📄 বিবাহের তারিখ-সংক্রান্ত বর্ণনা
হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহের তারিখ নিয়ে যথেষ্ট মতভিন্নতা থাকলেও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কারও দ্বিমত নেই যে, নবুওয়াতের দশম বছর হযরত খাদীজা রাযি.-এর ইন্তেকালের কিছুদিন পরই হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহ হয়েছিল এবং তার অনতিবিলম্ব পরই হযরত সাওদা রাযি.-এর বিবাহ হয়েছিল। অর্থাৎ নবীজী প্রথমে হযরত আয়েশা রাযি.-কে, তারপর হযরত সাওদা রাযি.-কে বিবাহ করেন। আর এটা যেহেতু সর্বস্বীকৃত বিষয় যে, হযরত সাওদা রাযি.-এর বিবাহ নবুওয়াতের দশম বছর হিজরতের তিন বছর পূর্বে হয়েছিল; সুতরাং হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহও যে নবুওয়াতের দশম বছর হয়েছিল এটা অনস্বীকার্য।
হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহের তারিখ-সংক্রান্ত মতভিন্নতা সম্ভবত হযরত খাদীজা রাযি.-এর ইন্তেকালের সন-তারিখের মতভিন্নতা থেকেই সৃষ্ট হয়েছে। কারণ কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে খাদীজা রাযি.-এর ইন্তেকাল হয়েছে হিজরতের চার বছর বা পাঁচ বছর আগে। তাদের মতে, হযরত খাদীজা রাযি.-এর ইন্তেকাল এবং হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহের মাঝে এক অথবা দুই বছরের ব্যবধান আছে। যদিও বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, নবুওয়াতের দশম বছর তাঁর ইন্তেকাল হয়েছে। যাই হোক, ইন্তেকাল ও বিবাহের এই ব্যবধানের ভিত্তিতেই সম্ভবত এটা ধরে নেওয়া হয়েছে যে, আয়েশা রাযি.-এর বিবাহ হিজরতের এক অথবা দুই বছর আগে হয়েছে। মোটকথা, বর্ণনাগুলোর মধ্যে যথেষ্ট বিরোধ আছে। এমনকি—খোদ বুখারীতেই দুই ধরনের রেওয়ায়েত আছে। আর বলাবাহুল্য যে, যে কোনো একটি বর্ণনা ঠিক, অপরটি ভুল। আর বিচার-পর্যালোচনার ক্ষেত্রে আবেগের বশবর্তী হয়ে কাউকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা ন্যায়পরিপন্থী। সুতরাং বুখারী-মুসলিম সন্দেহাতীতভাবে অতিনির্ভরযোগ্য ও সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, ভুলের ঊর্ধ্বে শুধু কুরআন। সারকথা হলো, বিবাহের সন-তারিখ নিয়ে যে মতভিন্নতা রয়েছে তাতে অধিকাংশ আলেমের মত (অর্থাৎ নবুওয়াতের দশম বছরের মত)-ই বিশুদ্ধ। যেমনটি সাইয়্যেদ সাহেবও লিখেছেন—
বিশ্লেষকদের মতে—এবং বেশিরভাগ গ্রহণযোগ্য বর্ণনা এ মতেরই সমর্থন করে—হযরত খাদীজা রাযি. নবুওয়াতের দশম বর্ষে হিজরতের তিন বছর পূর্বে রমযান মাসে মৃত্যুবরণ করেন। এক মাস পর সে বছরই শাওয়াল মাসে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহ হয়। -সীরাতে আয়েশা রাযি.
📄 নবীজীর সংসারে কখন এসেছিলেন?
দ্বিতীয় পর্যায়ে আমাদের দেখতে হবে তাঁর রোখসতের তারিখ। এখানেও দু-ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। কোনো বর্ণনায় হিজরতের আট মাস পর, কোনো বর্ণনায় আঠারো মাস পর। সাইয়্যেদ সাহেব সীরাতে আয়েশা রাযি. গ্রন্থে আল্লামা আইনীর মতকে (অর্থাৎ বদর যুদ্ধের পর ২য় হিজরীতে রোখসতের মতকে) প্রত্যাখ্যান করেছেন। অপরদিকে হাজি মুঈনুদ্দীন নদভী খোলাফায়ে রাশেদা গ্রন্থে দ্বিতীয় হিজরীর মতকে বিশুদ্ধ বলেছেন। সম্ভবত সাঈয়েদ সাহেব মতটি শুধু এ কারণে গ্রহণ করেননি যে, এটা মেনে নিলে বিবাহের সময় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স দশ বছর হয়ে যায়। মনে হয়, সাঈয়েদ সাহেবের মাথায় এটা ছিল না যে, হিজরতের প্রথম বছর তার রোখসত মেনে নিলেও বিবাহের সময় এগারো বছর প্রমাণিত হয়ে যায়। কারণ বলা হয়েছে, নবুওয়াতের দশম বছর শাওয়ালে তার বিবাহ হয়েছিল এবং বিবাহের সময় তার বয়স সাত বা আট বছর ছিল। এ হিসাব অনুযায়ী তেরোতম শাওয়ালে অর্থাৎ হিজরতের ছয়-সাত মাস আগে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স নয় কি দশ বছর হয়েছিল। আর হিজরতের প্রথম বছর শাওয়ালেও যদি রোখসত হয়ে থাকে তবুও হযরত আয়েশা রাযি.-বর্ণিত হাদীসগুলোর হিসাব অনুযায়ীই তখন তাঁর বয়স দশ বছর পূর্ণ হয়ে এগারো বছর কিংবা এগারো বছর পূর্ণ হয়ে বারো বছরে পড়েছিল। কোনো অবস্থাতেই নয় বছরের হিসাব মেলে না। কিন্তু বিশুদ্ধ মত সেটাই, যেটা বুখারী শরীফের বিশ্বনন্দিত ব্যাখ্যাগ্রন্থ উমদাতুল কারীতে আল্লামা বদরুদ্দিন আল আইনী উল্লেখ করেছেন-২য় হিজরীতে বদর যুদ্ধের পর রোখসত হয়েছিল। এই মতের সমর্থনেই আল্লামা ইবনে আবদুল বার ইসতিআব গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত আয়েশা রাযি.-এর রোখসত হিজরতের আঠারো মাস পর হয়েছিল। তা হলে, এই হিসাব অনুযায়ী আয়েশা রাযি.-বর্ণিত হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, রোখসতের সময় তাঁর বয়স এগারো বছর পূর্ণ হয়ে বারোতে পড়েছিল কিংবা বারো বছর পূর্ণ হয়ে তেরো বছরে পড়েছিল।
মোটকথা, এ সকল রেওয়ায়েত যদি সহীহ হয় তা হলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, হযরত আয়েশা রাযি. নিজের বয়স বর্ণনা করতে গিয়ে বিস্মৃতির শিকার হয়েছেন। কারণ তাঁর বিবাহ-রোখসতের মধ্যে পাঁচ বছরের ব্যবধান আছে। কমপক্ষে চার বছর তো অবশ্যই। সুতরাং বিবাহের সময় যদি তার বয়স ছয়-সাত বছর হয়ে থাকে তা হলে রোখসতের সময় নয় বছর বয়স হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
📄 অন্যান্য বর্ণনা থেকে বয়সের আন্দাজ
উপর্যুক্ত বিষয়গুলো ছাড়াও এমন আরও কিছু ঘটনা আছে যার কারণে মনে হয় যে, বিবাহের সময় তাঁর বয়স এত কম ছিল না। যেমন বুখারীর কিতাবুত তাফসীরে সূরাতুল ক্বমারের بَلِ السَّاعَةُ مَوْعِدُهُمْ وَالسَّاعَةُ أَدْهَى وَأَمَرُّ আয়াত প্রসঙ্গে হযরত আয়েশা রাযি. বলেন-
لَقَدْ أُنْزِلَتْ عَلَى مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَكَّةَ وَ إِنِّي لَجَارِيَةٌ أَلْعَبُ " بَلِ السَّاعَةُ مَوْعِدُهُمْ وَ السَّاعَةُ أَدْهَى وَأَمَرُ
অর্থ : মক্কায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর بَلِ السَّاعَةُ مَّوْعِدُهُمْ আয়াতটি যখন অবতীর্ণ হয় তখন আমি ছোট্ট এক বালিকা, (অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গে) খেলাধুলা করছিলাম।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, সূরায়ে কমার অবতীর্ণ হয়েছে মক্কায় ইসলামের শুরুর যুগে। কারণ এ সূরায় শাক্কুল কমার (চন্দ্র-খণ্ডন) মুজিযার আলোচনা রয়েছে, আর দুর্লভ এই নববী মুজিযা নবুওয়াতের সপ্তম বছরে শিআবে আবি তালিবে অবরুদ্ধ হওয়ারও আগের ঘটনা। তা ছাড়া, মুফাসসিরীনে কেরামের মত অনুযায়ী সূরায়ে নাজম-এর সঙ্গে এই সূরা কমারের অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে যা থেকে অনুমান করা যায়, সূরা দুটো কাছাকাছি সময়ে অবতীর্ণ। সুতরাং সূরা নাজম যেহেতু নবুওয়াতের পঞ্চম বছর অবতীর্ণ হয়েছে তাই বলা যায় সূরা কমারও পঞ্চম বছর অবতীর্ণ হয়েছে। এসব যদি ঠিক হয়ে থাকে তা হলে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বক্তব্য অনুযায়ী পঞ্চম বছর তাঁর বয়স ছিল পাঁচ-ছয় বছর। কারণ কোনো সূরা অবতীর্ণ হওয়ার বিষয়টি অনুধাবন করা এবং তা মুখস্থ করে ফেলা পাঁচ-ছয় বছরের চেয়ে কম বয়স্ক হলে সম্ভব নয়। সুতরাং নবুওয়াতের দশম বছর তার বয়স ছয়-সাত হওয়া অসম্ভব একটা বিষয়। সারকথা, যদি এই বর্ণনাগুলো সহীহ হয় তা হলে বলতেই হবে, বয়স বর্ণনার ক্ষেত্রে হযরত আয়েশা রাযি. কোনো প্রকার বিস্মৃতির শিকার হয়েছেন।
📄 আয়েশা রাযি. বর্ণিত আরেকটি হাদীস
বুখারী শরীফের হিজরত-সংক্রান্ত মশহুর হাদীসটিও আমাদের মতকে সমর্থন করে। দেখুন, হযরত আয়েশা রাযি. নিজেই বর্ণনা করছেন-
قَالَتْ: لَمْ أَعْقِلُ أَبَوَيَّ قَطُّ إِلَّا وَهُمَا يَدِيْنَانِ الدِّيْنَ ، وَلَمْ يَمُرُّ عَلَيْنَا يَوْمٌ إِلَّا يَأْتِيْنَا فِيْهِ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ طَرَفَ النَّهَارِ، بُكْرَةً وَعَشِيَّةٌ ، فَلَمَّا ابْتُلِيَ الْمُسْلِمُوْنَ ، خَرَجَ أَبُو بَكْرٍ مُهَاجِرًا قَبْلَ الْحَبَشَةِ .
অর্থ: বুদ্ধি হওয়ার সময় থেকেই আমি আমার মা-বাবাকে ইসলামের ওপর দেখছি। আর এমন কোনো দিন অতিবাহিত হতো না, যেদিন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকাল-সন্ধ্যা আমাদের কাছে আসতেন না। এরপর যখন মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন আবু বকর হাবশার উদ্দেশে হিজরত করলেন।
হযরত আবু বকর রাযি. সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর স্ত্রী উম্মে রুমান মাত্র সতেরো জনের পরেই নবুওয়াতের তৃতীয় বছর বা তারও আগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। কারণ চতুর্থ বছর মুসলমানদের সংখ্যা চল্লিশ জন অতিক্রম করেছিল। তা হলে, হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী হযরত আবু বকর রাযি.-এর হিজরত নবুওয়াতের পঞ্চম বছরে হওয়ার কথা। আর আবু বকর রাযি.-এর বাড়িতে নবীজীর সকাল-সন্ধ্যা আগমন তারও আগের ঘটনা। আর ওই সময় আয়েশা রাযি.-এর বুদ্ধির বয়সে উপনীত হওয়ার অর্থই হলো পাঁচ-ছয় বছর বয়স হওয়া। সুতরাং আয়েশা রাযি.-এর বয়স-সংক্রান্ত হাদীসগুলোকে সহীহ ধরলে নবুওয়াতের পঞ্চম বছর তার পাঁচ-ছয় বছর বয়স হওয়ার পরিবর্তে তখন তাঁর জন্ম হওয়ার কথা। এমতাবস্থায় কীভাবে তাঁর বয়স বর্ণিত হাদীসগুলোকে গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নেওয়া যায়?
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। হযরত আয়েশা রাযি.-কে যখন বিবাহের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল তখন তাঁর পিতা আবু বকর রাযি. উত্তরে বলেছিলেন, আয়েশার বিষয়ে আগে আরেকজনকে বলা হয়েছে। সুতরাং তার কাছ থেকে জেনে তারপর এ বিষয়ে আগে বাড়া যাবে।
এই ঘটনাও প্রমাণ করে যে, নবীজীর সঙ্গে বিবাহের সময় তাঁর বয়স ছয়-সাত বছর নয়; বরং এর চেয়ে বেশি ছিল। কারণ পাঁচ/ছয় বছর বয়সে নিশ্চয় বিবাহের কথা আলোচনা হওয়ার প্রথা আরবেও ছিল না। অথচ এখানে দেখা যাচ্ছে, নবীজীর সঙ্গে বিবাহের আগে হযরত আয়েশা রাযি.-এর অন্য জায়গায় বিবাহের আলোচনা হয়েছিল।