন্থায় ভবিষ্যত প্রজন্মকে লালন-পালন এবং প্রস্তুত করতে পারবে। এই আলোচনা থেকে নতুন প্রজন্ম খেলাফতের বৈশিষ্ট্য, নেতৃবৃন্দের গুণাবলী, তৎকালীন জনসাধারণের ধরন এবং এই শাসনব্যবস্থার পতনের কারণ সম্পর্কে জানতে পারবে।
খুলাফায়ে রাশেদীনের দ্বিতীয় কিতাবে আল-ফারুক উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু, তার ব্যক্তিত্ব এবং যুগ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তিনি দ্বিতীয় খলীফা ছিলেন। আর সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে আবু বকর আস-সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরই তার মর্যাদাপূর্ন অবস্থান। আমরা যেন তাদের পথ ও নির্দেশনা অনুসরণ করি তার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, 'আমার সুন্নাত আঁকড়ে থাকবে এবং আমার পরে খুলাফায়ে রাশেদীনের অনুসরণ করবে।'
নবী ও রাসূলগণ এবং আবু বকর সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু আনহুর পরেই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু শ্রেষ্ঠতম। এই দু-জন প্রসঙ্গে রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'আমার পরে এই দুজনকে অনুসরণ করবে—আবু বকর এবং উমর।'
প্রসিদ্ধ কয়েকটি হাদীসে এসেছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রশংসা করেছেন। তাকে নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'তোমাদের পূর্ববর্তী
উম্মতসমূহের মধ্যে কিছু লোক ছিলেন মুহাদ্দাস (যারা ওহীপ্রাপ্ত ছিলেন না কিন্তু, তাদের জিহ্বা ছিল সত্যবাদিতায় সিক্ত)। আমার উম্মতের মধ্যে যদি এমন কেউ থেকে থাকে, তবে উমর ইবনুল খাত্তাবই হবে।
আরেকটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, 'স্বপ্নে দেখলাম, আমি কূপ থেকে পানি তুলছি। আবু বকর এসে দুর্বলভাবে এক কি দুই বালতি পানি তুললেন। আল্লাহ তাকে মাফ করুন।” তারপরে উমর ইবনুল খাত্তাব এলেন। তার হাতে গিয়ে বালতিটি বৃহদাকার হয়ে গেল। আমি আর কাউকে তার মতো শক্তির সাথে পানি তুলতে দেখিনি। সবাই তৃপ্তি নিয়ে পানি পান করল। তারপর তাদের উটগুলোকে পানি দিয়ে সেখানেই বসে পড়ল।
আমর ইবনুল আস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, "আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ কে?' তিনি বললেন, 'আয়িশা।' আমি বললাম, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, পুরুষদের মধ্যে কে?' তিনি বললেন, 'তার পিতা।' আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'তারপরে কে?' তিনি বললেন, 'উমর ইবনুল খাত্তাব।' তারপরে আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করলেন।"
ইসলামী ইতিহাসের পাতাগুলো উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আলোয় উদ্ভাসিত। এর তুলনায় অন্য যে কোনো ইতিহাস ম্লান মনে হয়। অন্যান্য রাষ্ট্রের ইতিহাস একত্র করলেও ওগুলোর বিষয়বস্তু তার জীবনের মাত্র একাংশের, যেমন: উত্তম আখলাক, মর্যাদা, আন্তরিকতা, জিহাদ এবং আল্লাহর দিকে মানুষকে আহ্বান করার প্রবণতার, পাশে অপ্রতুল মনে হবে। এ কারণে রেফারেন্স ও অন্যন্য উৎস ঘেঁটে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ শেষে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই করে নিয়েছি। কিতাবটি যেন দাঈ, খতীব, আলেম, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সেনিনায়ক, নেতাসহ তালেবে ইলম এবং সাধারণ উম্মতের জন্য উপকারী হয়, সেভাবে উপস্থাপনে সচেষ্ট।
ছিলাম। খুলাফায়ে রাশেদীনের অনুসরণ করে তারা উপকৃত হোন, আল্লাহ তা'আলা দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের সফল করুন, আমীন।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জন্ম থেকে শাহাদাত বরণ পর্যন্ত আগে পড়াশোনা করে নিয়েছি। এই কিতাবে তার বংশপরিচয়, পরিবার, জাহেলী যুগের জীবন, ইসলাম গ্রহণ, হিজরতের, কুরআনের প্রভাব, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্যে দ্বীন শিক্ষা, ইসলামী আখলাক গঠন আলোচিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর আস-সিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবদ্দশায় সেনাবাহিনীতে এবং মদীনার সমাজে তার অবদান বর্ণনা করেছি। তার খলীফা হওয়ার প্রক্রিয়া, শাসনপদ্ধতি, শূরা, ইনসাফ ও সমতা-বিধান এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর উল্লেখযোগ্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, তার পারিবারিক জীবন, আহলে বাইতের প্রতি সম্মান, তার সামাজিক জীবন, মুসলিমদের খলীফা হিসেবে পদলাভ, সমাজে বসবাসকারী নারীদের যত্ন নেওয়া, নেককার ব্যক্তিদের গুণাবলী ও কাজের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ, অবাধ্যদের প্রতি আচরণ, জনগণের সুস্বাস্থ্যের দিকে নজরদারী, বাজার তদারকীর পদ্ধতি প্রবর্তন, তাওহীদ রক্ষার্থে সমাজে শরীয়তের পাবন্দী, বাতিল ও বিতআতের বিরুদ্ধে লড়াই, ইবাদাতের পদ্ধতি নিয়ে সচেতনতা, মুজাহিদদের সম্মান রক্ষা ইত্যাদি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছি।
তার জ্ঞানার্জনের প্রতি আসক্তির কথাও এসেছে। তিনি মদীনায় বসে যেমন জ্ঞান শিক্ষা দিতেন, তেমনই সঠিক নির্দেশনাশেষে লোকজনকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। ক্রমে মদীনা ফাতওয়া আর ফিকহ-শাস্ত্রের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। তার প্রতিষ্ঠানে অসংখ্য আলেম, দাঈ, গভর্নর এবং কাজী তৈরি হয়েছে। তাছাড়া উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর প্রভাবে মক্কা, মদীনা, বসরা, কুফা, সিরিয়া এবং মিসরেও দ্বীনী মাদরাসা বিকাশ লাভ করতে থাকে। তিনি নিজের তত্ত্বাবধানে রেখে যে স্কলার তৈরি করেছিলেন কেবল তাদের হাতেই বিভিন্ন অঞ্চলের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন।
বিজিত ভূখণ্ডের সাথে সাথে মসজিদের সংখ্যাও বাড়তে লাগল। তিনি তার প্রশিক্ষিত সেনাপতি এবং গভর্নরদের হাতে মসজিদ তৈরির গুরুদায়িত্ব দেন। কারণ, নতুন ভূখণ্ডে ইসলামের প্রচার-প্রসার এবং
মুসলিম সভ্যতার বিকাশে মজিদের বিকল্প নেই। মসজিদ ছিল দ্বীনী বিদ্যাপীঠ। এখানে বসেই বিজ্ঞ সাহাবীগণ স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করা নতুন মুসলিমদের দ্বীন শেখাতেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের সময় জুমআর নামাজ পড়ার মতো বারো হাজার মসজিদ আবাদ হয়েছিল। তার সময়ে ইরাক, ইরান, সিরিয়া, মিসর এবং উত্তর আফ্রিকা মুসলিমদের দখলে আসে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাতে গড়া নামী-দামী আলেম, ফকীহ এবং দাঈগণ সেই ভূখগুলোর দায়িত্ব নেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতেন-কীভাবে এই অমূল্য সম্পদের ব্যবহার করতে হবে। তার নির্দেশনায় উলামায়ে কেরাম এবং ফকীহগণ সেনাবাহিনীর সাথে তাল মেলাতে সদা প্রস্তুত ছিলেন।
কবি ও কবিতার প্রতি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর আগ্রহের কথা বলা হয়েছে। খুলাফায়ে রাশেদীনের মধ্যে উমর ইবনে খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু সবচেয়ে বেশি কবিতা পছন্দ করতেন। তিনি খুব ভালো আবৃত্তিও করতেন। বলা হয়ে থাকে, তার জীবনে এমন কোনো ঘটনা নেই যেখানে তিনি সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অন্তত এক লাইন কবিতা আবৃত্তি করেননি। তিনি উঁচুদরের কাব্য-সমালোচকও ছিলেন। কবি ও কাব্যগুণ বিচারের ক্ষেত্রে তার নিজস্ব কিছু মানদণ্ড ছিল। কবিতায় আরবী ভাষার ব্যবহার, শব্দচয়ন, ভাব প্রয়োগ, আজে-বাজে ও উদ্ভট শব্দ ও ভাব বর্জন, স্বচ্ছতা, অকপটতা, অর্থবহ শব্দের ব্যবহার, সুন্দর শব্দাবলী ও ছন্দের যথাযথ প্রয়োগ এই মানদণ্ডের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি শরীয়তবিরোধী এবং অপমানজনক কবিতা লিখতে নিষেধ করতেন। এমন কবিদের তিনি নানভাবে প্রতিহত করার বেলায় সচেষ্ট ছিলেন। এমনও হয়েছে যে অপ্রীতিকর কবিতা লেখা বন্ধ করার জন্য তিনি আল-হাতায়াকে তিন হাজার দিরহাম দিয়েছিলেন।
পাঠক এই কিতাবে 'প্লেগের বছর' সম্পর্কে জানতে পারবেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু কীভাবে সেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছিলেন তার পুরো বর্ণনা আছে। সেবার প্লেগের ছোবলে সিরিয়ায় অবস্থানরত প্রধান সেনাপতিদের মৃত্যু ঘটেছিল। বিশ হাজারেরও বেশি মুসলিম মৃত্যুবরণ করে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজে সিরিয়াতে যান এবং ত্রাণের ব্যবস্থা করেন। সীমান্ত-রক্ষার জন্য গ্রীষ্ম ও শীতে সেখানে পাহারা বসান। সিরিয়ার সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি সেখানে গর্ভনর নিয়োগ করেন।
সেনাবাহিনী, সেনাপতি এবং জনসাধরণকে সুসংগঠিত করেছেন। মৃতদের সম্পদ জীবিতদের মাঝে বিলি-বণ্টন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
অর্থনৈতিক এবং বিচারব্যবস্থায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ভূমিকা ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছি। এখানে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং উৎসের প্রসঙ্গ এসেছে। সে যুগে অর্থনৈতিক উৎসের মধ্যে যাকাত, জিযিয়া, খারাজ, উশুর এবং যুদ্ধলব্ধ মালামাল খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাছাড়া বায়তুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার), মন্ত্রণালয় স্থাপন, রাষ্ট্রের ব্যয়নির্বাহ পদ্ধতি, বিজিত ভূখণ্ডের ইজতিহাদ এবং ইসলামী মুদ্রা ছাপানোর ঘটনা আলোচনা করেছি। আদালত প্রতিষ্ঠা, বিচারকদের কাছে পাঠানো গুরুত্বপূর্ণ চিঠি-পত্র, বিচারক নিয়োগপদ্ধতি, তাদের বেতন-ভাতা, তাদের যোগ্যতা ও দায়িত্ব, আইন প্রয়োগের হুকুম-আহকাম, সাক্ষ্য-প্রমাণ বিচারকদের ব্যবহৃত দলীলাদি, ইজতিহাদের ভিত্তিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রণীত আইনসমূহ, কূফার বায়তুল মালে চুরির ঘটনা, যিনা হারাম তা না জেনে তাতে লিপ্ত হবার ঘটনা ইত্যাদি উল্লেখ করা হয়েছে। গভর্নরদের সাথে প্রযুক্ত ফিকহ, মুসলিম রাষ্ট্র অধ্যুষিত এলাকার নাম, সে এলাকায় নিয়োজিত গভর্নরদের নামও অন্তর্ভুক্ত করেছি। যেসব গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালার ভিত্তিতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর গভর্নরদের নিয়োগ দিতেন, তাদের উপরে আরোপিত শর্ত, গভর্নরদের বৈশিষ্ট্য, তাদের অধিকার ও দায়িত্ব, তাদের ওপরে নজরদারী, তাদের জবাবদিহিতা, গভর্নরদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিণতি, গভর্নরদের শান্তি প্রদানের ঘটনাও আছে। খালিদ বিন ওয়ালিদকে বরখাস্ত করার ঘটনা একাধিকবার উল্লেখ করতে হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের কারণ, মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া, স্বয়ং খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর অনুভূতির কথা এবং মৃত্যুশয্যায় উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রসঙ্গে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর মন্তব্য বিবৃত হয়েছে।
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার খেলাফতকালে ইরাক, ইরান, সিরিয়া, মিসর এবং লিবিয়া জয় করেন। কারণ, এসব অভিযান থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। তাছাড়া উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং সেনাপতিদের মধ্যে লেনদেনকৃত চিঠিপত্রাদির ওপরে আলোকপাত করেছি। এগুলোর মধ্যে জনসাধারণকে পরিচালনা, রাষ্ট্রগঠন, সমাজ ও নেতাদের দিক নির্দেশনা,
যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে শিক্ষার উপকরণ বিদ্যমান। তিনি সেনাপতিদের কাছে যে চিঠিগুলো পাঠিয়েছিলেন তাতে যুদ্ধসংক্রান্ত আল্লাহর হুকুম-আহকাম বর্ণিত আছে, যেমন- শত্রুর সামনে দৃঢ় থাকা, কেবল আল্লাহ তা'আলার দ্বীন রক্ষার নিয়তে লড়াই করা, ঈমান বজায় রাখা, পক্ষপাতিত্ব থেকে বেঁচে থাকা ইত্যাদি। সেনাপতিদের আদেশ-নিষেধের তথ্যাদিও সংগ্রহ করেছি। তারা কীভাবে নির্দেশ পালন করবেন, আবার সৈন্যরা তাদের প্রতি কেমন আজ্ঞাবহ থাকবে, নজরদারীর পদ্ধতি, অভিযানকালে তাদের প্রতি মমতা দেখানো আর যুদ্ধের সময় উৎসাহ দানের পদ্ধতিও আলোচনা করা হয়েছে।
প্রসঙ্গক্রমে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাথে ভিন্ন রাষ্ট্রের রাজা-বাদশাহদের সম্পর্ক, অভিযানের পরিণতি, জীবনের শেষ দিনগুলোর বর্ণনা আছে। তিনি মুসলিম হবার পর থেকেই আল্লাহ তা'আলার সাথে সাক্ষাতের ব্যাকুলতা তার অন্তরে গেঁথে বসে। শাহাদাত বরণের শেষ দিন পর্যন্ত তার এই অনুভুতি জাগরুক ছিল। আমার চেষ্টা ছিল এই কিতাবের মাধ্যমে আমি ইসলাম সম্পর্কে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর উপলব্ধি, জীবনধারা, বিভিন্ন ঘটনাকে তিনি যেভাবে প্রভাবিত করেছেন, তার সবটুকু তুলে ধরতে চেয়েছি। ব্যক্তি উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর পাশাপাশি খলীফা উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক, সামরিক, প্রশাসনিক এবং বিচার সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। অর্থনৈতিক, বিচারিক, প্রশাসনিক এবং সামরিক প্রতিষ্ঠান উন্নয়নের পেছনে তার অবদানে আলোকপাত করেছি।
এই কিতাব উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মহত্ত্বের দলীল। এতে পাঠকমাত্রই তার ঈমান, জ্ঞান, বুদ্ধি, বাগ্মীতা, আচরণ এবং প্রভাবের উৎকৃষ্ট পরিচয় পাবেন। তিনি যেমন মহৎ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন, তার দ্বীনী বোঝাপড়া, আল্লাহ তা'আলার সাথে সম্পর্ক, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাত আঁকড়ে থাকার প্রবণতাও ছিল তেমনই শ্রেষ্ঠ পর্যায়ের।
সঠিক দিক-নির্দেশনাদানে তিনি অত্যন্ত সফল ছিলেন। কথা এবং কাজে তিনি অন্যদের জন্য অনুকরণীয়। তার জীবন ছিল নির্ভেজাল ঈমান, অনুপ্রেরণা এবং ইসলামের সঠিক উপলব্ধির বাস্তব উদাহরণ। আজ মুসলিম উম্মাহর মধ্যে এমন মানুষের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে-যারা
নিজেদের জীবনে সাহাবায়ে কেরামের জীবনের প্রতিফলন ঘটাবে এবং দ্বীনী হুকুম আহকামের অনুসরণ করতে গিয়ে তাদের মতো ত্যাগ স্বীকার করতে পারবে। নিসন্দেহে খুলাফায়ে রাশেদীন এবং সাহাবায়ে কেরামের ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে হাতে ধরে পথ দেখাবে। এমন মহাপুরুষদের উদাহরণ ও শিক্ষা এ যুগে অনুকরণ করতে পারলে আমাদেরই লাভ। তখন আমরা বুঝতে পারবো, সাহাবায়ে কেরামের জীবন ও শিক্ষা সব অবস্থায়, সব যুগেই অনুকরণীয়। ঈমান যত দৃঢ় হয় আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের ধারণাও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে মানুষও ক্রমশ সচেতনতার সাথে কাজে করতে শেখে। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা এমন ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সাফল্য দেন এবং সব অবস্থায় তাদের স্বার্থ হেফাযত করেন। কিতাবটি সর্বাঙ্গীণ সুন্দর এবং ত্রুটিমুক্ত রাখতে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবন ও যুগ নিয়ে গবেষণায় কোনোরকম কার্পণ্য করিনি। আমি তার জন্য আল্লাহ তা'আলার সাহায্য প্রার্থনা করছি। আমি আমার এই চেষ্টার বদলে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি এবং উত্তম প্রতিদান প্রার্থনা করছি। আল্লাহ তা'আলা, যিনি সুন্দরতম নামসমূহের অধিকারী, যিনি সবার দুআ কবুলের মালিক, আমার কিতাবকে কল্যাণকর সাব্যস্ত করুন। ১৩ই রমজান ১৪২২ হিজরী/ ২৮ নভেম্বর ২০০১, বুধবার সকাল ৭টা ৫-এ কিতাবটি লেখা শেষ হলো। আদ্যোপান্ত, সকল প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার কাছে দুআ করছি, তিনি আমার কাজ কবুল করে নিন, যাতে মানুষের অন্তরে তা বসে যায় এবং তাদের জন্য কল্যাণকর সাব্যস্ত হয়। এর মাধ্যমে সবার প্রতি রহমত ও বরকত নাযিল হোক। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন,
مَا يَفْتَحِ اللَّهُ لِلنَّاسِ مِنْ رَّحْمَةٍ فَلَا مُمْسِكَ لَهَا ۚ وَمَا يُمْسِكُ فَلَا مُرْسِلَ لَهُ مِنْ بَعْدِهِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
আল্লাহ মানুষের জন্য যে রহমত খুলে দেন, তা ফেরাবার কেউ নেই এবং তিনি যা রুদ্ধ করেন, এমন কেউ নেই যে তারপর তা উন্মুক্ত করতে পারে তিনি ছাড়া। তিনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়।
আবারও আল্লাহ তা'আলার কাছে কুণ্ঠচিত্তে তাঁর রহমত, বরকত এবং যাবতীয় অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তিনি পরম করুণাময়, সাহায্যদাতা, সব শক্তির উৎস। আমি আল্লাহ তা'আলার সুন্দরতম উত্তম নাম ও সিফাতসমূহের (গুণাবলীর) অসিলায় দুআ করছি, আমার আমল যেন হয় কেবল তাঁর সন্তুষ্টির জন্য এবং একে তাঁর বান্দাদের জন্য কল্যাণকর পাথেয় বানিয়ে দেন। আমাকে এই কিতাবের প্রত্যেক বর্ণের বিনিময়ে নেকি দান করুন এবং আমার মিযানে একে স্থাপন করুন। যারা এই নেক কাজে শরীক হয়েছেন তিনি তাদেরও উত্তম প্রতিদান দেন। প্রত্যেক মুসলমানের কাছে অনুরোধ করছি, যারা কিতাবটি পড়বেন, তারা তাঁদের দু'আয় এই অধম বান্দাকে শামিল করে নেন। আমি আল্লাহর ক্ষমা, দয়া আর সন্তুষ্টির একনিষ্ঠ ভিখারী।
رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضُهُ وَأَدْخِلْنِي بِرَحْمَتِكَ فِي عِبَادِكَ الصَّالِحِينَ
হে আমার পালনকর্তা, তুমি আমাকে সামর্থ্য দাও, যাতে আমি তোমার সেই নেয়ামতের শোকর করতে পারি যা তুমি আমাকে ও আমার পিতামাতাকে দান করেছ এবং যাতে আমি তোমার পছন্দনীয় সৎকাজ করতে পারি এবং আমাকে নিজ অনুগ্রহে তোমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করো।
এই দুআর মাধ্যমে ভূমিকা শেষ করছি।
وَآخِرُ دَعْوَاهُمْ أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
আর তাদের শেষ কথা হবে, আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন (সমস্ত প্রশংসা কেবল আল্লাহর জন্য) বলে।
ড. আলী মুহাম্মাদ আস-সাল্লাবী
টিকাঃ
১. সূরা আলে-ইমরান, ৩: ১০২।
২. সূরা আন-নিসা, ৪: ১।
৩. সূরা আল-আহযাব, ৩৩: ৭০-৭১।
৪. সূরা আত-তাওবা, ৯ : ১০০।
৫. সূরা আত-ফাতহ, ৪৮: ২৯।
৬. সহীহ, মুসলিম, ৪/১৯৬৩-১৯৬৪।
৭. শরহুস-সুন্নাহ, আল-বাগাভী, ১/২১৪-২১৫।
৮. শরহুস-সুন্নাহ, আল-বাগাবী, ১/২১৪-২১৫।
৯. সুনান, আবু দাউদ, ৪/২০১; সুনান, আত-তিরমিযী, ৫/৪৪; এই হাদীসটি হাসান সহীহ।
১০. সহীহ সুনান তিরমিযী, আল-বানি, ৩/২০০।
১১. সে সময় কথায় কথায় মুসলমানরগণ 'আল্লাহ মাফ করুন' বলতেন। আবু বকর রা.-এর বেলায়ও এ কথা প্রযোজ্য।
১২. সহীহ, মুসলিম, হাদীস নং ২৩৯৩।
১৩. আল-ইহসান ফী সহীহ ইবনে হিব্বান, ১৫/৩০৯।
১৪. সূরা ফাতির, ৩৫:২।
১৫. সূরা আন-নামল, ২৭: ১৯।
১৬. সূরা ইউনূস, ১০: ১০।
📄 উপসংহার
উপসংহার
উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর মৃত্যুর সাথে ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হলো। ইতিহাসে তিনি জ্ঞান ও দূরদর্শিতায় একজন একক ব্যক্তিত্ব হিসাবেই পরিচিত। সম্পদ সঞ্চয় কিংবা দুনিয়ার ক্ষমতা অর্জন তার জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল না; তার পদমর্যাদা তাকে সত্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি এবং তিনি তার ছেলে বা নিকটাত্মীয়দের কোনো অন্যায় কাজে প্রশ্রয় দেননি; বরং তার মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামকে সাহায্য করা। আর তার সবচেয়ে বড় ইচ্ছা ছিল দুনিয়ার বুকে শরয়ী আইনকে প্রতিষ্ঠিত করা। তিনি তার অধীন সকল মানুষের মধ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। একটি জাতির সুদীর্ঘকালের তুলনায় তার শাসনামল ছিল অতি সামান্য। এর মধ্যেই তিনি আল্লাহর অনুগ্রহে এসব অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তার জীবনী অধ্যয়নে নতুন প্রজন্ম ইসলামের প্রথম যুগের গৌরব ও ঐতিহ্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত খুঁজে পাবে। আর এটি তাদের এ শিক্ষা দেবে যে, সর্বশেষ প্রজন্মের হেদায়েত লাভে এমন নীতির অনুসরণই প্রয়োজন, যা প্রথম প্রজন্ম অনুসরণ করেছিলেন। খুলাফায়ে রাশেদীনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ, তাদের সময়কে যথাযথ অনুধাবন এবং ওই সময়কার মানুষজন যেভাবে দ্বীনের দিকে অগ্রসর হয়েছিল—তা অনুসরণ করেই দাঈ এবং উলামায়ে কেরামকে বিশ্বমানবতাকে সর্বোতভাবে সাহায্য করতে পারবে। ইসলামের সভ্যতা-সংস্কৃতির অতীত গৌরব ও মর্যাদায় আসীন হওয়ার জন্য এর বিকল্প কিছু নেই।
আল্লাহ এ কাজকে কবুল করুন, এতে বরকত দেন এবং মানুষের উপকারে নিয়োজিত করুন। আল্লাহ বলেন,
مَا يَفْتَحِ اللَّهُ لِلنَّاسِ مِنْ رَّحْمَةٍ فَلَا مُمْسِكَ لَهَا وَ مَا يُمْسِكُ فَلَا مُرْسِلَ لَهُ مِنْ بَعْدِهِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
আল্লাহ মানুষের জন্য যে রহমত উন্মুক্ত করে দেন তা আটকে রাখার কেউ নেই। আর তিনি যা আটকে রাখেন, তারপর তা ছাড়াবার কেউ নেই। আর তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
আমি আশা করি, এ বইয়ের পাঠকগণ লেখকের জন্য দুআ করতে ভুলবেন না যে আপনাদের দুআ এবং আল্লাহর রহমতের খুবই মুহতাজ। মহান আল্লাহ বলেন,
رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَى وَ عَلَى وَالِدَيَّ وَ أَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضُهُ وَأَدْخِلْنِي بِرَحْمَتِكَ فِي عِبَادِكَ الصَّلِحِينَ
হে আমার রব, তুমি আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছ তার জন্য আমাকে তোমার শুকরিয়া আদায় করার তাওফীক দাও। আর আমি যাতে এমন সৎকাজ করতে পারি যা তুমি পছন্দ করো। আর তোমার অনুগ্রহে তুমি আমাকে তোমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করো।
কতই-না পরিপূর্ণ তুমি, হে আল্লাহ, সব প্রশংসা কেবল তোমার জন্য। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তুমি ছাড়া আর কেউ ইবাদতের উপযুক্ত নেই। আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই এবং সব গোনাহ থেকে তোমার কাছে তওবা করছি।
وَآخِرُ دَعْوَاهُمْ أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
তাদের শেষ কথা হবে, আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন (সমস্ত প্রশংসা কেবল আল্লাহর জন্য)।
একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ক্ষমা এবং সন্তুষ্টির ভিখারি আলী মুহাম্মাদ আস-সাল্লাবী