📄 জ্ঞান বিস্তার
আবদুল আজীজ শুধু নিজেই পাণ্ডিত্য অর্জন করে ক্ষান্ত হননি, বরং তিনি তাঁর কর্মচারী, পরিষদ এবং দরবারের অন্যান্য লোকদেরকেও এ বিষয়ে উৎসাহিত করলেন। এমনকি তাঁর কর্মচারীদের মধ্যে ভাষাজ্ঞান ভিত্তিতে বেতন-ভাতা ও পদের যোগ্যতা নির্ধারণ করে দিলেন। যার ভাষা ভুল হতো তার বেতন কমিয়ে দিতেন এবং যার ভাষা শুদ্ধ-মার্জিত হতো তাকে পদোন্নতি দিতেন। তাঁর এ কর্মসূচী অত্যন্ত সফলতার সাথেই কার্যকরী হল। সকলেই ভাষা আয়ত্ব করতে আগ্রহী হয়ে উঠল এবং খুব তাড়াতাড়িই তার কর্মচারীদের ভাষা পরিবর্তন হয়ে ত্রুটিমুক্ত হয়ে গেল।
একবার তাঁর একজন বিশিষ্ট কর্মচারী তাঁর সামনে হাজির হলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন তুমি কোন বংশের লোক? সে উত্তর করল- مِنْ بَنُو عَبْدِ الدَّارِ অর্থাৎ আমি আবদেদ্দার বংশের লোক। এ বাক্যটিতে ব্যাকরণগত ত্রুটি ছিল। তার বলা উচিত ছিল- مِنْ بَنِي عَبْدِ الدَّارِ
সে কর্মচারীর ভাষাগত এ ত্রুটির জন্য আবদুল আজীজ তার প্রতি খুব অখুশি হলেন এবং একশত দিনার বেতন কমিয়ে দিলেন। (আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৫৭)
আবদুল আজীজ মিশরের আলেম-উলামা ও শিক্ষিত সম্প্রদায়ের প্রতি বিশেষ সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি তাদের প্রতি যে দয়া-দাক্ষিণ্য ও সহানুভূতি দেখিয়েছিলেন, তার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিনি প্রত্যেকটি শিক্ষিত পরহেযগার লোকের মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। শিক্ষা ও জ্ঞানের আলো বিস্তারের জন্য বেশকিছু সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও খানকাহ নির্মাণ করেছিলেন, এমনকি তাঁর প্রাসাদটিকেও একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন। (ইবনে কাছীর, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৫৮)
📄 দানবীর
ইবনে কাছীর আবদুল আজীজকে তখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় দানশীল বাদশাহ বলে উল্লেখ করেছেন, আর বাস্তবিকপক্ষে তিনি তাই ছিলেন। তিনি শুধু দান-খয়রাতই করতেন না বরং সর্বসাধারণের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন করতে কৃষি বিভাগের উল্লেখযোগ্য সংস্কার করেছিলেন, বহু ফলের বাগান তৈরি করেছিলেন। বহু অনাবাদী ভূমি নতুন কৃষকদের মধ্যে বন্দোবস্ত দিয়ে দেশের আর্থিক উন্নয়ন সাধন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যে সমস্ত অনাবাদী ভূমিতে মিশরীয়দের স্বত্ব ছিল না, সে সমস্ত ভূমিতে আরবের কৃষিকার্যে অভিজ্ঞ লোক এনে তাদেরকে বন্দোবস্ত দিয়েছিলেন। মিশরীয় উপসাগরের উপর সেতু নির্মাণ, বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণ, মসজিদ নির্মানসহ অসংখ্য জনহিতকর অনেক কাজ করেছিলেন। তিনি কায়রো নগরীতে নিজের জন্য একটি মনোরম প্রাসাদ নির্মাণ করে অবশেষে সেটা মাদ্রাসার জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন এবং তিনি হালওয়ান নামক স্থানে এসে বসবাস করতেন।
📄 জনসেবা
কায়রোর জামে মসজিদ আজও আবদুল আজীজের স্মৃতি বহন করছে। তিনি পূর্বের মসজিদ ভেঙ্গে দিয়ে এমন এক বিরাট ও সুন্দর মসজিদ নির্মাণ করলেন যে, সে সময় এরূপ মসজিদ দুনিয়ার আর কোথায়ও ছিল না।
দেশের বিশিষ্ট আলেম-ওলামাগণ তাঁর খুবই প্রিয়পাত্র ছিলেন। ছোট-বড় সকল কাজেই তিনি আলেমদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। আবুল খায়ের মুরছেদ এবং আবদুর রহমান ইবনে মাজরাহ ছিলেন সে সময়কার বিশিষ্ট আলেম। তিনি তাঁদের উভয়কেই তাঁর প্রধান উপদেষ্টার পদে নিয়োগ দান করেছিলেন।
আবদুল আজীজের দানশীলতার কথা কল্প-কাহিনীর মত সর্বত্রই আলোচিত হতো। তাঁর বাবুর্চিখানায় প্রতি দুপুর ও সন্ধ্যায় দু'হাজার লোকের খানা রান্না করা হতো। যখন খাওয়ার জন্য দস্তরখানা বিছানো হত, তখন দেখা যেতো যে, মিশরের বিশিষ্ট আলেম-উলামাসহ সর্বপ্রকার জ্ঞানী-গুণী লোকেরাই সেখানে খানায় শামিল হয়েছেন।
আবদুল আজীজ প্রতি বছর শীত ও গ্রীষ্মের শুরুতে হাজার হাজার দরিদ্র ও অভাবী-অনাথ লোককে শীত ও গ্রীষ্মের বস্ত্র বিতরণ করতেন। বিধবা, ইয়াতীম ও নিঃস্ব লোকের ভাতার ব্যবস্থা করে অভাবী লোকদের দুঃখ দূর করতেন।
📄 সাহিত্যানুরাগী
কবি-সাহিত্যিকগণ ছিলেন তাঁর নিকট খুবই প্রিয়। বিশেষতঃ কাছীর ও নাছীবকে তিনি যে বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ দিয়েছিলেন, অতীতে কেউ কোন কবিকে এরূপ অর্থ-সম্পদ দিয়েছে বলে কারো জানা নেই। তিনি যে সমস্ত লোককে মোটা অংকের অর্থ সাহায্য করেছিলেন, তন্মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) অন্যতম ছিলেন। হযরত ইবনে ওমর (রা) ছিলেন তাঁর স্ত্রী উম্মে আসেমের চাচা এবং পুত্র ওমর ইবনে আবদুল আজীজের তত্ত্বাবধায়ক ও ওস্তাদ।
ইবনে কাছীর (র) আবদুল আজীজের মৃত্যুর শোকে কাতর হয়ে এ ছোট একটি বাক্য ব্যবহার করেছিলেন- وَقَدْ كَانَ عَبْدُ الْعَزِيزِ بْنِ مَرْوَانَ مِنْ خِيَارِ الْأُمَرَاءِ كَرِيمًا جَوَادًا مُمَدَّحًا
অর্থাৎ আবদুল আজীজ একজন যোগ্য শাসক ও দয়ালু-দাতা এবং প্রশংসার পাত্র ছিলেন। (আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৬৮)