📘 ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ > 📄 ক্রমবিকাশ ও শিক্ষা-দীক্ষা

📄 ক্রমবিকাশ ও শিক্ষা-দীক্ষা


হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) মদীনাতে জন্মগ্রহণ করেন এবং মদীনাতেই তিনি প্রতিপালিত হন। সালেহ ইবনে কাইসান এবং আবদুল্লাহ ইবনে উতবার মত বিশিষ্ট মুহাদ্দিসগণ ছিলেন তাঁর শিক্ষক ও তত্ত্বাবধায়ক। আল্লামা যুহরীর মতে, সালেহ ইবনে কাইসানকে তাঁর পিতা আবদুল আজীজই তাঁর শিক্ষক নিযুক্ত করেছিলেন। সালেহ সময় সময় সাধারণ ক্রমোন্নতির সাথে সাথে শিক্ষাগত উন্নতি সম্পর্কেও তাঁর পিতা আবদুল আজীজকে অবহিত করতেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ আল্লামা যুহরীর কথা উল্লেখ্য যে, একদা সালেহ ইবনে কাইসান আবদুল আজীজের নিকট তাঁর পুত্র সম্পর্কে যে রিপোর্ট দিয়েছিলেন তাতে তিনি এ অভিযোগও করেছিলেন যে, ওমর মাথার চুল আচড়াতে নামাযে বিলম্ব করেছে। (তাযকেরাতুন হুফফায, ১ম খণ্ড, ১৩৩ পৃ. ইবনুল জাওযি ৯ পৃ.)

এ বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) এমন সময়েই সালেহের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন, যখন নামাযে বিলম্বের কারণে কঠোরতা প্রদর্শনের প্রয়োজনীয়তা ছিল এবং যখন মাথার চুল পরিপাটি সম্পৰ্কেও তাঁর পূর্ণ ধারণা ছিল, আর এটা বার বছর বয়সের উপর ছাড়া কম নয়।

আমাদের ধারণা বার বছর বয়সের পর সালেহ ইবনে কাইসান হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)-এর শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। বার বছর বয়সের পূর্বে তিনি তাঁর নানা এবং মায়ের চাচা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন। ইবনে আবদুল হাকামের নিম্নোক্ত বর্ণনাটি আমাদের এ বিশ্বাসের মূল ভিত্তি "তিনি অধিকাংশ সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর নিকট আসতেন এবং মায়ের নিকটে গিয়ে বলতেন, মা! আমার ইচ্ছা হয় যে, আমিও তোমার চাচার মত হই!” এতে মা তাঁকে আদর করে সান্ত্বনা দিতেন, চিন্তা করো না, তুমিও আমার চাচার মত হবে ইনশাআল্লাহ।” (ইবনে আবদুল হাকাম, ১৯ পৃ.)

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন, না তিনি ওমরকে নিয়মিত শিক্ষা দিতেন একথা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এটা নিশ্চিত যে, যখন আবদুল আজীজ মিশর জয় করে সেখানকার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন, তখন উম্মে আসেম এবং তার পুত্র ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) উভয়েই মদীনাতে ছিলেন। আর যেহেতু হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (র) ছিলেন উম্মে আসেমের পিতৃব্য এবং তখন আসেম ইন্তেকাল করেছিলেন, কাজেই মা-পুত্র উভয়েই তাঁর তত্ত্বাবধানেই ছিলেন। উম্মে আসেম সকল কাজকর্মেই চাচার পরামর্শ গ্রহণ করতেন এবং তিনি যে পরামর্শই দিতেন সে অনুযায়ী কাজ করতেন। উদাহরণস্বরূপ ইবনে আবদুল হাকামের এ বর্ণনাটি প্রণিধানযোগ্য।

যখন তাঁর পিতা আবদুল আজীজ মিশরে গিয়ে সেখানকার শাসনকর্তার দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন, তখন তিনি তাঁর স্ত্রী উম্মে আসেমকে পুত্র ওমরসহ তার নিকট চলে যাওয়ার জন্য লিখে পাঠালেন। উম্মে আসেম তার পিতৃব্যের নিকট এসে স্বামীর পত্র সম্পর্কে জানালে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) বললেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্রী! তিনি তোমার স্বামী, তাঁর নিকট চলে যাও। উম্মে আসেম যখন স্বামীর নিকট চলে যেতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন, তখন আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) তাঁকে বললেন, বালকটিকে আমাদের নিকট রেখে যাও, সে আমাদের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। অতএব উম্মে আসেম ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) কে তাঁর চাচার নিকট রেখে তিনি স্বামীর নিকট চলে গেলেন। আবদুল আজীজ পুত্রকে দেখতে না পেয়ে উম্মে আসেমকে বললেন, ওমর কোথায়? উম্মে আসেম উত্তরে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর কথা বললেন এবং বললেন যে, চাচা আবদুল্লাহ স্বগোত্রের সাদৃশ্যের কারণে তাকে তাঁর নিকট রেখে যেতে বলেছিলেন। আবদুল আজীজ এতে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন এবং স্বীয় ভ্রাতা আবদুল মালেককে এ বিষয় জানিয়ে দিলেন। খলীফা আবদুল মালেক ওমর ইবনে আবদুল আজীজের জন্য মাসিক এক হাজার দীনার ভাতা দানের নির্দেশ প্রদান করলেন। (ইবনুল জাওযি ৯)

মাতা যতদিন মদীনায় ছিলেন তিনিও মায়ের সাথে মারওয়ানের ব্যক্তিগত গৃহেই থাকতেন। কিন্তু তবুও তাঁর অধিকাংশ সময় হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর নিকট কাটতো। মা মিশরে চলে যাওয়ার পর থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর তত্ত্বাবধানে চলে আসলেন এবং তাঁর নিকট অবস্থান করতে লাগলেন। তাঁর মা স্বীয় পিতৃব্যের নিকট তাঁকে রেখে গিয়েছিলেন, এতে তাঁর পিতা ইবনে ওমরের তত্ত্বাবধানকে শুধু সমর্থন করেননি, বরং তাঁর তত্ত্বাবধান গ্রহণ করার কারণে তিনি অত্যন্ত খুশি হলেন।

এসব বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধারণা করা যায় যে, আবদুল আজীজ নিজে তার পুত্রের শিক্ষকমণ্ডলী নিয়োগ করেননি, বরং আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) তাঁর শিক্ষক নিয়োগ করেছিলেন, তবে তাতে আবদুল আজীজের অনুমোদন ছিল। ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) তার ওস্তাদগণের প্রভাবে খুবই প্রভাবিত ছিলেন। বিশেষতঃ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ওবায়দুল্লাহ ইবনে ওতবাহর প্রভাব তাঁর উপর বিশেষভাবে কার্যকরী ছিল।

ইবনুল জাওযি বলেন-
كَانَ عُمَرُ بْنُ عَبْدُ الْعَزِيزِ يَقُولُ لَوْ كَانَ عُبَيْدُ اللهِ حَيًّا مَّا صَدَرْتُ إِلَّا عَنْ رَّابِهِ
অর্থাৎ ওমর বলতেন, যদি উবায়দুল্লাহ জীবিত থাকতেন তবে তাঁর পরামর্শ ব্যতীত আমি কোন আদেশ জারী করতাম না।

ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) অন্যান্য ওস্তাদগণের তুলনায় উবায়দুল্লাহর নিকট অনেক কিছু শিক্ষা অর্জন করেছিলেন। বিশেষতঃ অধিকাংশ হাদীস তাঁর নিকট থেকে শিক্ষা করেছিলেন।

তাঁর ব্যক্তিগত কথা হল-
رَوَيْتُ مِنْ عُبَيْدُ اللَّهِ بْنِ عُتْبَةَ أَكْثَرَ مِمَّا رَوَيْتُ عَنْ جَمِيعِ النَّاسِ
অর্থাৎ আমি অন্যান্য সকলের নিকট থেকে যে সমস্ত হাদীস বর্ণনা করেছি, তার চেয়ে অধিক বর্ণনা করেছি উবায়দুল্লাহর নিকট থেকে। (ইবনুল জাওযি-৯)

উবায়দুল্লাহ ইবনে উতবা একজন শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিস এবং বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন ছিলেন। তিনি এতই আত্মনির্ভর ও আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন লোক ছিলেন যে, ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র.) যখন মদীনার গভর্ণর ছিলেন, তখন কোন দিনই তিনি তাঁর গৃহে গমন করেননি। ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) অধিকাংশ সময় তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে তাঁর ঘরে আসতেন। অনেক সময় এমনও হয়েছে যে, উবায়দুল্লাহ ইবনে ওতবা তাঁর আগমনের কোন মূল্যই দেননি, খাদেমের মাধ্যমে তাঁকে ফিরিয়ে দিয়েছেন।

হযরত উবায়দুল্লাহ ইবনে ওতবা ছাড়াও সালেম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে জাফর, সাঈদ ইবন মুসাইয়‍্যাব, ইউসুফ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সালাম, হযরত আনাস ইবনে মালেক এবং আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা), প্রমুখ মনীষীদের নিকট থেকে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন।

ইবনুল জাওযি ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)-এর শ্রদ্ধেয় ওস্তাদগণের নাম ও তাঁদের নিকট থেকে তাঁর বর্ণিত হাদীসসমূহ লিপিবদ্ধ করেছেন- যা বিভিন্ন হাদীসের কিতাবে বর্ণিত আছে। উদাহরণস্বরূপ দু' একটি এখানে উল্লেখ করছি। ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা)-এর নিকট থেকে বেশ কিছুসংখ্যক হাদীস বর্ণনা করেছেন, তন্মধ্যে দু'টি হাদীস নিম্নে উল্লেখ করা হল।
قَالَ أَنَسٌ سَمِعْتُ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ أَوْ يُسَلِّطَنَّ عَلَيْكُمْ عَدُوًّا مِنْ غَيْرِكُمْ تَدْعُونَهُ فَلَا يَسْتَجِيبُ لَكُمْ

অর্থাৎ হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা) বলেছেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি- "তোমরা লোকদেরকে সৎকার্যের আদেশ কর, অসৎ কার্যের নিষেধ কর, অন্যথায় তোমাদের শত্রুগণ তোমাদের উপর শক্তিশালী হয়ে পড়বে, তারপর তোমরা তাঁকে যতই ডাক না কেন কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়ে দেবেন না।

قَالَ أَنَسٌ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ أَوْجَزِ النَّاسِ صَلوةٌ فِي تَمَامٍ -
অর্থাৎ হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা) বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নামায ছিল সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ অথচ সংক্ষিপ্ত।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা)-এর নিকট থেকে তিনি বহু হাদীস শিক্ষা করেছিলেন এবং কতিপয় হাদীস বর্ণনাও করে গিয়েছেন। তন্মধ্যে একটি হাদীস নিম্নে উল্লেখ করা হল-
عَنْ ابْنِ عُمَرَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى يُحِبُّ الشَّابَ يَفْنِي شَبَابَهُ فِي عِبَادَةِ اللَّهِ وَيُحِبُّ الْإِمَامَ الْمُقْسَطِ وَأَجْرُهُ أَجْرٌ مَنْ يَقُومُ سَنَتَيْنِ عَامًا يَصُومُ نَهَارَهُ وَيَقُومُ لَيْلَهُ
অর্থাৎ ইবনে ওমর (রা) থেকে বর্ণিত আছে নবী করীম (সা) বলেছেন, যে যুবক আল্লাহর ইবাদতে তার যৌবন অতিবাহিত করে, আল্লাহ তাকে ভালবাসেন এবং ন্যায়পরায়ণ শাসককেও আল্লাহ ভালবাসেন এবং যে ব্যক্তি দু' বছর ব্যাপী দিনে রোযা রাখে ও রাতে আল্লাহর ইবাদত করে তাকে তার সমান পুরষ্কার দেন।

আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা)-এর নিকট থেকেও তিনি অনেক হাদীস শিক্ষা করেছিলেন, কিন্তু মুহাদ্দিসগণ শুধু একটি হাদীসের সন্ধান পেয়েছেন।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ جَعْفَرٍ عَنْ أَسْمَاءِ قَالَتْ عَلَّمَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ دَعْوَةُ الْكَرْبِ قَالَ إِذَا نَزَلَ بِكَ كَرْبُ فَقُولِى اللَّهُ اللَّهُ رَبِّي لَا أُشْرِكْ بِهِ شَيْئًا

অর্থাৎ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে জাফর (রা) হযরত আসমা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে বিপদের সময়কার একটি দুআ শিক্ষা দিয়ে বললেন, যখন তোমার উপর কোন বিপদ এসে পড়ে তখন তুমি বল যে , لَا أُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا اللَّهُ اللَّهُ رَبِّي অর্থাৎ আল্লাহ, আল্লাহই আমার প্রতিপালক বা রব, আমি তাঁর সাথে কাউকে শরীক করি না।

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) ইউসুফ ইবন সালামের নিকট থেকে অনেক হাদীস শিক্ষা করেছিলেন এবং বহু হাদীস বর্ণনাও করেছেন; কিন্তু হাদীসের গ্রন্থসমূহে মাত্র এই একটি হাদীসই লিপিবদ্ধ দেখা যায়। قَالَ يُوسُفُ بْنُ عَبْدِ السَّلَامِ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَلَّ مَا يُحَدِّثُ إِلَّا يَلْمَعُ بِبَصَرِهِ إِلَى السَّمَاءِ -

অর্থাৎ ইউসুফ ইবনে আবদুস সালাম বলেছেন, নবী (সা) যখনই কোন হাদীস বলতেন, তখন তিনি আকাশের দিকে তাকাতেন।

সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব থেকেও তিনি একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনিও তাঁর অন্যতম উস্তাদ ছিলেন। এছাড়া আবু বকর ইবনে আবদুর রহমান, আবু সালমা ইবনে আবদুর রহমান, উরুয়া ইবন যুবাইর খারেজা ইবনে যায়েদ ইবনে সাবিত, আমের ইবনে সাদ, ইবনে আবু ওয়াক্কাস আবু বুরদা, রবী ইবনে সারাতুল জুহানী, উরান ইবনে মালেক আয-যাহরী, মুহাম্মদ ইবনে কাব, আবু সালাম এবং আবু হাযিম প্রমুখ মনীষীগণ তাঁর শ্রদ্ধাস্পদ উস্তাদ ছিলেন।

তন্মধ্যে কয়েকজন মুহাদ্দিস বিশেষ করে উরুওয়া ইবনে যুবাইর, আবু বুরদা, আয-যাহরী, আবু সালাম, খারেজা এবং আবুবকর ইবনে আবদুর রহমান প্রমুখ বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ছিলেন। (ইবনুল জাওযি ১২ থেকে ৩৫)

ইবনে-জাওযি বলেন, ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) এ সমস্ত বিশিষ্ট ওলামাগণ ছাড়াও অন্যান্যদের নিকট থেকে হাদীস শিক্ষা করেছিলেন। কিন্তু তিনি আরবী সাহিত্য ও আরবী কাব্য কার নিকট থেকে শিখেছিলেন তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে তাঁর উক্তি দ্বারা বুঝা যায় যে, মদীনায় থাকাকালে তিনি আরবী ভাষা ও সাহিত্যে বুৎপত্তি লাভ করেছিলেন। (ইবনুল জাওযি ১২-৩৫)

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)-এর নানা আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) যদিও স্বভাবতঃ ধর্মপ্রাণ ছিলেন, তথাপি পবিত্র কুরআন বোঝার জন্য সম-সাময়িক ভাষা ও সাহিত্যজ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে মনে করতেন। সুতরাং এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, এজন্যই আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) তাঁর মহান পিতা হযরত ওমর (রা)-এর আদর্শ বিচ্যুত না হয়েই তাঁর নাতী ওমর ইবনে আবদুল আজীজকে আরবী ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষা দিয়েছেন।

হযরত ওমর ফারুক (রা)-এর শাসন-পদ্ধতির ইতিহাস পাঠ করলে জানা যায় যে, হযরত ওমর (রা) প্রত্যেক মুসলিম বালককে বিশেষতঃ প্রত্যেক যুবককে আরবী ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষা দেয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে মনে করতেন। তিনি যখন মুসলমান বালক ও যুবকদের কুরআন শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে শিক্ষক নিয়োগ করেন তখন ভাষা শিক্ষা দেয়ার মত যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ করেছিলেন।

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) মদীনায় অবস্থানকালে আরবী ভাষা ও সাহিত্য এবং তদসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ যেমন- ব্যাকরণ, অলংকারশাস্ত্র ইত্যাদি এবং কুরআন ও হাদীসের অসাধারণ জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি যখন মদীনা থেকে বের হয়ে সিরিয়া তারপর মিশরে গমন করেন তখন তিনি ছিলেন একজন বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন আলেম। তাঁর জ্ঞানের স্বীকৃতি দিয়ে মায়মুন ইবনে মেহরানের মত যোগ্য আলেমও বলতে বাধ্য হয়েছিলেন- اتينا عُمَرَ بْنَ عَبْدُ الْعَزِيزِ فَظَنَنَّا أَنَّهُ يَحْتَاجُ إِلَيْنَا فَإِذَا نَحْنُ تَلَامِيذُهُ

অর্থাৎ আমরা ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)-এর নিকট আগমন করলাম, আমাদের ধারণা ছিল যে, জ্ঞান সম্পর্কে তিনি আমাদের মুখাপেক্ষী হবেন, কিন্তু তাঁর নিকট এসে উপলব্ধি করলাম যে, আমরা তাঁর ছাত্রতুল্য। (ইবনুল জাওযি ২৭)

অন্য এক স্থানে মায়মুন ইবনে মেহরান ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)কে মুআল্লিমুল উলামা অর্থাৎ আলেমদের শিক্ষক এবং সম-সাময়িক সমস্ত আলেমকে তাঁর শিষ্য বলে অভিহিত করেছিলেন। (ইবনুল জাওযি ৩৭)

ইবনে আবদুল হাকামের একটি বর্ণনায় জানা যায় যে, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) দু'বার মদীনায় আগমন করেছিলেন।

তার ভাষ্যটি হল- তারপর ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) তাঁর পিতার নিকট মিশরে গমন করলেন এবং আল্লাহর মর্জি অনুযায়ী কিছুদিন পিতার নিকট অবস্থান করলেন।

একদিন তিনি গাধার পিঠে আরোহন করে কোথাও যাচ্ছিলেন। ঘটনাক্রমে গাধার পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে আহত হলেন। তাঁর ভাই 'আছবাগ” এ খবর শুনে হেসে উঠলেন। আবদুল আজীজ তাকে তিরস্কার করে বললেন, তোমার ভাই পড়ে আহত হয়েছে, আর তুমি তাঁর বিপদে হাসছ! আছবাগ উত্তরে বলল, পিতা! আমি ভাইয়ের অমঙ্গল কামনা করে হাসিনি এবং আমি তার আহত হওয়ায় মোটেই খুশী হইনি। তবে তিনি পড়ে আহত না হলে বনী উমাইয়ার শীর্ণ দেহধারীর নিদর্শন পূর্ণ হত না। তিনি পড়ে আহত হওয়ায় বনী উমাইয়ার শীর্ণ দেহধারীর নিদর্শন পূর্ণ হয়েছে এ কারণেই আমি হাসলাম।

আবদুল আজীজ এটা শুনে চুপ করে রইলেন এবং বললেন, যার সাথে অনেকের অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা জড়িত রয়েছে, মদীনা ছাড়া তার উপযুক্ত শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে না। তারপর তিনি তাঁকে আবার মদীনায় পাঠিয়ে দিলেন। (ইবনে আবদুল হাকام ১৯-২০ ও ইবনে কাছীর ১৯১৭)

এ ঘটনায় আছবাগ যে কথার প্রতি ইঙ্গিত করেছিল, তা ছিল একটি ভবিষ্যদ্বাণী, যা বনু উমাইয়াদের মধ্যে বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করেছিল। ইবনে কাছীর বলেছেন যে, উমাইয়া বংশের লোকেরা বলাবলি করত যে, আমাদের সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ খলীফা হবেন তিনিই যিনি হবেন দুর্বল দেহের অধিকারী। আর তিনি ছিলেন ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)। (ইবন কাছীর, ৮ম খণ্ড, পৃ. ১১৯)

ইবনুল জাওযি তার গ্রন্থের টীকায় লিখেছেন যে, খোরাসানের একজন বুযুর্গ স্বপ্নে দেখলেন যে, কোন মহান ব্যক্তি তাকে বলছেন- যখন বনী উমাইয়ার সবচেয়ে দুর্বল দেহধারী ব্যক্তি খলীফা নির্বাচিত হবেন তখন তিনি দুনিয়াকে ন্যায়পরায়ণতার আবরণ দ্বারা পূর্ণ করে দিবেন। যেমন আজ অন্যায়-অত্যাচারে পূর্ণ হয়ে আছে। (ইবনুল জাওযি ৭)

ইবন কাছীর আরও বলেছেন যে, ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) যখন গাধার পিঠ থেকে পড়ে আহত হলেন, তখন তাঁর পিতা আবদুল আজীজ তাঁর ক্ষত স্থানের রক্ত মুছতে মুছতে বলেছিলেন- إِنْ كُنْتَ أَشْبَحَ بَنِي أُمَيَّةَ إِنَّكَ إِذَا سَعِيد অর্থাৎ তুমি যদি বনী উমাইয়ার সেই শীর্ণকায় লোক হয়ে থাক তবে তুমি সৌভাগ্যশালী। (আল-বেদায়া ওয়ান বেহায়া ৭ম খণ্ড পৃ. ১৯২)

উপরোক্ত ঘটনাটি ঘটেছিল মিশরে, তখন আবদুল আজীজ মিশরের শাসনকর্তা এবং ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) তাঁর পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে সেখানে গিয়েছিলেন।

ইবনে কাছীরের অপর একটি বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, আবদুল আজীজ যখন মক্কায় হজ্জ করতে আসতেন, তখন তিনি তাঁর পুত্রের সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং তাঁর তত্ত্বাবধায়ক এবং শিক্ষক সালেহ ইবনে কাইসানের সাথে সাক্ষাৎ করে নিজ পুত্র সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয় জিজ্ঞেস করে অবগত হতেন। (আল-বেদায়া ওয়ান-নেহায়া ৮ম খণ্ড, ১৯২ পৃ.)

ইবনে কাছীর তাঁর শিক্ষা জীবনের একটি ঘটনা বর্ণনা করে বলেছেন যে, বনু উমাইয়াদের সাধারণ লোকদের মত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ ও হযরত আলী (রা)-এর দোষ-ত্রুটি বর্ণনা করতেন। এটা জানতে পেরে তাঁর উস্তাদ হযরত উবায়দুল্লাহ ইবনে ওতবা অত্যন্ত দুঃখিত ও মর্মাহত হলেন। ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে আসলে তিনি তাঁর সাথে কোন কথা না বলে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) এই অসন্তুষ্টির কারণ জানতে চাইলে হযরত উবায়দুল্লাহ (র) অত্যন্ত ক্রুদ্ধস্বরে বললেন-

مَتَى بَلَغَكَ أَنَّ اللَّهَ سَخِطَ عَلَى أَهْلِ بَدْرٍ بَعْدَ أَنْ رَضِيَ عَنْهُمْ ৪৫ অর্থাৎ তুমি কখন অবগত হলে যে, বদরবাসীদের প্রতি আল্লাহ পাকের সন্তুষ্ট হওয়ার পর তিনি আবার তাঁদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন?

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) শ্রদ্ধেয় উস্তাদের কথার তাৎপর্য উপলব্ধি করে খুব অনুশোচনা করলেন, ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং ওয়াদা করলেন যে, ভবিষ্যতে আর কোন দিন হযরত আলী (রা)-এর দোষ বর্ণনা করবেন না। বাকী জীবন তিনি সে ওয়াদা পালন করেছিলেন। (ইবনে কাছীর ৮ম খণ্ড, পৃ. ১)

এখানে এ উদ্দেশ্যে এ ঘটনাটি উল্লেখ করা হল, যাতে পাঠকসমাজ উপলব্ধি করতে পারেন যে, তাঁর মদীনার উস্তাদগণ কিরূপে তাঁর মন-মস্তিস্ক সৃষ্টি করেছিলেন।

এ সময়কার উল্লেখযোগ্য অপর একটি ঘটনা হল, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) একদিন নামাযে শরীক হলেন না। তাঁর তত্ত্বাবধায়ক হযরত সালেহ (রা) এর কৈফিয়ত তলব করলে তিনি বললেন, আমি চুলে চিরুনী করছিলাম। এতে হযরত সালেহ (রা) অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে তিরস্কার করলেন- তুমি চুলে চিরুনী করাকে নামাযের উপর প্রাধান্য দিলে?

এরপর তাঁর পিতা আবদুল আজীজের নিকট এ অভিযোগ লিখে পাঠালেন। তখন এক বিশেষ দূত তাঁর শাস্তি প্রয়োগ করতে মদীনায় আসলেন এবং তাঁর মাথার চুল মুণ্ডন করে ফেললেন এবং তাঁর সাথে কথা বললেন। (ইবনে কাছীর ৮ম খণ্ড, পৃ. ১৯২)

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে তাঁর পিতার এরূপ মনোবৃত্তিই তাঁকে যুগশ্রেষ্ঠ আলেম হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিল, যার ফলে মেহরানের মত বিশিষ্ট আলেমগণও তাদের উপর তাঁকে প্রাধান্য দিতেন।

ইবনে কাছীরের অন্য একটি বর্ণনায় জানা যায় যে, ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) মদীনায় অবস্থানকালে তাঁর দেখা-শুনার জন্য একদল সেবক নিযুক্ত ছিল। তিনি শাহী পরিবারের এক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সদস্যের মতই মদীনায় অবস্থান করতেন। কিন্তু এসব ভোগ-বিলাসের প্রতি তাঁর কোন আগ্রহ ছিল না। তিনি সর্বক্ষণ আল্লাহর ধ্যানে বিভোর হয়ে থাকতেন। তাই সালেহ ইবন কাইসান (রা) তার পিতাকে বলেছিলেন, এ বালকের অন্তরে আল্লাহর ধ্যানে যত গভীরভাবে দাগ কেটেছে, আমার জানা মতে এরূপ আর কারও অন্তরে দাগ কাটতে পারেনি।

মদীনায় হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)-এর জন্য খুবই উচ্চ ধরণের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাঁর উস্তাদগণ তাঁকে শুধু ব্যবহারিক জ্ঞান শিক্ষা দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং তাঁর মন-মস্তিষ্ককেও খুব মার্জিত ও পরিশীলিত করে দিয়েছিলেন।

📘 ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ > 📄 ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)-এর পিতার ইন্তেকাল

📄 ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)-এর পিতার ইন্তেকাল


হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) শিক্ষা-দীক্ষা সমাপ্ত করে মদীনা থেকে দামেশকে গেলেন, তারপর সেখান থেকে পিতার নিকট মিশরে চলে গেলেন এবং তাঁর পিতার ইন্তেকাল পর্যন্ত তিনি পিতার নিকট অবস্থান করেছিলেন।

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) যখন তাঁর পিতা আবদুল আজীজের নিকট থাকতেন তখন তাঁর পিতা তাঁকে কোন কাজে নিযুক্ত করেছিলেন কিনা, তাঁকে প্রশাসনিক কোন দায়িত্ব দিয়েছিলেন কিনা এবং তিনি তাঁর পিতার নিকট কত দিনই অবস্থান করেছিলেন তা জানা সক্ষম হয়নি।

মনে হয়, তিনি সামান্য কিছুদিন পিতার সাথে অবস্থান করেছিলেন। যখন তিনি পিতার নিকট আসলেন তখন তাঁর পিতা ও চাচা আবদুল মালেকের মধ্যে যুবরাজ নিযুক্তির ব্যাপারে মন-কষাকষি চলছিল।

আবদুল মালেকের ইচ্ছা ছিল যে, আবদুল আজীজ-এর পুত্র ওমর ওয়ালিদের স্বপক্ষে খেলাফতের দাবী পরিত্যাগ করুক। কিন্তু আবদুল আজীজ এতে সম্মত ছিলেন না।

ইবনে কাছীর বলেন, আবদুল মালেক প্রথম প্রথম ইশারা-ইঙ্গিতে তার উদ্দেশ্য প্রকাশ করতেন। তারপর তিনি তার মনোভাব স্পষ্ট উল্লেখ করেই একটি পত্র লিখলেন। আবদুল আজীজ খুব সংক্ষিপ্ত অথচ খুব পরিষ্কার ভাষায় পত্রের উত্তর দিলেন যে, আপনি ওয়ালিদ সম্পর্কে যে আশা পোষণ করেন, আমি ওমর ইবনে আবদুল আজীজ সম্পর্কেও সেই আশা পোষণ করি।

এতে আবদুল মালেক তার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে লিখলেন যে, মিশরের সমস্ত রাজস্ব দামেশকে পাঠানো হোক। আবদুল আজীজ যখন থেকে মিশরের শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়েছিলেন তখন থেকেই তিনি একজন স্বাধীন শাসনকর্তা হিসেবে দেশ শাসন করছিলেন। দীর্ঘ বিশ বছর পর্যন্ত তিনি মিশরের আমদানীর একটি পয়সাও দামেশকে পাঠাননি। তার কোন হিসাবও দেননি। তদুপরি মিশর ও পশ্চিম আফ্রিকার সমস্ত প্রশাসকগণ সরাসরি আবদুল আজীজের অধীনস্থ ছিল। সমস্ত আমদানীর অর্থ তার নিকট জমা হত, তিনি তাঁর ইচ্ছামত তা ব্যয় করতেন অথবা সরকারী কোষাগারে জমা রাখতেন। আবদুল মালেক অস্বাভাবিক রূপেই এ নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। আবদুল আজীজ অত্যন্ত বিজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তিক্ততা বৃদ্ধি করতে রাজি হননি। কাজেই তিনি এর একটি সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন। পত্রের বিষয়বস্তু ছিল এই-

হে আমীরুল মুমিনীন! আমি ও আপনি জীবনের এমন এক পর্যায়ে এসে পৌছেছি যে, আমাদের বংশের খুব কম লোকই এর পর জীবিত আছে। আমিও জানি না, আপনি ও জানেন না, আমাদের কে প্রথম মৃত্যু বরণ করবে! যদি আপনি ভাল মনে করেন তবে আমার বাকী জীবনের এ সামান্য সময় আমাকে আর তিরস্কার করবেন না।

ইবনে কাছীর বলেন যে, এ সংক্ষিপ্ত চিঠি আবদুল মালেকের অন্তরে ভীষণ রেখাপাত করল। তিনি খুব কাঁদলেন এবং ভাইকে লিখলেন, আমার আল্লাহর কসম! তোমার বাকী জীবনে আমি আর তোমাকে কোন প্রকার তিরস্কার করব না।

আবদুল আজীজ তাঁর ভাইকে বিভ্রান্ত করার জন্য মিথ্যা লিখেননি। তিনি সে বছরই ইন্তেকাল করলেন। আবদুল মালেক এজন্যই বেশি অনুতপ্ত হলেন যে, তিনি কেন তাঁর ভাইয়ের যুবরাজের দাবী প্রত্যাহার করতে চাপ দিচ্ছিলেন। ইবনে কাছীর লিখেন, যখন আবদুল মালেক তাঁর ভাই আবদুল আজীজের মৃত্যু সংবাদ শুনতে পেল, তখন ব্যথা-বেদনার পাহাড় যেন তার উপর ভেঙ্গে পড়ল। তিনি এবং তার পরিবারের সকলেই কেঁদে শোক প্রকাশ করতে লাগলেন। (আল-বেদায়া ওয়ান-নেহায়া ৮ম খণ্ড, ৫৯ পৃ.)

ঐতিহাসিকগণ বলেন, হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ সবসময় আবদুল মালেককে আবদুল আজীজের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করত, তা না হলে তাঁরা দু' মায়ের সন্তান হলেও তাদের মধ্যে ভালবাসা ও সম্প্রীতি ছিল। জীবনের পটভূমিকায় তারা সমানভাবে অংশ নিয়েছিলেন। রাজত্ব ও নেতৃত্ব লাভের জন্য উভয়েই সমভাবে কাজ করেছিলেন।

আবদুল আজীজ শত আশা পোষণ করা সত্ত্বেও তার পুত্র ওমরকে রাজসিংহাসনে বসাতে পারেননি। যদি আবদুল আজীজ আরও কিছুদিন জীবিত থাকতেন তবে হযতো তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজীজকে আফ্রিকা অথবা পাশ্চাত্যের কোন দেশের আমীর নিযুক্ত করতেন অথবা তারপর তাঁকে মিশরের শাসনকর্তা নিযুক্ত করতেন। কিন্তু তাঁর জীবন তাঁকে এ সুযোগ দেয়নি। তার পুত্রদের বা ওমরের জন্য কিছু না করেই ৮৫ হিজরীতে তিনি ইন্তেকাল করলেন। অবশ্য তিনি তাঁর পুত্র-কন্যাদের জন্য প্রচুর ধন-সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন।

ইবনে কাছীর তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তি সম্পর্কে বলেন- আবদুল আজীজ ধন-সম্পদ, উট-ঘোড়া, গাধা-খচ্চর ইত্যাদি অগণিত সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন। তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তির মধ্যে শুধু স্বর্ণই ছিল তিন শত মুদ অর্থাৎ আমাদের দেশী হিসেবে ৭৫০ মণ (সাত শত পঞ্চাশ মণ)।

ঐতিহাসিকগণ বলেন- উমাইয়া বংশীয় বাদশাহদের মধ্যে ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) ছিলেন সবচেয়ে সম্পদশালী। তিনি খুব উত্তম পোষাক পরিধান করতেন, উন্নত জীবন-যাপন করতেন, উত্তম খাদ্য আহার করতেন, উন্নতমানের বাহনে আরোহন করতেন এবং খুব বেশি পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করতেন।

আবদুল আজীজের মৃত্যুর পর অনতিবিলম্বে আবদুল মালেক তার পুত্র আবদুল্লাহকে মিশরের শাসনকর্তার দায়িত্ব দিলেন, তখন আবদুল্লাহর বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর। তিনি ৮৬ হিজরীর জমাদিউল উখরায় মিশরে পৌঁছে শাসনকর্তার দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন।

তখন সম্ভবত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ মিশর থেকে দামেশকে এসেছিলেন। তবে এটা জানা যায়নি যে, তিনি স্বেচ্ছায় দামেশকে এসেছিলেন না, আবদুল মালেক শেষ জীবনে ভাইয়ের প্রতি সৃষ্ট তিক্ততা এড়াবার জন্যই তাঁকে দামেশকে ডেকে এনে তাঁর প্রতি করুণা প্রদর্শন করেছিলেন।

ইবনে কাছীর বলেন- তিনি যখন মিশর থেকে দামেশকে গেলেন তখন আবদুল মালেক তাঁকে তাঁর পুত্রদের সাথে অবস্থান করাতেন। তাঁকে তাঁর পুত্রদের চেয়েও অধিক প্রাধান্য দিতেন। ইবনে কাছীরের ভাষ্যটি এই- فَلَمَّا مَاتَ أَبُوهُ أَخَذَهُ أَمِيرُ الْمُؤْمِنِينَ عَبْدُ الْمَالِكِ فَخَلَطَهُ بِوَلَدِهِ وَقَدَّمَهُ عَلَى كَثِيرٍ مِّنْهُمْ . بن مروان

অর্থাৎ যখন তাঁর পিতার ইন্তেকাল হল তখন খলীফা আবদুল মালেক তাঁকে দামেশকে আনিয়ে তার পুত্রদের সঙ্গে রাখলেন, এমনকি তাদের অধিকাংশের উপর তাঁকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন।

খলীফা আবদুল মালেক তাঁর মর্যাদা উন্নীত করার জন্য প্রিয় কন্যা ফাতেমাকে তাঁর সাথে বিয়ে দিলেন। উক্ত বিয়েতে তাঁকে প্রচুর পরিমাণ ধন-সম্পদ উপহার হিসেবে দিলেন এবং বারি বর্ষণের মত দান-খয়রাত করেছিলেন।

ফাতেমা খুবই সৌভাগ্যশালী মহিলা ছিলেন, তিনি একজন বুদ্ধিমতি শাহজাদী ছিলেন। কোন এক কবি তাঁর প্রশংসা করে যে কাব্য রচনা করেছিল, তার একটি অংশ ছিল এই- بنتُ الْخَلِيفَةِ - وَالْخَلِيفَةُ جَدُّهَا أختُ الْخَلَائِفِ - وَالْخَلِيفَةُ زَوْجُهَا

অর্থাৎ খলীফার কন্যা, খলীফার পোত্রী অনেক খলীফার ভগ্নি এবং তাঁর স্বামীও একজন খলীফা।

ফাতেমার স্বভাব ছিল মধুর ও প্রাণবন্ত। তিনি খুবই স্বামীভক্ত এবং দায়িত্বশীল মহিলা ছিলেন। আবদুল মালেকের মত দোর্দণ্ড প্রতাপশালী খলীফার কন্যা হিসেবে তার মনে কোন অহংকার ছিল না।

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)-এর সাথে তার বিয়ে হওয়ায় তিনি তার ভাগ্য প্রসন্নতার জন্য গর্ব করতেন। সারা বংশে ওমর উমাইয়া ইবনে আবদুল আজীজ (র) সবচেয়ে সুন্দর যুবক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অবশ্য আহত হওয়ার কারণে তিনি চলার সময় শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারতেন না।

ইবন কাছীর আতাবী থেকে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন- "যখন ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) নিজ পিতৃব্যের নিকট আসলেন, তখন তার পিতৃব্য জিজ্ঞেস করলেন, তুমি চলার সময় শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে পার না কেন? ওমর ইবনে আবদুল আজীজ বললেন, আমি গাধার পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়েছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোন অঙ্গে আঘাত পেয়েছিলে? তিনি উত্তরে বললেন, মূত্রাশয় ও পিঠের মধ্যবর্তী স্থানের জোড়ায়।

ইবন কাছীর বলেন, এ প্রশ্নের উত্তর দিতে ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) যে উপযুক্ত শব্দ ব্যবহার করলেন, এতে খলীফা অত্যন্ত খুশি হলেন এবং তাঁর পার্শ্বে উপবিষ্ট রুহ ইবনে থাম্বাহকে বললেন, যদি এ প্রশ্নই তোমার বংশের অন্য কাউকে করা হতো তবে এমন রুচিশীল ও মার্জিত উত্তর দিতে পারত না।

ঐতিহাসিকগণ এর কারণ উল্লেখ করেননি যে, খলিফা আবদুল মালেক তাঁর অন্যান্য ভ্রাতুষ্পুত্রদের প্রতি এত দয়ালু ছিলেন না কেন? তবে অনুমিত হয় যে, জনসাধারণ সম-সাময়িক শিক্ষিত আলেম সমাজ ও বুদ্ধিজীবীগণ ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)-এর শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং মহৎ চরিত্রের প্রভাবে যেমন প্রভাবান্বিত ছিলেন, আবদুল মালেকও তাদের মতই প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন। ইবনে হাকাম এ প্রভাবের কারণ উল্লেখ করে বলেছেন, যখন আবদুল আজীজ নিজ স্ত্রী উম্মে আসেমের নিকট থেকে তাঁর পুত্র সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (র)-এর অভিমত জেনে আবদুল মালেককে সে সম্পর্কে জানিয়ে দিলেন, তখন থেকেই আবদুল মালেকের অন্তরে তাঁর প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং এর ফলেই খলীফা তাঁর জন্য মাসিক এক হাজার দীনার ভাতা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছিলেন, অথচ এত বিপুল পরিমাণ ভাতা আর কোন শাহজাদার জন্য বরাদ্দ করা হয়নি। এমনকি ওয়ালিদ এবং সুলায়মানও এ পরিমাণ ভাতা পেত না। (আল-বেদায়া ওয়ান-নেহায়া ৭ম খণ্ড, ১৯৫ পৃ.)

আমাদের বিশ্বাস যে, আবদুল আজীজের চিঠিতে শুধু খলীফার অন্তরে এ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। মদীনার গভর্ণরও ওমর ইবনে আবদুল আজীজের শিক্ষা-দীক্ষা এবং তার নৈতিক ক্রমোন্নতি সম্পর্কে গোপনে খলীফাকে জানাতেন- যার ফলে খলীফার অন্তর দিন দিন তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছিল এবং এ কারণেই আবদুল আজীজের মৃত্যু সংবাদ পাওয়া মাত্রই তিনি তার অন্যান্য সন্তানগণকে রেখেই ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) কে দামেশকে ডেকে আনলেন এবং তার নিজের পার্শ্বে অবস্থান করতে দিলেন।

ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)ও তাঁর পিতৃব্যের প্রতি গভীর মহব্বত ও শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। ইবনে কাছীর বলেন, যখন তাঁর পিতৃব্য খলিফা আবদুল মালেক ইন্তেকাল করলেন, তখন তিনি তাঁর বিয়োগ-ব্যথায় ভেঙ্গে পড়লেন। তিনি এতই ব্যথিত হয়েছিলেন যে, দীর্ঘ সতেরো দিন পর্যন্ত শোক প্রকাশ করলেন। (আল-বেদায়া ওয়ান-নেহায়া ৮ম খণ্ড, পৃ. ১৯৫)

আবদুল মালেকের মৃত্যুর পর তার পুত্র ওয়ালীদ খলীফার পদে অধিষ্ঠিত হলেন। আবদুল মালেক তার প্রতি যেরূপ আচরণ করেছিলেন ওয়ালীদও সেরূপ আচরণই করতে লাগলেন। তিনিও সুলায়মান ব্যতীত অন্যান্য যুবরাজদের উপর তাঁকেই প্রাধান্য দিতেন।

তাঁর প্রতি অধিক সম্মান প্রদর্শন করেই ওয়ালীদ তাঁকে হেজাজের গভর্ণর পদে নিয়োগ দান করলেন। খলীফা আবদুল মালেকের মৃত্যুর কিছুদিন পরই তিনি এই সম্মানিত পদে অধিষ্ঠিত হলেন।

📘 ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ > 📄 মদীনার শাসনকর্তা ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)

📄 মদীনার শাসনকর্তা ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)


হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) যে পদ লাভ করেছিলেন, এটা অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদার পদ ছিল। তিনি মদীনাকে সীমাহীন ভালবাসতেন। যেখানে সরওয়ারে দু'আলম (সা) চিরনিদ্রায় আরাম করছেন, ইসলাম আশ্রয় গ্রহণ করেছিল, যা ইসলামের প্রধান কেন্দ্র ছিল, হযরত উরুয়া, হযরত ইকরামা, হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব, হযরত আবু সালমা, হযরত আবু বকর ইবনে আবদুর রহমান, হযরত উবায়দুল্লাহ ইবনে ওতবা এবং হযরত সালেহ ইবন কাইসান (রঃ) প্রমুখ মহামনীষীগণ এবং আরও অন্যান্য বিশিষ্ট আলেমগণ অবস্থান করছিলেন, সেই পবিত্র ভূমির প্রতি তাঁর আন্তরিক আকর্ষণও ছিল সীমাহীন।

ওয়ালীদ যখন তাঁকে এ পদে নিযুক্ত করেন তখন তাঁর সন্তুষ্টিতে নিযুক্ত করেছিলেন, না ওয়ালীদ নিজের ইচ্ছায়ই এরূপ করেছিলেন ঐতিহাসিকগণ এদিকে কোন ইঙ্গিত দেননি। তবে এতটুকু সত্য যে, মদীনার শাসনকর্তার পদ লাভ করে তিনি অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন।

ইবনুল জাওযির মতে ৮৭ হিজরীতে তিনি মদীনার শাসনকর্তা নিযুক্ত হয়েছিলেন। ঐতিহাসিক ইবনে সাদও এ কথাই বলেন। কিন্তু ইবনে কাছীর তাঁর এ নিযুক্তি ৮৬ হিজরীর ঘটনা বলে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ আবদুল মালেকের মৃত্যুর অব্যাবহিত পরেই তাঁকে মদীনার শাসনকর্তার পদে মনোনীত করা হয়। এ দু'টি মতের ঐক্য এরূপই হতে পারে যে, তিনি ৮৬ হিজরীতে নিযুক্ত হয়েছিলেন সত্য, তবে ৮৭ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে তিনি মদীনায় শুভাগমন করেছিলেন।

(ইবনুল জওযি- ৩২, ইবনে সা'দ ৫ম, ২৪৪ পৃ.; ইবনে কাছীর ৮ম খণ্ড, ১৯৪) এ সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৫ বছর। যদি বয়সের এ বর্ণনা সঠিক বলে ধরা যায়, তবে তাঁর জন্ম ৬১ হিজরীতেই হয়েছে বলে স্বীকার করে নিতে হবে।

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) তাঁর স্ত্রী, সেবক-সেবিকা ও অনুচরগণসহ ৮৭ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে শাহজাদার বেশেই মদীনায় শুভাগমন করলেন।

ইবনে সাদ বলেন, তাঁর পোষাক-পরিচ্ছদ ছিল খুবই সুন্দর, তিনি সবসময় সুগন্ধি দ্রব্য ব্যবহার করতেন। তাঁর চাল-চলনে নমনীয়তা ছিল। যে দিয়ে চলতেন সুগন্ধিতে মোহিত হয়ে যেত। তিনি এতই মূল্যবান পরিধান করতেন যে লোকেরা তাঁকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন।

থাকত। তার পায়জামার আঁচল পায়ে জড়িয়ে থাকত, তাঁর কুঞ্চিত কেশ তাঁর ললাটদেশে এসে পড়ত।

ইবনে আবদুল হাকাম বলেন, তাঁর চাল-চলনে আমীরানা এবং আড়ম্বরপূর্ণ ভাব ছিল। কিন্তু সাথে সাথে এ কথাও স্বীকার করেছেন যে, এ আড়ম্বরপূর্ণ ভোগ-বিলাস সত্ত্বেও তিনি কখনও হারাম মাল ভক্ষণ করতেন না, পরস্ত্রীর প্রতি কোনদিন ফিরে চাননি এবং কখনও শরীয়ত বিরোধী কোন আদেশ জারী করতেন না।

তিনি যখন মদীনায় এসে শাসনভার গ্রহণ করলেন, তখন মদীনার দশজন বিশিষ্ট ফকীহ ও আলেমকে একত্রিত করলেন। ইবনুল জাওযির ভাষ্যটি হল-
وَدَعَا عُمَرُ عَشَرَةَ نَفَرًا مِنْ فُقَهَاءِ الْبَلْدَةِ مِنْهُمْ عُرْوَةَ وَالْقَاسِمُ والسَّالِمُ فَقَالَ إِنِّي دَعَوْتُكُمْ الأَمْرِ تُوجَرُونَ فِيهِ وَتَكُونُونَ فِيهِ أَعْوَانًا عَلَى الْحَقِّ إِنْ رَأَيْتُمْ أَحَدًا يتعدى أَوْ بَلَغَكُمْ مِّنْ عَامِلٍ لِي ظَلَامَةً فَأَخْبِرُونِي بِاللَّهِ وَتُوجَرُونَ -

ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র) শহরের বিশিষ্ট দশজন ব্যক্তিকে ডেকে আনলেন। তন্মধ্যে উরুয়া, কাসেম এবং সালেমও ছিলেন এবং তিনি তাদেরকে বললেন, আমি আপনাদেরকে এ উদ্দেশ্যেই কষ্ট দিয়েছি যে, আল্লাহর ওয়াস্তে আপনারা আমার কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করবেন। যদি আপনারা আমার কোন কর্মচারীকে জুলুম করতে দেখেন অথবা কারো প্রতি জুলুমের সংবাদ পান তবে আপনাদের উপর দায়িত্ব হল যে, সে ব্যাপারে আমাকে জানাবেন। তারা তাঁর এ আবেগ-অনুভূতির প্রশংসা করে সর্বোতোভাবে তাঁকে সাহায্য-সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফিরে গেলেন। (ইবনুল জাওযি ৩২)

ইবনুল জাওযি লিখেছেন, যখন ওয়ালীদ ওমর ইবনে আবদুল আজীজকে মদীনার শাসনকর্তার পদে নিযুক্ত করলেন, তখন তিনি মদীনায় যেতে বিলম্ব করতে লাগলেন। এতে ওয়ালীদ তার প্রধান উজিরকে জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কি? ওমর তার দায়িত্ব পালন করতে যায় না কেন? প্রধান উজির বললেন, ওমর শর্ত পেশ করেছেন! তারপর ওয়ালীদ ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি কি শর্ত আছে? ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, আমার পূর্ববর্তী শাসকগণ জুলুম-অত্যাচার করেছে। তারা অন্যায়-অবিচার করে আমদানী বৃদ্ধি করেছে, আমি জুলুম-অত্যাচার করতে পারব না, আমদানীও বৃদ্ধি করতে পারব না। (তাবকাতে ইবনে সাদ ৫ম খণ্ড, পৃ. ২৪৪)

ওয়ালীদ বললেন, আপনি সর্বদাই সত্য-ন্যায় পথ অবলম্বন করবেন। আমার অনুমতি থাকল, যদি এতে আপনি এক পয়সাও কেন্দ্রে পাঠাতে না পারেন তবুও আপনি অন্যায়-অত্যাচার করবেন না।

যখন ওয়ালীদ তাঁর সকল শর্ত মেনে নিয়ে তাঁকে পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করলেন, তখন তিনি মদীনায় গিয়ে সর্বত্র ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করলেন। মদীনা ছাড়া মক্কা এবং তায়েফও তাঁর শাসনাধীন ছিল।

*তিনি ন্যায়বিচার ও সাধারণ মানুষের অধিকার সংরক্ষণের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেন। মদীনার সর্বশ্রেষ্ঠ ফকীহ, আল্লাহভীরু ও ন্যায়পরায়ণ বিচারক আবু বকর ইবন হাযমকে তিনি প্রধান বিচারপতি পদে নিযুক্ত করলেন। মক্কা এবং তায়েফেও এ ধরণের ব্যক্তিগণকে বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন।

কর আদায়ের ক্ষেত্রে সকল প্রকার কঠোরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন। যেমন মদীনার ফকীহগণকে বলা হয়েছিল যে, যেখানেই তাঁরা কোন অন্যায়-অবিচার হতে দেখবেন, তাঁরা তাঁকে জানাবেন, মক্কা, তায়েফ এবং অন্যান্য স্থানের ফকীহগণের নিকট অনুরূপ আবেদন পেশ করা হল।

ওমর ইবনে আবদুল আজিজ মদীনার শাসনকর্তা হিসেবে যেরূপ ন্যায়পরায়ণতা, সুবিচার ও নিষ্ঠার সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন, যার ফলেই মদীনার সবচেয়ে বেশি আত্মমর্যাদাশীল ও সাম্রাজ্যবাদবিদ্বেষী ফকীহ সাঈদ ইবনে মুসায়‍্যাব (র) তাঁকে মাহদী উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

ইবনে সাদ বলেন- একদা কোন এক ব্যক্তি সাঈদ ইবনে মুসায়‍্যাব (র) কে জিজ্ঞেস করল যে, মাহদীর গুণাবলি কি কি? তিনি বললেন, মারওয়ানের বাসভবনে গিয়ে নিজের চোখে মাহদীকে দেখে আস। (তাবকাতে ইবনে সাদ ৫ম খণ্ড ১৪১ পৃ.)

অতএব এ ব্যক্তি মারওয়ানের বাসভবনে এসে অন্যান্য সাক্ষাৎ প্রার্থীদের সাথে অপেক্ষা করতে লাগল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) অনুমতি দিলে তাদের সাথে সেও ভিতরে প্রবেশ করল এবং ওমর ইবনে আবিদুল আজিজ (র) কে দেখে এসে সাঈদ ইবনে মুসায়‍্যাব (র) কে বলল, আমি মারওয়ানের বাসভবনে গিয়েছিলাম কিন্তু মাহদী সম্পর্কে আমাকে কেউ কিছু বলল না এবং কেউ মাহদীর প্রতি ইঙ্গিতও করল না।

তখন সাঈদ ইবনে মুসায়‍্যাব (র) বললেন, তুমি কি ওমর ইবনে আবদুল আজীজকে সিংহাসনে উপবিষ্ট দেখনি? সে বলল, হ্যাঁ, দেখেছি। তিনি বললেন, তিনিই যুগের মাহদী।

আসলেই তিনি মাহদী ছিলেন। সাধারণ মানুষ পরবর্তীতে তা বুঝতে পেরেছিল। হযরত সাঈদ ইবনে মুসায়‍্যাব (র) মদীনার সেই সমস্ত আলেমদের অন্যতম ব্যক্তি, যিনি কোন শ্রেষ্ঠ বা কোন সীমাহীন জালেম নরপতির সামনে মাথা নত করেননি। তিনি ওয়ালীদের মত খলিফার সম্মানার্থে দাঁড়াতে পছন্দ করেননি। তিনি ছিলেন হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর বিশিষ্ট শিষ্য। তিনি ছিলেন শরীয়তের জ্ঞানের বিশাল সমুদ্র। তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজীজ (র)কে সম্মান করতেন।

ইবনে হাকাম বলেন, একবার ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) কোন প্রয়োজনীয় বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য মসজিদের নিকট এসে তার দূতকে হযরত সাঈদ ইবনে মুসায়্যাবের নিকট প্রেরণ করলেন। দূত ভুল করে হযরত সাঈদ ইবনে মুসায়‍্যাবকে (র) বলল, আমীর! আপনাকে স্মরণ করেছেন। অথচ হযরত সাঈদ ইবনে মুসায়‍্যাব (র) কোন আমীর বা বাদশাহর ডাকে কোনদিনই সাড়া দেননি। এবারের আহ্বানকারী যেহেতু ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাই সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব (র) উঠে দাঁড়ালেন এবং সামনে অগ্রসর হতে লাগলেন। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাঁকে উঠতে দেখেই দৌড়িয়ে তাঁর নিকট গিয়ে বললেন, হে মুহাম্মদের পিতা! আমি আপনার নিকট যাচ্ছি, আপনি কি স্বস্থানে ফিরে যাবেন না? আমার দূত আপনার নিকট হাজির হয়েছিল আমাদের প্রয়োজনীয় বিষয় সম্পর্কে অবগত করতে। আমি আপনাকে ডেকে নিতে তাকে আপনার নিকট পাঠাইনি। সে ভুল করেছে। আমি শুধু জিজ্ঞেস করার জন্যই তাকে পাঠিয়েছিলাম।

ইবনে আবদুল হাকام ফকীহ সায়ীদ ইবন মুসায়্যাবের কঠোর স্বভাবের কথা আলোচনা করে বলেছেন, একদিন রাত্রে হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব (র)-এর বৈঠকের পার্শ্বেই নামায পড়ছিলেন। তিনি খুব জোরে কিরাত পড়তে অভ্যস্ত ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে জোরে জোরে কিরাত পড়ছিলেন। হযরত সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব (র) তাঁকে জোরে কিরাত পাঠ করতে শুনে তার খাদেম বারাদকে বললেন, হে বারাদ! এ লোকের কিরাত আমাকে খুব কষ্ট দিচ্ছে, একে সরিয়ে দাও না! গোলাম বারাদ কিরাত পাঠকারীর মর্যাদা সম্পর্কে অবগত ছিল, কাজেই তাঁকে সরানোর চেষ্টা করল না। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ কিরাত পড়তেই লাগলেন। পুনরায় হযরত সাঈদ ইবনে মুসায়্যাব (র) বললেন, তোমার জন্য দুঃখ হয়, আমি না তোমাকে এই ক্বারীকে সরিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছিলাম! বারাদ উত্তরে বলল, হুজুর! মসজিদ শুধু আমাদের জন্যই নয়।

বারাদ নেহায়েত সত্য কথাই বলেছিল, মসজিদ শুধু তাঁর একার জন্য ছিল না। সমস্ত মুসলমানের জন্যই। হযরত, ওমর ইবন আবদুল আজিজ (র) একথা শুনে নিজেই মসজিদের শেষ প্রান্তে চলে গেলেন।

(ইবনুল হাকام ২২ পৃ).

তিনি নবী করীম (সা)-এর মসজিদের সীমাহীন সম্মান করতেন। তিনি যখন কোন রাত্রে মসজিদে নববীতে অবস্থান করতেন, তখন তাঁর কোন স্ত্রী বা বাঁদীকে মসজিদে আসার অনুমতি দিতেন না। কারণ এতে মসজিদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতে পারে। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) যতদিন মদীনার শাসনকর্তা ছিলেন, ততদিন খলিফা ওয়ালীদকে এবং তারপর সুলায়মানকেও মদীনা কিংবা তাঁর শাসনাধীন কোন অঞ্চলে কোন নির্যাতনমূলক আদেশ জারী করতে দেননি।

এ প্রসঙ্গে ইবনুল হাকام একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন- একবার সুলায়মান হজ্জ করার উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করলেন। ওমর ইবন আবদুল আজিজও তাঁর সাথে ছিলেন। রাত্রে তিনি তার বাহনেই শয়ন করেছিলেন। তাঁর বাহন কুষ্ঠ রোগীদের আশ্রয় কেন্দ্রের নিকট দিয়ে অতিক্রম করছিল, এমন সময় সেখান থেকে খুব গোলমালের শব্দ শুনা গেল। এ গোলমালের শব্দে সুলায়মানের নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটল। তিনি উঠে বসলেন এবং লোক পাঠিয়ে তাদের অবস্থা সম্পর্কে অবগত হলেন যে, এরা কুষ্ঠ রোগী। তখন রাগান্বিত হয়ে তাদের এ বস্তিতে আগুন জ্বালিয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন।

এ নির্যাতনমূলক নির্দেশের কথা হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ জানতে পেরে আদেশ কার্যকরী দলকে বাঁধা দিলেন এবং তিনি সুলায়মানের নিকট গিয়ে এরূপ নির্যাতনমূলক আদেশ থেকে বিরত করলেন এবং তাদের বস্তি জ্বালিয়ে দেয়ার পরিবর্তে তাদেরকে এস্থান থেকে অন্যত্র সরিয়ে দিতে অনুমতি গ্রহণ করলেন।

ওমর ইবনে আবুল আজিজ ব্যক্তিগতভাবেই হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফকে পছন্দ করতেন না। একবার হাজ্জাজ খলীফা ওয়ালীদের নিকট থেকে অনুমতি গ্রহণ করলেন যে, তিনি হজ্জ করতে মক্কায় গিয়ে হজ্জ শেষে মদীনা যাবেন তারপর প্রত্যাবর্তন করবেন। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ হাজ্জাজের এ অভিপ্রায় জানতে পেরে ওয়ালীদকে লিখলেন, হাজ্জাজ এ স্থান হয়ে অতিক্রম করুক, এটা আমি মোটেই পছন্দ করি না। ওয়ালীদ এ চিঠি পেয়েই হাজ্জাজকে লিখলেন, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তোমার মদীনা হয়ে যাতায়াত করা পছন্দ করেন না, কাজেই তোমার উচিত এ দিক দিয়ে অতিক্রম না করা। (ইবন আবদুল হাকাম, ১১-১৩; ইবন কাছীর ৮ম খণ্ড, পৃ. ১৯৪)

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজ দীর্ঘ ছয় বছর মদীনার শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। এ সময়ে তাঁর কোন কর্মচারী কোন প্রজাকেই জুলুম করতে সাহস পায়নি। যদিও ঐতিহাসিকগণ তাঁর মদীনার শাসনামলের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেননি, তবুও ইবন কাছীর বলেন, এ সময় সামাজিক সৌহার্দ ও প্রজাদের সাথে কর্মচারীদের আচরণের দিক দিয়ে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ যুগ হিসেবে পরিচিত ছিল। যখনই কোন সমস্যা দেখা দিত তিনি মদীনার বিশিষ্ট দশজন ফকীহকে ডেকে পরামর্শ গ্রহণ করতেন। তাঁদের পরামর্শ ব্যতীত তিনি কোন সমস্যারই সমাধান করতেন না।

এ সমস্ত মনীষীগণ ছিলেন, হযরত উরুয়া, হযরত উবায়দুল্লাহ, হযরত আবদুল্লাহ, হযরত আবু বকর ইবনে আবদুর রহমান, হযরত আবু বকর ইবনে সুলায়মান, হযরত সুলায়মান ইবনে ইয়াসার, হযরত কাসেম ইবনে মুহাম্মদ, হযরত সালেম ইবনে আবদুল্লাহ এবং হযরত খায়েজা ইবন যায়েদ (র)।

আয-যাহরী তাযকেরাতুল হুফফাযে এবং সাদ তাবকাতের ৫ম খণ্ডে এ সমস্ত পণ্ডিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে বলেছেন যে, তাঁরা ছিলেন মদীনার সবচেয়ে বড় ও বিশিষ্ট ফকীহ এবং ইসলামের আদর্শ ও উদ্দেশ্যের ধারক ও বাহক।

ইবনে কাছীর এ দশজন ছাড়া হযরত সায়দ ইবনে মুসায়্যারের (র) কথাও উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন যে, তিনি হযরত সায়দ ইবনে মুসায়্যাব (র)-এর কোন সিদ্ধান্তই অমান্য করতেন না। হযরত সায়দ ইবনে মুসায়্যাবও এমন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন আলেম ছিলেন যে, তিনি কোন খলীফার দরবারেই গমন করতেন না। কিন্তু হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) মদীনার শাসনকর্তা থাকাকালীন তিনিও তাঁর নিকট গমন করতেন।

ইসলামের বিরুদ্ধে অগণতান্ত্রিক ব্যক্তি শাসনের অভিযোগকারী গণতন্ত্রের ধজাধারীদের চিন্তা করা উচিত যে, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) খলীফা ছিলেন না। তিনি মাত্র একজন প্রাদেশিক শাসনকর্তার পদে অধিষ্ঠিত হয়ে দেশের সেরা দশজন বিশিষ্ট পণ্ডিত ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি পরামর্শ সভার ব্যবস্থা করেছিলেন কেন? পবিত্র কুরআনের এ নির্দেশকে وَأَمْرُهُمْ شُورَى بَيْنَهُمْ (পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ কর) বাস্তবায়িত করার উদ্দেশ্যেই নয় কি? আধুনিক গণতন্ত্র এর চেয়েও উন্নত মানের পরামর্শ সভার আদর্শ স্থাপন করতে পেরেছে কি?

মদীনায় ছয় বছরের শাসনামলে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) সত্য-ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে জনসাধারণকে সুখী ও সমৃদ্ধশালী করেছিলেন। তিনি দেশের সর্বশ্রেণীর নাগরিকদের কল্যাণের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজ করেছিলেন।

মক্কা-মদীনার আশেপাশে কূপ খনন করে জনসাধারণের পানির অভাব দূর করেছিলেন। মসজিদে নববী সংলগ্ন বাগানটিতে একটি ঝর্ণা ও একটি হাউজ নির্মাণ করে আগতদের পানির অভাব পূরণ করেছিলেন। তিনি হেজাজের রাস্তাঘাট সংস্কার করেছিলেন, বিশেষতঃ মক্কা-মদীনা এবং তায়েফের মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী রাস্তাসমূহের সংস্কার সাধন করে পর্যটনের পথ সহজ করে দিয়েছিলেন।

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কীর্তি হল মসজিদে নববী পুনঃনির্মাণ ও তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি। এ বিরাট কীর্তি তিনি মদীনায় শুভাগমন করার এক বছর পর অর্থাৎ ৮৮ হিজরীর সফর মাসে শুরু করেন। (মুয়াজ্বামূল বুলদান, ৪র্থ খণ্ড, ৬৬ পৃষ্ঠা; বালাযুরী ৭৬; মকাদ্দাসী ৪৭৭; ইবনে সাদ ২য় খণ্ড)

ঐতিহাসিকগণ খলিফা ওয়ালীদকে মসজিদের নির্মাতা বলে উল্লেখ করেছেন, তা যথার্থই করেছেন। খলিফা ওয়ালীদ এ হিসেবেই এর নির্মাতা যেহেতু, তিনি এ মহান কর্মকাণ্ডের জন্য বিপুল সাজ-সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি স্বর্ণ-রৌপ্য গাড়ী বোঝাই করে ওমর ইবনে আবদুল আজীজের নিকট প্রেরণ করেছিলেন।

সিরিয়া, মিশর ও আফ্রিকার বিভিন্ন স্থান থেকে উন্নতমানের প্রকৌশলী এনে মদীনায় প্রেরণ করেছিলেন। যেখানেই উত্তম পাথর পাওয়া গিয়েছে সেখান থেকেই মর্মর, রুখام ও মূসা পাথর গাড়ী বোঝাই করে মদীনায় প্রেরণ করেছিলেন।

যখন মসজিদে নববীর পুনঃনির্মাণ কাজ শুরু হল তখন মনে হল মসজিদে নববী নয়, সমগ্র মদীনাই যেন পুনঃনির্মিত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এটা মদীনার পুনঃনির্মাণ ছিল না, এটা ছিল প্রেম-প্রীতির দুনিয়ার নব নির্মাণ।

ইবনে সাদ বলেন- ওয়ালীদ ও ওমর ইবনে আবদুল আজিজ মসজিদে নববীর পুনঃনির্মাণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন এজন্যই যে, তখন মুসলমানদের সংখ্যা অগণিত ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছিল, নামাযের সময় মসজিদে স্থান সংকুলান হতো না। যদিও হযরত উমর ফারুক (রা) ও হযরত ওসমান (রা) নিজ নিজ যুগে মসজিদে নববীকে বিশেষভাবে সংস্কার ও সম্প্রসারণ করেছিলেন, তবুও মসজিদে নামাযীর সংখ্যা এতই বৃদ্ধি পাচ্ছিল যে, মসজিদের বাইরের মহল্লায়ও মুসাল্লা বিছিয়ে নামায পড়তে হত।

হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) এ অবস্থায় মুসল্লীদের দুদর্শার কথা খলিফা ওয়ালীদকে জানালে ওয়ালীদ এই মহান কাজ সম্পাদন করে এক অমর গৌরবের অধিকারী হলেন।

মসজিদে নববী পূননির্মাণের প্রেরণা দানকারী ওমরই হোক অথবা ওয়ালীদ নিজে নিজেই উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকুক, মসজিদে নববীর পুনঃনির্মাণের কাজ শুরু হলে শুধু মদীনায়ই নয়, মদীনার পার্শ্ববর্তী এলাকা, মক্কা এবং আরও বহু দূর-দূরান্ত থেকে দর্শকগণ এসে মদীনায় ভীড় জমাচ্ছিল। তখন মসজিদে নববী প্রদর্শনীর রূপ ধারণ করেছিল।

পুরাতন মসজিদ ভেঙ্গে দেয়া হল, তার সাথে সাথে খড়-কুটা ও খেজুর পত্র দ্বারা নির্মিত রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সহধর্মীনীদের (রা) পবিত্র হুজরাসমূহও ভেঙ্গে দেয়া হল।

ঐতিহাসিক ইবনে সাদ যার নিকট থেকে ঘটনা বর্ণনা করেছেন, তার অবস্থা বর্ণনা করে বলেন যে, বর্ণনাকারী অশ্রুসিক্ত নয়নে বলছিল, আফসোস! যদি ঐ পবিত্র হুজরাসমূহ ভেঙ্গে না দেয়া হত, তবে আগত দিনের মুসলমানগণ দেখতে পারত, তাদের নবী (সা) কিভাবে জীবনযাপন করতেন, উম্মাহাতুল মুমিনীনগণ কেমন হুজরায় বসবাস করতেন।

(তাবাকাতে ইবনে সাদ, ২য় খণ্ড)

বাস্তবিকই এ সমস্ত হুজরাসমূহ দর্শনীয় স্মৃতিই ছিল। হুজরার দেওয়াল, ছাদ এবং তাঁদের শয্যা আগত দিনের মুসলমানদের চোখের মনি হিসেবেই বিবেচিত হতো। কিন্তু এ খড়-কুটায় নির্মিত হুজরাসমূহ আজীবন রক্ষা করা মোটেই সম্ভবপর ছিল না। মাত্র পঞ্চাশ বছরের মধ্যেই তার অধিকাংশগুলিই ভেঙ্গে গিয়েছিল, দেওয়ালে অসংখ্য ছিদ্র হয়ে গিয়েছিল, ছাদ ঝুলে পড়েছিল।

তা না হলে দশজন বিশিষ্ট ফকীহ যাঁদের মধ্যে হযরত সায়দ ইবনে মুসাইয়‍্যাব, হযরত আবু বকর ইবনে আবদুর রহমান, হযরত ইবনে হাজম, হযরত সালেম এবং হযরত উরুয়া (র)-এর মত নবী প্রেমিকগণ কখনও এ সমস্ত পবিত্র হুজরা ভাঙ্গার সম্মতি দিতেন না। এমনকি হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকটও এ খড়-কুটা ও মাটির নির্মিত পবিত্র মসজিদ এবং হুজরাসমূহ অত্যন্ত পবিত্র ও শ্রদ্ধেয় ছিল। যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বগুণসম্পন্ন মহামানব জনাবে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা) এবং তাঁর অনুসারীগণ। তিনি কখনও এসব ভাঙ্গতে সাহস করতেন না। এ মসজিদও এসব হুজরা যখন ভাঙ্গা হয় তখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ কেঁদেছিলেন, সায়দ ইবনে মুসাওয়াবের দু' চোখেও অশ্রু বন্যা প্রবাহিত হচ্ছিল।

কেবল উম্মাহাতুল মুমিনীনদের হুজরা সমূহই অত্র মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, বরং আশপাশের সমস্ত ঘর-বাড়ীও ক্রয় করে মসজিদ বৃদ্ধির কাজে শামিল করা হল।

যখন সমস্ত বাড়ী-ঘর ভেঙ্গে দিয়ে মসজিদের ভিত্তি তৈরি শুরু হল, তখন হযরত উমর ইবনে আবদুল আজিজ যে দশজন বিশিষ্ট ফকীহদের পরামর্শক্রমে এ সমস্ত কাজ করতেন, সে ফকীহগণকে ডেকে এনে তাঁদের দ্বারা এ পবিত্র মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করালেন। কারণ হযরত উমর ইবনে আবদুল আজীজের দৃষ্টিতে সম-সাময়িক যুগে এ দশজন ব্যক্তির চেয়ে শ্রদ্ধেয় সম্মানিত আর কেউ ছিলেন না। তাঁর দৃষ্টিতে খলীফা ওয়ালীদ এবং খেলাফতের পরবর্তী উত্তরাধিকারী সুলায়মানও তাঁদের তুলনায় অতি নগণ্য ছিলেন।

এ সমস্ত সম্মানিত মনীষীগণ ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করার পর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত ৮০ জন প্রকৌশলী তাদের অধীনস্থ বহু রাজমিস্ত্রী সমন্বয়ে মসজিদের দেওয়াল উঠাতে শুরু করলেন। এ সমস্ত প্রকৌশলীদের মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক রোমীয় ও মিশরীয় ছিল। তাবারী এ প্রকৌশলীদের সংখ্যা বলেছিলেন ৮০ জন বা একশত জন।

আল্লামা মুকাদ্দাসী (র) বলেন- এরা অত্যন্ত উচ্চস্তরের প্রকৌশলী ছিলেন, রোম সম্রাট তাদেরকে মিসকাল (এক মেসকাল সমান সাড়ে চার আনা পরিমাণ ওজন) স্বর্ণ এবং চল্লিশ গাড়ি মূল্যবান দুষ্প্রাপ্য পাথরও সরবরাহ করেছিলেন। (মুয়াজ্জমুল বুলদান, ৪র্থ খণ্ড, ৪৬৬ পৃষ্ঠা)

দীর্ঘ তিন বছর ব্যাপী এ সমস্ত রোমীয় ও মিশরীয় প্রকৌশলীগণ মসজিদ নির্মাণের কাজে লিপ্ত ছিলেন। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাদেরকে মুক্ত হস্তে রাজকীয় পুরস্কার দিয়েছিলেন। বিশেষতঃ দশজন বিশিষ্ট প্রকৌশলী তিন বছরে এক লক্ষ আশি হাজার দীনার মজুরী পেয়েছিলেন। দেয়ালের ভিত্তিতেও পাথর বসান হয়েছিল এবং স্তম্ভ সমূহ পাথর দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। ইয়াকুতের ভাষ্যটি হলো- দেওয়াল ও ভিত্তি পাথরের নির্মিত ছিল এবং স্তম্ভসমূহও পাথর দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। আর দেওয়াল গাত্রে এবং স্তম্ভসমূহে যে সমস্ত উপাদান কারুকার্য খচিত হয়েছিল তাতেও বেশ কয়েক মণ স্বর্ণ-রৌপ্য ব্যবহার করা হয়েছিল। (মুয়াজ্জমুল বুলদান, ৪র্থ খণ্ড, ৪৬৬ পৃষ্ঠা)

মসজিদে নববী পূণনির্মাণে যে সমস্ত বিচিত্র রঙ্গের পাথর ব্যবহৃত হয়েছিল, তা স্বর্ণ-রৌপ্য দ্বারা কারুকার্য খচিত ছিল এবং এতই মূল্যবান ছিল যে, কেবলামুখী গম্বুজ সংলগ্ন দোহারী ছাদটির মূল্য ছিল চল্লিশ হাজার আশরাফী। (খুলাছাতুল ওফা, ১৪০ পৃষ্ঠা)

দীর্ঘ তিন বছর ব্যাপী ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) এ মসজিদ নির্মাণ কাজে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। তিনি সারা দিন সাধারণ মজুরদের মতই পাথর ও অন্যান্য উপকরণ ধৌত করে এ পবিত্র মসজিদ নির্মাণ কার্যে অংশগ্রহণ করেছিলেন। দীর্ঘ তিন বছরে মসজিদ নির্মাণ কার্য শেষ হল।

ইয়াকুতের বর্ণনা মতে- মসজিদের দৈর্ঘ্য ছিল দু'শত গজ এবং প্রস্থও ছিল দু'শত গজ। সামনের দিক পূর্ণ দু' শত গজ ছিল এবং পিছনের দিকের দৈর্ঘ্য ছিল ২ শত ৮০ গজ। (মুয়াজ্জমুল বুলদান, ৪র্থ খণ্ড, ৪৬৬ পৃষ্ঠা)

মধ্যবর্তী মেহরাবের কারুকাজ করতে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম হয়েছিল। মসজিদে চারটি মেহরাব তৈরী করা হয়েছিল এবং একটি উন্নত ধরণের হাউজ ও একটি ঝর্ণা তৈরী করা হয়েছিল।

কলকশান্দি বলেন- মধ্যবর্তী মেহরাবটির অভ্যন্তর ভাগ খোলা ছিল। সমস্ত স্তম্ভই মর্মর ও রোখام পাথর দিয়ে নির্মিত ছিল। রোখامই সবচেয়ে মূল্যবান পাথর। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ ওয়ালীদের নির্দেশেই এ সমস্ত পাথর মাদায়েন থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। কিছু পাথর রোম সম্রাট উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন এবং অবশিষ্ট কিছু মিশর ও আফ্রিকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। (কলকশান্তি, ৩য় খণ্ড)

এ দীর্ঘ সময় ওয়ালীদ মসজিদ নির্মাণের ব্যাপারে খুব অধীর ছিলেন এবং তিনি স্বর্ণ-রৌপ্যের গাড়ী বোঝাই করে পাঠাতেন আর উমর ইবনে আবদুল আজিজকে এ পবিত্র কাজ যথাশীঘ্র সম্ভব তাড়াতাড়ি শেষ করতে নির্দেশ দিতেন। খুলাছাতুল ওফার বর্ণনা মতে, মসজিদ নির্মাণ কাজ শেষ হলে ওয়ালীদ মদীনায় এসে মসজিদ দেখে খুবই আনন্দিত হলেন।

আবুল মুহসিন, বালাযুরী ও মাসুদীর বর্ণনা মতে, মসজিদ নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ৮৮ হিজরীতে; কিন্তু ইয়াকুতীর মতে ৮৭ হিজরীর সফর মাসে শুরু হয়ে ৮৯ হিজরীতে শেষ হয়েছিল। আর অন্যান্যদের নিকট এটা শেষ হয়েছিল ৯১ হিজরীতে। (বালাযুরী, ৭৬ পৃষ্ঠা; মুকাদ্দাসী, ১২; মাসুদী, ৫ম খণ্ড)

যা হোক, ওয়ালীদ ও হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) উভয়েই এ মহান কাজের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁরা এতই শান-শওকতের সাথে এ মসজিদ পুনঃনির্মাণ করেছিলেন যে, এটা সম-সাময়িক যুগের বৃহত্তম প্রাসাদ হিসেবে গণ্য হয়েছিল। যদিও ইসলাম অনাড়ম্বরপ্রিয়, ইসলামের দৃষ্টিতে প্রাসাদে স্বর্ণ-রৌপ্য ব্যবহার করা অপব্যয় বলে গণ্য হয়, কিন্তু ওয়ালীদের ব্যক্তিগত ধন ভাণ্ডারে যে সম্পদ জমা হয়েছিল, তা ব্যয় করার জন্য এর চেয়ে আর কোন উত্তম স্থান ছিল না। ওমর ইবনে আবদুল আজিজের মত বিচক্ষণ এবং ইসলাম সম্পর্কে পূর্ণ ওয়াকিফহাল একজন শাসনকর্তা এক ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পদকে এরূপে মসজিদে নববীর নির্মাণ কাজে ব্যয় করেই পরিতৃপ্ত হয়েছিলেন। যদি জনগণের ধন-ভাণ্ডারের হেফাযতের দায়িত্ব তাকে দেয়া হতো তবে তিনি কখনও তা থেকে এতে এভাবে ব্যয় করতেন না।

মসজিদ নির্মাণ শেষ হওয়ার পর মাত্র দু' বছর হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) মদীনার শাসনকর্তার পদে বহাল ছিলেন। ইবনুল জাওযী বলেন- ৯৩ হিজরীতে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়েই শাসনকর্তার পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ইবনে কাছীর বলেন যে, হাজ্জাজের প্ররোচনায় ওয়ালীদ তাঁকে পদচ্যুত করেছিলেন। কারণ যা হোক, এ সৌভাগ্য ও সম্মানিত পদ হারিয়ে তিনি খুবই দুঃখিত হয়েছিলেন। তিনি যখন মদীনা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন তখন তিনি মদীনার প্রতি অশ্রুসিক্ত নয়নে বারবার ফিলে তাকাচ্ছিলেন এবং ক্রন্দন করতে করতে বলেছিলেন-
يَا مُزَاحِمُ نَخْشَى أَنْ يَكُونَ مِمَّنْ نَفَتِ الْمَدِينَةِ إِنَّ الْمَدِينَةَ تَنْفِى خَبَثَهَا - كَمَا يَنْفِي نَبْقَى الْكِبْرِ خَبْثُ الْحَدِيدِ - وَيَبْقَى طِيبَهَا

অর্থাৎ হে মুজাহিম, আমার আশংকা হয় যে, আমরাও মদীনার রোষে পতিত হব। মদীনা তার অন্যায়কে দূর করে দেয়, যেমন রেত লোহার ময়লা দূর করে দেয় এবং পরিচ্ছন্ন খাঁটি লোহা অবশিষ্ট থাকে। (ইবনুল জাওযি)

ইবনে কাছীর বলেন যে, আব্দুল মালেক ও তার বংশধরগণ হাজ্জাজের প্রভাবে প্রভাবিত ছিল। আব্দুল মালেক হাজ্জাজকে তার পিতার খেলাফতের প্রতিষ্ঠাতা বলে মনে করতেন এবং মৃত্যুর সময় খলিফা মালেক ওয়ালীদকে হাজ্জাজের প্রতি শ্রদ্ধা ও পূর্ববৎ সম্পর্ক বজায় রাখতে বলেছিলেন। খলিফা ওয়ালীদও হাজ্জাজের মর্যাদা বুঝতেন। তদুপরি হাজ্জাজ-ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সম্পর্কে ওয়ালীদকে যে বিষয়ে অবগত করেছিল তাও ভুল ছিল না। হাজ্জাজ লিখেছিল, ইরাকের বিচ্ছিন্নতাবাদীগণ এখান থেকে পালিয়ে গিয়ে মদীনা ও তায়েফে আশ্রয় নিয়েছে। এ অবস্থা চলতে দিলে দেশের আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটবে। (ইবনুল জাওযি-৩৫)

হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র) অত্যন্ত দয়ালু লোক ছিলেন। তা ছাড়া হাজ্জাজ যাদেরকে দুষ্কৃতিকারী বলে মনে করত তারা তাঁর দৃষ্টিতে নির্যাতিত বলেই বিবেচিত হত। তাঁরা যখন তাঁর নিকট এসে আশ্রয় প্রার্থনা করত তখন তিনি তাদেরকে আশ্রয় দেয়া নৈতিক দায়িত্ব মনে করে আশ্রয় দিতেন।

হাজ্জাজ ওয়ালীদের নিকট এ অভিযোগ করে দৃঢ়তার সাথে বলল, যদি দুষ্কৃতিকারীগণ এভাবে পালিয়ে গিয়ে হেজাজে আশ্রয় নিতে থাকে তবে সাম্রাজ্যের সংহতি বিনষ্ট হবার সম্ভাবনা আছে। ওয়ালীদের নিকট ওমর ইবনে আবদুল আজিজের চেয়ে রাজত্ব ও রাজ সিংহাসন অধিকতর প্রিয় ছিল। তিনি হাজ্জাজকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার ধারণায় এমন কোন ব্যক্তি আছে, যে এ সমস্ত দুষ্কৃতিকারীদের প্রতিরোধ করে নিরবিচ্ছন্ন শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে? হাজ্জাজ তার বন্ধুদের মধ্যে দু'জনের পক্ষে সুপারিশ করল। অতএব ওয়ালীদ তাদের একজনকে মদীনা ও অপরজনকে মক্কার শাসনকর্তার পদে নিযুক্ত করে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে দামেশকে ফিরিয়ে নিলেন।

ইবনে কাছীর হাজ্জাজের এ অভিযোগকে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক অভিযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, একবার ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ হাজ্জাজের নির্যাতন-নিপীড়ন সম্পর্কে ওয়ালিদের নিকট অভিযোগ করেছিলেন।

ইবনে কাছীর খুব বিশ্বস্ততার সঙ্গেই বর্ণনা করেছেন যে, ওমর ইবনে আবদুল আজিজ পদচ্যুত হয়েছিলেন।

ইবনুল জওযি তাঁর পদত্যাগের যে ঘটনা উল্লেখ করেছেন, তাও উল্লেখ করা হলো। ইবনুল জাওযি বলেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইয়েরের (রা) পুত্র খুবাইব মদীনাতেই বসবাস করতেন। তিনি একবার রাসূলুল্লাহ (সা) হতে একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে, আবুল আছের বংশধরগণ যখন ত্রিশ জনে পৌঁছবে, তখন তারা আল্লাহর বান্দাগণকে দাসে পরিণত করবে এবং আল্লাহর সম্পদ লুট করবে।

এ হাদীছ মুখে মুখে প্রচার হয়ে ওয়ালিদের কানেও গিয়ে পৌঁছল। তাঁর মতে এটা ছিল খুবাইবের মনগড়া রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রতি একটি মিথ্যা অপবাদ। কাজেই তিনি হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে লিখলেন যে, খুবাইবকে এই অপরাধে একশত বেত্রাঘাত কর। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তাঁকে ডেকে এনে বেত্রাঘাত করতে নির্দেশ প্রদান করলেন। খুবাইব খুব দুর্বল প্রকৃতির লোক ছিলেন, জল্লাদ খুব নির্মমভাবে বেত্রাঘাত করেছিল। তারপর যখন তাঁকে ফিরিয়ে নেয়া হল, তখন বেত্রাঘাতের যন্ত্রণায় তিনি মারা গেলেন। ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ তাঁর মৃত্যু-সংবাদ শুনতে পেয়ে শোকে-দুঃখে মাটিতে গড়াগড়ি করে কাঁদতে লাগলেন এবং গভর্ণর পদ ত্যাগ করলেন।

তবে তাঁর পদত্যাগ সম্পর্কিত দু'টি ঘটনাই যথাসম্ভব সত্য। কারণ খুবাইবের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ পদত্যাগ করে ওয়ালিদকে লিখেছেন, কিন্তু এ পদত্যাগ পত্র ওয়ালিদের নিকট পৌছার পূর্বেই তিনি হাজ্জাজের পত্রে প্রভাবিত হয়ে তাঁকে পদচ্যুত করে আদেশ জারী করেছেন।

তিনি পদচ্যুত হয়ে থাকুন অথবা পদত্যাগ করেই থাকুন, তিনি যখন মদীনা হতে দামেশকের পথে যাত্রা করলেন তখন রাত্র ছিল এবং জেনে বুঝেই তিনি রাত্রের সফর অবলম্বন করেছিলেন।

অতীব আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঘটনাক্রমে সে রাত্রেই চন্দ্রের কৃষ্ণপক্ষ শুরু হয়েছিল। তাঁর ব্যক্তিগত সেবক মুজাহিম এ অবস্থা লক্ষ্য করে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) কে বললেন-
الا تَنْظُرُ إِلَى الْقَمَرِ مَا أَحْسَنُ اسْتَوَاءٌ فِي هَذِهِ اللَّيْلَةِ -

অর্থাৎ চন্দ্রের প্রতি লক্ষ্য করে দেখছেন কি? আজ রাতের সাথে কি সুন্দর মিল রয়েছে?

হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র) চন্দ্রের প্রতি তাকিয়ে মুজাহিমকে বললেন, আমি তোমার কথার অর্থ বুঝেছি। তবে মনে রেখ, আমাদের যাত্রার উপর চন্দ্র-সূর্যের কোন প্রভাব পড়বে না, হ্যাঁ একমাত্র পরাক্রমশালী মহান আল্লাহর ফায়সালা।

হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র) পদত্যাগ করলে মক্কা-মদীনা ও তায়েফবাসীগণ যে দুঃখ-দুর্দশায় পতিত হল, কোন ঐতিহাসিকই তার বর্ণনা দেননি।

হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র)-এর পদত্যাগে মদীনার ফকীহগণ অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে ছিলেন। কারণ তাঁদের মাহদী এবং তাদের প্রিয় শাসক মদীনা হতে বহিষ্কৃত হলেন এ দুঃখে তাঁরা অধীর হয়ে পড়লেন। বিশেষতঃ হযরত সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যাব (র) সব চেয়ে বেশি দুঃখ পেয়েছিলেন। কারণ তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজিজের দ্বারাই ওয়ালিদের ক্রোধ হতে মুক্তি পেয়েছিলেন।

ইবনে কাছীর বলেন, আব্দুল মালেক এবং তারপর ওয়ালিদ উভয়ই সায়ীদ ইবনে মুসাইয়্যাব (র)-এর প্রতি বৈরীভাব পোষণ করতেন। কারণ, সায়ীদের একটি কন্যা সমসাময়িক যুগে সব চেয়ে সুন্দরী, শিক্ষিত ও ভদ্র বলে খ্যাত ছিল। আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহর জ্ঞানেও সে ছিল পারদর্শী। তার এ সমস্ত বৈশিষ্ট্যের কারণে আব্দুল মালেক তার পুত্র ওয়ালিদের সাথে তার বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব (র) তাঁর এই প্রস্তাবের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলেন না। ফলে আবদুল মালেক রাগান্বিত হয়ে মদীনার শাসনকর্তাকে লিখলেন যে, সাঈদকে বেত্রাঘাত কর। কাজেই তাকে বেত্রাঘাত করা হল।

যখন আবদুল আজীজ মারা গেলেন, তখন আবদুল মালেক তার পুত্র ওয়ালিদের খেলাফতের পক্ষে জনসাধারণের নিকট থেকে বায়আত গ্রহণ করলেন। মদীনার তৎকালীন শাসনকর্তা হিশাম ইবনে ইসমাঈল তাঁর অনুসরণ করলেন, কিন্তু হযরত সায়দ ইবনে মুসাইয়্যাব (র) ওয়ালীদের খেলাফতের বায়আত করতে অস্বীকার করলেন। যার কারণে তাঁকে বেত্রাঘাত করা হল এবং চরমভাবে অপমানিত করে সমস্ত মদীনায় ঘুরান হল।

ওমর ইবনে আবদুল আজিজের দ্বারাই তাঁর প্রতি এ সমস্ত নিপীড়নমূলক আচরণ বন্ধ হয়েছিল। হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) সায়দ ইবনে মুসাইয়‍্যাব (র) কে খুব শ্রদ্ধা করতেন, তিনি তাঁর মতামতের বিরুদ্ধে কোন নির্দেশ প্রদান করতেন না। কারণ হযরত সায়দ ইবনে মুসাইয়‍্যাব (র) সম-সাময়িক যুগে মদীনার সবচেয়ে বিজ্ঞ আলেম ও সাধক ছিলেন।

ইবনে কাছীরের ভাষ্যটি হলো-
كَانَ مِنْ أَزْهَدِ النَّاسِ فِي فُضُولِ الدُّنْيَا وَالْكَلَامِ لَا يَعْنِي وَمِنْ أَكْثَرِ النَّاسِ أَدَبَا فِي الْحَدِيثِ -
অর্থাৎ অনর্থক কথা ও কাজে তিনি বেশি সংযত ছিলেন এবং হাদীসের বেলায় তিনি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন।

ইবনে কাছীর বলেন, হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র) যখন মদীনা থেকে বের হলেন, তখন হযরত সায়দ ইবনে মুসাইয়‍্যাব (র) অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁর মঙ্গলের জন্য দু' হাত উঠিয়ে মহান আল্লাহপাকের দরবারে দোয়া করেছিলেন এবং ক্রন্দন করছিলেন।

📘 ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ > 📄 অন্তবর্তীকাল

📄 অন্তবর্তীকাল


হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজের জীবনের দীর্ঘ ছয়টি বছর অর্থাৎ ৯৩ হিজরী থেকে ৯৯ হিজরী পর্যন্ত কিভাবে অতিবাহিত হয়েছিল- ঐতিহাসিকগণ তার কোন বিস্তারিত আলোচনা করেননি।

ইবনে কাছীর এ সম্পর্কে মাত্র একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য ব্যবহার করেছেন-
ثُمَّ قَدِمَ دَمِشْقَ عَلَى بَنِي عَمِهِ
অর্থাৎ তারপর তিনি দামেশকে তাঁর চাচাত ভাইদের নিকট চলে গেলেন। এ বাক্যের সাথে সাথেই ইবনে কাছীর যহরীর বর্ণনার একটি উদ্ধৃতি পেশ করেছেন, যার প্রবক্তা স্বয়ং ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ (র)।

"একদিন দ্বিপ্রহরের সময় ওয়ালীদ আমাকে ডেকে পাঠালেন, আমি তাঁর নিকট এসে দেখলাম যে, তিনি খুবই অস্থির। তিনি আমাকে বসতে বললেন, আমি বসলাম। তখন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, যে ব্যক্তি খলীফাগণকে গালি দেয় তাকে হত্যা করা যাবে? এতে আমি নীরব রইলাম। তিনি সে কথাই আবার বললেন। তখনও আমি কোন উত্তর দিলাম না। তিনি তৃতীয় বারেও তিনি একই প্রশ্ন করলেন, তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, সে কি হত্যাও করছে? ওয়ালীদ বললেন, না, সে শুধু গালি দিয়েছে। আমি বললাম, তবে তাকেও অনুরূপ গালি দেয়া হোক। এতে ওয়ালিদ অসন্তুষ্ট হয়ে তার পরিবার-পরিজনের নিকট চলে গেলেন।

ইবনুল জাওযিও এ জাতীয় একটি ঘটনা সুলায়মানের যুগে সংঘটিত হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন। সুলায়মানের যুগে এক ব্যাক্তি খলীফাগণকে গালি দিয়েছিল। সুলায়মান হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে ডেকে এনে এ সম্পর্কে তাঁর মতামত জানতে চাইলেন। তিনি বললেন, তুমিও তাঁকে গালি দাও। সুলায়মান বললেন, সে আমার বাপ দাদাকে গালি দিয়েছে। হযরত ওমর ইবনে আজিজ বললেন, তুমিও তার বাপদাদাকে গালি দাও। কিন্তু সুলায়মান তাঁর কথা রক্ষা না করে সে ব্যক্তিকে হত্যা করে।

ইবনুল জাওযি আরও বলেন, এ সময় সুলায়মানের পুত্র, খেলাফতের পরবর্তী উত্তরাধিকারী আয্যবও সেখানে ছিল। সে একে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের ঔদ্ধত্য ও অভদ্রতা জ্ঞান করে তাঁর সাথে তর্ক করতে লাগল। সুলায়মান পুত্রকে তিরস্কার করে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট ক্ষমা চাওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন।

এ সমস্ত ঘটনা ব্যতীত ঐতিহাসিকগণ আরও কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যাতে প্রতীয়মান হয় যে, ওয়ালীদ ও সুলায়মান ইবনে আব্দুল মালেক যখনই কোন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সম্মুখীন হতেন তখনই তারা হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে ডেকে তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। তবে তারা কোন কোন সময় তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতেন আবার কোন কোন সময় তারা তাঁর মতামত অগ্রাহ্যও করতেন।

কোন জটিল-সমস্যা হলে ওয়ালীদ তাঁর খাদেমগণকে নির্দেশ দিতেন যে, সেই সৎ লোকটিকে ডেকে আন। তারাও ওমর ইবনে আব্দুল আজিজকে সৎলোক বলেই বিশ্বাস করত। প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন ভাল লোক ছিলেন। এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে যা ঠিক তিনি সে পরামর্শই দিতেন। পরিণাম কি হবে জিজ্ঞাসাকারী খুশি হবে না অখুশি হবে, তিনি তার ভয় করতেন না।

উদাহরণ স্বরূপ ইবনে আব্দুল হাকামের একটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো, একদা ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ সুলায়মান ইবনে আব্দুল মালেকের সাথে তার কোন বোনের উত্তারিধকার সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন। সুলায়মান বললেন এ সম্পর্কে খলীফা আব্দুল মালেকের একটি দলীল আছে। তাতে তিনি তাদেরকে মিরাছ হতে বঞ্চিত করেছেন এবং তিনি তাঁর পুত্রকে সেই দলীল আনতে নির্দেশ দিলেন। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ উপহাস করে বললেন, খলিফা কি কুরআন পাক আনতে নির্দেশ দিলেন? ওয়ালিদের পুত্র আয়্যব একে অভদ্রতা জ্ঞান করে ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে বলল, এ কথাটিই একটি লোককে হত্যা করার পক্ষে যথেষ্ট। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, তুমি যখন খলীফা হবে তখন এরূপই করিও। এতে সুলায়মান পুত্রকে তিরস্কার করলেন এবং ওমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে বললেন।

ইবনুল জাওযি বলেন, কোন কোন সময় খলীফাগণ তাঁর কথা মেনেও নিতেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, একবার এক সফরে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ সুলায়মানের সাথে ছিলেন। তাঁদের সাথে সামরিক বাহিনীর কিছু লোকও ছিল। সুলায়মান কিছু লোককে গান গেতে শুনে তাদেরকে ডেকে আনলেন এবং তাদেরকে নপুংসক করে দিতে নির্দেশ দিলেন। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ প্রতিবাদ করে বললেন, এটা শরীয়ত বিরোধী একটি নির্দেশ। তাদেরকে ছেড়ে দাও। সুলায়মান তাঁর কথা মেনে নিলেন।

এরূপ এক সফরে তিনি সুলায়মানের সাথে ছিলেন, এমন সময় খুব ঝড় শুরু হলো ও বিদ্যুৎসহ বজ্রপাত হতে লাগল। সুলায়মান ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে তার বাহনের উপর জড়সড় হয়ে বসেছিলেন এবং ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে ডাকছিলেন। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ এটা দেখে হাসতে লাগলেন। সুলায়মান অভিমান করে বললেন, আমরা ভয়ে মরি আর আপনি হাসেন! ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, এটা আল্লাহর রহমত, রহমত দেখে আনন্দ করা উচিত। কাঁদতে হয় আল্লাহর আযাব দেখে।

একদিন সুলায়মান দেখলেন, বহুলোকের সমাগম হয়েছে। তিনি ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে জিজ্ঞেস করলেন, এ সমস্ত লোক কি চায়? হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ বললেন, এরা তোমারই নিকট অভিযোগ করতে এসেছে। সুলায়মান বললেন, এ এক লাখ টাকা নিয়ে তাদের মধ্যে বিতরণ করে দিন। ওমর বললেন, এর চেয়েও ভাল হবে যে, তুমি তাদের অভিযোগ শুনে তার প্রতিকার বিধান কর। অতএব সুলায়মান ওমরের কথা মত তাদের অভিযোগ শুনে তার প্রতিকার করলেন।

একবার সুলায়মান ও হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজিজের মধ্যে একটি ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হল। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (র)-এর কোন গোলাম সুলায়মানের কোন এক গোলামকে খুব মারপিট করল। উক্ত গোলাম সুলায়মানের নিকট মিথ্যা অভিযোগ করল যে, এতে ওমর ইবনে আবদুল আজিজ খুব খুশি হয়েছেন। তারপর ওমর ইবনে আবদুল আজিজ আসলে সুলায়মান তার নিকট এ অভিযোগ করলেন। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ এ ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। তিনি বললেন, তোমার বলার পূর্বে আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। সুলায়মান ক্রোধান্বিত হয়ে বললেন, আপনি মিথ্যাবাদী। ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বললেন, تَقُولُ كَذِبْتُ وَمَا كَذِبْتُ مُنْذُ شَهِدْتُ عَلَى إِزَارِي وَإِنَّ فِي الْأَرْضِ عَنْ مَجْلِسِكَ هذَا لَسِعَةٌ

অর্থাৎ তুমি বল, আমি মিথ্যাবাদী, অথচ আমি যখন হতে কাপড় পরিধান করি, তখন হতে কোন মিথ্যা কথা বলিনি। আল্লাহর পৃথিবী তোমার মজলিস হতে অনেক প্রশস্ত। এ কথা বলে সুলায়মানের মজলিস হতে বের হয়ে আসলেন এবং বাড়ীতে এসেই তিনি মিশরে যেতে প্রস্তুত হলেন। সুলায়মান এটা জানতে পেরে খুবই বিব্রত বোধ করলেন এবং লোক পাঠিয়ে ওমরের নিকট ক্ষমা চাইলেন এবং তাকে ফিরিয়ে আনলেন। যখন ওমর ইবনে আবদুল আজিজ তার নিকট আসলেন তখন তিনি বললেন, আপনি মিশর যাত্রা করে আমাকে যেরূপ বিব্রত করছেন এরূপ আর কখনও হয়নি।

ঐতিহাসিকগণ, বিশেষতঃ ইবনে আব্দুল হাকাম, ইবনুল জাওযি এবং ইবনে কাছীর তার সত্যবাদীতা ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে এ সমস্ত ঘটনা উল্লেখ করেছেন এবং ৯৩ হিজরী হতে ৯৯ হিজরী পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় বছর দামেশকে অতিবাহিত করেন বলে উল্লেখ করেছেন। ইবনুল জাওযি এটাও বলেছেন যে, একদিন সুলায়মান কোন এক জনপদে গিয়েছিলেন। তার কাফেলা ভীষণ ঝড়ে আক্রান্ত হল। তখন সুলায়মান চিৎকার করে বলেছিলেন, হে ওমর! হে ওমর!

বনু উমাইয়্যার লোকদের সাধারণ রীতি ছিল যখন তাদের কেউ কোন বিপদে পতিত হত তখনই ওমর ইবনে আবদুল আজিজকে ডাকত এবং তিনিও “এইত আমি আসছি” বলে তার ডাকে সাড়া দিতেন।

ইবনুল জাওযির অপর একটি বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, শুধু বনু উমাইয়‍্যার খলীফাগণই নয় বরং সাধারণ লোকেরাও বিপদাপদে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের সাহায্য প্রার্থী হত।

৯৩ হিজরী হতে ৯৯ হিজরী পর্যন্ত বনু উমাইয়া এবং বনু উমাইয়ার খলীফাগণ বিশেষতঃ ওয়ালীদ ও সুলায়মান সকল প্রকার দুঃখ-শোকে, ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ওমর ইবনে আবদুল আজিজের পরামর্শ চাইতেন, আর তিনিও পরম বিশ্বস্ততার সাথে তাদেরকে উত্তম পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00