📘 ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ > 📄 সংস্কারমূলক কর্মসূচী

📄 সংস্কারমূলক কর্মসূচী


১. বনু হাশিম
২. যুক্ত দাস
৩. অমুসলিম সংখ্যালঘু / যিমি
৪. বন্দী

📘 ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ > 📄 বনু হাশিম

📄 বনু হাশিম


বনু উমাইয়াগণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভ করার পর প্রাক ইসলাম যুগের আরবের সেই পারস্পারিক সংঘর্ষ সৃষ্টিকারী গোত্রীয় বিদ্বেষকে ঘৃতাহুতি দিয়ে আসছিল যা একজনকে অপর জনের বিরুদ্ধে লড়তে এবং একের রক্তে অন্যের হাত রঙ্গীন করতে তাদেরকে উৎসাহিত করত।

যদিও মহানবী (সা) বংশবিদ্বেষ ও আভিজাত্য গৌরবকে নেহায়েত নীচ স্বভাব হিসেবে অবহিত করেছিলেন। যদিও তিনি বনু উমাইয়াগণকে তাঁর নৈকট্যে আকর্ষণ করতেই আবু সুফিয়ানের এক কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। হযরত মুয়াবিয়া (রা)কে তাঁর ওহী লেখক নিযুক্ত করেছিলেন, উমাইয়া বংশীয় কোন কোন লোকের উপর বিশেষ অনুগ্রহ করেছিলেন।

হযরত ওসমান (রা)-এর শাহাদাতকে কেন্দ্র করে হাশেমী ও উমুরী গোত্রদ্বয়ের মধ্যে বংশবিদ্বেষের যে দুষ্ট ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল, এতেই এ দুটি শিবির একে অপর হতে দূরে চলে গিয়েছিল। উমুরী খলিফাগণ মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে হযরত আলী (রা) কে গালিগালাজ করত। তাদের মজলিসে বনু হাশিমদের কোন স্থান ছিল না। বনু হাশিমগণ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বংশ, আত্মীয় আহলে বাইত হওয়ার পরও তারা তাদেরকে নীচ ও অস্পৃশ্য বলে মনে করত। বায়তুল মাল হতে তাদেরকে কোন প্রকার সাহায্য প্রদান করা হত না।

বিশেষতঃ খলীফা আব্দুল মালেক, ওয়ালীদ ও সুলায়মানের যুগে অসহায় বনু হাশিমগণ খুবই দুঃখ-কষ্টে জীবন অতিবাহিত করেছিল।

পূর্বেই আলোকপাত করা হয়েছে যে, এ মিল্লাতের উপর হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ এটাই যে, তিনি বনু হাশিম এবং উমাইয়াদের মধ্যকার বংশগত ঘৃণা-বিদ্বেষকে দূর করে পারস্পরিক সদ্ভাব সৃষ্টি করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।

মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে হযরত আলী (রা) কে যে অশ্লীল কথা বলা হত, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ ওকে আইনতঃ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি স্বয়ং মিম্বরে আরোহন করে গালির পরিবর্তে কুরআনের এ আয়াতটি পাঠ করতেন-
رَّبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيْمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا -

"প্রতিপালক আমাদেরকে এবং আমাদের ভাইগণকে যারা আমাদের পূর্বে ঈমান এনেছেন ক্ষমা কর এবং যারা ঈমান এনেছে তাদের প্রতি আমাদের অন্তরে কোন প্রকার বিদ্বেষ সৃষ্টি করো না।"

তিনি যেন প্রত্যেক শুক্রবার দিন মুসলমানগণকে এ কথাই বুঝিয়েছিলেন যে, পূর্ববর্তী मुसलमानों প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা জায়েয নেই এবং তার পূর্বে তার বাপ-দাদাগণ যে কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করেছিল উহা সম্পূর্ণরূপেই ভুল ছিল।

এ ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত কঠোর নীতি অবলম্বন করেছিলেন। তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের সমস্ত শাসনকর্তাগণকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তারা যেন হযরত আলী (রা)-এর প্রতি গালি-গালাজের স্থলে উপরিউক্ত আয়াত পাঠ করে যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে, এরূপ গালিগালাজ করা মোটেই জায়েয নেই।

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ এটুকু করেই ক্ষান্ত হননি। তিনি বনু হাশিমগণকে তার পার্শ্বে ডেকে এনে বিশেষ অনুগ্রহও প্রকাশ করতেন।

ঐতিহাসিক ইবনে সাদ বলেন, তিনি যখন মদীনার শাসনকর্তা ছিলেন, যখন তিনি খলিফা হননি, তখন হতেই এ হিংসা বিদ্বেষ দূর করার জন্য চেষ্টা শুরু করেছিলেন। তিনি তার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু বান্ধব সকলের নিকটেই হযরত আলী (রা) এবং অপরাপর আহলে বাইতের প্রশংসা করতেন।

📘 ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ > 📄 হযরত আলী (রা)-এর গোত্র

📄 হযরত আলী (রা)-এর গোত্র


হযরত ফাতেমার কথাই এর সাক্ষ্য, তিনি বলেন ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের খেলাফতের যুগে একদা আমি তাঁর নিকট গমন করেছিলাম। তিনি তাঁর কক্ষ হতে পরিষদ ও প্রহরী সকলকে বের করে দিলেন, শুধু তার কক্ষে তিনি ও আমি ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, হে আলীর কন্যা! আল্লাহর কসম! দুনিয়ায় তোমার বংশের চেয়ে আমার নিকট অধিক প্রিয় আর কোন বংশ নেই, এমনকি তোমার পরিবার আমার পরিবার পরিজন হতেও আমার নিকট বেশি প্রিয়।

তিনি ফাতেমার নিকট মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত কিছুই বলেননি। তাঁর নিকট এ বংশ বাস্তবিকই তাঁর বংশের চেয়েও বেশি প্রিয় ছিল। খেলাফত লাভের পর তারা আরও অধিক প্রিয়তর হয়েছিল। তিনি তাঁদের সাথে সকল প্রকার যোগ-সূত্র রক্ষা করে তাঁদের সকল প্রকার অধিকার আদায় করে দিলেন। এমনকি ফাদাকের বাগানটিও তাদেরকে ফিরিয়ে দিলেন- যার আমদানী ছিল বার্ষিক দশ হাজার দীনার। আর সবসময় আহলে বাইতের সদস্যগণ এটা লাভ করতে আশান্বিত ছিলেন। এর জন্যই হযরত ফাতেমা (রা) হযরত আবু বকর (রা)-এর সাথে মনোমালিন্য হয়েছিল। অবশ্য হযরত আবু বকর (রা) এ বাগান তাদেরকে অর্পণ না করে তার কর্তৃত্ত্বাধিনে রাখলেন এবং মহানবী (সা) যে প্রকারে এর আমদানী ব্যয় করতেন তিনি তাই করলেন।

হযরত ফাতেমা (রা)-এর পর আহলে বাইতগণ এ ফাদাক নামক বাগানটি তাদের অধিকার বলেই মনে করতেন।

বাইতুল মাল হতে ভাতা নির্ধারণ প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে যে, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ খলীফার পদে আসীন হয়েই দশ হাজার দীনার মদীনায় পাঠিয়ে দিলেন এবং মদীনার শাসনকর্তা ইবনে হাজমকে সমুদয় অর্থ হাশিম বংশীয়দের জন্য ব্যয় করতে নির্দেশ দিলেন।

পূর্বে এটাও উল্লেখ করা হয়েছে যে, স্ত্রী-পুরুষ, বালক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে বনু হাশিমের প্রত্যেক ব্যক্তিই এ দশ হাজার দীনার হতে ৫০ দীনার করে পেয়েছিলেন।

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ যখন তাঁদের প্রতি এরূপ দয়ার হাত প্রসারিত করলেন, তখন হযরত হুসাইন (রা)-এর কন্যা হযরত ফাতেমা খলিফাকে লিখলেন, আপনি আল্লাহর রাসূলের পরিবার পরিজনকে সাহায্য করে এ উপকার করেছেন যে, তাদের যার খাদেম ছিল না, সে খাদেমের ব্যবস্থা করেছে, যার কাপড়ের ব্যবস্থা ছিল না সে কাপড় খরিদ করেছে এবং যার নিকট ব্যয় করার কোন অর্থই ছিল না, এটা দিয়ে সে তার দৈনন্দিন খরচের ব্যবস্থা করেছে।

ইবনে সাদের অপর এক বর্ণনায় আছে যে, হযরত ফাতেমার এ চিঠি নিয়ে বাহক যখন হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের দরবারে আসল তখন তিনি কাসেদকে দশ দীনার পুরস্কার দিলেন এবং ফাতেমার প্রয়োজনীয় খরচের জন্য আর পাঁচশত দীনার কাসেদের নিকট দিয়ে দিলেন।

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ এটাই যে, তিনি বনু হাশিম ও বনু উমাইয়াদের পারপরিক গোত্রীয় গোঁড়ামীর বিষময় প্রতিক্রিয়া দূর করে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে চেষ্টা করেছিলেন এবং বনু হাশিমগণকে সে জাতির শ্রেষ্ঠতর সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছিলেন।

এ অর্থ ছাড়াও প্রত্যেক হাশিম বংশীয়গণ পঞ্চাশ দীনার ভাতা পেতেন। হযরত যুল কুরবার (রাসূলের নিকট আত্মীয়) নির্ধারিত পঞ্চমাংশ হতে এর ব্যবস্থা করে তাদের দীর্ঘদিনের অভাব দূর করে তাদেরকে বিত্তশালী করে দিয়েছিলেন।

ইবনে সাদ বলেন, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ যখন তাদের প্রতি এরূপ অনুগ্রহের হস্ত প্রসারিত করলেন, তখন বনু হাশিমগণ এক সাধারণ সমাবেশের ব্যবস্থা করে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের এ সব কাজের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে খলিফার নিকট একজন দূত প্রেরণ করলেন।

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাদেরকে উত্তরে লিখলেন, আমি যদি জীবিত থাকি তবে তোমাদের সকল অধিকার ফিরিয়ে দেব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00