📘 ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ > 📄 অন্তবর্তীকাল

📄 অন্তবর্তীকাল


হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের জীবনের দীর্ঘ ছয়টি বছর অর্থাৎ ৯৩ হিজরী থেকে ৯৯ হিজরী পর্যন্ত কিভাবে অতিবাহিত হয়েছিল- ঐতিহাসিকগণ তার কোন বিস্তারিত আলোচনা করেননি।

ইবনে কাছীর এ সম্পর্কে মাত্র একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য ব্যবহার করেছেন-
ثُمَّ قَدِمَ دَمِشْقَ عَلَى بَنِي عَمِهِ
অর্থাৎ তারপর তিনি দামেশকে তাঁর চাচাত ভাইদের নিকট চলে গেলেন। এ বাক্যের সাথে সাথেই ইবনে কাছীর যহরীর বর্ণনার একটি উদ্ধৃতি পেশ করেছেন, যার প্রবক্তা স্বয়ং ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র)।

"একদিন দ্বিপ্রহরের সময় ওয়ালীদ আমাকে ডেকে পাঠালেন, আমি তাঁর নিকট এসে দেখলাম যে, তিনি খুবই অস্থির। তিনি আমাকে বসতে বললেন, আমি বসলাম। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, যে ব্যক্তি খলীফাগণকে গালি দেয় তাকে হত্যা করা যাবে? এতে আমি নীরব রইলাম। তিনি সে কথাই আবার বললেন। তখনও আমি কোন উত্তর দিলাম না। তিনি তৃতীয় বারেও তিনি একই প্রশ্ন করলেন, তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, সে কি হত্যাও করছে? ওয়ালীদ বললেন, না, সে শুধু গালি দিয়েছে। আমি বললাম, তবে তাকেও অনুরূপ গালি দেয়া হোক। এতে ওয়ালিদ অসন্তুষ্ট হয়ে তার পরিবার-পরিজনের নিকট চলে গেলেন।

ইবনুল জাওযিও এ জাতীয় একটি ঘটনা সুলায়মানের যুগে সংঘটিত হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন। সুলায়মানের যুগে এক ব্যাক্তি খলীফাগণকে গালি দিয়েছিল। সুলায়মান হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে ডেকে এনে এ সম্পর্কে তাঁর মতামত জানতে চাইলেন। তিনি বললেন, তুমিও তাঁকে গালি দাও। সুলায়মান বললেন, সে আমার বাপ দাদাকে গালি দিয়েছে। হযরত ওমর ইবনে আজিজ বললেন, তুমিও তার বাপদাদাকে গালি দাও। কিন্তু সুলায়মান তাঁর কথা রক্ষা না করে সে ব্যক্তিকে হত্যা করে।

ইবনুল জাওযি আরও বলেন, এ সময় সুলায়মানের পুত্র, খেলাফতের পরবর্তী উত্তরাধিকারী আয্যবও সেখানে ছিল। সে একে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের ঔদ্ধত্য ও অভদ্রতা জ্ঞান করে তাঁর সাথে তর্ক করতে লাগল। সুলায়মান পুত্রকে তিরস্কার করে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট ক্ষমা চাওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন।

এ সমস্ত ঘটনা ব্যতীত ঐতিহাসিকগণ আরও কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যাতে প্রতীয়মান হয় যে, ওয়ালীদ ও সুলায়মান ইবনে আব্দুল মালেক যখনই কোন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সম্মুখীন হতেন তখনই তারা হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে ডেকে তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। তবে তারা কোন কোন সময় তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতেন আবার কোন কোন সময় তারা তাঁর মতামত অগ্রাহ্যও করতেন।

কোন জটিল-সমস্যা হলে ওয়ালীদ তাঁর খাদেমগণকে নির্দেশ দিতেন যে, সেই সৎ লোকটিকে ডেকে আন। তারাও ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে সৎলোক বলেই বিশ্বাস করত। প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন ভাল লোক ছিলেন। এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে যা ঠিক তিনি সে পরামর্শই দিতেন। পরিণাম কি হবে জিজ্ঞাসাকারী খুশি হবে না অখুশি হবে, তিনি তার ভয় করতেন না।

উদাহরণ স্বরূপ ইবনে আব্দুল হাকামের একটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো, একদা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সুলায়মান ইবনে আব্দুল মালেকের সাথে তার কোন বোনের উত্তারিধকার সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। সুলায়মান বললেন এ সম্পর্কে খলীফা আব্দুল মালেকের একটি দলীল আছে। তাতে তিনি তাদেরকে মিরাছ হতে বঞ্চিত করেছেন এবং তিনি তাঁর পুত্রকে সেই দলীল আনতে নির্দেশ দিলেন। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ উপহাস করে বললেন, খলিফা কি কুরআন পাক আনতে নির্দেশ দিলেন? ওয়ালিদের পুত্র আয়্যব একে অভদ্রতা জ্ঞান করে ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে বলল, এ কথাটিই একটি লোককে হত্যা করার পক্ষে যথেষ্ট। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, তুমি যখন খলীফা হবে তখন এরূপই করিও। এতে সুলায়মান পুত্রকে তিরস্কার করলেন এবং ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে বললেন।

ইবনুল জাওযি বলেন, কোন কোন সময় খলীফাগণ তাঁর কথা মেনেও নিতেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, একবার এক সফরে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ সুলায়মানের সাথে ছিলেন। তাঁদের সাথে সামরিক বাহিনীর কিছু লোকও ছিল। সুলায়মান কিছু লোককে গান গেতে শুনে তাদেরকে ডেকে আনলেন এবং তাদেরকে নপুংসক করে দিতে নির্দেশ দিলেন। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ প্রতিবাদ করে বললেন, এটা শরীয়ত বিরোধী একটি নির্দেশ। তাদেরকে ছেড়ে দাও। সুলায়মান তাঁর কথা মেনে নিলেন।

এরূপ এক সফরে তিনি সুলায়মানের সাথে ছিলেন, এমন সময় খুব ঝড় শুরু হলো ও বিদ্যুৎসহ বজ্রপাত হতে লাগল। সুলায়মান ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে তার বাহনের উপর জড়সড় হয়ে বসেছিলেন এবং ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে ডাকছিলেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এটা দেখে হাসতে লাগলেন। সুলায়মান অভিমান করে বললেন, আমরা ভয়ে মরি আর আপনি হাসেন! ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, এটা আল্লাহর রহমত, রহমত দেখে আনন্দ করা উচিত। কাঁদতে হয় আল্লাহর আযাব দেখে।

একদিন সুলায়মান দেখলেন, বহুলোকের সমাগম হয়েছে। তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে জিজ্ঞেস করলেন, এ সমস্ত লোক কি চায়? হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, এরা তোমারই নিকট অভিযোগ করতে এসেছে। সুলায়মান বললেন, এ এক লাখ টাকা নিয়ে তাদের মধ্যে বিতরণ করে দিন। ওমর বললেন, এর চেয়েও ভাল হবে যে, তুমি তাদের অভিযোগ শুনে তার প্রতিকার বিধান কর। অতএব সুলায়মান ওমরের কথা মত তাদের অভিযোগ শুনে তার প্রতিকার করলেন।

একবার সুলায়মান ও হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের মধ্যে একটি ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র)-এর কোন গোলাম সুলায়মানের কোন এক গোলামকে খুব মারপিট করল। উক্ত গোলাম সুলায়মানের নিকট মিথ্যা অভিযোগ করল যে, এতে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ খুব খুশি হয়েছেন। তারপর ওমর ইবনে আবদুল আজিজ আসলে সুলায়মান তার নিকট এ অভিযোগ করলেন। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। তিনি বললেন, তোমার বলার পূর্বে আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। সুলায়মান ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, আপনি মিথ্যাবাদী। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, تَقُولُ كَذِبْتُ وَمَا كَذِبْتُ مُنْذُ شَهِدْتُ عَلَى إِزَارِي وَإِنَّ فِي الْأَرْضِ عَنْ مَجْلِسِكَ هذَا لَسِعَةٌ

অর্থাৎ তুমি বল, আমি মিথ্যাবাদী, অথচ আমি যখন হতে কাপড় পরিধান করি, তখন হতে কোন মিথ্যা কথা বলিনি। আল্লাহর পৃথিবী তোমার মজলিস হতে অনেক প্রশস্ত। এ কথা বলে সুলায়মানের মজলিস হতে বের হয়ে আসলেন এবং বাড়ীতে এসেই তিনি মিশরে যেতে প্রস্তুত হলেন। সুলায়মান এটা জানতে পেরে খুবই বিব্রত বোধ করলেন এবং লোক পাঠিয়ে ওমরের নিকট ক্ষমা চাইলেন এবং তাকে ফিরিয়ে আনলেন। যখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তার নিকট আসলেন তখন তিনি বললেন, আপনি মিশর যাত্রা করে আমাকে যেরূপ বিব্রত করছেন এরূপ আর কখনও হয়নি।

ঐতিহাসিকগণ, বিশেষতঃ ইবনে আব্দুল হাকাম, ইবনুল জাওযি এবং ইবনে কাছীর তার সত্যবাদীতা ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে এ সমস্ত ঘটনা উল্লেখ করেছেন এবং ৯৩ হিজরী হতে ৯৯ হিজরী পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় বছর দামেশকে অতিবাহিত করেন বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনুল জাওযি এটাও বলেছেন যে, একদিন সুলায়মান কোন এক জনপদে গিয়েছিলেন। তার কাফেলা ভীষণ ঝড়ে আক্রান্ত হল। তখন সুলায়মান চিৎকার করে বলেছিলেন, হে ওমর! হে ওমর!

বনু উমাইয়্যার লোকদের সাধারণ রীতি ছিল যখন তাদের কেউ কোন বিপদে পতিত হত তখনই ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে ডাকত এবং তিনিও “এইত আমি আসছি” বলে তার ডাকে সাড়া দিতেন।

ইবনুল জাওযির অপর একটি বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, শুধু বনু উমাইয়‍্যার খলীফাগণই নয় বরং সাধারণ লোকেরাও বিপদাপদে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের সাহায্য প্রার্থী হত।

৯৩ হিজরী হতে ৯৯ হিজরী পর্যন্ত বনু উমাইয়া এবং বনু উমাইয়ার খলীফাগণ বিশেষতঃ ওয়ালীদ ও সুলায়মান সকল প্রকার দুঃখ-শোকে, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পরামর্শ চাইতেন, আর তিনিও পরম বিশ্বস্ততার সাথে তাদেরকে উত্তম পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন।

📘 ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ > 📄 খেলাফতের উত্তরাধিকার লাভ

📄 খেলাফতের উত্তরাধিকার লাভ


সুলায়মানের চরিত্রে যদিও দোষ-ত্রুটির কোন সীমা ছিল না, তবুও তাঁর মহত্ব ছিল যে, তিনি হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে আন্তরিকভাবে ভালবাসতেন। সাধারণত তিনি তাকে সঙ্গে করেই সফর করতেন এবং অধিকাংশ ব্যাপারেই তিনি তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতেন। ইতোপূর্বে আমরা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ ও সুলায়মানের প্রিয় পুত্র আয়্যবের মধ্যে বির্তক এবং সুলায়মান ও ওমর ইবনে আবদুল আজিজের মধ্যে মতবিরোধ সম্পর্কিত তিনটি ঘটনা বর্ণনা করেছি।

আয়্যুব সুলায়মানের প্রিয় পুত্র এবং খেলাফতের পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত ছিল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজের খাতিরেই সুলায়মান তাঁর এ. পুত্রকে দুই বার তিরস্কার করেছেন এবং ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। সুলায়মান তাঁকে মিথ্যাবাদীতার অভিযোগ দেয়ার পর ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। অথচ এতসব হওয়ার পর কারও ধারণা ছিল না যে, মৃত্যুর কঠিন হাত যখন তাঁর দ্বারে করাঘাত করবে তখন তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে খেলাফতের উত্তরাধিকারী মনোনীত করবেন। তাঁর প্রধানমন্ত্রী রেজা বিন হায়াতের পরামর্শেই সুলায়মান এ মহৎ কর্ম করতে উদ্বুদ্ধ হলেন।

ইবনে আব্দুল হাকام বলেন- সুলায়মানের পুত্র আয়্যব খেলাফতের পরবর্তী উত্তরাধিকারী ছিল। কিন্তু সুলায়মানের পূর্বেই সে ইন্তেকাল করল। এছাড়া সুলায়মানের অন্যান্য সন্তানগণ সকলেই ছিল অল্প বয়স্ক। যখন তাঁর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসল এবং তিনি কাউকে তার স্থলাভিষিক্ত করতে ইচ্ছা করলেন, তখন ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ এবং রেজা ইবনে হায়াত এসে উপস্থিত হলেন। সুলায়মান রেজাকে বললেন, আমার সন্তানগণকে জামা-কাপড় পরিধান করিয়ে আমার নিকট নিয়ে আস। তারপর তার সন্তানগনকে তার নিকট হাজির করা হল। তারা এতই অল্পবয়স্ক ছিল যে, তারা জামা কাপড় পর্যন্ত ঠিক রাখতে পারত না। সুলায়মান তাদের প্রতি তাকিয়ে এ কথা কয়টি আবৃত্তি করলেন। আমার সন্তানগণ ছোট ছোট তারা যদি বড় হতো তবে আমি সফল হতাম। এতে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ পবিত্র কুরআনের আশ্রয় গ্রহণ করলেন এবং পাঠ করিলেন-
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّى -
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আত্মশুদ্ধি লাভ করে আল্লাহর স্মরণ করে নামায পড়ে সেই সফল হয়েছে।

সুলায়মান রেজাকে পুনরায় আদেশ করলেন যে, আমার পুত্রগণকে অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত করে আমার নিকট নিয়ে আস। তারপর যখন তাদেরকে আনা হল, তখন দেখা গেল যে তাদের কোমরে বাঁধা তরবারী মাটি স্পর্শ করছে।

ইবনে সাদ বলেন, রেজা বিন হায়াত বলেছেন, শুক্রবার দিন সুলায়মান সবুজ রঙের রেশমী কাপড় পরিধান করলেন। তারপর আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে আক্ষেপ করে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি একজন যুবক বাদশাহ। তারপর লোকের সাথে জুমার নামাযে শরীক হবার জন্য বের হলেন। নামায হতে ফিরে এসে তিনি কঠিন রোগে আক্রান্ত হলেন এবং একটি অছিয়তনামায় তিনি তার অল্প বয়স্ক পুত্র আয়্যুবকে খেলাফতের পরবর্তী উত্তরাধিকারী মনোনীত করলেন। এতে আমি নিবেদন করলাম, আমীরুল মোমিনীন! যে খলিফা কোন যোগ্য লোককে তার স্থলাভিষিক্ত মনোনীত না করে যায়, তিনি কিরূপে কবরে শান্তি ও নিরাপত্তার আশা করতে পারেন? সুলায়মান বললেন, আমি আল্লাহর কিতাব দ্বারা এস্তেখারা করব এবং আরও চিন্তা ভাবনা করব। এভাবে এক দুই দিন চলে গেল।

অবশেষে তিনি তার পূর্ব লিখিত অছিয়তনামাটি ছিড়ে ফেললেন এবং আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, দাউদ ইবনে সুলায়মান সম্পর্কে তোমার কি ধারণা? আমি বললাম, তিনি আছেন কনষ্টান্টিনোপলে। আপনি জানেন না যে, তিনি কি জীবিত আছেন না ইন্তেকাল করেছেন। সুলায়মান পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, তবে তোমার মতামত কি? আমি বললাম, মতামতের অধিকারী তো আপনিই। আমার কর্তব্য হল আপনার মতামত সম্পর্কে চিন্তা করা ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যথাযথ বাস্তবায়িত করা।

সুলায়মান বললেন, ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সম্পর্কে তোমার কি ধারণা? আমি বললাম, তিনি একজন সৎ ও যোগ্য লোক। সুলায়মান বললেন, তোমার কথা সঠিক। তিনি যথার্থই একজন সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি। কিন্তু যদি আমি তাঁকে খলিফা মনোনীত করি এবং আব্দুল মালেকের সন্তানদের মধ্যে কাউকেও খলিফা মনোনীত না করি তবে খুব গোলমাল হবে এবং ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাদের উপর শাসন পরিচালনা করুক, তারা এটা কখনও সহ্য করবে না। কিন্তু যদি ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পর তাদের কাউকে খলীফা মনোনিত করে যাই তবে হয়ত তারা এটা মেনে নিতে পারে। ইয়াযিদ ইবনে আব্দুল মালেক এখন রাজধানীতে উপস্থিত নেই। আমি তাকেই ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পরবর্তী খলীফা মনোনীত করছি। এতে সে কিছুটা শান্ত্বনা লাভ করে আমার মনোনয়নে রাজী হতে পারে। আমি বললাম, আপনার মতামত যথার্থ এবং মতামত প্রকাশের জন্য আপনার সম্পূর্ণ অধিকার আছে।

ইবনে সা'দ বলেন ইবনে জাওযি, ইবনে কাছীর, ইবনে হাকام ও তাবারীসহ প্রায় সকল ঐতিহাসিকই এ ব্যাপারে এক মত যে, এই রেজা বিন হায়াতই ওমর ইবনে আবদুল আজিজের খেলাফতের পক্ষে সুলায়মানকে উৎসাহিত করেছিলেন। তিনি যদি আয়্যুবের মনোনয়নে আপত্তি না করতেন, যদি সুলায়মানকে কবরের শাস্তি সম্পর্কে ভয় না দেখাতেন তবে ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের মনোনয়নের ব্যাপারে বাধার সৃষ্টি হতো।

ইবনে হাকام ও ইবনে সাদের বর্ণনা যদিও পরস্পর বিরোধী, তবুও তারা উভয়েই স্বীকার করছেন যে, রেজা বিন হায়াতই হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে খলীফা মনোনিত করার জন্য সুলায়মানকে সম্মত করিয়েছিলেন।

রেজা বিন হায়াত খুব দৃঢ় ব্যক্তিত্বশীল, সংকল্পে অটল ও বিশেষ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন উজির ছিলেন এবং কারো ব্যক্তিত্বে তিনি আকৃষ্ট হতেন না। তিনি খুবই বিচক্ষণতার সাথে কাজ করে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের প্রতি সুলায়মানের মন আকৃষ্ট করেছিলেন।

ইবনে সা'দ পূর্ববর্তী ঘটনাবলি ছাড়াও এক বর্ণনায় বলেছিলেন যে, রেজা বিন হায়াত ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে খলীফা মনোয়নের জন্য নিজের পক্ষ হতে সুলায়মানকে পরামর্শ দিয়েছেন।

ইবনে জাওযি ইমাম শাফী (র) এর একটি কথা বর্ণনা করেছিলেন যে,
إِنسَى لَأَرْجُوا أَن يُدْخِلَ اللَّهُ سُلَيْمَانَ بْنِ عَبْدِ الْمَالِكِ الْجَنَّةَ يَا شَيْئَمَالُهُ عَمَرَ بْنَ عَبْدِ الْعَزِيزِ -
অর্থাৎ আমি আশা করি যে, আল্লাহপাক সুলায়মানকে এ জন্যই জান্নাতে স্থান দিবেন যে, তিনি ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে খলিফা মনোনীত করেছিলেন।

রেজা বিন হায়াতের পরামর্শক্রমেই সুলায়মান ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের পক্ষে মনোয়ন পত্র লিখেছিলেন।

ঐতিহাসিক ইবনে সা'দ সুলাইমানের উজীরে আজম রেজা বিন হায়াতের মৌখিক ভাষ্যটি এরূপে বর্ণনা করেছেনঃ

সুলাইমান অছিয়তনামাটি লিপিবদ্ধ করে তাতে সীল মোহর করলেন এবং দেহরক্ষী প্রধান কাব ইবনে হামেদুল আইসীকে ডেকে তাঁর বাড়ীর লোকজনকে একত্রিত করতে আদেশ দিলেন। কাব বনু উমাইয়্যার লোকজনকে ডেকে একত্রিত করল। তখন খলিফা সুলাইমান রেজাকে বললেন, তুমি আমার লিখিত চিঠিসহ তাদের নিকট গিয়ে বল যে, এটা আমার লিখিত অছিয়তনামা এবং তাদেরকে এটা মেনে নিতে এবং এতে আমি যাকে খলিফা হিসেবে মনোনীত করেছি তার আনুগত্য স্বীকার করতে দাও। তারপর যখন প্রধানমন্ত্রী রেজা তার কথামত তাদের নিকট গিয়ে উক্ত নির্দেশ দিলেন, তখন তারা বলল, আমরা আমিরুল মুমিনীনের নিকট গিয়ে তাঁকে সালাম করতে চাই। রেজা বিন হায়াত তাদেরকে অনুমতি দিলেন। তারা যখন সুলাইমানের নিকট উপস্থিত হল, তখন সুলাইমান তাদেরকে উক্ত অছীয়তনামার প্রতি ইঙ্গিত করলেন, তারা তার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে খলীফা তাদেরকে বললেন, এটাই আমার অছীয়তনামা, আমার নির্দেশ মেনে নাও এবং আমি যার জন্য খেলাফতের অছীয়ত করেছি তার আনুগত্য স্বীকার করে তারপর তা একের পর এক কর। সকলেই বায়আত গ্রহণ করল। তারপর প্রধান মন্ত্রী রেজা বিন হায়াত সেই সীল মোহরকৃত অছীয়তনামা নিয়ে বাইরে আসলেন।

রেজা বিন হায়াত আরো বলছেন যে, যখন সমস্ত লোক চলে গেল, তখন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ আমার নিকট এসে বললেন, আমার সন্দেহ হয় যে, এ অছীয়তনামাতে আমার সম্পর্কে কিছু লেখা হয়েছে। তিনি আরো বললেন, রেজা! "তোমার প্রতি আল্লাহ সদয় হোন" তুমি আমার বন্ধুত্বের প্রতি লক্ষ্য করে এ সম্পর্কে আমাকে কিছু জানাও। যদি আমার সন্দেহই সঠিক হয়, তবে তুমি বল আমি এখনই পদ হতে ইস্তফা দিয়ে মুক্তিলাভ করি। কারণ এখনও সময় আছে। রেজা বিন হায়াত বললেন, এ সম্পর্কে আমি আপনাকে কোন কিছুই বলতে পারব না। এ কথা শুনে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ রাগ করে সেখান হতে চলে গেলেন।

রেজা বিন হায়াত বলেন, এরপর হিশাম ইবনে আব্দুল মালেক আমার সাথে সাক্ষাৎ করে বলল, “রেজা! তুমি আমাকে এ অছীয়তনামার বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানাও।”

যদি এতে আমার সম্পর্কে কিছু বলা হয়ে থাকে তবে এখন হতেই আমি তা জেনে নিলাম, আর যদি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকেও এ কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়ে থাকে, তবে এখনই তার প্রতিবাদ করব। কারণ আমার মত লোক এরূপ অন্যায় অবিচার নীরবে মেনে নিতে পারে না।

রেজা বিন হায়াত গোপন রহস্য উদঘাটন করতে দৃঢ়তার সাথে অস্বীকার করলেন। হিশাম নিরাশ হয়ে ফিরে গেল এবং এক হাত দিয়ে অপর হাতে মারতে মারতে বলতে লাগল, "যদি খেলাফতের দায়িত্ব আমি না পাই, তবে আব্দুল মালেকের বংশে আর কে আছে?

রেজা বিন হায়াত আরো বলেন, এরপর আমি সুলাইমানের নিকট এসে দেখি তিনি মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। আমি তাকে কেবলমুখী করে দিলাম। তখন তিনি বললেন, যদি তুমি তাদের নিকট হতে দ্বিতীয়বার বায়আত না নাও তবে তারা মানবে না। তারপর সুলাইমান আশহাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু" বলতে বলতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।

রেজা বিন হায়াত বলেন আমি সবুজ রঙ্গের একটি চাদর দিয়ে তাঁর দেহ আবৃত করে দরজা বন্ধ করে দিলাম। তাঁর স্ত্রী সংবাদ বাহক পাঠিয়ে তার অবস্থা অবগত হতে চাইলেন। আমি বললাম, খলীফা এখন ঘুমন্ত অবস্থায় আছেন। সংবাদ বাহক চাদর দিয়ে খলিফার দেহ আবৃত দেখে তাঁর স্ত্রীকে এই সংবাদই দিল। বেগম সাহেবাও তার কথা সত্য বলে বিশ্বাস করলেন। আমি উক্ত সংবাদবাহককে দরজায় দাঁড় করিয়ে তার নিকট থেকে অঙ্গিকার নিলাম যে, সে কাউকে এখানে আসতে অনুমতি দেবে না। তারপর আমি সেখান হতে বের হয়ে কাব ইবনে হামিদুল আইসীর নিকট লোক পাঠালাম এবং খলিফা পরিবারের সমস্ত লোকজনকে "মসজিদে ওয়াবিতে” হাজির করার ব্যবস্থা করলাম এবং তাদেরকে বললাম যে, তোমরা অছিয়ত নামার প্রতি বায়আত কর। তারা বলল, আমরা তো একবার বায়আত করেছি আবার কেন? তুমি কি দ্বিতীয় বার আয়আত গ্রহণ করতে চাও? আমি বললাম এটা আমিরুল মুমিনীনের অছিয়তনামা। প্রতিশ্রুতি দাও যে, এ মোহরকৃত অছীয়তনামায় যাকে খলিফা হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে, তোমরা তার আনুগত্য স্বীকার করবে। তখন একে একে তাদের সকলেই দ্বিতীয় বার বায়আত করল।

রেজা বিন হায়াত বলেন, যখন সকলেই দ্বিতীয় বায়আত করল, তখন আমি মনে করলাম যে, এখন কথা মজবুত হয়ে গিয়েছে, কাজেই তাদেরকে খলিফার মৃত্যু সংবাদ জানিয়ে দেওয়া উচিত। তখন আমি বললাম, তোমরা সকলেই দাঁড়িয়ে যাও, শোন তোমাদের খলিফা ইন্তেকাল করেছেন। এরপর আমি সীলমোহরকৃত চিঠি খুলে সকলের সামনে পাঠ করতে লাগলাম, কিন্তু যখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নাম ঘোষণা করলাম, তখন হিশাম ইবনে আব্দুল মালেক চিৎকার করে বলতে লাগল, আল্লাহর কসম! আমি তার বায়আত করব না। আমিও চিৎকার করে বললাম, আল্লাহর কসম! তুমি বায়আত না করলে আমি এখনই তোমাকে হত্যা করব। উঠ, বায়আত কর। তারপর সে বাধ্য হয়ে উঠলো। তখন সে দু' পা ফরাশের উপর মারছিল এবং ইন্না লিল্লাহে ওয়াইন্না ইলাহি রাজিউন পড়ছিল। আমি ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে বললাম, উঠুন! মিম্বরে আরোহন করুন। তিনি অত্যন্ত বিরক্তির সাথে ইন্না লিল্লাহে ওয়াইন্না ইলাহি রাজিউন বলতে বলতে মিম্বরে আরোহন করে বললেন; এমন হল কেন?

রেজা বিন হায়াত আরো বলেন, যখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ মিম্বরে আরোহন করলেন এবং হিশাম ইবনে মালেক ইন্না লিল্লাহি বলতে বলতে বায়আত করতে আসল, তখন যে ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে বলল, আফসুসের বিষয়- আব্দুল মালেকের সন্তানরা বঞ্চিত হল আর তোমাকে খলিফা মনোনীত করা হল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ উত্তরে বললেন হ্যাঁ আমিত কখনও এটা কামনা করিনি, বরং অপছন্দই করতাম। আবার তিনি ইন্না লিল্লাহি পাঠ করলেন। এরপর সুলায়মানের কাফন দাফনের ব্যবস্থা করা হল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ জানাযার নামায পড়ালেন। আল্লামা সাদ, তাবারী ইবনুল জাওযী ও ইবনে কাছীর যে বর্ণনা প্রদান করেছেন তা দ্বারা স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়েছে যে, সুলায়মান ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে যেরূপ প্রীতির চোখে দেখতেন তাতেই তিনি সন্দেহ প্রবণ হয়ে পড়লেন যে, হয়তঃ তাকেই খেলাফতের জন্য মনোনয়ন করা হয়েছে। কিন্তু তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলনা, কাজেই তিনি রেজা বিন হায়াতের মাধ্যমে দৃঢ় অবগতির পর পদ হতে ইস্তফা দিয়ে মুক্তি লাভ করতে চেয়েছিলেন, অন্যথায় তিনি এরূপ করতেন না। ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের খেলাফতের ঘটনা বর্ণনা করে অন্যান্য ঐতিহাসিকদের হাতে কিছুটা ভিন্ন ধরণের সূক্ষ্ম তথ্য সংযোজন করেছেন। তিনি বলেন যে, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ পূর্ব হতেই অবগত ছিলেন এবং রেজা বিন হায়াতের নিকট এসে তাকে তার বন্ধুত্ব ও আল্লাহর রহমতের দোহাই দিয়ে কোন মতে এ পদ হতে ইস্তফা গ্রহণ করে তাকে মুক্তি দেয়ার জন্য রেজা বিন হায়াতকে উদ্বুদ্ধ করতে চাইলেন। কিন্তু রেজা বিন হায়াত কোন মতে তাতে রাজী হলেন না।

ইবনে খালদুনের এ বর্ণনায় বুঝা যায় যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ পূর্বেই জানতে পেরেছিলেন এবং পদ হতে ইস্তফা দিয়ে মুক্তি লাভ করতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে রেজা বিন হায়াতই ছিল তার একমাত্র প্রতিবন্ধক।

যা হোক আমাদের ধারণা সম্পূর্ণ সত্য যে, রেজা বিন হায়াতই হযরত ইবনে আব্দুল আজিজকে খেলাফতের পদ গ্রহণের জন্য রাজী করেছিলেন। এ ব্যাপারে ইবনে সাদের এ বর্ণনাটিও বিশেষ প্রাণিধান যোগ্য। রেজা ইবনে হায়াত বলেন যে, যখন সুলায়মান ইবনে আবদুল মালেকের মৃত্যুযন্ত্রণা বৃদ্ধি পেতে লাগলো, তখন আমি অস্থিরভাবে ঘরের ভিতর বাইরে আসা যাওয়া করতে লাগলাম। এই অবস্থায় ওমর ইবনে আবদুল আজিজ আমাকে ডেকে বললেন, রেজা তুমি আমার পরম হিতৈষী বন্ধু, তোমাকে ইসলাম ও আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, যদি প্রসঙ্গক্রমে খলীফার সামনে আমার আলোচনা উঠে এবং যদি তিনি তোমার পরামর্শ চান, তবে অনুরোধ করে আমার পক্ষ হতে তার দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে দিও। আমি তোমার জন্য আল্লাহপাকের নিকট দোয়া করব। কারণ এ ব্যাপারে তোমার পরামর্শই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

রেজা বিন হায়াত বলেন, আমি ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে তিরস্কার করে বললাম, তুমি তো কম লোভী নও! তোমার ইচ্ছা যে, আমি তোমাকে খলীফা মনোনীত করার জন্য সুলায়মানের নিকট সুপারিশ করি। এতে ওমর ইবনে আজীজ খুব লজ্জিত হয়ে চলে গেলেন। আমিও ভিতরে চলে গেলাম।

তখন সুলায়মান বললেন, তুমি কাকে খলীফা মনোনীত করতে পরামর্শ দাও এবং তার সম্পর্কে অছীয়তনামা লিখতে বল? আমি বললাম আমিরুল মুমিনীন, আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। কেননা, আপনি এখনই আল্লাহর সাথে মিলিত হতে যাচ্ছেন। তিনি আপনাকে এব্যপারে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।

সুলায়মান বললেন, তবে তোমার ইচ্ছা কি? তখন আমি ওমর ইবনে আবদুল আজীজের নাম প্রস্তাব করলাম। সুলায়মান এ বলে প্রতিবাদ করলেন যে, তবে আব্দুল মালেকের অছীয়তনামার কি হবে? তিনি আমার নিকট তার জীবিত সন্তানদের ব্যাপারে এবং ওয়ালিদের নিকট হতেও এ প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। আমি বললাম, তাদের কাউকেও ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পরবর্তী খলীফা মনোনীত করে দেন, কোন ঝামেলা থাকবে না। সুলায়মান আমার কথা সম্পূর্ণ রূপেই বুঝতে পারলেন এবং বললেন, তুমি ঠিকই 'বলেছ, কাগজ কলম নাও। আমি কাগজ কলম এনে দিলাম, তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পক্ষে খেলাফতের অছিয়তনামা লিখে দিলেন।

ইবনে সা'দের অপর এক বর্ণনায় স্পষ্টই জানা যায় যে, ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ খেলাফতের পদ লাভের জন্য মোটেই আশা করতেন না। তিনি অছীয়তনামা শুনে শপথ করে বললেন যে তিনি কখনও খেলাফতের পদ লাভের আশা করেননি। তার বক্তব্য ছিল এই وَاللَّهِ مَا أَرَدْتُ بِهِنَا আল্লাহর কসম! কখনও আমি এর আশা করিনি।

ইবনে আব্দুল হাকام এ ঘটনাটি যদিও খুব সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু এতে কিছু নতুন তথ্য যোগ করা হয়েছে। তার ভাষ্যটি এরূপ-

১। তারপর সুলাইমান যখন মৃত্যুমুখে পতিত হলেন, তখন রেজা বিন হায়াত তাঁর মৃত্যুর সংবাদ গোপন করে লোকদের কাছে গমন করে বললেন, খলিফা তোমাদেরকে অছীয়ত নামায় লিখিত ব্যক্তি সম্পর্কে নতুনভাবে বায়আত করতে নির্দেশ দিয়েছেন।

২। রেজা বিন হায়াতের এ কথা শুনে তারা বলল, আমাদেরকে খলিফার কাছে নিয়ে চলুন। তখন রেজা ভিতরে প্রবেশ করে মৃত খলিফাকে বালিশের সাহায্যে সোজা করে বসিয়ে দিলেন এবং একজন খাদেমকে তাঁর নিকট দাঁড় করিয়ে তিনি নিজে বাইরে আসলেন এবং লোকজনকে ভিতরে প্রবেশ করতে বললেন। লোকেরা ভিতরে গিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে দূর হতেই তাঁকে দেখছিল এবং সালাম করে বের হয়ে যাচ্ছিল। তখন একজন খাদেম রোগীর ন্যায় খলিফার গায়ের চাদর এদিক-ওদিক করছিল।

৩। রেজা বিন হায়াত তখন লোকদেরকে মসজিদে একত্রিত করলেন, তখন খলিফা পরিবারের লোকজনের সাথে অন্যান্য গণ্যমান্য লোকেরাও একত্রিত হয়েছিল এবং তারা সকলেই এক সঙ্গে অছীয়তনামায় নির্দেশিত ব্যক্তির প্রতি বায়আত করলেন।

৪। তারপর যখন অছীয়তনামা পাঠ করা হল, তখন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের নাম শুনে হিশাম ইবনে মালেককে উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠল, তখন একজন সিরিয়বাসী যুবক তরবারী উত্তোলন করে হিশাম ইবনে মালেককে ধমক দিয়ে বলল, “খলিফার অছীয়ত-নামা পড়া শেষ হোক, তারপর তুমি চিৎকার করবে।"

তারপর ইয়াজিদ ইবনে আব্দুল মালেকের নাম শুনে হিশাম বলল, আমরা শুনলাম এবং আনুগত্য স্বীকার করলাম। এরপর সকলে উঠে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের হাতে বায়আত করল।

এ ব্যাপারে ইবনুল জওযিও একটি মূল্যবান তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, হিশাম ইবনে মালেক বলল, আমি তখনই এ অছীয়তনামা মেনে নেব, যখন আমি জানতে পারব যে, তাতে আব্দুল মালেকের সন্তানদের অধিকার স্বীকার করা হয়েছে। লোকেরা তার এই কথার জন্য তাকে তিরস্কার করল এবং সে ভীষণ লজ্জা পেল। তখন সমস্ত লোক সামি'না ওয়া আতা'না অর্থাৎ আমরা আনুগত্যের শপথ করলাম বলে নতুনভাবে বায়আত করল। যখন রেজা ইবনে হায়াত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ মিম্বরে দাঁড়াতে অনুরোধ করলেন। তিনি মিম্বরের নিকটেই ছিলেন, তিনি বললেন, "আল্লাহর কসম”! আমি প্রকাশ্য বা গোপন কোনভাবেই এর আশা করিনি।

ইবনুল জাওযি আরো বলেন, এ দ্বিতীয় বায়আতের পর সুলাইমানকে দাফন করে যখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ মসজিদে আসলেন, তখন মিম্বরে আরোহণ করে বললেন, হে লোক সকল! আমাকে আমার মতামত ও ইচ্ছা ছাড়াই খেলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে সাধারণ মুসলিম জনতার কোন পরামর্শ গ্রহণ করা হয়নি। অতএব আমি তোমাদেরকে আমার বায়আত হতে মুক্তি দিলাম। তোমরা স্বাধীনভাবে যাকে ইচ্ছা খলীফা নির্বাচন কর। সমস্ত লোক সমস্বরে চিৎকার করে বলে উঠল, আমরা আপনাকেই খলিফা মনোনীত করেছি, আমরা আপনাকেই খলিফা মনোনীত করেছি। আমরা আপনার প্রতি সন্তুষ্ট।

📘 ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ > 📄 প্রথম পদক্ষেপ

📄 প্রথম পদক্ষেপ


হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সুলায়মানের জানাযায় নামায পড়িয়ে যখন তাকে দাফন করলেন তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ অন্য কোন কাজ করার পূর্বেই দোয়াত-কলম আনিয়ে সর্বপ্রথম তিনটি নির্দেশ প্রদান করলেন।

লোকজন তাঁর ব্যস্ততায় কানাঘোষা করতে লাগল। কেউ কেউ বলল, "এতো তাড়াহুড়া কেন, এ কাজ তো তিনি ঘরে ফিরেও করতে পারতেন। মনে হয় খেলাফতের লোভ-লালসায় তাঁকেও পেয়ে বসেছে।

ইবনুল হাকام বলেন, খেলাফতের লোভ-লালসার কারণেই ওমর ইবনে আবদুল আজিজ দোয়াত-কলম আনার ব্যবস্থা করেননি, বরং তিনি নিজেই নিজের পর্যালোচনা করেছেন এবং এই অবহেলাও তার অনুভুতি এবং কর্তব্য পরায়ণতার প্রতিকূলে ছিল বলেই তিনি এরূপ ব্যস্ততা প্রকাশ করেছিলেন।

এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, ওমর ইবনে আবদুল আজিজের এ ব্যস্ততার কারণ কর্তব্যপরায়ণতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কেননা, যদি তিনি বাদশাহী পছন্দ করতেন, যদি তিনি বাদশাহীর উপকরণাদি লাভ করতে ভালবাসতেন তবে ওয়ালিদ বা সুলাইমানের যুগে প্রকাশ্যে না হোক গোপনে হলেও এর জন্য কোন প্রচেষ্টা চালাতেন। অথচ বাস্তব ও সত্য কথা হলো ঐতিহাসিক ইবনে আব্দুল হাকام স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, সমগ্র বনু উমাইয়ার মধ্যে ওয়ালিদ ও সুলায়মান ব্যতীত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বনু উমাইয়ার সকলের নিকটেই প্রিয়পাত্র ছিলেন। তিনি দেশব্যাপী উলামা, ফুকাহা এবং মুহাদ্দেসিন -সকলের নিকটেই প্রশংসনীয় ছিলেন। তদুপরি মিশর ও আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকায় তাঁর যথেষ্ট সংখ্যক ভক্ত-অনুরক্ত ছিল। তিনি ইচ্ছা করলে ওয়ালিদ বা সুলায়মানের যুগেও মিশরে স্বাধীনভাবে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। কারণ তৎকালীন তিনজন নামকরা সেনাপতি মোহাম্মদ ইবনে কাসেম, মূসা ইবনে নাছীর এবং কুতাইবা ইবনে মুসলিম ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পরম ভক্ত ছিল। বিশেষতঃ মূসা ও কুতাইবা তাঁর ইশারায় লাখ লাখ সৈন্যসহ ময়দানে হাজির হতে দ্বিধাবোধ করত না।

মূসা ইবনে নাছীর সম্পর্কে ঐতিহাসকদের ধারণা হলো, মূসার সাথে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পিতা আব্দুল আজিজের বন্ধুত্ব ছিল। ওমরের সাথেও মূসার সম্পর্ক সেরূপ ঘনিষ্ট ছিল। কারণ মূসা যখন ইরাকের মন্ত্রী ছিলেন, তখন খলীফা আব্দুল মালেকের রোষে পড়ে তিনি কুফা হতে পালিয়ে মিশরে আব্দুল আজিজের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। এটা জানতে পেরে আব্দুল মালেক তার ভাই আব্দুল আজিজকে লিখলেন যে মূসা পলাতক ব্যক্তি-তাকে দামেশকে পাঠিয়ে দেয়া হোক। কিন্তু আব্দুল আজিজ কোন পরওয়াই করলেন না। বরং তাকে তিনি আফ্রিকার শাসনকর্তা নিযুক্ত করে সেখানকার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করে দিলেন। মূসাও সেই সুযোগে বিপুল পরিমাণে শক্তি বৃদ্ধি করে নিলেন।

সুলাইমান তার অভিষেকের সময় যখন মূসাকে গ্রেফতার করেন, তখন ওমর ইচ্ছা করলে মূসাকে স্বপক্ষে আনতে পারতেন এবং মূসাও তার সমর্থন পেলে এমন এক বিদ্রোহ ঘটাতে পারতেন যার ফলে সুলাইমান কেন, সমগ্র বনু উমাইয়ার নাম-নিশানা পর্যন্ত মুছে যেত। কিন্তু ওমর ইবনে আবদুল আজিজ এমনটা করলেন না।

যদি তিনি খেলাফত পরিচালনার লোভ করতেন তবে কুতাইবা ইবনে মুসলিম- যিনি প্রাচ্যের মহান বিজেতা ছিলেন, তার দ্বারাও তিনি সে দিনই খেলাফতের পতাকা উড্ডীন করতে পারতেন, যেদিন দামেশকে সুলাইমানের খেলাফতের সাধারণ বায়আত গ্রহণ করা হয়েছিল। ইবনে কাছীর স্পষ্ট ভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, ইয়াজিদ ইবনে মুহারিবের কারণে কুতাইবা সুলায়মানের প্রতি বিরূপ ভাবাপন্ন ছিলেন। তিনি সুলায়মানকে পদচ্যুত করার জন্যে এক বিরাট সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন। যদি ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ গোপনে ও একজন সংবাদ বাহকের মাধ্যমে তাকে কোন ইঙ্গিত দান করতেন যে সুলাইমানের পরিবর্তে তুমি আমার বায়আত গ্রহণ কর তবে কুতাইবা তাঁর এতটুকু ইশারায় তার খেলাফতের পতাকা উড্ডীন করে দিতেন। এবং তার এ কর্মতৎপরতায় কেউ বাধা দিতে সাহস পেত না। তিনি প্রকাশ্যে রাজধানী দামেস্কে এসে উপস্থিত হতেন, আর একজন উমুবী যুবরাজের পৃষ্ঠপোষকতাই তাকে তাঁর এ সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দিত।

কিন্তু ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ খেলাফতের মসনদকে শুধু কণ্টকাপূর্ণ নয় বরং অগ্নিস্ফুলিঙ্গ পূর্ণ শয্যা মনে করতেন। তিনি বলতেন, যে ব্যক্তির ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র ও স্বাধীনতা থাকে, সে খলিফা নিযুক্ত হবার পর তার সেই অধিকারটুকুও খর্ব হয়ে যায়।

যা হোক, তাঁর এরূপ কর্তব্যপরায়ণতাই সুলাইমানের জানাযার পর তাঁকে তিনটি ফরমান জারি করতে বাধ্য করেছিল। তন্মধ্যে প্রথম ফরমান ছিল মুসলিমা ইবনে আব্দুল মালেককে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে।

বিখ্যাত ঐতিহাসিক তাবারীর মতে, সুলাইমান ইবনে আব্দুল মালেক তার ভাই মুসলিমাকে ৯৮ হিজরীতে কনষ্টান্টিনোপলে প্রেরণ করে নির্দেশ দিয়েছেন যে, কনষ্টান্টিনোপল জয় না করা পর্যন্ত সে সেখানেই অবস্থান করবে, পরবর্তী নিদের্শ না পাওয়া পর্যন্ত সে ফিরে আসতে পারবে না।

মুসলিমা যখন সেখানে গিয়ে কনষ্টান্টিনোপুলের নিকটবর্তী হলেন, তখন তিনি প্রত্যেক অশ্বরোহীকে দুই মণ গম সঙ্গে নিতে নির্দেশ দিলেন। অশ্বরোহী সৈনিকগণ তাঁর নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করল এবং তারা কনষ্টান্টিনোপুলের নিকটে গমের একটি পাহাড় সৃষ্টি করে দিল। মুসলিমা তাদেরকে এ গম খেতে নিষেধ করলেন এবং রোমানদের ভান্ডার লুণ্ঠন করে এবং তাঁদের কৃষিক্ষেত্রে চাষ করা খাদ্য সংগ্রহ করতে নির্দেশ দিলেন।

সৈন্যবাহিনী কাঠ-খড় দ্বারা সেখানেই ঘর-বাড়ী নির্মাণ করে কৃষিকাজ শুরু করে দিল। তাদের কৃষিক্ষেত্রে ফসল উৎপন্ন না হওয়া পর্যন্ত তারা লুটতরাজ করে তাদের খাদ্য সংগ্রহ করতো। যখন তাদের কৃষি ক্ষেত্রে ফসল উৎপন্ন হল তখন পূর্বের খাদ্য সংরক্ষণ করে উৎপন্নদ্রব্য তারা খেতে লাগল।

তাবারী বলেন, বাহ্যতঃ মুসলিমার এ কর্মসূচী খুবই উত্তম ছিল। কিন্তু রোমানগণ চালাকী করে তাদের এ কর্মসূচী সম্পূর্ণরূপে ভন্ডুল করে দিল। রোমান সেনাপতি এক রাত্রিতে অর্তকিতে আক্রমণ করে মুসলমানদের নতুন ও পুরাতন উভয় শষ্য ভান্ডারে আগুন ধরিয়ে দিল। সমস্ত শষ্য ভান্ডার পুড়ে ভষ্ম হয়ে গেল। এখন সুলাইমানের সৈন্যবাহিনী খাদ্যের বিরাট সংকটের সম্মুখীন হয়ে মৃত্যুবরণ করতে লাগল।

মুসলমানরা খাদ্যের অভাবে তাদের বাহনের জন্তগুলি খেয়ে অবশেষে বৃক্ষের মূল ও পাতা খেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে লাগল। সুলাইমান যথারীতি এ সংবাদ অবগত হয়ে এর কোন প্রতিকার করলেন না। তিনি অত্যন্ত একগুঁয়ে ছিলেন। তিনি ওয়াবেক নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু মুসলমান সৈন্যবাহিনীকে কনষ্টান্টিনোপুল ত্যাগ করতে অনুমতি দিলেন না। তাবারী এ ঘটনা উল্লেখ করে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা বাস্তবিকই করুণ ও মর্মান্তিক। তিনি বলেন, তারা অনাহারে তাদের বাহনের সমস্ত পশু খেয়ে ফেলল, মাটি ব্যতিত গাছের শিকড় ও পাতাসহ সবকিছুই তারা ভক্ষণ করছিল, অথচ সুলাইমান ওয়াবেকে অবস্থান করেও এর কোন প্রতিকার বিধান করতে এগিয়ে আসলেন না। এভাবেই শীতকাল এসে পড়ল এবং সুলায়মান মৃত্যুমুখে পতিত হলেন।

ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, রোমানরা যখন মুসলমানদের সাথে প্রবঞ্চনা করে তাদের খাদ্যসামগ্রী জ্বালিয়ে দিল এ সংবাদ শুনে সুলাইমান খুবই রাগান্বিত হয়ে কসম করলেন যে, তিনি মুসলিমাকে আর ফেরত আনবেন না।

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট এটা একটি নিবর্তনমূলক কসম ছিল, কাজেই তিনি সুলাইমানের জানাযা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এ কসম ভঙ্গ করে মূহুর্তকাল বিলম্ব না করেই মুসলিমাকে দেশে ফিরে আসতে নির্দেশ দিলেন। তিনি লিখলেন তুমি ফিরে আস। এবং সমস্ত সৈন্যবাহিনীকে দামেস্কে ফিরিয়ে আন।

সুলায়মানের জীবিত অবস্থায় যখন তিনি মুসলমানদের এ দুঃখ কষ্টের কথা জানতে পারলেন তখন সুলায়মান একগুঁয়েমিতে অবিচল ছিলেন কিন্তু ওমর ইবনে আবদুল আজিজ অত্যন্ত বিচলিত ও মর্মাহত হয়েছিলেন।

ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, এটা ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে বিচলিত ও মর্মাহত করেছিল অতঃপর তিনি খেলাফতের পদ লাভ করার পর এক মূহুর্তও মুসলমানদের দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে পারলেন না। এ কারণেই তিনি পত্র লিখতে ব্যস্ততা প্রকাশ করেছিলেন।

তিনি দ্বিতীয় যে পত্র লিখেছিলেন তা প্রথম পত্র অপেক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি এ পত্রের মাধ্যমে মিশরের রাজস্ব সচিব উসামা ইবনে যায়েদ আত্মানুহীকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। তিনি আরো নির্দেশ দিলেন যে, তাকে প্রত্যেক ঘাটিতে এক বছর করে বন্দী করে রাখা হোক।

ইবনে হাকام এ কঠোর নির্দেশের কারণ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন যে, সে ছিল একজন অত্যাচারী ও আল্লাহর সীমালঙ্ঘনকারী শাসক। সে মানুষকে আল্লাহর বিধানের বিপরীতে শাস্তি দিত। সে এমন সব অপরাধে মানুষের হাত কেটে দিত যাতে আল্লাহপাক অনুরূপ বিধান দেননি। সুতরাং ওমর ইবনে আবদুল আজিজের ন্যায় কর্তব্যপরায়ণ আল্লাহভীরু শাসনকর্তা এরূপ জালেম ও জল্লাদ কর্মকর্তাকে কিভাবে বরদাশত করতে পারেন? অতএব তিনি যথাশীঘ্র সম্ভব মুসলমানগণকে এরূপ পাপিষ্ট ব্যক্তির হাত থেকে মুক্তি দিতে ব্যস্ততার সাথে পত্র লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন।

তিনি তৃতীয় ফরমান লিখেছিলেন আফ্রিকার শাসনকর্তা ইয়াযিদ ইবনে আবু মুসলিমকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে। ইয়াযিদ ইবনে মুসলিম শাহী নির্দেশাবলী অতি কঠোরভাবে কার্যকরী করত, মানুষের উপর সীমাহীন জুলুম-অত্যাচার করত, মানুষকে বিনা অপরাধে শাস্তি দিত। অথচ সে যথারীতি আল্লাহর যিকির ও তসবীহ তাহলীলও পাঠ করত। সে যখন কাউকে শাস্তি দিত তখন তার গোলামকে আদেশ দিত, সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, হে বালক! তার শরীরের অমুক অমুক স্থানে জোরে জোরে আঘাত কর। কখনো কখনো লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ আল্লাহু আকবার ধ্বনী করে এসব নির্দেশ দিত।

বাস্তবিক পক্ষে এটা আল্লাহর যিকির ও ইসলামের প্রতি বিদ্রূপেরই নামান্তর ছিল। সে যেন আল্লাহর নাম নিয়েই মানুষের উপর জুলুম অত্যাচার করত এবং মানুষকে শান্তি দিত।

এ তিনটি ফরমান লিখে যখন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সুলায়মানের কবরস্থান হতে উঠে আসলেন, তখন তাঁর জন্য শাহী সওয়ারী হাজির করা হল। তিনি এ সমস্ত সওয়ারী দেখে বললেন, এ সমস্ত কিসের সওয়ারী? উত্তর দেওয়া হল, এ নবনির্বাচিত খলিফার জন্য নির্ধারিত সওয়ারী। ইতোপূর্বে এসব বাহনে আর কেউ আরোহন করেনি। এতে নবনির্বাচিত খলিফা প্রথম দিন আরোহন করে থাকেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এসব সওয়ারী ফিরিয়ে দিয়ে তার নিজের খচ্চরের দিকে এগিয়ে চললেন এবং ব্যক্তিগত সেবক মুজাহিমকে বললেন, এ সমস্ত বায়তুল মালে নিয়ে যাও। এগুলি সাধারণ মুসলমানের সম্পদ।

ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, তাঁর জন্য এরূপ নতুন তাঁবু ও শামিয়ানা টানানো হল-যাতে ইতোপূর্বে আর কেউ তাতে বসবাস করেনি। এটাই সাধারণ প্রচলিত প্রথা ছিল। যে ব্যক্তি নতুন খলিফা নির্বাচিত হবেন তার জন্য এরূপ নতুন তাবুর ব্যবস্থা করা হত।

হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এ সমস্ত নতুন তাবু দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এগুলি কিসের তাবু? উত্তর দেওয়া হল, এ সমস্ত তাবুতে ইতিপূর্বে কারও বসার সৌভাগ্য হয়নি। কোন নবনির্বাচিত খলিফা খেলাফতের মর্যাদায় আসীন হবার পরই এসব তাবুতে অবস্থান করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ মুজাহিমকে বললেন, এগুলিও মুসলমানদের সম্পদ, এগুলোও বায়তুলমালে জমা করে দাও। এরপর তিনি তার খচ্চরে আরোহন করে সে সব বিছানার প্রতি অগ্রসর হলেন যা পূর্বনিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণ নতুন ছিল এবং যা ইতোপূর্বে আর কারও জন্য বিছানো হয়নি এবং কোন খলিফাও যাতে বসার সৌভাগ্য লাভ করেননি। মোটকথা এসব বিছানা সম্পূর্ণ নতুন ছিল শুধু অভিষেক অনুষ্ঠানের মর্যাদার খাতিরেই ঐসব ব্যবস্থা করা হয়েছিল। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বাহন হতে অবতরণ করে এ বিছানার নিকটবর্তী হয়ে তার হাতের ছড়ির অগ্রভাগ দিয়ে তা গুটিয়ে দিলেন এবং খালি চাটাই বের করে তাতে উপবেশন করলেন।

ইবনে আব্দুল হাকام বলেন, যখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ খলিফা হলেন তখন সমস্ত লোক তার সামনে দন্ডায়মান হল, তিনি উপস্থিত জনতাকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলেন, লোক সকল! তোমরা যদি আমার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে থাক তবে আমিও দাঁড়িয়ে যাব। যদি তোমরা বস আমিও বসব। মানুষ শুধু আল্লাহর সামনেই দাঁড়াবে। আল্লাহ মানুষের জন্য কিছু কাজ ফরযও কিছু কাজ সুন্নত করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এগুলি যথারীতি পালন করবে, সে সফলকাম হবে আর যে ব্যক্তি একথার প্রতি অবহেলা করবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে।

তোমাদের মধ্যে যে আমাদের সাহচর্যে আসবে তার পাঁচটি বিষয় অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে।

১। সে আমাদের নিকট তার সেসব প্রয়োজনীয় কথা পৌঁছাবে, আমরা যা অবগত নই।
২। আমাদেরকে এরূপ সুবিচারের প্রতি ধাবিত করবে- যা আমাদের দ্বারা হওয়া সম্ভব ছিল না।
৩। সত্যবাদিতার দিক দিয়ে সর্বদাই আমাদের সঙ্গী হবে।
৪। সবসময় আমাদের ও মুসলমান জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষা করবে।
৫। আমাদের নিকট কারও বদনাম না গীবত করবে না।
এই পাঁচটি বিষয় যে লক্ষ্য রাখবে না তার জন্য আমাদের দরজা বন্ধ থাকবে।

এ সম্পর্কে ইবনুল জাওযি মুহাম্মদুল মারুযির মাধ্যমে যে বর্ণনা করেছেন তাতে সুলায়মানের দাফন শেষ এবং খলিফার জন্য নতুন সওয়ারী হাজির করার বর্ণনায় কিছু অতিরিক্ত বিষয়ও বর্ণিত হয়েছে- তিনি বললেন, আমার বাহন আন। যখন তাঁর বাহনের জন্তুটি তাঁর নিকট উপস্থিত করা হল এবং তিনি তাতে আরোহন করলেন, তখন শহররক্ষী প্রধান এসে তার সামনে হাজির হল এবং খোলা তলোয়ার হাতে নিয়ে আগে আগে চলল। খলীফা তাকে বললেন, আমার সামনে হতে সরে যাও, তোমার কোন প্রয়োজন নেই। আমার নিকট তোমার কোন কাজও নেই। আমি একজন সাধারণ মুসলমান, একজন সাধারণ মানুষ মাত্র। তিনি চলতে লাগলেন। মানুষও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলল। তিনি মসজিদে এসে মিম্বরে আরোহন করে বসলেন, সমস্ত লোক তার চারদিকে জমায়েত হল। এরপর তিনি এই ভাষণ দিলেন,

হে লোক সকল! আমি তোমাদেরকে আল্লাহকে ভয় করার পরামর্শ দিচ্ছি। আল্লাহর ভয় সর্বপ্রথমে। আল্লাহর ভয় ব্যতীত কোন উপায় নেই। নিজের জীবন পরিপাটি করার জন্য যা কিছু প্রয়োজন মনে কর তবে যে ব্যক্তি পরকালের কাজ করে যায় আল্লাহ তার দুনিয়ার কাজ সঠিক করে দেন। যদি তোমরা তোমাদের অভ্যন্তরকে ঠিক রাখ তাহলে আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক দিক ঠিক রাখবেন। মৃত্যুকে বেশি স্মরণ কর। মৃত্যু যখন আসবে তখন তার জন্য উত্তমরূপে প্রস্তুত থাকা উচিত। মৃত্যু মানুষের জীবনের সমস্ত আনন্দ উপভোগ কেড়ে নেয়। এ উম্মত আল্লাহ ও তার রাসূল এবং আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে কোন মতবিরোধ করবে না। কিন্তু তারা ধন-সম্পদ নিয়ে ঝগড়া ফাসাদ করবে। আল্লাহর কসম, প্রাপ্য অধিকার ছাড়া আমি কাউকে কোন কিছুই দেবনা, কারও অধিকারে হস্তক্ষেপ করব না।

তারপর তার কণ্ঠস্বর আরও গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি বললেন, হে লোক সকল! যে আল্লাহর আনুগত্য করে মানুষের উপর তার অধীনতা স্বীকার করা ফরজ। যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করে মানুষের উপর তার আনুগত্য স্বীকার করা জায়েয নেই। আমি যদি আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করি তবে তোমরা আমার কথা মেনে চলবে আর যদি আল্লাহর নাফরমানী করি তবে তোমরাও আমার কথা অমান্য করবে।

অপর এক বর্ণনায় দেখা যায় যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এ সময় নিম্নলিখিত ভাষণ দিয়েছেন, “হে লোক সকল! এটা বাস্তব সত্য যে, তোমাদের নবীর পর আর কোন নবী আগমন করবেন না, তোমাদের কিতাবের পর আর কোন কিতাব অবতীর্ণ হবে না। মহান আল্লাহ যে সমস্ত বস্তু হালাল করেছেন সেগুলো হালাল আর তিনি যা হারাম করেছেন তাই হারাম। আর এ হারামের বিধান কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। হে লোক সকল! স্মরণ রেখো, আমি চুড়ান্ত বিচারক হিসেবে এ আসনে উপবেশন করিনি। আমি শুধু আল্লাহর বিধানসমূহ কার্যকরী করতেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমি কোন নতুন বিষয়ের দাবী করব না, আমি আল্লাহর বিধান অনুসরণ করে চলব। হে লোক সকল! দেখো, আল্লাহর বিধানের বিপরীতে কারোও আনুগত্য তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে না।

আরও মনে রেখো, আমি তোমাদের মধ্যে সকলের চেয়ে উত্তম ব্যক্তি নই। আমি তোমাদেরই মত একজন সাধারণ মানুষ। কিন্তু আল্লাহপাক তোমাদের চেয়ে আমাকে অনেক বেশী দায়িত্ব দিয়েছেন।

ইবনুল জাওযি বলেন, তার এ ভাষণ শেষ হওয়া মাত্রই একজন আনসারী সর্বপ্রথম উঠে এসে তাঁর হাতে বায়আত গ্রহণ করলেন। তারপর একের পর এক লোক এসে বায়আত গ্রহণ করতে লাগল, এরূপে সাধারণ বায়আত অনুষ্ঠান শেষ হল। তারপর তিনি তার তাবুতে আসলেন, পূর্ব হতেই তাঁর জন্য সুলায়মানের গালিচা বিছানো ছিল, তিনি এ গালিচা উঠিয়ে একটি আরমানি বিছানা বিছিয়ে তাতে বসলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! আমি যদি মুসলিম জনতার দায়িত্ব গ্রহণ না করতাম তবে তোমার উপর বসতাম না।

এ আরমানি বিছানাটি খুবই নিম্নমানের ছিল বলেই তিনি তাকে পছন্দ করেছিলেন, তা না হলে তিনি তা পছন্দ করতেন না।

ইবনুল জাওযির অপর এক বর্ণনায় জানা যায় যে, তিনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি তাঁর সামনে এসেছিল তার দুঃখ-কষ্টের কথা শুনে তিনি কেঁদে অস্থির হয়ে গেলেন, তাঁর চোখের পানিতে হাতের লাঠিটিও ভিজে গিয়েছিল। অবশেষে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তাকে নিজের তরফ হতে দুশত দীনার এবং বায়তুল মাল হতে আর তিনশ দীনার প্রদান করলেন এবং তার জন্য পৃথকভাবে মাসিক দশ দীনার ভাতা ধার্য করে দিলেন।

তারপর তিনি তার বাসস্থানে আসলেন, তখন রাত অনেক হয়েছিল। কাজেই তিনি বিশ্রাম গ্রহণ করলেন। পরের দিন সকালে সুলায়মানের বাসগৃহে চলে গেলেন।

ইবনে আব্দুল হাকام বলেন, সারা রাত ধরে সুলায়মানের পরিবারের লোকেরা শাহী আসবাবপত্র উল্টাপাল্টা করতে লাগল, অব্যবহৃত সুগন্ধি ব্যবহৃত বোতলে রাখল, নতুন কাপড় পরিধান করতে লাগল, যেন সেগুলোও ব্যবহৃত দেখা যায়। তারা এসব করার কারণ হলো, পূর্ব হতে প্রচলিত ছিল যে, যখন কোন খলিফার মৃত্যু হত তখন খলিফার ব্যবহৃত জিনিসপত্র, সুগন্ধি ও অন্যান্য সামগ্রী তার সন্তানগণ অংশীদার হতো, আর যা অব্যবহৃত থাকত তা নতুন খলিফা লাভ করত।

পরের দিন সকালে সুলায়মানের পরিবারের লোকেরা ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে এ সমস্ত সামান-পত্র দেখিয়ে বলল, এগুলি তোমার আর এগুলি আমাদের। খলিফা এ কথার ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তারা বলল, সুলায়মান যে সব কাপড় পরিধান করেছেন, যে সব সুগন্ধি ব্যবহার করেছেন সেগুলো তার সন্তানদের আর যেগুলি ব্যবহার করেননি সেগুলো আপনার।

হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এ ব্যাখ্যা শুনে বললেন, এসব আমারও নয় তোমাদেরও নয়। এসব মুসলমানদের সম্পদ। তখন তার খাদেমকে বললেন, মুজাহিম এসব বায়তুল মালে জমা করে দাও।

এখন শুধু বাঁদীগণ অবশিষ্ট থাকল। এই সমস্ত বাঁদী তাঁর সামনে হাজির করা হল, এরা জীবিকার জন্য এ পেশা গ্রহণ করেছিল। তাদের প্রত্যেকের পরিচয়, বংশ, দেশ সম্পর্কে অবহিত হয়ে তিনি নির্দেশ দিলেন যে, এদের প্রত্যেককে তাদের পিতা-মাতার নিকট পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হোক।

ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, মন্ত্রীগণ, পরিষদবর্গ এবং উমাইয়া বংশের লোকেরা এসব দেখে নিরাশ হয়ে পড়ল, তারা বুঝল যে, তিনি শুধু ইনসাফ তথা ন্যায় বিচারকেই বেছে নিবেন। তিনি কোন অন্যায়-অবিচার প্রশ্রয় দিবেন না।

📘 ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ > 📄 ওমর ইবনে আবদুল আজিজের জুলুম প্রতিরোধ

📄 ওমর ইবনে আবদুল আজিজের জুলুম প্রতিরোধ


ইসলামী জীবনবিধান তথা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী কেবল সে সমস্ত লোকই রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতার অধিকারী যারা নিজেদের প্রয়োজনের চেয়ে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেয় এবং যারা সাধারণ মানুষের মত জীবন যাপন করতে পছন্দ করে এবং সমকালীন সাধারণ মানুষ যে স্তরে থাকবে তারা সেই স্তরেই থাকবে।

সম্মানিত পাঠকবৃন্দ, অবশ্যই অবগত আছেন যে, মহানবী (সা) নিজে তাঁর কর্মময় জীবনে এর বহু দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন। ইবনে সা'দসহ অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ সাক্ষ্য দেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) সর্বদাই নিজের দলের অভাবী লোকদের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। যদি সাধারণ মানুষ অনাহারে থাকত তিনিও অনাহারে থাকতেন। তিনি অন্ন-বস্ত্র এবং বাসস্থান কোন দিক দিয়েই সাধারণ মানুষ হতে উচ্চস্তরে অবস্থান করতেন না। সাধারণ লোকেরা যা খেত, সাধারণ মানুষ যা পরিধান করত তিনিও তাই খেতেন ও পরতেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সাধারণ ভাবে জীবনযাপন করেছেন। তার ঘরের চার দেওয়াল ছিল মাটির, ছাদ ছিল খেজুর পত্র ও খড়ের, তাঁর ঘরে কোন খাট পালঙ্ক ছিল না। তিন দিন পর্যন্ত তার ঘরে চুলা জ্বলত না। জীবনে তিনি কখনও পেট ভরে আহার করেননি। ইবনে সা'দ বর্ণনা করেছেন হযরত আয়েশা (রা) যিনি সবচেয়ে প্রিয় সহধর্মিনী ছিলেন। তিনি কসম করে বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কখনও খেজুর ও পানি অথবা রুটি ও পানি দিয়ে পেট ভরে আহার করেননি এবং তাঁর এ অভ্যাস মৃত্যু পর্যন্ত বহাল ছিল।

হযরত আবু বকর (রা) খেলাফতের আসন অলংকৃত করার পর তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সুন্নাত অনুসরণ করে জীবন যাপন করেছেন। যাদের উপর শাসন করার জন্য তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনিও তাদের কাতারে এসে যোগদান করেছিলেন। তিনি তাঁর সোয়া দুই বছর খেলাফতের সময়ে কখনও সাধারণ নাগরিকদের প্রয়োজনের চেয়ে নিজের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেননি। সাধারণ মানুষ যা খেত, পরিধান করত তিনিও সেরূপ খাওয়া পরা করতেন, সাধারণ মানুষ যেস্থানে বসবাস করত তিনিও সেরূপ স্থানে বসবাস করতেন।

হযরত ওমর ফারুক (রা)-এর যুগ অত্যন্ত প্রাচুর্য্য ও সুখ-সমৃদ্ধির যুগ ছিল। তাঁর যুগে মানুষের জীবনযাত্রার মান বহুলাংশে উন্নীত হয়েছিল। কোন মুসলামানই তখন অনাহারে ও বস্ত্রাভাবে জীবন যাপন করেনি। সকলেই দুই বেলার খাওয়া এবং সাধারণভাবে পোষাক পরিচ্ছদের ব্যবস্থা করতে পারত। এজন্য হযরত ওমর (র) তার পূর্ববর্তী বুজর্গদের মত অনাহারে থাকতেন না, তিনি তিন দিন পর্যন্ত উপবাস করতেন না, বস্ত্রহীনও থাকতেন না এবং মুক্ত আকাশের নীচেও শয়ন করতেন না।

কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি সর্বসাধারণের মতই জীবন অতিবাহিত করেছেন। মোটা আটার রুটি খেতেন, তৈল, সিরকা এবং শুকনো গোশত ছিল তাঁর সাধারণ খাদ্য। তাঁর পরিধেয় বস্ত্রে বেশ কয়টি তালি থাকত।

যদিও তিনি ভাতা রেজিষ্ট্রারের তালিকায় ৩৯ ক্রমিক নম্বরের অধিকারী ছিলেন। যদিও তিনি বদরী সাহাবীদের মত ভাতা গ্রহণ করতেন তথাপি তার জীবন যাপন প্রণালী ছিল সাধারণ মানুষের মত।

হযরত আলী (রা)-এর জীবনও সাধারণ মানুষের জীবনের মত অনাড়ম্বর ছিল। তিনি যে কাপড় পরিধান করতেন তার মূল্য চার দেরহামের বেশি ছিল না। তিনি যে খাদ্য খেতেন তার চাকর-বাকররাও তা পছন্দ করত না। তিনি সাধারণ মানুষের দ্বারা নির্বাচিত খলিফা হওয়ার ফলেই তার ভাল খাদ্য ও ভাল পোষাক পরিধান করার কোন অধিকার আছে বলে তিনি মনে করতেন না।

তিনি যে পোষাক পরিধান করতেন তা দেখে কোন অপরিচিত লোক তাঁর ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কোন পার্থক্য করতে পারত না। একবার কোন এক আমীর তাকে দীন মজুর মনে করে তার মাথায় বোঝা উঠিয়ে দিয়েছিল।

রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাহাবী, হযরত আবু বকর (রা) হযরত ওমর (রা) হযরত উসমান (রা) এবং হযরত আলী (রা) এ চার মহাপুরুষের জীবনের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য করলে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয় যে, এ চারজনের কেউই কোন দিক দিয়ে নিজেদেরকে সাধারণ মানুষের চেয়ে উন্নত মনে করতেন না এবং নিজেদের সন্তান বা পরিজনের প্রয়োজনকে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের উপর প্রাধান্য দিতেন না।

এ সম্পর্কে ইমাম তিরমিযি (র) একটি স্পষ্ট উদাহরণ দিয়েছেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কন্যা হযরত ফাতেমা (রা) পানি উঠাতে উঠাতে হাতে কড়া পড়ে গিয়েছিল তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিকট একজন দাসীর জন্য আবেদন করেছিলেন। দেয়ার মত দাসীও ছিল তবুও মহানবী (সা) তার আবেদন গ্রহণ করে বললেন, কোন আনসারী স্ত্রী আমার নিকট দাসীর জন্য আবেদন করেছিল, তাদের প্রয়োজন তোমার পূর্বে পূরণ করতে হবে।

রাসূলুল্লাহ (সা) যে ক্ষেত্রে তার প্রাণপ্রিয় কন্যার প্রয়োজনকে আনসারদের স্ত্রীদের প্রয়োজনের উপর প্রাধান্য দেননি। সেক্ষেত্রে তারই স্থলাভিষিক্ত হযরত আবু বকর, ওমর ফারুক, উসমান যিনুরাইন ও আলী (রা) কখনও নিজেদের প্রয়োজনকে সাধারণ মানুষের প্রয়োজনের উপর প্রাধান্য দেননি। যদি তারা এমন কিছু করতেন তাহলে ইতিহাসের সূক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তারা সমালোচনার উর্ধ্বে থাকতে পারতেন না।

আমাদের দাবী হলো, একমাত্র ইসলামই এমন একটি জীবন ব্যবস্থা যা সাধারণ মানুষের উপর বিশিষ্ট লোকদের কখনও প্রাধান্য দেয় না। ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা মহানবী (সা) এবং তাঁর সাহাবীগণও ইসলামের পূর্ণাঙ্গরূপ বাস্তবায়নের পর তারা নিজেদেরকে সাধারণ মানুষের চেয়ে উন্নত মনে করেননি এবং তাঁদের পরও যারা ইসলামের উন্নতিকল্পে বিভিন্ন ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাঁরাও তাঁদের নিজেদেরকে অথবা তাদের সন্তান বা আত্মীয়-স্বজনকে কোন দিক দিয়েই প্রাধান্য দেননি।

তাঁদের ধারণায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার ছিল আল্লাহপাকের তরফ হতে একটি পবিত্র আমানত। আল্লাহর রসূল (সা) এবং তাঁর সুযোগ্য খলীফাগণ রাষ্ট্রীয় ধন ভান্ডারকে সাধারণ মুসলমানদের সম্পদ মনে করতেন। তাঁরা নিজেদেরকে সে ধন ভান্ডারের একজন বিশ্বস্ত সংরক্ষণকারী মনে করতেন। তাঁরা এমন চরিত্রবান ছিলেন যে, তাদের কোন প্রকার খেয়ানত সম্পর্কে কারও মনে কোনরূপ দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল না। একজন সাধারণ নাগরিক সে কোষাগার হতে যেটুকু পাবার অধিকারী ছিল তারাও তার চেয়ে এর অতিরিক্ত কিছু পাবার অধিকারী ছিলেন না।

বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে উবাইদের বর্ণনা মতে, রসূলুল্লাহ (সা) শাসনকর্তাদের মৌলিক প্রয়োজনসমূহ, পুরণ করার মত অর্থই শুধুমাত্র তাদেরকে কোষাগার হতে গ্রহণ করার অনুমতি দিয়েছিলেন। এর অতিরিক্ত এক পয়সা নেয়া তাঁর মতে খিয়ানতের শামিল ছিল।

আমানত ও খিয়ানতের এ ধারণা ইসলামের একটি মৌলিক ধারণা। কিন্তু হযরত মুয়াবিয়া (রা)-এর খেলাফতের পরেই এই ধারণা সম্পূর্ণভাবে শক্তি প্রয়োগ করে খেলাফত লাভ করেছিলেন। জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত ছিলেন না বলেই সরকারী কোষাগারকে সর্বসাধারণের সম্পদ হিসেবে মনে না করে তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করেছিলেন। কোষাগার থেকে তিনি যা ইচ্ছা গ্রহণ করতেন। বিলুপ্ত হয়ে যায়। হয়তো উমাইয়া খলীফা আব্দুল মালেক যাকে উমাইয়া সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তার বংশের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আমীর মুয়াবিয়া (রা)-এর চেয়ে বহুগুণ বেশি প্রচেষ্টা করেছিলেন। এজন্য তিনি আমীর মুযাবিয়া (রা)-এর চেয়ে ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। তার সন্তান সন্ততি বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন এবং পরিবার পরিজনদের জন্য সরকারী কোষাগার হতে যথেচ্ছাভাবে ব্যয় করেছেন। রাজ্যের আমদানী হতে যা ইচ্ছা গ্রহণ করেছেন। তিনি বসবাসের জন্য সুউচ্চ প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন, খাটপালঙ্ক ইত্যাদি তৈরি করেছিলেন, রেশমী বস্ত্র পরিধান করেছেন এবং সর্বসাধারণের ধন-ভান্ডারকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি মনে করেই তা থেকে খরচ করেছেন।

বাস্তবিক পক্ষে এটাই কি ইসলামের বিধান ছিল? না কখনই এটা ইসলামের বিধান ছিল না। তিনি নিজেও তো উপলব্ধি করতেন, কিন্তু তিনি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের আদর্শের সামনে নিজেকে জওয়াবদিহী করতে হবে এ কথা ভাবতে পারেননি। উদাহরণ স্বরূপ ইবনে কাছীর আব্দুল মালেক সম্পর্কে ইবনুল আরাবীর নিম্ন ভাষ্যটি বর্ণনা করেছেন। لَّمَا سَلَّمَ عَبْدُ الْمَالِكِ بِالْخِلَافَةِ كَانَ فِي حُجْرِهِ مَصْحَفُ فَاطْبَقَهُ ۞ وَقَالَ هَذَا فِرَاقٌ بَيْنِي وَبَيْنِكَ

অর্থাৎ আব্দুল মালেক যখন খলীফা মনোনীত হলেন তখন তার নিকট একখানা কোরআন শরীফ ছিল। তিনি তাকে বন্ধ করে দিয়ে বললেন, এটাই আমার ও তোমার শেষ বিদায়।

অন্য এক বর্ণনায় আছে- ۞ هَذَا آخِرُ الْعَهْدِ مِنْكَ

অর্থাৎ এটাই তোমার শেষ সাক্ষাত।

আব্দুল মালেক খেলাফতের আসন গ্রহণ করার পূর্বেই আল্লাহর কিতাবের সম্পর্ক ত্যাগ করেছিল। অথচ ইবনে কাছীরের বর্ণনা মতে, খলীফা হবার পূর্বে যখন আব্দুল মালেক মদীনায় অবস্থান করতেন তখন তিনি আল্লাহভীরুতা ও সংযম শীলতার কারণে মদীনার বিশিষ্ট আলেমদের মধ্যে গণ্য ছিলেন।

অপর এক বর্ণনায় জানা যায় যে, হযরত ইবনে জুবাইর শহীদ হবার পর আব্দুল মালেক হজ্জের সময় এক সাধারণ ভাষণে বলেছিলেন যে, আমার পূর্ববর্তী খলীফাগণ নিজেরা খেতেন, অপরকে খাওয়াতেন, কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি একমাত্র তরবারীর সাহায্যে এ উম্মতের রোগের চিকিৎসা করব।

ইবনে কাছীর স্পষ্টই উল্লেখ করেছেন যে, আব্দুল মালেক একজন রক্ত পিপাসু বাদশাহ ছিলেন। তিনি অগণিত লোককে হত্যা করেছিলেন। তারই প্রতিনিধি হাজ্জাজ অনর্থক লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল।

আব্দুল মালেক ও তার প্রতিনিধি হাজ্জাজ এ দুজন যার প্রতি অসন্তুষ্ট হতেন-তার সম্পদ কেড়ে নিতেন এবং তাকে হত্যাও করা হতো, আর তারা দু'জন যার প্রতি সন্তুষ্ট হতেন তাকে সরকারী ধনভান্ডার খুলে দিতেন।

এখন ওমর ইবনে আব্দুল আজীজের সামনে দু'টি মাত্র পথই খোলা ছিল। হয়তো তিনি তাঁর পূববর্তীদের অনুসরণ করবেন অথবা আল্লাহর রাসূল (সা) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের পথ অনুসরণ করবেন।

তিনি আল্লাহর রাসূল (সা) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের পথকে বেছে নিলেন এবং আব্দুল মালেকসহ অন্যান্য শাসকগণ যে সমস্ত অন্যায় অবিচার, জুলুম করেছিল তিনি সেই সবের প্রতিকার বিধান করলেন। তিনি নিজ হস্তে এর সূচনা করেছিলেন।

ঐতিহাসিক ইবনে সা'দের বর্ণনায় জানা যায় যে, ইবনে সুহাইল বলেছেন, আমি ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে তার ঘর হতে জুলুম প্রতিরোধ ও সংস্কারের সূচনা করতে দেখেছি। সর্বপ্রথম তিনি নিজের পরিবারের লোকদের জুলুম অত্যাচার প্রতিরোধ করে অন্য লোকদের প্রতি দৃষ্টি দিয়েছিলেন। আবু বকর ইবনে বুসরা বলেন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ যখন জুলুম অত্যাচার প্রতিরোধ ও লুণ্ঠিত ধন-সম্পদ ফেরত দিতে শুরু করলেন, তখন তিনি বললেন, সর্বপ্রথম আমার নিজের পক্ষ থেকেই শুরু করা উচিত। সুতরাং তিনি নিজের অধিকারভুক্ত ধন-সম্পদের হিসাব করে তার কাছে স্থাবর-অস্থাবর যে সমস্ত ধন-সম্পদ ছিল তিনি তা মুসলমানগণকে ফেরত দিয়ে দিলেন, এমনিক ওয়ালিদ তার প্রাচ্যদেশীয় আমদানী থেকে তাকে একটি আংটি উপহার দিয়েছিলেন, তাও খুলে তিনি বাইতুলমালে জমা দিলেন।

ইবনে জাওযি বলেন, যে রাত্রিতে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ খেলাফতের মসনদে বসলেন সে রাতেই তার ঘর হতে ক্রন্দনের শব্দ পাওয়া গেল। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায় যে, তিনি যখন তার বাঁদীগণকে অনুমতি দিলেন যে, তারা ইচ্ছা করলে থাকতে পারে, আর ইচ্ছা করলে চলেও যেতে পারে। কেননা আমি এমন এক দায়িত্বের বোঝা গ্রহণ করেছি যে, এরপর আমি আর তাদের প্রতি ফিরে তাকাতে সময় পাবনা। যে চায় আমি তাকে মুক্ত করে দিতে প্রস্তুত, আর যে চায় সে থাকতে পারে কিন্তু আমার সাথে কারও কোন সম্পর্ক থাকবে না। আমার উপর কোন আশা ভরসাও করতে পারবে না।

একথা শুনে বাঁদীরা কাঁদতে লাগল।

ইবনে জাওযির অপর এক বর্ণনায় জানা যায় যে, বর্ণনাকারী বলেন, আমি এবং ইবনে আবু যিকর হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের বাড়ীর কাছে উপস্থিত ছিলাম, আমরা তার ঘরের কান্নার আওয়াজ শুনে তার কারণ জিজ্ঞেস করলে লোকেরা বলল, খলীফা তার স্ত্রীকে এ বলে অধিকার দিয়েছেন যে তুমি ইচ্ছা করলে এ ঘরে থাকতে পার, ইচ্ছা করলে তোমার পিত্রালয়ে চলে যেতে পার। কারণ আমি যে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি এরপর স্ত্রীলোকের প্রতি আমার সাধারণ আসক্তিটুকুও আর নেই।

এ কথা শুনে খলীফার স্ত্রী ক্রন্দন করতে লাগলেন এবং তাঁর ক্রন্দনের ফলে তার বাঁদীরাও ক্রন্দন করতে লাগল।

এ ভদ্র মহিলাই দোর্দন্ড ও প্রতাপশালী খলীফা আব্দুল মালেকের সর্বাধিক প্রিয়তমা কন্যা ছিলেন। তিনি পূর্ববর্তী দু'জন খলীফা ওয়ালিদ ও সুলায়মানের ভগ্নি ছিলেন। তিনি যে ভোগ বিলাসে জীবন অতিবাহিত করেছেন সে যুগে আর কারও ভাগ্যে জুটেনি।

ইবনে জাওযি এ রাতের একটি আশ্চর্যজনক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ওমর ইবনে আবদুল আজিজের স্ত্রী ফাতেমার একটি সুন্দরী দাসী ছিল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাকে খুব ভাল বাসতেন। খলীফা হবার পূর্বে তিনি স্ত্রী ফাতেমার নিকট বহুবার এ দাসীটি চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। তার এ ব্যর্থতা দাসীর প্রতি তাঁর আকর্ষণকে আরও বহুগুণে বৃদ্ধি করে দিয়েছিল। তারপর তিনি যখন খলীফা মনোনীত হলেন তখন ফাতেমা তাকে বললেন, আমি সে দাসীটি আপনাকে দান করে দিলাম। এতে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের মুখমন্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি ফাতেমাকে বললেন, তাকে আমার নিকট পাঠিয়ে দাও। ফাতেমা তাকে খুব ভালরূপে সজ্জিত করে তার নিকট পাঠিয়ে দিলেন। ওমর ইবনে আজিজ তাকে দেখে খুব খুশি হলেন। তিনি দাসীকে তার অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বলল, হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ এক কর্মচারীর উপর জরিমানা করে তার সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল, আমিও তার অন্তর্ভূক্ত ছিলাম। তারপর হাজ্জাজ আমাকে খলীফা আব্দুল মালেকের নিকট পাঠিয়ে দিলেন এবং তিনি তাঁর স্নেহাধিক কন্যা ফাতেমাকে দান করলেন।

এই ঘটনা শুনে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ খুব ব্যথিত হলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হাজ্জাজ যে কর্মচারীর প্রতি কঠোর ব্যবহার করেছিল সে কী জীবিত আছে? দাসী বলল, উক্ত কর্মচারী মারা গিয়েছে তবে তার সন্তানগণ জীবিত আছে। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ উক্ত দাসীকে বিদায় করে দিয়ে কুফার শাসনকর্তাকে লিখে পাঠালেন যে, অমুকের পুত্রকে আমার নিকট পাঠিয়ে দাও। তারপর সে ব্যক্তি ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট এসে উপস্থিত হল। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তার পিতার বাজেয়াপ্ত সমস্ত সম্পত্তির সাথে এ দাসীটিও ফেরত দিলেন। ইবনুল জাওযি আরও বলেন যে, তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত এই দাসীর মহব্বত তার অন্তরে একটা স্থান দখল করে রেখেছিল কিন্তু এরপর তিনি আর কখনও এই দাসীর সাথে সাক্ষাত করেননি।

ইবনে কাছীরের বর্ণনায় জানা যায় যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তার ব্যক্তিগত যে সব সম্পত্তি কোষাগারে জমা দিয়েছিলেন তন্মধ্যে ফাদাকের বাগানটিও ছিল। তিনি বিশিষ্ট লোকদের এক সভায় ফাদাকের বাগানটি জমা দেয়ার কথা ঘোষণা করে বলেন, ফাদাক রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট ছিল। তিনি আল্লাহর নির্দেশ মতই তার আমদানী ব্যয় করতেন। তারপর হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত ওমর (রা) এরূপ করেছেন। কিন্তু মারওয়ান ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে তা দখল করে ভোগ করেছিল এবং তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির একাংশ আমিও উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। ওয়ালিদ এবং সুলায়মানও তাদের অংশ আমাকে দান করেছেন। কাজেই আমি আমার সেসব সম্পত্তি সরকারী কোষাগারে ফেরত দিচ্ছি তার চেয়ে অপবিত্র আর কোন সম্পত্তি নেই। আমি যা বায়তুলমালে জমা দিচ্ছি, রাসূলুল্লাহ (সা) যেভাবে এটা ব্যয় করতেন এটা সেভাবেই ব্যয় করা হবে।

অপর একটি বর্ণনায় জানা যায় যে, ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ শুধু স্থাবর সম্পত্তি ও নগদ অর্থই বায়তুলমালে জমা দেননি, তিনি তাঁর স্ত্রীর মূল্যবান অলংকারাদী এবং পোষাকাদী পর্যন্ত বায়তুলমালে জমা দিয়েছেন।

ইবনুল কাছীর বলেন, তিনি খেলাফতের পদ লাভ করার পূর্বে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তির আয় ছিল বার্ষিক চল্লিশ হাজার দীনার বা স্বর্ণমুদ্রা। এ সবই তিনি বায়তুলমালে জমা দিয়েছেন, অথচ তার অনেক সন্তানাদী ছিল, কয়েকজন স্ত্রী ছিলেন এবং এক স্ত্রী তো ছিলেন একজন বিশিষ্ট শাহজাদী।

এভাবে তিনি ব্যক্তিগত সম্পত্তির হিসাব-নিকাশ শুরু করলেন এবং নিজবংশের সমস্ত জবর দখলকৃত সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে সরকারী কোষাগারে জমা দিলেন। তিনি রাজ্যের সমস্ত প্রাদেশিক শাসককর্তাগণকে লিখলেন যে, আমার পূর্বে যে স্থানেই কোন জুলুম অত্যাচার করে মানুষের সম্পত্তি কেড়ে নেয়া হয়েছে তা তাদেরকে ফেরত দেয়া হোক।

ইবনে সা'দ ইবনে যুহাইলের একটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, "ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ যখন তাঁর নিজের ও নিজের বংশের ধন-সম্পদের হিসাব-নিকাশ করে তাদের অপবিত্র সম্পত্তি বায়তুলমালে জমা দিলেন তখন ওয়ালিদের এক পুত্র তার বংশের লোকদের বললেন, তোমরা ওমর ইবনে খাত্তাবের বংশের একজন লোককে খলীফা মনোনীত করেছ অতএব তিনিও তাঁর মতই করছেন।"

উদ্দেশ্যে ছিল যে, ওমর ফারুকের সন্তানগণ তাদের পূর্ব পুরুষের নির্দেশিত পথ পরিত্যাগ করবেন না। আমরাও ইতিপূর্বে ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের বাল্যজীবন বর্ণনার সময় তাঁর কথা লিখেছি যে, তিনি যখন আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর নিকট হতে তার মাতার নিকট ফিরে আসতেন তখন বলতেন, "মা, আমিও আপনার চাচার মত হতে চাই"। তিনি খলীফা মনোনীত হবার পর হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর পুত্র সালেমের নিকট এমন ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন।

ইবনে কাছীর বলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সালেম ইবনে আব্দুল্লাহকে বলেন যে, আমার জন্য ওমর চরিত রচনা করুন, আমি সে অনুযায়ী কার্যক্রম চালাব। সালেম বলেন, আপনি পারবেন না। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ জিজ্ঞেস করলেন আপনি সেটা কিভাবে বুঝলেন? সালেম কথার মোড় অন্য দিকে ঘুরিয়ে বললেন, যদি আপনি সে অনুযায়ী কাজ করেন তাহলে হযরত ওমর (রা) কেও হারিয়ে দিবেন, তাঁর চেয়েও উত্তম আদর্শ সৃষ্টি করতে পারবেন। কারণ তার যুগে সৎকর্মে সহযোগিতাকারী লোকের অভাব ছিল না। কিন্তু আপনার কোন সাহায্যকারী নেই।

সালেম যদিও সত্য কথা বলেছিলেন যে, সৎকর্মে তাঁর কোন সাহায্যকারী নেই কাজেই তিনিও হযরত ওমর (রা) হতে পারবেন না। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি হযরত ওমর (রা)-এর পদ্ধতি অনুসরণ করে চলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। ফলে তিনি বিশ্বে দ্বিতীয় ওমর হিসেবে খ্যাতি লাভ করে অমর হয়ে রয়েছেন।

ইবনে সা'দ বলেন, হযরত আমীর মুয়াবিয়া (রা)-এর পর হতে জনগণের প্রতি বনু উমাইয়াদের যে সমস্ত অন্যায় অবিচার চলে আসছিল হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সেগুলোর সংস্কার সাধন করলেন এবং সে যুগ হতে যে সমস্ত সম্পদ লুণ্ঠিত হয়ে আসছিল, তাও তিনি ফেরত দিলেন। অর্থাৎ বনু উমাইয়ার লোকেরা অন্যায়ভাবে যে সমস্ত ধন-সম্পদ উপার্জন করেছিল অথবা পূর্ববর্তী খলীফাগণ মুসলমান জনসাধারণের সম্পদ হতে তাদেরকে যা দান করেছিল ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সেসব مسلمانوں ফেরত দিয়েছিলেন।

ইবনে কাছীরের ভাষ্যটি হলো- ওমর ইবনে আবদুল আজীজ مَا زَالَ عُمَرُ بْن عَبْدِ الْعَزِيزِ يَردُّ الْمُظَالِمُ مِنْ لَدُنْ مُعَاوِيَةَ (رض) إلى أن اسْتَخْلِفَ أَخْرَجَ أَيْدِي وَرَثَةٍ مُعَاوِيَةَ (رض)
অর্থাৎ ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ হযরত মুয়াবিয়া (রা)-এর পর হতে তার যুগ সৃষ্ট সকল প্রকার অবিচারের সংস্কার সাধন করলেন। এমনকি হযরত মুয়াবিয়া (রা)-এর উত্তরাধিকারীদের দ্বারা লুণ্ঠিত জনসাধারণের সকল অধিকার আদায় করে দিলেন।

দামেশক ছাড়াও মক্কা, মদীনা, ইয়ামেন, তায়েফ, ইরাক এবং মিশরের যে সব স্থানে লুণ্ঠিত সম্পদ জমাকৃত ছিল তা হিসেব অনুযায়ী নিজ নিজ মালিককে ফেরত দেয়ার জন্য হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র) সাধারণ আদেশ জারী করলেন।

আয়্যুব সুখতিয়ানী বলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র) অন্যায় ভাবে অর্জিত ও লুণ্ঠিত সমস্ত সম্পদ বায়তুলমালে জমা করে দিলেন এবং বায়তুলমালে যে সমস্ত অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদ অথবা লুণ্ঠিত সম্পদ ছিল তাও তিনি তার প্রকৃত মালিককে ফেরত দিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে যে কয় বছর সে মাল বায়তুলমালে জমা ছিল সে কয় বছরের যাকাত রেখে দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে এ নির্দেশ সংশোধন করে শুধু চলতি বছরের যাকাত রেখে দিতে নির্দেশ দিলেন।

আবু জুনাদ বলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র) ইরাকের অন্যায় অবিচার প্রতিরোধ করতে আমাদেরকে আদেশ দিলেন, তার এই আদেশ কার্যকরী করতে গিয়ে প্রকৃত হকদারের হক আদায় করতে করতে বায়তুলমাল খালি হয়ে গেল। অতঃপর প্রশাসনিক ব্যয় বহন করার মত আর কোন অর্থই বায়তুলমালে থাকল না, সুতরাং হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সিরিয়া হতে ইরাকে অর্থ পাঠিয়ে দিলেন।

আবু জুনাদ আরও বলেন যে, সত্ত্বাধিকারীদের সত্ব ফিরিয়ে দিতে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সাক্ষ্য প্রমাণের কড়াকড়ি করলেন না, বরং নিপীড়িত জনতার নিপীড়ন প্রতিরোধ পথ সহজ করে দিলেন। তিনি নিপীড়নের কারণ অবগত হলেই তার লুণ্ঠিত সম্পদ ফিরিয়ে দিতেন তাকে অকাট্য প্রমাণাদী সংগ্রহ করতে বলতেন না।

ইবনে হাজম বলেন, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাদেরকে লিখে পাঠালেন যে, "আমি যেন কোষাগারের হিসাব করে তার পূর্বে প্রত্যেক মুসলমান ও জিম্মিদের সম্পদের পরিসংখ্যান করি এবং যদি কোন মুসলমান বা কোন জিম্মির প্রতি কোন অন্যায় করা হয়ে থাকে তবে আমি যেন তার ক্ষতি পূরণ ফিরিয়ে দেই। যদি নির্যাতিত ব্যক্তি ইন্তেকাল করে থাকে তবে তার প্রকৃত উত্তরাধিকারীকে ফিরিয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন।”

ইবনে সা'দ বলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ ইবনে হাজমকে এবং তৎকালীন সবচেয়ে বড় বড় ফকীহগণকে লিখেছেন যে, তাদেরকে মানুষের কাছে গিয়ে অভিযোগ শুনতে বলেন। কেউ যদি সে উমাইয়্যা বংশেরও হয়, তবুও যেন তারা তাকে কোন প্রকার ছাড় না দেন এবং হিসাব নিকাশের সময় যেন খলীফার আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি বিশেষ কড়াকড়ি ব্যবস্থা অবলম্বন করেন। যেহেতু ঝগড়ার সময় তারা অধিক শক্তি প্রয়োগ করে থাকে।

হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ নিজেও এ মূলনীতি সামনে রেখেই কাজ করেছিলেন। ইবনুল জাওযি বলেন, একবার কয়েকজন গ্রাম্যলোক এসে তার আদালতে অভিযোগ করল যে, ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালেক তার 'খেলাফতের সময় তার এক টুকরা জমি কেড়ে নিয়ে খলিফার পরিবারের লোককে দিয়েছেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তার এ দাবীর পক্ষে প্রমাণ পেশ করতে বললে সে বলল এটা একটি অনাবাদি ভূমি ছিল, আমিই সর্বপ্রথম এটা আবাদ করেছি। তখন হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের রাসূলুল্লাহ (সা) এর এই ফরমান স্মরণ হয়ে গেল-
البِلَادُ بِلَادُ اللَّهِ وَالْعِبَادُ عِبَادُ اللهِ مَنْ أَحْيَاء أَرْضًا مَيْتَةً فَهِيَ لَهُ .
অর্থাৎ জমি আল্লাহর, বান্দাও আল্লাহর, অতএব যে ব্যক্তি অনাবাদী ভূমি আবাদ করবে সে ঐ ভূমির মালিক হবে।

সুতরাং মহানবী (সা)-এর এই নির্দেশ অনুযায়ী হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ গ্রাম্য লোকটির দাবী মেনে নিলেন।

ইবনুল জাওযি বলেন, খলিফা সুলাইমানের দাফন কার্য শেষ করে শাহী প্রাসাদে এসেই হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ জুলুম অবিচার প্রতিরোধ শুরু করে দিলেন। তিনি সমস্ত পর্দা, গালিচাসহ সকল আসবাবপত্র বিক্রয় করে তার বিক্রয়লব্ধ অর্থ বায়তুলমালে জমা দিলেন।

ইবনুল জাওযির অপর একটি বর্ণনায় জানা যায় যে, সুলায়মানের দাফন শেষ করে পরবর্তী দিন হতেই তিনি জুলুম অত্যাচার প্রতিরোধ করতে শুরু করে দিলেন। ফজরের নামাযের পূর্বেই তিনি ঘোষক ওয়াবেককে শহরের অলিগলিতে এ বলে ঘোষণা করতে নির্দেশ দিলেন যে, যার প্রতি কোন প্রকার অন্যায় অবিচার করা হয়েছে সে যেন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের কাছে এসে তার আবেদন পেশ করে।

এ ঘোষণা শুনে সর্বপ্রথম হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের কাছে অভিযোগ পেশ করেছিল হেমসের অধিবাসী একজন অমুসলিম জিম্মি। সে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের কাছে এসে আবেদন করল যে আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী আমার অভিযোগের ফয়সালা করুন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তার অভিযোগ জানতে চাইলে সে বলল, আব্বাছ ইবনে ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালেক তার এক টুকরা জমি জবরদস্তিমূলক দখল করে নিয়েছিল। আব্বাছও সেস্থানেই উপস্থিত ছিল। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ আব্বাছকে জিজ্ঞেস করলেন যে, এ সম্পর্কে তোমার বক্তব্য কি? আব্বাছ বলল, খলিফা ওয়ালীদ আমাকে এ সম্পত্তি দান করে দানপত্র লিখে দিয়েছিলেন। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ যিম্মিকে জিজ্ঞেস করলে সে তার দাবীর পক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করল। সুতরাং হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তার দাবী মেনে নিয়ে আব্বাছকে তার জমি ফেরত দিয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন।

অপর এক বর্ণনায় জানা যায় যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ যখন জুলুম প্রতিরোধ শুরু করলেন তখনও জোহরের সময় হয়নি। তিনি সমস্ত লোককে মসজিদে একত্রিত করে তাদের সামনে মুজাহিমকে তাঁর নিজের সম্পত্তির দলীল সমূহ এক এক করে পাঠ করতে বললেন। ইবনুল জাওযি বলেন, মুজাহিম এক একটি দলীল পাঠ করত আর হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ নিজের হাতে প্রত্যেকটি দলীল কাঁচি দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিতেন। এত হলো দলীল দস্তাবিজের কথা। তাঁর স্ত্রী ফাতেমা বিনতে আব্দুল মালেকের নিকট খুব মূল্যবান একটি মতি ছিল। তার পিতা আব্দুল মালেক এটা তাকে দিয়েছিলেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ ফাতেমার নিকট এ মতিটি চেয়ে বললেন, তুমি দু'টি বিষয়ের একটি বেছে লও। হয়তো এ মতি বাইতুল মালে জমা দাও আর না হয় আমাকে অনুমতি দাও যে, আমি তোমা হতে পৃথক হয়ে যাই। কারণ এ মতি থাকা অবস্থায় তোমার সাথে একই ঘরে অবস্থান করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

ফাতেমা নিবেদন করলেন, আমি মতির চেয়ে আপনাকেই প্রাধান্য দিচ্ছি। এক একটি মতি কেন? এরূপ যদি হাজার মতি আমার থাকত তবুও আমি আপনাকেই প্রাধান্য দিতাম। অতএব হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ মতি এনে বাইতুলমালে জমা করে দিলেন।

ইবনুল জাওযি একটি দীর্ঘ ঘটনার মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন যে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ এখনও জুলুম প্রতিরোধের কাজ শুরু করেননি। সূচনাতেই তিনি তার প্রধান উপদেষ্টা ও ব্যক্তিগত খাদেম মুজাহিমকে বললেন যে, পূর্ববর্তী খলিফাগণ আমাকে এমন কিছু সম্পত্তি দিয়ে দিয়েছেন-প্রকৃত পক্ষে আমি সে সবের মালিক নই এবং সেসব দান গ্রহণ করাও আমার পক্ষে উচিত নয়। এখন যেহেতু আমি খলিফা কাজেই সে সমস্ত সম্পত্তির হিসাব-নিকাশ করা প্রয়োজন। এতে মুজাহিম তার উদ্দেশ্য বুঝতে পারল এবং সে তাকে বলল, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনার সন্তানদের কি উপায় হবে? তিনি বললেন, তাদের জীবিকার ব্যবস্থা আল্লাহই করবেন। একথা মুজাহিমের মনোপুত হল না, সে তার পুত্র আব্দুল মালেকের নিকট গিয়ে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করল। আব্দুল মালেক পিতার কাছে এসে বললেন, আপনি যা সংকল্প করেছেন, যথা শীঘ্র সম্ভব তা বাস্তবায়ন করুন। আপনি আমাদের জন্য কোন চিন্তাই করবেন না। দীনের কাজে বিলম্ব করা আল্লাহ পছন্দ করেন না। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তার পুত্র আব্দুল মালেকের এ কথায় অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে তার কপালে চুম্বন করলেন এবং আল্লাহ তাঁকে এমন সৎ সন্তান দান করেছেন এজন্যে তিনি তাঁর শুকরিয়া আদায় করলেন।

খলিফা সুলায়মান মৃত্যুর পূর্বে গাসবা ইবনে সায়াদ ইবনে আছকে বিশ হাজার দীনার দান করে একটি দানপত্র লিখে দিয়েছিলেন। এ দানপত্র বিভিন্ন দপ্তর অতিক্রম করে কোষাধ্যক্ষের নিকট এসে সীলমোহর হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু গাসবার হাতে পৌছার পূর্বেই সুলাইমান ইন্তেকাল করলেন।

সুলায়মানের দাফনের পর দ্বিতীয় দিন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের খেলাফতের প্রথম দিন গাসবা তাঁর নিকট আসল, তখন উমাইয়া বংশের সকলেই ওমর ইবনে আবদুল আজিজের কাছে সমবেত ছিল। উমাইয়া বংশের লোকেরা গাসবাকে দেখে ভাবল যে, গাসবা খলিফার পরম বন্ধু। দেখা যাক খলিফা তার সঙ্গে কিরূপ ব্যবহার করে। তারপর তাঁর সঙ্গে তারা নিজেদের ব্যাপারে কথা বলবে।

তাদের সামনেই গাসবা হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের কক্ষে প্রবেশ করল এবং বলল জনাব, খলীফা সুলায়মান আমাকে কিছু দীনার দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ নির্দেশ কোষাগারে এসে পৌঁছেছে। আপনার সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক তাতে আমি অবশ্য আশা পোষণ করি যে, আপনি তা বরাদ্দকৃত দীনার দেওয়ার নির্দেশ দিবেন।

হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ জিজ্ঞেস করলেন, কত টাকা? গাসবা বলল, বিশ হাজার দীনার। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, বিশ হাজার দীনারতো চার হাজার মুসলমান পরিবারের জন্যই যথেষ্ট। এটা তোমাকে দেয়া কিভাবে সম্ভব? এত বিপুল পরিমাণ অর্থ আমি একজনকে কিভাবে দেব? আল্লাহর কসম! এটা আমার পক্ষে মোটেই সম্ভব নয়।

গাসবা হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের উত্তর শুনে রাগে শাহী দানপত্র মাটিতে ছুড়ে মারল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাকে প্রবোধ দিয়ে বললেন, দানপত্র নষ্ট না করে যত্নের সাথে রেখ। হয়তো আমার পর এমন কেউ আসবে যে এর যথাযথ মূল্যায়ন করবে। গাসবা অতিযত্নে সেই দানপত্রটি রেখে দিল। আর যেহেতু হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের পক্ষে তার প্রগাঢ় বন্ধুত্ব ছিল কাজেই তাকে খোঁচা দিয়ে বলল, হুজুর এইত কথা হল, কিন্তু "জাবালুল ওয়ারস” সম্পর্কে আপনি কি করবেন? হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের জাবালুল ওয়ারস নামে একটি বড় জায়গীর ছিল। তিনি এ কথা শুনে গাসবার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বললেন, তুমি আমাকে খোঁচা দিচ্ছ।

তারপর তিনি তার ছেলেকে ডেকে দলীল-দস্তাবেজ আনতে নির্দেশ দিলেন। পুত্র সিন্দুক এনে হাজির করল। তিনি জাবালুল ওয়ারসের দলীলসহ সমস্ত দলীল দস্তাবেজ ছিড়ে ফেললেন। গাসবা এ দৃশ্য দেখে বাইরে অবস্থানরত উমাইয়া বংশের লোকদেরকে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করল। তারা গাসবাকে অনুরোধ করল যে, তুমি ভিতরে গিয়ে আমাদেরকে ঘরে ফিরে যেতে অনুমতি এনে দাও। গাসবা ফিরে গিয়ে উমাইয়াদের পক্ষে আপনার বংশের লোকেরা বলছে যে, আপনার পূর্বে তাদেরকে যে ভাতা প্রদান করা হতো তা যথারীতি আদায় করতে নির্দেশ দিয়ে তাদেরকে বাধিত করুন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, আল্লাহর কসম! এটা আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় এবং আমি এমন করতে পারব না। তখন গাসবা বলল, তবে আপনি তাদেরকে অন্য কোথায়ও চলে যেতে অনুমতি দিন। তারা জীবিকার জন্য কোন উপায় বের করে নিক।

হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, তারা যেখানে ইচ্ছা চলে যেতে পারে, আমার পক্ষ হতে কোন প্রকার বাধা বিঘ্ন নেই। তারপর গাসবা আবার বলল, তবে আমাকেও অনুমতি দিন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, তুমিও যেতে পার। তবে আমি মনে করি তুমি একজন সম্পদশালী লোক, তুমি এখানে থাকলে ভালই হত, কারণ আমি সুলায়মানের পরিত্যাক্ত সম্পত্তি বিক্রয় করে দেব। তুমি ইচ্ছা করলে তা হতে এমন কিছু জিনিস পত্র ক্রয় করতে পার যা পরে বিক্রয় করলে লাভবান হবে। অতঃপর গাসবা সেখানেই অবস্থান করল এবং হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ সুলায়মানের পরিত্যাক্ত সম্পত্তি বিক্রয় করার সময় গাসবা এক লক্ষ দীনারের মাল ক্রয় করে ইরাকে নিয়ে গিয়ে দুই লক্ষ দীনার বিক্রয় করল।

ন্যায় ও সুবিচারের ভিত্তিতে যে শাহী ফরমান জারী হয়নি হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের নিকট তা একেবারে মূল্যহীন ছিল।

ইবনে হাকام তার পূর্বেকার নিবর্তনমূলক শাহী ফরমানের প্রতি তাঁর অশ্রদ্ধার আরোও একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। "ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালেকের" রুহ নামক একটি ছেলে ছিল। গ্রামে লালিত পালিত হওয়ার ফলে তাকে গ্রাম্য বলেই মনে করা হত। কিছু লোক হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের নিকট এসে অভিযোগ করল যে, হেমছের সরাইখানা ওয়ালিদ ইবনে মালেক তার পুত্র রুহকে প্রদান করেছিলেন। এখনও রুহ সেগুলো দখল করে ভোগ করে চলছে। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রুহকে এ সমস্ত সরাইখানা প্রকৃত মালিকদের নিকট ফিরিয়ে দেয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। রুহ আবেদন করল যে, ওয়ালিদ এ সব সরাইখানা আমাকে যে দানপত্র লিখে দিয়েছেন তা এখনও আমার নিকট আছে। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, ওয়ালিদ লিখিত দানপত্র তোমার কোন উপকারেই আসবে না। কারণ এ সমস্ত সরাইখানা যে তাদের, এ সম্পর্কে তারা প্রয়োজনীয় স্বাক্ষী প্রমাণ সংগ্রহ করেছে।

বর্ণনাকারী বলেন রুহ হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের এ নির্দেশকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে হেমছের অধিবাসীদের সরাইখানা ফেরত দিতে অস্বীকার করল। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ এ ঘটনা জানতে পেরে শহররক্ষী প্রধান কাবকে বললেন যে, তুমি এখনই রুহের নিকট চলে যাবে, যদি রুহ সরাইখানার দখল ছেড়ে প্রকৃত মালিকদের ফেরত দিয়ে থাকে তবে তো ভালই, অন্যথায় তুমি তার শিরচ্ছেদ করবে। ঘটনাক্রমে উক্ত মজলিসের এক ব্যক্তি হেমছে গিয়ে রুহকে এই সংবাদ অবহিত করল। অতঃপর কাব যখন তার নিকট উন্মুক্ত তরবারী হাতে উপস্থিত হল, এর পূর্বেই সে সমস্ত সরাইখানা ফেরত দিয়ে হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের প্রতিশোধ হতে আত্মরক্ষা করল।

গভীরভাবে লক্ষ্য করলে বুঝা যায় যে, রুহ ছিল ওয়ালীদের পুত্র এবং ওয়ালিদও তার পূর্বে একজন পরাক্রমশালী খলীফা এবং তার পরম আত্মীয় ছিলেন। তবুও সত্য এবং ন্যায়ের খাতিরে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ আত্মীয় ও রক্ত সম্পর্কের কোন মূল্যই দিলেন না। ইবনে হাকাম বলেছেন যে, রুহের মত উমাইয়া বংশের আরো কিছু কিছু লোক হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের সংস্কারের পাল্লায় পড়েছিল এবং তিনি তাদের নিকট হতে বে-আইনি দখলকৃত সত্তর হাজার দীনার আদায় করে বাইতুল মালে জমা দিয়েছিলেন।

ইবনে হাকام এ কথাও উল্লেখ করেছেন যে, পূর্ববর্তী খলীফাগণ বনু উমাইয়ার লোকদের জন্য যেসব ভাতা বরাদ্দ করেছিলেন, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তাও বন্ধ করে দিলেন এবং তার এক ফুফুর ভাতাও বন্ধ করে দিলেন।

তাঁর এ ফুফু তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেশ করার জন্য এক রাতে তাঁর স্ত্রী ফাতেমার নিকট আগমন করলেন। তখন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ শাহী কাজ কর্মে ব্যস্ত ছিলেন। কিছুক্ষণ পর তাঁর পুত্র এসে ঘর থেকে তাঁর ব্যক্তিগত প্রদীপ নিয়ে গেল। ফাতেমা বললেন, তিনি এ মাত্র শাহী কাজ কর্ম হতে অবসর হয়েছেন, ছেলে এসে তার ব্যক্তিগত প্রদীপ নিয়ে গিয়েছে। আপনি ভিতরে এসে অপেক্ষা করুন। অতঃপর তাঁর ফুফু ভিতরে এসে অপেক্ষা করতে থাকেন। এরপর দেখলেন, তিনি যে ঘরে এসে আহার করতে বসেছেন তার সামনে দু' টুকরো রুটি, একটু লবণ ও সামান্য তৈল ব্যতীত আর কিছুই ছিলনা। ফুফু খাদ্যের এ আয়োজন দেখে বললেন, এসেছিলাম নিজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছু কথা বলতে কিন্তু এখন দেখি তোমার সম্পর্কেই আমার প্রথম কথা বলতে হচ্ছে। অতঃপর তিনি হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের খাদ্যের সমালোচনা করে বললেন, তুমি কি এর চেয়ে উন্নত মানের আহার্য গ্রহণ করতে পার না? তখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, "আমার শ্রদ্ধেয় ফুফু আম্মা! এর চেয়ে উন্নতমানের খাদ্য গ্রহণ করার মত অবস্থা যে আমার নেই। যদি আমার সামর্থ থাকত তবে নিশ্চয়ই আপনার কথা পালন করার চেষ্টা করতাম।"

তারপর ফুফু আলোচনা শুরু করে বললেন, "তোমার চাচা আব্দুল মালেক জীবিতকালে আমার জন্য অনেক ভাতা বরাদ্দ করেছিলেন। তাঁরপর তোমার ভাই ওয়ালীদ তা আরো বৃদ্ধি করে দিয়েছিল এবং সুলায়মানও বৃদ্ধি করে দিয়েছিল কিন্তু তুমি খলীফা হয়ে আমার সে ভাতা বন্ধ করে দিলে?"

হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, ফুফুজান! আমার চাচা আব্দুল মালেক এবং আমার ভাই ওয়ালিদ ও সুলায়মান আপনাকে সাধারণ মুসলমানদের সম্পদ হতে আপনার ভাতা বরাদ্দ করেছিল। এসব সম্পদ তো আমার নয়। আমি শুধু আমার সম্পদই আপনাকে দিতে পারি, যদি আপনি সুখী হন। ফুফু জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কি পরিমাণ সম্পদ আছে? তিনি বললেন, আমার বার্ষিক আমদানী দু'শত দীনার, আপনি তা গ্রহণ করুন। ফুফু বললেন, এতে আমার কোন উপকার হবে না। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, তা ছাড়া যে আমার কাছে আর কিছু নেই! তাঁর ফুফু এ কথা শুনে ফিরে গেলেন।

হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ মোটেই অসত্য কথা বলেননি। তার বার্ষিক আমদানী ছাড়া তাঁর অন্য কোন সম্পদ ছিল না। অথচ তিনি খলীফা হবার পূর্বে মিকিদাস, জাবালুল ওয়ারস এবং ফাদাকের মত জায়গীর ছাড়াও ইয়ামামাতেও কয়েকটি জায়গীর ছিল। তিনি খলীফা মনোনীত হবার পর দ্বিতীয় দিন এ সমস্ত সম্পদ বাইতুলমালে জমা দিয়েছেন। তাঁর অধিনে ছিল একমাত্র সুয়াইদা নামক একটি ঝরণা তা হতেই তিনি বার্ষিক ১৫০ দীনার মূল্যের শষ্য পেতেন।

ইবনে জাওযি বলেন, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের এ ফুফুই একবার তাঁর বংশের পক্ষ হতে সুপারিশ করার জন্য তাঁর নিকট আসলেন। তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট বনু উমাইয়ার লোকদের আবেগ-অনুভূতি প্রকাশ করে বললেন, তোমার বিরুদ্ধে তাদের অভিযোগ হলো, তুমি তাদের রুজি কেড়ে নিয়েছ অথচ তুমি তা তাদেরকে প্রদান করনি। অন্যরা তাদেরকে এসব প্রদান করেছিল।

হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ জবাব দিলেন, সত্য ও ন্যায় যা ছিল আমি তা করেছি। তারপর তিনি একটি দীনার, একটি অঙ্গার দানি ও এক টুকরা মাংস আনতে বললেন এবং অঙ্গার দানিতে সে দীনারটি গরম করলেন। যখন তা খুবই গরম হয়ে গেল, তখন সেটা গোস্তের টুকরার উপর রেখে দিলেন। ফলে গোস্তের টুকরাটি যখন পুড়ে গেল তখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাঁর ফুফুকে বললেন, ফুফুজান! আপনি কি আপনার ভাতিজাকে এরূপ কঠিন শাস্তি থেকে বাঁচাতে চান না? তাঁর ফুফু লজ্জিত হয়ে বনু উমাইয়ার লোকদের নিকট ফিরে গেলেন এবং বললেন, তোমরা ওমর ইবনে খাত্তাবের ঘরে বিবাহও করবে অথচ তার মত সন্তান হলেও চিৎকার করবে। এখন তোমরা মজা বুঝ।

ইবনুল জাওযি বলেন গাসবা একবার ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট এসে আবেদন করল, হে আমিরুল মুমিনীন! আপনার পূর্ববর্তী খলীফাগণ আমার জন্য যে ভাতা বরাদ্দ করেছিলেন, আপনি তা বন্ধ করে দিয়েছেন। আমার পরিবার পরিজনের জন্য সম্পদের প্রয়োজন আছে। আপনি অনুমতি দিলে আমি আমার জমিতে গিয়ে চাষাবাদ করে পরিবারের ভরণ পোষণের ব্যবস্থা করতে পারি। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তাকে অনুমতি দিয়ে বললেন, চলে যাও। সে যখন দরজায় উপস্থিত হল তখন তিনি তাকে ডেকে বললেন, যদি জীবিকা সংকীর্ণ হয় তবে মৃত্যুকে অধিক মনে করবে এতে জীবিকা প্রশস্ত হয়ে যাবে। আর যদি জীবিকা প্রয়োজনের চেয়ে প্রশস্ত হয় তবুও মৃত্যুর কথা মনে করবে এতে জীবিকা কিছুটা সংকীর্ণ মনে হয়ে আসবে।

সুলায়মানের এক পুত্র হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট অভিযোগ করলেন, তার যে ধন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে তা অন্যায়ভাবে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এ সম্পত্তির পক্ষে তার নিকট দলীল আছে। সে ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে সেই দলীলটি দেখাল। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, পূর্বে এই সম্পত্তি কার ছিল? সে বলল, হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, তবে তো এটা হাজ্জাজই পাবে। সে তোমার চেয়ে বেশি হকদার। সুলায়মানের পুত্র কথার মোড় ঘুরিয়ে বলল, না এটা হাজ্জাজের ছিল না। এটা বাইতুল মালের ছিল। তখন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, তবে মুসলমানগণই এর বেশি হকদার।

এই অধিকার প্রশ্নেই হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের বংশের সমস্ত লোক তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছিল। এ সব লোক প্রত্যেক দিন তাঁর নিকট প্রতিনিধি পাঠিয়ে তাঁকে বুঝাতে চেষ্টা করত এবং তাদের দখলকৃত সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ না করতে তাঁকে পরামর্শ দিত।

একবার আব্দুল মালেকের সব চেয়ে অহংকারী পুত্র হিশাম যে বনু উমাইয়ার শাহজাদার মধ্যে নিজেকে খেলাফতের সবচেয়ে বেশি হকদার মনে করত, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট তার বংশের পক্ষে মধ্যস্থতা করতে এসে একটি মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতে তাঁকে পরামর্শ দিল। সে বলল, আমার বংশের লোকেরা বলে, যে পর্যন্ত আপনার খেলাফতের সম্পর্ক তা আপনি যা ইচ্ছা করেন, তাতে তাদের কোন আপত্তি নেই। কিন্তু আপনার পূর্ববর্তী খলিফাগণ যা করে গিয়েছেন, আপনি সেটা সে ভাবেই ছেড়ে দিন। এ ব্যাপারে কোন হস্তক্ষেপ করবেন না।

যদি অন্য কোন রাজনীতিবিদ হত এবং ন্যায়নিষ্ঠ না হয়ে রাজনীতি প্রিয় হত তবে অবশ্যই এ মধ্যম পন্থা অবলম্বন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করত না। ফলে তার বংশের লোকেরাও খুশী হত এবং তাঁর উপর কোন প্রকার অসন্তুষ্টও হত না। কিন্তু যেহেতু নিজেকে রক্ষা করা বা বংশের লোকদের খুশী করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না, উদ্দেশ্য ছিল শুধু ন্যায় ও সুবিচারের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করা- যাতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন এবং তার দায়িত্বের উপরও কোন প্রকার অভিযোগ না ওঠে। এ জন্য তিনি হিশামকে জিজ্ঞেস করলেন, যদি আমার নিকট এরূপ দু'টি ফরমান আনা হয় একটি হযরত মুয়াবিয়া (রা)-এর লিখিত এবং অপরটি আব্দুল মালেক লিখিত এবং উভয় ফরমান একই বিষয় সম্পর্কীত হয়, তবে তুমি আমাকে কোন ফরমান অনুযায়ী কাজ করতে পরামর্শ দিবে? হিশাম বলল, পূর্বেরটির। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, তবে আমি ঠিকই করেছি। কারণ আমিও আল্লাহর কিতাবকেই অগ্রাধিকার প্রদান করেছি। যে সব বিষয় আমার নিকট বলছ তা আমার যুগেরই হোক অথবা আমার পূর্বের যুগেরই হোক আমি তাতে আল্লাহর কিতাবের পরেই স্থান দিব।

হযরত ওসমান (রা) এর পৌত্র সায়ীদ ইবনে খালিদ উমাইয়া বংশের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। তিনি খুব বিনয়ের সাথে হিশামের সমর্থন করে বলছিলেন যে, আমিরুল মুমিনীন! আপনার যুগের বিষয় সমূহেরই ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর থাকুন, আপনার জন্য কল্যাণকর হবে।

হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সায়ীদকে লক্ষ্য করে বললেন, “আল্লাহ তোমাকে সৎপথ প্রদর্শন করুন, আমরা সকলেই তাঁর নিকট ফিরে যাব। মনে কর, এক ব্যক্তি কয়েকটি ছোট বড় ছেলে রেখে ইন্তেকাল করল। বড় ছেলেরা তার শক্তিতে ছোটদেরকে নির্যাতন করে তাদের ধন সম্পদ আত্মসাৎ করতে লাগল, আর তোমার নিকট ছোট ছেলেরা এসে ন্যায় বিচার প্রার্থনা করল, এখন তুমি কি করবে? খালেদ বলল, 'সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে আমি বড়দের নিকট থেকে ছোটদের হক আদায় করে দেওয়ার ব্যবস্থা করব।"

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, আমিও দেখছি যে, আমার পূর্ববর্তী শাসকগণ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, এমনকি তাদের অধীনস্থ লোকেরাও শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই জনগণকে নির্যাতন করে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। অতএব আমার কাছে ক্ষমতা আসার পর সবল হতে দুর্বলের অধিকার আদায় করে দেয়া ছাড়া আমি অন্য কোন পথই দেখতে পাচ্ছি না।

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ যথার্থই বলেছিলেন, মূলতঃ এরূপই হয়েছিল। হযরত মুয়াবিয়া (রা) এর স্থলাভিষিক্ত শাসকগণ বিশেষতঃ খলিফা আব্দুল মালেক এবং তার উত্তরাধিকারীগণ সাধারণ নাগরিকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিলেন, তাদের উত্তম ফসলোপযোগী জমিসহ অন্যান্য সহায় সম্পদ জোর করে দখল করেছিলেন। তারা সম্পূর্ণ ইরানী যুবরাজদের মতই জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত ছিলেন। সাধারণ নাগরিক ও তাদের মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান ছিল। মনে হত তারা যেন আকাশ হতেই জন্ম গ্রহণ করেছেন এবং বাকী সব লোক মাটি থেকে জন্ম গ্রহণ করেছে। তারা স্বর্ণ রৌপ্য খচিত গদীতে আরাম করতেন, স্বর্ণের বাসনে খাদ্য খেতেন, রেশমী কাপড় পরিধান করতেন। তাদের কারও আস্তাবলে সুন্দর ঘোড়ার অভাব ছিল না। তাদের প্রাসাদ রঙধনুর মত উজ্জ্বল ঝলমলে ছিল। তাদের অন্তঃপুরে দুনিয়ার সেরা সুন্দরী মহিলাগণকে দাসী হিসেবে আনা হত এবং তাদের সাথে আনন্দ উপভোগকে শুধু শরিয়ত সম্মতই মনে করত না বরং গৌরব বলেই মনে করত।

ইবনুল জাওযি বলেন, একবার যুদ্ধক্ষেত্র হতে কয়েকজন সুন্দরী যুদ্ধবন্দিনী ওমর ইবনে আবদুল আজিজের সামনে আনা হল। যখনই কোন সুন্দরী মহিলাকে তার সামনে আনা হত তখনই ওয়ালিদের পুত্র আব্বাছ মুখে পানি উঠিয়ে বলত, আমিরুল মুমিনীন! আপনি স্বয়ং একে গ্রহণ করুন। এ কথা সে বার বার বলতে লাগল। এতে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তাকে তিরস্কার করে বললেন, তুমি কি আমাকে ব্যাভিচার করার জন্য বলছ।

আব্বাছ যেরূপ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল, সে অনুযায়ী এটা ব্যাভিচার ছিল না। তার পিতা, তার চাচা এবং অন্যান্য আত্মীয়দের অন্তঃপুরে এরূপ দাসীর অভাব ছিল না। সেও ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে সে কথাই বলেছিল- যা তার পিতা, তার দাদা ও অন্যান্য আত্মীয় স্বজনকে করতে দেখেছে। কাজেই ওমর ইবনে আবদুল আজিজের এ কথায় তার মনে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করল। সে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের ঘর হতে বের হয়ে গেল এবং দরজায় অবস্থানরত তার আত্মীয়-স্বজনকে দেখে অত্যন্ত রাগান্বিত হয়ে বলল, তোমরা এ লোকের দরজায় এসে বসেছ, সেতো তোমাদের বাপ-দাদাকে ব্যাভিচারী বলছে।

আসলে এটা তার বাপ-দাদাকে ব্যাভিচারী মনে করার কথা নয়, প্রকৃতপক্ষে ইয়াযিদ হতে শুরু করে খলিফা সুলায়মান পর্যন্ত উমাইয়া বংশীয় যুবরাজগণ সম্পূর্ণরূপেই শরিয়ত বিরোধী জীবনযাপনে অভ্যস্থ ছিল। তারা সমালোচনার উর্ধ্বে ছিল না। তাদের জীপনযাপন পদ্ধতি সম্পূর্ণরূপেই ইসলামের পরিপন্থী ছিল।

ইসলাম এ জন্য আবির্ভূত হয়নি যে, কোন মানুষ অপর কোন মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করবে, আমীর লোকেরা অন্তঃপুরে হাজারও সুন্দরী রমণী রেখে ভোগ বিলাস করবে আর সর্বসাধারণের সহায় সম্পদ জোর করে নিজের আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে বণ্টন করে দিবে। অপরদিকে সাধারণ মানুষ ক্ষুধা দারিদ্রের কবলে নিষ্পেষিত হয়ে অসহায়ভাবে মৃত্যুবরণ করবে।

আল্লাহর কিতাব এবং মহানবীর (স) জীবনাদর্শ এরূপ জীবন উপভোগের অনুমতি দান করেনি বলেই হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ দাসী ব্যবহার করা থেকে বিরত ছিলেন।

যা হোক, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ যখন খালেদকে এসব কথা বললেন, তখন সে নির্বাক হয়ে গেল এবং অবশেষে বলল, আল্লাহ আপনার সহায় হোন।

খালেদ অবশ্যই চরিত্রবান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে সৎকর্ম করার জন্যে দোয়া করেই বিদায় হলেন। কিন্তু ওয়ালিদের পুত্র শাহী জীবন যাপনে অভ্যস্থ ছিল, সে কঠোর ভাষায় ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে তিরস্কার করে তাঁকে একটি পত্র লিখল। 'তুমি তোমার পূর্ববর্তী খলিফাদের দোষ-ত্রুটি খোঁজ করছ, তাদের উপর অভিযোগ দাঁড় করছ। তুমি তাদের প্রতি ও তাদের সন্তানদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন পথ অবলম্বন করছ। তুমি কোরাইশ বংশীয় লোকদের ও তাদের ধন-সম্পদের উপর জুলুম করে অন্যায়ভাবে তা বাইতুল মালে জমা করে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহপাক যাদের সাথে প্রীতির সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে নির্দেশ দিয়েছেন, তা লঙ্ঘন করেছ।

হে আব্দুল আজিজের পুত্র! আল্লাহকে ভয় কর। তুমি জালিম, এ মসনদে তুমি তৃপ্তি লাভ করতে পারছ না। তুমি তোমার অন্তরের দুর্বার আগুন নিভাবার জন্যই নিজের আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি জুলুম-অত্যাচার শুরু করেছ।

আল্লাহর কসম! যিনি মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা) কে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করেছিলেন, তুমি তোমার শাসনের সামান্য সময়ের মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর নবী (সা)-এর পথ থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছ। অথচ তোমার এ শাসন আমলকে তুমি একটি পরীক্ষা মনে করছ। তোমার উপরও একজন পরাক্রমশালীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রয়েছে। তুমি তাঁর শক্তি অতিক্রম করতে পারবে না এবং তিনি তোমার এসব জুলুম-অত্যাচারকেও ক্ষমা করবেন না।

এ ব্যক্তি হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে যে সব জুলুম-অত্যাচারের অভিযোগ উত্থাপন করেছে তা কি বাস্তবিকই জুলুম অত্যাচার ছিল? তা শুধু এ ছিল যে, তিনি তার নিকট হতে এবং তার আত্মীয় -স্বজনদের নিকট হতে মুসলমানদের অধিকার আদায় করে প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দিতে শুরু করেছিলেন। স্বয়ং জালিমগণ অবিচারকে সুবিচার আর সুবিচারকে অবিচার বলে মনে করেছিল।

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ খুব উত্তম ও সঠিকভাবেই তার উত্তর লিখেছিলেন যে, "তুমি মনে কর যে, আমি জালিম-অত্যাচারী। কারণ আমি তোমাকে ও তোমার আত্মীয় স্বজনকে আল্লাহপাকের সে সমস্ত সম্পদের অংশ দিতে রাজী নই যা কেবল আত্মীয়-স্বজন, দরিদ্র ও বিধবাদের জন্যই নির্ধারিত ছিল।

তুমি আমার উপর এ অভিযোগ আনার সময় ভুলে গেলে কেন আমার চেয়েও বড় জালিম সে ব্যক্তি যে, তোমার মত একটি নির্বোধকে শুধু পিতৃস্নেহেই একটি বিরাট মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি নিয়োগ করেছিল, আর তুমি যথেচ্ছাভাবে মুসলিম বাহিনীর উপর কর্তৃত্ব করেছিলে। তোমার এ নিয়োগের পশ্চাতে পিতৃস্নেহ বৈ আর কোন কারণ ছিল কি? না আর কোন কারণ ছিল না।

আফসোস! তোমার ও তোমার পিতার বিরুদ্ধে কিয়ামতের দিন কত লোক যে অভিযোগ করবে, সে দিন তোমরা কিভাবে এ অভিযোগকারীদের থেকে আত্মরক্ষা করবে, তা ভেবে অস্থির হই।

আমার চেয়ে বহু গুণ বেশি জালিম সেই ব্যক্তি, যে হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ ছাকাফীর মত নরাধমকে আরবের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিল। এই হাজ্জাজ বিনা কারণে মুসলমানদের হত্যা করত এবং তাদের ধন-সম্পদ লুট করে নিত।

আমার চেয়েও বহু গুণ বেশি জালিম সে ব্যক্তি, যে কুরয়া ইবনে শুরাইকের মত চরিত্রহীন, অসভ্য ও মুর্খকে মিশরের শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োগ দান করেছিল এবং তাকে প্রকাশ্যভাবে অনর্থক খেলাধুলা, মদ্যপানসহ সকল প্রকার অন্যায় অপকর্মের অনুমতি দিয়েছিল। আমার চেয়েও শতগুণ জালিম এবং আল্লাহর আইন লঙ্ঘনকারী সে ব্যক্তি, যে আলিয়া বারবারিয়াকে মুসলমানদের সম্পদের অংশীদার করে দিয়েছিল। যদি আমি পর্যাপ্ত সময় পেতাম তবে আমি আল্লাহর সম্পদ এবং مسلمانوں অধিকার পূর্ণভাবে তোমাদের কাছ থেকে আদায় করে তাদের নিকট ফিরিয়ে দিতাম এবং তোমার ও তোমার বংশের সকল গর্বই খর্ব করে দিতাম। দীর্ঘ দিন যাবত তোমরা সাধারণ নাগরিকদের সম্পদ লুণ্ঠন করে খাচ্ছ। আল্লাহর কসম! এখন যদি তোমাদেরকে গোলাম বানিয়ে বিক্রয় করে দেয়া হয় এবং সেই বিক্রয়লব্ধ অর্থ বঞ্চিত, বিধবা, ইয়াতিম ও দরিদ্রের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয় তবুও তোমাদের কৃত জুলুম-অত্যাচারের ক্ষতি আদায় হবে না।

আমরা জানিনা, ইবনে ওয়ালিদ এই পত্র পেয়ে তা বাড়াবাড়ি বলে মনে করেছিল কি না। তবে সত্য কথা হলো, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ ওয়ালিদের পুত্রকে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত করেননি।

কুররা ইবনে শুরাইক এবং হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ বনু উমাইয়ার ললাটে দু'টি কলঙ্কের ছাপ ছিল। এই দু' জালিমের একজন মিশরে অত্যাচারের স্টীমরোলার চালিয়েছিল, অপর জন ইরাকে রক্তের নদী প্রবাহিত করেছিল। বিশেষতঃ হাজ্জাজ ছিল সে যুগের হালাকু খাঁ। পার্থক্য ছিল শুধু এ যে, হালাকু খাঁ ছিল অমুসলিম আর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ ছিল মুসলমান এবং নিজেকে হাফিজে কুরআন দাবী করত। হালাকু খাঁর অপরাধ ক্ষমাযোগ্য কিন্তু হাজ্জাজের অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য। এ হাজ্জাজই উমাইয়া খলিফা আব্দুল মালেকের অতি প্রশংসনীয় ব্যক্তি ছিল। তিনি মৃত্যুর সময় তার পুত্র ওয়ালিদকে অছিয়ত করেছিলেন যে, হাজ্জাজই তোমাদের সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। সবসময় তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করবে, কাউকেও তার উপর প্রাধান্য দিবে না।

ইবনে খালকান বলেন, বাস্তবিকই হাজ্জাজ সমকালীন যুগে বিশিষ্ট বাগ্মী ও পবিত্র কোরআনের হাফিজ ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এ হাফিজে কোরআনই আব্দুল মালেকের রাজত্বকে সুসংহত করতে কাবা শরীফের উপর পাথর নিক্ষেপ করতেও সংকোচবোধ করেনি। এ জালিম শাসক পবিত্র কাবার চার দেওয়ালের ভিতরে রক্তনদী বহাতেও তার বিবেক দংশন করেনি। সে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা) ও তাদের মুখে থুথু নিক্ষেপ করেছিল যারা মহানবী (সা)-এর পবিত্র চেহারা হতে নূর গ্রহণ করে ধন্য হয়েছিলেন। যে হযরত আনাস (রা) যিনি একাধারে দীর্ঘ দশ বৎসর মহানবী (সা)-এর সঙ্গী ছিলেন, তার উপর কঠোরতা করত এবং তাকে অপদস্ত করতেও বিন্দুমাত্র ইতস্তত করেনি। এ পাপিষ্ঠ হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রা)-এর মত বিশিষ্ট যুগশ্রেষ্ঠ সাহাবীর লাশ মুবারক চল্লিশ দিন পর্যন্ত শূলিতে ঝুলিয়ে রেখেছিল।

এ পাপিষ্ঠ কা'বা শরীফের উপর পাথর নিক্ষেপ এবং সাহাবীগণের সন্তানগণকে হত্যা করেও এই অপরাধের জন্য জীবনে কোন দিন অনুতপ্ত হয়নি এবং লজ্জিত হয়নি। সে কুফার লোকগণকে অত্যাচারে জর্জরিত করেছিল। অনেক নিরপরাধ জ্ঞানী গুণী মানুষকে হত্যা করেছিল, শুধু এ অপরাধে যে, তাঁরা আব্দুল মালেককে ন্যায় হিসেবে মানতে পারেননি। সে বিনাদ্বিধায় মুসলমানদের ধন-সম্পদ লুট করেছিল, তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল এবং নিষ্পাপ মানুষের রক্ত দিয়ে আল্লাহর জমিনকে রঙ্গীন করে তুলেছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00