📘 ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ > 📄 আবদুল আজীজ

📄 আবদুল আজীজ


ঐতিহাসিকগণ আবদুল আজীজের বড় ভাই এবং মারওয়ানের জ্যেষ্ঠপুত্র আবদুল মালেককে তার তীক্ষ্ণ মেধা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তার জন্য দ্বিতীয় মুয়াবিয়া হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তারা তাকে সে সময় সকল লোকের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। বাস্তবিকই তিনি দ্বিতীয় মুয়াবিয়া ছিলেন। তিনিও হযরত মুয়াবিয়া (রা)-এর মত দৃঢ় চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার দ্বারা তার সকল প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে রাজ্যের বুনিয়াদকে শক্তিশালী ও সুসংহত করেছিলেন।

কিন্তু আবদুল আজীজ বয়স, বুদ্ধি ও রাজনীতিতে আবদুল মালেকের চেয়ে ভাল হলেও চরিত্রমাধুর্য, ভদ্রতা, সততা-সাধুতা ও স্বচ্চরিত্রতার অন্যান্য গুণে আবদুল মালেকের চেয়েও অনেক উর্ধ্বে ছিলেন।

আবদুল মালেকের স্বভাব-চরিত্র, কাজ-কর্ম, কথাবার্তা ইত্যাদি দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনি মারওয়ান ইবনে হাকামেরই সুযোগ্য পুত্র। যারা আবদুল আজীজকে দেখেছেন, যারা তাঁর পার্শ্বে অবস্থান করেছেন, তাদের নিকট আবদুল আজীজের বংশ পরিচয় প্রকাশ না করলে, তারা তাঁর সৎ স্বভাব ও অন্যান্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে তাঁকে ওমর ফারুক বা আবুবকর (রা) অথবা এ জাতীয় কোন মনীষীর সন্তান বলেই ধারণা করত।

আবদুল আজীজ তার ভাই আবদুল মালেকের চেয়ে শৌর্য-বীর্য ও সাহসিকতার দিক দিয়ে সমান পর্যায়ের ছিলেন না। যখন তিনি তাঁর পিতার সাথে মিসরে অভিযান পরিচালনা করেন, তখন তিনি অসীম বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে সেখানকার শাসক ইবনে মাজাদামকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছিলেন।

ঐতিহাসিক সুয়ূতী বলেন, মিশরের কিছুসংখ্যক লোকের আমন্ত্রণক্রমে মারওয়ান যখন মিশর আক্রমণ করতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন তার পুত্র আবদুল আজীজকে অল্প কিছু সৈন্যসহ জেরুজালেমে পাঠালেন। সেখানে মিশরের শাসনকর্তা পূর্ব থেকেই বিরাট এক সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করে রেখেছিলেন।

আবদুল আজীজ তখনও পথিমধ্যে ছিলেন। ইবনে মাজদাম তাঁর অগ্রযাত্রা রোধ করার জন্যে যুদ্ধপটু সেনাপতি যুবাইর ইবনে কায়েসকে পাঠালো। বাচ্ছাক নামক স্থানে আবদুল আজীজ ও যুবাইরের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল।

এ যুদ্ধে আবদুল আজীজ অত্যন্ত দক্ষতা ও যোগ্যতার সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করে শত্রু বাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে পরাভূত করে তাদের কয়েকজন বিখ্যাত সেনাপতিকে হত্যা করলেন। শত্রু বাহিনী যেভাবে পরাজিত ও পর্যুদস্ত হল, ইবনে মাজদাম ও তার সেনাপতি যুবাইর তা ভাবতেও পারেনি।

আবদুল আজীজের এ অসাধারণ বীরত্বের ফলেই ইবনে মাজদাম মারওয়ানের সাথে একটি প্রদর্শনীমূলক যুদ্ধ করেই সন্ধি করতে বাধ্য হয়েছিল।

মারওয়ানও তার পুত্রের যোগ্যতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। এ কারণেই তিনি দুই মাস মিশরে অবস্থান করার পর যখন সিরিয়ায় গমন করেন তখন আবদুল আজীজের হাতেই মিশরের শাসনভার অর্পণ করেন।

ঐতিহাসিক ইবনে কাছীর বলেন- ৬৫ হিজরীতে মারওয়ান আবদুল আজীজকে মিশরের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। তখন মিশরবাসী তাঁর ধ্যান-ধারণা ও চারিত্রিক গুণাবলি সম্পর্কে কিছুই জানতো না। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা উপলব্ধি করেছিল যে, এরূপ চরিত্রবান, দয়ালু, বিদ্যোৎসাহী ও দানশীল কোন বাদশাহ ইতোপূর্বে আর মিশরবাসীদের শাসন করেনি। (ইবনে কাছীর, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৫৮)

ইবনে সাদ বলেন- আবদুল আজীজ একজন উচ্চশ্রেণীর আলেম এবং নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিস ছিলেন। তিনি ছিলেন হযরত আবু হুরায়রা (রা)-এর একজন ছাত্র। তিনি তাঁর নিকট থেকে বেশ কয়েকটি হাদীসও বর্ণনা করেছেন। আবদুল আজীজের ওস্তাদগণের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা) এবং ওকবা ইবনে আমের (রা) ছিলেন অন্যতম।

(তাবকাতে ইবনে সাদ, ৫ম খণ্ড, পৃ. ৩৪৫)
ইবনে কাছীর আবদুল আজীজের ওস্তাদগণের আলোচনা শেষে মন্তব্য করেছেন যে, তিনি একজন নির্ভরযোগ্য হাদীসবিদ ছিলেন। কিন্তু তাঁর হাদীস বর্ণনা সংখ্যায় খুবই কম ছিল। তিনি ছিলেন সব দিক দিয়ে সফল ব্যক্তিত্ব, তিনি বিনয়-নম্রতা, শালীনতা ও ভদ্রতার সাথে শুদ্ধ ভাষায় কথাবার্তা বলতেন।

📘 ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ > 📄 শিক্ষা-দীক্ষা

📄 শিক্ষা-দীক্ষা


আবদুল আজীজ মদীনায় জন্মগ্রহণ করে সেখানেই কুরআনসহ অন্যান্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছিলেন। কিন্তু মিশরে আসার পর তিনি ভাষায় বিশেষ দক্ষতা ও পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।

আবদুল আজীজের ভাষায় দক্ষতা অর্জন প্রসঙ্গে ইবনে কাছীর একটি সুন্দর ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন যে, একবার এক ব্যক্তি তার জামাতার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ নিয়ে আবদুল আজীজের নিকট আগমন করল। আরবীতে জামাতাকে "খাতেন” বলা হয়, কিন্তু সে ব্যক্তি তার এরাবের (স্বরচিহ্ন) উপর খুব জোর দেয়নি, আবদুল আজিজও এরাব সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন- مَنْ خَتَنَكَ )মান খাতানাক( অর্থাৎ তোমাকে কে খৎনা করেছে? অথচ তার জিজ্ঞাসা ছিল مَنْ خَتِنُكَ )মান খাতিনুকা) অর্থাৎ তোমার জামাতা কে? অতএব সে অভিযোগকারী বিদ্রূপ করে জবাব দিল যে, সাধারণ মানুষকে যে খৎনা করে থাকে আমাকেও সে খৎনা করেছে। এতে আবদুল আজীজ অত্যন্ত লজ্জিত হলেন। অতঃপর আবদুল আজীজ উপদেষ্টার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে তিনি বললেন, আপনার জিজ্ঞাসা ছিল مَنْ خَتِنُكَ )মান খাতিনুকা) অর্থাৎ তোমার জামাতা কে? কারণ খাতেনুনের অর্থ হল জামাতা। এরপর আবদুল আজীজ কসম করলেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি ভাষার উপর পুরোপুরি দক্ষতা অর্জন করতে না পারবেন ততক্ষণ পর্যন্ত আর প্রাসাদের বাইরে বের হবেন না। অতএব তিনি পূর্ণ আট দিন প্রাসাদের ভিতরে থেকে ভাষায় পূর্ণ দখল অর্জন করে যখন বের হলেন, তখন তিনি ছিলেন একজন উচ্চ পর্যায়ের ভাষাবিদ, পণ্ডিত।

📘 ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ > 📄 জ্ঞান বিস্তার

📄 জ্ঞান বিস্তার


আবদুল আজীজ শুধু নিজেই পাণ্ডিত্য অর্জন করে ক্ষান্ত হননি, বরং তিনি তাঁর কর্মচারী, পরিষদ এবং দরবারের অন্যান্য লোকদেরকেও এ বিষয়ে উৎসাহিত করলেন। এমনকি তাঁর কর্মচারীদের মধ্যে ভাষাজ্ঞান ভিত্তিতে বেতন-ভাতা ও পদের যোগ্যতা নির্ধারণ করে দিলেন। যার ভাষা ভুল হতো তার বেতন কমিয়ে দিতেন এবং যার ভাষা শুদ্ধ-মার্জিত হতো তাকে পদোন্নতি দিতেন। তাঁর এ কর্মসূচী অত্যন্ত সফলতার সাথেই কার্যকরী হল। সকলেই ভাষা আয়ত্ব করতে আগ্রহী হয়ে উঠল এবং খুব তাড়াতাড়িই তার কর্মচারীদের ভাষা পরিবর্তন হয়ে ত্রুটিমুক্ত হয়ে গেল।

একবার তাঁর একজন বিশিষ্ট কর্মচারী তাঁর সামনে হাজির হলে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন তুমি কোন বংশের লোক? সে উত্তর করল- مِنْ بَنُو عَبْدِ الدَّارِ অর্থাৎ আমি আবদেদ্দার বংশের লোক। এ বাক্যটিতে ব্যাকরণগত ত্রুটি ছিল। তার বলা উচিত ছিল- مِنْ بَنِي عَبْدِ الدَّارِ

সে কর্মচারীর ভাষাগত এ ত্রুটির জন্য আবদুল আজীজ তার প্রতি খুব অখুশি হলেন এবং একশত দিনার বেতন কমিয়ে দিলেন। (আল-বেদায়া ওয়ান নেহায়া, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৫৭)

আবদুল আজীজ মিশরের আলেম-উলামা ও শিক্ষিত সম্প্রদায়ের প্রতি বিশেষ সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি তাদের প্রতি যে দয়া-দাক্ষিণ্য ও সহানুভূতি দেখিয়েছিলেন, তার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিনি প্রত্যেকটি শিক্ষিত পরহেযগার লোকের মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। শিক্ষা ও জ্ঞানের আলো বিস্তারের জন্য বেশকিছু সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও খানকাহ নির্মাণ করেছিলেন, এমনকি তাঁর প্রাসাদটিকেও একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন। (ইবনে কাছীর, ৮ম খণ্ড, পৃ. ৫৮)

📘 ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ > 📄 দানবীর

📄 দানবীর


ইবনে কাছীর আবদুল আজীজকে তখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় দানশীল বাদশাহ বলে উল্লেখ করেছেন, আর বাস্তবিকপক্ষে তিনি তাই ছিলেন। তিনি শুধু দান-খয়রাতই করতেন না বরং সর্বসাধারণের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন করতে কৃষি বিভাগের উল্লেখযোগ্য সংস্কার করেছিলেন, বহু ফলের বাগান তৈরি করেছিলেন। বহু অনাবাদী ভূমি নতুন কৃষকদের মধ্যে বন্দোবস্ত দিয়ে দেশের আর্থিক উন্নয়ন সাধন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যে সমস্ত অনাবাদী ভূমিতে মিশরীয়দের স্বত্ব ছিল না, সে সমস্ত ভূমিতে আরবের কৃষিকার্যে অভিজ্ঞ লোক এনে তাদেরকে বন্দোবস্ত দিয়েছিলেন। মিশরীয় উপসাগরের উপর সেতু নির্মাণ, বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণ, মসজিদ নির্মানসহ অসংখ্য জনহিতকর অনেক কাজ করেছিলেন। তিনি কায়রো নগরীতে নিজের জন্য একটি মনোরম প্রাসাদ নির্মাণ করে অবশেষে সেটা মাদ্রাসার জন্য ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন এবং তিনি হালওয়ান নামক স্থানে এসে বসবাস করতেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00