📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 আল্লামা ইবনে আবদুল বার

📄 আল্লামা ইবনে আবদুল বার


হযরত মাওলানা সম্ভবত ইবনে আবদুল বার রহ.-এর আল-ইসতিআব গ্রন্থের ৭৬৫ পৃষ্ঠা থেকে তার সুবিধাজনক এই উদ্ধৃতিটি নকল করেছেন-'হিজরতের তিন বছর পূর্বে নবুওয়াতের দশম বছর বিবাহ হয়েছে এবং হিজরতের আঠারো মাস পর বাসর হয়েছে'; অথচ এটা ইবনে আবদুল বার-এর নিজস্ব তাহকীক নয়; বরং অন্যের বক্তব্য তিনি তুলে ধরেছেন মাত্র। একই কিতাবের (হায়দারাবাদ থেকে ছাপা নুসখার) ১ম খণ্ডে ১৯ নং পৃষ্ঠায় তিনি নিজের মত এভাবে ব্যক্ত করেছেন-
تَزَوَّجَهَا بِمَكَّةَ قَبْلَ سَوْدَةَ وَ قِيْلَ بَعْدَ سَوْدَةَ أَجْمَعُوا عَلَى أَنَّهُ لَمْ يَبْنِ بِهَا إِلَّا بِالْمَدِينَةِ قِيْلَ سَنَةَ هَاجَرَ وَ قِيْلَ سَنَةَ اثْنَتَيْنِ مِنَ الْهِجْرَةِ فِي شَوَّالٍ وَ هِيَ ابْنَةُ تِسْعِ سِنِينَ وَ كَانَتْ فِي حِيْنِ عَقَدَ عَلَيْهَا بِنْتَ سِتٌّ سِنِينَ وَ قِيْلَ بِنْتِ سَبْعِ سِنِينَ.
অর্থ: নবীজী আয়েশা রাযি.-কে বিবাহ করেছেন সাওদা রাযি.-এর আগে কিংবা পরে। এ বিষয়ে সবাই একমত যে, বাসর হয়েছে মদীনায়। কেউ বলেন হিজরতের প্রথম বছর শাওয়ালে, কেউ বলেন ২য় হিজরীর শাওয়ালে। তখন তাঁর বয়স ছিল নয় বছর। বিবাহের আকদের সময় তাঁর বয়স ছিল ছয় বছর, (ভিন্নমতে) সাত বছর।
আশা করি, বিজ্ঞ পাঠক এটা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছেন যে, বর্ষ আসল নয়; বয়সই আসল। তবে বিভিন্ন বর্ষের মাস-সংখ্যা কম-বেশি হওয়ায় বর্ষনির্ধারণে নানা মতের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বয়সের ব্যাপারে কারও ভিন্নমত নেই。

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 সাহিবে মেশকাতের বক্তব্য

📄 সাহিবে মেশকাতের বক্তব্য


অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে, মৌলভি সাহেব–হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর বোন আসমা রাযি.-এর চেয়ে দশ বছরের ছোট ছিলেন—কথাটাকে সাহিবে মেশকাত-এর হাওয়ালা দিয়ে লিখেছেন। অথচ পুরো মেশকাত শরীফের কোথাও এ ধরনের বক্তব্য পাওয়া যাবে না। হাঁ, মেশকাত-এর শেষে পরিশিষ্ট হিসেবে যুক্ত আল-ইকমাল-এর মধ্যে ট্র-এর মতো দুর্বল শব্দযোগে আনা হয়েছে। দেখুন, মেশকাত ও ইকমাল-এর মুসান্নিফ যদিও একজন; কিন্তু মেশকাত-এর গ্রহণযোগ্যতা আর ইকমাল-এর গ্রহণযোগ্যতায় আসমান-জমিনের তফাত। সুতরাং ইকমাল-এর বক্তব্যকে সাহিবে ইকমাল-এর বক্তব্য বলা উচিত, সাহিবে মেশকাত-এর বক্তব্য বলা উচিত নয়। আসলে মৌলভি সাহেব নিজের মতের পক্ষে কোনো দলিল মেশকাত-এ না পেয়ে ইকমাল-এর আশ্রয় নিয়েছেন। যেই সাহিবে মেশকাতকে মাওলানা সাহেব বিশাল ব্যক্তিত্বের তকমা দিলেন এবং যার বক্তব্যকে গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার প্রতীক বানালেন তাঁর বক্তব্য দেখুন-
خَطَبَهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَ تَزَوَّجَهَا بِمَكَّةَ فِي شَوَّالٍ سَنَةَ عَشْرٍ مِّنَ النُّبُوَّةِ قَبْلَ الهِجْرَةِ بِثَلَاثِ سِنِينَ وَ قِيْلَ غَيْرُ ذَلِكَ وَ أَعْرَسَ بِهَا بِالْمَدِينَةِ فِي شَوَّالٍ سَنَةَ اثْنَتَيْنِ عَلَى رَأْسِ ثَمَانِيَ عَشَرَ شَهْرًا وَ لَهَا تِسْعُ سِنِينَ وَ قِيْلَ دَخَلَ بِهَا بِالْمَدِينَةِ بَعْدَ سَبْعَةِ أَشْهُرٍ مِّنْ مَّقْدَمِهِ وَ بَقِيَتْ مَعَهُ تِسْعَ سِنِينَ وَ مَاتَ عَنْهَا وَ لَهَا ثَمَانِيَ عَشَرَةَ سَنَةٌ.
অর্থ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিবাহ করেন নবুওয়াতের দশম বর্ষে, শাওয়াল মাসে, হিজরতের তিন বছর পূর্বে; এ নিয়ে অবশ্য কম-বেশি মতও আছে। এরপর হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষে মদীনায় শাওয়াল মাসে আঠারো মাসের মাথায় তাদের বাসর হয়। কেউ কেউ বলেছেন, এটা হিজরতের সাত মাস পরের কথা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে তিনি নয় বছর ঘর করেছিলেন। আঠারো বছর বয়সে তিনি বিধবা হন।
শুধু মেশকাত নয়, কুরআন ছাড়া সমস্ত সহীহ হাদীস, জাওয়ামে, মাসানীদ, সুনান, মাআজীম, মাযহাব, ফিকহ, ইতিহাস, হাদীস ও সীরাতের সকল ইমাম ও কিতাবের বর্ণনা যে বিষয়ে একমত ও ঐক্যবদ্ধ—সেখানে কিছু ভ্রান্ত ও নীতিভ্রষ্ট বিবেচনার ওপর ভর করে নতুন মত প্রকাশ করা কতটা যুক্তিসঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে?

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 সীরাতে আয়েশা রাযি.-এর উক্তি

📄 সীরাতে আয়েশা রাযি.-এর উক্তি


মৌলভি সাহেব আমার রচিত সীরাতে আয়েশা রাযি. গ্রন্থ থেকেও আমার বিপক্ষে দলিল দিয়েছেন। আমি স্বীকার করি যে, এক জায়গায় বিবাহের সন উল্লেখ করে ফেলেছি নববী দশম বর্ষ। ভুলবশত আমার লেখায়ও প্যাঁচ লেগেছে। আসলে সেখানে আরও স্পষ্ট করার দরকার ছিল। কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো, পুরো কিতাবে সব জায়গায় যা আছে, তা কিন্তু এই প্যাঁচ এমনিতেই খুলে দেয়; অথচ তিনি পুরো কিতাবে অনেকটা চিরুনি অভিযান চালিয়ে এই জায়গাটা বের করে আমাকে ঘায়েল করার চেষ্টা করেছেন। আমার প্রশ্ন হলো, মাওলানা সাহেবের এই সূক্ষ্মদর্শিতা যদি আমার বিচ্যুতি তালাশের পরিবর্তে সত্যের সন্ধানে নিয়োজিত হতো, তা হলে আমাকে এত দীর্ঘ আলোচনা করে লেখক-পাঠক উভয়ের 'সময় নষ্ট করা'র প্রয়োজন হতো না। আমার কিতাবের অন্যান্য জায়গাগুলো সম্পর্কে বলছি:
(১) জন্মতারিখ আলোচনা করতে গিয়ে, যারা হযরত আয়েশা রাযি.-এর জন্ম চতুর্থ বছর এবং বিবাহ দশম বছর বলেছে, তাদের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে আমি সাব্যস্ত করেছি যে, জন্ম পঞ্চম বছরের শেষ দিকে হিজরতের প্রায় নয় বছর আগে শাওয়াল মাসে হয়েছে (মোতাবেক ৬১৪ খৃস্টাব্দের জুলাই মাসে)। এখন নবুওয়াতের পঞ্চম বর্ষে শাওয়ালে যদি জন্ম হয় এবং তাঁর ছয় বছরে বিবাহ হয়, তা হলে এটা তো স্পষ্ট হয়ে যায় যে, বিবাহের সন আমি নবুওয়াতের এগারোতম বছরই বিশ্বাস করি। তবে লিখতে গিয়ে ভুলে দশম বছর লিখে ফেলেছি।
(২) বিবাহের তারিখ-সংক্রান্ত আলোচনায় লিখেছি—এই হিসাব অনুযায়ী হিজরতের তিন বছর আগে শাওয়াল মাসে (মোতাবেক ৬২০ খৃস্টাব্দের মে মাসে) বিবাহ হয়েছে। হিসাব মেলালে এখানেও নবুওয়াতের সেই এগারোতম নববী বর্ষই হবে বিবাহের সন।
(৩) একই জায়গায় হিজরতের আলোচনা করতে গিয়ে আমি লিখেছি—হযরত আয়েশা রাযি. বিবাহের পরও প্রায় তিন বছর পিতৃগৃহে ছিলেন। দু'বছর তিন মাস মক্কায় এবং সাত কি আট মাস মদীনায়। আমার এ বক্তব্যও এ বিষয়ের সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, আমি বিবাহের সন এগারোতম নববী বর্ষই মনে করি। কারণ বিবাহের পর মক্কায় মাত্র দুই বছর তিন মাস অবস্থানের কথা বলেছি।
(৪) বিষয়টিকে আরও খোলাসা করার জন্য সৌরবর্ষের হিসাব মেলানো যেতে পারে। জুলাই ৬১৪ খৃস্টাব্দে জন্ম, আর ৬২০ খৃস্টাব্দের মে মাসে বিবাহ হয়েছে। যার অর্থ হলো বিবাহের সময় তাঁর বয়স মোট পাঁচ বছর এগারো মাস হয়েছিল।
(৫) একই জায়গায় আমি আল্লামা ইবনে আবদুল বার রহ.-এর সমর্থনের কথা উল্লেখ করেছি। তাঁর মত হলো হিজরতের দুই বছর আগে বিবাহ হয়েছে (আরও নির্দিষ্ট করে বললে দুই বছর চার মাস আগে)।
তো এ সকল বিষয় থেকে মাওলানা সাহেবের খুব ভালোভাবেই বোঝার কথা যে আমি দশম বর্ষ নয়, বরং একাদশ বর্ষকেই বিবাহের সন মনে করি।
হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহের বিষয়ে হিজরতের তিন বছর আগে হওয়ার যে কথা লোকমুখে প্রচলিত আছে, তাতে শব্দগত একটা ত্রুটি আছে। কারণ— হিসাব অনুযায়ী তিন বছর নয়; বরং দুই বছর চার মাস হয়।

📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 বছর ও বর্ষের পার্থক্য

📄 বছর ও বর্ষের পার্থক্য


এটা একটা মৌলিক বিষয় যে, বছর ও বর্ষ সাধারণত এক নয়। সাধারণত বছর বারো মাস ছাড়া হতে পারে না। কিন্তু বর্ষ বারো মাস ছাড়াও হতে পারে। যেমন, যদি বলা হয়-হিজরতের তিন বছর আগে, তা হলে তিন গুণ বারো সমান ছত্রিশ মাস বোঝাবে। পক্ষান্তরে যদি বলা হয় তিন বর্ষ আগে, তা হলে ছত্রিশ মাস হওয়া জরুরি নয়; বরং প্রথম বর্ষের (এগারোতম বর্ষের) চার মাস, দ্বিতীয় (বারোতম) বর্ষ পূর্ণ, আর তৃতীয় (তেরোতম) বর্ষের দুই মাস হলেই তিন বর্ষ বলা যাবে। কারণ, বর্ষ এখানে (আংশিক হলেও) তিনটিই পাওয়া গেছে। কিন্তু বছরের হিসাবে মোট আঠারো মাস বা দেড় বছর পাওয়া গেছে। এই মূলনীতি মাথায় রেখে উরওয়াহ ইবনে যুবায়েরের বুখারী শরীফে বর্ণিত হাদীসটি দেখুন-
قَالَ تُوُفِّيَتْ خَدِيجَةُ قَبْلَ مَخْرَجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى الْمَدِينِةِ بِثَلَاثٍ فَلَبِثَ سَنَتَيْنِ أَوْ قَرِيباً مِّنْ ذَلِكَ وَ نَكَحَ عَائِشَةَ وَ هِيَ بِنْتُ سِتٌ سِنِيْنِ وَ بَنَى بِهَا وَ هِيَ بِنْتُ تِسْعِ سِنِيْنِ
অর্থ: উরওয়াহ বলেন, হিজরতের তিন বছর পূর্বে হযরত খাদীজা রাযি. ইন্তেকাল করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই বছর বা এর কাছাকাছি সময় অপেক্ষা করেন। তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-কে ছয় বছর বয়সে বিবাহ করেন এবং নয় বছর বয়সে কাছে নেন। (১/৫৫১)
উপরোক্ত হাদীসে যে হিজরতের তিন বছর পূর্বের কথা বলা হয়েছে এবং খাদীজার ইন্তেকালের পর যে দুই বছর অপেক্ষার কথা বলা হয়েছে—এখানে যদি পুরো তিন বছর এবং পূর্ণ দুই বছর বা দেড় বছর ধরা হয়, তা হলে হযরত আয়েশা রাযি.-এর জন্মসন নবুওয়াতের পঞ্চম বছর না হয়ে ষষ্ঠ বছর হয় এবং সেই হিসাবে বিবাহের সময় তার বয়স ছয় বছরও ঠিক থাকে না; অথচ এই হাদীসেই বিবাহের বয়স ছয় বছর বলা হয়েছে। এর অর্থ হলো এখানে পুরো তিন বছর উদ্দেশ্য নয়।
এই আলোচনা থেকে আরও একটি মূলনীতি সাব্যস্ত হয়, তা এই যে, সীরাত ও জীবনচরিতের ক্ষেত্রে হিসাব-নির্ণয়ের জন্য মূল হলো বয়স। হিজরী বা নববী বর্ষ নয়।
এ কারনেই সমস্ত উলামায়ে কেরাম, মুহাদ্দিসীন, মুহাক্কিকিন, মুআররিখীন এ বিষয়ে একমত যে, বিবাহের সময় হযরত আয়েশা রাযি.- এর বয়স ছয় বছর, বাসরের সময় নয় বছর, স্বামী-বিয়োগের সময় আঠারো বছর এবং ইন্তেকালের সময় ছাপ্পান্ন বছর বয়স ছিল। অথচ তাদের মাঝে নববী-বর্ষ এবং হিজরী-বর্ষ নিয়ে যথেষ্ট বরং বলা যায় ঘোর মতবিরোধ রয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00