📄 বিবাহের সময় হযরত আয়েশা রাযি.-এর প্রকৃত বয়স
মৌলভি সাহেব লিখেছেন 'সিংহভাগ বর্ণনা এ বিষয়ে একমত যে, বিবাহের সময় আয়েশা রাযি.-এর বয়স ছিল ছয় অথবা সাত'-তার বক্তব্যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এভাবেই তিনি 'অথবা সাত' লিখে গেছেন। কাজটা তিনি ঠিক করেননি। কারণ সিংহভাগ বর্ণনার ঐকমত্য ছয় বছরের ওপর; ছয় বা সাতের ওপর নয়। একটিমাত্র রেওয়ায়েতে বিবাহের বয়স 'নয় অথবা সাত' লেখা আছে, যার রাবীর স্মৃতিশক্তি প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। তাই মৌলভি সাহেবের লেখা উচিত ছিল, 'এক দুটো ছাড়া সব রেওয়ায়েত এ বিষয়ে একমত যে, বিবাহের সময় তার বয়স ছিল ছয় বছর। রোখসতের সময় নয় বছর, স্বামী-বিয়োগের সময় আঠারো বছর।
মাওলানা সাহেব ইবনে সাদের রেওয়ায়েত تَزَوَّجَ رَسُوْلُ اللهِ وَ هِيَ بَنْتُ تِسْعِ سِنِينَ )নবীজী তাকে বিবাহ করেছেন যখন তিনি নয় বছরের( রেওয়ায়েতটি নকল করেছেন, কিন্তু রেওয়ায়েতের শেষাংশ وَ مَاتَ عَنْهَا وَ هِيَ بِنْتُ ثَمَانِيَ عَشَرَةً سَنَةٌ )নবীজী তাকে রেখে ইন্তেকাল করেছেন তার আঠারো বছর বয়সে) চেপে গেছেন। কারণ এ অংশ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, বিবাহ দ্বারা এখানে রোখসত উদ্দেশ্য।
একইভাবে হিশাম ইবনে উরওয়াহ থেকে বর্ণিত অসমাপ্ত হাদীস ৪২ নং পৃষ্ঠা থেকে উঠিয়ে দিয়েছেন। কারণ এখানে সাত বছরের কথা বলা হয়েছে। অথচ (৪১ নং) পৃষ্ঠায় একই হাদীস পূর্ণাঙ্গরূপে উল্লিখিত আছে; কিন্তু সেটা তিনি আনেননি। কারণ এর শেষাংশে বলা হয়েছে, রোখসত হয়েছে নয় বছর বয়সে।
মোটকথা, দুজন মাত্র রাবী পাওয়া গেল যারা ছয় বছরের ভিন্নমত দিয়েছেন। একজন বলেছেন নয় অথবা সাত। কিন্তু তিনি স্মৃতিশক্তির বিষয়ে প্রশ্নবিদ্ধ। অপরজন বলেছেন নয় বছর বয়সে বিবাহ হয়েছে তো এখানে তিনি ভুলক্রমে রোখসতের জায়গায় বিবাহ বলেছেন। কারণ সঙ্গে তিনি এটাও বলেছেন যে, স্বামী-বিয়োগের সময় আঠারো বছর ছিল। এখন নয় বছর বয়সে যদি বিবাহ হয় এবং তিন বছর পর যদি রোখসত হয় তা হলে তো বিয়োগের সময় তার বয়স আঠারো না হয়ে একুশ হওয়ার কথা ছিল।
অপরদিকে হিশাম ইবনে উরওয়াহ এক জায়গায় যদিও সন্দেহের সঙ্গে ৯/৭ বলেছেন, কিন্তু বুখারী-মুসলিমে বহু জায়গায় দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, ছয় বছর বয়সে বিবাহ হয়েছে, নয় বছর বয়সে রোখসত হয়েছে। তো কেন আমরা দৃঢ়তাসমৃদ্ধ বহু হাদীসের পরিবর্তে সন্দেহপূর্ণ একটি মাত্র হাদীসকে গ্রহণ করব?
এবার আসুন, আমরা নববী বর্ষ ও হিজরী বর্ষের সঙ্গে বিবাহ-বর্ষের সমন্বয় সাধন করি। মৌলভি সাহেব এটা তো স্বীকার করেছেন যে, বিবাহ নববী দশম বছরে হয়েছে এবং শাওয়াল মাসেই হয়েছে। এমনকি, বাসর হয়েছিল কয়েক বছর পর শাওয়ালে। আর সর্বসম্মতভাবে বিবাহ ও বাসরের মাঝে তিন বছরের ব্যবধান ছিল। এখন কথা হলো আল্লামা আইনী ও ইবনে আবদুল বার রহ.-এর মতো যারা দ্বিতীয় হিজরীতে বাসরের কথা বলেছেন, তারা বিবাহের সময় উল্লেখ করেছেন নবুওয়াতের এগারোতম বছর। পক্ষান্তরে যারা প্রথম হিজরীতে বাসরের কথা বলেছেন, তারা বিবাহের সময় বলেছেন নবুওয়াতের দশম বছর। দু-একজন ভুলক্রমে যদিও বিবাহ দশম বছর আর বাসর প্রথম হিজরীর কথা বলেছেন, কিন্তু তারা স্পষ্ট বলেছেন যে, উভয়ের মাঝে ব্যবধান তিন বছর। চার-পাঁচ বছরের ব্যবধান কেউ বলেননি। মৌলভি সাহেব বিবাহের বয়স বাড়ানোর জন্য তার সুবিধামতো বিবাহের সন এক পক্ষ থেকে গ্রহণ করেছেন, আর বাসরের তারিখ অপর পক্ষ থেকে গ্রহণ করেছেন; এটাই কি ইনসাফের দাবি? হযরত মাওলানার উচিত ছিল বিবাহ ও বাসর উভয় ক্ষেত্রে যে কোনো এক পক্ষের মত গ্রহণ করা। যা হোক, মাওলানা সাহেব যেহেতু আল্লামা আইনী এবং হাফেজ ইবনে আবদুল বার-এর হাওয়ালা দিয়েছেন, সুতরাং আমরা এখন এই মহান ব্যক্তিদ্বয়ের বক্তব্য পর্যায়ক্রমে তুলে ধরব।
📄 আল্লামা আইনীর বক্তব্য
আল্লামা আইনী যেমন দ্বিতীয় হিজরীতে বাসরের কথা বলেছেন তেমনই তিনি বিবাহের কথা বলেছেন, নববী এগারোতম বর্ষে। ব্যবধান মাঝখানে সেই তিন বছরই। কিন্তু আমাদের আলোচনার মূল বিষয় তথা বিবাহের সময় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স কত ছিল? এ বিষয়ে তিনি কেমন দ্ব্যর্থহীন সুস্পষ্ট ভাষায় মন্তব্য করেছেন-তার শব্দগুলো লক্ষ্য করলেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে-
تَزَوَّجَهَا رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَكَّةَ قَبْلَ الْهِجْرَةِ بِسَنَتَيْنِ. وَ قِيْلَ بِثَلَاثٍ وَ قِيْلَ بِسَنَةٍ وَ نِصْفٍ أَوْ نَحْوِهَا فِي شَوَّالٍ وَ هِيَ بِنْتُ سِتٌ سِنِينَ وَ قِيلَ سَبْعٍ وَ بَنَى بِهَا فِي شَوَّالٍ أَيْضاً بَعْدَ وَقْعَةِ بَدْرٍ فِي السَّنَةِ الثَّانِيَةِ مِنَ الْحِجْرَةِ، أَقَامَ فِي صُحْبَتِهِ ثَمَانِيَةَ أَعْوَامٍ وَ خَمْسَةَ أَشْهُرٍ وَ تُوُفِّيَ عَنْهَا وَ هِيَ بِنْتُ ثَمَانِي عَشَرَةَ وَ عَاشَتْ خَمْساً وَ سِتِّيْنَ سَنَةً. (عمدة القارى ج 1 ص / ٤٥
অর্থ: হিজরতের দুই বছর আগে মক্কায় নবীজী তাঁকে বিবাহ করেছেন, (ভিন্নমতে তিন বছর, দেড় বছর ইত্যাদি) শাওয়াল মাসে। তখন তাঁর বয়স ছিল ছয় বছর (ভিন্নমতে সাত বছর); বাসর করেছেন সেই শাওয়ালেই দ্বিতীয় হিজরীতে, বদর যুদ্ধের পর। এরপর দীর্ঘ আট বছর পাঁচ মাস নবীজীর সোহবতে অবস্থান করেছেন। নবীজীর ইন্তেকালের সময় তাঁর বয়স ছিল আঠারো বছর। তিনি ছাপ্পান্ন বছর বেঁচে ছিলেন। (উমদাতুল কারী, ১ম খণ্ড: ৪৫ পৃষ্ঠা)
মোটকথা, হিজরী ও নববী বর্ষের হিসাব নিয়ে মতভিন্নতা থাকলেও বিবাহ-বাসর ও স্বামী-বিয়োগের সময় অর্থাৎ বয়স নিয়ে কোনো মতবিরোধ নেই।
📄 আল্লামা ইবনে আবদুল বার
হযরত মাওলানা সম্ভবত ইবনে আবদুল বার রহ.-এর আল-ইসতিআব গ্রন্থের ৭৬৫ পৃষ্ঠা থেকে তার সুবিধাজনক এই উদ্ধৃতিটি নকল করেছেন-'হিজরতের তিন বছর পূর্বে নবুওয়াতের দশম বছর বিবাহ হয়েছে এবং হিজরতের আঠারো মাস পর বাসর হয়েছে'; অথচ এটা ইবনে আবদুল বার-এর নিজস্ব তাহকীক নয়; বরং অন্যের বক্তব্য তিনি তুলে ধরেছেন মাত্র। একই কিতাবের (হায়দারাবাদ থেকে ছাপা নুসখার) ১ম খণ্ডে ১৯ নং পৃষ্ঠায় তিনি নিজের মত এভাবে ব্যক্ত করেছেন-
تَزَوَّجَهَا بِمَكَّةَ قَبْلَ سَوْدَةَ وَ قِيْلَ بَعْدَ سَوْدَةَ أَجْمَعُوا عَلَى أَنَّهُ لَمْ يَبْنِ بِهَا إِلَّا بِالْمَدِينَةِ قِيْلَ سَنَةَ هَاجَرَ وَ قِيْلَ سَنَةَ اثْنَتَيْنِ مِنَ الْهِجْرَةِ فِي شَوَّالٍ وَ هِيَ ابْنَةُ تِسْعِ سِنِينَ وَ كَانَتْ فِي حِيْنِ عَقَدَ عَلَيْهَا بِنْتَ سِتٌّ سِنِينَ وَ قِيْلَ بِنْتِ سَبْعِ سِنِينَ.
অর্থ: নবীজী আয়েশা রাযি.-কে বিবাহ করেছেন সাওদা রাযি.-এর আগে কিংবা পরে। এ বিষয়ে সবাই একমত যে, বাসর হয়েছে মদীনায়। কেউ বলেন হিজরতের প্রথম বছর শাওয়ালে, কেউ বলেন ২য় হিজরীর শাওয়ালে। তখন তাঁর বয়স ছিল নয় বছর। বিবাহের আকদের সময় তাঁর বয়স ছিল ছয় বছর, (ভিন্নমতে) সাত বছর।
আশা করি, বিজ্ঞ পাঠক এটা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছেন যে, বর্ষ আসল নয়; বয়সই আসল। তবে বিভিন্ন বর্ষের মাস-সংখ্যা কম-বেশি হওয়ায় বর্ষনির্ধারণে নানা মতের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বয়সের ব্যাপারে কারও ভিন্নমত নেই。
📄 সাহিবে মেশকাতের বক্তব্য
অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে, মৌলভি সাহেব–হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর বোন আসমা রাযি.-এর চেয়ে দশ বছরের ছোট ছিলেন—কথাটাকে সাহিবে মেশকাত-এর হাওয়ালা দিয়ে লিখেছেন। অথচ পুরো মেশকাত শরীফের কোথাও এ ধরনের বক্তব্য পাওয়া যাবে না। হাঁ, মেশকাত-এর শেষে পরিশিষ্ট হিসেবে যুক্ত আল-ইকমাল-এর মধ্যে ট্র-এর মতো দুর্বল শব্দযোগে আনা হয়েছে। দেখুন, মেশকাত ও ইকমাল-এর মুসান্নিফ যদিও একজন; কিন্তু মেশকাত-এর গ্রহণযোগ্যতা আর ইকমাল-এর গ্রহণযোগ্যতায় আসমান-জমিনের তফাত। সুতরাং ইকমাল-এর বক্তব্যকে সাহিবে ইকমাল-এর বক্তব্য বলা উচিত, সাহিবে মেশকাত-এর বক্তব্য বলা উচিত নয়। আসলে মৌলভি সাহেব নিজের মতের পক্ষে কোনো দলিল মেশকাত-এ না পেয়ে ইকমাল-এর আশ্রয় নিয়েছেন। যেই সাহিবে মেশকাতকে মাওলানা সাহেব বিশাল ব্যক্তিত্বের তকমা দিলেন এবং যার বক্তব্যকে গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার প্রতীক বানালেন তাঁর বক্তব্য দেখুন-
خَطَبَهَا النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَ تَزَوَّجَهَا بِمَكَّةَ فِي شَوَّالٍ سَنَةَ عَشْرٍ مِّنَ النُّبُوَّةِ قَبْلَ الهِجْرَةِ بِثَلَاثِ سِنِينَ وَ قِيْلَ غَيْرُ ذَلِكَ وَ أَعْرَسَ بِهَا بِالْمَدِينَةِ فِي شَوَّالٍ سَنَةَ اثْنَتَيْنِ عَلَى رَأْسِ ثَمَانِيَ عَشَرَ شَهْرًا وَ لَهَا تِسْعُ سِنِينَ وَ قِيْلَ دَخَلَ بِهَا بِالْمَدِينَةِ بَعْدَ سَبْعَةِ أَشْهُرٍ مِّنْ مَّقْدَمِهِ وَ بَقِيَتْ مَعَهُ تِسْعَ سِنِينَ وَ مَاتَ عَنْهَا وَ لَهَا ثَمَانِيَ عَشَرَةَ سَنَةٌ.
অর্থ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিবাহ করেন নবুওয়াতের দশম বর্ষে, শাওয়াল মাসে, হিজরতের তিন বছর পূর্বে; এ নিয়ে অবশ্য কম-বেশি মতও আছে। এরপর হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষে মদীনায় শাওয়াল মাসে আঠারো মাসের মাথায় তাদের বাসর হয়। কেউ কেউ বলেছেন, এটা হিজরতের সাত মাস পরের কথা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে তিনি নয় বছর ঘর করেছিলেন। আঠারো বছর বয়সে তিনি বিধবা হন।
শুধু মেশকাত নয়, কুরআন ছাড়া সমস্ত সহীহ হাদীস, জাওয়ামে, মাসানীদ, সুনান, মাআজীম, মাযহাব, ফিকহ, ইতিহাস, হাদীস ও সীরাতের সকল ইমাম ও কিতাবের বর্ণনা যে বিষয়ে একমত ও ঐক্যবদ্ধ—সেখানে কিছু ভ্রান্ত ও নীতিভ্রষ্ট বিবেচনার ওপর ভর করে নতুন মত প্রকাশ করা কতটা যুক্তিসঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য হতে পারে?