📘 উম্মুল মুমিনীন সীরাতে আয়েশা রা > 📄 বিবাহের সময় বয়স কত ছিল?

📄 বিবাহের সময় বয়স কত ছিল?


রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হযরত আয়েশা রাযি.-কে বিবাহ করেন, তখন ইসলামী বর্ণনাসমূহের ভিত্তিতে-তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় পঞ্চাশ বছর; পক্ষান্তরে হযরত আয়েশা রাযি. তখন সবেমাত্র ছয় বছর পূর্ণ করেছেন, অথবা সাত বছরে পা দিয়েছেন।
ইসলামবিদ্বেষীদের আপত্তি, এত পরিণত বয়সে এত ছোট্ট একটা মেয়েকে বিবাহ করা তাঁর পক্ষে অশোভন।
উত্তরে মুসলিম লেখকগণ একেকজন একেক পন্থা অবলম্বন করেছেন। একজন অসম ও বাল্যবিবাহের অসঙ্গতিকেই অস্বীকার করেছেন। আর একজন বিবাহ ও রোখসতের তারিখটিকে মেনে নিয়েছেন ঠিকই; কিন্তু রোখসত হয়েছে বলেই যে পতি-পত্নীর সম্পর্ক স্থাপিত হবে তা অস্বীকার করেছেন।
কিন্তু তৃতীয়জন ঘটিয়েছেন সাংঘাতিক কাণ্ড। আধুনিক ধর্মতত্ত্ব অবলম্বনে মাথাব্যথা সারাতে মাথাকাটার অবস্থা। যেন ইতিহাসের পাতা থেকে পুরনো তারিখগুলো মুছে ফেলে সুবিধেমতো নতুন নতুন তারিখ বসিয়ে দেবেন।
তিনি পূর্বাপরের মিলহীন অসংলগ্ন একটি প্রবন্ধ লিখে পত্রিকায় ছাপিয়েছেন। প্যাফলেট আকারে বিতরণ করিয়াছেন। ডাকযোগে ও পাঠিয়েছেন অনেকের কাছে। স্বয়ং আমার কাছেও একাধিকবার পাঠানো হয়েছে। বারবারই আমি নীরব থেকেছি; ভেবেছি, প্রাবন্ধিক যা করছেন, সৎ উদ্দেশ্যেই করছেন।
কিন্তু আজ দুটো কারণে এই নীরবতা ভাঙতে হচ্ছে :
এক. দিন দিন দেখছি, পদস্খলনটি ইতিহাসে পদাসন লাভ করতে চাচ্ছে। এমনকি, সীরাতে-নববীর তুর্কি সহকারী-অনুবাদক যাফর আহমদ সাহেব কনস্টান্টিনোপল থেকে পত্র মারফত লিখেছেন, যদি এটি আপনার দৃষ্টিতে সঠিক মনে হয়, তা হলে সীরাতের তুর্কি অনুবাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
দুই. বিষয়টি এখানেই শেষ হয়ে যায় না; আরও অনেক দূর গড়ায়। একটি ফিক্হী মাসআলাহ্ও প্রমাণ হিসেবে পেশ করার পাঁয়তারা চলছে। তাই বাধ্য হয়েই দায়িত্বজ্ঞানহীন লেখটিকে সমালোচনায় আনতে হচ্ছে।
আলোচ্য প্রবন্ধটির মূল ভিত্তি হলো মেশকাতের মুসান্নিফ শাহ ওয়ালিউদ্দিন রচিত রহ. কর্তৃক মেশকাতের রাবীন্দের পরিচতির ওপর রচিত একটি সংক্ষিপ্ত রিসালা : আল-ইকমাল ফী আসমাইর রিজাল। রিসালাটি মেশকাতের শেষে অন্তর্ভূক্তি হিসেবে সংযোজিত হয়েছে।
প্রাবন্ধিক বলতে চান, মেশকাতের মুসান্নিফ উপযুক্ত রিসালায় যে তথ্য দিয়েছেন, তাতে বোঝা যায়, হযরত আসমা রাযি. বয়সে হযরত আয়েশা রাযি.-এর চেয়ে দশ বছরের বড় ছিলেন। হযরত আসমা রাযি.-এর বয়স যখন সাতাশ বছর, তখন হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স সতেরো বছর। সুতরাং বিবাহের সময় তাঁর বয়সের অবস্থা হয়ে থাকবে—পনেরো বছর শেষ, অথবা ষোলো বছর শুরু।
বিষয়টির সমালোচনার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ এগুতে হবে : প্রথমত প্রবন্ধটির অবস্থানগত মূল্যায়ন করতে হবে, এরপর যেই তথ্যটির ওপর ভিত্তি করে এত কিছু সেই তথ্যটির গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে হবে; এবং এরপর প্রামাণ্য বর্ণনাসমূহের আলোকে তুলনামূলক পর্যালোচনায় আসতে হবে। সর্বপ্রথম এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে যে, শাহ ওয়ালিউদ্দিন খতিব রহ.-রচিত রিসালাটি প্রামাণ্য পর্যায়ের নয়। এটি লিখিত হয়েছে শুধুমাত্র মেশকাতের ছাত্রদের রাবী-সম্পর্কিত একটা সাধারণ ধারণা দেওয়ার জন্য। খতিব রহ. ছিলেন অষ্টম শতাব্দীর মানুষ। সাতশো সাঁইত্রিশ হিজরীর পর, অর্থাৎ মেশকাতের তালিফ শেষ করে তিনি রিসালাটি লিখেছিলেন। এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অষ্টম শতকের একজন মুআল্লিফের সাধারণ বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে পূর্ববর্তী সকল প্রামাণ্য উৎসগ্রন্থ ও বিশুদ্ধ সূত্রে প্রাপ্ত বর্ণনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করাটা কতটা যুক্তিযুক্ত?
এরচেয়েও আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রাবন্ধিক শাহ ওয়ালিউদ্দিন রহ.- এর মূল বক্তব্যটি উদ্ধৃত করার প্রয়োজন বোধ করেননি; শুধু লিখেছেন- এ রকম একজন বিশ্বস্ত, নির্ভরযোগ্য, প্রামাণ্য মুআল্লিফ এ কথা লিখেছেন। এরপর উপর্যুক্ত বক্তব্যটি নিজের ভাষ্যে অত্যন্ত আস্থা ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে উপস্থাপন করেছেন। অথচ বেচারা খতিব রহ. যেই শব্দ ও শৈলীতে তথ্যটি উপস্থাপন করেছেন-যে কেউই বুঝতে পারেন-তা তথ্যগত দুর্বলতারই পরিচায়ক। তাঁর মূল বক্তব্যটি এই:
قِيلَ أَسْلَمَتْ بَعْدَ سَبْعَةَ عَشَرَ إِنْسَانًا وَ هِيَ أَكْبَرُ مِنْ أُخْتِهَا عَائِشَةَ بِعَشْرِ سِنِينَ وَ مَاتَتْ بَعْدَ قَتْلِ ابْنِهَا بِعَشَرَةِ أَيَّامٍ وَ قِيْلَ بِعِشْرِينَ يَوْماً وَ لَهَا مِائَةُ سَنَةٍ وَ ذَلِكَ سَنَةَ ثَلَاثٍ وَ سَبْعِينَ
অর্থ: কথিত আছে-তিনি (হযরত আসমা রাযি.) সতেরো জনের পর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-এর চেয়ে দশ বছরের বড় ছিলেন। তাঁর পুত্র (আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রাযি.) নিহত হওয়ার দশ দিন পরে, মতান্তরে বিশ দিন পরে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল একশো বছর। এটি ছিল তেয়াত্তর হিজরীর ঘটনা।
লক্ষ করুন, প্রাবন্ধিক যতটা আস্থার সঙ্গে তথ্যটি গ্রহণ করেছেন; স্বয়ং তথ্যদাতাই তথ্যপ্রদানে ততটা আস্থাপোষণ করেননি। তাই তথ্যটা দিয়েছেন (কথিত আছে) কথাটাকে আশ্রয় করে। তা হলে, কোথায় তথ্যগ্রহীতার আস্থা, আর কোথায় তথ্যদাতার অনাস্থা!
(ফিল (কথিত আছে)-এর অধীনে প্রদত্ত তথ্য যদি কখনো প্রমাণ হিসেবে মেনেও নেওয়া হয়; তবু ভুলে গেলে চলবে না যে, স্বয়ং লেখকও ভুল করতে পারেন। তিনি তো ভুলের ঊর্ধ্বে নন। অকপটে বলছি, সত্যি সত্যিই তিনি আলোচ্য বিষয়ে ভ্রান্তির শিকার হয়েছেন। কেননা এই একই কিতাবে তিনি হযরত আয়েশা রাযি. সম্পর্কে লিখেছেন:
تَزَوَّجَهَا بِمَكَّةَ فِي شَوَّالٍ سَنَةَ عَشْرٍ مِّنَ النُّبُوَّةِ قَبْلَ الْهِجْرَةِ بِثَلَاثِ سِنِينَ وَ قِيْلَ غَيْرُ ذَلِكَ وَ أَعْرَسَ بِهَا بِالْمَدِينَةِ فِي شَوَّالٍ سَنَةَ اثْنَيْنِ مِنَ الْهِجْرَةِ عَلَى رَأْسِ ثَمَانِي عَشَرَ شَهْرًا وَ لَهَا تِسْعُ سِنِينَ وَ قِيْلَ دَخَلَ بِمَا بِالْمَدِينَةِ بَعْدَ سَبْعَةِ أَشْهُرٍ مِّنْ مَّقْدَمِهِ بَقِيَتْ مَعَهُ تِسْعَ سِنِينَ وَ مَاتَ عَنْهَا وَ لَهَا ثَمَانِيَ عَشَرَةَ سَنَةً
অর্থ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিবাহ করেন নবুওয়াতের দশম বর্ষে শাওয়াল মাসে হিজরতের তিন বছর পূর্বে; এ নিয়ে অবশ্য কম-বেশি মতও আছে। এরপর হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষে মদীনায় শাওয়াল মাসে আঠারো মাসের মাথায় তাদের বাসর হয়। কেউ কেউ বলেছেন, এটা হিজরতের সাত মাস পরের কথা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে তিনি নয় বছর ঘর করেছিলেন। আঠারো বছর বয়সে তিনি বিধবা হন।
গবেষক প্রাবন্ধিক কি একই মুসান্নিফের একই রিসালার এই স্ববিরোধী তথ্য দুটোর সমন্বয় দেখাতে পারবেন? এমনটাও কি সম্ভব যে, হযরত আয়েশা রাযি. সম্পর্কে জানতে তিনি হযরত আসমা রাযি.-এর পরিচিতিটা পড়েছেন; অথচ স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি.-এর পরিচিতিটাই পড়েননি? তবে কি এটা জ্ঞানপাপ নয়?
হযরত আয়েশা রাযি.-এর পরিচয় দিতে গিয়ে শাহ ওয়ালিউদ্দিন খতিব রহ. স্বরচিত রিসালায় যে তথ্য দিয়েছেন, ইসলামের ইতিহাসের উৎসমূলের একটি বর্ণ ও বর্ণনাও এর ব্যতিক্রম নয়। সহীহ বুখারী: মানাকিবু আয়িশা রাযি., তাযবিজুস সিগার ইত্যাদি অধ্যায়; সহীহ মুসলিম : বিবাহ অধ্যায়; মুসতাদরাকে হাকেম: চতুর্থ খণ্ড; মুসনাদে আহমাদ: ৬/১১৮; তাবাকাতে ইবনে সাদ: অষ্টম খণ্ড; ইসতিআব, উসদুল গাবাহ, ইসাবা-সহ সকল হাদীসগ্রন্থে এই একই বাণী ধ্বনিত হয়েছে। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, আমার বিবাহ ছয় বছর বয়সে এবং রোখসত নয় বছর বয়সে হয়েছে। (সহীহ বুখারী: ফাযলু খাদীজা রাযি.)
পক্ষান্তরে মুসনাদে আহমাদ: ষষ্ঠ খণ্ডের আটান্ন নম্বর পৃষ্ঠায় যে হাদীসটি এসেছে—তিনি বলেন, হযরত খাদীজা রাযি.-এর ওফাতের তিন বছর পর আমার বিবাহ হয়েছে—তাতে বিবাহ বলতে রোখসতের কথা বলা হয়েছে। অথবা হতে পারে, রাবী ভুলবশত রোখসত বলতে বিবাহ বলে ফেলেছেন। তা না হলে, এই বর্ণনাটি অন্য বিশুদ্ধ বর্ণনাগুলোর সঙ্গে মেলে না।
এখন অষ্টম শতকের খতিবের একটি ভুল বর্ণনার ওপর একের পর এক কিয়াস বা বিবেচনা করা সঙ্গত হবে, নাকি ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইবনে সাদ, ইবনে আবদুল বার, ইবনে আসির, ইবনে হাজার প্রমুখ হাদীসবিশারদ ও ইতিহাসবেত্তার ঐকমত্যপোষণকৃত বর্ণনা ও সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়া সঙ্গত হবে?
তা ছাড়া এ বিষয়টিও মনে রাখতে হবে যে—বুখারী, মুসলিম, মুসনাদ ও তাবাকাতে যে বর্ণনাগুলো এসেছে সেগুলো হযরত আয়েশা রাযি.-এর নিজ জবানিতে বিবৃত; এবং তাঁর একান্ত আপনজনদেরই সূত্রে বর্ণিত। তা হলে, এই বর্ণনাগুলোর চেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য আর কী হতে পারে?
এই মূল ভাষ্যগুলোর সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পারিপার্শ্বিক বিষয়ও মাথায় রাখা দরকার। হযরত আয়েশা রাযি. বিবাহের সময় এত ছোট ছিলেন যে, তিনি দোলনায় দোল খেতেন, পুতুল খেলতেন (আবু দাউদ: কিতাবুল আদাব; ইবনে মাজাহ: বাবু মুদারাতিন নিসা; সহীহ মুসলিম: বাবু ফাযলি আয়িশা রাযি.)। তিনি বলেন, যখন সূরা কমারের আয়াতগুলো নাজিল হয় তখন আমি খেলছিলাম (সহীহ বুখারী: তাফসীর-সূরা কমার)। তিনি আরও বলেন, যখন আমার বিবাহ হয় তখন আমার খবরও ছিল না (ইবনে সাদ: ৮/৪৩)। ইফকের ঘটনার প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছে তিনি 'জারিয়াতুন হাদীসাতুস সিন' অর্থাৎ অল্পবয়সী বালিকা ছিলেন। অথচ প্রাবন্ধিকের দাবি অনুসারে ইফকের ঘটনার সময় হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স বিশ-একুশ বছর হয়ে যাওয়ার কথা। বিশ-একুশ বছর বয়সের মেয়েকে উঠতি বয়সী বালিকা বলে নাকি?
এরকম সুনির্দিষ্ট, নির্ভরযোগ্য, অসংখ্য সূত্রে বর্ণিত তথ্যের বিপরীতে একটি 'কথিত আছে' কথার ওপর দাঁড় করানো দাবি কার কাছে, কতক্ষণ ধোপে টেকে? তবে এ কি স্বতঃস্ফূত ভুল? আমরা জানি, মানুষের কেন এত 'স্বেচ্ছাভ্রান্তি'র শখ হয়। কিন্তু আমরা দুঃখিত, আমরা আমাদের ধর্ম ও ধর্মতত্ত্বে আশ্বস্ত; কোনো 'আপাতমধুর মিথ্যা কল্যাণ'-এর 'জয়ধ্বনি'তে ভড়কে যেতে নারাজ।
রইল আসল আপত্তিটি, যা অনেক ধর্মপ্রাণ কিন্তু অবিবেচক মুসলমানের মস্তিষ্কেও বিপত্তি ঘটিয়েছে। আসলে যারা আপত্তিটি করেছেন, তারা ইউরোপ-আমেরিকার শীতল জলবায়ু ও আবহাওয়াকে মরু-আরবের তপ্ত জলবায়ু ও আবহাওয়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন। শীতপ্রধান দেশগুলোতে শিশুদের স্বাস্থ্যগত সক্ষমতা ও শারীরিক উপযুক্ততা তৈরি হয় ধীরগতিতে। কিন্তু গ্রীষ্মমণ্ডলের শিশুরা, বিশেষ করে শিশুকন্যারা, এদিক থেকে আলাদা (তা ছাড়া, তখনকার খোলা আকাশের নিচে সর্বাঙ্গসুস্থ-সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জনজীবন আদৌ এখনকার মতো আলো-বাতাসহীন, যান্ত্রিক ও দূষিত ছিল না)। অথচ, এখনো- ভারতের মতো নাতিশীতোষ্ণ দেশে ইউরোপের তুলনায় অল্প বয়সেই মেয়েরা বয়ঃপ্রাপ্ত হয়।
তদুপরি, আলোচ্য বিবাহের উদ্দেশ্য নিছক দাম্পত্যজীবন ছিল না; বরং অন্য কিছু ছিল। ইতিহাসের সোনালি পাতায় তা সমুজ্জ্বলও হয়ে আছে। প্রথম উদ্দেশ্য ছিল নবুওয়াত ও খেলাফতের মধ্যে সুদৃঢ় বন্ধন তৈরি করা। দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল হযরত আয়েশা রাযি.-এর সহজাত মেধা-প্রতিভা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ইসলামের খেদমত গ্রহণ করা এবং মুসলিম নারী সমাজের মধ্যে ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপক প্রচার- প্রসার ঘটানো। আল্লাহর প্রশংসা, এই মহত্তম উদ্দেশ্যগুলো অক্ষরে- অক্ষরে বাস্তবায়িত হয়েছে। হযরত আয়েশা রাযি.-এর পুরো জীবনচরিত এর সাক্ষ্য বহন করে। সবচেয়ে বড় কথা, এটা ছিল নবুওয়াতের ব্যতিক্রমতা ও বিশিষ্টতার মেছাল। এগুলোর মূল্যায়ন ব্যতিক্রমতানুসারেই করা উচিত।
যাই হোক, বিভিন্ন হাদীসে স্বয়ং হযরত আয়েশা রাযি. থেকে তাঁর বিবাহ ও রোখসত সম্পর্কে যে বর্ণনাগুলো এসেছে, বিষয়টিকে সুপ্রমাণিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বর্ণনা তুলে ধরা হচ্ছে:
সহীহ বুখারী বাবু নিকাহির রজুল-এ আছে:
عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَزَوَّجَهَا وَ هِيَ بِنْتُ سِتِّ سِنِينَ وَ أُدْخِلَتْ عَلَيْهِ وَ هِيَ بِنْتُ تِسْعٍ وَ مَكَثَتْ عِنْدَهُ تِسْعاً
অর্থ: হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বিবাহ করেছেন যখন তাঁর বয়স সাত বছর এবং তাঁর কাছে গিয়েছেন যখন তাঁর বয়স নয় বছর। তিনি তাঁর কাছে থেকেছেন নয় বছর। [১/৭৭১)
এই একই বিবরণ আছে বিভিন্ন অধ্যায়ে, বিভিন্ন পরিচ্ছেদে; বিশেষ করে সহীহ বুখারীর চার-পাঁচ জায়গায়। সহীহ বুখারী: বাবু তাযবিজি আয়িশা রাযি.-তে আছে:
قَالَ تُوُفِّيَتْ خَدِيجَةُ قَبْلَ مَخْرَجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِلَى الْمَدِينَةِ بِثَلَاثٍ فَلَبِثَ سَنَتَيْنِ أَوْ قَرِيباً مِّنْ ذَلِكَ وَ نَكَحَ عَائِشَةَ وَ هِيَ بِنْتُ سِتِّ سِنِينَ وَ بَنَى بِهَا وَ هِيَ بِنْتُ تِسْعِ سِنِينَ
অর্থ: উরওয়াহ বলেন, হিজরতের তিন বছর পূর্বে হযরত খাদীজা রাযি. ইন্তেকাল করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই বছর বা এর কাছাকাছি সময় অপেক্ষা করেন। তিনি হযরত আয়েশা রাযি.-কে ছয় বছর বয়সে বিবাহ করেন এবং নয় বছর বয়সে কাছে নেন। [১/৫৫১)
لَبِثَ سَنَتَيْنِ أَوْ قَرِيْبَاً مِّنْ ذَلِكَ (দুই বছর বা এর কাছাকাছি সময় অপেক্ষা করেছেন) এ থেকে এমন ভুল বোঝার অবকাশ নেই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতদিন অবিবাহিত থেকেছেন; বরং এর অর্থ হলো, হযরত খাদীজা রাযি.-এর মৃত্যুর পর প্রায় দুই বছর বা এর কাছাকাছি সময়—হযরত সাওদা রাযি. এবং হযরত আয়েশা রাযি.-কে বিবাহ করা সত্ত্বেও—কোনো স্ত্রীর কাছেই যাননি। নয়তো প্রথম হিজরীতে হযরত আয়েশা রাযি.-এর বয়স নয় বছর হয় কী করে?
একই পৃষ্ঠার আর একটি হাদীসে আছে, হযরত আয়েশা রাযি. বলেন,
تَزَوَّجَنِيَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَ أَنَا بِنْتُ سِتِّ سِنِينَ أَسْلَمْنَنِي إِلَيْهِ وَ أَنَا بِنْتُ تِسْعِ سِنِينَ
অর্থ : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বিবাহ করেছেন ছয় বছর বয়সে। আর নারীরা আমাকে তাঁর কাছে অর্পণ করেছেন নয় বছর বয়সে।
হযরত খাদীজা রাযি.-এর মৃত্যু-সাল এবং সে অনুযায়ী হযরত আয়েশা রাযি.-এর বিবাহ ও জন্ম-সাল নিয়ে হাদীস ও ইতিহাসে যত কথাই থাকুক, এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই যে, বিবাহের সময় তাঁর বয়স ছিল ছয় বছর; আর রোখসতের সময় ছিল নয় বছর। এই বর্ণনাটিই সমস্ত হাদীসগ্রন্থে রয়েছে। এ বিষয়টি হযরত আয়েশা রাযি. নিজেই স্পষ্ট করেছেন। তাঁর কাছে শুনেই উরওয়াহ বর্ণনা করেছেন। উরওয়াহ থেকে শুনে তাঁর ছেলে হিশাম বর্ণনা করেছেন। এই উরওয়াহ কে? ইনি হযরত আসমা রাযি.-এর পুত্র, যেই আসমা রাযি.-এর অনিশ্চিত বয়স ও বছরের 'ধুলো দিয়ে' হযরত আয়েশা রাযি.-এর সুনিশ্চিত বয়স ও বছরকে 'ঢেকে দেওয়া'র অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। [মাআরিফ: শুমারা নং: ১ জিলদ: ২২]
***
[পাঠকবৃন্দের মনে থাকার কথা, মাওলানা মুহাম্মাদ আলী লাহোরি একটি নতুন ফতোয়া প্রদান করেছিলেন। যার মূল কথা ছিল—ইসলামে বাল্যবিবাহ বৈধ নয়। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি দাবি করেছিলেন, হযরত আয়েশা রাযি.-এর বাল্যবিবাহের যে কথাটি প্রচলিত আছে তা ঠিক নয়। আমরা মাআরিফ: জুলাই, ১৯২৮ সংখ্যার খোলা কলামে তার দাবির বিপক্ষে বেশ কিছু আপত্তি উত্থাপন করেছিলাম। কয়েক মাস পর মাওলানা সাহেব বন্ধুমহলের তাগাদায় নিজস্ব পত্রিকায় আমাদের উত্থাপিত আপত্তিগুলোর নিরসন করার চেষ্টা করেছেন। সত্য অন্বেষণ ও প্রতিষ্ঠার স্বার্থে তার প্রতি-উত্তর পর্যালোচনা ও ভ্রান্তিগুলো সুস্পষ্ট করা সমীচীন মনে করছি।] [মাআরিফ, শাযারাত: জানুয়ারি, ১৯২৯]

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00