📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 হযরত আবু বকর রাযি.-এর হিজরত প্রসঙ্গ

📄 হযরত আবু বকর রাযি.-এর হিজরত প্রসঙ্গ


মৌলভি সাহেব হযরত আবু বকর রাযি.-এর হিজরত-সংক্রান্ত হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে, হযরত আয়েশা রাযি.-এর জন্ম নবুওয়াতের প্রথম বছর কিংবা তারও আগে। কারণ তিনি দেখাতে চেষ্টা করেছেন যে, আবু বকর রাযি.-এর ওই হিজরত (হাবশার উদ্দেশে) প্রথম হিজরত ছিল। আর তখন আয়েশা রাযি. বুদ্ধিসম্পন্ন হয়েছিলেন। আর পাঁচ-ছয় বছরের কমে তো আর মানুষের হুঁশ-বুদ্ধি হয় না। সুতরাং নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষে প্রথম হিজরতের সময় আয়েশা রাযি. পাঁচ-ছয় বছর বয়স হওয়ার জন্য তাঁর জন্ম নবুওয়াতের প্রথম বছর বা তারও আগে হতে হবে।
দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, হাদীসের তরজমা- لَمْ أَعْقِلْ أَبَوَيَّ قَطُّ إِلَّا وَهُمَ يَدِيْنَانِ الدِّيْنَ এই অংশের তরজমা মাওলানা সাহেব নিজের মতলব হাসিলের জন্য এভাবে করেছেন- যখন থেকে আমার বুদ্ধি হয়েছে তখন থেকেই আমি আমার মা-বাবাকে দীন-ইসলামের ওপর দেখছি। অথচ এ অংশের বিশুদ্ধ তরজমা হলো-আমি আমার মা-বাবাকে যখন থেকে চিনতে শুরু করেছি, তখন থেকেই তাদেরকে ইসলামের ওপর দেখেছি।' অর্থাৎ أَعْقِلُ এর আসল তরজমা এড়িয়ে তিনি তার জন্য সুবিধাজনক তরজমা করেছেন। অথচ উভয়ের মধ্যে আসমান-জমিনের তফাত। কারণ চেনার জন্য পাঁচ-ছয় বছর বয়স জরুরি নয়; কিন্তু বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়ার জন্য সেটা অপরিহার্য।
এখন আমরা হযরত আবু বকর রাযি.-এর হিজরতের হাদীস সম্পর্কে অতিগুরুত্বপূর্ণ তবে খুবই সূক্ষ্ম একটি পর্যালোচনা পেশ করব।
প্রথমেই আমরা যে বিষয়টি পাঠকের সামনে স্পষ্ট করা জরুরি মনে করছি তা এই যে, জনান লাহোরি সাহেব হিজরতের এই হাদীসটিকে আমাদের বিপক্ষে দলিল হিসাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন-হাদীসের তারতীব অর্থাৎ বর্ণনার ধারাবাহিকতাকে পুঁজি করে। কারণ মূল হাদীসটি কখনোই আমাদের বিপক্ষে যাবে না। হাদীসের বক্তব্যের পরিবর্তে হাদীসের তারতীব বা ধারাবাহিকতাকেই তিনি গ্রহণ করেছেন হাতিয়ার হিসাবে। তিনি বলতে চাচ্ছেন, হাদীসটি যে তারতীবে আছে অর্থাৎ :
لَمْ أَعْقِلْ أَبَوَي قَطُّ إِلَّا وَهُمَا يَدِيْنِانِ الدِّيْنَ وَ لَمْ يَمُرَّ عَلَيْنَا يَوْمٌ إِلَّا يَأْتِيْنَا فِيْهِ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ طَرَفِي النَّهَارِ بُكْرَةً وَ عَشِيَّةً فَلَمَّا ابْتُلِيَ الْمُسْلِمُوْنَ خَرَجَ أَبُو بَكْرٍ نَحْوَ أَرْضِ الْحَبَشَةِ .
এই তারতীব এটা প্রমাণ করে যে, যখন নবীজী আবু বকর রাযি.-এর বাড়িতে সকাল-সন্ধ্যা আসতেন এবং যখন আবু বকর রাযি. হাবশার উদ্দেশে হিজরত করেন, তখন আয়েশা রাযি.-এর হুঁশ-বুদ্ধি হয়েছে। অর্থাৎ পঞ্চম নববী বর্ষে আবু বকর রাযি. হিজরতের সময় আয়েশা রাযি.- এর পাঁচ-ছয় বছর বয়স হয়েছিল। এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য হলো, এই হাদীসের রাবী হচ্ছেন, ইবনে শিহাব যুহরী, যার অভ্যাস হলো ভিন্ন-ভিন্ন সময়ের ভিন্ন-ভিন্ন ঘটনাকে একসঙ্গে একই সূত্রে ধারাবাহিকভাবে বলে যাওয়া। এর অসংখ্য নজির রয়েছে। যেমন, ওহী সূচনার হাদীস, ইফকের ঘটনার হাদীস। এই হাদীসটিও এর ব্যতিক্রম না। কারণ এখানেও তিনি ভিন্ন-ভিন্ন চারটি ঘটনার টুকরো অংশকে জোড়া দিয়ে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। প্রথম অংশ ছোট্ট বয়স থেকেই মা-বাবাকে ইসলামের অনুসারীরূপে দেখতে ও চিনতে থাকা, দ্বিতীয় অংশ সকাল-সন্ধ্যা নবীজীর আসা-যাওয়া, তৃতীয় অংশ হযরত আবু বকর রাযি.-এর হাবশার উদ্দেশে হিজরত করা, চতুর্থ অংশ মদীনার উদ্দেশে হিজরত। তো এ চারটি ঘটনা যে বিভিন্ন সময়ের তা প্রমাণ করার প্রয়োজন নেই। তবে মৌলভি সাহেব তার স্বভাব অনুযায়ী এখানে যেহেতু পূর্ণ হাদীস না এনে তার সুবিধার অংশটুকু এনেছেন তাই বাধ্য হয়ে পুরো হাদীসটিকে সহজ-সরল তরজমা আকারে এখানে তুলে ধরছি। এতে পাঠকের সামনে অনেক কিছু স্পষ্ট হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ:
'ইবনে শিহাব যুহরী থেকে বর্ণিত, উরওয়াহ ইবনে যুবায়ের বলেছেন, হযরত আয়েশা রাযি. তাকে বলেছেন, আমি যখন থেকে আমার মা- বাবাকে চিনতে শুরু করেছি তখন থেকেই তাঁদের ইসলামের ওপর দেখছি। আর এমন কোনো দিন যেত না, যেদিন সকাল-সন্ধ্যা নবীজী আমাদের এখানে আসতেন না। এরপর যখন মুসলমানদের ওপর বিপদাপদের তুফান শুরু হলো, তখন আবু বকর হাবশায় হিজরতের উদ্দেশে বের হলেন। যখন তিনি বারাকুল গিমাদ নামক স্থানে পৌঁছলেন, তখন কারা অঞ্চলের সরদার ইবনুদ্দাগিনার সঙ্গে আবু বকরের সাক্ষাৎ হলো। সে জিজ্ঞাসা করল, কোথায় চললেন আবু বকর? আবু বকর বললেন, আমার কওম আমাকে বের করে দিয়েছে। সে বলল, আপনি তো এমন ব্যক্তি, যাকে বের করে দেওয়া যায় না; কিংবা যিনি বের হয়ে যেতে পারেন না। আপনি গরিবকে সাহায্য করেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলেন, আত্মীয়দের হক আদায় করেন, মেহমানদারি করেন, করজ দান করেন, বিপদাপদে সবাইকে সাহায্য করেন; সুতরাং আপনার মতো মহান ব্যক্তিকে বের করে দেওয়া যায় না এবং আপনার মতো ব্যক্তি বের হয়ে যেতে পারেন না। তিনি ফিরে আসতে সম্মত হলেন। তখন ইবনুদ্দাগিনা তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন এবং সন্ধ্যায় কুরাইশ-সরদারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঘুরে বললেন, আবু বকর এমন ব্যক্তি যাঁকে বের করা যায় না। তার (উপরোল্লিখিত) এ সকল গুণ রয়েছে। তখন কুরাইশ-সরদাররা ইবনুদ্দাগিনার আশ্রয়দানকে প্রত্যাখ্যান করতে না পেরে এই আরজি পেশ করল, আবু বকর যেন নিজের ঘরের মধ্যে তাঁর রবের বন্দেগী করে। ঘরের অভ্যন্তরে নামায-তেলাওয়াত যা ইচ্ছা করে; কোনো কিছুই যেন প্রকাশ্যে না করে। কারণ আমাদের স্ত্রী-সন্তানদের ব্যাপারে ধর্মচ্যুতির আশঙ্কা করি। ইবনুদ্দাগিনা আবু বকরকে শর্তটি শোনানোর পর তিনি সম্মত হলেন এবং শর্তমতো নামায-তেলাওয়াত সবকিছু ঘরের মধ্যে গোপনে করতেন।
কিছুকাল পর হযরত আবু বকরের মনের অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেল। তিনি বাড়ির আঙিনায় একটি নামাযের জায়গা ঠিক করলেন এবং সেখানেই নামায-তেলাওয়াত আরম্ভ করলেন। তখন মুশরিকদের স্ত্রী-সন্তানরা তাঁর প্রতি ঝুঁকে পড়তে লাগল। তারা অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকত। আর আবু বকর যখন তেলাওয়াত করতেন তখন তাঁর চোখ থেকে অঝোরে অশ্রু ঝরত। তিনি কান্না সংবরণ করতে পারতেন না।
এ অবস্থা দেখে কুরাইশ-সরদাররা ঘাবড়ে গিয়ে ইবনুদ্দাগিনাকে ডেকে পাঠাল এবং তাকে বলল, আমরা আপনার আশ্রয়দানকে সম্মান করে তাঁর নিজের ঘরে গোপনে বন্দেগী করার শর্তে আশ্রয় দিয়েছিলাম। কিন্তু সে তাঁর সীমা লঙ্ঘন করে বাড়ির আঙিনায় মসজিদ বানিয়েছে। সেখানে প্রকাশ্যে ইবাদত-বন্দেগী করছে। ফলে আমরা স্ত্রী-সন্তানদের ব্যাপারে শঙ্কিত। এখন আপনি তাঁকে বারণ করুন। অন্যথায় আশ্রয়দান প্রত্যাহার করুন এবং তাঁকে তাঁর নিজের জিম্মায় ছেড়ে দিন। কারণ আমরা যেমন আপনার নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করতে চাই না, ঠিক তেমনি আবু বকরকেও স্বাধীনতা দিতে পারি না। আয়েশা রাযি. বলেন, এরপর ইবনুদ্দাগিনা আবু বকরের কাছে এসে বললেন, আপনি জানেন, আমি কী শর্তে আপনাকে নিরাপত্তা দিয়েছিলাম। এখন হয় আপনি শর্ত মেনে চলুন, না হয় আমার দেওয়া নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিন।
তখন আবু বকর বললেন, আপনার নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিলাম। আমার আল্লাহর নিরাপত্তাই আমার জন্য যথেষ্ট। এ সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায়ই ছিলেন। একদিন নবীজী বললেন, তোমাদের হিজরতের স্থান আমাকে স্বপ্নে দেখানো হয়েছে, বিশিষ্ট দুই পাহাড়ের মাঝখানের ভূমি; (অর্থাৎ) মদীনা। এরপর যেসব সাহাবী হাবশায় হিজরত করেছিলেন, তারা মদীনায় ফিরে এলেন। তখন হযরত আবু বকরও মদীনার উদ্দেশে হিজরতের প্রস্তুতি নিলেন। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, একটু অপেক্ষা করো। আশা করছি আমাকেও অনুমতি দেওয়া হবে। তখন আবু বকর রাযি. নবীজীর সোহবত অর্থাৎ হিজরতের সফরসঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য-লাভের উদ্দেশ্যে বিরত হলেন এবং দুটো উটনী খরিদ করে চার মাস পর্যন্ত গাছের পাতা পেড়ে খাওয়াতে থাকলেন।
ইবনে শিহাব বলেন, উরওয়াহ বলেছেন যে, হযরত আয়েশা রাযি. তাকে বলেছেন, আমরা একদিন ঠিক দুপুরে আবু বকরের ঘরে বসা ছিলাম। এমন সময় কেউ একজন বলে উঠল ওই যে আল্লাহর রাসূল চাদরে মুখ ঢেকে আসছেন। সাধারণত এমন সময় হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনোই আসতেন না। আবু বকর বললেন, আপনার প্রতি আমার মা-বাবা কোরবান হোক। আল্লাহর কসম, নিঃসন্দেহে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই এমন সময় আপনাকে এখানে এনেছে। নবীজী বললেন, তোমার কাছে যারা আছে, সবাইকে সরিয়ে দাও। তিনি বললেন, আমার মা-বাবা কোরবান হোক, এখানে আপনার স্ত্রী ছাড়া আর কেউ নেই। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের ইজাজতের কথা শোনালেন। হযরত আসমা ও আয়েশা রাযি. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাথেয় প্রস্তুত করে দিলেন।...'
আশা করি, বিজ্ঞ পাঠক বুঝতে পেরেছেন, মাওলানা লাহোরি সাহেব হাদীসের যে অংশটুকু উল্লেখ করেছেন, তা বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত খণ্ড ঘটনা। যেমন মা-বাবাকে ইসলামের অনুসারীরূপে চিনতে পারা পৃথক একটি ঘটনা। সকাল-সন্ধ্যা নবীজীর আসা-যাওয়ার সম্পর্কে মদীনায় হিজরতের সঙ্গে-যা ভিন্ন সময়ে সংঘটিত। মাঝে হাবশায় হিজরতের আলোচনা, এটাও ভিন্ন সময়ের ঘটনা। অবশেষে মদীনায় হিজরতের বিবরণ। তো হাবশায় হিজরতের ঘটনা দুইবার ঘটেছিল, যদি এটা প্রথম হিজরতের ঘটনা হয়ে থাকে, তা হলে সেটা হবে নববী পঞ্চম বর্ষের ঘটনা। পারিপার্শ্বিক আলোচনা থেকে বোঝা যায়, এটা দ্বিতীয় বারের অর্থাৎ নবম বর্ষের ঘটনা, পক্ষান্তরে মদীনায় হিজরত নবুওয়াতের চৌদ্দতম বছরের ঘটনা। তো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিবেশে সংঘটিত ঘটনাকে অভিন্ন ও ধারাবাহিক ঘটনার রূপ দিয়ে হযরত আয়েশা রাযি.-এর জন্মসন ও বিবাহের বয়স নির্ণয় করা কতটা যুক্তিসঙ্গত ও ন্যায়ানুগ?
তদুপরি এটা যদি মেনে নেওয়াও হয় যে, যুহরী বর্ণিত হাদীসের সবগুলো ঘটনা পরস্পর-সংযুক্ত ধারাবাহিক ঘটনা, তা হলে এটা বলতেই হবে যে, এগুলো নবুওয়াতের নবম বর্ষের ঘটনা। এখন দুই মতের কোনো একটা গ্রহণ করতে হবে। হয় বলতে হবে এগুলো বিচ্ছিন্ন সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা, না হয় বলতে হবে অভিন্ন সময়ে বা কাছাকাছি সময়ে সংঘটিত ধারাবাহিক ঘটনা। কিন্তু মৌলভি সাহেব কোনোভাবেই নিজের মত সাব্যস্ত করতে না পেরে তৃতীয় পন্থা আবিষ্কার করেছেন।
তিনি হাদীসের প্রথম ও তৃতীয় অংশকে নববী পঞ্চম বর্ষের ঘটনা আখ্যায়িত করেছেন। আর দ্বিতীয় ও চতুর্থ অংশকে নবুওয়াতের চতুর্দশ বর্ষের ঘটনা সাব্যস্ত করেছেন এবং দুই ঘটনার মাঝখানে আট-নয় বছরের ব্যবধান মেনে নিয়েছেন। যা হাদীসের শব্দ ও মর্ম কোনোটা থেকেই প্রতীয়মান হয় না। এখন দেখার বিষয় হলো, এই ঘটনাগুলোর ভিন্নতা ও অভিন্নতা সম্পর্কে (অর্থাৎ এগুলো পরস্পর-সংযুক্ত ও ধারাবাহিক ঘটনা, নাকি বিচ্ছিন্ন সময়ে ঘটা বিক্ষিপ্ত ঘটনা, এ সম্পর্কে) সীরাতের গবেষক ও ঐতিহাসিকরা কী মত পোষণ করেন?
সীরাতের অনেক বড় আলেম, সীরাতে হালবির রচয়িতা আল্লামা বুরহানুদ্দীন হালবির মত হলো এগুলো পরস্পর-সংযুক্ত ধারাবাহিক ঘটনা যা নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বর্ষে সংঘটিত হয়েছিল। তার বক্তব্য-
وَ فِي السَّنَةِ الثَّالِثَةَ عَشَرَ مِنَ النُّبُوَّةِ كَانَتْ بَيْعَةُ الْعَقَبَةِ الثَّانِيَةِ. وَ فِي هَذِهِ السَّنَةِ أَرَادَ أَبُو بَكْرٍ أَنْ يُهَاجِرَ لِلْحَبَشَةِ فَلَمَّا بَلَغَ بَرْكَ الْغِمَادِ ... (ج / ٣ ص / ٤٠٦)
অর্থ: নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বর্ষে দ্বিতীয় আকাবার বাইআত সংঘটিত হয়েছে। আর এ বছরই আবু বকর হাবশায় হিজরতের উদ্দেশে বের হন। যখন তিনি বারকুল গিমাদে পৌঁছলেন... (৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪০৬; মিশরি নুসখা)
তারীখে খামিছ ফি আহওয়ালি আনফাসি নাফীস গ্রন্থের প্রণেতা বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ আল্লামা হুসাইন ইবনে আহমাদ নববী ত্রয়োদশ বর্ষের ইতিহাস লিখতে গিয়ে বলেন-
وَ فِي هَذِهِ السَّنَةِ هَاجَرَ أَبُو بَكْرٍ إِلَى الْحَبَشَةِ رُوِيَ لَمَّا ابْتُلِيَ الْمُسْلِمُوْنَ (ج/۱ ص / ۳۱۹)
অর্থ: এবং এ বছরই হযরত আবু বকর হাবশায় হিজরত করেন। বর্ণিত আছে যখন মুসলমানরা মুশরিকদের নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হলেন... (১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৩১৯)
সারকথা, যুহরী বর্ণিত হাদীসের সব ঘটনা যদি নববী ত্রয়োদশ বর্ষে বা কাছাকাছি সময়ে ঘটে, তা হলে হিসাব অনুযায়ী তখন হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স ৮/৯ বছর হবে। আর এ বয়সে বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া খুবই স্বাভাবিক। আশা করি, এই দীর্ঘ আলোচনার পর পাঠক এ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন যে, ইমাম যুহরী বর্ণিত হিজরতের হাদীস দ্বারা কোনোভাবেই এটা প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে, হযরত আয়েশা রাযি.-এর জন্ম নবুওয়াতের প্রথম বছর বা তারও আগে এবং নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষে তাঁর বয়স ৬/৭ বছর হয়েছিল। আর বিবাহ ও বাসরের সময় তাঁর বয়স যথাক্রমে বারো ও ষোলো বছর ছিল; বরং সঠিক তথ্য সেটাই যা হযরত আয়েশা রাযি. নিজেই বর্ণনা করেছেন একাধিক সহীহ সনদে বর্ণিত হাদীসে যে, তাঁর বিবাহ হয়েছে ছয় বছর বয়সে, বাসর হয়েছে নয় বছর বয়সে এবং স্বামী-বিয়োগ হয়েছে আঠারো বছর বয়সে।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 সূরা নাজম ও সূরা কমার প্রসঙ্গ

📄 সূরা নাজম ও সূরা কমার প্রসঙ্গ


হযরত আয়েশা (রাযি.) বলেছেন—
لَقَدْ أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَ إِنِّي لَجَارِيَةٌ أَلْعَبُ "بَلِ السَّاعَةُ مَوْعِدُهُمْ".
অর্থ: নিঃসন্দেহে যখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর এই আয়াত অবতীর্ণ হয়... بَلِ السَّاعَةُ مَوْعِدُهُمُ, তখন আমি ছিলাম এক বালিকা, খেলাধুলা করতাম। (সহীহ বুখারী: তাফসীর-সূরা কমার)
মৌলভি সাহেব বলেছেন, এই আয়াত সূরা কমারের। আর সূরা কমার মাক্কী জামানার শুরুর দিকে নাজিল হয়েছে। কারণ এই সূরায় চন্দ্র দ্বিখণ্ডিতকরণের আলোচনা রয়েছে। আর শাক্কুল কমার বা চন্দ্র দ্বিখণ্ডিতকরণের মুজিযা ইসলামের শুরুর যুগের ঘটনা। কারণ সপ্তম বর্ষে তো আল্লাহর নবী অবরোধের শিকার হয়েছিলেন। সুতরাং এটা অবরোধের আগে পঞ্চম বর্ষের ঘটনাই হবে। তা ছাড়া, সূরা নাজমের সঙ্গে সূরা কমারের অনেক মুনাসাবাত (মিল বা সাদৃশ্য) রয়েছে। তাই সূরা কমারও পঞ্চম বর্ষেই অবতীর্ণ হয়েছে। আর ওই সময় হযরত আয়েশা রাযি. ছোট বালিকা ছিলেন, খেলাধুলা করতেন, আবার বিভিন্ন আয়াত শুনে মুখস্থও রাখতেন। এই বিষয়গুলো এটাই প্রমাণ করে যে, নবুওয়াতের দশম বছর বিবাহের সময় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স ৬/৭ বছর নয়, বরং আরও বেশি (১০/১২) বছর ছিল।
কিন্তু জনাব লাহোরি সাহেব 'যদি, যেহেতু এবং তবে, সেহেতু'-র যে বিশাল সিরিয়াল লাগিয়েছেন এর পুরোটাই ভিত্তিহীন, মনগড়া। তার বক্তব্য অনেকটা মানতেকের সুগরা-কুবরার তারতীবের মতো। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তার বক্তব্য আরেকবার লক্ষ করুন—এই আয়াত সূরা কমারের, আর সূরা কমার সূরা নাজমের সদৃশ, আর সূরা নাজম পঞ্চম বর্ষে অবতীর্ণ, আর পঞ্চম বর্ষে হযরত আয়েশা রাযি.-এর আয়াত মুখস্থ রাখতে পারা তার ৫/৬ বছর বয়স হওয়ার প্রমাণ বহন করে। আর নববী পঞ্চম বর্ষে ৫/৬ বছর বয়স হওয়া দশম বছর বিবাহের সময় ১১/১২ বছর বয়স হওয়া প্রমাণ করে।
এখন আমাদের দেখতে হবে, যেসব 'হওয়া' বিষয় অন্যগুলোর 'হওয়া' প্রমাণ করছে সেগুলো আদৌ হয়েছিল কি না। এগুলোর কোনো একটা যদি না হয়ে থাকে তা হলে বাকিগুলোও হয়নি।
প্রথম কথা হলো, হাদীসে হযরত আয়েশা রাযি.-এর (সূরা কমারের) শুধু একটি আয়াত নাজিল হওয়া এবং তা ইয়াদ রাখার প্রসঙ্গ এসেছে, পূর্ণ সূরার আলোচনা এখানে আসেনি। আর কুরআন নাজিলের ক্ষেত্রে সাধারণত দেখা যায়, কখনো শুধু একটি আয়াত, কখনো কয়েকটি আয়াত, আবার কদাচিৎ পূর্ণ সূরা অবতীর্ণ; কখনো এমনও হয় একটি সূরা কয়েক বছর ধরে অল্প অল্প করে নাজিল হতে থাকে। তো এই হাদীস তখনই মৌলভি সাহেবের স্বপক্ষে দলিল হবে যখন পূর্ণ সূরা একসঙ্গে অবতীর্ণ হওয়া প্রমাণিত হবে। অথচ বাহ্যিকভাবে এটাই মনে হচ্ছে যে, পূর্ণ সূরা একসঙ্গে নাজিল হয়নি। কারণ, পূর্ণ সূরা নাজিল হলে হযরত আয়েশা রাযি. বলতেন, যখন সূরা কমার নাজিল হয় তখন আমি... অথচ তিনি বলছেন, যখন এই আয়াত নাজিল হলো...
উল্লেখ্য: হযরত আয়েশা রাযি. যে স্বভাবজাত প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন তাঁর জন্য একটি আয়াত ছোট্ট বয়সে ইয়াদ রাখা অসম্ভব নয়।
দ্বিতীয় কথা হলো, কোনো সূরার কিছু আয়াত এক সময় অবতীর্ণ হওয়া কিংবা কোনো সূরা অন্য সূরার সঙ্গে মুনাসাবাত থাকা এটা প্রমাণ করে না যে, ওই সূরার সব আয়াত বা উভয় সূরা একই সময় বা কাছাকাছি সময় অবতীর্ণ হয়েছে। যেমন সূরা মায়েদার الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ এই আয়াত দশম হিজরীর বিদায় হজের সময় অবতীর্ণ হয়েছে। অথচ মায়েদার সিংহভাগ আয়াত তার পাঁচ বছর আগে পঞ্চম হিজরীতে অবতীর্ণ হয়েছে, যেমন তায়াম্মুমের আয়াত। এরপর জীবজন্তুর হালাল- হারামসংক্রান্ত আয়াত দুই বছর পর খায়বার যুদ্ধের পর নাজিল হয়েছে। একইভাবে সূরা বাকারার শেষ দিকের আয়াতগুলো মক্কায় থাকা অবস্থায় মেরাজের সময় নাজিল হয়েছে। আর অবশিষ্ট পুরা সূরা মদীনায় নাজিল হয়েছে। আবার সূরা আলাকের শুরুর কয়েকটি আয়াত প্রথম ওহীরূপে নাজিল হয়েছিল। কিন্তু সূরার শেষ দিকে নামায থেকে বিরত থাকার আয়াতগুলো বহু পরে নাজিল হয়েছে। একইভাবে লক্ষ্য করুন, সূরা নিসা ও সূরা তালাক খুবই সাদৃশ্যপূর্ণ। অথচ উভয়ের অবতরণের মধ্যে বহু বছরের ব্যবধান রয়েছে। আবার সূরা আনফাল ও সূরা তাওবার মাঝের সম্পর্ক এতটাই সুদৃঢ় যে হযরত উসমান রাযি. উভয় সূরার মাঝে بسم الله الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ পর্যন্ত উঠিয়ে দিয়েছেন। অথচ সূরা আনফালে আলোচনা করা হয়েছে দ্বিতীয় হিজরীতে সংঘটিত বদর যুদ্ধের ঘটনা। আর সূরা তাওবায় আলোচনা করা হয়েছে মক্কা-বিজয়ের পরবর্তী নবম হিজরীর ঘটনা।
যাই হোক, সূরা নাজম নববী পঞ্চম বর্ষে অবতীর্ণ হয়েছে এই কথাটাও সঠিক নয়। কারণ এই সূরায় মেরাজের বিভিন্ন ঘটনা ও দৃশ্যের বিবরণ রয়েছে। আর মেরাজ হয়েছে নববী একাদশ বর্ষে। তো একাদশ বর্ষের ঘটনা পঞ্চম বর্ষে অবতীর্ণ সূরায় কীভাবে প্রবেশ করতে পারে?
তৃতীয় কথা হলো, মৌলভি সাহেব বলেছেন, এটা সূরা কমারের আয়াত, আর সূরা কমারে শাক্কুল কমারের ঘটনা বর্ণিত আছে। আর এটা সুস্পষ্ট যে, শাক্কুল কমার ইসলামের শুরুর যুগের ঘটনা। কারণ পরবর্তীতে সপ্তম বর্ষে নবীজী অবরোধের শিকার হয়েছিলেন।
এখানেও একই কথা। সূরা কমারের একটি আয়াত নির্দিষ্ট কোনো সময়ে নাজিল হওয়া পুরো সূরা ওই সময় অবতীর্ণ হওয়ার দলিল হতে পারে না। তা ছাড়া, শাক্কুল কমারের মুজিযাকে শুধু এই কারণে ইসলামের শুরুর যুগের ঘটনা বানানোও ঠিক নয় যে, আল্লাহর নবী সপ্তম বর্ষে অবরোধের শিকার হয়েছিলেন। কারণ অবরোধের পর নুবওয়াতের নবম বর্ষ থেকে একাদশ বর্ষ পর্যন্ত এই মুজিযা দেখানোর পথে কোনো বাধা ছিল না, সুতরাং ৫ম/৬ষ্ঠ বর্ষে না দেখিয়ে থাকলে আর দেখাতে পারবেন না এর তো কোনো প্রমাণ নেই। তা ছাড়া, অবরোধের সময় বের হতে কোনো বাধা ছিল না; নিষেধাজ্ঞা ছিল বেচাকেনা, লেনদেন ও সম্পর্ক স্থাপন বা উন্নয়নের ক্ষেত্রে। সুতরাং অবরোধের অবস্থায় যে কোনো সময় বের হয়ে মুজিযা দেখানোটা অসম্ভব কিছু নয়। তা ছাড়া, শাক্কুল কমারের মুজিয়ার তারিখ সম্পর্কে বহু মুহাদ্দিস ও অসংখ্য ঐতিহাসিক মত দিয়েছেন যে, সেটা নবুওয়াতের দশম বছরের ঘটনা। তবে সমস্যায় পড়েছে আমাদের স্বনামধন্য লাহোরি সাহেব। কারণ ইতিহাসবিদরা বলেছেন, 'এটা হিজরতপূর্ব পঞ্চম বর্ষের ঘটনা', কিন্তু মাওলানা সাহেব সেটা বুঝে উঠতে পারেননি। তিনি হিজরতপূর্ব পঞ্চম বর্ষ আর নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। অথচ উভয়ের মাঝে প্রায় ছয় বছরের বিশাল ফারাক। কারণ হিজরতপূর্ব পঞ্চম বর্ষ মানেই হলো নবুওয়াতের দশম বছর।
তো এই হিসাব অনুযায়ী হিজরতের দশম বছর হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স পূর্ণ পাঁচ বছর অথবা পাঁচ বছর পূর্ণ হয়ে ছয় বছরে পড়েছিল। আর এই বয়সে এক দুই আয়াত মুখস্থ রাখা, বিশেষত স্বভাবজাত প্রখর মেধা ও আল্লাহপ্রদত্ত বিরল প্রতিভার অধিকারী হযরত আয়েশা রাযি.-এর পক্ষে এটা খুবই সাধারণ একটি ঘটনা।
খোলাসা কথা: এই হাদীস দ্বারা সূরা কমার নববী পঞ্চম বা ষষ্ঠ বর্ষে অবতীর্ণ হওয়া প্রমাণ করা কখনোই সম্ভব নয়। সুতরাং মৌলভি সাহেব 'যদি-যেহেতু ও তবে-সেহেতু'-র যে দীর্ঘ জাল বুনেছিলেন কোনোটাই আর ধোপে টিকছে না। সুতরাং এ পন্থায় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স বেশি প্রমাণিত করার সর্বশেষ চেষ্টাও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো。

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 আরব-সমাজে বাল্যবিবাহের প্রথা

📄 আরব-সমাজে বাল্যবিবাহের প্রথা


মৌলভি সাহেবের সর্বশেষ দলিল এই যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহের আলোচনার আগে জুবায়ের ইবনে মুতইম রাযি.-এর ঘরে তাঁর বিবাহের কথা হয়েছিল। আরবসমাজে ৪/৫ বছর বয়সের বাচ্চা মেয়েদের বিবাহের প্রচলন ছিল না। সুতরাং নবীর সঙ্গে বিবাহের আগেই অন্য জায়গায় বিবাহের আলোচনা হওয়া এটাই প্রমাণ করে যে, বিবাহের আগে তাঁর বয়স এই পরিমাণ হয়েছিল, যেই বয়সে বিবাহের আলাপ-আলোচনা শুরু হয়ে যায়।
এ বিষয়ে আমাদের বক্তব্য হলো, আরবসমাজে শুধু বাল্যবিবাহ নয়, বরং দুগ্ধপোষ্য এমনকি গর্ভজাত সন্তানের বিবাহেরও প্রচলন ছিল। যার সুস্পষ্ট প্রমাণ হচ্ছে আবু দাউদ শরীফের কিতাবুন নিকাহ, বাবু তাযবিজি মান লাম ইউলাদ, তথা জন্মপূর্ব ভ্রূণের বিবাহ-প্রসঙ্গ। এখন মৌলভি সাহেব আরবসমাজ বলতে কী বুঝিয়েছেন, ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগ, না ইসলামের যুগ তা এখানে স্পষ্ট করেননি। যদি জাহেলি যুগ বুঝিয়ে থাকেন, তা হলে সেটা হবে ভিত্তিহীন দাবি। কারণ জাহেলি যুগের কোনো ইতিহাসই বিশুদ্ধ সূত্রে সংরক্ষিত নেই; সুতরাং কীসের ভিত্তিতে তিনি এই দাবি করবেন। আর যদি ইসলামের যুগ বুঝিয়ে থাকেন, তা হলে দেখুন তার এ দাবিও কতটা বাস্তবানুগ—
(১) হযরত কুদামা ইবনে মাযউন রাযি. যুবায়ের রাযি.-এর নবজাতক কন্যার সঙ্গে তার জন্মের দিনই বিবাহ পড়ান। (মোল্লা আলী কারী প্রণীত মিরকাত, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪১৭)
(২) স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উম্মে সালামার অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান সালামাকে সাইয়্যেদুশ শুহাদা হযরত হামযা রাযি.-এর কন্যার সঙ্গে বিবাহ পড়িয়ে দেন।
(৩) এমনকি, খোদ মাওলানা সাহেব নিজেও এতটুকু স্বীকার করেছেন যে, বিবাহের সময় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স এগারো বছর ছিল। আর এই বয়সকে তো প্রাপ্তবয়স্কতার বয়স বলা যায় না।
(৪) বাইহাকী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ আলাল বাইহাকীর প্রথম খণ্ডের ৭৬-৭৯ পৃষ্ঠায় দীর্ঘ আলোচনার পর মুসান্নিফ লিখেছেন-
وَ تَزْوِيجُ غَيْرِ وَاحِدٍ مِّنَ الصَّحَابَةِ ابْنَتَهُ الصَّغِيرَةَ
অর্থ: একাধিক সাহাবা কর্তৃক নিজ নিজ শিশুকন্যাকে বিবাহ দেওয়ার ঘটনা প্রমাণিত আছে।
সর্বসম্মতিক্রমে, কোনোরকম মতভেদ-মতপার্থক্য ছাড়া, সাহাবা, তাবেঈ, আইম্মায়ে মুজতাহিদিন, মুহাদ্দিসীন সকলের নিকট পিতা এই অধিকার রাখেন যে, তিনি চাইলে তার নাবালেগ শিশুকে বিবাহ দিতে পারেন। এরকম একটি সর্বসম্মত মাসআলায় হঠাৎ করে কেন দ্বিমত পোষণ করতে হবে, জানি না।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 আলোচনার সারকথা

📄 আলোচনার সারকথা


আমার আলোচনা ও দাবির মূলকথা এই যে, সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনাসমূহের আলোকে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহ হয় ছয় বছর বয়সে। এই বর্ণনাগুলোর সঙ্গে একটু ভিন্নতাসহ যে দু-একটি ব্যতিক্রমী বর্ণনা এসেছে, তাও যৌক্তিকভাবেই সমন্বয়যোগ্য। আর তিনি যে নয় বছর বয়সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র সান্নিধ্যে এসেছেন, তা নিয়ে একটিও ভিন্নমত বা ভিন্নবর্ণনা নেই। হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স-সংশ্লিষ্ট সবগুলো বর্ণনাকে একত্রিত ও সমন্বিত করলে যা পাই, তাতে তাঁর জন্ম হয়েছে নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষের শেষের দিকে। নবুওয়াতের একাদশ বর্ষে শাওয়াল মাসে বিবাহ হয় এবং হিজরতের প্রথম বর্ষে শাওয়াল মাসে রোখসত হয়।
মাওলানা মুহাম্মাদ আলী সাহেব 'পয়গামে সুলহ: জুলাই, ১৯২৮' সংখ্যায় লিখেছিলেন-নির্ভরযোগ্য বর্ণনাসমূহের আলোকে জানা যায়, হযরত আয়েশা রাযি. বড় বোন হযরত আসমা রাযি.-এর চেয়ে দশ বছরের ছোট ছিলেন। এই বিবেচনায়, হিজরতের এক বছর পূর্বে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিবাহ করেন, তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ষোলো বছর।
আমি মাআরিফে মাওলানা মুহাম্মাদ আলী সাহেবের বক্তব্যের সমালোচনা করেছিলাম। বেশ কিছু আপত্তি উত্থাপনের পর জানতে চেয়েছিলাম, আপনার নির্ভরযোগ্য বর্ণনাগুলোর মধ্য থেকে একটি বর্ণনাও কি প্রমাণ করে যে:
১. তিনি হযরত আসমা রাযি.-এর চেয়ে দশ বছরের ছোট ছিলেন?
২. হিজরতের এক বছর পূর্বে তাঁর বিবাহ হয়েছিল?
৩. এবং হিজরতের এক বছর পূর্বে তাঁর বয়স ষোলো বছর ছিল (এবং রোখসতের সময় আঠারো বছর ছিল)?
প্রায় চার মাস পর 'বন্ধুমহলের খুবই জোরাজুরিতে' ২৭ নভেম্বর পয়গামে সুলহে মাওলানা মুহাম্মাদ আলী সাহেব প্রতিউত্তরে একটি প্রবন্ধ লেখেন। তাতে পূর্বোক্ত দাবিগুলো প্রত্যাহার করত স্পষ্টত উল্লেখ করেন যে:
• এমন কোনো হাদীস তিনি পাননি, যাতে প্রমাণিত হয় যে, হযরত আয়েশা রাযি. হযরত আসমা রাযি.-এর চেয়ে দশ বছরের ছোট ছিলেন।
• বিবাহের সময় যে তাঁর বয়স ষোলো বছর ছিল, তা সঠিক নয়।
• তিনি এও স্বীকার করেছেন যে, বিবাহ যে হিজরতের এক বছর পূর্বে হয়েছিল, এমন কথাটা ভুলবশত লেখা হয়ে গেছে।
এভাবে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বিষয়গুলো উল্লেখ করার পর তিনি পুনরায় নতুন সুরে নতুন কিছু দাবি তুলেছেন। সেগুলো এই:
১. হযরত আয়েশা রাযি. নিজের বয়স বলতে ভুল করেছেন।
২. বিবাহের সময় (নবুওয়াতের দশম বর্ষে) তাঁর বয়স এগারো বছরের কম ছিল না।
৩. রোখসতের সময় তাঁর বয়স ষোলো বছরের কম ছিল না।
ইনসাফের সঙ্গে একটু ভাবুন-একজন হযরত আয়েশা রাযি. ভুল করলেন, তাই হাদীসবিশারদগণ, ইতিহাসবেত্তাগণ সকলে ভুল করলেন! একসঙ্গে ভুল করলেন! একইভাবে ভুল করলেন! আবার যেই মানুষটির স্মৃতিশক্তির প্রখরতা এত বেশি যে, মেধা-প্রতিভায় এবং স্মৃতিশক্তির প্রখরতায় নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বিশিষ্টতা লাভ করলেন, হাদীসের জগতে সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারীর সম্মানে ভূষিত হলেন, সেই মানুষটিই স্বয়ং নিজের বয়সের ব্যাপারে এত বেশি ভুল করবেন যে, নিজের এগারো বছর বয়সের বিবাহকে ছয় বছরের; ষোলো বছরের রোখসতকে নয় বছরের; এমন কি, পঁচিশ বছরের বৈধব্যকে আঠারো বছরের বলে দেবেন? বড়ই অদ্ভুত!
রোখসতের সময় হযরত আয়েশা রাযি. দোলনায় দোল খাচ্ছিলেন। সখীদের সঙ্গে খেলা থেকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো তাঁকে। মা হাত-মুখ ধুয়ে দিলেন, মাথার চুল আঁচড়ে দিলেন। ছোট ছোট বাচ্চারা সঙ্গে ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘরে এসেও একদম পুতুলখেলা। সবই এসেছে বিশদাকারে বিশুদ্ধ গ্রন্থসমূহে, বিশুদ্ধ সূত্র ধরে। এগুলো কি নয় বছরের কোমলমতি শিশুর আচরণ, না ষোলো বছরের ভরাযৌবনা নারীর আচরণ? স্বয়ং বিচার করুন। (মুসনাদে তয়ালিসি, ২০৫ পৃষ্ঠা; এবং দারিমি ২৯৬ পৃষ্ঠা)
ইফকের ঘটনা পঞ্চম হিজরী সনের। সে সময় তিনি, সকল মুহাদ্দিস ও মুআররীখের দৃষ্টিতে ছিলেন বারো কি তেরো বছরের মেয়ে। কিন্তু মাওলানা মুহাম্মাদ আলী সাহেবের দৃষ্টিতে তাঁর বয়স তখন উনিশ বছর হওয়ার কথা। অথচ, সহীহ বুখারীতে দেখা যায়, ইফকের ঘটনা প্রসঙ্গে একটি বর্ণনায় তাঁর আজাদকৃত দাসী হযরত বারীরাহ রাযি. এবং আরেকটি বর্ণনায় তিনি নিজে নিজের ব্যাপারে বলছেন-'জারিয়াতুন হাদীসাতুস সিন': 'উঠতি বয়সী বালিকা'। যারা আরবী জানেন, তাদের প্রত্যেকের কাছে প্রশ্ন- 'জারিয়াতুন হাদীসাতুস সিন' কথাটি কার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য? বারো-তেরো বছরের বালিকা, নাকি উনিশ বছরের যুবতী? তা ছাড়া, হযরত আয়েশা রাযি. বলেন-
وَ أَنَا جَارِيَةٌ حَدِيثَةُ السِّنِّ ، لَا أَقْرَأُ كَثِيْرًا مِّنَ الْقُرْآنِ
অর্থ: তখন আমার বয়স ছিল অল্প; কুরআন তেমন পড়িনি। [সহীহ বুখারী, ২/৯৪২/২৫১৮ বাব তাদিলুন্ নিসাউ বা'দুহুম বা'দা
এখন চিন্তা করুন, কুরআন তেমন না পড়ার অজুহাতটা সিদ্দীক ও নবীপরিবারে-বিশেষত হযরত আয়েশা রাযি.-এর মতো ব্যক্তিত্বের শানে-কোন বয়সের মেয়ের মুখে মানায়? বারো-তেরো বছরের ছোট্ট মেয়ের মুখে, না উনিশ বছরের ভরাট যুবতীর মুখে?
সবশেষে-সহীহ বুখারী (৫৫১ পৃষ্ঠা), সহীহ মুসলিম (কিতাবুন নিকাহ) ও সুনানে দারিমী (২৯৩ পৃষ্ঠা)-এর বর্ণনার আলোকে হযরত আয়েশা রাযি.-এর জবানিতে তাঁর রোখসতের পুরো চিত্রটি শুনিয়ে আলোচনার ইতি টানতে চাইছি, হযরত আয়েশা রাযি. বলেন-
'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম আমাকে যখন বিবাহ করেছেন তখন আমার বয়স ছিল ছয় বছর। এরপর আমরা মদীনায় আসি। বনু হারেসের মহল্লায় অবতরণ করি। কিছুকালের মধ্যেই আমি অসুস্থ হই। রোগে আমার মাথার চুল পড়ে গিয়েছিল। একটু-আধটু চুল গজাতেই একদিন মা এলেন। আমি তখন দোলনায় খেলছিলাম। আমার সঙ্গে আমার খেলার সখীরা ছিল। মা চেঁচিয়ে আমাকে ডাক দিলেন। আমি ছুটে এলাম। আমি বুঝতেই পারিনি, তিনি কী চাইছিলেন। তিনি আমার হাত ধরলেন এবং দরজায় সোজা দাঁড় করালেন। আমার খুব জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ছিল (সম্ভবত খেলতে খেলতে দৌড়ে আসার কারণে)। একটু জিরিয়ে নিতেই মা সামান্য পানি নিয়ে আমার মাথা-মুখ ধুয়ে দিলেন। এরপর ঘরের ভেতর নিয়ে গেলেন। দেখলাম, ভেতরে কয়েকজন আনসারি মহিলা বসা। তারা আমাকে দেখেই মোবারকবাদ জানালেন। মা আমাকে তাদের হাতে তুলে দিলেন। তারা আমাকে ঠিকঠাক করে নিচ্ছিলেন। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আসতে দেখে আমি চমকে গেলাম। তারা আমাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সোপর্দ করলেন। তখন আমার বয়স ছিল নয় বছর।'
ভাবুন তো, এই যে চিত্রটি ফুটে উঠেছে, এতে সিদ্দীক-পরিবারের কনের যে আচরণ ও অবস্থা দেখা যাচ্ছে, তা কি কোনো ষোলো বছরের মেয়ের হতে পারে, না নয় বছরের মেয়ের হতে পারে? আবার যে নারী নিজের রোখসত সম্পর্কে এত কিছু মনে রেখেছেন, তিনি নিজের বয়সটাই এভাবে ভুলে গেলেন? কোনোরকম দ্বিধা ছাড়া, সংশয় ছাড়া যার তার কাছে-সারা জীবন-রোখসতের সময় নিজের বয়সটা কত ছিল, সেটা বলতেই ভুল করলেন? খুবই আশ্চর্যের!
শুধু কি তাই? রোখসতের সময় তাঁর বয়স যে নয় বছর ছিল, সে ব্যাপারে তিনি এতটাই নিশ্চিত যে, আরব মেয়েদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সীমানাও নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন-নয় বছর। তিনি বলেন,
إِذَا بَلَغَتِ الْجَارِيَةُ تِسْعَ سِنِينَ فَهِيَ امْرَأَةٌ
অর্থ: মেয়ে যখন নয় বছরে উপনীত হয়, তখন সে মহিলা হয়ে যায়। [তিরমিযী : كتاب النکاح
এত কিছুর পরও কি এ কথা বলা উচিত হবে যে, বিবাহের সময় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স ছিল বারো-তেরো বছর অথবা ষোলো- সতেরো বছর? [মাআরিফ, জানুয়ারি, ১৯২৯]
وَمَا عَلَيْنَا إِلَّا الْبَلَاغُ
সমাপ্ত

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00