📄 গুরুত্ব না দেওয়ার কারণ
আমি এটা নিঃসঙ্কোচে স্বীকার করছি যে, হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহের বয়স আমার মূল আলোচ্য বিষয় না হওয়ার কারণে বিষয়টির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। প্রাসঙ্গিক বিষয় হওয়ার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে জেহেনে যা ছিল তাই লিখে দেওয়া হয়েছে। আলোচ্য প্রবন্ধে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহের বয়স কিছুটা বেশি উল্লেখ করার পাশাপাশি এটাও বলা হয়েছে যে, হিজরতের এক বছর পূর্বে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহ হয়েছে। অথচ এ তথ্যটি ঠিক নয়; বরং বিবাহ হয়েছিল হিজরতের তিন বছর পূর্বে। আসল কথা হলো, দুই ধরনের রেওয়ায়েতই আছে। কোনো রেওয়ায়েতে এক বছর, কোনো রেওয়ায়েতে তিন বছর পূর্বে বিবাহের কথা উল্লেখ আছে।
📄 নয় বছর বয়সে বিবাহের রেওয়ায়েত
অধিকাংশ রেওয়ায়েত এ বিষয়ে একমত যে, বিবাহের সময় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স ছয় বছর, আর রোখসতের সময় নয় বছর ছিল এবং নবীজীর ইন্তেকালের সময় ছিল আঠারো বছর। কিন্তু তাবাকাতে ইবনে সাদ-এর এই রেওয়ায়েত দুটো দেখুন—
تَزَوَّجَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَ هِيَ بِنْتُ تِسْعِ سِنِينَ
অর্থ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-কে যখন বিবাহ করেন তখন তাঁর বয়স ছিল নয় বছর। (৮/৪১)
نَكَحَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَائِشَةَ وَ هِيَ ابْنَةُ تِسْعِ سِنِينَ أَوْ سَبْعٍ
অর্থ: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রাযি.-কে যখন বিবাহ করেন তখন তাঁর বয়স ছিল নয় বছর, অথবা সাত বছর। [৮/৪২]
এখন স্বভাবত সবাই চাইবে, কোনো একটা ব্যাখ্যাট্যাখ্যা করে ভিন্ন বর্ণনার তথ্যটিকে অধিকাংশ বর্ণনার তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলি। কিন্তু কী করে? অধিকাংশ বর্ণনার তথ্যও যে হিসাব অনুযায়ী মেলে না। আবার বর্ণনাকারীরা এত উচ্চ পর্যায়ের যে, তাদের বর্ণনার শুদ্ধ্যশুদ্ধি নিয়ে কথা বলার সাহসও কেউ করে না।
📄 বিবাহের তারিখ-সংক্রান্ত বর্ণনা
হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহের তারিখ নিয়ে যথেষ্ট মতভিন্নতা থাকলেও এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কারও দ্বিমত নেই যে, নবুওয়াতের দশম বছর হযরত খাদীজা রাযি.-এর ইন্তেকালের কিছুদিন পরই হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহ হয়েছিল এবং তার অনতিবিলম্ব পরই হযরত সাওদা রাযি.-এর বিবাহ হয়েছিল। অর্থাৎ নবীজী প্রথমে হযরত আয়েশা রাযি.-কে, তারপর হযরত সাওদা রাযি.-কে বিবাহ করেন। আর এটা যেহেতু সর্বস্বীকৃত বিষয় যে, হযরত সাওদা রাযি.-এর বিবাহ নবুওয়াতের দশম বছর হিজরতের তিন বছর পূর্বে হয়েছিল; সুতরাং হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহও যে নবুওয়াতের দশম বছর হয়েছিল এটা অনস্বীকার্য।
হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহের তারিখ-সংক্রান্ত মতভিন্নতা সম্ভবত হযরত খাদীজা রাযি.-এর ইন্তেকালের সন-তারিখের মতভিন্নতা থেকেই সৃষ্ট হয়েছে। কারণ কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে খাদীজা রাযি.-এর ইন্তেকাল হয়েছে হিজরতের চার বছর বা পাঁচ বছর আগে। তাদের মতে, হযরত খাদীজা রাযি.-এর ইন্তেকাল এবং হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহের মাঝে এক অথবা দুই বছরের ব্যবধান আছে। যদিও বিশুদ্ধ মত হচ্ছে, নবুওয়াতের দশম বছর তাঁর ইন্তেকাল হয়েছে। যাই হোক, ইন্তেকাল ও বিবাহের এই ব্যবধানের ভিত্তিতেই সম্ভবত এটা ধরে নেওয়া হয়েছে যে, আয়েশা রাযি.-এর বিবাহ হিজরতের এক অথবা দুই বছর আগে হয়েছে। মোটকথা, বর্ণনাগুলোর মধ্যে যথেষ্ট বিরোধ আছে। এমনকি—খোদ বুখারীতেই দুই ধরনের রেওয়ায়েত আছে। আর বলাবাহুল্য যে, যে কোনো একটি বর্ণনা ঠিক, অপরটি ভুল। আর বিচার-পর্যালোচনার ক্ষেত্রে আবেগের বশবর্তী হয়ে কাউকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখা ন্যায়পরিপন্থী। সুতরাং বুখারী-মুসলিম সন্দেহাতীতভাবে অতিনির্ভরযোগ্য ও সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, ভুলের ঊর্ধ্বে শুধু কুরআন। সারকথা হলো, বিবাহের সন-তারিখ নিয়ে যে মতভিন্নতা রয়েছে তাতে অধিকাংশ আলেমের মত (অর্থাৎ নবুওয়াতের দশম বছরের মত)-ই বিশুদ্ধ। যেমনটি সাইয়্যেদ সাহেবও লিখেছেন—
বিশ্লেষকদের মতে—এবং বেশিরভাগ গ্রহণযোগ্য বর্ণনা এ মতেরই সমর্থন করে—হযরত খাদীজা রাযি. নবুওয়াতের দশম বর্ষে হিজরতের তিন বছর পূর্বে রমযান মাসে মৃত্যুবরণ করেন। এক মাস পর সে বছরই শাওয়াল মাসে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহ হয়। -সীরাতে আয়েশা রাযি.
📄 নবীজীর সংসারে কখন এসেছিলেন?
দ্বিতীয় পর্যায়ে আমাদের দেখতে হবে তাঁর রোখসতের তারিখ। এখানেও দু-ধরনের বর্ণনা পাওয়া যায়। কোনো বর্ণনায় হিজরতের আট মাস পর, কোনো বর্ণনায় আঠারো মাস পর। সাইয়্যেদ সাহেব সীরাতে আয়েশা রাযি. গ্রন্থে আল্লামা আইনীর মতকে (অর্থাৎ বদর যুদ্ধের পর ২য় হিজরীতে রোখসতের মতকে) প্রত্যাখ্যান করেছেন। অপরদিকে হাজি মুঈনুদ্দীন নদভী খোলাফায়ে রাশেদা গ্রন্থে দ্বিতীয় হিজরীর মতকে বিশুদ্ধ বলেছেন। সম্ভবত সাঈয়েদ সাহেব মতটি শুধু এ কারণে গ্রহণ করেননি যে, এটা মেনে নিলে বিবাহের সময় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স দশ বছর হয়ে যায়। মনে হয়, সাঈয়েদ সাহেবের মাথায় এটা ছিল না যে, হিজরতের প্রথম বছর তার রোখসত মেনে নিলেও বিবাহের সময় এগারো বছর প্রমাণিত হয়ে যায়। কারণ বলা হয়েছে, নবুওয়াতের দশম বছর শাওয়ালে তার বিবাহ হয়েছিল এবং বিবাহের সময় তার বয়স সাত বা আট বছর ছিল। এ হিসাব অনুযায়ী তেরোতম শাওয়ালে অর্থাৎ হিজরতের ছয়-সাত মাস আগে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স নয় কি দশ বছর হয়েছিল। আর হিজরতের প্রথম বছর শাওয়ালেও যদি রোখসত হয়ে থাকে তবুও হযরত আয়েশা রাযি.-বর্ণিত হাদীসগুলোর হিসাব অনুযায়ীই তখন তাঁর বয়স দশ বছর পূর্ণ হয়ে এগারো বছর কিংবা এগারো বছর পূর্ণ হয়ে বারো বছরে পড়েছিল। কোনো অবস্থাতেই নয় বছরের হিসাব মেলে না। কিন্তু বিশুদ্ধ মত সেটাই, যেটা বুখারী শরীফের বিশ্বনন্দিত ব্যাখ্যাগ্রন্থ উমদাতুল কারীতে আল্লামা বদরুদ্দিন আল আইনী উল্লেখ করেছেন-২য় হিজরীতে বদর যুদ্ধের পর রোখসত হয়েছিল। এই মতের সমর্থনেই আল্লামা ইবনে আবদুল বার ইসতিআব গ্রন্থে লিখেছেন, হযরত আয়েশা রাযি.-এর রোখসত হিজরতের আঠারো মাস পর হয়েছিল। তা হলে, এই হিসাব অনুযায়ী আয়েশা রাযি.-বর্ণিত হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, রোখসতের সময় তাঁর বয়স এগারো বছর পূর্ণ হয়ে বারোতে পড়েছিল কিংবা বারো বছর পূর্ণ হয়ে তেরো বছরে পড়েছিল।
মোটকথা, এ সকল রেওয়ায়েত যদি সহীহ হয় তা হলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, হযরত আয়েশা রাযি. নিজের বয়স বর্ণনা করতে গিয়ে বিস্মৃতির শিকার হয়েছেন। কারণ তাঁর বিবাহ-রোখসতের মধ্যে পাঁচ বছরের ব্যবধান আছে। কমপক্ষে চার বছর তো অবশ্যই। সুতরাং বিবাহের সময় যদি তার বয়স ছয়-সাত বছর হয়ে থাকে তা হলে রোখসতের সময় নয় বছর বয়স হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।