📄 বাল্যবিবাহ এবং হযরত আয়েশা রাযি.
বিবাহের সময় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স ঠিক কত বছর ছিল এ বিষয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ একটা খটকার মধ্যে ছিলাম। তবে আমার এ খটকার কারণ কখনোই এটা নয় যে, নয় বছর বয়সে কোনো মেয়ের বালেগ হওয়া এবং বিবাহের উপযুক্ত হওয়াকে আমি অসম্ভব মনে করি; বরং এর মূল কারণ হলো—পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন হাদীস।
একদিকে এমন কিছু হাদীস আছে, যেগুলো প্রমাণ করে যে, হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স বিবাহের সময় ছিল ছয় বছর, আবার রোখসতির সময় ছিল নয় বছর; অন্যদিকে এমন কিছু হাদীসও আছে, যেগুলো ভাবিয়ে তোলে যে, আদৌ বিবাহ ও রোখসতি এত কম বয়সে হয়েছিল কি না? নাকি আরও বেশি বয়সে হয়েছিল? তবে সত্য বলতে কি, এ নিয়ে যে খুব একটা ঘাঁটাঘাঁটি করেছি, তা নয়।
এরই মধ্যে বাল্যবিবাহ-সংক্রান্ত একটি বিল অ্যাসেম্বলিতে পাশ হলো। আমিও নিজের মত প্রকাশের প্রয়োজন অনুভব করলাম। আমার মধ্যে মৌলিকভাবে যে চিন্তাটা কাজ করেছে তা হচ্ছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাল্যবিবাহের আইন নিষেধাজ্ঞা শরীয়তের খেলাফ হবে কি না? দীর্ঘ চিন্তা-ভাবনার পর আমার মনে হলো, এটা শরীয়তের মানশার খেলাফ হবে না। কারণ বালেগ হওয়ার পরই বিবাহ-শাদির মুয়ামালা করা শরীয়তের পছন্দ। পরে বিষয়টি আমার পরিচিত কয়েকজন আলেমের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের মতামত যাচাই করলাম; দেখলাম তারাও আমার সঙ্গে একমত। তখন বিষয়টি প্রবন্ধাকারে ছেপে লাইট পত্রিকায় প্রচার করলাম।
পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশের পর থেকেই বাল্যবিবাহের পক্ষাবলম্বীদের হৈচৈ শুরু হয়ে গেল। তাদের বক্তব্য হলো, হযরত আয়েশা রাযি.-কে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিবাহ করেছিলেন খুবই ছোট্ট বয়সে। সুতরাং স্বয়ং আল্লাহর নবী যেটাকে জায়েয করেছেন সেটাকে অবৈধ বলার অধিকার কারও নেই। আখের, এই সাওয়ালের জবাব দেওয়াটাও জরুরি হয়ে পড়ল।
📄 মূল আলোচনা
পয়গামে সুলহ-এর স্বনামধন্য সম্পাদক বন্ধুবর মুহাম্মাদ সাহেব নিজেই আমার প্রবন্ধটি উর্দুতে তরজমা করে পত্রিকায় ছেপে দিয়েছিলেন। পাঠকের প্রতি সবিনয় অনুরোধ, প্রবন্ধে প্রদত্ত আমার শব্দগুলো লক্ষ্য করুন-
'বিপরীতে বলা হয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হযরত আয়েশা রাযি.-কে বিবাহ করেন তখন তাঁর বয়স ছিল ছয় বছর বা সাত বছর। এসব হাদীসকে যদি গ্রহণযোগ্য ধরে নেয়াও হয় তবুও এটা তো সর্বস্বীকৃত বিষয় যে, শাদি-তালাকের বিধান নাজিল হয়েছে মদীনায় আর আয়েশা রাযি.-এর বিবাহ হয়েছিল মক্কায়। সুতরাং মক্কার ঘটনাকে মদীনায় নাজিল হওয়া হুকুমের মোকাবেলায় দলিল হিসেবে পেশ করা যুক্তিসঙ্গত নয়।'
'তা ছাড়া, বিবাহের সময় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স এতটা কম ছিল না; বরং আরেকটু বেশি ছিল। কারণ সহীহ হাদীস দ্বারা এটা প্রমাণিত হয় যে, হযরত আয়েশা রাযি. তাঁর বোন আসমা রাযি.-এর চেয়ে দশ বছরের ছোট ছিলেন। আর হিজরতের সময় আসমা রাযি.-এর বয়স ছিল সাতাশ বছর। সুতরাং হিজরতের সময় আয়েশা রাযি.-এর বয়স সতেরো বছর ছিল, আর হিজরতের এক বছর আগে যখন বিবাহ হয় তখন তাঁর বয়স ছিল ষোলো বছর।'
আশা করি, উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এটা ফুটে উঠেছে যে, আমার প্রবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল বাল্যবিবাহ; হযরত আয়শো রাযি.-এর বয়স নয়। আমার মূল জবাব এটুকুই ছিল যে, হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহ মক্কায় হয়েছিল, যা মদীনায় নাজিল হওয়া শাদি-তালাকের হুকুমের মোকাবেলায় দলিল হিসেবে আসতে পারে না, অর্থাৎ এটা মেনে নিয়েই জবাব দেওয়া হয়েছে যে, আয়েশা রাযি.-এর শাদি অল্প বয়সেই হয়েছে; তবে প্রসঙ্গক্রমে এটাও বলে দেওয়া হয়েছে যে, শাদির সময় বয়স কিছুটা বেশি হওয়ার বিষয়টিও মেনে নেওয়ার সুযোগ আছে।
📄 দালিলিক ভিত্তি
আমার প্রবন্ধ এবং অব্যবহিত পরেই সাইয়্যেদ সুলাইমান নদভীর সমালোচনা প্রকাশিত হওয়ার পর একাধিক পত্রযোগে আমাকে অনুরোধ করা হয়েছে যেন আমি হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহের বয়স সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করি। অবশ্য সাইয়্যেদ রিয়াসত আলি নদভী কিছুটা কঠোরতার সঙ্গে পীড়াপীড়ি করেছেন যেন আমি ঐ সকল রেওয়ায়েতের 'ঠিকানা' উল্লেখ করি কিংবা নিজের ভুল স্বীকার করি।
এটা তো ঠিক যে, আমার প্রবন্ধে আমি যখন হযরত আসমা রাযি.-এর চেয়ে হযরত আয়েশা রাযি. দশ বছরের ছোট হওয়ার হাওয়ালা দিই, তখন আমার মাথায় আল-ইকমাল-এর নামও ছিল। ঐ প্রবন্ধটি কিছুদিন আগে লিফলেট-প্যাম্ফলেট আকারে বিতরণ করা হয়েছিল এবং সাইয়্যেদ সুলায়মান নদভী তার ওপর পর্যালোচনা পেশ করেছিলেন। আল-ইকমাল-এর হাওয়ালা ছাড়াও আমার খুবই আস্থাভাজন এক মাওলানা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন, উসদুল গাবা-র এক জায়গায় আছে— বিবাহের সময় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স বারো বছর ছিল। দুর্ঘটনাক্রমে তখন আমার হাতের নাগালে কিতাবটি না থাকায় তাহকীক করাও সম্ভব হয়নি; বরং তার স্মৃতিশক্তির ওপর আস্থা রেখেই আমাকে ক্ষান্ত থাকতে হয়েছে। পরে অবশ্য কিতাবটিতে হযরত আসমা রাযি., আবু বকর রাযি. এবং হযরত আয়েশা রাযি.-এর আলোচনায় তালাশ করেও বারো বছরের তথ্যটি খুঁজে পাইনি। কিন্তু আমার সেই মাওলানা এখনো বলছেন, উসদুল গাবায় অবশ্যই তিনি পড়েছেন। সুযোগ পেলে আমাকে বের করে দেখাবেন। তবে এ সবকিছুর পরও নির্ভরযোগ্য কিছু হাদীসের ভিত্তিতে সবসময় আমার এটাই মনে হয়েছে যে, বারো বছর না হলেও বয়স এতটা কম ছিল না।
📄 গুরুত্ব না দেওয়ার কারণ
আমি এটা নিঃসঙ্কোচে স্বীকার করছি যে, হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহের বয়স আমার মূল আলোচ্য বিষয় না হওয়ার কারণে বিষয়টির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। প্রাসঙ্গিক বিষয় হওয়ার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে জেহেনে যা ছিল তাই লিখে দেওয়া হয়েছে। আলোচ্য প্রবন্ধে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহের বয়স কিছুটা বেশি উল্লেখ করার পাশাপাশি এটাও বলা হয়েছে যে, হিজরতের এক বছর পূর্বে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহ হয়েছে। অথচ এ তথ্যটি ঠিক নয়; বরং বিবাহ হয়েছিল হিজরতের তিন বছর পূর্বে। আসল কথা হলো, দুই ধরনের রেওয়ায়েতই আছে। কোনো রেওয়ায়েতে এক বছর, কোনো রেওয়ায়েতে তিন বছর পূর্বে বিবাহের কথা উল্লেখ আছে।