📄 প্রথম পদক্ষেপ
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সুলায়মানের জানাযায় নামায পড়িয়ে যখন তাকে দাফন করলেন তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ অন্য কোন কাজ করার পূর্বেই দোয়াত-কলম আনিয়ে সর্বপ্রথম তিনটি নির্দেশ প্রদান করলেন।
লোকজন তাঁর ব্যস্ততায় কানাঘোষা করতে লাগল। কেউ কেউ বলল, "এতো তাড়াহুড়া কেন, এ কাজ তো তিনি ঘরে ফিরেও করতে পারতেন। মনে হয় খেলাফতের লোভ-লালসায় তাঁকেও পেয়ে বসেছে।
ইবনুল হাকام বলেন, খেলাফতের লোভ-লালসার কারণেই ওমর ইবনে আবদুল আজিজ দোয়াত-কলম আনার ব্যবস্থা করেননি, বরং তিনি নিজেই নিজের পর্যালোচনা করেছেন এবং এই অবহেলাও তার অনুভুতি এবং কর্তব্য পরায়ণতার প্রতিকূলে ছিল বলেই তিনি এরূপ ব্যস্ততা প্রকাশ করেছিলেন।
এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, ওমর ইবনে আবদুল আজিজের এ ব্যস্ততার কারণ কর্তব্যপরায়ণতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কেননা, যদি তিনি বাদশাহী পছন্দ করতেন, যদি তিনি বাদশাহীর উপকরণাদি লাভ করতে ভালবাসতেন তবে ওয়ালিদ বা সুলাইমানের যুগে প্রকাশ্যে না হোক গোপনে হলেও এর জন্য কোন প্রচেষ্টা চালাতেন। অথচ বাস্তব ও সত্য কথা হলো ঐতিহাসিক ইবনে আব্দুল হাকام স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, সমগ্র বনু উমাইয়ার মধ্যে ওয়ালিদ ও সুলায়মান ব্যতীত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বনু উমাইয়ার সকলের নিকটেই প্রিয়পাত্র ছিলেন। তিনি দেশব্যাপী উলামা, ফুকাহা এবং মুহাদ্দেসিন -সকলের নিকটেই প্রশংসনীয় ছিলেন। তদুপরি মিশর ও আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকায় তাঁর যথেষ্ট সংখ্যক ভক্ত-অনুরক্ত ছিল। তিনি ইচ্ছা করলে ওয়ালিদ বা সুলায়মানের যুগেও মিশরে স্বাধীনভাবে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। কারণ তৎকালীন তিনজন নামকরা সেনাপতি মোহাম্মদ ইবনে কাসেম, মূসা ইবনে নাছীর এবং কুতাইবা ইবনে মুসলিম ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পরম ভক্ত ছিল। বিশেষতঃ মূসা ও কুতাইবা তাঁর ইশারায় লাখ লাখ সৈন্যসহ ময়দানে হাজির হতে দ্বিধাবোধ করত না।
মূসা ইবনে নাছীর সম্পর্কে ঐতিহাসকদের ধারণা হলো, মূসার সাথে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পিতা আব্দুল আজিজের বন্ধুত্ব ছিল। ওমরের সাথেও মূসার সম্পর্ক সেরূপ ঘনিষ্ট ছিল। কারণ মূসা যখন ইরাকের মন্ত্রী ছিলেন, তখন খলীফা আব্দুল মালেকের রোষে পড়ে তিনি কুফা হতে পালিয়ে মিশরে আব্দুল আজিজের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। এটা জানতে পেরে আব্দুল মালেক তার ভাই আব্দুল আজিজকে লিখলেন যে মূসা পলাতক ব্যক্তি-তাকে দামেশকে পাঠিয়ে দেয়া হোক। কিন্তু আব্দুল আজিজ কোন পরওয়াই করলেন না। বরং তাকে তিনি আফ্রিকার শাসনকর্তা নিযুক্ত করে সেখানকার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করে দিলেন। মূসাও সেই সুযোগে বিপুল পরিমাণে শক্তি বৃদ্ধি করে নিলেন।
সুলাইমান তার অভিষেকের সময় যখন মূসাকে গ্রেফতার করেন, তখন ওমর ইচ্ছা করলে মূসাকে স্বপক্ষে আনতে পারতেন এবং মূসাও তার সমর্থন পেলে এমন এক বিদ্রোহ ঘটাতে পারতেন যার ফলে সুলাইমান কেন, সমগ্র বনু উমাইয়ার নাম-নিশানা পর্যন্ত মুছে যেত। কিন্তু ওমর ইবনে আবদুল আজিজ এমনটা করলেন না।
যদি তিনি খেলাফত পরিচালনার লোভ করতেন তবে কুতাইবা ইবনে মুসলিম- যিনি প্রাচ্যের মহান বিজেতা ছিলেন, তার দ্বারাও তিনি সে দিনই খেলাফতের পতাকা উড্ডীন করতে পারতেন, যেদিন দামেশকে সুলাইমানের খেলাফতের সাধারণ বায়আত গ্রহণ করা হয়েছিল। ইবনে কাছীর স্পষ্ট ভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, ইয়াজিদ ইবনে মুহারিবের কারণে কুতাইবা সুলায়মানের প্রতি বিরূপ ভাবাপন্ন ছিলেন। তিনি সুলায়মানকে পদচ্যুত করার জন্যে এক বিরাট সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন। যদি ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ গোপনে ও একজন সংবাদ বাহকের মাধ্যমে তাকে কোন ইঙ্গিত দান করতেন যে সুলাইমানের পরিবর্তে তুমি আমার বায়আত গ্রহণ কর তবে কুতাইবা তাঁর এতটুকু ইশারায় তার খেলাফতের পতাকা উড্ডীন করে দিতেন। এবং তার এ কর্মতৎপরতায় কেউ বাধা দিতে সাহস পেত না। তিনি প্রকাশ্যে রাজধানী দামেস্কে এসে উপস্থিত হতেন, আর একজন উমুবী যুবরাজের পৃষ্ঠপোষকতাই তাকে তাঁর এ সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দিত।
কিন্তু ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ খেলাফতের মসনদকে শুধু কণ্টকাপূর্ণ নয় বরং অগ্নিস্ফুলিঙ্গ পূর্ণ শয্যা মনে করতেন। তিনি বলতেন, যে ব্যক্তির ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র ও স্বাধীনতা থাকে, সে খলিফা নিযুক্ত হবার পর তার সেই অধিকারটুকুও খর্ব হয়ে যায়।
যা হোক, তাঁর এরূপ কর্তব্যপরায়ণতাই সুলাইমানের জানাযার পর তাঁকে তিনটি ফরমান জারি করতে বাধ্য করেছিল। তন্মধ্যে প্রথম ফরমান ছিল মুসলিমা ইবনে আব্দুল মালেককে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে।
বিখ্যাত ঐতিহাসিক তাবারীর মতে, সুলাইমান ইবনে আব্দুল মালেক তার ভাই মুসলিমাকে ৯৮ হিজরীতে কনষ্টান্টিনোপলে প্রেরণ করে নির্দেশ দিয়েছেন যে, কনষ্টান্টিনোপল জয় না করা পর্যন্ত সে সেখানেই অবস্থান করবে, পরবর্তী নিদের্শ না পাওয়া পর্যন্ত সে ফিরে আসতে পারবে না।
মুসলিমা যখন সেখানে গিয়ে কনষ্টান্টিনোপুলের নিকটবর্তী হলেন, তখন তিনি প্রত্যেক অশ্বরোহীকে দুই মণ গম সঙ্গে নিতে নির্দেশ দিলেন। অশ্বরোহী সৈনিকগণ তাঁর নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করল এবং তারা কনষ্টান্টিনোপুলের নিকটে গমের একটি পাহাড় সৃষ্টি করে দিল। মুসলিমা তাদেরকে এ গম খেতে নিষেধ করলেন এবং রোমানদের ভান্ডার লুণ্ঠন করে এবং তাঁদের কৃষিক্ষেত্রে চাষ করা খাদ্য সংগ্রহ করতে নির্দেশ দিলেন।
সৈন্যবাহিনী কাঠ-খড় দ্বারা সেখানেই ঘর-বাড়ী নির্মাণ করে কৃষিকাজ শুরু করে দিল। তাদের কৃষিক্ষেত্রে ফসল উৎপন্ন না হওয়া পর্যন্ত তারা লুটতরাজ করে তাদের খাদ্য সংগ্রহ করতো। যখন তাদের কৃষি ক্ষেত্রে ফসল উৎপন্ন হল তখন পূর্বের খাদ্য সংরক্ষণ করে উৎপন্নদ্রব্য তারা খেতে লাগল।
তাবারী বলেন, বাহ্যতঃ মুসলিমার এ কর্মসূচী খুবই উত্তম ছিল। কিন্তু রোমানগণ চালাকী করে তাদের এ কর্মসূচী সম্পূর্ণরূপে ভন্ডুল করে দিল। রোমান সেনাপতি এক রাত্রিতে অর্তকিতে আক্রমণ করে মুসলমানদের নতুন ও পুরাতন উভয় শষ্য ভান্ডারে আগুন ধরিয়ে দিল। সমস্ত শষ্য ভান্ডার পুড়ে ভষ্ম হয়ে গেল। এখন সুলাইমানের সৈন্যবাহিনী খাদ্যের বিরাট সংকটের সম্মুখীন হয়ে মৃত্যুবরণ করতে লাগল।
মুসলমানরা খাদ্যের অভাবে তাদের বাহনের জন্তগুলি খেয়ে অবশেষে বৃক্ষের মূল ও পাতা খেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে লাগল। সুলাইমান যথারীতি এ সংবাদ অবগত হয়ে এর কোন প্রতিকার করলেন না। তিনি অত্যন্ত একগুঁয়ে ছিলেন। তিনি ওয়াবেক নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু মুসলমান সৈন্যবাহিনীকে কনষ্টান্টিনোপুল ত্যাগ করতে অনুমতি দিলেন না। তাবারী এ ঘটনা উল্লেখ করে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা বাস্তবিকই করুণ ও মর্মান্তিক। তিনি বলেন, তারা অনাহারে তাদের বাহনের সমস্ত পশু খেয়ে ফেলল, মাটি ব্যতিত গাছের শিকড় ও পাতাসহ সবকিছুই তারা ভক্ষণ করছিল, অথচ সুলাইমান ওয়াবেকে অবস্থান করেও এর কোন প্রতিকার বিধান করতে এগিয়ে আসলেন না। এভাবেই শীতকাল এসে পড়ল এবং সুলায়মান মৃত্যুমুখে পতিত হলেন।
ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, রোমানরা যখন মুসলমানদের সাথে প্রবঞ্চনা করে তাদের খাদ্যসামগ্রী জ্বালিয়ে দিল এ সংবাদ শুনে সুলাইমান খুবই রাগান্বিত হয়ে কসম করলেন যে, তিনি মুসলিমাকে আর ফেরত আনবেন না।
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট এটা একটি নিবর্তনমূলক কসম ছিল, কাজেই তিনি সুলাইমানের জানাযা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এ কসম ভঙ্গ করে মূহুর্তকাল বিলম্ব না করেই মুসলিমাকে দেশে ফিরে আসতে নির্দেশ দিলেন। তিনি লিখলেন তুমি ফিরে আস। এবং সমস্ত সৈন্যবাহিনীকে দামেস্কে ফিরিয়ে আন।
সুলায়মানের জীবিত অবস্থায় যখন তিনি মুসলমানদের এ দুঃখ কষ্টের কথা জানতে পারলেন তখন সুলায়মান একগুঁয়েমিতে অবিচল ছিলেন কিন্তু ওমর ইবনে আবদুল আজিজ অত্যন্ত বিচলিত ও মর্মাহত হয়েছিলেন।
ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, এটা ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে বিচলিত ও মর্মাহত করেছিল অতঃপর তিনি খেলাফতের পদ লাভ করার পর এক মূহুর্তও মুসলমানদের দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে পারলেন না। এ কারণেই তিনি পত্র লিখতে ব্যস্ততা প্রকাশ করেছিলেন।
তিনি দ্বিতীয় যে পত্র লিখেছিলেন তা প্রথম পত্র অপেক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি এ পত্রের মাধ্যমে মিশরের রাজস্ব সচিব উসামা ইবনে যায়েদ আত্মানুহীকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। তিনি আরো নির্দেশ দিলেন যে, তাকে প্রত্যেক ঘাটিতে এক বছর করে বন্দী করে রাখা হোক।
ইবনে হাকام এ কঠোর নির্দেশের কারণ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন যে, সে ছিল একজন অত্যাচারী ও আল্লাহর সীমালঙ্ঘনকারী শাসক। সে মানুষকে আল্লাহর বিধানের বিপরীতে শাস্তি দিত। সে এমন সব অপরাধে মানুষের হাত কেটে দিত যাতে আল্লাহপাক অনুরূপ বিধান দেননি। সুতরাং ওমর ইবনে আবদুল আজিজের ন্যায় কর্তব্যপরায়ণ আল্লাহভীরু শাসনকর্তা এরূপ জালেম ও জল্লাদ কর্মকর্তাকে কিভাবে বরদাশত করতে পারেন? অতএব তিনি যথাশীঘ্র সম্ভব মুসলমানগণকে এরূপ পাপিষ্ট ব্যক্তির হাত থেকে মুক্তি দিতে ব্যস্ততার সাথে পত্র লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন।
তিনি তৃতীয় ফরমান লিখেছিলেন আফ্রিকার শাসনকর্তা ইয়াযিদ ইবনে আবু মুসলিমকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে। ইয়াযিদ ইবনে মুসলিম শাহী নির্দেশাবলী অতি কঠোরভাবে কার্যকরী করত, মানুষের উপর সীমাহীন জুলুম-অত্যাচার করত, মানুষকে বিনা অপরাধে শাস্তি দিত। অথচ সে যথারীতি আল্লাহর যিকির ও তসবীহ তাহলীলও পাঠ করত। সে যখন কাউকে শাস্তি দিত তখন তার গোলামকে আদেশ দিত, সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, হে বালক! তার শরীরের অমুক অমুক স্থানে জোরে জোরে আঘাত কর। কখনো কখনো লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ আল্লাহু আকবার ধ্বনী করে এসব নির্দেশ দিত।
বাস্তবিক পক্ষে এটা আল্লাহর যিকির ও ইসলামের প্রতি বিদ্রূপেরই নামান্তর ছিল। সে যেন আল্লাহর নাম নিয়েই মানুষের উপর জুলুম অত্যাচার করত এবং মানুষকে শান্তি দিত।
এ তিনটি ফরমান লিখে যখন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সুলায়মানের কবরস্থান হতে উঠে আসলেন, তখন তাঁর জন্য শাহী সওয়ারী হাজির করা হল। তিনি এ সমস্ত সওয়ারী দেখে বললেন, এ সমস্ত কিসের সওয়ারী? উত্তর দেওয়া হল, এ নবনির্বাচিত খলিফার জন্য নির্ধারিত সওয়ারী। ইতোপূর্বে এসব বাহনে আর কেউ আরোহন করেনি। এতে নবনির্বাচিত খলিফা প্রথম দিন আরোহন করে থাকেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এসব সওয়ারী ফিরিয়ে দিয়ে তার নিজের খচ্চরের দিকে এগিয়ে চললেন এবং ব্যক্তিগত সেবক মুজাহিমকে বললেন, এ সমস্ত বায়তুল মালে নিয়ে যাও। এগুলি সাধারণ মুসলমানের সম্পদ।
ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, তাঁর জন্য এরূপ নতুন তাঁবু ও শামিয়ানা টানানো হল-যাতে ইতোপূর্বে আর কেউ তাতে বসবাস করেনি। এটাই সাধারণ প্রচলিত প্রথা ছিল। যে ব্যক্তি নতুন খলিফা নির্বাচিত হবেন তার জন্য এরূপ নতুন তাবুর ব্যবস্থা করা হত।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এ সমস্ত নতুন তাবু দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এগুলি কিসের তাবু? উত্তর দেওয়া হল, এ সমস্ত তাবুতে ইতিপূর্বে কারও বসার সৌভাগ্য হয়নি। কোন নবনির্বাচিত খলিফা খেলাফতের মর্যাদায় আসীন হবার পরই এসব তাবুতে অবস্থান করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ মুজাহিমকে বললেন, এগুলিও মুসলমানদের সম্পদ, এগুলোও বায়তুলমালে জমা করে দাও। এরপর তিনি তার খচ্চরে আরোহন করে সে সব বিছানার প্রতি অগ্রসর হলেন যা পূর্বনিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণ নতুন ছিল এবং যা ইতোপূর্বে আর কারও জন্য বিছানো হয়নি এবং কোন খলিফাও যাতে বসার সৌভাগ্য লাভ করেননি। মোটকথা এসব বিছানা সম্পূর্ণ নতুন ছিল শুধু অভিষেক অনুষ্ঠানের মর্যাদার খাতিরেই ঐসব ব্যবস্থা করা হয়েছিল। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বাহন হতে অবতরণ করে এ বিছানার নিকটবর্তী হয়ে তার হাতের ছড়ির অগ্রভাগ দিয়ে তা গুটিয়ে দিলেন এবং খালি চাটাই বের করে তাতে উপবেশন করলেন।
ইবনে আব্দুল হাকام বলেন, যখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ খলিফা হলেন তখন সমস্ত লোক তার সামনে দন্ডায়মান হল, তিনি উপস্থিত জনতাকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলেন, লোক সকল! তোমরা যদি আমার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে থাক তবে আমিও দাঁড়িয়ে যাব। যদি তোমরা বস আমিও বসব। মানুষ শুধু আল্লাহর সামনেই দাঁড়াবে। আল্লাহ মানুষের জন্য কিছু কাজ ফরযও কিছু কাজ সুন্নত করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এগুলি যথারীতি পালন করবে, সে সফলকাম হবে আর যে ব্যক্তি একথার প্রতি অবহেলা করবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে।
তোমাদের মধ্যে যে আমাদের সাহচর্যে আসবে তার পাঁচটি বিষয় অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে।
১। সে আমাদের নিকট তার সেসব প্রয়োজনীয় কথা পৌঁছাবে, আমরা যা অবগত নই।
২। আমাদেরকে এরূপ সুবিচারের প্রতি ধাবিত করবে- যা আমাদের দ্বারা হওয়া সম্ভব ছিল না।
৩। সত্যবাদিতার দিক দিয়ে সর্বদাই আমাদের সঙ্গী হবে।
৪। সবসময় আমাদের ও মুসলমান জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষা করবে।
৫। আমাদের নিকট কারও বদনাম না গীবত করবে না।
এই পাঁচটি বিষয় যে লক্ষ্য রাখবে না তার জন্য আমাদের দরজা বন্ধ থাকবে।
এ সম্পর্কে ইবনুল জাওযি মুহাম্মদুল মারুযির মাধ্যমে যে বর্ণনা করেছেন তাতে সুলায়মানের দাফন শেষ এবং খলিফার জন্য নতুন সওয়ারী হাজির করার বর্ণনায় কিছু অতিরিক্ত বিষয়ও বর্ণিত হয়েছে- তিনি বললেন, আমার বাহন আন। যখন তাঁর বাহনের জন্তুটি তাঁর নিকট উপস্থিত করা হল এবং তিনি তাতে আরোহন করলেন, তখন শহররক্ষী প্রধান এসে তার সামনে হাজির হল এবং খোলা তলোয়ার হাতে নিয়ে আগে আগে চলল। খলীফা তাকে বললেন, আমার সামনে হতে সরে যাও, তোমার কোন প্রয়োজন নেই। আমার নিকট তোমার কোন কাজও নেই। আমি একজন সাধারণ মুসলমান, একজন সাধারণ মানুষ মাত্র। তিনি চলতে লাগলেন। মানুষও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলল। তিনি মসজিদে এসে মিম্বরে আরোহন করে বসলেন, সমস্ত লোক তার চারদিকে জমায়েত হল। এরপর তিনি এই ভাষণ দিলেন,
হে লোক সকল! আমি তোমাদেরকে আল্লাহকে ভয় করার পরামর্শ দিচ্ছি। আল্লাহর ভয় সর্বপ্রথমে। আল্লাহর ভয় ব্যতীত কোন উপায় নেই। নিজের জীবন পরিপাটি করার জন্য যা কিছু প্রয়োজন মনে কর তবে যে ব্যক্তি পরকালের কাজ করে যায় আল্লাহ তার দুনিয়ার কাজ সঠিক করে দেন। যদি তোমরা তোমাদের অভ্যন্তরকে ঠিক রাখ তাহলে আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক দিক ঠিক রাখবেন। মৃত্যুকে বেশি স্মরণ কর। মৃত্যু যখন আসবে তখন তার জন্য উত্তমরূপে প্রস্তুত থাকা উচিত। মৃত্যু মানুষের জীবনের সমস্ত আনন্দ উপভোগ কেড়ে নেয়। এ উম্মত আল্লাহ ও তার রাসূল এবং আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে কোন মতবিরোধ করবে না। কিন্তু তারা ধন-সম্পদ নিয়ে ঝগড়া ফাসাদ করবে। আল্লাহর কসম, প্রাপ্য অধিকার ছাড়া আমি কাউকে কোন কিছুই দেবনা, কারও অধিকারে হস্তক্ষেপ করব না।
তারপর তার কণ্ঠস্বর আরও গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি বললেন, হে লোক সকল! যে আল্লাহর আনুগত্য করে মানুষের উপর তার অধীনতা স্বীকার করা ফরজ। যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করে মানুষের উপর তার আনুগত্য স্বীকার করা জায়েয নেই। আমি যদি আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করি তবে তোমরা আমার কথা মেনে চলবে আর যদি আল্লাহর নাফরমানী করি তবে তোমরাও আমার কথা অমান্য করবে।
অপর এক বর্ণনায় দেখা যায় যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এ সময় নিম্নলিখিত ভাষণ দিয়েছেন, “হে লোক সকল! এটা বাস্তব সত্য যে, তোমাদের নবীর পর আর কোন নবী আগমন করবেন না, তোমাদের কিতাবের পর আর কোন কিতাব অবতীর্ণ হবে না। মহান আল্লাহ যে সমস্ত বস্তু হালাল করেছেন সেগুলো হালাল আর তিনি যা হারাম করেছেন তাই হারাম। আর এ হারামের বিধান কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। হে লোক সকল! স্মরণ রেখো, আমি চুড়ান্ত বিচারক হিসেবে এ আসনে উপবেশন করিনি। আমি শুধু আল্লাহর বিধানসমূহ কার্যকরী করতেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমি কোন নতুন বিষয়ের দাবী করব না, আমি আল্লাহর বিধান অনুসরণ করে চলব। হে লোক সকল! দেখো, আল্লাহর বিধানের বিপরীতে কারোও আনুগত্য তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে না।
আরও মনে রেখো, আমি তোমাদের মধ্যে সকলের চেয়ে উত্তম ব্যক্তি নই। আমি তোমাদেরই মত একজন সাধারণ মানুষ। কিন্তু আল্লাহপাক তোমাদের চেয়ে আমাকে অনেক বেশী দায়িত্ব দিয়েছেন।
ইবনুল জাওযি বলেন, তার এ ভাষণ শেষ হওয়া মাত্রই একজন আনসারী সর্বপ্রথম উঠে এসে তাঁর হাতে বায়আত গ্রহণ করলেন। তারপর একের পর এক লোক এসে বায়আত গ্রহণ করতে লাগল, এরূপে সাধারণ বায়আত অনুষ্ঠান শেষ হল। তারপর তিনি তার তাবুতে আসলেন, পূর্ব হতেই তাঁর জন্য সুলায়মানের গালিচা বিছানো ছিল, তিনি এ গালিচা উঠিয়ে একটি আরমানি বিছানা বিছিয়ে তাতে বসলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! আমি যদি মুসলিম জনতার দায়িত্ব গ্রহণ না করতাম তবে তোমার উপর বসতাম না।
এ আরমানি বিছানাটি খুবই নিম্নমানের ছিল বলেই তিনি তাকে পছন্দ করেছিলেন, তা না হলে তিনি তা পছন্দ করতেন না।
ইবনুল জাওযির অপর এক বর্ণনায় জানা যায় যে, তিনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি তাঁর সামনে এসেছিল তার দুঃখ-কষ্টের কথা শুনে তিনি কেঁদে অস্থির হয়ে গেলেন, তাঁর চোখের পানিতে হাতের লাঠিটিও ভিজে গিয়েছিল। অবশেষে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তাকে নিজের তরফ হতে দুশত দীনার এবং বায়তুল মাল হতে আর তিনশ দীনার প্রদান করলেন এবং তার জন্য পৃথকভাবে মাসিক দশ দীনার ভাতা ধার্য করে দিলেন।
তারপর তিনি তার বাসস্থানে আসলেন, তখন রাত অনেক হয়েছিল। কাজেই তিনি বিশ্রাম গ্রহণ করলেন। পরের দিন সকালে সুলায়মানের বাসগৃহে চলে গেলেন।
ইবনে আব্দুল হাকام বলেন, সারা রাত ধরে সুলায়মানের পরিবারের লোকেরা শাহী আসবাবপত্র উল্টাপাল্টা করতে লাগল, অব্যবহৃত সুগন্ধি ব্যবহৃত বোতলে রাখল, নতুন কাপড় পরিধান করতে লাগল, যেন সেগুলোও ব্যবহৃত দেখা যায়। তারা এসব করার কারণ হলো, পূর্ব হতে প্রচলিত ছিল যে, যখন কোন খলিফার মৃত্যু হত তখন খলিফার ব্যবহৃত জিনিসপত্র, সুগন্ধি ও অন্যান্য সামগ্রী তার সন্তানগণ অংশীদার হতো, আর যা অব্যবহৃত থাকত তা নতুন খলিফা লাভ করত।
পরের দিন সকালে সুলায়মানের পরিবারের লোকেরা ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে এ সমস্ত সামান-পত্র দেখিয়ে বলল, এগুলি তোমার আর এগুলি আমাদের। খলিফা এ কথার ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তারা বলল, সুলায়মান যে সব কাপড় পরিধান করেছেন, যে সব সুগন্ধি ব্যবহার করেছেন সেগুলো তার সন্তানদের আর যেগুলি ব্যবহার করেননি সেগুলো আপনার।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এ ব্যাখ্যা শুনে বললেন, এসব আমারও নয় তোমাদেরও নয়। এসব মুসলমানদের সম্পদ। তখন তার খাদেমকে বললেন, মুজাহিম এসব বায়তুল মালে জমা করে দাও।
এখন শুধু বাঁদীগণ অবশিষ্ট থাকল। এই সমস্ত বাঁদী তাঁর সামনে হাজির করা হল, এরা জীবিকার জন্য এ পেশা গ্রহণ করেছিল। তাদের প্রত্যেকের পরিচয়, বংশ, দেশ সম্পর্কে অবহিত হয়ে তিনি নির্দেশ দিলেন যে, এদের প্রত্যেককে তাদের পিতা-মাতার নিকট পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হোক।
ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, মন্ত্রীগণ, পরিষদবর্গ এবং উমাইয়া বংশের লোকেরা এসব দেখে নিরাশ হয়ে পড়ল, তারা বুঝল যে, তিনি শুধু ইনসাফ তথা ন্যায় বিচারকেই বেছে নিবেন। তিনি কোন অন্যায়-অবিচার প্রশ্রয় দিবেন না।
📄 ওমর ইবনে আবদুল আজিজের জুলুম প্রতিরোধ
ইসলামী জীবনবিধান তথা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কেবল সে সমস্ত লোকই রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতার অধিকারী যারা নিজেদের প্রয়োজনের চেয়ে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেয় এবং যারা সাধারণ মানুষের মত জীবন যাপন করতে পছন্দ করে এবং সমকালীন সাধারণ মানুষ যে স্তরে থাকবে তারা সেই স্তরেই থাকবে।
সম্মানিত পাঠকবৃন্দ, অবশ্যই অবগত আছেন যে, মহানবী (সা) নিজে তাঁর কর্মময় জীবনে এর বহু দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন। ইবনে সা'দসহ অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ সাক্ষ্য দেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সর্বদাই নিজের দলের অভাবী লোকদের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। যদি সাধারণ মানুষ অনাহারে থাকত তিনিও অনাহারে থাকতেন। তিনি অন্ন-বস্ত্র এবং বাসস্থান কোন দিক দিয়েই সাধারণ মানুষ হতে উচ্চস্তরে অবস্থান করতেন না। সাধারণ লোকেরা যা খেত, সাধারণ মানুষ যা পরিধান করত তিনিও তাই খেতেন ও পরতেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সাধারণ ভাবে জীবনযাপন করেছেন। তার ঘরের চার দেওয়াল ছিল মাটির, ছাদ ছিল খেজুর পত্র ও খড়ের, তাঁর ঘরে কোন খাট পালঙ্ক ছিল না। তিন দিন পর্যন্ত তার ঘরে চুলা জ্বলত না। জীবনে তিনি কখনও পেট ভরে আহার করেননি। ইবনে সা'দ বর্ণনা করেছেন হযরত আয়েশা (রা) যিনি সবচেয়ে প্রিয় সহধর্মিনী ছিলেন। তিনি কসম করে বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কখনও খেজুর ও পানি অথবা রুটি ও পানি দিয়ে পেট ভরে আহার করেননি এবং তাঁর এ অভ্যাস মৃত্যু পর্যন্ত বহাল ছিল।
হযরত আবু বকর (রা) খেলাফতের আসন অলংকৃত করার পর তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সুন্নাত অনুসরণ করে জীবন যাপন করেছেন। যাদের উপর শাসন করার জন্য তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনিও তাদের কাতারে এসে যোগদান করেছিলেন। তিনি তাঁর সোয়া দুই বছর খেলাফতের সময়ে কখনও সাধারণ নাগরিকদের প্রয়োজনের চেয়ে নিজের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেননি। সাধারণ মানুষ যা খেত, পরিধান করত তিনিও সেরূপ খাওয়া পরা করতেন, সাধারণ মানুষ যেস্থানে বসবাস করত তিনিও সেরূপ স্থানে বসবাস করতেন।
হযরত ওমর ফারুক (রা)-এর যুগ অত্যন্ত প্রাচুর্য্য ও সুখ-সমৃদ্ধির যুগ ছিল। তাঁর যুগে মানুষের জীবনযাত্রার মান বহুলাংশে উন্নীত হয়েছিল। কোন মুসলামানই তখন অনাহারে ও বস্ত্রাভাবে জীবন যাপন করেনি। সকলেই দুই বেলার খাওয়া এবং সাধারণভাবে পোষাক পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করতে পারত। এজন্য হযরত ওমর (র) তার পূর্ববর্তী বুজর্গদের মত অনাহারে থাকতেন না, তিনি তিন দিন পর্যন্ত উপবাস করতেন না, বস্ত্রহীনও থাকতেন না এবং মুক্ত আকাশের নীচেও শয়ন করতেন না।
কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি সর্বসাধারণের মতই জীবন অতিবাহিত করেছেন। মোটা আটার রুটি খেতেন, তৈল, সিরকা এবং শুকনো গোশত ছিল তাঁর সাধারণ খাদ্য। তাঁর পরিধেয় বস্ত্রে বেশ কয়টি তালি থাকত।
যদিও তিনি ভাতা রেজিষ্ট্রারের তালিকায় ৩৯ ক্রমিক নম্বরের অধিকারী ছিলেন। যদিও তিনি বদরী সাহাবীদের মত ভাতা গ্রহণ করতেন তথাপি তার জীবন যাপন প্রণালী ছিল সাধারণ মানুষের মত।
হযরত আলী (রা)-এর জীবনও সাধারণ মানুষের জীবনের মত অনাড়ম্বর ছিল। তিনি যে কাপড় পরিধান করতেন তার মূল্য চার দেরহামের বেশি ছিল না। তিনি যে খাদ্য খেতেন তার চাকর-বাকররাও তা পছন্দ করত না। তিনি সাধারণ মানুষের দ্বারা নির্বাচিত খলিফা হওয়ার ফলেই তার ভাল খাদ্য ও ভাল পোষাক পরিধান করার কোন অধিকার আছে বলে তিনি মনে করতেন না।
তিনি যে পোষাক পরিধান করতেন তা দেখে কোন অপরিচিত লোক তাঁর ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোন পার্থক্য করতে পারত না। একবার কোন এক আমীর তাকে দীন মজুর মনে করে তার মাথায় বোঝা উঠিয়ে দিয়েছিল।
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাহাবী, হযরত আবু বকর (রা) হযরত ওমর (রা) হযরত উসমান (রা) এবং হযরত আলী (রা) এ চার মহাপুরুষের জীবনের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য করলে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, এ চারজনের কেউই কোন দিক দিয়ে নিজেদেরকে সাধারণ মানুষের চেয়ে উন্নত মনে করতেন না এবং নিজেদের সন্তান বা পরিজনের প্রয়োজনকে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের উপর প্রাধান্য দিতেন না।
এ সম্পর্কে ইমাম তিরমিযি (র) একটি স্পষ্ট উদাহরণ দিয়েছেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কন্যা হযরত ফাতেমা (রা) পানি উঠাতে উঠাতে হাতে কড়া পড়ে গিয়েছিল তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট একজন দাসীর জন্য আবেদন করেছিলেন। দেয়ার মত দাসীও ছিল তবুও মহানবী (সা) তার আবেদন গ্রহণ করে বললেন, কোন আনসারী স্ত্রী আমার নিকট দাসীর জন্য আবেদন করেছিল, তাদের প্রয়োজন তোমার পূর্বে পূরণ করতে হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা) যে ক্ষেত্রে তার প্রাণপ্রিয় কন্যার প্রয়োজনকে আনসারদের স্ত্রীদের প্রয়োজনের উপর প্রাধান্য দেননি। সেক্ষেত্রে তারই স্থলাভিষিক্ত হযরত আবু বকর, ওমর ফারুক, উসমান যিনুরাইন ও আলী (রা) কখনও নিজেদের প্রয়োজনকে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের উপর প্রাধান্য দেননি। যদি তারা এমন কিছু করতেন তাহলে ইতিহাসের সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তারা সমালোচনার উর্ধ্বে থাকতে পারতেন না।
আমাদের দাবী হলো, একমাত্র ইসলামই এমন একটি জীবন ব্যবস্থা যা সাধারণ মানুষের উপর বিশিষ্ট লোকদের কখনও প্রাধান্য দেয় না। ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা মহানবী (সা) এবং তাঁর সাহাবীগণও ইসলামের পূর্ণাঙ্গরূপ বাস্তবায়নের পর তারা নিজেদেরকে সাধারণ মানুষের চেয়ে উন্নত মনে করেননি এবং তাঁদের পরও যারা ইসলামের উন্নতিকল্পে বিভিন্ন ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাঁরাও তাঁদের নিজেদেরকে অথবা তাদের সন্তান বা আত্মীয়-স্বজনকে কোন দিক দিয়েই প্রাধান্য দেননি।
তাঁদের ধারণায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার ছিল আল্লাহপাকের তরফ হতে একটি পবিত্র আমানত। আল্লাহর রসূল (সা) এবং তাঁর সুযোগ্য খলীফাগণ রাষ্ট্রীয় ধন ভান্ডারকে সাধারণ মুসলমানদের সম্পদ মনে করতেন। তাঁরা নিজেদেরকে সে ধন ভান্ডারের একজন বিশ্বস্ত সংরক্ষণকারী মনে করতেন। তাঁরা এমন চরিত্রবান ছিলেন যে, তাদের কোন প্রকার খেয়ানত সম্পর্কে কারও মনে কোনরূপ দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল না। একজন সাধারণ নাগরিক সে কোষাগার হতে যেটুকু পাবার অধিকারী ছিল তারাও তার চেয়ে এর অতিরিক্ত কিছু পাবার অধিকারী ছিলেন না।
বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে উবাইদের বর্ণনা মতে, রসূলুল্লাহ (সা) শাসনকর্তাদের মৌলিক প্রয়োজনসমূহ, পুরণ করার মত অর্থই শুধুমাত্র তাদেরকে কোষাগার হতে গ্রহণ করার অনুমতি দিয়েছিলেন। এর অতিরিক্ত এক পয়সা নেয়া তাঁর মতে খিয়ানতের শামিল ছিল।
আমানত ও খিয়ানতের এ ধারণা ইসলামের একটি মৌলিক ধারণা। কিন্তু হযরত মুয়াবিয়া (রা)-এর খেলাফতের পরেই এই ধারণা সম্পূর্ণভাবে শক্তি প্রয়োগ করে খেলাফত লাভ করেছিলেন। জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত ছিলেন না বলেই সরকারী কোষাগারকে সর্বসাধারণের সম্পদ হিসেবে মনে না করে তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করেছিলেন। কোষাগার থেকে তিনি যা ইচ্ছা গ্রহণ করতেন। বিলুপ্ত হয়ে যায়। হয়তো উমাইয়া খলীফা আব্দুল মালেক যাকে উমাইয়া সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তার বংশের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আমীর মুয়াবিয়া (রা)-এর চেয়ে বহুগুণ বেশি প্রচেষ্টা করেছিলেন। এজন্য তিনি আমীর মুযাবিয়া (রা)-এর চেয়ে ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। তার সন্তান সন্ততি বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন এবং পরিবার পরিজনদের জন্য সরকারী কোষাগার হতে যথেচ্ছাভাবে ব্যয় করেছেন। রাজ্যের আমদানী হতে যা ইচ্ছা গ্রহণ করেছেন। তিনি বসবাসের জন্য সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন, খাটপালঙ্ক ইত্যাদি তৈরি করেছিলেন, রেশমী বস্ত্র পরিধান করেছেন এবং সর্বসাধারণের ধন-ভান্ডারকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করেই তা থেকে খরচ করেছেন।
বাস্তবিক পক্ষে এটাই কি ইসলামের বিধান ছিল? না কখনই এটা ইসলামের বিধান ছিল না। তিনি নিজেও তো উপলব্ধি করতেন, কিন্তু তিনি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের আদর্শের সামনে নিজেকে জওয়াবদিহী করতে হবে এ কথা ভাবতে পারেননি। উদাহরণ স্বরূপ ইবনে কাছীর আব্দুল মালেক সম্পর্কে ইবনুল আরাবীর নিম্ন ভাষ্যটি বর্ণনা করেছেন। لَّمَا سَلَّمَ عَبْدُ الْمَالِكِ بِالْخِلَافَةِ كَانَ فِي حُجْرِهِ مَصْحَفُ فَاطْبَقَهُ ۞ وَقَالَ هَذَا فِرَاقٌ بَيْنِي وَبَيْنِكَ
অর্থাৎ আব্দুল মালেক যখন খলীফা মনোনীত হলেন তখন তার নিকট একখানা কোরআন শরীফ ছিল। তিনি তাকে বন্ধ করে দিয়ে বললেন, এটাই আমার ও তোমার শেষ বিদায়।
অন্য এক বর্ণনায় আছে- ۞ هَذَا آخِرُ الْعَهْدِ مِنْكَ
অর্থাৎ এটাই তোমার শেষ সাক্ষাত।
আব্দুল মালেক খেলাফতের আসন গ্রহণ করার পূর্বেই আল্লাহর কিতাবের সম্পর্ক ত্যাগ করেছিল। অথচ ইবনে কাছীরের বর্ণনা মতে, খলীফা হবার পূর্বে যখন আব্দুল মালেক মদীনায় অবস্থান করতেন তখন তিনি আল্লাহভীরুতা ও সংযম শীলতার কারণে মদীনার বিশিষ্ট আলেমদের মধ্যে গণ্য ছিলেন।
অপর এক বর্ণনায় জানা যায় যে, হযরত ইবনে জুবাইর শহীদ হবার পর আব্দুল মালেক হজ্জের সময় এক সাধারণ ভাষণে বলেছিলেন যে, আমার পূর্ববর্তী খলীফাগণ নিজেরা খেতেন, অপরকে খাওয়াতেন, কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি একমাত্র তরবারীর সাহায্যে এ উম্মতের রোগের চিকিৎসা করব।
ইবনে কাছীর স্পষ্টই উল্লেখ করেছেন যে, আব্দুল মালেক একজন রক্ত পিপাসু বাদশাহ ছিলেন। তিনি অগণিত লোককে হত্যা করেছিলেন। তারই প্রতিনিধি হাজ্জাজ অনর্থক লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল।
আব্দুল মালেক ও তার প্রতিনিধি হাজ্জাজ এ দুজন যার প্রতি অসন্তুষ্ট হতেন-তার সম্পদ কেড়ে নিতেন এবং তাকে হত্যাও করা হতো, আর তারা দু'জন যার প্রতি সন্তুষ্ট হতেন তাকে সরকারী ধনভান্ডার খুলে দিতেন।
এখন ওমর ইবনে আব্দুল আজীজের সামনে দু'টি মাত্র পথই খোলা ছিল। হয়তো তিনি তাঁর পূববর্তীদের অনুসরণ করবেন অথবা আল্লাহর রাসূল (সা) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের পথ অনুসরণ করবেন।
তিনি আল্লাহর রাসূল (সা) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের পথকে বেছে নিলেন এবং আব্দুল মালেকসহ অন্যান্য শাসকগণ যে সমস্ত অন্যায় অবিচার, জুলুম করেছিল তিনি সেই সবের প্রতিকার বিধান করলেন। তিনি নিজ হস্তে এর সূচনা করেছিলেন।
ঐতিহাসিক ইবনে সা'দের বর্ণনায় জানা যায় যে, ইবনে সুহাইল বলেছেন, আমি ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে তার ঘর হতে জুলুম প্রতিরোধ ও সংস্কারের সূচনা করতে দেখেছি। সর্বপ্রথম তিনি নিজের পরিবারের লোকদের জুলুম অত্যাচার প্রতিরোধ করে অন্য লোকদের প্রতি দৃষ্টি দিয়েছিলেন। আবু বকর ইবনে বুসরা বলেন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ যখন জুলুম অত্যাচার প্রতিরোধ ও লুণ্ঠিত ধন-সম্পদ ফেরত দিতে শুরু করলেন, তখন তিনি বললেন, সর্বপ্রথম আমার নিজের পক্ষ থেকেই শুরু করা উচিত। সুতরাং তিনি নিজের অধিকারভুক্ত ধন-সম্পদের হিসাব করে তার কাছে স্থাবর-অস্থাবর যে সমস্ত ধন-সম্পদ ছিল তিনি তা মুসলমানগণকে ফেরত দিয়ে দিলেন, এমনিক ওয়ালিদ তার প্রাচ্যদেশীয় আমদানী থেকে তাকে একটি আংটি উপহার দিয়েছিলেন, তাও খুলে তিনি বাইতুলমালে জমা দিলেন।
ইবনে জাওযি বলেন, যে রাত্রিতে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ খেলাফতের মসনদে বসলেন সে রাতেই তার ঘর হতে ক্রন্দনের শব্দ পাওয়া গেল। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায় যে, তিনি যখন তার বাঁদীগণকে অনুমতি দিলেন যে, তারা ইচ্ছা করলে থাকতে পারে, আর ইচ্ছা করলে চলেও যেতে পারে। কেননা আমি এমন এক দায়িত্বের বোঝা গ্রহণ করেছি যে, এরপর আমি আর তাদের প্রতি ফিরে তাকাতে সময় পাবনা। যে চায় আমি তাকে মুক্ত করে দিতে প্রস্তুত, আর যে চায় সে থাকতে পারে কিন্তু আমার সাথে কারও কোন সম্পর্ক থাকবে না। আমার উপর কোন আশা ভরসাও করতে পারবে না।
একথা শুনে বাঁদীরা কাঁদতে লাগল।
ইবনে জাওযির অপর এক বর্ণনায় জানা যায় যে, বর্ণনাকারী বলেন, আমি এবং ইবনে আবু যিকর হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের বাড়ীর কাছে উপস্থিত ছিলাম, আমরা তার ঘরের কান্নার আওয়াজ শুনে তার কারণ জিজ্ঞেস করলে লোকেরা বলল, খলীফা তার স্ত্রীকে এ বলে অধিকার দিয়েছেন যে তুমি ইচ্ছা করলে এ ঘরে থাকতে পার, ইচ্ছা করলে তোমার পিত্রালয়ে চলে যেতে পার। কারণ আমি যে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি এরপর স্ত্রীলোকের প্রতি আমার সাধারণ আসক্তিটুকুও আর নেই।
এ কথা শুনে খলীফার স্ত্রী ক্রন্দন করতে লাগলেন এবং তাঁর ক্রন্দনের ফলে তার বাঁদীরাও ক্রন্দন করতে লাগল।
এ ভদ্র মহিলাই দোর্দন্ড ও প্রতাপশালী খলীফা আব্দুল মালেকের সর্বাধিক প্রিয়তমা কন্যা ছিলেন। তিনি পূর্ববর্তী দু'জন খলীফা ওয়ালিদ ও সুলায়মানের ভগ্নি ছিলেন। তিনি যে ভোগ বিলাসে জীবন অতিবাহিত করেছেন সে যুগে আর কারও ভাগ্যে জুটেনি।
ইবনে জাওযি এ রাতের একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ওমর ইবনে আবদুল আজিজের স্ত্রী ফাতেমার একটি সুন্দরী দাসী ছিল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাকে খুব ভাল বাসতেন। খলীফা হবার পূর্বে তিনি স্ত্রী ফাতেমার নিকট বহুবার এ দাসীটি চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। তার এ ব্যর্থতা দাসীর প্রতি তাঁর আকর্ষণকে আরও বহুগুণে বৃদ্ধি করে দিয়েছিল। তারপর তিনি যখন খলীফা মনোনীত হলেন তখন ফাতেমা তাকে বললেন, আমি সে দাসীটি আপনাকে দান করে দিলাম। এতে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের মুখমন্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি ফাতেমাকে বললেন, তাকে আমার নিকট পাঠিয়ে দাও। ফাতেমা তাকে খুব ভালরূপে সজ্জিত করে তার নিকট পাঠিয়ে দিলেন। ওমর ইবনে আজিজ তাকে দেখে খুব খুশি হলেন। তিনি দাসীকে তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ এক কর্মচারীর উপর জরিমানা করে তার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল, আমিও তার অন্তর্ভূক্ত ছিলাম। তারপর হাজ্জাজ আমাকে খলীফা আব্দুল মালেকের নিকট পাঠিয়ে দিলেন এবং তিনি তাঁর স্নেহাধিক কন্যা ফাতেমাকে দান করলেন।
এই ঘটনা শুনে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ খুব ব্যথিত হলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হাজ্জাজ যে কর্মচারীর প্রতি কঠোর ব্যবহার করেছিল সে কী জীবিত আছে? দাসী বলল, উক্ত কর্মচারী মারা গিয়েছে তবে তার সন্তানগণ জীবিত আছে। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ উক্ত দাসীকে বিদায় করে দিয়ে কুফার শাসনকর্তাকে লিখে পাঠালেন যে, অমুকের পুত্রকে আমার নিকট পাঠিয়ে দাও। তারপর সে ব্যক্তি ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট এসে উপস্থিত হল। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তার পিতার বাজেয়াপ্ত সমস্ত সম্পত্তির সাথে এ দাসীটিও ফেরত দিলেন। ইবনুল জাওযি আরও বলেন যে, তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত এই দাসীর মহব্বত তার অন্তরে একটা স্থান দখল করে রেখেছিল কিন্তু এরপর তিনি আর কখনও এই দাসীর সাথে সাক্ষাত করেননি।
ইবনে কাছীরের বর্ণনায় জানা যায় যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তার ব্যক্তিগত যে সব সম্পত্তি কোষাগারে জমা দিয়েছিলেন তন্মধ্যে ফাদাকের বাগানটিও ছিল। তিনি বিশিষ্ট লোকদের এক সভায় ফাদাকের বাগানটি জমা দেয়ার কথা ঘোষণা করে বলেন, ফাদাক রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট ছিল। তিনি আল্লাহর নির্দেশ মতই তার আমদানী ব্যয় করতেন। তারপর হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত ওমর (রা) এরূপ করেছেন। কিন্তু মারওয়ান ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে তা দখল করে ভোগ করেছিল এবং তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির একাংশ আমিও উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। ওয়ালিদ এবং সুলায়মানও তাদের অংশ আমাকে দান করেছেন। কাজেই আমি আমার সেসব সম্পত্তি সরকারী কোষাগারে ফেরত দিচ্ছি তার চেয়ে অপবিত্র আর কোন সম্পত্তি নেই। আমি যা বায়তুলমালে জমা দিচ্ছি, রাসূলুল্লাহ (সা) যেভাবে এটা ব্যয় করতেন এটা সেভাবেই ব্যয় করা হবে।
অপর একটি বর্ণনায় জানা যায় যে, ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ শুধু স্থাবর সম্পত্তি ও নগদ অর্থই বায়তুলমালে জমা দেননি, তিনি তাঁর স্ত্রীর মূল্যবান অলংকারাদী এবং পোষাকাদী পর্যন্ত বায়তুলমালে জমা দিয়েছেন।
ইবনুল কাছীর বলেন, তিনি খেলাফতের পদ লাভ করার পূর্বে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তির আয় ছিল বার্ষিক চল্লিশ হাজার দীনার বা স্বর্ণমুদ্রা। এ সবই তিনি বায়তুলমালে জমা দিয়েছেন, অথচ তার অনেক সন্তানাদী ছিল, কয়েকজন স্ত্রী ছিলেন এবং এক স্ত্রী তো ছিলেন একজন বিশিষ্ট শাহজাদী।
এভাবে তিনি ব্যক্তিগত সম্পত্তির হিসাব-নিকাশ শুরু করলেন এবং নিজবংশের সমস্ত জবর দখলকৃত সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে সরকারী কোষাগারে জমা দিলেন। তিনি রাজ্যের সমস্ত প্রাদেশিক শাসককর্তাগণকে লিখলেন যে, আমার পূর্বে যে স্থানেই কোন জুলুম অত্যাচার করে মানুষের সম্পত্তি কেড়ে নেয়া হয়েছে তা তাদেরকে ফেরত দেয়া হোক।
ইবনে সা'দ ইবনে যুহাইলের একটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, "ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ যখন তাঁর নিজের ও নিজের বংশের ধন-সম্পদের হিসাব-নিকাশ করে তাদের অপবিত্র সম্পত্তি বায়তুলমালে জমা দিলেন তখন ওয়ালিদের এক পুত্র তার বংশের লোকদের বললেন, তোমরা ওমর ইবনে খাত্তাবের বংশের একজন লোককে খলীফা মনোনীত করেছ অতএব তিনিও তাঁর মতই করছেন।"
উদ্দেশ্যে ছিল যে, ওমর ফারুকের সন্তানগণ তাদের পূর্ব পুরুষের নির্দেশিত পথ পরিত্যাগ করবেন না। আমরাও ইতিপূর্বে ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের বাল্যজীবন বর্ণনার সময় তাঁর কথা লিখেছি যে, তিনি যখন আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর নিকট হতে তার মাতার নিকট ফিরে আসতেন তখন বলতেন, "মা, আমিও আপনার চাচার মত হতে চাই"। তিনি খলীফা মনোনীত হবার পর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর পুত্র সালেমের নিকট এমন ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন।
ইবনে কাছীর বলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সালেম ইবনে আব্দুল্লাহকে বলেন যে, আমার জন্য ওমর চরিত রচনা করুন, আমি সে অনুযায়ী কার্যক্রম চালাব। সালেম বলেন, আপনি পারবেন না। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ জিজ্ঞেস করলেন আপনি সেটা কিভাবে বুঝলেন? সালেম কথার মোড় অন্য দিকে ঘুরিয়ে বললেন, যদি আপনি সে অনুযায়ী কাজ করেন তাহলে হযরত ওমর (রা) কেও হারিয়ে দিবেন, তাঁর চেয়েও উত্তম আদর্শ সৃষ্টি করতে পারবেন। কারণ তার যুগে সৎকর্মে সহযোগিতাকারী লোকের অভাব ছিল না। কিন্তু আপনার কোন সাহায্যকারী নেই।
সালেম যদিও সত্য কথা বলেছিলেন যে, সৎকর্মে তাঁর কোন সাহায্যকারী নেই কাজেই তিনিও হযরত ওমর (রা) হতে পারবেন না। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি হযরত ওমর (রা)-এর পদ্ধতি অনুসরণ করে চলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। ফলে তিনি বিশ্বে দ্বিতীয় ওমর হিসেবে খ্যাতি লাভ করে অমর হয়ে রয়েছেন।
ইবনে সা'দ বলেন, হযরত আমীর মুয়াবিয়া (রা)-এর পর হতে জনগণের প্রতি বনু উমাইয়াদের যে সমস্ত অন্যায় অবিচার চলে আসছিল হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সেগুলোর সংস্কার সাধন করলেন এবং সে যুগ হতে যে সমস্ত সম্পদ লুণ্ঠিত হয়ে আসছিল, তাও তিনি ফেরত দিলেন। অর্থাৎ বনু উমাইয়ার লোকেরা অন্যায়ভাবে যে সমস্ত ধন-সম্পদ উপার্জন করেছিল অথবা পূর্ববর্তী খলীফাগণ মুসলমান জনসাধারণের সম্পদ হতে তাদেরকে যা দান করেছিল ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সেসব مسلمانوں ফেরত দিয়েছিলেন।
ইবনে কাছীরের ভাষ্যটি হলো- ওমর ইবনে আবদুল আজীজ مَا زَالَ عُمَرُ بْن عَبْدِ الْعَزِيزِ يَردُّ الْمُظَالِمُ مِنْ لَدُنْ مُعَاوِيَةَ (رض) إلى أن اسْتَخْلِفَ أَخْرَجَ أَيْدِي وَرَثَةٍ مُعَاوِيَةَ (رض)
অর্থাৎ ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ হযরত মুয়াবিয়া (রা)-এর পর হতে তার যুগ সৃষ্ট সকল প্রকার অবিচারের সংস্কার সাধন করলেন। এমনকি হযরত মুয়াবিয়া (রা)-এর উত্তরাধিকারীদের দ্বারা লুণ্ঠিত জনসাধারণের সকল অধিকার আদায় করে দিলেন।
দামেশক ছাড়াও মক্কা, মদীনা, ইয়ামেন, তায়েফ, ইরাক এবং মিশরের যে সব স্থানে লুণ্ঠিত সম্পদ জমাকৃত ছিল তা হিসেব অনুযায়ী নিজ নিজ মালিককে ফেরত দেয়ার জন্য হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র) সাধারণ আদেশ জারী করলেন।
আয়্যুব সুখতিয়ানী বলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র) অন্যায় ভাবে অর্জিত ও লুণ্ঠিত সমস্ত সম্পদ বায়তুলমালে জমা করে দিলেন এবং বায়তুলমালে যে সমস্ত অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদ অথবা লুণ্ঠিত সম্পদ ছিল তাও তিনি তার প্রকৃত মালিককে ফেরত দিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে যে কয় বছর সে মাল বায়তুলমালে জমা ছিল সে কয় বছরের যাকাত রেখে দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে এ নির্দেশ সংশোধন করে শুধু চলতি বছরের যাকাত রেখে দিতে নির্দেশ দিলেন।
আবু জুনাদ বলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র) ইরাকের অন্যায় অবিচার প্রতিরোধ করতে আমাদেরকে আদেশ দিলেন, তার এই আদেশ কার্যকরী করতে গিয়ে প্রকৃত হকদারের হক আদায় করতে করতে বায়তুলমাল খালি হয়ে গেল। অতঃপর প্রশাসনিক ব্যয় বহন করার মত আর কোন অর্থই বায়তুলমালে থাকল না, সুতরাং হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সিরিয়া হতে ইরাকে অর্থ পাঠিয়ে দিলেন।
আবু জুনাদ আরও বলেন যে, সত্ত্বাধিকারীদের সত্ব ফিরিয়ে দিতে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সাক্ষ্য প্রমাণের কড়াকড়ি করলেন না, বরং নিপীড়িত জনতার নিপীড়ন প্রতিরোধ পথ সহজ করে দিলেন। তিনি নিপীড়নের কারণ অবগত হলেই তার লুণ্ঠিত সম্পদ ফিরিয়ে দিতেন তাকে অকাট্য প্রমাণাদী সংগ্রহ করতে বলতেন না।
ইবনে হাজম বলেন, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাদেরকে লিখে পাঠালেন যে, "আমি যেন কোষাগারের হিসাব করে তার পূর্বে প্রত্যেক মুসলমান ও জিম্মিদের সম্পদের পরিসংখ্যান করি এবং যদি কোন মুসলমান বা কোন জিম্মির প্রতি কোন অন্যায় করা হয়ে থাকে তবে আমি যেন তার ক্ষতি পূরণ ফিরিয়ে দেই। যদি নির্যাতিত ব্যক্তি ইন্তেকাল করে থাকে তবে তার প্রকৃত উত্তরাধিকারীকে ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন।”
ইবনে সা'দ বলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ ইবনে হাজমকে এবং তৎকালীন সবচেয়ে বড় বড় ফকীহগণকে লিখেছেন যে, তাদেরকে মানুষের কাছে গিয়ে অভিযোগ শুনতে বলেন। কেউ যদি সে উমাইয়্যা বংশেরও হয়, তবুও যেন তারা তাকে কোন প্রকার ছাড় না দেন এবং হিসাব নিকাশের সময় যেন খলীফার আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি বিশেষ কড়াকড়ি ব্যবস্থা অবলম্বন করেন। যেহেতু ঝগড়ার সময় তারা অধিক শক্তি প্রয়োগ করে থাকে।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ নিজেও এ মূলনীতি সামনে রেখেই কাজ করেছিলেন। ইবনুল জাওযি বলেন, একবার কয়েকজন গ্রাম্যলোক এসে তার আদালতে অভিযোগ করল যে, ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালেক তার 'খেলাফতের সময় তার এক টুকরা জমি কেড়ে নিয়ে খলিফার পরিবারের লোককে দিয়েছেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তার এ দাবীর পক্ষে প্রমাণ পেশ করতে বললে সে বলল এটা একটি অনাবাদি ভূমি ছিল, আমিই সর্বপ্রথম এটা আবাদ করেছি। তখন হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের রাসূলুল্লাহ (সা) এর এই ফরমান স্মরণ হয়ে গেল-
البِلَادُ بِلَادُ اللَّهِ وَالْعِبَادُ عِبَادُ اللهِ مَنْ أَحْيَاء أَرْضًا مَيْتَةً فَهِيَ لَهُ .
অর্থাৎ জমি আল্লাহর, বান্দাও আল্লাহর, অতএব যে ব্যক্তি অনাবাদী ভূমি আবাদ করবে সে ঐ ভূমির মালিক হবে।
সুতরাং মহানবী (সা)-এর এই নির্দেশ অনুযায়ী হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ গ্রাম্য লোকটির দাবী মেনে নিলেন।
ইবনুল জাওযি বলেন, খলিফা সুলাইমানের দাফন কার্য শেষ করে শাহী প্রাসাদে এসেই হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ জুলুম অবিচার প্রতিরোধ শুরু করে দিলেন। তিনি সমস্ত পর্দা, গালিচাসহ সকল আসবাবপত্র বিক্রয় করে তার বিক্রয়লব্ধ অর্থ বায়তুলমালে জমা দিলেন।
ইবনুল জাওযির অপর একটি বর্ণনায় জানা যায় যে, সুলায়মানের দাফন শেষ করে পরবর্তী দিন হতেই তিনি জুলুম অত্যাচার প্রতিরোধ করতে শুরু করে দিলেন। ফজরের নামাযের পূর্বেই তিনি ঘোষক ওয়াবেককে শহরের অলিগলিতে এ বলে ঘোষণা করতে নির্দেশ দিলেন যে, যার প্রতি কোন প্রকার অন্যায় অবিচার করা হয়েছে সে যেন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের কাছে এসে তার আবেদন পেশ করে।
এ ঘোষণা শুনে সর্বপ্রথম হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের কাছে অভিযোগ পেশ করেছিল হেমসের অধিবাসী একজন অমুসলিম জিম্মি। সে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের কাছে এসে আবেদন করল যে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী আমার অভিযোগের ফয়সালা করুন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তার অভিযোগ জানতে চাইলে সে বলল, আব্বাছ ইবনে ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালেক তার এক টুকরা জমি জবরদস্তিমূলক দখল করে নিয়েছিল। আব্বাছও সেস্থানেই উপস্থিত ছিল। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ আব্বাছকে জিজ্ঞেস করলেন যে, এ সম্পর্কে তোমার বক্তব্য কি? আব্বাছ বলল, খলিফা ওয়ালীদ আমাকে এ সম্পত্তি দান করে দানপত্র লিখে দিয়েছিলেন। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ যিম্মিকে জিজ্ঞেস করলে সে তার দাবীর পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করল। সুতরাং হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তার দাবী মেনে নিয়ে আব্বাছকে তার জমি ফেরত দিয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন।
অপর এক বর্ণনায় জানা যায় যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ যখন জুলুম প্রতিরোধ শুরু করলেন তখনও জোহরের সময় হয়নি। তিনি সমস্ত লোককে মসজিদে একত্রিত করে তাদের সামনে মুজাহিমকে তাঁর নিজের সম্পত্তির দলীল সমূহ এক এক করে পাঠ করতে বললেন। ইবনুল জাওযি বলেন, মুজাহিম এক একটি দলীল পাঠ করত আর হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ নিজের হাতে প্রত্যেকটি দলীল কাঁচি দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিতেন। এত হলো দলীল দস্তাবিজের কথা। তাঁর স্ত্রী ফাতেমা বিনতে আব্দুল মালেকের নিকট খুব মূল্যবান একটি মতি ছিল। তার পিতা আব্দুল মালেক এটা তাকে দিয়েছিলেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ ফাতেমার নিকট এ মতিটি চেয়ে বললেন, তুমি দু'টি বিষয়ের একটি বেছে লও। হয়তো এ মতি বাইতুল মালে জমা দাও আর না হয় আমাকে অনুমতি দাও যে, আমি তোমা হতে পৃথক হয়ে যাই। কারণ এ মতি থাকা অবস্থায় তোমার সাথে একই ঘরে অবস্থান করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
ফাতেমা নিবেদন করলেন, আমি মতির চেয়ে আপনাকেই প্রাধান্য দিচ্ছি। এক একটি মতি কেন? এরূপ যদি হাজার মতি আমার থাকত তবুও আমি আপনাকেই প্রাধান্য দিতাম। অতএব হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ মতি এনে বাইতুলমালে জমা করে দিলেন।
ইবনুল জাওযি একটি দীর্ঘ ঘটনার মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন যে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ এখনও জুলুম প্রতিরোধের কাজ শুরু করেননি। সূচনাতেই তিনি তার প্রধান উপদেষ্টা ও ব্যক্তিগত খাদেম মুজাহিমকে বললেন যে, পূর্ববর্তী খলিফাগণ আমাকে এমন কিছু সম্পত্তি দিয়ে দিয়েছেন-প্রকৃত পক্ষে আমি সে সবের মালিক নই এবং সেসব দান গ্রহণ করাও আমার পক্ষে উচিত নয়। এখন যেহেতু আমি খলিফা কাজেই সে সমস্ত সম্পত্তির হিসাব-নিকাশ করা প্রয়োজন। এতে মুজাহিম তার উদ্দেশ্য বুঝতে পারল এবং সে তাকে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনার সন্তানদের কি উপায় হবে? তিনি বললেন, তাদের জীবিকার ব্যবস্থা আল্লাহই করবেন। একথা মুজাহিমের মনোপুত হল না, সে তার পুত্র আব্দুল মালেকের নিকট গিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করল। আব্দুল মালেক পিতার কাছে এসে বললেন, আপনি যা সংকল্প করেছেন, যথা শীঘ্র সম্ভব তা বাস্তবায়ন করুন। আপনি আমাদের জন্য কোন চিন্তাই করবেন না। দীনের কাজে বিলম্ব করা আল্লাহ পছন্দ করেন না। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তার পুত্র আব্দুল মালেকের এ কথায় অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে তার কপালে চুম্বন করলেন এবং আল্লাহ তাঁকে এমন সৎ সন্তান দান করেছেন এজন্যে তিনি তাঁর শুকরিয়া আদায় করলেন।
খলিফা সুলায়মান মৃত্যুর পূর্বে গাসবা ইবনে সায়াদ ইবনে আছকে বিশ হাজার দীনার দান করে একটি দানপত্র লিখে দিয়েছিলেন। এ দানপত্র বিভিন্ন দপ্তর অতিক্রম করে কোষাধ্যক্ষের নিকট এসে সীলমোহর হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু গাসবার হাতে পৌছার পূর্বেই সুলাইমান ইন্তেকাল করলেন।
সুলায়মানের দাফনের পর দ্বিতীয় দিন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের খেলাফতের প্রথম দিন গাসবা তাঁর নিকট আসল, তখন উমাইয়া বংশের সকলেই ওমর ইবনে আবদুল আজিজের কাছে সমবেত ছিল। উমাইয়া বংশের লোকেরা গাসবাকে দেখে ভাবল যে, গাসবা খলিফার পরম বন্ধু। দেখা যাক খলিফা তার সঙ্গে কিরূপ ব্যবহার করে। তারপর তাঁর সঙ্গে তারা নিজেদের ব্যাপারে কথা বলবে।
তাদের সামনেই গাসবা হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের কক্ষে প্রবেশ করল এবং বলল জনাব, খলীফা সুলায়মান আমাকে কিছু দীনার দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ নির্দেশ কোষাগারে এসে পৌঁছেছে। আপনার সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক তাতে আমি অবশ্য আশা পোষণ করি যে, আপনি তা বরাদ্দকৃত দীনার দেওয়ার নির্দেশ দিবেন।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ জিজ্ঞেস করলেন, কত টাকা? গাসবা বলল, বিশ হাজার দীনার। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, বিশ হাজার দীনারতো চার হাজার মুসলমান পরিবারের জন্যই যথেষ্ট। এটা তোমাকে দেয়া কিভাবে সম্ভব? এত বিপুল পরিমাণ অর্থ আমি একজনকে কিভাবে দেব? আল্লাহর কসম! এটা আমার পক্ষে মোটেই সম্ভব নয়।
গাসবা হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের উত্তর শুনে রাগে শাহী দানপত্র মাটিতে ছুড়ে মারল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাকে প্রবোধ দিয়ে বললেন, দানপত্র নষ্ট না করে যত্নের সাথে রেখ। হয়তো আমার পর এমন কেউ আসবে যে এর যথাযথ মূল্যায়ন করবে। গাসবা অতিযত্নে সেই দানপত্রটি রেখে দিল। আর যেহেতু হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের পক্ষে তার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল কাজেই তাকে খোঁচা দিয়ে বলল, হুজুর এইত কথা হল, কিন্তু "জাবালুল ওয়ারস” সম্পর্কে আপনি কি করবেন? হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের জাবালুল ওয়ারস নামে একটি বড় জায়গীর ছিল। তিনি এ কথা শুনে গাসবার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বললেন, তুমি আমাকে খোঁচা দিচ্ছ।
তারপর তিনি তার ছেলেকে ডেকে দলীল-দস্তাবেজ আনতে নির্দেশ দিলেন। পুত্র সিন্দুক এনে হাজির করল। তিনি জাবালুল ওয়ারসের দলীলসহ সমস্ত দলীল দস্তাবেজ ছিড়ে ফেললেন। গাসবা এ দৃশ্য দেখে বাইরে অবস্থানরত উমাইয়া বংশের লোকদেরকে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করল। তারা গাসবাকে অনুরোধ করল যে, তুমি ভিতরে গিয়ে আমাদেরকে ঘরে ফিরে যেতে অনুমতি এনে দাও। গাসবা ফিরে গিয়ে উমাইয়াদের পক্ষে আপনার বংশের লোকেরা বলছে যে, আপনার পূর্বে তাদেরকে যে ভাতা প্রদান করা হতো তা যথারীতি আদায় করতে নির্দেশ দিয়ে তাদেরকে বাধিত করুন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, আল্লাহর কসম! এটা আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় এবং আমি এমন করতে পারব না। তখন গাসবা বলল, তবে আপনি তাদেরকে অন্য কোথায়ও চলে যেতে অনুমতি দিন। তারা জীবিকার জন্য কোন উপায় বের করে নিক।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, তারা যেখানে ইচ্ছা চলে যেতে পারে, আমার পক্ষ হতে কোন প্রকার বাধা বিঘ্ন নেই। তারপর গাসবা আবার বলল, তবে আমাকেও অনুমতি দিন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, তুমিও যেতে পার। তবে আমি মনে করি তুমি একজন সম্পদশালী লোক, তুমি এখানে থাকলে ভালই হত, কারণ আমি সুলায়মানের পরিত্যাক্ত সম্পত্তি বিক্রয় করে দেব। তুমি ইচ্ছা করলে তা হতে এমন কিছু জিনিস পত্র ক্রয় করতে পার যা পরে বিক্রয় করলে লাভবান হবে। অতঃপর গাসবা সেখানেই অবস্থান করল এবং হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ সুলায়মানের পরিত্যাক্ত সম্পত্তি বিক্রয় করার সময় গাসবা এক লক্ষ দীনারের মাল ক্রয় করে ইরাকে নিয়ে গিয়ে দুই লক্ষ দীনার বিক্রয় করল।
ন্যায় ও সুবিচারের ভিত্তিতে যে শাহী ফরমান জারী হয়নি হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের নিকট তা একেবারে মূল্যহীন ছিল।
ইবনে হাকام তার পূর্বেকার নিবর্তনমূলক শাহী ফরমানের প্রতি তাঁর অশ্রদ্ধার আরোও একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। "ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালেকের" রুহ নামক একটি ছেলে ছিল। গ্রামে লালিত পালিত হওয়ার ফলে তাকে গ্রাম্য বলেই মনে করা হত। কিছু লোক হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের নিকট এসে অভিযোগ করল যে, হেমছের সরাইখানা ওয়ালিদ ইবনে মালেক তার পুত্র রুহকে প্রদান করেছিলেন। এখনও রুহ সেগুলো দখল করে ভোগ করে চলছে। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রুহকে এ সমস্ত সরাইখানা প্রকৃত মালিকদের নিকট ফিরিয়ে দেয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। রুহ আবেদন করল যে, ওয়ালিদ এ সব সরাইখানা আমাকে যে দানপত্র লিখে দিয়েছেন তা এখনও আমার নিকট আছে। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, ওয়ালিদ লিখিত দানপত্র তোমার কোন উপকারেই আসবে না। কারণ এ সমস্ত সরাইখানা যে তাদের, এ সম্পর্কে তারা প্রয়োজনীয় স্বাক্ষী প্রমাণ সংগ্রহ করেছে।
বর্ণনাকারী বলেন রুহ হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের এ নির্দেশকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে হেমছের অধিবাসীদের সরাইখানা ফেরত দিতে অস্বীকার করল। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ এ ঘটনা জানতে পেরে শহররক্ষী প্রধান কাবকে বললেন যে, তুমি এখনই রুহের নিকট চলে যাবে, যদি রুহ সরাইখানার দখল ছেড়ে প্রকৃত মালিকদের ফেরত দিয়ে থাকে তবে তো ভালই, অন্যথায় তুমি তার শিরচ্ছেদ করবে। ঘটনাক্রমে উক্ত মজলিসের এক ব্যক্তি হেমছে গিয়ে রুহকে এই সংবাদ অবহিত করল। অতঃপর কাব যখন তার নিকট উন্মুক্ত তরবারী হাতে উপস্থিত হল, এর পূর্বেই সে সমস্ত সরাইখানা ফেরত দিয়ে হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের প্রতিশোধ হতে আত্মরক্ষা করল।
গভীরভাবে লক্ষ্য করলে বুঝা যায় যে, রুহ ছিল ওয়ালীদের পুত্র এবং ওয়ালিদও তার পূর্বে একজন পরাক্রমশালী খলীফা এবং তার পরম আত্মীয় ছিলেন। তবুও সত্য এবং ন্যায়ের খাতিরে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ আত্মীয় ও রক্ত সম্পর্কের কোন মূল্যই দিলেন না। ইবনে হাকাম বলেছেন যে, রুহের মত উমাইয়া বংশের আরো কিছু কিছু লোক হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের সংস্কারের পাল্লায় পড়েছিল এবং তিনি তাদের নিকট হতে বে-আইনি দখলকৃত সত্তর হাজার দীনার আদায় করে বাইতুল মালে জমা দিয়েছিলেন।
ইবনে হাকام এ কথাও উল্লেখ করেছেন যে, পূর্ববর্তী খলীফাগণ বনু উমাইয়ার লোকদের জন্য যেসব ভাতা বরাদ্দ করেছিলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তাও বন্ধ করে দিলেন এবং তার এক ফুফুর ভাতাও বন্ধ করে দিলেন।
তাঁর এ ফুফু তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করার জন্য এক রাতে তাঁর স্ত্রী ফাতেমার নিকট আগমন করলেন। তখন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ শাহী কাজ কর্মে ব্যস্ত ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর পুত্র এসে ঘর থেকে তাঁর ব্যক্তিগত প্রদীপ নিয়ে গেল। ফাতেমা বললেন, তিনি এ মাত্র শাহী কাজ কর্ম হতে অবসর হয়েছেন, ছেলে এসে তার ব্যক্তিগত প্রদীপ নিয়ে গিয়েছে। আপনি ভিতরে এসে অপেক্ষা করুন। অতঃপর তাঁর ফুফু ভিতরে এসে অপেক্ষা করতে থাকেন। এরপর দেখলেন, তিনি যে ঘরে এসে আহার করতে বসেছেন তার সামনে দু' টুকরো রুটি, একটু লবণ ও সামান্য তৈল ব্যতীত আর কিছুই ছিলনা। ফুফু খাদ্যের এ আয়োজন দেখে বললেন, এসেছিলাম নিজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু কথা বলতে কিন্তু এখন দেখি তোমার সম্পর্কেই আমার প্রথম কথা বলতে হচ্ছে। অতঃপর তিনি হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের খাদ্যের সমালোচনা করে বললেন, তুমি কি এর চেয়ে উন্নত মানের আহার্য গ্রহণ করতে পার না? তখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, "আমার শ্রদ্ধেয় ফুফু আম্মা! এর চেয়ে উন্নতমানের খাদ্য গ্রহণ করার মত অবস্থা যে আমার নেই। যদি আমার সামর্থ থাকত তবে নিশ্চয়ই আপনার কথা পালন করার চেষ্টা করতাম।"
তারপর ফুফু আলোচনা শুরু করে বললেন, "তোমার চাচা আব্দুল মালেক জীবিতকালে আমার জন্য অনেক ভাতা বরাদ্দ করেছিলেন। তাঁরপর তোমার ভাই ওয়ালীদ তা আরো বৃদ্ধি করে দিয়েছিল এবং সুলায়মানও বৃদ্ধি করে দিয়েছিল কিন্তু তুমি খলীফা হয়ে আমার সে ভাতা বন্ধ করে দিলে?"
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, ফুফুজান! আমার চাচা আব্দুল মালেক এবং আমার ভাই ওয়ালিদ ও সুলায়মান আপনাকে সাধারণ মুসলমানদের সম্পদ হতে আপনার ভাতা বরাদ্দ করেছিল। এসব সম্পদ তো আমার নয়। আমি শুধু আমার সম্পদই আপনাকে দিতে পারি, যদি আপনি সুখী হন। ফুফু জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি পরিমাণ সম্পদ আছে? তিনি বললেন, আমার বার্ষিক আমদানী দু'শত দীনার, আপনি তা গ্রহণ করুন। ফুফু বললেন, এতে আমার কোন উপকার হবে না। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, তা ছাড়া যে আমার কাছে আর কিছু নেই! তাঁর ফুফু এ কথা শুনে ফিরে গেলেন।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ মোটেই অসত্য কথা বলেননি। তার বার্ষিক আমদানী ছাড়া তাঁর অন্য কোন সম্পদ ছিল না। অথচ তিনি খলীফা হবার পূর্বে মিকিদাস, জাবালুল ওয়ারস এবং ফাদাকের মত জায়গীর ছাড়াও ইয়ামামাতেও কয়েকটি জায়গীর ছিল। তিনি খলীফা মনোনীত হবার পর দ্বিতীয় দিন এ সমস্ত সম্পদ বাইতুলমালে জমা দিয়েছেন। তাঁর অধিনে ছিল একমাত্র সুয়াইদা নামক একটি ঝরণা তা হতেই তিনি বার্ষিক ১৫০ দীনার মূল্যের শষ্য পেতেন।
ইবনে জাওযি বলেন, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের এ ফুফুই একবার তাঁর বংশের পক্ষ হতে সুপারিশ করার জন্য তাঁর নিকট আসলেন। তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট বনু উমাইয়ার লোকদের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করে বললেন, তোমার বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ হলো, তুমি তাদের রুজি কেড়ে নিয়েছ অথচ তুমি তা তাদেরকে প্রদান করনি। অন্যরা তাদেরকে এসব প্রদান করেছিল।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ জবাব দিলেন, সত্য ও ন্যায় যা ছিল আমি তা করেছি। তারপর তিনি একটি দীনার, একটি অঙ্গার দানি ও এক টুকরা মাংস আনতে বললেন এবং অঙ্গার দানিতে সে দীনারটি গরম করলেন। যখন তা খুবই গরম হয়ে গেল, তখন সেটা গোস্তের টুকরার উপর রেখে দিলেন। ফলে গোস্তের টুকরাটি যখন পুড়ে গেল তখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাঁর ফুফুকে বললেন, ফুফুজান! আপনি কি আপনার ভাতিজাকে এরূপ কঠিন শাস্তি থেকে বাঁচাতে চান না? তাঁর ফুফু লজ্জিত হয়ে বনু উমাইয়ার লোকদের নিকট ফিরে গেলেন এবং বললেন, তোমরা ওমর ইবনে খাত্তাবের ঘরে বিবাহও করবে অথচ তার মত সন্তান হলেও চিৎকার করবে। এখন তোমরা মজা বুঝ।
ইবনুল জাওযি বলেন গাসবা একবার ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট এসে আবেদন করল, হে আমিরুল মুমিনীন! আপনার পূর্ববর্তী খলীফাগণ আমার জন্য যে ভাতা বরাদ্দ করেছিলেন, আপনি তা বন্ধ করে দিয়েছেন। আমার পরিবার পরিজনের জন্য সম্পদের প্রয়োজন আছে। আপনি অনুমতি দিলে আমি আমার জমিতে গিয়ে চাষাবাদ করে পরিবারের ভরণ পোষণের ব্যবস্থা করতে পারি। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তাকে অনুমতি দিয়ে বললেন, চলে যাও। সে যখন দরজায় উপস্থিত হল তখন তিনি তাকে ডেকে বললেন, যদি জীবিকা সংকীর্ণ হয় তবে মৃত্যুকে অধিক মনে করবে এতে জীবিকা প্রশস্ত হয়ে যাবে। আর যদি জীবিকা প্রয়োজনের চেয়ে প্রশস্ত হয় তবুও মৃত্যুর কথা মনে করবে এতে জীবিকা কিছুটা সংকীর্ণ মনে হয়ে আসবে।
সুলায়মানের এক পুত্র হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট অভিযোগ করলেন, তার যে ধন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে তা অন্যায়ভাবে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এ সম্পত্তির পক্ষে তার নিকট দলীল আছে। সে ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে সেই দলীলটি দেখাল। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, পূর্বে এই সম্পত্তি কার ছিল? সে বলল, হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, তবে তো এটা হাজ্জাজই পাবে। সে তোমার চেয়ে বেশি হকদার। সুলায়মানের পুত্র কথার মোড় ঘুরিয়ে বলল, না এটা হাজ্জাজের ছিল না। এটা বাইতুল মালের ছিল। তখন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, তবে মুসলমানগণই এর বেশি হকদার।
এই অধিকার প্রশ্নেই হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের বংশের সমস্ত লোক তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছিল। এ সব লোক প্রত্যেক দিন তাঁর নিকট প্রতিনিধি পাঠিয়ে তাঁকে বুঝাতে চেষ্টা করত এবং তাদের দখলকৃত সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ না করতে তাঁকে পরামর্শ দিত।
একবার আব্দুল মালেকের সব চেয়ে অহংকারী পুত্র হিশাম যে বনু উমাইয়ার শাহজাদার মধ্যে নিজেকে খেলাফতের সবচেয়ে বেশি হকদার মনে করত, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট তার বংশের পক্ষে মধ্যস্থতা করতে এসে একটি মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতে তাঁকে পরামর্শ দিল। সে বলল, আমার বংশের লোকেরা বলে, যে পর্যন্ত আপনার খেলাফতের সম্পর্ক তা আপনি যা ইচ্ছা করেন, তাতে তাদের কোন আপত্তি নেই। কিন্তু আপনার পূর্ববর্তী খলিফাগণ যা করে গিয়েছেন, আপনি সেটা সে ভাবেই ছেড়ে দিন। এ ব্যাপারে কোন হস্তক্ষেপ করবেন না।
যদি অন্য কোন রাজনীতিবিদ হত এবং ন্যায়নিষ্ঠ না হয়ে রাজনীতি প্রিয় হত তবে অবশ্যই এ মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করত না। ফলে তার বংশের লোকেরাও খুশী হত এবং তাঁর উপর কোন প্রকার অসন্তুষ্টও হত না। কিন্তু যেহেতু নিজেকে রক্ষা করা বা বংশের লোকদের খুশী করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল শুধু ন্যায় ও সুবিচারের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা- যাতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন এবং তার দায়িত্বের উপরও কোন প্রকার অভিযোগ না ওঠে। এ জন্য তিনি হিশামকে জিজ্ঞেস করলেন, যদি আমার নিকট এরূপ দু'টি ফরমান আনা হয় একটি হযরত মুয়াবিয়া (রা)-এর লিখিত এবং অপরটি আব্দুল মালেক লিখিত এবং উভয় ফরমান একই বিষয় সম্পর্কীত হয়, তবে তুমি আমাকে কোন ফরমান অনুযায়ী কাজ করতে পরামর্শ দিবে? হিশাম বলল, পূর্বেরটির। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, তবে আমি ঠিকই করেছি। কারণ আমিও আল্লাহর কিতাবকেই অগ্রাধিকার প্রদান করেছি। যে সব বিষয় আমার নিকট বলছ তা আমার যুগেরই হোক অথবা আমার পূর্বের যুগেরই হোক আমি তাতে আল্লাহর কিতাবের পরেই স্থান দিব।
হযরত ওসমান (রা) এর পৌত্র সায়ীদ ইবনে খালিদ উমাইয়া বংশের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। তিনি খুব বিনয়ের সাথে হিশামের সমর্থন করে বলছিলেন যে, আমিরুল মুমিনীন! আপনার যুগের বিষয় সমূহেরই ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর থাকুন, আপনার জন্য কল্যাণকর হবে।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সায়ীদকে লক্ষ্য করে বললেন, “আল্লাহ তোমাকে সৎপথ প্রদর্শন করুন, আমরা সকলেই তাঁর নিকট ফিরে যাব। মনে কর, এক ব্যক্তি কয়েকটি ছোট বড় ছেলে রেখে ইন্তেকাল করল। বড় ছেলেরা তার শক্তিতে ছোটদেরকে নির্যাতন করে তাদের ধন সম্পদ আত্মসাৎ করতে লাগল, আর তোমার নিকট ছোট ছেলেরা এসে ন্যায় বিচার প্রার্থনা করল, এখন তুমি কি করবে? খালেদ বলল, 'সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে আমি বড়দের নিকট থেকে ছোটদের হক আদায় করে দেওয়ার ব্যবস্থা করব।"
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, আমিও দেখছি যে, আমার পূর্ববর্তী শাসকগণ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, এমনকি তাদের অধীনস্থ লোকেরাও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই জনগণকে নির্যাতন করে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। অতএব আমার কাছে ক্ষমতা আসার পর সবল হতে দুর্বলের অধিকার আদায় করে দেয়া ছাড়া আমি অন্য কোন পথই দেখতে পাচ্ছি না।
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ যথার্থই বলেছিলেন, মূলতঃ এরূপই হয়েছিল। হযরত মুয়াবিয়া (রা) এর স্থলাভিষিক্ত শাসকগণ বিশেষতঃ খলিফা আব্দুল মালেক এবং তার উত্তরাধিকারীগণ সাধারণ নাগরিকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিলেন, তাদের উত্তম ফসলোপযোগী জমিসহ অন্যান্য সহায় সম্পদ জোর করে দখল করেছিলেন। তারা সম্পূর্ণ ইরানী যুবরাজদের মতই জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত ছিলেন। সাধারণ নাগরিক ও তাদের মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান ছিল। মনে হত তারা যেন আকাশ হতেই জন্ম গ্রহণ করেছেন এবং বাকী সব লোক মাটি থেকে জন্ম গ্রহণ করেছে। তারা স্বর্ণ রৌপ্য খচিত গদীতে আরাম করতেন, স্বর্ণের বাসনে খাদ্য খেতেন, রেশমী কাপড় পরিধান করতেন। তাদের কারও আস্তাবলে সুন্দর ঘোড়ার অভাব ছিল না। তাদের প্রাসাদ রঙধনুর মত উজ্জ্বল ঝলমলে ছিল। তাদের অন্তঃপুরে দুনিয়ার সেরা সুন্দরী মহিলাগণকে দাসী হিসেবে আনা হত এবং তাদের সাথে আনন্দ উপভোগকে শুধু শরিয়ত সম্মতই মনে করত না বরং গৌরব বলেই মনে করত।
ইবনুল জাওযি বলেন, একবার যুদ্ধক্ষেত্র হতে কয়েকজন সুন্দরী যুদ্ধবন্দিনী ওমর ইবনে আবদুল আজিজের সামনে আনা হল। যখনই কোন সুন্দরী মহিলাকে তার সামনে আনা হত তখনই ওয়ালিদের পুত্র আব্বাছ মুখে পানি উঠিয়ে বলত, আমিরুল মুমিনীন! আপনি স্বয়ং একে গ্রহণ করুন। এ কথা সে বার বার বলতে লাগল। এতে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তাকে তিরস্কার করে বললেন, তুমি কি আমাকে ব্যাভিচার করার জন্য বলছ।
আব্বাছ যেরূপ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল, সে অনুযায়ী এটা ব্যাভিচার ছিল না। তার পিতা, তার চাচা এবং অন্যান্য আত্মীয়দের অন্তঃপুরে এরূপ দাসীর অভাব ছিল না। সেও ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে সে কথাই বলেছিল- যা তার পিতা, তার দাদা ও অন্যান্য আত্মীয় স্বজনকে করতে দেখেছে। কাজেই ওমর ইবনে আবদুল আজিজের এ কথায় তার মনে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করল। সে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের ঘর হতে বের হয়ে গেল এবং দরজায় অবস্থানরত তার আত্মীয়-স্বজনকে দেখে অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে বলল, তোমরা এ লোকের দরজায় এসে বসেছ, সেতো তোমাদের বাপ-দাদাকে ব্যাভিচারী বলছে।
আসলে এটা তার বাপ-দাদাকে ব্যাভিচারী মনে করার কথা নয়, প্রকৃতপক্ষে ইয়াযিদ হতে শুরু করে খলিফা সুলায়মান পর্যন্ত উমাইয়া বংশীয় যুবরাজগণ সম্পূর্ণরূপেই শরিয়ত বিরোধী জীবনযাপনে অভ্যস্থ ছিল। তারা সমালোচনার উর্ধ্বে ছিল না। তাদের জীপনযাপন পদ্ধতি সম্পূর্ণরূপেই ইসলামের পরিপন্থী ছিল।
ইসলাম এ জন্য আবির্ভূত হয়নি যে, কোন মানুষ অপর কোন মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করবে, আমীর লোকেরা অন্তঃপুরে হাজারও সুন্দরী রমণী রেখে ভোগ বিলাস করবে আর সর্বসাধারণের সহায় সম্পদ জোর করে নিজের আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে বণ্টন করে দিবে। অপরদিকে সাধারণ মানুষ ক্ষুধা দারিদ্রের কবলে নিষ্পেষিত হয়ে অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করবে।
আল্লাহর কিতাব এবং মহানবীর (স) জীবনাদর্শ এরূপ জীবন উপভোগের অনুমতি দান করেনি বলেই হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ দাসী ব্যবহার করা থেকে বিরত ছিলেন।
যা হোক, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ যখন খালেদকে এসব কথা বললেন, তখন সে নির্বাক হয়ে গেল এবং অবশেষে বলল, আল্লাহ আপনার সহায় হোন।
খালেদ অবশ্যই চরিত্রবান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে সৎকর্ম করার জন্যে দোয়া করেই বিদায় হলেন। কিন্তু ওয়ালিদের পুত্র শাহী জীবন যাপনে অভ্যস্থ ছিল, সে কঠোর ভাষায় ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে তিরস্কার করে তাঁকে একটি পত্র লিখল। 'তুমি তোমার পূর্ববর্তী খলিফাদের দোষ-ত্রুটি খোঁজ করছ, তাদের উপর অভিযোগ দাঁড় করছ। তুমি তাদের প্রতি ও তাদের সন্তানদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন পথ অবলম্বন করছ। তুমি কোরাইশ বংশীয় লোকদের ও তাদের ধন-সম্পদের উপর জুলুম করে অন্যায়ভাবে তা বাইতুল মালে জমা করে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহপাক যাদের সাথে প্রীতির সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দিয়েছেন, তা লঙ্ঘন করেছ।
হে আব্দুল আজিজের পুত্র! আল্লাহকে ভয় কর। তুমি জালিম, এ মসনদে তুমি তৃপ্তি লাভ করতে পারছ না। তুমি তোমার অন্তরের দুর্বার আগুন নিভাবার জন্যই নিজের আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি জুলুম-অত্যাচার শুরু করেছ।
আল্লাহর কসম! যিনি মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা) কে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করেছিলেন, তুমি তোমার শাসনের সামান্য সময়ের মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর নবী (সা)-এর পথ থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছ। অথচ তোমার এ শাসন আমলকে তুমি একটি পরীক্ষা মনে করছ। তোমার উপরও একজন পরাক্রমশালীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রয়েছে। তুমি তাঁর শক্তি অতিক্রম করতে পারবে না এবং তিনি তোমার এসব জুলুম-অত্যাচারকেও ক্ষমা করবেন না।
এ ব্যক্তি হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে যে সব জুলুম-অত্যাচারের অভিযোগ উত্থাপন করেছে তা কি বাস্তবিকই জুলুম অত্যাচার ছিল? তা শুধু এ ছিল যে, তিনি তার নিকট হতে এবং তার আত্মীয় -স্বজনদের নিকট হতে মুসলমানদের অধিকার আদায় করে প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দিতে শুরু করেছিলেন। স্বয়ং জালিমগণ অবিচারকে সুবিচার আর সুবিচারকে অবিচার বলে মনে করেছিল।
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ খুব উত্তম ও সঠিকভাবেই তার উত্তর লিখেছিলেন যে, "তুমি মনে কর যে, আমি জালিম-অত্যাচারী। কারণ আমি তোমাকে ও তোমার আত্মীয় স্বজনকে আল্লাহপাকের সে সমস্ত সম্পদের অংশ দিতে রাজী নই যা কেবল আত্মীয়-স্বজন, দরিদ্র ও বিধবাদের জন্যই নির্ধারিত ছিল।
তুমি আমার উপর এ অভিযোগ আনার সময় ভুলে গেলে কেন আমার চেয়েও বড় জালিম সে ব্যক্তি যে, তোমার মত একটি নির্বোধকে শুধু পিতৃস্নেহেই একটি বিরাট মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি নিয়োগ করেছিল, আর তুমি যথেচ্ছাভাবে মুসলিম বাহিনীর উপর কর্তৃত্ব করেছিলে। তোমার এ নিয়োগের পশ্চাতে পিতৃস্নেহ বৈ আর কোন কারণ ছিল কি? না আর কোন কারণ ছিল না।
আফসোস! তোমার ও তোমার পিতার বিরুদ্ধে কিয়ামতের দিন কত লোক যে অভিযোগ করবে, সে দিন তোমরা কিভাবে এ অভিযোগকারীদের থেকে আত্মরক্ষা করবে, তা ভেবে অস্থির হই।
আমার চেয়ে বহু গুণ বেশি জালিম সেই ব্যক্তি, যে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ ছাকাফীর মত নরাধমকে আরবের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিল। এই হাজ্জাজ বিনা কারণে মুসলমানদের হত্যা করত এবং তাদের ধন-সম্পদ লুট করে নিত।
আমার চেয়েও বহু গুণ বেশি জালিম সে ব্যক্তি, যে কুরয়া ইবনে শুরাইকের মত চরিত্রহীন, অসভ্য ও মুর্খকে মিশরের শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ দান করেছিল এবং তাকে প্রকাশ্যভাবে অনর্থক খেলাধুলা, মদ্যপানসহ সকল প্রকার অন্যায় অপকর্মের অনুমতি দিয়েছিল। আমার চেয়েও শতগুণ জালিম এবং আল্লাহর আইন লঙ্ঘনকারী সে ব্যক্তি, যে আলিয়া বারবারিয়াকে মুসলমানদের সম্পদের অংশীদার করে দিয়েছিল। যদি আমি পর্যাপ্ত সময় পেতাম তবে আমি আল্লাহর সম্পদ এবং مسلمانوں অধিকার পূর্ণভাবে তোমাদের কাছ থেকে আদায় করে তাদের নিকট ফিরিয়ে দিতাম এবং তোমার ও তোমার বংশের সকল গর্বই খর্ব করে দিতাম। দীর্ঘ দিন যাবত তোমরা সাধারণ নাগরিকদের সম্পদ লুণ্ঠন করে খাচ্ছ। আল্লাহর কসম! এখন যদি তোমাদেরকে গোলাম বানিয়ে বিক্রয় করে দেয়া হয় এবং সেই বিক্রয়লব্ধ অর্থ বঞ্চিত, বিধবা, ইয়াতিম ও দরিদ্রের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয় তবুও তোমাদের কৃত জুলুম-অত্যাচারের ক্ষতি আদায় হবে না।
আমরা জানিনা, ইবনে ওয়ালিদ এই পত্র পেয়ে তা বাড়াবাড়ি বলে মনে করেছিল কি না। তবে সত্য কথা হলো, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ ওয়ালিদের পুত্রকে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত করেননি।
কুররা ইবনে শুরাইক এবং হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ বনু উমাইয়ার ললাটে দু'টি কলঙ্কের ছাপ ছিল। এই দু' জালিমের একজন মিশরে অত্যাচারের স্টীমরোলার চালিয়েছিল, অপর জন ইরাকে রক্তের নদী প্রবাহিত করেছিল। বিশেষতঃ হাজ্জাজ ছিল সে যুগের হালাকু খাঁ। পার্থক্য ছিল শুধু এ যে, হালাকু খাঁ ছিল অমুসলিম আর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ ছিল মুসলমান এবং নিজেকে হাফিজে কুরআন দাবী করত। হালাকু খাঁর অপরাধ ক্ষমাযোগ্য কিন্তু হাজ্জাজের অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। এ হাজ্জাজই উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালেকের অতি প্রশংসনীয় ব্যক্তি ছিল। তিনি মৃত্যুর সময় তার পুত্র ওয়ালিদকে অছিয়ত করেছিলেন যে, হাজ্জাজই তোমাদের সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। সবসময় তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করবে, কাউকেও তার উপর প্রাধান্য দিবে না।
ইবনে খালকান বলেন, বাস্তবিকই হাজ্জাজ সমকালীন যুগে বিশিষ্ট বাগ্মী ও পবিত্র কোরআনের হাফিজ ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এ হাফিজে কোরআনই আব্দুল মালেকের রাজত্বকে সুসংহত করতে কাবা শরীফের উপর পাথর নিক্ষেপ করতেও সংকোচবোধ করেনি। এ জালিম শাসক পবিত্র কাবার চার দেওয়ালের ভিতরে রক্তনদী বহাতেও তার বিবেক দংশন করেনি। সে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা) ও তাদের মুখে থুথু নিক্ষেপ করেছিল যারা মহানবী (সা)-এর পবিত্র চেহারা হতে নূর গ্রহণ করে ধন্য হয়েছিলেন। যে হযরত আনাস (রা) যিনি একাধারে দীর্ঘ দশ বৎসর মহানবী (সা)-এর সঙ্গী ছিলেন, তার উপর কঠোরতা করত এবং তাকে অপদস্ত করতেও বিন্দুমাত্র ইতস্তত করেনি। এ পাপিষ্ঠ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা)-এর মত বিশিষ্ট যুগশ্রেষ্ঠ সাহাবীর লাশ মুবারক চল্লিশ দিন পর্যন্ত শূলিতে ঝুলিয়ে রেখেছিল।
এ পাপিষ্ঠ কা'বা শরীফের উপর পাথর নিক্ষেপ এবং সাহাবীগণের সন্তানগণকে হত্যা করেও এই অপরাধের জন্য জীবনে কোন দিন অনুতপ্ত হয়নি এবং লজ্জিত হয়নি। সে কুফার লোকগণকে অত্যাচারে জর্জরিত করেছিল। অনেক নিরপরাধ জ্ঞানী গুণী মানুষকে হত্যা করেছিল, শুধু এ অপরাধে যে, তাঁরা আব্দুল মালেককে ন্যায় হিসেবে মানতে পারেননি। সে বিনাদ্বিধায় মুসলমানদের ধন-সম্পদ লুট করেছিল, তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল এবং নিষ্পাপ মানুষের রক্ত দিয়ে আল্লাহর জমিনকে রঙ্গীন করে তুলেছিল।
📄 ব্যক্তিগত সম্পত্তির হিসাব
যারা পরের প্রতি হিসাব-নিকাশের বেলায় কঠোর-ইতিহাসে এরূপ শাসকদের উদাহরণ যথেষ্ট থাকলেও নিজেদের হিসেব নিকেশের বেলায় আরোও অধিক কঠোর এরূপ শাসনকর্তার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে নেই বললেই চলে।
এদিক বিবেচনা করলে ইতিহাসের সুক্ষ্ণ দৃষ্টিতে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি অন্যের সম্পদের উপর হিসেবের কঠোরতা করার আগে নিজের সম্পদের পর্যালোচনা ও পরিসংখ্যান করেছিলেন।
ইবনে সাদ বলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ খলিফা মনোনীত হবার পর তার সম্পত্তির পরিসংখ্যান করলেন। তাঁর নিকট যে সমস্ত দাস দাসী, বস্ত্র, সুগন্ধি এবং এ জাতীয় আরো যে সব অপ্রয়োজনীয় জিনিস ছিল, তিনি সে সব বিক্রি করে বিক্রি লব্ধ ত্রিশ হাজার দীনার আল্লাহর পথে দান করে দিলেন এবং তিনি একজন সাধারণ নাগরিকের স্তরে নেমে আসলেন। সুয়াইদা ব্যতিত তাঁর আর কোন সম্পত্তি ছিলনা। এ সুয়াইদা হতে তিনি বার্ষিক দেড়শত দীনার মূল্যের ফসল পেতেন। এটা ছিল তাঁর একমাত্র আমদানী এবং এ আমদানী দিয়েই তাঁর সংসার চলত।
আব্দুল ফরিদের ভাষ্যকার বলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বায়তুল মাল হতে কোন অর্থই গ্রহণ করতেন না এমনকি রাজস্ব হতেও না। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে একবার বলা হল যে, হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) রাজস্ব খাত হতে দৈনিক দুই দেরহাম গ্রহণ করতেন, আপনি অন্ততঃ সেই পরিমাণই গ্রহণ করুন, তিনি যে পরিমাণ গ্রহণ করতেন। তিনি বললেন, ওমর ইবনে খাত্তাব (রা)-এর কোন সম্পদ ছিল না, কিন্তু আমার প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ আছে। সুতরাং আমি কেন গ্রহণ করব?
ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বায়তুল মাল অথবা জনগণের ধন-ভান্ডার হতে অর্থ গ্রহণ করাকে খুবই অন্যায় মনে করতেন। তিনি খুব অনাড়ম্বর ও সাধারণ জীবনযাপন করতেন। কিন্তু তবুও বায়তুল মালের উপর সামান্য বোঝা চাপিয়ে দেওয়াও পছন্দ করতেন না। এমনকি যদি কোন সময় সামান্য অর্থের বিশেষ প্রয়োজন হত তবুও তিনি তা বায়তুল মাল হতে গ্রহণ করতেন না। ইবনুল জাওযি এ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন যে, একবার তিনি স্ত্রী ফাতেমার নিকট এসে বললেন, আমার আঙ্গুর খেতে খুব ইচ্ছা হয়েছে, তোমার নিকট কি একটি দেরহাম আছে? ফাতেমা অবাক হয়ে বললেন, আপনি এত বিরাট সাম্রাজ্যের শাসনকর্তা, আপনি একটি দেরহামেরও ব্যবস্থা করতে পারেন না?
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, খিয়ানতের অপরাধে ধৃত হয়ে জাহান্নামের বেড়ী পরিধান করার চেয়ে এই অবস্থাকেই ভাল মনে করি।
অন্য কথায় বায়তুল মাল হতে সামান্য অর্থ গ্রহণ হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের মতে দোযখের পথ প্রশস্ত করা মনে হতো। তাঁর সততা-সাধুতা এতই দৃঢ় ছিল যে, কঠিন প্রয়োজনের মুহূর্তেও তিনি বায়তুল মাল হতে কোন অর্থই গ্রহণ করতেন না।
ইবনুল জাওযি বলেন, একবার হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ ক্ষুধায় অস্থির হয়ে পড়লেন, অথচ বায়তুল মালে প্রচুর খাদ্য সামগ্রী মওজুদ ছিল, কিন্তু তিনি সেখান থেকে কিছুই গ্রহণ করলেন না।
তিনি ঘরে এসে স্ত্রীকে বললেন, তোমাদের নিকট খাওয়ার কিছু আছে কি? ঘরে কয়টি খেজুর ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তাঁকে সেই খেজুর দেয়া হলে তিনি তা খেয়ে পানি পান করলেন এবং বললেন, যে ব্যক্তি তার পেটে আগুন ভরে আল্লাহপাক তাকে তার নিকট হতে দূর করে দেন।
তিনি কখনও তার পেটে এ আগুন ভরতেন না। তাঁর আমদানী খুবই সামান্য ছিল, তার ও তার পরিজনের প্রয়োজন মিটাবার মত অর্থ আয় হত না। কাজেই অধিকাংশ সময়ই তাঁর ঘরে ভাল কোন খাদ্য-দ্রব্য তৈরি হত না। সাধারণত তিনি পিঁয়াজ ও তেল দিয়েই রুটি খেতেন।
ইবনুল জাওযি হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের এক ভৃত্য আবু উমাইয়ার কথা বর্ণনা করে বললেন যে, ভৃত্য জুমার সময় তার মনিব পত্নীর নিকট আসলে তিনি তাকে পিঁয়াজ দিয়ে রুটি খেতে দিলেন। সে প্রতিবাদ করে বলল, প্রত্যেক দিন পিঁয়াজ! আর পিঁয়াজ! আর ভাল লাগে না! মনিব পত্নি বললেন বৎস! এটা যে, তোমার মনিবের খাদ্য।
প্রকৃতপক্ষে এটাই ছিল তার মনিবের দৈনন্দিন খাদ্য-তালিকা। বায়তুল মালের উপর যাতে কোন প্রকার চাপ সৃষ্টি না হয়, এ উদ্দেশ্যেই তিনি এ খাদ্য বেছে নিয়েছিলেন। مسلمانوں বায়তুল মাল ছিল তাঁর নিকট নিষিদ্ধ খাদ্যের মত। এমন কি কোন সময় যদি সরকারী ডাক যোগে কোন জিনিস তাঁর নিকট আসত, তিনি তাও গ্রহণ করতেন না।
ইবনুল জাওযি উদাহরণ স্বরূপ বর্ণনা করেন, একবার তার বন্ধু আম্মারা ইবনে নাসী সরকারী ডাকের মাধ্যমে কিছু খেজুর পাঠাল। যে ব্যক্তি খেজুর নিয়ে তাঁর নিকট আসল তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, এ খেজুর কিভাবে বহন করে এনেছ? সে বলল, ঘোড়ার ডাক যোগে আনা হয়েছে। তিনি নির্দেশ দিলেন যে, এগুলি বাজারে নিয়ে বিক্রি করে দাও। সে ব্যক্তি খেজুরের ঝুড়ি নিয়ে বাজারে আসলে একজন উমাইয়া বংশীয় লোক সে খেজুরের ঝুড়ি ক্রয় করে অবিকল সেরূপেই খলিফার নিকট হাদিয়া হিসেবে পাঠিয়ে দিল। খলিফা তা দেখে বললেন, এটা যে সেই খেজুরই! অতঃপর সে সম্পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করলে তিনি তা তার খাদেমদেরকে খেতে দিলেন এবং অবশিষ্ট যা ছিল, তিনি তা তাঁর কোন এক স্ত্রীর নিকট পাঠিয়ে দিলেন। এবং নিজে তার মূল্য বায়তুল মালে জমা দিয়ে দিলেন।
এরূপ একটি ঘটনা আরো একবার ঘটেছিল। একবার তিনি বললেন, লেবানন বা সীজের মধু হলে খুব ভাল হত। তাঁর স্ত্রী ফাতেমা তার এ আকাংখার কথা জানতে পেরে তার খাদেমকে পাঠিয়ে লেবাননের গর্ভণর ইবনে মাদিকারাবকে এ সম্পর্কে জানালেন। ইবনে মাদিকারাব প্রচুর মধু পাঠিয়ে দিলেন। এ মধু ফাতিমার নিকট এসে পৌছলে তিনি. তা খলিফার সামনে হাজির করলেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সমস্ত বিষয় জানতে পেরে সমস্ত মধু বাজারে পাঠিয়ে বিক্রি করে দিলেন এবং তার মূল্য বায়তুল মালে জমা করে দিলেন। তারপর তিনি ইবনে মাদিকারাবকে লিখলেন যে, যদি ফাতেমার কথায় আর কখনও মধু পাঠাও তবে আমি আর কখনও তোমার মুখ দেখব না এবং তোমার দ্বারা কোন খেদমতও গ্রহণ করব না।
এ ধরনের আরও একটি ঘটনার কথা জানা যায়, একদিন তিনি তার স্ত্রীর নিকট মধু খেতে চেয়েছিলেন কিন্তু তার স্ত্রীর নিকট মধু ছিল না। কিছুক্ষণ পর তিনি খলিফার নিকট মধু পাঠিয়ে দিলেন তিনি মধু খেয়ে খুবই তৃপ্ত হলেন। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন। এ মধু কোথা হতে এনেছ?
তার স্ত্রী বললেন, আমার নিকট দু'টি দেরহাম ছিল তা দিয়ে সরকারী বাহনে একটি খাদেমকে পাঠিয়ে এ মধু বাজার থেকে ক্রয় করে এনেছি। তিনি মধুর বাসনটি আনালেন এবং স্ত্রীকে মধুর মূল্য দিয়ে বললেন, ওমরের প্রবৃত্তি দমনের জন্য সরকারী ঘোড়া ব্যবহার করা তোমার উচিত হয়নি। তখন সে মধু বায়তুল মালে পাঠিয়ে দিলেন।
একবার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রচুর আপেল আসল। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ গরীবদের মধ্যে সে আপেল বিতরণ করেছিলেন, হঠাৎ তাঁর একটি ছোট ছেলে এসে আপেলের স্তূপ থেকে একটি আপেল নিয়ে খেতে লাগল। তিনি এটা দেখে তার হাত থেকে আপেলটি কেড়ে নিলেন। ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে তার মায়ের নিকট চলে গেল। তার মা বাজার থেকে আপেল খরিদ করিয়ে এনে তাকে শান্তনা দিলেন। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ ঘরে এসে আপেলের ঘ্রাণ পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি বায়তুলমালের আপেলের অংশ পেয়েছ? তার স্ত্রী বললেন না, ছেলে কাঁদতেছিল দেখে আমি বাজার থেকে ক্রয় করে এনেছি।
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তার প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করে বলেন, আল্লাহর কসম! যখন আমি ছেলের হাত থেকে আপেলটি কেড়ে নিলাম, তখন মনে হলো, যেন আমার কলিজাটি চিড়ে ফেললাম। কিন্তু আল্লাহর সামনে मुसलमानों একটি আপেলের জন্য অপমানিত হওয়াটা আমার কাছে খুবই খারাপ মনে হল।
বাস্তবিক পক্ষে যে কোন মূল্যের বিনিময়ে তিনি এ অপদস্ততা পছন্দ করতেন না। ইবনুল জাওযি বলেন, তিনি বায়তুল মালের সম্পদের ব্যাপারে এতই কঠোরতা অবলম্বন করতেন যে, একদিন প্রচণ্ড শীতের সময় জুমার নামাযের উদ্দেশ্যে গোসল করার জন্য খাদেমগণকে পানি গরম করতে বললেন। খাদেমগণ বলল যে, জ্বালানী নেই, কি দিয়ে পানি গরম করব? তারপর তারা সরকারী রন্ধনশালা থেকে পানি গরম করে আনল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা বলেছিলে জ্বালানী নেই তবে এখন কিভাবে পানি গরম করেছো? খাদেমগণ পানি গরম করার ঘটনা বর্ণনা করল। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ রন্ধন শালার প্রধানকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, তারা কি তোমাকে বলেছিল এটা খলিফার পানির পাত্র, গরম করে দাও। রন্ধন শালার প্রধান বলল, আল্লাহর শপথ! এ পানি গরম করতে আমি এক টুকরো জ্বালানী ব্যবহার করিনি। খাদ্য পাকাবার পর চুল্লিতে অঙ্গর জ্বলছিল যদি তা ছেড়ে দিতাম তবুও নিভে যেত এবং ভষ্ম হত।
এরূপ কারণ দর্শাবার পরও হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, জ্বালানীর মূল্য কত ছিল? সে জ্বালানীর মূল্য বলল। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে জ্বালানীর মূল্য পরিশোধ করে দিলেন।
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বায়তুল মালের অর্থ দিয়ে একটি লঙ্গরখানা প্রতিষ্ঠা করে দরিদ্র আলেম, ফাজেল ও অন্যান্য গরীব লোকদের খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। একদিন মেহমানগণ দস্তরখানে বসে খাদ্য খেতে অস্বীকার করলেন। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা খাচ্ছেন না কেন, তারা বলল, আপনি আমাদের সাথে না খেলে আমরা খাব না। তখন হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাদের সাথে খাদ্য খেতে বাধ্য হলেন এবং তার ব্যক্তিগত তহবিল হতে দৈনিক দু দেরহাম বায়তুল মালে জমা করে দিতে আদেশ দিলেন। তারপর হতে তিনি প্রত্যেক দিন মেহমানদের সাথে মিলে খাদ্য খেতেন।
হযরত ওমর লঙ্গরখানা প্রতিষ্ঠা করার পর তাঁর পরিবারের লোকগণকে সর্তক করে দিয়ে বললেন, সাবধান! কেউ যেন কখনও লঙ্গরখানা হতে কোন জিনিস চেয়ে না আনে। কারণ এ সমস্ত গরীব মিসকীন ও মুসাফিরদের জন্য।
ইবনে সাদ বলেন, একদিন হযরত ওমর বললেন, তাঁর দাসীকে একটি আবৃত দুধের পাত্র উঠাতে দেখে বললেন, এটা কার জন্য এবং কোথা হতে এনেছ? দাসী বলল, আপনার এক বেগম অন্তঃসত্ত্বা, তিনি দুধ খেতে চেয়েছিলেন, আর গর্ভবতী রমণী কোন কিছু খেতে চাইলে তার আশা পূর্ণ করতে হয়, অন্যথায় গর্ভস্থিত সন্তান নষ্ট হবার সম্ভাবনা থাকে। এ জন্যই আমি এক পিয়ালা দুধ দারুল ফুকরা হতে চেয়ে এনেছি। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ দাসীকে হাত ধরে টেনে নিতে লাগলেন এবং উচ্চস্বরে বললেন, যদি গরীব মিসকিনদের জন্য নির্ধারিত খাদ্য সামগ্রী না খেলে তার গর্ভ ঠিক না থাকে, তবে আল্লাহ যেন তা নষ্টই করে দেন। একথা বলতে বলতে তিনি দাসীকে টেনে স্ত্রীর নিকট গিয়ে বললেন, এ দাসী বলে যে, তুমি নাকি গরীব-মিসকীনদের জন্য রক্ষিত খাদ্য না খেলে তোমার গর্ভ ঠিক থাকবে না, আমি দোয়া করি, যদি এরূপই হয় তবে এ গর্ভ যেন নষ্ট হয়ে যায়।
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের স্ত্রী তাঁর উদ্দেশ্য বুঝে দাসীকে তিরস্কার করলেন এবং দুধপাত্রটি ফেরত পাঠিয়ে দিলেন।
ইবনে সাদ আরও বলেন, রন্ধন শালায় দীর্ঘ এক মাস পর্যন্ত তাঁর জন্য অজুর পানি গরম করা হচ্ছিল কিন্তু তিনি তা জানতে পারেননি। তারপর যখন তিনি তা জানতে পারলেন, তখন খাদেমদের বললেন, তোমরা কত দিন যাবত এখানে পানি গরম করছ? খাদেমগণ বলল, এক মাস যাবত পানি গরম করছি। তখন তিনি সে পরিমাণ জ্বালানী কাঠ রন্ধন শালায় পাঠিয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন।
উবাইদ ইবনে ওয়ালিদ বলেন, যদি ওমর ইবনে আবদুল আজিজ রাতে সরকারী কাজ করতেন তখন তিনি বায়তুল মালের বাতি ব্যবহার করতেন আর যদি ব্যক্তিগত কাজ করতেন তখন ব্যক্তিগত বাতি ব্যবহার করতেন।
এ বর্ণনাকারীই বলেন যে, একবার কাজ করতে করতে বাতির তৈল শেষ হয়ে গেল। তিনি বাতির তৈল ভরতে উঠলেন। তার নিকট উপবিষ্ট লোকেরা বলল, আমরাও তো এ কাজটুকু করে দিতে পারি! কিন্তু ওমর রাজি হলেন না নিজেই বাতির তৈল ভরে এনে বললেন, আমি পূর্বেও যে ওমর ছিলাম এখনও সেই ওমরই আছি।
তিনি বায়তুল মালের সম্পদের এতই গুরুত্ব দিতেন যে, তিনি যখন কোন সরকারী কাগজে সরকারী ফরমান লিখতেন তখনও তিনি সরু কলম দ্বারা ছোট অক্ষর দ্বারা সংক্ষিপ্ত আকারে ফরমান লিখতেন।
ইবনে সাদের ভাষ্যটি এই- তাঁর লিখা চিঠিপত্র খুবই সংক্ষিপ্ত হত তার চিঠিপত্র মাত্র চারটি লাইন থাকত।
হযরত ওমর বায়তুলমাল অথবা লঙ্গরখানার কোন আসবাব দ্বারা নিজে উপকৃত হতে খুবই ঘৃণা বোধ করতেন। যদি খাদেমগণ কোন সময় তাড়াহুড়ার দরুন লঙ্গরখানার চুলায় তাঁর কোন খাদ্য পাকিয়ে আনত হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তা খেতেন না।
ইবনুল জাওযি, আল হাকام ইবনে ওমরের একটি ভাষ্য বর্ণনা করেছেন। ভাষ্যকার বলেন যে, একবার আমি ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের নিকট উপস্থিত ছিলাম। তিনি তাঁর এক খাদেমকে গোশত ভেজে আনতে নির্দেশ দিলেন। উক্ত খাদেম খুব তাড়াতাড়িই গোশত ভেজে নিয়ে আসল। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তার দ্রুতগতি দেখে বললেন, তুমি খুব তাড়াতাড়ি করেছ। সে বলল, জি হা, বাবুর্চিখানা হতে ভেজে এনেছি। তিনি খাদেমকে বললেন, তবে এখন তুমিই এটা খেয়ে ফেল। তোমার জন্যই তুমি এ খাদ্য তৈরি করেছ আমার জন্য নয়।
তিনি বাড়ীতে বসবাস করার সময় যেরূপ সর্তকতা অবলম্বন করতেন প্রবাসেও ঠিক সেরূপই করতেন। তিনি যখন কোন সরকারী সফরে বের হতেন তখন সরকারী অর্থে নির্মিত কোন ঘরে অর্থাৎ কোন সরাইখানা বা কোন বাংলোতে অবস্থান করতেন না, বরং তিনি স্বীয় তাবুতে থাকতেন নিজের খাদ্য খেতেন কোন লোকের দাওয়াত বা কারও প্রেরিত খাদ্য খেতেন না। তিনি কারও কোন হাদীয়া গ্রহণ করতেন না। তাঁর মনে এসমস্ত ঘুষ বা উৎকোচ হিসেবে বিবেচিত হত।
হাদীয়া বা উপঢৌকন সম্পর্কে ইবনুল জাওযি মুহারিবের বরাত দিয়ে একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন যে, একবার হযরত ওমর ইবনে আজিজ আপেল খেতে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেন। তাঁর বংশের একটি লোক এটা জানতে পেরে তাঁর জন্য কিছু আপেল ক্রয় করে হাদীয় পাঠিয়ে দিলেন। এই আপেল যখন তাঁর নিকট উপস্থিত করা হল তখন তিনি আপেল হাতে নিয়ে বললেন, কত সুন্দর! কত সুগন্ধি! এটা দাতার নিকট নিয়ে গিয়ে তাকে আমার সালাম দিয়ে বল, তোমার হাদীয়া আমার অন্তরের সেই স্থানই দখল করেছে, যা তুমি কামনা করছ।
মুহারিব বলেন, আমি নিবেদন করলাম, আমিরুল মুমেনিন! সেত আপনারই চাচাত ভাই, আপনার বংশের লোক! এছাড়া আপনি অবশ্যই জানেন যে, মহানবী (সাঃ) হাদীয়ার বস্তু খেতেন, যদিও তিনি ছাদকা গ্রহণ করতেন না।
হযরত ওমর ইবনে আজিজ বললেন, তোমার জন্য আফসুস হয়। রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্য হাদীয়া প্রকৃতই হাদীয়া ছিল, কিন্তু এখনকার সময়ে এটা আমাদের জন্য সরাসরি উৎকোচ ব্যতীত আর কিছুই নয়।
এতো হল তাঁর চাচাত ভাইয়ের ঘটনা। এরূপ ঘটনা তার এক সফরের সময়ও ঘটেছিল। তিনি এক সফরে ছিলেন তাঁর সঙ্গে ফুরাত ইবনে মুসলিমও ছিল। এ সময়ও তিনি আপেল খেতে আকাঙখা প্রকাশ করলেন। তাঁর বাহন অগ্রসর হতে লাগল, দেখা গেল যে, কিছু লোক আপেলের ঝুড়ি নিয়ে যাচ্ছে। হযরত ওমর ইবনে আজিজ তাঁর সওয়ারীকে আপেল বহনকারীদের একজনের নিকটবর্তী করে একটি আপেল তুলে নিলেন এবং তা ঘ্রাণ শুঁকে সেটা যথাস্থানে রেখেদিলেন এবং বললেন, তোমরা স্বগৃহে চলে যাও। সাবধান, তোমাদের কেহ যেন আমার কোন লোককে কোন বস্তু হাদীয়া না দেয়।
বর্ণনাকারী বলেন, আমি আমার খচ্ছরকে তাড়া করে হযরত ওমর ইবনে আজিজের নিকটবর্তী হলাম এবং বললাম, হযরত! আপনি আপেল খেতে চেয়েছেন, আমরা তা তালাশ করেছি কিন্তু পাইনি। এ আপেল আপনার নিকট হাদীয়া হিসেবে এসেছে, আর আপনি তা এভাবে ফিরিয়ে দিলেন? তিনি বললেন, আল্লাহর রসূল (সাঃ) হযরত আবুবকর (রাঃ) ওমর ফারুক (রাঃ) জন্য হাদীয়া হাদীয়াই হত কিন্তু তাদের পরবর্তী শাসকদের জন্য তা হাদীয়া নয় বরং সরাসরি উৎকোচ।
হযরত ওমর ইবনে আজিজ (রহঃ) যথার্থই বলেছেন, রসূলুল্লাহ (সাঃ)। হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত ওমর ফারুকের (রাঃ) জন্য যে সব লোক হাদীয়া পাঠাতেন তাদের অন্তরে লোভ লালসার লেশমাত্রও থাকত না এবং হাদীয়া সেসব পবিত্রাত্মা মনীষীদের উপর কোন প্রভাবও বিস্তার করত না।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের যুগে সাধারণ মানুষের নৈতিকমান এতই নীচে নেমে এসেছিল যে কর্মচারীগণ কথায় কথায় ঘুষ গ্রহণ করতে দ্বিধাবোধ করত না। বিশেষতঃ খলিফা ও তার ঘরে হাদীয়া উপঢৌকনের পাহাড় জমে উঠত। ঈদ উৎসব নববর্ষ ইত্যাদি দিবসে খলিফাগণ লাখ লাখ টাকা সালামী বা নযর নিয়াজ পেতেন।
আল-ইয়াক্বীর বর্ণনায় জানা যায় যে, প্রাচীনকালে প্রজাগণ নওরোজ ও মেহেরজান দিবসে রাজার জন্য যে সমস্ত উপঢৌকন প্রেরণ করত, বনু উমাইয়ার খলিফাদের যুগ হতে তা পুনরায় চালু হয় এবং এ কুসংস্কারটি খলিফা সুলায়মানের যুগ পর্যন্ত চালু ছিল। হযরত ওমর ইবনে আজিজ খলিফা হয়েই এ কুসংস্কার বন্ধ করে দিলেন এবং সরকারী কর্মচারীদের জন্য যে কোন প্রকার উপঢৌকন নিষিদ্ধ করে দিলেন এবং এ ব্যাপারে এতই কঠোরতা অবলম্বন করলেন যে, সমস্ত কর্মচারীই সতর্ক হয়ে গেল।
বায়তুলমাল হতে এক পয়সাও বেশী গ্রহণ করার মত সাহস কারও ছিল না। সাধারণ প্রয়োজনীয় ব্যয়ের জন্যও হযরত ওমর ইবনে আজিজের নিকট তাদের আবেদন করে মঞ্জুরী গ্রহণ করতে হত। তাঁর অনুমতি ব্যতীত বায়তুল মাল হতে কেউ এক পয়সা খরচ করতে পারত না।
ইবনে হাজম হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের একজন বিশ্বস্ত ও প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাকে মদীনার শাসনকর্তা পদে নিয়োগ করেছিলেন। ইবনে হাজম হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট আবেদন করলেন যে, তাঁর পূর্ববর্তী শাসকগণ সরকারী খরচেই বাতি ব্যবহার করতেন, কাজেই আমাকেও সে ব্যাপারে অনুমতি দেয়া হোক। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তার উত্তরে লিখলেন, ইবনে হাজম! আল্লাহর কসম! আমি তোমার সেই দিনও দেখেছি যখন শীতের গভীর অন্ধকার রাতে তুমি প্রদীপ ছাড়া বাইরে যাতায়াত করতে। এখন তোমার অবস্থা পূর্বের তুলনায় অনেক ভাল। তোমার ঘরে যে প্রদীপ আছে তাই যথেষ্ট, অন্য কোন প্রদীপের তোমার প্রয়োজন নেই।
এ ছাড়াও ইবনে হাজম একবার আবেদন করেছিলেন যে, তার পূর্ববর্তী শাসকগণ সরকারী তহবীল হতেই কাগজ-কলম ও কালির খরচ পেতেন, কাজেই তাকেও সরকারী পর্যায়ে এ সমস্ত দ্রব্যাদি সরবরাহ করার ব্যবস্থা করা হোক। এর উত্তরে তিনি লিখলেন যে, আমার এ চিঠি পাওয়া মাত্রই তোমার কলমের আগা সরু করে নিবে, শব্দ খুব ঘন করে লিখবে এবং অনেক কথা একই পত্রে লিখতে চেষ্টা করবে যাতে বায়তুল মালে কোন চাপ না পড়ে, কারণ এরূপ লম্বা চিঠিপত্র লেখায় জনসাধারণের কোনও উপকারে আসবে না।
উদাহরণ স্বরূপ এ দু'টি ঘটনা উল্লেখ করা হলো এ জন্য যে, হযরত ওমর ইবনে আজিজ শুধু নিজেই বায়তুলমাল হতে কিছু নিতে অপছন্দ করতেন না তা নয়, বরং প্রশাসনিক কাজে অন্যান্য কর্মচারীদের অপ্রয়োজনীয় খরচও তিনি বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তাঁর মতে অপ্রয়োজনীয় খরচের বোঝা বায়তুল মালের উপর দেয়া কোন মতেই জায়েয নেই। তিনি বায়তুল মালকে একটি পবিত্র আমানতে পরিণত করে দিয়েছিলেন। যদি কোন কর্মচারী কখনও কোন অর্থ নষ্ট করত তখন তিনি তাকে সেজন্যে গ্রেফতার করতেন।
ইবনে আব্দুল হাকام একটি উদাহরণ পেশ করে বলছেন যে, ইয়ামেনের গভর্ণর ওয়াহ্হাব ইবনে মুনতিয়া হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে জানালেন যে, বায়তুল মালের কিছু দীনার হারানো গিয়েছে। এর উত্তরে হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ যে, নির্দেশ দিয়েছিলেন তা বর্তমান যুগের জনসাধারণ এবং শাসকদের জন্য পথ প্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। তিনি ওয়াহ্হাবকে লিখলেন-
لَسْتُ أَتَّهِمُ دِينَكَ وَأَمَا نَتَكَ وَلَكِنْ أَتَّهِمُ تَضِيعَكَ وَتَفْرِ تَطَكَ أَلَّا أَنَا حَجِيعُ الْمُسْلِمِينَ فِي مَا لَهِمْ وَإِنَّمَا لَأَنْعَمُ يَمِينِكَ فَاخْلُفْ لَهُمْ وَالسَّلَام -
অর্থাৎ আমি তোমার সততা ও আমানতদারীর উপর অভিযোগ করি না, তবে তোমার বাহুল্য ও অনর্থক খরচের জন্য আমি তোমাকে অভিযুক্ত করছি। কারণ আমি জনসাধারণের সম্পদ সংরক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। কাজেই এ ব্যাপারে সমস্ত লোক জমা করে তাদের সামনে কসম কর যে, তুমি এ ব্যাপারে নির্দোষ। তুমি সুখে শান্তিতে থাক।
বায়তুল মাল সম্পর্কে তিনি কতটুকু সতর্কতা অবলম্বন করতেন, নিম্নের ঘটনা দ্বারা তার কিছুটা উপলব্ধি করা যায়। যে সমস্ত আতর ও সুগন্ধি দ্রব্য সুলায়মান ব্যবহার করতেন, আব্দুল্লাহ ইবনে রাশেদ একদিন সে সমস্ত আতর ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের সামনে হাজির করল। তিনি তা দেখতে পেয়েই হাত দিয়ে নাক বন্ধ করে দিলেন এবং বললেন, “আতরের ঘ্রাণই গ্রহণ করা হয়”।
তার ব্যক্তিগত খাদেম মুজাহিম কাছেই ছিল। সে বলল, আমিরুল মুমিনীন! এর ঘ্রাণ শুধু বাতাসে মিশ্রিত হয়ে আপনার নাকে পৌঁছেছে। তিনি মুজাহিমকে তিরস্কার করে বললেন, হতভাগা! আতরের ঘ্রাণ গ্রহণ ছাড়া আর কোন উপকারী আছে কি?
বর্ণনাকারী বলেন- যতক্ষণ পর্যন্ত সে আতর তাঁর কাছ থেকে দূর না করা হল ততক্ষণ তিনি নাক বন্ধ করে রাখলেন। এজন্য আবদুল আজিজ মাজশুন বলেছেন যে. “হযরত ওমর ইবনে আজিজের চেয়ে কঠোর নীতিপরায়ণ শাসনকর্তা আমি আর দেখিনি।”
একদিন ইবনে যাকারিয়া হযরত ওমর ইবনে আজিজকে বলল, আপনি আপনার কর্মচারীগণকে এক শত আবার কাউকে দুশত দীনার বেতন দিয়ে থাকেন, আর আপনি কোন ভাতা গ্রহণ করেন না। অথচ আপনিও প্রশাসনিক কাজ করেন, প্রশাসনে আপনারও অধিকার আছে। আপনার পরিবারেরও অভাব অভিযোগ আছে। সুতরাং উর্ধ্বতন কর্মচারীদের যে পরিমাণ বেতন ধার্য করা আছে আপনিও সে পরিমাণ ভাতা গ্রহণ করুন।
হযরত ওমর ইবনে আজিজ বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ। আমি কর্মচারীদের এ জন্যই অধিক বেশি দেই, যাতে তারা পরিবার-পরিজনের চিন্তা ভাবনা মুক্ত থেকে আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সুন্নাত অনুযায়ী কাজ করতে পারে।
তারপর তিনি ইবনে যাকারিয়াকে বললেন, আমি তোমার সৎ ধারণা বুঝতে পেরেছি। আমার পারিবারিক অস্বচ্ছলতার কথা জেনেই তুমি আমার নিকট এ ধরণের প্রস্তাব দিয়েছ।
বর্ণনাকারী বলেন, এরপর তিনি তার ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে বললেন, এ অস্থি মাংস আল্লাহর সম্পদে গড়া। আল্লাহর কসম! আমি এর কিছুই পরিবর্ধন হতে দিব না।
মুহাম্মদ ইবনে কায়েস বর্ণনা করেন যে, একবার মুজাহিম আমার কাছে এসে বলল, হযরত ওমর ইবনে আজিজের গৃহে খাওয়ার মত কিছুই নেই, তাঁর পারিবারিক খরচের অত্যন্ত প্রয়োজন, কিন্তু আমি জানি না যে, এ খরচের অর্থ কোথা হতে যোগাড় করব। তখন মুহম্মদ ইবনে কায়েস বললেন, যদি আমার নিকট বেশি দীনার থাকত তবে আমি আপনাকে দিতাম। মুজাহিম জিজ্ঞেস করল, আপনার নিকট কত দীনার আছে? আমি বললাম মাত্র পাচটি দীনার আছে। মুজাহিম বলল, পাঁচ দীনারতো অনেক বেশি। এটা দেন পরে আপনাকে ফেরত দেব।
উক্ত বর্ণনাকারী বলেন, তারপর হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের ইয়ামেনের জমির শষ্য আসল। একদিন মুজাহিম আমার নিকট এসে খুব সোল্লাসে বলল, আমাদের জমির ফসল এসেছে, আপনার প্রাপ্য টাকা তাড়াতাড়ি পরিশোধ করে দেব। এ কথা বলে সে হযরত ওমর ইবনে আজিজের নিকট গিয়েই আবার ফিরে আসল এবং মাথায় হাত রেখে বলতে লাগল আল্লাহ খলিফাকে দ্বিগুণ পুরস্কার দান করুন। তার সাথে সাথে আমিও এ কথার পুনরাবৃত্তি করলাম। তারপর মুজাহিম বলল, খলিফা তার সমস্ত ফসল বায়তুল মালে জমা দিয়ে দিয়েছেন।
এই সমস্ত বর্ণনায় এমন কোন সুষ্পষ্ট তথ্য নেই যে, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাঁর ব্যক্তিগত মাল বায়তুলমালে কেন জমা দিয়েছিলেন।
তবে ধারণা করা হয় যে, হয়ত তাঁর খাদেমগণ অথবা তার পরিবারের লোকেরা সাধারণ লঙ্গরখানা হতে খাদ্য সামগ্রী সংগ্রহ করেছিল এবং হযরত ওমর ইবনে আজিজ তা এভাবে পরিশোধ করে দিয়েছেন।
অথবা এটাও সম্ভব যে, তখন বায়তুল মালে প্রশাসন পরিচালনার প্রয়োজনীয় অর্থের অভাব ছিল বলে তিনি তার সমস্ত সম্পদ বায়তুল মালে জমা দিয়েছিলেন।
যা হোক, হযরত ওমর ইবনে আজিজের মতে সাধারণ মানুষের সম্পদ দিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত- প্রয়োজন পূরণ করা কোন মতেই উচিত নয়। যদি প্রয়োজনের তাগিদে তিনি কখনও বায়তুল মাল হতে কোন কিছু গ্রহণ করতেন তবে তা ফেরত দেয়া অবশ্য প্রয়োজন বলে মনে করতেন। উদাহরণ স্বরূপ তাঁর মন্ত্রী ফুরযাত ইবনে মুসলেমার ভাষ্যটি উদ্ধৃত করা হল।
ইবনে মুসলেমা বলেন, প্রত্যেক জুমার দিন তার নিকট সমস্ত কাগজপত্র হাজির করা হত। সে রীতি অনুযায়ী আমি এক জুমার দিন তাঁর নিকট কাগজপত্র হাজির করলে তিনি তার কোন প্রয়োজনে চার অঙ্গুলী পরিমাণ এক টুকরো কাগজ নিয়ে রাখলেন। আমি মনে করলাম, তিনি এর কথা ভুলে গিয়েছেন। দ্বিতীয় দিন তিনি আমাকে কাগজপত্র নিয়ে আসতে ডেকে পাঠালেন। আমি কাগজ পত্র নিয়ে হাজির হলে তিনি আমাকে কাগজপত্র নিয়ে ভিতরে আসতে বললেন। আমি ভিতরে প্রবেশ করলে তিনি বললেন, এখন আমার খুবই ব্যস্ততা অবসর নেই। কাগজপত্র রেখে চলে যাও। আমি তোমাকে ডাকলে এসো। এরপর আমি কাগজ পত্র নিয়ে ফিরে গিয়ে খাতা পত্র খুলে দেখি যে, যে পরিমাণ কাগজ খলিফা নিয়েছিলেন সে পরিমাণ কাগজ দিয়ে দিয়েছেন।
ইবনে সাদ হযরত ওমর ইবনে আজিজের পোষাক পরিচ্ছদ সম্পর্কে বলেন যে, হযরত ওমর ইবনে আজিজের ঘরে কাল রঙ্গের একটি পুরাতন জামা পরিধান করতেন।
মায়মুন কর্তৃক বর্ণিত আছে, আমি ছয় মাস পর্যন্ত হযরত ওমর ইবনে আজিজের নিকট ছিলাম। এ ছয় মাস তার গায়ে একটি চাদর ব্যতীত অন্য কোন কাপড় দেখিনি। এ চাদরটি তিনি জুমার দিন ধুয়ে দিতেন।
ইবনে মুআফফা বলেন, হযরত ওমর ইবনে আজিজ একবার অসুস্থ হলেন। মুসলেমা ইবনে আব্দুল মালেক তার নিকট আগমন করল এবং তার ভগ্নি ফাতেমাকে বলল, খলিফার অবস্থা আজ কিছুটা সংকটাপন্ন, তাঁর গায়ের জামাটি খুব নোংরা দেখা যাচ্ছে। এটা বদলিয়ে দাও, যেন লোকজনকে তাঁর নিকট আসার অনুমতি দেয়া যায়। ফাতেমা কিছু বললেন না। মুসলেমা তার কথাটির পুনরুক্তি করল যে, তাকে অন্য কোন জামা পরিধান করিয়ে দাও। ফাতেমা কসম করে বললেন, এটা ছাড়া তার অন্য কোন জামা নেই।
অপর এক বর্ণনাকারী বলেন, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ খুব ছোট চাদর পরিধান করতেন। তা খুব বেশী হলে ছয় ফুট এক গিরা লম্বা এবং সাত গিরা প্রশস্ত থাকত।
ওমর ইবনে মায়মুন বলেন, হযরতের জামার মূল্য ছিল খুব বেশি হলে এক দীনার।
রেজা ইবনে হায়াত বলেন, যখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ খলিফা নির্বাচিত হলেন তখন তার খাদেমগণ তাঁর জন্য যে পোষাক ক্রয় করেছিল তার মূল্য ছিল বার দেরহাম। এটা মিশরীয় কাপড় ছিল। তন্নধ্যে জামা, পাগড়ী, কুবা, মোজা ইত্যাদি সবকিছুই ছিল।
সায়ীদ ইবনে সুয়াইদ বলেন, একবার তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজিজের সাথে জুমার নামায পড়ার সময় দেখলেন যে, তার জামার সামনে ও পিছনে অসংখ্য তালি লাগানো আছে। অপর এক বর্ণনাকারী বলেন যে, তিনি হযরত ওমর ইবনে আজিজকে খানাফেরা নামক স্থানে ভাষণ দিতে দেখেছেন, তখন তার জামায় তালি লাগানো ছিল।
মারুফ ইবনে ওয়াছেল একবার তাকে মক্কা শরীফে আগমন করতে দেখলেন তখন তার পরিধানে মাত্র দু'টি চাদর ছিল। অন্য এক বর্ণনাকারী বলেন, আমি তাকে শুধু একটি জুব্বা পরিহিত অবস্থায় নামায পড়তে দেখেছি, তখনও তার পরিধানে কোন পায়জামাও ছিল না।
ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, একবার তিনি জুমার নামাযে আসতে দেরী করলেন, এতে তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, আমি জামা ধৌত করে তা শুকানোর জন্যে রোদ্রে দিয়েছিলাম কাজেই দেরী হয়েছে।
ফাতেমাও কসম করে একথাই বলেছিলেন যে, একটি মাত্র জামা ব্যতীত তাঁর আর কোন জামা নেই।
ইবনে আব্দুল হাকام বলেন যে, একবার তিনি তার কোন এক লোককে কাপড় ক্রয় করতে আশিটি দেরহাম দিলেন। তাঁর জন্য কাপড় ক্রয় করে আনলে তিনি তার উপর হাত রেখে বললেন, কত নরম! কত মুলায়েম! সে ব্যক্তি এ কথা শুনে হেসে দিল, তিনি তাকে হাসির কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলল, আপনি খলিফা না হতে একবার আপনার জন্য আটশত দেরহাম দিয়ে একটি জামা ক্রয় করেছিলাম, আপনি তা দেখে বলেছিলেন, কত মোটা! কত শক্ত ও অমসৃণ? আর আজ আশি দেরহাম দিয়ে যে কাপড় ক্রয় করা হয়েছে, তা দেখে আপনি বলছেন, কত নরম ও মসৃণ। এতে আমি আশ্চর্যান্বিত হয়ে হেসে দিলাম। আবদুল ফরিদে আছে যে, সে ব্যক্তির নাম ছিল রেবাহ।
অন্য এক বর্ণনায় হযরত ওমর ইবনে আজিজের সম্পূর্ণ পোষাকের মূল্য ষাট দেরহাম ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইবনে জাওযি বলেন যে, হযরত ওমর ইবনে আজিজ নিজে তাঁর পূর্ণ পোষাক জামা চাদর ও পায়জামার মূল্য ১৪ দেরহাম ছিল বলেছেন। এক বর্ণনায়ই আছে যে হযরত ওমর ইবনে আজিজকে জিজ্ঞেস করা হল, আপনি জুমার নামাজে দেরী করে এসেছেন কেন? তখন তিনি বললেন, আমি কাপড় ধৌত করে তা শুকানোর জন্যে রোদ্রে দিয়েছিলাম। তখন বর্ণনাকারী জিজ্ঞেস করলেন, কি কি কাপড়? ওমর ইবনে আবদুল আজিজ জবাবে বললেন, জামা, চাদর ও পায়জামা তার মূল্য ১৪ দেরহাম।
খলিফা নির্বাচিত হবার পর তিনি এ জাতীয় পোষাক পছন্দ করতেন। অথচ খেলাফতের পূর্বে তিনিও একজন অভিজাত শ্রেণীর শাহজাদার মত কাপড় ব্যবহার করতেন এবং তিনি সম-সাময়িক যুগে সর্বোত্তম পোষাক পরিধানকারী হিসেবে খ্যাত ছিলেন।
খাদ্য ও পোষাকে তিনি যে আড়ম্বরহীনতা অবলম্বন করেছিলেন, বাসস্থানের বেলায়ও ঠিক সেরূপই অবলম্বন করেছিলেন। তাঁর ধারনায় সরকারী অর্থ ব্যয়ে প্রাসাদ তৈরি করা একটি জঘন্য অপরাধ বলে মনে করতেন। তিনি তার কয়েক বৎসরের শাসনামলে কোন প্রাসাদ নির্মাণ করেসনি। তাঁর পূর্ববর্তী খলিফাগণ যেরূপ সরকারী অর্থে শাহী প্রাসাদ ও অন্যান্য প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন, তা দেখে তিনি কসম করেছিলেন যে কোন দিন তিনি ক্ষমতা লাভ করলে সরকারী অর্থ ব্যয় করে কোন প্রাসাদ নির্মাণ করবেন না।
ইবনে জাওযি তাঁর এক খাদেমের ভাষ্য উদ্ধৃত করেছেন, ভাষ্যটি হলো, হযরত ওমর ইবনে আজিজের জন্য একটি চোবতরা নির্মাণ করা হয়েছিল। মাঝে মাঝে তার সিঁড়ির ইট খসে পড়ছিল। তিনি যখন তাতে উঠা নামা করতেন তখন তার ইট নড়া চড়া করত। তার এক খাদেম কাদা দিয়ে সেই খসা ইটগুলো লাগিয়ে দিল। একদিন সিড়ি দিয়ে নামার সময় সে ইট আর নড়াচড়া করল না। তখন তিনি এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। খাদেম বলল, 'আমি কাদা দিয়ে ঠিক করে দিয়েছি। তখন তিনি বললেন, আমি আল্লাহর অথে ওয়াদা করেছিলাম, যদি আমি ক্ষমতা লাভ করি, তবে পাকা বা কাঁচা ইট দিয়ে কোন কিছু নির্মাণ করব না।
হযরত ওমর ইবনে আজিজ খেলাফত লাভ করে শুধু থাকা- খাওয়া ও পোষাক পরিচ্ছদেই আড়ম্বরহীনতা অবলম্বন করেননি, ইবনে কাছীরের ভাষ্য অনুযায়ী সর্বপ্রকার আরাম আয়েশ এবং বিলাস সামগ্রী বর্জন করেছিলেন।
ইবনে কাছীরের ভাষ্যটি নিম্নে উদ্ধৃত করা হল- তিনি পোষাক পরিচ্ছদ, থাকা খাওয়াসহ সকল প্রকার ভোগ বিলাস ত্যাগ করেছিলেন। এমন কি তার অনিন্দ সুন্দরী স্ত্রী ফাতেমা বিনতে আব্দুল মালেকের সম্ভোগ পর্যন্ত বর্জন করেছিলেন।
ফাটা ও মোটা কাপড়ই ছিল তার সাধারণ পোষাক। তাঁর দরবারে যে প্রদীপটি জালানো হতো তাও বাঁশের তিনটি খুঁটির উপর রাখা হত এবং | প্রদীপটি ছিল মাটির। তিনি তাঁর শাসনামলে কোন ঘর বা প্রাসাদ তৈরি করেননি। তিনি নিজেই কাজ সম্পাদন করতেন। তিনি খুব নিম্নমানের খাদ্য আহার করতেন এবং কোন প্রকার ভোগ বিলাস পছন্দ করতেন না। তিনি কখনও তাঁর কোন অনাবশ্যক বাসনা পূর্ণ করেননি।
ইবনে কাছীর বলেন, হযরত ওমর ইবনে আজিজ বায়তুল মাল হতে কোন অর্থ গ্রহণ করতেন না। খেলাফত পূর্বে তার বার্ষিক আমদানী ছিল চল্লিশ হাজার দেরহাম। তিনি এ সমস্তই বায়তুল মালে জমা দিয়ে দিলেন। নিজের জন্যে শুধু বার্ষিক দু'শত দেরহাম আমদানীর একটি সম্পত্তি রেখেছিলেন।
এ উঁচু স্তরের তাকওয়া ও পরহেজগারীর সাথে সাথে তিনি উঁচু স্তরে সহিঞ্চুতা, বিনয় নম্রতা অবলম্বন করেছিলেন এবং খাওয়া পরা ও বসবাসের অনাড়ম্বরতার সাথে সাথে আচার-আচরণেও ভদ্র ও মার্জিত ছিলেন। তিনি পূর্ববর্তী বাদশাদের মত লোকজনকে নিজের জন্য দাঁড় করে রাখতেন না এবং তাদের সাথে অভদ্র অমার্জিত আচরণও করতেন না। তারপরেও তিনি যে তাদের চেয়ে উত্তম এটা কোন প্রকারেই প্রকাশ করতেন না।
ইবনে জাওযি ও ইবনে কাছীর এ সম্পর্কে একটি উদাহরণ পেশ করে বলেছেন যে, একবার হযরত ওমর ইবনে আজিজ তার কোন এক দাসীকে পাখা করতে বললেন। দাসী পাখা করতে করতে ঘুমিয়ে গেল। তখন হযরত ওমর ইবনে আজিজ পাখা দিয়ে দাসীকে বাতাস করতে লাগলেন। অবশেষে দাসীর নিদ্রার ঘোর কেটে গেলে সে খলিফাকে বাতাস করতে দেখে চিৎকার করে উঠলো। খলিফা বললেন, অস্থির হওয়ার কোন কারণ নেই। তুমিও আমার মতই একজন মানুষ। আমার মতই তোমারও গরম লেগেছিল। আমার ইচ্ছা হলো তুমি যেরূপ আমাকে বাতাস করেছ আমিও তোমাকে সেরূপ বাতাস করি।
এ ধরণের অত্যাশ্চর্য উদাহরণ আম্বিয়া (আ) সাহাবায়ে কেরামগণও আওলিয়াগণ ছাড়া কোন সাধারণ মানুষের জীবনে ঘটতে দেখা যায় না।
একদিন হযরত ওমর ইবনে আজিজ নামাযের পর দরবারে বসে সাধারণ মানুষের অভিযোগ শুনছিলেন। এমন সময় হযরত উসামা ইবনে যায়েদের (রা) এক কন্যা তার সেবিকাসহ সেথায় এসে উপস্থিত হলেন। হযরত ওমর ইবনে আজিজ তাকে দেখে তার আসন ছেড়ে উসামা ইবনে সাদেরের কন্যার দিকে অগ্রসর হলেন এবং তাকে সসম্মানে নিজের আসনে বসতে দিলেন এবং তিনি তার সামনে বসে তার কথা শুনলেন এবং তার সকল প্রয়োজন পূরণ করে দিলেন।
হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা) রসূলুল্লাহ (সা)-এর আজাদকৃত গোলাম হযরত যায়েদ (রা)-এর পুত্র ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ইন্তেকালের পর সিরিয়া অভিযানকারী সৈন্য বাহিনীর প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর কন্যা রসূলুল্লাহ (সা) এরই একজন আজাদকৃত গোলামের পৌত্রী ছিলেন।
রেজা ইবনে হায়াত, যিনি খলিফা সুলায়মানের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন, তিনি বলেন, আমি হযরত ওমর ইবনে আজিজের সাথে রাত্রি যাপন করেছিলাম। বাতির আলো তখন নিভু নিভু করছিল। তার পার্শ্বেই খাদেম শুয়েছিল। আমি বললাম খাদেমকে জাগিয়ে দিব কি? তিনি বললেন না, তাকে ঘুমাতে দাও। আমি বললাম, তবে আমি উঠি। তিনি বললেন, না, মেহমান দিয়ে কাজ করান অভদ্রতা ও মানবতা বিরোধী। তারপর তিনি চাদর রেখে উঠে তৈল পাত্রের নিকট গেলেন এবং বাতিতে তৈল ভরে তৈল পাত্রটি যথাস্থানে রাখলেন। তারপর বললেন, যখন আমি একাজ করতে উঠলাম তখনও আমি হযরত ওমর ইবনে আজিজ আর এখনও আমি সেই হযরত ওমর ইবনে আজিজ।
সাধারণ মানুষের জীবনে এ ধরনের উদাহরণ প্রায়ই দেখা গেলেও রাজা বাদশাদের জীবনে বিশেষতঃ আব্দুল মালেক, ওয়ালিদ ও সুলায়মানের মত বিলাসী বাদশাদের জীবনে এ ধরনের উদাহরণ পাওয়া ছিল সম্পূর্ণ অসম্ভব ব্যাপার।
আল হাকام ইবনে ওমর আর রাবিনী বলেন, একবার প্রবল বৃষ্টির দিনে আমি হযরত ওমর ইবনে আজিজের সাথে এক জানাযায় শরীফ ছিলাম। এক অপরিচিত ব্যক্তির ছাতা ছিল না। সে তাঁর সামনে আসলে তিনি তাকে কাছে ডেকে এনে তার পাশে বসালেন এবং তার চাদর দিয়ে তাকে জড়িয়ে দিলেন।
এ ভাষ্যকারই বলেন, আমি ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে দেখেছি যে, তিনি সাধারণ লোকদের এক মজলিস হতে উঠে অন্য মজলিসে গিয়ে বসেছেন। সাধারণতঃ কোন অপরিচিত লোক এসে তাঁর কাছেই জিজ্ঞেস করত, হযরত ওমর ইবনে আজিজ কোথায়? কারণ তার সাজসজ্জায় তাকে চিনার কোন উপায় ছিল না।
তারপর হয়তো কেউ ইশারা করে তাকে দেখিয়ে দিত আর তখন সে অবাক হয়ে তাঁকে সালাম করত।
তিনি জেনে বুঝেই এ সাধারণ বেশ-ভূষা ব্যবহার করতেন। তিনি সাধারণ মানুষের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করার উদ্দেশ্যেই হযরত ওমর ফারুক (রাঃ)-এর নীতি অনুসরণ করে সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে আসলেন।
তিনি কারও নিকট হতে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। অথচ তাঁর পূর্ববর্তী খলিফাগণ যে কোন ঔদ্ধত্য প্রকাশকারীকে নির্মূল করে দিত।
খানাফেরার জনৈক লোক বলেন, একবার ফাতেমার গর্ভজাত এক পুত্র অন্যান্য বালকদের সাথে খেলা করতে বাড়ীর বাইরে গিয়েছিল। অন্য এক বালক তাকে মেরে আহত করল। লোকেরা এটা দেখতে পেয়ে আহতকারী বালকসহ খলিফার বাড়ীর ভিতর ফাতেমার নিকট নিয়ে গেল। ক্রন্দন ধ্বনি শুনে হযরত ওমর ইবনে আজিজ ঘরের এক কামরা হতে বাইরে এসে দেখলেন যে, এক মহিলা চিৎকার করে বলছে এ আমার এতীম ছেলে। হযরত ওমর ইবনে আজিজ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ছেলে কি বায়তুল মাল হতে বৃত্তি পায়? মহিলা বলল, না। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে বললেন, এখনই এ ছেলেকে বৃত্তি গ্রহণকারীদের তালিকায় নাম লিখে নাও। তাঁর স্ত্রী ফাতেমা ক্ষোভে দুঃখে বললেন, এ ছেলে আপনার ছেলেকে আহত করেছে আর আপনি কি না তার বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিলেন। আল্লাহই তাকে এতীম করেছেন এটা তাঁরই কাজ। সে আপনার ছেলেকে আহত করেছে আবার হয়ত অন্য ছেলেকে আহত করবে। হযরত ওমর ইবনে আজিজ বললেন, তোমরা তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছ। আর কেন?
পুত্র সন্তানের প্রতি স্নেহ বাৎসল্য সকলেরই থাকে, বিশেষতঃ রাজা-বাদশাহদের ছেলে মেয়ে খুবই আদরের হয়ে থাকে। এ এতীম বালকটিই ফাতেমা বিনতে আব্দুল মালেকের পুত্র, ওয়ালিদ ও সুলায়মানের ভাগিনা এবং ওমর ইবনে আবদুল আজিজের ঔরষজাত সন্তানকে আহত করেছে আর তিনি স্বয়ং ছেলের পক্ষে ওকালতি করেছেন কিন্তু হযরত ওমর ইবনে আজিজ এতীম বালকের ব্যাপারে কারও কথা শুনলেন না। তাকে একটু ধমক পর্যন্ত দিলেন না। বরং বায়তুল মাল হতে তার ভাতার ব্যবস্থা করে দিলেন।
একমাত্র হযরত ওমর ইবনে আজিজ ব্যতীত দুনিয়ার আর কোন বাদশাহর জীবনে এরূপ আদর্শ চরিত্রের উদাহরণ আছে বলে জানা যায়নি।
📄 ওমর ইবনে আবদুল আজীজের সাধারণ জীবন
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ নিজেই নিজের হিসেব করে আড়ম্বরহীন দুঃখ-দৈন্যের জীবন অবলম্বন করেছিলেন। সরকারী কোষাগারের উপর কোন প্রকার চাপ সৃষ্টি না করে অতি সাধারণ মোটা ও ফাটা কাপড় পরিধান করতেন। পরহেজগারী ও ফকিরী, দরবেশীর উদ্দেশ্যে ছিল না। খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর তার মনের কামনা বাসনারও মৃত্যু হয়নি। তাঁর অন্তরের শিরা উপশিরাও বন্ধ হয়ে যায়নি। তারপরও তার আশা আকাঙ্ক্ষার রজ্জু ও ছিন্ন হয়ে যায়নি।
এ সমস্ত হিসাব-নিকাশ, এ সকল আড়ম্বরহীনতা, বায়তুল মাল ও ব্যক্তিগত বিত্ত বৈভব হতে সংযমশীলতা তিনি শুধু এ জন্যই অবলম্বন করেছিলেন যে, ইসলাম বায়তুল মালের সম্পদের অধিকার কোন ব্যক্তি বিশেষের জন্য নির্ধারণ করেনি। এটা কোন খলিফার কোন বাদশার বা কোন শাহজাদার ব্যক্তিগত সম্পদ ছিল না। এটা শুধু জনসাধারণের কল্যাণের নিমিত্ত প্রতিষ্ঠিত ছিল। এটা আবু সুফিয়ান ও উমাইয়ার পুত্র-সন্তানদের ভোগ বিলাসের জন্য ছিল না। হযরত আলী (রা) হযরত ফাতেমা (রা)-এর পুত্র সন্তানদের ভোগের জন্য ছিল না। এটা মারওয়ানের পুত্র আব্দুল মালেকের জন্য ছিল না, ছিল না আব্দুল আজিজ, ওয়ালীদ, সুলায়মান অথবা ইয়াযিদ প্রমুখের ভোগ বিলাসের জন্য। ইয়াযিদ, আব্দুল মালেক, ওয়ালীদ ও সুলায়মান এবং অন্যান্যরা এতে অন্যায় হস্তক্ষেপ করেছিল। কামনা বাসনা চরিতার্থ করতে তারা বিনাদিধায় জনসাধারণের সম্পদ খরচ করেছিল।
সাধারণ মানুষকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করেছিল। যদি বায়তুল মাল কারো ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে স্বীকৃত হতো তবে এটা তা হত- মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা), তার প্রিয়তমা কন্যা হযরত ফাতেমা (রা) এবং তার পুত্র হযরত হাছান ও হুছাইন (রা)-এর জন্য। এটা হতো হযরত আবু বকর (রা), তার কন্যা হযরত আয়েশা (রা), আসমা ও তার পুত্র মুহাম্মদ এবং আবদুর রহমানের জন্য। এটা হতো হযরত ওমর ফারুক (রা) এবং তার পুত্র আছেম ও আবদুল্লাহর জন্য। এটা তালহা, যুবাইর, আব্দুর রহমান ইবনে আওফ, সা'দ ইবনে আবু ওয়াক্কাছ, মাআয ইবনে জাবাল, সা'দ ইবনে মাআয, আবু আয়্যুব আনসারী, বিলাল হাবশী ও অন্যান্য বিশিষ্ট সাহাবী (রা) দের জন্য যারা তাদের প্রাণের বিনিময়ে ইসলামের শাসন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যারা আবু জেহল, আবু লাহাব, প্রমুখের অন্যায় অত্যাচার নীরবে সহ্য করেছিলেন, যারা ইসলামী শাসনের চারা বৃক্ষকে তাদের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে লালন করে বলবান বৃক্ষে পরিণত করেছিলেন।
ইয়াযিদ, মারওয়ান, আব্দুল মালেক, ওয়ালিদ ও সুলায়মান ও অন্যান্য উমাইয়া খলিফাগণ শুধু পাকা শষ্য ও পাকা ফল ভোগ করেছিল। এরা না ছিল ইসলামের স্থপতি না ছিল স্থপতিদের বংশধর।
তারপর এখানে স্থপিত বা স্থপতি পুত্রদের কোন প্রশ্নই উঠে না। এখানে স্থপতিদের কোন মূল্যই ছিল না, মূল্য ছিল শ্রমিকদের। এ নতুন সংগঠন যা মক্কায় সংঘটিত হয়েছিল, যে সংগঠন আবু সুফিয়ান, ও আবু লাহাবের হাতে নির্মমভাবে বাঁধাগ্রস্থ হয়েছিল। দীর্ঘ তিন বৎসর পর্যন্ত অর্থনৈতিক অবরোধ সহ্য করতে হয়েছিল, যে জামাত আত্মরক্ষা করতে মক্কা ত্যাগ করে সুদূর মদীনায় এসে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। তাঁরা এমন এক বিপ্লবের আহবান করেছিল যাতে বংশ গোত্র বা গোষ্ঠীগত আভিজাত্যের কোন স্থান ছিল না।
এটা কোন বিশেষ গোষ্ঠী বা কারো রক্তের পবিত্রতার প্রবক্তা ছিল না। এ দল শুধু এ জন্যই সকল দুঃখ কষ্ট সহ্য করেছিল যাতে তারা এমন এক সমাজ গঠন করবে, এমন এক শাসন পদ্ধতি কায়েম করবে, যাতে মালিক শ্রমিকের, প্রভু ও গোলামের, দুর্বল ও সবলের কোন ভেদাভেদ থাকবে না। যে সমাজে কোন পীড়িত বা কোন পীড়নকারীও থাকবে না। এ দল বুকের রক্ত পানি করে এমন এক সুখী ও সমৃদ্ধিশালী সমাজ প্রতিষ্ঠা করার কাজে সচেষ্ট ছিল, যাতে কোন প্রকার অন্যায়-অবিচার বা উঁচু নিচুর ভেদাভেদ থাকবে না। - সকলেই সমভাবে নিজ নিজ অধিকার ভোগ করার পূর্ণ সুযোগ পাবে।
তাঁরা এমনি এক সমাজ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন, যে সমাজ ব্যবস্থা বঞ্চিত, দুঃস্থ দরিদ্রদের সাহায্য সহায়তার জন্য অকাতরে অর্থ সম্পদ ব্যয় করেছিল। যে সমাজ ব্যবস্থায় আমদানী ব্যয় হতো বিধবা, এতীম, নিঃস্ব মুসাফির, অভাবক্লিষ্ট, আশ্রয়হীন, ঋণগ্রস্ত দুঃখী মানুষের জন্য। কিন্তু এ সমাজ ব্যবস্থার প্রবর্তক মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা) কেও যিনি আল্লাহর প্রিয়নবী ছিলেন, কিছু গ্রহণ করতে অনুমতি দেয়নি। তিনি তার সন্তান-সন্ততি ও প্রিয়জনের আরাম-আয়েশের জন্য এ সমাজ ব্যবস্থার আমদানীর কিছু মাত্রও ব্যয় করেননি।
ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ ভালভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইসলাম কোন বিশেষ বংশ বা গোষ্ঠীর বিত্ত-বৈভব বৃদ্ধির বা কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের কল্যাণের জন্য দায়ী নয়। এটা উঁচু নিচু, ভদ্র-অভদ্র নির্বিশেষে প্রত্যেকটি নাগরিকের অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দের জন্য সমভাবে যিম্মাদার। তাঁর সামনে ইসলামের প্রথম রাষ্ট্রনায়ক, ইসলামের শাসন পদ্ধতির প্রর্বতক মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা) এর আদর্শ বিরাজমান ছিল, যিনি কয়দিন অনাহারে দিন কাটিয়েছেন, যিনি জীবনে কখনও উদর ভর্তি করে আহার করেননি, যাঁর কন্যার জন্য কোন উন্নত মানের কোন পোষাক-পরিচ্ছদের ব্যবস্থা ছিল না, উন্নত মানের খাদ্যের সংস্থান করেননি, যার প্রিয়তমা স্ত্রী হযরত আয়েশা (রা) ক্ষুধার তাড়নায় দীর্ঘ সময় ক্রন্দন করতেন।
তাঁর সামনে খলিফাতুর রাসূল হযরত আবু বকর (রা)-এর মহান আদর্শ বিরাজমান ছিল, যিনি मुसलमानों নির্বাচিত খলিফা হওয়া সত্ত্বেও সরকারী কোষাগার হতে শুধু মাত্র প্রাথমিক প্রয়োজনাদি পূরণ করতে সামান্য পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করতেন। তিনি খলিফা নির্বাচিত হবার পর কোষাগার হতে দুধ পান করার জন্য একটি মাটির পেয়ালা, আটা পিষার জন্য একটি যাতা, দুধের জন্য একটি উটনী এবং ব্যক্তিগত কাজ-কর্ম করার জন্য একজন খাদেম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পরিচ্ছদ ও আহার্য ছিল অত্যন্ত সাধারণ।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের সামনে ইসলামের মহান খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা)-এর মহান আদর্শ বিদ্যমান ছিল। রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতার মানব ইতিহাসে যিনি এক অতুলনীয় উদাহরণ সৃষ্টি করে ছিলেন। যিনি মুসলিম সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ এবং সবচেয়ে প্রজ্ঞাশীল শাসক হিসেবে খ্যাত ছিলেন কিন্তু তিনিও শুস্ক রুটি আহার করতেন, মোটা কম্বল পরিধান করতেন, যার সমগ্র পশ্চাতে আঠারটি তালি লাগানো থাকতো। তিনিও সরকারী কোষাগার হতে কোন ভাল পোষাক বা খাদ্যের সংস্থান করেননি।
কিন্তু তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে সকল অভাবী মানুষের অভাব অনটন দূর হলো। তাঁদের সাধনার ফলে সকল মুসলমানের দুঃখ দৈন্যের অবসান ঘটল, সাধারণ সমাজের অবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধিত হল। তাদের প্রচেষ্টায় প্রত্যেকটি মুসলমান উত্তম কাপড় পরিধান করার ও উত্তম খাদ্য আহার করার সুযোগ পেল এমনকি সদ্য প্রসূত সন্তানেরও সমস্ত অভাব পূরণ হল। তাঁরা একজন দরিদ্র হতে দরিদ্রতম মুসলমান শিশুর জন্য সে কাপড় ও খাদ্য ভাতার ব্যবস্থা করলেন যা হযরত আলী, হযরত ওসমান, হযরত আবু বকর, হযরত ওমর (রা) প্রমুখ বিশিষ্ট লোকদের সন্তানদের জন্য বরাদ্দ ছিল।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের কাছেও সরকারী আমদানী হতে সেসব লোকই কিছু পাবার অধিকারী ছিল যাদেরকে আল্লাহর রাসূল (সা) ও খোলাফায়ে রাশেদীন হকদার হিসেবে সাব্যস্ত করেছিলেন। এ কারণেই তিনি নিজের পুত্র সন্তান, পরিবার পরিজন, আত্মীয় স্বজনদের জন্য একটি পয়সাও খরচ করতেন না। এ কারণেই তিনি আব্দুল মালেক, ওয়ালিদ ও সুলায়মান কর্তৃক বরাদ্দকৃত তাঁর ফুফুর ভাতা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তাঁর ফুফু ও পবিত্র কোরআন, আল্লাহর রাসূল খেলাফায়ে রাশেদীনের বিঘোষিত পদ্ধতি অনুযায়ী সরকারী ভাতা পাবার অধিকারী ছিল না। তিনি দিন রাত مسلمانوں জন্যই কাজ করতেন। কাজেই নীতিগতভাবে তাঁর পারিবারিক প্রয়োজন পূরণের জন্যে সরকারী কোষাগার গ্রহণ করতে বাধ্য ছিল।
কিন্তু ইতোপূর্বেই আমরা আলোচনা করেছি যে, বার্ষিক দু' শত দীনার আমদানীর একটি জায়গীর তিনি তাঁর ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্য নির্ধারিত করে রেখেছিলেন। আর যেহেতু এ জায়গীর তাঁর ছিল, কাজেই সরকারী কোষাগারের উপর তার নিজস্ব প্রয়োজনের চাপ প্রদান করতে তিনি কোন মতেই সঠিক মনে করেননি। একবার তার এক হিতাকাঙ্ক্ষী তার দুঃখ দুর্দশা দেখে হযরত ওমর ফারুক (রা)-এর মত রাষ্ট্রীয় কোষাগার হতে প্রয়োজনীয় খরচ গ্রহণ করতে তাকে পরামর্শ দিলে তিনি তাকে এ কথাই বলেছিলেন।
হযরত ওমর (রা)-এর ধারণায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার হতে প্রয়োজনীয় খরচ তিনি তখনই গ্রহণ করতে পারতেন যদি তিনি সম্পদহীন হতেন এবং ওমর ফারুক (রা)-এর মত তারও কোন কিছুই না থাকত।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের নিকট রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যয়ের খাত নির্ধারিত ছিল, তা কোন প্রকার পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল না।
তিনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেই তার শাসনকর্তাদের নামে যেসব পত্র লিখেছিলেন তাতে তিনি সরকারী অর্থ ব্যয়ের কথা স্পষ্ট ভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। তার পত্রের মর্ম ছিল- অতঃপর আল্লাহর রসূল (সা) নগদ মুদ্রা, ক্ষেতের ফসল, চতুস্পদ জন্তুর উপর যাকাত ফরয করে তাদের পরিমাণ ও ব্যয়ের খাত নির্ধারণ করে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন যে সকল প্রকার সাদকা ফকীর মিসকীন সরকারী কর্মচারী এবং যাদের চিত্ত আকর্ষণ করতে হয় তাদের জন্য এবং দাসমুক্তি, ঋণগ্রস্ত ও আল্লাহর পথে জিহাদ এবং মুসাফিরদের জন্য ব্যয় করতে হবে।
আল্লাহর রাসূল (সা) নিজের দুশমনদের সাথে একাধিকবার যুদ্ধ করেছেন, তার সৈন্য বাহিনীও অনেকবার দুশমনের মুকাবিলা করেছেন। যদি তিনি নিজে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতেন, তবে প্রাপ্ত সমস্ত গনিমতের মাল প্রকাশ্যে বন্টন করে দিতেন। আর তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর মনোনীত প্রতিনিধি তথা প্রধান সেনাপতিই পবিত্র দায়িত্ব পালন করতেন এবং পবিত্র কুরআনের এ নির্দেশকে যথাযথ বাস্তবায়িত করতেন।
মহান আল্লাহর বাণীঃ
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِنْ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
"আরও জেনে রেখ যে, তোমরা যুদ্ধে কোন বস্তু সামগ্রীর মধ্য থেকে যা কিছু গনীমত হিসাবে পাবে তার এক পঞ্চমাংশ হল আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের জন্য। তার নিকটাত্মীয় স্বজনের জন্য এবং এতীম-অসহায় মুসাফিরদের জন্য যদি তোমাদের বিশ্বাস থাকে আল্লাহর উপর এবং সে বিষয়ের উপর যা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করেছি। কিয়ামতের দিনে যেদিন সম্মুখীন হয়ে যায় উভয় সেনাদল আর আল্লাহ সব কিছুর উপরই ক্ষমতাশীল।"
তারপর আল্লাহপাক তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সা) কে যে সমস্ত জনপদ ও সম্পদের উপর বিজয়ী করেছেন, যাতে তিনি এরপরও যে সমস্ত জনপদ বিজিত হবে তাতে একটি বিধিবদ্ধ পদ্ধতি নির্ধারিত হয়ে যায়, আর পবিত্র কুরআন সে পদ্ধতিটি এ রূপে নির্ধারিত করে দিয়েছে।
'জনপদবাসীদের কাছ থেকে তার রাসূল (সা)কে যা দিয়েছেন তা আল্লাহর রাসূলের আত্মীয় স্বজনের এতিম-মিসকিন, পথিকদের জন্যে যাতে এটা তোমাদের ধনীদের সম্পদে পরিণত না হয়। আল্লাহর রাসূল (সা) তোমাদেরকে যা দেন তোমরা তা গ্রহণ কর এবং যা তিনি নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহপাক কঠোর শাস্তিদাতা।"
لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيَارِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ يُبْتَغُونَ فَضْلاً مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا وَيَنْصُرُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أَوْلَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ .
অর্থঃ এই ধন-সম্পদ দেশত্যাগী নিঃস্বদের জন্যে যারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি লাভের কামনায় এবং আল্লাহ, তাঁর রাসূলের সাহায্যার্থে নিজেদের বাস্তুভিটা ও ধন-সম্পদ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। তারাই সত্যবাদী। (সূরা হাশরঃ ৮)
যে সমস্ত লোক মক্কা ত্যাগ করে মদীনায় এসে আশ্রয় গ্রহণ করেছেন তাঁদের উদ্দেশ্যেই এই আয়াত অবতীর্ণ। আনসারগণ তাঁদের মধ্যে শামিল ছিলেন না। তারপর এ আয়াত লিখলেন-
وَالَّذِينَ تَبَوَّأُ الدَّارَ وَالإِيْمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ ..... أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ .
অর্থঃ যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে মদীনায় বসবাস করছিল এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছিল তারা মুহাজিরদের ভালবাসে, মুহাজিরদের যা দেয়া হয়েছে তজ্জন্যে তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদেরকে অগ্রাধিকার দান করে। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারা সফলকাম। (সূরা হাশরঃ ৯)
এই আয়াতের মর্মানুযায়ী মদীনার আনসারদের অধিকার স্বীকৃত হল কারণ আল্লাহর রাসূল (সা) হিজরত করে তাদের নিকট এসেছিলেন। অতঃপর তৃতীয় আয়াত দ্বারা এই দলের পর অবশিষ্ট مسلمانوں অধিকার সাব্যস্ত হল।
তারপর তিনি এই আয়াত উদ্ধৃত করলেন-
وَالَّذِينَ جَاوُا مِنْ بَعْدِهِمْ الخ
অর্থঃ আর এই সম্পদ তাদের জন্যে যারা তাদের পরে আগমন করেছে। তারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভ্রাতাদেরকে ক্ষমা কর।
এই আয়াত সমস্ত মুসলমানদের শামিল করেছে। আর এর অর্থ প্রথম হিজরত থেকে শুরু করে কিয়ামত পর্যন্ত সমস্ত মুসলমানকে শামিল করেছে।
অপর এক চিঠিতে, যা প্রথমটির মতই ব্যাপক ছিল, হযরত ওমর (রা) এতে বিশেষ আলোকপাত করেছেন। ইবনে আবদুল হাকাম বলেন, তিনি লিখলেন-
হিজরত আমাদের নিকট অত্যন্ত প্রশস্ত- অতএব যদি কোন আরাবী স্বীয় পশু বিক্রয় করার উদ্দেশ্যে নিজেদের বাড়ী-ঘর ছেড়ে দারুল হিজরতে আগমন করে এবং আমাদের দুশমনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে- তবে সে মুহাজির। সেও প্রথম যুগের মুহাজিরদের মত পুরস্কার পাবে এবং তার সঙ্গে মুহাজিরদের মত আচরণ করা হবে।
মুহাজিরগণ বেতন ভাতা ছাড়াই আল্লাহর পথে সংগ্রাম করতেন। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে বিজয়ের মাধ্যমে সাফল্য দান করলেন। এ সমস্ত বিজয়ের সুফল সেসব লোকেরাও পাবে, যারা তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে তাদের মত কাজ করবে এবং যারা তাদের ভাইদেরকে ভালবাসবে তাদের মঙ্গলের জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করবে।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের এ সুদীর্ঘ চিঠি আমরা এ উদ্দেশ্যেই উল্লেখ করলাম, যাতে এ কথা স্পষ্টই প্রমাণিত হয় যে, তিনি সরকারী অর্থ ব্যয়ের ঐসমস্ত খাতকেই বৈধ খাত বলে মনে করতেন, যা আল্লাহর রাসূল (সা) পবিত্র কুরআনের আলোকে নির্ধারিত করেছিলেন এবং যেগুলোকে খোলাফায়ে রাশেদীন সনদ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগে সরকারী আয় বলতে যাকাত, মালে গনিমত এবং বিজিত ভূমির শস্য ছাড়া অন্য কিছুই ছিল না। আর এই সমস্ত আমদানীও যেহেতু নির্ধারিত ছিলনা এ জন্যই যখন বাহির হতে কোন সম্পদ মদীনায় আসত তখন রাসূলুল্লাহ (সা) তা मुसलमानों মধ্যে বিতরণ করে দিতেন।
তারপর যখন হযরত আবুবকর (রা) খলিফা নির্বাচিত হলেন তখন বাহির হতে কোন অর্থ মদীনায় আসলে তিনিও তা মদীনা ও পার্শ্ববর্তী লোকদের মধ্যে সমভাবে বণ্টন করে দিতেন। হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা) বলেন, প্রথম ও দ্বিতীয় বৎসর তিনি এ পদ্ধতিই গ্রহণ করেছিলেন।
হযরত আবু বকর (রাঃ) এর ইন্তেকালের সময় সরকারী কোষাগারে একটি দেরহাম ছাড়া আর কিছুই ছিলনা। দু' বৎসরের সমস্ত আমদানী তিনি মুসলমান জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করে দিয়েছিলেন।
হযরত ওমর (রা) খলিফা হওয়ার পর যখন তিনি বায়তুলমালের হিসাব করলেন, তখন তিনি একটি মুদ্রা ছাড়া আর কিছুই পেলেন না। এতে তিনি ক্রন্দন করে বলেছিলেন, যদি এ দেরহামটিও আবু বকরের দৃষ্টি পড়ত তবে এটাও তিনি বিতরণ করে দিতেন।
হযরত আবু বকর (রা) যুগে সরকারী আয় খুবই নগণ্য ছিল। সমস্ত مسلمانوں প্রয়োজন পূরণের মত সরকারী সম্পদ ছিল না। এ জন্যই তিনি ব্যয়ের খাতগুলি নির্ধারণ করেননি, বরং যখন যে খাত বেশি প্রয়োজনীয় বিবেচিত হত তাতেই ব্যয় করতেন।
হযরত ওমর (রা) জনসাধারণকে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভক্ত করলেন। পবিত্র কুরআনের আলোকে তিনি মুহাজির, আনসার ও সাধারণ مسلمانوں স্তর নির্ধারণ করলেন এবং প্রত্যেক স্তরের জনগণকে নিয়মিত ভাবে বার্ষিক ভাতা প্রদান করতে লাগলেন। হযরত ওমর (রা) ভাতার যে সমস্ত ক্রম নির্ধারণ করেছিলেন, তাতে ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামী হওয়াকেই তিনি মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সৈনিকদের মধ্যে সাধারণ সৈনিক, বদর, ওহুদ, খন্দক ও হুদাইবিয়ায় অংশ গ্রহণকারীদের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে বিভক্ত করলেন।
এ পর্যায় ও ক্রম নির্ধারণের পরও তিনি প্রথম স্তরের জন্য এরূপ ভাতার ব্যবস্থা করেননি যাতে অন্যান্যদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হতে পারে বা তাদের মৌলিক প্রয়োজন পুরণে ব্যাঘাত সৃষ্টি হতে পারে।
তিনি স্বাধীন, গোলাম, বালক, বৃদ্ধ নির্বিশেষে প্রত্যেকটি মুসলমানের দৈনিক খাদ্যের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিলেন এবং প্রত্যেক মাসে নিয়মিতভাবে সরকারী কোষগার হতে তা প্রদান করার ব্যবস্থা করলেন। এছাড়াও বার্ষিক পনর দেরহাম হতে দু'শত দেরহাম বিবিধ কাজে খরচের জন্য প্রদান করা হল।
ঐতিহাসিক ইবনে উবাইদ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তার একান্ত ইচ্ছা ছিল যে, প্রত্যেকটি মুসলমানের জন্য তিনি বার্ষিক দু' হাজার দেরহাম ভাতার ব্যবস্থা করবেন, কিন্তু তিনি তার এ বাসনা পূর্ণ হবার পূর্বেই ইন্তেকাল করলেন। এর বাস্তবায়নের জন্য আর সুযোগ পেলেন না।
হযরত ওমর (রা) কর্তৃক রাষ্ট্রের আমদানীকৃত অর্থ নির্ধারিত ব্যয়ের খাতগুলি হযরত আলী (রা) এর যুগ পর্যন্ত চালু ছিল।
হযরত মুয়াবিয়া (রা)-এর উত্তরাধীকারীদের যুগে এ পদ্ধতির বিলুপ্তি ঘটল। আমদানীর ব্যয়খাতগুলি সম্পূর্ণরূপেই ভিন্ন হয়ে গেল। অতঃপর হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজও সে সমস্ত ব্যয়খাতগুলি নির্ধারণের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, তার মতে হযরত ওমর (রা)-এর নীতিই সুষ্ঠ ইসলামী নীতি বলে পরিগণিত ছিল। তাঁর মতে হযরত ওমর ফারুক (রা) ন্যায়পরায়ণ খলিফা ছিলেন। তিনিও তাঁর অনুসৃত নীতি সমূহই অনুসরণ করতে চেষ্টা করলেন। বেতন ভাতা নির্ধারণ সম্পর্কে তিনি রাজ্যের গভর্ণরদের নিকট লিখিত তাঁর এক পত্রে এ পদ্ধতির উল্লেখ করে লিখেছিলেন-
হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা) বিজিত সম্পদ সম্পর্কে একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন, মুসলমানগণ তার সিদ্ধান্ত বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিয়েছিল। তিনি সমস্ত मुसलमानों জন্য বেতন ভাতা নির্ধারণ করলেন- যা প্রতি বছর তারা পেতে থাকে। সুতরাং এ ন্যায়পরায়ণ খলিফার অনুসরণ করা তোমাদের কর্তব্য।
ইবনে আব্দুল হাকام এবং ইবনে সাদ বলেন যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ নিজেও এ ন্যায়পরায়ণ খলিফার অনুসরণ অপরিহার্য্য মনে করতেন। তিনিও হযরত ওমর ফারুক (রা)-এর মত রাজ্য ভান্ডার হতে জনসাধারণকে বেতন ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন, তবে তার যুগে রাষ্ট্রে আমদানী যেহেতু হযরত ওমর ফারুক (রা)-এর যুগের তুলনায় খুবই হ্রাস পেয়েছিল এবং লোকও সে পর্যায়ে ছিল না। কাজেই তিনি বেতন ভাতার ক্রম বিভক্তি বাতিল করে এক সাধারণ পদ্ধতি গ্রহণ করলেন, আর হযরত ওমর ফারুক (রা) এই পদ্ধতি অবলম্বন করতেই চেয়েছিলেন। অবশ্য বিশিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য তিনি বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বন করেছিলেন।
ইবনে জাওযি ও ইবনে আব্দুল হাকামের বর্ণনা মতে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তার কর্মচারীদের একশত হতে তিনশত দীনার বার্ষিক বেতন ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন।
কর্মচারী ব্যতীত সাধারণ লোকদের জন্য তিনি এক রকম বেতন ভাতা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে ইবনে সাদের নিম্ন লিখিত ভাষ্যটি প্রণিধানযোগ্য-
ওসমান ইবনে হানী বলেন, আমি হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে দুই স্থানে বেতন প্রদান করতে দেখেছি। তিনি সমস্ত লোককেই একই রকম বেতন দিতেন।
মুহাম্মদ ইবনে হেলাল বলেন যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ ব্যবসায়ী ছাড়া অন্যান্য সমস্ত লোকদের ভাতা নির্ধারণ করে দিতে আবুবকর ইবনে হাজামকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।
অন্য একটি বর্ণনায় ব্যবসায়ীদের ভাতা বরাদ্দ না করার কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। রবিয়া ইবনে আতা বলেন, একবার আমি বিশিষ্ট পন্ডিত ও আলেম সুলাইমান ইবনে ইয়াসারের নিকট উপবিষ্ট ছিলাম। তার সামনে আবুবকর ইবনে হাজামের নিকট হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের লিখিত চিঠির কথা আলোচিত হল যাতে তিনি ব্যবসায়ীদের জন্য ভাতা বরাদ্দ না করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তখন সুলাইমান ইবনে ইয়াসার বললেন, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের চিন্তাধারা খুবই যথার্থ। কারণ ব্যবসায়ীগণ মুসলমান জনসাধারণের কল্যাণ চিন্তা ব্যতীতই নিজ নিজ ব্যবসা বাণিজ্যে নিয়োজিত থাকে।
অপর এক বর্ণনায় জানা যায় যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সর্বোচ্চ ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন দু' হাজার দীনার।
অন্য একটি বর্ণনায় সরকারী কোষাগার হতে মদীনাবাসীদের ভাতার কথা বর্ণিত আছে যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ ২৮ মাস ২৫ দিনে মদীনাবাসীদের জন্য তিনটি ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের খেলাফতের যুগও এ সামান্য সময়ই ছিল। এই বৎসরের ভাতা জনসাধারণের প্রাপ্য ছিল এবং তিনি অসুস্থ অবস্থায় তৃতীয় ভাতা প্রদানের নির্দেশ এ জন্যই দিয়েছিলেন যাতে জনসাধারণের কোন প্রকার অসুবিধা না হয়।
শুধু মদীনাবাসীই তাঁর এরূপ দয়ার দানে ধন্য হয়নি, বরং প্রতিটি মুসলমানই তাঁর দান লাভে ধন্য হয়েছিল। তালহা ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ আমার মাধ্যমে আমার বংশের লোকদেরকে তিনটি ভাতা প্রদান করলেন অথচ সাধারণ লোকেরা দু'টি ভাতা পেয়েছিল।
অপর একটি বর্ণনায় জানা যায় যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রাজ্যের مسلمانوں জন্য ভাতা নির্ধারণ করে ঘোষণা করে দিলেন যে, যাদের জন্য ভাতা বরাদ্দ করা হয়নি, তারা যেন তাকে সে বিষয়ে জ্ঞাত করেন, যাতে তিনি তাদের ভাতা বরাদ্দ করে দিতে পারেন।
মুহাম্মদ ইবনে ওমর বলেন- আমার চাচা আমাকে বলেছেন যে, আমি ৯৭ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেছি। আমার বয়স যখন তিন বৎসর তখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ খলিফা নির্বাচিত হলেন এবং আমিও সাধারণ ভাতা হিসেবে তিন শত দীনার পেতে লাগলাম।
নগদ ভাতা ছাড়াও হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ সমস্ত লোককেই শস্য প্রদান করতেন এবং সকলকেই খাদ্য শস্য প্রদানের সাম্যের নীতি গ্রহণ করেছিলেন। প্রত্যেককেই প্রায় ১০ (দশ) মন খাদ্য প্রদান করা হত।
সাধারণ মানুষের ভাতা আদায়ে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করতেন। এমন কি কয়েদীদের ভাতা নিয়মিত আদায় করার ব্যবস্থা ছিল।
ইবনে হাজাম বলেন, আমরা কয়েদীদের রেজিষ্টার বের করে রাখতাম, যাতে খলিফার নির্দেশ মত তারা তাদের ভাতা গ্রহণ করতে পারে। তিনি আরও বলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ আমাকে লিখলেন যে, ভাতা প্রাপ্তদের কেহ যদি উপস্থিত না থাকে বা আশেপাশে কোথাও গিয়ে থাকে তবে তার ভাতার অর্থ কোষাধ্যক্ষের নিকট রেখে দিও যাতে সে এসে গ্রহণ করতে কোন অসুবিধায় না পড়ে, আর যদি কেউ দূরে চলে গিয়ে থাকে তবে তার ফিরে আসা পর্যন্ত তার ভাতা বন্ধ রাখ। যে দিন সে আসবে বা তার মৃত্যুর সংবাদ পাবে অথবা তার কোন প্রতিনিধি তার জীবিত থাকার প্রমাণ নিয়ে উপস্থিত হবে তখন তাকে তা দিয়ে দিবে।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ প্রথম বছর হতেই চৌদ্দ বৎসরের বয়স্ক বালক-বালিকাদের জন্য ভাতা বরাদ্দ করে দিয়েছিলেন অবশ্য তাদের ভাতা সৈনিকদের ভাতার চেয়ে কম ছিল। তিনি শুধু পনের বছর বয়সের কম বয়সের সৈনিককেও সৈনিক ভাতা দিতেন না। এ ব্যাপারে হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ একটি ফরমান জারী করেছিলেন যে, পনের বছর বয়সের কম সৈন্যদেরকে সাধারণ সৈনিকভাতা প্রদান করা হবে না। শুধু পনের বৎসর বয়স্কদের জন্য সৈনিক ভাতা প্রদান করা হবে।
সামরিক বাহিনীর বেতনেও বিভিন্ন পর্যায় ছিল। পদস্থ ও দক্ষ সৈনিকদের বেতন ছিল বার্ষিক তিন শত দীনার। এ সম্পর্কে তাঁর সুনির্দিষ্ট আদেশ ছিল। তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, যখন সৈনিকদের একশত দীনার বেতন দাও, তখন লক্ষ্য করে দেখবে তার ঘোড়া আরবী কিনা, তাঁর বর্ম, তরবারী, তীর ধনুক ও বর্শা সহ প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র আছে কিনা।
যে সমস্ত সৈনিক ডাক বা এ জাতীয় কোন কাজে নিযুক্ত থাকত তাদের সৈনিকদের ভাতা প্রদান করা হত। সকল শ্রেণীর বেতন ভাতা আদায় করার জন্য তিনি খুব চিন্তিত থাকতেন। বছরের শুরুতেই কোষাগারের দরজা খুলে দিতেন।
ইবনে সাদ বর্ণনা করেন, ইরাকের শাসনকর্তা আব্দুল হামিদের গোলাম বলেছে যে, আব্দুল হামিদ সর্বপ্রথম ওমর ইবনে আবদুল আজিজের যে পত্র পেলেন, তাতে লিখা ছিল শয়তানের ধোকা এবং বাদশার জুলুমের পর মানুষের জীনের কোন মূল্যই থাকে না। আমার এ পত্র পাওয়া মাত্রই তুমি প্রত্যেক হকদারের হক আদায় করে দিবে।
আবু বকর ইবনে মরিয়াম, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ আরব, অনারব, স্বাধীন, গোলাম নির্বিশেষে সকল মুসলমানের খাদ্য, পোষাক এবং বেতন সমান সমান করে দিয়েছিলেন। অবশ্য তিনি মুক্তিপ্রাপ্ত গোলামের ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন পঁচিশ দীনার।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এ ব্যাপারে একটি অদ্ভুত কাণ্ডও করেছিলেন। তিনি মদীনার হাসেম বংশীয়কে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর আত্মীয়তার মর্যাদা দান করে বার্ষিক দশ হাজার দীনার ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন-
دَعَانِي عُمَرُ بْنُ عَبْدِ الْعَزِيزِ فَقَالَ خُذْ هُذَا الْمَالَ الْأَرْبَعَةَ الْآبِ أَوْ خَمْسَةَ الْآفِ دِينَارٍ فَاقَدِمْ بِهَا عَلَى أَبِي بَكْرِ بْنِ حَزَمَ فَقُل لَّهُ فَيَصِمٌ الَيْهِ خَمْسَةَ أَلَافٍ دِينَارٍ أَو سِتَّةِ الافِ دِينَارٍ حَتَّى يَكُونَ عَشَرَةَ الْأَفِ دِينَارٍ ثُمَّ تَقْسِمُ ذَالِكَ عَلَى بَنِي هَاشِمٍ وَتُسَوَّى بَيْنَهُمُ الذَّكَرَ وَالْأُنْثَى وَالصَّغِيرَ وَالْكَبِيرَ سَوَاء
قَالَ وَفَعَلَ أَبُو بَكْرُ هَذَا فَعَقَبَ زَيْدُ بْنُ حَسَنٍ فَقَالَ لِأَبِي بَكْرٍ قَوْلاً قَالَ فِيهِ مِنْ عُمَرَ وَكَانَ فِيمَا قَالَ يَسْوَى بَيْنِي وَبَيْنَ صِبْيَانِ فَقَالَ أَبُو بكر لا تبلغ هذا الْمَقَالَةُ مِنْكَ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ فَيُغْضِهِ ذَالِكَ وَهُوَ حَسَنُ الرَّايِ فِيكُمْ - قَالَ زَيْدٌ فَاسْتَلْكَ بِاللَّهِ إِنْ كَتَبْتَ إِلَيْهِ مُصْيِرُهُ بِذَالِكَ فَكَتَبَ أَبُو بَكْرٍ إِلَى عُمَرُ لَهُ إِنَّ زَيْدُ بْنُ حَسَنٍ قَالَ مَقَالَةٌ فِيهَا غَلَطَهُ وَخَبَرَهُ بِالَّذِي قَالَ قُلْتُ يَا أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ إِنَّ لَهُ قَرَابَةً وَرَحْمًا - فَلَمْ يُبَالُ عُمَرُ وَ تَرَكَهُ -
একদিন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন যে, বায়তুলমাল হতে চার অথবা পাঁচ হাজার দীনার নাও এবং আবু বকর ইবনে হাজামের নিকট গিয়ে তাকে বলবে, সে যেন এতে আরও পাঁচ কি ছয় হাজার দীনার মিলিয়ে দশ হাজার করে নেয় এবং এটা হাসেম বংশীয়দের নিকট বিতরণ করে দেয়। তাকে এটাও বলবে যে, স্ত্রী পুরুষ, বালক-বৃদ্ধ সকলকেই যেন সমান সমান অংশ দেয় কোন পার্থক্য যেন না করে।
ভাষ্যকার বলেন, আবু বকর ইবনে হাজام এরূপই করলেন, ফলে যায়েদ ইবনে হাছান অসন্তুষ্ট হয়ে খলিফা সম্পর্কে দুই চার কথা ভালমন্দ বলে ফেললেন এবং অভিযোগ করলেন, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ আমাদেরকে ছেলেদের সাথে মিলিত করে দিয়েছে। আবু বকর ইবনে হাজام তাকে বললেন, খলিফা আপনাদের প্রতি ভাল মনোভাব পোষণ করেন। তিনি যদি আপনার এসব কথা শুনেন তবে নিশ্চয়ই অসন্তুষ্ট হবেন। যায়েদ তার নিকট বললেন, খলিফাকে অবশ্যই এটা অবহিত করতে হবে। আবু বকর ইবনে হাজাম খলিফার নিকট তার লিখিত এক পত্রে এ কথাও উল্লেখ করলেন।
বর্ণনাকারী বলেন, আমি খলিফাকে বললাম, যায়েদ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পরম আত্মীয়। কাজেই খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ যায়েদের কথায় মোটেই অসন্তুষ্ট হলেন না।
হযরত হুসাইন (রা) এর কন্যা ফাতেমা হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে এক পত্র লিখে তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বললেন যে, তিনি একটি ভাল কাজই করেছেন। যার কোন খাদেম ছিল না, তিনি তাকে খাদেম প্রদান করেছেন, যার পরিধানের কাপড় ছিল না তাকে কাপড় প্রদান করেছেন। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ ফাতেমার এই পত্র পেয়ে খুব খুশি হলেন।
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ একটি বিরাট কর্তব্য পালন করেছিলেন। দীর্ঘ ষাট বছর যাবৎ বায়তুলমালের আমদানীকৃত অর্থ হতে যাদেরকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল তিনি তাদেরকে সেই অধিকার ফিরিয়ে দিলেন। এটা তাঁর একটি দায়িত্বও ছিল। ফাতেমার এ পত্র খলিফাকে খুবই খুশী করল। যেহেতু এটা মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নাতনীর পবিত্র পত্র, এটা হযরত আলীর (রা) দৌহিত্রীর লিখিত পত্র, এটা শহীদে কারবালা হযরত হুসাইন (রা)-এর প্রাণপ্রিয় কন্যার পত্র। তিনি এ পত্র চোখে মুখে লাগালেন এবং পত্র বাহককে পাঁচশত দীনার পুরস্কারসহ হযরত ফাতেমাকে ধন্যবাদ জানাতে মদীনায় পাঠালেন ও তার জন্য দোয়া করতে বললেন।
বর্ণনাকারী বলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তার চিঠির জবাবে যে উত্তর লিখেছিলেন তাতে তিনি তাঁর মর্যাদা এবং আল্লাহপাক তাদের যে সমস্ত অধিকার প্রদান করেছেন তাও স্বীকার করেছিলেন।
ফাতেমা ব্যতীত অন্যান্য হাশেম বংশীয়গণও হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের এই কর্তব্যপরায়ণতার জন্য তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।
ইবনে সাদ বলেন, একদিন বনি হাশেমের কিছু লোক সমবেত হয়ে একটি পত্র লিখলেন এবং একজন বাহক মারফত তা হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের নিকট পাঠিয়ে দিলেন। তিনি আত্মীয়তার মর্যাদা দান করে যা করেছেন তাতে তাঁরা তাকে ধন্যবাদ প্রদান করলেন।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ উক্ত পত্রের উত্তরে তাদেরকে লিখলেন যে, পূর্ব হতেই আমার এরূপ অভিপ্রায় ছিল এবং আমি ওয়ালিদ ও সুলায়মান উভয়কেই এই পরামর্শ দিয়েছিলাম, কিন্তু তারা আমার কথা বুঝতেও পারেনি। এখন যেহেতু আমিই দায়িত্বের বোঝা গ্রহণ করেছি কাজেই আমি আমার পূর্ব ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করে যাচ্ছি।
অপর এক বর্ণনাকারী বলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সর্বপ্রথম সে সমস্ত অর্থই বিতরণ করলেন যা তিনি সিরিয়া হতে মদীনায় প্রেরণ করেছিলেন। তা হতে স্ত্রী-পুরুষ, বালক বৃদ্ধ নির্বিশেষে সকলেই সমান অংশ পেয়েছিল।
অতঃপর আহলে বাইতের একজন বললেন যে, আমরা আহলে বাইতের সদস্যগণ প্রত্যেকেই তিন হাজার দীনার ভাতা পেয়েছি তদুপরি তিনি লিখেছেন যে, আমি জীবিত থাকলে আপনাদের পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠা করার ব্যবস্থা করব।
পবিত্র কুরআনে বায়তুল মালের সম্পদ ব্যয়ের যে সমস্ত খাতের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সে সমস্ত খাতেই বায়তুল মালের অর্থ ব্যয় করতেন। এমন কি তিনি ঋণগ্রস্ত লোকের ঋণও পরিশোধ করে দিয়েছিলেন।
ইবনে সাদ বলেন যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এক ঋণগ্রস্ত লোকের পঁচাত্তর দীনার ঋণ পরিশোধ করলেন। আর এটা ঋণগ্রস্তদের জন্য নির্ধারিত অংশ হতেই প্রদান করেছিলেন।
একবার আছেম, কাতাদা ও বশির ইবনে মুহাম্মদ হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের নিকট এসে হানাজেরায় তাঁর সাথে সাক্ষাত করলেন এবং তার নিকট তাদের উভয়ের ঋণের কথা ব্যক্ত করলেন। তিনি তাদের প্রত্যেকের পক্ষ হতে চার শত দীনার ঋণ আদায় করে দিলেন। এ সম্পর্কে তিনি যে পত্র লিখেছিলেন তাতে কালব বংশের সাদকা হতে এই অর্থ প্রদান করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এটা দীর্ঘদিন যাবৎ বায়তুলমালে জমা পড়েছিল।
অপর এক বর্ণনাকারী বলেন, একবার কাশেম ইবনে মুখাইমা তাঁর নিকট এসে তার ঋণ পরিশোধ করে দেওয়ার আবেদন করল। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ঋণের পরিমাণ কত? সে বলল, ৯০ দীনার। তিনি বললেন ঠিক আছে, এটা ঋণ গ্রস্তদের অংশ হতেই আদায় করে দেওয়া হবে।
ইবনে আবি হাইছামা বলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ খলিফা থাকা অবস্থায় আমার আড়াই শত দীনার ঋণ পরিশোধ করে দিয়েছিলেন।
মূল কথা, পবিত্র কুরআন ও আল্লাহর রাসূল (সা) যে সমস্ত খাতে বায়তুল মালের অর্থ ব্যয় করতে নির্দেশ দিয়েছেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ যতদিন মুসলিম রাষ্ট্রের খলিফা ছিলেন, ততদিন তিনি সে সমস্ত খাতৈই বায়তুল মালের অর্থ ব্যয় করেছিলেন। তিনি হকদারদের হক আদায় করতে এবং রাষ্ট্রের সমস্ত হকদারদেরকে বায়তুলমাল হতে নির্ধারিত অংশ প্রদান করতে সবসময় ব্যস্ত থাকতেন এবং এ চিন্তায় কোন কোন সময় ক্রন্দনও করতেন।
তাঁর স্ত্রী ফাতেমা বলেন, খলিফা হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র) সেবার জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি সদাসর্বদা তাঁদের জন্য চিন্তা করতেন। যদি কোন দিন দিনের বেলায় সরকারী কাজকর্ম শেষ না হত সারা রাত্রই তিনি সেই কাজ করতেন। যখন তিনি রাষ্ট্রীয় কাজ হতে অবসর হতেন তখন তিনি তাঁর ব্যক্তিগত প্রদীপ আনিয়ে নিতেন এবং দু' রাকাত নামায পড়ে হাতের উপর মাথা রেখে বসে পড়তেন, আর অশ্রু প্রবাহিত হয়ে গন্ডদ্বয় ভেসে যেত। তারপর এমন জোরে জোরে কাঁদতেন, 'শুনে মনে হত যেন, কাঁদতে কাঁদতে তার অন্তর ফেটে যাবে-তিনি ইন্তেকাল করবেন। তারপর সকাল হতে তিনি রোযা রাখতেন।
তার স্ত্রী ফাতেমা বলেন, আমি কখনও কখনও তাঁর নিকট এসে বলতাম, হে আমিরুল মুমিনীন, আপনার উপর কি আমার কোন অধিকার নেই? পূর্বে যা ছিল তাও কি এখন শেষ হয়ে গিয়েছে? তিনি বলতেন আমাকে আমার কাজে ছেড়ে তুমি তোমার মত থাক। আমি বলতাম, আমাকে কিছু বলেন। তখন তিনি বলতেন, আমি এ রাষ্ট্রের ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেকটি নাগরিকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি। তাদের ক্ষুধার্ত, নিঃস্ব, অসহায়, মুসাফির, অপারগ, বন্দী, সামান্য পুজির মালিক, বহু সন্তানের দরিদ্র পিতা যারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে শহরে বন্দরে বসবাস করছে, তাদের কথা আমার স্মরণ হয়। আমি জানি এ সম্পর্কে আল্লাহ আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন, আল্লাহর রাসূলও (সা) জিজ্ঞাসা করবেন। আমার ভয় হয়, যদি আল্লাহ আমার ওযর আপত্তি গ্রহণ না করেন, আল্লাহপাক আমার কোন দলীল না মানেন, তখন আমার কি উপায় হবে?
ইবনে আব্দুল হাকাম বর্ণনা করেন-
وَقَدِمَتْ امْرَأَةً مِّنَ الْعِرَاقِ عَلَى عَهْدِ عُمَرَ بْنِ عَبْدِ الْعَزِيزِ قَدْ خَلَتِ الْمَرْأَةُ عَلَى فَاطِمَةَ - وَهِيَ جَالِسَةٌ فِي بَيْتِهَا وَفِي يَدِهَا قَطْنَّ تعالِجَهُ فَسَلَّمَتْ فَرَدَّتْ عَلَيْهَا السَّلَامَ وَقَالَتْ لَهَا ادْخُلِي فَلَمَّا جَلَسَتِ الْمَرْأَةُ رَفَعَتْ بَصَرَهَا فَلَمْ تَرَ فِي الْبَيْتِ شَيْئًا لَهُ بَالَ - فَقَالَتْ لِفَاطِمَةَ إِنَّمَا جِئْتُ لِأَمْرِ بَيْتِي مِنْ هُذَا الْبَيْتِ الْخَرَابِ فَقَالَتْ لَهَا فَاطِمَةُ إِنَّمَا خَرَبَ هُذَا الْبَيْتِ مِنْ عِمَارَةٍ بُيُوتِ أَمْثَالَكِ فَأَقْبَلَ عُمَرُ دخَلَ الدَّارَ فَمَالَ إِلَى بِشْرٍ فِي نَاحِيَةِ الدَّارِ فَانْتَزَعَ مِنْهَا وَلَاءَ صَبَهَا كَانَ بِحَضْرَةِ الْبَيْتِ وَهُوَ يَكْثَرُ النَّظْرَ إِلَى فَاطِمَةً نَقَالَتْ لَهَا الْمَرْأَةُ اسْتَتَرَى مِنْ هَذَا الطَّيَانِ فَأَنَّى أَرَاهُ بِدَيْمِ النَّظْرِ إِلَيْكِ فَقَالَتْ لَيْسَ هُوَ طيان - هُوَ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ ثُمَّ أَقْبَلَ عُمَرُ فَسَلَّمَ وَدَخَلَ بَيْتِهِ فَقَامَ إلى مُصَلَّى كَانَ فِي الْبَيْتِ يُصَلَّى فِيْهِ فَسَالَ فَاطِمَةَ عَنِ الْمَرْأَةِ فَقَالَتْ هِيَ هَذِهِ فَأَخَذَ مَكْتَهُ لَهُ فِيهِ شَيْءٌ مِّنْ عِنَبٍ فَجَعَلَ يَتَخَيَّرَ لَهُ خَيْرُهُ يُنَاوِلُهَا إِيَّاهُ ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَيْهَا فَقَالَ مَا حَاجَتَكِ فَقَالَتِ الْإِمْرَأَةُ لَى خَمْسَةٌ بَنَاتٍ كَسَلِ فَجِئْتُكَ ابْتَغِي حُسْنِ نَظَرُكَ لَهُنَّ فَهِيَ يَقُولُ كَسَلٌ كَسَل وَيَبْلَى فَأَخَذَ الدُّواةَ وَالْقِرْطَاسُ وَكَتَبَ إِلَى وَالِيُّ الْعِرَاقِ الْخَر -
একবার ইরাকের এক মহিলা হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজের সাথে দেখা করার জন্য তাঁর গৃহে আগমন করল। এ মহিলা ফাতেমার নিকট গিয়ে উপস্থিত হল, তখন ফাতেমা গৃহে বসে সেলাইর কাজ করছিলেন, সে মহিলা তাঁকে সালাম করলে তিনি তার সালামের জওয়াব দিয়ে তাকে ঘরে এসে বসতে বললেন। তারপর ঘরে প্রবেশ করে উপবেশন করে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল যে, ঘরে কোন আসবাবপত্র নেই। এতে সে বলল, আমি এসেছি কি, এ খালি ঘরের ওসিলায় আমার ঘর পূর্ণ করতে? ফাতেমা জওয়াব দিলেন, তোমার মত লোকদের ঘর ঠিক করতে গিয়ে এ ঘর বিরান হয়েছে।
তারপর হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ ঘরে প্রবেশ করলেন এবং ঘরের কাছেই একটি কূপ ছিল, তা হতে পানি উঠিয়ে প্রাঙ্গনস্থিত মাটিতে ঢাললেন। এ সময় তিনি বারবার ফাতেমাকে দেখছিলেন। সেই মহিলা ফাতেমাকে বলল, আপনি এই বেগানা লোকটি হতে কেন পর্দা করেন না? এ লোকটি বার বার আপনাকে দেখছে। ফাতেমা বললেন, ইনিইত আমিরুল মুমিনীন। তারপর হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সামনে অগ্রসর হয়ে সালাম করলেন এবং তার কক্ষে প্রবেশ করলেন। তারপর জায়নামাযের দিকে যেতে যেতে মহিলার কথা জিজ্ঞেস করলেন। ফাতেমা তার আগমনের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ আঙ্গুরের ঝুড়ির দিকে হাত বাড়িয়ে কয়েকটি ভাল আঙ্গুর সেই মহিলাকে দিলেন এবং তার অবস্থা জিজ্ঞেস করলেন। সে নিবেদন করল যে, আমি ইরাক হতে আগমন করেছি। আমার পাঁচটি কুমারী বালিকা আছে, আমি খুবই অভাবগ্রস্থ। এটা শুনে তিনি কাঁদতে লাগলেন। তারপর দোয়াত কলম নিয়ে ইরাকের শাসনকর্তাকে এক আদেশনামা লিখলেন এবং সে মহিলাকে বললেন, তোমার বড় মেয়ের নাম বল, সে বড় মেয়ের নাম বললে তিনি তার ভাতা ধার্য্য করলেন। মহিলা এতে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করল। তারপর দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ বালিকার নাম জিজ্ঞেস করে তাদেরও ভাতা নির্ধারণ করলেন। মহিলা অত্যন্ত খুশী হয়ে তাঁর জন্য দোয়া করল। পঞ্চম বালিকার জন্য তিনি কোন ভাতা বরাদ্দ না করে বললেন, এ চার জনের ভাতা দ্বারাই তারও খরচ বহন করতে পারবে।
সে মহিলা খলিফার আদেশনামা নিয়ে ইরাকে প্রত্যাবর্তন করল এবং যখন ইরাকের শাসনকর্তাকে সে আদেশ নামা দিল তখন তিনি খুব কাঁদতে লাগলেন এবং আদেশনামা লেখকের জন্য দোয়া করতে লাগলেন। মহিলা জিজ্ঞেস করল, তিনি কি ইন্তেকাল করেছেন? গভর্ণর বললেন, হ্যাঁ, এটা শুনে মহিলাও চিৎকার করে উঠল। গভর্ণর তাকে শান্ত্বনা দিয়ে বললেন, তোমার আশংকার কোন কারণ নেই। আমি কখনও এই মহামানবের চিঠির অমর্যাদা করব না। অতঃপর তিনি তার কন্যাদের ভাতা নির্ধারণ করে তার সকল অভাব দূর করে দিলেন। কিন্তু তাদের এ ভাতার পরিমাণ কত ছিল, এ সম্পর্কে স্পষ্ট কোন বর্ণনা পাওয়া যায়নি। তবে এক বর্ণনায় জানা যায় যে, তিনি বনু উমাইয়াদের প্রত্যেকের জন্য দশ দীনার ভাতা দিয়েছিলেন। আর এটা ছিল সবচেয়ে কম ভাতা।
বর্ণনাকারীর ভাষ্যটি হলো, একবার আম্বা ইবনে সায়ীদ হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ-এর নিকট হতে বের হচ্ছিলেন, তখন বনু উমাইয়ার লোকেরা তাঁর দরজায় উপবিষ্ট ছিল। তাদের মধ্যে ইয়াযিদ ইবনে আব্দুল মালেকও ছিলেন। তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত ছিলেন। লোকেরা আমার কাছে অভিযোগ করে বলল, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ আমাদেরকে মাত্র দশ দীনার ভাতা দিয়েছে। আমরা তার অসন্তুষ্টির ভয়ে ফিরিয়ে দেইনি। ইয়াযিদ বললেন, তাকে বল যে, আমি এ দশ দীনার ভাতা গ্রহন করব না। তিনি কি আমাকে তার পরবর্তী খলিফা মনে করেন না? আম্বা খলিফার কাছে ফিরে এসে বললেন, আপনার পিতার বংশধরেরা আপনার দরজায় উপবিষ্ট। দশ দীনার করে ভাতা দেওয়াতে তারা আপনার প্রতি অসন্তুষ্ট। ইয়াযিদ বলেন যে, আপনি কি মনে করেন? তিনি কি আপনার পরবর্তী খলিফা নন? হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ আম্বাকে বললেন, তাদেরকে আমার সালাম দিয়ে বল যে, আমি গতরাত্রে সারারাত্র জেগে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছি এবং আল্লাহর নিকট ওয়াদা করেছি, যাতে সমস্ত মুসলমানগণকে বাদ দিয়ে তাদের কিছু না দেই। আল্লাহর কসম! আমি সমস্ত مسلمانوںকে বাদ দিয়ে তাদেরকে একটি দেরহামও অতিরিক্ত প্রদান করব না, যদি দেই তবে তখনই দিব যখন সকলেই এই পরিমাণ পাবে।
এ ভাষ্য দ্বারা স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়ে যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বনু উমাইয়ার লোকদের দশ দীনার ভাতা দিয়েছিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে এটাও বুঝা যায় যে, এ পরিমাণ তিনি প্রত্যেক মুসলমানকেই প্রদান করতেন।
আমরা সঠিক বলতে পারি না যে, তিনি কি তাদেরকে মাসিক দশ দীনার দিতেন, না এটা তাদের জন্য তার বিশেষ অনুদান ছিল। এ দশ দীনার দিয়ে তিনি তার আত্মীয়দেরকে তার অর্থনৈতিক পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত করেছিলেন। কারণ ইবনে আব্দুল হাজামের অপর এক বর্ণনায় স্পষ্টই বুঝা যায় যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বায়তুল মালের কোন অর্থ হকদার ব্যতীত অন্য কাকেও বা কোন আমির-উমারাকেও প্রদান করতেন না।
ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, একবার আম্বা হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের নিকট অর্থ চেয়েছিল। তিনি তাকে বললেন, তোমার কাছে যে মাল আছে যদি তা হালাল হয়, তবে তাই তোমার জন্য যথেষ্ট, আর যদি হারাম হয় তবে সেটা বৃদ্ধি করো না। আমাকে বল, তুমি কি দরিদ্র? সে বলল না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি ঋণগ্রস্থ? সে বলল না। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, তবে আমার কাছে আল্লাহর দেয়া আমানত হতে বিনা প্রয়োজনে তোমাকে কিছু দিতে তুমি কেন আমাকে পরামর্শ দাও? যদি তুমি অভাবী হতে তবে তোমার প্রয়োজন মিটাতে পারে সে পরিমাণ অর্থ আমি তোমাকে দিতাম। তুমি যদি ঋণগ্রস্ত হতে তবে আমি তোমার ঋণ পরিশোধ করার ব্যবস্থা করে দিতাম। তোমার নিকট যে সম্পদ আছে তাই খাও এবং আল্লাহকে ভয় কর।
এ সমস্ত হকদার ছাড়াও হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বায়তুল মাল হতে ঐ সময় লোকদেরকে একশত হতে তিনশত দীনার পর্যন্ত ভাতা প্রদান করতেন- যারা জুলুম প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে বাদী হতেন অথবা তাঁর নিকট আবেদন পেশ করার জন্য দূর দূরান্ত হতে সফর করে আগমন করত।
ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তার অধীনস্ত কর্মচারীগণকে নির্দেশ দিলেন যে, যে ব্যক্তি কোন জুলুম প্রতিরোধ করতে অথবা ধর্মীয় সংস্কারমূলক কোন কাজ করার জন্যে আমাদের কাছে আগমন করবে তা কোন ব্যক্তিগত ব্যাপারেই হোক বা সামাজিক ব্যাপারই হোক তাকে একশত হতে তিনশত দীনার প্রদান করবে। হয়ত আল্লাহ তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে দেবেন, আর না হয় তার মাধ্যমে কোন বাতিল শক্তি ধ্বংস করে দিবেন বা তার দ্বারা কোন মঙ্গল সাধিত হবে।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বায়তুলমাল হতে কুমারী মেয়েদের বিবাহ এবং যিম্মি সংস্কার উন্নয়নের জন্য অর্থ সাহায্য করতেন।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ কুফার শাসনকর্তা যায়িদ ইবনে আব্দুর রহমানকে তাঁর এক পত্রের উত্তরে লিখলেন, তুমি লিখেছ যে সৈন্য বাহিনীর বেতন ভাতা প্রদান করার পরও তোমার কাছে অর্থ উদ্ধৃত রয়েছে। তবে তুমি অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে এখন ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধ করে দাও। যারা কোন অসৎ উদ্দেশ্যে ঋণ গ্রহণ করেনি এবং যে সমস্ত লোক অর্থাভাবে বিবাহ করতে পারেনি তাদের বিবাহের ব্যবস্থা করে দাও। যায়েদ তাঁর নির্দেশ যথাযথ কার্যকরী করার পরও তার নিকট অর্থ থেকে গেল। তিনি পুনরায় লিখলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ নির্দেশ দিলেন যে, এ অতিরিক্ত সম্পদ তুমি অমুসলিম কৃষকদের ও অন্যান্যদের অবস্থার উন্নয়নের জন্য বিতরণ কর যেহেতু তাদের সাথে তোমাদের সম্পর্ক দু' এক বছরের জন্য নয়।
ঐতিহাসিক ইবনে আসাকের এ ঘটনা বর্ণনা করে সে নির্দেশনামার শেষ বাক্যটি উল্লেখ করেছেন তা এই-
انْظُرْ مَنْ كَانَتْ عَلَيْهِ جِزْيَةً فَضَعِفَ عَنْ أَرْضِهِ فَأَسْلِفْ مَا يَقْوَى بِهِ عَمِلَ أَرْضِهِ فَأَنَا لَا نُرِيدُ هُمْ لِعَامٍ وَلَا عَامِينَ -
অর্থাৎ যে সমস্ত লোক জিযিয়া কর প্রদান করে এবং এর ফলে তার ক্ষেত বা অন্য কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাকে তার অবস্থার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সাহায্য প্রদান কর। যাতে সে ভালরূপে কৃষিকাজ করতে পারে। কারণ আমাদের সাথে তাদের সম্পর্ক এক বা দু' বছরের নয়।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ গরীব মুসাফিরদের সফরের খরচও বায়তুল মাল হতে বহন করতেন, কারণ পবিত্র কোরআন ইবনুস সাবীল দ্বারা মুসাফরিগণকে সাদকার অধিকারী করেছে। মুসাফিরদের আরাম আয়েসের জন্য তিনি তার রাষ্ট্রে বিভিন্ন স্থানে সরাই খানা নির্মাণ করেছিলেন এবং কর্মচারীগণকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, এ সমস্ত সরাইখানায় যে সমস্ত মুসাফির অবস্থান করবে সরকারী মেহমান খানা হতে তাদেরকে একদিন ও এক রাতের খাদ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করবে এবং অসুস্থ মুসাফিরদের দু দিন ও দু রাতের খোরাকীর ব্যবস্থা করতে হবে। যে সমস্ত মুসাফির দেশে ফিরে যেতে চায় অথচ রাস্তা খরচের অভাবে দেশে যেতে পারেনা, তাদের দেশে ফিরে যাবার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সাহায্যের ব্যবস্থা করে দিবে।
মূল কথা হলো, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ খলিফা হবার পর জনসাধারণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপেই বায়তুলমালের উপর ন্যস্ত করলেন। জনসাধারণের মধ্যে এমন কোন দরিদ্র-অভাবী হকদার ছিল না, বায়তুলমাল যার ব্যয়ভারের দায়িত্ব গ্রহণ করেনি। এ কারণেই তার মাত্র দু' বছরের সংক্ষিপ্ত শাসনামলে সমগ্র জনসাধারণ সুখী ও সমৃদ্ধিশালী হয়ে গিয়েছিল-কোথাও কোন দরিদ্র ও অভাবী লোক ছিল না।
এ সম্পর্কে ইবনে আব্দুল হাকাম যায়েদ ইবনে খাত্তাবের একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ মাত্র আড়াই বছর মুসলিম সাম্রাজ্যের খলিফা ছিলেন। এ সামান্য সময়ের মধ্যে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা এ দাঁড়াল যে, কোন কোন লোক বিপুল ধন-সম্পদ নিয়ে আমাদের কাছে এসে বলত, আমার এই সম্পদ গ্রহণ করুন এবং আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী গরীবদের মধ্যে বিতরণ করে দিন। তখন তার এ ধন-দৌলত ফিরিয়ে দিয়ে বলা হত যে, আমাদের জানামতে এমন গরীব লোক নেই যাকে এই ধন-সম্পদ দেয়া যেতে পারে। কারণ হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের প্রচেষ্টায় দেশের সমস্ত মানুষই সুখী ও সমৃদ্ধিশালী হয়েছিল।
এটা কোন বাহুল্য কথা নয়। রাষ্ট্রে সকল অভাবী ও দরিদ্র হকদারদের জন্য ওমর ইবনে আবদুল আজিজ প্রয়োজনীয় ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। কাজেই দরিদ্র ও অভাবের কোন প্রশ্নই ছিল না। এসমস্ত দোষ শুধু সে সব স্থানেই প্রকাশ পায়, যেখানকার শাসকগণ স্বার্থপর ও লোভী, যেখানকার শাসকগণ বায়তুলমালের অর্থ নিজেরা আত্মসাৎ করে এবং যেখানে সাধারণভাবে মানুষের উপর জোর-জুলুম করা হয়।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ জোর জুলুম-অত্যাচার ও নির্যাতনের সকল পথ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কাজেই এর প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পাবার সুযোগই ছিল না। তিনি বায়তুলমালকে একটি পবিত্র আমানত হিসেবে গণ্য করতেন। তার একটি কপর্দকও বৈধখাত ব্যতীত খরচ করতেন না।