📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 সূরা নাজম ও সূরা কমার প্রসঙ্গ

📄 সূরা নাজম ও সূরা কমার প্রসঙ্গ


হযরত আয়েশা (রাযি.) বলেছেন—
لَقَدْ أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَ إِنِّي لَجَارِيَةٌ أَلْعَبُ "بَلِ السَّاعَةُ مَوْعِدُهُمْ".
অর্থ: নিঃসন্দেহে যখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর এই আয়াত অবতীর্ণ হয়... بَلِ السَّاعَةُ مَوْعِدُهُمُ, তখন আমি ছিলাম এক বালিকা, খেলাধুলা করতাম। (সহীহ বুখারী: তাফসীর-সূরা কমার)
মৌলভি সাহেব বলেছেন, এই আয়াত সূরা কমারের। আর সূরা কমার মাক্কী জামানার শুরুর দিকে নাজিল হয়েছে। কারণ এই সূরায় চন্দ্র দ্বিখণ্ডিতকরণের আলোচনা রয়েছে। আর শাক্কুল কমার বা চন্দ্র দ্বিখণ্ডিতকরণের মুজিযা ইসলামের শুরুর যুগের ঘটনা। কারণ সপ্তম বর্ষে তো আল্লাহর নবী অবরোধের শিকার হয়েছিলেন। সুতরাং এটা অবরোধের আগে পঞ্চম বর্ষের ঘটনাই হবে। তা ছাড়া, সূরা নাজমের সঙ্গে সূরা কমারের অনেক মুনাসাবাত (মিল বা সাদৃশ্য) রয়েছে। তাই সূরা কমারও পঞ্চম বর্ষেই অবতীর্ণ হয়েছে। আর ওই সময় হযরত আয়েশা রাযি. ছোট বালিকা ছিলেন, খেলাধুলা করতেন, আবার বিভিন্ন আয়াত শুনে মুখস্থও রাখতেন। এই বিষয়গুলো এটাই প্রমাণ করে যে, নবুওয়াতের দশম বছর বিবাহের সময় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স ৬/৭ বছর নয়, বরং আরও বেশি (১০/১২) বছর ছিল।
কিন্তু জনাব লাহোরি সাহেব 'যদি, যেহেতু এবং তবে, সেহেতু'-র যে বিশাল সিরিয়াল লাগিয়েছেন এর পুরোটাই ভিত্তিহীন, মনগড়া। তার বক্তব্য অনেকটা মানতেকের সুগরা-কুবরার তারতীবের মতো। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তার বক্তব্য আরেকবার লক্ষ করুন—এই আয়াত সূরা কমারের, আর সূরা কমার সূরা নাজমের সদৃশ, আর সূরা নাজম পঞ্চম বর্ষে অবতীর্ণ, আর পঞ্চম বর্ষে হযরত আয়েশা রাযি.-এর আয়াত মুখস্থ রাখতে পারা তার ৫/৬ বছর বয়স হওয়ার প্রমাণ বহন করে। আর নববী পঞ্চম বর্ষে ৫/৬ বছর বয়স হওয়া দশম বছর বিবাহের সময় ১১/১২ বছর বয়স হওয়া প্রমাণ করে।
এখন আমাদের দেখতে হবে, যেসব 'হওয়া' বিষয় অন্যগুলোর 'হওয়া' প্রমাণ করছে সেগুলো আদৌ হয়েছিল কি না। এগুলোর কোনো একটা যদি না হয়ে থাকে তা হলে বাকিগুলোও হয়নি।
প্রথম কথা হলো, হাদীসে হযরত আয়েশা রাযি.-এর (সূরা কমারের) শুধু একটি আয়াত নাজিল হওয়া এবং তা ইয়াদ রাখার প্রসঙ্গ এসেছে, পূর্ণ সূরার আলোচনা এখানে আসেনি। আর কুরআন নাজিলের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায়, কখনো শুধু একটি আয়াত, কখনো কয়েকটি আয়াত, আবার কদাচিৎ পূর্ণ সূরা অবতীর্ণ; কখনো এমনও হয় একটি সূরা কয়েক বছর ধরে অল্প অল্প করে নাজিল হতে থাকে। তো এই হাদীস তখনই মৌলভি সাহেবের স্বপক্ষে দলিল হবে যখন পূর্ণ সূরা একসঙ্গে অবতীর্ণ হওয়া প্রমাণিত হবে। অথচ বাহ্যিকভাবে এটাই মনে হচ্ছে যে, পূর্ণ সূরা একসঙ্গে নাজিল হয়নি। কারণ, পূর্ণ সূরা নাজিল হলে হযরত আয়েশা রাযি. বলতেন, যখন সূরা কমার নাজিল হয় তখন আমি... অথচ তিনি বলছেন, যখন এই আয়াত নাজিল হলো...
উল্লেখ্য: হযরত আয়েশা রাযি. যে স্বভাবজাত প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন তাঁর জন্য একটি আয়াত ছোট্ট বয়সে ইয়াদ রাখা অসম্ভব নয়।
দ্বিতীয় কথা হলো, কোনো সূরার কিছু আয়াত এক সময় অবতীর্ণ হওয়া কিংবা কোনো সূরা অন্য সূরার সঙ্গে মুনাসাবাত থাকা এটা প্রমাণ করে না যে, ওই সূরার সব আয়াত বা উভয় সূরা একই সময় বা কাছাকাছি সময় অবতীর্ণ হয়েছে। যেমন সূরা মায়েদার الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ এই আয়াত দশম হিজরীর বিদায় হজের সময় অবতীর্ণ হয়েছে। অথচ মায়েদার সিংহভাগ আয়াত তার পাঁচ বছর আগে পঞ্চম হিজরীতে অবতীর্ণ হয়েছে, যেমন তায়াম্মুমের আয়াত। এরপর জীবজন্তুর হালাল- হারামসংক্রান্ত আয়াত দুই বছর পর খায়বার যুদ্ধের পর নাজিল হয়েছে। একইভাবে সূরা বাকারার শেষ দিকের আয়াতগুলো মক্কায় থাকা অবস্থায় মেরাজের সময় নাজিল হয়েছে। আর অবশিষ্ট পুরা সূরা মদীনায় নাজিল হয়েছে। আবার সূরা আলাকের শুরুর কয়েকটি আয়াত প্রথম ওহীরূপে নাজিল হয়েছিল। কিন্তু সূরার শেষ দিকে নামায থেকে বিরত থাকার আয়াতগুলো বহু পরে নাজিল হয়েছে। একইভাবে লক্ষ্য করুন, সূরা নিসা ও সূরা তালাক খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ। অথচ উভয়ের অবতরণের মধ্যে বহু বছরের ব্যবধান রয়েছে। আবার সূরা আনফাল ও সূরা তাওবার মাঝের সম্পর্ক এতটাই সুদৃঢ় যে হযরত উসমান রাযি. উভয় সূরার মাঝে بسم الله الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ পর্যন্ত উঠিয়ে দিয়েছেন। অথচ সূরা আনফালে আলোচনা করা হয়েছে দ্বিতীয় হিজরীতে সংঘটিত বদর যুদ্ধের ঘটনা। আর সূরা তাওবায় আলোচনা করা হয়েছে মক্কা-বিজয়ের পরবর্তী নবম হিজরীর ঘটনা।
যাই হোক, সূরা নাজম নববী পঞ্চম বর্ষে অবতীর্ণ হয়েছে এই কথাটাও সঠিক নয়। কারণ এই সূরায় মেরাজের বিভিন্ন ঘটনা ও দৃশ্যের বিবরণ রয়েছে। আর মেরাজ হয়েছে নববী একাদশ বর্ষে। তো একাদশ বর্ষের ঘটনা পঞ্চম বর্ষে অবতীর্ণ সূরায় কীভাবে প্রবেশ করতে পারে?
তৃতীয় কথা হলো, মৌলভি সাহেব বলেছেন, এটা সূরা কমারের আয়াত, আর সূরা কমারে শাক্কুল কমারের ঘটনা বর্ণিত আছে। আর এটা সুস্পষ্ট যে, শাক্কুল কমার ইসলামের শুরুর যুগের ঘটনা। কারণ পরবর্তীতে সপ্তম বর্ষে নবীজী অবরোধের শিকার হয়েছিলেন।
এখানেও একই কথা। সূরা কমারের একটি আয়াত নির্দিষ্ট কোনো সময়ে নাজিল হওয়া পুরো সূরা ওই সময় অবতীর্ণ হওয়ার দলিল হতে পারে না। তা ছাড়া, শাক্কুল কমারের মুজিযাকে শুধু এই কারণে ইসলামের শুরুর যুগের ঘটনা বানানোও ঠিক নয় যে, আল্লাহর নবী সপ্তম বর্ষে অবরোধের শিকার হয়েছিলেন। কারণ অবরোধের পর নুবওয়াতের নবম বর্ষ থেকে একাদশ বর্ষ পর্যন্ত এই মুজিযা দেখানোর পথে কোনো বাধা ছিল না, সুতরাং ৫ম/৬ষ্ঠ বর্ষে না দেখিয়ে থাকলে আর দেখাতে পারবেন না এর তো কোনো প্রমাণ নেই। তা ছাড়া, অবরোধের সময় বের হতে কোনো বাধা ছিল না; নিষেধাজ্ঞা ছিল বেচাকেনা, লেনদেন ও সম্পর্ক স্থাপন বা উন্নয়নের ক্ষেত্রে। সুতরাং অবরোধের অবস্থায় যে কোনো সময় বের হয়ে মুজিযা দেখানোটা অসম্ভব কিছু নয়। তা ছাড়া, শাক্কুল কমারের মুজিয়ার তারিখ সম্পর্কে বহু মুহাদ্দিস ও অসংখ্য ঐতিহাসিক মত দিয়েছেন যে, সেটা নবুওয়াতের দশম বছরের ঘটনা। তবে সমস্যায় পড়েছে আমাদের স্বনামধন্য লাহোরি সাহেব। কারণ ইতিহাসবিদরা বলেছেন, 'এটা হিজরতপূর্ব পঞ্চম বর্ষের ঘটনা', কিন্তু মাওলানা সাহেব সেটা বুঝে উঠতে পারেননি। তিনি হিজরতপূর্ব পঞ্চম বর্ষ আর নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। অথচ উভয়ের মাঝে প্রায় ছয় বছরের বিশাল ফারাক। কারণ হিজরতপূর্ব পঞ্চম বর্ষ মানেই হলো নবুওয়াতের দশম বছর।
তো এই হিসাব অনুযায়ী হিজরতের দশম বছর হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স পূর্ণ পাঁচ বছর অথবা পাঁচ বছর পূর্ণ হয়ে ছয় বছরে পড়েছিল। আর এই বয়সে এক দুই আয়াত মুখস্থ রাখা, বিশেষত স্বভাবজাত প্রখর মেধা ও আল্লাহপ্রদত্ত বিরল প্রতিভার অধিকারী হযরত আয়েশা রাযি.-এর পক্ষে এটা খুবই সাধারণ একটি ঘটনা।
খোলাসা কথা: এই হাদীস দ্বারা সূরা কমার নববী পঞ্চম বা ষষ্ঠ বর্ষে অবতীর্ণ হওয়া প্রমাণ করা কখনোই সম্ভব নয়। সুতরাং মৌলভি সাহেব 'যদি-যেহেতু ও তবে-সেহেতু'-র যে দীর্ঘ জাল বুনেছিলেন কোনোটাই আর ধোপে টিকছে না। সুতরাং এ পন্থায় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স বেশি প্রমাণিত করার সর্বশেষ চেষ্টাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো。

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 আরব-সমাজে বাল্যবিবাহের প্রথা

📄 আরব-সমাজে বাল্যবিবাহের প্রথা


মৌলভি সাহেবের সর্বশেষ দলিল এই যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহের আলোচনার আগে জুবায়ের ইবনে মুতইম রাযি.-এর ঘরে তাঁর বিবাহের কথা হয়েছিল। আরবসমাজে ৪/৫ বছর বয়সের বাচ্চা মেয়েদের বিবাহের প্রচলন ছিল না। সুতরাং নবীর সঙ্গে বিবাহের আগেই অন্য জায়গায় বিবাহের আলোচনা হওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, বিবাহের আগে তাঁর বয়স এই পরিমাণ হয়েছিল, যেই বয়সে বিবাহের আলাপ-আলোচনা শুরু হয়ে যায়।
এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য হলো, আরবসমাজে শুধু বাল্যবিবাহ নয়, বরং দুগ্ধপোষ্য এমনকি গর্ভজাত সন্তানের বিবাহেরও প্রচলন ছিল। যার সুস্পষ্ট প্রমাণ হচ্ছে আবু দাউদ শরীফের কিতাবুন নিকাহ, বাবু তাযবিজি মান লাম ইউলাদ, তথা জন্মপূর্ব ভ্রূণের বিবাহ-প্রসঙ্গ। এখন মৌলভি সাহেব আরবসমাজ বলতে কী বুঝিয়েছেন, ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগ, না ইসলামের যুগ তা এখানে স্পষ্ট করেননি। যদি জাহেলি যুগ বুঝিয়ে থাকেন, তা হলে সেটা হবে ভিত্তিহীন দাবি। কারণ জাহেলি যুগের কোনো ইতিহাসই বিশুদ্ধ সূত্রে সংরক্ষিত নেই; সুতরাং কীসের ভিত্তিতে তিনি এই দাবি করবেন। আর যদি ইসলামের যুগ বুঝিয়ে থাকেন, তা হলে দেখুন তার এ দাবিও কতটা বাস্তবানুগ—
(১) হযরত কুদামা ইবনে মাযউন রাযি. যুবায়ের রাযি.-এর নবজাতক কন্যার সঙ্গে তার জন্মের দিনই বিবাহ পড়ান। (মোল্লা আলী কারী প্রণীত মিরকাত, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪১৭)
(২) স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উম্মে সালামার অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান সালামাকে সাইয়্যেদুশ শুহাদা হযরত হামযা রাযি.-এর কন্যার সঙ্গে বিবাহ পড়িয়ে দেন।
(৩) এমনকি, খোদ মাওলানা সাহেব নিজেও এতটুকু স্বীকার করেছেন যে, বিবাহের সময় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স এগারো বছর ছিল। আর এই বয়সকে তো প্রাপ্তবয়স্কতার বয়স বলা যায় না।
(৪) বাইহাকী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ আলাল বাইহাকীর প্রথম খণ্ডের ৭৬-৭৯ পৃষ্ঠায় দীর্ঘ আলোচনার পর মুসান্নিফ লিখেছেন-
وَ تَزْوِيجُ غَيْرِ وَاحِدٍ مِّنَ الصَّحَابَةِ ابْنَتَهُ الصَّغِيرَةَ
অর্থ: একাধিক সাহাবা কর্তৃক নিজ নিজ শিশুকন্যাকে বিবাহ দেওয়ার ঘটনা প্রমাণিত আছে।
সর্বসম্মতিক্রমে, কোনোরকম মতভেদ-মতপার্থক্য ছাড়া, সাহাবা, তাবেঈ, আইম্মায়ে মুজতাহিদিন, মুহাদ্দিসীন সকলের নিকট পিতা এই অধিকার রাখেন যে, তিনি চাইলে তার নাবালেগ শিশুকে বিবাহ দিতে পারেন। এরকম একটি সর্বসম্মত মাসআলায় হঠাৎ করে কেন দ্বিমত পোষণ করতে হবে, জানি না।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 আলোচনার সারকথা

📄 আলোচনার সারকথা


আমার আলোচনা ও দাবির মূলকথা এই যে, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনাসমূহের আলোকে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহ হয় ছয় বছর বয়সে। এই বর্ণনাগুলোর সঙ্গে একটু ভিন্নতাসহ যে দু-একটি ব্যতিক্রমী বর্ণনা এসেছে, তাও যৌক্তিকভাবেই সমন্বয়যোগ্য। আর তিনি যে নয় বছর বয়সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সান্নিধ্যে এসেছেন, তা নিয়ে একটিও ভিন্নমত বা ভিন্নবর্ণনা নেই। হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স-সংশ্লিষ্ট সবগুলো বর্ণনাকে একত্রিত ও সমন্বিত করলে যা পাই, তাতে তাঁর জন্ম হয়েছে নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষের শেষের দিকে। নবুওয়াতের একাদশ বর্ষে শাওয়াল মাসে বিবাহ হয় এবং হিজরতের প্রথম বর্ষে শাওয়াল মাসে রোখসত হয়।
মাওলানা মুহাম্মাদ আলী সাহেব 'পয়গামে সুলহ: জুলাই, ১৯২৮' সংখ্যায় লিখেছিলেন-নির্ভরযোগ্য বর্ণনাসমূহের আলোকে জানা যায়, হযরত আয়েশা রাযি. বড় বোন হযরত আসমা রাযি.-এর চেয়ে দশ বছরের ছোট ছিলেন। এই বিবেচনায়, হিজরতের এক বছর পূর্বে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিবাহ করেন, তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ষোলো বছর।
আমি মাআরিফে মাওলানা মুহাম্মাদ আলী সাহেবের বক্তব্যের সমালোচনা করেছিলাম। বেশ কিছু আপত্তি উত্থাপনের পর জানতে চেয়েছিলাম, আপনার নির্ভরযোগ্য বর্ণনাগুলোর মধ্য থেকে একটি বর্ণনাও কি প্রমাণ করে যে:
১. তিনি হযরত আসমা রাযি.-এর চেয়ে দশ বছরের ছোট ছিলেন?
২. হিজরতের এক বছর পূর্বে তাঁর বিবাহ হয়েছিল?
৩. এবং হিজরতের এক বছর পূর্বে তাঁর বয়স ষোলো বছর ছিল (এবং রোখসতের সময় আঠারো বছর ছিল)?
প্রায় চার মাস পর 'বন্ধুমহলের খুবই জোরাজুরিতে' ২৭ নভেম্বর পয়গামে সুলহে মাওলানা মুহাম্মাদ আলী সাহেব প্রতিউত্তরে একটি প্রবন্ধ লেখেন। তাতে পূর্বোক্ত দাবিগুলো প্রত্যাহার করত স্পষ্টত উল্লেখ করেন যে:
• এমন কোনো হাদীস তিনি পাননি, যাতে প্রমাণিত হয় যে, হযরত আয়েশা রাযি. হযরত আসমা রাযি.-এর চেয়ে দশ বছরের ছোট ছিলেন।
• বিবাহের সময় যে তাঁর বয়স ষোলো বছর ছিল, তা সঠিক নয়।
• তিনি এও স্বীকার করেছেন যে, বিবাহ যে হিজরতের এক বছর পূর্বে হয়েছিল, এমন কথাটা ভুলবশত লেখা হয়ে গেছে।
এভাবে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বিষয়গুলো উল্লেখ করার পর তিনি পুনরায় নতুন সুরে নতুন কিছু দাবি তুলেছেন। সেগুলো এই:
১. হযরত আয়েশা রাযি. নিজের বয়স বলতে ভুল করেছেন।
২. বিবাহের সময় (নবুওয়াতের দশম বর্ষে) তাঁর বয়স এগারো বছরের কম ছিল না।
৩. রোখসতের সময় তাঁর বয়স ষোলো বছরের কম ছিল না।
ইনসাফের সঙ্গে একটু ভাবুন-একজন হযরত আয়েশা রাযি. ভুল করলেন, তাই হাদীসবিশারদগণ, ইতিহাসবেত্তাগণ সকলে ভুল করলেন! একসঙ্গে ভুল করলেন! একইভাবে ভুল করলেন! আবার যেই মানুষটির স্মৃতিশক্তির প্রখরতা এত বেশি যে, মেধা-প্রতিভায় এবং স্মৃতিশক্তির প্রখরতায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বিশিষ্টতা লাভ করলেন, হাদীসের জগতে সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারীর সম্মানে ভূষিত হলেন, সেই মানুষটিই স্বয়ং নিজের বয়সের ব্যাপারে এত বেশি ভুল করবেন যে, নিজের এগারো বছর বয়সের বিবাহকে ছয় বছরের; ষোলো বছরের রোখসতকে নয় বছরের; এমন কি, পঁচিশ বছরের বৈধব্যকে আঠারো বছরের বলে দেবেন? বড়ই অদ্ভুত!
রোখসতের সময় হযরত আয়েশা রাযি. দোলনায় দোল খাচ্ছিলেন। সখীদের সঙ্গে খেলা থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো তাঁকে। মা হাত-মুখ ধুয়ে দিলেন, মাথার চুল আঁচড়ে দিলেন। ছোট ছোট বাচ্চারা সঙ্গে ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে এসেও একদম পুতুলখেলা। সবই এসেছে বিশদাকারে বিশুদ্ধ গ্রন্থসমূহে, বিশুদ্ধ সূত্র ধরে। এগুলো কি নয় বছরের কোমলমতি শিশুর আচরণ, না ষোলো বছরের ভরাযৌবনা নারীর আচরণ? স্বয়ং বিচার করুন। (মুসনাদে তয়ালিসি, ২০৫ পৃষ্ঠা; এবং দারিমি ২৯৬ পৃষ্ঠা)
ইফকের ঘটনা পঞ্চম হিজরী সনের। সে সময় তিনি, সকল মুহাদ্দিস ও মুআররীখের দৃষ্টিতে ছিলেন বারো কি তেরো বছরের মেয়ে। কিন্তু মাওলানা মুহাম্মাদ আলী সাহেবের দৃষ্টিতে তাঁর বয়স তখন উনিশ বছর হওয়ার কথা। অথচ, সহীহ বুখারীতে দেখা যায়, ইফকের ঘটনা প্রসঙ্গে একটি বর্ণনায় তাঁর আজাদকৃত দাসী হযরত বারীরাহ রাযি. এবং আরেকটি বর্ণনায় তিনি নিজে নিজের ব্যাপারে বলছেন-'জারিয়াতুন হাদীসাতুস সিন': 'উঠতি বয়সী বালিকা'। যারা আরবী জানেন, তাদের প্রত্যেকের কাছে প্রশ্ন- 'জারিয়াতুন হাদীসাতুস সিন' কথাটি কার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? বারো-তেরো বছরের বালিকা, নাকি উনিশ বছরের যুবতী? তা ছাড়া, হযরত আয়েশা রাযি. বলেন-
وَ أَنَا جَارِيَةٌ حَدِيثَةُ السِّنِّ ، لَا أَقْرَأُ كَثِيْرًا مِّنَ الْقُرْآنِ
অর্থ: তখন আমার বয়স ছিল অল্প; কুরআন তেমন পড়িনি। [সহীহ বুখারী, ২/৯৪২/২৫১৮ বাব তাদিলুন্ নিসাউ বা'দুহুম বা'দা
এখন চিন্তা করুন, কুরআন তেমন না পড়ার অজুহাতটা সিদ্দীক ও নবীপরিবারে-বিশেষত হযরত আয়েশা রাযি.-এর মতো ব্যক্তিত্বের শানে-কোন বয়সের মেয়ের মুখে মানায়? বারো-তেরো বছরের ছোট্ট মেয়ের মুখে, না উনিশ বছরের ভরাট যুবতীর মুখে?
সবশেষে-সহীহ বুখারী (৫৫১ পৃষ্ঠা), সহীহ মুসলিম (কিতাবুন নিকাহ) ও সুনানে দারিমী (২৯৩ পৃষ্ঠা)-এর বর্ণনার আলোকে হযরত আয়েশা রাযি.-এর জবানিতে তাঁর রোখসতের পুরো চিত্রটি শুনিয়ে আলোচনার ইতি টানতে চাইছি, হযরত আয়েশা রাযি. বলেন-
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম আমাকে যখন বিবাহ করেছেন তখন আমার বয়স ছিল ছয় বছর। এরপর আমরা মদীনায় আসি। বনু হারেসের মহল্লায় অবতরণ করি। কিছুকালের মধ্যেই আমি অসুস্থ হই। রোগে আমার মাথার চুল পড়ে গিয়েছিল। একটু-আধটু চুল গজাতেই একদিন মা এলেন। আমি তখন দোলনায় খেলছিলাম। আমার সঙ্গে আমার খেলার সখীরা ছিল। মা চেঁচিয়ে আমাকে ডাক দিলেন। আমি ছুটে এলাম। আমি বুঝতেই পারিনি, তিনি কী চাইছিলেন। তিনি আমার হাত ধরলেন এবং দরজায় সোজা দাঁড় করালেন। আমার খুব জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছিল (সম্ভবত খেলতে খেলতে দৌড়ে আসার কারণে)। একটু জিরিয়ে নিতেই মা সামান্য পানি নিয়ে আমার মাথা-মুখ ধুয়ে দিলেন। এরপর ঘরের ভেতর নিয়ে গেলেন। দেখলাম, ভেতরে কয়েকজন আনসারি মহিলা বসা। তারা আমাকে দেখেই মোবারকবাদ জানালেন। মা আমাকে তাদের হাতে তুলে দিলেন। তারা আমাকে ঠিকঠাক করে নিচ্ছিলেন। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আসতে দেখে আমি চমকে গেলাম। তারা আমাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সোপর্দ করলেন। তখন আমার বয়স ছিল নয় বছর।'
ভাবুন তো, এই যে চিত্রটি ফুটে উঠেছে, এতে সিদ্দীক-পরিবারের কনের যে আচরণ ও অবস্থা দেখা যাচ্ছে, তা কি কোনো ষোলো বছরের মেয়ের হতে পারে, না নয় বছরের মেয়ের হতে পারে? আবার যে নারী নিজের রোখসত সম্পর্কে এত কিছু মনে রেখেছেন, তিনি নিজের বয়সটাই এভাবে ভুলে গেলেন? কোনোরকম দ্বিধা ছাড়া, সংশয় ছাড়া যার তার কাছে-সারা জীবন-রোখসতের সময় নিজের বয়সটা কত ছিল, সেটা বলতেই ভুল করলেন? খুবই আশ্চর্যের!
শুধু কি তাই? রোখসতের সময় তাঁর বয়স যে নয় বছর ছিল, সে ব্যাপারে তিনি এতটাই নিশ্চিত যে, আরব মেয়েদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সীমানাও নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন-নয় বছর। তিনি বলেন,
إِذَا بَلَغَتِ الْجَارِيَةُ تِسْعَ سِنِينَ فَهِيَ امْرَأَةٌ
অর্থ: মেয়ে যখন নয় বছরে উপনীত হয়, তখন সে মহিলা হয়ে যায়। [তিরমিযী : كتاب النکاح
এত কিছুর পরও কি এ কথা বলা উচিত হবে যে, বিবাহের সময় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স ছিল বারো-তেরো বছর অথবা ষোলো- সতেরো বছর? [মাআরিফ, জানুয়ারি, ১৯২৯]
وَمَا عَلَيْنَا إِلَّا الْبَلَاغُ
সমাপ্ত

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00