📄 মদীনার শাসনকর্তা ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) যে পদ লাভ করেছিলেন, এটা অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদার পদ ছিল। তিনি মদীনাকে সীমাহীন ভালবাসতেন। যেখানে সরওয়ারে দু'আলম (সা) চিরনিদ্রায় আরাম করছেন, ইসলাম আশ্রয় গ্রহণ করেছিল, যা ইসলামের প্রধান কেন্দ্র ছিল, হযরত উরুয়া, হযরত ইকরামা, হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব, হযরত আবু সালমা, হযরত আবু বকর ইবনে আবদুর রহমান, হযরত উবায়দুল্লাহ ইবনে ওতবা এবং হযরত সালেহ ইবন কাইসান (রঃ) প্রমুখ মহামনীষীগণ এবং আরও অন্যান্য বিশিষ্ট আলেমগণ অবস্থান করছিলেন, সেই পবিত্র ভূমির প্রতি তাঁর আন্তরিক আকর্ষণও ছিল সীমাহীন।
ওয়ালীদ যখন তাঁকে এ পদে নিযুক্ত করেন তখন তাঁর সন্তুষ্টিতে নিযুক্ত করেছিলেন, না ওয়ালীদ নিজের ইচ্ছায়ই এরূপ করেছিলেন ঐতিহাসিকগণ এদিকে কোন ইঙ্গিত দেননি। তবে এতটুকু সত্য যে, মদীনার শাসনকর্তার পদ লাভ করে তিনি অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন।
ইবনুল জাওযির মতে ৮৭ হিজরীতে তিনি মদীনার শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়েছিলেন। ঐতিহাসিক ইবনে সাদও এ কথাই বলেন। কিন্তু ইবনে কাছীর তাঁর এ নিযুক্তি ৮৬ হিজরীর ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ আবদুল মালেকের মৃত্যুর অব্যাবহিত পরেই তাঁকে মদীনার শাসনকর্তার পদে মনোনীত করা হয়। এ দু'টি মতের ঐক্য এরূপই হতে পারে যে, তিনি ৮৬ হিজরীতে নিযুক্ত হয়েছিলেন সত্য, তবে ৮৭ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে তিনি মদীনায় শুভাগমন করেছিলেন।
(ইবনুল জওযি- ৩২, ইবনে সা'দ ৫ম, ২৪৪ পৃ.; ইবনে কাছীর ৮ম খণ্ড, ১৯৪) এ সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৫ বছর। যদি বয়সের এ বর্ণনা সঠিক বলে ধরা যায়, তবে তাঁর জন্ম ৬১ হিজরীতেই হয়েছে বলে স্বীকার করে নিতে হবে।
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) তাঁর স্ত্রী, সেবক-সেবিকা ও অনুচরগণসহ ৮৭ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে শাহজাদার বেশেই মদীনায় শুভাগমন করলেন।
ইবনে সাদ বলেন, তাঁর পোষাক-পরিচ্ছদ ছিল খুবই সুন্দর, তিনি সবসময় সুগন্ধি দ্রব্য ব্যবহার করতেন। তাঁর চাল-চলনে নমনীয়তা ছিল। যে দিয়ে চলতেন সুগন্ধিতে মোহিত হয়ে যেত। তিনি এতই মূল্যবান পরিধান করতেন যে লোকেরা তাঁকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন।
থাকত। তার পায়জামার আঁচল পায়ে জড়িয়ে থাকত, তাঁর কুঞ্চিত কেশ তাঁর ললাটদেশে এসে পড়ত।
ইবনে আবদুল হাকাম বলেন, তাঁর চাল-চলনে আমীরানা এবং আড়ম্বরপূর্ণ ভাব ছিল। কিন্তু সাথে সাথে এ কথাও স্বীকার করেছেন যে, এ আড়ম্বরপূর্ণ ভোগ-বিলাস সত্ত্বেও তিনি কখনও হারাম মাল ভক্ষণ করতেন না, পরস্ত্রীর প্রতি কোনদিন ফিরে চাননি এবং কখনও শরীয়ত বিরোধী কোন আদেশ জারী করতেন না।
তিনি যখন মদীনায় এসে শাসনভার গ্রহণ করলেন, তখন মদীনার দশজন বিশিষ্ট ফকীহ ও আলেমকে একত্রিত করলেন। ইবনুল জাওযির ভাষ্যটি হল-
وَدَعَا عُمَرُ عَشَرَةَ نَفَرًا مِنْ فُقَهَاءِ الْبَلْدَةِ مِنْهُمْ عُرْوَةَ وَالْقَاسِمُ والسَّالِمُ فَقَالَ إِنِّي دَعَوْتُكُمْ الأَمْرِ تُوجَرُونَ فِيهِ وَتَكُونُونَ فِيهِ أَعْوَانًا عَلَى الْحَقِّ إِنْ رَأَيْتُمْ أَحَدًا يتعدى أَوْ بَلَغَكُمْ مِّنْ عَامِلٍ لِي ظَلَامَةً فَأَخْبِرُونِي بِاللَّهِ وَتُوجَرُونَ -
ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) শহরের বিশিষ্ট দশজন ব্যক্তিকে ডেকে আনলেন। তন্মধ্যে উরুয়া, কাসেম এবং সালেমও ছিলেন এবং তিনি তাদেরকে বললেন, আমি আপনাদেরকে এ উদ্দেশ্যেই কষ্ট দিয়েছি যে, আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা আমার কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন। যদি আপনারা আমার কোন কর্মচারীকে জুলুম করতে দেখেন অথবা কারো প্রতি জুলুমের সংবাদ পান তবে আপনাদের উপর দায়িত্ব হল যে, সে ব্যাপারে আমাকে জানাবেন। তারা তাঁর এ আবেগ-অনুভূতির প্রশংসা করে সর্বোতোভাবে তাঁকে সাহায্য-সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফিরে গেলেন। (ইবনুল জাওযি ৩২)
ইবনুল জাওযি লিখেছেন, যখন ওয়ালীদ ওমর ইবনে আবদুল আজীজকে মদীনার শাসনকর্তার পদে নিযুক্ত করলেন, তখন তিনি মদীনায় যেতে বিলম্ব করতে লাগলেন। এতে ওয়ালীদ তার প্রধান উজিরকে জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কি? ওমর তার দায়িত্ব পালন করতে যায় না কেন? প্রধান উজির বললেন, ওমর শর্ত পেশ করেছেন! তারপর ওয়ালীদ ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি কি শর্ত আছে? ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, আমার পূর্ববর্তী শাসকগণ জুলুম-অত্যাচার করেছে। তারা অন্যায়-অবিচার করে আমদানী বৃদ্ধি করেছে, আমি জুলুম-অত্যাচার করতে পারব না, আমদানীও বৃদ্ধি করতে পারব না। (তাবকাতে ইবনে সাদ ৫ম খণ্ড, পৃ. ২৪৪)
ওয়ালীদ বললেন, আপনি সর্বদাই সত্য-ন্যায় পথ অবলম্বন করবেন। আমার অনুমতি থাকল, যদি এতে আপনি এক পয়সাও কেন্দ্রে পাঠাতে না পারেন তবুও আপনি অন্যায়-অত্যাচার করবেন না।
যখন ওয়ালীদ তাঁর সকল শর্ত মেনে নিয়ে তাঁকে পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করলেন, তখন তিনি মদীনায় গিয়ে সর্বত্র ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করলেন। মদীনা ছাড়া মক্কা এবং তায়েফও তাঁর শাসনাধীন ছিল।
*তিনি ন্যায়বিচার ও সাধারণ মানুষের অধিকার সংরক্ষণের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেন। মদীনার সর্বশ্রেষ্ঠ ফকীহ, আল্লাহভীরু ও ন্যায়পরায়ণ বিচারক আবু বকর ইবন হাযমকে তিনি প্রধান বিচারপতি পদে নিযুক্ত করলেন। মক্কা এবং তায়েফেও এ ধরণের ব্যক্তিগণকে বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন।
কর আদায়ের ক্ষেত্রে সকল প্রকার কঠোরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। যেমন মদীনার ফকীহগণকে বলা হয়েছিল যে, যেখানেই তাঁরা কোন অন্যায়-অবিচার হতে দেখবেন, তাঁরা তাঁকে জানাবেন, মক্কা, তায়েফ এবং অন্যান্য স্থানের ফকীহগণের নিকট অনুরূপ আবেদন পেশ করা হল।
ওমর ইবনে আবদুল আজিজ মদীনার শাসনকর্তা হিসেবে যেরূপ ন্যায়পরায়ণতা, সুবিচার ও নিষ্ঠার সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন, যার ফলেই মদীনার সবচেয়ে বেশি আত্মমর্যাদাশীল ও সাম্রাজ্যবাদবিদ্বেষী ফকীহ সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব (র) তাঁকে মাহদী উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
ইবনে সাদ বলেন- একদা কোন এক ব্যক্তি সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব (র) কে জিজ্ঞেস করল যে, মাহদীর গুণাবলি কি কি? তিনি বললেন, মারওয়ানের বাসভবনে গিয়ে নিজের চোখে মাহদীকে দেখে আস। (তাবকাতে ইবনে সাদ ৫ম খণ্ড ১৪১ পৃ.)
অতএব এ ব্যক্তি মারওয়ানের বাসভবনে এসে অন্যান্য সাক্ষাৎ প্রার্থীদের সাথে অপেক্ষা করতে লাগল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) অনুমতি দিলে তাদের সাথে সেও ভিতরে প্রবেশ করল এবং ওমর ইবনে আবিদুল আজিজ (র) কে দেখে এসে সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব (র) কে বলল, আমি মারওয়ানের বাসভবনে গিয়েছিলাম কিন্তু মাহদী সম্পর্কে আমাকে কেউ কিছু বলল না এবং কেউ মাহদীর প্রতি ইঙ্গিতও করল না।
তখন সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব (র) বললেন, তুমি কি ওমর ইবনে আবদুল আজীজকে সিংহাসনে উপবিষ্ট দেখনি? সে বলল, হ্যাঁ, দেখেছি। তিনি বললেন, তিনিই যুগের মাহদী।
আসলেই তিনি মাহদী ছিলেন। সাধারণ মানুষ পরবর্তীতে তা বুঝতে পেরেছিল। হযরত সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব (র) মদীনার সেই সমস্ত আলেমদের অন্যতম ব্যক্তি, যিনি কোন শ্রেষ্ঠ বা কোন সীমাহীন জালেম নরপতির সামনে মাথা নত করেননি। তিনি ওয়ালীদের মত খলিফার সম্মানার্থে দাঁড়াতে পছন্দ করেননি। তিনি ছিলেন হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর বিশিষ্ট শিষ্য। তিনি ছিলেন শরীয়তের জ্ঞানের বিশাল সমুদ্র। তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)কে সম্মান করতেন।
ইবনে হাকাম বলেন, একবার ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) কোন প্রয়োজনীয় বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য মসজিদের নিকট এসে তার দূতকে হযরত সাঈদ ইবনে মুসায়্যাবের নিকট প্রেরণ করলেন। দূত ভুল করে হযরত সাঈদ ইবনে মুসায়্যাবকে (র) বলল, আমীর! আপনাকে স্মরণ করেছেন। অথচ হযরত সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব (র) কোন আমীর বা বাদশাহর ডাকে কোনদিনই সাড়া দেননি। এবারের আহ্বানকারী যেহেতু ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাই সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব (র) উঠে দাঁড়ালেন এবং সামনে অগ্রসর হতে লাগলেন। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাঁকে উঠতে দেখেই দৌড়িয়ে তাঁর নিকট গিয়ে বললেন, হে মুহাম্মদের পিতা! আমি আপনার নিকট যাচ্ছি, আপনি কি স্বস্থানে ফিরে যাবেন না? আমার দূত আপনার নিকট হাজির হয়েছিল আমাদের প্রয়োজনীয় বিষয় সম্পর্কে অবগত করতে। আমি আপনাকে ডেকে নিতে তাকে আপনার নিকট পাঠাইনি। সে ভুল করেছে। আমি শুধু জিজ্ঞেস করার জন্যই তাকে পাঠিয়েছিলাম।
ইবনে আবদুল হাকام ফকীহ সায়ীদ ইবন মুসায়্যাবের কঠোর স্বভাবের কথা আলোচনা করে বলেছেন, একদিন রাত্রে হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব (র)-এর বৈঠকের পার্শ্বেই নামায পড়ছিলেন। তিনি খুব জোরে কিরাত পড়তে অভ্যস্ত ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে জোরে জোরে কিরাত পড়ছিলেন। হযরত সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব (র) তাঁকে জোরে কিরাত পাঠ করতে শুনে তার খাদেম বারাদকে বললেন, হে বারাদ! এ লোকের কিরাত আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে, একে সরিয়ে দাও না! গোলাম বারাদ কিরাত পাঠকারীর মর্যাদা সম্পর্কে অবগত ছিল, কাজেই তাঁকে সরানোর চেষ্টা করল না। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ কিরাত পড়তেই লাগলেন। পুনরায় হযরত সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব (র) বললেন, তোমার জন্য দুঃখ হয়, আমি না তোমাকে এই ক্বারীকে সরিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছিলাম! বারাদ উত্তরে বলল, হুজুর! মসজিদ শুধু আমাদের জন্যই নয়।
বারাদ নেহায়েত সত্য কথাই বলেছিল, মসজিদ শুধু তাঁর একার জন্য ছিল না। সমস্ত মুসলমানের জন্যই। হযরত, ওমর ইবন আবদুল আজিজ (র) একথা শুনে নিজেই মসজিদের শেষ প্রান্তে চলে গেলেন।
(ইবনুল হাকام ২২ পৃ).
তিনি নবী করীম (সা)-এর মসজিদের সীমাহীন সম্মান করতেন। তিনি যখন কোন রাত্রে মসজিদে নববীতে অবস্থান করতেন, তখন তাঁর কোন স্ত্রী বা বাঁদীকে মসজিদে আসার অনুমতি দিতেন না। কারণ এতে মসজিদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতে পারে। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) যতদিন মদীনার শাসনকর্তা ছিলেন, ততদিন খলিফা ওয়ালীদকে এবং তারপর সুলায়মানকেও মদীনা কিংবা তাঁর শাসনাধীন কোন অঞ্চলে কোন নির্যাতনমূলক আদেশ জারী করতে দেননি।
এ প্রসঙ্গে ইবনুল হাকام একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন- একবার সুলায়মান হজ্জ করার উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করলেন। ওমর ইবন আবদুল আজিজও তাঁর সাথে ছিলেন। রাত্রে তিনি তার বাহনেই শয়ন করেছিলেন। তাঁর বাহন কুষ্ঠ রোগীদের আশ্রয় কেন্দ্রের নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিল, এমন সময় সেখান থেকে খুব গোলমালের শব্দ শুনা গেল। এ গোলমালের শব্দে সুলায়মানের নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটল। তিনি উঠে বসলেন এবং লোক পাঠিয়ে তাদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হলেন যে, এরা কুষ্ঠ রোগী। তখন রাগান্বিত হয়ে তাদের এ বস্তিতে আগুন জ্বালিয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন।
এ নির্যাতনমূলক নির্দেশের কথা হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ জানতে পেরে আদেশ কার্যকরী দলকে বাঁধা দিলেন এবং তিনি সুলায়মানের নিকট গিয়ে এরূপ নির্যাতনমূলক আদেশ থেকে বিরত করলেন এবং তাদের বস্তি জ্বালিয়ে দেয়ার পরিবর্তে তাদেরকে এস্থান থেকে অন্যত্র সরিয়ে দিতে অনুমতি গ্রহণ করলেন।
ওমর ইবনে আবুল আজিজ ব্যক্তিগতভাবেই হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফকে পছন্দ করতেন না। একবার হাজ্জাজ খলীফা ওয়ালীদের নিকট থেকে অনুমতি গ্রহণ করলেন যে, তিনি হজ্জ করতে মক্কায় গিয়ে হজ্জ শেষে মদীনা যাবেন তারপর প্রত্যাবর্তন করবেন। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ হাজ্জাজের এ অভিপ্রায় জানতে পেরে ওয়ালীদকে লিখলেন, হাজ্জাজ এ স্থান হয়ে অতিক্রম করুক, এটা আমি মোটেই পছন্দ করি না। ওয়ালীদ এ চিঠি পেয়েই হাজ্জাজকে লিখলেন, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তোমার মদীনা হয়ে যাতায়াত করা পছন্দ করেন না, কাজেই তোমার উচিত এ দিক দিয়ে অতিক্রম না করা। (ইবন আবদুল হাকাম, ১১-১৩; ইবন কাছীর ৮ম খণ্ড, পৃ. ১৯৪)
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ দীর্ঘ ছয় বছর মদীনার শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। এ সময়ে তাঁর কোন কর্মচারী কোন প্রজাকেই জুলুম করতে সাহস পায়নি। যদিও ঐতিহাসিকগণ তাঁর মদীনার শাসনামলের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেননি, তবুও ইবন কাছীর বলেন, এ সময় সামাজিক সৌহার্দ ও প্রজাদের সাথে কর্মচারীদের আচরণের দিক দিয়ে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ যুগ হিসেবে পরিচিত ছিল। যখনই কোন সমস্যা দেখা দিত তিনি মদীনার বিশিষ্ট দশজন ফকীহকে ডেকে পরামর্শ গ্রহণ করতেন। তাঁদের পরামর্শ ব্যতীত তিনি কোন সমস্যারই সমাধান করতেন না।
এ সমস্ত মনীষীগণ ছিলেন, হযরত উরুয়া, হযরত উবায়দুল্লাহ, হযরত আবদুল্লাহ, হযরত আবু বকর ইবনে আবদুর রহমান, হযরত আবু বকর ইবনে সুলায়মান, হযরত সুলায়মান ইবনে ইয়াসার, হযরত কাসেম ইবনে মুহাম্মদ, হযরত সালেম ইবনে আবদুল্লাহ এবং হযরত খায়েজা ইবন যায়েদ (র)।
আয-যাহরী তাযকেরাতুল হুফফাযে এবং সাদ তাবকাতের ৫ম খণ্ডে এ সমস্ত পণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে বলেছেন যে, তাঁরা ছিলেন মদীনার সবচেয়ে বড় ও বিশিষ্ট ফকীহ এবং ইসলামের আদর্শ ও উদ্দেশ্যের ধারক ও বাহক।
ইবনে কাছীর এ দশজন ছাড়া হযরত সায়দ ইবনে মুসায়্যারের (র) কথাও উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন যে, তিনি হযরত সায়দ ইবনে মুসায়্যাব (র)-এর কোন সিদ্ধান্তই অমান্য করতেন না। হযরত সায়দ ইবনে মুসায়্যাবও এমন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন আলেম ছিলেন যে, তিনি কোন খলীফার দরবারেই গমন করতেন না। কিন্তু হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) মদীনার শাসনকর্তা থাকাকালীন তিনিও তাঁর নিকট গমন করতেন।
ইসলামের বিরুদ্ধে অগণতান্ত্রিক ব্যক্তি শাসনের অভিযোগকারী গণতন্ত্রের ধজাধারীদের চিন্তা করা উচিত যে, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) খলীফা ছিলেন না। তিনি মাত্র একজন প্রাদেশিক শাসনকর্তার পদে অধিষ্ঠিত হয়ে দেশের সেরা দশজন বিশিষ্ট পণ্ডিত ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি পরামর্শ সভার ব্যবস্থা করেছিলেন কেন? পবিত্র কুরআনের এ নির্দেশকে وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ (পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ কর) বাস্তবায়িত করার উদ্দেশ্যেই নয় কি? আধুনিক গণতন্ত্র এর চেয়েও উন্নত মানের পরামর্শ সভার আদর্শ স্থাপন করতে পেরেছে কি?
মদীনায় ছয় বছরের শাসনামলে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) সত্য-ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে জনসাধারণকে সুখী ও সমৃদ্ধশালী করেছিলেন। তিনি দেশের সর্বশ্রেণীর নাগরিকদের কল্যাণের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজ করেছিলেন।
মক্কা-মদীনার আশেপাশে কূপ খনন করে জনসাধারণের পানির অভাব দূর করেছিলেন। মসজিদে নববী সংলগ্ন বাগানটিতে একটি ঝর্ণা ও একটি হাউজ নির্মাণ করে আগতদের পানির অভাব পূরণ করেছিলেন। তিনি হেজাজের রাস্তাঘাট সংস্কার করেছিলেন, বিশেষতঃ মক্কা-মদীনা এবং তায়েফের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী রাস্তাসমূহের সংস্কার সাধন করে পর্যটনের পথ সহজ করে দিয়েছিলেন।
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কীর্তি হল মসজিদে নববী পুনঃনির্মাণ ও তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি। এ বিরাট কীর্তি তিনি মদীনায় শুভাগমন করার এক বছর পর অর্থাৎ ৮৮ হিজরীর সফর মাসে শুরু করেন। (মুয়াজ্বামূল বুলদান, ৪র্থ খণ্ড, ৬৬ পৃষ্ঠা; বালাযুরী ৭৬; মকাদ্দাসী ৪৭৭; ইবনে সাদ ২য় খণ্ড)
ঐতিহাসিকগণ খলিফা ওয়ালীদকে মসজিদের নির্মাতা বলে উল্লেখ করেছেন, তা যথার্থই করেছেন। খলিফা ওয়ালীদ এ হিসেবেই এর নির্মাতা যেহেতু, তিনি এ মহান কর্মকাণ্ডের জন্য বিপুল সাজ-সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি স্বর্ণ-রৌপ্য গাড়ী বোঝাই করে ওমর ইবনে আবদুল আজীজের নিকট প্রেরণ করেছিলেন।
সিরিয়া, মিশর ও আফ্রিকার বিভিন্ন স্থান থেকে উন্নতমানের প্রকৌশলী এনে মদীনায় প্রেরণ করেছিলেন। যেখানেই উত্তম পাথর পাওয়া গিয়েছে সেখান থেকেই মর্মর, রুখام ও মূসা পাথর গাড়ী বোঝাই করে মদীনায় প্রেরণ করেছিলেন।
যখন মসজিদে নববীর পুনঃনির্মাণ কাজ শুরু হল তখন মনে হল মসজিদে নববী নয়, সমগ্র মদীনাই যেন পুনঃনির্মিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটা মদীনার পুনঃনির্মাণ ছিল না, এটা ছিল প্রেম-প্রীতির দুনিয়ার নব নির্মাণ।
ইবনে সাদ বলেন- ওয়ালীদ ও ওমর ইবনে আবদুল আজিজ মসজিদে নববীর পুনঃনির্মাণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন এজন্যই যে, তখন মুসলমানদের সংখ্যা অগণিত ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল, নামাযের সময় মসজিদে স্থান সংকুলান হতো না। যদিও হযরত উমর ফারুক (রা) ও হযরত ওসমান (রা) নিজ নিজ যুগে মসজিদে নববীকে বিশেষভাবে সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেছিলেন, তবুও মসজিদে নামাযীর সংখ্যা এতই বৃদ্ধি পাচ্ছিল যে, মসজিদের বাইরের মহল্লায়ও মুসাল্লা বিছিয়ে নামায পড়তে হত।
হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) এ অবস্থায় মুসল্লীদের দুদর্শার কথা খলিফা ওয়ালীদকে জানালে ওয়ালীদ এই মহান কাজ সম্পাদন করে এক অমর গৌরবের অধিকারী হলেন।
মসজিদে নববী পূননির্মাণের প্রেরণা দানকারী ওমরই হোক অথবা ওয়ালীদ নিজে নিজেই উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকুক, মসজিদে নববীর পুনঃনির্মাণের কাজ শুরু হলে শুধু মদীনায়ই নয়, মদীনার পার্শ্ববর্তী এলাকা, মক্কা এবং আরও বহু দূর-দূরান্ত থেকে দর্শকগণ এসে মদীনায় ভীড় জমাচ্ছিল। তখন মসজিদে নববী প্রদর্শনীর রূপ ধারণ করেছিল।
পুরাতন মসজিদ ভেঙ্গে দেয়া হল, তার সাথে সাথে খড়-কুটা ও খেজুর পত্র দ্বারা নির্মিত রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সহধর্মীনীদের (রা) পবিত্র হুজরাসমূহও ভেঙ্গে দেয়া হল।
ঐতিহাসিক ইবনে সাদ যার নিকট থেকে ঘটনা বর্ণনা করেছেন, তার অবস্থা বর্ণনা করে বলেন যে, বর্ণনাকারী অশ্রুসিক্ত নয়নে বলছিল, আফসোস! যদি ঐ পবিত্র হুজরাসমূহ ভেঙ্গে না দেয়া হত, তবে আগত দিনের মুসলমানগণ দেখতে পারত, তাদের নবী (সা) কিভাবে জীবনযাপন করতেন, উম্মাহাতুল মুমিনীনগণ কেমন হুজরায় বসবাস করতেন।
(তাবাকাতে ইবনে সাদ, ২য় খণ্ড)
বাস্তবিকই এ সমস্ত হুজরাসমূহ দর্শনীয় স্মৃতিই ছিল। হুজরার দেওয়াল, ছাদ এবং তাঁদের শয্যা আগত দিনের মুসলমানদের চোখের মনি হিসেবেই বিবেচিত হতো। কিন্তু এ খড়-কুটায় নির্মিত হুজরাসমূহ আজীবন রক্ষা করা মোটেই সম্ভবপর ছিল না। মাত্র পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই তার অধিকাংশগুলিই ভেঙ্গে গিয়েছিল, দেওয়ালে অসংখ্য ছিদ্র হয়ে গিয়েছিল, ছাদ ঝুলে পড়েছিল।
তা না হলে দশজন বিশিষ্ট ফকীহ যাঁদের মধ্যে হযরত সায়দ ইবনে মুসাইয়্যাব, হযরত আবু বকর ইবনে আবদুর রহমান, হযরত ইবনে হাজম, হযরত সালেম এবং হযরত উরুয়া (র)-এর মত নবী প্রেমিকগণ কখনও এ সমস্ত পবিত্র হুজরা ভাঙ্গার সম্মতি দিতেন না। এমনকি হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকটও এ খড়-কুটা ও মাটির নির্মিত পবিত্র মসজিদ এবং হুজরাসমূহ অত্যন্ত পবিত্র ও শ্রদ্ধেয় ছিল। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বগুণসম্পন্ন মহামানব জনাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) এবং তাঁর অনুসারীগণ। তিনি কখনও এসব ভাঙ্গতে সাহস করতেন না। এ মসজিদও এসব হুজরা যখন ভাঙ্গা হয় তখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ কেঁদেছিলেন, সায়দ ইবনে মুসাওয়াবের দু' চোখেও অশ্রু বন্যা প্রবাহিত হচ্ছিল।
কেবল উম্মাহাতুল মুমিনীনদের হুজরা সমূহই অত্র মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, বরং আশপাশের সমস্ত ঘর-বাড়ীও ক্রয় করে মসজিদ বৃদ্ধির কাজে শামিল করা হল।
যখন সমস্ত বাড়ী-ঘর ভেঙ্গে দিয়ে মসজিদের ভিত্তি তৈরি শুরু হল, তখন হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ যে দশজন বিশিষ্ট ফকীহদের পরামর্শক্রমে এ সমস্ত কাজ করতেন, সে ফকীহগণকে ডেকে এনে তাঁদের দ্বারা এ পবিত্র মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করালেন। কারণ হযরত উমর ইবনে আবদুল আজীজের দৃষ্টিতে সম-সাময়িক যুগে এ দশজন ব্যক্তির চেয়ে শ্রদ্ধেয় সম্মানিত আর কেউ ছিলেন না। তাঁর দৃষ্টিতে খলীফা ওয়ালীদ এবং খেলাফতের পরবর্তী উত্তরাধিকারী সুলায়মানও তাঁদের তুলনায় অতি নগণ্য ছিলেন।
এ সমস্ত সম্মানিত মনীষীগণ ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করার পর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত ৮০ জন প্রকৌশলী তাদের অধীনস্থ বহু রাজমিস্ত্রী সমন্বয়ে মসজিদের দেওয়াল উঠাতে শুরু করলেন। এ সমস্ত প্রকৌশলীদের মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক রোমীয় ও মিশরীয় ছিল। তাবারী এ প্রকৌশলীদের সংখ্যা বলেছিলেন ৮০ জন বা একশত জন।
আল্লামা মুকাদ্দাসী (র) বলেন- এরা অত্যন্ত উচ্চস্তরের প্রকৌশলী ছিলেন, রোম সম্রাট তাদেরকে মিসকাল (এক মেসকাল সমান সাড়ে চার আনা পরিমাণ ওজন) স্বর্ণ এবং চল্লিশ গাড়ি মূল্যবান দুষ্প্রাপ্য পাথরও সরবরাহ করেছিলেন। (মুয়াজ্জমুল বুলদান, ৪র্থ খণ্ড, ৪৬৬ পৃষ্ঠা)
দীর্ঘ তিন বছর ব্যাপী এ সমস্ত রোমীয় ও মিশরীয় প্রকৌশলীগণ মসজিদ নির্মাণের কাজে লিপ্ত ছিলেন। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাদেরকে মুক্ত হস্তে রাজকীয় পুরস্কার দিয়েছিলেন। বিশেষতঃ দশজন বিশিষ্ট প্রকৌশলী তিন বছরে এক লক্ষ আশি হাজার দীনার মজুরী পেয়েছিলেন। দেয়ালের ভিত্তিতেও পাথর বসান হয়েছিল এবং স্তম্ভ সমূহ পাথর দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। ইয়াকুতের ভাষ্যটি হলো- দেওয়াল ও ভিত্তি পাথরের নির্মিত ছিল এবং স্তম্ভসমূহও পাথর দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। আর দেওয়াল গাত্রে এবং স্তম্ভসমূহে যে সমস্ত উপাদান কারুকার্য খচিত হয়েছিল তাতেও বেশ কয়েক মণ স্বর্ণ-রৌপ্য ব্যবহার করা হয়েছিল। (মুয়াজ্জমুল বুলদান, ৪র্থ খণ্ড, ৪৬৬ পৃষ্ঠা)
মসজিদে নববী পূণনির্মাণে যে সমস্ত বিচিত্র রঙ্গের পাথর ব্যবহৃত হয়েছিল, তা স্বর্ণ-রৌপ্য দ্বারা কারুকার্য খচিত ছিল এবং এতই মূল্যবান ছিল যে, কেবলামুখী গম্বুজ সংলগ্ন দোহারী ছাদটির মূল্য ছিল চল্লিশ হাজার আশরাফী। (খুলাছাতুল ওফা, ১৪০ পৃষ্ঠা)
দীর্ঘ তিন বছর ব্যাপী ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) এ মসজিদ নির্মাণ কাজে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তিনি সারা দিন সাধারণ মজুরদের মতই পাথর ও অন্যান্য উপকরণ ধৌত করে এ পবিত্র মসজিদ নির্মাণ কার্যে অংশগ্রহণ করেছিলেন। দীর্ঘ তিন বছরে মসজিদ নির্মাণ কার্য শেষ হল।
ইয়াকুতের বর্ণনা মতে- মসজিদের দৈর্ঘ্য ছিল দু'শত গজ এবং প্রস্থও ছিল দু'শত গজ। সামনের দিক পূর্ণ দু' শত গজ ছিল এবং পিছনের দিকের দৈর্ঘ্য ছিল ২ শত ৮০ গজ। (মুয়াজ্জমুল বুলদান, ৪র্থ খণ্ড, ৪৬৬ পৃষ্ঠা)
মধ্যবর্তী মেহরাবের কারুকাজ করতে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম হয়েছিল। মসজিদে চারটি মেহরাব তৈরী করা হয়েছিল এবং একটি উন্নত ধরণের হাউজ ও একটি ঝর্ণা তৈরী করা হয়েছিল।
কলকশান্দি বলেন- মধ্যবর্তী মেহরাবটির অভ্যন্তর ভাগ খোলা ছিল। সমস্ত স্তম্ভই মর্মর ও রোখام পাথর দিয়ে নির্মিত ছিল। রোখامই সবচেয়ে মূল্যবান পাথর। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ ওয়ালীদের নির্দেশেই এ সমস্ত পাথর মাদায়েন থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। কিছু পাথর রোম সম্রাট উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন এবং অবশিষ্ট কিছু মিশর ও আফ্রিকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। (কলকশান্তি, ৩য় খণ্ড)
এ দীর্ঘ সময় ওয়ালীদ মসজিদ নির্মাণের ব্যাপারে খুব অধীর ছিলেন এবং তিনি স্বর্ণ-রৌপ্যের গাড়ী বোঝাই করে পাঠাতেন আর উমর ইবনে আবদুল আজিজকে এ পবিত্র কাজ যথাশীঘ্র সম্ভব তাড়াতাড়ি শেষ করতে নির্দেশ দিতেন। খুলাছাতুল ওফার বর্ণনা মতে, মসজিদ নির্মাণ কাজ শেষ হলে ওয়ালীদ মদীনায় এসে মসজিদ দেখে খুবই আনন্দিত হলেন।
আবুল মুহসিন, বালাযুরী ও মাসুদীর বর্ণনা মতে, মসজিদ নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ৮৮ হিজরীতে; কিন্তু ইয়াকুতীর মতে ৮৭ হিজরীর সফর মাসে শুরু হয়ে ৮৯ হিজরীতে শেষ হয়েছিল। আর অন্যান্যদের নিকট এটা শেষ হয়েছিল ৯১ হিজরীতে। (বালাযুরী, ৭৬ পৃষ্ঠা; মুকাদ্দাসী, ১২; মাসুদী, ৫ম খণ্ড)
যা হোক, ওয়ালীদ ও হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) উভয়েই এ মহান কাজের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁরা এতই শান-শওকতের সাথে এ মসজিদ পুনঃনির্মাণ করেছিলেন যে, এটা সম-সাময়িক যুগের বৃহত্তম প্রাসাদ হিসেবে গণ্য হয়েছিল। যদিও ইসলাম অনাড়ম্বরপ্রিয়, ইসলামের দৃষ্টিতে প্রাসাদে স্বর্ণ-রৌপ্য ব্যবহার করা অপব্যয় বলে গণ্য হয়, কিন্তু ওয়ালীদের ব্যক্তিগত ধন ভাণ্ডারে যে সম্পদ জমা হয়েছিল, তা ব্যয় করার জন্য এর চেয়ে আর কোন উত্তম স্থান ছিল না। ওমর ইবনে আবদুল আজিজের মত বিচক্ষণ এবং ইসলাম সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল একজন শাসনকর্তা এক ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদকে এরূপে মসজিদে নববীর নির্মাণ কাজে ব্যয় করেই পরিতৃপ্ত হয়েছিলেন। যদি জনগণের ধন-ভাণ্ডারের হেফাযতের দায়িত্ব তাকে দেয়া হতো তবে তিনি কখনও তা থেকে এতে এভাবে ব্যয় করতেন না।
মসজিদ নির্মাণ শেষ হওয়ার পর মাত্র দু' বছর হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) মদীনার শাসনকর্তার পদে বহাল ছিলেন। ইবনুল জাওযী বলেন- ৯৩ হিজরীতে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়েই শাসনকর্তার পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ইবনে কাছীর বলেন যে, হাজ্জাজের প্ররোচনায় ওয়ালীদ তাঁকে পদচ্যুত করেছিলেন। কারণ যা হোক, এ সৌভাগ্য ও সম্মানিত পদ হারিয়ে তিনি খুবই দুঃখিত হয়েছিলেন। তিনি যখন মদীনা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন তখন তিনি মদীনার প্রতি অশ্রুসিক্ত নয়নে বারবার ফিলে তাকাচ্ছিলেন এবং ক্রন্দন করতে করতে বলেছিলেন-
يَا مُزَاحِمُ نَخْشَى أَنْ يَكُونَ مِمَّنْ نَفَتِ الْمَدِينَةِ إِنَّ الْمَدِينَةَ تَنْفِى خَبَثَهَا - كَمَا يَنْفِي نَبْقَى الْكِبْرِ خَبْثُ الْحَدِيدِ - وَيَبْقَى طِيبَهَا
অর্থাৎ হে মুজাহিম, আমার আশংকা হয় যে, আমরাও মদীনার রোষে পতিত হব। মদীনা তার অন্যায়কে দূর করে দেয়, যেমন রেত লোহার ময়লা দূর করে দেয় এবং পরিচ্ছন্ন খাঁটি লোহা অবশিষ্ট থাকে। (ইবনুল জাওযি)
ইবনে কাছীর বলেন যে, আব্দুল মালেক ও তার বংশধরগণ হাজ্জাজের প্রভাবে প্রভাবিত ছিল। আব্দুল মালেক হাজ্জাজকে তার পিতার খেলাফতের প্রতিষ্ঠাতা বলে মনে করতেন এবং মৃত্যুর সময় খলিফা মালেক ওয়ালীদকে হাজ্জাজের প্রতি শ্রদ্ধা ও পূর্ববৎ সম্পর্ক বজায় রাখতে বলেছিলেন। খলিফা ওয়ালীদও হাজ্জাজের মর্যাদা বুঝতেন। তদুপরি হাজ্জাজ-ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সম্পর্কে ওয়ালীদকে যে বিষয়ে অবগত করেছিল তাও ভুল ছিল না। হাজ্জাজ লিখেছিল, ইরাকের বিচ্ছিন্নতাবাদীগণ এখান থেকে পালিয়ে গিয়ে মদীনা ও তায়েফে আশ্রয় নিয়েছে। এ অবস্থা চলতে দিলে দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটবে। (ইবনুল জাওযি-৩৫)
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র) অত্যন্ত দয়ালু লোক ছিলেন। তা ছাড়া হাজ্জাজ যাদেরকে দুষ্কৃতিকারী বলে মনে করত তারা তাঁর দৃষ্টিতে নির্যাতিত বলেই বিবেচিত হত। তাঁরা যখন তাঁর নিকট এসে আশ্রয় প্রার্থনা করত তখন তিনি তাদেরকে আশ্রয় দেয়া নৈতিক দায়িত্ব মনে করে আশ্রয় দিতেন।
হাজ্জাজ ওয়ালীদের নিকট এ অভিযোগ করে দৃঢ়তার সাথে বলল, যদি দুষ্কৃতিকারীগণ এভাবে পালিয়ে গিয়ে হেজাজে আশ্রয় নিতে থাকে তবে সাম্রাজ্যের সংহতি বিনষ্ট হবার সম্ভাবনা আছে। ওয়ালীদের নিকট ওমর ইবনে আবদুল আজিজের চেয়ে রাজত্ব ও রাজ সিংহাসন অধিকতর প্রিয় ছিল। তিনি হাজ্জাজকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ধারণায় এমন কোন ব্যক্তি আছে, যে এ সমস্ত দুষ্কৃতিকারীদের প্রতিরোধ করে নিরবিচ্ছন্ন শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে? হাজ্জাজ তার বন্ধুদের মধ্যে দু'জনের পক্ষে সুপারিশ করল। অতএব ওয়ালীদ তাদের একজনকে মদীনা ও অপরজনকে মক্কার শাসনকর্তার পদে নিযুক্ত করে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে দামেশকে ফিরিয়ে নিলেন।
ইবনে কাছীর হাজ্জাজের এ অভিযোগকে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক অভিযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একবার ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ হাজ্জাজের নির্যাতন-নিপীড়ন সম্পর্কে ওয়ালিদের নিকট অভিযোগ করেছিলেন।
ইবনে কাছীর খুব বিশ্বস্ততার সঙ্গেই বর্ণনা করেছেন যে, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ পদচ্যুত হয়েছিলেন।
ইবনুল জওযি তাঁর পদত্যাগের যে ঘটনা উল্লেখ করেছেন, তাও উল্লেখ করা হলো। ইবনুল জাওযি বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইয়েরের (রা) পুত্র খুবাইব মদীনাতেই বসবাস করতেন। তিনি একবার রাসূলুল্লাহ (সা) হতে একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে, আবুল আছের বংশধরগণ যখন ত্রিশ জনে পৌঁছবে, তখন তারা আল্লাহর বান্দাগণকে দাসে পরিণত করবে এবং আল্লাহর সম্পদ লুট করবে।
এ হাদীছ মুখে মুখে প্রচার হয়ে ওয়ালিদের কানেও গিয়ে পৌঁছল। তাঁর মতে এটা ছিল খুবাইবের মনগড়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি একটি মিথ্যা অপবাদ। কাজেই তিনি হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে লিখলেন যে, খুবাইবকে এই অপরাধে একশত বেত্রাঘাত কর। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাঁকে ডেকে এনে বেত্রাঘাত করতে নির্দেশ প্রদান করলেন। খুবাইব খুব দুর্বল প্রকৃতির লোক ছিলেন, জল্লাদ খুব নির্মমভাবে বেত্রাঘাত করেছিল। তারপর যখন তাঁকে ফিরিয়ে নেয়া হল, তখন বেত্রাঘাতের যন্ত্রণায় তিনি মারা গেলেন। ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তাঁর মৃত্যু-সংবাদ শুনতে পেয়ে শোকে-দুঃখে মাটিতে গড়াগড়ি করে কাঁদতে লাগলেন এবং গভর্ণর পদ ত্যাগ করলেন।
তবে তাঁর পদত্যাগ সম্পর্কিত দু'টি ঘটনাই যথাসম্ভব সত্য। কারণ খুবাইবের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ পদত্যাগ করে ওয়ালিদকে লিখেছেন, কিন্তু এ পদত্যাগ পত্র ওয়ালিদের নিকট পৌছার পূর্বেই তিনি হাজ্জাজের পত্রে প্রভাবিত হয়ে তাঁকে পদচ্যুত করে আদেশ জারী করেছেন।
তিনি পদচ্যুত হয়ে থাকুন অথবা পদত্যাগ করেই থাকুন, তিনি যখন মদীনা হতে দামেশকের পথে যাত্রা করলেন তখন রাত্র ছিল এবং জেনে বুঝেই তিনি রাত্রের সফর অবলম্বন করেছিলেন।
অতীব আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঘটনাক্রমে সে রাত্রেই চন্দ্রের কৃষ্ণপক্ষ শুরু হয়েছিল। তাঁর ব্যক্তিগত সেবক মুজাহিম এ অবস্থা লক্ষ্য করে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) কে বললেন-
الا تَنْظُرُ إِلَى الْقَمَرِ مَا أَحْسَنُ اسْتَوَاءٌ فِي هَذِهِ اللَّيْلَةِ -
অর্থাৎ চন্দ্রের প্রতি লক্ষ্য করে দেখছেন কি? আজ রাতের সাথে কি সুন্দর মিল রয়েছে?
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র) চন্দ্রের প্রতি তাকিয়ে মুজাহিমকে বললেন, আমি তোমার কথার অর্থ বুঝেছি। তবে মনে রেখ, আমাদের যাত্রার উপর চন্দ্র-সূর্যের কোন প্রভাব পড়বে না, হ্যাঁ একমাত্র পরাক্রমশালী মহান আল্লাহর ফায়সালা।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র) পদত্যাগ করলে মক্কা-মদীনা ও তায়েফবাসীগণ যে দুঃখ-দুর্দশায় পতিত হল, কোন ঐতিহাসিকই তার বর্ণনা দেননি।
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র)-এর পদত্যাগে মদীনার ফকীহগণ অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে ছিলেন। কারণ তাঁদের মাহদী এবং তাদের প্রিয় শাসক মদীনা হতে বহিষ্কৃত হলেন এ দুঃখে তাঁরা অধীর হয়ে পড়লেন। বিশেষতঃ হযরত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যাব (র) সব চেয়ে বেশি দুঃখ পেয়েছিলেন। কারণ তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজিজের দ্বারাই ওয়ালিদের ক্রোধ হতে মুক্তি পেয়েছিলেন।
ইবনে কাছীর বলেন, আব্দুল মালেক এবং তারপর ওয়ালিদ উভয়ই সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যাব (র)-এর প্রতি বৈরীভাব পোষণ করতেন। কারণ, সায়ীদের একটি কন্যা সমসাময়িক যুগে সব চেয়ে সুন্দরী, শিক্ষিত ও ভদ্র বলে খ্যাত ছিল। আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহর জ্ঞানেও সে ছিল পারদর্শী। তার এ সমস্ত বৈশিষ্ট্যের কারণে আব্দুল মালেক তার পুত্র ওয়ালিদের সাথে তার বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব (র) তাঁর এই প্রস্তাবের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলেন না। ফলে আবদুল মালেক রাগান্বিত হয়ে মদীনার শাসনকর্তাকে লিখলেন যে, সাঈদকে বেত্রাঘাত কর। কাজেই তাকে বেত্রাঘাত করা হল।
যখন আবদুল আজীজ মারা গেলেন, তখন আবদুল মালেক তার পুত্র ওয়ালিদের খেলাফতের পক্ষে জনসাধারণের নিকট থেকে বায়আত গ্রহণ করলেন। মদীনার তৎকালীন শাসনকর্তা হিশাম ইবনে ইসমাঈল তাঁর অনুসরণ করলেন, কিন্তু হযরত সায়দ ইবনে মুসাইয়্যাব (র) ওয়ালীদের খেলাফতের বায়আত করতে অস্বীকার করলেন। যার কারণে তাঁকে বেত্রাঘাত করা হল এবং চরমভাবে অপমানিত করে সমস্ত মদীনায় ঘুরান হল।
ওমর ইবনে আবদুল আজিজের দ্বারাই তাঁর প্রতি এ সমস্ত নিপীড়নমূলক আচরণ বন্ধ হয়েছিল। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) সায়দ ইবনে মুসাইয়্যাব (র) কে খুব শ্রদ্ধা করতেন, তিনি তাঁর মতামতের বিরুদ্ধে কোন নির্দেশ প্রদান করতেন না। কারণ হযরত সায়দ ইবনে মুসাইয়্যাব (র) সম-সাময়িক যুগে মদীনার সবচেয়ে বিজ্ঞ আলেম ও সাধক ছিলেন।
ইবনে কাছীরের ভাষ্যটি হলো-
كَانَ مِنْ أَزْهَدِ النَّاسِ فِي فُضُولِ الدُّنْيَا وَالْكَلَامِ لَا يَعْنِي وَمِنْ أَكْثَرِ النَّاسِ أَدَبَا فِي الْحَدِيثِ -
অর্থাৎ অনর্থক কথা ও কাজে তিনি বেশি সংযত ছিলেন এবং হাদীসের বেলায় তিনি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।
ইবনে কাছীর বলেন, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) যখন মদীনা থেকে বের হলেন, তখন হযরত সায়দ ইবনে মুসাইয়্যাব (র) অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁর মঙ্গলের জন্য দু' হাত উঠিয়ে মহান আল্লাহপাকের দরবারে দোয়া করেছিলেন এবং ক্রন্দন করছিলেন।
📄 অন্তবর্তীকাল
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের জীবনের দীর্ঘ ছয়টি বছর অর্থাৎ ৯৩ হিজরী থেকে ৯৯ হিজরী পর্যন্ত কিভাবে অতিবাহিত হয়েছিল- ঐতিহাসিকগণ তার কোন বিস্তারিত আলোচনা করেননি।
ইবনে কাছীর এ সম্পর্কে মাত্র একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য ব্যবহার করেছেন-
ثُمَّ قَدِمَ دَمِشْقَ عَلَى بَنِي عَمِهِ
অর্থাৎ তারপর তিনি দামেশকে তাঁর চাচাত ভাইদের নিকট চলে গেলেন। এ বাক্যের সাথে সাথেই ইবনে কাছীর যহরীর বর্ণনার একটি উদ্ধৃতি পেশ করেছেন, যার প্রবক্তা স্বয়ং ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র)।
"একদিন দ্বিপ্রহরের সময় ওয়ালীদ আমাকে ডেকে পাঠালেন, আমি তাঁর নিকট এসে দেখলাম যে, তিনি খুবই অস্থির। তিনি আমাকে বসতে বললেন, আমি বসলাম। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, যে ব্যক্তি খলীফাগণকে গালি দেয় তাকে হত্যা করা যাবে? এতে আমি নীরব রইলাম। তিনি সে কথাই আবার বললেন। তখনও আমি কোন উত্তর দিলাম না। তিনি তৃতীয় বারেও তিনি একই প্রশ্ন করলেন, তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, সে কি হত্যাও করছে? ওয়ালীদ বললেন, না, সে শুধু গালি দিয়েছে। আমি বললাম, তবে তাকেও অনুরূপ গালি দেয়া হোক। এতে ওয়ালিদ অসন্তুষ্ট হয়ে তার পরিবার-পরিজনের নিকট চলে গেলেন।
ইবনুল জাওযিও এ জাতীয় একটি ঘটনা সুলায়মানের যুগে সংঘটিত হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন। সুলায়মানের যুগে এক ব্যাক্তি খলীফাগণকে গালি দিয়েছিল। সুলায়মান হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে ডেকে এনে এ সম্পর্কে তাঁর মতামত জানতে চাইলেন। তিনি বললেন, তুমিও তাঁকে গালি দাও। সুলায়মান বললেন, সে আমার বাপ দাদাকে গালি দিয়েছে। হযরত ওমর ইবনে আজিজ বললেন, তুমিও তার বাপদাদাকে গালি দাও। কিন্তু সুলায়মান তাঁর কথা রক্ষা না করে সে ব্যক্তিকে হত্যা করে।
ইবনুল জাওযি আরও বলেন, এ সময় সুলায়মানের পুত্র, খেলাফতের পরবর্তী উত্তরাধিকারী আয্যবও সেখানে ছিল। সে একে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের ঔদ্ধত্য ও অভদ্রতা জ্ঞান করে তাঁর সাথে তর্ক করতে লাগল। সুলায়মান পুত্রকে তিরস্কার করে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট ক্ষমা চাওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন।
এ সমস্ত ঘটনা ব্যতীত ঐতিহাসিকগণ আরও কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যাতে প্রতীয়মান হয় যে, ওয়ালীদ ও সুলায়মান ইবনে আব্দুল মালেক যখনই কোন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সম্মুখীন হতেন তখনই তারা হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে ডেকে তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। তবে তারা কোন কোন সময় তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতেন আবার কোন কোন সময় তারা তাঁর মতামত অগ্রাহ্যও করতেন।
কোন জটিল-সমস্যা হলে ওয়ালীদ তাঁর খাদেমগণকে নির্দেশ দিতেন যে, সেই সৎ লোকটিকে ডেকে আন। তারাও ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে সৎলোক বলেই বিশ্বাস করত। প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন ভাল লোক ছিলেন। এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে যা ঠিক তিনি সে পরামর্শই দিতেন। পরিণাম কি হবে জিজ্ঞাসাকারী খুশি হবে না অখুশি হবে, তিনি তার ভয় করতেন না।
উদাহরণ স্বরূপ ইবনে আব্দুল হাকামের একটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো, একদা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সুলায়মান ইবনে আব্দুল মালেকের সাথে তার কোন বোনের উত্তারিধকার সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। সুলায়মান বললেন এ সম্পর্কে খলীফা আব্দুল মালেকের একটি দলীল আছে। তাতে তিনি তাদেরকে মিরাছ হতে বঞ্চিত করেছেন এবং তিনি তাঁর পুত্রকে সেই দলীল আনতে নির্দেশ দিলেন। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ উপহাস করে বললেন, খলিফা কি কুরআন পাক আনতে নির্দেশ দিলেন? ওয়ালিদের পুত্র আয়্যব একে অভদ্রতা জ্ঞান করে ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে বলল, এ কথাটিই একটি লোককে হত্যা করার পক্ষে যথেষ্ট। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, তুমি যখন খলীফা হবে তখন এরূপই করিও। এতে সুলায়মান পুত্রকে তিরস্কার করলেন এবং ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে বললেন।
ইবনুল জাওযি বলেন, কোন কোন সময় খলীফাগণ তাঁর কথা মেনেও নিতেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, একবার এক সফরে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ সুলায়মানের সাথে ছিলেন। তাঁদের সাথে সামরিক বাহিনীর কিছু লোকও ছিল। সুলায়মান কিছু লোককে গান গেতে শুনে তাদেরকে ডেকে আনলেন এবং তাদেরকে নপুংসক করে দিতে নির্দেশ দিলেন। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ প্রতিবাদ করে বললেন, এটা শরীয়ত বিরোধী একটি নির্দেশ। তাদেরকে ছেড়ে দাও। সুলায়মান তাঁর কথা মেনে নিলেন।
এরূপ এক সফরে তিনি সুলায়মানের সাথে ছিলেন, এমন সময় খুব ঝড় শুরু হলো ও বিদ্যুৎসহ বজ্রপাত হতে লাগল। সুলায়মান ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে তার বাহনের উপর জড়সড় হয়ে বসেছিলেন এবং ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে ডাকছিলেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এটা দেখে হাসতে লাগলেন। সুলায়মান অভিমান করে বললেন, আমরা ভয়ে মরি আর আপনি হাসেন! ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, এটা আল্লাহর রহমত, রহমত দেখে আনন্দ করা উচিত। কাঁদতে হয় আল্লাহর আযাব দেখে।
একদিন সুলায়মান দেখলেন, বহুলোকের সমাগম হয়েছে। তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে জিজ্ঞেস করলেন, এ সমস্ত লোক কি চায়? হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, এরা তোমারই নিকট অভিযোগ করতে এসেছে। সুলায়মান বললেন, এ এক লাখ টাকা নিয়ে তাদের মধ্যে বিতরণ করে দিন। ওমর বললেন, এর চেয়েও ভাল হবে যে, তুমি তাদের অভিযোগ শুনে তার প্রতিকার বিধান কর। অতএব সুলায়মান ওমরের কথা মত তাদের অভিযোগ শুনে তার প্রতিকার করলেন।
একবার সুলায়মান ও হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের মধ্যে একটি ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র)-এর কোন গোলাম সুলায়মানের কোন এক গোলামকে খুব মারপিট করল। উক্ত গোলাম সুলায়মানের নিকট মিথ্যা অভিযোগ করল যে, এতে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ খুব খুশি হয়েছেন। তারপর ওমর ইবনে আবদুল আজিজ আসলে সুলায়মান তার নিকট এ অভিযোগ করলেন। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। তিনি বললেন, তোমার বলার পূর্বে আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। সুলায়মান ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, আপনি মিথ্যাবাদী। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, تَقُولُ كَذِبْتُ وَمَا كَذِبْتُ مُنْذُ شَهِدْتُ عَلَى إِزَارِي وَإِنَّ فِي الْأَرْضِ عَنْ مَجْلِسِكَ هذَا لَسِعَةٌ
অর্থাৎ তুমি বল, আমি মিথ্যাবাদী, অথচ আমি যখন হতে কাপড় পরিধান করি, তখন হতে কোন মিথ্যা কথা বলিনি। আল্লাহর পৃথিবী তোমার মজলিস হতে অনেক প্রশস্ত। এ কথা বলে সুলায়মানের মজলিস হতে বের হয়ে আসলেন এবং বাড়ীতে এসেই তিনি মিশরে যেতে প্রস্তুত হলেন। সুলায়মান এটা জানতে পেরে খুবই বিব্রত বোধ করলেন এবং লোক পাঠিয়ে ওমরের নিকট ক্ষমা চাইলেন এবং তাকে ফিরিয়ে আনলেন। যখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তার নিকট আসলেন তখন তিনি বললেন, আপনি মিশর যাত্রা করে আমাকে যেরূপ বিব্রত করছেন এরূপ আর কখনও হয়নি।
ঐতিহাসিকগণ, বিশেষতঃ ইবনে আব্দুল হাকাম, ইবনুল জাওযি এবং ইবনে কাছীর তার সত্যবাদীতা ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে এ সমস্ত ঘটনা উল্লেখ করেছেন এবং ৯৩ হিজরী হতে ৯৯ হিজরী পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় বছর দামেশকে অতিবাহিত করেন বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনুল জাওযি এটাও বলেছেন যে, একদিন সুলায়মান কোন এক জনপদে গিয়েছিলেন। তার কাফেলা ভীষণ ঝড়ে আক্রান্ত হল। তখন সুলায়মান চিৎকার করে বলেছিলেন, হে ওমর! হে ওমর!
বনু উমাইয়্যার লোকদের সাধারণ রীতি ছিল যখন তাদের কেউ কোন বিপদে পতিত হত তখনই ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে ডাকত এবং তিনিও “এইত আমি আসছি” বলে তার ডাকে সাড়া দিতেন।
ইবনুল জাওযির অপর একটি বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, শুধু বনু উমাইয়্যার খলীফাগণই নয় বরং সাধারণ লোকেরাও বিপদাপদে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের সাহায্য প্রার্থী হত।
৯৩ হিজরী হতে ৯৯ হিজরী পর্যন্ত বনু উমাইয়া এবং বনু উমাইয়ার খলীফাগণ বিশেষতঃ ওয়ালীদ ও সুলায়মান সকল প্রকার দুঃখ-শোকে, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পরামর্শ চাইতেন, আর তিনিও পরম বিশ্বস্ততার সাথে তাদেরকে উত্তম পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন।
📄 খেলাফতের উত্তরাধিকার লাভ
সুলায়মানের চরিত্রে যদিও দোষ-ত্রুটির কোন সীমা ছিল না, তবুও তাঁর মহত্ব ছিল যে, তিনি হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে আন্তরিকভাবে ভালবাসতেন। সাধারণত তিনি তাকে সঙ্গে করেই সফর করতেন এবং অধিকাংশ ব্যাপারেই তিনি তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতেন। ইতোপূর্বে আমরা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ ও সুলায়মানের প্রিয় পুত্র আয়্যবের মধ্যে বির্তক এবং সুলায়মান ও ওমর ইবনে আবদুল আজিজের মধ্যে মতবিরোধ সম্পর্কিত তিনটি ঘটনা বর্ণনা করেছি।
আয়্যুব সুলায়মানের প্রিয় পুত্র এবং খেলাফতের পরবর্তী উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত ছিল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজের খাতিরেই সুলায়মান তাঁর এ. পুত্রকে দুই বার তিরস্কার করেছেন এবং ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। সুলায়মান তাঁকে মিথ্যাবাদীতার অভিযোগ দেয়ার পর ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। অথচ এতসব হওয়ার পর কারও ধারণা ছিল না যে, মৃত্যুর কঠিন হাত যখন তাঁর দ্বারে করাঘাত করবে তখন তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে খেলাফতের উত্তরাধিকারী মনোনীত করবেন। তাঁর প্রধানমন্ত্রী রেজা বিন হায়াতের পরামর্শেই সুলায়মান এ মহৎ কর্ম করতে উদ্বুদ্ধ হলেন।
ইবনে আব্দুল হাকام বলেন- সুলায়মানের পুত্র আয়্যব খেলাফতের পরবর্তী উত্তরাধিকারী ছিল। কিন্তু সুলায়মানের পূর্বেই সে ইন্তেকাল করল। এছাড়া সুলায়মানের অন্যান্য সন্তানগণ সকলেই ছিল অল্প বয়স্ক। যখন তাঁর মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসল এবং তিনি কাউকে তার স্থলাভিষিক্ত করতে ইচ্ছা করলেন, তখন ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ এবং রেজা ইবনে হায়াত এসে উপস্থিত হলেন। সুলায়মান রেজাকে বললেন, আমার সন্তানগণকে জামা-কাপড় পরিধান করিয়ে আমার নিকট নিয়ে আস। তারপর তার সন্তানগনকে তার নিকট হাজির করা হল। তারা এতই অল্পবয়স্ক ছিল যে, তারা জামা কাপড় পর্যন্ত ঠিক রাখতে পারত না। সুলায়মান তাদের প্রতি তাকিয়ে এ কথা কয়টি আবৃত্তি করলেন। আমার সন্তানগণ ছোট ছোট তারা যদি বড় হতো তবে আমি সফল হতাম। এতে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ পবিত্র কুরআনের আশ্রয় গ্রহণ করলেন এবং পাঠ করিলেন-
قَدْ أَفْلَحَ مَنْ تَزَكَّى وَذَكَرَ اسْمَ رَبِّهِ فَصَلَّى -
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আত্মশুদ্ধি লাভ করে আল্লাহর স্মরণ করে নামায পড়ে সেই সফল হয়েছে।
সুলায়মান রেজাকে পুনরায় আদেশ করলেন যে, আমার পুত্রগণকে অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত করে আমার নিকট নিয়ে আস। তারপর যখন তাদেরকে আনা হল, তখন দেখা গেল যে তাদের কোমরে বাঁধা তরবারী মাটি স্পর্শ করছে।
ইবনে সাদ বলেন, রেজা বিন হায়াত বলেছেন, শুক্রবার দিন সুলায়মান সবুজ রঙের রেশমী কাপড় পরিধান করলেন। তারপর আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে আক্ষেপ করে বললেন, আল্লাহর কসম! আমি একজন যুবক বাদশাহ। তারপর লোকের সাথে জুমার নামাযে শরীক হবার জন্য বের হলেন। নামায হতে ফিরে এসে তিনি কঠিন রোগে আক্রান্ত হলেন এবং একটি অছিয়তনামায় তিনি তার অল্প বয়স্ক পুত্র আয়্যুবকে খেলাফতের পরবর্তী উত্তরাধিকারী মনোনীত করলেন। এতে আমি নিবেদন করলাম, আমীরুল মোমিনীন! যে খলিফা কোন যোগ্য লোককে তার স্থলাভিষিক্ত মনোনীত না করে যায়, তিনি কিরূপে কবরে শান্তি ও নিরাপত্তার আশা করতে পারেন? সুলায়মান বললেন, আমি আল্লাহর কিতাব দ্বারা এস্তেখারা করব এবং আরও চিন্তা ভাবনা করব। এভাবে এক দুই দিন চলে গেল।
অবশেষে তিনি তার পূর্ব লিখিত অছিয়তনামাটি ছিড়ে ফেললেন এবং আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, দাউদ ইবনে সুলায়মান সম্পর্কে তোমার কি ধারণা? আমি বললাম, তিনি আছেন কনষ্টান্টিনোপলে। আপনি জানেন না যে, তিনি কি জীবিত আছেন না ইন্তেকাল করেছেন। সুলায়মান পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, তবে তোমার মতামত কি? আমি বললাম, মতামতের অধিকারী তো আপনিই। আমার কর্তব্য হল আপনার মতামত সম্পর্কে চিন্তা করা ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যথাযথ বাস্তবায়িত করা।
সুলায়মান বললেন, ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সম্পর্কে তোমার কি ধারণা? আমি বললাম, তিনি একজন সৎ ও যোগ্য লোক। সুলায়মান বললেন, তোমার কথা সঠিক। তিনি যথার্থই একজন সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি। কিন্তু যদি আমি তাঁকে খলিফা মনোনীত করি এবং আব্দুল মালেকের সন্তানদের মধ্যে কাউকেও খলিফা মনোনীত না করি তবে খুব গোলমাল হবে এবং ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাদের উপর শাসন পরিচালনা করুক, তারা এটা কখনও সহ্য করবে না। কিন্তু যদি ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পর তাদের কাউকে খলীফা মনোনিত করে যাই তবে হয়ত তারা এটা মেনে নিতে পারে। ইয়াযিদ ইবনে আব্দুল মালেক এখন রাজধানীতে উপস্থিত নেই। আমি তাকেই ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পরবর্তী খলীফা মনোনীত করছি। এতে সে কিছুটা শান্ত্বনা লাভ করে আমার মনোনয়নে রাজী হতে পারে। আমি বললাম, আপনার মতামত যথার্থ এবং মতামত প্রকাশের জন্য আপনার সম্পূর্ণ অধিকার আছে।
ইবনে সা'দ বলেন ইবনে জাওযি, ইবনে কাছীর, ইবনে হাকام ও তাবারীসহ প্রায় সকল ঐতিহাসিকই এ ব্যাপারে এক মত যে, এই রেজা বিন হায়াতই ওমর ইবনে আবদুল আজিজের খেলাফতের পক্ষে সুলায়মানকে উৎসাহিত করেছিলেন। তিনি যদি আয়্যুবের মনোনয়নে আপত্তি না করতেন, যদি সুলায়মানকে কবরের শাস্তি সম্পর্কে ভয় না দেখাতেন তবে ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের মনোনয়নের ব্যাপারে বাধার সৃষ্টি হতো।
ইবনে হাকام ও ইবনে সাদের বর্ণনা যদিও পরস্পর বিরোধী, তবুও তারা উভয়েই স্বীকার করছেন যে, রেজা বিন হায়াতই হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে খলীফা মনোনিত করার জন্য সুলায়মানকে সম্মত করিয়েছিলেন।
রেজা বিন হায়াত খুব দৃঢ় ব্যক্তিত্বশীল, সংকল্পে অটল ও বিশেষ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন উজির ছিলেন এবং কারো ব্যক্তিত্বে তিনি আকৃষ্ট হতেন না। তিনি খুবই বিচক্ষণতার সাথে কাজ করে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের প্রতি সুলায়মানের মন আকৃষ্ট করেছিলেন।
ইবনে সা'দ পূর্ববর্তী ঘটনাবলি ছাড়াও এক বর্ণনায় বলেছিলেন যে, রেজা বিন হায়াত ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে খলীফা মনোয়নের জন্য নিজের পক্ষ হতে সুলায়মানকে পরামর্শ দিয়েছেন।
ইবনে জাওযি ইমাম শাফী (র) এর একটি কথা বর্ণনা করেছিলেন যে,
إِنسَى لَأَرْجُوا أَن يُدْخِلَ اللَّهُ سُلَيْمَانَ بْنِ عَبْدِ الْمَالِكِ الْجَنَّةَ يَا شَيْئَمَالُهُ عَمَرَ بْنَ عَبْدِ الْعَزِيزِ -
অর্থাৎ আমি আশা করি যে, আল্লাহপাক সুলায়মানকে এ জন্যই জান্নাতে স্থান দিবেন যে, তিনি ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে খলিফা মনোনীত করেছিলেন।
রেজা বিন হায়াতের পরামর্শক্রমেই সুলায়মান ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের পক্ষে মনোয়ন পত্র লিখেছিলেন।
ঐতিহাসিক ইবনে সা'দ সুলাইমানের উজীরে আজম রেজা বিন হায়াতের মৌখিক ভাষ্যটি এরূপে বর্ণনা করেছেনঃ
সুলাইমান অছিয়তনামাটি লিপিবদ্ধ করে তাতে সীল মোহর করলেন এবং দেহরক্ষী প্রধান কাব ইবনে হামেদুল আইসীকে ডেকে তাঁর বাড়ীর লোকজনকে একত্রিত করতে আদেশ দিলেন। কাব বনু উমাইয়্যার লোকজনকে ডেকে একত্রিত করল। তখন খলিফা সুলাইমান রেজাকে বললেন, তুমি আমার লিখিত চিঠিসহ তাদের নিকট গিয়ে বল যে, এটা আমার লিখিত অছিয়তনামা এবং তাদেরকে এটা মেনে নিতে এবং এতে আমি যাকে খলিফা হিসেবে মনোনীত করেছি তার আনুগত্য স্বীকার করতে দাও। তারপর যখন প্রধানমন্ত্রী রেজা তার কথামত তাদের নিকট গিয়ে উক্ত নির্দেশ দিলেন, তখন তারা বলল, আমরা আমিরুল মুমিনীনের নিকট গিয়ে তাঁকে সালাম করতে চাই। রেজা বিন হায়াত তাদেরকে অনুমতি দিলেন। তারা যখন সুলাইমানের নিকট উপস্থিত হল, তখন সুলাইমান তাদেরকে উক্ত অছীয়তনামার প্রতি ইঙ্গিত করলেন, তারা তার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে খলীফা তাদেরকে বললেন, এটাই আমার অছীয়তনামা, আমার নির্দেশ মেনে নাও এবং আমি যার জন্য খেলাফতের অছীয়ত করেছি তার আনুগত্য স্বীকার করে তারপর তা একের পর এক কর। সকলেই বায়আত গ্রহণ করল। তারপর প্রধান মন্ত্রী রেজা বিন হায়াত সেই সীল মোহরকৃত অছীয়তনামা নিয়ে বাইরে আসলেন।
রেজা বিন হায়াত আরো বলছেন যে, যখন সমস্ত লোক চলে গেল, তখন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ আমার নিকট এসে বললেন, আমার সন্দেহ হয় যে, এ অছীয়তনামাতে আমার সম্পর্কে কিছু লেখা হয়েছে। তিনি আরো বললেন, রেজা! "তোমার প্রতি আল্লাহ সদয় হোন" তুমি আমার বন্ধুত্বের প্রতি লক্ষ্য করে এ সম্পর্কে আমাকে কিছু জানাও। যদি আমার সন্দেহই সঠিক হয়, তবে তুমি বল আমি এখনই পদ হতে ইস্তফা দিয়ে মুক্তিলাভ করি। কারণ এখনও সময় আছে। রেজা বিন হায়াত বললেন, এ সম্পর্কে আমি আপনাকে কোন কিছুই বলতে পারব না। এ কথা শুনে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ রাগ করে সেখান হতে চলে গেলেন।
রেজা বিন হায়াত বলেন, এরপর হিশাম ইবনে আব্দুল মালেক আমার সাথে সাক্ষাৎ করে বলল, “রেজা! তুমি আমাকে এ অছীয়তনামার বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানাও।”
যদি এতে আমার সম্পর্কে কিছু বলা হয়ে থাকে তবে এখন হতেই আমি তা জেনে নিলাম, আর যদি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকেও এ কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়ে থাকে, তবে এখনই তার প্রতিবাদ করব। কারণ আমার মত লোক এরূপ অন্যায় অবিচার নীরবে মেনে নিতে পারে না।
রেজা বিন হায়াত গোপন রহস্য উদঘাটন করতে দৃঢ়তার সাথে অস্বীকার করলেন। হিশাম নিরাশ হয়ে ফিরে গেল এবং এক হাত দিয়ে অপর হাতে মারতে মারতে বলতে লাগল, "যদি খেলাফতের দায়িত্ব আমি না পাই, তবে আব্দুল মালেকের বংশে আর কে আছে?
রেজা বিন হায়াত আরো বলেন, এরপর আমি সুলাইমানের নিকট এসে দেখি তিনি মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। আমি তাকে কেবলমুখী করে দিলাম। তখন তিনি বললেন, যদি তুমি তাদের নিকট হতে দ্বিতীয়বার বায়আত না নাও তবে তারা মানবে না। তারপর সুলাইমান আশহাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু" বলতে বলতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
রেজা বিন হায়াত বলেন আমি সবুজ রঙ্গের একটি চাদর দিয়ে তাঁর দেহ আবৃত করে দরজা বন্ধ করে দিলাম। তাঁর স্ত্রী সংবাদ বাহক পাঠিয়ে তার অবস্থা অবগত হতে চাইলেন। আমি বললাম, খলীফা এখন ঘুমন্ত অবস্থায় আছেন। সংবাদ বাহক চাদর দিয়ে খলিফার দেহ আবৃত দেখে তাঁর স্ত্রীকে এই সংবাদই দিল। বেগম সাহেবাও তার কথা সত্য বলে বিশ্বাস করলেন। আমি উক্ত সংবাদবাহককে দরজায় দাঁড় করিয়ে তার নিকট থেকে অঙ্গিকার নিলাম যে, সে কাউকে এখানে আসতে অনুমতি দেবে না। তারপর আমি সেখান হতে বের হয়ে কাব ইবনে হামিদুল আইসীর নিকট লোক পাঠালাম এবং খলিফা পরিবারের সমস্ত লোকজনকে "মসজিদে ওয়াবিতে” হাজির করার ব্যবস্থা করলাম এবং তাদেরকে বললাম যে, তোমরা অছিয়ত নামার প্রতি বায়আত কর। তারা বলল, আমরা তো একবার বায়আত করেছি আবার কেন? তুমি কি দ্বিতীয় বার আয়আত গ্রহণ করতে চাও? আমি বললাম এটা আমিরুল মুমিনীনের অছিয়তনামা। প্রতিশ্রুতি দাও যে, এ মোহরকৃত অছীয়তনামায় যাকে খলিফা হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে, তোমরা তার আনুগত্য স্বীকার করবে। তখন একে একে তাদের সকলেই দ্বিতীয় বার বায়আত করল।
রেজা বিন হায়াত বলেন, যখন সকলেই দ্বিতীয় বায়আত করল, তখন আমি মনে করলাম যে, এখন কথা মজবুত হয়ে গিয়েছে, কাজেই তাদেরকে খলিফার মৃত্যু সংবাদ জানিয়ে দেওয়া উচিত। তখন আমি বললাম, তোমরা সকলেই দাঁড়িয়ে যাও, শোন তোমাদের খলিফা ইন্তেকাল করেছেন। এরপর আমি সীলমোহরকৃত চিঠি খুলে সকলের সামনে পাঠ করতে লাগলাম, কিন্তু যখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নাম ঘোষণা করলাম, তখন হিশাম ইবনে আব্দুল মালেক চিৎকার করে বলতে লাগল, আল্লাহর কসম! আমি তার বায়আত করব না। আমিও চিৎকার করে বললাম, আল্লাহর কসম! তুমি বায়আত না করলে আমি এখনই তোমাকে হত্যা করব। উঠ, বায়আত কর। তারপর সে বাধ্য হয়ে উঠলো। তখন সে দু' পা ফরাশের উপর মারছিল এবং ইন্না লিল্লাহে ওয়াইন্না ইলাহি রাজিউন পড়ছিল। আমি ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে বললাম, উঠুন! মিম্বরে আরোহন করুন। তিনি অত্যন্ত বিরক্তির সাথে ইন্না লিল্লাহে ওয়াইন্না ইলাহি রাজিউন বলতে বলতে মিম্বরে আরোহন করে বললেন; এমন হল কেন?
রেজা বিন হায়াত আরো বলেন, যখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ মিম্বরে আরোহন করলেন এবং হিশাম ইবনে মালেক ইন্না লিল্লাহি বলতে বলতে বায়আত করতে আসল, তখন যে ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে বলল, আফসুসের বিষয়- আব্দুল মালেকের সন্তানরা বঞ্চিত হল আর তোমাকে খলিফা মনোনীত করা হল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ উত্তরে বললেন হ্যাঁ আমিত কখনও এটা কামনা করিনি, বরং অপছন্দই করতাম। আবার তিনি ইন্না লিল্লাহি পাঠ করলেন। এরপর সুলায়মানের কাফন দাফনের ব্যবস্থা করা হল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ জানাযার নামায পড়ালেন। আল্লামা সাদ, তাবারী ইবনুল জাওযী ও ইবনে কাছীর যে বর্ণনা প্রদান করেছেন তা দ্বারা স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়েছে যে, সুলায়মান ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে যেরূপ প্রীতির চোখে দেখতেন তাতেই তিনি সন্দেহ প্রবণ হয়ে পড়লেন যে, হয়তঃ তাকেই খেলাফতের জন্য মনোনয়ন করা হয়েছে। কিন্তু তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলনা, কাজেই তিনি রেজা বিন হায়াতের মাধ্যমে দৃঢ় অবগতির পর পদ হতে ইস্তফা দিয়ে মুক্তি লাভ করতে চেয়েছিলেন, অন্যথায় তিনি এরূপ করতেন না। ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের খেলাফতের ঘটনা বর্ণনা করে অন্যান্য ঐতিহাসিকদের হাতে কিছুটা ভিন্ন ধরণের সূক্ষ্ম তথ্য সংযোজন করেছেন। তিনি বলেন যে, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ পূর্ব হতেই অবগত ছিলেন এবং রেজা বিন হায়াতের নিকট এসে তাকে তার বন্ধুত্ব ও আল্লাহর রহমতের দোহাই দিয়ে কোন মতে এ পদ হতে ইস্তফা গ্রহণ করে তাকে মুক্তি দেয়ার জন্য রেজা বিন হায়াতকে উদ্বুদ্ধ করতে চাইলেন। কিন্তু রেজা বিন হায়াত কোন মতে তাতে রাজী হলেন না।
ইবনে খালদুনের এ বর্ণনায় বুঝা যায় যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ পূর্বেই জানতে পেরেছিলেন এবং পদ হতে ইস্তফা দিয়ে মুক্তি লাভ করতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এ ব্যাপারে রেজা বিন হায়াতই ছিল তার একমাত্র প্রতিবন্ধক।
যা হোক আমাদের ধারণা সম্পূর্ণ সত্য যে, রেজা বিন হায়াতই হযরত ইবনে আব্দুল আজিজকে খেলাফতের পদ গ্রহণের জন্য রাজী করেছিলেন। এ ব্যাপারে ইবনে সাদের এ বর্ণনাটিও বিশেষ প্রাণিধান যোগ্য। রেজা ইবনে হায়াত বলেন যে, যখন সুলায়মান ইবনে আবদুল মালেকের মৃত্যুযন্ত্রণা বৃদ্ধি পেতে লাগলো, তখন আমি অস্থিরভাবে ঘরের ভিতর বাইরে আসা যাওয়া করতে লাগলাম। এই অবস্থায় ওমর ইবনে আবদুল আজিজ আমাকে ডেকে বললেন, রেজা তুমি আমার পরম হিতৈষী বন্ধু, তোমাকে ইসলাম ও আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, যদি প্রসঙ্গক্রমে খলীফার সামনে আমার আলোচনা উঠে এবং যদি তিনি তোমার পরামর্শ চান, তবে অনুরোধ করে আমার পক্ষ হতে তার দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে দিও। আমি তোমার জন্য আল্লাহপাকের নিকট দোয়া করব। কারণ এ ব্যাপারে তোমার পরামর্শই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রেজা বিন হায়াত বলেন, আমি ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে তিরস্কার করে বললাম, তুমি তো কম লোভী নও! তোমার ইচ্ছা যে, আমি তোমাকে খলীফা মনোনীত করার জন্য সুলায়মানের নিকট সুপারিশ করি। এতে ওমর ইবনে আজীজ খুব লজ্জিত হয়ে চলে গেলেন। আমিও ভিতরে চলে গেলাম।
তখন সুলায়মান বললেন, তুমি কাকে খলীফা মনোনীত করতে পরামর্শ দাও এবং তার সম্পর্কে অছীয়তনামা লিখতে বল? আমি বললাম আমিরুল মুমিনীন, আপনি আল্লাহকে ভয় করুন। কেননা, আপনি এখনই আল্লাহর সাথে মিলিত হতে যাচ্ছেন। তিনি আপনাকে এব্যপারে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।
সুলায়মান বললেন, তবে তোমার ইচ্ছা কি? তখন আমি ওমর ইবনে আবদুল আজীজের নাম প্রস্তাব করলাম। সুলায়মান এ বলে প্রতিবাদ করলেন যে, তবে আব্দুল মালেকের অছীয়তনামার কি হবে? তিনি আমার নিকট তার জীবিত সন্তানদের ব্যাপারে এবং ওয়ালিদের নিকট হতেও এ প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। আমি বললাম, তাদের কাউকেও ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পরবর্তী খলীফা মনোনীত করে দেন, কোন ঝামেলা থাকবে না। সুলায়মান আমার কথা সম্পূর্ণ রূপেই বুঝতে পারলেন এবং বললেন, তুমি ঠিকই 'বলেছ, কাগজ কলম নাও। আমি কাগজ কলম এনে দিলাম, তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পক্ষে খেলাফতের অছিয়তনামা লিখে দিলেন।
ইবনে সা'দের অপর এক বর্ণনায় স্পষ্টই জানা যায় যে, ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ খেলাফতের পদ লাভের জন্য মোটেই আশা করতেন না। তিনি অছীয়তনামা শুনে শপথ করে বললেন যে তিনি কখনও খেলাফতের পদ লাভের আশা করেননি। তার বক্তব্য ছিল এই وَاللَّهِ مَا أَرَدْتُ بِهِنَا আল্লাহর কসম! কখনও আমি এর আশা করিনি।
ইবনে আব্দুল হাকام এ ঘটনাটি যদিও খুব সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু এতে কিছু নতুন তথ্য যোগ করা হয়েছে। তার ভাষ্যটি এরূপ-
১। তারপর সুলাইমান যখন মৃত্যুমুখে পতিত হলেন, তখন রেজা বিন হায়াত তাঁর মৃত্যুর সংবাদ গোপন করে লোকদের কাছে গমন করে বললেন, খলিফা তোমাদেরকে অছীয়ত নামায় লিখিত ব্যক্তি সম্পর্কে নতুনভাবে বায়আত করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
২। রেজা বিন হায়াতের এ কথা শুনে তারা বলল, আমাদেরকে খলিফার কাছে নিয়ে চলুন। তখন রেজা ভিতরে প্রবেশ করে মৃত খলিফাকে বালিশের সাহায্যে সোজা করে বসিয়ে দিলেন এবং একজন খাদেমকে তাঁর নিকট দাঁড় করিয়ে তিনি নিজে বাইরে আসলেন এবং লোকজনকে ভিতরে প্রবেশ করতে বললেন। লোকেরা ভিতরে গিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে দূর হতেই তাঁকে দেখছিল এবং সালাম করে বের হয়ে যাচ্ছিল। তখন একজন খাদেম রোগীর ন্যায় খলিফার গায়ের চাদর এদিক-ওদিক করছিল।
৩। রেজা বিন হায়াত তখন লোকদেরকে মসজিদে একত্রিত করলেন, তখন খলিফা পরিবারের লোকজনের সাথে অন্যান্য গণ্যমান্য লোকেরাও একত্রিত হয়েছিল এবং তারা সকলেই এক সঙ্গে অছীয়তনামায় নির্দেশিত ব্যক্তির প্রতি বায়আত করলেন।
৪। তারপর যখন অছীয়তনামা পাঠ করা হল, তখন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের নাম শুনে হিশাম ইবনে মালেককে উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠল, তখন একজন সিরিয়বাসী যুবক তরবারী উত্তোলন করে হিশাম ইবনে মালেককে ধমক দিয়ে বলল, “খলিফার অছীয়ত-নামা পড়া শেষ হোক, তারপর তুমি চিৎকার করবে।"
তারপর ইয়াজিদ ইবনে আব্দুল মালেকের নাম শুনে হিশাম বলল, আমরা শুনলাম এবং আনুগত্য স্বীকার করলাম। এরপর সকলে উঠে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের হাতে বায়আত করল।
এ ব্যাপারে ইবনুল জওযিও একটি মূল্যবান তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, হিশাম ইবনে মালেক বলল, আমি তখনই এ অছীয়তনামা মেনে নেব, যখন আমি জানতে পারব যে, তাতে আব্দুল মালেকের সন্তানদের অধিকার স্বীকার করা হয়েছে। লোকেরা তার এই কথার জন্য তাকে তিরস্কার করল এবং সে ভীষণ লজ্জা পেল। তখন সমস্ত লোক সামি'না ওয়া আতা'না অর্থাৎ আমরা আনুগত্যের শপথ করলাম বলে নতুনভাবে বায়আত করল। যখন রেজা ইবনে হায়াত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ মিম্বরে দাঁড়াতে অনুরোধ করলেন। তিনি মিম্বরের নিকটেই ছিলেন, তিনি বললেন, "আল্লাহর কসম”! আমি প্রকাশ্য বা গোপন কোনভাবেই এর আশা করিনি।
ইবনুল জাওযি আরো বলেন, এ দ্বিতীয় বায়আতের পর সুলাইমানকে দাফন করে যখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ মসজিদে আসলেন, তখন মিম্বরে আরোহণ করে বললেন, হে লোক সকল! আমাকে আমার মতামত ও ইচ্ছা ছাড়াই খেলাফতের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে সাধারণ মুসলিম জনতার কোন পরামর্শ গ্রহণ করা হয়নি। অতএব আমি তোমাদেরকে আমার বায়আত হতে মুক্তি দিলাম। তোমরা স্বাধীনভাবে যাকে ইচ্ছা খলীফা নির্বাচন কর। সমস্ত লোক সমস্বরে চিৎকার করে বলে উঠল, আমরা আপনাকেই খলিফা মনোনীত করেছি, আমরা আপনাকেই খলিফা মনোনীত করেছি। আমরা আপনার প্রতি সন্তুষ্ট।
📄 প্রথম পদক্ষেপ
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সুলায়মানের জানাযায় নামায পড়িয়ে যখন তাকে দাফন করলেন তখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ অন্য কোন কাজ করার পূর্বেই দোয়াত-কলম আনিয়ে সর্বপ্রথম তিনটি নির্দেশ প্রদান করলেন।
লোকজন তাঁর ব্যস্ততায় কানাঘোষা করতে লাগল। কেউ কেউ বলল, "এতো তাড়াহুড়া কেন, এ কাজ তো তিনি ঘরে ফিরেও করতে পারতেন। মনে হয় খেলাফতের লোভ-লালসায় তাঁকেও পেয়ে বসেছে।
ইবনুল হাকام বলেন, খেলাফতের লোভ-লালসার কারণেই ওমর ইবনে আবদুল আজিজ দোয়াত-কলম আনার ব্যবস্থা করেননি, বরং তিনি নিজেই নিজের পর্যালোচনা করেছেন এবং এই অবহেলাও তার অনুভুতি এবং কর্তব্য পরায়ণতার প্রতিকূলে ছিল বলেই তিনি এরূপ ব্যস্ততা প্রকাশ করেছিলেন।
এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, ওমর ইবনে আবদুল আজিজের এ ব্যস্ততার কারণ কর্তব্যপরায়ণতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কেননা, যদি তিনি বাদশাহী পছন্দ করতেন, যদি তিনি বাদশাহীর উপকরণাদি লাভ করতে ভালবাসতেন তবে ওয়ালিদ বা সুলাইমানের যুগে প্রকাশ্যে না হোক গোপনে হলেও এর জন্য কোন প্রচেষ্টা চালাতেন। অথচ বাস্তব ও সত্য কথা হলো ঐতিহাসিক ইবনে আব্দুল হাকام স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, সমগ্র বনু উমাইয়ার মধ্যে ওয়ালিদ ও সুলায়মান ব্যতীত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বনু উমাইয়ার সকলের নিকটেই প্রিয়পাত্র ছিলেন। তিনি দেশব্যাপী উলামা, ফুকাহা এবং মুহাদ্দেসিন -সকলের নিকটেই প্রশংসনীয় ছিলেন। তদুপরি মিশর ও আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকায় তাঁর যথেষ্ট সংখ্যক ভক্ত-অনুরক্ত ছিল। তিনি ইচ্ছা করলে ওয়ালিদ বা সুলায়মানের যুগেও মিশরে স্বাধীনভাবে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। কারণ তৎকালীন তিনজন নামকরা সেনাপতি মোহাম্মদ ইবনে কাসেম, মূসা ইবনে নাছীর এবং কুতাইবা ইবনে মুসলিম ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পরম ভক্ত ছিল। বিশেষতঃ মূসা ও কুতাইবা তাঁর ইশারায় লাখ লাখ সৈন্যসহ ময়দানে হাজির হতে দ্বিধাবোধ করত না।
মূসা ইবনে নাছীর সম্পর্কে ঐতিহাসকদের ধারণা হলো, মূসার সাথে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পিতা আব্দুল আজিজের বন্ধুত্ব ছিল। ওমরের সাথেও মূসার সম্পর্ক সেরূপ ঘনিষ্ট ছিল। কারণ মূসা যখন ইরাকের মন্ত্রী ছিলেন, তখন খলীফা আব্দুল মালেকের রোষে পড়ে তিনি কুফা হতে পালিয়ে মিশরে আব্দুল আজিজের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। এটা জানতে পেরে আব্দুল মালেক তার ভাই আব্দুল আজিজকে লিখলেন যে মূসা পলাতক ব্যক্তি-তাকে দামেশকে পাঠিয়ে দেয়া হোক। কিন্তু আব্দুল আজিজ কোন পরওয়াই করলেন না। বরং তাকে তিনি আফ্রিকার শাসনকর্তা নিযুক্ত করে সেখানকার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করে দিলেন। মূসাও সেই সুযোগে বিপুল পরিমাণে শক্তি বৃদ্ধি করে নিলেন।
সুলাইমান তার অভিষেকের সময় যখন মূসাকে গ্রেফতার করেন, তখন ওমর ইচ্ছা করলে মূসাকে স্বপক্ষে আনতে পারতেন এবং মূসাও তার সমর্থন পেলে এমন এক বিদ্রোহ ঘটাতে পারতেন যার ফলে সুলাইমান কেন, সমগ্র বনু উমাইয়ার নাম-নিশানা পর্যন্ত মুছে যেত। কিন্তু ওমর ইবনে আবদুল আজিজ এমনটা করলেন না।
যদি তিনি খেলাফত পরিচালনার লোভ করতেন তবে কুতাইবা ইবনে মুসলিম- যিনি প্রাচ্যের মহান বিজেতা ছিলেন, তার দ্বারাও তিনি সে দিনই খেলাফতের পতাকা উড্ডীন করতে পারতেন, যেদিন দামেশকে সুলাইমানের খেলাফতের সাধারণ বায়আত গ্রহণ করা হয়েছিল। ইবনে কাছীর স্পষ্ট ভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, ইয়াজিদ ইবনে মুহারিবের কারণে কুতাইবা সুলায়মানের প্রতি বিরূপ ভাবাপন্ন ছিলেন। তিনি সুলায়মানকে পদচ্যুত করার জন্যে এক বিরাট সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন। যদি ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ গোপনে ও একজন সংবাদ বাহকের মাধ্যমে তাকে কোন ইঙ্গিত দান করতেন যে সুলাইমানের পরিবর্তে তুমি আমার বায়আত গ্রহণ কর তবে কুতাইবা তাঁর এতটুকু ইশারায় তার খেলাফতের পতাকা উড্ডীন করে দিতেন। এবং তার এ কর্মতৎপরতায় কেউ বাধা দিতে সাহস পেত না। তিনি প্রকাশ্যে রাজধানী দামেস্কে এসে উপস্থিত হতেন, আর একজন উমুবী যুবরাজের পৃষ্ঠপোষকতাই তাকে তাঁর এ সাফল্যের স্বর্ণশিখরে পৌঁছে দিত।
কিন্তু ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ খেলাফতের মসনদকে শুধু কণ্টকাপূর্ণ নয় বরং অগ্নিস্ফুলিঙ্গ পূর্ণ শয্যা মনে করতেন। তিনি বলতেন, যে ব্যক্তির ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র ও স্বাধীনতা থাকে, সে খলিফা নিযুক্ত হবার পর তার সেই অধিকারটুকুও খর্ব হয়ে যায়।
যা হোক, তাঁর এরূপ কর্তব্যপরায়ণতাই সুলাইমানের জানাযার পর তাঁকে তিনটি ফরমান জারি করতে বাধ্য করেছিল। তন্মধ্যে প্রথম ফরমান ছিল মুসলিমা ইবনে আব্দুল মালেককে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে।
বিখ্যাত ঐতিহাসিক তাবারীর মতে, সুলাইমান ইবনে আব্দুল মালেক তার ভাই মুসলিমাকে ৯৮ হিজরীতে কনষ্টান্টিনোপলে প্রেরণ করে নির্দেশ দিয়েছেন যে, কনষ্টান্টিনোপল জয় না করা পর্যন্ত সে সেখানেই অবস্থান করবে, পরবর্তী নিদের্শ না পাওয়া পর্যন্ত সে ফিরে আসতে পারবে না।
মুসলিমা যখন সেখানে গিয়ে কনষ্টান্টিনোপুলের নিকটবর্তী হলেন, তখন তিনি প্রত্যেক অশ্বরোহীকে দুই মণ গম সঙ্গে নিতে নির্দেশ দিলেন। অশ্বরোহী সৈনিকগণ তাঁর নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করল এবং তারা কনষ্টান্টিনোপুলের নিকটে গমের একটি পাহাড় সৃষ্টি করে দিল। মুসলিমা তাদেরকে এ গম খেতে নিষেধ করলেন এবং রোমানদের ভান্ডার লুণ্ঠন করে এবং তাঁদের কৃষিক্ষেত্রে চাষ করা খাদ্য সংগ্রহ করতে নির্দেশ দিলেন।
সৈন্যবাহিনী কাঠ-খড় দ্বারা সেখানেই ঘর-বাড়ী নির্মাণ করে কৃষিকাজ শুরু করে দিল। তাদের কৃষিক্ষেত্রে ফসল উৎপন্ন না হওয়া পর্যন্ত তারা লুটতরাজ করে তাদের খাদ্য সংগ্রহ করতো। যখন তাদের কৃষি ক্ষেত্রে ফসল উৎপন্ন হল তখন পূর্বের খাদ্য সংরক্ষণ করে উৎপন্নদ্রব্য তারা খেতে লাগল।
তাবারী বলেন, বাহ্যতঃ মুসলিমার এ কর্মসূচী খুবই উত্তম ছিল। কিন্তু রোমানগণ চালাকী করে তাদের এ কর্মসূচী সম্পূর্ণরূপে ভন্ডুল করে দিল। রোমান সেনাপতি এক রাত্রিতে অর্তকিতে আক্রমণ করে মুসলমানদের নতুন ও পুরাতন উভয় শষ্য ভান্ডারে আগুন ধরিয়ে দিল। সমস্ত শষ্য ভান্ডার পুড়ে ভষ্ম হয়ে গেল। এখন সুলাইমানের সৈন্যবাহিনী খাদ্যের বিরাট সংকটের সম্মুখীন হয়ে মৃত্যুবরণ করতে লাগল।
মুসলমানরা খাদ্যের অভাবে তাদের বাহনের জন্তগুলি খেয়ে অবশেষে বৃক্ষের মূল ও পাতা খেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে লাগল। সুলাইমান যথারীতি এ সংবাদ অবগত হয়ে এর কোন প্রতিকার করলেন না। তিনি অত্যন্ত একগুঁয়ে ছিলেন। তিনি ওয়াবেক নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। কিন্তু মুসলমান সৈন্যবাহিনীকে কনষ্টান্টিনোপুল ত্যাগ করতে অনুমতি দিলেন না। তাবারী এ ঘটনা উল্লেখ করে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা বাস্তবিকই করুণ ও মর্মান্তিক। তিনি বলেন, তারা অনাহারে তাদের বাহনের সমস্ত পশু খেয়ে ফেলল, মাটি ব্যতিত গাছের শিকড় ও পাতাসহ সবকিছুই তারা ভক্ষণ করছিল, অথচ সুলাইমান ওয়াবেকে অবস্থান করেও এর কোন প্রতিকার বিধান করতে এগিয়ে আসলেন না। এভাবেই শীতকাল এসে পড়ল এবং সুলায়মান মৃত্যুমুখে পতিত হলেন।
ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, রোমানরা যখন মুসলমানদের সাথে প্রবঞ্চনা করে তাদের খাদ্যসামগ্রী জ্বালিয়ে দিল এ সংবাদ শুনে সুলাইমান খুবই রাগান্বিত হয়ে কসম করলেন যে, তিনি মুসলিমাকে আর ফেরত আনবেন না।
হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট এটা একটি নিবর্তনমূলক কসম ছিল, কাজেই তিনি সুলাইমানের জানাযা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এ কসম ভঙ্গ করে মূহুর্তকাল বিলম্ব না করেই মুসলিমাকে দেশে ফিরে আসতে নির্দেশ দিলেন। তিনি লিখলেন তুমি ফিরে আস। এবং সমস্ত সৈন্যবাহিনীকে দামেস্কে ফিরিয়ে আন।
সুলায়মানের জীবিত অবস্থায় যখন তিনি মুসলমানদের এ দুঃখ কষ্টের কথা জানতে পারলেন তখন সুলায়মান একগুঁয়েমিতে অবিচল ছিলেন কিন্তু ওমর ইবনে আবদুল আজিজ অত্যন্ত বিচলিত ও মর্মাহত হয়েছিলেন।
ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, এটা ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে বিচলিত ও মর্মাহত করেছিল অতঃপর তিনি খেলাফতের পদ লাভ করার পর এক মূহুর্তও মুসলমানদের দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে পারলেন না। এ কারণেই তিনি পত্র লিখতে ব্যস্ততা প্রকাশ করেছিলেন।
তিনি দ্বিতীয় যে পত্র লিখেছিলেন তা প্রথম পত্র অপেক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি এ পত্রের মাধ্যমে মিশরের রাজস্ব সচিব উসামা ইবনে যায়েদ আত্মানুহীকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। তিনি আরো নির্দেশ দিলেন যে, তাকে প্রত্যেক ঘাটিতে এক বছর করে বন্দী করে রাখা হোক।
ইবনে হাকام এ কঠোর নির্দেশের কারণ ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন যে, সে ছিল একজন অত্যাচারী ও আল্লাহর সীমালঙ্ঘনকারী শাসক। সে মানুষকে আল্লাহর বিধানের বিপরীতে শাস্তি দিত। সে এমন সব অপরাধে মানুষের হাত কেটে দিত যাতে আল্লাহপাক অনুরূপ বিধান দেননি। সুতরাং ওমর ইবনে আবদুল আজিজের ন্যায় কর্তব্যপরায়ণ আল্লাহভীরু শাসনকর্তা এরূপ জালেম ও জল্লাদ কর্মকর্তাকে কিভাবে বরদাশত করতে পারেন? অতএব তিনি যথাশীঘ্র সম্ভব মুসলমানগণকে এরূপ পাপিষ্ট ব্যক্তির হাত থেকে মুক্তি দিতে ব্যস্ততার সাথে পত্র লিখতে বাধ্য হয়েছিলেন।
তিনি তৃতীয় ফরমান লিখেছিলেন আফ্রিকার শাসনকর্তা ইয়াযিদ ইবনে আবু মুসলিমকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে। ইয়াযিদ ইবনে মুসলিম শাহী নির্দেশাবলী অতি কঠোরভাবে কার্যকরী করত, মানুষের উপর সীমাহীন জুলুম-অত্যাচার করত, মানুষকে বিনা অপরাধে শাস্তি দিত। অথচ সে যথারীতি আল্লাহর যিকির ও তসবীহ তাহলীলও পাঠ করত। সে যখন কাউকে শাস্তি দিত তখন তার গোলামকে আদেশ দিত, সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, হে বালক! তার শরীরের অমুক অমুক স্থানে জোরে জোরে আঘাত কর। কখনো কখনো লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ আল্লাহু আকবার ধ্বনী করে এসব নির্দেশ দিত।
বাস্তবিক পক্ষে এটা আল্লাহর যিকির ও ইসলামের প্রতি বিদ্রূপেরই নামান্তর ছিল। সে যেন আল্লাহর নাম নিয়েই মানুষের উপর জুলুম অত্যাচার করত এবং মানুষকে শান্তি দিত।
এ তিনটি ফরমান লিখে যখন হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সুলায়মানের কবরস্থান হতে উঠে আসলেন, তখন তাঁর জন্য শাহী সওয়ারী হাজির করা হল। তিনি এ সমস্ত সওয়ারী দেখে বললেন, এ সমস্ত কিসের সওয়ারী? উত্তর দেওয়া হল, এ নবনির্বাচিত খলিফার জন্য নির্ধারিত সওয়ারী। ইতোপূর্বে এসব বাহনে আর কেউ আরোহন করেনি। এতে নবনির্বাচিত খলিফা প্রথম দিন আরোহন করে থাকেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এসব সওয়ারী ফিরিয়ে দিয়ে তার নিজের খচ্চরের দিকে এগিয়ে চললেন এবং ব্যক্তিগত সেবক মুজাহিমকে বললেন, এ সমস্ত বায়তুল মালে নিয়ে যাও। এগুলি সাধারণ মুসলমানের সম্পদ।
ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, তাঁর জন্য এরূপ নতুন তাঁবু ও শামিয়ানা টানানো হল-যাতে ইতোপূর্বে আর কেউ তাতে বসবাস করেনি। এটাই সাধারণ প্রচলিত প্রথা ছিল। যে ব্যক্তি নতুন খলিফা নির্বাচিত হবেন তার জন্য এরূপ নতুন তাবুর ব্যবস্থা করা হত।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এ সমস্ত নতুন তাবু দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এগুলি কিসের তাবু? উত্তর দেওয়া হল, এ সমস্ত তাবুতে ইতিপূর্বে কারও বসার সৌভাগ্য হয়নি। কোন নবনির্বাচিত খলিফা খেলাফতের মর্যাদায় আসীন হবার পরই এসব তাবুতে অবস্থান করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ মুজাহিমকে বললেন, এগুলিও মুসলমানদের সম্পদ, এগুলোও বায়তুলমালে জমা করে দাও। এরপর তিনি তার খচ্চরে আরোহন করে সে সব বিছানার প্রতি অগ্রসর হলেন যা পূর্বনিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণ নতুন ছিল এবং যা ইতোপূর্বে আর কারও জন্য বিছানো হয়নি এবং কোন খলিফাও যাতে বসার সৌভাগ্য লাভ করেননি। মোটকথা এসব বিছানা সম্পূর্ণ নতুন ছিল শুধু অভিষেক অনুষ্ঠানের মর্যাদার খাতিরেই ঐসব ব্যবস্থা করা হয়েছিল। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বাহন হতে অবতরণ করে এ বিছানার নিকটবর্তী হয়ে তার হাতের ছড়ির অগ্রভাগ দিয়ে তা গুটিয়ে দিলেন এবং খালি চাটাই বের করে তাতে উপবেশন করলেন।
ইবনে আব্দুল হাকام বলেন, যখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ খলিফা হলেন তখন সমস্ত লোক তার সামনে দন্ডায়মান হল, তিনি উপস্থিত জনতাকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলেন, লোক সকল! তোমরা যদি আমার সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে থাক তবে আমিও দাঁড়িয়ে যাব। যদি তোমরা বস আমিও বসব। মানুষ শুধু আল্লাহর সামনেই দাঁড়াবে। আল্লাহ মানুষের জন্য কিছু কাজ ফরযও কিছু কাজ সুন্নত করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি এগুলি যথারীতি পালন করবে, সে সফলকাম হবে আর যে ব্যক্তি একথার প্রতি অবহেলা করবে সে ধ্বংস হয়ে যাবে।
তোমাদের মধ্যে যে আমাদের সাহচর্যে আসবে তার পাঁচটি বিষয় অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে।
১। সে আমাদের নিকট তার সেসব প্রয়োজনীয় কথা পৌঁছাবে, আমরা যা অবগত নই।
২। আমাদেরকে এরূপ সুবিচারের প্রতি ধাবিত করবে- যা আমাদের দ্বারা হওয়া সম্ভব ছিল না।
৩। সত্যবাদিতার দিক দিয়ে সর্বদাই আমাদের সঙ্গী হবে।
৪। সবসময় আমাদের ও মুসলমান জনসাধারণের স্বার্থ রক্ষা করবে।
৫। আমাদের নিকট কারও বদনাম না গীবত করবে না।
এই পাঁচটি বিষয় যে লক্ষ্য রাখবে না তার জন্য আমাদের দরজা বন্ধ থাকবে।
এ সম্পর্কে ইবনুল জাওযি মুহাম্মদুল মারুযির মাধ্যমে যে বর্ণনা করেছেন তাতে সুলায়মানের দাফন শেষ এবং খলিফার জন্য নতুন সওয়ারী হাজির করার বর্ণনায় কিছু অতিরিক্ত বিষয়ও বর্ণিত হয়েছে- তিনি বললেন, আমার বাহন আন। যখন তাঁর বাহনের জন্তুটি তাঁর নিকট উপস্থিত করা হল এবং তিনি তাতে আরোহন করলেন, তখন শহররক্ষী প্রধান এসে তার সামনে হাজির হল এবং খোলা তলোয়ার হাতে নিয়ে আগে আগে চলল। খলীফা তাকে বললেন, আমার সামনে হতে সরে যাও, তোমার কোন প্রয়োজন নেই। আমার নিকট তোমার কোন কাজও নেই। আমি একজন সাধারণ মুসলমান, একজন সাধারণ মানুষ মাত্র। তিনি চলতে লাগলেন। মানুষও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলল। তিনি মসজিদে এসে মিম্বরে আরোহন করে বসলেন, সমস্ত লোক তার চারদিকে জমায়েত হল। এরপর তিনি এই ভাষণ দিলেন,
হে লোক সকল! আমি তোমাদেরকে আল্লাহকে ভয় করার পরামর্শ দিচ্ছি। আল্লাহর ভয় সর্বপ্রথমে। আল্লাহর ভয় ব্যতীত কোন উপায় নেই। নিজের জীবন পরিপাটি করার জন্য যা কিছু প্রয়োজন মনে কর তবে যে ব্যক্তি পরকালের কাজ করে যায় আল্লাহ তার দুনিয়ার কাজ সঠিক করে দেন। যদি তোমরা তোমাদের অভ্যন্তরকে ঠিক রাখ তাহলে আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক দিক ঠিক রাখবেন। মৃত্যুকে বেশি স্মরণ কর। মৃত্যু যখন আসবে তখন তার জন্য উত্তমরূপে প্রস্তুত থাকা উচিত। মৃত্যু মানুষের জীবনের সমস্ত আনন্দ উপভোগ কেড়ে নেয়। এ উম্মত আল্লাহ ও তার রাসূল এবং আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে কোন মতবিরোধ করবে না। কিন্তু তারা ধন-সম্পদ নিয়ে ঝগড়া ফাসাদ করবে। আল্লাহর কসম, প্রাপ্য অধিকার ছাড়া আমি কাউকে কোন কিছুই দেবনা, কারও অধিকারে হস্তক্ষেপ করব না।
তারপর তার কণ্ঠস্বর আরও গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি বললেন, হে লোক সকল! যে আল্লাহর আনুগত্য করে মানুষের উপর তার অধীনতা স্বীকার করা ফরজ। যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করে মানুষের উপর তার আনুগত্য স্বীকার করা জায়েয নেই। আমি যদি আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করি তবে তোমরা আমার কথা মেনে চলবে আর যদি আল্লাহর নাফরমানী করি তবে তোমরাও আমার কথা অমান্য করবে।
অপর এক বর্ণনায় দেখা যায় যে, হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এ সময় নিম্নলিখিত ভাষণ দিয়েছেন, “হে লোক সকল! এটা বাস্তব সত্য যে, তোমাদের নবীর পর আর কোন নবী আগমন করবেন না, তোমাদের কিতাবের পর আর কোন কিতাব অবতীর্ণ হবে না। মহান আল্লাহ যে সমস্ত বস্তু হালাল করেছেন সেগুলো হালাল আর তিনি যা হারাম করেছেন তাই হারাম। আর এ হারামের বিধান কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। হে লোক সকল! স্মরণ রেখো, আমি চুড়ান্ত বিচারক হিসেবে এ আসনে উপবেশন করিনি। আমি শুধু আল্লাহর বিধানসমূহ কার্যকরী করতেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমি কোন নতুন বিষয়ের দাবী করব না, আমি আল্লাহর বিধান অনুসরণ করে চলব। হে লোক সকল! দেখো, আল্লাহর বিধানের বিপরীতে কারোও আনুগত্য তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে না।
আরও মনে রেখো, আমি তোমাদের মধ্যে সকলের চেয়ে উত্তম ব্যক্তি নই। আমি তোমাদেরই মত একজন সাধারণ মানুষ। কিন্তু আল্লাহপাক তোমাদের চেয়ে আমাকে অনেক বেশী দায়িত্ব দিয়েছেন।
ইবনুল জাওযি বলেন, তার এ ভাষণ শেষ হওয়া মাত্রই একজন আনসারী সর্বপ্রথম উঠে এসে তাঁর হাতে বায়আত গ্রহণ করলেন। তারপর একের পর এক লোক এসে বায়আত গ্রহণ করতে লাগল, এরূপে সাধারণ বায়আত অনুষ্ঠান শেষ হল। তারপর তিনি তার তাবুতে আসলেন, পূর্ব হতেই তাঁর জন্য সুলায়মানের গালিচা বিছানো ছিল, তিনি এ গালিচা উঠিয়ে একটি আরমানি বিছানা বিছিয়ে তাতে বসলেন এবং বললেন, আল্লাহর কসম! আমি যদি মুসলিম জনতার দায়িত্ব গ্রহণ না করতাম তবে তোমার উপর বসতাম না।
এ আরমানি বিছানাটি খুবই নিম্নমানের ছিল বলেই তিনি তাকে পছন্দ করেছিলেন, তা না হলে তিনি তা পছন্দ করতেন না।
ইবনুল জাওযির অপর এক বর্ণনায় জানা যায় যে, তিনি খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি তাঁর সামনে এসেছিল তার দুঃখ-কষ্টের কথা শুনে তিনি কেঁদে অস্থির হয়ে গেলেন, তাঁর চোখের পানিতে হাতের লাঠিটিও ভিজে গিয়েছিল। অবশেষে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তাকে নিজের তরফ হতে দুশত দীনার এবং বায়তুল মাল হতে আর তিনশ দীনার প্রদান করলেন এবং তার জন্য পৃথকভাবে মাসিক দশ দীনার ভাতা ধার্য করে দিলেন।
তারপর তিনি তার বাসস্থানে আসলেন, তখন রাত অনেক হয়েছিল। কাজেই তিনি বিশ্রাম গ্রহণ করলেন। পরের দিন সকালে সুলায়মানের বাসগৃহে চলে গেলেন।
ইবনে আব্দুল হাকام বলেন, সারা রাত ধরে সুলায়মানের পরিবারের লোকেরা শাহী আসবাবপত্র উল্টাপাল্টা করতে লাগল, অব্যবহৃত সুগন্ধি ব্যবহৃত বোতলে রাখল, নতুন কাপড় পরিধান করতে লাগল, যেন সেগুলোও ব্যবহৃত দেখা যায়। তারা এসব করার কারণ হলো, পূর্ব হতে প্রচলিত ছিল যে, যখন কোন খলিফার মৃত্যু হত তখন খলিফার ব্যবহৃত জিনিসপত্র, সুগন্ধি ও অন্যান্য সামগ্রী তার সন্তানগণ অংশীদার হতো, আর যা অব্যবহৃত থাকত তা নতুন খলিফা লাভ করত।
পরের দিন সকালে সুলায়মানের পরিবারের লোকেরা ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে এ সমস্ত সামান-পত্র দেখিয়ে বলল, এগুলি তোমার আর এগুলি আমাদের। খলিফা এ কথার ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তারা বলল, সুলায়মান যে সব কাপড় পরিধান করেছেন, যে সব সুগন্ধি ব্যবহার করেছেন সেগুলো তার সন্তানদের আর যেগুলি ব্যবহার করেননি সেগুলো আপনার।
হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এ ব্যাখ্যা শুনে বললেন, এসব আমারও নয় তোমাদেরও নয়। এসব মুসলমানদের সম্পদ। তখন তার খাদেমকে বললেন, মুজাহিম এসব বায়তুল মালে জমা করে দাও।
এখন শুধু বাঁদীগণ অবশিষ্ট থাকল। এই সমস্ত বাঁদী তাঁর সামনে হাজির করা হল, এরা জীবিকার জন্য এ পেশা গ্রহণ করেছিল। তাদের প্রত্যেকের পরিচয়, বংশ, দেশ সম্পর্কে অবহিত হয়ে তিনি নির্দেশ দিলেন যে, এদের প্রত্যেককে তাদের পিতা-মাতার নিকট পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হোক।
ইবনে আব্দুল হাকাম বলেন, মন্ত্রীগণ, পরিষদবর্গ এবং উমাইয়া বংশের লোকেরা এসব দেখে নিরাশ হয়ে পড়ল, তারা বুঝল যে, তিনি শুধু ইনসাফ তথা ন্যায় বিচারকেই বেছে নিবেন। তিনি কোন অন্যায়-অবিচার প্রশ্রয় দিবেন না।